লেখক নয় , লেখাই মূলধন

কবিতা

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

স্বজনকথা


গাছবৃত্তে লেখা পদ্য। গাছশীর্ষে ন্যুব্জ মাতা-পিতা
উঠে দেখছে কামপ্রবাহ; কালো আকাশ উন্মুক্ত স্তন।
“আয়” ডাকছে, “আয়” ডাকছে, আমি সে-স্তন মুঠোয় রাখি যেই
ঝরে পড়ল ন্যুব্জ মাতা, ন্যুব্জ পিতা— হলুদ বিদ্যুৎ।
শ্মশানবঁধূ কাঠ সাজাল, কাঠ জ্বালাল, গাছবৃত্তে লেখা
পারিবারিক হাড় জ্বলছে; চিতাকাষ্ঠে ন্যুব্জ মাতা-পিতা
কুঁকড়ে গেল; অন্ধকার; আলো ফুটলে ন্যাড়ামুণ্ডি হই।
মুঠো শক্ত, স্তনমাংস আদরে নয় ব্যথায় কাতরায়।

ন্যুব্জ মাতা, ন্যুব্জ পিতা একসঙ্গে বৈতরণী পার।
আমি দেখছি প্রতি পর্বে পাতাবর্ণ বাদামি হয়ে যায়।
“আয়” ডাকছে, “আয়” ডাকছে গাছবৃত্তে জন্ম নেওয়া জরা।
তর্পণের সময়কাল। মায়াকুণ্ডে চংক্রমণ করি।
গাছবৃত্তে লেখা পদ্য শিকড় ভেঙে আছড়ে পড়ে মাঠে।
ন্যুব্জ মাতাপিতার মুখ আকাশস্তন চুষছে সারারাত…


অন্ধকারে নেমে আসছি। স্বপ্নে কার খুকির চিৎকার
খুনদৃশ্য দেখার মতো তীক্ষ্ণ ভয়ে হঠাৎ জ্বলে ওঠে?
হত্যা এত কঠিন, তবু কোথাও কোনো প্রশিক্ষণ নেই।
অন্ধকারে নেমে আসছি। গঙ্গাজল, আমায় ত্রাণ দাও।
এখন যাকে অনাত্মীয় ভেবেছি, তার আত্মীয়-শরীর
গলা বাড়ায়। ছাগের গলা। খাঁড়ার মতো আমার স্পৃহা নামে।
অন্ধকারে মাথা গড়ায়। স্বপ্নে কার খুকির চিৎকার
খুনশব্দ শোনার মতো মুগ্ধ শোকে হঠাৎ জ্বলে ওঠে?

এখন শোক অনপনেয়। অথচ খুকি বোধের মতো চুপ।
কার যে মেয়ে! আমার? তবে স্বপ্নে কেন মুখোশ-পরিহিতা?
দেখেছে তার বিশাল সখা হত্যা শেষে শিশুর মতো কাঁদে।
অন্ধকারে নেমে আসছি। স্বপ্নে তার মাটির মতো হাত
আমার হাত স্পর্শ করে; রক্ত ছুঁয়ে মোমের মতো জ্বলে।
অনেক হল! গঙ্গাজল, বাপ-বেটিকে এবার ত্রাণ দাও।


এই আমার ঘর-দুয়ার। হিংস্র থেকে হিংস্রতর রোজ।
পশুর মতো দু-তিনজন। ক্ষুব্ধ খুব। হাঁড়ির জল ফোটে।
ফুটতে থাকি সপরিবার। ধোঁয়ার মতো অলীক, নিরাকার
এই আমার ঘর-দুয়ার শূন্যে উঠে শূন্য পেড়ে আনে।
বৃত্তে বসি। শূন্য খাই। চিন্তামণি বঁটিতে আঁশ ঘষে।
হিংস্র থেকে হিংস্রতর। ভাতের থালা বিষের চোটে নীল।
সে-বিষ শেষে কথামৃত। শরীর থেকে মায়া-প্রপঞ্চর
আদিম বীজ বেরিয়ে যায়; ঘর-দুয়ার মৃতের মতো চুপ…

এই আমার দুয়ার-ঘর। মন্দিরের সাপের মতো রোজ
দৈব কোনো লিঙ্গ ভেবে আমার আয়ু জড়িয়ে জেগে থাকে।
চিন্তামণি বঁটি জাগায়। আমার আঁশ সিঁটিয়ে যায় ভয়ে।
মাছের মতো দু-তিনজন। বেকুব খুব। কড়ায় তেল ফোটে।
আঁশের মায়া তলিয়ে গেছে। সবার দেহ নুন-হলুদে মাখা।
এই আমার ঘর-দুয়ার। চিন্তামণি, জমিয়ে রাঁধো। খাই…


