Categories
উৎসব সংখ্যা ২০১৯ সাক্ষাৎকার

আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

বাংলাভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। আল মাহমুদ নামেই বাংলা সাহিত্যে তাঁর লেখালেখি ও পরিচিতি। একজন আল মাহমুদ মানে একজন ব্যক্তি নয় এখন একটি প্রতিষ্ঠান। যে বখতিয়ারের ঘোড়ায় চড়ে লোকলোকান্তর খোঁজে কালের কলস থেকে ‘সোনালী কাবিন’ বের করে পাখির কাছে ফুলের কাছে নিয়ে যেতে পেরেছেন তাঁর ভক্ত পাঠকদের। কবির সঙ্গে শিল্প সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে দুইবার কথা হয়। দ্বিতীয়বার ২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় তাঁর মগবাজার বাসায়। কথা হয় পরিবার, সাহিত্য, রাজনীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে কবি জব্বার আল নাঈম এর সঙ্গে।

মাহমুদ ভাই, গত বছর তো ঘোষণা দিয়ে মহাকাব্য লেখা শুরু করেছিলেন এবং লিখে কিছু অংশ প্রকাশও করেছেন। মহাকাব্যের বাকি অংশের কি অবস্থা?

—হ্যাঁ। লিখতে শুরু করেছিলাম। কতটুকু শেষ করতে পারি তা তো বলা যাচ্ছে না আর। (পাশে বসা শামিল আরাফাতের কাছে জানতে চায় মহাকাব্যের লাইন সংখ্যা কত? শামিল আরাফাত জানায়, মোট লেখা হয়েছে ৯২৭ লাইন) আল মাহমুদ আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে শুনলে তো। তবে, কতটুকু টেনে নিয়ে যেতে পরি তা বলতে পারছি না। এই বয়সে মহাকাব্য লেখা খুব ট্রাফ কাজ। আমি সেটা করছি।

কত লাইনের মধ্যে রাখার ইচ্ছে বা কতটুকু হেঁটে দাঁড়াতে চান?
—এটা তো একচুয়্যালি বলা কঠিন। তবে, আমার চেষ্টার ঘাটতি থাকবে না। আমি তো একটা ফ্রম শেষ করতে চাই। শেষে মিলন দিয়েই শেষ করতে চাই। আমি চেষ্টা করব। তবে, কতটুকু পারি বা কোথায় গিয়ে পারব তা বলতে পারছি না।

আমরা আপনার পুরো মহাকাব্যের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে আছি। আশা রাখি দ্রুত শেষ হবে। আপনার আগের বইগুলো ‘সোনালি কাবিন’, ‘মায়াবী পর্দা’ দুলে ওঠে। আবার ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’, ‘কাবিলের বোন’ কিংবা ‘উপমহাদেশ’-এর মতো গ্রন্থ রয়েছে। আপনার অনুভূতি কী? আর সেগুলোর কোনো অপূর্ণতা আছে যার ঘাটতি মহাকাব্যে পূর্ণতা আনবে?

—প্রথমে বলি তৃপ্তি বা অতৃপ্তির কথা। আসলে প্রতিভাবানদের আত্মতৃপ্ত হতে নেই। প্রতিনিয়ত তাঁরা ক্ষুধার্ত থাকা ভালো। এখন তো ভালো করে লিখতে পারছি না। যদি ভালো করে লিখতে পারতাম। চোখে দেখতে পেতাম। আমার আরও কিছু লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু, পারছি না। ইচ্ছা থাকলেই সব সময় সব কিছু লিখতে পারা যায় না তা এখন বুঝতে পারছি। কত সময় কেটে গেল অবহেলায়! (কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর)
আমার ইচ্ছা আছে কাব্য নাট্য লেখার। কিন্তু সেটা আমি আর পারব বলে মনে হয় না। অনেক সময় মনে হয় এটা করতে পারলে একধরনের আত্মতৃপ্তি কাজ করত মনে। তারপরও ইচ্ছে আছে।

বলছিলাম আপনার আগের সাহিত্যে অপূর্ণতা যদি থেকে থাকে তা মহাকাব্যের মাধ্যমে পূর্ণতা দেয়ার ইচ্ছে আছে?

—অপূর্ণতা তো কত প্রকারের হয়। অপূর্ণতা থাকবেই। যেহেতু প্রত্যেকটি সৃজনের বিষয় আলাদা অতএব, একটার সঙ্গে আরেকটার অর্থগত মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। উচ্চারণগত কিংবা অন্য কিছু হয়ত কাছাকাছি থাকলেও থাকতে পারে। পূর্ণতা নয়।

একটু আগে কাব্য নাট্য করার ইচ্ছা পোষণ করছিলেন? বাংলাদেশের কার কাব্যনাট্য আপনার ভালো লেগেছে?

—বয়সের কারণে অনেক কিছু মনে করতে পারি না। (স্মরণ করার চেষ্টা করার পর) সরি, ফর মেমোরি। এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। তবে, আমি বেশ কয়েকটা ইংরেজি কাব্যনাট্য পড়েছি। সেগুলোও অনেক আগে। তখন চোখে অসুখ ছিল না। চোখে অসুখ হওয়ার পর তেমন কোনো সাহিত্য আর পড়া হয় না। নিজে দেখে পড়ায় আলাদা একটা আনন্দ আছে। আমি তা থেকে বঞ্চিত।

আপনি কিছুক্ষণ আগে বলেছেন নিজের হাতে লিখতে না পারার বেদনার কথা। নিজের হাতে লিখতে পারলে কী লিখতেন?

—নিজের হাত দিয়ে কাজ করলে আপনি যত সুন্দর ফিনিশিং টানবেন আরেকজনের হাতে তা নাও হতে পারে। এভাবেই সৃষ্টিশীলরা অতৃপ্তিতে ভোগেন। তৃপ্ত হতে নেই। সেখানে আমি না দেখি চোখে, না লিখতে পারি হাতে। আবার কানেও কম শুনি।

তাহলে, সৃষ্টিশীল জগতে নতুনত্ব নিয়ে কেউই সন্তুষ্ট নন?

—এটা জটিল প্রশ্ন। আমার কাছে তাই মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের এত বেশি সৃজন। সে কি হয়েছে? আমার তো মনে হয় সেও তৃপ্ত ছিল না। শত বছর পরে তাঁর সাহিত্য স্মরণের আবেদন করতেন না। সব সময় আমার ভেতরে একটা হাহাকার ছিল। হয়ত সব লেখকের ভেতরে ভেতরে আছেও। পরিতৃপ্ত নন। তবে, ভালো কিছু লেখলে বা কলমের মাথা এলে মনে অটোমেটিক একটা হাসি আসে। যে হাসিটা বড়ো কিছু অর্জনের। জীবনে অনেকদিন এমন হাসতে পেরেছি আমি।

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ যেহেতু চলে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে বড়মাপের একজন লেখক। কিন্তু, দেখা যায়, কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই বাংলা সাহিত্য শুরু করে। সেখানে মাইকেলরা উপেক্ষিত থেকে যায়। এটাকে আপনি কীভাবে বলবেন?

এর একটা কারণ আছে যে, যেটা আমার মনে হয়। (কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর) আচ্ছা, মধুসূদন নিজে কখনও মাইকেল বলতেন না। অথচ তোমরা তাকে মাইকেল বলো এটা একটা আশ্চর্য ব্যপার! আমরা অতি উৎসাহে মাইকেল বলি। কিন্তু, সে কি কখনও কোথাও বলেছেন? নেভার। বলেন না। তিনি বলতেন—
পিতা রাজ নারায়ণ
জননী জাহ্নবী
দত্তকূল কবি
আমি শ্রী মধুসূদন।

কখনও সে নিজ থেকে বলতেন না যে আমি মাইকেল।
আর বাংলা সাহিত্যে তো অনেকেরই নাম আলোচনায় আসে না। কালিদাস পূিতের নাম আসে না। অসাধারণ গদ্য শিল্পী মীর মোশারফ হোসেন, তিনি বিষাদ সিন্ধুর লেখক। সে বিশ্বমানের কাতারে পৌছে গেছেন। অথচ এত কম আলোচিত। তাতে কী? গদ্য পুস্তক লেখক সে। যাকে বারবার সালাম করতে ইচ্ছে হয়। মুনীর চৌধুরী সম্ভবত ‘নীল মানুষ’ নামক একটা বইয়ে তাঁকে নিয়ে খুব আলোচনা করেছেন। অসাধারণ সেই আলোচনা। বিভিন্ন সময়ে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা অসম্ভব ভালো কিছু লিখে গেছেন। তাঁরা আজ নেই। কারো আলোচনা হচ্ছে আবার কারো আলোচনা হচ্ছে না। আলোচনায় থাকতে পছন্দ রাজনীতিবিদদের। আলোচনাকে পুঁজি ভাবেন তাঁরা। চলচ্চিত্র অভিনেতা অভিনেত্রীরাও আলোচনায় থাকলে বাজার ভালো হয়। সময়ের হিট অভিনেতা হয়। কিন্তু, লেখালেখির জগৎ একেবারে ভিন্ন। নীরবে চিন্তার কাজ করতে হবে। লেখকরা আলোচনায় চলে আসলেই সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি। হয়ত লেখক সেই সময়ে এটা বুঝতে পারবেন না।

যদি ভালো করে লিখতে পারতাম। চোখে দেখতে পেতাম। আমার আরও কিছু লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু, পারছি না।

মাহমুদ ভাই, তারপরও এটা সত্য যে সব লেখকরাই তো চায় আলোচনায় আসতে এবং মিডিয়া ফোকাস পেতে।

—ওই যে আমি বললাম, লেখকের কাজ পর্দার অন্তরালে থেকে প্রচলিত চিন্তাকে নতুন চিন্তা দিয়ে আঘাত করা।

মাহমুদ ভাই, পর্দার অন্তরালে থাকলে তো পেট চলে না। পেট চালানোর জন্য বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়। দু’চার বাক্য কথাও বলতে হয়। দ্বিতীয়ত বাইরে বের না হলে তো হতাশ হয়ে যাবে।

—আমি কখনই হতাশ ছিলাম না। মাসের পর মাস কাজ পাই না। কেউ চাকরি দেয় না। বেকার ছিলাম। তারপরও আমি আশাবাদী মানুষ। হতাশ হওয়ার কোনো কারণ তো নেই। সাহিত্য কোনোদিন কোনো মানুষকে খালি হাতে ফেরায় না। সাহিত্য কিছু না কিছু দেয়। আর যাঁরা হতাশবাদী কথা বলে টলে আমার মনে হয় এরা সাহিত্যিক না।

হতাশবাদীরা সাহিত্যচর্চা করতে পারে?

—যুদ্ধের ময়দানে একজন সেনাপ্রধান থাকে। সে যদি হতাশ হয় কিংবা ভয় পায় যুদ্ধে হেরে যাবে নিশ্চয়। একজন লেখক একটি সমাজের সেনাপ্রধান। তাঁকে হতাশ হলে চলবে কেমনে? প্রকৃত লেখকরা হতাশ নয়।
এরকম সত্য সাহিত্যের বাইরে যাঁরা আছেন তাদের বেলায়ও সত্য। এক নাগাড়ে একটা কাজে মনোযোগী হয়ে কাজ করলে সে সফল হতে বাধ্য। আমি যেহেতু সাহিত্যের মানুষ তাই আমি সাহিত্যের কথাই বললাম। তবে, এটা নিশ্চিত সাহিত্য মানুষকে কিছু না কিছু দেয়। যে যেই কাজই করুক, লেগে থাকতে হবে। দিন শেষে ফল আসবে। না হয় মানুষ, প্রতিনিয়ত পেশার বদলে ফেলত।

মাহমুদ ভাই, মানুষের হারানোর কিছু নেই। মানুষ এক জীবনে সব অর্জন করে।

—জীবন নিয়ে এত হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মানুষ কখনই হারায় না। মানুষ অর্জনের ভেতরে বড়ো হতে থাকে। তবে, প্রশ্নটা জটিলও আরেক অর্থে, মানুষ হারায় না। মানুষ কি সব অর্জন করে? আমার জীবনে জেল-জুলুম হয়েছে। চাকরিচূত্য হয়েছি। অযথা আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে। তারপরও আমি আমার কাজ করেছি। এই বৃদ্ধ বয়সেও আমি বসে থাকিনি। যখন যেটা পেরেছি করেছি। এখনও করছি। কবিতা, গল্প উপন্যাস লিখে যাচ্ছি। হয়ত ভালোভাবে সম্পূর্ণ করতে পারি না। তারপরও অলস বসে থাকি না

পৃথিবীর বড়ো বড়ো কবি লেখকরা জেল গিয়েছে। মামলা-মোকাদ্দমায় লড়েছে। ইতিহাস সেই সাক্ষী দেয়। এখনও সেরকম চলছে। আপনার বেলায় অস্বাভাবিক কিছু?

—এ নিয়ে আমার দুঃখ নেই। প্রকৃত লেখকরা ভিন্ন কিছু ভাবে। ভাবনার ভেতর ডুবে থাকে। তাদের ভাবনা প্রথম প্রথম সমাজ গ্রহণ করেনি। ফলে গোটা সমাজ তাঁর বিপক্ষে চলে যায়। মামলা-মোকাদ্দমা হয়, জেল-জুলুম হয়। অনেকের ফাঁসিও হয়েছে। কেউ আবার রাজনৈতিকভাবে হেনস্থ হয়। আমি রাজনৈতিকভাবে হেনস্থ হয়েছি। এখনও হয়ে যাচ্ছি।

রাজনৈতিকভাবে হেনস্থা হয়েছেন, সাপোর্টও পেয়েছেন নিশ্চয়। রাজনীতির নীতিই একপক্ষ আঘাত করলে আরেকপক্ষ টেনে নেবে এটাই রাজনীতির নিয়ম।

—আমি সেই সময় ধরতে পারিনি। আমি শুধু মত পালটিয়েছি। মত পালটানো বা মত প্রকাশের অধিকারের জন্যই তো একাত্তর সালে যুদ্ধ করেছি। আমার যুদ্ধের কোনো গুরুত্ব নেই? হয়ত আছে। সেটা দিতে চায় না। কেড়ে নিতে চায়। এখন কাড়াকাড়ি বেড়ে গেছে। এই কাড়াকাড়ি যত বাড়বে ততই আমরা পেছনের দিকে যেতে থাকব।

আপনার কি মনে হয় আমরা পেছনের দিকে যাচ্ছি? অথবা কেন মনে হল?

—কখনও কখনও মনে হয়। যোগ্য মানুষরা যখন অবিবেচিত হয় তখনই এমন ভাবনা মাথায় কাজ করে। যোগ্যরা তো মূল্যায়ণ বা সম্মান পাওয়ার দাবি রাখে। যোগ্যরা নতুন পথে হাঁটতে চায় বলে কেউ কেউ দমিয়ে রাখে।

এই ভাবনাটা আপনার মাথায় কখন এসেছে? নাকি এই সময়ে ঘরে বসে থাকার কারণে ভাবছেন?

—ঘরে যেহেতু থাকি, এখানেই ভাবি। এমন ভাবনার জন্য পণ্ডিত হতে হয় না, যে কেউই ভাবতে পারে।
মাহমুদ ভাই, ভাবনাটি ২০১৪ সালের আগে ভেবেছিলেন কিনা? আমি এটাই জানতে চাইছি।
— বেশ কয়েক বছর ধরেই ভাবছি।

মাহমুদ ভাই, ২০০৮-০৯ সালের দিকে এমন ভাবনা কাজ করেছিল আপনার মাথায়? যে শেষ বয়সে অবমূল্যায়িত হতে হবে?

—আমি অবমূল্যায়িত সেটা কে বলে (কিছুটা উচ্চ কণ্ঠে)! আমাকে তো মূল্যায়ন করার দরকার নেই। আমি যেই কাজ করেছি সেটার প্রাপ্য মূল্যায়ন হলেই আমি খুশি। সৃজনের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া দরকার। না হয় মানুষ এতে আগ্রহ হারাবে। মানুষের সৃজনশীলতা মরে যাবে। সৃজনশীলতা না থাকলে মানুষের চিন্তার গভীরতা কমবে। একজন আরেকজনের কথাকে মূল্যায়ন করবে না। আমার সাহিত্যই থাকবে আমি থাকব না।

আপনার সাহিত্য থাকবে এটি আপনি বিশ্বাস করেন?

—বড় লেখকরা জীবদ্দশায় কিছুটা বুঝতে পারে, তাঁর সৃজন থাকবে কিনা।

মাহমুদ ভাই, তার মানে আপনি নিজেকে বড় লেখক দাবি করছেন? (হাসি)

—(হাসতে হাসতে) কবির এই সামান্য অহংকার থাকতে হয়। না হয় কবি হবে কেন?

আপনার কি মনে হয় আজ থেকে এক’শ বছর পরে আপনার সাহিত্য টিকে থাকবে?

