আনসারউদ্দিনের সাক্ষাৎকার

আনসারউদ্দিনের সঙ্গে কথোপকথনে রবিউল ইসলাম

বাংলা আকাদেমির সোমেন চন্দ পুরস্কার থেকে বর্তমান সময়ে প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে উপন্যাস অন্তর্ভুক্তি— সাফল্য সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

— প্রেসিডেন্সীতে যে পাঠ্য হয়েছে এ খবরটা আমি জানতাম না। কোথাও পাঠ্য হবে— আমার এরকম কোনো ধ্যান ধারণা ছিল না। আমার মতো একটা গ্রাম্য লেখকের, যার কোনো বেস্ নেই, যার কোনো পরিচিতি নেই, সেই লেখকের কোনো বই পাঠ্য করবে এটা আমি বুঝতে পারিনি। যখন শুনলাম বন্ধু-বান্ধবদের মুখ থেকে, যে এরকম পাঠ্য হয়েছে, তখন আমি একটু আশ্চর্যই হলাম।

আপনি কীভাবে জানলেন যে আপনার বই পাঠ্য হয়েছে?

— আমার বন্ধু নবদ্বীপের সিরাজুল ইসলাম, মাস্টারমশাই, সাহিত্য করে, সে বলল যে আনসার ভাই আপনার বই পাঠ্য হয়েছে। আমি বললাম, কীরকম ব্যাপার! বলল, হ্যাঁ আমার মেয়ে তো প্রেসিডেন্সির ছাত্রী। ওদের পড়াচ্ছে এটা। তারপর কয়েকজন বলল যে না পাঠ্য হয়েছে আমরা নেটে দেখেছি। তবুও আমার মনে তেমন দাগ কাটেনি। পাঠ্য হলে একজন লেখককে তো জানাবে যে তার একটা বই পাঠ্য হয়েছে, আপনার বই আমরা পাঠ্য করতে চাই। এখনও জানায়নি কেন জানিনি। তবে যিনি পড়াচ্ছেন মুস্তাক আহ্‌মেদ, তার সঙ্গে আমার টেলিফোনে একটু কথা হয়েছিল অন্য লেখা প্রসঙ্গে। আমার ‘গো-রাখালের কথকতা’র উনি আলোচনা লিখেছিলেন, সমালোচনা। কলম পত্রিকায়। সেই সূত্রে ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। মারুফ হোসেনের থেকে ওনার নাম্বারটা নিই। তারপর উনি বললেন যে আপনার বই তো আমরা পড়াচ্ছি। আমরা এম.এ ক্লাসে পড়াচ্ছি। তারপর শুনিই থাকলাম। এরপর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করিনি। পড়াচ্ছে, পড়াচ্ছে। এতে আমার কোনো বিশেষ উতালতা নেই। কারণ আমাকে তো জানায়নি ওরা। জানাতে পারতো। এটা একটা লেখকের স্বীকৃতিও বটে।

আপনার সমস্ত লেখাই গ্রামকেন্দ্রীক, গ্রামের মানুষদের নিয়েই, তো নিজের গ্রামের মানুষের কাছে আপনি লেখক হিসেবে কতটা পরিচিতি পান?

—গিরামে কিন্তু পড়াশুনার, সাহিত্য পড়ার বা কবিতা পড়া, সেই চলটা কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি না। কোনো কোনো ছেলে, যারা একটু পড়াশুনা করে, সেই সংখ্যাটা খুবই কম। মানে আমি এই গিরামের একটা ছেলে, এই গিরামের কোনো কবিতা নিয়ে আলোচনা করব। আমি বাদে, আরেকটা কাউকে জুগাড় করতে পারব না। পাশে বসে আলোচনা করার মতো পরিস্থিতি নেই। অধিকাংশ গিরামে নেই, পড়াশুনার ব্যাপার, গল্প, উপন্যাস, সাহিত্য— এগুলো তো নেই। হয়তো কোনো গিরামে আছে কিন্তু সে আর কাউকে সঙ্গী পায় না। তার জন্য তাদের সাহিত্য করতে হয় গ্রাম থেকে বেরিয়ে গিয়ে। একটা গোষ্ঠী তাদের তৈরি করতে হয় মত বিনিময়ের জন্যি। বন্ধু-বান্ধব গিরামে তার তৈরি হয় না। গিরামে প্রধানত মানুষের রুটি-রুজি এইটা হচ্ছে বড়ো ব্যাপার। মানে এর বাইরে যে সাহিত্য সাধনা, সাহিত্য কী— এই বোধ তাদের কাছ থেকে অনেক দূরি। হ্যাঁ যাদের তৈরি হয় ধরো তাদের নিজের থেকেই তৈরি হয়। বা তার কোনো প্রতিভার গুণি। সেটাই এসে যায়। পড়াশুনা যেটা দরকার হয় সাহিত্য বুঝতি গেলি— এটা তো বাইরের ব্যাপার, এর থেকে রুটি-রুজির তো কোনো সংস্থান নেই। এটা একান্ত নিজস্ব ভালোলাগা। সেই ভালোলাগার ক্ষেত্রটা কিন্তু বই তৈরি করতে পারে না। আমাদের গ্রামাঞ্চলে যেটা হয় পাঠ্য বইয়ের বাইরে মানুষ যেতে চায় না। তা আমার গিরামের মানুষ জানে না যে আমি কীরকম লিখি না লিখি। বা অনেকে ভাবে ও কী লেখে। ওরা একটা দরখাস্ত লেখাকেও লেখা মনে করে, একটা গল্প লেখাকেও লেখা মনে করে। কাজে আমি যে একটা লিখছি একটা দরখাস্ত সেও লেখা, গল্প সেও লেখা। গ্রামের মানুষদের মধ্যে সাহিত্য বলে কোনো বোধ নেই। আবার কিছু লোক আছে, যারা একটু লেখাপড়া জানে অথচ এই দিকে ততটা এগোতে পারে না। বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে ওহ্ পুরস্কার পেয়েছে আনসার ওহ্ কোথায় থেকি সব কিনে টিকে এনে ঘর করে রেখিছে।

আরেকটা বিষয় দেখা যায় যে গ্রামের দিকে কবিতা চর্চা বেশি হয় গল্প উপন্যাসের চেয়ে। এই ব্যাপারে আপনার কী মত?

