Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

পার্থজিৎ চন্দ

অশুভ লেখারা

অভিশাপ

এ অন্ধকার মরুবন্দর, এই তামস সন্ধে, ক্যারাভ্যান ও ব্ল্যাক-প্যান্থার
বালিয়াড়ির ভেতর যে লুপ্ত-সমুদ্রের রেখা… ধকধক করছে
অশুভ তারার আলো
এ সবের মধ্যে, রক্ত-কুয়াশার ভেতর দুলে উঠবে উন্মাদ মাতৃমূর্তি
ঘুমের ভেতর সে উন্মাদিনী সন্তানকে ঠেলে দেবে আগুন-নদীতে
কোনও এক সর্পসংকুল, শয়তান-রহস্য ঘেরা দ্বীপে
তাকে যেতে হবে বাবার সন্ধানে।
সেখানে ক্রুশকাঠ, পেরেকে মাখানো রক্ত, নীল কুয়াশাকে
লালাভ করছে বিষণ্ণ রুধির, আর প্রহরের পর প্রহর
বালি-সমুদ্রের বুক চিরে, সন্তানের দিকে ধেয়ে আসছে
উন্মাদিনীর গূঢ় অভিশাপ

অন্তিম

খিলান ফুরানো রাস্তা। পাখির চোখের দিকে ছুটে আসা বন শিস্‌ দিচ্ছে
দু’দিকের ফাঁকা মাঠে শাদা বক শূন্য থেকে উড়ে এসে
মিলিয়ে যাচ্ছে আবার শূন্যে। স্কুল ছুটি হল; বহুক্ষণ
লোহার ঘণ্টা বাজতে বাজতে স্থির হয়ে গেছে
এখন বিকেল; একটি স্থলচর নৌকার পাল দুলে উঠছে দিগন্তের কাছে—

তারপর এখানে নদীর ঘাট হবে, নৌকাভর্তি ছেলেমেয়ে
বনের ভেতর ঢুকে দেখবে যজ্ঞের রাত
তারামণ্ডলের দিকে উড়ে যাচ্ছে ধোঁয়া,
ধোঁয়ার ভেতর শিশুদের হাসি
ইন্ধনের দিকে এগিয়ে আসছে আগুনের রেখা;
শুনবে শিথিল কণ্ঠের নরনারী, কামাচ্ছন্ন, বলে উঠছে
‘হে, অঙ্গিরা, এ-কান্তার তোমার; এ-নদী ও নৌকা তোমার
আমরা দিন-রাত মাড়িয়ে এসেছি, রক্তাক্ত পা, এবার তোমার কোলে
আমাদের নাও… কাম দাও… ঘুমাই’

ঋক্ষ

রথ থেকে নেমে
তিনি ক্লান্ত ঘোড়ার শরীরে হাত রেখে,
ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন
হাওয়া দিচ্ছে
দূরে তারাদের বনে

সাতটি তারার দীর্ঘকেশ, ঋক্ষ…
ঘুম ভেঙে তাকিয়ে দেখেছে
দীর্ঘ রাত,
ক্লান্ত রথস্বামীর মুখে
পড়ে আছে
তার শরীরের মৃদু প্রভা

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

ধুলোবালি

এক
মাঝে মাঝে মনে হয় শ্বাস নেওয়ার মতো ভারি পৃথিবীতে কিছু নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় অপেক্ষা শব্দের গায়ে যদি একটা চারা গাছ পুঁতে দিতে পারতাম। মাঝে মাঝে মনে হয় একবার চলে গেলে আর কারো সঙ্গেই দেখা হবে না? এ সমস্ত দিনে এও মনে হয় বড়ো বেশি ক্ষমাপ্রবণতা লঘু করে দেয়।

আজকাল প্রায়ই মনে হয়
কারণ ছাড়াও পৃথিবীতে কত কিছুই তো ঘটে…

দুই
সবুজ ল্যান্ডস্কেপ, মসে ঢাকা লোমশ গাছেরা, এসব পেরিয়ে অনেকটা দূর চলে গেলে পথ আর পা পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করে ঠিকানা। কেউই কিছু বলতে পারে না কাউকে।
একটা খরগোশ আর একটা শেয়াল পরস্পর বিপরীত দিকে দৌড়ে যাচ্ছে দেখি।
কার পায়ের চিহ্ন ধরে যাবে তুমি, তুমি ঠিক করো।
সোজা হাঁটতে গেলে মস্ত সরীসৃপ রাস্তা জুড়ে শুয়ে
কে কার বন্ধু এরা, শত্রু বা কার? জঙ্গল জঙ্গল বিস্তৃত সবুজ সমস্তটা গিলে ফেলে। আমাকেও।

কখন উগড়ে তুলে ফেলে দেয়, অপেক্ষায় থাকি।

তিন
ছোটো ছোটো গঞ্জের হাট ধুলো ও কাদামাটি মেখে ঘর ছাড়ার স্পৃহা কিরকম মায়া করে তোলে সব।
হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় না।
তবু হাত প্রসারিত থাকে।
তবু দৃশ্যগুলো সরে সরে যায়।
অপ্রাকৃত শব্দের কাছাকাছি এত আলো জমে থাকে, খুব অলক্ষ্যে

ঘরে ফেরার পথ রূপকথা হয়ে যায়!

চার
ছবি আঁকতে বসেছ
রেখায় রঙে আলো আঁকতে গিয়ে ফুটিয়ে তুলেছো অন্ধকার—
যাকে ঘিরে ঘিরে
ওই কিছু না থাকাটুকুই আলো।
তাকে জায়গা দিয়েছ খেলাধুলো মেখে নিতে
কিছু নেই বোঝাতেও তো কিছু আছে বলতেই হল!
হাওয়াকে আঁকতে গিয়ে ঝরাপাতা কেঁপে ওঠা জল
উড়ো চুল যেভাবে এঁকেছ

আর হাওয়া তার পাশ দিয়ে চোখ মটকিয়ে দূরে সরে গেছে!

পাঁচ
অপরাজিতার নীলে হলুদ প্রজাপতি উড়ে উড়ে ঘোরে।পুরনো নদীর মতো তাপ তাদের ডানায়। হঠাৎ মনে হয় হুল নেই কান্না নেই ভাষা নেই। তবে কী ভাবে ফুলের কাছে রেখে যায় হয়ে ওঠবার ব্যথা? কুৎসিত কীট থেকে এমন ডানার আলো কতটা যন্ত্রণা সাঁতরে এসে এনেছিল সে, ফুল জানে, গাছ জানে, পাতাগুলো জানে?

যে খোলস ফাটিয়ে সে উড়ে এলো সেখানে সুতোয় কিছু বাঁধা রয়ে গেল— ছেঁড়া সুতো, জানো তুমি, তুমি জানো?

সমস্তই জানতে হবে, একথা কে কবে জেনেছে!

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

পঙ্কজ চক্রবর্তী

ইচ্ছাপত্র

কীই বা চেয়েছি এমন
দু- একজন সামান্য অবুঝ পাঠক
অথবা নিরক্ষর শ্রোতা
রেলপথে হাওয়া ছোটে দূরত্বের কাছের মানুষ

যে জটিল, সহজ চোখে দৃষ্টিপাত করে
মধ্যদুপুরে উনোনে স্নানের অবসর

অনাবৃষ্টির দিনে দু’চোখে যে বিরহ ঝরে

নকল মানুষের মেধা
আমার কবিতা যেন স্পর্শ না করে

বৈধব্য

যে নেই তার ভঙ্গিমাটুকু নিয়ে বাজার সেরে এলে
বলছ : দেখো তো রঙটা কেমন?
মানাবে এই বয়সে !

আয়নার গল্প ছড়িয়ে পড়ছে দুই দিকে

কে দেখছে ? দুপুর ?
এলোমেলো বিছানায়
মিথ্যে সাঁকোর ছায়া পেরোচ্ছে জোয়ারের জল

ঝড়ের ভুল

সুন্দর, আমি গিয়েছিলাম

তুমি তো বলনি : বাজাও আমারে বাজাও
তাই ফিরে আসা
বিষণ্ণ আমিষ ছায়া দরোজা স্পর্শ করেনি

তোমারও সংসার আছে
আছে জল, প্রিয় মুদ্রাদোষ, অন্তিম সাঁকোর চরিত্র

অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা নিয়ে
পৃথিবীর  সব গান ঘি ও আগুন মেপে
বিবাহরেখায় শেষ হবে ?
ধান ও যবের শিষে সূর্যাস্তের গান

সন্তান উৎপাদন জটিল হয়েছে

মিথের ওপারে

মহৎ তাঁর দুঃখ নিয়ে কিছুদিন সম্ভাবনা খোঁজে

চুল্লির ভিতর তাঁরও পয়তাল্লিশ মিনিট
উত্তরীয় ডানা ঝাপটায়
বেজে ওঠে স্মারকের টিনের পরাণ

সামান্য দূরত্বে পরামর্শ সেরে নিচ্ছে দুধওলা
দেবতা ও পাইলট কার
বদ্ধ ডোবার পাশে কিংবদন্তী উবু হয়ে বসে
দু-একজন নিরীহ মানুষ কারণে অকারণে বোঝে

মহৎ তাঁর দুঃখ নিয়ে প্রতিদিন সম্ভাবনা খোঁজে

বয়ন

জানালা বেয়ে নামছে কাঠবেড়ালির মৃত ছায়া
পুরনো ক্লার্কের ঘুম ভেঙে যায়

মাঠ থেকে উঠে এল একজন
দাঁড়িয়ে রইল  নিজের তৈরি করা মেঠো বাসস্টপে
তার নাভির কাছে তামার পয়সা টলোমলো

সমস্ত দূরত্ব আলোকবর্ষব্যাপী এক শ্বাপদ ভঙ্গিমা

দুজন মানুষ আলাদা অসুখে পড়ে আছে খড়ের গাদায়
যেন সব অস্থিরতায় গ্রহণ লেগেছে

যেন সূঁচই প্রকৃত বিদ্যা উন্মাদ ঘাসের জঙ্গলে

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

অনুপম মুখোপাধ্যায়

কমেডি অপেরা

এক কমেডি থেকে আরেক কমেডি অবধি আমাদের
চাওয়া পাওয়া

যেমন অদ্ভুত শৃঙ্খলায় বাঁধা থাকে গরম হাওয়া
আর বৃক্ষের আপনজন শুকনো পাতাগুলো

আমরা পাহাড়ে গিয়ে দেখছি
সেখানে মনের মতো শীত নেই

আমরা সমুদ্রে গিয়ে দেখছি
যথেষ্ট জল পাওয়া যায় না

তোমার গলায় সেদিন শুনতে পেলাম
অবিকল আমারই আওয়াজ

আমাদের মধ্যকার বাতাসকে ভেঙে
ডিগবাজি খাচ্ছে কিছু গম্ভীর ক্লাউন

ভ্রমণ

জলের কিনারায় স্বচ্ছ হয়ে আছে বরফ
তাহলে আমরা সম্পর্কের কঠিনতার কথা বলি

যে কবিতায় চোখের জল থাকে
সেই কবিতাই স্পষ্ট পড়া যায়

বেড়াতে যাওয়ার চেয়েও বেড়াতে যাওয়া নিয়ে
কথা বলতে বেশি ভাল লাগে

অশ্রুপারের কুয়াশা নিয়ে যা বলবে
কবিতার মতোই শোনাবে

ভৌতিক

ভূত কখনো পরিষ্কার ঘর পছন্দ করে না
ভূত চায় বিছানায় তোমার পা ঠান্ডাই থাক

বাতাস যতটা নিঃসঙ্গ হয় জীবন তার চেয়ে
অনেক বেশি ফাঁকা হতে পারে

রক্ত পরীক্ষা করিয়ে ফেরার পথে
তুমি একটা টিভি কিনে আনলে

ধপধপে সাদা একটা ঘরে উলঙ্গ এক মহিলা
চামচে ঢেলে কাফ সিরাপ খাচ্ছেন

টকটকে লাল কাফ সিরাপ

যেমন মৃত্যু নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোনো লেখক
জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখেন

জলের জাহাজ

ঘুমের মধ্যে বৃষ্টি হল তুমি জানতে পারলে না
একটা বিকেল তুমি এভাবেই কাটিয়ে দিলে

অথচ জলের জাহাজ তোমার ঘুমের মধ্যে ঢুকেছিল

স্বচ্ছ জাহাজভর্তি লবণাক্ত জল
চোখ আর মেঘের মধ্যে আকার নিচ্ছিল

রক্তে মিশে আছে নৌচালনা বিষয়ক সতর্কতা
রক্তে মিশে আছে জাহাজডুবির রাসায়নিক ধারণা

সমুদ্রকে এভাবে মোটেই হারানো যায় না

তোমার প্রিয় পুরুষকে তুমি কাগজের মতো
ভাঁজ করে রেখেছ

তার লাল টালির বাড়ি থেমে যাওয়া বৃষ্টিতে
কমলালেবুর খোসার মতো তেতো হয়ে আছে

মেঘের নীচের পৃথিবী

পথকে শক্ত করে ধরে রাখো যেন হারিয়ে না যায়
পাখিরাও ওড়ে কারণ তারা আকাশ ছাড়া বাঁচতে চায়

কালো মেঘের তলায় জলজমা ক্ষেতগুলো চকচক করছে

জল দিয়ে ঘেরা পৃথিবীতেই তোমাকে একটা
জীবন কাটাতে হবে

জল ভেঙে উঠে আসছে জন্মের আগের শূন্যতা
জল ভেঙে কেটে যাচ্ছে জন্মের পরের ফাঁকা স্বভাব

দিগন্ত থেকে হুহু করে ছুটে আসছে দমকা জোলো হাওয়া
তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে আরো বাঁচার জন্য

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

কৌশিক জোয়ারদার

পশুখামার-১

শকুন


মনের অর্ধেকটা নিয়েছে শেয়াল অর্ধেকটা শকুন
এখন আর সে মেয়ে নয়, মানুষও নয় আর
আপাদমস্তক মাংস পড়ে আছে প্লেটে
কাদের কুলের শেয়াল তুমি
লিঙ্গে শান দিচ্ছো কখন থেকে
ওদিকে অন্য দেশে অন্য শকুন বুঝি জিতে গেল
স্কোরবোর্ডে লেখা হলো তিন-দুই


বেশকিছু মানুষকে আপনি
শকুন হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবেন
মানুষেরা অনেকেই শেয়াল।
আসলে শকুন একটা ধারণামাত্র
যেমন এক নয় সব শেয়ালের রা
ফলে, শকুনের দলে হঠাৎ একজন
মানুষের দেখা পেয়ে গেলে
অবাক হবার কিছুই নেই

মুরগি

সকালবেলা দুটো ডিমসেদ্ধ খেয়েছি
মুরগির সম্ভাবনাও কী সুস্বাদু — আমি ভাবছিলাম
‘মুরগি’ শব্দটির দ্বারা আমরা মোরগকেও বুঝিয়ে থাকি
মোরগ ভোরবেলায় ডাকে
বাড়ির মালিক অথবা দিনকর, কে যে আগে
ঘুম থেকে ওঠে — আমি জানি না
পাশের বাড়ির ভাড়াটে অবশ্য জানে—
দিনের মধ্যে যখন তখন ডেকে উঠতে পারে মোরগ
দুপুরে ঘুমের ব্যাঘাত হলে
মোরগকে মুরগি করে ফেলতে ইচ্ছে করে—
মানে খেয়ে ফেলতে
মোরগের মাংসও আমরা খাই
কিন্তু মানুষ খেয়ে ফেললে আমরা বলি:
অমুককে মুরগি করা গেছে

গাধা

সব মাস্টারমশাইকেই আমার ধোপা মনে হতো
তারপর একদিন গাধাকে দেখেই বুঝেছি—
এ কিছুতেই ঘোড়া নয় জেব্রা নয় জিরাফ নয়
ইনিই হলেন সকাল বিকেল উচ্চারিত সেই পশু।
গাধাও জানে গাধাকে দেখাও অসহ্য ভার
তাই তারা পরস্পরের দিকে সরাসরি তাকায় না
তথাপি যতক্ষণ না আপনি বাড়ি ফিরে
আরেকজনের কানে চিৎকার ক’রে সঞ্চারিত করছেন—
“গাধা”, আপনার মুক্তি নেই
পৃথিবীর সকল মানুষ তাই দেখার আগেই
শুনে ফেলে— গাধা
গাধার জন্ম হয় তারপর ধোপার বাড়িতে

জেব্রা

পৃথিবীতে জেব্রার কোনো প্রভাব নেই
চিড়িয়াখানায় যে-দুয়েকবার তাকে দেখেছি—
দেহটি সুঠাম, স্মার্ট
সাদা-কালোয় চমৎকার রঙিন দেখতে সে
অথচ ঘোড়ার মতো রূপকথার গল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
গাধা বলেও তাকে হেয় করে না অবশ্য কেউ
আজীবন ত্বকের গরাদের ভেতর বন্দী
অভুত এক ছায়াহীন নিরপেক্ষ প্রাণী।
তবে আমার কথা যদি বলো,
ব্যস্ত রাস্তার ওপারে তোমাকে দেখতে পেলে
সত্যি্ বলছি আমার ইচ্ছে করে
জেব্রা হয়ে শুয়ে পড়ি পথের উপর

গোরু

গোরু থাকে গোয়ালে
এখন তাকে যদি আপনি বনের রাজা হতে বলেন,
তাহলে সে কী করবে?
ল্যাজ তুলে কিছুটা গোবর থপাস করে মাটিতে।
গোবর থেকে ঘুঁটে হয়, ঘুঁটে থেকে জ্বালানি
গোরু দুধ দেয় গাড়ি টানে জমি চষে
সব ঠিক আছে, কিন্তু হলে কী হবে
গোরু তো আর বনের বাঘ নয় যে রাজা হবে
এক সকালের জলখাবারেই সে সাবার
কিন্তু এটাও ঠিক যে, বাঘের গায়ে এতটাই জোর
সেও হতে পারেনি ততটা বিতর্কিত

 

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

দেবজ্যোতি রায়

বাড়ি

দীর্ঘ ভ্রমণের পর রক্ত গড়াচ্ছে পা ফেটে
শরীরে বাতাস ঢুকে উড়ে গেল চৌহদ্দি, ঠিকানা।

এ পাড়ায় সব নেমপ্লেটই ঝাপসা
বাড়ির দরোজাগুলো একই ছুতোরের তৈরি!
সূর্যাস্ত রঙের বাড়ি শনাক্ত হলো না

বিস্মরণের ভেতর গৃহচেতনার আভাস পেয়েছি
খুঁজেছি যুবকবেলা, হারানো চোখের মৌতাতে
বাড়ির গঠন নিয়ে অলীক ধারণা।
সংসার ক্রমশ অশরীরী হয়ে উঠছে

রান্না হচ্ছে ফুলের পাপড়ি,
থালায় থালায় নীহারিকা আলো।
চলো, কুয়োর ভেতর খোঁজ করি
গৃহচ্যুত জীবনের ছেঁড়া অ্যালবাম

চালকবিহীন সাইকেল ছুটেছে দিগন্তপথে
তাকে জিজ্ঞাসা করি বাড়ির ঠিকানা!

চুল দাড়ি পাকছে, চোয়াল শিথিল হচ্ছে
সন্দেহ আরও তীব্র
একসময় নিজেই ঢুকে পড়ি সন্দেহ তালিকায়।
একখণ্ড আমি অন্য খন্ডকে সন্দেহ করে
এক টুকরো সাদা মেঘ সন্দেহ করে কালো টুকরোকে।

বাড়ির আপেক্ষিকতায় ভাসছে বাড়ি
ঘুঙুরের এক লহমা ধ্বনির মতো কম্পিত বর্তমান,
অতীত, সমুদ্রের জোয়ারভাটা
ভবিষ্যৎ, অন্তহীন চিৎসাঁতার।

মরণোত্তর

বুনোফল ফুটো ক’রে ঢুকেছে পোকা ও শূন্যতা

ফলের শরীর নিঃশেষ করতে চায় পোকা
শূন্যতা নিশ্বাস ফেলে
সারসের ঠোঁটে ভেসে আসে তিলক কামোদ

তুমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, প্রেমে, রূপান্তরে।
প্রতিশ্রুতি ঘুরতে থাকে অ্যান্টিক্লকওয়াইজ
দূরে অরুন্ধতী আরও ম্লান

হারানো পথের রেখা রাত্রির আকাশে
আরেকটু উদাস হোক মন

টের পাওয়া যায় প্রতিশ্রুতির মধ্যে
বসে আছে পুরোনো ঘাতক
আত্মপক্ষ, মাংস, শোণিত ও ত্বক।

আশমানে ভাসছে বাকি কথাগুলো
কবে তোমাকে শোনাতে পারব?
আমার সব অবয়ব ভেঙে পড়ছে
দুই কানে শববাহকের পদধ্বনি

পান ও সুপুরি মুখে নিয়ে কথাগুলি
জেগে উঠতে চায় মরণোত্তর!

তুমিই পারদ, অধরাও তুমি

স্টেশন, বাজার, জনপদ ঘুরে দিনশেষে
বোবা ভিক্ষাপাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে।
অর্থনীতির প্রশ্নে বাটিটি সূচকমাত্র
চারপাশে বাজারের জলস্রোত, কলকোলাহল
উড়ালপুলের শীর্ষে, মন্দির চাতালে বাটি
বৃদ্ধ, পঙ্গু, জরাগ্রস্ত ভিখিরির হাতে হাতে ওড়ে।

চাল ও কাঁকর ছাড়া আর কোনো সঞ্চয়মাহাত্ম্য নেই
কয়েনের তালে তালে গাছে ফুল, ডালে পাখি
জলে মাছ, খেতে শস্যের হাওয়া।

বাটপাড় উৎসাহ হারায় চোরের ওপর
নিঃস্বতায় কোনো ফাঁকি নেই
এখন সমস্ত গান অরাজনৈতিক।

সৎকার সমিতির গাড়ি চড়ে আমরা বেড়াতে যাব
পকেটে রয়েছে মৃত্যুর সার্টিফিকেট।

স্বপ্নের ফাতনা কাঁপে। স্থির চোখ, আশ্রম আঙিনা।
অন্ধ দোহার মনে মনে দেখে—
জ্যোৎস্নায় স্নান করে বোবা হরিমতি

যুগলমূর্তির পরা ও অপরা
বাজারদরের মতো ওঠানামা করে
এক পাশে হরিমতি, জ্যোৎস্না, চরণমঞ্জীর
অন্যদিকে রাশি রাশি শূন্য থালা বাটি।

ফ্রেম

ফিরে এলাম স্টেশন থেকে বাড়ি
রেল-টিকিট উড়িয়ে দিয়ে হাওয়ায়
কোথায় যেন যাওয়ার কথা ছিল?
দরজা জুড়ে ঘুণের স্মৃতি আঁকা

ক্রুশকাঠের মরচে পড়া পেরেক
শরীরে গেঁথে দাঁড়িয়ে আছো, একা
চাবির গায়ে রক্তছাপগুলি…
কিছু শকুন পাক খাচ্ছে দূরে।

আমাকে ডাকে বেদনাহত শেকড়,
ছয়টি নদী, পদ্মফুলে ভ্রমর,
মনে পড়ছে? মহানিমের ছায়া
শিশিরভেজা ঘাসের আপ্যায়ন।

আকারহীন বাড়ির কার্নিশে
বালি, পাথর, ইটের শূন্যতা।
তোমার গানের দৈব স্বরলিপি
ভেসে যাচ্ছি, রোগা পাতার মতো

শালিক হাঁটে উঠোন জুড়ে পা
পেরিয়ে যায় ত্রিমাত্রিক ফ্রেম
ফিরে এলাম, বোবা দেয়াল বাড়ির
বিন্দু বিন্দু পিপাসা জমে আছে।

কীটাণুকীট

কুণ্ডলী পাকিয়ে আছ স্বপ্নে, আধখাওয়া ফলে :
সনাতন কীট ঢুকছি গরুর কানে, মৃতের শরীরে

দূর থেকে লক্ষ রাখে রাত্রিবর্ণ কাক—
কাকের ঐতিহ্য আমি কপালে ঠেকাই
আমার তিনকুল কাকের জঠরে বসে
অন্নজল গ্রহণ করেছে।

বায়ুভূত পরিচয় নিয়ে বন্ধুরাও আসে

যা চেয়েছি সবই কুণ্ডলিত,
সাপ ও কেঁচোর মধ্যে শরীর বদল হয়
বদলায় আধার, আধেয়।
সময়ের হতবাক প্রান্তে বসে ঝিমোয় গোরুর গাড়ি,
কালিমাখা লন্ঠনের আলো।

বুঝতে পারি না, তক্ষকের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল
নাকি, তোমাকে জড়িয়ে ধরছি রাক্ষসের হাতে!
তুমি সেই নিরাকার, অপরিবর্তিত
আকাশের রঙে ভাসমান

আমার বিভ্রম, রক্তের স্বাদ খোঁজে শেয়ালের জিভে,
দাবার চৌষট্টি খোপে বোড়ের ভূমিকা
থেকে সরে এসে
ষাঁড়ের অন্ডকোষে কান পেতে শোনে
আদি স্তব, ব্রহ্মকমলের।

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

অর্ণব রায়

সংসাররাত্রিকোরাস

রাতের প্রথম যামে মার্জারপ্রভাতগীত,
মৎস্যঅন্নলোভে দরোজা আঁচড়ায়ন ও প্রবল লুটোপুটি,
তৎসহ যে রাগিনী গৃহস্থের দুয়ারে অনুষ্ঠিত হয়
তার দর্শক ও শ্রোতা কিছু শুকনো পাতার ওপর একটি বিপুল ব্যাঙ
আর প্রবল প্রতাপশালী রাত। পাহারাওলাদের শ্বাসবায়ু
হুইসেলে, হাত সাইকেলে, নজর গৃহের দিকে থাকে। তারা
ধর্তব্যের মধ্যে নেই।

অনুকম্পা নিতান্ত সুলভ। সকালেই পাওয়া গেছিল। ভাত
ও দুধের রূপে। এখনও পাওয়া যেবে। পায়ে মুখ ঘসাঘসি ওলটপালট
ইত্যাদি কিছু সঙ্গত লাগবে। তার আগে কিছু আরশোলা টিকটিকি
পোকা ও ইঁদুর। রাতের প্রথম যামে
শিকার ও শিকারীর যৌথসংগীত।

দ্বিতীয়ার্ধে নিদ্রাকর্ষণ। অন্ততঃ চেষ্টা। না আসে তখন ব্যবস্থা
অন্য। ইতিমধ্যে কোলাহল আলাদা মাত্রা নিয়েছে। কিছু বালক মার্জার সহ
একত্রে মনোবাসনা ব্যক্ত করতে চায়। সঙ্গতে টিকটিকি। বালকদের শিশুটি
বেড়ালের মৎস্যটি সংসারের দুধের বাটিটি— একসাথে বেজে চলেছে
দরোজার ওপারে।

পৃথিবীর কোনও ফাটলবশে মায়ায় চড়ে এরা আসে। গৃহস্থকে দায়ী
করে অকালে চলে যাবে বলে বুঝি— এরকম বুঝে নিদ্রার বুকের
কৃষ্ণবর্ণ কুঞ্চিত লোম ধরে টানাটানি। বাক্য সমাপ্ত হওয়ার আগে অভিভূত হওয়া।

নববিধান, সুসমাচার


ভিক্ষান্নে কি জীবন বাঁচে? তাই দু-চারটে হত্যা, মা।
প্রতি শনি-মঙ্গলে লোকালয়ে আসতে হয়। গুরুর আদেশ।
তাছাড়া সেলাই করা কাপড় পরতে মানা। না মা,
আমাদের গেরুয়া নয়। গেরুয়া সব মঠ মিশনের। আমাদের
এই বর্ণহীন। না, সাদা না, কালো না। বর্ণহীন।
হ্যাঁ, রক্ত লেগে যাবার ভয় তো থাকেই। তাছাড়া
আজকাল এত মানুষ বেড়ে গেছে! খুব সাবধানে
চলতে হয়। দড়ি, দড়িই ভালো মা। পেছন থেকে। গলায়।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি শুধু চালই দিন। প্রত্যেক হপ্তায় কি আর
ডাল আলু ব্যাঞ্জন জগাড় থাকে! আমাদের মা ভিক্ষান্নে জীবন।
অত বাছবিচার করলে হবে?


হিমচতুর্দশীর রাতে আমাদের করোটি গুনে গুনে ঘরে তোলা হয়।
আমাদের গুরুমা, নিজ বেশবাশ সামলে হাড়ের ফটফটে
মেঝেতে আমাদের অন্ন দেন। সে অন্ন খাবার নিমিত্ত নয়।
অশুভসংযোগে সে অন্ন ত্যাজ্যজ্ঞানে শরীরের বাঁ
দিকে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। অন্নে পুষ্ট শরীর
সেই সঙ্গে একটু একটু করে ত্যাগ হয়। মানুষের সংযোগ
তবু থেকে গেলে আমরা তাকে দেহের মায়া মনে করে
যতদিন দেহ আছে, লক্ষীর ভাঁড়ের খুচরোজ্ঞানে
রেখে দিই। শবানুগমনে খরচ করি।


কাহিনীও আমাদের আরাধ্য। বিশেষ কল্পনাবশে
তার বিশেষ সাকার মূর্তি জেগে ওঠে। সমবেত মানসপট
তখন আমাদের আচমনঘর। ধোঁয়া, উনুনের তাপ ও
আন্তরিক ইচ্ছার চাপে তিনি দৃশ্যমান হন। কী তার রূপ
বেরোবে তা নিয়ে জল্পনার শেষ থাকেনা সন্ধ্যে থেকে।
আরাধ্য বটে, কিন্তু তিনি আমাদের সকড়ি দেবতা।
দর্শন হলে হাত ধুতে হয়, ছুঁয়ে দিলে একজীবন চান
করবার বিধান। না মা, আমাদের যেসব বইপত্তর,
যা আমরা মেলাটেলায় বিলি করে থাকি, সেখানে এই দেব্‌তার
কথা পাবেন না। গৃহস্থে এনার আরাধনা করতে পারবে না।
সইবে না।


প্রতিটি শ্বাস ঘৃণাভরে নিতে হবে। প্রতিটি শ্বাসের
ঘৃণা দমে দমে পাকিয়ে দেহভান্ডে পরতে পরতে জমা হবে।
কালো চটচটে, অল্প অল্প দানা। এই আমাদের নিত্যকর্ম।
দেহ থেকে শ্বাস বের হলে যেন সেই জমে থাকা ঘৃণার
ওপরের বাস্প বের হয়, এমনই আশ্রমের আদেশ।
আমাদের সাধনা ঘৃণায় সুস্থিত হওয়া। আমাদের ইষ্ট আত্মলোপ।

মধ্যবিন্দু

আকাশে রাত। পৃথিবী কথার ভারে ঝুলে আছে।
ভয়াবহ মনোযোগে কপালের মধ্যবিন্দু পুড়ছে ধীরে।
সুগন্ধ ধোঁয়া ঘনিয়ে উঠছে কপালের ঘর ঘিরে,
সে ঘরে হাঁটু বুকে নিয়ে বসে আছে চারখানি জোয়ান পুরুষ,
আর কোনও আসবাব নেই সেই সাদা চুনকাম করা ঘরে, শুধু দেওয়াল
তোমার হাত পিছু থেকে ধরে ধরে রাতের শুরুতে এই ঘরে এলাম,
বিবাহের পরেও তোমাদের গ্রামে তোমার কক্ষে রাত কাটানো মানা—
এরকম স্বপ্নে বহুবছর পরে, ঠিকঠাক দশবছর পরে তোমাদের দাওয়ায়
চারপাই পেতে ন্যাড়া পাহাড়ের কোলে শুতে হবে শুনে রাত থাকতে থাকতে
এখানেই চলে এলাম। এখানে পাহাড়ের কপাল, ঠিক মধ্যবিন্দু পুড়ছে
আর রাতের তারার মাঝে অগুনতি তারার মাঝে মানুষের কথার ভারে
ভারী আরও ভারী হয়ে ধীর ও ক্লান্ত অনিচ্ছায় ঘুরছে পৃথিবী—

কারা যেন এখানেই থাকে। আমি ভেদ করে যে চারজন বসে
আছে, তারা থাকে, তারা বাদে আরও কারা যেন এখানেই থাকে,
আমাদের মধ্যবিন্দু দিয়ে যাতায়াত করে, ঘরের কাজ করে,
মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে বলে, বোধহয় আরও কেউ এখানেই
থাকে। কথার ওপরে কথা চেপে চেপে ভার। ঘোরে। আকাশে
রাতের ওপারে আরও আরও রাত

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

অঞ্জলি দাশ

প্রেম

জানো না কোথায় ব্যথা, কালো জল কতটা ডোবায়,
স্বপ্ন নামধারী এক শবরের তীর বিদ্ধ এ হৃদয়
উথাল পাথাল হলে, তোমাদের কেন বা এতটা লাগে?
কৃষ্ণ এক নাম বৈ তো নয়,
আসলে নিষিদ্ধ গাথা লিখি আর মুছে ফেলি,
পাড়া প্রতিবেশী জানে কতবার ডুবে ডুবে
বিষ খেয়ে অমৃত বলেছি।

এ শরীর জ্বলন্ত প্রদীপ
যে কোনো মুহূর্তে তাকে শবসাধনার কাজে
নিয়ে যেতে পারে সন্তজন…
যৌথ যাপন ক্রিয়া, রতি বা আরতি সবই এক রীতি;
দাহকাজ শেষ করে যেভাবে আত্মজন দাঁতে কাটে মায়া,
যা পোড়ে তা বাহ্য সন্তাপ।
অন্তরের বহ্নি তুমি জানো, পুড়েছ তো কতবার কতজন্ম ধরে।

জলছাপ

বৃষ্টিরাত চাই যতোবার, রাত একা আসে

বিষাদের খোলাচিঠি ফেলে রেখে মেঘ উড়ে যায়

শুধু চোখ ভেজে…
রং নেই, হাহাকারও নেই, জলে লিখি আত্মকথন।

অশ্রু ভেজা
অন্ধকার আর সঘন একাকী রাত
পরষ্পর নৈকট্যের তীব্রতায় ক্ষয়ে যেতে যেতে
সামান্য বিষের ছোঁয়া নীল হয়ে লেগে থাকে
ফুরোনোর আগে।
কিছু কি ফুরোতে দাও রাত্রিচর ঘুম?
গ্লানি ও বিষাদ, প্রেমে
ঝাপসা হয়ে আসা স্পর্শ এফোঁড় অফোঁড় করে রোজ।
রঙিন তরল নামে,
প্রবচন এক ঋতু মাটিকে অদ্ভুত রাখে, মাটি বীজ নেয়;
তপ্ত শরীর, শেষবেলা অভুক্ত বৃষ্টি এসে লিপ্ত হয়।

গোটানো ডানার নীচে
ভাঙা শামুকের মতো ক্ষত ঢাকতে গিয়ে মনে পড়ে যায়,
জলছাপ অক্ষরের গায়ে জ্বর ছিল।

ক্ষত

আঘাত মানেই শিল্প, কেননা সে আয়ুষ্মন
তাকে তুমি মুছতে পারো না কিছুতেই।
বিপন্নতা নিজেকে যখনই ভাঙে,
চিড় ধরা সম্পর্কের চোরা স্রোতে গুলে যায় তুচ্ছতার রং,
যাতে কোনো ছবি হতে নেই।

দু-চোখের ব্যাপ্তি জুড়ে মেঘ আসে, রোদে পুড়ে যায়।
তোমাকে ভেজাবে বলে বৃষ্টি আসেনি কোনোদিন;
ঘরে ফেরা অশ্রুস্রোতই তোমার তৃষ্ণার কাছে ঋণী।

মুখের প্রতিটি রেখা ভেঙে পড়ছে গানের বিস্তারে,
তুমি আলাপ বোঝোনি।

মাঝপথে সুর থেমে গেলে অপ্রস্তুত স্বরলিপি, ভাঙা গান,
খোলামকুচির মতো, ব্যথা গিলে আগলে রেখেছ
যাতে মনে থাকে একদিন ভেঙেছিলে ঘর ও জলের পাত্র।

বিষাদ সঞ্চয়

কিচ্ছু ফেলিনি,
সামনে এগোলে পিছনে যে অন্ধকার
বিচ্ছেদের মতো লেগে থাকে, তার কাছে সব জমে আছে।
ভাঁটায় যাওয়ার আগে,
টুকরো টুকরো নদী স্নান জুড়ে বানানো যে জলের শরীর,
সে-ই জানে ভুলে যেতে কতটা বিষাদ লাগে,
কতটা অশ্রু দিয়ে ধুতে হয় সুখ।

দুঃখদিনের চিঠি ছিঁড়ে ফেললে কথারা যেভাবে
শুধু স্পর্শ হয়ে আঙুল জড়িয়ে রাখে,
নদী জানে সেই সুখ, মোহনা অব্দি সে-ই সঙ্গে থাকে।
তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার ভিন্ন রাগ, ভিন্ন যন্ত্রনার ঘোর।
তারপর অন্য নামে, অন্য বাঁক, কেউ যাকে ভুলেও দেখে না কোনোদিন।

ভাঙা গান

গান থেকে টেনে তুলি তাকে, তার ছিঁড়ে যায়…
ভাঙা সুর ছড়িয়েছে আগুন অবধি।
চোখে জল, খিদে জাগছে খাদে;
রাত চলে গেছে তবু শরীরে শরীর নেই।

দুপুরের ঘুমে ভাত ফুটছে, সূর্য ডুবলে বেড়ে দেবে পাতে।
অতিথি সামান্য নয়, খিদের মহিমা জানে।
সন্ধেবেলা প্রতিদিন আগুন বাড়ন্ত, খিদে বাড়ে
ধুলোর মতন ওড়ে অন্নব্যাঞ্জনের সুখ…
আগুনকে সাক্ষী রেখে শরীর পোড়ায়,
প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে আজ তারসপ্তকে হাততালি হবে।

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

বিজয় দে

জুলাইপঞ্জি ০২

(৬ই জুলাই ২০২৩-১০ই জুলাই ২০২৩)

৬ই জুলাই ২০২৩ বৃহস্পতিবার

আমার গর্ব আমার মুখের ভাষা
তবুও একটা পর্ব সর্বনাশা

আমি বমি করলে তুমি জমি হারাবে
আমি জিতলে তুমি বর্গাচাষা

৭ই জুলাই ২০২৩ শুক্রবার

কোনো কোনো শুক্রবার শেষ হতে চায় না
যেমন আজ

যেমন সগৌরবে সপ্তমী তিথি
যেমন সনাতন শুক্লপক্ষ
যেমন সাত রাতের জমানো স্বপ্ন নিয়ে একদিন

পাঠ্যপুস্তকের ভেতরে আমাদের জন্মদিনের ইতিহাস
লেখা চলতেই থাকে; শেষ হয় না

ইতিহাসের ভেতরে লেখা যে-কোনো একটি অক্ষর
আমি সেই অক্ষরটির শুধুমাত্র একটি নিরীহ মাত্রা…

বেঁচে থাকতে থাকতে একদিন একটা গোটা শ্রাবণ মাস
যা কখনও শেষ হবে না

৮ই জুলাই ২০২৩ শনিবার


“যো ওয়াদা কিয়া হো নিভানা পড়েগা”

তাজমহলে ঢুকেই প্রথম এই গানটির কথা
মনে পড়েছিল; অন্য কোনো কথা নয়

ছায়াছবিটি দেখিনি। গান শুনেছি। তাতে কী?
সে তো সম্রাট শাজাহানকেও দেখিনি; সে তো
বিবি মমতাজের সঙ্গেও আমার দ্যাখা হয়নি

কেউ আগে বা পরে; সবাই নিশ্চই একমত হবেন
আমরা কিন্তু তিনজনই একই দেশের অধিবাসী

এইটুকু ভেবে মহলের মার্বেল-পাথরের গায়ে
হাত রাখি সযতনে


সাদা ধবধবে পাথরের ছাদ-বারান্দা। আর সেখানে
নীল-রঙা পিওর সিল্কের শাড়ি; যাচ্ছে-আসছে

ঘুরতে ঘুরতে সে হঠাৎ একটা জোরালো ডাক দিয়ে বলল—
“দ্যাখো দ্যাখো, ওই হচ্ছে যমুনা নদী”

হ্যাঁ, দেখলাম, ইতিহাসের পেছন দিকে একটা রোগা-মতন নদী
বহিয়া যাইতেছে

নদী আছে কিন্তু শূন্য; আচ্ছা, ওখানে একটা নৌকা থাকলে
দৃশ্যের কী ক্ষতি হোতো?

যদি আজ বর্ষার তিস্তা নদীর মতো
এই যমুনা নদীতে কাঠ ভেসে আসতো…

৯ই জুল্লাই ২০২৩ রবিবার

খাওয়ার সময় মুখে এত শব্দ হয় কেন
এখন তো ভাত খাচ্ছ, তাহলে কেন শব্দ হবে?

কবিতা লেখার সময় কি তোমার কোনো শব্দ হয়?

এখন তোমাকেই বলি, সশব্দে যারা একদিন
প্রেমে লিপ্ত হয়েছিল
তাদের প্রেম কিন্তু বেশি দিন টেকেনি

জন্মের শব্দ হতে পারে
কিন্তু মৃত্যুর কোনো শব্দ কি তুমি কোনোদিন শুনেছ?

১০ই জুলাই ২০২৩ সোমবার

খোকা ঘুমোলো পাড়া জুড়োলো…ঘুম-পাড়ানি গান
ঘর-বাড়ি দুলছে

তবে খোকা এখনও ঘুমোলো কিনা জানি না
মেয়েটি কিন্তু দুলতে দুলতে ঘুমের দিকে ঢলে পড়ছে

‘বোকা মেয়ে’… সে বললো
‘আহা,তোমার পেটের ভেতর যে-পাড়ায় খোকা থাকত
সেটার নাম কি শান্তিপাড়া?’

‘যদি হয় শান্তিপাড়ার খোকা
আমার আদর থোকা থোকা’

“যাচ্ছে কারা শান্তিপাড়া, আবার কবে বছর পরে”
ঘুমের ভেতরে খোকাদের মিছিল চলছে

Categories
2023-Sharodiyo-Kobita

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়

পাঠক

চামড়া-কুঁচকানো মুখে অজস্র জটিল বলিরেখা।
কাঠের চেয়ারে একা বসে থাকে…
গলিটির শেষে বাড়িটির
শেষ ঘর। জানলা খোলা। জানলায় দেখি বুড়োটির ফেসবুক।

সে ডুবে থাকে সারাদিন। বই পড়ে―
দেখি সেই চামড়া বাঁধানো
কীট দষ্ট একই বই, যেটি তাঁর প্রিয়,
মনে হয়
তাঁর শেষ বুক।

সংশয়

সারারাত
কবিতা থই থই করছে অন্ধকারে।

রোজ
রাত বাড়ে সারা রাত। জলের মতোন
কবিতাও বেড়ে ওঠে। আকাশ অবধি
ছোটছোট মেঘপুঞ্জ, তারা
আসলে কবিতাই?… ভাবি

নাকি অন্য কিছু?

কিন্তু কি? আর বলতে ওই
অন্ধকার
আর জাননার অন্যপারে আমি, বিশ্ব।
নাকি অন্য কেউ?

সুখ

ভোরের ইঁদারা। তার পাশে
এক
ঢ্যাঙা তাল গাছ।

বেলা বাড়ে। উঠোন পেরিয়ে
তার ঝাঁকড়া মাথার ছায়া
উঠে আসে মাটির দাওয়ায়
পিঁড়ি পাতা।
সুখে বিশ্ব খায়―

বগি থালে ডাল, ভাত, মাছ…

আবহমান

আমার সংসার
সেতো ঈশ্বরই চালায়।
রোজ ভোরে
পাখি গায় ডালিমের ডালে।
মনে মনে
সাড়া দিই। কখনো উঠোনে
দ্বিপ্রহর স্থির। শুধু এক
পুরাতন যাঁতা ঘোরে…
ঈশ্বরী চালায়।
তার কোলে
শিশু বিশ্ব। বুকে দুধ খায়।

দরজা

দুপুর পড়ন্ত হয় বুকের ভিতরে।
সোনালি রোদের ছায়া দীর্ঘ… ক্রমে উঠোন ছাড়িয়ে
চলে যাবে যেখানে যাবার।

সবই ঠিক।
বস্তুত বাড়িটি, ক্রমে পড়ে আসা উঠোনের ছায়া,
এখন বিকেল নামছে, বোঝা যায়,
আরও যতদূর
স্মৃতিপটে পরিস্ফুট ছবিগুলি আসলে কি ঠিক
শুধু মাত্র ভিতরেই?
নাকি বাইরে?… যত ভাবি ―

দরজা কই?
কান পেতে থাকি। কোনো দিন যদি শব্দ হয়,
কেউ
চুপি চুপি তালা খোলে―

ক্লিক্…