Categories
গল্প

পাপড়ি রহমানের গল্প

জলময়ূরীর সংসার

জামগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দুই পা সামনে ছড়িয়ে বসেছিল ঝুলমুলি। তার চোখের সামনে বাঘিয়ার বিলের থইথই জলরাশি। হাওয়া বেগে বইলে সমস্ত বিল যেন মুহূর্তে দুলে ওঠে। তারপর তারা ঢেউ হয়। ইয়া বড়ো বড়ো মস্তপানা ঢেউ। ঢেউ হয়, আর ছুটে যায় দূরে, বহুদূর। একেবারে দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে। এ-মতো দৃশ্য শুধুমাত্র বাদলার কালেই দেখা যায়। উইন্যার মরশুমে কাদাপ্যাকলার রাজত্ব। তখন বিলের রুগ্ন চেহারা। কিছু জলজ উদ্ভিদ বেঁচে থাকার আশায় আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে। কিছু শাদা ঘাস তখন মাথাডগা বের করে ভালো করে দুনিয়া দেখতে চায়। এই ঘাসেরা বাদলার কালে জলের তলায় ডুবে থেকে নিজেদের সবুজ বরণ খুইয়ে বসে আছে। এতক্ষণে দুনিয়াদারি দেখতে দেখতে ফের তারা সবুজ হয়ে উঠবে। ফের তারা তরতরিয়ে বিস্তার করে চলবে নিজেদের বংশ। বাঘিয়ার বিলের এমন রকমসকম ঝুলমুলি কোমরে কালোতাগা বাঁধা অবস্থা থেকেই দেখে এসেছে। রোগবালাই দূরে রাখার জন্য মা একটা কালোতাগা ঝুলমুলির কোমরে বেধে দিত। তাগার সঙ্গে একটা ছোট্ট ঘুঙ্ঘুট। উঠানময় দৌড়ে বেড়ানোর সময় ওই ঘুঙ্ঘুট টুংটুং করে বেজে যেত। আর মা আম্বিয়া খাতুন কাজ ফেলে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত ঝুলমুলির উদোম গতর— মেয়েটার গায়ের রং মাজা হবে। গরিবের সংসারে কালো মেয়ের বড়ো অনাদর। কালো মেয়ে পরের ঘরে বিদায় করা বড়ো ঝক্কির। টিভি, মোটরসাইকেল দিতে চাইলেও কালো মেয়ের বাজারদর চড়া হয় না। সেরকম পাত্রও জোটে না। যদিও-বা জোটে তাও ম্যালাই দাবিদাওয়া নিয়ে হাজির হয় তারা! টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেলের সঙ্গে মোটা অঙ্কের যৌতুক দাবি করে বসে। ঝুলমুলির মা মেয়ের উদ্দাম চলা দেখেও তাই খুশি হতে পারত না। মনে শঙ্কা বাসা বাধত— কাইল্যা মাইয়াডারে পার করুম কেমতে?

কিন্তু ঝুলমুলির মায়ের নানান আশঙ্কা সত্ত্বেও ঝুলমুলি বড়ো হতে থাকে। তার দেহে লাবণ্য এসে হামলে পড়ে আর ঝুলমুলি সেয়ানা হয়ে ওঠে। আম্বিয়া খাতুনের মেয়ের এই ঝলমলে ছিরিছাঁদ দেখে মনে মনে আঁতকে ওঠে—

মরারশুকির গতরে য্যান বাইস্যা মাসের নয়া পানির মাছেগো খলবলানি। এত উজাইও না গো মা-জননী! বেশি উজাইলে বোয়াল মাছের প্যাডের ভিতর চইল্যা যাইবা, নইলে শইল মাছ তুমারে গিল্যা খাইব। তহন আর বারাইতে পারবা না। মাছের প্যাডের ভিতরের মাছ কবে আর তার নিজের পরান ফিরত পাইছে?।

না, আম্বিয়া খাতুন এমন ভাবে, কিন্তু তার ভাবনা সে মনের লাটাইয়ে পেঁচিয়ে রাখে। এই লাটাইয়ের সুতার সন্ধান সে কিছুতেই দেবে না ঝুলমুলিকে। দিলে মেয়েটা আর নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে পারবে না। তার বাড়বাড়ন্ত বাধাগ্রস্ত হবে। মেয়েটা অন্তত নিজের মতো করে বেড়ে উঠুক। জমিনে শুয়ে থাকা মিষ্টিকুমড়ার ডগা যেমন আপন গতিতেই বাড়ে, লকলকিয়ে তরতরিয়ে বাড়ে— ঝুলমুলি না হয় তেমনিভাবেই বেড়ে উঠুক। আম্বিয়া খাতুন এমন ভাবে, কিন্তু ছলিমুদ্দি এমন ভাবে না, বা ভাবতে পারে না। এর আগে দুই মেয়ে মঞ্জুলি আর ফুলকলি যখন সেয়ানা হয়েছিল, তখনও সে এমন ভাবে নাই। বা ভাবতে পারে নাই। দুই মেয়ের বিয়ে দিতে হালের চারটা বলদ ছলিমুদ্দিকে বিক্রি করতে হয়েছিল। গোয়াল ঘরের দিকে তাকালে আজও তার দুই নয়ন জলে ভরে যায়। গোরু বিক্রির টাকায় একটা হাতঘড়ি আর টেলিভিশন দেয়া গিয়েছিল। বাকি টাকায় ছেলেপক্ষকে শাদাভাতে গোরুর মাংসের সুরুয়া ঢেলে কোনোরকমে খাওয়ানো গেছে। এ নিয়ে মঞ্জুলি আর ফুলকলির শ্বশুরবাড়ি কম কথা শোনায় নাই!

‘মুরগার রুস্টের কতা কি আবার কইয়া বইল্যা নিতে অয় নাহি? বেবাক বিয়াতেই তো এইগুলা আকছার খাওন দেয়।’

ছলিমুদ্দি রা করতে গিয়েও যেন গিলে ফেলেছে। কষ্টেমষ্টে নিজেকে সামলেছে। মাইয়ার বাপ অইলে নীচা অইয়া থাকতে অয়! নীচা মাইনষেগো এত রাওউও করলে চলে নাহি?

নীচা মাইনষেগো মাতাডা আরও নীচা কইরা রাহন নাগে। মাতাডা মাটির লগে মিসমার কইরা রাহন নাগে। ছলিমুদ্দি তাই নীচা কইরাই রাখে নিজের মাথাডা। নীচাই রাখতে চায়। কিন্তু তাও কি মঞ্জুলি আর ফুলকলির সুখ মেলে? মেলে না! ছলিমুদ্দি তো কম চেষ্টা চালায় নাই। কথা সত্য, মুরগার রোস্ট সে খাওয়াতে পারে নাই। জনা পঞ্চাশেক লোক খাওয়ার পরেই মাংসের হাড়িতে টান পরে যায়। কিন্তু কী-ই-বা করবে ছলিমুদ্দি?

ভালো কোম্পানির টেলিভিশনের দাম তো তার একটা বলদ বিক্রির দামের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কাল্লা, ধলা, লাল্লি আর সফেদাকে বিক্রি করতে গিয়ে ছলিমুদ্দির বুক ফেটে গিয়েছে। ছলিমুদ্দির ঘরদোর এতদিনে শূন্য-ময়দান। সহায়-সম্পত্তির খুদকুঁড়োও কোথাও পড়ে নাই। দিনমান হা হা করে ছলিমুদ্দির দুয়ার-আঙিনা। বাঁশঝাড়ে হাওয়া জোরে বইলে মনে হয়, কে যেন কেঁদে চলেছে! কে যেন গুনগুনিয়ে অথচ গোপনে কেঁদেই চলে। ছলিমুদ্দির মন মিথ্যে বলে না বা হয়তো তার কানও ভুল শো্নে না। কাল্লা, ধলা, লাল্লি, সফেদার হাম্বা হাম্বা রবের সাথে মঞ্জুলি আর ফুলকলিও গলা মিলিয়ে কাঁদে। ছলিমুদ্দির কানে তেমনভাবেই পৌঁছায়। ছলিমুদ্দি ইদানীং মানুষ আর জন্তুর বিভেদ করতে পারে না। সে কীভাবেই-বা বিভেদ করবে? ছলিমুদ্দির কাছে তো মানুষ আর জন্তুর মূল্য প্রায় সমান কাতারে। আর তার ঘরদোরও শূন্য ময়দান। কাল্লা, ধলা, লাল্লি, সফেদার সাথে সাথে মঞ্জুলি আর ফুলকলিও তার চোখের আড়ালে চলে গেছে! এটা ভেবেও ছলিমুদ্দি্রমন বড়ো বেচান হয়।

‘যাগো এত্তদিন বুকে ধইরা আগলাইয়াছি, হেরা দেহি বেবাকেই আমারে ফালায়া থুইয়া গেলগা! আমার কুনদিহে লাভ কিডা অইল? আমার আপনার আর থাকল কী? লাল্লির চক্ষু দুইটা দিয়া ক্যামতে যে পানি পড়বার নাগছিল! বুবা জানোয়ার, কিছু কইয়া যাইতে পারে নাই। মাইয়া দুইটার চক্ষু দিয়া পানি পড়বার নাগছিল, হেরাও তো আমারে ভালা কি মন্দ কি কুনু কতাই কইয়া গেল না!’

এ-সব ভেবে ভেবে কোনো কোনো রাতে ছলিমুদ্দি একেবারে বেঘোর কেঁদে ওঠে। তখন হয়তো আম্বিয়া খাতুনের ঘুম ভেঙে যায়। ছলিমুদ্দি তখন জোর করে কান্নার ফুঁপানি বন্ধ করতে চায়, কিন্তু দম ফুরিয়ে যাবার মতো করে নতুন কান্না তাকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। আম্বিয়া খাতুন পরম মমতায় সোয়ামির পিঠে হাত রাখে। ধীরে ধীরে আঙুল বুলিয়ে বলে—

‘কীয়ের নাইগ্যা আফনে কাইন্দা মইরুন কন তো? হারাদিন তো ভালাই থাহুন। রাইত অইলেই কি জন্মের দুস্ক আফনেরে সজাগ কইরা তুলে? কীয়ের দুস্কে আফনে কাইন্দুন এমুন কইরা?’

ছলিমুদ্দি তখন বউয়ের এতসব প্রশ্নের জবাব দেবার অবস্থায় থাকে না। এত দুঃখ গলায় চেপে রেখে কোন মানুষই-বা কথা বলতে পারে? ছলিমুদ্দি আম্বিয়া খাতুনের উপর মনে মনে বিরক্ত হয়—

‘কীয়ের সোমসার যে আমি করি? হেয় তো বেবাকই জানে আর বুঝে, তাও কী না আমারে জিগায়? ঘুইরা ফিরা পত্যি আমার দুস্ক তালাশ করে! এই যে আমাগোরে বাড়িঘর, উঠান সব কেমতে ধূ ধূ ময়দান অইয়া গেল হের তালাশি তার মনে নাইক্কা। কিমুন বেহুশি মাইয়ানুক! যে কুনুদিন অন্তরের ভাও বুঝে না হের লগে জনমভর সোমাসার কেমতে করে মাইনষে?’

ছলিমুদ্দির অবিশ্রাম অথচ লুকানো কান্নার খোঁজখবর না করেই আম্বিয়া খাতুন ফের ঘুমে মরে যায়। নাকি দুম করে ঘুম এসে তাকে মেরে ফেলে? খানিক আগেই যে টসটসিয়ে কথা বলল, ভালোমন্দের খবরবার্তা জানতে চাইল, তার এমন আঁতকা ঘুমিয়ে পড়া দেখে ছলিমুদ্দির কান্না ফুরিয়ে যায়। ছলিমুদ্দি অনুভব করে, তার সকল কান্না কেমন ধুন্দুমার মিলিয়ে গেছে! তখন হয়তো পূবের আকাশে সামান্য শাদা শাদা আলো ফুটে উঠছে। ওই শাদাটে আলোর নীচে উঠানের জোয়ান শিউলি গাছটা বেশুমার ফুলেদের পাপড়ি মেলে দিয়েছে। ততক্ষণে আম্বিয়া খাতুনের খোঁয়াড়ের বড়ো রাতাটাও জেগে উঠেছে! জেগে উঠে ঘাড়ের কালো-সোনালি-খয়েরি রঙা পালক ফুলিয়ে সূর্যোদয়ের প্রথম বাগ দিচ্ছে।

এইবার আষাঢ় নামার সঙ্গে সঙ্গেই বাঘিয়ার বিলে জল একেবারে উপচে উঠতে লাগল। ঝুলমুলি বিলের এরকম বাড়-বাড়ন্ত রূপ ম্যালাদিন চক্ষে দেখে নাই। ঝুলমুলি দেখেছে, লিলুয়া বাতাসে বিলের ছোটো ছোটো ঢেউদের জেগে উঠতে। তারপর তারা মৃদুমন্দ গতিতে, আয়েশ করে ক্রমশ সরে গেছে তীরের দিকে। অথবা ঢেউদের বুকের ভেতর, ঢেউদের শরীরের ভিতর দুলে দুলে মিশে যেতে। কিন্তু এইবার বাদলার জল ঝরে পড়ামাত্রই বিলের চেহারা গেল আমূল পালটে! স্বচ্ছ জলের স্তম্ভ ভেঙেচুরে চক্ষে একেবারে ধান্দা লাগিয়ে দিল। বাঘিয়ার বিলে রুই-কাতলা আর মৃগেলের পাখনা-লেজের ঝাপটানিতে রুপালি ঝিলিক উঠল ঘনঘন। শিঙ্গি-মাগুর আর পুঁটির ঘাঁইয়ে বুরবুরি উঠতে লাগল পার ঘেঁষে। ফি বছর শাদা শাদা এন্তার শাপলার মাঝে কিছু বেগুনি পানার ফুল অনাহূতের মতো তাকিয়ে থাকে। এবার কি না একেবারে অন্য দৃশ্য! পদ্মফুলের বড়ো বড়ো পাতা ছাতার মতো ভেসে রইল বিলের চারধারে। আর ফুটল অগণন ফুল। শাদা শাপলার ফুটে থাকাকে ম্লান করে পদ্মের গোলাপি আভা ঢেকে দিল স্বচ্ছ জলের বিস্তীর্ণ চাদর। ঝুলমুলির চক্ষে বিস্ময় আর ধরে না! আচানক এতকিছু দেখে শুনে তার মাথাটাও যেন আর আগের মতো কাজ করে না!

‘ই-ই-রে! এইডা কুন জমানা আইল? এতকাল দেখতাছি এই বিলের ছুরত! আইজ কুন কারণে হে্র ছুরত বদলায়া যায় রে? কত মাছের ঝাইকের খলবলানি আর ল্যাজ নাড়ানি দেইখ্যাই না সিয়ান অইলাম, অহন কিনা দেখি মাছগুলান ফাল দিয়া টানে উইঠা আইবার চায়! জাল ফেলাইলেই অহন খালুই ভইরা নেওন যাইব মনে লয়! বঁড়শিতে আদার দিলেই টপাটপ মাছ উইডা আইব!’

ঝুলমুলির আন্দাজ একেবারে মিথ্যে নয়। ছলিমুদ্দি এর মাঝে জাল ফেলে খালুই দুই মাছ নিয়ে গেছে। মাদারজানির মানুষজন ঝাপ্পুরঝুপ্পুর করে মাছ ধরার কায়দা-কানুন আবিষ্কার করে চলেছে।

ঝুলমুলির চক্ষু ভরা বিস্ময়ের মাঝে মাদারজানির জোয়ান ছেলে-ছোকরারাও জাল ফেলে। বঁড়শিতে আদার দিয়ে টপাটপ মাছ টানে তুলে আনে। ওই দলে জমির চেয়ারম্যানের পুত্র ইস্কান্দারকেও দেখা যায়, সে-ও জলে নেমে খুইয়া জালে কইয়ের ঝাঁক তুলে আনে। মাছগুলার লাফালাফির ফাঁকে খুব সন্তর্পনে একটা পদ্মফুলও উপড়ে আনে সে। ওই পদ্মফুল শোভা পেতে দেখা যায় ঝুলমুলির লম্বা বিনুনির আগায়।

ইস্কান্দারের তুলে আনা পদ্মফুল কোন ফাঁকে-বা কেন ঝুলমুলি বিনুনির শোভা বাড়ায় তা কেউ খেয়াল করে না। এমনকী আম্বিয়া খাতুন ও ছলিমুদ্দির চোখেও তা পড়ে না। ঝুলমুলির কালো মুখে কোথা থেকে যেন হলদেটে আলোর ছটা এসে পড়ে! ঝুলমুলির সইয়েরা বহুদিন বাদে তাকে ‘ফুলটোক্কা’ খেলতে দেখে। এক সইয়ের চোখ দুই হাতের আঙুলে ভালো করে চেপে ধরে ঝু্লমুলি ডাক ছাড়ে—

টাপটুপানি লোহারকাঠি
বৃন্দাবনে টিয়াপাখি
ছুটলোরে ছুট!
কচুর পাতা হলদি
ছুঁইয়া আয় জলদি
কোন ঘরে চোর গেছে ‘সাবধান!’

বলেই জোরে ডাক দেয়—
‘আয়রে আমার কদমফুল!’

শেষ পাতা

Categories
গল্প

লোকগল্প

আরও কিছু আছে বাকি

গল্প কথক: পার্থ হাজরা
সংগ্রহ ও লেখা: সুব্রত ঘোষ

কোন এক গ্রামে এক শখের সাধক বাস করতেন। সামান্য মন্ত্র বিদ্যার চর্চা করতেন তিনি। সাধক এবং সংসারী মানুষটির তাই জীবন নিয়ে কৌতূহল কম ছিল না। চাষাবাদ করে কোনো মতে দিন চালিয়েই খুশি থাকতে পারতেন না। মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াতেন। আর নিজের মন্ত্র প্রয়োগ করে দেখতেন পশু পাখি গাছপালা এমনকী মানুষের উপর। এই কারণেই তাকে এড়িয়ে চলত গ্রামের লোক। এমনি একদিন বেড়াতে বেড়াতে তার চোখে পড়ল একটা মড়ার মাথার খুলি কাত হয়ে আলের ধারে পড়ে আছে। খুলি দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। হায়, জীবনের এই তো পরিণতি হবে একদিন। এই ভেবে বিমর্ষ হয়েই ভাবলেন এই খুলি এখানে এল কী করে! কাছে পিঠে শ্মশান নেই। চোত-গাজন শেষ হয়েছে মাস চার হল। পচা ভাদ্র শুরু হবে এবার। ধরম পুজোও মিটে গেছে। গাজনের দলের কেউ যদি ভুল করে ফেলে গিয়েও থাকে খোঁজ খোঁজ রব উঠবে। তবে কি শেয়াল কুকুরে টেনে নিয়ে এল? না, কাঁচা খুলি নয়। শুকনো খুলি। একটা কাঠি দিয়ে খুলিটা নাড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে হল তার। কাঠি দিয়ে নেড়ে সোজা করতেই খুলিটার মুখোমুখি হতে হল তাকে। মানুষের মাথার খুলি। কিন্তু খুলির কপালের লেখন যেন তিনি পড়তে পারলেন। মন্ত্রবলে একটু চেষ্টা করেই পড়তে পারলেন লেখাটা— লেখা আছে— ‘আরও কিছু আছে বাকি’। এর পরেও বাকি থাকে কিছু জীবনে? মৃত্যুই জীবনের শেষ পরিণতি। তারপর আর কী? কর্মফলের কারণে আবার ফিরে আসা নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে। কিন্তু সেই আত্মা তো নশ্বর শরীর ছেড়ে গিয়েছে। জড় দেহ মিশে যাবে পঞ্চভূতে। এই খুলির তবে এমন কোন পরিণতি বাকি আছে? একটা সিদ্ধান্ত নিতে মানুষটি বিচলিত হলেন। কিন্তু নিজের কৌতূহলের কাছে হার মানলেন শেষ পর্যন্ত। এই খুলির শেষ পরিণতি না দেখে তিনি ছাড়বেন না। চারপাশে তাকিয়ে দেখে হেঁট হয়ে কুড়িয়ে নিলেন খুলিটা। খুব দ্রুত বেঁধে ফেললেন গামছায়। ঝুলিয়ে নিলেন পিঠে। তারপর হাঁটা দিলেন বাড়ির দিকে। বাড়ি না গিয়ে তিনি গিয়ে ঢুকলেন গোয়াল ঘরে। খুলিটাকে তুলে রাখলেন গোয়াল ঘরের মাচার ওপর, সবার চোখের আড়ালে।

কেউ খেয়াল না করলেও তার স্ত্রী খেয়াল করল স্বামীর চরিত্রে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। আরও যেন সংসার বিমুখ হয়ে গেছে মানুষটা। জোর করে কাছে টানলেও কাছে আসতে চায় না। একদিন ভোর রাতে স্বামীকে গোয়াল ঘরের দিকে যেতে সন্দেহ হল তার। একদিন গোয়াল ঘর থেকে ঘেমে নেয়ে বের হতে দেখল স্বামীকে, ফলে সন্দেহ আরও বাড়ল। একদিন দেখল স্বামী গোয়াল ঘরের মাচার উপর বসে আছে, সে যেতেই হুড়মুড়িয়ে নেমে এল। যে এক আড়া মঁইটা দেওয়াল লেপতে নিয়ে এসেছিল সে গোয়াল ঘর থেকে, দেখল ভর দুপুরে তার স্বামী সেই মঁই নিয়ে গোয়াল ঘরে ঢুকল, আবার কিছুক্ষণ পরে মঁই কাঁধে ফিরে এল বাড়িতে। সন্দেহ তখন মানুষ ছেড়ে গোয়াল ঘরের মাচার দিকে ধাবিত হল। একদিন স্বামী মাঠের দিকে যেতেই স্ত্রী ছুটে গেল গোয়ালে। মাচায় উঠে একটু খুঁজতেই সে দেখতে পেল খুলিটাকে। এই খুলির টানে মানুষ যুবতী স্ত্রী ছেড়ে ভোর রাতে গোয়াল ঘরের মাচায় ছুটে আসে!! সন্দেহ একটা হত। আজ তীব্র হল। এ নিশ্চয়ই তার স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকার খুলি। তন্ত্র মন্ত্রের নামে এইসব হচ্ছে দু-জনে। মরেও শান্তি দিচ্ছে না, এখনও তার আর তার স্বামীর মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে!! এর একটা হেস্তনেস্ত না হলেই নয়। খুলিটাকে বাড়িতে এনে শিলে ফেলে নোড়া দিয়ে ঠুকে ঠুকে ভেঙে মশলার মতো বেটে ধুলো বানিয়ে ফেলল সে। তাতেও তার রাগ কমল না। সেই ধুলো ঝেটিয়ে ফেলে দিয়ে এল পাঁদাড়ে। যাক, এবার গিয়ে প্রেমিকার মুখোমুখি বসুক মাঝরাত্তিরে গোয়াল ঘরের মাচার ওপর।

সাধক মানুষটি এই ভেবেই চিন্তিত ছিলেন যে একটা মড়ার খুলির এমন কী পরিণতি বাকি থাকতে পারে। বিদ্যা তার গুরুমুখী নয়। মেলার মাঠে কেনা দশ বিশ টাকার বশীকরণ সংক্রান্ত পুঁথি পাঠেই সীমাবদ্ধ তার তন্ত্র মন্ত্রের জগৎ। এই নিয়ে আক্ষেপ ছিল তার মনে মনে। মড়ার খুলির কপালের লেখন পড়তে পেরে তার আস্থা জন্মেছিল নিজের উপর। কিন্তু গোয়াল ঘরের মাচায় রোজ ওঠেন আর হতাশ হন এই দেখে যে খুলির কোনো পরিবর্তন হয়নি। দিন কয়েক যেতে না যেতেই আবার দেখতে ইচ্ছে করে। ছুটে যান। মাস খানেক কেটেও গেছে। আজ মাঠ থেকে ফিরে মাচায় উঠে চমকে উঠলেন তিনি। খুলি গেল কোথায়? সন্দেহের তির ছুটল স্ত্রীর দিকে। ছুটে এলেন বাড়িতে। স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন— “মাচায় একটা খুলি রাখা ছিল। তুমি জান সেটা কোথায়?” স্ত্রী তাকে ভর্ৎসনা করে খুলির পরিণতির কথা বলে জানাল— “যাও কেন, গিয়ে বসো মাচার ওপর। যেটুকু ওর সাধ বাকি ছিল আজ মিটিয়ে দিয়েছি। আর তুমি যদি ফের ঐ মাচামুখ হয়েছ তবে তোমাকেও আস্ত রাখব না।”

গল্প সংগ্রহের স্থান: গ্রাম মোহনপুর, থানা নানুর, জেলা: বীরভূম, ২০১৮

Categories
কবিতা

অনিন্দ্য রায়ের কবিতা

হাসির সমার্থশব্দ

হাসির সমার্থশব্দ, তুমি তো ব্রুনেট

দেহাতি ডান্সবার, এখানে আয়না নিয়ে প্রবেশ নিষেধ
যদি নিজেকে খোলার ব্রীড়া নিজেই দেখতে

ওই ছুরি, শীতল খেলনা
ওই টারকোয়েজ রুমাল
          পরস্পরকে টুকরো করছে
               অবদমনের বশে যেভাবে ইন্দ্রিয় কাটা হয়
আর হ্যাজাকের পাশে চুপ করে বসেছে টিকটিকি
পোকারা বিপন্ন হচ্ছে
          পুরুষের চোখের মতো ছোটোছোটো পোকা

সমস্ত পোশাক খুলে শুধু হাসিটুকু পরে রয়েছ, তুমি দ্যু
আর দীর্ঘ কালোচুল যতখানি প্রহেলিকাপ্রিয়

বিরহ বুড়ির বাড়ি

বিরহ বুড়ির বাড়ি, স্বামী ও সতীন থাকে ওপাশের ঘরে
প্রেম কি ওখানে!
আজ কেউ আগুন ধরাবে?
কেউ বলবে, “ভালোবাসা বয়সের পোষা”?
সহসা শেকল খুলে বাইরে এনেছে, নগ্ন
               এবং মাংসাশী
বুক্কনের শেষে যে নৈঃশব্দ্য আসে
সেখানে রক্তের ছোপ উটকো তরুলতায় ছেটানো রয়েছে

Categories
গদ্য

উৎপলকুমার বসুর অগ্রন্থিত গদ্য

শিশুসাহিত্য প্রসঙ্গে

কোথায় যেন পড়েছিল— বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। বহু অর্থহীন প্রবচনের মতো এরও আছে যুক্তিহীন অবিস্মরণীয়তা। এভাবে আমরা চমৎকার উপায়ে সমাজকে চিরদিনের মতো,  ছকে ফেলে, ভাগ করে দিতে পারি— জেলেরা জলে সুন্দর, ধোপারা সাইকেলের পিছনে বা শত্রুরা কারাগারে সুন্দর, নাগরিকতা ধর্মতলায়। হেন সৌন্দর্যবোধ ব্যতিক্রমকে অগ্রাহ্য করে। সঠিক ব্যতিক্রম-চিন্তা মাথায় না থাকার ফলে আকাশ থেকে খসে পড়া বহু আকর্ষণীয় ঘুড়ি আমরা শেষ পর্যন্ত ধরতে পারিনি। শুধু গতিবিক্রম এর জন্য দায়ী নয়, এর পিছনে ছিল ভুল জ্যামিতি জ্ঞান, ভুল উচ্চতা নির্ণয় এবং গ্রামের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছেলেটি, যে একইসঙ্গে ছিল বায়ুবিজ্ঞানী ও হঠকারী, মসজিদ হইতে পতনের ফলে যে ভবিতব্যতার দেখা পেয়েছিল— তাহলে তার সম্বন্ধে বলতে হয়, সে ছিল ছাদের সুন্দর। মুঙ্গেরের ভূমিকম্প অবশ্য মুঙ্গেরে সুন্দর বলা চলে না।

অনুরূপ, ব্যতিক্রমী একটি তালিকা যদি তৈরি করি তবে দেখা যাবে কত-না ভুল ধারণা আমরা বাস্তুসাপের মতো পুষে আসছি যেমন, আমরা ভাবি শিশুদের জন্য, কিশোরদের উপকারার্থে একটি বিশেষ ধরনের সাহিত্য আছে বুঝি, যার নাম শিশুসাহিত্য। অতীতে যে রামায়ণ মহাভারত বুড়ো-বুড়িরা শুনত, তাই বালকের বা বালিকার পক্ষে ছিল পর্যাপ্ত। যে-নিসর্গের সঙ্গে চিরদিন প্রাপ্ত বয়স্করা যুদ্ধ ও মৈত্রী ঘোষণা করেছিল— ওরা তারই রণক্ষেত্রে অকুতোভয়ে ঘোরাফেরা করেছে। তার আলাদা জগৎ তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি— কারণ, আলাদা জগৎ বলে কিছু নেই। যেমন, নেই বিশেষ সাহিত্য— শিশুসাহিত্য বা মহিলা সাহিত্য বা রেল কর্মচারীদের জন্য সাহিত্য।

শিশু সাহিত্য আসলে এক মরালিটি বোধ থেকে জাত শিল্প প্রচেষ্টা। এবং ভিক্টোরিয়ান আমলে এর বহুল প্রচার ঘটে। পাপবোধ বুঝি পাপের চেয়েও দুর্বল। তাই ভিক্টোরিয়ান দুর্নীতির সঙ্গে সঙ্গেই ‘শিশুসাহিত্য’ নামে এক সুনীতি প্রচার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। লিউইস ক্যারল গোপনে কিশোরীদের ফটোগ্রাফ তুলতেন সদ্য আবিষ্কৃত একটি বিস্ময়কর যন্ত্রের সাহায্যে যার নাম ক্যামেরা। তাঁর ডায়েরি এবং সমসায়িকদের চিঠিপত্র থেকে জানা গেল এই অকৃতদার, স্বল্পবাক্ অধ্যাপকের ঘরে ‘লজেন্স টফি’-র লোভে বালিকাদের আনাগোনা ছিল। অপর দিকে তাঁরই রচিত শিশুসাহিত্যে— যা মনোমোহন কাব্যের মতো উদার, জটিলতাময় ও উন্মুখর— সেই ভিক্টোরিয়ান যুগেরই নীতিসঞ্চান দেখতে পাই। ব্রহ্মা সুকুমার রায় সে-ধারার প্রচলন ঘটালেন আমাদের সাহিত্যে।

আজ মনে পড়ে, প্রবাসী বা ভারতবর্ষে একদা যে-কাহিনিগুলি ছাপা হত তা ছিল আকর্ষণীয়। কিন্তু, অর্ধনগ্না মহিলাদের ছবিগুলির কথা ভুলিনি। আমাদের যে সেনসুরালিটি তৈরি হয়েছিল— তাতে উভয়েরই অকৃপণ হস্তক্ষেপ ছিল। বুঝি-বা মনে হয়েছিল দূর আজমিড় পাহাড়ের মতো কোনো এক রহস্যময় উপত্যকায় ওই স্বপ্নময়ীদের সন্ধ্যাজল থেকে উঠে আসা।

শিশুসাহিত্যের আশ্চর্য ও অফুরন্ত প্রকাশ ঘটেছিল ওই ভিক্টোরিয়ান আমলে। অধুনালুপ্ত ‘বয়েজ ওন বুক’ জাতীয় কিশোর পত্রিকার এক্ষেত্রে উল্লেখ প্রয়োজন। আধুনিক কমিক‍্স— এর আদি রূপ এবং সামাজিকতা দেখা যায় এই সংগ্রহগুলিতে। সেকালের অরণ্যদেব ছিলেন শ্বেতাঙ্গ, অসমসাহসী এবং প্রায়শ আফ্রিকার জঙ্গলে অভিযানরত। তিনি বশংদ আফ্রিকানদের ত্রাণকর্তা— কিন্তু বিদ্রোহীদের যম। এই ঔপনিবেশিক আদর্শ পুরুষের আরেকটি রূপ দেখতে পাই পরবর্তীকালে টার্জান চরিত্রে এবং ফিল্মজগতে মূক পশুদের সাহায্যে সে, শ্বেতাঙ্গদের উপকারার্থে, কত-না অসম্ভব সম্ভব করেছে। সে-ও কিন্তু বর্ণবৈষম্যবাদী। চীন-বিরোধী ‘ফু-মান্-চু’ গল্পগুলিতে ছিল ওই জাতির বিরুদ্ধে অবজ্ঞা, ঘৃণা ও অপপ্রচার। গোয়েন্দা শার্লক হোমসের হাতে ধরা-পড়া দুষ্কৃতকারীরা তো প্রায়ই স্বীকার করত যে, তাদের অভিনব কর্মপদ্ধতির নৃশংসতা আসলে ভারতীয় নেটিভদের কাছে শেখা। সাহেব-বালকদের যে-ঔপনিবেশিকতা শিক্ষা দেওয়া হত— তার প্রথম পাঠ ছিল তথাকথিত অ্যাডভেঞ্চারে।

অপরের কাছ থেকে গ্রহণ করায় আমরা, বাঙালিরা, বড়োই অপরিনামদর্শী। তাই বাংলা সাহিত্যে চালু হল ওই কাহিনিগুলির জাতিবর্ণ নির্বিশেষ অনুকরণ।

আজ এগুলি ফেলে দেওয়ার সময় এসেছে। শিশুসাহিত্য বা কিশোর সাহিত্য রচনার জন্য আর আমাদের বুড়ো-খোকা সাজার প্রয়োজন নেই। বড়োদের সাহিত্যে যে-আধুনিকতা, যে-সমসমায়িকতা প্রকাশ পেয়েছে তারই জ্যোতির্বিকাশ ঘটুক আজ যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাদের চোখের উপর। তাদের যেন আমরা খোলাখুলি বলতে পারি বাঘ দেখে ভয় পেয়ো না— তাকে সহজেই পুরোনো অস্ত্রে মারা যায়। কিন্তু সমাজের যারা অহরহ ক্ষতি করে চলেছে, যারা ভণ্ড, যারা শোষণবাদী, তাদের মারার জন্য নব নব হাতিয়ার তোমরা কল্পনাপ্রবণতার সাহায্যে তৈরি করে নাও।

ঋণ:
মহাযুদ্ধের ঘোড়া। প্রথম সংকলন, মে-জুন ১৯৭৮। সম্পা. দীপান্বিতা রায়।
(দাহপত্রের ফাইল থেকে)

Categories
কবিতা

গৌরাঙ্গ মণ্ডলের কবিতা

সমঝোতা

একঘাটে যতদিন স্নান করা যায়
তার চেয়ে দীর্ঘ না সময়

নিঙড়ে নেওয়ার জন্য হাত কি
জলের আজ্ঞা শোনে?

উদ্বাস্তু শ্যাওলায় আমাদের সূর্যোদয়
পিছলে যাওয়ার আগে শক্ত করে বাঁধো আলিঙ্গন

রাজা নই, চন্দ্র নই, কর্তৃকারকের দায়
এখনও পারি না

খুচরো মাংসের দিকে জিভডগা সাপের ফকিরি

ঘর বড়ো, ধড় বড়ো, হাঁড়ি, শূন্য, কাঁধ…
বয়স বেশির মেয়ে, পারাপার দেবে বলে
তুমিও তো নিয়ে চলো
কায়াভীতিতলে

বাংলা ভাষার থেকে সরে যাও
ব্যাকরণ বড়ো বেশি নিষ্ঠুর প্রেরণা

পদটির অনিচ্ছা জেনেও
ব্যাস বাক্য
ভেঙে ভেঙে রাখছ

এই বিচ্ছেদের দায় নাও। যত পারো দুঃখ করো। শোনো, কসাই হইয়ো না

আমার যা পছন্দের, তার
বাইরে তোমাকে খুঁজি
যা অপছন্দের, তার ভেতরেও…

বিস্তৃত সিঁথির মাঝে
বালকেচ্ছা তীব্র হয়ে ওঠে

সমস্ত রৌদ্রকে আজ স্তনের মাদুলি করে নাও
বৃক্ষহীন এ জীবনে বিদ্ধ হোক অপ্রস্তুত ছায়া

সময়

চিহ্ন দেখে নির্ধারণ
বিশ্বাস রাখিনি এই প্রাচীন প্রথায়

কাদা কি পায়ের কেউ!
সে কেন, সে কেন
নির্মাণে ভুলেছে বৃষ্টিকে

দৃশ্যেও গোপন থাকে, রঙের আড়ালও
ছুরির লাগে না কোনো সাজঘর, ব্যাধি

যা বলার, বলে নাও দ্রুত
তুমি তো চন্দন না যে, ক্ষয়ে গিয়ে ছড়াবে সুখ্যাতি

Categories
কবিতা

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

খিদে

হরিণ লাফাক, তুমি সাপের গর্ভের কথা বলো। আমাদের মাঠে বসে গুণিন ছিলিম টানে ভোরে। ফের কিছু লোক এসে কোকুনের ছাল রেখে যাবে। নদীতে যে মড়া এসে কাল রাতে ঠেকেছে শ্মশানে, তার কোনো নাভি নেই, শুধু কিছু কুচো মাছ খুঁটে খুঁটে শ্যাওলা খেয়ে যায়। গুণিন জমিয়ে বসে, সাপের রভস ব্যাখ্যা করে। কীভাবে নক্ষত্র থাকে শঙ্খ হলে কৃষ্ণা প্রতিপদে… কীভাবে সাপের শুক্র উচাটনে স্থির হয়ে যায়… ফের ঘুম, ফের কিছু উপোসের বাটি নড়ে ওঠে। হরিণ শিথিল হয়ে মুচড়ে গেছে ছোটার আগেই।

একা বুড়ো গুণিনের ঘরের উনুনে ছাই ছুঁড়ে
মড়ার কণ্ঠার হাড় মাছ ভেবে ছিঁড়েছে সারস।

চাষ

মধ্যযামে রমণ। প্রতিবার ক্লান্ত স্ত্রী আরও যেন কুহক, আগামী।
প্রবেশ সংযম ধরে বীভৎস ঝাঁকিয়ে দিল,
যেন নিচে বিছানা নেই, মাধ্যাকর্ষণ নেই।

গতি তো ধ্রুবক নয়; ধীরে ধীরে নিভে যায় আয়ু।

যত চেনা ঘামগন্ধ, সিঁদুরগন্ধ, গৃহগন্ধ—
হাড় তত আগন্তুক শামুক।

সারাদিন বীজ পেটে ভাত রাঁধছে দানে পাওয়া গাছ।

অন্দরে মানতের জ্যান্ত, গাঢ় সুতো

ন’মাস

সুজাতা হয়ে ভাসে।

Categories
কবিতা

নির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছায়ামানুষের খেলনাগাড়ি

১৬

আলো-না আলোয় বোনা পাতার পোশাক তারে মেলা

ফাঁকে ফাঁকে বাজনা থেমে আছে

নেভানো ঘরের জানলা উগরে দিচ্ছে দ্রাক্ষারস, ময়ূরের কেকা

পাড় ভাঙছে মাটির পেয়ালা

বারান্দা হারিয়ে যাচ্ছে দুপুরের নীরব মুঠোয়

জলরঙে আঁকা শূন্য থেকে

যা কখনও লাল নয় তবু তার লালের গভীরে
অস্থির প্যাডেল ঠেলে নেমে যাচ্ছে কাঙাল সেলাই

১৭

নিজেকে পিছন থেকে ধাওয়া করে ব্রহ্মবীজে ফিরেছে কুসুম

ভিতরে তারের বাজনা, বাজনার ভিতরে ডালপালা

ঘুঘু ডাকছে পাতার আড়ালে

দেউটির পিরান থেকে খসে পড়ছে গুলঞ্চ, টগর

কব্জি থেকে কাটা বালিঘড়ির জখমচিহ্ন শুষে
হাওয়া উঠছে ঘুরে ঘুরে ঘুরে

টলমলে গর্ভের ঘুম ভেঙে
গোলকের মুঠো খুলে ভেসে যাচ্ছে মাটির শাবক

Categories
কবিতা

প্রীতম বসাকের কবিতা

স্থিত হও। মধুর যে আলোক—চক্ষু মুদিয়া তাহার সংহিতা বুঝিয়া লও। প্রবীণ বাক্যের পার্শ্বে আমাদিগের সারল্য রাখিয়া দিয়াছি। ওলো কৃষাণীর দেহের কাঁচা লাবণি ভাসিয়া যায় স্রোতে! অধর ফাটিয়া জীবমণ্ডল প্রস্ফুটিত হইতে থাকে। একটি মানুষের দিনলিপির ভেতর ঢুকিয়া পড়ে ভিন্ন মানুষ। দুঃখের সনাতন কাঁপিয়া ওঠে। তুমি ধারণ করিও উহার সজল বায়ু। মেঘ নামাইয়ো আশার ছলনে। দুদণ্ড দাঁড়াইয়ো হে পথিন৷ নিকটে ঘুমাইয়া আছে আমাদিগের দীন সফলতা !

অতঃপর তাহারা পাখির উচ্চতায় আসিয়া বসিল। দেখিল কুঞ্জবনে ছড়াইয়া আছে কাহার নোলক। একটি অসম্পূর্ণ আত্মজীবনীর অংশ ভাবিল কেহ। কেহ কেহ নদীর নিকট রাখিল দুঃখের তরজমা। একটি সহজ রচিত হইতে হইতে সহসা বাঁক লইয়া মানুষের পাড়ায় আসিয়া পড়িল। দেখিল ফুলের প্রতি সন্দেহ! শুশ্রূষা কেন্দ্রের নিকটে পথ হারাইয়াছে একাধিক ছোটোগল্প। একটি শিশুর দাঁতে আমি দেখিলাম চাঁদের টুকরো লাগিয়া আছে। তাহাকে একটি সরলরেখা উপহার দিতে গিয়া আমার হাসি হাসিগুলোর অপমৃত্যু হইল।

Categories
অনুবাদ গদ্য

একটি আত্মজ্ঞানের খসড়া

তলস্তয়

ভাষান্তর: রূপক বর্ধন রায়

জানুয়ারি ০১

বিস্তর অকেজো আর মধ্যবিত্ত জিনিসের থেকে অল্প কিছু উত্তম এবং প্রয়োজনীয় জিনিস জানা ভালো।

একটা ছোটো, নির্বাচিত বইয়ের পাঠাগারে কত বিরাট সম্পদ লুকিয়ে রাখা যায়! হাজার বছর ধরে, পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতিবান দেশগুলির সর্বোচ্চ বুদ্ধিমান এবং সর্বাধিক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের একটা অনুষঙ্গ, তাদের পড়াশোনা এবং জ্ঞানের ফল আমাদের কাছে উপলব্ধ হতে পারে। অপর শতাব্দীর কিছু মানুষ, যে-ভাবনা হয়তো তারা তাদের প্রিয়তম বন্ধুদের কাছেও প্রকাশ না করে থাকতে পারে তা আমাদের জন্য এখানে স্পষ্ট শব্দে লিখে রাখা আছে। হ্যাঁ, আমাদের শ্রেষ্ঠ বইগুলোর জন্য, আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অর্জনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

— রালফ ওয়াল্ডো এমার্সন

বহুল পরিমাণে বই আমাদের মনকে কেবল আনন্দ দেওয়ার জন্য মজুত রয়েছে। তাই, শুধু সেই বইগুলোই পড়ো যেগুলো কোনো প্রকার সন্দেহাতীতভাবে উৎকৃষ্ট।

— লুশিয়াস আন্নাইয়াস সেনেকা

শ্রেষ্ঠতম বইগুলো আগে পড়ো, না হলে দেখবে তোমার হাতে আর সময় নেই।

— হেনরি ডেভিড থরু

প্রকৃত জৈবিক বিষ ও বৌদ্ধিক বিষের মধ্যে পার্থক্য হল, বেশিরভাগ জৈবিক গরল অত্যন্ত বিস্বাদ, কিন্তু বৌদ্ধিক বিষ, যা কি না সস্তা খবরের কাগজ বা নিকৃষ্ট বইয়ের আকার নেয়, দূর্ভাগ্যক্রমে কখনো কখনো আকর্ষণীয় হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি ১৫

প্রাকৃতিক সরলতা হয়, এবং আত্মজ্ঞানের সরলতা হয়। উভয়ই প্রেম এবং সম্ভ্রম দাবি করে।

যে-কোনো মহৎ সত্যই হল সরলতম।

মানুষ যখন অত্যন্ত বিস্তৃত এবং পরিশীলিতভাবে কথা বলে, তখন হয় সে মিথ্যে বলছে অথবা নিজের স্তুতি করতে চাইছে। এমন মানুষদের বিশাস কোরো না। ভালো অভিভাষণ সর্বদাই স্পষ্ট, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সর্বজনবিদিত।

সরলতা পরিশোধিত আবেগের একটি পরিণতি।

— জঁ ড’আলেমবার্ট

শব্দ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। তাই, স্পষ্টভাবে কথা বলতে চেষ্টা করো, এবং শুধু সত্যিটা বলো, কারণ, সত্য আর সারল্যের চেয়ে আর কোনো কিছুই মাবুষকে সংঘবদ্ধ করতে পারে না।

এপ্রিল ২৮

সুখের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তটি হল কাজ। প্রথমত, প্রিয় এবং স্বাধীন কাজ; দ্বিতীয়ত, কায়িক শ্রম যা তোমার খিদে বাড়ায় এবং পরবর্তীকালে তোমাকে শান্ত ও গভীর ঘুম প্রদান করে।

কায়িক কাজ বৌদ্ধিক ক্রিয়া বর্জিত নয়, বরং তার গুণবর্ধক এবং তাকে সাহায্যও করে।

অবিরাম আলস্যকে নরকের অত্যাচারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, কিন্তু পক্ষান্তরে, সেটিকে স্বর্গের আমোদগুলির একটি বলে বিবেচিত করা হয়।

— চার্লস দি মন্টেসকিউ

একজন মানুষ যখন কাজে প্রবৃত্ত হয়, সে যতই সর্বোচ্চ পর্যায়ে অযোগ্য, আদিম, সহজ কাজই হোক না কেন, তার আত্মা শান্ত হয়। কাজ আরম্ভ করার সাথে সাথেই, সমস্ত অপদেবতা তাকে ছেড়ে যায় এবং কাছাকাছি ঘেঁষতে পারে না। একজন মানুষ, মানুষ হয়ে ওঠে।

— থোমাস কার্লায়েল

কাজ প্রয়োজনীয়। যদি তুমি তোমার মানসের সুস্বাস্থ প্রত্যাশা করো, পরিশ্রান্ত হওয়া অবধি কাজ করো। তবে অত্যধিক বেশি নয়। তুমি ব্যয়িত হওয়া অবধি নয়। আত্মিক সুস্বাস্থ্য অত্যধিক কাজের পাশাপাশি আলস্যেও বিনষ্ট হতে পারে।

জুন ১১

আমাদের আত্মিক জীবনের পরিবর্তনগুলোর তুলনায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত বস্তুবাদি পরিবর্তনগুলো ক্ষুদ্র। অনুভূতি ও কাজে একটা পরিবর্তন হতে পারে, চিন্তা ও ধারণায় একটা বদল আসতে পারে। তোমার চিন্তা ও ধারণায় পরিবর্তন আনতে হলে, তোমার সচেতন মনকে তোমার আত্মিক প্রয়োজনীয়তাগুলোর উপর কেন্দ্রীভূত করতে হবে।

প্রত্যেকটি চিন্তা যার উপর মানুষটির আবাস, তা সে প্রকাশ করুক অথবা না করুক, তার জীবনকে হয় ক্ষতিগ্রস্ত করে অথবা উন্নত করে।

— লুসি মালোরি

পাপকে পরাস্ত করতে হলে, তোমাকে মানতে হবে যে, প্রতিটি পাপের মূল একটি বদ ভাবনা। আমরা সকলে শুধুমাত্র আমাদের ভাবনারই অনুসারী।

— বুদ্ধ

আমরা একটি টাকাভরতি থলি হারানোয় অনুতাপ করি, কিন্তু একটা খাঁটি ভাবনা যা আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে, যা আমরা শুনেছি অথবা পড়েছি, একটা চিন্তা যা আমাদের মনে রেখে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করা উচিত ছিল, যা পৃথিবীকে উন্নত করতে পারত— আমরা এই ভাবনাটিকে হারিয়ে ফেলি এবং তৎক্ষণাৎ সেটির ব্যাপারে ভুলে যাই, এবং তার ব্যাপারে অনুতাপ করি না, যদিও চিন্তাটি লক্ষগুণে মূল্যবান।

জুন ১৬

ব্যক্তির নৈতিক উন্নতির মধ্যে দিয়েই সমাজের উম্মতি অর্জন করা সম্ভব।

আমরা শৃঙ্খল, সংস্কৃতি ও সভ্যতার যুগে বসবাস করি, কিন্তু নৈতিকতার যুগে নয়। বর্তমান পরিস্থিতে, আমরা বলতে পারি যে, মানুষের সুখ বৃদ্ধি হয়, তবু তার সাথে মানুষের অসুখের পরিমাণও বাড়ছে। আমরা মানুষকে কীভাবে সুখি করব যখন তারা উচ্চতর নৈতিকতার জন্য শিক্ষিত হচ্ছে না? তারা জ্ঞানী হয় না।

— ইমানুয়েল কান্ট

জীবনের যা কিছু সাধারণ অশুভতা তার সাথে লড়াই করার একটাই উপায় হতে পারে, তা তোমার জীবনের নৈতিক, ধার্মিক, এবং আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার মধ্যেই বিদ্যমান।

আগস্ট ০৬

মেধা মানব জীবনের একমাত্র উপযুক্ত পথপ্রদর্শক।

চোখ হল দেহের আলো: সুতরাং তোমার চোখ যখন একক তোমার সমস্ত শরীর আলোয় পূর্ণ; কিন্তু তোমার চোখ যখন দুর্বৃত্য, শরীরটাও অন্ধকারে পরিপূর্ণ। কাজেই সাবধান হও, তোমার মধ্যে যে-আলো রয়েছে তা যেন অন্ধকারে পরিবর্তিত না হয়।

— লিউক ১১: ৩৪-৩৫

বৌদ্ধিক জীবন যাপনকারী মানুষটি এমন একজন মানুষের মতো যে নিজের পথ আলোকিত করার জন্য সামনে একটি লণ্ঠন বহন করে। এমন একজন মানুষ কখনো অন্ধকার জায়গায় পৌঁছাবে না, কারণ, তার মেধার আলো তার সামনে সামনে চলে। এমন জীবনে কোনো মৃত্যুভয় নেই, কারণ, যে-লণ্ঠনটি তোমার সামনে চলেছে সে শেষ মুহূর্ত অবধি তোমার পথ আলোকিত করে, এবং তুমি তাকে শেষ অবধি অনুসরণ করো যেমন সারাজীবন ধীর স্থিরভাবে করে এসেছ।

কিছু মানুষ নিজের ভাবনা অনুসারে বাঁচে এবং কাজ করে, আর কিছু মানুষ অন্যের চিন্তা অনুসরণ করে; এটাই মানুষের মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

সেপ্টেম্বর ১৭

বিস্তীর্ণ জমির স্বতন্ত্র মালিকানা অন্য মানুষের মালিকানার মতোই অন্যায্য।

ভূমি মালিকানা সংক্রান্ত বিদ্যমান নিয়মকানুনগুলো আইনসঙ্গত তা তুমি বলতে পারো না। এই আইনগুলির মধ্যেই রয়েছে হিংসা, অপরাধ এবং ক্ষমতার উৎস।

— হার্বার্ট স্পেন্সার

মানুষের মাঝের প্রাকৃতিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে নয়, বরং দস্যুতার মধ্যে দিয়েই ভূমির স্বতন্ত্র মালিকানা এসেছে।

— হেনরি জর্জ

অন্যান্য অবিচারের মতই, বড়ো জমির টুকরোগুলোর স্বতন্ত্র মালিকানার অবিচার, তাকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত অন্য আরও অবিচারের সাথে অপরিহার্যভাবে সংযুক্ত।

নভেম্বর ০৯

আত্মপ্রশংসা অহংকারের প্রারম্ভ। অহং-বোধ হল অপসারিত আত্ম-উপাসনা।

যারা নিজের স্বার্থপরতাকে, নিজেদের বাকি পৃথিবীর থেকে উচ্চাসনে স্থাপন করাকে ঘৃণা করে না, তারা অন্ধ, কারণ, এই ক্রিয়া সত্যের বিরোধিতা করে।

— ব্লেইজ পাসকাল

একটি বস্তু যত হালকা এবং যত কম ঘনত্বের, সে তত সীমিত জায়গা অধিকার করে। এর সাথে একজন অহংকারী মানুষের নিজের চরিত্রের তুলনা করা চলে।

— প্রাচ্যের পাণ্ডিত্য

এমন বহু মানুষ রয়েছে যাদের নিজেদের প্রথমত শিক্ষাগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নিজেদেরকে অপরের শিক্ষক বলে দাবি করে।

জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পথ হল পরিপূর্ণতার পথ, এবং কোনো মানুষ যদি নিজেকে নিয়ে গর্বিত ও সন্তুষ্ট থাকে তবে কী ধরনের পরিপূর্ণতা অধিষ্ঠান করতে পারে?

ডিসেম্বর ১১

ভূমি কর্ষণে লিপ্ত চাষির শ্রমের মতো আনন্দদায়ক আর কিছুই নয়।

তুমি বা তোমার সন্তান নিজে হাতে যে-খাদ্য উৎপাদন করো তাই পরম খাদ্য।

— মহম্মদ

যারা নিজেদের খাবারের যোগান নিজেরাই করে তারা ধার্মিক বলে দাবি করা মানুষের থেকে বেশি সম্মানের যোগ্য।

— তালমূদ

জমির কাজ ও নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করা সব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, তবে অন্য কোনো ধরনের কাজ মানবতার জন্য বেশি জরুরি নয়, এবং অন্য কোনো ধরনের কাজ বৃহত্তর মাত্রায় স্বাধীনতা এবং ভালোত্ব প্রদান করে না।

ডিসেম্বর ২৮

মানবজীবনের রীতি উদ্‌ঘাটনের কাজে ব্যবহৃত হলে বিজ্ঞান অত্যাবশ্যক রূপে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতে হলে, আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, কাজটি উপযোগী। সাধারণত বিজ্ঞানীরা দেখান যে, ওঁরা কিছু একটা করছেন এবং হয়তো কোনো সময়, কোনো একদিন, এটি ভবিষ্যতে মানুষের কাজে লাগবে।

মহাবিশ্ব সীমাহীন, এবং কারো পক্ষেই তাকে সম্পূর্ণরূপে বোঝা অসম্ভব। সুতরাং, আমাদের পক্ষে আমাদের দৈহিক জীবনকেও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

— ব্লেইজ পাসকাল

“বিজ্ঞান” তেমন কোনো ধারণা নয় যেভাবে মানুষ এই শব্দটিকে শনাক্ত করে ব্যবহার করে; এটি আমাদের বোধগম্যের জন্য সর্বোচ্চ, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু।

Categories
কবিতা

প্রবীর মজুমদারের কবিতা

আজীবন

তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে
যাইনি বহুদিন।
অথচ জানালা থেকে উঁকি মারলেই
ঝুরঝুর করে তোমার খেলাঘর
ভেঙে যেতে দেখি
ধুলোবালিতে এতদূর থেকেও
শ্বাসকষ্ট টের পাই।

যেন আজীবন দু’জনেই
জানালায় মুখ রেখে বসে আছি।

চিঠি লেখার দিন

চিঠি লেখার দিন ফিরে আসুক আবার। স্কুল থেকে সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ফাজিল ছেলেরা মেয়েদের দিকে ছুঁড়ে দিক লাল-নীল-হলুদ রঙের অজস্র সব চিরকুট। গভীর রাতে জলতেষ্টা পেলে গোপন স্রোতের মতো সুধারসে ভিজে যাক সমস্ত হৃদয়। আর কোন এক বিকেলে কেটে যাওয়া ঘুড়ির সাথে কচি কলাপাতার খাম হয়ে খসে পড়ি তোমার ছাদে। দুড়াদাড় করে ছুটে এসে আমাকে তুলে নিতেই ব্জ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত।

জলসাঘর

তোমাকে একটা দরকারি কথা বলতে গিয়ে বারবার অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই। কিছুতেই বলা হয় না। আজ হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়াতে বলছি শোন— যেদিন তোমার খুব মন খারাপ, মনে হবে আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। সেদিন চোখ বুজলেই দেখতে পাবে মনের ভিতরেও এক জলসাঘর। সে ঘর জুড়ে দীন হয়ে আছে কত রংবেরঙের লতাপাতা। আর এমন দুপুরে তার আড়ালে বেজে ওঠে দিলরুবা।