রোগ বিদ্যা। রোগ বন্ধু। উড়ে মরছে আরোগ্যের ছাই।
ঘোর চিনছি। জড় চিনছি। বাস্তবিক জড় কিচ্ছু নেই।
প্রাণবাষ্প ঘিরে ধরছে। দূরে মৃত্যু একা। অপেক্ষায়…
ঘোর কিন্তু যুবতী আয়া। রাত বাড়লে পথ্য কাছে রাখে।
খাদ্য গেল ভিতরে আর তখন থেকে প্রবল বমিভাব।
রোগবন্ধু শিয়রে বসে; কানের পাশে ঠান্ডা মুড়ো নামে—
“এখন থেকে লেখার হাত দাসানুদাস, বশংবদ নয়।”
রোগ বিদ্যা। রোগ বন্ধু। উড়ে যাচ্ছে পঙ্গু স্থিতিকাল।

স্বজন ছিল লিখনকাম। এখন হাত আমার আওতায়
থাকে না আর; পৃষ্ঠা বোঝে রমণগতি বদলে গেছে খুব।
সে স্বৈরিণী, তবুও তার শরীর কাঁপে। গর্ভপথ জড়।
কিন্তু, দ্যাখো, জড় চিনেছি। বাস্তবিক জড় কিচ্ছু নেই।
প্রাণবাষ্প ফিকে হচ্ছে। মরণ কাছে। রভস উবে যায়…
রোগ বিদ্যা। রোগ বন্ধু। ক্রমান্বয়ে আমার মাথা চাটে।


ক্ষণজন্মা আমি একটি সুলক্ষণা মেয়ে পয়দা করে
স্ত্রী-র গর্ভ খুশি করেছি। আঁতুর ম-ম করেছে তার ওমে।
আমার ঘাড়ে তিন-চারটে ফুটোর মতো জন্মদাগ দেখে
গুরু আমায় বলেছিলেন, “গতজন্মে সদ্যোজাত মৃগ
ছিলিস, তোর ঘাড় কামড়ে এক বাঘিনী আরামে খেয়েছিল…”
আমার স্ত্রী বা মেয়ের জ্ঞানে এ-সব কিছু রাখিনি। তবু রাতে
খেলাচ্ছলে মেয়ে আমার ঘাড়ে নরম থাবা বোলায়, বলে—
“এগুলো ছুঁলে ব্যথা লাগছে? এ-দাগগুলো কোথায় পেলে, বাবা?”

স্বপ্নে দেখি মেয়ে আমার সেই বাঘিনী; চক্ষু জ্বেলে ঘোরে।
এই আমায় দেখল। ছুট। ছিটকে যায় অরণ্যের মাটি।
আর্তনাদ। দু-একবার। ঘাড়ের পেশী কামড় মেখে স্থির।
আদরমুখো তিন শাবক কিছুটা খেল… বাকিটা মেয়ে খায়…
“এ-দাগগুলো কোথায় পেলে? এ-গুলো ছুঁলে ব্যথা লাগছে, বাবা?”
ঘুমপুতুল মেয়ের গায়ে খুঁজে মরছি কালো ডোরার শোক…


মন্ত্রখাকী ঘর আমার। চিবিয়ে খায় মারণ-উচাটন।
বশবর্তী রাখতে চাই। কিন্তু ঘর এমন চঞ্চলা,
মধ্যরাতে উলটে দেয় লক্ষ্মীভাঁড়। পয়সা ছড়াছড়ি।
পয়সা যে-ই গড়িয়ে পড়ে, সারা উঠোন প্রবল বেঁকে যায়।
মন্ত্রখাকী ঘর আমার। যাগ-যজ্ঞে নরমুণ্ড ছোঁড়ে।
নরকরোটি অগ্নি ছোঁয়। সত্ত্বগুণ সিঁটিয়ে যায় ভয়ে।
ভয়? না মোহ? চিলেকোঠায় চুল বিছিয়ে দুর্বিপাক বসে।
যজ্ঞাহুতি কিচ্ছু নেই। সমিধ ডোবে মারণী বন্যায়…

শুধুমাত্র একতারার পরাৎপর ধুন জাগালে কেউ,
ঘর-দুয়ার ঘুমায়। সুখ। খোকার মুখে চাঁদের দুধ নামে।
বাপ-পিতেমো যে-শাপ পেয়ে অন্ধপ্রাণ, দৃশ্য থেকে দূর,
সে-শাপ নেভে; দৃশ্যাতীত স্বপ্নঘোরে দৃশ্য হয়ে যায়।
অলপ্পেয়ে ঘর আমার অলখ্ সাঁই দেখার লোভে-লোভে
আমায় ফের বাউল করে ভাসিয়ে দিল ত্রিনদী সঙ্গমে।

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

জন্ম ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৯৮। হুগলি জেলার আরামবাগে। বর্তমানে তারকেশ্বরের স্থায়ী বাসিন্দা। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ রবীন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে ইংলিশ অনার্স নিয়ে পাঠরত। লেখালিখির সূত্রপাত ২০১৬-র শেষদিকে হলেও লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে ২০১৯ থেকে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও ওয়েবজিনে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে একটি বই প্রকাশের সম্ভাবনা আছে।

আমাদের নতুন বই