কৌশিক মিত্রের নিবন্ধ

ইলিশ মারির চর: একটি পৃথক সন্ধানে

“পদ্মায় ইলিশ মাছ ধরার মরশুম চলিয়াছে। দিবারাত্রি কোনো সময়েই মাছ ধরিবার কামাই নাই। সন্ধ্যার সময় জাহাজঘাটে দাঁড়াইলে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অনির্বাণ জোনাকির মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জেলে–নৌকার আলো ওগুলি। সমস্ত রাত্রি আলোগুলি এমনিভাবে নদীবক্ষের রহস্যময় ম্লান অন্ধকারে দুর্বোধ্য সংকেতের মতো সঞ্চালিত হয়। একসময় মাঝরাত্রি পার হইয়া যায়। শহরে, গ্রামে, রেলস্টেশনে ও জাহাজঘাটে শ্রান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষরাত্রে ভাঙা ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি উঠে। জেলে নৌকার আলোগুলি তখনো নেভে না। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ। লণ্ঠনের আলোয় মাছের আঁশ চকচক করে, মাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মতো দেখায়।” (পদ্মা নদীর মাঝি)।

এ লেখা আমাদের কাছে বহু পরিচিত, বারংবার পঠিত। এ লেখার তুলনা নেই। এ লেখা অমৃত সমান। আসুন বন্ধু, এবার আমরা একটু ঘুরে আসি গঙ্গার বুক থেকে।

“বিদ্যুতের আলোয় দেখা যায় ইলিশের জাল ফেলে ভাসতে থাকা কালো কালো নৌকাগুলো। দ্যাখা যায় ওপারের গাছপালার বৃষ্টি-ভেজা স্তব্ধ কালো রেখাটা।… পুব পারের বুক জুড়ে অনেকটা দূর পর্যন্ত জ্বলে বিড়লা কোম্পানির চটকলের আলোর মালা।… এদিকে পাঁচটা চিমনিওয়ালা লালরঙা পাওয়ার হাউসের ঘর।…। এক ফটুকে পোলের ধাপে ধাপে সেই মাঝ রাতের ঘন অন্ধকারে ছেঁড়া ছাতা বা তালপাতার পেখে মাথায় দিয়ে বসে আছে পাজারী মেয়েপুরুষরা কখন ভাঁটা পড়লে জাল উঠবে তার অপেক্ষায়। তারপর বিরাট একটা অংশ জুড়ে বুক শিউরে ওঠা ধস নামছে প্রতি বছরে বছরে, ইলিশ মারির বুকের চরে এগিয়ে চলেছে ধান জমিকে গ্রাস করতে।… ইলিশ মারির চরের আসল মানুষরা হল জেলে”। (ইলিশ মারির চর, আবদুল জব্বার)।

‘পদ্মা নদীর মাঝি’ বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক, আর ‘ইলিশ মারির চর’?? সম্পূর্ণ পাদপ্রদীপের অন্ধকারে তার থেকে যাওয়া, আলোচনার বৃত্তের হাজার যোজন দূরে তার অবলুপ্তপ্রায় অবস্থান!

কেমন সেই জেলেদের জীবন যা নাকি উঠে আসে ‘ইলিশ মারির চর’-এর পাতায় পাতায়:
“ইলিশের মরসুমে… পুরুষরা ঝেঁটিয়ে চলে যায় গাঙে। প্রৌঢ়া আর বুড়োরা যায় ইলিশের বাজরা মাথায় নিয়ে পাজারী হয়ে গঞ্জে হাটে বাজারে” পুরুষরা ফেরে। “ট্যাঁক ভর্তি ওদের টাকা। চোখ দুটো কুঁচের মত লাল। হাতে দেড়সের সাতপোয়া ওজনের কাজল গৌরী ইলিশ। এ মাছ তারা কিছুতেই বেচবে না। ঘরের মাগছেলেরা খাবে। দারুণ তার আস্বাদ।… তবে দশ বারোটা জাল আর নৌকা খাটছে যার সেই মহাজনের কথা আলাদা। তাকে দিতে হয় সবকিছু। মাছ, টাকা, মান, ইজ্জত মায় জীবন পর্যন্ত।… তাদের বখরা জাল নৌকোর ভাড়া হিসেবে আড়াইটে। বাকিটা দাঁড়ি মাঝিদের। চারটে মাছ পাও মহাজনের আড়াইটে, বাকিটা হবে সাড়ে তিন বখরা, দু-জন দাঁড়ির দুবখরা একজন মাঝির দেড় বখরা। মহাজনের হাত দিয়েই হবে সে ভাগ-বাঁটোয়ারা। কোন বছর কিরকম মাছ হয় বিধাতা জানে।… বদর গাজী আর বরুণ দেবের মানত পুজো দিয়েই জালে যায় ওরা। মাছ বেশী পড়লে, দাম কম হোকনা, তাতেই পোষায় বেশী। নইলে মাছ আককারা হলে হাঁড়ি শিকেয় ওঠে— আশায় আশায় মহাজনের ঘরে চলে যায় থালা, ঘটি, বাটি; ধরে আমাশা, পেটের অসুখ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া। টো টো করে জাল ফেলে রোদে রোদে ঘোরাই তখন সার হয়।”

বিড়লাপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বজবজ থানার একটি অখ্যাত জনপদ, গঙ্গার তীরে বিড়লা কম্পানির শতাব্দীপ্রাচীন জুট মিলগুলির অবস্থিতির কারণেই হয়তো-বা এ হেন নামকরণ। আর পাশেই বয়ে চলা গঙ্গার বুকের উপর প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে তৈরি হওয়া ইলিশ মারির চর যাকে কেন্দ্র করে কেটে যায় গঙ্গার বুকে স্থানীয় ভ্রাম্যমাণ মৎস্যজীবিদের ইলিশ শিকারের মরসুম, তৈরি হয় জীবনের আবর্তলেখ। জব্বার সাহেব এই জনপদেরই মানুষ। দীর্ঘ দিনের নিবিড় সহাবস্থান, পরিচিতি এবং অপার মমত্ববোধে তিনি সনাক্ত করেন এই মানুষগুলির জীবন আলেখ্য, এক নিরালম্ব এবং মর্মস্পর্শী কথনে উঠে আসে প্রান্তিক জনজীবনের চালচিত্র, সম্প্রদায়গত সহাবস্থানের স্বরূপ এবং একটি অখ্যাত জনপদের সামাজিক চলনের সর্পিল ইতিবৃত্ত।

গ্রামীণ বুনিয়াদি অর্থনীতির অপ্রাতিষ্ঠানিক রূপের চিত্র এ উপন্যাসে ধরা দেয় এক অনিবার্য স্বতঃস্ফূর্ততায়! মহাজনী শোষণ ঠিক কতখানি নির্মম এবং বছরের পর বছর গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিশীর্ণ করেছে তার একটা সুস্পষ্ট রেখাচিত্র পাওয়া যায় তরবদি এবং তারিণী মাঝির জীবনবৃত্তান্তের মধ্যে দিয়ে। মনে রাখতে হবে এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ব্যাপারটি এত সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি তখনও। প্রাকৃতিক সম্পদের উত্তোলন এবং তাকে বাজারজাত করার মধ্যে যে-অসংখ্য মানবশৃঙ্খলগুলি রয়ে গেছে, যা আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক তার একটা সুন্দর রূপরেখা পাওয়া যাচ্ছে এ উপন্যাসে। মাছ ধরার জাল তৈরির সূক্ষ্ম শিল্প, রাতের পর রাতের বৃষ্টিতে ভিজে প্রকৃতির চরম অনিশ্চয়তার হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নদীগর্ভ থেকে সোনালি ফসল তুলে আনার কঠিন প্রক্রিয়া, ঘাটে বসে থাকা খুচরো মাছের ব্যাপারীদের (‘পাজারী’) রাত জাগা উদ্বিগ্ন মুখ, নৌকো ঘাটে ভিড়লেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ সংগ্রহের জন্য লাফিয়ে যাওয়া, নিজেদের মধ্যে তুমুল কলহ, বাদ বিসংবাদ, বিকি-কিনি শেষে ঘাট-সংলগ্ন ভাটিখানায় তাড়ির গ্লাসে উজাড় হয়ে যাওয়া ধীবর জীবন এক অমলিন কারুণ্যে উপন্যস্ত হয় এ আখ্যানে। জলজীবনের পাশাপাশি উঠে আসে জমিমালিক-ভাগচাষীর উৎপাদন-বিনিময় এবং শস্য ভাগাভাগির সুপ্রাচীন কড়চা।