— কম এই কারণেই, কবিতা হচ্ছে সাহিত্যের নাড়ির জায়গা। আমরা যা কিছু শুরু করেছি কবিতা দিয়েই। গ্রামের মানুষ অনেক সময় মুখে মুখে ছন্দের আকারেও কিছু কবিতা বলে শ্লোক বলে এবং অন্যান্য সমস্ত কতগুলি প্রবাদের আকারে কবিতার ছন্দে তারা বলে— যার ফলে কবিতা কিছুটা তারা বোঝে। সেই অর্থে আধুনিক কবিতা বোঝে না কিন্তু ছন্দোবদ্ধ একটা কথা, যে ঘুমপাড়ানির ছড়া— সেটাই তারা কবিতা বলে ভাবে। কিন্তু এর বাইরে যে গল্প, উপন্যাস, মানুষের জীবন আখ্যান এগুলা নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে তেমন উৎসাহ নেই।

আপনি কি কবিতা লিখেছেন?

— আমি কবিতা লিখেছি, হ্যাঁ লিখতাম। একটা বয়সে তো সবাই লেখে যেমন, উঠে আসে। আমার শ্রদ্ধা থাকত কবিদের উপরে এবং এটা কী বলব যে আমি খুব পড়াশুনা করেছি তবে কবিতা খুব বেশি পড়িনি। গল্প-উপন্যাস পড়তাম বিশেষ করে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নাম শুনেই একটা শ্রদ্ধা তৈরি হতো। এবং খুব ইচ্ছে ছিল, প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল যে কবি হব। তার জন্য কবিতা কিছু লিখেছি দু’য়েকটা। প্রকাশও পেয়েছে। আর সবচেয়ে ব্যাপার কী আমার ধারে পাশে কাউকে পেতাম না। একটু মাঠ-ঘাট খাটতাম, আলাদা সাহিত্যচর্চার জন্য যে কোথাও যাব বা কেউ আছে আমার পাশে, কোনো পত্রিকা আছে আমি জানতাম না। একদম অজানা একটা জায়গায়— কিছু কবিতা আমি লিখেছিলাম। তারপরে একটা ছোটোগল্প লিখে ফেলি যে-কোনোভাবে।

প্রথম কবিতা দিয়েই শুরু তাহলে?

— হ্যাঁ প্রথম কবিতা দিয়েই শুরু, কবিতার একটা ছোটো খাতাও ছিল। আধুনিক কবিতাও বুঝতাম না এডাও ঠিক। তবে আমার বিশ্বাস ছিল যে আমি যদি আধুনিক কবিতা রপ্ত করতে পারি— আমি লিখতে পারব। কবিতা লিখেছিলাম তবে একেবারে খারাপ হত তা কিন্তু হত না।

তেমন কোনো আপনার কবিতা মনে আছে?

— “মধুমিতা তোমাকে পায়নি বলেই কবি হয়ে গেছি/ তুমি দৃষ্টির বাইরে বলেই আমি অন্ধকারে ফুল ফোটাই/ফুল ফোটাই কবিতার /মধুমিতা তুমি কবিতা হয়ে গেছ”।

তা এইরকম। একটু বড়ো কবিতা সবটুকু মনে নেই।

“যতদিন জীবনে জীবন আছে,/বেঁচে আছি বাঁচার অনুভবে/ দর্পণ রেখেছি দূরে/পৃথিবীর ভালোবাসা অণুগুলো/ ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে, ভালো থেকো।/ শাড়ির আঁচলটা গুটিয়ে নিয়ো সাবধানে/ কারণ ওটাতে আমি মুখ মুছেছিলাম”।

লেখা আমার মনে নেই কিন্ত এরকম একটা শুনতে ভালো লাগে আরকি তাদের ভেতরে কবিতা থাক আর না থাক। এইরকম বেশিরভাগই, বয়সে একটা প্রেমের ব্যাপার থাকে, আসে প্রেমের কবিতা। বা কিছু জীবনযাত্রার কবিতা বাস্তবতার ক্ষেত্রে লিখেছি। এখন সমস্যা হল কী ছাত্র হিসাবে ভালো ছিলাম না পরিষ্কার বলাই ভালো। কারণ আমাদের যে কেউ একটা ভুল ধরিয়ে দেবে সেটা কেউ ছিল না। মাস্টারমশাইদের দেখে ভয় পেতাম। এরপর বুঝতে না পারলেও আমরা বলতে পারতাম না যে আমরা বুঝতে পারিনি। বাড়ি এসে যে ভুলটা কেউ দেখিয়ে দেবে বা কারোর কাছে যাব সেরকম কেউ ছিল না। যার ফলে আমরা লেখাপড়ায় এগোতে পারিনি। বিশেষ করে অঙ্ক একটা দুরূহ ব্যাপার ছিল আমার কাছে। যে অন্য বিষয় যদি ভুল হয় কখনও কোনো জায়গায়, বিশেষ করে ইতিহাসের উত্তর দিতে গিয়ে, দশের মধ্যে তিনও দেবে। কিন্তু অঙ্কে যদি উত্তর না মেলে আমাকে দশের মধ্যে, আমি কিছুই পাব না, শূন্য। এইজন্য অঙ্কটা আমার মাথায় আসত না। এখনও পর্যন্ত জীবনে কোনো কিছু আমি মেপে করতে পারিনি। তা এই ছাত্র হিসাবে দুর্বল ছিলাম, রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলাম। রাজনীতি, চাষবাস– ছাত্র ভালো ছিলাম না বলেই চাকরি হয়নি। একটা ইস্কুল করতাম, চৌগাছা ইস্কুল। আমার বাড়ি থেকে প্রায় ১২ কিমি দূর। সাইকেলে করে যেতাম। দীর্ঘ চৌদ্দ-পনের বছর ইস্কুলটা অর্গানাইজ করেছি। ইস্কুল চালিয়ে, হয়তো ভেবেছিলাম অনুমোদন পাবে কিন্তু সে আর তো অনুমোদন পায়নি। আর এই সময়ের মধ্যে সকালবেলায় মাঠে খাটতাম।

স্কুলটা কি স্বাক্ষরতা মিশনের অন্তর্ভূক্ত?

—না না ওটা আমরা জুনিয়র হাইস্কুল দিয়েই আমরা চালিয়েছিলাম। তা সেই ইস্কুল হয়নি। তখন আমার অভাবও ছিল। মানে দুটো খেতে পেতাম ঠিকই, তারপর জীবনযাত্রার আরো যে সামগ্রী দরকার সেগুলির ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তাম। ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ ইত্যাদি। তা ওই সময় ওই ইস্কুলে পরীক্ষা হতো, পরীক্ষার কিছু খাতায় ফাঁকা সাদা খাতা ছাত্রদের থাকত, কোনো কোনোটায়। পৃষ্ঠা নিয়ে যেগুলো ওরা লিখত না। আমি একদিন ভাবলাম যে, ছেলেমেয়েদের খাতা কিনে তো দিতে হয়– তা ফাঁকা পাতাগুলো ছিঁড়ে নিয়ে যদি একটা খাতা বানিয়ে দিই তাইতে একটু সুবিধা হয়। ওরা কিছু অঙ্ক-টঙ্ক করতে পারবে বাড়িতে বসে। দিয়ে সেই খাতা আমি সাদা সুতো দিয়ে সেলাই করে দিই। তারপরে তখন আমি খুব পড়তাম, বইপত্র। উপন্যাস পড়তাম সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন বই পড়তাম। পড়তে পড়তে আমার নিজেকে মনে হল যে, আমি লিখতে পারব। মস্কো করতে গেলাম সেই খাতার উপরে, যদি কোনো কিছু লেখা যায় কিনা।

এটা ঠিক কতদিন আগে?

— এটা ১৯৯১ সালে। ওরা যে খাতা জমা দিত ছাত্র-ছাত্রীরা সাদা পাতা চলে আসত একটা না একটা। ওরা যে খাতা জমা দিত সেগুলি মুদির দোকানে বিক্রি হয়ে যায়। তা কাগজ ছিঁড়ে বানানো ওদের সেই খাতায় আমি একটু মশ্‌কো করেছিলাম। খাতাটা ওদের না দিয়ে আমি নিয়ে, আমি ভাবি একটা কিছু লিখতে পারি কি না দেখি। তা শুরু করতে করতে চার পাতার মধ্যে একটা লেখা শেষ হয়ে গেল আপনা-আপনি। পড়ে দেখলাম একটা ভালো গল্প হয়েছে মনে হচ্ছে।

কী নাম ছিল গল্পটার?

—গল্পটার নাম হচ্ছে ‘আবাদ’। সে গল্পটা আমাদের গিরামের একজন মাস্টার মশাই ছিলেন বাড়ির কাছে। উনি একটু পড়াশোনা ভালোবাসতেন। আমি বললাম চাচা শোনেন তো একটু দেখি একটা, আমি গল্পটি পড়লাম মিনিট-পনের, তো উনি বললেন, ‘এটা তো খুব ভালো গল্প’। উনি তখন ‘কাফেলা’ পড়তেন। উনি বললেন, ‘তুমি লেখ’। আমাকে উনি আনসার আলি বলতেন। যে আনসার আলি তুমি লেখ। সেই গল্পটা ছিল আর কিছু কবিতা ছিল আমার কাছে যেটা আগে লেখা। তারপরে নদিয়া বইমেলা হচ্ছে সেটা অষ্টম-নবম হবে এরকম। আমাদের সিংহাটির মাস্টার মশাই শওকত আলী, উনি তখন সাহিত্য করতেন। বাংলার মাস্টার মশাই। আমি বললাম শওকত ভাই বইমেলায় যাব ভাবছি, শুনছি কবি সম্মেলন হবে। আমি জীবনে কোনো কবিকে দেখিনি। দেখিনি মানে, আমি ভাবতাম কবিরা মরা হয়। বইয়ের পাতায় দেখি জন্ম এত সালে, মৃত্যু এত সালে, এই বই লিখেছেন। তাহলে কবি সম্মেলন জ্যান্ত কবিদের দেখতে পাওয়া যাবে, এই আগ্রহটা ছিল কবি দেখব। উনি বললেন, তুমি তো একটু আধটু কবিতা লেখ তুমি কবিতা পড়বে? আমি বললাম, আমি চিনি না কাউকে। উনি বললেন, আমি লিখে দিচ্ছি। দিয়ে মোহিতবাবু, মোহিত রায় গবেষক। ওর কাছে লিখে দিল যে– মোহিত দা, এ আনসারউদ্দিন। এ ভালো ছেলে। এ একটু-আধটু কবিতা লেখে-সম্মেলনে একে যদি একটা কবিতা পড়তে দেওয়া হয়। তারপর সেই কবিতা সম্মেলনে গিয়ে অনেক কবিতা শুনলাম। কবিদের দেখলাম, শোনার থেকে বড় কথা। যে এরা সব জীবন্ত কবি। এতদিন তো এদের দেখিনি। আমিও পড়লাম একটা। পড়ে নেমে আসি সেই সময় একজন কবির সঙ্গে দেখা হল। উনিও পড়েছেন পড়ে নেমে আসছেন। আপনার বাড়ি কোথায় নতুন ন’পাড়ায়। আপনার বাড়ি, বেথুয়াডহরী, আমি ‘বনামী’ পত্রিকার সম্পাদক। আপনি আমাদের কাছে লেখা পাঠাবেন। কবিতা পাঠাবেন। এখন জানে আমি কবিতা পড়েছি, কবিতা লিখি তাহলে। আমি কবিতার সঙ্গে ঐ গল্পটিও পাঠিয়ে দিলাম। ওরা কবিতাটি ছাপল না, গল্পটি ছাপল। ‘আবাদ’ গল্প। সে পত্রিকাতে ‘আবাদ’ গল্প বেরোনোর পরপরই কলকাতার একটা ম্যাগাজিন সাহিত্য রবিবাসরীয় বলে, ওরা লিটল ম্যাগাজিনের গল্প পুনর্মুদ্রণ করে। সপ্তাহে বেরোত। আমার ‘আবাদ’ গল্পটি পুনর্মুদ্রিত হল। দিয়ে গল্পটি নিয়ে একটু আলোচনা হল। সেইসময় আলোচনা হওয়ার পরে আমি দুটো একটা কবিতা লিখেছি। অনুপ ঠাকুর বলে একজন কবি বেথুয়াডহরীর, আমাকে বললেন তো আপনার গল্পে খুবই মাটির গন্ধ আছে, তা আপনি একটা কাজ করুন, আপনি যদি লিখতে চান ঐ যে সুবোধ দাশ বলে একজন ভদ্রলোক আছেন কৃষ্ণনগর থাকেন, নেদেরপাড়া যোগাযোগ করুন। রগচটা মানুষ। কিছু বললে কিন্তু রাগ করবে না। ওর হাত চিঠি নিয়ে আমি সুবোধ দাশের বাড়ি গেলাম। সুবোধ দাশের বাড়িতে একটা আড্ডা হয়। রবিবার সেদিন। সেখানে সুধীর চক্রবর্তী ছিলেন, শৈবাল সরকার, কুন্তল মিত্র ছিলেন।অধীর বিশ্বাস আনন্দ বাজারে কাজ করে উনি ছিলেন। ওর মধ্যে সঞ্জীব প্রামাণিক, কবি; উনি ছিলেন। এখন সেখানে গিয়ে আমি বললাম হাতচিঠিটি দিয়ে, অনুপ ঠাকুর আমাকে পাঠিয়েছেন, আমি একটা গল্প লিখেছি যদি আপনারা দেখেন। তো সুবোধ দাশ বললেন, সঞ্জীব আসছে। শোনাও তাহলে। পড়ুন আপনি। আমি দু’লাইন পড়ার পরে, তখন ভালো পড়তে পারতাম না। সঞ্জীব বলল তাহলে আমি পড়ি। সঞ্জীবের পড়া ভালো ও পড়ে ফেলল। এবং গল্পটা ওদের খুব মনে ধরে গেল। যে দারুণ গল্প। আপনি কবে থেকে লিখছেন। এই একটা গল্পই লিখেছি। আর একটা গল্প আছে আধখানা। এ তো অসাধারণ গল্প। অধীর বিশ্বাস লাফিয়ে উঠলেন— আনসার ভালো গল্প লিখেছে। ওখান থেকে একটু উৎসাহ পেলাম। সেই বছরই আনন্দবাজার আমার ইন্টারভিও নিতে আসে। তখন আমার কাছে গুডা পাঁচ-ছয় গল্প ছিল। খবরের কাগজে আমার ছবি ছাপা হল যে আনসারউদ্দিনের ঝোলায় একগুচ্ছ গল্পের পাণ্ডুলিপি। আনন্দবাজারে বেরিয়েছে যখন বিশাল পাঠকের কাছে পৌঁছে গেল। …তা প্রচুর চিঠিপত্র আসতে লাগল। আমি ওই ব্যাপারটা খুব পাজল্ড হয়ে গেলাম যে আমি কিছুই লিখলাম না কিন্তু এত মানুষের চিঠি। গল্পের দু’একটা লাইন কোট করেও দিয়েছেন, মানে অধীর বিশ্বাস যিনি লিখেছেন। যে আমরা এরকম লেখক চাইছিলাম ইত্যাদি। এ তো বিপদে পড়ে গেলাম, মানে সেই সময়। মানে জনমানসের চাপ। আমি রাতদিন ঘুমোতে পারতাম না। খুব সত্যি কথা। আবার এটাও ভাবলাম আমাকে লেখক হতে হবে, মানুষের কাছে পরিচয় দিতে হবে। আর অধীর বিশ্বাস এই লেখাটি লিখে ও একটু হতবোধ হয়ে গেল। হাউজের সবাই বলতে লাগল কই তোমার আনসারুদ্দিনের খবর কী। অতএব অধীর যখন বলত আমাকে, আমারই খারাপ লাগত। যে অধীরদা এটা আমাকে না নিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে লিখতে পারতেন। তো বলল হ্যাঁ অন্য কাউকে নিয়ে তো লেখার কথা হয়েছিল। আমি বললাম আমি লেখক খুঁজে পেয়েছি, আমি সেই লেখককে নিয়ে লিখব। পরবর্তীকালে খুব কম লিখেছি। ভেবেছি বেশি লিখেছি কম। কিন্তু যে লেখাগুলি লিখেছি সেগুলি সমাদর পেয়েছে। তো ১৯৯৪ সালে সুধীরবাবুর অগ্রহে ‘ধ্রুবপদ’ থেকে প্রথম বই বের করলেন। ভূমিকাও উনি লিখলেন। যে কেন এই বই। এই কথার প্রেক্ষিতে উনি কিছু বক্তব্য রেখেছিলেন। তাতে বলছেন, আনসার যেমন, যে হাতে লাঙল ধরে, সেই হাতে খেপলা দিয়ে মাছ ধরে, সেই হাতে কলমও ধরে। তা ওনার এইসব লেখার বাচনগুলি খুবই সুন্দর। ৬টা গল্প নিয়ে আমার এই বই হয়েছিল– ‘আনসারউদ্দিনের গল্প’। সেই গল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। খুব বেশি আলোচনাটা এগোয়নি। পরবর্তীকালে ‘প্রতিক্ষণ পাবলিকেশন’ সুধীর চক্রবর্তীর বদান্যতায় বলা যায় ওরা ছোটোগল্পকারদের নিয়ে একটা বই করে। স্বপ্নময়ের ছোটোগল্প, অসীম রায়ের ছোটোগল্প, উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প। এই তালিকায় আফসার আহমেদের ছোটোগল্প, আনসারউদ্দিনের ছোটোগল্প এবং সে বইটা ২০০৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেল, সোমেন চন্দ পুরস্কার। এখন সমস্যা হল কি– ওরা চিঠি ছেড়েছে কুরিয়ারে। গিরামে তো কুরিয়ার আসে না। আমি জানতেও পারিনি। হঠাৎ দেখি কলকাতার একটা লোক ওদের অফিসেরই একজনকে দিয়ে পাঠিয়েছে যে অনুষ্ঠান হবে যাঁকে পুরস্কার দেওয়া হবে তাঁরই খোঁজ খবর নেই। এখন সেই লোক খুঁজতে খুঁজতে শালিকগ্রামে গেছে, ওখানে আমার জন্মভিটে আরকি। ওখানে ওরা বলেছে নতুন ন’পাড়া, কাদা রাস্তা। ভদ্রলোক এত কষ্ট করে সেই এক হাঁটু কাদার উপর দিয়ে… একটা লোক তাকে বলেছে যে পিছনে পিছনে আসুন, কাপুড়টা গুটিয়ে নেন। আমার তখন বেড়ার ঘর— যাক ভদ্রলোকের করুণদশা দেখে আমারই খারাপ লাগল। একটা খবর দিতে এতদূরে এসেছেন কলকাতার মানুষ। যাইহোক তাকে একটু নাস্তা পানি দেওয়া হল। পরে আবার তাঁকে সাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম বাস রাস্তায়। বললেন আগামীকাল আপনার অনুষ্ঠান। তো এই অনুষ্ঠান হল। আরেকটা পুরস্কার পেয়েছিলাম বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ থেকে। সেখানেও চিঠি যখন আসল ১৫ দিন পর। আমি ওদেরকে ফোন করে বললাম— দেখুন আমি আমার চিঠি এই পেয়েছি তা আপনাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারিনি— বলল যে আপনি পরবর্তী আমাদের একটা অনুষ্ঠান আছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিবস উপলক্ষ্যে ওই দিন আপনি আসবেন। ওইদিন আপনাকে দেওয়া হবে। আসলে পুরস্কারগুলিকে কারা সুপারিশ করেছে কীভাবে করেছে, আমি তো জানিই না। আবার চিঠিগুলোও আসে না। এই ক্ষেত্রে আমার ভালো লাগত যে আমাকে নিয়ে কিছু ভাববার মানুষ আছে— মানুষ স্বীকৃতি দিয়েছে। আমার কোনো দাদা-বন্ধু নেই। এগুলি অটোমেটিকলি এসেছে— এগুলি ভালো লাগত। যে গিরামের কথা লিখে স্বীকৃতি পাওয়া এতে গিরামের মানুষই সম্মানিত হল। তারপর সন্দীপ দত্তের লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি থেকে পুরস্কার পেয়েছি। তবে আরো অনেক জায়গা থেকে পুরস্কার-সংবর্ধনা পেয়েছি। আমার এতে কোনো আক্ষেপ নেই কোনো কিছু না পাওয়ার জন্য। আমার লেখাটা যদি ভালো হয়– আমার পুরস্কারের কোনো দরকার নেই এবং পুরস্কারটা আমি পাঠকদেরই উপরে ছেড়ে দিয়েছি— যে পাঠকরাই আমার সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার। কারণ, আমার বিদ্যে-ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত আমি যেতে পারিনি। খুব সাদামাটা একটা ছাত্র। সেখানে আমার লেখা যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ানো হচ্ছে— এটাও আমার একটা ভালো লাগে। তারপরে বিভিন্ন অধ্যাপক বাংলার গবেষক-সাহিত্যের। তারা যখন ফোন নং যোগাড় করে নিয়ে কথা বলে বা আমাকে জানায় যে আপনার বইটা পড়লাম— ভীষণ ভালো লেগেছে। তখন মনে হয়, আমি যেন কিছু পারছি। এদের জন্যই আমাকে লিখতে হবে। কারণ আমার তো কোনো লবি নেই। যে কেউ আমাকে সামনে এগিয়ে তুলে ধরবে— এক সুধীরবাবু আমাকে রাস্তা চিনিয়েছেন। সেই রাস্তা দিয়েই হাঁটছি। তারপরে লেখকদের মধ্যে এই যে বিভিন্ন গ্রুপ, দলাদলি, জটিলতা, পুরস্কারের জন্য ধরাধরি-আমি এসবের অনেক বাইরে। আমাকে কেউই চেনে না, আমিও কাউকে চিনি না… আরেকটা সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার— এটা আমার অহংকারের জায়গাও বটে, যে আগে একজন লেখক কিন্তু একজন পাঠক। লেখক যদি পাঠক না হতে পারে, লেখক লিখবেন কী করে? একটা শিল্পী যদি দর্শক না হতে পারে শিল্প সৃষ্টি হবে না। একটা কুমোর যখন প্রতিমা তৈরি করে সে শিল্পী কিন্তু প্রতিমা তৈরি করতে করতে সে যখন দূরে দাঁড়িয়ে দেখে সে তখন দর্শক। বুঝতে পারে কোথায় ভুল ত্রুটি আছে নির্মাণের— কোথায় কী করতে হবে। সেটা আবার যখন তিনি করেন, তখন শিল্পী। মানে শিল্পী সত্তা এবং দর্শক সত্তা বা লেখক সত্তা বা পাঠক সত্তা এটা থাকে। এখন কোন লেখকের এই সত্তাগুলি প্রকট, কতটা ধারালো, তার উপর নির্ভর করবে তিনি কত বড়ো মাপের লেখক।

এখানে বলা যেতে পারে যে লেখার প্রাথমিক শর্তই হল পড়া।

—অবশ্যই। আমি এই যে লিখতে পারছি, আমার তো কেউ লিখিনি। আমার লেখক তালিকায় আমার বংশের কেউ নেই। বাবা একটু ছড়া লিখতে পারতেন, তার মতো। যেটা অনেকেই গিরাম-গঞ্জে লেখে। এক জসীমদ্দীন পল্লী কবি। হঠাৎ তার বই পড়তে পড়তে পেলাম তাঁর বাবার নাম আনসারউদ্দিন। আমার নামও তো আনসারউদ্দিন মনে হল এটাই আমার যোগসূত্র। এছাড়া আমার তো কোনো যোগসূত্র নেই। অতএব আমি ইস্কুল জীবনে যা পড়েছি, খুব ছোটো অবস্থায়। ভালো-মন্দ বাছবিচার না করেই পড়েছি। সেই পড়া আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তীকালে আরো অনেক বড়ো ঔপন্যাসিকদের লেখা পড়েছি। এই পড়তে পড়তে আমার ভিতরে একটা জগৎ তৈরি হল। যে জগতটা হচ্ছে আমার কল্পনার জগৎ। সেই জগতটাকে আমি ভীষণ ভালোবাসতাম। পড়তে পড়তে হাসতাম কখনও, কাঁদতাম। মা বলতো কাঁদছে কেন ছেলি। বই পড়ছে তো কাঁদবে কেন? হয়তো কোনো জেন-পরী ভর করল। এতে ভুল বোঝাবুঝি হতো। বা হাসতাম এটা নিয়েও কীরকম একটা ব্যাপার হতো বাড়িতে। অর্থাৎ আমি হৃদয় দিয়ে পড়তাম। অনুভবের জায়গাগুলি আমার খুব প্রকট। যেমন ‘পথের পাঁচালী’ পড়তে পড়তে অনেকই কেঁদেছে— আমিও চোখের মানে জল ফেলেছি। তা সে জায়গাগুলো কাঁদতে কাঁদতে সে জায়গাগুলো আমি বুঝেছি যে খুব মান্য লেখক, আবেগটা লেখকের মধ্যে খুব বেশি কাজ করেছে। আমরা লেখকের আবেগে চোখের জলটা বেশি ফেলেছি। যাইহোক সে তুলনায় আমি বলব আরণ্যক খুব সেরা লেখা উপন্যাস।

ওই সময়ের এমন কোনো ঘটনা আছে যে আপনি কোনো উপন্যাস পরে কাঁদছেন আর এর জন্য বাড়িতে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু বই পড়তে পড়তে আমার এরকম হয়েছিল। যে হেসেছে এবং কতগুলি জায়গায় আমি কেঁদে ফেলি। আমি নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না যে কার কোনো বইয়ের কোথায় কেঁদেছি– তবে এরকম তো থাকে যেগুলা মনের মধ্যে গেঁথে যায় বিষয়গুলো। তখন সেই চরিত্ররা আর বইয়ের চরিত্র থাকে না। সেই চরিত্রের মধ্যে কখনো নিজেই ঢুকে পড়ি। এ সমস্যা আমার সমস্যা। যে হরিহর তিনি আমার বাবা বা আমি অপু বা আমার বোনটা সে দুর্গা। এই পরিবারের সমস্যা আমাদেরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে এবং লেখার থেকে আমি বড়ো পাঠক ছিলাম এটা আমার অহংকারের জায়গাও ছিল। যার ফলে সচেতন হয়েই লিখতে এসেছি বলে আমাকে মশ্‌কো করে যেতে হয়নি। এবং যে কারণে আমার প্রথম উপন্যাস ‘গো- রাখালের কথকতা’। এটা তো আমার প্রথম উপন্যাস কিন্তু পাঠক মহলে যথেষ্ট সাড়া পাচ্ছি আমি। প্রথম যে এডিশন শেষ হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়েছে এবং এই বইটা বহুজন জানাচ্ছেন তাদের ভালো লাগার কথা। কালও যেমন একজন বলছিলেন, পাঠক শেষ কথা। আমি বললাম দেখুন পাঠক যেমন শেষকথা, লেখকও তো পাঠক। আমি যদি পাঠক না হতে পারি তাহলে কী লিখছি বুঝব কী করে। আমি আন্দাজে আমি কি লিখব? একজন লেখক সবচেয়ে বড়ো পাঠক। তারপরে সার্বিকভাবে পাঠক সমাজ। কে কোন ভাবে নেবে, কার ধ্যান ধারণা কোনদিকে, কার দৃষ্টিভঙ্গী কোনদিকে তা নিয়ে তো সাহিত্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ হবেই। কিন্তু একজন লেখক যদি ভালো পাঠক না হতে পারে তাহলে তিনি ভালো লেখকও হতে পারবেন না। আর সমস্যা হচ্ছে কী যদি বিষয়ের মধ্যে না ঢোকা যায়, একদম বিষয়কে নিজের করা— এটা পারলে কিন্তু সাহিত্য করা যায় না।

এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে বর্তমানে অনেক লেখক-লেখিকা আছেন তারা গ্রাম নিয়ে লিখলেও গ্রামের মূল সমস্যাটিকে ঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন না।

—না মূল সমস্যা মুটাদাগে ধরে তো লাভ নেই। চাষি পাটে দাম পাচ্ছে না, আত্মহত্যা করছে। এটা মুটাদাগের সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যাটা কোন গভীর থেকে উঠে আসছে সেই জায়গায় তো আমাকে যেতে হবে… এবং এটা আমি দেখেছি যে গিরামের কথা যদি লেখা যায় প্রচুর উপাদান ছড়িয়ে আছে, প্রচুর উপাদান। প্রচুর লেখার বিষয় আছে। এই জায়গাতে কেউ হাত দেয়নি। হাত পড়েছে, আঁচড় পড়েছে। কিন্তু তার গভীর থেকে মণিমুক্তো তুলতে পারিনি। হয়তো আমি চেষ্টা করছি আরো গভীরে যাবার। কিন্তু এর অতলে যাবার অনেক জায়গা আছে। সেখানকার কথা যদি নিয়ে আসা যায়, তখন সেগুলো প্রকৃতই সাহিত্য হয়ে উঠবে। যে সাহিত্যগুলি কালজয়ী হয়েছে সবই হচ্ছে গিরামের মানুষের কথা। শহরের ফ্ল্যাটবাড়ির গল্প দিয়ে কোনো কালজয়ী নির্মাণ হয়নি। কারণ গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি-সংগ্রাম করে তাকে বেঁচে থাকতে হয় এবং সেই সংগ্রামের মধ্যেই তাদের সাহিত্যের ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।

এই প্রসঙ্গে না বললেই নয়, আপনার গল্প এবং উপন্যাসে আমরা দেখি জীবন সংগ্রাম, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা, ধর্ম এবং প্রয়োজনীয়তা। এই দুইয়ের মধ্যে আপনি প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

—ধর্মীয় ব্যাপারটা আমাদের মুসলিম জনজীবনে খুব প্রকট হয়ে আছে। মানে আমরা ধর্মাচরণটা ততটা ঠিকঠাক না পারলেও আমাদের মান্যতা দেওয়ার যে জায়গাটা— এটা আছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে একজন মানুষ যার রুটি-রুজির ব্যাপার সে পাঁচবার ওজু করবে কখন, নামাজ পড়বে কখন কিন্তু আমাদের ধর্মটা এমনই— তুমি না খেয়ে মরে যাও তবু তুমি পাঁচবার নামাজ পড়ো। তোমার হাঁটার দোয়া, খাওয়ার দোয়া, বাড়ি থেকে পা বের করতে হলে কুন পা আগে যাবে— কুন পা পরে যাবে এই হাজারো বিধিনিষেধ এগুলি যদি মেনে চলে সেই মানুষটাই প্রকৃত ইমানদার। আর যে মানুষটা সারাদিন উদয়স্ত পরিশ্রম করছে পেটের দায়ে সে কিন্তু ইমানদার নয়। এটা হচ্ছে একটা বেঁধে দেওয়া আছে। তো ধর্মীয় আচরণ সর্বস্ব যে আমাদের ধর্ম— আমার কাছে এই ধর্মের গুরুত্ব নেই। ঈশ্বররের বিষয় হচ্ছে অনুভবের। পালন করার না। মানে কোরান শরীফে আছে যে তুমি পড়ো। পড়ো এবং জানো। তুমি জ্ঞান লাভ করো। আমাদের সে জ্ঞানচর্চা মানেই হচ্ছে ঈশ্বরচর্চা। সে আমি ভূগোল পড়ি ইতিহাস পড়ি সব কিছুই তো ঈশ্বরের বিষয়। এই প্রাকৃতিক যে বিষয়গুলো আছে এগুলো জানা মানেই তো ঈশ্বরকে জানা। কিন্তু ঐ যে একটা আরবী কথা ঢুকে আছে এলেম্‌। আরবী কথা। এলেম্‌ যদি আরবী হয় ধর্মটা আরবের। তাহলে পড়তে ঐ নামাজ পড়তে হবে। ওটা এলেম্‌। আরবী শিক্ষাটা এলেম্‌। আর ইতিহাস-ভূগোলটা এলেম্‌ নয়। এলেম্‌ মানে হচ্ছে সার্বিক জ্ঞান। তা সার্বিক জ্ঞান আমার কখনও হবে— আমি সবটা যখন জানব। যতটা সম্ভব জানব। সেই জানাটায় আমার জানা। সেই জানাটাই ঈশ্বরকে জানা। ঈশ্বরের তো কোনো আলাদা অস্তিত্ব নেই, রূপ নেই যে ঈশ্বর এইরকম। ঈশ্বর একটা শক্তি একটা ফোর্স। যে ফোর্স তার সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে মিশে থাকে। সে সমুদ্র হোক, সে পর্বত– সে যা কিছুই থাক বা জীব বৈচিত্র্যের মধ্যে হোক। অণু-পরামাণুর বিষয়গুলি যে আছে তার অবস্থানগুলো, তার মধ্যেও ঈশ্বরের উপস্থিতি আছে। সেটা অনুভবের আর জ্ঞানলাভের। এই জন্য ঈশ্বরকে খোঁজা মানে জ্ঞানান্বেষণ করা। এই শুধু নামাজ পড়া আর এই দরুদ গাওয়া এর মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।