—এই কথা আমি আপনাকে বলব না, মানুষ মূল্যায়ন করবে। গত সত্তর বছরের বাংলা সাহিত্যের একটা হিসেব করলে আগামী একশ বছরের একটা হিসেব দাঁড় করানো যাবে। খুবই নিঁখুত হিসেব। সেই হিসাবটা আমি বুঝি।

চোখের আড়াল তো মনের আড়াল’ বলে একটি প্রবাদ সমাজে প্রচলিত আছে।

—কেউ কেউ জীবিত থাকাবস্থায়ও অমরত্ব লাভ করে। এই সমাজ এটাও জানে। যদিও আমি ওসব নিয়ে ভাবিনি। ভাবি জীবন খুবই সুন্দর।

আল মাহমুদের সঙ্গে জব্বার আল নাঈম

মাহমুদ ভাই, অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনাকে সবাই কবি বলেন। আমি যতটুকু জানি কবিতার চেয়ে আপনার অন্য বই বেশি।

—মানুষ আমাকে কবি বললে আমার কী করার আছে? ইচ্ছে করলে অন্য কিছুও বলতে পারে। কিন্তু, কবিতে একটা অহংকার আছে। আমার কাছে কবি শুনতে বেশি ভালো লাগে।
সব লেখক প্রথম জীবনে কবি হতে চায়। কবি হতে না পেরে অন্য কিছু করে।

আপনি জীবনের প্রথম থেকেই কবি হতে চেয়েছিলেন?

—হ্যাঁ। কারণ, আমি আগেই বুঝে গেছি আমি আর কিছু পারি না।

কবিতায় এমন কী যাদু আছে? যার জন্য কবি হতে চেয়েছিলেন? আসলে কবিতার সংজ্ঞাটা কী?

—কবিতার সংজ্ঞা বলা তো ভারি মুশকিল কাজ। বলা কঠিন। কী বলব? (কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর) কবিতা হল প্রথমে কবির দর্শন ও উপলব্ধির বাসত্মবতা এবং জীবনের বাসত্মবতা, এবং স্বপ্ন যার মধ্যে পা ফেলে অবিরাম হেঁটে চলা। আবার সেই অভিজ্ঞতা শৈল্পিক ভঙ্গিতে কলমের মাথায় তুলে আনা।

কেউ কেউ তো ভিন্ন ভাবেও ব্যখ্যা করেছেন।

—যেহেতু সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই, তাই করতেই পারে।

আপনি আলোচনার শুরুতে বলেছেন— বড়ো মানের লেখক হওয়ার পরও কালিদাস পণ্ডিতকে মানুষ স্মরণ করেন না। আমিতো মনে করি ধাঁধার কারণে তাকে মানুষ অনেক বেশি স্মরণ করে।

—ধাঁধা মূলত কবিতাই। আর কালিদাস অনেক বড়ো মানের কবি। কারণ, তিনি মেঘদূত রচনা করেন। তাঁর মেঘদূত যেসব দেশের উপর দিয়ে মেঘদূত উড়ে যাচ্ছে, সে সব দেশের বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি। শুনলে অবাক হবে, এত একুরেট বর্ণনা! কোন দেশের মেঘের চুল কেমন, সে সবের বর্ণনা দিচ্ছেন। গায়ের বর্ণনা দিচ্ছেন। এটা কী খুব সহজ! এটা গভীর জ্ঞান ছাড়া অসম্ভব।
কালিদাস তাঁর সময়ে সবচে বড়ো পণ্ডিত ছিলেন। তিনি প্রায় সব বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন। এছাড়াও ভারতের ভৌগলিক অবস্থান যেভাবে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন ভাবলে এখনও অবাক হই! আসলে খুব সহজ কথা নয়। কালিদাস একজন কবি। জেনুইন কবি। কবিতা একজন কবির স্বপ্ন। এখানে সব কিছুই এসে যায়। যা গল্পে বা উপন্যাসে আসে অন্যভাবে।

গল্প উপন্যাসের কথা চলে আসল, কবি ও কথাসাহিত্যিকের মধ্যে তফাৎ?

—গল্পকার যখন সৃজন করেন তখন তিনি একজন কবিই। কারণ, সৃজনের কম্পন কবির মতন। কিন্তু, তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধি, পড়াশোনা তাকে গদ্য প্রস্তুতে প্ররোচনা দিচ্ছে। আবার কবিতাও সে লেখে। কখনও কখনও কবিতাও লেখে। কথা হল, রচনার মুহূর্তে তাঁর মধ্যে যে সৃজন কম্পন হয়, শরীর শিরশির করতে থাকে এবং শুধু লিখতে বা বলতে ইচ্ছে করে। এটাই তো একজন কবির কাজ।
আমি তো শুধু কবিই নই। একজন গদ্যকারও বটে। আমার গল্পের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিও আছে। আমার গল্পের উপর গবেষক আছে। চলচ্চিত্র হয়েছে দেশের বাইরে। জলবেশ্যা গল্প অবলম্বণে ‘টার্ন’ চলচ্চিত্র হয়েছে। আমার গল্পগুলো আমার অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি। আমি জানি না এমন বিষয়গুলো আমি কখনই লিখি না।

দশক হিসেবে কবিতার বাঁক বদল ঘটে। এই বাঁকবদলে নেতৃত্ব দিয়েছে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, জসীমউ্দদীন থেকে শুরু করে আল মাহমুদ সর্বশেষ সংযোজন

—পরিবর্তনটা সব কবিই চায়। সমসাময়িক কালের যে গণ্ডি আছে এটা সবাই ভেঙে বের হয়ে যেতে চায়। পঞ্চাশের পরের জেনারেশনও ভাঙতে চেয়েছে। আমার একটা ছড়া আছে—
সবাই বলে ভাঙব ভাঙব
কেউ কি কিছু ভাঙ্গে?
ষাটের দশক বগল বাজায়
বউ কেড়ে নেয় লাঙ্গে।
হাহাহা…. (হাসি)

কথাটা কিন্তু ঠাট্টা নয়। আবার ঠাট্টা হলেও বাস্তবতা আছে। ষাটের দশকের কিছু কবির বউ ঘরে ছিল না। তবে, এটা কাউকে আহত করার জন্য বলা না।
আসল কথা হল, সমসাময়িক কালটাকে ধরে ভেঙে বের হতে হবে আমাদের দেশে যেহেতু কাব্যে আমরা একটু বেশি এগিয়ে আছি, আমাদের কাব্য নিয়েই বেশি কথা হবে। আর হলেই ভালো। কবিতা হল আধুনিক একটা প্যাটার্ন।

কাব্য নিয়ে বেশি কথা হওয়ার আরেকটা কারণ আছে বলে মনে হয়। গল্পকারের তুলনায় দেশে কবির সংখ্যা বেশি। যেটা বেশি সেটা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা একটু বেশি হবেই।

—ইতিহাস ঘাটলেও দেখা যাবে এই অঞ্চলের মানুষের কবিতা প্রেম সত্যিকারার্থে বেশি ছিল। কিন্তু, সব জায়গায় এমনটা নয়। ফরাসি বা ইংরেজি সাহিত্যে কবিতার চেয়ে গল্পের দিকেই ঝোঁক বেশি। সেটা এখনও আছে। কিন্তু কবিকে অবমূল্যায়ন করে না তাঁরা। কবিকে অনেক সম্মান দেখায়। তাঁরা এটা ভালোভাবে বুঝে, একজন কবির কব্জির অনেক শক্তি।

কবির শক্তি অনেক বেশি বলতে কবিতার টেক্স বুঝতে না পারা?

—কে বলে টেক্স কঠিন?
কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা স্নান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি— রাবেয়া রাবেয়া—
কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায়— ঢাকা—পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ান দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠোনে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর! …

ভাই, কবিতা এরকম। তবে, এমনই যে হতে হবে এমন ও নয়। এগুলোতো আমি বলেছি। স্রেফ আমার কল্পনামাত্র। আমার মনে হয়েছে। তবে, এটাই যে স্বার্থক সংজ্ঞা এমনটা বলতে পারব না।

‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থে আপনি লিখেছেন ‘ছলনা জানি না বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি’। আসলেই কি তাই? কোনো ব্যবসা শিখেননি?

হ্যাঁ। আসলেই তাই। আমি কিছু করতে পারতাম না। পারলে তো অনেক কিছু করতাম। আরেক লাইন আছে, ‘দেহ দিলে দেহ পাবে দেহের অধিক মূলধন’ যাই হোক, এখানে একজন কবির বক্তব্য খুব ওপেন বলেছি। আমি বলতে পেরেছি— প্রেমের সংজ্ঞা তো সবাই দেয়। কথাটা আশা রাখি বুঝতে পেরেছ।

আরেক জায়গায় বলেছেন ‘পরাজিত নই নারী; পরাজিত হয় না কবিরা’।
—কবিরা পরাজিত নয়। কোনো কবি কোনো কালে পরাজয় বরণ করে না। কবিরা পরাজয় মানতে চায় না। এই হল কবির স্বভাব। কোনো কবিই পরাজয় মানতে চায় না। সেই কালিদাস থেকে শুরু করে আজ অব্দি কোনো কবি পরাজয় মানে না। কবি ইমরুল কায়েসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখবে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে, কিন্তু পরাজয় মানে না। আর একজন কবি পরাজয় মানবেই বা কার কাছে। একজন প্রকৃত কবির হারানোর কিছু নেই। হারানোর ভয় শিক্ষক ও অধ্যাপকদের। একজন প্রকৃত কবি আরও জানে সামনের দিকে তাকাতে। এবং একজন প্রকৃত কবির উচিত সব সময় সামনের দিকে তাকানো।

ফরাসি বা ইংরেজি সাহিত্যে কবিতার চেয়ে গল্পের দিকেই ঝোঁক বেশি। সেটা এখনও আছে। কিন্তু কবিকে অবমূল্যায়ন করে না তাঁরা। কবিকে অনেক সম্মান দেখায়। তাঁরা এটা ভালোভাবে বুঝে, একজন কবির কব্জির অনেক শক্তি।

আপনার কবিতায় অনেক চিত্রকল্প আছে। এই চিত্রকল্পের ব্যবহার আপনি কিভাবে দেখবেন বা দেখছেন?

—আমি অন্য কোনো কবির সাথে নিজেকে তুলনা করতে চাই না। এখনও না। আগামি দিনও না। আমি নিজের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে চলি। আমি আমার অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যা দেখেছি, যা বুঝেছি তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছিমাত্র। তাছাড়া আমি আমার ছোটো দেশটাকে ভালো করে জানি এবং চিনি। আমি আমার দেশের অলিগলি দাবড়ে বেড়িয়েছি। এক মাথা হতে আরেক মাথা পর্যন্ত। কথায় আছে না, এমন নদী কই, যেই নদীতে আমি সাঁতার কাটি না? আমার অভিজ্ঞতাই আমার সম্বল। আমার শব্দরাজি খুলে দেখো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়নি এমন অনেক শব্দ আমি আমার লেখায় ব্যবহার করেছি। বাংলা ভাষার আঞ্চলিক ডিকশনারি বের করেছে সেখানে আমি দেখেছি আমার অনেক শব্দ। আমি মনে করি এটা আমার পাওয়া।

ডিকশনারি বা অভিধানের কথা যেহেতু বললেন আরেকটা প্রশ্ন করে ফেলি। কবি এবং ডিকশনারি কে কার উপর নির্ভরশীল?

—আগে বলো, অভিধান দেখে কি কেউ কবিতা লিখে? আমার তো এমনটা মনে হয় না। অভিধান কবির পেছন পেছন যায়। ধরো, অক্সফোর্ড ডিকশনারিটায় ‘খই’ শব্দ কোথায় আছে? দেখাও তো। ইংরেজরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক কিছু করলেও ‘খই’ শব্দটি ইংরেজি অভিধানে বসাতে পারেন না। আমি উলটিয়ে পালটিয়ে পেলাম না। বলো এই যে ‘খই’ শব্দের উদ্বোধক কারা? নিশ্চয় কবি। বুঝতে হবে কে কার পেছনে ঘুরে?
তবে, জীবন অভিজ্ঞতার জন্য সহায়তাকারী অনেক বই পড়তে হবে। তুমি যে লিখতে এসেছ তার জন্য নিশ্চয় মাল মশলার প্রয়োজন? ঐ মাল মশলা হল, বই, অভিধান ইত্যাদি। প্রত্যেক কবির একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে। থাকে আয়োজন। কী পরিমাণ অর্থ জানেন। থাকে ইমাজিনেশন। আর এগুলো তখন মস্তিষ্কে খেলা করতে থাকে। কোনটার সাথে কোনটার মিল হবে, অন্তমিল কীভাবে দেয়া হবে। উপমা কী, উৎপ্রেক্ষা জানতে হবে। কবি যখন কবিতা ভাবনায় বসেন তখন ইমাজিনেশন, শব্দ, ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা সব একসাথে কাজ করতে থাকে। সবগুলোকে সমানভাবে কন্ট্রোল করতে হয়। কবিতা কী এতই সোজা কথা! যে কেউ ইচ্ছে করলেই কবিতা লিখতে পারে না। আবার লিখলেই হয় বলা যায় না। প্রকৃত কবিরা ভেতরের সত্ত্বাটাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন মাত্র।
জালালউদ্দিন রুমী’র কথা ধর,কত বড়ো মানের আধ্যাত্মিক মানুষ তিনি। কত বড়ো মাপের কবি। সেই রুমী’র একটি দল ছিল, মৌলানা দল। তাঁরা কেবল নাচত। ড্যান্সিং মওলানা দল। যে অবস্থায় পড়লে অনেকেই বলে দিতে পারত ‘আমিই খোদা’। তখন তাঁর কাছে মনে হবে আমিই সব। তাঁর ধ্যান এতটাই উচ্চপর্যায়ে যা সাধারণের চিন্তারও বাইরে। তখন সমানভাবে তাঁর শরীরের সবগুলো অংশ কাজ করতে থাকে। কবিতা লিখতে গেলেও একজন কবির কবিতাবিষয়ক সব মেকানিজম কাজ করে। এজন্য বলা হয় সবাই কবিতা লিখতে পারে না। এই কাজটা যে আবার সব সময় হয় তাও না। সবদিক সবসময় কাজ করবে না। তারজন্য একাগ্রতা থাকা চাই।

একাগ্রহতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার। আচ্ছা, কবিতা কলা না বিজ্ঞান? এটা নিয়ে একটা তর্ক সব সময়ই থাকে।

—তর্ক আজীবন থাকবে। কবিতা হল, মানুষের হৃদয়ের রসায়ন। যেখান থেকে রসবৃত্তি ভেসে এলে তাকে ভাষায় রূপ দিয়ে কবিতা করা হয়। কবিতা কলা না বিজ্ঞান এই তর্কে আমি যেতে অনিচ্ছুক। অনেক কিছুরই সামষ্টিক একটি রূপ হল কবিতা। কবিতাকে হালকা বা সহজ ভাবে দেখার অবকাশ নেই। শিল্পের সবচেয়ে উপরের সত্য হল কবিতা। কবিতার সংজ্ঞা একেকজন একেকভাবে দিয়েছেন।

কবিতা প্রমাণ করার কিছু নেই। এটা বিজ্ঞান না যে এটাকে প্রমাণ করতে হবে। উপপাদ্য বা সম্পাদ্য বানাতে হবে। কবিতা হল নিজ থেকে অনুভবে বুঝা আর লেখা। কবিতা লেখার পর তোমার মুখে একধরনের উজ্জ্বলতা কাজ করবে। যা তুমি নিজেই বুঝে ফেলবে। বুঝবে কিছু একটা কিছু হয়েছে। এটা কবিতা হওয়ার ইঙ্গিত। তুমি তখন ঘরময় পায়চারি করতে থাকবে। কবিতাটি বারবার পড়তে থাকবে। তখন বুঝবে কাজ হয়ে গেছে। দশমাস মা তার সন্তান পেটে রাখার পর যখন প্রসব করে সেই মাই বুঝে তার মনের আনন্দের অবস্থান।

তাহলে কবিতা কলা বা বিজ্ঞান কোনটাই নয়?

—কবিতা কলাও না আবার কবিতা বিজ্ঞানও না। কবিতা হল কবিতা। আবার কখনও কখনও কলা ও বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি। সর্বশেষ কবিতা কবিতাই থাকে। কবিতাকে কবিতা হিসেবেই বুকে টানতে হবে। কবিতাকে কবিতার কাছে রাখাই ভালো। গবেষণা করে কবিতা নষ্ট করার দরকার নেই। গবেষকরা মূলত গবেষণা করে কবিতার সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলছে।

বর্তমান কবিতা আধুনিকতা অতিক্রম করে উত্তরাধুনিকতায় পৌছেছে।

—উত্তরাধুনিক বিষয়ে আমি কিছু জানি না। যাঁরা আধুনিক আর উত্তরাধুনিক বলে লাফালাফি করে তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন, আগে বলুন— আধুনিকতার বয়স কত? আধুনিকতার বয়স ধরা যায় বড়োজোর এক’শ বছর। উত্তরাধুনিকতার প্রশ্ন আসলে আবার আধুনিকতার সীমা নির্ধারন করা আছে। এরপর উত্তরাধুনিকের কথা আসবে। এরপর আসবে কবিতার উত্তরাধুনিকতাবাদ। বা উত্তরাধুনিকতাবাদ চর্চা। মানুষ কবিতা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! তাহলে একটা সময় কবিতা হবে সকল সমস্যার সমাধান!

কবিতা কি সকল সমস্যার সমাধান?

—এটা কথা প্রসঙ্গে বলা। এটা অন্য প্রসঙ্গ। আর কবিতার কাছে তুমি এত সমস্যার সমাধান চাও কেন। কবিতা কোনো সমাধান দিতে পারে না। অতএব, কবিতার কাছে তোমার কোনো সমাধান চাওয়া উচিত হবে না। কবিতার কাছে প্রেম, কাম ও ভালোবাসা চাইতে পারো। এর অধিক নয়। কবিতা কাউকে নিশ্চয় বিল্ডিং বানিয়ে দিতে পারবে না। কেউ যখন কারো টাকা চুরি করবে তখন সে তার সেই সমাধান কবিতার কাছে চাইবে না নিশ্চয়। (হাহাহা) কবিতা মানুষের মনে সাময়িক আনন্দ দেয়। কবিতা মানুষের মুখের ভাষাকে সমৃদ্ধতা যোগান দেয় শুধু।

মাহমুদ ভাই, একবার আপনি বলেছিলেন কবিতায় আধুনিকতার সূত্রপাত মূলত দেশভাগের মাধ্যমে। এটা কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

—আমি এমনটা বলেছিলাম?

সম্ভবত।

—বললেও মনে নেই। বা স্মরণে নেই। কবিতা মূলত চর্যাপদ থেকে শুরু হয়েছে। শুনো, চর্যাপদে কী ছিল তা দেখতে হবে। বাংলাভাষার শব্দ, বাক্য এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। আর আমরা উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। এতে পূর্বেও এবং পরের আমাদের এবং তোমাদের অনেক কিছু জানাও হচ্ছে। এই জানাটা কী? আধুনিক না উত্তরাধুনিক?

তবে, দেশভাগের মাধ্যেমে যে বাংলা কবিতার সূত্রপাত হয়েছে এটা অযৌক্তিক। দেশভাগের মাধ্যমে মূলত তিনটা দেশ তিনটা ভূ-খণ্ড হয়েছে। পরবর্তীকালে এসে আমরা বাংলা ভাষা ও স্বাধীনতা পেয়েছি। স্বর-সুর পেয়েছি। অধিকার পেয়েছি। আমরা আমাদের মতো করে লিখতে পারছি। আমাদের জীবন যাপনই আমাদের শিল্প সাহিত্যিকরা লিখে যাচ্ছে। এবং পড়তে পারছে। এই যে পারাটা, পারাটা কিন্তু আমাদের অধিকার। আরা যুদ্ধ করছি নতুনভাবে বাঁচার জন্য। বেঁচে থাকাটা শিল্প সাহিত্যের মাধ্যমে। এই যে নতুনভাবে শুরু করাটা আধুনিক।

৪৭ এর দেশভাগের পর আমরা একঝাঁক সাহিত্যিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পেয়েছি। দেখা গেল, ৭০ এর আগে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পূর্বেই আমরা একঝাঁক নিবেদিত সাহিত্যিক পেয়েছি। কিন্তু, তার পরবর্তীতে আমরা সেখানে কিছুটা হতাশ হয়েছি বলে মনে করি।

—সবাই যে খারাপ লিখছে তেমন নয়। ভালো অনেক সাহিত্য আমাদের আছে। তবে, এরমধ্যেও অনেক লেখক আছেন যাঁদের লেখা আমার খুব ভালো লেগেছে। আর আমি অনেকদিন যাবৎ চোখে কম দেখি। কানে কম শুনি বলে এখন আর পড়া সম্ভব হয় না। আবার তেমনভাবে সবার নাম বলাও সম্ভব নয়। যেহেতু স্মৃতিশক্তি লোপ। আর অনেক নাম আছে, যাঁরা ভালো লেখে চলছে। তাঁদের সবার নাম বলা হয়ত সম্ভব না। কিবা বললে দেখা যাবে আমার ভালোলাগা নামটিই বাদ দিয়ে গেছি। এগুলো বলতে গেলেও একটা প্রিপারেশন দরকার। আবার এখন এসব বলা মানে বাড়াবাড়ি হবে। অনেকেই ভালো লেখেন। আসল কথা হল, ভালো কিছু কেউ যদি না লেখে তাহলে ঐ সেক্টরে কেউ টিকে থাকবে না। সম্ভব নয়। এত ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও বাংলা সাহিত্য যেহেতু টিকে আছে, তাহলে বুঝতে হবে বাংলা সাহিত্যে কিছু না কিছু হচ্ছে।

কবিতা লেখার পর তোমার মুখে একধরনের উজ্জ্বলতা কাজ করবে। যা তুমি নিজেই বুঝে ফেলবে। বুঝবে কিছু একটা কিছু হয়েছে। এটা কবিতা হওয়ার ইঙ্গিত।

মাহমুদ ভাই, কবিতা কতটুকু তথ্যভিত্তিক ও কতটুকু জ্ঞান ভিত্তিক?

—তথ্য এবং জ্ঞান দুটিই আলাদা। আলাদাই থাকে। কবিতা একটা দারুণ ইমাজিনেশন। অনেক কিছুর সংমিশ্রণেই কবিতা। তবে, কবিতায় কী থাকবে আর কী থাকবে না তা নির্ভর করে সময়ের উপর। আমি যখন লিখি তখন আমি আমার লেখাটা লিখি। যা আমি ভাবি। আমি চিত্রকল্প তৈরি করি।আমি স্বপ্ন তৈরি করি। আমি লিখি। আমি একটা জিনিস তৈরি করি। এই যে তৈরি করাটাকে বলে সৃজন বা ক্রিয়েশন। এই ক্রিয়েশন শুধু একজনই করতে পারে, সে হল কবি। সৃষ্টির একটা কম্পন আছে। এই কম্পন শরীর থেকে ছেড়ে দেয়। এবং তিনি তখন বুঝতে পারেন যে তিনি কোথাও না কোথাও পৌঁছে গেছেন।

৫২ সালের ভাষা সংগ্রামে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে আমরা ভাষা শহীদ বলি। আবার জীবিতদের ভাষা সৈনিক। একাত্তরের যুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে বলি মুক্তিযোদ্ধ। অথচ, একজন লেখক আজীবন সেই ভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য, মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য সুন্দর ও সত্যকে উপস্থাপনা করে থাকেন। লেখককে ভাষা সংগ্রামী বা ভাষা সৈনিক বলা যাবে না?

—আসল কথা হল, ওটা প্রয়োজন নেই। কবি, লেখক এর মধ্যেই এসব লুকিয়ে আছে। তাকে আলাদা করে ভাষা সংগ্রামী বলার কিছুই নেই। কবি বললে সবাই বুঝে সে শব্দ নিয়ে কাজ করে। সে ভাষা নিয়ে কাজ করে।

যেমন? বিস্তারিত বলেন।

—বললাম তো। কবি শব্দটা অনেক দামি শব্দ। অহংকার করার মতো শব্দ। কমিট হতে ‘কবি’ শব্দের আগমন ঘটেছে। কবি কিছু বলেন, আর অন্যরা সেসব শুনে মুগ্ধ হবেন। এটাই স্বাভাবিক সত্য। ‘কবি’ শব্দটা খুব নরম্যাল নয়। আরও পাঁচ হাজার বছর পরেও শব্দটা নরম্যাল হবে না। ‘কবি’ শব্দের ওজন অনেক। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারের বড়ো বড়ো আমলা-কামলাও কবি হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করতে দেখেছি। তাঁরা সময়ের টানে হারিয়ে যায়। আবার কেউ যদি কবি হয়ও তাঁরা তাঁদের ঐ পদবিটা লুকিয়ে নামের আগে ‘কবি’ শব্দটা সুন্দরভাবে বসিয়ে দেন। রবীন্দ্রনাথ ও মধুসূদন দত্ত তো জমিদার ছিলেন। তাঁরা নামের আগে ‘জমিদার’ শব্দটি কখনই বসাতেন না। শিল্প সাহিত্যেও সবচেয়ে এলিট ক্লাব হল কবিতা। শৈশবে কবি হওয়ার চেষ্টা কমবেশি সবাই করেছে। কবি সবাই হতে পারে না। কবি হওয়া পরম সৌভাগ্যের ব্যপার বটে।

কবি ও কবিতা প্রায় একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু, যখন কোনো কবি কোনো সম্প্রদায় বা কোনো দলের হয়ে যায় সেটাকে কীভাবে দেখবেন?

—বুঝেছি। এটারও জবাব আছে। জবাব থাকবে না কেন? কোনো কবিই কোনো কালে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না। হয়ে যান না। কবি যে কোনো অবস্থাতেই কবি থাকে। সাময়িক অবস্থাতেই একজন কবি একটি দলের আশ্রয় নিল। আসলেই কি আশ্রয় নেয়। প্রকৃত কবি যখন কোনো কবিতা লেখে তখন সেটা কোনো দলের না হয়ে সেটা হয়ে ওঠে সার্বজনীনের। কবিরা আজীবনই নিঃসঙ্গ। রাজনীতির উর্ধ্বে তার অবস্থান। কবি যে চিন্তা করেন। রাজনীতিক ব্যক্তিরা তা করলে দেশ উন্নতি হওয়াটা সময়ের ব্যপার।

মাহমুদ ভাই, শিল্প-সাহিত্যে সব সময় একটা আলোচনা থাকে যে দেশের প্রধান কবি একটি দলের ছত্রছায়ায় থাকেন।

—কিছু প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত। আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর সময় দিয়ে দেয়। কবি আল মাহমুদ কোন দলের লোক কখনই ছিল না। এটা কেউ বলতে পারে না। আমি সবার জন্য কবি। একজন কবির কাছে দেশের যে কেউ আসতে পারে। বিভিন্ন ব্যপারে পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে। সেটা গ্রহণ করা না করার দায়িত্ব কবির। কবি আল মাহমুদ কোন দলের সাপোর্ট করে কবিতা লিখে না। যাঁরা লিখে তাঁদের বেলায় সেটা প্রযোজ্য। কবি সবসময় কবি। আমি এখন যেমন কবি আজ হতে ৫০ বা ১০০ বছর পরেও কবি থাকব। কেউ আমাকে রাজনৈতিক দলের নেতা বলবে না। যেমন, কোনো নেতাকে কবি বলবে না। (হিহিহি)

এসব ব্যক্তি আল মাহমুদের বেলায় প্রযোজ্য কিনা? শিল্প-সাহিত্যের অনেকেই আপনাকে মৌলবাদী কবি বলে থাকেন।

—সময় অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়। যাঁরা আমাকে এসব কথা বলে আমি কি তাঁর প্রতিবাদ করতে যাই? আমি চোখে দেখি না। কানে কম শুনি। হাঁটতেও পারি না ঠিকমতো। এ অবস্থা আমাকে শোনা ছাড়া আর কিছু করার আছে?

সেটা তো আপনার ভালো বুঝার কথা…

প্রতিবাদ করতে যাই না। যখনই সময় আসে তখনই দেখা যায় তাঁদের অনেকেই আমার আশপাশে ঘুরঘুর করে। আমি তখন তাঁদের গ্রহণ করি। আমি বিশ্বাসী মানুষ। দলছুট হবে। আবার আসবে। আমি আমার বিশ্বাস নিয়ে কাজ করি। এবং প্রার্থনা করি। এটাই আমার বৈশিষ্ট্য। যাঁরা আমার নিন্দা করে আমি তাঁদের প্রতিবাদ করি না। হয়ত তাঁরাও একদিন বুঝবে। পৃথিবীতে অনেক বড়ো বড়ো কবি জন্মেছেন। তাঁরা কিন্তু বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ একজন। তিনি কিন্তু বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। কথা হল, তাঁর বেলায় যে এমন কথা ওঠে না। আমি এ ব্যপারে আর কথা বাড়াতে চাই না। আশা রাখি এখানে এই প্রশ্ন শেষ।

একবার কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে আলোচনায় চলে এসেছিল আপনার প্রসঙ্গ। তিনি আপনার ব্যপারে বেশ উচ্ছ্বাস পোষণ করেছিলেন। সময় সুযোগ মতো একবার দেখাও করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।

—হাহাহ… সমরেশ ভালো লিখে। ঢাউস লিখতে পারে। একটা ঘটনা বলি, হল কী– একবার আমি বসে আছি। হঠাৎ করে একজন লোক আমার কাছে এসে পায়ে কদমবুছি শুরু করল। কথা নেই বার্তা নেই। প্রশ্ন করলাম কে তুমি। তখন বলল, মাহমুদ ভাই আমি জয় গোস্বামী। কবিতা লিখি। তারপর তাঁর সঙ্গে আমার অনেক কথাবার্তা হয়। আসল কথা, তাঁরা আরেক দেশের হলেও তাঁদের মধ্যে কবিতার বেলায় একটা ইন্টালেকচুয়্যালি সরলতা আছে। এজন্যই এরা বড়ো হতে পারে। কবিকে বিচার করতে হয় কবিতা দিয়ে। মানুষকে বিচার করতে হয় মানুষের কাজ দিয়ে। আবার বিচার না করলেও হয় না। এই আর কী। কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গেল। একটু পানি খাওয়া দরকার। (বাসার কাজের মেয়ে এসে পানি দিয়ে গেল)

শুনো, শিল্প-সাহিত্য চর্চা করতে গেলে মানসিকভাবে আরও বড়ো ও প্রসার হতে হয়। না হয় বড়ো হওয়া যাবে না। সংকীর্ণ মন নিয়ে এইটা করা যাবে না। তাঁরা শেষ পর্যন্ত লেখক হতে পেরেছেন বলে তো আমার মনে হয় না। সমালোচনা কারা করে? কাদের সমালোচনা করে? যাঁদের পোডাক্ট আছে তাঁদের সমালোচনা আছে। আর যাঁদের নাই তাঁরাই সমালোচনা করে। তাই এ-ব্যপারে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। আমাদের সময়ের অনেক আগে থেকেই এই সমালোচনা শুরু হয়েছে এখনও আছে। হয়ত থাকবে।

আপনাদের পঞ্চপাণ্ডবদের সম্পর্কে জানতে চাই। আপনারা সবাই ভালো বন্ধু ছিলেন শুনেছি?

পঞ্চাশের ফজল (ফজল সাহাবুদ্দীন), শহীদ (শহীদ কাদরী) এবং শামসুর রাহমান এরা আমার বন্ধু ছিল। এই শামসুর রাহমানের সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেছে। বোধহয় তাঁর সাঙ্গে আমার খারাপ সম্পর্ক কখনই হয়নি। চমৎকার সম্পর্ক ছিল।

অনেকের মুখে প্রচলিত আছে…

শামসুর রাহমান কোথাও বলে গেছেন? উনার সঙ্গে আমার খুবই প্রীতি সম্পর্ক ছিল। মাঝেমাঝে আমার বাসায় এসে চুপচাপ বসে থাকতেন। একা আসতেন। জানতে চাইতাম কী ব্যপার? বলতেন আমার ভালো লাগে না তাই চলে এসেছি। এই কথাগুলো কি মানুষ জানে? জানে না। আর জানলে বলবে না কেন? শামসুর রাহমান ও আমার সঙ্গে অসংখ্য সুখকর স্মৃতি আছে। যা বলতে গেলে দিনকে দিন অতিবাহিত হবে। আর ফজলের (ফজল সাহাবুদ্দীন) চলে যাওয়াটা খুবই দুঃখজনক। তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ ছিল না। দিব্যি ঘুরে বেড়াত। খুব খারাপ লাগে। শহীদ কাদরী আমরা প্রাণের মানুষ। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমাকে ফোন করে। আমি তাকে বলি, শালা কী খবর? হাহাহা… তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শালা ভাই।

মাহমুদ ভাই, আপনার শৈশব, কৈশোর বা লেখক জীবনের সহপাঠির অনেকেই চলে গেছেন। আপনারও বয়স হয়েছে। মৃত্যুচিন্তা কাজ করে?

—মন খারাপ হবে কেন? মৃত্যুর পর কী হবে সে সব ভেবে কেউ কি মৃত্যুর দুয়ার হতে ফেরত আসে? আসে না। এগুলো আননোন। আননোন নিয়ে এখন কথা বলব না। এগুলো থাক।

সেসব আননোন কোথায়, ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে তো আমরা অনেক কিছু জানি।

—আছে তাও জানি। কিন্তু আমাদের জন্য কী ব্যবস্থা করে রেখেছেন তা তো জানি না। মৃত্যুচিন্তা কমবেশি সবার ভেতরেই আছে। আমার ভেতরেও আছে। সেগুলো বলার তেমন কিছু আছে বলে মনে হয় না। মৃত্যুচিন্তা নিয়ে একধরনের হাহাকার বোধ সবার আছে। আমারও আছে। আমি কী করব। আসল কথা, এসবের ব্যখ্যা আমি কীভাবে দেব বুঝতে পারছি না। একদিন আমি থাকব না এটাই সত্যি কথা। (কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ বেয়ে পানি ঝরে)

মাহমুদ ভাই, কবিতা লিখতে গিয়ে, কখনও ফেরারি আসামি হয়েছেন। আবার কখনও জাহাজে পানি তোলার কাজ করেছেন। গিয়েছেন পুরাণ ঢাকার বুড়ির হোটেলেও।

—কবিতা লেখা ছেড়ে দেব এমন সিদ্ধান্ত কখনই নিতে পারি না। কষ্ট ছাড়া কারো জীবনে কখনই পরিপূর্ণতা আসে না। আমি যতবার আমাকে প্রশ্ন করেছি ততবারই ভেতর থেকে এসেছে তুমি কবি। বুঝতে পারলাম আমাকে দিয়ে অন্য কিছু হবে না। আর কবিতা লেখা ছাড়ব কী করে? ততদিনে লোকে তো আমাকে কবি বলে ডাকে। হাহাহাহ…. কোথাও গেলে মানুষ আঙ্গুল আমার দিকে তাক করে দেখিয়ে বলে ওই যে কবি। ব্যাস। সেই আমি কবিতা ছেড়ে দিলে হয়। হয়না। আমাকে লেখা চালিয়ে যেতে হয়েছে। জীবনে অনেক কষ্ট ছিল, কষ্ট ত থাকবেই। আর কবিতা লেখার কারণেই লোকে আমাকে চিনতে পেরেছে। কবিতা না লিখলে লোকে আমার ইন্টারভিউ নিত না। শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী জানতে চাইত না। তুমি ব্যক্তি আল মাহমুদের কাছে আসো না, এসেছ কবি আল মাহমুদের কাছে।

হাহাহা….. ভালো কথা বলেছেন। আপনি আগের কথাটা এখানে বলে দিলেন মাহমুদ ভাই?

—কোন কথাটা? আগে কি বলেছি সেটা যে মনে নেই।

কবিরা একসময়ে শৌর্য বীর্যের অধিকারি ছিল। ছিল বলছি। কিন্তু, সত্যিকারার্থে এখন আর্থিক লাভের জন্য কিছু কবি বিক্রি হয়ে যায়।

—আমি একজন কবি। আজীবনই স্বপ্ন ছিল কবি হব। কবি হয়েছি। আমি লোভী নই। তকমা কাজে লাগিয়ে অর্থবৃত্তশালী হওয়া অন্যের বৈশিষ্ট্য হতে পারে। আমি তা করি না। আমি জানি আমি কবি। ‘কবি’ শব্দটা মানুষের অন্তর জগতে একধরনের মোহ সৃষ্টি করে। সেই মোহ আমাকে আরো ভালো চিন্তা এবং লেখতে সাহায্য করে। কবিকে সেসব চিন্তা করতে হবে। অর্থবৃত্তশালীরা পৃথিবীতে অল্প ক’দিন বাঁচে। আবার ওরা মারা যাওয়ার পরপরই মরে যায়। সমাজে একজন কবির আর্বিভাবে সেই সমাজ সেই দেশ ধন্য হয়। সেই কবিরা লোভী নয়।

কবিতা লেখা ছেড়ে দেব এমন সিদ্ধান্ত কখনই নিতে পারি না। কষ্ট ছাড়া কারো জীবনে কখনই পরিপূর্ণতা আসে না। আমি যতবার আমাকে প্রশ্ন করেছি ততবারই ভেতর থেকে এসেছে তুমি কবি। বুঝতে পারলাম আমাকে দিয়ে অন্য কিছু হবে না। আর কবিতা লেখা ছাড়ব কী করে?

শুনেছি আরব দেশগুলোতে একজন কবির আগমনে বিশাল আয়োজন করে। এটা নাকি ওদের শৌর্য…

—হতে পারে। আমি জানি না। আমি আরব সাহিত্যের অরজিন্যাল হিস্ট্রি পড়েছি। বিভিন্ন জাতির কাব্য সৃষ্টির যে ইতিহাস এটা প্রাণবন্ত ও জীবন্ত মনে হয় রক্ত ঝরে। অনেক সুন্দর। তোমারও পড়তে ভালো লাগবে। ইংরেজি কবিতার ইতিহাস পড়েছি। প্যারিসের কবিতা জীবনী পড়েছি। পড়ে পড়েই জীবনটা এখানে ঠেকেছে। সাহিত্য নিয়ে কোনো ধরনের ফাঁকিবাজি করিনি।

আরব সাহিত্য সম্পর্কে আপনার জানাশোনা কেমন?

—অ্যারাবিয়ান সাহিত্যেও দুটি ভাগ আছে। অন্ধকার যুগের সাহিত্য এবং আধুনিক সাহিত্য। দুই সময়ের সাহিত্য কম বেশি জানা আছে।

মাহমুদ ভাই, অন্ধকার যুগ বলতে কোন সময়কে বুঝাতে চেয়েছেন?

—আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগ। সেই সময়কে অন্ধকার যুগ বলা হয়।

ইতিহাস পর্যলোচনা করলে দেখা যায়, সে সময়ে অনেক জ্ঞানী, গুণী, কবি, সূফী ও দরবেশ ছিলেন। অথচ, সেই সময়কে অন্ধকার সময় বলা হয়।

সেই সময়ে চিন্তাও করা যাবে না এমন বড়ো মানের জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তারা অনেকেই বড়ো বড়ো সাহিত্যিকও ছিল। কিন্তু একটা সভ্যতার অনুপস্থিত ছিল।

তাহলে জাহেলিয়াত কেন?

—এই সময়টাকে হয়ত চিহ্নিত করার জন্য ‘জাহেলিয়াত’ নামকরণ হয়। আর সেই সময় তো পার হয়ে গেছে। তখন নাকি তাদের মাঝে বর্বর সময় ছিল। কিন্তু, ওই বর্বর সময়ে অনেক বড়ো কবি ছিল। তা কি আমরা অস্বীকার করতে পারব? অস্বীকার সম্ভব নয়। যেমন ইমরুল কায়েস। কবিকূল শিরোমনি বলে আরবরা জানত। সে একজীবনে যা করেছে তা এই পর্যন্ত অন্যকোনো কবি করতে পারে না। ইমরুল ছিল যুবরাজ। অনেক টাকা পয়সা ছিল তাঁর। নারী ছিল ইমরুলের হাতের খেলা। নারীকে ইমরুল ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পারত। নারীরাও সুদর্শন কবির জন্য ছিল পাগল। বিবাহিত মহিলারা ইমরুলকে দেখলে মনে মনে স্বামীকে ঘৃণা করতে শুরু করত। তখনকার আমলে সে অনেক ছন্দে কবিতা লিখতে পারত। এটা ভাবা যায়। আল কামারের মতো সাধারণ গরিব পরিবারের ছেলে অনেক বড়ো মাপের কবি হয়েছিল। জ্ঞানের জয়জয়কার তখনও ছিল।

আমরা এবার পুরষ্কার প্রসঙ্গে আসি। কবি লেখকদের সাহিত্য পুরষ্কার।

—সব পুরস্কার সাহিত্যের মানদণ্ড নয়। কিছু পুরষ্কার আছে কিছু লেখক নেয়। কিছু পুরষ্কার আছে আয়োজক কমিটি দেয়। এই দুই গোত্রকে চিনতে হবে। ইমরুল কায়েস তখনকার দিনে কোন পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিল?এটা কেউ মনে রাখে না। জালালউদ্দিন রুমীর বেলায় একই কথা বলা যায়। অথচ, সবাই মনে রেখেছে টেক্স। টেক্স ছাড়া গতি নেই। পুরষ্কার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে না। টেক্সই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। নোবেল পেয়েছেন এমন অনেক সাহিত্যিক যারা আজ আর নেই। কেন নেই? তা সবাই জানবে না। কিন্তু জানতে হবে। সাহিত্য চর্চা করলে এসব জানতে হবে।

মাহমুদ ভাই, কত বছর হয় অন্যের সহায়তায় লেখালেখি করছেন?

—কম হবে না ১৫-১৬ বছরের। আমি বলি আর অন্য কেহ লিখে। শুনো, মানুষের ইন্দ্রিয় সব সময় একরকম কাজ করে না। আমার চোখ ও কান খুব কম কাজ করে। চোখে দেখতে পাই না। এভাবে যখন মানুষের ইন্দ্রিয়গুলো চলে যায়, তখন লেখালেখিগুলো কি বন্ধ হয়? তখনও তো সে লেখে। আমি বলি আমার পরিচিত কেউ সেই লেখা কাগজে লিখে। এভাবে তাদের সহযোগিতা নিয়ে চলছে আমার প্রতিদিন। এই আমার প্রতিদিনের জীবন।

কারা আপনার শ্রুতি লিখনে সহযোগিতা করে?

—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজন করে থাকে। অনেকেই আছে। আমার নাতিরা আছে। এরা খুবই উচ্চ শিক্ষিত। বেশির ভাগ সময়ই এই কাজে সহযোগিতা করে থাকে। তাঁরা ভালো লেখাপড়া জানা। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায়। এরাই মূলত আমাকে সহযোগিতা করে। এছাড়াও সাংবাদিক ও শুভাকাঙ্খি কিছু বন্ধু আছে তারাও মাঝে মাঝে আমাকে সহযোগিতা দেয়।

এই বয়সেও ক্লান্তিহীনভাবে লিখে যাচ্ছেন। এর পেছনে কোন উৎসাহ কাজ করে?