জয়নদ্দি, কানাই, হরেন, কাশেম প্রমুখ মানুষগুলির খণ্ডজীবন বৃত্তান্তের মধ্যে দিয়েই ফুটে ওঠে হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা একটি পেশার মানুষগুলির অবহেলিত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, হাসি-কান্না, ঘটনা-দুর্ঘটনার, সারাৎসার। খুচরো ব্যাপারী পদী অথবা হরেনের স্ত্রী সিন্ধুর ফ্রয়েডীয় নির্যাসে আসঞ্জিত চলাফেরা এ উপন্যাসের আর একটি নান্দনিক দিক।

তারিণী অথবা তরবদি মহাজনের কাছ থেকে জমা নেওয়া জেলেনৌকায় কেটে যায় ধীবর জীবনের মরসুমী রাত্তির। জয়নদ্দি মূল মাঝি, হয়তো-বা এ উপন্যাসের মূল চরিত্রও, সঙ্গে দুই দাড়ি হরেন, কানাই। জোয়ারের প্রতীক্ষা, সর্বশক্তিমানের কৃপার উপর ভরসা করে গাঙের বুকে মিলে দেওয়া জীবন… চক্রবৃদ্ধি হারে ধার বেড়ে চলে মহাজনের খাতায়, কে রাখে কে বোঝে তার হিসাব, যেটুকু অলংকার, সম্পদ থেকে যায় বাঁধা পড়ে মহাজনের কাছে, তবুও অন্ধকার রাত্তিরে নদীর বুকে জয়নদ্দির গলা থেকে ভেসে আসে নবীন বাউলের আখড়া থেকে শিখে আসা লালনের গান “মলে পাবো বেহেস্ত খানা, তা শুনে আর মন মানে না। বাকির লোভে আসল পাওনা, কে ছেড়েছে এই ভুবনে।।” দীর্ঘ নৈশ যাপনের পারস্পরিক বন্ধন ছেড়ে মাঝি হওয়ার বাসনায়, জয়নদ্দির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে কানাই চলে যায় তরবদির তাঁবে, ভুল বোঝাবুঝি, তিক্ততার শুরু। জয়নদ্দি হরেনকে নিয়ে আশ্রয় নেয় তারিণী মহাজনের কাছে। জীবন বহমান।

মহাজন তারিণির ছেলে রতন এক অন্যভুবনের বাসিন্দা, কলকাতার কলেজ থেকে বি. এ. পাস করে এসে সে স্বপ্ন দেখে শোষণমুক্ত সাম্যবাদী সমাজের। প্রাগুক্ত ধীবরদের নিয়ে এক অসম লড়াই সে শুরু করে এলাকায়। সঙ্গী হয় তার বোন রোহিণী। আন্দোলনের বীজ বুনতে থাকে সে। লড়াই তার মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে বুঝি-বা তার বাবার বিরুদ্ধেও। এইখানেই এ উপন্যাসের সফলতা, লেখক শুধু উত্তরণের স্বপ্ন দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যাননি তিনি সফলভাবে দেখাতে পেরেছেন সাম্যবাদী আন্দোলনের জন্ম হয় পুঁজিবাদী বৈভবের মধ্যেই, অমেয় ঐশ্বর্য আর ভোগবাদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মুক্তির বীজ। রতন আর তারিণীর মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রাম তাই এ উপন্যাসের এক মহৎ দিক। রতন অনায়াসে চলে যেতে পারে তাই জয়নদ্দির ঘরে, সেখানে তৈরি হয় ভবিষ্যৎ সংগ্রামের রূপরেখা।

“চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে রতন। একটা বালিশ এনে দেয় শকিনা (জয়নদ্দির স্ত্রী)। জয়নদ্দি খাতা পেনসিল বের করে এনে বসে। রতন বলে যায় হিসেবটা। কুড়ি টাকাকে [ধরে নেওয়া চলতে পারে, এই কুড়ি টাকাটা এক নৈশ অভিযানের উপার্জন] ছ বখরা কর… তিন ছয়ে আঠারো। থাকে দু-টাকা মানে বত্রিশ আনা। ছয় দিয়ে ভাগ কর। পাঁচ ছয় ত্রিশ আনা। থাকে দু-আনা— ওটা ছেড়ে দাও— বিড়ি খাবার দাম।… জয়নদ্দি হিসেব করে যায় খাতা পেনসিলে। কিছুক্ষণ পরে বলে, মাহাজন আড়াই বখরায় পাবে আট টাকা সাড়ে চার আনা। মাঝি দেড় বখরায় পাবে চার টাকা সাড়ে পনেরো আনা। আর দাঁড়ি দু-জন দেড় বখরায় তিন টাকা পাঁচ আনা করে।

হ্যাঁ। ঠিক হয়েছে। তাহলে মহাজনের আড়াই বখরার পাওনা কত কমল দেখলে ত।

সামান্য কুড়ি টাকার হিসেবেই দেখ না, কোথা শালা সাড়ে বারো টাকা আর কোথা আত টাকা সাড়ে চার আনা।”

জয়নদ্দি বলে, “মুই যে লৌকো জমা লিইচি তোমাদের, মোকেও ত তাহলে ঐ নিয়মে দিতে হবে?”

“তা ত হবেই। সেইটাই ত আরও জোরদার হবে। হিসেবটা সবাইকে বুঝিয়ে দাও। একটা জোট করো। আমার মনে হয় সবাই মত দিতে পারবে।”

অনেক অস্বস্তির মধ্যেও আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। তারিণী, তরবদি দু-জনেই স্তম্ভিত হয়ে যায় জেলেদের এই স্পর্ধায়। শুরু হয় দমন পীড়ন। বন্ধ করে দেওয়া হয় নৌকা জাল দেওয়া। সে এক দুঃসহনীয় যাপন। মরসুম চলে যেতে থাকে, মাছ ধরা বন্ধ, জেলের ঘরে হাঁড়িতে টান পড়ে, তরবদি লোকসানের হিসেব গুনতে থাকে, এই অবসরে চড়াও হয় জেলেদের উপরে। তারিণী আগুন হয়ে ওঠে, সে বুঝে যায় এতে ছেলের হাত আছে। রোহিণীর হাত দিয়ে বাবার টাকা চুরি করে জয়নদ্দিদের মধ্যে বিলিয়ে দেয় রতন, আন্দোলন তীব্রতর হয়। শেষমেশ তারিণী হার স্বীকার করে নেয়, হার মেনে নিতে হয় তরবদিকেও। এই অসম আন্দোলন জয়যুক্ত হয়। এই সফলতার মধ্যেও লেখক কিন্তু বিস্মৃত হতে পারেন না সাম্যবাদী আন্দোলনের জয়যুক্ত হওয়ার বিপজ্জনক পরিণতির কথা। তাই তারিণীর চৈতন্যোদয়ের মধ্যে দিয়ে, পুত্রের প্রতি তার সতর্কবাণীর মধ্যে ফুটে ওঠে এক অতলান্তিক বিপন্নতা।

“খোকা ওদের জন্য তোর মনে যদি সত্যিই ভালবাসা থাকে, তাহলে তুই মানুষ হিসেবে আমার থেকেও অনেক বড় হবি। আর তা যদি না থাকে তবে ভণ্ডামির মধ্যে পড়ে সংসারের ছাপোষজীব আমার চেয়েও অনেক খারাপ হয়ে যাবি।”

এ-সব মিটে গেলে রতন লেগে পড়ে গ্রামে স্কুল তৈরির কাজে, সেও এক কঠিন কাজ। পাশে থাকে বোন রোহিণী। কলকাতার কলেজ দিনের সঙ্গী প্রদীপ আনোয়ার যোগ দেয় তার সঙ্গে। প্রদীপ রোহিণীর মিষ্টি প্রেমের আঁকিবুকি কিছুক্ষণের জন্যেও পাঠককে নিয়ে যায় অন্য জগতে। সামাজিক বিরুদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করে কীভাবে এ প্রেম এগিয়ে যায় পরিণতির দিকে সেও এ উপন্যাসের আরও একটি মাধুর্যময় দিক।

সফল জয়নদ্দির নতুন জীবনের সঙ্গী হয়ে ওঠে হরেন আর কাশেম, তাদের নিয়ে এবার তার পাড়ি দেওয়া সমুদ্রের গভীরে। নিত্য নতুন অনিশ্চয়তার নিগড়ে বাঁধা পড়ে পরিবারগুলি। তরবদির পরামর্শে কিছু টাকার লোভে কানাই তার দুই বন্ধুকে নিয়ে হরেনের স্ত্রী সিন্ধুকে খুন করে পৈশাচিক উন্মত্ততায়। আর এ ঘটনার পরেই ফিরে আসে জয়নদ্দি, হরেনরা। প্রচণ্ড অপরাধবোধে এবং তরবদির বিশ্বাসঘাতকতায় একসময় কানাই ফাঁস করে দেয় এই জঘন্য কুকর্মের ইতিবৃত্ত। আগুনে লড়াই শুরু হয়। কানাই তরবদি-সহ বাকি দু-জন গেপ্তার হয়, তরবদি প্রভাবশালী উকিলের সহায়তায় জামিন পেলেও তার জীবনের ইতি ঘটে হরেনের প্রতিশোধ নেওয়ার মধ্যে দিয়ে। কঠিন লড়াইয়ের পর হরেনকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। গ্রামীণ জীবন এগিয়ে চলে নিজস্ব গতিতে। এখানেই কাহিনির ইতি।

খুব সংক্ষেপে হয়তো বলে দেওয়া গেল এ উপন্যাসের কাহিনি। কিন্তু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আগাগোড়া শৈল্পিক উপাদানে পাঠকসত্তাকে বিবশ করে এগিয়ে নিয়ে যায় কাহিনির বুনোট। প্রতিটি অনুচ্ছেদে লুকিয়ে আছে লোকায়ত গ্রামীণ জীবনের নিপুণ ব্যবচ্ছেদ, সামাজিক নৃ-বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ, সাম্যবাদী সমাজ গঠনের নিরলস স্বপ্ন এবং নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের অশ্রুসজল আখ্যান। কথা হচ্ছে আবদুল জব্বার বেঁচে আছেন ‘বাংলার চালচিত্র’-এ কেন-না তাঁর এই একটি মাত্র বই বোধহয় ছাপার অক্ষরে লভ্য। আমরা মনে রাখিনি ‘বাংলার চালচিত্র (উত্তর পর্ব)’, ‘বাংলার নৈবেদ্য’ এবং একইভাবে ‘ইলিশ মারির চর’-কেও। আবদুল জব্বারকেই বা আমরা ক-জন মনে রেখেছি। আন্তর্জালে ‘বাংলার চালচিত্র’-এর উপর শ্রী নীলাঞ্জন শান্ডিল্যের একটি রিভিউ এবং মুখবইয়ে শ্রী অমিতাভ পালের একটি স্মৃতিচারণ। এই তো মাত্র লভ্য! নোদাখালির কোনো অখ্যাত গ্রাম এবং অখ্যাত কবরস্থান… ঝোপে ঝাড়ে ঢাকা… কয়েকটা ধাড়ি ছাগল বাড়ি ফেরার জন্য মালিকের অপেক্ষায়… এখানেই তো শুয়ে আছেন দেশভাগোত্তর এপার বাংলার লোকায়ত গ্রামীণ জীবনের চালচিত্র এঁকে যাওয়া শ্রেষ্ঠ শিল্পী আবদুল জব্বার। বইপাড়া কি একটু ভাববে না তাঁর সৃষ্টিগুলির পুনর্মুদ্রণের কথা!!

Spread the love

4 Comments

  • ভীষন ভালো লাগলো | সহজিয়া বেঁচে থাকে মনে, আড়ম্বরের তোয়াক্কা সে করেনা |

    হৃদয়ে অনির্বান !!!!!

    গৌতম বসু,
  • অসাধারণ নিরীক্ষণ,,, এই উপন্যাসে চিরাচরিত মহাজনী শোষণে জর্জরিত অসহায় জেলেরা ঘন কালো মেঘের মাঝে এক চিলতে রুপোলি ঝিলিকের আলোতে দেখতে পেয়েছেন সাম্যবাদের মুক্তির পথ।
    হার্দিক শুভেচ্ছা জানাই কৌশিক মিত্র কে এই ফান কালচার এর মধ্যেও সমুদ্রের অতল থেকে মণি-মাণিক্যের সন্ধানের দেওয়ার জন্য।

    Jaya sengupta,
  • খুব খুব ভালো লাগলো।

    মহুয়া সেনগুপ্ত,
  • গৌতম বাবু, জয়া দি এবং মহুয়া দি কে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। মূল উপন্যাসটি এপার বাংলায় মুদ্রিত হয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছলে, সেইটে হবে আমাদের সবথেকে বড় প্রাপ্তি।

    কৌশিক মিত্র,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *