Categories
2021-Aug-Sakkhatkar

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়

“একটা সময়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কোনো এক মহাশক্তি আমার এই বিজ্ঞান-সাধক হয়ে ওঠাটাকে ঠিক সমর্থন করছে না।”

আলাপচারিতায় পার্থজিৎ চন্দ

প্রথম পর্ব

পার্থজিৎ: আমি সম্প্রতি ‘আবহমান’ পত্রিকায় আপনার কয়েকটি হাইকু পড়লাম, আজ সকালেও আপনার একটি হাইকুর সামনে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। হাইকুটি হল— ‘নদীটি/তার নিরক্ষর তীর/গুনছে ঢেউ’। হাইকু-র রহস্যময়তাকে নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়। আপনার ছোটোবেলায় বাড়িতে বিদ্যাচর্চার এক মহৎ পরিসর ছিল, আবার বাংলার কৌম-সমাজকে আপনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। কোথাও কি মনে হয় এই দুইয়ের সংমিশ্রণ আপনার বেড়ে ওঠা, চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে?

বিশ্বদেব: নিশ্চিতভাবেই সেটা করেছে, তবে আমি প্রথমেই স্পষ্টভাবে বলতে চাই, পারিবারিক সূত্রে আমার যা অর্জন তার মধ্যে আলাদা করে কোনো গৌরবের ব্যাপার নেই… ওটা সবাই নিজের মতো করে পায়। কিন্তু পারিবারিক সূত্রে আমি অর্জন করেছিলাম এক আস্তিক্যবোধ। বুঝেছিলাম জীবনে শুধুমাত্র কিছু বিচ্ছিন্ন প্রশ্ন করা ও তার উত্তর খোঁজার জন্য আমি আসিনি, সামগ্রিকতার একটা উত্তর আছে… আমাকে সেটারই সন্ধান করে যেতে হবে। যে-কবিতাটির কথা তুমি বললে, সেখানেও আমি তারই সন্ধান করতে চেয়েছি।

পার্থজিৎ: যে-আস্তিক্যবোধের কথা আপনি বললেন, আপনার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটি (গাছের মতো গল্প) পাঠ করতে করতে আমার মনে হয়েছে যত পরিণত বয়সের দিকে আপনি গেছেন তত তীব্র হয়েছে আপনার এই সন্ধান…

বিশ্বদেব: হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই, এখানে বলে নেওয়া দরকার আমি সৃষ্টি আর স্রষ্টার পৃথক অস্তিত্বে বিশ্বাস করি না… সৃষ্টি ও স্রষ্টা একই। অথচ কী আশ্চর্য দেখ, মানুষের যত বয়স বাড়ে তত যেন তার কাছে সৃষ্টি ও স্রষ্টা আলাদা হয়ে যায়, যদিও আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক উলটো হয়েছে। একটি কবিতায় আমি লিখেছিলাম এক কুম্ভকারের কথা যে একটি কলসি গড়ছে; আসলে যে গড়ছে সেও এক মাটির তৈরি কুম্ভকার। সে নিজের শরীর থেকে মাটি দিয়েই ক্রমাগত ওই কলসটা গড়ে তুলছে এবং কলসটা যখন শেষ হল তখন আর কুম্ভকার নেই; শুধু কলস রয়েছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে আমার ঠিক এমনই মনে হয়, মনে হয় পরমেশ্বর যেন তাঁর শরীর থেকে উপাদান নিয়ে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি করলেন। ‘দার্শনিক বোধ’ কথাটি উচ্চারণ করব না, শুধু বলব এটিই আমার সর্বস্ব।

 

পার্থজিৎ: জীবনের প্রথম দিকে আপনি বিজ্ঞানের অনুসন্ধিৎসু ছাত্র ছিলেন, বাড়িতে সমবয়সিদের সঙ্গে ল্যাবরেটরি বানিয়ে রীতিমতো রকেট বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। আপনার আত্মজীবনী পড়তে পড়তে বার বার মনে হয় সেই জীবন আর পরবর্তী সময়ের জীবন দর্শনের মাঝে যেন একটা প্যারাডাইম শিফট ঘটে গেছে। একে কি আপনি কোনো ‘শিফ্‌ট’ হিসাবে চিহ্নিত করবেন? না কি এটি একটি ন্যাচারাল কন্টিনিউয়েশন?

বিশ্বদেব: দেখ আমি কী বলছি সেটা খুব বড়ো কথা নয়, কারণ, আমি যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে বিশ্বজগতের অংশ বলে মনে করছি ততক্ষণ এটা তো ন্যাচারাল বটেই। তার ভেতর অন্তর্নিহিত সে-সত্য, যে-নিয়ম তাই আমাকে এখানে আসতে বাধ্য করেছে। বিজ্ঞানের আস্বাদন আমার কাছে খুব প্রিয় একটা বিষয়, এখনও দিনে যতক্ষণ আমি কবিতার কথা ভাবি তার থেকে বেশি বিজ্ঞানের কথা ভাবি। কিন্তু একটা সময়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কোনো এক মহাশক্তি আমার এই বিজ্ঞান-সাধক হয়ে ওঠাটাকে ঠিক সমর্থন করছে না। তাও আমাকে স্বীকার করতেই হবে আমি বহুদিন সেই চেষ্টা চালিয়ে গেছি। এখন বুঝতে পারি আমি তো মুক্তজীব, আমি যেভাবে কবিতা লিখি সেভাবেই যদি বিজ্ঞানের চর্চা করি তাতেই-বা ক্ষতি কী! কিছু পাবার জন্য কবিতা লিখিনি কোনোদিন, কিছু পাবার জন্য বিজ্ঞানচর্চাও করিনি।

পার্থজিৎ: আপনার একদম প্রথম দিকের একটি লেখা ‘মধ্যরাতের হল্ট’, আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি কবিতা। যতবার কবিতাটি পড়ি ততবার এক রহস্যজনক ডুয়ালিটির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ি আমি। এই কবিতাটির একদম প্রথম দিকে আপনি লিখলেন, ‘ভুল করে নেমে গেছি, এখানে এখন খুব রাত’। আবার শেষের দিকে লিখলেন, ‘তোদের ভুলেই/আমি এই মাঝরাতে নেমে গেছি অমিতাভ’। রহস্যের উন্মোচন করতে পারি না, কিন্তু মনে হয় আপনি খুব গূঢ় কোনো ইঙ্গিত রেখে গেছেন এখানে…

বিশ্বদেব: অমিতাভ-র কথা এল বলে একটা কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন, এই কথাটা কখনো কোথাও বলা হয়নি। অমিতাভ চক্রবর্তী আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, অসামান্য কবি ছিলেন। এত বড়ো কবি ছিলেন… কিন্তু তিনি পরবর্তীকালে আইএএস হয়ে বড়ো পদে চাকরি করতে চলে যান। ব্যস্ততার জন্য আর কবিতার ততটা চর্চা করেননি পরের দিকে। অকালে চলেও যান অমিতাভ; সেই অমিতাভ-র কথাই এই কবিতায় বলেছিলাম আমি। একদম প্রথম দিকে, যখন আমি তীব্রভাবে বিজ্ঞানচর্চায় মেতে তখন অমিতাভ কেমিস্ট্রি অনার্স ছেড়ে পলিটিকাল সায়েন্সে অনার্স নিয়ে পড়া শুরু করল। কবিতা লেখার ব্যাপারে অমিতাভ-র কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। কবিতায় তার কথা উল্লেখ করলেও কবিতার শরীরে এসে সে কিন্তু আর সেই ‘অমিতাভ’ থাকেনি। সে-সময়ে আমার বার বার মনে হত, কোথাও একটা ভীষণ ভুল হয়ে যাচ্ছে, নিজেকে প্রচণ্ড বিপন্ন মনে হত। মনে হত যে-কোনো মুহূর্তে ওই অন্ধকার একটা স্টেশনে আমি নেমে যেতে পারি। অথবা অন্য সবাই আমাকে ভুল করে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিচ্ছে… খুব স্পষ্ট করে বিষয়টা আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না হয়তো। এ-প্রসঙ্গে আর একটা কথাও বলতে হয়, ছেলেবেলায় আমরা কলকাতা থেকে লাভপুর যেতাম… বাবার একটা বিলাসিতা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে চাকরি করার কারণে সারাদিন খুব ব্যস্ত থাকতেন বাবা… পুজোর সময়ে কয়েকদিনের জন্য লাভপুর যাবার আনন্দ। কলকাতা থেকে মাত্র একশো কুড়ি মাইল রাস্তা; কিন্তু বাবা বরাবর আমাদের চার ভাইবোন আর মাকে নিয়ে লাভপুর যেতেন একটি ফার্স্ট ক্লাস কামরা রিজার্ভ করে। সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। লাভপুর যাওয়া আমার কাছে জীবনের শ্রেষ্ঠতম অনুভবগুলির মধ্যে একটি, এটার জন্য সারা বছর দিন গুনতাম। হয়তো দশ দিন থাকতাম। আমি ট্রেনে সারারাত জেগে থাকতাম, মধ্যরাতে কোনো নাম-না-জানা স্টেশনে গিয়ে দাঁড়াত ট্রেন। এখন মনে মনে ভাবি ভাগ্যিস গয়া প্যাসেঞ্জার ছিল… তাই ওইটুকু রাস্তা যেতে অত দীর্ঘ সময় লেগে যেত। সেখান থেকেই ওই অনুভূতিটি আমার মধ্যে কাজ করতে শুরু করে… কোনোদিন হয়তো আমাকে মাঝরাতের কোনো হল্ট-স্টেশনে নেমে যেতে হবে। আজ আর একটা কথাও বলা দরকার, আমার কবিতা নিয়ে অনেকেই প্রশংসা করেন তাই কবিদের কাছেই এ-কথাটা মন খুলে বলা যায়… আমাকে ‘অফিসিয়ালি’ বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র থেকে সরে না-আসতে হলে আমি হয়তো একদিন বিজ্ঞানীই হতাম। যে-প্রশংসা কবিতার জন্য পেয়েছি তা হয়তো বিজ্ঞানের জন্য পেতাম। এই বিপন্নতার থেকেই হয়তো ‘তোদের ভুলে’ কথাটির উঠে আসা… আমাদের ঘিরে থাকা সমাজ মানুষ ইত্যাদি আমাকে যে বিপন্নতা উপহার দিয়েছে তার থেকে। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষকে খুব কোমল-নরম স্বভাবের কোনো জীব বলেও মনে করতাম না আমি। আমি মানুষের মধ্যে ভায়োলেন্স খুব বেশি দেখতাম আর ভেতরে ভেতরে সংকুচিত হয়ে পড়তাম। ভয়ে ভয়েই থাকতাম…

পার্থজিৎ: যে-লাভপুরের কথা বললেন আপনি, তা যেন বাংলার কৌমসমাজের ছায়া হয়ে মিশে গেছে আপনার কবিতায়। একটি কবিতার কথা এই মুহূর্তেই মনে পড়েছে ‘বিনোদ নট্টের ঢোল’; কবিতাটিতে যেন নটরাজের তাণ্ডব নৃত্য শুরু হয়েছে।

বিশ্বদেব: আমার অনুভব যে তোমাকে ছুঁয়েছে এটা খুব ভালো লাগল… আহা, এ যে কী আনন্দ…

পার্থজিৎ: আপনি কি সেই বীরভূমকে এখনও বুকের মধ্যে নিয়ে ঘোরেন?

বিশ্বদেব: একদম, একদমই তাই…আমাকে যদি অধিকার দেওয়া হত আমি বীরভূমকেই ভূস্বর্গ বলতাম। বীরভূমের লাভপুর গ্রাম হাজার বছরের পুরানো গ্রাম… তার ভেতর যে কত রহস্যময়তা। বাবার মৃত্যুর পর আমরা মামারবাড়ি, অর্থাৎ, তারাশঙ্করবাবুর বাড়িতে থাকতে শুরু করি। মা গল্প বলতেন, একটা গল্প থেকে আর একটা গল্প… গ্রামের একটা কথা থেকে আর একটা কথা। আমার একটা কবিতায় আছে ‘ও খোকার মা/ঝুমঝুমি লিবি?’… আসলে ওই পঙতিটিও আমার নয়। পঙতিটি আমার বলেছিলেন মা… সে-সময়ে বীরভূমে বাজিকর মেয়েরা আসত। তারা দুপুরবেলায় মাটির ঝুমঝুমি বিক্রি করতে আসত গ্রামে। আমি এখনও ভাবি কেন তারা দুপুরবেলাতেই আসত… নিজঝুম জৈষ্ঠ্যের দুপুর… বাজিকর রমণীরা দুপুরে ডেকে উঠত, ‘ও খোকার মা ঝুমঝুমি লিবি?’। বাড়ির ছেলেমেয়েরা লুকিয়ে পড়ত, কারণ, তাদের বাজিকর-রা ছেলেধরা বলে ভয় দেখানো হত। মনে রাখতে হবে একটা সমাজ, একটা গ্রাম শুধুমাত্র কয়েকটা বাড়ি বা মানুষ মিলে গড়ে তোলে না, সেখানে অনেক সত্য, অনেক মিথ্যা, অনেক গল্প লুকিয়ে থাকে… এটাকে না-বুঝলে একটা সমাজকে বোঝা যায় না। এখন একটা জিনিস দেখি, লাভপুরেও দেখি… সব গ্রামকে কেন শহর হয়ে যেতে হবে আমি বুঝি না। আর দ্বিতীয় দুঃখ হল সমস্ত সংস্কারের মধ্যে জাগতিক সত্য আর মিথ্যাকে খুঁজতে আমরা বড্ড বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমাদের এখন একমাত্র জানতে চাওয়া কোনো বিষয় ‘সায়েন্টিফিক্যালি ট্রু’ কি না… কিন্তু সায়েন্টিফিক ট্রুথই যে একমাত্র সত্য এটাও তো প্রমাণিত নয়। আনফরচুনেটলি আমাদের এই গতে-বাঁধা পথেই শিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। কী আশ্চর্য ‘এটা বিজ্ঞানের যুগ’ এমনটা শুনি আজকাল; কিন্তু ভেবে দেখ এক সময়ে দর্শনের খুব উন্নতি হয়েছে, সাহিত্যের উন্নতি হয়েছে, গণিতের উন্নতি হয়েছে। সেগুলিকে কি আমরা দর্শনের যুগ, সাহিত্যের যুগ, গণিতের যুগ ইত্যাদি বলি? আসলে ‘এটা বিজ্ঞানের যুগ’ বলে গ্রাম থেকে গ্রামে কৃষকের বাড়ি থেকে বাড়িতে সাংঘাতিক এক ভ্রম ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পার্থজিৎ: সেভাবে দেখলে হোমো সেপিয়ান্সের পাথর থেকে ধাতুতে যাওয়া, আগুনের আবিষ্কার… সবটাই তো বিজ্ঞানের যুগ…

বিশ্বদেব: বটেই তো… সত্যি কথা বলতে কি মা যে শিশুকে দুধ খাওয়ান সেটা কি তিনি বিজ্ঞান জানেন বলে করেন? তা তো নয়… প্রকৃতির ভেতর প্রতিটি ঘটনা একটা কার্যকারণ সূত্রে আবদ্ধ হয়ে আছে এটা একটা বিশ্বাস। কিন্তু আমি এখনও কী করে খুব জোর দিয়ে বলব যে, এই কার্যকারণ সূত্রে আবদ্ধ হয়ে থাকাটা এম্পিরিকাল ট্রুথ! কার্যকারণ সম্পর্ক থাকতেই হবে এটা কি একেবারে লজিকাল ট্রুথ? আমি জানি না… তবে আমার মনে হয় এ-সব প্রশ্নের উত্তর কোনোদিন পাওয়া যাবে না। তবে আমি নিশ্চিতভাবে জানি, বুঝতে পারি স্টিফেন হকিং যাকে থিয়োরি অফ এভ্রিথিং বলেছেন তা আসলে চিন্ময় হতে বাধ্য।

পার্থজিৎ: সম্প্রতি ধ্যানবিন্দু থেকে প্রকাশিত আপনার গদ্যের বইটিতে (বিজ্ঞান ও অন্তিমতত্ত্ব) এই কথাটিই বার বার ফিরে এসেছে… এই কথায় আমরা নিশ্চয় পরে আবার ফিরে আসব, শুধু এখন অন্য একটি কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে। আমাদের সভ্যতার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এই যে-মিথ রূপকথা ছড়া… এগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলে। অনেক সময়েই আমরা বুঝে উঠতে পারি না। কিন্তু কবি পারেন, যেমন আপনি ‘নাপিতবাড়ি’ নামে একটি কবিতায় সরাসরি ছড়ার ছন্দ ব্যবহার করেছিলেন। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম, মনে হয়েছিল ছদ্মআধুনিকতা ও অনুচ্চ দর্শন থেকে আমাদের যে-দেখা তাকে আপনি পরাজিত করতে করতে চলেছেন… আর একটা কথাও মনে হয়, আমাদের শিল্প-সাহিত্যে কলোনিয়াল ছায়া দীর্ঘ হয়ে উঠল, ওর‌্যাল ট্র্যাডিশনগুলি লুপ্ত হয়ে গেল। আমাদের ইনডিজিনাস খোঁজগুলি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেল…

বিশ্বদেব: কথাটা তুমি চমৎকারভাবে বলেই দিলে, ইনডিজিনাস খোঁজ…আসলে খোঁজটা তো নিজেকেই…নিজেকেই খুঁজে চলা। মানুষের জীবনকে বিষিয়ে দিচ্ছে ‘সংকট’; সে কিছুতেই পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে নিজেকে কনসিসটেন্ট মনে করছে না। এর কারণ, আমরা যে-জগৎটাকে দেখি সে-জগৎটাকে আসলে অন্যরকমভাবে দেখতে চাই। প্রথমেই জগৎ সম্পর্কে এই চাওয়াটা থেকে বেরোতে হবে। আমার কলকাতার টালাপার্কের কাছে বাসা থেকে দেখা একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে… এক ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোক… মাঝখানে একটি তিন-চার বছর বয়সের শিশু… শিশুটি মা-বাবার হাত ধরে রয়েছে… গাড়ি যাচ্ছে। শিশুটির কিন্তু কোনো দিকে খেয়াল নেই, সে চারদিকের গাছপালা ঘরবাড়ি গাড়িঘোড়া দেখছে। মা বাবার হাত ধরে সে নির্বিকার রাস্তাও পেরিয়ে গেল… এক অদ্ভুত অনুভূতির সামনে দাঁড়ালাম আমি। বুঝতে পারলাম একেই বলে নিশ্চিন্ততা, একেই বলে বিশ্বাস। আমাদের এই জেনারেশন হাত ধরতে শিখলাম না… যা পরম সত্য তাকে শুধুমাত্র আনস্মার্ট বলে বর্জন করলাম।

পার্থজিৎ: যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে, এই পরম সত্যটি ‘আনস্মার্ট’… সেটিকে আনস্মার্ট প্রতিপন্ন করবার জন্য যে-খোঁজের প্রয়োজন আমরা সেটাও করলাম না…

বিশ্বদেব: এটা তো সত্যিই তাই, আমরা কোনো খোঁজ করলাম না। আরও একটা বিষয়, আমি বিশ্বাস করি একজন মানুষের মস্তিষ্কের নানা স্তরে তার অস্তিত্ব থাকে। যেমন আমি এই মুহূর্তে যেভাবে কথা বলছি পাঁচ মিনিট আগেও সে-স্তরে ছিলাম না। এর কোনোটির মধ্যেই কিন্তু কোনো হিপোক্রেসি নেই… প্রত্যকেটা স্তরেই মানুষ থাকতে পারে। থাকতে হয় তাকে। উচ্চতম স্তরের সন্ধান অধিকাংশ মানুষ পায় না। আমাদের অস্তিত্বেরও একটা ট্রান্সফর্মেশন হয়, তার খোঁজ না করেই আমরা শুধু বর্জন করে দিলাম এটা হাস্যকর। অনেকেই নিজেদের বিজ্ঞান-মনস্ক ইত্যাদি বলে জাহির করেন, কিন্তু তারা যে খুব ভালো বিজ্ঞান বোঝেন বা জানেন এমনও নয়।

পার্থজিৎ: সমস্যাটা সেখানে আরও বেশি…

বিশ্বদেব: আমার মতে এগুলো সব কন্টিনিউয়াস… একজন রাখাল যদি গোরু চরানোতে খুব দক্ষ হয়ে ওঠেন তবে তিনি ক্রমশ ক্রমশ বংশী ধরবেন… আমার এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্বের যে-কোনো বিন্দুতে মানুষ ব্রহ্মদর্শন করতে পারে। যে-কোনো বিষয়ের ভেতরে সত্য অনুসরণের পথ পেতে পারে।

পার্থজিৎ: আপনার একটি কবিতা ‘দরজা’, সেখানে আপনি একটি পোকার কথা বলছেন… পোকাটি চাতাল পেরিয়ে চলেছে। পোকাটি কিছুটা দিশাহারা। কবিতাটিতে দু-বার একটি লাইন ব্যবহৃত হয়েছে… ‘প্রতিক্ষার প্রান্তে খোলে আলকাতরামাখানো কপাট’… এখানে এসে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। ব্যক্তি কি তার চৈতন্য দিয়ে একদিন খুলে ফেলতে সমর্থ হয় সে-দরজা? না কি তার চেতন-অবচেতনের বাইরে রয়েছে এক উন্মোচন প্রক্রিয়া? একটা প্রতিক্ষার অন্তে খুলে যায় সে-দরজা…

বিশ্বদেব: তুমি একটু ফাঁদে ফেলে দিয়েছ আমাকে… তুমি যখন চৈতন্য বলছ তখন আমার উত্তর দেবার কিছু নেই। কিন্তু যদি বলো জীব কি খুলে ফেলতে পারে সেই দরজা তবে আমি বলব যে, জীব পারে না সেটা। যেমন ধরো, এই মুহূর্তে আমি যে তোমার সঙ্গে কথা বলছি এর সবটা কি আমি নিজে আয়োজন করেছি? আমি নিজে কিছুটা করেছি, তুমি মনে করতে পারো তুমি আয়োজন করেছ… এবার ধরা যাক, আমার যদি জন্মই না-হত তা হলে কি আমাদের এই কথাবার্তা সম্ভব হত? এই যে অপূর্ব এক ‘কারুকাজ’, বস্ত্রের উপর হাজারও নকশা… বুটি… সব যেন এক সূত্রে গাঁথা হয়ে আছে। ভালো করে ভাবলে বোঝা যাবে, কোনো নকশা বা বুটিরই আলাদা কোনো স্বাধীনতা নেই। কোন বিন্দুতে কে থাকবে তা নির্ধারিত হয়েছে… তাকে বিশ্বচৈতন্য, রস, ঈশ্বর যে-কোনো নামেই ডাকতে পারো। কবিতার ওই গুবরে পোকাটাও নিজে খোলেনি আসলে… আরও একটা কথা, এখানে আলকাতরা-মাখানো কপাটের মধ্যে মৃত্যুর ঈঙ্গিতও রয়েছে কিন্তু। এই কপাট আমার দেখা। গ্রামের দিকে দরজায় সবসময় আলকাতরা মাখানো হত, আমাদের বাড়িতে যদিও আলকাতরা মাখানো দরজা ছিল না; সেটা আমি দেখতাম অজন্তাপিসিদের বাড়ি… আমাদের বাড়ির পিছনেই সেই বাড়ি। ভীষণ নির্জন, দোতলায় টানা বারান্দা আর কাঠের রেলিং… সব মিলিয়ে খুব ভয় লাগত, এ-সব মিলেমিশেই হয়তো কবিতায় এসেছে ওই দরজার কথা…

পার্থজিৎ: আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আর একটা বিষয় নিয়েও কথা উঁকি দিচ্ছে মনে… এ-সময়ের বেশ কিছু দার্শনিক, ফিজিসিস্ট বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে অ্যনথ্রোপিক ডিজাইন রয়েছে… এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সেলফ-ডিজাইন্ড এভাবেই, যেন একটা সময়ে উন্নত কনসাসনেস-সম্পন্ন জীবের আগমন ঘটবে। এটা খুবই জানা কথা, ওঁরাও বলছেন বিগ-ব্যাং-এর মুহূর্তে যদি এক সেকেন্ডের এক মিলিয়নভাগের এক ভাগ এদিক ওদিক হত তো ব্রহ্মাণ্ডের চেহার এমন হত না। আপনার কি কোথাও মনে হয় যে, ব্রহ্মাণ্ড আসলে সেলফ-ডিজাইনড একটা বিষয় আর যাক একটা অংশ আমরা?

বিশ্বদেব: তুমি যে-বইটার কথা বললে, ধ্যানবিন্দু থেকে প্রকাশিত সেখানে এ নিয়ে অনেক কথাই লিখেছি। সব থেকে আশ্চর্য, একজন মানুষকে সারাজীবনে ফাইনাইট নাম্বার অফ ফ্যাক্টস-ই দেখে যেতে হয়। ফলে অসীমকে অবজার্ভ করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। সেটা কোনোদিন হবেও না। ফলত যে-বিষয়টা দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে দুটো বিন্দুকে আমি যে-সূত্র দিয়ে গাঁথব তা কখনো সসীম হবে না; সেটা অসীমে গিয়ে ঠেকবে। যেমন দুটো বিন্দুকে আমি সরলরেখা দিয়ে যুক্ত করতে পারি, বৃত্ত দিয়ে যুক্ত করতে পারি, উপবৃত্ত দিয়ে যুক্ত করতে পারি… আসলে অসংখ্যভাবে যুক্ত করতে পারি। ইনফ্যাক্ট সেটা অনন্ত সংখ্যক উপায় হবে। যুক্ত করার প্রতিটি পদ্ধতির যদি একটা করে সমীকরণ থাকে তা হলে দুটি রেখাকে যুক্ত করার সমীকরণ অসংখ্য। প্রতিটিই এক-একটা তত্ত্ব। ফলে এই বিশ্বজগৎকে আমরা যতটাই দেখি না কেন, অনন্ত সংখ্যক তত্ত্ব পাব আমরা। হকিং মহান বিজ্ঞানী, কিন্তু তিনি যাকে থিয়োরি অফ এভ্রিথিং বলছেন আমি তাকে অন্তিমতত্ত্ব বলতেই ভালোবাসি… সেই অন্তিমতত্ত্ব হচ্ছে চৈতন্যময়। সে-অন্তিমতত্ত্ব আসলে স্বাধীন, তাকে কেউ গভর্ন করে না…করতে পারে না। তার কোনো আচরণের সম্পর্কেই ‘কেন’ এই প্রশ্নটাই চলে না। তার ইচ্ছা… সাঁই আমার কখন হাসে কখন কাঁদে কে জানে…

পার্থজিৎ: আপনি ‘কূট’ নামে একটি কবিতায় লিখছেন, ‘উপরে নিকষ গাব আন্দোলিত আকাশ ত্রিকাল/অতল তালের শব্দ। আগে ঢিপ, কিংবা আগে তাল?’। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমাদের এই বাংলারই এক কবি তো গূঢ় প্রশ্ন করেছিলেন, যখন ব্রহ্মাণ্ড ছিল না তখন মা মুণ্ডমালা কোথা থেকে পেলেন… এখন প্রশ্ন হল, সেই কবি তো কোনো প্রমাণিত সত্যের উপর দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন করেননি। তা হলে কি এক বোধকে আশ্রয় করে এই রহস্যের ভেতর প্রবেশ করা সম্ভব?

বিশ্বদেব: আহা, সাধক কমলাকান্ত…আসলে বোধ ছাড়া তো আর কিছুই নেই। এ-জগৎ কীরকম কেউ প্রশ্ন করলে আমি কী বলব? যেমন দেখি সেটা বলব? না, যেটা দেখতে পাই না সেটা বলব? যে-অবজেক্টিভ রিয়েলিটির কথা বলা হয় এখন কোয়ান্টাম মেকানিক্স তো তার কাছাকাছিই। আমি আমার ‘বিজ্ঞান ও অন্তিমতত্ত্ব’-এ এই কথাই বলেছি বার বার। হাইসেনবার্গের যে-প্রিন্সিপাল অফ ইনডিটারমিনেসি সেটা আমাদের প্রথম আভাস দিল যে, তুমি বাবা যেই হও এ-জগতের কিছুকেই তুমি নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না… একটা অজ্ঞানতার জায়গা আছে। কোনো কিছু কেন ঘটবে সেটা বলতে পারি না… যা খুশি ঘটতে পারে… কিন্তু সেটা কার ইচ্ছায় ঘটে? বিজ্ঞান এখানে এসে হাত তুলে দিচ্ছে, বলছে আমি ঠিক বলতে পারব না ঠিক কী ঘটে। এমন কথাও অনেকে বলেন যে, ওই অনিশ্চয়তা আসলে চিহ্নিত করে বিশ্বজগৎ সম্পর্কে যে-প্রশ্নটা আমরা করে চলেছি সেটাই ভুল। আমরা এই জগৎকে এই মুহূর্তে যেভাবে দেখছি পরমুহূর্তে ঠিক কীভাবে দেখব সে-সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।

পার্থজিৎ: ‘আবহমান’-এ প্রকাশিত হাইকু-র কাছে ফিরে আসি একটু… জেন দর্শন, বার বার বলা হয় sitting quietly and doing nothing বা Spring comes and grass grows by itself… এই যে আপনাআপনি গজিয়ে ওঠা ঘাস…এর মধ্যে যে ‘তাঁর’ ইচ্ছারই প্রকাশ… সেদিকেই কি আপনি ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন?

বিশ্বদেব: একদম সেটাই… আর একটা কথা বলতে চাই, এ-কথাটা কার কেমন লাগবে জানি না কিন্তু এখন আমি একটা ঘোরের মধ্যে থাকি… আমাকে কে কী মনে করবেন জানি না, কিন্তু আমি বুঝতে পারি মানুষের এই অবস্থায় এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা, এক পরম-আনন্দের অবস্থা থাকে… এখন আমার গুরুদেব ওই শিশুটি যে বাবা-মায়ের হাত ধরে নিশ্চিন্তে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছিল। আমি ক্রমশ সেই শিশু হওয়ার দিকে এগোচ্ছি। এখন আমি বুঝতে পারি কিছু করার জন্য আমার ছটফট করার কোনো কারণ নেই, কিছু না-করার জন্যও আমার ছটফট করার কারণ নেই… শুধু যেটা প্রয়োজন তা হল সমর্পণ। জলে পড়ে গেলে ভেসে যাওয়া যেতে পারে, স্রোতের অনুকূলে বা প্রতিকূলে সাঁতার কেটে যাওয়া যেতে পারে… আমি শুধু বলছি, আমি গাছের পাতার মতো, টুপ করে খসে পড়ব। তারপর নদী তার ইচ্ছায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে… ওই খসে পড়াটা আমার হয়ে গেছে। আমার অবাক লাগে আধুনিক মানুষ গর্বের সঙ্গে ওই অসম্পূর্ণ তত্ত্বের (থিয়োরি অফ এভ্রিথিং) কথা বলে, কিন্তু একটি সম্পূর্ণ তত্ত্ব ‘বেদান্ত’… তার দিকে ঘেঁষে না। মানুষ এখন অসম্ভব ব্যাকুল হয়ে যেটা খুঁজছে সেটা আনন্দ নয়, বিজ্ঞানের চাবি। এই জায়গাটে আমার খুব আপত্তি।

পার্থজিৎ: আমার মনে হয় মানুষ আসলে খুব সরলরৈখিক শর্টকাট একটা পথ খুঁজছে, সে মনে করছে সেই পথটিই তাকে (হয়তো) অনন্তের সন্ধান দেবে… সব রহস্যের উন্মোচন ঘটবে সে-পথ ধরেই। আপনি বললেন আপনি প্রায় দ্বিতীয় শৈশবে পৌঁছে গেছেন। প্রথম দিকেই আপনি বলেছিলেন, কোনো কিছু পাবার জন্য আপনি কবিতা লেখেননি। কিন্তু অস্বীকার করার তো উপায় নেই আমাদের সাহিত্যের কলকাতাকেন্দ্রিকতা আছে, পুরস্কারের রাজনীতি আছে, ক্ষমতার আস্ফালন আছে। যদিও এ-সবের সঙ্গে একজন কমলাকান্ত একজন রবীন্দ্রনাথ একজন জীবনানন্দের কোনো লেনাদেনা নেই। ‘মানচিত্র ‘৯৭’ নামে আপনার একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে যেখানে আপনি খুব ধীরস্থির অভিজাত ভঙ্গিতে এই নশ্বরতাকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম থেকেই এ-সমস্ত পকেটসগুলো থেকে নিজের আত্মাকে নিজের সত্তাকে রক্ষা করবার কবজকুণ্ডল কী ছিল আপনার?

বিশ্বদেব: আমি স্পষ্টভাবে বলি— আমি নিজেকে রক্ষা করিনি, আমাকে ঈশ্বর রক্ষা করেছেন। আরও স্পষ্টভাবে বলি— কবিতা লেখার যে-আনন্দ, সে-আনন্দ যে একবার পাবে সে এইসব কোলাহলের মধ্যে যাবে না। আমি কবিতার ভেতরে থেকে, চিন্তার ভেতর থেকে যে-আনন্দ পাই কোলাহলের ভেতরে গিয়ে একশোটা পুরস্কার পেলেও সে-আনন্দ আমি পাব না। তুমি কি সেইসব মানুষের সমাজে যাতায়াত করবে যাদের ভাষার একবর্ণও তুমি বোঝো না? আমি এদের ভাষা বুঝি না; আমি এত আধুনিক নই। আমি সেকেলে মানুষ, আমার মনে হয়েছে সেকালের মানুষের মধ্যে এতটা ভেজাল ঢোকেনি। জানো, আমি একসময় আকাশবাণীতে চাকরি করতাম, আমাদের বলা হত এই যে এয়ারকন্ডিশন ব্যবস্থা সব কিন্তু যন্ত্রের জন্য, আপনাদের জন্য কিছুই না। রাস্তায় ট্রাক যাচ্ছে, ট্রাকের নিজস্ব কোনো চিন্তা নেই… কিন্তু তার স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকা ড্রাইভারের চিন্তার অন্ত নেই। রাস্তায় হেঁটেচলে বেড়ানো মানুষের চিন্তার অন্ত নেই…মানুষ এই অবস্থাটা তৈরি করছে আর তার নাম দিচ্ছে আধুনিকতা। আমার ‘অনন্তমূলের খোঁজে’ বইটিতে একটি ছবি আছে, বনের মধ্যে বৃষ্টি পড়ছে আর একটা ছোট্ট কুটির… একলা বসে আছি। আমার ইহজাগতিক সুখের ওটাই চরমসীমা। আমার কোনও গতি নেই, দুর্গতিও নেই… কোনো কিছু ‘করার’ বাসনাও নেই, ‘না-করার’ বাসনাও নেই। অনেকে এ-সব শুনে আঁতকে উঠে বলতে পারেন তা হলে তো সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে… আমি শুধু বলব সভ্যতার নামে আমরা যা গড়ে তুলেছি তাকে ঠিক সভ্যতা বলা যায় না। প্রকৃত সভ্যতা হলে সেখানে শান্তি বিরাজ করত, কারণ, শান্তির থেকে মূল্যবান তো আর কিছুই নেই।

পার্থজিৎ: আপনি যখন ‘ঢেঁকিঘর’ লিখছেন তখন সেখানে সৃষ্টি প্রলয় মহাকাল মহাকালী ইত্যাদি বিষয় বার বার ছায়া ফেলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তন্ত্রের এক জগৎ আপনার ভেতর ডালপালা মেলছে। আপনি কি সে-সময় তন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন?

বিশ্বদেব: এগুলো বীজ-রূপে থাকতে পারে কিছু, কিন্তু আমি নিজে পড়ার থেকে ভাবতে বেশি ভালোবাসি। যাঁরা তন্ত্র-সংক্রান্ত বই লিখেছেন, চর্চা করেছেন তাঁরা প্রকরণের ভেতর দিয়ে গেছেন। আমি এ-সবের মধ্য দিয়ে যাইনি। আমি একটা সাধনাই বুঝি— প্রতি মুহূর্তে নিজেকে অতিক্রম করে আরও ভালো মানুষ হয়ে ওঠা। অন্য কারোকে অতিক্রম করা অন্যায়, সে-ভাবনা মনে আনতে নেই। ঈশ্বর মানুষের কাছে একটাই কামনা করেন— মানুষ প্রকৃত মানুষ হবে। ঈশ্বর কুকুরের কাছে কামনা করেন— কুকুর কুকুর হবে… সাপ সাপ হবে… হাতি হাতি হবে… গাছ গাছ হবে… এই তাঁর একমাত্র ইচ্ছা। তাই-ই হয়ে আছে; একমাত্র মানুষই অন্য কিছু হবার চেষ্টা করে।

পার্থজিৎ: যে-আনন্দের কথা বললেন, শিল্প তো সেই আনন্দেরই প্রকাশ। একজন শিল্পী যখন সেই আনন্দিত স্তরে পৌঁছান তখন কি তাঁর কাছে ফর্মের সব কারিকুরি ফিকে হয়ে যেতে শুরু করে? কনটেন্ট-ই কি তখন মুখ্য হয়ে ওঠে তাঁর কাছে?

বিশ্বদেব: আমার নিজের ধারণা, ফর্ম আসলে আপনি আসে। কবিতার শরীর, আত্মা এ-সবকে আমি পৃথক করে দেখতে পারি না। কবিতা কীভাবে আসে সে এক গূঢ় রহস্য। কার্ল পপার যেমন বলেছিলেন, একটা সায়েন্টিফিক থিয়োরির মূলে ধারণার আদি বীজটি একজন বিজ্ঞানীর মনে কীভাবে অঙ্কুরিত হয়, সেটা তাঁর কাছে রহস্য। আমাদের চৈতন্যের গুহাগাত্রে খোদিত রয়েছ অপরূপ যে-সব কারুকার্য, আমরা তাকে দেখছি… তারপর তাকে পুনর্লিখন করছি। কবি, বিজ্ঞানী, শিল্পী… সকলেই তাই করে থাকেন, তাছাড়া আর কিছুই করতে পারেন না। দেখ, শিশু জন্মানোর আগে পর্যন্ত বাবা-মা জানেনও না যে, তার গায়ের রং কেমন হবে, তাকে দেখতে কেমন হবে, তার হাত-পা কেমন হবে… অথচ শিশু জন্মায়। কবিতাও একটি নিটোল ভাবকে অনুসরণ করে। এমনই এক রহস্যময় পদ্ধতিতে লিখিত হয়… কবির ভূমিকা সেখানে আমেরিকা আবিষ্কারে কলম্বাসের ভূমিকার থেকে বেশি বা কম কিছু নয়। ‘আমার’ থেকে যেমন আমার শরীরকে আলাদা করা যাবে না, আমি কবিতার ক্ষেত্রেও সে-কথা বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি কবিতা জন্ম নেয় তার ফর্মকে নিয়েই।

ক্রমশ…

Categories
2021-Aug-Story

সরিতা আহমেদ

আশ্রয়

অফিসে ঢোকার মুখেই মেয়েটাকে চোখে পড়ল ইন্সপেক্টর মাইতির। কব্জি উলটে দেখলেন— দুপুর আড়াইটা। থানা থেকে এগারোটায় বেরোনোর সময়ই মেয়েটিকে ওভাবেই বসে থাকতে দেখেছিলেন। এত বেলা হল, এখনও সে ওই বেঞ্চটায় ঠাঁই বসে আছে! ওড়নার খুঁট আঙুলে পেঁচিয়ে ইতিউতি ঠান্ডা চোখে তাকাচ্ছে, যেন তাড়া নেই কোনো। এক ঝলক দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি অভুক্ত, কিন্তু চোখদুটোর আগুন যেন নেভেনি এখনও।

কনস্টেবল বড়ুয়ার কাছে জানা গেল, মেয়েটি ‘সারেন্ডার’ করতে এসেছে।

সারেন্ডার!

— কী কেস?

“স্যার, কেসটাই তো ভালো বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটা একটা মোবাইল জমা দিয়েছে ঐ টেবিলে। বলছে, সব নাকি মোবাইলে বলা আছে।”

— ইন্টারেস্টিং। আর কিছু বলেনি?

“না… মানে হ্যাঁ, ওই তো বলছে সারেন্ডার করতে এসেছে। আসলে সকাল থেকে আপনারাও ছিলেন না। বড়োবাবুও গেছেন মিটিঙে। আমি আগের কেসটা নিয়ে একটু ব্যস্ত… মানে, সেই জন্যই… তবে আমি বলেছিলাম, ‘মোবাইলটা রেখে যা। স্যার এলে ওনাকে দিয়ে দেব।’ কিন্তু ও বলছে এখানেই বসে থাকবে যতক্ষণ না ঐ রেকর্ডিং শোনা হচ্ছে। বুঝুন, কোনো মানে হয় স্যার!”

— হুম্‌, বুঝলাম। ঠিক আছে আমি মোবাইলটা দেখছি। ততক্ষণ মেয়েটিকে কিছু খেতে দিন। নিজে থেকে মুখ না খুললে বেশি জোড়াজুড়ি করা ঠিক হবে না। আগে দেখি রেকর্ডিংটা কী, তারপর বাকি ব্যবস্থা হবে।

“আমি প্রতিমা মাঝি। এবারে উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছি। আমি সারেন্ডার করতে চাই, কারণ, কাকাদের বাড়ির সবার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছি। চমকে গেলেন! সব বলছি। আচ্ছা, সরকার থেকে নাকি কয়েদি পড়ুয়াদের সাহায্য করে। সত্যি? আমার কেসটা একটু দেখবেন, স্যার।

হাতিপোতা গ্রামে আমার বাবা ‘একশো দিন’ শ্রমিক ছিল, আর মা দু-বাড়ি রান্নার কাজ করত। আমিও মাঝে মাঝে খেটে দিতাম। দাদা নাইনে উঠে স্কুল ছেড়ে বাবার সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। অভাব থাকলেও বাবা কোনোদিন চায়নি আমাদের স্কুলছুট করতে। তাই দাদা ড্রপ আউট হতেই আমাকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন দ্বিগুণ বেড়ে গেছিল। বলত, “বেটি, বড়ো হয়ে তুই অফিসার হবি, কেমন!” দিব্যি চলছিল টানাটানির সংসার। কে জানে কবে মা ধীরে ধীরে বদলে গেল। আমার সোজাসিধা মা যে কিনা স্বামী আর সংসার ছাড়া কিচ্ছুটি বুঝত না, সে-ই পালিয়ে গেল আমাদের ফেলে। দু-বছর হয়ে গেল আজ অবধি মাকে দেখিনি। জানেন স্যার, মাধ্যমিকে আমি খুব খারাপ নাম্বার পাইনি। স্কুলে সবাই বলেছিল সায়েন্স নিতে, কিন্তু বাড়ির ওইরকম বিচ্ছিরি পরিবেশে সায়েন্সের কথাটা বলতেই পারলাম না। মা চলে যাওয়ার পরে আমার হাসিখুশি বাবাটা কেমন যেন হয়ে গেল। সকালেই উঠেই কাজে যাওয়া আর কাজ থেকে ফিরেই ঘুমিয়ে পড়া— এর বাইরে আমরা কেমন আছি, আদৌ আছি কিনা সে-সব দিকে তাকাবার যেন সময়ই পেত না মানুষটা।

জানেন, দাদাকে ধমকানোর সাহস শুধু মায়ের ছিল। মা চলে যেতেই দাদাটাও যেন লাগামহীন ঘোড়ার মতো পাগলা হয়ে গেল। কাজেও কামাই করতে লাগল। রাতদিন অন্য পাড়ার নানারকম লোকেদের সাথে কী কী সব বাজে আড্ডায় মেতে থাকত। দিন যত যাচ্ছিল নানারকম গুন্ডা টাইপের লোকের সঙ্গে ওর মেলামেশাও বাড়ছিল। রাতের পর রাত বাড়ি ফিরত না। জিজ্ঞেস করলে বলত, “কাজে গেছিলাম। তুই বুঝবি না।”

আমি কিন্তু একটু একটু বুঝতে পারছিলাম যে, দাদা কোনো খারাপ দলে ভিড়ে গেছে। একদিন ঠিক আমাদের বাড়িতে পুলিশ আসবে দাদার খোঁজে। বাবা কিন্তু কিছুতেই মানতে চাইত না এ-সব। এইসবের মধ্যেই একদিন “বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি”, বলে দাদা সত্যিই বেপাত্তা হয়ে গেল।

এ-বছরের গোড়ায় বাবার একটা ছোটো অ্যাক্সিডেন্ট হল। পায়ের ঘাটা এমন বিষিয়ে গেছিল যে, টানা দু-মাস কাজে যেতে পারেনি। মার্চের মাঝামাঝিতে কে যেন খবর দিল নয়া ‘মজদুর-লিস্ট’ বেরিয়েছে যাতে বাবার নাম নেই। কোথায়, কার কাছে দরবার করলে সমাধান হবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লকডাউন শুরু হয়ে গেল। এমনিতেই মায়ের আর দাদার শোকে পাগলাটে হয়ে গেছিল বাবা, লকডাউনে টানা তিন মাস রাতদিন ঘরে থাকতে থাকতে উন্মাদ হয়ে উঠল যেন। ওষুধপত্র আর সংসার খরচে জমানো টাকাও দ্রুত ফুরাচ্ছিল! মাঝে মাঝে কাঁদতে কাঁদতে এমন ছটফট করত যে, আমি সামলাতে পারতাম না। এরকমই একদিন সকালে উঠে দেখি, উঠানের বাঁশে ফাঁস লাগিয়েছে বাবা।

হাসপাতালে যে নিয়ে যাব, তার সময়টুকুও দিল না।

করোনাকালে লোকে আত্মহত্যা করলেও নাকি লাশের দায়িত্ব কেউ নেয় না। পুলিশ এল, ঘর তোলপাড় করে ছানবিন করল, তারপর ‘সুইসাইড’ লিখে কেস বন্ধ করে দিল। কিন্তু আমার কী হবে— তার উত্তর কেউ দিল না। জানি, বাবা সারাজীবন অশান্তি সয়েছে। মরেই হয়তো শান্তি পেতে চেয়েছিল। সেটুকুও কি জুটবে না! তাই যে কাকা আমাদের কোনোদিনই পাশে দাঁড়ায়নি— তাদেরই হাতে পায়ে ধরতে বাধ্য হলাম। দাদাকে মৃত বাবার খবরটুকুও দেওয়া হল না। সবাই বলল, ফাঁকা বাড়িতে একলা থাকা ঠিক না— তাই ‘বাবার কাজ’ মেটার পরে কাকার বাড়িতেই উঠতে হল। খাওয়া থাকার বদলে ঘরের সব কাজই করতাম। ওপর ওপর সব ঠিক থাকলেও, ওদের কথাবার্তায় মনের খটকা দিন দিন বাড়ছিল।

জানেন স্যার, শত অভাবেও নিজেকে কোনোদিন এত অসহায় লাগেনি। কিন্তু বাবা নামের বটগাছটা মরে যেতেই বুঝলাম মাথার উপর থেকে বড়ো ছাতাটা এ-জন্মের মতো সরে গেছে। কাউকে ভরসা করতেই ভয় লাগে। ভয়টা সত্যি করতেই যেন ঝড়টা এল— ‘আমফান’। চোখের সামনে দেখলাম আমাদের বাড়িখানাকে একেবারে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল দানবটা। ভেবেছিলাম সময় করে ট্র্যাঙ্ক থেকে নিজের পড়ার জিনিস, ব্যাঙ্কের বই সব গুছিয়ে আনব।

কিন্তু ভাগ্য! মায়ের রান্নাঘর যেখানে ছিল সেখানে এখন পাঁকভরতি ডোবা। ওদিকে রোজ মাইকে ঘোষণা হচ্ছে “আমরা থাকব ঘরে/করোনা পালাবে দূরে”। রাতারাতি ঘরহীন হওয়া লোকজন এ-সব শুনে হাসবে না, বলুন!

গত সাতদিন ধরে এক নয়া বিপদের আঁচ পাচ্ছি। ওদের বাড়িতে এক বুড়ো আসা-যাওয়া করছে। মেয়েদের দিকে লোকটার নজর একদম ভালো না। সেদিন লোকটার সঙ্গে কাকা বেজায় ঝামেলা করে এসে বেদম পিটিয়েছিল আমাকে। নেশার ঘোরে বলা কথায় বুঝেছিলাম, ওরা আমাকে বাইরে কোথাও পাঠিয়ে দেবে। কান্নাকাটি করতেই, কাকী বোঝাতে লাগল, “তুই একা নাকি। আরও কত মেয়ে যাচ্ছে। বড়ো শহর, বড়ো কাজ। অল্প খাটনি, অনেক টাকা। লাইফ একেবারে সেট!”

অনেক চেষ্টাতেও যখন আমি রাজি হলাম না, তখন কাকী আর দিদি মিলে খুব মারল, একদিন খেতে না দিয়ে ঘরে আটকে রাখল। বুঝলাম যে-করেই হোক পালাতে হবে আমায়। কিন্তু পালাতে গেলেও তো টাকা চাই। ব্যাঙ্কের বই আমফানে উড়িয়ে নিয়েছে, ‘শিক্ষাশ্রী’ আর ‘কন্যাশ্রী’-র টাকা তোলার কোনো উপায় দেখছি না। স্কুলও বন্ধ, টিচারদের কাছে সাহায্য নেব সেই সুযোগও নেই। এদিকে প্রমাণ ছাড়া তো থানায় আসাও মানা, সে আমি বাবার কেসের সময় খুব বুঝেছিলাম।

কাকাদের হাতে রোজ মারধর গালিগালাজ খেতে খেতে কীভাবে কাটিয়েছি সে আমিই জানি। তাই শেষমেষ আজ ওদের রাতের খাবারে কীটনাশক মিশিয়ে দিয়েছি। খুব অল্প মাত্রায়। বড়ো চাষি ওরা, ওটুকু বিষ জোগাড়ে কোনো অসুবিধা হয়নি। এখন সবাই খুব বমি করছে। বিষটা খুব ধীরে কাজ করে। ভোর হতে এখনও দেরি, তাই এই কথাগুলো গুছিয়ে রেকর্ড করলাম।

এবার ফোন করব হাসপাতালে। তারপর যাব থানায়। না স্যার, আমি ফেরার আসামি হব না। কারণ, আমি জানি, বাইরের দুনিয়ার থেকে এই মুহূর্তে জেলই আমার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা হতে পারে। ভাবছেন হয়তো, এলামই যদি তবে কেন আগে এলাম না থানায়? কী হত স্যার, বিনা প্রমাণে আপনারা বিশ্বাস করতেন আমায়?

দু-দিন আগেও ১০০ নাম্বারে ডায়াল করেছিলাম। বলতে চেয়েছিলাম আমায় ওরা পাচার করে দিচ্ছে— কেউ পাত্তাই দেয়নি। তাই এবার ভাবলাম, বড়ো কিছু করে তবেই আসব আপনাদের কাছে।

জেলে শুনেছি খাওয়া-থাকা-কাজের পাশাপাশি লেখাপড়ারও সুযোগ মেলে। দেবেন আমাকেও লেখাপড়ার সুযোগ? আমার বড়োলোক হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। দাদার মতো ভুল পথে গেলে হাতে যা টাকা আসত তাতে দামি জীবন পেতে পারতাম, মায়ের মতো পালিয়ে গেলেও হয়তো পেতাম। কিন্তু আমি সারাজীবন সরল সিধা বাবার মতো হতে চেয়েছি। আমার সেই ভালো মানুষ বাবা, যে বলত আমাকে বড়ো হয়ে অফিসার হতে হবে। দেবেন আমায় বড়ো হতে?

সাব-ইন্সপেক্টর মিঃ ঘোষের সঙ্গে দু-জন কনস্টেবলকে সিটি হসপিটালে পাঠিয়ে দিয়ে এবং অডিয়ো ফাইলটার দুটো কপি করতে বলে মাইতিবাবু প্রতিমার কাছে গেলেন। অবিশ্বাস্য ব্যাপার! এত অল্পবয়সি মেয়ে এমন মরিয়া হয়ে রীতিমতো পরিকল্পনা করে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে! কেসটা ভালো করে স্টাডি করতে হবে।

— খেয়েছ কিছু?

শান্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে প্রতিমা মাথা হেলালো। তারপর বলল, “আমায় বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন না তো?”

— বলছি, তার আগে বলো এই ফোনটি কার?

‘কাকীমার’ বলেই হাতজোড় করে তাড়াতাড়ি বলে উঠল “ওদের কিছু হবে না স্যার। ওরা হাসপাতালে আছে। বেঁচে যাবে। কিন্তু দয়া করে ওদের কাছে ফিরে যেতে বলবেন না স্যার।”

— তুমি জানো, যা কিছু তুমি বলেছ তা যদি সত্যি হয় তবে বেশ কঠিন সাজা হবে তোমার।

ইন্সপেক্টর মাইতিকে অবাক করে দিয়ে প্রতিমা বলল, “জানি। সাজা না হলে জেলে থাকব কী করে?”

— তুমি জেলে থাকতে এত আগ্রহী! স্ট্রেঞ্জ! তোমার একটুও ভয় করছে না?

শান্ত দৃষ্টিতে প্রতিমা কিছুক্ষণ ইন্সপেক্টরের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর পায়ের আঙুলে আঙুল ঘষতে ঘষতে কেটে কেটে বলল, “ভয় করছিল বলেই তো আপনার কাছে এসেছি।”

আর্কাইভে যেতে যেতে আর একবার প্রতিমার দিকে তাকালেন ইন্সপেক্টর মাইতি। শেষ বিকেলের অদ্ভুত এক জেদি আলো শ্যামলা মুখটায় পড়েছে। আর্কাইভে ঢুকতে ঢুকতে বার বার তাঁর মনে হচ্ছিল এটা বোধহয় দামোদর মাঝির কেসের লিঙ্ক। দ্রুত হাতে ফাইলের স্তূপ ঘাঁটতে লাগলেন তিনি। এই অঞ্চলে এমন কিছু কাজের চাপ থাকে না। দু-একটা চুরি কিংবা মোলেস্টেশনের কেস আসে অবশ্য। কাঙ্ক্ষিত ফাইলটি খুঁজে পেতে খুব বেশি দেরি হল না তাঁর। মাত্র দেড় মাস আগের সুইসাইডের ঘটনা। মেয়েটির বয়ানের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। সুইসাইড নোটের খোঁজে খানাতল্লাশি চালিয়ে সেরকম কিছুই মেলেনি তাঁদের, তবে মাইতি বাবুর হাতে এসেছিল একটা পাতলা নোটবুক। ফাইলের মধ্যে সেটিও আছে। এতদিন খুলে দেখার দরকার পড়েনি, তবে আজ দেখলেন। এটি প্রতিমা মাঝির কবিতার খাতা।

পড়তে পড়তে তিনি বুঝলেন এতে প্রতিমা শুধু কবিতা নয়, স্বপ্নেরও চাষ করেছে। অপটু কাঁচা হাতে লেখা ছন্দহীন লাইনগুলোর পরতে পরতে ভাষার জড়তা স্পষ্ট। তবে তাতে বক্তব্যের আড়ষ্টতা নেই। ভাঙা টালির ফুটো দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদকে হয়তো দশ টাকার কয়েনের মতোই লাগে, তবে তাতে জোছনার বন্যা আটকানো যায় না। এ যেন তেমনই।

ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বহু বছর আগে ফেলে আসা এমনই কিছু স্মৃতি হুড়মুড় করে মাইতিবাবুর চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল।

সেই স্মৃতিতে আছে, জলপাইগুড়ির এক মলিন বোকাসোকা যুবকের ছবি— নিজের বাড়ি থেকে যাকে অন্যায়ভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ভিন জাতে বিয়ে করার দোষে। আর আর এক বাড়ি থেকে কেস দেওয়া হয়েছিল তাদের নাবালিকা মেয়েকে ফুসলিয়ে পালিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

স্ত্রীর সঙ্গে আলাদা হয়ে একা জেলের কুঠুরিতে বসে বসে ছেলেটি কেবল নিজের দোষ খুঁজত।

“মিনতিকে একবার দেখতে দেবেন না, স্যার?”— প্রথম দিকে এর উত্তরে “ও বাড়ি চলে গেছে” বলে কাটিয়ে দিলেও, দিনের পর দিন একই প্রশ্নে বিরক্ত জেলার তাকে বেধড়ক মারধর করত। তবু প্রশ্ন করা থামাত না সে। আদালত চত্বরে একশো পুলিশের ঠেলাঠেলি সত্ত্বেও মিনতি তার হাত জড়িয়ে কেঁদে উঠেছিল— “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না গো। আর পেটেরটাও যে রাক্ষুসে খিদে নিয়ে আছড়িপিছড়ি করছে। তুমি না থাকলে…” ওই শেষবারের মতো দেখেছিল পানপাতার মতো মুখের ছোটোখাটো মেয়েটিকে। যাকে বড়ো ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সে।

আর সেই ভালোবাসার দিব্যি কেটেই যুবকটি বিশ্বাস করত মিনতিরা তাঁর জন্য কোথাও-না-কোথাও নিশ্চয় আছে। তাই হয়তো প্রতিবার মার খাওয়ার পরে সে চিৎকার করে উঠত, “আমি কি বিনা দোষেই সাজা কাটব, স্যার! একটা সুযোগ দিন। নইলে জেল ভেঙে পালিয়ে যাব ঠিক। মিনতিকে একটিবার দেখে আসি, পাকাপাকি একটা দোষ না হয় করেই আসি।”

বিড়বিড় করতে করতে কতবার সে জেল পালিয়ে মিনতির জানলায় দাঁড়াত, কতবার সে ভাবত জেলই যখন হল তখন বিনা দোষে কেন হল! কতবার যে তার আঘাতের গায়ে আলো ছড়িয়ে চাঁদ ডুবে যেত কালো রাতের বুকে। তবু প্রশ্ন করা থামাত না সে। যাকে সামনে পেত একই কথা বার বার বলত, “বলো না গো, আঠারো বছর পুরলেও কি মিনতি আমার হবে না? ও যে আমার বিয়ে করা বউ গো।” কেউ বলত প্রেমে পাগল হেয়ে গেছে ছোকরা, কেউ বলত আকাট বোকা, মূর্খ লোক। যে যা-ই বলুক, সে জীবনের শেষদিন অবধি এ-কথাই বিশ্বাস করেছিল হয়তো-বা তার অন্তহীন প্রশ্ন করার বোকামিটাই তাকে তপনবাবুর নজরে ফেলে দিয়েছিল।

আর সে-জন্যই কলকাতা শহরের হাজারটা কেসের ভিড়ে তার হেরে যাওয়া, ডুবে যাওয়া, বাতিল হওয়া কেস আবারও দিনের আলো দেখল। বাকিটা ইতিহাস।

বউ-ছেলেকে ফিরে পেয়ে যেন পৃথিবী জিতে নিয়েছিল সে। ভেসে যাওয়ারই কথা ছিল তাদের। কিন্তু তপনবাবুর মতো সজ্জন ব্যারিস্টারের নেক নজরই তাদের মুঠোয় খড়কুটো জুটিয়ে দিল কোনো যাদুবলে মোটর গ্যারাজে কাজ পেল সে। মেকানিক-কাম-দারোয়ান। মালিকের কৃপায় গ্যারাজের কোনায় পাতা হল সংসার। যাতে সম্বল বলতে ছিল তাদের সততা, মুক্তির স্বপ্ন আর শান্তি বলতে ছিল একটা ডায়রি। ছেলেকে দিবারাত্র মুড়ে রাখা নিরাপদ কাঁথাটায় বাপের স্বপ্নের নকশাগুলোর খোঁজ, যদিও মিলেছিল বহু বছর বাদে। ততদিনে সেই জেলখাটা মোটর মেকানিকের ছেলে ইন্সপেক্টর হয়ে গেছে।

ইতিহাস কি এভাবেই বার বার ফিরে আসে, মানুষের সামনে আয়না হয়ে?

থানা থেকে বাড়ি ফেরার পথেও প্রশ্নটা তাড়া করছিল মাইতিকে। আরও একজন কয়েদির পালভাঙা জীবনে কি আর একটা তপন সিনহা হাল ধরতে পারেন না!

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল হঠাৎ। গাড়িটা একটু আগেই জ্যামে আটকে ছিল। আনলক ফেজ শুরু হতেই রাস্তায় ভিড় বেড়েছে। এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা প্রতিমা যেন হঠাৎ একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। পেছনের তারজালি আঁটা শার্সিতে মুখ চেপে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে কি! ইন্সপেক্টর মাইতি ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে বাইরে তাকালেন। গাড়ি তখন শম্বুক গতিতে পার হচ্ছে ‘নেতাজী বালিকা বিদ্যামন্দির’। ছ-মাস ধরে সব স্কুল বন্ধ। গেটের ভেতর থেকে এক বিরাট ছাতিমগাছের মাথা বেরিয়ে আছে। রাস্তা থেকে স্কুলের সামনেটায় ধুলো আর আগাছা ভরে গেছে। তারই মধ্যে শান্ত পাহাড়ের মতো নির্লিপ্ত ঔদাসীন্য নিয়ে স্কুলবাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে দেখার মতো কিছুই নেই। তবু সেটা থেকে প্রতিমার পলক পড়ছে না। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অপলক দেখেছে সে।

— “কী রে, এটা তোর স্কুল?”

প্রশ্নটা বোধহয় শুনতে পেল না প্রতিমা। নাকি অস্ফুটে বলল কিছু! মুখে চেপে বসে থাকা কালো মাস্কে ঠিকমতো ঠাহর করতে পারলেন না মাইতিবাবু। কিন্তু ওর চোখের দিকে চেয়ে তিনি স্থাণু হয়ে গেলেন। প্রতিমার ডাগর দু-চোখে তখন যেন শুষে নিতে চাইছে বাইরের পৃথিবীর সবটুকু আলো, সবটুকু হাসি, সবুটুকু স্বপ্ন।

“একদিন এখানে ঠিক ফিরে আসব”— বাঙময় চোখের ভাষা পড়তে ভুল হল না ইন্সপেক্টর মাইতির।

এমন উজ্জ্বল চাহনির জেদি পরিন্দাকে আইনের খাঁচায় পুরে ডানা কেটে ফেলবে, পুলিশ ভ্যানের ক্ষুদ্র তারজালির এত সাধ্যি কোথায়! প্রতিমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে শক্ত চোয়ালে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি দেখতে লাগলেন তিনি।

Categories
2021-Aug-Dharabahik

শতদল মিত্র

মস্তানের বউ


দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো পার হয়ে গেছে, তবুও শরতের সাদা ভাসা মেঘ হঠাত্‍ হঠাত্‍ই জলে নেয়ে সে জল ঝরিয়ে দিচ্ছে শহরের বুকে— এখানে, ওখানে, সেখানে। যেন-বা বিদায় বেলায় চোখের জল প্রাণপণ চাপতে গিয়েও চাপতে পারছে না! যেমন এ-মুহূর্তে হঠাত্‍ই দিনের আলোকে মুছে ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি ঝরছে। রূপা আনমনে বৃষ্টির ঝরে যাওয়া দেখে। দেখে রাস্তার ওপারে কৃষ্ণের গলির মুখে কালিপুজোর প্যান্ডেলের সদ্য বাঁধা বাঁশের কাঠামোটার ভিজে যাওয়া। বৃষ্টির ঝরা জলের ছোঁয়ায়ই যেন ভিজে ওঠে রূপার চোখ। আঁচল চাপা দিয়েও সে চোখের জলের ঝরে যাওয়া মুছে দিতে পারে না, যেহেতু স্মৃতিরা ঝরে পড়ে সে-জলে ভিজে। ভাগ্যিস, দোকানে খদ্দের নেই এখন! রূপা চোখ থেকে আঁচল না সরিয়েই মনে মনে লজ্জা পায়। সজল অতীত ভিড় করে আসে মনে।

শক্তিশ্রী। কৃষ্ণের গলির মুখের ওই কালিপুজোর ভিজে যাওয়া রংচটা ব্যানারের লিখন— আয়োজনে: শক্তিশ্রী, তেমনটাই জানান দিচ্ছে। যদিও জৌলুসহীন এ-পুজো বর্তমানে নামপরিচয়হীন অনেক পুজোর একটা হয়েই টিকে আছে। শক্তিহীন শক্তি পুজোই কি? ভাবে রূপা। সেদিন যখন কৃষ্ণরাজ, তখন সত্যিই শক্তির আরাধনাই শক্তিশ্রীর এ-কালিপুজো। হয়তো শক্তির প্রদর্শন, কৃষ্ণের জাঁক— শক্তি আরাধনার বকলমে, তবুও। যদিও এখনও যেমন, তখনও শক্তিশ্রী নামটি আঁধারেই ঢাকা ছিল, কৃষ্ণের শক্তির ঔজ্জ্বল্যে। মুখ ফেরতা নাম ছিল কৃষ্ণের কালিপুজো। কী জাঁক সে-পুজোর তখন! গোটা এলাকার সমস্ত পুজো ছাপিয়ে জেগে উঠেছিল এ-পুজো। যেমন প্যান্ডেল, তেমনই আলোর জেল্লা— চন্দননগরের। বিসর্জনেও রাস্তার দু-ধারে লোক থোকা বেঁধে থাকত যেন! ১০৮ ঢাকি, লাইটের গেট, ব্যান্ড, সঙ্গে ছৌ নাচও। কিন্তু প্রতিমা ছিল সাবেকিই— শ্যামাকালি নয়, ঘোর কৃষ্ণবর্ণা দক্ষিণা কালীই তা, যা পুজোর নিষ্ঠায় জাগ্রত হয়ে উঠত যেন সে-অমা রাতে। না, পুজোর আচারে কোনোরকম আপোশে নারাজ ছিল তার কৃষ্ণ। ফলে লোকের মুখ ফেরতা সে-নাম—কৃষ্ণের কালী যেন টেক্কাই দিত সোমেন মিত্তির বা ফাটা কেষ্টর কালীকে। কৃষ্ণের কালী! নিজের ভাবনায় নিজেই চমকে ওঠে যেন রূপা, কৃষ্ণের বিধবা যে। কৃষ্ণকালী, কালীকৃষ্ণ, হরগৌরী— পুরুষ-প্রকৃতি! তার পুরুষের সে কি প্রকৃতিই ছিল! রূপার অজান্তেই তার আঁচলচাপা ঠোঁটজোড়া হাসি আঁকে।সে-হাসিতেই যেন তখনই শরতের উড়োমেঘ ভেসে গিয়ে বৃষ্টি মুছে নির্মল রোদ হেসে উঠেছিল বাইরে।


— হরে কৃষ্ণ! ভিক্ষা দেবে মা!

দোকানে সকালের খদ্দের সামলাতে ব্যস্ত রূপা চমকে মুখ তুলে তাকায় সে বৃদ্ধ ভিখারির দিকে। এদিকে ইদানীং ভিখারি আর আসে না তেমন। তাছাড়া কৃষ্ণনাম, যা নরম করে তোলে যেন তাকে। সে, রূপা, কৃষ্ণের বিধবা— ভিখারিকে এক টাকার একটা কয়েনই বাড়িয়ে দেয়। সিকি প্রত্যাশী ভিখারি ষোল আনায় অভিভূত। দাতাকে প্রাণ খুলে আশীর্বাদ করে—দীর্ঘজীবী হও মা। ঈশ্বর মঙ্গল করুক তোমার।

আর দীর্ঘজীবন! বাঁচতে আর চায় না সে।… কিন্তু তবুও দুই মেয়ে তার। তাদের জন্যই এ-লড়াই! ভাবে রূপা, আর সে ভাবনার টানে বুক কাঁপানো এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইলেও ঢোক গিলে তাকে চেপে দেয় সে। কেননা আজ দোকানে সকাল থেকেই ভিড়। সামনে কর্পোরেশন ভোট। আজ তাই মিছিল বেরোবে লাল পার্টির। এ-ওয়ার্ডের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরবে তা। ফলে সকাল থেকেই পার্টির গলির মুখটায় লাল রঙের থকথকে ভিড়।

তখনও ছিল ভোটের মরসুম। না, তখন গার্ডেনরিচ-মেটিয়াবুরুজ কলকাতা কার্পোরেশনের আওতায় ছিল না— ছিল স্বতন্ত্র গার্ডেনরিচ মিউনিসিপালিটি, যেমন বেহালা বা যাদবপুর। যে-অঞ্চল ছিল লাল দুর্গ। লাল জমানার পরবর্তীতে যখন লাল সরকার বুঝল যে, নগর কলকাতা তেমন লাল নয় আর, সে-সময় নগর কলকাতাকে দখলে রাখতে পাশের গার্ডেনরিচ-বেহালা-যাদবপুরকে নগর কলকাতার গায়ে জুড়ে দেওয়া হল। চলতি ভাষায় আদি কলকাতা কর্পোরেশনের অ্যাডেড এরিয়া এ তিন অঞ্চল। ১০১ থেকে ১৪১ ওয়ার্ড— তার মধ্যে ১৩৩ থেকে ১৪১ গার্ডেনরিচ অঞ্চলে। এতটুকুই জানে রূপা, এটুকু জেনেছিল সে কৃষ্ণের কাছে। এখন মহানাগরিক তকমায় কর বাড়া ছাড়া, উন্নয়নের বান ডেকেছিল কিনা সে ভিন্ন বিষয় এবং তর্কেরও! সামান্য রূপা জানে না তা। ই ন কি লা ব জি ন্দা বা দ!

হঠাত্‍ তীব্র স্লোগানে রূপার চিন্তা ছিঁড়ে যায়। সে দেখে যে, তার দোকান কখন ফাঁকা হয়ে গেছে সে খেয়ালই করেনি। শুধু তার ভাবনার ফাঁকফোকরে এতক্ষণ যান্ত্রিক অভ্যস্ততায় খদ্দের সামলে গেছে মাত্র! স্লোগানের তীব্রতায় বাস্তব তাকে সামনের রাস্তায় আছড়ে ফেলে যেন। গোটা রাস্তা জুড়ে, যতদূর চোখ যায় শুধু লাল আর লাল। আকাশও ঢেকে গেছে যেন সে রক্তলালে! সহসা এক ভয় ঘিরে ধরে রূপাকে— লাল যেমন জীবনের মায়া বোনে, তেমনই মৃত্যুর ছায়াও বিছায় তা! রূপার ভীত চোখে ভেসে ওঠে তার কৃষ্ণের সাদা আবরণ জুড়ে চটচটে রক্তের থকথকে জমে ওঠা, যা লালই তো! যে-লালে কয়েকটা মৃত মাছির আটকে থাকা! গোটা শরীরটা শিউড়ে ওঠে রূপার যেন! সে-কম্পন চোখ বন্ধ করে কানে হাত দিয়ে কাউন্টারের টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে বসতে বাধ্য করে রূপাকে। মিছিল চলে গেলে হঠাত্‍ই এক নিস্তব্ধতা বিরাজিত হয় যেন সে-চত্বরে। সে-স্বস্তিতে চোখ মেলে তাকায় রূপা। তার বিহ্বল দৃষ্টি আটকে যায় সামনে ঝোলানো কৃষ্ণের ফোটোর দিকে। সে-সময়ের কৃষ্ণ— যখন মথুরা বিজয় অন্তে সদ্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া রাজা কৃষ্ণ, যে বিরাট অথচ সরলও!

সরল! হ্যাঁ, সরল বলেই তো কৃষ্ণ ফাঁদে পড়ে যায়। নাকি বোকাই ছিল সে! হয়তো-বা নিয়তিই তা। যে-নিয়তির টানে রূপাও…!

নাঃ! আর ভাবতে পারে না রূপা। কত ভাববে সে! আর সে-মুহূর্তে তার ভাবনার জাল কেটে বেরিয়ে আসেও রূপা, কেন-না বুড়োর দলটি দোকানে ঢোকে সে-সময়— একটু দেরিতেই যেন আজ। হয়তো মিছিলের অভিঘাত আটকে রেখেছিল তাদের।

— দেখলে কী বিশাল মিছিল!

— হ্যাঁ, চারদিক লালে লাল যেন!

— কর্পোরেশনের ভোট মানেই তো ভয়। আবার কোনো ঝুটঝামেলা হয় কিনা! এখানে তো রাজ্যের পুলিশ আর হোম গার্ড। সেন্ট্রাল ফোর্স তো আর এ-ভোটে আসবে না!

— আরে সেটাই তো শাপে বর। এক তরফা ভোট হবে। বিরোধীদের কোমরের সে-জোর কোথায় যে ঝামেলা পাকাবে? বাধা না দিলে তো আর অশান্তির ভয় থাকে না।

— আমি বাবা ভোটে নেই। গরমে অত কষ্ট করে লাইন দিয়ে দেখব যে, আমার ভোট পড়ে গেছে আগেই!

মিছিল, ভোট, ঝামেলা— শব্দগুলো যেন আট পা ষোলো হাঁটু দিয়ে আবারও ভাবনার জাল বিছায় রূপার মনে। তখনও ছিল ভোটের মারসুম। মিউনিসিপ্যালিটির ভোট। যে-কালো ছায়া সদ্য মথুরাধিপতি কৃষ্ণকে শীতলতার, শান্তির আশ্রয় দিয়েছিল, সেই কালো ছায়াই ক-দিন পর কৃষ্ণকে গিলে খায়। প্রদীপ রায়ের ঔজ্জ্বল্যতা থেকে আর পরিত্রাণ মেলে না কৃষ্ণের, যতই সে তার নিজের এলাকার একছত্র অধিপতি হোক না কেন। সুতো বাঁধা থাকে কৃষ্ণকালো প্রদীপ রায়ের আঙুলেই চিরকাল। ফলে মথুরা বিজয়ের কিছু দিন বাদেই একদিন কালো সে-ছায়া আছড়ে পড়ল কৃষ্ণের ওপর এমনই ভঙ্গিমায়।

— সামনে মিউনিসিপ্যালিটির ভোট জানো তো?

— হ্যাঁ, দাদা।

— হিন্দু পাড়ার দুটো ওয়ার্ড তোমার এলাকায় পড়ে। তার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।

সদ্য যুবা, সরল কৃষ্ণ এ-হেঁয়ালির মানে বুঝতে না পেরে কথা হাতড়ে বেড়ায়। কোনোরকমে বলে ওঠে সে।

— আমি তো পার্টির মেম্বার নই!

কেন-না তখনও রাজনীতির ছায়া না মাড়ানো কৃষ্ণের কাছে রাজনীতি মানে রাজনীতির নেতা-ক্যাডারদের বিষয়ই। সে তো পার্টির মেম্বার নয়। লাল জমানার সকালবেলায় সে জানে তাদের মতো আমজনতার কাছে রাজনীতি মানে পাঁচ বছরে একবার ভোট দেওয়া এবং না দিতে পারাও— যখন বুথে গিয়ে বোকাবদনে দেখবে যে, তার ভোটটা আগেই পড়ে গেছে। সে-সময়ে কৃষ্ণের অভিজ্ঞতায় ভোট মানে টুকটাক ফলস্ ভোটও। কোনো এক কায়দায় আঙুলের গণতান্ত্রিক পবিত্র ছাপটা মুছে নিয়ে ক্যাডার বাহিনীর স্লিপ হাতে ভোটের লাইনে বার বার দাঁড়িয়ে যাওয়া। এবং দিনের শেষে হাসতে হাসতে হিসাব মেলানো কে ক-টা ফলস্ ভোট দিতে পেরেছে— দশটা-বিশটা! আর ভোট মানে মিছিল-মিটিং। কিন্তু এ-সব প্রক্রিয়াই তো পার্টি মেম্বার, ক্যাডারদের কাজ। সে তো তখনও পার্টির কেউ নয়! এও শুনেছে শ্রদ্ধায়, যে, লাল পার্টির মেম্বার হওয়াও নাকি সহজ নয় তেমন। ফলে তার অবাক জিহ্বায় এ-উচ্চারণই উথলে ওঠে— আমি তো পার্টির মেম্বার নই!

হঠাত্‍ই বিহ্বল কৃষ্ণকে এক হা-হা হাসি বা হাওয়ার গর্জনও যেন-বা, চমকে দিয়ে আরও কালো চটচটে ছায়ায় তাকে ডুবিয়ে দেয়, কেন-না প্রদীপ রায় হেসে কৃষ্ণের কাঁধে তার হাত রেখেছিল পার্টির আলো-আঁধারি ঘরে। আর সে হা-হা রব অনুরণন তুলেছিল ছোটো সে-ঘরে আরও একটু আঁধার লেপে, কেন-না সে-ঘরে জোট বাঁধা মেজ-সেজ-ছোটো নেতা বা নেতা নয় এমন গোটা কয়েকজনা হেসে উঠেছিল একতালে।

— দেখ্, বোকা ছেলের কাণ্ড দেখ। অথচ এ-ছেলে দু-দুটো মানুষের খুনি, মার্ডার কেসের আসামি!

প্রদীপ রায়ের চোখে শার্দুল চাহনি ঝিলিক হেনেছিল। সে-চাহনির ফাঁদে পড়ে হরিণ যেন, কৃষ্ণ কেঁপে উঠেছিল— সে খুনি! কিন্তু নিজের হাতে তো সে খুন করেনি!

কৃষ্ণের ভাবনাকে জমাট বাঁধার সুযোগ না দিতেই প্রদীপ রায়ের সাদা পাঞ্জাবির ঘেরাটোপ থেকে বার হওয়া হাতটা কৃষ্ণের কাঁধে থাবার মতই চেপে বসেছিল।

— শোনো কৃষ্ণ, তাই তো তোমাকে ডেকেছি। আজ থেকে তুমি আমাদের পার্টি ক্যাডার— অ্যাকশন স্কোয়াডের সদস্য। ভোটের দুয়েক দিন আগে থেকে এই দুটো ওয়ার্ডে অপোনেন্টের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের একটু বোঝাবে শুধু…।

পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বার করে প্রদীপ রায়।একজন তড়িঘড়ি লাইটার জ্বালে। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে ধোঁয়ার মতোই ভাসিয়ে প্রদীপ রায় বাকি কথাগুলো কৃষ্ণের দিকে তাক করে।

— আর ভোটের দিন একটু চমকানো সকাল সকাল। সে-সব বুঝিয়ে বলে দেবে গোপাল তেওয়ারি তোমাকে ভোটের আগে। ভয় নেই। তোমার সঙ্গে গোপাল তো থাকবেই, সঙ্গে আমাদের অ্যাকশন স্কোয়াডের অন্য ছেলেরাও। আপাতত তোমার কাজ আমাদের সঙ্গে মিছিল-মিটিং-এ থাকা। সে প্রোগ্রাম সময় মতো তোমাকে জানিয়ে দেওয়া হবে। তুমি শুধু তোমার ক্লাবের ছেলেদের তোমার সঙ্গে ডেকে নেবে।

কেটে কেটে কথাগুলো উচ্চারণ করে প্রদীপ রায় নিষ্পলক চোখে, তার চাহনির আওতার বাইরে কৃষ্ণকে যেতে না দিয়ে। সিগারেটে টান দেয় ধীরেসুস্থে।

কৃষ্ণর কাঁধ থেকে হাতটা আলগা তুলে তার পিঠে আলতো দুটো চাপড় মারে সে-জোনাল নেতা। হাসে। আবার বলে, যেন-বা শেষ নিদান তা।

— আশা করি বুঝতে পেরেছ আমার কথা। বুঝদার ছেলে বলেই তো তোমাকে আমি নিজে ডেকে পাঠিয়েছি।আর… আবারও সিগারেটে টান দিতে একটু থামে সে-নেতা, যেন কৃষ্ণকে বুঝে ওঠার সুযোগ দিতেই। আলতো ধোঁয়ার সঙ্গে অসম্পূর্ণ কথাটা শেষ হয় এমনই নির্ভার ভঙ্গিমায়।

— আর আমি তো আছি। ভয় নেই কোনো। আমি থাকতে, আমাদের সরকার থাকতে পুলিশ যমজ খুনের খাতা খুলবে না কোনোদিন। যাও এবার। সময়মতো তোমাকে সব প্রোগ্রামই জানিয়ে দেওয়া হবে।

শেষ টান দিয়ে সিগারেটের শেষটুকু গুঁজে দেয় টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে। হাত নাড়িয়ে ধোঁয়া তাড়ায় প্রবল প্রতাপান্বিত সে-নেতা। কৃষ্ণের মনে হয় যেন-বা তাকেই মাছি তাড়ানোর মতো তাড়িয়ে দেয় সে-ভঙ্গিমায়। বোকা হেসে নমস্কার করে পিছু হটে সে এক শরীরিক যান্ত্রিকতায় যেন, কেন-না তার মস্তিষ্কে সহস্র বোলতা হুল ফোটায় নেতার শেষ বাণীখানি— যমজ খুনের খাতা!

কিশোরী রূপা তখন তো দেখেছিল কৃষ্ণের দাপট। ভোট দেওয়ার বয়স তার হয়নি, ফলে বুথমুখো হওয়ার প্রশ্নও তার ছিল না। তবু রূপা সে ভোটের দিন সকালে তার সেকেন্ড লেনের বাড়ির জানলার ফাঁক দিয়ে শুধু দেখেছিল কয়েকজন যুবকের হেঁটে যাওয়া, যে-হাঁটায় দাপট ছিল। তার আগেই সে শুনেছিল সাতসকালে রূপশ্রী সিনেমার সামনের রাস্তায় পর পর দুটো বোমা পড়ার কথা। যা কেবল নিরীহ ভোটারদের একটু চমকানো, যেন চেতাবনি— হে ভোটার, ভালো মানুষের পো তোমরা, কী দরকার ভোট দিতে গিয়ে বাপোত্তর প্রাণটা খোয়ানোর? নিজে বাঁচলে বাপের নাম— এ-প্রবাদে বিশ্বাসী অনেকে ভোট দিতে যায়ও না। আবার ভোট দান গণতন্ত্রের মহান কর্তব্য— এ-মতগতে বিশ্বাসী যারা, তারা বেলা একটু গড়ালে, সময় থিতোলে ভোটের লাইনে দাঁড়ায়।অনেকের দাঁড়ানোই সার হয়, কেন-না বুথে ঢুকে দেখে তার হয়ে কেউ গণতন্ত্রের মহান কর্তব্যটি আগেই সেরে রেখে গেছে। থতমত তারা মুখ কালো করে ঘরে ফিরে যায়, জনান্তিকে ক্ষোভ ঝরায়—আরে আমি সেই কবে থেকে লাল পার্টি করি, তবুও আমাকে বিশ্বাস নেই! বিরোধিরা মনে মনে গজরায়— শালা! এ তো গনতন্ত্রের গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো! পাবলিকের স্মৃতি যেহেতু বড়োই তরঙ্গায়িত জলবত্‍, ফলে সময়ের পলিতে সত্তরের সিদ্ধার্থ-ইন্দিরার জমানা তার মনে ফিকেই বর্তমানে। আর যারা ভোট দিতে সক্ষম হয়, তারা মহান কর্তব্য সমাধানে কৃতার্থ মুখে বাড়ি ফিরে মাংস ভাত খায়— ভোটের দিন ছুটি কিনা! এ-বিক্ষোভে বা আনন্দের আতিশয্যে অনেকে দেখে বা দেখেও না যে কী করে এক নেতার উত্থান হয়! মুদিয়ালি মোড় থেকে বাঁধা বটতলা হয়ে ফতেপুর সেকেন্ড লেন— কৃষ্ণ দাপিয়ে বেড়ায়, তার বুকে পার্টির লাল ব্যাজ জ্যোতি উগড়ায়। নতুন এক নেতার তত্ত্বাবধানে পার্টির ছেলেরা বুথে বুথে নীরবে লাইনে দাঁড়ায়, ভোট দেয়, আবার দাঁড়ায়। এবং দিন শেষে নির্বিঘ্নে শান্তিতে ভোট-উত্সব শেষ হলে সাইন্টিফিক রিগিং তত্ত্ব প্রথম বারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। গার্ডেনরিচ মিউনিসিপ্যালিটি লাল দল নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় দখল করে, যার চেয়ারম্যান— প্রদীপ রায়। হ্যাঁ, তার ওয়ার্ডে নির্দল আব্বাসও জিতেছিল উদীয়মান সূর্যের প্রতীকে, কাচ্চি সড়কে। যেখানে দুপুর নাগাদই লাল শরিক ছোটো এক পার্টি তাদের প্রার্থী তুলে নেয়— নির্বিচার বোমাবাজি ও ছাপ্পাভোটের অভিযোগে।

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

Categories
2021-Aug-Dharabahik

সোমা মুখোপাধ্যায়

নিশারানির কন্যাশ্রী পুতুল

বাংলায় বিভিন্ন ধরনের পুতুল রয়েছে। একসময় কাদামাটি দিয়ে প্রথম পুতুল বানিয়ে ছিল মানুষ। ধীরে ধীরে নানা মাধ্যমে তা তৈরি হতে থাকে। এভাবেই পুরোনো কাপড় দিয়ে একসময় পুতুল তৈরি করা শুরু হয়। সে-সময় বাইরের বিনোদন অন্দরে প্রবেশ করেনি তখন এগুলোই ছিল মেয়েদের বিনোদনের মাধ্যম। এতে তাদের সৃষ্টিশীলতাও প্রকাশ পেত। তাই সংসারের অবসরে এমন কাপড়ের পুতুল বানাত মেয়েরা। একসময় এই কাপড়ের পুতুল মেয়েদের রুজি রোজগারের অবলম্বন হয়ে যায়। আজ এমন স্বাবলম্বী এক গৃহবধূর শিল্প কথা শোনাব।

কোচবিহার জেলার মহিষবাথানের বাসিন্দা নিশারানি একজন গৃহবধূ। ছাপোষা সংসারে দুই মেয়ে এক ছেলে আর স্বামীকে নিয়েই দিন কাটাতেন। পয়সার অভাবে মেয়েদের পুতুল কিনে দেবার সাধ থাকলেও সাধারণ ছিল না। তাই মেয়েরা পুরোনো কাপড় দিয়েই নিজেদের খেলার পুতুল তৈরি করত। কাপড়ে তুলো ভরা পুতুলগুলো দাঁড়াতে পারত না। তাই মেয়েরা স্কুলে চলে গেলে সংসারের কাজ সেরে নিশারানি সেই পুতুলকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে করতে একদিন নিজেই স্বাবলম্বী হয়ে গেলেন। মাধ্যম এই কাপড়ের পুতুল।

বছর পাঁচেক আগে কলকাতার রাজ্য হস্তশিল্প মেলায় ঘুরতে ঘুরতে চোখ আটকে গিয়েছিল কারুভাষায় নিশারানির কন্যাশ্রী পুতুলে। স্কুলের শাড়ি পরে হাতে বই খাতা নিয়ে বড়ো বড়ো উজ্জ্বল চোখে চেয়ে আছে কন্যাশ্রীরা। এই পুতুল জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছিল। তাই এখানে প্রদর্শিত হচ্ছিল। আমি দপ্তরের কর্মীদের কাছ থেকে তখনই নিশারানির ফোন নম্বর নিয়ে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আর তৈরি হয় এক আত্মীয়তা।

ছোটোবেলায় দিদিমাকে দেখতাম এই কাপড়ের পুতুল তৈরি করতে। পুতুলের দেহের নানা অংশ কেটে নিয়ে তুলো পুরে সেলাই করে জুড়ে জুড়ে রূপ দিতেন। উল বা কাপড়ের পাড়ের সুতো দিয়ে চুল, চোখ নাক মুখ করতেন। নিশারানির পদ্ধতী এক কিন্তু আরও সৌখিন আরও নিপুণভাবে তৈরি এই পুতুলগুলো। আর আছে উদ্ভাবনী শক্তি।

সে-সময় সরকার কন্যাশ্রী প্রকল্প শুরু করেছেন। নিশারানি তাকেই রূপ দিলেন। মেয়েরা লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এমনটাই তাঁরও স্বপ্ন। সেই স্বপ্নপূরণ করলেন নানা ধরনের কন্যাশ্রী পুতুল। সবাই অবাক হয়ে গেল দেখে। কন্যাশ্রী দিবসে সরকারি দপ্তরে আমন্ত্রিত হয়ে প্রদর্শনীতে সাজালেন পুতুল। পাশাপাশি সবুজসাথ-সহ আরও প্রকল্পকে রূপ দিলেন।

এর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতিও স্থান পেল তাঁর ভাবনায়। তিনি নিজে রাজবংশী। তাই রাজবংশী বিয়ের বৈরাতি নৃত্য স্থান পেল তাঁর ভাবনায়। এই সমাজে বর এলে এয়োস্ত্রীরা নাচে গানে বরকে বরণ করেন এর নাম বৈরাতি নৃত্য। পুতুলের মাধ্যমে তাঁকে রূপায়ণ করলেন তিনি। পাশাপাশি বিয়ের বিভিন্ন দৃশ্য তুলে ধরলেন। স্থান পেল আদিবাসী সংস্কৃতির ঝলকও।

সমাজে এখনও রয়েছে মেয়েদের নিয়ে অনেক কুসংস্কার আর কুপ্রথা। নিশারানি তাঁর পুতুলের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধেও প্রচার করেছেন। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রয়েছে তাঁর পুতুল।

আমার সঙ্গে নিশারানির দেখা হয় বেশ কয়েক বছর আগে।দমদমে ছেলের বাড়িতে এসেছিলেন। ছেলে আর বউমা দু-জনেই কলকাতায় চাকরি করেন। রয়েছে একটি ছোটো নাতি। দোহারা চেহারার সদালাপী নিশারানি প্রথম আলাপে বুঝতেই দেননি আমাদের প্রথম এই দেখা হচ্ছে। বেড়াতে এসেও সঙ্গে আনতে ভোলেননি পুতুলের সরঞ্জাম। আমাকে একটা সুন্দর কন্যাশ্রী পুতুল উপহার দিয়েছিলেন। আর কথা বলতে বলতেই তৈরি করছিলেন পুতুল।

নিশারানি একাই এই পুতুল তৈরি করেন। অন্যদের মতো তাঁর কোনো দল নেই। আর এই পুতুলগুলো একেবারেই সবটাই কাপড় দিয়ে তৈরি। এখানে কোনো মাটির মুখ বা কাঠের কাঠামো তিনি ব্যবহার করেন না। তাঁর পুতুল দেখলেই আলাদাভাবে চেনা যায়।

Categories
2021-Aug-Dharabahik

ফা-হিয়েন

ফা-হিয়েনের ভ্রমণ

ত্রয়োদশ অধ্যায়

পশ্চিম প্রান্ত বরাবর ১৬ ইউ য়েন চলার শেষে তীর্থযাত্রী দল এসে পড়লেন না শিয়ে দেশের সীমান্তে। এ-দেশের শি লো শহরের একটি বৌদ্ধবিহারে বুদ্ধের করোটি রাখা আছে। এর পুরোটাই সোনায় আর সাতটি মূল্যবান পাথরে মোড়া। এই করোটির প্রতি এ-দেশের রাজার রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা। পাছে চুরি যায় সেই ভয়ে রাজা, শহরের মুখ্য পরিবারগুলির মধ্যে থেকে আটজনকে নিযুক্ত করেছেন পাহারা দেওয়ার জন্য। এঁদের প্রত্যেকের কাছে রয়েছে আলাদা আলাদা তালা। প্রত্যেক সকালে এই আটজন একত্রিত হয়ে নিজের নিজের সিলমোহরগুলি প্রথমে পর্যবেক্ষণ করেন তারপর একে একে দ্বার খোলা হয়।সে-কাজ সম্পূর্ণ হলে সুগন্ধি জলে হাত ধুয়ে নেন সকলে। তারপর করোটিখানি বের করে এনে মঠের বাইরের দিকে একটি বেদীর উপরে অধিষ্ঠিত করেন। এটিকে মূল্যবান সপ্ত দ্রব্যে তৈরি একখানি গোলকের উপরে রাখা হয়।আর উপরে কাচ দিয়ে ঢাকা থাকে।এসবের পুরোটাই জমকালো মুক্তা আর রত্ন খচিত। করোটী খানি হলদে সাদা রঙের,চার ইঞ্চি ব্যাস যুক্ত এবং মধ্যবর্তী স্থান উত্থিত।প্রতিদিন দেহাংশটি বাইরে আনার পর,বিহারের দ্বায়িত্বে থাকা সন্ন্যাসী, উঁচু মিনারে উঠে প্রথমে বিরাট এক ভেরি, তারপর শঙখ বাজান।আর সব শেষে ঝনঝন রবে বাজাতে থাকেন কাঁসর। এই সমবেত ধ্বনি শুনতে পেলেই রাজা বিহারের পথে অগ্রসর হন।ফুল আর সুগন্ধি সহযোগে পূজা সম্পন্ন করেন।পূজা শেষে সকলে একে একে আভূমিনত প্রণাম করে, প্রস্থান করেন। পূর্ব দ্বার দিয়ে প্রবেশ এবং পশ্চিম দ্বার দিয়ে প্রস্থান করে, রাজা প্রতিদিন সকালে একইভাবে নিজের পূজা নিবেদন করেন। তারপর রাজা তার রাজ দরবারের কাজ আরম্ভ করেন। বিদ্বান ও প্রবীণ ব্যক্তিগণ প্রথমে এখানে পূজা সম্পন্ন করেন তারপর নিজ নিজ কর্মে মনোনিবেশ করেন। এই হল নিত্যদিনের সূচি। কোনোদিন এর কোনো নড়চড় হয় না।সকল পূজা সমাধা হলে করোটিখানি আবার বিহারের অন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিহারের অভ্যন্তরে আছে একটি স্বতন্ত্র প্যাগোডা। এটি মূল্যবান সপ্ত দ্রব্যে তৈরি, পাঁচ ফুটের অধিক উচ্চতা বিশিষ্ট। প্যাগোডাটি কখনো খোলা হয়, কখনো-বা আবার বন্ধ থাকে। বিহারের মূল ফটকের সামনের দিকে প্রতিদিন সকালে ফুল আর ধূপ বিক্রেতার আনাগোনা শুরু হয়, যাতে পূজা দিতে আসা ভক্তগণ তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তাদের কাছ থেকে কিনতে পারেন। এ-দেশের অন্যান্য রাজা যারা আছেন, তারাও নিয়মিত তাদের অমাত্যদের প্রতিনিধি হিসেবে পূজা নিবেদন করতে পাঠান এই বৌদ্ধ বিহারে।বিহারটি চল্লিশ কদম বর্গাকৃতি বিশিষ্ট। স্বর্গ, মর্ত্য কেঁপে উঠলে, ধরনী দ্বিধা হলেও এই স্থানটি রইবে অবিচল।

এখান থেকে উত্তরে এক ইউ ইয়েন দূরত্ব অতিক্রম করে তীর্থযাত্রী দল, না শিয়ের রাজধানীতে এসে পৌঁছোল। এখানে বোধিসত্ত্ব পাঁচটি বৃন্ত বিশিষ্ট ফুল নিবেদন করেছিলেন দীপংকর বুদ্ধকে। বুদ্ধের দাঁতের স্মারক নিয়ে তৈরি প্যাগোডা রয়েছে এ-শহরে। করোটির উদ্দেশে যেভাবে পূজা করা হয় সেই একই উপচারে পূজা দেওয়া হয় এই প্যাগোডাতেও।

এখান থেকে চলে যাও এক ইউ ইয়েন উত্তরপূর্বে, গিয়ে পড়বে একটি উপত্যকার প্রবেশ মুখে। এখানে রাখা আছে বুদ্ধের রূপদস্তায় তৈরি যষ্টি। এটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একখানি বিহার আর এখানেই পূজা করা হয় দণ্ডটিকে। গো-শির চন্দনে প্রস্তুত এই দণ্ড, ১৬-১৭ ফুট দীর্ঘ। একটি কাঠের খাপের ভিতরে রাখা আছে এটি। শত বা সহস্র জন মিলেও এই খাপ থেকে দণ্ডটিকে সরানো যায় না।

এই উপত্যকায় পশ্চিম দিক বরাবর দিন চারেকের পথ পেরোলে এসে পৌঁছোনো যাবে এক বৌদ্ধ বিহারে। এখানে পূজিত হয় বুদ্ধের সংহাতি বা কাসায় বস্ত্র। কথিত আছে যে, এ-দেশ যখন অত্যধিক খরার কবলে পড়ে, রাজ্যের প্রধান ব্যক্তিগণ ও সাধারণ মানুষজন মিলে বুদ্ধের বস্ত্রটি বাইরে বের করে আনে এবং পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করে। অনতিবিলম্বে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়।

এই স্থান থেকে অর্ধ ইউ ইয়েন দূরে, শহরের দক্ষিণ দিকে আছে একটি গুহা। বৃহৎ পর্বতশৃঙ্গের দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে এই গুহা। বুদ্ধ তার ছায়া রেখে যান এই গিরি-গুহা গাত্রে। দশ কদমের অধিক দূরত্ব থেকে দেখলে, স্বর্ণাভ বর্ণের একখানি, উজ্জ্বল, ঝলমলে, বুদ্ধের পূর্ণাবয়ব সিল্যুয়েট ভেসে ওঠে চোখের সামনে। যত এগিয়ে যেতে থাকবে এই ছায়ার দিকে, তত অস্পষ্টতা ঘিরে ফেলবে তোমায়। রইবে কেবল ছায়া, কেবল একফালি আঁধার।তথাগত রইবেন অধরা।

পড়শি রাষ্ট্রগুলি থেকে সম্রাটগণ সবচেয়ে দক্ষ চিত্রকর পাঠালেন এই ছায়া অনুসরণে একখানি ছবি আঁকাবার উদ্দেশ্যে। হায়! সব নৈপুণ্যের অতীত তিনি। কেউ পারল না ছবিতে তাঁকে বাঁধতে। এ-দেশের মানুষের বিশ্বাস, তথাগত তাঁর সহস্র জন্মের ছায়া রেখে যাবেন এই গুহা গাত্রে। বুদ্ধ যখন জীবিত ছিলেন, এই ছায়া-স্থল থেকে একশো কদম পশ্চিমে একটি জায়গায় নখ কাটেন আর শির মুণ্ডন করান। এর পর ভবিষ্যতে প্যাগোডার আদর্শ নমুনা হিসাবে তার শিষ্যদের সহায়তায় সত্তর-আশি ফুট উচ্চতার একটি প্যাগোডা নির্মাণ করান।এই প্যাগোডা বর্তমানে বিদ্যমান। এর পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে একখানি মন্দির। আর এই মন্দিরে থাকেন সাতশো জন সন্ন্যাসী।

চতুর্দশ অধ্যায়

ক্রমে শীত তার হিমের পসরা সাজিয়ে হাজির হল। এ-ঋতুর দ্বিতীয় চাঁদে ফা-হিয়েন আর তাঁর দু-জন সহযাত্রী মিলে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হতে শুরু করলেন।পার করলেন বরফাবৃত পর্বতশৃঙ্গ। শীত গ্রীষ্মের প্রভেদ নেই কোনো। চির তুষারাবৃত পর্বতশ্রেণি। পর্বতের উত্তর গাত্র ছায়াবৃত, তাই ভয়ংকর ঠান্ডা। যখন হাওয়া বইতে শুরু করে, হাড় পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। কাঁপুনির চোটে মুখ খোলা দুষ্কর। দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি হয়ে একাকার, তাই নীরব থাকাই যেন বাধ্যতামূলক। হুই চিং-এর আর এগোবার ক্ষমতা নেই, মুখের ভিতর ফেনা। অতি কষ্টে ফা-হিয়েনকে বললেন, “আমার আর উদ্ধার নেই, আর বাঁচব না আমি। তুমি এগিয়ে যাও, যতক্ষণ পারো। নতুবা আমরা সকলে একসঙ্গে প্রাণ হারাব।” মৃতদেহের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ফা-হিয়েন হাহাকার করে কেঁদে উঠলেন। বলতে লাগলেন, “ভ্রমণের মূল পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত করা যাবে না। এই ছিল ভবিতব্য!” সকলের উদ্যম যেন সত্যিই নিঃশেষিত। তারপরও নিজেদেরকে আরও একবার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলা শুরু।পর্বতশ্রেণি অতিক্রম করে দক্ষিণ ঢালে এসে পৌঁছলেন তাঁরা। অবশেষে এসে পড়া গেল আফগানিস্তান। তিন হাজার সন্ন্যাসী আছেন এ-রাজ্যে। সকলেই মহাযান ধর্মাবলম্বী। এবারের বর্ষা এ-দেশেই কাটল। আর বর্ষা অন্তে আবার বেরিয়ে পড়া দক্ষিণ প্রান্ত ধরে। এবার এসে পৌঁছোলেন তাইওয়ান প্রদেশে। এখানেও রয়েছেন তিন হাজারের বেশি সন্ন্যাসী। তবে এখানে সকলেই হীনযান সম্প্রদায়ের। এই স্থল থেকে ঠিক তিন দিন ভ্রমণ করে তাঁরা আরও একবার হিন-তো নদী পার করলেন। এই নদীর দুই তীর একেবারে সমতল।

পঞ্চদশ অধ্যায়

নদীর অপর তীরে আছে পি-তু নামের একটি দেশ। এখানে বৌদ্ধধর্ম তার সকল সমৃদ্ধি নিয়ে বর্তমান, তা সে হীনযান হোক বা মহাযান। এ-দেশের মানুষেরা যখন দেখল সুদূর চীন থেকে একদল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এসেছেন, বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটে না তাদের। এই ব্যাপারটি দারুণ প্রভাবিত করল সাধারণ মানুষকে। সংসার ত্যাগী হয়ে একজন বিদেশির পক্ষে এই সুদূর পরবাসে ধর্ম সন্ধান, এ একপ্রকার অকল্পনীয় তাদের কাছে। তীর্থযাত্রীদের প্রয়োজনীয় সব সামগ্রীর বন্দোবস্ত করলেন তারা। অতিথিদের প্রতি তাদের আচরণ ছিল বুদ্ধের নীতি অনুসারী।

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

 

Categories
2021-Aug-Story

অলোকপর্ণা

রাজু ও নোনতা লোক

লোকটাকে ঠিক বাবার মতো দেখতে। রাজু লক্ষ করে দেখেছে। রোজ সকালে নোনতা মুখে রাজুর বাড়ির সামনে দিয়ে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে চলে যায়। অর্থাৎ, পূর্ব থেকে পশ্চিমে। দাঁত ব্রাশ করতে করতে লোকটার চলে যাওয়া দেখে রাজু প্রতিদিন। লোকটা যায়, কিন্তু ফেরে না। রাজু তার ফিরে আসা দেখেনি কোনোদিন। রাজু জানে লোকটাকে চলে যেতে কেমন দেখতে লাগে, লোকটার ফিরে আসা কেমন— রাজু জানে না। রাজুর বাড়ির সামনের দিয়ে রাজুর বাবার মতো দেখতে লোকটা সকাল সকাল শুধু চলেই যায়, ফেরে না।

কোথায় যায়? নিশ্চয়ই কাজে। কীসে যায়? ট্রেনে নিশ্চয়। স্টেশন তো বাঁ-দিকেই। যে-সময় লোকটা নোনতা মুখে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে যায়, সে-সময় স্টেশনে গেলে আপ বনগাঁ লোকাল আর ডাউন শিয়ালদা লোকাল বারো বগি আসে পরপর। লোকটা হয়তো শিয়ালদা যায়। লোকটা হয়তো বনগাঁ যায়। রাজুর বাড়ির সামনে দিয়ে রাজুর বাবার মতো দেখতে লোকটা রোজ সকালে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে নোনতা মুখে দ্রুত হেঁটে যায়।

লোকটার চারটে জামা, সবক-টা হলদেটে। লোকটার দুটো ফুল প্যান্ট, একটা খয়েরি, একটা ধূসর। লোকটার খয়েরি চামড়ার জুতোজোড়া মাসে দু-বার পালিশ হয়। হাতের রুপোলি চেনের ঘড়ি লোকটার পিঠে থেকে থেকে চাবুক মারে। লোকটার চুল ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে পাট করে রাখা। রোজ সকালে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে নোনতা মুখে স্টেশনে যাওয়ার সময় রাজুর বাবার মতো দেখতে লোকটাকে কেউ বলে না, যে-হলদে রং তার গায়ে বেমানান।

রাজু লোকটাকে দেখে এসে কলতলায় মুখ ধুয়ে ফেলে। তারপর মাঝে মাঝে মায়ের ঘরে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে দেওয়ালে নোনতা লোকটার মতো দেখতে রাজুর বাবার ছবি ১৯৮৫ সালের ১৩ই ডিসেম্বর থেকে ঝুলছে। নোনতা লোকটার মতো দেখতে রাজুর বাবা কোথাও যায় না, না ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে, না বাঁ-দিক থেকে ডান দিকে, শুধু ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। নোনতা মুখে।

¬¬তার পাশেই ইদানীং মায়ের ছবিটা, যা রাজু লক্ষ করে না। মায়ের বেশি বয়সের ছবির পাশে বাবার অল্প বয়সের ছবি বসবাস করতে করতে বাবাকে একসময় মায়ের ছোটোভাই বা যুবক বয়সে হারিয়ে যাওয়া ছেলের মতো দেখায়। হয়তো নকশাল আমলে পুলিশের গু খেয়ে মৃত। অথবা পথদুর্ঘটনায়। অর্থাৎ, পথদুর্ঘটনায়।

রাজুর আর মনে থাকে না, নোনতা লোকটার মতো দেখতে মানুষটা রাজুর বাবা। মায়ের ছোটো বয়সে হারানো ভাই বা ছেলের মতো, নোনতা লোকটার মতো দেখতে রাজুর বাবার ছবি রাজুদের দেওয়াল থেকে ঝুলে থাকে। রাজু ছবিদের ঝুলে থাকা দেখতে দেখতে সকালের চা খায়।

আর ভাবে, এখন নিশ্চয় লোকটা দমদম ক্যান্টনমেন্ট, অথবা বামুনগাছি।

অথবা বৃষ্টির কারণে ট্রেন লেট করায় ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন মনে কান খাড়া করে রেল লাইন দেখছে।

লোকটার অপেক্ষা ভাবতে গিয়ে রাজু গরম চায়ে চুমুক দিয়ে জিভ আংশিক পুড়িয়ে ফেলে।

কোনোদিন সকালে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে যাওয়ার সময় লোকটা ব্রাশমুখে রাজুকে লক্ষ করে না। কোনো দিকে না তাকিয়ে স্টেশনের তরফে নোনতা মুখে ধেয়ে যায়। লোকটার মুখ সকাল সকাল নোনতা হয় কীভাবে? লোকটার বউ অভিযোগ করে না এই নিয়ে? কেন হররোজ লোকটা নোনতা মুখে ঘর থেকে বেরোয় আর ফিরে আসে না? রাজু নিজের মনেই গুম হয়ে থাকে। রাজু জানে না লোকটাকে হাসলে কেমন দেখায়। রাজু তবু জানে লোকটাকে হাসলে কেমন দেখায়।— বাবার মতো। এভাবেই রাজু জানে লোকটাকে কাঁদলে, রাগ করলে, কষ্ট পেলে কেমন দেখতে লাগে। তবু রাজু জানে না। রাজুর বেশি বেশি জানতে লোভ হয়।

একদিন সকালে রাজুর বাড়ির সামনের রাস্তায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আর ঠিক সেই সময়েই ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে নোনতা মুখে হেঁটে যাচ্ছিল বাবার মতো দেখতে লোকটা। প্রবল বর্ষায় দুটো পথকুকুরের সাথে লোকটা তার নোনতা মাথা বাঁচাতে রাজুদের খোলা বারান্দায় আশ্রয় নিল।

রাজু বলল, “ভিতরে এসে বসতে পারেন,”

লোকটাকে ভেলকি দেখাবে বলে রাজু নিয়ে এল তার মায়ের ঘরে, যেখানে দেওয়াল থেকে মায়ের পাশাপাশি যুবক বাবার ছবি লেগে আছে। লোকটা চুপ করে বসল চেয়ারে। খয়েরি প্যান্টটা পরেছে সে আজ, তারই পিছনের পকেট থেকে আরও খয়েরি একটা রুমাল বের করে মাথা, কপাল, দুহাত থেকে জলকণা মুছে নিল। রাজু বলল, “চা খাবেন?”

“না না, দরকার নেই,”

“আমি খাব এখন, আপনার জন্যেও আনি,”

রাজু মন দিয়ে চা করে। বেশি বেশি চিনি দেয়। লোকটার হাতে সেই চা পৌঁছে দিয়ে দেওয়ালের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে এমনভাবে যাতে যে-কেউ ভদ্রতাবশত প্রশ্ন করে, “আপনার বাবা মা?”

“আপনার মা বাবা?”, নোনতা লোকটা জানতে চায়।

রাজুর চোখ চকচক করে ওঠে। নোনতা লোকটা এবার নিশ্চয়ই অবাক হয়ে যাবে, যখন সে বুঝবে তাকে হুবহু রাজুর বাবার মতো দেখতে। রাজু প্রতিক্ষা করে।

“আপনার মা বাবা?” লোকটা আবার সহজ প্রশ্ন করে, অবাক হয় না।

রাজু উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, আমার বাবা অহিভূষণ সরকার, মা উমা সরকার। বাবা কর বিভাগে কাজ করতেন। ১৯৮৫ সালের ১লা ডিসেম্বর তিন দিনের জ্বরে মারা যান।” বলে রাজু ফের নোনতা লোকটার অবাক হওয়ার অপেক্ষা করে। তবু লোকটা অহিভূষণ সরকারের সঙ্গে নিজের মুখের মিল খেয়াল করে না।

রাজু চুপ করে চায়ে চুমুক দেয়, প্রতি চুমুকে সে আশা করে লোকটা এইবার তার বাবার সাথে নিজের মুখের মিল টের পাবে। বাইরে বৃষ্টি উত্তরোত্তর বাড়ছে। রাজু জানে ছাদের ফাটা জায়গাগুলো দিয়ে জল পড়া আরম্ভ হবে এবার।

এই সুযোগ, অহিভূষণ সরকারের ছবির সামনে লোকটাকে বসিয়ে রেখে রাজু উঠে দাঁড়ায়, “আপনি বসুন, আমি বালতি নিয়ে আসি।”

দু-হাতে দুটো বালতি আর একটা মগ নিয়ে ফিরে সে দেখে লোকটা এখনও চুপচাপ চা খেয়ে চলেছে।

ঘরের তিনটে জায়গায় নিপুণ লক্ষ্যভেদে দুটো বালতি ও একটা মগ রেখে দিয়ে রাজু চেয়ারে এসে বসে। কাছ থেকে লোকটাকে দেখতে সহজ লাগছে রাজুর। হলদে জামা খয়েরি প্যান্ট। হাতের রুপোলি ঘড়ি। লোকটার নখগুলো দেখে রাজু। কেজো নখ। না ধূর্ত, না ভোঁতা। রাজু আরাম পায়। এতদিনে কাছ থেকে লোকটার আগাপাশতলা সে দেখতে পাচ্ছে। আরামে রাজুর আনন্দ হয়, সে বলেই ফেলে, “আপনার সাথে কিন্তু আমার বাবার মুখের খুব মিল,”

লোকটা অন্যমনস্ক ছিল, ফিরে এসে অবাক চোখে বলল, “তাই?”

রাজু বুঝল লোকটা অবাক হওয়ার ভাণ করছে, আসলে অবাক হয়নি। লোকটা এখন রাজুর বাবাকে মন দিয়ে দেখার ভাণ করছে। লোকটা এখন নিজেদের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়ার ভাণে মাথা নাড়ছে। বালতি আর মগে জল পড়ার টপ টপ আওয়াজ শুরু হল।

লোকটার মুখ এখন আর নোনতা নয়, মিঠে লাগছে রাজুর। চিনির প্রলেপ দেওয়া। মেকি। উগ্র গন্ধ পারফিউম যেমন ফুলের গন্ধের ভাণ করে, লোকটা তেমন অবাক হওয়ার ভাণ করে রাজুর সকালটা একটু একটু করে চালাক করে দিচ্ছে।

একটা চালাক বৃষ্টির সকালে অবাক হতে চাওয়া একটা লোকের সামনে বসে আছে রাজু, হাতে চায়ের কাপ। চা খাওয়া শেষ, দূরে বালতিতে ছাদ ফেটে বৃষ্টির জল জমা হওয়ার শব্দ। দেওয়ালে রাজুর সদ্যপ্রয়াত মা, এবং অহিভূষণ সরকার।

এর মধ্যেই লোকটা চায়ের কাপ হাতে উঠে দাঁড়াল। ভাণ করল রান্নাঘর খোঁজার, বলল, “কোথায় রাখব,”

“আমাকে দিন” বলে রাজু হাত বাড়ালো আর লোকটার চামড়া ছুঁয়ে দিল তার হাত।

রাজুর চোখে মুখে চড় চড় করে একটা বাজ পড়ল। রাজু টের পেল— লোকটারও তাই।

রাজু দাবার ঘুটির মতো হিসেবি পায়ে রান্নঘরে এসে চায়ের দুটো কাপ পাশাপাশি নামিয়ে রেখে আবার অংকের মতো হিসেব করে করে মায়ের ঘরে ফিরে এসে দেখল লোকটা এখনও বজ্রাহত স্থির দাঁড়িয়ে আছে।

রাজু যেভাবে তাকে রেখে গেছিল, সেভাবেই।

কাছাকাছি ফের বাজ পড়ল কোথাও।

রাজুর ঠোঁটের ভিতর লোকটার নোনতা ঠোঁট মিশে যাচ্ছে। রাজুর পেশিতে পেশিতে লোকটার বাজ পড়ছে। বালতিতে টপ টপ করে রাজুরা জমা হচ্ছে। অহিভূষণ সরকার এবং উমা সরকারের ছবির সামনে নোনতা লোকটা রাজুকে গিলে ফেলছে টপাটপ। রাজু জোর টান মেরে লোকটার হলদে শার্ট চড়চড় করে ছিঁড়ে ফেলল।

বোতামেরা মাটিতে কিছুক্ষণ লুটোপুটি খায়। দূরে জল পড়ার টপ টপ শব্দ হতে থাকে।

রাজুর দুনিয়া নোনতা হয়ে যায়।

লোকটাকে খানিকটা বাবার মতো দেখতে, হুবহু নয়। রাজু বোঝে এখন। রোজ সকালে নোনতা মুখে রাজুর বাড়ির সামনে দিয়ে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে এখনও চলে যায়। দাঁত ব্রাশ করতে করতে লোকটার চলে যাওয়া দেখে রাজু প্রতিদিন।

কোথায় যায়? নিশ্চয়ই কাজে। কীসে যায়? ট্রেনে নিশ্চয়। স্টেশন তো বুকের বাঁ-দিকেই। যে-সময় লোকটা নোনতা মুখে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে যায়, সে সময় স্টেশনে গেলে আপ রাজু লোকাল আর ডাউন রাজু সরকার লোকাল বারো বগি আসে পরপর। লোকটা হয়তো রাজুতে যায়। লোকটা হয়তো রাজুতে আসে। রাজুর বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে যেতে নোনতা লোকটা একবারও রাজুর দিকে ফিরে তাকায় না।

লোকটা এখন তিনটে হলদে জামা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ে। লোকটার দুটো ফুল প্যান্ট, একটা ধূসর, একটা খয়েরি— যাতে সেদিন রাজু লেগে গেছিল। রোজ সকালে, ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে নোনতা মুখে চোয়াল শক্ত করে স্টেশনে যাওয়ার সময় রাজুর বাবার মতো দেখতে লোকটাকে কেউ বলে না, রাজু তাকে হাঁ করে দেখছে।

লোকটা যায়, কিন্তু ফেরে না। রাজু তার ফিরে আসা কোনোদিন দেখেনি। রাজু জানে লোকটাকে চলে যেতে কেমন দেখতে লাগে, লোকটার ফিরে আসা কেমন দেখায় তা রাজু জানে না।

সেই যে একদিন এসেছিল, তারপর রাজুর জীবন থেকে দূরে, আরও দূরে রাজুর বাবার মতো দেখতে লোকটা সকাল সকাল শুধু চলেই যায়, রাজুর কাছে কোনোদিন ফিরে আসে না। আসবে না।

রাস্তায় আকাশ ভেঙে পড়লেও না। কাছে-দূরে কোথাও বাজ পড়লেও না। রাজু রাজুতে মিশে থাকে। এখনও নোনতা হয়ে থাকে।

মুখ ভরা পেস্টও নোনতা হয়ে যায়। মুখ ধুয়ে ফেলতে ফেলতে রাজু ভাবে– “আজকাল সবাই টুথপেস্টে নুন দিচ্ছে নাকি রে বাবা”

Categories
2021-Aug-Story

ঝুমুর পাণ্ডে

ভিখারি বুড়োউয়া

এক

বলবেন নাই বাবু কাল হামি দুইটা মার্ডার করলাম।

মার্ডার?

হঁ বাবু তার বাদে নিজেও মার্ডার হইলাম।

ভোটবাবু পান চিবোতে ছিল। এখন সব পানসুপুরি গলায় আটকে গেল। আজকাল সব দামি দামি গাড়ি চলছে এই জংলা রাস্তা দিয়ে। আহা রে কত রঙের, কত কিসিমের গাড়ি, ভোটপরব বলে কথা। কত মানুষ এখন বিড়ি ছেড়ে সিগারেট ধরেছে। শ্যামবতীর ঘরের মদ ছেড়ে বিলাতি ঢালছে গলায়। তবে অবশ্য বিলাতি এক দু-জনের ভাগ্যেই জুটছে। জুটুক। বিলাতি মালে কি আর নেশা হয়? আর ঠিকমতো নেশা না হলে আর খাওয়া কেনে?

হঁ ভালা।

হঁ ভালা খাওয়া কেনে?

নিজের মনে মনেই দু-তিনবার আওড়াল ভিখারি।

হই দেখ ভিখারি বুড়োউয়া যাচ্ছে। বাচ্চাগুলো আবার বলে— ভিখারি বুড়োউয়া। ভিখারি বুড়োউয়া। বুড়োউয়া বলছিস। ব্যাগ কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াল ভিখারি। কী বললিস। বুড়োউয়া? হামি বুড়োউয়া। তোদের মাই বুড়োউয়া বাপ বুড়োউয়া। তোদের চৌদ্দোগোষ্ঠী বুড়োউয়া। বুড়োউয়া বলছে। বয়স হামার দুই কুড়িও হইল নাই বুঝলিস। হামার দাঁতে সোহাগা লাগাইছিলি ওই রামধনীর মায়ের কথায়। হই যে পাতি তোলে রামধনীর মা। হঁ। দাঁত একটায় দরদ হতেছিল। হ্যাঁ সত্যিই রোজ ভেরেন্ডার কষ দিয়ে দাঁতন দিয়ে ঘষত তবুও। আর সোহাগা লাগাতেই দাঁতগুলো নাকি পড়ে গেল সব খসখস করে।

তখন বাচ্চাগুলো বলত পিছু পিছু— ফোকলা বুড়হা যাচ্ছে। ফোকলা বুড়া হুতোমপেঁচা। আর বাচ্চাগুলোর দোষ কী? ওদের সব শিখিয়ে দেয় ওই যে নকলা! নকলা রিকিয়াসন। যেমন একবার বাসন্তীর মাকে বলার জন্য শিখিয়েছিল বাচ্চাদের। ওকে দেখলেই বাচ্চাগুলো বলত—

বাসন্তীয়াকে মায়ি

শাগ রোটি খায়ি…

তবে রাগত না বাসন্তীর মা। উলটে সবাইকে দাঁড়িয়ে বলত— দে লেইকন দে। শাক রোটি দে। খাইব।

বড়ো হাসিখুশি থাকত এই বাসন্তীর মা। জঙ্গল থেকে মাটি খুঁড়ে জংলি আলু আনত। জংলি বেগুন আনত। আনত কচু শাক। বাবুভাজি। কিন্তু একবার রক্ত আমাশা হয়ে মরে গেল বাসন্তীর মা। বাসন্তীরও জানি কোথায় বিয়ে হয়ে গেল।

ভিখারির প্রায় কাঁধ ঘেঁষে একটা গাড়ি চলে গেল। একটু হলেই মরত। কী গাড়ি কী জানি। আজকাল তো কত কিসিমের গাড়ি। সব গাড়ির নামও জানে না ভিখারি। আগে তো ওই বাস, ট্রাক আর জিপগাড়ি। সাহেবেরও একটা জিপগাড়ি ছিল। কখনো কখনো ওকে পেছন থেকে ধাক্কা দিতে হত। ভিখারিও কত বার ধাক্কা দিয়েছে। কখনো কখনো বাসগাড়িও বড়োরাস্তায় খারাপ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে বাচ্চারা ছুটত ধাক্কা দিতে। ওই ধাক্কা মারাটাই একটা বিরাট মজা ছিল ওদের কাছে। অনেকক্ষণ ধাক্কা দেওয়ার পর গাড়িটা যখন চলতে শুরু করত তখন আহা রে কী যে আনন্দ হত, মনে হত যেন কত বড়ো যুদ্ধ জয় করল। তবে যুদ্ধ আর কোথায় দেখল ভিখারি। ওই যাত্রা দেখতে গিয়ে দেখত। ওরা অবশ্য গান বলত, কেউ নাচও বলত। বগলে পিঁড়ি নিয়ে মা যেত মাথায় চুপচুপ করে গন্ধ তেল মেখে। সর্দার সুমন্ত তখন লাঠি দিয়ে বলত হেই হাল্লা। হেই হাল্লা। স্টেজে তখন পেট্রোমাক্স বাতির আলোয় যুদ্ধ চলত। আহা রে তরোয়াল নিয়ে সে কী যুদ্ধ। একবার তো ওই যুদ্ধ করতে করতে রাজার ধুতি খুলে গেল। ওই যে পোস্টমাস্টার ছিল গো কী যেন নাম বউয়ের বিয়ের বেনারসি শাড়ি এনে ধুতি করে পরে রাজা সেজেছিল। সে আর এক বৃত্তান্ত। নিজেরাও চুরি করা আলতা, সিন্দুর ঠোঁটে গালে মেখে গাছের ডাল দিয়ে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলত। সে কী আনন্দ। সে কী উত্তেজনা। ওইরকম খেলতে খেলতেই একদিন খবর পেল চা ঘরে মেশিনে পাতি ঢালতে ঢালতে বাপের হাত ঢুকে গেছে মেশিনে। ওই দিনের কথা মনে হলে এখনও গা-টা থরথর করে কাঁপে। মা তখন চলে গেছিল বাপের ঘরে। আবার একটা গাড়ি হুস্ করে গেল। বড়োরাস্তা দিয়ে। এখন আল ধরে হাঁটছে ভিখারি। দুটো বাচ্চা ছেলে ওদিকে কাঁকড়ার গর্তে হাত ঢুকিয়েছে। একজন হাত দিয়ে টেনে একটা কাঁকড়া বের করে আনল। ভিখারি বুড়োউয়া। ভিখারি বুড়োউয়া।

তোদের মা বুড়োউয়া। বাপ বুড়োউয়া।

বাচ্চাগুলো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে।

হামি বুড়হা লাগি?

তোর চুল যে গো ধলা। দাঁতও নেই একটাও।

সত্যিই জন্ম থেকেই ভিখারির চুলটা সাদা। মানে একদম রুপালি রং। গায়ের রংটা আবার কালো। কে জানে কার কোন সাহেবের জিন বহন করছে ভিখারি। এদিকে মানে এই চা বাগানে অনেকের রং কালো। সোনালি চুল। কেউ সাদা রং নিয়ে জন্মেও পরে রোদে-জলে কাজ করতে করতে রংটা কেমন তামাটে হয়ে যায়। বাচ্চাগুলো এখন আর একটা কাঁকড়া বের করল। ভিখারি বুড়োউয়া। ভিখারি বুড়োউয়া। না— এদের সঙ্গে মুখ চালিয়ে আর লাভ নেই মিছেমিছি। ওদিকে কাজললতা তুলছে পরাণের মা। ছেলাগিলান বহুত বদমায়েশ হয়েছে হঁ। দেখনো কেমন বুড়োউয়া বলছে। হামি বুড়োউয়া লাগি। তুহেই বলনো গো?

আরে তোর জনম দেখলি। তোর ধাই কলৌতি এখনও বাঁচে আছে। নিজের হাতে রান্ধাবাড়া করে খাছে। বলনো ভালা। আর তোখে মানুষ… কাজললতাগুলো এখন শাড়ির আঁচলে বেঁধে নিচ্ছে পরাণের মা। রোদটা এখন বেশ তেতে উঠেছে। পরাণকে বললাম যা জালটা লিয়ে। দুটা পুটি চিংড়ি ধরে আন। হামি কাজললতা লিয়ে আসছি। বাকিন যেই উ বাহরাইল একটা ভুটের গাড়ি উওয়াকে উঠায় করে লিয়ে গেল।

এ মা কাঁহা গেল গো?

কী জানি বাবা। কাল তো পয়সা পায়ে একটা মুরগি কিনেছিল।

খাইলি?

নাই। নাই। রান্ধার বাদে ওই ভুটের ইয়ার গিলানেই সব খায়ে লিল।

এ মা?

হঁ বাদে হামি তো খালি ঝোল দিয়ে ভাত খাইলি।

বাচ্চাগুলো আবার বলছে ভিখারি বুড়োউয়া। ভিখারি বুড়োউয়া।

বল বল কত বলবিস বল? ওদিকে এখন গান গেয়ে গেয়ে আসছে শ্যাম রবিদাস।

সারাদিন রোজি করলি

এক রুপিয়া পাইনু হো

দাদা হো তেনি সাদা দা।

এখন কোনে এক রুপিয়ার যুগ আছে গো? ব্রিটিশ যুগের গান বলছিস? শ্যাম রবিদাসের এ-সব কিছুই কানে ঢুকছে না। আবার গাইছে আরও জোরে জোরে—

বারো আনা কে চাওল কিনলু

চার আনা কে দাল হো

দাদা হো তেনি সাদা দা…

এই শ্যাম রবিদাসের চারা বাড়ির কাছে কিছু জমি ছিল চা বাগানের ইংরেজ সাহেবের দেওয়া। কিন্তু এই দেশি সাহেব কয়েক বছর আগে সব জমি হাতিয়ে নিল। একটা ঘোড়া ছিল ওটাও মরল। বউও বিছানায়। হাঁটতে পারে না। এইসব দুঃখেই বোধহয় শ্যাম রবিদাস সবসময় গান করে। রাতে ঢোলকও বাজায়। তখন ওর সাঙ্গপাঙ্গরাও জড়ো হয়। আগে শীতটা যাব যাব করলেই সেই ফাগুন মাসে একজন হিজরা এসে ওর ঘরে থাকত। লম্বা বিনুনি ডান হাতে দুলাতে দুলাতে বাঁ-হাত কোমরে রেখে নাচত আর ভাল লাগে না বাবু বান্ধা কবির তরকারি। শ্যাম তখন ঢোলক ছেড়ে হারমোনিয়মের রিড ধরত। ভিখারি তখন বোতাম ছাড়া প্যান্ট এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে কুল খেতে খেতে ওদের পিছু পিছু ঘুরত। আকাশের দিকে তাকালো। অনেক সাদা সাদা মেঘ। দল ছাড়া একটা বক একা একা উড়ে যাচ্ছে। ওদিক দিয়ে শ্যামবতী দেখি কতটা গুগলি নিয়ে আসছে কচুপাতায় করে— আবার গান গাইছে—

ঝিঙ্গা ফুল উড়িল বাতাসে গো

হাতে ধরি চুমা খাব তোখে

ঝিঙ্গা ফুলে মধু আছে…

গুগলি কাঁহা পাইলিস?

গান থেমে গেল শ্যামবতীর।

হামার মাও বলে গুগলি লিয়ে দিতে।

হঁ তো দিস নাই কেনে লিয়ে? হইতো চারা বাড়ির নালায় কত ঘুরাঘুরি করছে। ঝিনুকও আছে।

সচ বলছিস?

সচ না তো কী? খাকড়িও আছে।

বুড়হা মা চোখে দেখছে না। কতদিন থেকে। তবু শাকপাতা ছিঁড়ে আনে। আনে জংলি বেগুন। চাম কাঁঠালের বিচি কুড়োয়। সবই আন্দাজে। আগে তো জংলি আলু খুঁড়ে আনত জঙ্গল থেকে। খাম আলু, চুন আলু। মা-বেটা মিলে পুড়িয়ে পুড়িয়ে খেত। বউটা তো আর দুদিনও থাকল না। চলে গেল। আবার কী কাণ্ড। আবার সাঙা করে এখানেই এসেছে। ওই পল্টু চারা বাড়িতে নম্বরে জল খাওয়ায়। ওই পল্টুর সঙ্গেই সাঙা হয়েছে। মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। লজ্জায় না ঘৃণায় কে জানে। পল্টু অবশ্য দেখলেই বলে কেমন আছ ভায়া? আর কীর্তনেও মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যায়। গাঁজার ছিলিমটা যখন কীর্তনে এক হাত থেকে আর এক হাতে ঘুরে তখন ছিলিমটাও এগিয়ে দেয় পল্টু। পঞ্চায়েতের ঘরে টিভি দেখতে যেত সে অনেক আগে। যখন রবিবারে সারা হপ্তায় শুধু একটা সিনেমা তখন পঞ্চায়েতের ঘরে গিয়ে মাটিতে পাশাপাশি বসে টিভিতে সিনেমা দেখত। কত মানুষ গিজগিজ করত। তবু পল্টু ওর পাশেই বসত। আর আজ কিনা ওর বউকে সাঙা করল? করুক। ওর আর কী দোষ? বউটাই তো ছেডে চলে গেল। আর ঝগড়া না কাজিয়া। যাওয়ার সময় ওর মায়ের রুপার হাঁসলিটাও নিয়ে গেল। যাক। কী আর করা। সব কিছুকে কি ধরে রাখা যায়? কিছু কিছু জিনিস তো এমনি আলগা হয়ে খসে পড়ে। ভিখারি বুড়োউয়া। ভিখারি বুড়োউয়া। আবার কারা বলছে। কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। ব্যাগ কাঁধে দুটো চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে ভিখারি। না, কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। বেজন্মার ছেলারা। হেই কে বলছিস বাইরাহ। হঁ বাইরাহ বলছি। কতবার ভাবে ভিখারি মুখ খারাপ করবে না, তবু ওই বুড়োউয়া শুনলেই মাথাটা কেমন চনচন করে উঠে। এক একবার মনে হয় হাতের সুখ মিটিয়ে নেয় দু-চার থাপ্পড় মেরে। যেমন সেই সনৎ মাস্টারের ইশকুলে পড়ার সময় বাচ্চাগুলো বলত দে দে ভিখারি আইসেছে। এক টুকুন ভিখ আনে দে। কেউ বলত— চাল লিবি ন পয়সা লিবি? অন্যরা তখন কেউ হি হি কেউ হো হো কেউ বা হা হা করে হাসত। ওই জন্য শেষে দ্বিতীয় ভাগ পড়েই ইশকুল ছাড়ল ভিখারি। আর যায়নি। সনৎ মাস্টার ঘরে এল। তবু না। বাগানে লেড়কা দফায় কাজে ঢুকল। নম্বরে গেলেই সাথীরা বলত ভিখারি আইল হি হি হি… আর একবার করমপূজায় নাচ হচ্ছিল— সবাই হাত ধরাধরি করে নাচছিল—

পাতি তুললি কিনি কিনি

কলে ওজন দিয়েছি

নয় পণ পাতি ছয় পণ হইল

হায় রে মনের দুখে রয়েছি…

বীরসা বাজাচ্ছিল মাদল। ভিখারি ওর বাঁশের বাঁশিটা নিয়ে গেছিল। যেটা বাগাল বুড়োর সঙ্গে গোরু চরাতে চরাতে বাজাত। এ মা যেই বাঁশিটা বের করল। ওই যে সনাতন আজকাল চারাবাড়িতে চা বানায়। ওই সনাতন বলল ভিখারি আইল। ভিখারি।

এ মা কাঁহা লে বাঁশি মাঙে আনলি রে ভিখারি। বলে, হো হো করে হাসল। ভিখারির মেজাজটা এত খারাপ হয়েছিল। শেষে অতি কষ্টে সামলে নিয়েছিল নিজেকে। সুধবি তখন গান ধরেছিল—

ফুটেছে শালুকের ফুল

গহন জলে আছে

ও সই আনে দে হামাকে

সুধবির জন্য মনটা আগে কেমন আকুলি বিকুলি করত। কিন্তু পাত্তাই দিত না সুধবি। এখনও দেয় না। মরদটা তো ওর রোজ রাতে মদ খেয়ে হল্লা করে। মারপিটও করে। কোনোদিন সুধবিও দু-চার ঘা বসিয়ে দেয়। বীরসা তখন মাদল বাজায়। আহা রে গহিন রাতে মাদলটা শুনলে মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। দাদির কথা খুব মনে পড়ে। টুসু রাখত দাদি। তখন রোজ সন্ধ্যের সময় গান হত। কেউ সাদা মলতে মলতে কেউ পান চিবোতে চিবোতে গান ধরত—

হামদের টুসু মুড়ি ভাজে

শাঁখা ঝলমল করে গো

তোদের টুসু বড়ো বেহায়া

আঁচল পাতে মাঙ্গে গো

ছি ছি লাজ লাগে না

সবাই আবার একসঙ্গে গাইত ছি ছি লাজ লাগে না। দাদি আবার গান বাঁধতেও পারত। টুসুকে নিয়ে ছোটোবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে গাইত—

ছোটোবাবুর ভাঙা ঘরে

ভূতে ঢেলা মাইরেছে

কে দেইখেছে কে দেইখেছে

জনার বেটি দেইখেছে…

চা ঘরে শব্দ হচ্ছে। ফ্যাক্টরি চলছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে চা-পাতার ঘ্রাণ। প্রাণভরে গন্ধটা বুকে ভরল ভিখারি।

ভিখারি বুড়োউয়া। ভিখারি বুড়োউয়া। হই দেখ ভাইলে ভিখারি বুড়োউয়া যাছে। ও তো কারো সাতে পাঁচে থাকে না তবু কেন যে লোকে ওর পেছনে লাগে। কে জানে? এই তো কাল ভোট অফিসের সামনে সাত পাঁচ কথা বলছিল লোকে। শেষে ওই যে নাম হ্যাঁ তো নানকা বলল— কত পয়সা পাইলি এবার ভিখারি?

কীসের পয়সা?

আরে ভোটের পয়সা।

ভোটের?

হঁ ভোটের পয়সা মাঙলি নাই? মাঙলি নাই ভিখারি?

তখন মাথাটা আর ঠিক রাখতে পারেনি ভিখারি। দু-ঘা বসিয়ে দিয়েছিল। শেষে পচা আর বিকর্ণ আসতে ওদেরও দু-ঘা দিয়েছিল। তাই না ভোটবাবুকে বলছিল কাল তিনটা মার্ডার করলাম বাবু। তবে ওরাও কি আর ছাড়ল? ওরাও বেশ ভালোই মার দিল। এখনও শরীরের ব্যথাটা যায়নি। লম্বা শ্বাস ফেলল ভিখারি। ওর এই ভিখারি নামটা কি ও নিজে ধারণ করেছে! ওর দাদিই না আগের ওর তিন-চারজন ভাই-বোন জন্মের পর পরই মরে যেতে ওর নাম ভিখারি রেখেছিল তাতে ওর কী দোষ? আবার আকাশে একঝাঁক পাখি উড়ে গেল। ওদিকে তাকাল ভিখারি। আহা রে পাখিদের জীবনটা কত সুন্দর। আহা রে ভিখারি যদি পাখি হতে পারত? এখন জঙ্গলের কাছে চাম কাঁঠাল গাছটার নীচে চলে এসেছে। এখানেই তো নানকার কচি মেয়েটাকে ছিঁড়ে খেয়েছিল কোন নানুষ নেকড়ে আহা রে… আজও ধরা পড়ল না প্রকৃত দোষী। একটু সময় এখানে থম মেরে দাঁড়াল ভিখারি। কত পাখি ডাকছে। এদিক দিয়েই তো পুঞ্জির রাস্তা। যেখানে ভোটবাবুর সেন্টার। জোরে জোরে পা চালায় ভিখারি…

দুই

মার্ডার হয়ে গেল।

কে? কে মার্ডার হল?

ওই যে গো ভিখারি। ভিখারি বুড়োউয়া।

এ মা কে মারল গো ওকে।

এই সাদা-সিধা ভোলাভালা মানুষটাকে?

কী জানি কে মারল।

আহা রে আহা রে…

কিন্তু যে-কারণে মারল ওদের উদ্দেশ্য তো আর সফল হবে না।

কেন? কেন?

আরে ও তো হিন্দুও ছিল না মুসলিমও না বাঙালিও না; বিহারি, অসমীয়া, নেপালি, নাগা, বড়ো, মিজো, মণিপুরিও না।

তবে কী ছিল? কী ছিল ভিখারি বুড়োউয়া? ও তো চা বাগানের লেবার ছিল গো। কুলি।

কুলি মনসার বেটা ভিখারি। ভিখারি বুড়োউয়া। তবে ভুল করে মেরেছে।

হতে পারে! হতে পারে!

আরে গত পরশুই তো ভোটবাবুর ব্যাগ বয়ে নিয়ে যেতেছিল গো।

হ্যাঁ গো হ্যাঁ।

আর পুলিশও ধরল কিনা নিরপরাধ নানকা, পচা আর বিকর্ণকে।

ধুর। ধুর। ধুর।

বীরসা আবার মাদল বাজায়…

সুধবি আবার গান ধরে—

ও ভাই প্রাণের লখন

জানিলে আসিতাম না আর।

পঞ্চবটী বন।

Categories
2021-Aug-Traslation

পিটার মার্কাস

বব অথবা নৌকায় থাকা লোকটা
[Bob, or Man on Boat]

ভাষান্তর: অত্রি ভট্টাচার্য

ভূমিকা: হেরাক্লিটাস-এর প্রবাদবাক্য: “কোনো মানুষই এক নদীতে দু-বার পা ডোবায় না”। এর লাজবাব প্রত্যুত্তরে পিটার মার্কাস এক বিপ্রতীপ কথন তুলে ধরেছেন; নদী সে একাই এবং একটিই, যে-মানুষ তাতে পা ডোবায় সে-ই নদী হয়ে যায়। শুধুমাত্র এক সহজ চোখে চেয়ে থাকাই নদী ও কর্দমাক্ততার গভীরের রহস্যকে খোলতাই করতে থাকে। এখানে, মার্কাসের এই নদীবিশ্বে সকল চরিত্রের নামই বব। এখানে মানুষ মাছ হয়ে যায়। মাছ হয়ে যায় মানুষ। যেখানে জাদুর সবুজ আলো কাদার ভিতরে। যেখানে স্বপ্নে ছেলেরা পোশাকের মতো গায়ে চাপিয়ে নেয় বাবার চামড়া। ‘বব, অর ম্যান অন বোট’ বইটির উৎসর্গপত্রে পিটার তাঁর নদীপথ চেনানো বাবা ও নক্ষত্রের গল্প শোনানো মায়ের কথা বলেছেন। দু-চার মিনিট গুগ্ল করলেই পিটার মার্কাস সম্পর্কে যৎসামান্য যা জানা যাবেই সেই দুর্গম পথ ধরে অনুসন্ধিৎসু বাঙালি পাঠক অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে পৌঁছে যাবেন বোধহয়। এই উপন্যাসের অংশবিশেষ এখানে অনুবাদ করা হয়েছে।

*
কখনো কখনো, রাতের বেলা যখন মাছেরা ছিপে কামড় দিতে দেরি করে, বব নদীর ওপর থেকে মুখ সরিয়ে আকাশের দিকে মুখ তোলে নক্ষত্র দেখবে বলে।

সেরকম রাতে, বব দেখে আকাশে ক-টা নক্ষত্র সে গুনতে পারে।

এক-একদিন রাতে বব দু-হাজার বাইশটা নক্ষত্র গুনে ফেলে।

সেই রাতগুলো মাছ ধরার জন্য খারাপ।

সেই রাতগুলো নক্ষত্র গোনার জন্য উপযুক্ত।

বেশিরভাগ রাতেই বব দশটা নক্ষত্র গোনার আগেই মাছেরা ছিপ কামড়ে ধরে।

মাছ ধরার জন্য উপযুক্ত একটি রাতে, যে-রাত নক্ষত্র গোনার জন্য অনুপযুক্ত, সেরকম রাতে বব নিজের নৌকা ভরে ফেলে আকাশে যত নক্ষত্র আছে তার থেকেও বেশি মাছে।

এই রাতগুলোতে, ববের নৌকা আর শুধুমাত্র একটা নৌকা থাকে না, হয়ে ওঠে মাছেদের নক্ষত্রসমাবেশ।

*
একবার বড়ো শহরে ঘুরতে গিয়ে আমি একটা লোককে রাস্তায় নিজের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম।

ওই একই শহরে একই রাস্তায় আমি আরও একজনকে গান গেয়ে হেঁটে যেতে দেখেছিলাম।

আমাকে ওই শহরের ওই সময়ের এক বাসিন্দা বলেছিল, এদের উভয়েরই মাথায় ছিট আছে।

ওই কথার উত্তরে, আমি বলেছিলাম, আমাদের মধ্যে কে আছে যে অমন নয়?

বেশিরভাগ লোক যাদের যাদের আমি এ-কথা বলেছিলাম, যখন এদের বলেছিলাম, তখন সবাই মাথা হ্যাঁ-এর দিকে ঝুঁকিয়েছিল।

বব অন্য কারোর থেকে বেশি ছিটগ্রস্ত নয়।

সোজাসাপ্টা কথা হল, বব জানে ওর কী ভালো লাগে।

আর বব তা-ই করে যা ওর সবথেকে বেশি পছন্দ
বব নিজের মনের কথা শোনে।

ববের মনটা একটি মাছের মতন।

*
এটা একটা আলাদাই ব্যাপার যে, বব একই নদীতে ওর পাশের মাছ ধরা জেলেটার থেকে বেশি মাছ ধরে।

বব নদীতে থুতু ফেলতে পছন্দ করে।

বব নদীতে মুততে পছন্দ করে।

সৌভাগ্যের জন্য।

*
সেই রাতে বিছানায় আমার বউ আবার ওই একই কথা বলে উঠল।

‘আমি নিশ্চয়ই একটা জেলেকে বিয়ে করিনি’

ও মুখ ঘুরিয়ে নিল ওর নিজের দিকে।

ওর পিঠে ঠেকে গেছে আমার পেট।

এভাবেই, ও গন্তব্যে পৌঁছায় আর নিভিয়ে দেয় আলো।

*
সেই রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম বব মাছ ধরছে।

সেই স্বপ্নের ভিতরে আমিও ববের সাথে মাছ ধরছিলাম।

আমি মাছ ধরছিলাম ববের নৌকাতে বসে।

বব আমাকে কীভাবে মাছ ধরতে হয় শেখাচ্ছিল।

সে আঙুল তুলে ইঙ্গিত দিচ্ছিল নদীর ভেতরে সেইসব জায়গার দিকে যেখানে ধরবার জন্য সবসময় একটার বেশি মাছ থাকে।

তারপর বব আমাকে বলল, হাতদুটো বাড়িয়ে দাও।

তাই আমার হাতদুটো আমি বাড়িয়ে দিলাম।

ও আমার হাত নিজের হাতে নিল।

ও দেখতে থাকল আমার হাতদুটো।

আমি বলতে পারি ও দেখছিল।

আমি ওর হাতের দিকে তাকালাম।

ওর হাত ছিল মাছের আঁশ আর ছাল।

ওর হাত ছিল মাছের পাখনা।

আমি নিজের হাতটা ববের থেকে ছিনিয়ে নিলাম

‘কি ব্যাপারটা কী?’

বব জিজ্ঞেস করল।

‘তুমি কি কখনো মাছের সঙ্গে হাত মেলাওনি নাকি?’

আমি মাথা নাড়িয়ে না বললাম।

ওটাই তোমার সমস্যা, বব আমায় বলল।

বব ঘুরল আর বলতে-না-বলতেই নিজের নৌকা থেকে জলে ঝাঁপ দিল।

নদীর ভিতরে।

সে সাঁতরে এগোচ্ছিল।

আর তখন আমি একা হয়ে গেলাম নদীতে ভাসতে থাকা ববের নৌকায়।

*
সকালে আমি নিজের নৌকা নিয়ে ববের নৌকার কাছে গেলাম।

বব সেখানে ছিল না।

আমি চারপাশে ববকে খুঁজলাম।

সকালে সাধারণত বব মাছের গা সাফ করে।

সূর্য উঠেছে নদীর ওপরে।

নদীর ওপরে একটু ধোঁয়াশা এনেছে সূর্যটা।

বব, নাম ধরে চেঁচালাম।

আমার কণ্ঠস্বর একটা পাথরের মতো নদীর ওপরে বেঁকে চলে গেল।

আমি মাছ-ধরা নৌকায় বসে থাকা একটা লোককে জিজ্ঞেস করলাম ববকে দেখেছে কিনা

সে মাথা নেড়ে না বলল।

আমি বাড়ি চলে এলাম।

বাড়ি এসে ফোনটা তুললাম।

আমার জানা ছিল না কী অথবা কাকে আমার ফোন করা উচিত। অথবা আমাকে কথাই যদি বলতে হয় তবে কী বলব।

বব কি তার নৌকাতে নেই?

বব কি আমার স্বপ্নে মাছ হয়ে গেছে?

*
ওই রাতে আমি ঘুমাতে ঘুমাতে সোফা থেকে পড়ে গেছিলাম।

আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারছিলাম না।

আমি চোখ বুজলাম আর মাথার ভিতরে সাঁতার কাটতে থাকা মাছগুলো গুনতে থাকলাম।

আকাশে যত নক্ষত্র তার থেকেও বেশি মাছ ছিল সেদিন আমার মাথায়।

সারারাত্তির ধরে আমি এই শব্দগুলোই শুধু শুনতে পাচ্ছিলাম

আমি একটি মাছ

আমি একটি মাছ

আমি একটি মাছ

এটা ছাড়াও শুনতে পাচ্ছিলাম আমার ছেলের গলা, ‘বাবা আমি চাই না তুমি মাছ হয়ে যাও’

*
রাতের বেলা একদিন সেটা আমায় ধাক্কা মেরেছিল।

হয়তো আমার ছেলেই ঠিক বলেছে।

হয়তো আমি একটা মাছ।

ববের জন্য নির্দিষ্ট মাছ।

সেই মাছ যার জন্য বব এখন নদীতে মাছ ধরে চলেছে।

Categories
2021-Aug-Prabandha

রাহুল হালদার

বুড়িবালামের তীরে রচিত হল জাতীয় বীরগাথা

সময়টা বিগত শতকের আট-নয়ের দশক। সরকারি বিদ্যালয়ের কর্মশিক্ষা ক্লাসে শেখানো হত বাঁশপাতা কাগজের খাম তৈরি, দেশের বিখ্যাত মনীষীদের ছবি দিয়ে প্লাস্টার তৈরি, মোমের পুতুল, মোমবাতি তৈরি প্রভৃতি। সেই সঙ্গে আমরা তৈরি করতাম একটি খাতা। যে-খাতাতে দেশের বরণীয় কবি, সাহিত্যিকদের সাথে সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি খাতার বাঁ-দিকের সাদা পৃষ্ঠায় আঠা দিয়ে লাগিয়ে ডান দিকের পৃষ্ঠায় তাঁদের জীবনী লিখতে হত। কে কার কার ছবি, কতগুলি ছবি সংগ্রহ করত সেগুলি বন্ধুদের খাতা নিয়ে একে-অপরেরটা দেখতাম।

সেই সময়ে ছবিতে ছোটো পোস্টকার্ডের মাপের ছবিতে বাঘা যতীনকে দেখি আর হন্যে হয়ে খুঁজতাম কোন ক্লাসের রচনা বইতে তাঁর জীবনী খুঁজে পাওয়া যাবে। সংক্ষিপ্ত জীবনী পড়ে অবাক বিস্ময়ে বুঁদ হয়ে থাকতাম যখন জানলাম তিনি বাঘের সঙ্গে লড়াই করে বাঘ মেরেছিলেন। তাই তিনি বাঘা যতীন নামে পরিচিত ছিলেন।

শুধু স্বাধীনোত্তর সময়ে আমাদের সকলে নয়, স্বাধীনতাপূর্বে ও বাঘা যতীনের সমসাময়িক সময়ে অনেকেই তাঁর বীরত্বে অভিভূত হতেন এবং গর্ববোধ করতেন। যেমন যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়। তিনি তাঁর ‘বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি’ গ্রন্থে লিখেছিলেন— “আমার বাবা আঠারো বছর বয়েসে গোরা ঠেঙিয়েছিলেন। আমার ছোটকাকা গৌরবাবু বাঘের সঙ্গে লড়েছিলেন। এই জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম। মনে মনে একটা গৌরবও ছিল। কিছুদিন বাদে গৌরবের স্থলে জন্ম নিল বিষাদ। মনে হল আগের যুগে বীর জন্মাত, আমার যুগে কই জন্মায়? এমন সময় ১৯০৬ সালে খবরের কাগজে বের হল একজন যুবক একপ্রকার খালি হাতেই একটা ছোরার সাহায্যে একটা বাঘ মেরেছে। গৌরবে বুক দশ হাত হল। কারণ, আমি বীরের যুগের লোক হয়ে গেছি। পরে তিনি কলকাতায় আসেন। তাঁকে সপ্রশংস নয়নে অনেকদিন দেখতাম। নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।”

উনিশ শতকের শেষের দিকের কুষ্টিয়া শহর। পদ্মার গড়ুই নদীর উত্তর পাড়ে ছোটো সুন্দর গ্রাম কয়া। কয়া গ্রামেই সেইসময় নামকরা বাড়ি, চট্টোপাধ্যায়দের। বাড়িতে বিরাট আঙিনা, অনেকটা অংশ নিয়ে বড়ো বড়ো বাড়িঘর, চণ্ডীমণ্ডপের দালান। এই সাবেকি আমলের বাড়িতেই ইংরেজি ১৮৭৯ সালের ৮ই ডিসেম্বর চট্টোপাধ্যায় বাড়ির বড়োমেয়ে শরৎশশী দেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।

যতীন্দ্রনাথের শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছে কয়া গ্রামের মামার বাড়িতে। তাঁর পৈতৃক ভিটা যশোর জেলার ঝিনাইদা মহকুমার সাধুহাটি রিসখালি গ্রামে। যতীনের ছোটোমামা ললিতকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন— “যশোর জেলা। ঝিনাইদা মহকুমার সাধুহাটি রিসখালি গ্রাম। কাছেই নদী নবগঙ্গা। নদীর ধারে সিঁদরে গ্রামে দোর্দণ্ডপ্রতাপ নীলকর সাহেবদের কুঠি।… ঘোড়ায় চড়ে সাহেবরা পথে বার হলে বিনয়ে আনুগত্যে বেঁকে দাঁড়ান প্রতিবেশী সকলেই।… কিন্তু একটি লোক, যুবক ব্রাহ্মণ— কোনোদিন ফিরে তাকান না সাহেবদের দিকে, ভেদ মানেন না কালো সাদার, মাথা তাঁর উঁচু।… আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সম্ভ্রান্ত এই তেজস্বী ব্রাহ্মণকে সবাই চেনে। বিঘা কয়েক জমির অধিকারী এই শিক্ষিত ব্রাহ্মণের নাম শ্রী উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়।” যিনি যতীন্দ্রনাথের পিতা। যখন যতীনের বয়স পাঁচ তখন তাঁর পিতৃবিয়োগ হলে বড়োমামা বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় এসে প্রথমে যতীনকে এবং তার কিছু পরে বোন শরৎশশী এবং যতীনের দিদি বিনোদবালাকে বিনোদবালার পৈতৃক ভিটে থেকে কয়া গ্রামের মামার বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে আমরা যে-শিক্ষিত ও নির্ভীক পরোপকারী যতীনকে দেখি সেটা যে তাঁর পিতার কাছ থেকে পাওয়া, সেটা মামা ললিতকুমারের দ্বারা যতীনের পিতার পরিচয় থেকেই বুঝতে পারি।

মামার বাড়ির গ্রামের গোপাল পণ্ডিতের পাঠশালাতে যতীনের লেখাপড়া শুরু হয়। ছোটোবেলাতেই গ্রামে পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামের বালকদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, সাঁতার, খেলাধূলাতে দক্ষ হতে থাকেন। তাঁর ন’মামা অনাথবন্ধু চট্টোপাধ্যায় ছিলেন নদিয়া রাজবাড়ির সুপারিন্টেনডেন্ট। ভারি শৌখিন মানুষ তিনি।

খেলাধূলা, জিমনাস্টিক, ঘোড়া চড়া, বন্দুক চালানো, মাছধরায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এই ন’মামার একটি ঘোড়া ছিল যার নাম ‘সুন্দরী’। তখন যতীনের বয়স আট কি নয় বছর, একদিন মামার কাছে আবদার করে বলল, মামা ঘোড়ায় চড়া শিখব। ভাগ্নের শখকে মামা না বলতে পারল না। বাড়ির পাশ দিয়ে জেলা বোর্ডের যে-পাকা সড়ক গিয়েছিল কুষ্টিয়ায় উত্তর দিক পার হয়ে সোজা কুমারখালি পর্যন্ত সেই রাস্তায় কিছুদিন মামার দ্বারা ঘোড়ায় চড়া তালিম চলল। অল্প কিছুদিনেই ঘোড়ায় চড়া আয়ত্ত করে যতীন এরপর একা একাই ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে লাগল। গড়ুই নদীর জলে সাঁতরে পার হত আট-দশ মাইল। এমন করেই যতীন বড়ো হতে লাগল। তাঁর বড়োমামা যতীন আর বাড়ির অন্যান্য ছেলেদের কুস্তি, লাঠিখেলা, ছোরাখেলা, তরোয়াল শেখানোর জন্য বাড়িতে ফেরাজ খান নামে এক ওস্তাদকে মাইনে দিয়ে রেখে দিলেন।

এদিকে যতীনের বড়োমামা বসন্তকুমার আইনের অধ্যয়ন শেষ হলে কৃষ্ণনগরে জেলা বোর্ডের ওকালতিতে নিযুক্ত হলেন। অল্প সময়েই তিনি ওকালতিতে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেন। যতীন্দ্রনাথ তখন বারো বছরে পড়েছে। গ্রামের পাঠ শেষ হলে বড়োমামা গ্রামের পণ্ডিতের কথামতো এন্ট্রান্স পড়বার জন্য কৃষ্ণনগরে নিয়ে এসে ভর্তি করিয়ে দেন সেখানকার অ্যাংলো ভার্নেকুলার (এ ভি স্কুল) বিদ্যালয়ে। সেখানে অতি অল্প সময়েই যতীন সকলের প্রিয় হয়ে গেলেন এবং হয়ে উঠলেন তাদের অবিসংবাদী নেতা। তিনি যেহেতু আগে থেকেই সাঁতার, খেলাধূলা, পড়াশোনায় দক্ষ ছিলেন। কৃষ্ণনগরে এসে সেই গুণের সঙ্গে যুক্ত হল পরোপকার আর সমাজসেবা। এইসমস্ত কাজে যতীন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ফলে হয়ে উঠলেন সকলের প্রিয় ‘যতীনদা’। এই ‘যতীনদা’ সম্পর্কে মানবেন্দ্র রায় পরবর্তীকালে বলেছিলেন— “আমরা তাঁকে সোজাসুজি দাদা বলেই ডাকতাম। দাদাদের দেশে আর দাদাদের যুগে তিনি ছিলেন অতুলনীয়— তাঁর মতো দ্বিতীয়টি আর কাউকে আমি দেখিনি। আধুনিক শিল্পে যেমন, তেমনি আমাদের রাজনীতির সেই শৈশবকালে দাদাবাদ ছিল একটি যুক্তিহীন মতবাদ। যতীনদা কিন্তু দাদাবাদের ধার ধারতেন না, কিংবা তিনি এর প্রবক্তা ছিলেন না। আর সব দাদাদের দেখেছি অপরকে আকর্ষণ করবার বিদ্যা অভ্যেস করতে; একমাত্র যতীন মুখার্জি ছিলেন এর ব্যতিক্রম।… যে-বিশাল দৈহিকশক্তির তিনি অধিকারী ছিলেন এবং যা পরিণত হয়েছিল একটি কিংবদন্তীতে, সেটা কিন্তু তার আকৃতি দেখলে প্রতীয়মান হত না, যদিও তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ কুস্তিগীর”।

তিনি যে ভীষণই সাহসী আর শক্তিশালী ছিলেন সেটা তাঁর কীর্তি দেখেই বোঝা যেত। একবার তিনি নদিয়া ট্রেডিং কোম্পানি নামে কৃষ্ণনগরের একটি দোকানে যখন পেন্সিল কিনতে গিয়েছিলেন তখন তাঁর কানে এল চিৎকার ‘পালাও পালাও’। কী ব্যাপার দেখতে যখন তিনি রাস্তার দিকে তাকালেন দেখলেন রাজবাড়ির (বারাণসী রায়ের) একটি ঘোড়া বাঁধন ছিঁড়ে রাস্তা দিয়ে ছুটে চলছে এবং ঘোড়াটিকে কেউ ধরবার চেষ্টা না করে সবাই পালাচ্ছে অথচ ঘোড়াটিকে না থামালে যখন-তখন বিপদ ঘটে যেতে পারে। এই ভেবে তিনি নিজের জখম হওয়ার কথা না ভেবে ঘোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে চলন্ত ঘোড়াটির কপালের কেশর ধরে ঘোড়াটিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন।

এন্ট্রান্স পাশ করে যতীন কলকাতায় শোভাবাজার চিৎপুর রোডে মেজমামা, এল. এম. এস ডাক্তার হেমন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছে থেকে সেন্ট্রাল কলেজে এফ. এ. পড়েছেন। পড়ার সময় যাতে অর্থোপার্জন করতে পারেন তার জন্য তিনি শিখতে লাগলেন শর্টহ্যান্ড আর টাইপরাইটিং।

একদিন কলকাতা থেকে গ্রামের বাড়িতে এসে শুনলেন কাছের এক গ্রামে বাঘের উপদ্রব হওয়াতে সকালে যতীনের মামাতো ভাই ফণিভূষণ বন্দুক নিয়ে বাঘ মারতে গেছে। কথাটা শুনে যতীন শুধুমাত্র একটি ভোজালি হাতে করে সেখানে গিয়ে দেখলেন যেখানে বাঘ আছে সেই জঙ্গল থেকে বাঘ বেরোলে ফণি বন্দুকের গুলি চালালে বাঘের গায়ে ঘর্ষণ করে বেরিয়ে যায়। তখন বাঘটি তাঁর দিকে এগিয়ে এলে যতীন্দ্রনাথ বাঘটির গলা বাম বগলে চেপে ধরে ভোজালির দ্বারা মাথায় আঘাত করতে লাগলেন। সেই লড়াইয়ে অবশেষে বাঘটি মেরে ফেললেও বাঘের আক্রমণে যতীন্দ্রনাথও প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে গেলেন। মেজমামা তখন তাঁকে কলকাতায় বিখ্যাত সার্জন সুরেশপ্রসাদ সর্বাধিকারীকে দিয়ে প্রায় ছয়মাস চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ যতীন্দ্রনাথ তাঁর নবজীবনদাতাকে উপহার দিয়েছিলেন সেই মারা বাঘের চামড়াখানি। এই সময়ে যতীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাওয়ায় হৃত স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার জন্য ছোটোমামা ললিতকুমার কুস্তিগীর ক্ষেত্রনাথ গুহের আখড়ায় ভর্তি করিয়ে দেন।

যতীন্দ্রনাথ শর্টহ্যান্ড আর টাইপরাইটিং শেখবার পর প্রথমে কলকাতার অমহুটি অ্যান্ড কোম্পানি, তারপর মজঃফরপুর এবং শেষে সেখানে চাকরি ছেড়ে শেষে বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে মি. এ. এইচ. হুইলার নামে একজন আই-সি-এসের অধীনে চাকরিতে নিযুক্ত হন।

বিংশ শতকের সূচনায় এক নব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বাংলার বুকে। যতীন্দ্রনাথ তখন বাংলা সরকারের একজন বেতনভুক কর্মচারী। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে স্বদেশ আন্দোলনের সূচনা হয়। বাঙালির কণ্ঠে গর্জন শোনা গেল লর্ড কার্জনের এই ষড়যন্ত্র আমরা রোধ করবই। ১৯০৫ সালের শেষভাগে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হল গুপ্ত সমিতি এবং ১৯০৬ সালে এই সমিতিতে যোগদান করলেন যতীন্দ্রনাথ। যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন— “১৯০৩ সালে যোগেন বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের বাড়িতে ভাবী যুগান্তকারীদের এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটল। বিদ্যাভূষণ আগে থেকে কেবল বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে বেড়াতেন।… এঁর বাড়িতে শ্রী অরবিন্দ ও যতীন্দ্রনাথ আসেন। সেখানে ললিতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ভাবী কালের ‘বাঘা যতীন’ এঁদের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে যতীন্দ্রনাথের কাছে ধরা দিলেন বাঘা যতীন।”

আলিপুর বোমা মামলা আরম্ভ হওয়ার পর থেকে বাঘা যতীনের প্রকৃত বিপ্লবী জীবনের সূত্রপাত হয় বাঙালি দারোগা নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি প্রফুল্ল চাকীকে মোকামা স্টেশনে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেছিলেন তাঁকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে। দ্বিতীয় ঘটনা আলিপুর বোমা মামলার সরকারি উকিল আশুতোষ নিধন এবং তৃতীয় ঘটনা তৎকালীন কলকাতা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট অব পুলিশ সামশুল নিধনের কর্মকাণ্ড দিয়ে। এই ঘটনার পরে যতীন্দ্রনাথের সরকারি চাকরি চলে গেলে তিনি জেলা বোর্ডের ঠিকাদারি কাজ নিযুক্ত হয়ে বাংলার বিভিন্ন জেলায় গুপ্তসমিতি গঠনের কাজে মনোনিবেশ করলেন।

১৯১৪ সালে জার্মানির সঙ্গে ব্রিটিশ ও অন্যান্যর যুদ্ধ লাগলে জার্মানিতে থাকা ভারতীয়রা ভারতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিদ্রোহ করবার জন্য সাহায্য চাইলে জার্মানি অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করবার প্রতিশ্রুতি দেয়। জার্মানির সহায়তায় ১৯১৫ সালে যতীন্দ্রনাথ সমগ্র ভারতবর্ষে বিদ্রোহ জাগিয়ে তুলবার ব্যবস্থা করতে থাকেন। বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ফোর্ট উইলিয়ামে যে-সমস্ত ভারতীয় সৈন্য ছিল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন যাতে ফোর্ট উইলিয়াম দখল করা যায় কিন্তু একজন ভারতীয়র বিশ্বাসঘাতকতায় সেই পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়েছিল।

পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়েননি যতীন্দ্রনাথ। এরপর যখন জার্মানদের সহায়তায় ‘এস. এস. ম্যাভারিক’ নামে একটি জাহাজে করে ভারতীয় বিপ্লবীদের জন্য ত্রিশ হাজার রাইফেল, প্রত্যেক রাইফেলের জন্য চারশো করে গুলি আর তার সঙ্গে দু-লক্ষ টাকা আসবে সেইসমস্ত কিছু পূর্ববঙ্গে, কলকাতা আর বালেশ্বর এই তিন জায়গায় পাঠানোর বন্দোবস্ত করবার জন্য যতীন্দ্রনাথ নিজে এবং চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরি, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নীরেন্দ্রচন্দ্র দাশগুপ্ত আর জ্যোতিষ পালকে নিয়ে বালেশ্বরের কাপ্তিপোদায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে-সংবাদ ব্রিটিশের কাছে চলে যায়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলবি, পুলিশ সাহেব খোদাবক্স, ডি. আই. জি. ই. বি রাইল্যান্ড সাহেব সমস্ত সশস্ত্র পুলিশ এবং মিলিটারি নিয়ে রদারফোর্ডের নেতৃত্ব চলল যতীন্দ্রনাথদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান। সরকার পক্ষের দুড়ুম দুড়ুম গুলির শব্দে সিপাহিরা এগিয়ে আসতেই দেশের জাতীয় বীরদের তরফ থেকে ব্রিটিশদের ভীত, স্তম্ভিত করে কটাকট কটাকট করে চলতে শুরু করল মসার পিস্তলের গুলি। দেশের বীরদের তরফ থেকে প্রত্যুত্তরে ব্রিটিশ সিপাহি সমেত রদারফোর্ড হতাহত হয়ে পালাতে লাগল, জলকাদা মেখে মাটিতে শুয়ে পড়ল অন্য সিপাহিরা। প্রায় দু-তিন ঘণ্টা যুদ্ধ চলতে লাগল বুড়িবালামের তীরে। এই সময় এক সুবেদারের গুলিতে চিত্তপ্রিয় বীরের মতন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। যতীন্দ্রনাথ বাঁ-হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে গুলিবিদ্ধ হয়েও এক হাতে মসার পিস্তল চালাতে লাগলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, সেই সময়ে আর একটা গুলি এসে লাগল তাঁর পেটে।

এর পর ৩রা আশ্বিন ১৩৬৫ সালের সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় ডাঃ সত্যেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি সে-সময়কার বালেশ্বর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছিলেন, তিনি লিখেছিলেন শহিদ হওয়ার আগে যতীন্দ্রনাথের শেষ বক্তব্য—“এবার আমার পালা ডাক্তার। আজ আমাদের জীবন দেবার শুভ সুযোগ এসেছে। শুরু হলো আবার গুলি বিনিময়-সন্মুখে পিছনে, দক্ষিণে, বাঁয়ে চারিদিক হতে আসছে গুলি— ওই যে আমাদের মধ্যে ব্যবধান কমে আসছে— ঐ জীবন-মরণের সেতু ভেঙ্গে আসছে। তারপর অজ্ঞান হয়ে গেছি। কতক্ষণে জ্ঞান হল জানি না… জানো ডাক্তার আমাদের স্বাধীনতা নিশ্চয় আসবে — পরাধীনতার শিকল ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাবে।”

যতীন্দ্রনাথদের কাঙ্ক্ষিত দেশের স্বাধীনতা আজ এসেছে। সেই স্বাধীন দেশে আমরা যতীন্দ্রনাথকে কেমন স্মরণে রেখেছি সেই বিষয়ে শ্রীশচীনন্দন চট্টোপাধ্যায় যথার্থই লিখেছেন— “‘বাঘা যতীন’। হায়-রে এর চেয়েও তাঁর দীনতম প্রকাশ কি হতে পারে? গ্যারিবল্ডীর চেয়েও যাঁর দুঃসাহস ছিল বড়, হিটলারের চেয়েও যিনি ছিলেন অধিকতর দুর্বার, বিসমার্কের চেয়েও কুশলী ডিপ্লোম্যাট, সংগঠন শক্তিতে অদ্বিতীয়-সহকর্মী সতীর্থ এবং মানুষ মাত্রেরই প্রতি প্রীতি এবং করুণায় বিগলিত বিশাল হৃদয় তাঁর, দেশের স্বাধীনতার বেদীমূলে তাঁর অভিনব আত্মাহুতি, যার তুলনা বিরল ভারতের ইতিহাসে— সন্মিলিত বিপ্লবী দলের সেই সার্বভৌম সর্বাধিনায়ককে দেশ কতটুকু চিনল, কতটুকু উপলব্ধি করলো?”

এ শুধু শ্রী শচীনন্দন চট্টোপাধ্যায়ের আক্ষেপ নয়, এই আক্ষেপ বর্তমান সময়ে আমাদের সকলের। আজকের দিনে রাজনীতির তরজায় মেতে থাকা জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশের বাঙালি কি ক্রমশ নিজেদের অতীত গৌরবকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে না?

Categories
2021-Aug-Prabandha

অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত

উর্দু সাহিত্য ও প্রগতিশীলতা

গল্পটি এইরকম, দু-জন ব্যক্তির আলাপচারিতা… একজন হাকিম, অন্যজন রোগী—

“ধর্ম আসলে খুব বড় ব্যাপার। কষ্টের সময়, বিপদে আপদে, হতাশার সময়, যখন আমাদের বোধবুদ্ধি কাজ করে না আর আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই; যখন আমরা কোনও ঘায়েল জানোয়ারের মতো ভয়ে ত্রাসে বিবশ দৃষ্টিতে চারিদিকে দৌড়ে বেড়াই— সেসময় কী এমন শক্তি থাকে যা আমাদের ডুবে যাওয়া হৃদয়কে ভরসা দিয়ে থাকে? তা হল ধর্ম। আর ধর্মের শিকড় হল ইমান। ভয় আর ইমান। ধর্মের প্রশংসা শুধু বাক্য দিয়ে করা সম্ভব না, একে আমরা বুদ্ধির প্রাবল্য দিয়েও বুঝতে পারব না। এটি একটি অন্তর্গত অবস্থা…”

“কী বললে? অন্তর্গত অবস্থা?”

“এটা কোনো হাস্যকর কথা নয়, ধর্ম এক স্বর্গীয় প্রভা— যার দীপ্তিতে আমরা সৃষ্টির উজ্জ্বল আড়ম্বরগুলি প্রত্যক্ষ করি। এটি এক অন্তর্গত…।”

“খোদার ওয়াস্তে আপনি অন্যকিছু কথা বলুন। ঠিক এই মুহূর্তে আপনি আমার অন্তর্গত অবস্থা আন্দাজ করতে পারছেন না। আমার পেটে খুব যন্ত্রনা হচ্ছে। এই সময় আমার স্বর্গীয় প্রভার প্রয়োজন একেবারেই নাই। আমার প্রয়োজন বিরেচক ওষুধ…”

বুদ্ধি আর ইমান, আকাশ আর পৃথিবী, মানুষ আর ফেরেশতা, খোদা আর শয়তান— এ-সব আমি কী ভেবে চলেছি? এ হল বর্ষার বৃষ্টি। যখন শুকনো নিরস জমি আর্দ্র হয়ে ওঠে আর সেখান থেকে অদ্ভুত সুন্দর সোঁদা সুগন্ধ আসতে থাকে। অথচ দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ মরে। বুড়ো, শিশু, জোয়ান, নারী-পুরুষ সকলের চোখ গর্তে ঢুকে যায়। চেহারা হলুদ হয়, চামড়া ফেটে হাড়-পাঁজরা বেরিয়ে আসে। ক্ষুধার জ্বালা, কলেরা, বমি, পাতলা পায়খানা, মাছি, মৃত্যু… মৃত লাশের দাফন করার বা পোড়ানোর লোক নেই। লাশগুলো পচতে থাকে আর তা থেকে অদ্ভুত রকমের দু্র্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

আর একটি গল্পে—

“— প্রিয় বোন, আমাদেরও তো আসতে দাও।”

বারান্দা থেকে কথাগুলো ভেসে এল। আর সেইসঙ্গে একটি মেয়ে তার কুর্তার আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল।

তার পরিচিত জানাশোনার মধ্যে মল্লিকা বেগমই ছিলেন প্রথম মহিলা যিনি রেলগাড়িতে চড়েছিলেন। আর সেটাও ছিল ফরিদাবাদ থেকে দিল্লি পর্যন্ত। একদিনের সফর। মহল্লার সব মহিলা ওর সেই সফরের গল্প শোনার জন্য হাজির হয়েছিল।

“— ওহো, আসার ইচ্ছে হলে এসো। একই কথা বারবার বলতে বলতে আমার মুখে তো ব্যথা হয়ে গেল। আল্লাহ্‌ যেন আমাকে দিয়ে মিথ্যা না বলিয়ে নেয়। তো, হাজারবার তো শোনালাম। এখান থেকে রেলগাড়িতে চেপে দিল্লি পৌঁছালাম। সেখানে ওর পরিচিত হতভাগা ষ্টেশনমাষ্টারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমাকে আসবাবপত্রের সঙ্গে রেখে তিনি উধাও হয়ে গেলেন। আর আমি বোরকায় সারা শরীর ঢেকে ওই আসবাবপত্রের উপর বসে রইলাম। একে তো বিরক্তিকর বোরকা আর দ্বিতীয় হল পুরুষমানুষেরা। পুরুষমানুষেরা এমনিতেই তো বদস্বভাবের হয়ে থাকে। তার উপর যদি কোনো স্ত্রীলোককে একভাবে বসে থাকতে দেখে তো তখন ওখানেই ঘুরঘুর করতে থাকে। একটা পান খাওয়ারও জো নেই। কোনও হতভাগা খুকখুক করে কাশতে থাকে, তো কেউ আবার গলা খাঁকারি দেয়। ভয়ে তো আমার দম বেরিয়ে আসার জোগার। আর খোদা জানেন, কী ভয়ানক খিদে যে লেগেছিল…”

একটি নাটকে দু-জন শরিফ মুসলিম পরিবারের জেনানার কথোপকথনটি ছিল এইরকম—

“আফতাব বেগম-ও, তাহলে এই কথা! এ-সব আমি কী করে জানব বল্‌! খোদা যেন এরকম পুরুষ মানুষের হাত থেকে সকলকে রক্ষা করেন। জানোয়াররাও দেখি লজ্জা শরম করে, ভয় করে। কিন্তু এ তো দেখছি জানোয়ারের থেকেও বদস্বভাবের হয়ে গেছে। এরকম পুরুষমানুষের পাল্লায় কেউ যেন না পড়ে। এরকম ব্যাপার-স্যাপার আগে কিন্তু ছিল না বুয়া ! আর এখন প্রত্যেক পুরুষমানুষের বিষয়েই এই এক কথা শোনা যায়। হতভাগাদের নিয়ে এই হল আপদ। এই ত তোমার বেহনই-এর কথাই যদি বলতে হয়, যদিও এখন সে বুড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু যুবক বয়সেও কখনোও জোরজবরদস্তি করেনি… খোদার কসম, ঘন্টার পর ঘন্টা আমার পায়ে ধরে সাধত।

মহম্মদি বেগম— সবই নসিব। তোমার এই কথা শুনে মনে পড়ে গেল, হ্যাঁ ওই ডাক্তারনির কথা তো শেষ হয়নি। কথা যে কোথা থেকে কোথায় গড়িয়ে যায়! ওই ডাক্তারনি যখন বললেন যে আমার দুই মাসের পেট… তারপর অবাক হয়ে আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলেন। বললেন– বেগাম সাহেবা আপনি তো বলছেন যে চারমাস থেকে আপনি বিছানায় পড়ে রয়েছেন! ডাক্তার গিয়াসও বলছিলেন আপনার রোজ সন্ধ্যায় ১০০ থেকে ১০১ পর্যন্ত জ্বর হয়। তবুও আপনি বলতে চান যে আপনার…। আমি বললাম— ও মিসসাহেবা, তুমি তো ভাগ্যবতী! নিজের রোজগারে খাও দাও আর শান্তিতে ঘুমাও। কিন্তু আমাদের মতো মেয়েরা মৃত্যুর পরে জান্নাতেই যাই বা দোজখে, নিজের হালুয়া নিজেকেই বানিয়ে খেতে হবে। বিবি মুখপুড়িদের শরীর সুস্থই থাক বা অসুস্থই থাক, অসুখ-বিসুখে মরে যাক— পুরুষদের শুধু নিজের ভোগবিলাস আর আনন্দ-ফুর্তির সাথে সম্পর্ক। সে বেচারি সব শুনে চুপ হয়ে গেলেন…”

উপরের গল্পগুলোকে, তাদের চরিত্র বা চরিত্রের মুখের কথাগুলোকে আজকের সমকালে দাঁড়িয়ে দেখলে হয়তো স্বাভাবিক বলেই মনে হবে, কতজন আজকের দিনে এরকম বা এর চেয়েও আরও তীব্র ভঙ্গিমায়, চটপটে টানটান বয়ানে গল্প বলে থাকেন। গদ্য-পদ্যের চাতুর্যে, ভাঙাগড়ায় কথাগুলোর আবেদন আরও নিপুণ লক্ষ্যভেদী হয়ে ওঠে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় একশো বছরের ওপারে গত শতাব্দীর তিরিশ-চল্লিশের দশকের চরম রক্ষনশীল সামাজিক পরিসরে দাঁড়িয়ে বিশেষ করে গোঁড়ামির বৃত্তে আটকে থাকা মুসলিম সমাজের মধ্যে থেকে এইসব কথাগুলো বলে ফেলা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। সহজ ব্যাপার হয়ওনি। অথচ সত্যিটা হল সেইসময়ই রক্ষনশীল পারিপার্শ্বিকতার অন্ধকার পর্দাটিকে স্রেফ কলমের জোরে ছিন্নভিন্ন করে তৎকালীন সাহিত্যের ফেনিল আবেগসর্বস্বতার বাইরে বেরিয়ে ঘোর বাস্তবকে নিয়ে লেখালেখির সূচনা হল, এবং তা উর্দুতে। এই আখ্যানে আমরা সেই সোনালি সময়ের গল্প বলতে চেষ্টা করব। বুঝতে চেষ্টা করব ইতিহাস যাকে প্রগতিশীল উর্দু সাহিত্য বলে চিহ্নিত করেছে। কী অসম্ভব বৈপ্লবিক এক সময়ের আখ্যান— যতটা না তার আঙ্গিকে, রচনাশৈলীতে তার চেয়েও বেশি তার বিষয়ধর্মীতায়, রাজনীতিতে, সামাজিক আবেদনে। এক অপরিচিত নতুন ভাষ্যে। তাতে যতটা কল্পনাশ্রিত আবেগ আছে তার চেয়েও বেশি আছে নিষ্ঠুর কঠোরতা, সমস্ত হিপক্রেসিকে মুহূর্তে নগ্ন করে দেওয়া সুতীব্র কশাঘাত। চমকে উঠেছিল সবাই। তারপর রাগে ফেটে পড়েছিল। তবুও কলম থামেনি। এই আলোচনার স্বল্পবিস্তৃত পরিধিতে সেই কথাগুলোকেই জেনেবুঝে নেওয়া যাক।

ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষে সে-সময় শিক্ষার অভাব, অশিক্ষা-কুসংস্কারের কুপ্রভাব আর পুরুষ প্রধান সমাজে সুযোগের অভাবে ভারতীয় নারীরা বিশেষ করে মুসলিম নারীরা ছিলেন অধিকার বঞ্চিত এবং ঘরের কোণে পর্দার আড়ালে বন্দি বন্দী। এই সময়েই স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের আহ্বানে আলিগড়ে আসেন শেখ আবদুল্লাহ ও তাঁর স্ত্রী বেগ ওয়াহিদ জাহান বা আলা বি, দু-জনেই একটা অন্ধকার সময়ে আলোর খোঁজ এনেছিলেন। ওয়াহিদ জাহানের পিতা মির্জা ইব্রাহিম বেগ ছিলেন দিল্লি রেঁনেসার অন্যতম স্থপতি। দু-জনেই রক্ষনশীল মুসলিম সমাজের মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব অনুভব করেন, এবং সারাজীবন নানান প্রতিবন্ধকতা, বিরোধের মোকাবিলা করেও মুসলিম মেয়েদের শিক্ষাবিস্তারের জন্য প্রাণপাত করেন। গড়ে তোলেন এক স্কুল, ‘আলিগড় জেনানা মাদ্রাসা’, যা আলিগড়ে শুধু না সমগ্র উত্তর ভারতে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার ভরকেন্দ্রে পরিনত হয়। শেখ আব্দুল্লাহ আর ওয়াহিদ জাহানের উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকা ‘খাতুন’ তাঁদের চিন্তাভাবনাকে, মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্বকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে থাকে। আবদুল্লার বাড়িতে যে-প্রগতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে নিয়মিত উপস্থিত হতেন হালি, নাজির আহমেদ, জাকারুল্লাহ, আতিয়া ফৈজীর মতো মুসলিম সমাজের নতুন চিন্তার নানা মানুষ, যারা একত্রে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রবল জনমত তৈরি করেন, পাশে পান মহমদিয়ান এডুকেশন কনফারেন্সকে, আর ভোপালের বেগমকে। এই সমস্তই তৈরি করেছিল বিপ্লবের এক উজ্জ্বল পটভূমি, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আলিগড়েই সেই আগুনে তপ্ত হয়ে অঙ্গার হয়ে ওঠে একদল তরুণ দামাল ছেলে-মেয়ে— সাজ্জাদ জাহির, আহমেদ আলি, রশিদ জাহাঁ (শেখ আবদুল্লার কন্যা) আর মাহমুদ-উজ-জাফর। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত একদল তরুণ লেখকের নেতৃত্বে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে ভারতের প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন। তৈরি হবে প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পী সংঘ। একে একে আসবেন, থাকবেন কৃষাণ চন্দর, ইসমত চুগতাই, সাদাত হাসান মন্টো, রাজিন্দর সিংহ বেদি-রা, যোগ দেবেন ফৈজ আহমেদ ফৈজ, আহমদ নাদিম কাসেমি, আলী সরদার জাফরি, সিবতে হাসান, এহতেশাম হোসেন, মমতাজ হোসেন, সাহির লুধিয়ানভি, কাইফি আজমি, আলী আব্বাস হুসাইনী, মাখদুম মহিউদ্দিন, ফারিগ বুখারী, খাতির গজনবী, রাজা হামদানি, অমৃতা প্রীতম, আলী সিকান্দার, জো আনসারী, মাজাজ লাকনাভি ও আরও অনেকে। যাঁদের হাতে তৈরি হবে, রক্ষিত থাকবে দেশভাগ-বিক্ষত, ভীত, ক্লিষ্ট এই উপমহাদেশের এক নতুন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ভাষ্য। নিঃসন্দেহে উর্দু সাহিত্যে প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন স্যার সৈয়দের শিক্ষা আন্দোলনের পরে সবচেয়ে শক্তিশালী আন্দোলন ছিল।

প্রগতিবাদীরা উর্দু সাহিত্যে গদ্য ও কবিতায় বাস্তব ও কল্পনার চমৎকার মেলবন্ধন করেছিল। ইউরোপীয় রোমান্টিকতার পরবর্তীতে বাস্তববাদ বা রিয়্যালিজমের প্রভাব উর্দু সাহিত্যেও পড়ে। ঊনবিংশ শতকের শেষে বা বিংশ শতকের প্রথম দশকে রোমানিয়ত-এর পরম্পরা উর্দু সাহিত্যকে জারিত করেছিল, সমান্তরালে বাস্তববাদ প্রভাব ফেললেও বিংশ শতাব্দীর কয়েক দশকে দেখা যায় কালাকার বাস্তবতার গভীরতায় ডুবে থেকে রোমানিয়ত্‌-এর নতুন ধারার সন্ধান করছেন। প্রথাগত রোম্যান্টিকতাকে সরিয়ে এই নতুন বাস্তবধর্মী রোমানিয়ত্‌ সামাজিক বাস্তবতাগুলিকে সাহিত্যের উপজীব্য করে তুলল।

শুরুটা একটু একটু করে হচ্ছিল আগে থেকেই। কিন্তু প্রথাগত উর্দু সাহিত্যের কোমল রোমান্টিক পরম্পরাকে, প্রেমোদ্যানের বুলবুল, আশিক-মাসুক আর শের-শায়েরির মৃদু নরম আঙিনা ছেড়ে সমাজবাস্তবতার কঠিন জমিনে প্রথম নামিয়ে আনলেন মুন্সি প্রেমচাঁদ, নিম্নবর্গীয় সাধারণ মানুষের কাহিনি চিত্রিত করলেন। প্রেমচাঁদের কাছে হিন্দি ও উর্দু উভয় ক্ষেত্রেই ছোটোগল্প এবং উপন্যাসে নতুন ধরন তৈরি করার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কার্যত একাকী তিনি উর্দু ও হিন্দী কথাসাহিত্যকে উর্বর তুলেছিলেন, তত্কালীন ইউরোপীয় কথাসাহিত্যের সঙ্গে তুলনীয় এক বাস্তববাদী আখ্যানের রোমান্টিক ক্রনিকলগুলি রচনা করেছিলেন।

‘কাফন’ গল্পটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, গল্পের শুরুটা এইরকম—

“ঝুপড়ির দুয়ারে বাপ-বেটা দু’জন বসে আছে। চুপচাপ। সামনে একটা আগুনের কুণ্ডুলি নিভু নিভু জ্বলছে। ভেতরে বেটার যুবতী বউ বুধিয়া প্রসব বেদনায় উথাল পাথাল আছাড় খায়। থেকে থেকে তার মুখ থেকে এমন মর্মবিদারক আর্তনাদ বের হয়ে আসে যে, উভয়ের কলিজা পানি হয়ে যায়।

শীতের রাত। চারদিক নৈশব্দে ডোবা। সারা গ্রাম অন্ধকারের চাদরে ঢাকা।

— মনে হচচে বাঁচপে নাকো। দিনমানই তড়পি গেলো। যা তো যা, মাধু, একটু দিকি আয়। বাপ হাসু বললো।

— মরিই গিলি তো জলদি মরচে না ক্যান? কী দিকি আসপো গো? ভয়-খাওয়া পাখির মতো জবাব দিলো মাধু।

— তুই একটু শক্ত-মক্ত পাষাণ আচিস হে। বচ্ছর ভরি যার সাতন জীবনের সুকু-মুকু খেললি তার সাতে এমন অকরুণ করচিস?

— বললি-ই হবি? ওর ওই তড়পানি, তাতে আবার হাত-পার ছট-ফটি, ওসব আমি দিকতি পারি নাকো।

একে তো চামারের ঘর। তারপর আবার গাঁ জুড়ে তার বদনাম আছে। হাসু একদিন কাজ-কাম করে তো তিন দিন করে আয়েশ। মাধুও কম না। সে এমনই কামচোর, এক ঘণ্টা খেঁটে-ছিটে ফের এক ঘণ্টা চুরুট টানে। এ কারণে কেউই তাকে কাজে রাখে না। ঘরে যদি একমুঠ চাল, ডাল কিংবা একফোঁটা শালুনের ঝোল থাকে তো কসম খেলেও কাজে নামবে না মাধু। দিন দু-এক অনাহারে কাটলে পরে একদিন হাসু গাছের ডাল-পাতা ভেঙ্গে কুড়িয়ে মাধুর কাছে দেয়, আর মাধু সেগুলো নিয়ে বাজারে বেচে আসে। যে ক’দিন এ দিয়ে চলে সে ক’দিন আর রোজগার নেই। দু’জন নবাবের বদন নিয়ে দিনভর এদিক সেদিক ঘুরে বেরায়। আবার যখন খুদ-পিপাসা হবে তখন হয়তো আবার কাঠখড়ি ভাঙে, নয়তো অনিচ্ছায় কারো দু’চার আনার মজদুরির তালাশে যায়।

এমন না যে, গাঁয়ে এখন কাজের দুর্ভিক্ষ যাচ্ছে। কাজকামের কোনো অভাব নেই। কৃষাণকুলের গ্রাম। মেহনতি মানুষের জন্য পাচ-পঞ্চাশটা কাজ ছড়িয়েই থাকে। কিন্তু গাঁয়ের মানুষ এদের কাজের জন্যে তখনই পায় যখন দু’জন থেকে অন্তত একজনের কাজ না করে আর কোনো উপায় থাকে না। ভাগ্যক্রমে এ দু’জন যদি সাধু-সন্ন্যাসী হতো তবে ‘অল্পতুষ্টি’ আর ‘খোদাভরসা’র লাইনে এদের শুদ্ধ করতে কোনো সবকের দরকার হতো না কেননা, এসব তাদের স্বভাব জাত ‘গুণাবলি’…”

এইভাবেই চামার সমাজের কঠিন বাস্তবতার অভিব্যক্তি মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে এই রচনায়। এভাবেই মানুষের বাস্তব জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, পাওয়া-না-পাওয়া ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। চরম দারিদ্র্য আর অভাবকে, দলিত সমাজ, জাতপাত নির্ভর জীবনের কঠিন রূপ— সমাজের নীচু তলার মানুষরাই তার লেখার মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেছিল। মাধু, হাসু এরাই প্রথম সাহিত্যের চৌহদ্দিতে প্রবেশের সুযোগ পেল প্রেমচাঁদের হাত ধরে।

এর পরেই হুড়মুড় করে উর্দু সাহিত্যের দোরগোরায় হাজির হল সেই চারজন, জলন্ত অঙ্গার হয়ে। ১৯৩২ সালে ‘অঙ্গারে’ নামক উর্দু গল্পের যে-দুঃসাহসী সংকলনটি বাজারে বেরোনোর অল্প কিছুদিনের মধ্যে যুক্ত প্রদেশে নিষিদ্ধ করা হয়, তার চারজন নবীন বুদ্ধিচর্চায় উদ্বুদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দীপ্ত চার গল্পকার একত্রে পরিচিত অঙ্গার গ্রুপ নামে। চারজনই র‍্যাডিকাল, প্রগতিশীল, পরবর্তী সময়ে আহমেদ আলি বাদ দিয়ে বাকি তিনজনই প্রত্যক্ষভাবে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। সাহিত্যে বিধিনিষেধ এবং উত্তর ভারতের মুসলমান সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামির মূলে প্রবল আঘাত করেছিল অঙ্গার। তাই আওয়াজ উঠল এ-বই ‘নোংরা’, ‘ভাষা ও ভঙ্গিতে নির্লজ্জ’, এবং ‘ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি আক্রমণাত্মক’। পরবর্তিতে এই ‘অঙ্গারে’ বিতর্ককে ঘিরে পালটা-আওয়াজ তুললেন নানা ভাষার প্রগতিশীল লেখকরা; ধর্মীয় ও সাম্রাজ্যবাদী সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে।

মূলত সাজ্জাদ জাহির-এর পাঁচটি ছোটোগল্প, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নিদ নেহি আতি’ ও ‘দুলারি’, আহমেদ আলি-র ‘বাদল নেহি আতি’ ও ‘মহাব্বতোঁ কি এক রাত’, মাহমুদ-এর ‘জওয়ানমর্দী’ এবং রশিদ জাহান-এর ছোটোগল্প ‘দিল্লি কি সয়ের’ ও নাটক ‘পর্দে কি পিছে’… এই দশটি লেখা নিয়ে ‘অঙ্গারে’।

এই রচনার উল্লিখিত একদম প্রথমের গল্পটি সাজ্জাদ জাহিরের ‘ফির ইয়ে হাঙ্গামা’। ধর্ম আর রক্ষণশীলতার শোষণের পেছনের ছলচাতুরি আর তার বাইরের ভয়ংকর রিয়্যালিজমকে দেখিয়েছেন সাজ্জাদ। পরের গল্প ‘দিল্লী কি সয়ের’ আর নাটকটি ‘পর্দে কে পিছে’, ‘লেখিকা, ডাক্তার এবং কমিউনিষ্ট’ রাশিদ জাহাঁ অঙ্গারেওয়ালির লেখা। যিনি ইসমত চুঘতাই-এর ‘রাশিদা আপা’। ‘দিল্লী কি সয়ের’ গল্পটিকে দেখা যাক— একটি মুসলিম রমণীর দিল্লী ভ্রমণের কাহিনি, তার স্বামী তাকে মালপত্রের স্তূপে বসিয়ে দিয়ে নিজে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে চলে গেছেন। বউটি সেই জনবহুল স্টেশনে কয়েক ঘণ্টা একা একা যে-সব ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সেগুলি ফিরে গিরে একটি মেয়েদের আড্ডায় বলছে… কিংবা ‘পর্দে কে পিছে’ নাটকটি, যেখানে দু-জন শরিফ মুসলিম পরিবারের রমণী তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে, তাদের যৌনতার সুখ-দুঃখের কথা বলছে, একটি চরিত্র মহমুদি বেগম তার বার বার গর্ভপাত ও খারাপ স্বাস্থের কার্যকারণ সম্পর্কে কথা প্রসঙ্গে লেডি ডাক্তারটিকে বলে ওঠে যে, সে ডাক্তার সাহিবার মতো স্বাধীন নয়, বরং তার পুরুষের অধীন, যে-পুরুষ শুধু নিজের সুখের পরোয়া করে, তার কাছে তার পত্নী বাঁচল কি মরল, কোনো গুরুত্ব পায় না। যেন সে শুধু যৌনদাসী মাত্র… অঙ্গারের ভাষ্য তাবৎ তৎকালীন উর্দু সাহিত্যের পরিসরে সত্যিই আগুন জ্বালিয়েছিল। নাড়িয়ে দিয়েছিল যাবতীয় সামাজিক হিপোক্রেসির শিকড়, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বাঁধন, পুরষতান্ত্রিকতার অহংকারকে।

অঙ্গার উর্দু সাহিত্যে একটা বাঁক। প্রগতিশীলতার দিকে। যেখানে পরতে পরতে মিশে আছে বামপন্থা আর রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের পরবর্তী বাস্তববাদের ভাবনা। আঙ্গারে গোষ্ঠীর লেখকরাও পরবর্তীতে (মেহমুদ আলি ছাড়া) জড়িয়ে পড়েছেন সক্রিয় রাজনীতিতে, সদস্য হয়েছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির। তাঁরা আলোচনাত্বক, সামাজিক এবং বৈপ্লবিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করতেন। লেখার গুণগত মান বা শৈলীর বিচারে অঙ্গারের অবস্থান যাইহোক না কেন, উর্দু সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারার জনক হিসেবে এই চটি বইটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। যদিও প্রগতিশীল আন্দোলনের সব লেখক-কবিই সমাজবাদী বা সাম্যবাদি ছিলেন না, তবুও তার প্রত্যেকেই সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী ছিলেন। এই বৈশিষ্ট্য অঙ্গার বা পরবর্তী উর্দু প্রগতিশীল সাহিত্যের মধ্যেও ছিল।

উর্দু প্রগতিশীল ধারার সাহিত্যের আর একটি গুরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের গভীর প্রভাব। পরবর্তীতে এই মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা রহস্যবাদের সঙ্গে মিশে আধুনিক উর্দু সাহিত্যের নির্মাণ করেছে, কিন্তু সে ভিন্ন গল্প। প্রগতিশীলতার চরম উৎকর্ষতার সময়কালে উর্দু সাহিত্যিকরা লেখায় মানবিক সংবেদনকে দৃষ্টিগোচর করার ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে ইসমত চুঘতাই, মন্টো, কৃষণ চন্দর, রাজেন্দ্র সিং বেদী বা মুমতাজ মুফতি, হাসান অসকরি, মহসিন আজিমাবাদী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। একাধিক উদাহারণের মধ্যে ইসমত চুঘতাই-এর ‘দিল কি দুনিয়া’, মন্টো-র ‘তোবা টেক সিং’, কৃষণ চন্দরের ‘ভরা চাঁদের রাত’ বা রাজেন্দ্র সিং বেদী-র ‘লাজবন্তি’ নিয়ে কথা বললে মনোগত জটিলতার ভাঙাগড়ার ছবিটা স্পষ্ট হবে।

যেমন ইসমত চুঘতাই-এর ‘দিল কি দুনিয়া’ গল্পটি—

“কুদসিয়া বানো কচি বয়সেই স্বামী-পরিত্যক্তা, ফিট খেত ভক্তির সুর মিশ্রিত হামদ শুনলে, এত ইন্দ্রিয়জ কামনাতুর ছিল সেই সদ্যোযৌবনের হতাশার বোধ। শেষে তার একটু গর্ববোধও হতে থাকে যে, এক মেমের জন্য তার স্বামী তাকে ছেড়েছেন। অর্থাৎ, দেশের রাজার সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক রয়েছে কিছু। পাড়ার লোকেও সশ্রদ্ধ ভাবে তাকায়। পাঠানি বুয়া তার বাবা-মা-স্বামীকে দুর্ঘটনায় হারিয়ে চাঁপা গাছের ডালে বেপর্দা বসে থাকে, তাকে প্রলুব্ধ করে লোকগানের যে নাগর মেরঠে চলে গেছে, তার কথা গেয়ে বিলাপ করে সে। নিজেকে মনে করতে থাকে ওই গ্রামের যে পীর বালে মিয়াঁ, যার মৃত্যুদিনে ওরস হয়, তাঁরই রাধা, মত্ত, দিওয়ানি। এ ভাবে তার ভিতরের কামনাগুলি, যা কোনও দিন পূর্ণতা পাবে না, জানলে লোকে বেহুদা বেশরম বলে দোর বন্ধ করে রাখবে, তা বলতে পারা যায় জোরে জোরে। অন্য বৈধতায়। শরিয়তি ধর্মের দিক থেকে দেখলে শাস্ত্রে তার ঠাঁই নেই, কিন্তু এই উপমহাদেশের লোকজ মরমিয়া তত্ত্বের ইতিহাসে সম্পূর্ণ সিদ্ধ। এক দিকে উত্তরপ্রদেশের উর্দু আফসানা, তাকে এলিট অন্তঃপুরের নিজস্ব রূপে দেখান চুঘতাই, অন্য দিকে তাঁর লেখা যেন জানানার মধ্য থেকে দেখা,নানা-নানী-বড়ি-আব্বা-আম্মা-বাঈজী-ছোটি বুয়া-ভাবীজান-চাচা সন্ধেবেলা লণ্ঠন-হাতে আলি বকশ। যাদের দেখার জন্য তিনি বেছে নেন এক বালিকা কথককে। বালিকার চোখ থেকে দেখায় জানাচেনা জিনিসগুলি হয়ে দাঁড়ায় না-জানা, সংকেতময়, ভয়াবহ বা সারল্যে ভরা। ঝিয়ের মেয়ে গাইন্দাকে যে গর্ভবতী করেছে ভাইয়া, বা এটা যে লেপের নীচে বেগমজান আর তার পরিচারিকা রাব্বু— রোজ রাত্তিরে ভয় দেখানো পাগল হাতি না, বালিকা কথকদের এই সব ভয় আর অজানা দিয়েই তৈরি হয় একটা সমাজের অবসন্নতা, ক্ষয়িষ্ণুতার ছবি, তার সমালোচনাও। নারীবাদের তীব্র প্রতিবাদের স্বর এখানে অনেক মনস্তাত্ত্বিক, অন্তর্ঘাতমূলক।”

এভাবেই প্রগতিশীল উর্দু সাহিত্য ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে। যা কেবল উর্দু সাহিত্যকেই পুষ্ট করেনি প্রতিটি ভারতীয় ভাষার সাহিত্যে তা আলোকবর্তিকার কাজ করেছিল। প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন ১৯৩৬ সালে লখনউতে গঠিত হয়েছিল, ভারতীয় লেখকদের লন্ডন বৈঠকের ঠিক এক বছর পরে, এই সংস্থার পিছনে প্রেরণা হিসাবে সাজ্জাদ জহির-এর নেতৃত্বে ‘আঞ্জুমান তারককি পাসান্দ মুসান্নাফিন’ ছিল। শীর্ষস্থানীয় অন্যান্য লেখকরা যাঁরা যুক্ত ছিলেন— ডঃ মুলক রাজ আনন্দ, ডাঃ জোশী পারশাদ, প্রমোদ রঞ্জন সেনগুপ্ত এবং ডাঃ এমডি তাসির ইত্যাদিরা। সাজ্জাদ জহির তাঁর বিখ্যাত বই ‘রোশনিতে’-র গঠনের বিবরণ সন্ধান করেছিলেন। বলা যেতে পারে যে, উর্দু লেখকরা ‘আঞ্জুমান তারককি পাসান্দ মুসান্নাফিন’-এর সর্বাগ্রে ছিলেন, তবে পরবর্তীকালে ভারতীয় ভাষার প্রায় সমস্ত লেখকেরা একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, দেশের অভ্যন্তরে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে, কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের জন্য সংগঠনটি সমাজতন্ত্রকে যথাযথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে বিবেচনা করে, যা শোষণের অবসান ঘটাতে পারে। প্রগতিশীল সাহিত্যের লেখকগণ স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, জনগণের শাসনের দাবিকে লেখায় গুরুত্ব দিয়েছিল।

উর্দু তথা ভারতীয় সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারা একটি বহুধা বিস্তৃত আলোচনা। আজকের সমকালীনতায় সেই ইতিহাসকে জানা ও বোঝা খুব জরুরি। জরুরি এই আলোচনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

একবার বলা দরকার প্রিয় ফয়েজ-এর কথাও, বামপন্থী চিন্তাধারার বিপ্লবী উর্দু কবি ছিলেন ফয়েজ । সর্বভারতীয় প্রগতিশীল লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সাম্যবাদী এই কবি সাম্রাজ্যবাদ আর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন, নির্বাসন দণ্ড ভোগ করেছেন। উর্দু কবিতা চর্চার প্রতিটি মুহূর্তে বিশ্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আফ্রো-এশীয় মানুষের মুক্তি ও শান্তির সপক্ষে সংগ্রাম করেছেন…

“তারপর কেউ এলো বুঝি মুর্দা-মনের জানাজায়?
না তো, কেউ না পথভোলা মুসাফির হবে কোনো
চলে যাবে এখনই
ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সুদীর্ঘ রাত, মুখ লুকাচ্ছে তারকারাজির মাহফিল মহলে মহলে কাঁপছে ঘুমাতুর প্রদীপশিখা
পথচারীর অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়েছে হরেক পথ অচেনা ধুলো ঢেকে দিয়েছে বাসি কদমের ছাপ।
প্রদীপ নেভাও ঢালো রত্নখচিত পেয়ালায় শরাব,
এরপর শিকল লাগিয়ে নাও তোমার স্বপ্নহীন সব দরজায়
কেউ না, কেউ আর আসবে না এই ঠিকানায়…।”