Categories
2021-NOVEMBER-POEM

দেবজ্যোতি দাশগুপ্ত

একাদশী

অন্ধ আকাশে উজ্জ্বল চন্দ্রবিন্দু ঝুলিয়ে,
জোৎস্না ‘চ’ থেকে ‘ছ’-এর দিকে
বৈঠা হাতে এগোয় অভিকর্ষের টানে।

‘দ’-এ দূরত্ব; ‘দ’-এ দৃষ্টি।

আমরা স্বাধীন জোৎস্না উপভোগ করে,
ওর ত‍্যাগ করা একাধিক শয‍্যা-কে কলঙ্ক বলে ডাকি।

অনুরণন

মাঝরাতে আলো নেভার পর,
প্রতিটি শরীর দেশ হয়ে ওঠে।
এক নিঃশ্বাসে আওড়ে নেয় পররাষ্ট্র নীতির সারমর্ম।
চৌষট্টি খোপের বিছানায় সেঁধিয়ে যায়
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য।
এখানে শুধু আমদানি হয়।
আর রপ্তানিতে বজ্রপাতের ভয়।
মখমলের সীমানায় ভাগ হয় আত্মপ্রকৃতি।
পাশবালিশের দুই ধারে দুইটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র আবদ্ধ
এক জীবনের হার না-মানার চুক্তিতে।

পাসওয়ার্ড

ইস্তক দেখছি, চোখের সামনে একটি জায়ান্টস্ক্রিন ঘোরাফেরা করছে।
শুধু আমার নয়, সবার।
তবুও কিছু দৃশ্যে
কেউ কেউ কী সুন্দর, সুনিপুণ ভাবে চোখ বন্ধ রাখে।
ভাবে, অন‍্যরাও বুঝি এর স্বাদ হতে বঞ্চিত।
সুযোগের সদ্‌ব্যবহার ঠিক তখনই ঘটে।
যাবতীয় গোপনীয়-নিষিদ্ধ যা-কিছু আছে কুড়িয়ে
মা, বাবা, ভাই, বোন, প্রেমিক, প্রেমিকা, বন্ধু, বান্ধবী
সকলকে বোরের মতো সামনে দাঁড় করিয়ে দিই পাহারায়।
আর এরাই এই ডিজিটাল যুগে ক্রমশ,
মানুষ থেকে পাসওয়ার্ড-এর এক-একটি বিন্দু হয়ে ওঠে।

পদোন্নতি

একে-অপরের উন্নতির পাশ দিয়ে যাতায়াত করি

অজানা সময়, অজ্ঞাত পরিচয়

ঘরে সবকিছুর মান শূন্য

ধনাত্মকে গিয়ে ঋণাত্মকে ফেরা

উন্নতির দূরত্ব স্থির

আফসোস

সেটি কমে গেলে পথ বলে আর কিছুই থাকবে না।

ইনসমনিয়া

ঘুম না-আসার দায় রাতের উপর চাপিয়ে দিই

আণুবীক্ষণিক স্মৃতিচারণ

দেখতে দেখতে পৃথিবীর সমস্ত ভরকেন্দ্রের মালিকানা পেয়ে চোখ বুজতে ভয় হয়

ঘুমোলে নিজেকে দেখতে পাই না বলে জেগে থাকি পাহারায়

আর ঘুমন্ত মুখ দেখে ভাবি

সে তার পরিচয়কে এত সহজে সরিয়ে রাখে কীভাবে?

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

নিমাই জানা

শিথিল বরফের চাঁদ

রাতের নক্ষত্রেরা মেঘলা পথে হাঁটলেই সকলে অন্ধ মুনির আলখাল্লায় আমলকি বন দেখতে পায়
যৌগিক পুরুষ হয়েও আমি কোনো পার্বত্য নারীর কথা বলিনি, যারা ডুয়ার্সের অতলান্ত গভীর খাত থেকে তুলে আনে চা পাতার ভেজা শহর
আমি তাদের নরম বিভাজিকার গ্রাম্য রাস্তা থেকে তুলে আনি নদীপথের পিচ্ছিল গিরিখাত
দু-দণ্ড প্রশান্ত সাগরের চুমুকে গজিয়ে ওঠা শিরা রক্তের সংবহন খুঁজে বেড়াই শিথিল বরফে

দ্রাক্ষাফল ও সেলেনিয়াম ওষুধ

কে ঐ আত্মহত্যার সেলেনিয়াম ওষুধ খায় ক্রমশ ভাঙা খুদকণা, ভাতের পঞ্চব্যঞ্জন দিয়ে
দীর্ঘতর হয় এই লোমকূপের ছায়া
আমি এক প্রকাণ্ড বাবার ছায়ার নীচে বসে জমাট পাথরকুচি পাতায় আমার যৌনঘর ভেঙে সিমেন এনালাইসিস করছি
সপ্তর্ষিমণ্ডল থেকে মৃত নক্ষত্রদের হাতে করে নিয়ে আসি এই দ্রাক্ষাফুলের ভেতর
তাদেরকে জবজবে সাদা আতপ চালের হায়ারোগ্লিফিক শিখিয়ে চলি মধ্য প্রহরের পর কোনো শান্ত নারী ধ্রুপদী সংগীতে ডুবে যায় পশ্চিম দিকে মুখ রেখে

ধাতব ও পুরুষ অথবা কর্কট ছায়া

কালো মানুষের গর্ভ আর জরায়ু উলটো হচ্ছে কালো পাথরের মতো
আমি এক পরিচ্ছন্ন ছেঁড়া গামছা থেকে ভাঁজ করা লিবিডো অসুখ বের করি
রাতের পরিরা ঘুমোতে গেলে আমি ক্রমশ ধাতব ও বিষধর কর্কট পোকা বিছানায় উপুড় করে রাখি
নরম শেকড় থেকে সব পার্বত্য কথার বিয়োগচিহ্ন ভেঙে পাললিক পাথর সাজাই ভূগোল মায়ের দেহে
আমার কৌতূহল ভেঙে দিচ্ছেন মহাজন, দুটো আঙুলের ফাঁকে এত রাজকীয় তরল পোশাক গায়ে শাড়িটি ক্রমশ অনুর্বর হয় সুদর্শন পুরুষটির জন্য

মানচিত্র অথবা বৃত্তের কথা

ঈশ্বরী উলঙ্গ হয় আমার বৃত্তের পরিধির উপর
আমিও কালো রঙের মানচিত্র এঁকে দিই আমার ঠোঁটের উপর
জনৈক মৃৎশিল্পী পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের কবিতা রাখে আমার ছেঁড়া হাফহাতা পলিয়েস্টার জামার ভেতর, ঘামের গন্ধে দ্বিতীয় ছায়াটি নড়ে ওঠে জলের মতো
আমি সনাতন ঋষির জন্য দুটো সর্পগন্ধা, একটি নীল অপরাজিতা ও সহস্র বন্ধ্যা জলাভূমি রেখে এসেছি দেহ ত্বকের নীচে নরম শালুক ঢেকে
গর্ভাধান পুষ্ট হচ্ছে ক্রমশ

রাইবোজোম অথবা দুইজন মেডিকেটেড নার্স

আমি স্নায়ুর অস্ত্রোপচারের পর দু-টি পুরুষ নার্স তিনটি এক কোয়া রসুনের গল্প বলতেই অস্ত্রোপচার রুমের বাইরে আমার তিন শতক আগের উদ্ভিদ প্রেমিকার দেখা পেলাম
মেডিকেটেড নারীর সাথে দেবালয় ঘুরে এলাম আমার গায়ে নীল চাদর আর দুটো পুরুষ ফুলের গন্ধ অথচ আমি বেড়ে উঠছি না রাইবোজোম পুরুষের গায়ে, শীতল নদীর কখনো সংগমের পর্যায়ক্রম হয় না
এখনও শিথিল হয়ে আছি সংগমের পর, কোনো রাত্রিকালীন মহাযুদ্ধ অথবা প্রলয়ের পর কোলাহল মুখর নাইট্রোজেন স্নান করে ফিরলাম বৃষ্টির পর
সকলেই তরল বিষধর দাঁতে চম্পক নারীদের সাথে প্যাগোডা ভ্রমণ করছেন

কাঞ্চনজঙ্ঘা ও সূর্যোদয়ের দ্বিঘাত

ফাঁকা ঘরে একাকী কেউ ফাঁসির কাঠ আর কীটনাশকের সরল সমাধান করছে দ্বিঘাত দিয়ে
বিছানার গোখরো ফেলে যাচ্ছে উচ্ছিষ্ট খোলস কাঞ্চনজঙ্ঘা আজ বড়ো চকচকে আজ সূর্যোদয়ের আগে
আমি রাতের গ্রাম্য নারীদের মতো ভেজা কাপড় হয়ে ঝুলে আছি তরল অসদ বিম্ব আমার কোনো পার্শ্বীয় পরিবর্তন নেই
দেহটি নিরাকার, চোখটি বাইফোকাল, নাভিটি থার্ড ডিগ্রির

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

কৌশিক দাস

দেশ-সংকলন

বিকল্প

ভিড় করবেন না

আপনারা সবাই সরে দাঁড়ান
বড়োবাবু আসছেন

বড়োবাবু আসছেন
চেয়ারটা পরিষ্কার রাখুন

কী কাণ্ড হাতল কই!
এক কাজ করুন, আপনাদের হাতগুলোই দিন

নিউটন

গুলির কোনো ধর্ম নেই,
সে চোখ বুজে মালিকের ট্রিগার শোনে

মালিকের কোনো ধর্ম নেই,
সে শোনে উপরওয়ালার কথা

উপরওয়ালারও কোনো ধর্ম নেই
সে শুধু বোঝে চারপায়ার সিংহাসন

সিংহাসনের অবশ্য একটি ধর্ম আছে,
সে কেবল প্রতিটি বস্তুকে নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে।

নল

কেমন গোলমেলে যাচ্ছে
দিনগুলো

বন্দুকের নলটা ভেঙে এনে সেখানে
চোখ রেখেছে ছেলেটা

আর তাকে খেলার ছলে ট্রিগার শেখাচ্ছে
পলিটিক্যাল বস্ত্র বিতরণ।

দেশ

হাসপাতালে শুয়ে আছ

অনেকেই শুয়ে থাকে যেভাবে

একটা রাগ চটা বেড— আড়াইজন মানুষ

কষ্ট কিছুটা ঝুঁকে আছে নীচে

নার্স আসবে— নিজেকে শক্ত করো

সামান্যই তো ইনজেকশন— এত ভয়!

কিছুক্ষণ আগেই যে গুলি খেলে!

আমি আর কুকুর

আমি একটা কুকুরকে নিয়ে কবিতা
লিখতেই পারি যেমনটা লেখে এখনকার
কবিরা কুকুরের একটা লেজ নিয়ে

কিন্তু আমি লিখছি না তার কারণ ওই
কুকুরটাই

চার রাস্তার মোড়ে রোদের মধ্যে শুয়ে
আছে। গায়ের অনেকটা জুড়ে পচন ছড়িয়েছে
— এই কথাগুলো নিয়েই কবিতা লেখা যায়

কিন্তু আমি লিখছি না কারণ আমার যেন
মনে হচ্ছে জলীয় আর করুণ চোখ নিয়ে
আমিই চার রাস্তার মোড়ে পচতে থাকা শরীরটা
নিয়ে কুকুরের দিকে তাকিয়ে আছি।

দেশ ২

কবরের সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকবার পর
যেটা সবার আগে চলে আসে সেটা হল উঠে পড়া

সামনের রাস্তাটা ঠিকানার দিকে গেছে;
তুমি তো রাস্তা ছুঁয়ে বাড়ি ফিরে যাবে

ফিরে গিয়ে বেলচাটুকু জেনো: তার গায়ে
নিরহং মাটি লেগে আছে!

 

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

অনির্বাণ মজুমদার

ডিসেম্বরের স্মৃতি


তাই শিরোধার্য তোমার মমত্ববোধ
নরম আস্তানা ছেড়ে বহুকাল অনিদ্রায়, বিষাদবন্দরে—

বিরোধিতা আমার কম্ম নয়,
লিখে রাখি অলক্ষ্যে, সবটুকু, অভিমান বাদে
মাঝপথে প্রস্থান ভালো কিনা, সে-বিষয়ে ভাবি
ভাবনার প্রয়োজন ফুরিয়েছে জনসৈকতে।

ফুটপাথ-শ্বাস পাতার শিকলে মেশে
ঝড় নেই, ঝড়ের সময় ঠিক হয়নি এখনও

সূর্যোদয়ের ভয়ে
পাউরুটির ফাঁকে লুকোয় মাখন
স্নেহ কি ভেজেনি গর্ভজাত আলোর প্রপাতে?
অপচয় হল তবে শত্রুতার, ঠিক-ভুল জ্ঞানে

সহসা গ্রহণ লাগে
চাকা বদলাতে নামি জনশূন্য বিষাদবন্দরে।


কাঁঠালবাগানে আয়ুকারকের স্থূল মাছিগুলো
সরল বিপথগামী খরগোশ কোণে জড়সড়,
চা-কাপে ভাসে প্রজাপতির আদুরে ডানা
দেশলাই জ্বলে ওঠে, হাওয়া এল নীরব উঠোনে—

সাইকেলে ফিরে আসে আহত ভাবুকদের শিখা
অনেক বছর ধরে একাকী পাগল থাকে ঘরে…
প্রাচীন সংকেত চিনেছিল পশুরাও, অগোচরে
বাকি সব হারিয়েছে ঘড়ির অসম ব্যবহারে।

এখানে কিচ্ছু নেই, ফলের অলস শাঁস
জানে তার পরিণতি, তবু
নিজেকে মেলেছে ধরে ইভের সরল অভিনয়ে

আয়ুপথ ধরে ওরা আগুনের দিকে ভেসে চলে।


অবিরাম কথকতা, সহৃদয় নিমের জঙ্গল
অতিপরিচিত বাতাসের দোলা— তুলনারহিত
কুঠার ও শাবলের পেশাদার কথোপকথন;
নৈঋত— নীচে, কয়েক প্রজন্মের অব্যবহৃত জাঁতি,
নাড়ির অমোঘ টান— নিয়তিও হেরে সংযত
রাতপাহারায় পরশ্রীকাতর চাঁদের
অসংখ্য প্রহরী,
তাদের অন্তর্ঘাত সমাচারে
মুচলেকা দিয়েছে বাঁদর— নিছক কৌতূহলে…

সাজানো বাসর শেষে অগত্যা হেসেছে নাগর!

পাতা খসে অপমান-খলপ্রত্যাশে,
যেভাবে ক্ষমতা বুঝে নীরবে আঘাত করে ওরা
একমনে রুপোর জাঁতি: ঝাঁপ দেয় কাছে পেলে
কোমল সুপুরি।

খয়েরি ঘোড়ার দঙ্গল চলে প্রমোদবিহারে।


মৌনব্রত অবসর নিয়েছিল পাহাড়ের কাঁধে
অন্ধকার সমতলে নিশ্চিন্ত হৃদয়ের বাস—
স্মৃতির নেশায় শেরপার দৃঢ় আরোহণ,
আকাশের কাছাকাছি, দুঃখ যত মিথ্যে হয়ে যায়…

অভিমানে হারায় গাছের ফাঁকে আহত শিকার
বুনোফুল, রোমকূপে সম্মোহনের নির্যাস,

নেকড়ের অভিজাত সাহচর্যের ছোঁয়ায়
বোবা মেয়ে নেচে ওঠে, ঐশ্বরিক ইঙ্গিতে।
পায়নি, পায়নি টের— শব্দের প্রত্যাখ্যানে
অনাহূত ছায়ার আগমন!

শেখেনি ক্ষমার পরিষেবা, এই কথা স্বজনবিদিত
সতর্ক শ্বাস আর রক্তের শর্ত বিমূঢ়
নেকড়ে অদৃশ্য হয় নরকের নিঃশব্দ নীলে।


আর্সেনিকের দিন শেষ হয়ে এল কি তবে?
অভ্যেস অহেতুক কাগজ কুড়োনো কবেকার
রাত্রের কুকুরেরা সূত্রের সন্ধানে ব্রতী
ভিজে খঞ্জনি, শীতের বিহ্বল কীর্তন,
মোজাইকে মিলিয়েছে ইঁদুরের ছোট্ট তীক্ষ্ণ লাফ…

বন্দির চোখে সূর্যের নিষ্ঠুর আলো
দৃষ্টি ফেরালো?

পোকাদের উৎসবে কখনো নিমন্ত্রণ পেলে
সম্মতি জানিয়ে উপহার তল্লাশে মাছি!

ঘরের বাইরে যেন না যায় ভালোবাসাবাসি…

অযথা ভয়ের জামা পরে কেন এই মানুষেরা?
আতঙ্ক চিরকাল বহুদুর্ঘটনাবিলাসী।

অগ্রাহ্য করে তাই বহুরূপী ভক্তির টানে
মুক্তির অগ্রাধিকার চায় নিজের আসনে,
হায়নার লালারসে ধুয়ে গেছে সূক্ষ্ম প্রমাণ—

সময় ধাক্কা মারে আর্সেনিকের বোকা হাওয়ায়…


হুজুর
আবার বলছি এ-রণক্লান্ত দেহে
নির্বাসন মকুব হল না?

আগুনের থেকে আরও পাওয়া বাকি ছিল,
মাংসের থেকে আরও চাওয়া বাকি ছিল
গত ক্রিসমাসে আমি গুনেছি মাশুল—
সবিনয়ে,

চিরকাল কেউ ভালো না…

 

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

তন্ময় ভট্টাচার্য

পুত্রশোকাতুরা

পুত্রশোকাতুরা নারী, তাঁর ব্যথা কতটুকু জানি!
শুধু কি মৃত্যুর শোক? সন্তানের অযোগ্যতা নয়?
গৃহসূত্রে বেঁচে থাক বাংলার পিতৃপরিচয়
দিনান্তে, ভাতের পাতে, কীভাবে সংসার চলে, তাতে—

আত্মশোকাকুল যুবা কোনোদিন বুঝিবে নিশ্চয়!

নসিব

তোমাকে, স্মৃতির দেশে…
স্মৃতিরও রায়ট, খানদানি

দিবারাত্র ঝিকঝিক, কু এবং সীমানা-স্টেশন

কোথায় যে চলে যাও
ফেরত আনতে গিয়ে দেখি পর্দা, নসিব হয়েছ

একটি বেয়াড়া স্মৃতি
খুদগর্জ
থমথমে
একা

শাদা পৃষ্ঠা

‘এতদিন হয়ে গেল, ওসব কি মনে রাখলে চলে!’
এই বলে, বই ছেড়ে চলে গেল প্রেমের কবিতা

শিরোনাম একা-একা কিছুদিন চেষ্টা করেছিল
তারপর, অন্য কোনো বই দেখে, প্রতিপত্তি দেখে
যেই-না এগোতে যাবে— টান পড়ে সেলাইয়ে, পাতায়

কবিতা, শরীরইচ্ছা, বিজ্ঞাপনে ভুল থেকে যায়

নিঃসঙ্গতা

জীবন, আশ্চর্য কিছু হতে পারত। সেই সূত্রে
সাজিয়ে নিতাম দীক্ষা, ঝোড়ো রাত, অনিদ্রাকুসুম

জীবন, সচরাচর হয়ে রইল। ঘর থেকে
আরেকটি ঘর— ফের আরেকটি— সাড়াশব্দহীন—

পায়ে পা লাগিয়ে ভাবছি
আমাদের ঝগড়া হল খুব

ভূগোল অথবা মানববিদ্যা

এইসব ভয়ংকর কথা, তারও ভিতরকার কথা থেকে একটা ছোট্ট খাঁড়ি বেরিয়ে এসেছে। এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে ঘন জনবসতির মধ্যে দিয়ে। অথবা খাঁড়িই পুরোনো; স্বভাব পালটাবে না জেনে দু-পাশ থেকে চেপে ধরেছে মানুষ। দু-হাজারের বন্যায় একবার চমকে দিয়েছিল। আটাত্তরেও। তার আগের কথা কারোরই মনে নেই বিশেষ। পলি পড়তে পড়তে ক্রমশ বুজে এসেছে গলা। খাঁড়িটি, নদীর কাছে ফিরে রোজ চুপ করে বসে। ভয়ংকর কথাগুলো যাহোক মসৃণ করে বলে। নদী বোঝে, শেষ হল। তারও গলা ধরে আসতে থাকে।

