বোলান শিল্পী শ্যামল প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার

চৈত্রের গাজন ও বোলান গান

আপনার বোলান গানে দেখছি সমসময়, সমাজ, রাজনীতি অনায়াসে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আপনার প্রিয় কিছু গানের উল্লেখ করলে বিষয়টা আরও বুঝতে পারব আমরা।

বোলানের প্রাথমিক ব্যাপারটা শিব সংক্রান্ত। কিন্তু আমার ঠাকুরদার সময় থেকে, আমার জ্যাঠা ফ্যাটাদের সময় থেকে তখন দেশ সম্বন্ধে নানা বিষয় বোলানের মধ্যে শুনতে পাই। বোলানে স্বদেশী ব্যাপার ছিল। আমার জ্যাঠা স্বদেশী আন্দোলনে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। পরে উনি ১৯৪৬-৪৭ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির অনুরক্ত হয়ে পড়েন। তখন উনি জাপান সম্বন্ধে, রেঙ্গুনের মেয়েদের সম্বন্ধে ইত্যাদি বিষয় বোলানে নিয়ে আসেন। সেই হতে হতে এবার সামাজিক নানা বিষয় চলে আসে। মেয়েদের আধুনিকতা যেটা গ্রাম সমাজ নিতে পারত না, সেই বিষয়গুলো সম্পর্কেও তারা তুলে ধরত। গান পাঁচালী লেখা হত। তার মধ্যে রগরগে ভাষাও চলে এসেছিল। আবার সমাজটা যেভাবে হোক ধাক্কা খেয়েছে। আবার পালাবন্দী গানে ফিরে গেছে। শ্রী কৃষ্ণর উপরে হোক, দুর্গার উপরে হোক ইত্যাদি, কী মহাভারতের যুদ্ধ ইত্যাদির উপরে গানে ফিরে গেছে। তবে আমার দলে দেড়শোজন মতো প্লেয়ার ছিল, তিরিশ চল্লিশজন রিহার্সাল দিত, বাকিরা ঠ্যাকান দিত। শ্যামলদার দল, তারা ঢুকে পড়বে। বারণ করা যাবে না। ব্যাপারটা উৎসবের মতো। দু-তিন গাজন গাইতে গাইতে গলা মিলিয়ে তুলে নিত। সাধারণত এই ধরনের গানগুলো লিখতে আমি পছন্দ করতাম। (গানের খাতা খুলে বলেন)—

স্মরণ করি বরণ করি নয়ন বারি দিয়ে।
তোমার অধম ছেলে মেয়ে।
ওমা বসুন্ধরা, হও মা খুশি হৃদয় অর্ঘ্য নিয়ে।
বলি নয়ন বারি দিয়ে।
মনের কথা বলতে আজকে গাইব বোলানের গান।
গাইতে বোলানের গান ক্ষোভেতে জ্বলেগো পরাণ।
মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার, ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
দেবকী মা বন্দী যেন কংস কারাগারে, গরীব চাষির প্রাণে হাহাকার।
ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
ধনীদের ফোলে ভুঁড়ি গদিতে বসে, চাষা ভাই মরে মাটি চষে।
ও তার পরনে নাইকো ত্যানা, পেটে নাই দানা,
সদা দুখে আঁখি জলে ভাসে, চাষা ভাই মরে মাটি চষে।
খাস জমি সব হাইকোর্টেতে মারাংবাবু দল নেতা।
সব ভরসা হয় ফরসা তারাই নেতা তারাই দাতা।
আমি যাই বাজারে মরি ঘুরে ঘুরে সস্তায় বুঝি কিছু মেলে না,
কানা বেগুন কিনে খুশি মনে মনে তরকারি আজ মন্দ হবে না।

আরও একটা গান।

ব্যাঘ্র মশাই খোঁয়াড়ের মালিক, গবাদিরা পাবে গো রিলিফ,
মন্ত্রী আমলায় শালা সামলায় ওরা সব শ্বশুরের কলিগ,
গবাদিরা পাবে গো রিলিফ।

মানে বাঘ খোঁয়াড়ের মালিক হয়েছে। (হাসি) আরও শোনো—

যে আসে সে বসায় শিলা, শিলা শিলা মজার খেলা,
যে বোঝে তার ঘরে জ্বালা, বলেনা মুখে, লাফানি দেখে।
পতিত জমি থাকতে পড়ে খেতের ফসল নেয়গো কেড়ে
গেঁয়ো চাষি ভয়ে মরে, ভয়ে কাঁপুনি বুকে।
যে বোঝে তার ঘরে জ্বালা, বলে না মুখে।
সরকার যত আইন জারি করে, ঘুরে ফিরে চাপে বোঝা গরিবের ঘাড়ে।
ধনী লোকের গায়ে দেখ হাত না পড়ে, হেটকার চাপে দাদা মুসুরি মরে।
পুরির শেকলে বাধা আজও এ সমাজ, মানুষ পশুর সম হয় হাল আজ।
মুনাফায় লালসায় খাবারেতে ঢালে বিষ, দেবগণ অন্ধ কী আজ?
পুরির শেকলে বাধা আজও এ সমাজ।
লীলাচলে পড়ে দাদা গো মোরা আজ বিষ হারা ঢোঁরা।
বুকেতে যাতনা ভরা, কি করি ফোঁস করা ছাড়া।
অধম শ্যামল ভাবে কেবল রুখবে কেবা ক্ষতি গো রুখবে কেবা ক্ষতি।
জাতের নামে ভাইয়ে ভাইয়ে চলছে লাঠালাঠি।

একদল গাইছে। ছাড়ছে। বাজনা চলছে। আবার একদল গিয়ে ধরছে। যার ফলে কনটিনিউশনে ব্রেকটা হয় না। শেষ হচ্ছে। আবার নতুন গানে লাফিয়ে ধরছে। দলটা দুটো ভাগে ভাগ করা থাকে। দুটো খাত থাকে। একদল ছাড়ে একদল ধরে।

এই এরকম সমাজচিত্র আগেও এসেছে বোলানে। আমার গ্রামের একজন গরিব চাষি। সে লিখতে পড়তে জানত না। সে গান বেঁধেছে। শোন—

একে চিনি মেলে না, তাতে আগুন দর ছানা,
মিষ্টিতে মেশায় গেঁড়ো সানা গো,সানা গো।
ভাগীরথী তীরে হোমগার্ডে চাল ধরে,
গর্ভবতী নারী ছিঃ ছিঃ লাজে মরি,
ওগো চাল বলে মারে রুলের গুঁতো গো, গুঁতো গো।
একে চিনি মেলে না, তাতে আগুন দর ছানা,
মিষ্টিতে মেশায় গেড়ো সানা গো, সানা গো।

কবে ছোটোবেলায় শুনেছি এই গানগুলো। ছানার দর আগুন হয়ে গেছে। গেঁড়ো সানা মানে কচুর গেঁড়ো। মুকিটা যেখানে ধরে। যেখান থেকে কচুটা ছিঁড়ে নেওয়া হয়, দেখেচেন নিশ্চয়ই। ওইটা ছেনে চালের গুঁড়ো আর ছানার সঙ্গে পাইল করে সন্দেশ হত একটা সময়। আমি নিজেও ছোটো বেলায় খেয়েছি। কালিগঞ্জের মেলায় যেতাম। কলাইয়ের ডাল থেকে ছানা তৈরি করে সেটা দিয়ে রসগোল্লা হত। কেসরী আলু যেটা মিষ্টি আলু সেটা দিয়ে রসগোল্লা। এই গানটা উনিশশো চৌষট্টি পঁয়ষট্টি ছেষট্টি সালের। নদিয়ায় তখন চালের খুব ক্রাইসিস। চাল ব্ল্যাক হত তখন। এমারজেন্সির সময় শুধু নয়, তার আগেও এ-সব হয়েছে। গরিব মহিলারা পেটের মধ্যে চাল বেঁধে নিয়ে যেত। এখন সত্যি সত্যি গর্ভবতী নারীর পেটে খোঁচা মেরে দিয়েছে রুল দিয়ে। তখন চাল নিয়ে গেলে ঘাটে পুলিশ আটকাত বলে মানুষ ভাত রেঁধে নিয়ে যেত। তাহলে ধরতে পারত না। হোমগার্ডরা ভাতগুলো কেড়ে ফেলে দিত অনেক সময়। এটা সেই মৃগেনের জ্যাঠা, গোবর্ধন দাস লিখেছে। আমি অবাক হয়ে যাই শুনে। আবার দেখো লিখেছে, বনানীর জেড়শ্বশুর, বসে বসে ঘটি তৈরি করত, সে গান বেঁধেছে—

চিরদিন পুরুষ আর প্রকৃতি এই দুয়ে হয় পিরিতি।
গোপনে কিছুদিন তো ঢাকা রয়, সময়েফেরে ফিরে প্রকাশ হয়।
ফাগুন মাসে দখিনা হাওয়ায় কোকিলের কুহু সুরে প্রাণ জুড়ায়।
সময়ে ফেরে ফিরে প্রকাশ হয়।

একটা ভূমিহীন লোক। মানে লেবার। তার মুখ দিয়ে যে এই কথাটা বেরিয়েছে। কোথা থেকে পাচ্ছে! আমি অবাক হয়ে যাই। (হাসি)

আমাদের কথোপকথন এখানেই শেষ করব। তবে কোন দিকটা আলোচনায় বাদ পড়ে গেছে মনে হলে বা আমার প্রশ্ন করে জানা উচিত ছিল মনে করলে আপনি এই আলোচনায় যোগ করতে পারেন।

একটা সময় পার্টির রাজনৈতিক লাইনটা আমার আর বিশ্বাস হচ্ছে না। তবে মনে হত হবে, একটা কিছু হবে। সাধারণ মানুষকে নিয়ে হবে। মানুষ বিপদে পড়ে গেলে আমাকে ডাকতে আসত। দাদা চলো একটুখানি। তখন মনে হত, এটা যদি না করি তবে কী করব? সারাজীবনে অনেক ঘটনা ঘটেছে। গুণ্ডা বদমাইশের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। নানানভাবে তারা বদলা নিয়েছে। আমার ঠাকুমা বলছিল তুই যদি পার্টি ছাড়িস আড়াই ভরি সোনা, আড়াই বিঘে জমি তোকে দেব। পার্টি তখনও ছাড়িনি। পঁচিশ কাঠা মতো জমি আমায় দিয়েছিল। পরবর্তীকালে আমার শ্বশুর মারা গিয়েছিল। বাবাও মারা গিয়েছিলেন। আমার শ্বশুর আমার স্ত্রীকে একটু জায়গা দিয়েছিল বাড়ি করার জন্য। কাজে লেগেছিলাম, সেখানে কনট্রাক্টরের আন্ডারে কাজ করতাম। কিছু টাকা করে ভায়রা ভাইদের কিছু টাকা দিয়ে বাড়তি জমি কিছুটা কিনে নিয়েছিলাম। তারপর টিবি হয়ে গেল। এক বছরে ভালো হয়নি। প্রায় চার বছর লেগেছিল। কাটোয়ার ডাক্তার জবাব দিয়েছিল। তখন পিজিতে ট্রিটমেন্ট করে ঠিক হয়ে গেছি। ওটা করতে করতে আমার একটা মেয়ে মারা গেল নানান চক্রান্তে। সেই সমস্ত লোকেরা যারা খুব বদমাইশ ছিল, মায়ের কোল থেকে মেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করত তাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমার মেয়েটাকে শেষ করে দিল। ব্ল্যাকমেল করে হত্যা করল। বুঝতে পেরেছি। আমার উপর মানুষের বিশ্বাসটা তারা মানতে পারত না। মনে করত এই আমাদের বাধা। ছেলেটার তো এঙ্কেফেলাইটিস হয়ে মাথা গণ্ডগোল হয়ে গেল। পরে সেও মারা গেল। স্ত্রী মারা গেল। একটা মেয়ে আছে। ওর বিয়ে দিয়েছি। ছেলেটা ভালো। নাতনি আছে। মেয়েটা প্যারাটিচারের কাজ পেয়েছে। সেখান থেকে চলছে। গ্রামের জায়গাটা বেচে দিয়েছি। নারকেল গাছ, দুটো আম গাছ ভালো ভালো। বাড়ি ছিল। চোখের জল মুছতে মুছতে বেচে দিয়েছি। ওই টাকা কিছুটা মেয়েকে দিয়েছি। কিছুটা আমার আছে। এখন আমি বান্দরা গ্রামে থাকি। কাটোয়া সংলগ্ন বান্দরা গ্রাম। আর বোলান গানের শিল্পী হিসেবে হাজার টাকা ভাতা পাই সরকার থেকে। সেখানে যারা ছিল গান শুনে খুশি হয়েছে। তাই দিয়েছিল। পোগ্রাম আমি নিই না। অসুস্থ ছিলাম। লাঠি নিয়ে হাঁটতাম। এখন একটু ঠিক আছি। আর নিজের দলটাকে গোছ করতে পারিনি। এখন আমি একা মানুষ।

স্থান: বাথানগাছি উচ্চ বিদ্যালয়, বাথানগাছি, দিগনগর, নদিয়া
ঋণ স্বীকার: ২১তম শিশু কিশোর বিকাশ মেলা, ২০১৮।

চিত্রঋণ: স্বপন ঠাকুর, অনুপ ঘোষ, সুব্রত ঘোষ

প্রথম পাতা

Spread the love

3 Comments

  • অসামান্য কাজ। অনেক কথা জানলাম।

    রঘু জাগুলীয়া,
  • খুব ভালো লাগল. যেহেতু লাভপুর, কাটোয়ার সঙ্গে আমার মাটির যোগ, তাই আত্মীয়তা অনুভব করলাম.

    শতদল মিত্র,
  • নিঃসন্দেহে খুব ভালো কাজ। এই সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সৃষ্টিশীল মানুষগুলির জীবনবোধ টাই অবাক করে, শ্রদ্ধাবনত করে।লেখক শিল্পীর মুখের কথা এমন হুবহু রেখেছেন যে এত দীর্ঘ লেখা পড়তে পড়তে মনে হল শিল্পী শ্যামলবাবুর সামনে বসেই বুঝি কথাগুলি শুনছি।

    বিদিশা ঘোষ,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *