Categories
কবিতা

দেশিক হাজরা

সময়ে অসময়ে ঝরে পড়া পাতা

গুচ্ছ

আর একটু সরে এসে বসি
তেতলা থেকে ঝুলে আছে
আহারে বাহারি লতা।

আর একটু কমে আসে দুঃখ

পরম প্রজল্পে আরও কাছাকাছি
ঘেঁষে ঘেঁষে থাকা…

বেজন্মা

ভাঙ্গা কোলাজ, অস্পষ্ট স্মৃতি ধুয়ে
নেমে আসে মা আর মেয়ে, ওদের
কোনো বাবা নেই। ব্যঙ্গ; পিছিয়ে পড়ছে
শুভ দিন। তবুও এই সময়ে মিশে আছে
বাগানের কাছাকাছি দুরন্ত বালকের
কালো চামড়ার ভিতর জেগে ওঠা অজস্র
ইচ্ছামতি… চাটো চিনির ডেলা কিংবা পা
চুপিসারে অত্যান্ত চুপি চুপি মাথা। দেখে
ফেললাম এই ভেবে সরে গিয়ে বসো। চলো
একটু দূর থেকে হেঁটে আসি। নব পুরুষের
নতুন দণ্ড মিশে থাকা রাতের অন্ধকারে।

আবারো বলি ওদের কোনো বাবা নেই
ওদের শুধুই আছে নিজস্ব শব্দ…

অবস্থান্তর

ছেলেটি হয়ে উঠলো অলৌকিক,
নখের উপরে জমে ওঠেছে সবুজ
শ্যাওলা, চামড়ায় ছড়িয়ে পড়ছে
বাদামি কালো শিরা/ উপশিরা।
অদ্ভুত রহস্যময় হয়ে পায়ে পায়ে
জোর লেগে গোল হয়ে যায়…

মাথাভর্তি চুল, হলুদ হয়ে ঝরে
পড়ে, জন্ম নেয় সবুজ নবপল্লব।
মাটি খামছে ধরে চেটো, হাতের
আঙুল ছোটো বড়ো বিভক্ত হয়ে
ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, তাতে
পাখি বসে বিষ্ঠা ছড়ায়, নিজেদের
মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে, এই মুহূর্তে
আর অক্সিজেন গ্রহণ করে না;

এরপর। ওকে ভাবতে দাও : এই তো
জানালার ভেতর দিয়ে আর একটি
জানালা খুলে দিচ্ছে। এই তো বাতাসের
আঘাতে নুয়ে পড়ে আবার সোজা হয়ে
দাঁড়িয়ে পড়ছে—

P.N.P.C

কথার ভারে পেট ফুলে ওঠে
মাথা নুয়ে যায়। ঘাড়, আলতো
ক্লেশ-এর ওজনে ঝুঁকে আসে
পেটের দিকে। অদ্ভুত রহস্যময়
ঘোড়া দৌড়। আমাদের শরীর
থেকে শরীরের যে দূরত্ব তার মধ্যে
লুকিয়ে বেঁচে থাকে শব্দ। সেইসব
শব্দ ঘিরে আমি তুমি ও আমাদের…

Categories
কবিতা

নিয়াজুল হক

বিগ-ব্যাং

আমি
বর্তমানে
আগুনের ভেতর ঘর বানিয়ে
বিশ্রাম করছি

শাসন দেখছি

তোষণ দেখছি

এবং
নাশন দেখছি

আপাতত
সব হৃৎপিণ্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখছি

বুঝতে পারছি
আমরা আর একটা বিগ-ব্যাংয়ের
প্রাক্কালে এসে হাজির হয়েছি

আবার
নতুন করে সূর্য সৃষ্টি হবে

আবার
চাঁদ হবে

আবার
মহাকাশ জন্ম নেবে

কবন্ধ কথা

একদা
একতাল লোহা
গোল চ্যাপ্টা এবং পুরু হয়ে

তৈরি হয়েছে
কোদাল গাঁইতি এবং শাবল

এরাই একদিন
তাপে চাপে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে
ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে দেখা দেবে

এরাই
তোমার চেয়ার-টেবিলের পায়া ভেঙে
তোমাকে উলটে দেবে

তোমার ধরমুণ্ডু আলাদা করবে

এরাই তোমাকে
মাথাকাটা কণিষ্কের মতো কবন্ধ বানাবে

তার আগে
তোমার লুকোনোর
গোপন আস্তানা খুঁজে নাও

হে দেবদেবী

ভূমিকম্প

নেহাত
উলটো দিক থেকে
পা পিছলে পড়ে গেছি

নেহাত
দু’পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারিনি

নেহাত
আমি পলকা হয়ে জন্মেছি

তাই কিছু বলিনি

এসবই কালক্রমে
মেঘের আড়ালে
পাহাড়-পর্বতের গুহায়
অথবা
সমুদ্রের তলদেশে
দীক্ষা নিয়ে
সামনে এসে দৈত্যের মতো দাঁড়াবে

এদের হাতেই থাকবে
ভূমিকম্প রচনার যাবতীয় কৃৎকৌশল

তুমি থরহরিকম্প হয়ে
থপাস করে মাটিতে সপাটে পড়ে যাবে

তোমার চারপাশে
তোমাকে তুলে ধরার মতো
একজনও কেউ থাকবে না

মধুসূদন

মাত্র
একটাই শর্ত

হয় মৃত্যুকে বেছে নাও

নয়তো
জীবন আমার হাতে সঁপে দাও

আমি তোমাকে
ইচ্ছেমতো
মাংসের মতো টুকরো করব
সবজির মতো কুটবো
অথবা
মাছের মতো পিস করব

তারপর
একদিন
পেস্ট করে কোপতা-কাবাব বানাব
ঘরে ঢুকব-বেরবো
আর একটা করে মুখে ফেলে দেব

তোমাকেই
কখনো ভিখিরির পাত্রে
খুচরো পয়সার মতো ছুঁড়ে দেব

কখনো
নোটের মতো ওড়াবো

আমার সাম্রাজ্যের
হর্ম্যরাজি দেখে চিনতেই পারবে না আমাকে

কখন আমি
মদনা থেকে মধুসূদন হয়ে গেছি

পুনর্জন্ম

জাতকের গল্পের মতো না হলেও
সমস্ত ব্যবহার্য দ্রব্যেরই পুনর্জন্ম আছে

প্রথমে
পা থেকে মাথা পর্যন্ত ধরুন

পায়ের জুতোমোজা চপ্পল প্যান্টশার্ট বেল্ট বুকপকেটের কলম হাতের আংটি স্টোন গলার চেন যা যা দেখছেন সবকিছুরই পুনর্জন্ম আছে

সবই ফুলে ওঠে অথবা চকচকে হয়

ব্যবহার্য যানবাহনেরও পুনর্জন্ম হয়
অর্থাৎ
বাস ট্রেন ফ্লাইট ইত্যাদি সবকিছুরই

অর্থাৎ
ঢিবি টিলা হয়
টিলা পাহাড়-পর্বত হয়

শুধুমাত্র
সব সাধারণ মানুষ এবং গরীবগুর্বোদের
কোনো পুনর্জন্ম নেই

তারা গরীবগুর্বো ও নিঃস্ব হয়ে জন্মায়
এবং গরীবগুর্বো ও নিঃস্ব হয়েই চলে যায়

তাদের জন্য একটাই অপশন
তারা লাঠিয়াল এবং আগ্নেয়াস্ত্রধারী হতে পারে শুধু

ভাঁজ

জগতের যা কিছু ভাঁজ করা থাকে না
তার সামনেই দাঁড়াতে ইচ্ছে হয়

যা কিছু ভাজ করা থাকে
তার ভাঁজ খুলতে খুলতে
নানারকম বিষাক্ত পোকামাকড়
বেরিয়ে আসতে দেখি

হিংস্র পশুদের দেখে
ছুটে পালাতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াই
আর সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে ওঠে

ভাঁজ খুলতে খুলতে
তোমাকে যে পাইনি তা কিন্তু নয়

পেয়েছি এবং হারিয়ে ফেলেছি

ভাঁজ খুলতে খুলতে
তোমাকে পাখির মতো
উড়িয়েও দিয়েছি

কখনো

Categories
কবিতা

যশোধরা রায়চৌধুরী

১ নভেম্বর রাত্রির কবিতা


কোনো কোনো রাতে হঠাৎ ফিরে আসে সেই জাগরণ
কোনো কোনো রাতে , নিদ্রাহারা , আমি পাই সেই চেতনা
ভাস্বর হয়ে ওঠার মুহূর্ত আর প্রাসাদোপম
কোনো এক মূর্খ আত্মকেন্দ্রিকতার ভেঙে পড়ার মুহূর্ত
এক সাথে মিলে মিশে যায়

ঘুমহীনতা এক অসুখ।
ভাস্বরতা এক সুখ।
আমি ত চেতন!! আহা, আমি কি চেতন।

তার দু-তিন ঘণ্টা পরে অবশ্যই
শুধু ঘুমের ওষুধ চেয়ে ক্রন্দনরোল ওঠে আমার।


কোনো কোনো রাতে ইন্দ্রিয় সব সতর্ক হয়ে ওঠে
বাতাসে বারুদের গন্ধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে
যাপনের মধ্যে সমস্ত ছেনালি স্পষ্ট হয়ে ওঠে
মিথ্যা হয়ে ওঠে প্রকট

কোনো কোনো রাতে বাতাস স্বচ্ছ হয়ে ওঠে
প্রখর হয়ে ওঠে ঘ্রাণ
পোড়া পোড়া গন্ধ পাই
জানালায় চোখ ঠেকালে দেখতে পাই বাইরে
অন্ধকারেও নড়াচড়া করছে কারা

এই তীব্র বোধ নিয়ে এখন আমি কি করি
মগজের অক্সিজেন মাত্রা ছাড়া হয়ে গেলে কোনো কোনো রাতে
আমরা জেগে উঠি এবং জেগে থাকি এবং জানতে পারি
অনেক কিছু জানতে পারি
অনেক কিছু বুঝতে পারি


কোনো কোনো রাতে
আমরা জানতে পারি
যে, জীবনের অধিকাংশ সমস্যার কোনো সমাধান নেই।
আমরা খবরের কাগজে দেখেছি
ফ্লাইওভারের তলায় কুড়িয়ে পাওয়া মানুষের মুখ
যার কোনো পরিচয় নেই
যাকে বলি একটি নম্বরযুক্ত শবদেহ

কোনো কোনো রাতে
সমস্ত ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যায় আমার কাছে
সমস্ত নশ্বরতা নম্বরযুক্ত হয়ে যায় আমার কাছে


এইসব রাতেই
আমি স্পষ্ট দেখি
আমরা কী করতে চাইছি আর কী করতে চলেছি
আমরা একটি পিছল রাস্তায় হামাগুড়ি দিচ্ছি
শিরদাঁড়ার বিনিময়মূল্যে বেঁচে আছি
আমরা খাড়াই বেয়ে উঠেছি
শুধু নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে চাইছি যাতে ফসকে না পড়ে যাই
আমরা শুধু আছি
সমাধানহীন সমস্যার সমাধানের জন্য
একরকমের অভ্যাসবশত হাত-পা নাড়তে নাড়তে

কোনো কোনো রাতে
আমি জানতে পেরেছি
পরতের পর পরত খুলে
একটার পর একটা নতুন গল্প আমরা দেখতে পাবো
প্রতিটি মিথ্যার পেছনে আছে আরও একটি মিথ্যা
সেই মিথ্যার পর্দার পেছনে আছে আরো একটি মিথ্যা।

সবার পিছনে আছে আরো একটি সত্য
স্পষ্ট জানতে যারা পারে,
তারা চিরতরে বধির ও অন্ধ হয়ে যায়
কেননা তারা জেনেছে
একটা সরু সুতোর ওপর কীভাবে রয়েছে সব
এই দুলছে মৃত্যুর দিকে
তো ওই দুলছে বেঁচে থাকার দিকে।


কোন কোন রাতে আমি নিজেই খুব স্বচ্ছ হয়ে গেছি
এ ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়িয়েছি প্রেতাত্মার মত
এবং জানতে পেরেছি যে আমার সমস্ত মিথ্যাচরণ
আসলে নিজেকে বাঁচানোর জন্য

আমি জেনেছি যে বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী দুটি পৃথিবী
চিরতরে ভাগ হয়ে গেছে
একদল রাস্তায় বসে পুরনো কাগজ নিয়ে আগুন জ্বলে এবং হাত গরম করে
তারা সভ্যতায় বিশ্বাস করে না
তারা সাম্য এবং সুবিচারে বিশ্বাসী নয়
তাদের উদ্ধার করতে হবে বলে
আরেক দল বেরিয়েছে বুলডোজার নিয়ে

তারা বন্ধ ঘরে থাকে
তাদের জানালায় নেই কোনো কাগজ আটকানো
তাদের ছিদ্রহীন ঘরে
গুনগুন করে মেশিন
তারা সকাল থেকে বিকেল
হাত সেঁকে নেয়
নিজেদের অনিবার্য ক্ষমতার আগুনে
কাঠ কুড়িয়ে আনতে হয় না তাদের
জল ভরে আনতে হয় না, অনেক দূর থেকে

তাই তারা বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাসকে বিশ্বাস করে
এবং অবিশ্বাসীদের
বিশ্বাসে ফেরাবে বলে
অন্যায়কারীদের ন্যায় ফেরাবে বলে
তারা মস্ত মস্ত সব ধজা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে
যুদ্ধজয়ের জন্য

জয়ীদের সঙ্গে
এবং বিজিতদের সঙ্গে
কী কী হয় এবং কী কী হবে
কোনো কোনো রাতে আমি স্পষ্ট দেখতে পেয়ে যাই।

সেই দিন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে

কিন্তু সেই দিন আমি সবচেয়ে বেশি জীবিত বোধ করি।