প্রজিত জানার সাক্ষাৎকার

সাদা পাতা, কবিতা ও সময়-চিহ্নেরা

কবি প্রজিত জানার মুখোমুখি হলেন অর্পণ বসু

মোটামুটি আটের দশক থেকেই আপনার লেখালেখির পরিচিতি। আচ্ছা, এই যে বললাম ‘আটের দশক’, এরকম কবিতার দশক ভাগ কি সঙ্গত বলে আপনার মনে হয়?

এটা প্রধানত ব্যবহারিক এবং সম্পূর্ণ হাস্যকর একটা বিভাজন। জীবনানন্দকে তুমি কোন দশকের কবি বলবে? তিরিশের দশকের নিশ্চয়ই। কেননা তিনি তিরিশের দশকে কবিতা লিখতে এসেছেন। কিন্তু তাঁর প্রধান প্রায় সব কবিতাই তো চল্লিশের দশকের। ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘বেলা-অবেলা কালবেলা’-এর প্রায় সব কবিতাই তো চল্লিশের দশকের। তুলনায় তাঁর তিরিশের দশকের অধিকাংশ কবিতা অনেক কম উল্লেখযোগ্য ও দুর্বল… যে জীবনানন্দ দাশের কথা আমরা বলি, যে কারণে বলি, তাঁর ওই সময়ের (তিরিশের দশকের) কবিতা তাঁর প্রতিনিধিত্ব প্রায় করে না বললেই চলে।

একই কথা রিলকে বা পাউন্ডের ক্ষেত্রেও অনেকটাই প্রযোজ্য। তাঁদের সমস্ত প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান কবিতা ৩৫-৪০ বছরের পরে লেখা। রিলকে যদি আঠাশ বা তিরিশ বছর বয়সে মারা যেতেন, আদৌ তাঁকে কেউ মনেই রাখত না। একই কথা সুধীন দত্ত বা সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। অধিকাংশ কবিকেই তাঁর নিজস্ব কবিতার ভাষা বা টেমপ্লেট খুঁজে পেতে এক বা দু-দশক অপেক্ষা করতে হয়। একজন র‍্যাঁবো বা একজন জন কীটস্ ব্যতিক্রম, এমন দু-চারজন ক্ষণজন্মা বড়ো প্রতিভার তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘজীবী বড়ো প্রতিভার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রথম বা দ্বিতীয় গ্রন্থ থেকে আলোড়ন তুলে দেওয়া কবিদের তুলনায়, সাধারণত তৃতীয় ও চতুর্থ বা পঞ্চম গ্রন্থেই উত্তীর্ণ হওয়া প্রধান কবিদের সংখ্যা সারা পৃথিবীতেই একটু বেশি, অর্থাৎ ওই এক-দু’দশকের প্রতীক্ষা এঁদের অধিকাংশকেই করতে হয়েছে নিজস্ব ভাষা বা ‘সিগনেচার’ খুঁজে পেতে! যে কারণে এলিয়ট বা পাউন্ড উনবিংশ শতাব্দীর কোন দশকের কবি, এহেন প্রশ্ন কেউ কখনও করে না, এমনকী তাঁরা তেমন বিখ্যাত হওয়ার আগেও কোনো দীক্ষিত পাঠক বা সমালোচক এ ধরনের প্রশ্ন করেননি।

২০১১ সালে আপনার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রলাপ-সরণি’ বীরেন্দ্র পুরস্কার পায় এই পুরস্কার পেয়ে আপনার কীরকম লেগেছিল? আপনাকে কি পরবর্তী সময়ে তা লিখতে আরও অনুপ্রাণিত করেছিল?

যে পুরস্কারের সঙ্গে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শক্তিমান কবি ও খাঁটি মানুষের নাম জড়িত, সে পুরস্কার পেতে তো ভালোই লাগার কথা। আমার কাছেও সেটাই প্রধান কারণ ভালো লাগার। তবে আমি নিজেকে যতটুকু জানি, কোনো পুরস্কার আলাদা করে লেখালেখির ব্যাপারে আমাকে কোনো অতিরিক্ত অনুপ্রেরণা দেবে বা দিয়েছিল, এমন আমার মনে হয়নি। বীরেন্দ্র পুরস্কারের ক্ষেত্রেও সে কথা প্রযোজ্য। আমার কাছে কবিতা-যাপন বা লেখালেখি সম্পূর্ণ ভিতরের ব্যাপার। বাইরের কোনও ঘটনা, সেটা পুরস্কারই হোক বা অন্য কিছু… আমাকে খুব প্রবলভাবে আলোড়িত করে না। তবে উৎসাহিত হয়তো কিছুটা করে, সবচেয়ে বেশি যেটা উৎসাহিত করে তা হল পরিণত বা দীক্ষিত পাঠকের ভালো লাগা, পাঠ-মুগ্ধতা বা মনোযোগ। প্রকৃত পাঠকের মনোযোগ আমার কাছে সবসময়ই একটা বড়ো প্রাপ্তি।

কবিতার দীক্ষিত বা প্রকৃত পাঠক কারা?

এটা একটু জটিল একটা বিষয়। যে কোনও কবিতা-‘পড়ুয়াই’ নিঃসন্দেহে কবিতা-‘পাঠক’ নন। কবিতা লেখক মাত্রই কবি নন, কবিতা পাঠক ও কবিতা-পড়ুয়ার মধ্যেও তেমন তফাত আছে। কবিও যেমন কেউ কেউ– সবাই নন; কবিতার পাঠকও তেমন কেউ কেউ– সবাই নন।

আপনি কি দীক্ষিত বা পরিণত পাঠকের জন্যেই কবিতা লেখেন?

আমার মনে হয়, আমি প্রধানত নিজের জন্য, বা নিজের মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্যই কবিতা লিখি। দীক্ষিত বা অদীক্ষিত কোনও পাঠকের কথা ভেবে নয়। লেখার টেবিলে আমি একেবারেই একা, নিঃসঙ্গ। সেখানে কোনো পাঠকের চেহারা চোখের সামনে ভাসার কথা নয়। তবে একটি কবিতা লেখা হয়ে যাওয়ার পর, লেখকের বোধহয় আর বিশেষ কোনও ভূমিকা নেই। এরপর তো পুরোটাই পাঠকের আওতায় চলে গেল। আর একজন দীক্ষিত পাঠকের পাঠ তো একটা কবিতাকে নতুন করে রচনা করে, নির্মাণ করে, পুনর্গঠিত করে। অতএব দীক্ষিত পাঠক নিছক কবিতাটিকে ‘পড়েন’ না, তিনি তাঁর পাঠের মধ্য দিয়েই লেখাটিকে নতুন করে ‘লেখেনও’। একজন কবি যদি সত্যিই সেরকম পাঠক পান, তাহলে সেটা তাঁর সৌভাগ্য বলতে হবে।

আপনার কবিতার পাঠক তো এই দীক্ষিত পাঠকরাই?

এখানে একটা কথা বলা দরকার। আমার কবিতা পছন্দ হলেই তিনি দীক্ষিত পাঠক, আর না হলেই তিনি অদীক্ষিত বা অপরিণত, এমন কোনও নির্বোধ ধারণা আমি পোষণ করি না। এ কথা বললাম এই কারণেই যে, এমন অর্বাচীনতা আমি কারো কারো মধ্যে দেখেছি। তাঁদের কেউ কেউ হয়তো কবি হিসাবেও সুপ্রতিষ্ঠিত।

সত্যি কথা বলতে কি পরিণত পাঠকদের মনোযোগ যেমন আমি পেয়েছি, তেমনি কখনও কখনও ততটা পরিণত নয়, এমন সাধারণ দীক্ষিত পাঠকের মনোযোগও আমার কোনো কোনো কবিতা হয়তো কখনও কখনও পেয়েছে। আবার অন্যদিকে দীক্ষিত পাঠকেরও কেউ কেউ হয়তো কোনও সময় আমার কোনো কবিতা পছন্দ করেননি। এটাই তো হওয়া স্বাভাবিক। অর্থাৎ, একজন পাঠক পরিণত বা অপরিণত, তা নির্ধারিত হওয়া উচিত তাঁর সামগ্রিক কবিতা-বোধ, রসবোধ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে, ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিশেষ কবিতার প্রতি তাঁর মুগ্ধতা বা উদাসীনতার নিরিখে নয়।

তবে হ্যাঁ, দীক্ষিত বা শিক্ষিত পাঠকের অনেকের মনোযোগ বা মুগ্ধতা আমি কখনও কখনও পেয়েছি, সেটা আনন্দের ও সৌভাগ্যের, কখনও কখনও এই সীমিত পরিমণ্ডলের বাইরের বৃহত্তর পাঠকেরও একাংশের মনোযোগ পেয়েছি… সেটাও কম আনন্দের নয়।

আপনার কি মনে হয় না বাংলা কবিতায় এই দীক্ষিত পাঠকের সংখ্যা একেবারেই সীমিত?

শুধু বাংলা কবিতা কেন, সারা পৃথিবীর কবিতাতেই দীক্ষিত পাঠকের সংখ্যা সীমিত। এবং ঐতিহাসিকভাবেই এটা শুধু এখন বলে নয়, চিরকালই। কবিতা তো চরিত্রগতভাবে পারফর্মিং আর্ট নয়। আর কবিরাও সিনেমার নায়ক বা এমনকি পার্শ্বচরিত্রের মতো কোনও পাদপ্রদীপের সামনে থাকা আলোকবর্তিকা নন।

কবিতা যবে থেকে সুর (গানের) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে তবে থেকেই তা মূলত পাঠকের, ততটা আর শ্রোতার নয়। সুরের ওপর ভর করে এক বিপুল সংখ্যক শ্রোতা-দর্শকের কাছে পৌঁছনো তো আধুনিক কবিতার কাজ নয়, উদ্দেশ্যও নয়। যে কারণে গানের লিরিক আর কবিতাও এক নয়। অবশ্যই গানের লিরিকও কখনও কখনও স্বতন্ত্রভাবেই, অর্থাৎ সুর নিরপেক্ষভাবে কবিতা হয়ে উঠতে পারে (রবীন্দ্রনাথের অনেক গানের লিরিকের ক্ষেত্রে সে কথা প্রযোজ্য), কিন্তু সেটা ব্যতিক্রমই। পৃথিবীর বহু শ্রেষ্ঠ গানের লিরিকই স্বতন্ত্রভাবে কবিতা হয়ে উঠতে পারে না, এবং সেটা হয়ে ওঠাটা তার লক্ষ্যের মধ্যেও পড়ে না। তা যেটা বলছিলাম, কবিতা মৌলিক চরিত্রের দিক থেকে পারফর্মিং আর্ট নয়, তা যত না শোনার এবং মঞ্চে উঠে পরিবেশন করার, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাক্তিগতভাবে পড়ার এবং অনুভব করার। নিঃসন্দেহে গদ্য বা গল্প-উপন্যাসের তুলনায় কবিতার পাঠক সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে সব ভাষাতেই সীমিত। এবং এই স্বল্প-সংখ্যক কবিতা পাঠকের মধ্যেও আরও একটা ছোটো অংশকেই দীক্ষিত পাঠক বলা যেতে পারে। এই দীক্ষিত পাঠকেরা নিজেরা কবিতা লিখুন বা না লিখুন, তাঁদের ভাবনা-চিন্তা ও অনুভূতির জগৎটা অনেকটাই একজন কবির মতো বলেই আমার বিশ্বাস।

একটা সময় দেশ, পরিচয়, কৃত্তিবাস প্রভৃতি বহু প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত নানান পত্রিকায় আপনার কবিতা নিয়মিত দেখা যেত। অনেক বছর ধরে তা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এর কারণ কী?

কারণ কিছুই নয়। একটা সময় বর্ষীয়ান কবি ও লেখকদের অনেকে এইসব পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এছাড়াও যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নামজাদা কবি বা লেখক না হলেও, লেখালেখির প্রতি মুগ্ধতাবোধ তখনও তাঁদের অনেকের মধ্যে যথেষ্টই অবশিষ্ট ছিল। তাঁরা যখন লেখা চাইতেন, তার মধ্যে এমন এক ধরনের আন্তরিকতা বা উদারতার আকর্ষণ থাকত, যে স্বভাব-আলস্য সত্ত্বেও তা অগ্রাহ্য করা আমার পক্ষে বেশ মুশকিল ছিল। ক্ষুদ্রতা কোথাও একেবারে যে ছিল না তা নয়, তবে তা হাতে গোনা যেত। পরবর্তীকালে সবকিছুই অনেকটা বদলে গেল।

বিনা আমন্ত্রণে লেখা পাঠানোর কোনও প্রশ্ন তো ছিলই না। কিন্তু পরবর্তীকালে আহ্বান বা আমন্ত্রণ সত্ত্বেও কোথাও কোথাও লেখা পাঠানোর তাগিদ আমি আর অনুভব করিনি। হয়তো বহু আগে কখনো লিখেছি, কিন্তু পরবর্তীকালে সেই একই পত্রিকায় আর লেখা পাঠানোর ইচ্ছা হয়নি।

এরমধ্যে কোথাও কোথাও অবশ্য, শুধু আলস্য বা তাগিদের অভাব থেকে নয়, সচেতনভাবেই আমি লেখা দিইনি। কারণ, এইসব ‘সম্পাদক’ বা পত্রিকা চালকদের অনেককেই আমার লেখালেখির কোনো লোক বলেই মনে হয়নি। একজন লেখককে তাঁর যোগ্য সম্মান দেওয়ার জন্য যে শিক্ষা বা উদারতা থাকা দরকার, তা এদের মধ্যে আমি দেখতে পাইনি। এতে অবশ্যই তাঁদেরও কিছু যায় আসেনি, এবং আমারও নয়। সৌভাগ্যক্রমে এইসব অনভিপ্রেত আমন্ত্রণের অত্যাচার থেকে আমি এখন অনেকটাই মুক্ত।

প্রথম পাতা

পরিচিতি:

কবি প্রজিত জানার জন্ম ২৯ জুন, ১৯৫৯, কলকাতায়। দুটি গদ্য-আকর সহ তাঁর এযাবৎ প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১১ টি। ২০১১ সালে ‘প্রলাপ সরণি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ‘বীরেন্দ্র পুরস্কার’। এছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে নানান বাংলা-ইংরেজী সংবাদপত্র ও পত্রিকায় লিখেছেন কবিতা ও চলচ্চিত্র বিষয়ক গদ্য।

Spread the love
By অ্যাডমিন সাক্ষাৎকার 1 Comment

1 Comment

  • চমৎকার।

    Dipankar Mukhopadhyay,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *