Categories
2023-sharodiyo-krorpatro amitava_smritikotha

বেবী সাউ

কবির অনস্তিত্ব ও কবিতার অস্তিত্ব

‘সময়টা ভালো নয় রে, সাবধানে থাকিস।’ সময়টা যে ভালো নয়, তা অমিতাভ মৈত্র-র চেয়ে আর কেই বা বেশি করে বুঝতেন, জানি না। কারণ খবরকাগজের পাতা থেকে বাস্তবতাকে যাঁরা জানেন, তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবতার মুখোমুখি হতেন সরকারি প্রশাসনের উচ্চ দপ্তরে কর্মরত এই কবি। তার জন্য বিস্তর যে সব কাঁটাঝোপ অতিক্রম করতে হতো তাঁকে, রক্তাক্ত হন তাঁর মন। বাইরে থেকে হাসিখুশি এই অনুভূতিপ্রবণ কবির মনের ভিতরে যে অস্থিরতা চলত, তা সহজে বোঝা যেত না। হয়তো সেই আগুনের মতো অস্থিরতাকেই তিনি লিখতেন তাঁর কবিতায়। বাংলা কবিতার জগতে তথাকথিত আলোর জন্য মাথা খুঁড়ে মরেননি এই কবি। কারণ প্রকৃত কবির মতোই তাঁর ছিল দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। নিজের ভাষার সাহিত্য, দেশের সাহিত্য, বিদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র নিয়ে সর্বদা তিনি নিমগ্ন থাকতেন নিজের পড়াশুনোয়। হয়তো এ কারণেও কবি অমিতাভ মৈত্রর কবিতাকে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক বলে মনে হয়। মনে হয়, তাঁর কবিতার ভিতর যেমন মেদিনীপুর পুরুলিয়ার এক প্রান্তিক মানুষ কথা বলে উঠছেন, তেমনই স্বর শোনা যাচ্ছে এই সময়েরই প্যালেস্তাইন থেকে, সিরিয়া থেকে, ভেনেজুয়েলা থেকে। যখনই কথা হতো, মনে হতো, মনে মনে অস্থির এক কবি, বিদীর্ণ হয়ে আছেন সাম্প্রতিক সময় নিয়ে। প্রশাসনিক কাজ তাঁকে আরও রুক্ষ বাস্তবতার সামনে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু তাতে তাঁর কবিতা শুধুই সংবাদের বৃত্তান্ত হয়ে পড়েনি। হয়ে পড়েনি বিবৃতি।

কবিতা আসলে একটা ভ্রমণ। একটা সফর। পাঠকের সঙ্গে কবির। কিংবা বলা যেতে পারে কবি এবং পাঠক পরস্পর কবিতাটির পেছন পেছন যান, তাকে ছোঁয়ার জন্য। অনুভবের জন্য। আর তাতেই রহস্যময়ী হয়ে ওঠে সেও। একটা নতুন কবিতা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় পরিদর্শনে বেরিয়েছি। এক একটা দৃশ্য এসে বসছে। আবার এসে যাচ্ছে পরের দৃশ্যপট। চারপাশে অজস্র আলো-আঁধারের খেলা। এইসব রংকে কবি যেমন কিছু শব্দের মধ্যে বেঁধে রাখার সঙ্কল্প নেন, আবার পাঠক তাকে ছড়ায় বিস্তৃতির দিকে। হাঁটে। কবি আড়চোখে হাসেন। কবিও বেরিয়ে পড়াটুকু উপভোগ করেন। পাঠক রোমাঞ্চ বোধ করে। দেখে, শব্দ আর দৃশ্যের মতান্তর। সহযোগ। মুগ্ধ হয়। কখনও বিধ্বস্ত; বিভ্রান্ত। আবার বহুদিন পরে হঠাৎ কোনো দৃশ্যে নিজে খুঁজে পায় সেই কবিতাটির প্রকৃত আধার। তাই কবিতা যতটা না শব্দের ঠিক ততটাই স্বশব্দেরও। কবি অমিতাভ মৈত্রের কবিতা জীবন ঠিক এরকমই। দৃশ্যের জগত নেমে আসছে শব্দের কাছে। আবার শব্দের জগত মিশে যাচ্ছে দৃশ্যে। বাস্তব এসে গল্প করছে সাদা অ্যাপ্রোণ পরা নার্সদের সঙ্গে; একঘরে শব্দ চিৎকার করছে। আর বিরাট নার্সিংহোম থ মেরে আছে। ঠিক তখনই যেন হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসার মত কবি যেখানে হাজির। দেখছেন এবং স্তব্ধ হয়ে আছেন। বুঝতেই পারছেন না, এই মুহূর্তে তাঁর ভয় পাওয়া উচিত নাকি অর্ডার করা উচিত দায়িত্ব সূচি অনুযায়ী নাকি চিৎকার করে আউড়ে যাওয়া উচিত কোনও সংবিধানের সাজানো, সংযোজিত মুখস্থ করা লাইন!
“This long, this long dream, I’m awaking, no, I’m going to die, dawn is breaking” —Albert Camus এর এই লাইনগুলি কবিই ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যগ্রন্থ “টোটেমভোজ”-এ। এইযে ভয়াবহতার প্রকৃত দৃশ্য কবি ব্যবহার করলেন সার্জিকল টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে— আর সাদা টকটকে একটা বলের সঙ্গে মেশালেন আসন্নমান মৃত্যুর দৃশ্যকে— আর এখানেই পালটে গেল এতদিনের নিয়ম কানুন। সাহিত্য রচনার ব্যাকরণ বিধি। কই বাংলা সাহিত্য তো কখনও এমনভাবে বাস্তবের সঙ্গে কথা বলেনি! শুধু ফল-ফুল-লতা-পাতা নিয়ে পড়ে থাকার মতো দিন যে আর নেই কবি অমিতাভ মৈত্রের কবিতা পাঠের মাধ্যমে সেই অনুভূতিকে খুঁজে পাওয়া যায়। কবিও বলতে পারেন ” প্রতিটি অপরাধের পাশে রক্তের হালকা ছোপ লেখে থাকা ট্রেন/একবার মাত্র আলো ফেলে ঘুরে যায়/আর ভয়ার্ত ঘাস আর ভয়ার্ত ভেড়াদের সামনে/আমরা বিচ্ছিন্ন এবং আত্মস্থ হতে চেষ্টা করি”( মনঃসমীক্ষকের স্বীকারক্তি)।

অমিতাভ মৈত্রর জন্ম ১৯৫২ সালে। যে সময়টাতে জন্মেছেন এখনকার আরও বিশিষ্ট কয়েকজন কবি। সমকালীন অবস্থানটিকে ধরলে দেখা যাচ্ছে, কবি অমিতাভ মৈত্রের রচনাকৌশল পুরোপুরি ভিন্ন। আঙ্গিক, বচন, কবিতার বিষয় বৈচিত্র্য— সবকিছুতেই কবির নিজস্ব ছাপ; ‘বিভীষিকার জগৎ রক্তের আঁশটে ব্লান্ট-গন্ধ’ মাখা এক বাস্তব দুনিয়া। কবির নিজস্ব কথায়।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ “বিদ্ধ করো, তীর” প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। দীর্ঘ একটা সফরের কবিতা নিয়ে কবির এই কবিতার বই। বাংলা সাহিত্যের পাঠকের মতো করে, ছন্দ, রূপ রসের সৌন্দর্যে মণ্ডিত এই সব কবিতাগুলি। কিন্তু কবির সন্তুষ্ট নন। কবি চাইছেন অন্য কিছু; ধরতে চাইছেন সেই বিরাট বাস্তবকে। মনের ভেতর চলছে অস্থিরতা; দ্বিধা-দ্বন্দ। এঁকে ফেলতে চাইছেন প্রকৃত বাস্তবকে। তখনই ব্যর্থ কবির মনে হয়েছে— “‘বিদ্ধ করো, তীর’-এর এইসব কবিতা থেকে আমার আত্মা বিযুক্ত হয়ে গেল। নিজের কবিতা বিষয়ে স্ফীত আস্থা নেই এমন মানুষ যা করতে পারেন, আমি তাই করলাম। এরিয়া ছেড়ে সরে গেলাম।”

দীর্ঘ দশ বছরের বিরতি। দীর্ঘ একটা পরাজিত মন? নাকি নিজেকে ভাঙার জন্য নির্জন কোনও সাধনা? দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে শব্দের কাছে কবি ফিরলেন। অসন্তুষ্টি; ক্রোধ; রাগ; অভিযোগ; অভিযোগ সবটুকু নিয়েই ফিরলেন। ততদিনে ভেঙে গেছে অনেক কিছু। ততদিনে তিনি খুঁজে পেয়েছেন তলস্তয়ের “The death of IvanGlych” গল্পে ইভানইলিচের অদ্ভুত অসুখ ও যন্ত্রণা থেকে ব্যথার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর কাছে কবিতা শুধু শরতের মেঘোজ্জ্বল আনন্দ নয়; বরং কবিতা ধরা দিয়েছে এক রক্ত মাংস হিংসা দ্বেষ কলহ বাস্তব জীবনের প্রকৃত সত্য হিসেবে। শুধু সৌন্দর্য মণ্ডিত হয়ে নয়; বরং মিলিত সত্ত্বার রূপ ধারণ করে। কবিও এটাই চাইছিলেন। কাফকার মতো তিনিও বলতে চান “সেই মানুষটির মতো লিখতে চাই আমি যে সেই হাতের আশ্রয়ে উন্মাদের মতো ছুঁড়ে দিতে পারে নিজেকে। ” তবে যে বিপন্নতা কাজ করছিল কাফকার ভেতরে সেটি কি কবির ভেতরেও আছে? একটা বিরাট অস্বস্তি কাজ করছে কবির মধ্যে। একটা অনিশ্চয়তায় মোড়া রাত্রি; ঘাতকের মতো চোখ আর দমবন্ধ একটা অবস্থান থেকে কবি বেরোতে চাইছেন যেন। আর ওইসব অজস্র হিংস্র চোখ কবির চোখে ফোকাস করে চলেছে অবিরত। ওখান থেকে যেন মুক্তির সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতদিনের জমে থাকা মনের ভেতরে ক্রোধ মুক্তি চাইছে। কিন্তু এই পৃথিবী যে বড্ড নিস্পৃহ; নিঃসঙ্গ। কারোর কথা শোনার মতো অবসর নেই তার। কবি অসহায়। ফিরলেন শব্দের কাছে। বললেন, ” টোটেম’ এর ভাষা প্লাষ্টার করা হাতের মত শক্ত, আড়ষ্ট, কৃত্রিম। দাঁন্তের নরক ও পরিশুদ্ধিতে আমি মুক্তি খুঁজছিলাম তখন।সঙ্গে বাইবেল এবং কাফকা। “Inferno” –তে নরকের দরজায় লেখা ছিল –“Leave every hope, ye, who enter.” আমি সেটি ব্যবহার করেছিলাম বইয়ের শুরুতেই।” ম্যাডাম এম. এর সঙ্গে। ম্যাডাম এম. দেখালেন টোটেম ভোজ এর প্রাকমুহূর্ত। আত্মহত্যার আগে একজন সুস্থ সবল মানুষের কী কী করণীয়। আর প্রাসঙ্গিকভাবেই কবি তুলে আনছেন Andre Hardellet এর উক্তি “Such detachment! Such relief.” কীরকম মুক্তি? নিজেকে আবিষ্কার? নাকি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলা? এই আত্মহত্যার ছবি আঁকতে গিয়ে কবি জোগাড় করে আনলেন চোখের সামনে এক প্রোটাগনিস্ট নারীর বর্ণনা। “এগিয়ে আসছে আপেল আর লাফিয়ে কামড়ে ধরছে ম্যাডাম এম এর গলা/ দাঁতের ডাক্তারের মতো শ্লথ গ্যাস সিলিণ্ডার দু-পায়ের মাংসে জায়গা খুঁজে নিচ্ছে”। চমকে উঠতে হয়। লাইনের পর লাইনে উঠে আসে সমাজের বাস্তবচিত্র। আর পাঠক ম্যাডাম এম এর মধ্যে দেখে সেই নারীটির যন্ত্রনাজর্জর দিনগুলির দৃশ্য চিত্র। আর এই ভারতীয় সমাজে হাঁটা ফেরা করে বেড়ায় কবি সৃষ্ট চরিত্রগুলি। কবিও তাঁর যাবতীয় চিন্তা ভাবনা; রাগ-অভিযোগ নিয়ে চরিত্রগুলির সঙ্গে সহবাস করেন।

২০১৫ সালে বেরোয় কবির ‘সি আর পি সি ভাষ্য’। ততদিনে কবি তাঁর কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। সিভিল সার্ভিসে চাকরির সূত্রে আইনের মারপ্যাঁচ স্বাভাবিক ভাবেই এসেছে। কিন্তু এই কবিতার বইটিতে আছে কবির নিজস্ব অনুভূতি এবং উপলব্ধির প্রকাশ। ‘vision of evil’ থেকে তুলে আনা কবির বয়ান; স্বীকারোক্তি।

কবি অমিতাভ মৈত্রের কবিতাতে দেখা মেলে একজন তৃতীয় ব্যক্তির— কখনো তিনি ক্রিস্টোফার, কখনো ম্যাডাম এম, কোয়ারান্ট রিগ্রেসন অথবা আয়নাতে প্রতিবম্বিত ছায়া হেনরি। এবং তারা কেউ এদেশীয় নয়। তারা কেউ লেখক নন, কবি নন, এমনকি পাঠক নন। তৃতীয় জন। নিরপেক্ষ? যারা শুধু আসে এবং চলে যায়।

চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরণের বাস্তব চলচিত্র। অথচ দৃশ্যের সঙ্গে অনুবাদ হচ্ছে একটি শ্লথ-মন্থর যাতায়াতের। আবার সামনে বেজে উঠছে কোনও ফ্রেগর্যান্স অফ কালার-এর অতলান্ত স্পর্শে। মনে হচ্ছে এ যেন রসের ভিয়েন। এ যেমন সত্য, তেমনি এও সত্য সমস্ত বাস্তবতা একটা আশ্চর্য গ্লোবের ওপর ঘুরছে। আবার মুহূর্তে তৈরী হওয়া সেই কালারের ফোকাস ভেঙে পড়ছে। এখানে পাঠকই সর্বত্র। নিজস্বতা আছে বলেই নিত্যতার এই সূত্র, এই মহিমা। আমি আছি বলেই রূপ রঙ রস স্পর্শ। আমার জন্যেই সমস্ত নিয়ম কানুন, ব্যস্ততা, ভাঙা-গড়া। কবি অমিতাভ মৈত্রের কবিতা এসব কথাই বলে যাচ্ছে। তাই হেনরির মধ্যে পাঠক নিজেকে খোঁজে; বাউণ্ডুলে জীবনকে খোঁজে। আর হাঁটে। আর এখানেই কবির কবিতার সার্থকতা। এখানেই কবি অমিতাভ মৈত্র-র কাব্যব্যক্তিত্ব।

এমন এক কবি এই রণ-রক্ত-সফলতা-ব্যর্থতার পৃথিবী থেকে অনেক দূরে চলে গেলেন। রয়ে গেল তাঁর কলম, যার রক্তের দাগ এখনও শুকোয়নি।

Categories
amitava_prochod

প্রচ্ছদচিত্র

Categories
amitava_chitrokola

চিত্রকর্ম

 

 

 

Categories
amitava_ogronthito

অগ্রন্থিত গদ্য

রাত্রি রচনা করেছে যাঁকে

“Find by means of this face, what it means to be confronting the infinite world.”
— Rilke.

কোনো গভীর বন্ধনে যেন বাঁধা ছিলেন রিলকে ও রাত্রি। রাত্রির মতোই গহন রহস্যময়, আর একা একজন মানুষ আর তারায় ভরা রাত্রি যেন নাছোড় জান্তবতায় জড়িয়ে আছে পরস্পরকে। রাত্রি বার বার প্রিয় মোটিফ হয়ে ফিরে এসেছে তাঁর কবিতায়। সেই রাত্রি কখনো ঘুমের মধ্যে আমাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত রক্তের মতো শান্ত। আবার কখনো নীচে দেওয়া কবিতাটির মতো বিদ্বেষপূর্ণ—

“When I approach a window, over there/some one who’s dying turns to in maybe/groans, gazes, and devours me dyingly.” (For Lotte Pritzel) যেখানে একজন মুমূর্ষুর তীব্র চোখ নিয়ে জানলার বাইরে থেকে রাগে গরগর করতে করতে রাত্রি খেতে শুরু করছে কবিকে।

হতেই পারে তাঁর অনেক কবিতা রাত্রির প্রসঙ্গ থেকে বহু দূরে, কিন্তু বিলকের কবিতার প্রতি শব্দে, এমনকী তাঁর ভাবনা ও যাপনের সবকিছুই রাত্রির আত্মা থেকে উঠে আসে। যেন অন্তর্নিহিত রাত্রি নিয়ন্ত্রণ করে তাঁকে। জীবনানন্দর কবিতা ও যাপনেও একধরনের রাত্রির উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। মনে হয় এই কবি রাত্রির রচনা।

“My shy moon-shadow has something to say to my sun shadow from far away in the language fools can share. I between an illumined sphinx, that stand establishing silence on either hand, have given birth to the pair.” (Antistrophes)

রাত্রিকে নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন রিলকে। এইসব কবিতা যেন জীবনের অপার বিস্ময় আর রহস্যের, এক মহান বিশালতার, এক সীমাতিক্রান্ত নিয়েতার সামনে মানুষের তুচ্ছ মলিকিউলার অস্তিত্বের কথা বলে যায়। কবির চিন্তা ও অনুভূতির স্তর ছাড়িয়ে এইসব কবিতার অন্তঃসারে পৌঁছানো দুঃসাধ্য। কিন্তু একবার হাতে তুলে নিলে পাঠকের আর নামিয়ে রাখার উপায় নেই। শক্ত করে রিলকে ধরে ফেলবেন তার হাত।

একবার বার্লিনের ‘Egyptian Museum’-এ ঘুরতে ঘুরতে রিলকের চোখে পড়ল চতুর্থ অ্যামেনোফিসের মূর্তি। অনেকক্ষণ ভূতগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় তাঁর মনে হল তিনি যেন হারিয়ে যাচ্ছেন মহাশূন্যে আর পাথরের একটা মুখ বড়ো হতে হতে অসীমে ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ। মুখের রেখাগুলি যেন ছড়িয়ে পড়ছে ছায়াপথে, নীহারিকা আর নক্ষত্র রাশির অপরিমেয় দূরত্বে।

রিলকে অনুভব করলেন যে মহাজাগতিক নিয়ম এই আর ছায়াপথ রাত্রির নক্ষত্রপুঞ্জকে নিয়ন্ত্রণ করে সেই একই অব্যক্ত মহিমা, নিয়ম ও দুর্জ্ঞেয়তা অ্যামেনোফিসের মুখের আলোছায়ায় ধরা।

একটি রাত্রি আর পাথরের একটি মুখ আমূল বদলে দিল রিলকেকে। সেই রাত্রির স্মৃতি সারাজীবনের জন্য গভীর এক দাগ রেখে গেল রিলকের মধ্যে। বদলে গেল তাঁর জীবন-দেখা। সমস্ত কিছুর মধ্যে এক অনুপস্থিতির চলমান প্রক্রিয়া, an act of disappearing অনুভব করলেন। মানুষই দূরত্বের জনক। যেখানে মানুষ নেই সেখানে দূরত্ব নেই। যখন মানুষ আসে তখন চারপাশ থেকে কাচের এক সুমসৃণ পিছল রাস্তা আসে তার সঙ্গে— যে-রাস্তা পার হওয়া খুব কঠিন। এই রাস্তা দূরত্ব। এমনকী অ্যামেনোফিসের কোনো ছোট্ট রেপ্লিকাতেও সেই একই দূরত্ব ও দুর্গমতা থাকবে। ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখা এই অভিজাত মূর্তিও একই ভাবে স্পর্শ সীমার বাইরে থাকা এক সুদূরতা, এক ভ্যাকুয়াম। ঐ মুখকে হাজার বছরেও চেনা মনে হবে না। বন্ধু মনে হবে না।

এই মূর্তি দেখার অভিজ্ঞতা সুদূরপ্রসারী ছিল রিলকের জীবনে। ১৯১৩ সালের গ্রীষ্মে কয়েকদিনের ব্যবধানে তিনি একটি কবিতা ও একটি গদ্য লিখেছিলেন। প্রথমে কবিতাটি পড়া যাক। “Head of Amenophis IV in Berlin
as young and flowery meadows through a lightly spread covering of growth will give a slope a share in the sensations of the season, wind-wise, perceptive, gentle, almost happy along the mountain’s perilous abruptness; so, bloom-expending, mildly transient, face rests on this skull’s anteriors, which, descending with something like the slope of terraced vineyards, outreach into the All, confront the shining.

এবার গদ্য লেখাটি বাংলা অনুবাদে পড়ব— “কাপের আকৃতির আধার বা হোল্ডারে যেমন ওক ফল সংযুক্ত থাকে, সেভাবেই অ্যামেনোফিসের মাথা যুক্ত ছিল তার বেদীর সঙ্গে, নিবিড়ভাবে। হেলে পড়া হাড়ের কাঠামো থেকে ঝুঁকে আছে অ্যামেনোফিসের মাথা কোমল ভাবে, যেন সূর্যঘড়ির ওপর ছায়া সরে যাচ্ছে ঘড়ির হাতের। চওড়া ছোট্ট কপাল মুকুটে ঢেকে আছে। ডানার মতো এক জোড়া কান, যেন আভ্যন্তরীণ কোহলের ব্যাকাস। মুখের গঠন সহজ, অভিব্যক্তিবর্জিত, স্থির। ওষ্ঠ এমনভাবে চেপে ধরেছে অধরকে, যেন স্বর্গ-প্রভুত্ব করছে পৃথিবীর ওপর। গভীরে হারিয়ে যাওয়া চোখ যেন রেখাচিত্রের আভাসে ধরা। ভ্রূজোড়া যেন বন্ধুত্ব করছে চোখের সাথে।” বদলে গেল তাঁর জীবন দেখার ধরন। বেনভেলুটাকে লিখলেন—

“Through such things I learnt to look into reality. In Egypt they stood round me in numbers… insight into them came over me in such waves that I lay for almost a whole night beneath the great sphinx. The plane on which it was enacted had moved into dark night, all that makes world and existence proceded upon a loftier scence, on which a star and a god lingered in silent confrontation.” (Letter to Benvenuta)

অ্যামেনোফিসের মুখে তিনি দেখেছিলেন অসীমতা, যেমন কোনো মহান ভূদৃশ্য, তারায় ভরা রাত্রির, আকাশ,
সমুদ্র আমাদের দেখাকে প্রসারিত করে, অবারিত করে দেয়। যখন মিশরে সেই রাত্রে প্রথম স্ফিংস দেখলেন রিলকে, তাঁর মনে হল ঈশ্বরের প্রতিরূপ তাঁর সামনে। নক্ষত্রখচিত রাত্রির সমভার যেন তার মানুষী মুখে।

দশম এলিজিতে দেখা গেল এক শান্ত ঈশ্বরের মতো স্ফিংসকে—

“That has silently poised
for ever, the human face or the scale of the stars.”

মানুষের মুখে খোদাই করা স্ফিংসের মধ্যে তিনি দেখলেন তাঁর ক্ষণস্থায়িত্বের; নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ভয়। রাত্রি, স্ফিংস আর অ্যামেনোফিসের মুখ তাঁর কাছে জীবনের দুর্ভেয় রহস্য আর ভয়ের প্রতিরূপ হয়ে উঠল। বস্তু যেন প্রতিমা হয়ে এল। জন বার্জার যেমন বলেছিলেন “অ্যান অবজেক্ট স্ট্রাইভিং টু বিকাম অ্যান ইমেজ”— বস্তু যেখানে প্রতিমা হয়ে উঠছে। রিলকের নিয়তি হয়ে উঠছে।

Categories
amitava_ogronthito

অগ্রন্থিত কবিতা

অনুতাপের ঘরের দেয়ালে যা লেখা ছিল

এমন জীবাণুশূন্য করে নিয়ো না নিজেকে, যাতে মনে হয়
সাদা সাবানের ওপর কালো ফিনাইল দিয়ে
লেখা হয়েছে তোমাকে

ঈশ্বরের হাতে, ঈশ্বরের লেখার খাতায়

শপিং মল-এ একজন আধ্যাত্মিক

ট্রায়াল রুমের ভেতর থেকে লাল কর্সেট পরা মহিলাটি
চাপা গলায় বললেন— গাধা কোথাকার!

আর ব্লেজার বাড়িয়ে ধরে একজন ঝকঝকে বিক্রেতা
তখন বলছেন—
নিন এই দুর্দান্তকে! শুধু আপনার আগের জীবন আমাকে
দিন।

মনে হয় এই শহরে সবাই
ঘরের আলো নিভিয়ে
স্ট্যাচু হয়ে থাকার খেলা পছন্দ করে
আর কোনোভাবে সেই খেলা আমাকেও টেনে নিচ্ছে হয়তো।

ঘষা কাচের ওপাশ থেকে আর একজন লাল কর্সেট
খসখসে গলায় বলে উঠলেন— গাধা কোথাকার!

যাও, বলো

হেনরিরই আছে সেই অনন্য শুদ্ধতা
যার সাথে পেত্রার্কের সনেটের কোনো মিল নেই

রোদ বোকার মতো খড়্গ হস্ত হয়ে উঠেছে ওকে দেখে

এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলো তাকে দুধাপ পিছিয়ে আসতে

আশাবাদী হয়ে লাভ নেই এখানে
এবং অংশীদার হওয়াও যাবে না

কোয়ারেন্টাইন ও হেনরি

যার আবরন নেই হেনরি তাকে নতুন করে
নগ্ন করতে যাবে না

একই সাথে, যে নগ্ন তাকে আবৃত্ত করার চেষ্টাও আর
করবে না সে

দেখা

শেষপর্যন্ত আবার তোমার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হল,
বুড়ো জাহাজ!

মরা কাঠ সাজিয়ে বারো বছর, আমি এজন্যই
তৈরি করেছি নিজেকে

কোন যুগ যুগান্তর ধরে সূর্য
নিজেকে সন্দেহ আর হাওয়াকে অবিশ্বাস করছে

যদি ডুবে যাও জলের অন্ধকারে আমাকেই পাবে
আর তোমাকে দেখতে পাওয়ার চোখ আমার থাকবে

কুকুর ও ফুটনোট

যখন হঠাৎ একসাথে মুখ ঘুরিয়ে নেয় ঘোড়াগুলো
তখন ভয় হয়, মায়েস্ত্রোর চিঠি আসবে

মহৎ সেই চিঠির মাথায়
নির্ভুলভাবে জ্বলজ্বল করবে লাল কুকুর

পালা করে ষোলটা পাথর সারাজীবন চুষে যাওয়ার মধ্যে
কোথাও কোনো মহত্ব নেই

কিন্তু ফুটনোট থাকবে, আর তার মাথায় নির্ভুলভাবে
লাল হয়ে জ্বলবে কুকুর

অনুশাসন

যেকোনো ভারী বোমার গায়ে
লম্বা আর হলুদ দাগ দেওয়া থাকে ঈশ্বরের নির্দেশে

আর ওই দাগের জন্যই সে সবসময়
নিয়ন্ত্রণে থাকে অপেক্ষা করে সীমা ছাড়ায় না

শর্টকাট

যদি ক্রাচ সঙ্গে থাকে
অস্তিত্ব স্রেফ দু-মিনিটের হাঁটা পথ

যেভাবে মিথের জন্ম হয়

রাতে তারা দু-জন কবরখানার প্রধান ফটক থেকে
নেমে আসে নিঃশব্দে
আর অন্ধকার রাস্তায়
নরম থাবা ফেলে ঘুরে বেড়ায়।

লোকে বলাবলি করে
ধুলোমাখা শিরীষ গাছের আড়ালে
মাঝে মাঝে তারা পেচ্ছাপ করার জন্য থামে।

বুড়ো আর সূর্য

মাটির পাত্রে জ্বলন্ত কাঠকয়লা জুটত না বলে
শীতে অসাড় বুড়োটা চাইত
সূর্য যেন না ডুবে যায় কখনো।

সূর্যই জানে আসলে এক অবাস্তব ধর্মযাজক সে
মৃত্যুদণ্ডের আগে যে দণ্ডিতের সামনে
অনুভূতিশূন্য কিছু কথা
কাগজ দেখে অন্যমনস্কভাবে পড়ে যায়।

Categories
amitava_oprokashito

অপ্রকাশিত গদ্য

শব্দকে তুলোর হাতুড়ি দিয়ে আঘাত

‘… a man can not successfully defend himself in the eyes of another, and when he is talking he is doing so only to drown the silence which spreads around him.’
(Love and garbage: Ivan Klima)

আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যা কিছু আমরা বলি, তার মধ্যে থেকে যায় চারপাশের স্তব্ধতাকে নিমজ্জনের একটা চেষ্টা— উপরের এই উদ্ধৃতিটিকে বিস্ময়কর একসত্য বলে এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমার। হতে পারে, কালই হয়তো সরে যাব এখান থেকে। নতুন কোন কথায় বিস্মিত হব। সারাজীবন ধরে এমন কয়েক হাজার বিস্ময়কর সত্য আসে এবং চলে যায়। এভাবেই আমরা নিঃস্ব আর সমৃদ্ধ হই একসাথে। আমার দুই তরুণ কবিবন্ধু— স্বপন এবং রঞ্জন আমার এই ব়্যান্ডাম পুলিশি লাঠিচার্জ কীভাবে সহ্য করবে জানি না। কিন্তু আমিও নিরুপায়। লাঠি ছাড়া আর কিছু নেই আমার।

খুব কুণ্ঠার সঙ্গে একটা কথা প্রথমেই স্বীকার করে নিই— কবিতা নিয়ে কথা বলার কোনো যোগ্যতা আমার থাকতে পারে না, কেননা সব থেকে কম আমি যা পড়ি তা কবিতা। এমন নয় যে আগে পড়তাম, এখন পড়ি না। এক অগ্নিময় তৃষ্ণা নিয়ে কবিতা পড়তাম একসময়, বলা ভালো শুষে নিতাম। সে-সময় কবিতার বই/পত্রিকা খুব বেশি আসত না কলকাতা থেকে অনেক দূরের এই মফস‍্সলে। প্রতি সপ্তাহে ৭৫ পয়সা দিয়ে ‘দেশ’ কেনা সম্ভব ছিল না— পয়সা নেই। প্রশান্ত মজুমদার আর আমি— দু-জনেরই বছর কুড়ির নীচে বয়স তখন— দু-জনের টাকা দিয়ে একটু-একটু করে কিনলাম ‘কবিতার পুরুষ’ (সং: অমিতাভ দাশগুপ্ত) ‘বাংলা কবিতা বার্ষিকী ১৩৭৫’ (সং: শক্তি চট্টোপাধ্যায়)। বহরমপুরের অগ্রজ কবিরা মাঝে মাঝে দুয়েকটা বই পড়তে দিতেন। একদিন মনে হল ফেরতযোগ্য এই সব বই আর না— কিনতে- পারা পত্রিকা থেকে প্রিয় লেখাগুলো যদি মুখস্থ করে নেওয়া যায়, একটা সুরাহা হয় তাহলে। দোকানে চা স্টলে দাঁড়িয়ে সার্জেনের মতো একাগ্রতায় কবিতা মুখস্থ করা শুরু করলাম। যে অংশগুলো মনে পড়ত না, পরের দিন দোকানে দাঁড়িয়ে আবার সেগুলো পড়তে যেতাম। নিজেকে মহাপ্রাণ হিসেবে দেখানোর জন্য এসব বলছি না কিন্তু। সেই সময় রেস্তহীন কবিতা পাগলদের অনেকেই এমনটা করতেন।

তো, এভাবেই চলছিল। কবিতা পড়া, কবিতা লেখা, কখনো-সখনো ঝামেলা মারপিটে জড়িয়ে পড়া, টিউশনি, আর দিনরাত আড্ডা। মদ খেতাম না। গাঁজা ভাং এসব চলত। মালদার পোস্ট অফিসের ব্যস্ততম মোড়ের ট্রাফিক আমি আর শিশির গোস্বামী (কবি নন) পুরো বন্ধ করে দিয়েছিলাম ভাংয়ের গুলি খেয়ে রাস্তায় বেঁহুশ পড়ে থেকে। সেই আনন্দময় মুহূর্তের কথা ভাবলে আজও রোমাঞ্চ হয়। এরপর গাঁ-গঞ্জে চাকরি জুটল একটা। বই-পত্রিকাহীন এক সাধকের জীবন শুরু হল। কবিতা নিয়ে তীব্রতা পরিস্থিতির চাপে স্তিমিত, প্রায় নিশ্চিহ্ন তখন। কয়েকবছর পরে অন্য চাকরিতে গেলাম। কবিতা আরও দূরের ব্যাপার হয়ে উঠল। এই—


কবিতা এল না আর কোনোদিনই। এল জীবন-দেখা। সেই দেখার তীব্রতায় আমি ধ্বংস হয়ে গেলাম। চোখের পাতা ঝলসে গেল আমার। চাকরির শর্তে তখন আমাকে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি নিতে হয়। সন্দেহজনক মৃত্যুর ইনকোয়েস্ট করতে হয় হাসপাতালে, মর্গে, মাঠে ঘাটে সবখানে। সবে হাঁটতে শেখা ছেলে উঁচু মাচা থেকে মাটিতে পুঁতে রাখা বেশ কয়েকটি লোহার রডে পড়ে গেছে। একটা রড তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে। Custodial death হয়েছে একজনের। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আমি মর্গে হাজির সুরতহালের জন্য। ছুরির একটানে পেট দু-ফাঁক করে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসা পচা নাড়িভুঁড়ি থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা নেওয়ার পর খুলির চামড়া পুরো তুলে ফেলে চালের বস্তা নামানোর কাঁটার মতো জিনিস হাতুড়ি দিয়ে কপালে গেঁথে উঠে দাঁড়ায় ডোম। জোরে শ্বাস নিয়ে শক্তি সংগ্রহ করে। তারপর এক ঝটকায় শূন্যে তিনহাত লাফিয়ে উঠে ছিটকে পড়ে সেই মৃতদেহ এবং ডোম। তখন খুলির দরজা হাট হয়ে খুলে গেছে, তরল আলো গড়িয়ে নামছে মর্গের মেঝের ওপর।

হাসপাতালের বেডে শুয়েছিল বছর ত্রিশের একটি বিবাহিতা মেয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। ঠোঁটে স্ফুরিত হাসির আভাস। মেয়েটির ত্রিসীমানায় মৃত্যু নেই, আর এর dying declaration নিতে হবে আমাকে! আমার প্রশ্ন শুনে ডাক্তার হাসলেন। মেয়েটির চোয়ালে অভ্যস্ত চাপ দিলেন, আর আমি দেখলাম সাদা আলোর বল উঠে আসছে মেয়েটির মুখ থেকে। তীব্র অ্যাসিডে তার জিভ তালু, গলা জড়িয়ে একটা খোসা ছড়ানো ফটফটে সাদা ডিমের মতো হয়ে উঠছে, টিভবের আলো ঠিকরে উঠছে সেই সাদা থেকে।

১৯৯৩ থেকে ২০০০ পর্যন্ত কয়েকশো বার এই কাজ করতে হয়েছে আমাকে। না করলেও পারতাম। তখন অনিচ্ছুক আর সব ম্যাজিস্ট্রেটদের কাজটা করতে হত। দেখতাম ৮০% ভিকটিমই মেয়ে। মেয়েদের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পৃথিবীকে একটি ছোট্ট মেয়ের বাবা হিসেবে আমার সাধ্যমতো জঞ্জাল মুক্ত করা দরকার— মনে হয়েছিল এরকম। গলাপচা মৃতদেহে গন্ধ তাড়াতে কড়া আতর সারা গায়ে মেখে দিনে/গভীর রাতে কয়েকশো বার এই কাজ নিয়ে প্রেতের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি আমি। শরীর ধ্বংস হয়ে গেছে ভিতরে ভিতরে এই অসহনীয় মানসিক চাপে। রাতে ঘুমোতে পারতাম না। চাপ কাটাতে আমি দান্তে (বিশেষ করে Inferno/Paradiso নয়) ওভিদ আর ভার্জিল পড়তে শুরু করি। সাথে ফ্রেজারের Golden Bough এবং জেসি ওয়েস্টনের From Ritual to Romance। সব থেকে মন দিয়ে পড়তাম ফ্রয়েড, ইয়ুং এবং অ্যাডলার। বছর দুয়েক এই বইগুলোয় বুঁদ হয়ে থাকলাম। স্বস্তি এল না, ঘুম এল না, কিন্তু চোখ খুলে গেল। ঠিক করলাম জীবনে কবিতা লিখব না আর, কিন্তু আমার ভয়ংকর দেখাগুলো টুকরো- টুকরো দৃশ্যে লিখে রাখব। কাল্পনিক একজন protagonist হিসেবে ম্যাডাম এম. নামের একজন এলেন। তাঁর জন্ম, তীব্র ভয়াবহতার মধ্যে বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টা, ও আত্মহত্যা— সাথে প্রক্ষিপ্ত আরও কিছু টুকরো দৃশ্য— এই নিয়ে শুরু করলাম ‘টোটেম ভোজ’। টোটেম-এর সম্পূর্ণ পরিকল্পনা লেখা শুরুর আগে মনে মনে ছকে নিয়েছিলাম। একটি শব্দও প্রেরণাচালিত হয়ে আসেনি এবং প্রেরণায় আমি একবিন্দু বিশ্বাস করি না। আমি একটা pseudo-epic-এর আদলে বইটি ভেবেছি। Epic-এ invocation to the muse থাকে, টোটেমেও সেটা এল, কিন্তু অভিশাপ হিসেবে। এরপর ম্যাডাম এম আর আবির্ভাব, বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের অনুসরণে এল সৃজনমূলক সাতটি দিনের কথা।

এই লেখাগুলির মধ্যে ‘Protagonist’ ম্যাডাম এম.— এক ঋতুহারা নারীসত্তা। তাঁর ভয়ার্ত চিৎকার সারা বইটিতে ছড়িয়ে। এডোয়ার্ড মুংখ-এর The Cry ছবিটির মুখ যেমন সারা ক্যানভাসে ছড়িয়ে যায়। এই ম্যাডাম এম হয়তো আমারই অ্যানিমাস।

টোটেমের ভাষা কৃত্রিম, আড়ষ্ট শীতল বিশ্লেষণমুখী। খুব বোকার মতোই আমি চেয়েছি ভাষাকে তার আদিলক্ষণে অর্থাৎ স্রেফ চিহ্নমূল্যে (Sign value) ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। কোথাও suggestiveness নেই, symbol নেই। চেয়েছি শব্দ প্রাথমিকভাবে যা বোঝায় সেটুকুই সে বোঝাক। শব্দের নিরেট বাস্তব দিয়ে বাস্তবতার প্রতীকী গঠনকে আঘাত করতে চেয়েছিলাম। যদি সেটা হয়ে ওঠে তুলোর হাতুড়ি দিয়ে হত্যার চেষ্টার মতো হাস্যকর— আমার যায় আসে না কিছু। বাংলা অনুবাদে বাইবেলের ভাষার আড়ষ্টতা আমি টোটেমে ব্যবহার করেছি। পড়লেই মনে হবে ইংরেজি বাক্য গঠনের নিয়মে অন্ধের মতো অনুসরণ করা হয়েছে।

আর একটা কথা, টোটেম-এ মাঝে মাঝেই কথোপকথন এসেছে। আড়ষ্ট কৃত্রিম কথাবার্তা। কেউ কাউকে শুনছে না, উত্তর দিচ্ছে না। দুয়েকটি নমুনা দিই—
১. ‘আমি কিন্তু এইমাত্র আপনাকে রাতের খাবারে আমন্ত্রণের কথা ভাবছিলাম।’
২. ‘আপনার পাঁজর থেকে বেরোনো রক্তের ওই তিনটে মোমবাতি কি পেতে পারি আমি?
৩. ‘হ্যাঁ। কিন্তু খাবারগুলো দেখুন। মনে হয় না আপনি ক্ষুধার্ত?’
— বাংলায় এভাবে কথা বলা হয় না। ইংরেজি ভাষায় এক স্বাভাবিক ফর্মাল দূরত্ব আছে, যা পারস্পরিক যোগাযোগহীনতা বোঝাতে কাজে লাগানো হয়েছে টোটেমে। ভাষাকে মন্থর করতে ব্যবহৃত হয়েছে প্রচুর ক্রিয়াপদ। এসবই করেছিলাম নিজেকে আরো নিঃসম্বল করে তোলার জন্য। সব কিছুই শেষপর্যন্ত হয়তো হয়ে দাঁড়িয়েছে একজন সার্কাস-ক্লাউনের দেকার্ত বিষয়ে গুরুগম্ভীর বক্তৃতার চেষ্টার মতো হাস্যকর। কিন্তু আমার সত্যি তো আমাকে বলতেই হয়।


দৃশ্য, আদ্যন্ত বানানো— এই জায়গা থেকেই প্রাথমিক ধাক্কাটা পাই— যখন লিখি কিছু। বিপন্ন, ত্রাস-তাড়িত মানুষ (কখনো তার নাম ক্রিস্টোফার, কখনো হেনরি— এরকম) সেই দৃশ্যের মধ্যে (আবার কখনো দৃশ্যের বাইরে) পরিত্রাণ খুঁজছে, পরিস্থিতি বুঝতে চাইছে। চাপে সে বিপর্যস্ত, তার চিন্তা শৃঙ্খলাহীন, arbitrary, কিন্তু তবু সে চেষ্টা করছে। যেন দৃশ্য, রং, ধ্বনি, আর যুক্তি শৃঙ্খলাহীন এক ধারাবিবরণী মিলেমিশে এক chaos সৃষ্টি করছে। কিন্তু এই chaos-এর অতলে একটা কিছু বলে দেওয়াও আছে। সেটা যদি পাঠককে না পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে সেই লেখা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। নিজের লেখার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থাকে অনেকের। আমিও তার বাইরে নই। চার লাইনের কবিতার দু-লাইন পড়েই যদি কেউ লম্বা লম্বা করে ধু-উ-স বলে অন্য পাতায় চলে যান! এই ভয় থেকেই আমি চাই এমন এক নিজস্ব সিনট্যাক্স থাকুক আমার লেখায়, যাতে পাঠককে ধাক্কা না খেতে হয় পড়ার সময়। (যাঁরা কবিতা লেখেন তাঁরা সবাই এটা করেন, বলাই বাহুল্য।) মোটে তো দু-তিনজন আমার লেখা একটু পড়েন, তাঁদের কেও যদি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিই এবং তাঁরা চলে যান, আমি কী করব তখন? ধুধু সাদা বরফের ওপর একটা লাল পায়রার মতো নখের আঁচর কাটব?
আমার নিজের সীমাবদ্ধতা আমি জানি খুব ভালোভাবেই। শক্তি থাকলে একদিন আমিও হয়তো গুটি কেটে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারতাম। আজ আমি শুধু নিজের কথাই বলে গেলাম। কোন ভাবনা থেকে আমি কী কী করতে চেয়েছি— এসবে কেন আগ্রহী হবে কেউ? কিন্তু আমাকে অপ্রস্তুত করে বমির মতো উঠে এল যা কিছু বলিনি আগে, যা দরকারও হয়নি বলার। এবং স্বপন! রঞ্জন!…

‘… These are the fragments I have shored against my ruins.’ বিশ্বাস কর।

Categories
amitava_oprokashito

অপ্রকাশিত কবিতা

চৈতন্যোদয়

সাদা মাংস চলতে পারে
কিন্তু লাল আমার জন্য নিষিদ্ধ।
এটা না জেনেই আমি মানুষের মাংস খেয়ে আসছি
দীর্ঘদিন
তৃপ্তি ও অনুতাপের সঙ্গে।
ভয় করছে, এতদিন আমি কি ক্ষতিই করেছি আমার?

ইয়ে, মানুষের মাংস লাল না সাদা?

ডিভোর্স পেপার

রবার স্ট্যাম্পের ছাপগুলো খুঁটিয়ে দেখছে হেনরি
এবং রবার ঘষে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে।
সম্ভবত বিকেল থেকেই সংক্রমণ ছড়াবে
রবার স্ট্যাম্পের ছাপগুলো খুঁটিয়ে দেখছে হেনরি।
বেড়ার ওপর একটা পুরোনো মাছি
পুরোনো রোদকে ঠিক তখন থেকেই আর চিনতে পারছে না
রাস্তা থেকে শান্তভাবে একটা বাড়ি সরে যাচ্ছে
ক্ষমা করে দিচ্ছে।

সিঁড়িতে বসে রবার স্ট্যাম্পের ছাপগুলো
শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে হেনরি।

Categories
amitava_smritikotha

রিমি দে

অমিতাভ মৈত্র: এক ঝোলাওয়ালা

অমিতাভ মৈত্রকে নিয়ে একটি স্মৃতিচারণগোছের লেখা লিখছিলাম একটি পত্রিকার জন্য। লেখাটি শেষ করে একটু হালকা লাগছিল। ভাবলাম অমিতাভদাকে একটা ফোন করি। করলাম। ৮৯০৬২০… নম্বরে। রিং হয়ে গেল। কেউ রিসিভ করলেন না। এরকম আগেও হয়েছে। পার্থক্য একটাই আগে অমিতাভদা রিং ব্যাক করতেন। আজ সে শব্দহীন! ফাল্গুন মাস। খাঁ খাঁ করছে চারদিক। দখিন হাওয়া মৃদু। টবের ফুলের আলোতেও যেন বিষণ্ণতার চাহনি। বাড়িটাও ফাঁকা। আশ্চর্য ধূসর। কেউ যেন কিছু খুঁজছে। পাচ্ছে না! ‘ছায়া আঁকার খাতা’ পড়ে আছে। শূন্যতা এসে গ্রাস করে নিয়ে গেছে শুকনো পাতাভর্তি ঝোলাটা! জীবন্ত ছায়ারা অচেনা ছায়ার দেশে চলে গেছে।
জানি মৃত্যু এক অনিবার্য সত্যের নাম। তবু মানুষ সেই অনির্দিষ্ট বৈতরণীর দিকে তাকিয়ে থাকে অসহায়ভাবে। ভেবেছিলাম বৌদি বা অর্যমার সঙ্গে কথা হবে। অর্যমার মেয়ে কি দাদু দাদু বলে কাঁদছে! দাদু নাতনিকে খুব ভালোবাসতেন। প্রায়ই নাতনির ছবি পাঠাতেন। কথা বলতে চেয়েছিলাম! হল না।

চাকরির শেষদিকে এই নম্বরটা দিয়ে বলেছিলেন সেভ করে রাখতে। সেই থেকে নম্বরটি গুগলেই সেভ হয়ে আছে। ফোন হারালেও নম্বর হারায় না! এরকম প্রচুর নম্বর আমার সেলফোনে রয়েছে। আমি মাঝে মাঝে নম্বরগুলোতে রিং করি। বেশিরভাগ ফোন বেজে যায়। কেউ হয়তো সেই নম্বরটা সারেন্ডার করেন। কেউ-বা ব্যবহার করেন। যেমন কবি সমর চক্রবর্তীকে ফোন করলে কাবেরীদি রিসিভ করেন। দীর্ঘক্ষণ কথা হয়! আমার মনে হয় আমি সমরদার সঙ্গেই কথা বলছি। সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়। বিকেল সন্ধে নিয়ে আসে। সমরদার ব্রাশ করা হয় না! এটা আমার একটা খেলা বলা যেতে পারে!

অমিতাভদার সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ কলকাতা বইমেলায়। সেতু কবিতাপাক্ষিক। প্রভাতদাই পরিচয় করিয়ে দেন। এখন প্রভাতদা নেই। তবু কবিতাপাক্ষিক হচ্ছে প্রভাতদারই আদর্শে। কোনো এক বছর কবিতাপাক্ষিকের বাৎসরিক অনুষ্ঠান হয়েছিল বাঁকুড়ায়। জায়গাটির নাম ছাঁদাড়। মাদল, লাল মাটির তৈরি বাড়িটা। কবিতা আখড়া করার পরিকল্পনা ছিল প্রভাতদার। মাদলকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। সে-বছর আমাকে কবিতাপাক্ষিক সম্মান দেওয়া হবে জানলাম। তো খুব আনন্দ। যাব বাঁকুড়া। কীভাবে যাব! প্রভাতদা বললেন কলকাতা চলে যেতে। তারপর একসঙ্গে বাঁকুড়া। সে অনেকটা সময়ের ব্যাপার। সেসময় শতাব্দী এক্সপ্রেস ছিল না যে টিকিট ঠিক পেয়ে যাব! তাছাড়া আকাশবাণী আর দূরদর্শনের কাজটাও তো করতে হয়। যাতায়াত অনুষ্ঠান নিয়ে দু-দিনের বেশি থাকা যাবে না। অগত্যা কষ্ট হলেও ঠিক হল বাসে যাব। বাড়ি থেকেও চিন্তা করছিল। প্রভাতদা ফোনে জানালেন, ‘অমিতাভ আসবে রিমি, তুমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ করো।’ তখন সম্ভবত ঘাটালে ছিলেন। সঠিক মনে নেই। কথা হল। বাড়ি থেকেও নিশ্চিন্ত হয়ে আমাকে বাসে তুলে দিল। বাঁকুড়া পৌঁছোলাম। একটুও অপেক্ষা করতে হয়নি। অমিতাভদা এসে গেছিলেন বাসস্ট্যান্ডে। তারপর ওঁর গাড়ি চেপেই ছাঁদাড়। দেখি সবাই এসে গেছেন। শঙ্খ ঘোষ থেকে ইন্দ্রানী দত্ত পান্না। হই হই কাণ্ড। নাসেরদা, প্রভাতদা, বৌদি, গৌরাঙ্গদা এবং আরও অনেকেই আগের রাতে চলে এসেছিলেন। আমি সেই প্রথম লালমাটির গ্রাম দেখলাম। অনুষ্ঠান চলল। আমরা সেবারেই অনেকে মিলে মাদলে সমবায় কবিতা লিখেছিলাম। মাটির দোতলা বাড়ি দেখে বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়েছিলাম! সেই দোতলায় প্রভাতদার দুই বোনের সঙ্গে রাতে ছিলাম। কী যে স্বচ্ছ আনন্দে কবিতার ভেলায় গা ভাসিয়েছিলাম সে বলে বোঝানো সম্ভব নয়! অমিতাভদা রাতে নিজের কাজের জায়গায় ফিরে গেছিলেন। পরদিন আবার এসেছিলেন। এই লেখা লিখতে গিয়ে ফেলে আসা সময় ও ঘটনা ছবির মতো ভাসছে। কত কবি সম্পাদকের সঙ্গে যে পরিচয় হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। দু-দিন কবিতামহলে কাটানো হল মহানন্দে। দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ রবিবার সন্ধেবেলা আমাকে অমিতাভদা বাসে তুলে দিলেন। তাতেই ক্ষান্ত হননি! বেশ ক-বার ফোন করে খবর নিয়েছেন। সোমবার ভোরে তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড। বাড়ি। বিকেলে অফিস। বাইরের মানুষেরা হয়তো এভাবেই কাছের হয়ে ওঠেন। পরিবারের হয়ে ওঠেন। আবার বাইরেরও থেকে যান! আসলে আমার মনে হয় সময় যেভাবে কথা বলতে চায়, কথাকেও সময়ের সুরের কাছে ঠিক সেভাবেই ধরা দিতে হয়, দূরত্ব এবং সম্ভ্রম বজায় রেখে! সেখানে ঘনিষ্ঠতা কোনো সমস্যা তৈরি করে না।

লেখালেখিতে অমিতাভ মৈত্রর অর্থ এবং অর্থহীনতা দুটোর প্রতিই বিশ্বাস এবং প্রশ্রয় ছিল। হেনরি, ম্যাডাম এম, ক্রিস্টোফারকে নানান ভঙ্গিমায় লালন করেছেন। একের মধ্যে ফুটেছে বহু স্বর। সিসিফাস ওঁর প্রিয় চরিত্র হলেও জিউসের মধ্যে নিজেকে অন্বেষণ করেছেন বহু আঙ্গিকে। পৌরাণিক চরিত্র হলেও সিসিফাস ও পাথরের প্রচুর ব্যাখ্যা। হোমার, কামু ছাড়াও যারা যেভাবে দেখেছেন প্রতিটি দ্যাখাকে নিজের লেখায় চোরাস্রোতের মতো নির্মোহ লালন করেছেন। প্রচুর পরিমাণে বিদেশি সাহিত্য শুধু পাঠ করতেন না, আত্মসাৎ করে ফেলতে পারতেন একবার পাঠেই। মিথ, ইতিহাস, সাহিত্য, লেখকদের জীবনী, চিত্র, চিত্রকরদের জীবনযাপন, কল্পনাশক্তি, অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার সংমিশ্রণ ওঁর লেখাকে এক অদ্ভুত আশ্চর্যজনক জায়গায় নিয়ে যায়। কবিতা কিংবা গদ্য যাই হোক না কেন প্রকরণ এবং প্রক্রিয়াগত দিকে অবিচল থাকলেও, স্বভাবগত অস্থিরতার প্রভাব লেখায় পড়েছে। সেই কারণেই লেখায় একটি অনির্দেশের ইশারা থাকে! অমিতাভদার মর্মে মর্মে দান্তে এবং ডিভাইন কমেডি লেগে আছে। পদ্যতে ২০০৩-এ কবিতা দিয়ে লেখা শুরু হয়। ২০০৪-এ প্রচ্ছদ করলেন এবং একটি গদ্য লিখলেন। ওরকম গদ্য আগে পড়িনি, তাই খুব অবাক হয়েছিলাম পাঠ করে। গদ্যটির নাম ‘পতনশীল নায়ক’। ২০১২-তে কেমব্রিজ ইন্ডিয়া থেকে ‘পতনশীল নায়ক’ শিরোনামে প্রথম গদ্যের বই প্রকাশ পায়। ১১.০১.১৩ তারিখে বইটি উপহার পাই। অর্থাৎ সেদিন কলকাতায় বাংলা আকাদেমি পরিচালিত লিটল ম্যাগাজিন মেলা শুরু হয়েছিল। ২০০৪ থেকে ২০২১ নভেম্বর আর্তিসংখ্যা অবধি প্রতি সংখ্যাতেই গদ্য লিখেছেন। ২০১৫-তে ‘মা: মিথ কিংবা ডিমিথ’ ভাবনায় পদ্যর একটি সংখ্যা করেছিলাম। সেখানে ‘এক ধূসর অন্তহীন হাওয়া’ এই শিরোনামে মনকাঁপানো একটি গদ্য লিখেছিলেন। আশা করি গদ্যসংগ্রহে লেখাটি পাব। সেখানে অদ্ভুত এক মায়েদের মন্তাজ আঁকেন। শেষে ডি এইচ লরেন্সের Sorrow নামের কবিতাটি। এই গদ্যটি লেখা হয়েছিল কাফকা, কামু, The Outsider-এর নায়ক ম্যরসো এবং স্যামুয়েল বেকেটের মোলোয় উপন্যাসের মায়েদের নিয়ে। তারপর এসেছে বিমল করের ‘ভুবনেশ্বরী’’ উপন্যাসে পরিবারের পূর্ব নারীকে অলৌকিক মা বানিয়ে মিথ করে তোলা। মায়ের সঙ্গে সন্তানের আলোছায়ায় জড়িয়ে থাকা বিন্যাসের কোলাজ।

নাথিংনেসে অগাধ বিশ্বাস রেখেছেন অমিতাভ মৈত্র। নিজের জীবনের ক্ষেত্রেও যেন সামনে একটি শূন্য ঝোলানো। লিখেই চলেন লিখেই চলেন উদ্দেশ্যহীন প্রত্যাশাহীন! তবে প্রচুর গদ্য লিখবেন অবসরের পরে এরকম পরিকল্পনা ছিল। কর্মরত অবস্থায় যা লিখেছেন, তা-ই বা কম কীসের! একটা ভুল ধারণা হয়তো অনেকের আছে যে ওঁর লেখা তেমনভাবে পঠিত নয়! একজন মেধাবী লেখক হিসেবেই উনি পরিচিত। অনেকেই পড়েন কিন্তু চুপ থাকেন! তাতে অবশ্য লেখকের কিছু এসে যায় না! ২০০৫-এ পত্রলেখা থেকে ‘ষাঁড় ও সূর্যাস্ত’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। ইদানীং লোকমুখে শোনা যায় অমিতাভ মৈত্র ‘ষাঁড় ও সূর্যাস্ত’ বইটিকে নাকি গুরুত্ব দিতে চাননি! তবে লেখাগুলি এবং পাণ্ডুলিপি যখন তৈরি হয় তখন একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন একথা নিজে বলেছেন সেই বিগত সময়কালে। তাহলে অপছন্দের কাব্যগ্রন্থ কীভাবে হয়! পিতার পাঁচ সন্তান। পিতা জীবনের সব স্তর পেরিয়ে বৃদ্ধ হলেন। পাঁচ সন্তান পাঁচ-রকম। দ্বিতীয় সন্তানের মধ্যে পিতার পছন্দের গুণাবলী না থাকলে তাকে কি তিনি অস্বীকার করতে পারেন? মলিন হয়ে আসা ফ্যামিলি গ্রুপ ফটো থেকে একজনের উপর গাঢ় নীল পেনের দাগ দিয়ে বুজিয়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হলে তাতে পাঠকের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। আমি ‘ষাঁড় ও সূর্যাস্ত’-কে অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কাব্যগ্রন্থটির লেখাগুলি পাঠ করলে পাঠক অনুভব করবেন কবিতাগুলির অনুরণন। লেখকের মতের বিরুদ্ধে কথা বলছি অথচ দেখুন লেখকবাউল কাঁধে গেরুয়া ঝোলা নিয়ে কোন অজানায় পাড়ি দিয়েছেন! পেছন ফিরে দেখছেন না একটিবারও! কী অদ্ভুত, না!

Categories
amitava_smritikotha

দেবাশিস সাহা

আন্তরিক, আন্তর্জাতিক অমিতাভদা ছিলেন আত্মার আত্মীয়

যখন অমিতাভ মৈত্র পড়লাম, জানলাম। তখন আমার গর্ব হল এবং আনন্দ হল। অমিতাভ মৈত্র একজন আন্তর্জাতিক মানের ও মাপের কবি ও গদ্যকার। আমি গর্বিত। এই কবির সঙ্গে এক শহরেই থাকি।

২০০২ সালে বহরমপুর আসার পর দু-চারটে সাহিত্য অনুষ্ঠানে আলাপ-পরিচয়। ঘনিষ্ঠতা শুরু কবি সুশীল ভৌমিক-এর বাড়িতে। সুশীলদা ও অমিতাভদার সম্পর্ক অনেক গাঢ় ও আন্তরিক ছিল। আমি দু-জনের কাছাকাছি থাকার সুবাদে টের পেয়েছিলাম। সেই কারণে দু-জনের কবিতার রহস্যময়তা ছিল যাপনের অংশ।

অমিতাভদা সরকারি আধিকারিক হয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার ছোটো-বড়ো নানা শহরে চাকরি করেছেন। সেখানের কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক বলয়। অমিতাভদা ছিলেন ভীষণ আন্তরিক। অনুজ ও অগ্রজের বই কিনে সংগ্রহ করতেন,পড়তেন এবং মতামত দিতেন। আমার কবিতার বই, ‘দেখা শেখার ইস্কুল’ কিনে নিয়ে প্রতিটি কবিতার পাশে পেনসিল দিয়ে মন্তব্য, পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখে আমাকে উপহার দিলেন। আমি অবাক। চোখে-মুখে বিস্ময় নিয়ে দেখছি এক ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে একজন ভালোবাসার মানুষ আমার কাঁধে হাতে দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের সবুজ উঠোনের দিকে। বইটি খুলে দেখে আমি তাজ্জব। প্রতিটি পাতায় আমার কবিতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ যা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে।

২০১২। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিলেন। মাঝে মাঝে দেখা হত। দেখা হত কখনও প্রেসে, কখনও চায়ের দোকানে কখনও বা সাহিত্যের কোনো অনুষ্ঠানে। দেখা হলেই কথা হত, আডডা হত কবিতা নিয়ে। অমিতাভদা বলতেন, কবিতা লেখায় আত্মবিস্মৃত হতে হবে। নিজের অবস্থান, কাল-পাত্র সব দূরে সরিয়ে লিখতে হবে।

অমিতাভদার কবিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন মনে উঁকি দিত। জিজ্ঞেস করতাম। পিঠে একটা টোকা দিয়ে বলতেন, ও-সব ছাইপাঁশ লিখি, ওগুলো কি কবিতা হয়? তোমরা পড়ো?

নিজের কবিতায় অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, প্রশ্ন রেখে দিতেন। যেন নিজের দিকে আঙুল রেখে কোশ্চেনগুলো করতেন। হেনরি, ক্রিস্টোফার, ম্যাডাম এম নিজেরই অংশ। কবিতা যে অনুভূতির তা বারবার টের পেতাম। পাঠকের ভাবনার জন্য রেখে দিতেন এক সমুদ্র আকাশ। প্রচুর পরিমাণে আন্তর্জাতিক লেখকদের বইপত্র সংগ্রহ করতেন এবং পড়াশোনা করতেন। তার ফসল আমরা পেতাম অমিতাভদার গদ্য ও কবিতায়।

বই কেনা ও পড়া ছিল অমিতাভদার নেশা। আমাদের সম্পাদিত পত্রিকা ছাপাখানার গলির সঙ্গে অমিতাভদার সম্পর্ক ছিল একদম প্রথম থেকেই। স্টল থেকেই নিজে সংগ্রহ করতেন প্রতিটি সংখ্যা। মতামত দিয়ে আমাদের উৎসাহ দিতেন। ২০০৭ সালে ছাপাখানার গলির বিষয় ছিল, এই মুহূর্তে যে-বই পড়ছেন সেই বই নিয়েই লিখুন, স্বভাবতই অমিতাভদাকে বলতেই এককথায় রাজি।
সেই সময়ে উঠে আসছে এক ঝাঁক তরুণ কবি। তার মধ্যে অন্যতম অনুপম মুখোপাধ্যায়। অনুজদের লেখাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়তেন। সেই সংখ্যায় অনুপমের হাইওয়ে নিয়ে লিখলেন এক অসামান্য গদ্য। আমাদের কাগজ সমৃদ্ধ হল। পাঠক সমৃদ্ধ হল।

২০১৫ সালে নাটক সংখ্যায় অমিতাভদা আলোচনা করলেন, Samuel Beckett-এর Waiting for Godot. কী বলব! এক অসাধারণ আলোচনা পাতার পর পাতা জুড়ে। এই সমস্ত লেখা আরও পাঠকের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।

পরের বছর কাব্যগ্রন্থ আলোচনা সংখ্যায় অমিতাভদা নিজেই নির্বাচন করলেন উল্লেখযোগ্য চারজন কবির চারটি কাব্যগ্রন্থ।
১. নির্বাচিত কবিতা প্রয়াস– অমিতাভ গুপ্ত
২. তাঁবু মই ও শ্রেষ্ঠ কবিতাগুচ্ছ– সুধীর দত্ত
৩. সম্মোহন পাঠের পিছনে– সমরেন্দ্র দাস
৪. নির্বাচিত কবিতা– নাসের হোসেন

নিজের সংগ্রহ থেকে নিজ উদ্যোগে বইগুলো আলোচনা করলেন। সেই আলোচনায় আমরা ঋদ্ধ হলাম।

Jose Saramago-র Cain উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করলেন আমাদের উপন্যাস আলোচনা সংখ্যায়। এই আলোচনা ভীষণ উচ্চমার্গের। আপামর পাঠকের জন্য অমিতাভ মৈত্র নয়। যে-পাঠক পড়াশোনা করে, অনুসন্ধিৎসু। তাঁদের জন্য অমিতাভদার আলোচনা যেন তৈরি হয়ে থাকে। এইসব আলোচনা সংকলিত হওয়া জরুরি। অমিতাভদা নিজে বই কিনে নিতেন অথচ দেখা হলেই নিজের প্রকাশিত বই লিখে দিতেন, ‘দেবাশিস আমার আত্মার অংশ।’

অমিতাভদা ছিলেন আমাদের আত্মার আত্মীয়। আজ আমরা আত্মীয়হীন, অভিভাবকহীন। এমন আন্তরিক, আন্তর্জাতিক মাপের, মানের মানুষ ও লেখককে হারিয়ে বাকরুদ্ধ। অমিতাভদার সৃষ্টিকে সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। এই ব্রতে আমিও পাশে আছি।

Categories
amitava_smritikotha

অনুপম মুখোপাধ্যায়

অমিতাভদা ছিলেন বাংলা কবিতায় এক সংক্রামক ব্যাধি

আমি জীবনে প্রত্যক্ষভাবে একজন কবির সঙ্গেই মিশেছি। একজন কবির সঙ্গেই মুখোমুখি বসে দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছি। আড্ডা অর্থে পরচর্চা পরনিন্দা নয়। ‘আগন্তুক’ ছবির সেই ভূপর্যটকের ভাষায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের আড্ডা, কথোপকথন। তিনি কবি অমিতাভ মৈত্র। তিনি ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে ঘাটাল শহরে এসডিও হয়ে এসেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়, মাধ্যম ছিলেন ‘কবিতাপাক্ষিক’ পত্রিকার প্রাণপুরুষ প্রভাত চৌধুরী। আমি প্রভাত চৌধুরীর কাছে অনেক কারণেই কৃতজ্ঞ। তার মধ্যে অন্যতম কারণ হল তিনি আমার সঙ্গে অমিতাভ মৈত্রের যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সময়টায় আমি সবেমাত্র কবিতা ছাপতে দেওয়া শুরু করেছি। শুধুমাত্র ‘কবিতাপাক্ষিক’-এই ছাপতে দিতাম। সেই সময়টায় আমার পায়ের তলায় কোনো মাটি ছিল না। সেই সময়টায় আমার শহরে এবং আমার জীবনে অমিতাভ মৈত্রের এসে পড়াটা দৈবপ্রেরিত ছিল বলে আমার মনে হয়।

রোজ সন্ধ্যায় আমাদের কথা হত। যদি না কোনো প্রশাসনিক কাজে উনি অনুপস্থিত থাকতেন। কখনও বাইরে থাকত গ্রীষ্মের গুমোট হাওয়া, কখনও শীতের তীক্ষ্ণ বাতাস, কখনও বর্ষার জলধারা। উনি থাকতেন শিলাবতী নদীর ধারে লম্বা লম্বা গাছে ঘেরা একটা ব্রিটিশ আমলের বাংলোয়। সেটার ভূতুড়ে হিসাবে খ্যাতি আছে। অমিতাভদা বলতেন রাত গভীর হলে ছাদ থেকে কাঁধের উপর কোমল পায়ের স্পর্শ নেমে আসে। অমিতাভদাকে একটা ধারালো ছুরির মতো মনে হত। স্পর্শ করলে হাত কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আশ্চর্য মেধাবী একজন মানুষ। এবং আশ্চর্যরকমের উৎসুক ও তৃষ্ণার্ত। ওঁকে দেখলে মনে হত কোনো এক জলের নেশায় ছটফট করছেন। সেই জল কবিতার হতে পারে। গদ্যের হতে পারে। কিন্তু সেই জল অবশ্যই খুব উঁচু ও দুর্গম কোনো পর্বতের চূড়া বা খুবই গহীন ও বিপজ্জনক উপত্যকার খাঁজে রাখা আছে। কোনো বাঙালির চোখে আমি অমন তৃষ্ণা দেখিনি।
অমিতাভদা যে-কবিতা লিখেছেন তার তুলনা বাংলা কবিতায় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ওঁর কবিতার কোনো পূর্বপুরুষ কি আছেন? সুশীল ভৌমিক আর ভাস্কর চক্রবর্তীকে কি ওঁর কবিতার সূত্রে কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? ওঁদের কবিতার উত্তরাধিকার কি আছে অমিতাভদার লেখায়? সম্ভবত আছে। কিন্তু সেভাবেই আছে, যেভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের শরীরে আছে আমার বা আপনার জেনেটিক কোড। উনি এক একক উপস্থিতি বাংলা কবিতায়। এবং বাংলা গদ্যেও। গদ্য আর কবিতাকে কোথায় একই রাখবেন আর কোথায় আলাদা করবেন এই নিয়ে বাংলার চিন্তকরা যখন কাতর, কোথায় যে অমিতাভ মৈত্র মিলিয়ে দিয়ে গেলেন গদ্য আর কবিতাকে তাঁর অদ্ভুত লেখালেখিতে! যেন তিমিমাছ শ্বাস নিতে ভেসে উঠল, আর তার ফোয়ারায় আপনি দেখতে পেলেন কবিতার রামধনু। লেখার পৃথিবীতে গদ্য আর পদ্য যে একই ঘটনা, তার চরম উদাহরণ অমিতাভ মৈত্র।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে অমিতাভ মৈত্র পুরোপুরি আন্তর্জাতিক লেখালেখি করেছেন। লেখার জায়গায় ওঁর নিষ্ঠা আর অধ্যবসায়ের তুলনা হয় না। ‘টোটেম ভোজ’ নামক কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতার অহংকার হয়ে থাকবে। শুধু কি তাই? ‘সিআরপিসি ভাষ্য’? ‘ষাঁড় ও সূর্যাস্ত’? ‘পিয়ানোর সামনে বিকেল’? ‘মৃতরেখা’? উনি আজীবন একটাই কবিতাকে যেন হাজারভাবে লিখেছেন, আর সেই হাজার কবিতার প্রত্যেকটা সত্য হয়ে আছে ওঁর ইচ্ছাকৃত হ্যালুসিনেশনে। বিভ্রমকে যে এত বড়ো শক্তি বানিয়ে নেওয়া যায়, অমিতাভ মৈত্র ছাড়া আর কে পেরেছেন বিশ্বের কবিতায়? আর কিছু অদ্ভুত গদ্য, যেগুলো ওঁর কবিতারই বিকল্প রূপ, যা কেবল উনিই লিখতে পারতেন। হয়ত আর কারও কবিতা নিয়েই কথা বলার সময় দস্তয়েভস্কি বা বর্হেস বা কাহলিল জিব্রানের নাম এসে পড়ে না। উনি অনায়াসে পারতেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান নিয়ে কথা বলতে বলতেই সালভাদর দালির ছবির প্রসঙ্গে চলে যেতে। সম্পূর্ণ অ-সম্পর্কিত দুটো ব্যাপারকে মিলিয়ে দিয়ে কী যে আনন্দ পেতেন উনি! ওঁর গদ্যের মধ্যে এই খেলাটা দারুণভাবে আছে। আর আছে কোনোকিছুকে তার নির্দিষ্ট পরিচয় থেকে ছিনিয়ে আনার ম্যাজিক। একটা পেপারওয়েটকেও উনি নিছক একটা কাগজচাপা হিসাবে দেখে স্বস্তি পেতেন না, যতক্ষণ না সেটাকে একটা উল্কার টুকরো বানিয়ে দিচ্ছেন নিজের ভাষা দিয়ে।

আর আছেন অনেক কবি যাঁরা বিভিন্ন সময়ে ওঁর কবিতায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের সম্পর্কে কথা বলার সময় ওঁর চোখে দেখেছি করুণার ঘোর। তাঁরা কেউ কেউ নারী। একজন পুরুষের কাব্যভাষায় নারীদের আচ্ছন্ন হতে আমি কদাচিৎ দেখেছি। অমিতাভ মৈত্র সেটা ঘটাতে পেরেছিলেন। তাঁর ভাষার মধ্যে এক দুর্নিবার সেক্স অ্যাপিল আছে, কিছুটা আজগুবি ও হাস্যকর হলেও এই উক্তি আমি করতে চাই। আর হ্যাঁ, খুবই অপ্রিয় ভঙ্গিতে বলতে চাই, অমিতাভদা ছিলেন বাংলা কবিতায় এক সংক্রামক ব্যাধি। হ্যাঁ, ব্যাধি। অনেক কবিই ওঁর কবিতার ভাষায় আক্রান্ত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছেন। বেরোতে পারেননি। ওই ভাষাও বাংলা কবিতায় এক দুর্ঘটনা। বাংলা কবিতার জল-আলো-বাতাসের সঙ্গে তার লেনদেন একজন বিদেশির। বাংলা কবিতার ইতিহাসে আর ভূগোলে অমিতাভ মৈত্রর হয়তো কোনো আত্মীয় নেই। কিন্তু থেকে গেছে একটা আক্রান্ত কবিদের মিছিল। সৌভাগ্যক্রমে, হয়তো ওঁর খুব কাছাকাছি যাওয়ার ফলেই, আমি ভ্যাকসিনেটেড হয়ে গিয়েছিলাম।