তাহলে বলা যায়-ধর্মীয় আচার আচরণ একদিকে, প্রার্থনা একদিকে আর জ্ঞানান্বেষণের মাধ্যমেও ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়।

—অবশ্য যায় না প্রকৃত অর্থে। তাকে খোঁজ করে যেতেই হয়— যেতেই হয়। এটা প্রকৃত এলেম্‌ অর্জন করা। মানে তাকে সন্ধানের শেষ নেই। শেষ থাকলে বিজ্ঞান থেমে যেত। আমাদের সমস্ত যে অগ্রগতি-সভ্যতা থেমে যেত। ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায় না। খুঁজতে হয়, পরম্পরায় খুঁজে যেতে হয়।

আপনার এই ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে তো আপনি সমস্যায় পড়েন তাহলে।

—সমস্যা হয়। আমার এই কথা কেউ মানতে পারে না। এটা আমার একটা বড়ো সমস্যা। এই মুহূর্তে তবলিগে যদি আমি এক চিল্লা যায়, খুব ইমানদার লোক হয়ে গিয়েছি। আমি যত অন্যায় করি আমি ইমানদারী। কারণ মৌলানা-মৌলবিরা জনমানসের মনে এই বিশ্বাসটা ছড়িয়ে দিয়েছে। একটা লোক কিছু জানে না। সে জানে নামাজ পড়া একটা ইমানদারী কাজ।

আরেকটা বিষয়-আপনার ‘গো-রাখালের কথকতা’ এবং ‘গৈ-গেরামের পাঁচালী’ যদি পড়া যায় তাহলে একে অপরের পরিপূরক মনে হয়। এ বিষয়ে প্লট নির্মাণে আগে থেকে কোন পরিকল্পনা ছিল?

—না একটা কথা বলি। ‘গৈ-গিরামের পাঁচালী’র পাঁচটা আখ্যান আছে। গ্রামীণ নারীদের নিয়ে একটা আছে। আর গিরাম নিয়েই আছে সবকিছু। আর একটা পার্ট যেটা ছিল রাখালদের কথা নিয়ে। বা রাখালদের কথা নিয়ে যে উপন্যাস করব এটা আমি ভাবিনি আলাদা করে। আমাকে নন্দন থেকে উপন্যাস লেখার একটা সুযোগ দেওয়া হল। তার আগে গল্প লিখেছিলাম ‘দন্তমঞ্জন’ বলে। তা গল্পটা ওদের ভীষণ ভালো লেগেছিল যে আপনি এত সুন্দর একটা গল্প লিখলেন যে আমরা খুব আপ্লুত আপনার গল্পের জন্যি। একটা উপন্যাস দেন। কী নিয়ে শুরু করব কিছু ভাবিনি। শুরু করেছিলাম এমনি। এখন শুরুটা দেখা গেল সে রাখালদের দিকে টেনে যাচ্ছে। তাহলে মনে হল যে, রাখালদের নিয়ে যে আখ্যানটা লেখা হল ‘গৈ-গেরামের পাঁচালী’তে ওইটাকে কেন্দ্র করেই আমি ‘গৈ-গেরামের পাঁচালী’ লিখি। তা ওটাতে লিখলাম। ওরা শব্দবন্ধ দিয়েছিল— ঐ ২০০০ শব্দ মতো। তা আমি ১৯০০ শব্দের মধ্যে আমি শেষ করেছিলাম। একটু ছোটো মতো উপন্যাস হতো। আমাকে সুধীরবাবু বললেন আনসার তুমি এটা বড়ো করো। রাখালদের যে বৈচিত্র আছে আরো জীবনযাত্রার তুমি সেইটা দেখাও। তা সেইটা করতে গিয়ে অটা ৫৫-৫৬ হাজার শব্দের মধ্যি হয়ে গেল। হয়ত আরো কিছুটা বাড়তে পারতো। আমার আবার একটা তাগিদ ছিল বাইরে থেকে যে শেষ করার। তো ওটা, উপন্যাসটা ওই ভাবেই হয়ে গিয়েছিল। এবং উপন্যাস লিখতে আমার কষ্ট হয়নি। খুব স্বচ্ছলভাবে লিখেছিলাম। অনেকসময় লিখতে গিয়ে কলম থমকে যায় তা এটা লিখতে গিয়ে কলম থমকাইনি।

আমি পড়ে যতটুকু বুঝতে পেরেছি যে সেখানে রাখালদের সম্পূর্ণ জীবনযাত্রা এত পুঙ্খানুপুঙ্খ আছে যে বলা যেতে পারে এটি একটি গবেষণামূলক উপন্যাস। উপন্যাসে এই যে এত ছড়া, ওষুধ, চরিত্রদের ‘ডিটেইলস’-নিশ্চয়ই আপনার সচক্ষে দেখা সব চরিত্র। উপন্যাসে এমন কোনো চরিত্র আছে যে আপনি সেটা খুব কাছে থেকে দেখেছেন এবং পরে উপন্যাসে স্থান দিয়েছেন।

—আমি এগুলি জানতাম কিছু কিছু। কারণ, গোরু আমাকেও চরাতে হয়েছে মাঝেমধ্যি। হয়তো গোরুর পাল নিয়ে রাখাল আসেনি আমাকে যেতে হয়েছে তাদের সঙ্গে। গোরু চরিয়েছি, লম্বা বাখারি সেই বাখারি পিছনে ঠেকনা দিয়ে দাঁড়িয়েও থেকেছি, একটু আরাম করি। যে কারণে রাখালদের জীবনযাত্রা আমি জানতাম। আর এই যে হাকিমুদ্দিন আমাদের মূল চরিত্র যে শালি গাঁইয়ে বাড়ি শালি গাঁয়ের খালি পেট ভুখা মানুষের মাথা হেঁট। অর্থাৎ আমাদের শালিক গিরামে প্রচণ্ড অভাব ছিল, অভাব আমাদেরও ছিল। তা সে খালি পেটও দেখেছি— মানুষের মাজা নুইয়ে যেত। এ কারণে হাকিমুদ্দিন নিজেকে ধরেই আমি এগিয়েছি।

আরেকটা বিষয় আপনার গল্প-উপন্যাসের যদি পরিধি দেখি তাহলে দেখা যায় এই যে জলঙ্গীর পাড় আর গ্রামের নামগুলি দেখে মনে হয় আশে পাশের গ্রামাঞ্চল নিয়ে আপনার গল্প-উপন্যাসের পটভূমি তৈরি হয়েছে। আগের যে শালিকগ্রাম বাড়ি তার আশে পাশের সমস্ত কিছু উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আপনার কি মত?

—তবে ব্যাপার হচ্ছে বেশিরভাগ গিরাম সরাসরি আমি, প্রকৃত গিরাম আমি তুলে ধরিনি আমি একটু আলোছায়া খেলা খেলতে চায়। হয়ত শালিগ্রাম দিয়েছি ঠিকই ওটা আমার যেহেতু নিজস্ব ভূমি। তাছাড়া অন্যান্য যে জায়গা— পেটান্তিপুর বলে গিরাম আছে বা আরো যেসব গিরাম আছে– গ্রামগুলি কিন্তু কল্পনা। বা ব্যক্তিনাম আমি কাউকে কেন্দ্র করে লিখিনি। কারণ আমি নিজেও যেমন আড়ালে থাকতে ভালোবাসি আমার চরিত্রগুলোকেও গিরামগুলোকেও আড়ালে রাখতে চায়। কেউ যদি কুমিরখালি গ্রাম দেখতে চায়, আমি কুমিরখালি গ্রামটাকে দেখাতে পারব না।

আপনার লেখাতে গ্রাম বাংলার অনেক মিথের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে কিছু যদি বলেন।

—যেমন দরবেশ একজন, দরবেশ এসেছিলেন নদীর উপর দিয়ে নামাজ পড়তে পরতে একটা নামাজের পাটি নদীর উপর ভাসছে তার উপর নামাজ পড়ছে-এগুলোকে নিয়ে আসতে হয়েছে। কারণ গ্রাম-বাংলায় প্রচুর মিথের ব্যবহার আছে। লেখাটাকে আমি, সত্যি আমি— নিজেও লিখতে লিখতে কতগুলি জায়গায় আমি কেঁদেছি। আমি নির্মোহ দৃষ্টি থেকেই আমি কেঁদেছি। যেমন বিভূতিভূষণের কতগুলি জায়গা আছে যেখানে আমাদের কাঁদতে হয় বা লেখক আমাদের কাঁদিয়েছেন। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি বলব আমি কাউকে কাঁদায়নি। অনেক পাঠক চোখের জল ফেলেছেন সেটা আমার লেখা পড়ে ফেলেছেন। তারা নিজেরা ফেলেছেন চোখের জল।

উপন্যাসে এই যে ছড়ার ব্যাবহার সেগুলো কি সংগ্রহ করেছেন?

—যে ছড়াগুলো আছে সেই ছড়াগুলো কিন্তু অধিকাংশ আমি নিজেই তৈরি করেছি। ‘রাখাল রাখাল গো রাখাল’ এরকম একটা ছড়া আছে— ঐ ছড়াটা বরণ করে নেওয়ার যে ছড়া। ওগুলো লেখা হয়েছে।

নতুন যদি কেউ লিখতে চায় তার কী কী গুণ থাকা দরকার বা তাকে কোন কোন দিকে দৃষ্টি দিতে হবে?

—দৃষ্টি এক নম্বর হচ্ছে মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই ভালোবাসা এমনি অর্জন করা যায় না। এই ভালোবাসা অটোমেটিক আসে। যদি তার এই গুণ না থাকে হয় না। এই ভালোবাসা তো তৈরি করতেই হবে আর বিষয়ের গভীরে যাওয়া। যে আমি অন্যের কাহিনি লিখছি না, আমি নিজের কাহিনি লিখছি অন্যকে চরিত্র করে। এবং মন যদি তার উদার না হয়, সংস্কারাচ্ছন্ন যদি মন থাকে তার দ্বারা বড়ো লেখক হওয়া কখনোই যাবে না। মনকে সংস্কার মুক্ত করতে হবে। এবং মনটাকে বড়ো করতে হবে, হৃদয়কে বড়ো করতে হবে। সবকিছু গ্রহণ করার মতো তার ক্যাপাসিটি থাকতে হবে। মনটা খুব বড়ো ব্যাপার। কোনো কুচক্রীকে দিয়ে কোনো বড়ো মাপের সাহিত্য হয় না। কারণ সে তো লুকাবে। আমার তো লুকানোর কিছু নেই। আমি উজাড় করব। যেটুকু লুকিয়ে রাখব বুঝতে হবে সে লুকানো জিনিসটা সবচেয়ে মহৎ সাহিত্যের উপাদানকে লুকিয়ে ফেললাম, আড়াল করলাম। এই কথাগুলি বলছি কী করে বলছি। এই কথাগুলি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করছি। আমার তো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। যা শিখেছি সেটা আত্মশিক্ষা। সে ধর্মীয় জায়গাগুলো হোক, সাহিত্যের জায়গাগুলো হোক। এগুলো আত্মশিক্ষায় শিক্ষিত না হলে পারা যায় না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে বেশি দূরে পৌঁছে দিতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও দরকার আছে কিন্তু সেই সঙ্গে আত্মশিক্ষাও জরুরী।

আনসারউদ্দিনের সাহিত্যকর্ম

· আনসারউদ্দিনের গল্প (১৯৯৪)

· আনসারউদ্দিনের ছোটোগল্প(১৯৯৮)

· আনসারউদ্দিনের গল্প সংগ্রহ(২০০৩)

· গৈ-গেরামের পাঁচালী(২০০৬)

· শোকতাপের কথামালা( ২০১৪)

· গো-রাখালের কথকতা(২০১৫)

· মাটির মানুষ মাঠের মানুষ(২০১৬)

· গণিচাচার খেত খামার(২০১৭)

পুরস্কার

· গল্পমেলা পুরস্কার-২০০২

· বাংলা আকাদেমির সোমেন চন্দ পুরস্কার-২০০৩

· বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ পুরস্কার-২০০৩

· কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত পুরস্কার-২০০৭

· কোলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্র ও লাইব্রেরি পুরস্কার-২০১৫ এবং অন্যান্য পুরস্কার।

আনসারউদ্দিনের সাক্ষাৎকার

আমাদের নতুন বই