—আমার বয়স আর কত হবে? বড়জোড় ২২ বছর। হাহাহা… এরকম কারো নাম বলতে পারব না। অনেকের উৎসাহ ছিল। এখন আমি কাউকে দেখে উৎসাহ নেই না। আমাকে দেখে অনেকেই উৎসাহ নেয়। আমি তো উৎসাহ নেওয়ার কিছু নেই। আর ইচ্ছে হলে লিখি আবার ইচ্ছে না হলে শুয়ে ঘুমাই। আগে বই পড়তাম। এখন চোখে দেখি না, এটাই আমার দুঃখের বিষয়। (কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে)

তবে, একজন আছে যে আমাকে বেশি সহযোগিতা করে, কবি জাকির আবু জাফর। সে আমাকে দিয়ে অনেক কিছু লিখিয়ে নিয়েছে। হি ইজ লিগ্যাল পয়েট, আই লাইক ভেরি মাচ। হি ইজ গুডম্যান। আমি সব সময় তার জন্য দোয়া করি।

মাহমুদ ভাই, আমাদের সাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখবেন শুধু রক্তক্ষরণের ইতিহাস। সেই ৫২ থেকে ৭১। এর পর ৯০ তারপরও চলছে…

—শুনো, মানুষের একটা বিষয় আছে। যেমন, নর-নারীর প্রেম ভালোবাসা এটাও একটা দিক। দার্শনিকগত ব্যাখ্যা, জীবনী এরকম আরো লেখা ছিল। আবার স্বদেশ প্রেমের কথা অন্য আরেকভাবেও আসতে পারে। তবে, ভবিষতের লেখালেখি সেদিকেই যাবে। কারণ, সামনের দিকে আমরা আমাদের সাথে দ্বন্বে আটকাব। তখন আবারও লেখা হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লেখকদের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের দেশের লেখকরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল।

—এটা মোটেও ঠিক না। এর কারণ, এখনকার লেখকরা অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী অনেক।

আর এটা হওয়ার আরেকটা কারণও থাকতে পারে। এটা অনেক সময় ভৌগলিক সীমারেখার উপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। সেজন্য বলছি আমাদের কবিদেরকে অন্যান্যদের সঙ্গে তুলনা করলে দুর্বল বলা যাবে না। আমাদের লেখা যদি ভালো ট্রান্সলেট হত তাহলে আমাদের লেখকরা আরও বেশি অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হত।

—যেহেতু আমাদের অবস্থান একটা ভাষার ভিতরে এবং এই ভাষায় আমাদের জীবনচরিত্র। অতএব, আমরা কিন্তু অন্যদের প্রতিদ্বন্ধী। ব্যপারটা আমি সব সময় এভাবে দেখি। আমাদের কবি সাহিত্যিকরা যে একটা জগৎ তৈরি করেছে এটা কিন্তু সহজ কথা না। আজ হতে ১০০ বছর পরে পৃথিবীর সেরা সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের সাহিত্যের প্রতিযোগিতা হবে। যখন প্রতিযোগিতা হবে তখন তাঁরা অতীতের দিকেও তাকাবে। তাকিয়ে দুঃখ প্রকাশ করবে। আর বলবে, ইস্ আমরা কত কিছুই জানতাম না। আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।আমাদের এই ভূ-খণ্ডে অনেক মহৎ লেখক আছেন, যাঁরা খুব ভালো সাহিত্য করছেন। কিন্তু আলোচিত কম।আর সাহিত্য তো অর্থের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যাবে না। এটাও একটা ব্যপার। সেটাও করা গেলে বিশ্ব সাহিত্যে দৃশ্যয়মানভাবে আমাদের শক্ত একটা অবস্থান থাকত।

আপনার সময় কাটছে কীভাবে?

—এখন পড়ছি (অরেকজনের সহযোগিতা নিয়ে) আর্কিওলজি। প্রত্মতত্ত্ব। এটা সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ আমার। এটা নিয়ে লেখারও আগ্রহ আছে। শরীর ভালো থাকলে হয়ত লিখব। এটা নিয়ে একটা উপন্যাসও লিখতে পারি। যেমন, হরপ্পা। যেগুলো লস্ট সিটি। যেগুলো ওয়ান্স অ্যাপন অ্যা টাইমে ছিল। সেগুলো নিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায়।

এই বড়ো বিষয় নিয়ে লেখার জন্য একজন লেখককে অনেক ঘুরতে হয়। আপনার বেলায় তা হচ্ছে না।

—অভিজ্ঞতা আমার চিরকালের সঙ্গী। অভিজ্ঞতা নিয়েই আমি পথ হাঁটছি। তোমরা হয়ত জানো না, একটা সময় আমি পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। দেখেছি এবং হেঁটেছি। আমরা বলি প্যারিস আর ওরা বলে পারি। সেই শহরের ফুটপাত ধরে দিনের পর দিন হেঁটেছি। লন্ডনে খুব ভোরবেলা ঘুমভাঙার পর সকালবেলা মাইলের পর মাইল হেঁটে গেছি। হাঁটলে যত অভিজ্ঞতা অর্জন হয় তা, গাড়ি বা বিমানে চড়লে ততটা হয় না। আমার তখন মনে হয়েছে এই সেই শহর যে শহরকে এক সময় আমরা বিলেত বলে জানতাম। হা হা হা…

বাংলাদেশের এমন লেখক আছেন, যাঁরা বিদেশে বাড়ি করে থাকেন। আপনি চাইলে তো সুযোগ ছিল।

—এ কথা আমি কখনই ভাবি না, যে অন্যদেশে গিয়ে বাড়ি করব। সুযোগ আমিও পেয়েছি। কিন্তু, আমি সেই সুযোগ নেই না। সব সুযোগ নিতে হয় না। আবার সবার আগ্রহ সব কিছুতে থাকে না। আমার প্রয়োজন হয় না আমি নেই না। যার প্রয়োজন সে নিয়েছে। আমি কিছুটা গ্রাম্য লোক ছিলাম। শহরের অনেক কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেক কাজ শেষ হয়ে গেছে। গ্রাম্যপ্রীতিটা আমার ভেতরে এখনও রয়ে গেছে। সেই বন্ধন এখনও ছিন্ন করতে পারি না। দ্বিতীয়ত, পরের দেশে পরের জমিতে থাকা আমার পছন্দ না।

ঢাকার বাইরে কোথাও যাওয়া হয়?

—এখন আর ভালো লাগে না। শরীরে কূলায় না। আমি চাই বাসায় থেকে কিছু একটা করতে এবং লিখতে। এখন তো সেই বয়স নেই যে ঘুরব, আড্ডা দেব। তবে, সেরা সাহিত্য করার ফর্মূলা হল সফর। এর বিকল্প নেই। দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো। অজানারে জানা। অচেনারে চেনা। সেই সব একটা সময় আমি করেছি। শক্তি সামর্থ্য থাকলে এখনও বেড়িয়ে পড়তাম। কিন্তু, অন্যের সাহায্য ছাড়া যে এক মুহূর্তও চলতে পারি না।

গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়?

—না।

যেতে ইচ্ছে হয়?

—নিজ জন্মস্থানে কার না যেতে ইচ্ছে হয়। কত বছর হয় যাই না। একবার গেলে ভালো লাগত।

সেখানে থাকেন কারা?

—আমার ভাই। ওদের সঙ্গে অনেক দিন দেখা নেই। মাঝেমধ্যে কথা হয়।

আপনার সমবয়সী শৈশবের কোন বন্ধুর কথা মনে পড়ে? বা ওরা জীবিত আছে কেউ?

—অনেকের কথা মনে হয়। অনেকেই মারা গেছে। একাবার এক বন্ধু এসেছিল। অনেক কথা হয়েছে। শুনেছি সেও নাকি মারা গেছে।

আপনার শৈশবের স্মৃতি কথা মনে পড়ে?

—এগুলো আমার লেখার সম্বল। মনে পড়বেই। আমার দাদির সঙ্গে আমার বেশি স্মৃতি। গ্রামের পুকুরে দৌড়ঝাঁপ দিয়েছি, সেই সব ভুলার নয়। তবে, এই আশি পঁচাশি বছরেও সেই স্মৃতি আমাকে তাড়া দেয়।

আজ হতে ১০০ বছর পরে পৃথিবীর সেরা সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের সাহিত্যের প্রতিযোগিতা হবে। যখন প্রতিযোগিতা হবে তখন তাঁরা অতীতের দিকেও তাকাবে। তাকিয়ে দুঃখ প্রকাশ করবে। আর বলবে, ইস্ আমরা কত কিছুই জানতাম না।

মাহমুদ ভাই, আমরা আলোচনার শেষ দিকে চলে এসেছি, এই বয়সে তো বলতে বা লিখতে পারেন, কার সাহিত্য কেমন?

—এগুলো বললে সম্পর্ক খারাপ হয়। শত্রু বাড়ে। তাই ওসব বলতে চাই না। এখন বয়স শেষের দিকে, এ নিয়ে কিছু বলতে চাই না আর। বললে বলতে পারতাম কার কবিতা কতটুকু হয়, কার কাব্য নাট্য হয় না। কে উপন্যাস লেখার পরও কবি হওয়ার চেষ্টা করে। থাক সেসব। শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হয় না। অনেক কথা হল। আর কিছু না বলি?

মাহমুদ ভাই, এক দুইজনের নাম বলা যাবে?

—লেখালেখির সঙ্গে যাঁরা জড়িত তারা বুঝার কথা।

মাহমুদ ভাই, আজকের মতো এখানেই শেষ করব। আমরা আরেকদিন আসব। অনেক কথা হবে।

—ঠিক আছে।

মাহমুদ ভাই, এত সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

—তোমাকেও ধন্যবাদ।

2 replies on “আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *