বোলান শিল্পী শ্যামল প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সুব্রত ঘোষ

শিল্পী: শ্যামল প্রামাণিক, বয়স ৬৬, বান্দরা, কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান।

চৈত্রের গাজন ও বোলান গান

আপনার বড়ো হয়ে ওঠার দিনগুলো কেমন ছিল?

আমার গ্রামের নাম বেগুনকোলা। কেতুগ্রাম থানা। কাটোয়ার পশ্চিম প্রান্তে আছে অজয় নদী। অজয় নদীর ওপারে চারিদিকে জল ঘেরা যে-গ্রামটা তার নাম বেগুনকোলা। অনেক পুরোনো গ্রাম। নদী দিয়ে ঘেরা। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে আছে বাইগন কোলা। বৈষ্ণব কবি মনোহর দাসের আখড়া ছিল এইগ্রামে। যদুনারায়ণ চক্রবর্তীর আখড়া এই গ্রামেই ছিল বলে শোনা যায়। সেই সময়ে কৃষি এই গ্রামে উন্নত ছিল। আমন ধান প্রত্যেক বছর হত। খরায় অনেক বছর মরেও যেত। অজয় এবং গঙ্গা কাছে থাকার জন্য অনেক বছর বন্যায় সব ধুয়ে যেত। তখন অন্য ধরনের ধানের চাষ ছিল। ধানটা ডুবে গেলেও হত। ধানটা শক্ত ধান। এখন যে-সব ধান উঠেছে এগুলো খুব নরম ধান। বন্যায় এক দু-দিন থাকলে গলে যায়। তখন ফলনটা কম ছিল কিন্তু ধানটা সহনীয় ছিল। চার দিন পাঁচ দিন ডুবে থাকলেও পাওয়া যেত। এখন সতেরো আঠারো মন ফলন হয়। তখন দশ বারো মন হলেই অনেক। আমাদের গ্রামের কথা বলছি, গ্রামে খাবারটা জুটত। অনেক গ্রামে অনেক সমস্যায় খরায় খাবার জুটত না। আর একটা স্পেশাল পেশা ছিল আমাদের গ্রামে। প্রায় ঘরে ঘরে পিতলের ঘটি তৈরি করা, গ্লাস তৈরি করা হত। আর সব গ্রামের লোকের দু-খানা তিন খানা চার খানা গাঁতি জাল, চাবি জাল, ঘুনসি জাল থাকত। ছোটোবেলাতে এত বেশি মাছ খেয়েছি শুনলে এখন গল্প বলবে। এ-সব বিষয়গুলো ছিল। পরবর্তীকালে ফারাক্কা হওয়ার পর থেকে নদীর মাছ কোথায় চলে গেল। কীটনাশকও এসে গেল। জলে মিশে মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যেত শোনা যায়। মাছ সব চলে গেল। এখন আর সেই জায়গাটা নেইকো। গত তিন চার বছর হল গ্রামটা একদম উঠে গিয়েছে। বিশ পঁচিশ ঘর আছে কোনোমতে। উঠে গেছে বলতে নদীর ভাঙন আর যাতায়াতের অসুবিধা ছিল। কিন্তু কিছু এন্টিসোশ্যাল গ্যাংও হয়ে গিয়েছিল যারা হায়ারে যেত। ডাকাতি করত। আগেও ওরা পার্টির হয়ে কাজ করেছে। পরবর্তীকালে এরা অন্য পাটিতে ঢুকে গেছে। যাইহোক।

আমার জন্ম বাংলা ১৩৫৯ সালে। ৮ই কার্তিক। এখন আমার বয়স ৬৬। আমার ইশকুলে নাম ছিল নিকুঞ্জ প্রামাণিক। আইন ফাইনে আস্থা আমার তেমন ছিল না। যখন একাত্তর সালে বন্যার পর রেশন কার্ড তৈরি হল জিজ্ঞাসা করল কী নাম দেব? বললাম দে একটা নাম দিয়ে দে। তখন কেরোসিন আর চিনি ছাড়া তো এত গুরুত্ব ছিল না। তখন আমার যে-ডাক নাম ছিল শ্যামল, ওটাই দিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে ওই নামটাই হয়ে গেছে। কিন্তু লোকাল লোকে আমায় নিকুঞ্জই বলে। আমি একটা বড়ো পরিবারে মানুষ হয়েছি যাদের অনেক ধান-জমিটমি ছিল। আমার বাবার নাম মদন মোহন প্রামাণিক। উনি চাষি ছিলেন। সৌখিন চাষি নয়। চরম খাটনি ছিল। ভাদ্র মাসে বৃষ্টি হল না তো বিশ বিঘে জমির লাঙলের দামটা উঠত না। পরে আমাদের পরিবারে একটা মেরুকরণ ঘটে গিয়েছিল। আমার এক জ্যাঠা, মেজ জ্যাঠা দোকানে কাজ করত। জমি রক্ষা করতে বাবা ছোটো থেকেই চাষ-আবাদে লেগে থাকত। ধান কাটা থেকে শুরু করে লাঙল বওয়া থেকে শুরু করে সারাদিন ওই করত। বাকিরা চাকরি করত কেউ রেলে, কেউ রেজিস্ট্রি অফিসে। কেউ কলেজে পড়ত। এইভাবে একটা মেরুকরণ ঘটে যায়। আমরা ছিলাম যৌথ ফ্যামিলিতে। পরবর্তীকালে সংসার যত বড়ো হতে শুরু করল প্রচণ্ড যন্ত্রণা সংসারের মধ্যে তৈরি হল। মা-কাকিমা-জেঠিমা এক-একটা ক্লাস থেকে এক-একজন এসেছে। তাদের চাহিদা চলাফেরা কাজের ধারা সব আলাদা ছিল। আমরা একটু নেগলেক্টেড হয়েছিলাম। আমার বাবা তখন পৃথক হয়ে গিয়েছিল। খুব অল্প জমি পেয়েছিল। চার পাঁচ বিঘে জমি পেয়েছিল। তখন তো সেচ ব্যবস্থা ছিল না, মেশিন-ফেশিন ছিল না। দাদু ছিল। সে চোখে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এক বড়ো জ্যাঠা ছিলেন, তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। বাইরে রেলে কাজ করতেন। মানসিকতাটা ভালো ছিল, গ্রামে এলে সকলকে ভালোবাসতেন।

আমার জীবন ধারাটা ওই কাকা জ্যাঠার ছেলেদের মতো আমার যায়নি। নিজেদের জমি চাষ করতাম। কিছু জমি ভাগে করতাম। সে লোকসান। মা বিয়েতে যে-ক-টা গয়না পেয়েছিল চলে গেছে। ঘটি-বাটি সব চলে গেছে। ধানটা রাখতাম আমরা। বান এলে সব চলে গেল। কিংবা এমন একটা খরা এল, ঠিক ভাদ্র মাস থেকে আর বৃষ্টি হল না। তখন রিভার পাম্প ছিল। ২৪০ টাকা একর। জল নেই। সেই ধান শুকিয়ে গেল। হাইহেল্ডের ধান চাষটা একবার হত। ধান তখন একবার হত। আষাঢ় থেকে অঘ্রান পৌষ। তখন মাঠ প্রায় সময় ফাঁকা ধূ ধূ করত। তারপর শ্যালো এল। জলে টান পড়ল এক সময়। চৈত্র মাসের শেষ দিকটা প্রচুর টান। যে দশজনকে জল দেবে ঠিক করেছে সে জল দিতে পারছে না। তখন বোলান কালচার মাথায় উঠেছে। সেটা তিয়াত্তর চুয়াত্তর পঁচাত্তর সাল। মনে পড়ছে দু-বিঘে ধান লাগিয়েছি। আমার কাকার শ্যালোতে (চুপ থাকেন), জমিটা ভাগে করেছি (চুপ থাকেন), দিয়ে সেই শ্যালো ফেল হয়ে গেছে। ঠিক বোলানের রাতে। কেউ আর যাবে না। জল উঠছে না। যদি হয়ে যায় ভেবে আমি গেলাম। আমাকে ছেড়ে দিল চাবিটা। সে জল টিপে টিপে জল টিপে টিপে রাত বারোটা বেজে গেছে। সন্ধ্যে ছ-টায় গিয়েছি। ছ-ঘণ্টা কল টিপছি। মেশিন চলছে আবার জল ছেড়ে দিচ্ছে। দিয়ে গোটা গায়ে সেই কলের গোড়ার কাদা লেগে গিয়েছে। পরিশ্রান্ত হয়ে গেছি। তখন গাজনের মাতন চলছে মড়ার মাথা নিয়ে। গ্রামের উত্তর দিকটায়। ওখানে গিয়ে চিৎপাত হয়ে কাদা নিয়ে শুয়ে পড়লাম। আজও মনে পড়ে। সবাই বলছে কী ব্যাপার? কাকা শুয়ে পড়ল কেন? ভাবছে ঠাম মদ খেয়েছি। কিন্তু এক ফোঁটাও খাইনিকো সেদিন। (হাসি)

আপনি রাজনৈতিক আদর্শে অল্প বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন শুনেছি। সেই সময়ের কথা যদি বলেন—

খুব পরিপাটি চাষের কাজটা শিখিনি আমি। আমাদের মাঠটা প্রায় দেড় মাইল দূর। মাথায় করে দশজনের ভাত নিয়ে যাওয়া। সকাল বেলা মুড়ি নিয়ে যাওয়া। বর্ষায় আবায় দুশ ফুট মতো জায়গায় জল থাকত। রাস্তায়। ভাতটাকে জলে ভাসিয়ে নিয়ে যেতাম। ক্লাস টেনে পড়তে পড়তেই ঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। ওই গ্রামের কৃষিবিপ্লবী সংগঠন করতে। ভারতবর্ষের কৃষকদের মুক্তির জন্যে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দেশ গড়ার একটা ভাবনা থেকে তৎকালীন সময়ে আমার মনে হয়েছিল তাই বেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম। তখন মুনিষ খেটেছি। বীরভূমের লাভপুরের কাছে আছে লাঘাটা। ওর দক্ষিণ প্রান্তে দোনাইপুর কালীবাড়ি। দোনাইপুরের দক্ষিণে আছে তাদপুর। ওখানে মুনিষ খেটেছি অনেকদিন। অন্য পরিচয়ে থাকতাম। সব কাজ করতে পারতাম না। ধরলে বলতাম মিষ্টির দোকানে কাজ করতাম, মালিক খুব মদ খেত, মারধর করত। পালিয়ে এসেছি। দেখি জমি-জায়গা করব। বিয়ে-থিয়ে করে থাকব এখানে। এইসব কথাবার্তা হত। (হাসি) গ্রামের ভাষাটা বলতে পারতাম। কাজ জুটত। এদিকে সংগঠনের একটা বিচ্ছিরি লাইন ছিল। বিভ্রান্তিকর খতম করার লাইন ছিল। আদর্শ দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল। কিন্তু যে-লাইন ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে এডজাস্ট নয়। কিছু হিরো লোক এ-সব করতে পারে, কিছু পার্টিজান করতে পারে, কিছু ডাকাত করতে পারে। কিন্তু সাধারণ কৃষকের জীবনে এই লাইনটা নেওয়াটা একটা কঠিন ব্যাপার থাকে। কিন্তু আলোচনাগুলো তাদের ভালো লাগত। জমিদারের বিরুদ্ধে, জোতদারদের বিরুদ্ধে। একাত্ম হচ্ছে। কিন্তু এই ঘটনাগুলোয় তারা আসতে পারছে না। নিজের মধ্যে হতাশা চাগছে। পরবর্তীকালে বুঝতে পারলাম সামগ্রিকভাবে একটা ব্যর্থতা এসেছে। এটা শুধু আমি পারছি না এটা নয়। আর লিডাররা তো ফোর্সফুলি করে, ডগমা— ‘এই তুমি কে? তোমার ভুল আছে দেখ।’— আমার সঙ্গে আর হয়নিকো। পার্টির সঙ্গে থাকতে থাকতে ভারতবর্ষের সেন্ট্রাল কমিটির বহু লিডারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার ভাবনার সঙ্গে এডজাস্ট কারো হয়নি। কানু সান্যালকে আমার একটা সময় ভালো লেগেছিল। নকশালবাড়ি সংগ্রাম। সন্তোষ রাণার নেতৃত্বে সংগ্রাম। কিন্তু পরবর্তীকালে একটা খাদে গিয়ে পড়ে যায়। সেই খাদ থেকে তুলতে যদি কোনো দল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদেরকে আলাদা করে আপনি তো রাস্তাটাই বন্ধ করে দিলেন। লোকটা ভালো ছিল। একসাথে শুয়ে থেকেছি। খেয়েছি। জীবনের চাহিদা কিছু নাই। একমুঠো ভাত একটু আলুসেদ্ধ যদি পায় পরমানন্দ। একটু র-চা পেলে খেতেন। বিড়ি ফিরি খেতেন না। রাতে শুয়ে আছি। একটা বালিশ। বালিশ ওনাকে দিয়েছি। ভোরবেলা দেখছি বালিশ আমার মাথায় গোঁজা। এই ধরনের ঋষিতুল্য লোক ছিলেন। অসীম চৌধুরীর সঙ্গে বসেছি। সে অনেক কথা। অসুস্থ হয়ে পরে কিছুদিন বাড়ি ছিলাম। অর্শ ছিল। শহরের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। এরেস্ট হয়ে গেছি। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি। আবার পালিয়ে গেলাম। দশ পনেরো বছর এখানে ওখানে মুনিষ খাটা টুনিশ খাটা এইসব করে পরবর্তীকালে নব্বই সালে পুলিশের সাথে একটা রফা হল যে তুমি সারেন্ডার করো। তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। যদি সারেন্ডার কর নতুন কেস দেব না। দেখলাম যখন সেই জায়গাটা নেই, কিছু প্রগতিশীল কাজ কারবার সব মানুষই করে, তেমন আমিও করেছি, সারেন্ডার করলাম। পুলিশ দেখালো গ্রেফতার করেছি। ফলে ওইখানকার যিনি ওসি ছিলেন তার ভালো পোস্টিং হয়ে গেল আসানসোলে। ক-বছর জেলে কেটে গেল। ফিরে এলাম।

একদিকে বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্বাস আর একদিকে এই বোলান সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম থাকা— কেমন করে এটা পেরেছেন?

আমাদের একটা সংগঠন ছিল। আশপাশের চার পাঁচটা গ্রাম মিলে। যেখানে দুশ আড়াইশো ছেলে ছিল। ইয়ং ছেলে। যাদের অনেকে আমার ভাবনার অনুসারী ছিল। তারা তাদের চেতনা অনুযায়ী ছিল। সবাই মিলে দলটা করতাম। কাটোয়ার উপকেন্দ্রে একটা জায়গায় আমাদের রিহার্সাল হত। কোন দিন কোন গ্রামে হত। সুরে তেমন একটা সুবিধা হত না। কোথাও হয়তো গাজন গাইবার সময় গোলমাল হল। কিন্তু সবাই তো পাকা। পরবর্তী গাজনে গিয়ে এডজাস্ট হয়ে গেল। পায়ে হেঁটে দশ বারো মাইল দূরে গ্রামে গ্রামে যাওয়া। সেই ঝামটপুর, বহরান চলে গেছি ঘুরে ঘুরে গান গাইতে। আমার একটা ভাবনা ছিল যে মানুষের যে-ধরনের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, মানুষ তা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ওপর তলাতে যত ডিস্কো নাচ গান এ-সব হোক না কেন সে ওয়ান পারসেন্ট লোকের মধ্যে। তাদের জীবন ধারার সঙ্গে গ্রাম অঞ্চল খাপ খায় না। তো এই ভাবনা থেকে তাদের ক্রাইসিসের মধ্যে একটা কিছু খোঁজার চেষ্টা করা। আমার গানে সেটা এসেছে। লিখেছি, “সরকার যত আইন জারি করে, ঘুরে ফিরে চাপে বোঝা গরিবের ঘাড়ে।/ধনী লোকের গায়ে দেখ হাত না পড়ে, হেটকার চাপে দাদা মুসুরি মরে।” মানুষ এমনি বলে সে কথাগুলো। ওরে বাবা হেটকার চাপে মুসুরি মরে। মুসুরি জমিতে হেটকা বলে একরকম আগাছা বের হয়। সেটা মুসুরির মতোই দেখতে হয়। যখন ফলটা হয় তখন আলাদা দেখতে হয়ে যায়। ওদের কথা ওদের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে গেছি। গ্রাম দিয়ে যাচ্ছি। দূর থেকে দেখছি মাঠে ধান রুইছে একদল লেবার। আমি লিখেছি, “ধনীর আইনে কীবা জমি পাওয়া যায়, বলদ গরুর বাচ্চা কিগো হয়?”— দেখেছি তারাই গাইছে। বীজের আঁটি খুলছে আর গাইতে শুরু করছে। আমাকে দেখেনি। আমি দেখছি সেই গানটা তো এখনও বেঁচে আছে! এখনও আমার এই বিশ্বাস যায়নি যে, মানুষের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন যেখানে যেভাবে রয়েছে সেগুলোকে ব্যবহার করে বিজ্ঞানের চেতনা দাও, সমাজের চেতনা দাও, রাজনৈতিক চেতনা দাও। সেইভাবে দিলে যাদের জীবনে যন্ত্রণা বেশি তারা সেইভাবে বুঝতে পারে। অন্তত গানটা শুনবে।

এই যে বললেন নিজস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বোলান সংস্কৃতি বিষয়ে আপনার নিজস্ব মতামত জানতে চাইছি?

বিশেষ করে বর্ধমান জেলা কাটোয়া সাবডিভিশনের কেতুগ্রাম থানা, মঙ্গলকোট থানা, কাটোয়া থানা, পুর্বস্থলি থানার বেশ কিছুটা অংশ, নদীয়া কালীগঞ্জ, মুর্শিদাবাদের বড়োয়া থানা, কাঁদি, ভরতপুর থানা, বীরভূমের নানুরের বেশ কিছু অঞ্চল— এই সমস্ত অঞ্চলগুলিতে শিব পূজার প্রভাবটা প্রচুর রয়েছে। কাঁদি সাবডিভিশনে। এমনিতে প্রচলিত একটা উৎসব গাজন। সেই গাজন উৎসবে বোলান গানটা সাধারণ গরিব মানুষের জন্য একটা পরম আনন্দের বিষয় বলা যায়। পাঁচ ছ-দিন গাজন হয়। গাজন মানে হচ্ছে, মন্দির আছে, সেখানে সন্ন্যাসীরা কামায়। দশ জন, কোথাও একশো জন, কোথাও দু-শো জন কামায়। চৈত্র সংক্রান্তির আগে পঁচিশ ছাব্বিশ তারিখ থেকে কামান শুরু হয়। যদি তিরিশ তারিখে মাস হয় তবে পঁচিশ তারিখে কামায়। আর যদি একত্রিশ তারিখে মাস হয় তবে ছাব্বিশ তারিখে কামায়। বোলানটা হয় সাতাশ তারিখে আর আঠাশ তারিখে। সাতাশ কিংবা আঠাশ তারিখ শুরু। যদি একত্রিশ দিনে মাস হয় তাহলে আটাশ তারিখ। তিরিশ তারিখে মাস শেষ হলে তাহলে সাতাশ তারিখে শুরু হয়। এখন তো এন্টারটেনমেন্টের অনেক সুযোগ এসে গেছে। তখন তো গরিব মানুষের জন্য কিছু ছিল না। বোলান এমনিতে সাধারণের উৎসব। যাত্রা অনেক খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। ফলে একদম লেবার ক্লাস, তপশীলি বল গরিব চাষি, এই বোলান করত। একটা ঢোল দিয়ে দল তৈরি করত। গানটা লিখে আনত অন্য অন্য মহাজনদের কাছ থেকে। যারা কবিয়াল ছিল তাদের কাছ থেকে। নিয়ে একমাস ধরে রিহার্সালটা সন্ধ্যেবেলায় বৈঠকখানায় বসে বসে করে তারপরে বেরিয়ে যেত। এক একটা গ্রামে চারটে পাঁচটা দল হত। একটা একটা দলে তিরিশ জন চল্লিশ জন ছেলেপুলে আছে। আসরটা তো হয়েই আছে। এবার ডাকলো এসো গো আমাদের এখানে এসো। এই গ্রামটা এখানে এল, ওই গ্রামটা ওখানে গেল। এইভাবে চলে। কয়েকশো গ্রাম এইভাবে উৎসবে মেতে ওঠে। আগে দু-চারটে গ্রামে গান গাওয়া হত। এখন ভ্যান ভাড়া করে, ট্রেকার ভাড়া করে দলগুলো দশটা বিশটা তিরিশটা গ্রামে গেয়ে গেয়ে বেড়ায়। সেটা আরও আনন্দের এই জন্য যে, আগেকার দিনে উৎপাদন ব্যবস্থা, মানে চাষ অনুন্নত ছিল। অবস্থাপন্ন লোকেদের শোষণটা গ্রাম অঞ্চলে খুব তীব্র ছিল। দুর্গা পুজো এত এসেনশিয়াল বা বিখ্যাত ছিল না, আমার নিজের কাছেও ছিল না। ছোটোবেলাতে আমরা দেখেছি দুর্গা পুজোতে আমাদের আনন্দ হত না। গ্রামে একটা দুর্গা পুজো হত। সেখানে যাদের একটু বনেদিয়ানা আছে তারাই এ-সব পরিচালনা করত। আমরা দু-আনা দামের একটা বন্দুক নিয়ে খেলতাম। কোনোরকমে একটা মোটা জামা কাপড় হত, আর একটা দড়ি লাগানো প্যান্ট। ওই সারা বছর চলবে। একটু মুড়ি একটু নাড়ু করত।

গ্রামে নানান মানুষ আছে। গরিব মানুষ। তাদের মধ্যে গ্রামে তপশীলি মানুষ আছে। ডোম এরা সব। এরাই আমার কাছের বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। এদের সঙ্গে থেকে বোলান গানে এলাম। চাষিদের মধ্যে শুধু যে অবস্থাপন্ন ছিল তা নয়। সাধারণরা ছিল। এরাও সবাই বোলানটা খুব ভালোবাসত। বোলানটা এদের প্রাণের উৎসব ছিল। চৈত্র মাস শুরু হলে যখন ঢোলে বাড়ি পড়ত, তখন মনটা খানিক পাগলপাড়া হয়ে যেত। আমি শ্মশান বোলানটা খুব করতাম। শ্মশান বোলানে খরচটা কম ছিল। একটা মড়ার মাথা কোনোরকমে জোগার করতে পারলে হয়ে যেত। তার আগে ওই বেল ফেল এটা সেটা দিয়ে তৈরি করে মুখে কালি ফালি মেখে একটা গান করতাম। পরবর্তীকালে বোলানের মধ্যে এসে সুর কথা নিয়ে আমার মানসিকভাবে একটা জায়গা তৈরি হয়ে যায়।

দ্বিতীয় পাতা

Spread the love