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়

জলরঙের ছবি


জলের কাছে এসে খুলে রাখছ সাবালক বয়স। উঠানে খোঁপা খোলা রোদ। পুরানো ক্যালেন্ডারের পাতায় ঘুড়ি আঁকতে গিয়ে দেখলে— দূরে সাইকেল ঠেলে হেঁটে যাচ্ছে কেউ। হঠাৎই মনে পড়ল— বাতিল টায়ারের সাথে তোমারও কিছু কথা ছিল। অথচ কিছুতেই মনে করতে পারছ না— শেষ কবে দেখেছিলে, এঁটোলাগা অ্যালুমিনিয়ামের বাসন কীভাবে একা পড়ে আছে।

এখন তুমি নদী আঁকবে। পাথরের চাতালে পুয়ালদড়ির মতো পড়ে থাকবে একটা ঢ্যামনা সাপ। দূরে দূরে কিছু গাছপালার দৃশ্য। মাছের কাঁটার মতো বাতিল অ্যান্টেনা জড়িয়ে শুয়ে থাকবে অনেক পুরানো একটা হলুদ বাড়ি।

তুমি জল ঢেলেই যাচ্ছ। কিছুতেই রং উঠছে না।


সম্পর্ক থেকে উড়ে যাচ্ছে পরপুরুষ বক। পুকুরের চরিত্র নিয়ে কথা উঠতেই অনেক দূর জল গড়ালো। মেঘের পাশে মেঘ এল। নিরাপত্তা নিয়ে কেউই তেমন ভাবিনি। হাতে হলুদ সুতো বেঁধে বিশ্বাস করেছিলাম— উচ্ছেদের পর আমাদের আশ্রয় হবে শামুকবাড়ি।

এই ছবিতে কোনো রং নেই। তবু জলের বিরহ নিয়ে আমরা অনেকদূর যাব।


পুরানো তানপুরা থেকে সন্ধ্যা উঠে এল। গতজন্মের ভুলভ্রান্তির পাশ দিয়ে খালি-পায়ে হেঁটে ফিরছে কয়েকটা ছায়া। শ্যাওলাপড়া কুয়োর চাতালে দীর্ঘদিন পায়ের ছাপ নেই। শুকনো লঙ্কার মতো গুঁড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকার। জেগে উঠছে সামবেদ। কয়েকটা হোঁচট খাওয়া সরগম।

নিভে যাওয়া হ্যারিকেনের রং দিয়ে বিষাদ আঁকছ তুমি। ক্লান্তি থেকে ক্যানভাসের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে অন্ধকার।

ছবিকে ছিঁড়ে খাচ্ছে ছবি।

সান্ধ্য

মালা চন্দনের দিকে ঝুঁকে আছে সন্ধ্যার রেওয়াজ। এ-সংগীতে পিতার জন্মটুকু অবৈধ। পুরানো কাঁসার বাসন থেকে বাল্যপ্রেমের দাগ তুলতে তুলতে, গোপালের সান্ধ্যভোগ নুনে পুড়িয়ে ফেলেছে মা। আয়োজনহীন অন্ধকার। হাতবদল হয়ে আসা কুয়োর পাশে বৈচিত্র্যহীন বালিকার মুখ। সংগম ফেলে উড়ে গেছে খয়েরি চড়ুই। এসব কথা লেখা নেই কোথাও। তবু পাথরের ঘণ্টা বাজছে দূরে।

তৃষ্ণা নেই। অথচ নামগানের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছে উদাসীন। পোড়া সলতের গন্ধ গায়ে মেখে, রক্তশূন্য বাতাসার পাশে শুয়ে আছে ঐহিক পাপ।

বৈকালিক

বাদাম খেতের পাহারায় অসতর্ক ঘুমিয়ে পড়েছে অনার্যবালিকা। লাল শালুকের ডাঁটার মতো দু-পায়ের নীচে সরু হয়ে আসছে রোদের শেকল। উলটো পালটা হাওয়া দিচ্ছে। ধুলো উড়ছে। এ-জন্মের পাতা উড়ে যাচ্ছে ও-জন্মের দিকে। ঘুমের ভেতর যেন তার কষ্ট হচ্ছে খুব। যেন পিতলের নাভিতে বেজে উঠছে রাক্ষসবাদ্য।

কেউ কাউকে দেখছে না। সংকটকালীন একটা খরগোশ পালিয়ে যাচ্ছে প্রথম ঋতুর দিকে।

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

যখন সে জোনাকির দীর্ঘশ্বাস


এত যে ধ্রুবচোখ— নাম কী শান্তি না অপার

চিতানদীর মোহনায় দাহ জ্বলে অশেষ
বার বার কায়া মিশে যায় অর্বাচীন

পিছিয়ে সেই শূন্যতা শুকনো মাঠের কোলে সাদা বক
সম্পর্কে সমস্ত ওমধ্বনি আচ্ছন্ন আলোকরেখায়
অথবা আরও চায় মধ্যরাত—
কাছে বসে প্রতিপল চাঁদের ওজন
অন্তরাল আর নীরবতা ছুঁয়ে যায় কেবল

কাছে থাকি স্মৃতিতন্তুকাল


নদীর রাত ফিরে আসলেই জেগে ওঠে মহাকাশ
পরজন্মের কাছে হেঁটে যায় নীলিম আর পরম

এ-দুয়ের ভিতর শূন্য এক চৌম্বক আবেশ
মেঘমালা নামে এবং নির্বাসিত পাখি উড়ে যায়

আলোর কোলাহল শেষে কয়েকটা ধাপ সিঁড়ি
যতই উঠছি নেমে যাচ্ছি আরও গভীরে
টনটন করা পেশিতে শুয়ে থাকার আর্তি

অসুস্থের ছায়া তবু জেগে থাকে সুস্থতার উপর


বকুলপারের বাঁক দেখলেই সুগন্ধ হয়ে যাই
সমস্ত রং জড়িয়ে ধরে ঝিরঝির শিশির মায়া
বিষুবরেখায় দৌড়ে যায় রৈখিক সময়

আরও কিছু পথ, বাগেশ্রী রাগ বাজে
আঁকা বাঁকা ডালপালার ভিতরে উন্মুক্ত অশ্রু
ভারশূন্য দিঘির পাড়ে দাহিত নেপচুন

পরম কিছু যাতায়াত সহজপাঠ থেকে সূর্যাস্ত
সে-পথের একটু দূরেই সুস্মিত শ্মশান
তার নির্জন আলোয় অকপট খেয়াঘাট

আর শীতার্ত প্রদীপ


তার হয়ে পড়ি যখন সে জোনাকির দীর্ঘশ্বাস
বার বার সাধকের স্তোত্র ও শরীর
বিষুবরেখায় শূন্যজ সময় অকপট ছায়াটুকু

কোন এক শিয়রে সাদা দাগ ইতিউতি বাষ্প
সারাবেলাটি উড়ে গেল দিপদিপ নীল বর্ণ
প্রার্থনা থেকে প্রতিফলিত হল অনতিদূর

অবশ্য উত্তর নেই নেই কিছু প্রশ্নও—
আবছা স্নায়ুর আঁচড় কেটেছি সে-সব দাগে
মন্দ নয় ভেবে নদী পার করিয়ে দিই কিছু হসন্ত
ক্লান্ত আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছে

জন্ম চাই চেতনা, ভীষণ সাঁতার


পাতা ঝরার আঘাত নিয়ে ভেসে আসে অনঙ্গ সংগীত
প্রতিবর্ত হৃৎস্পন্দনে কত সম্পর্ক
কোথায় হারায় অপেক্ষা—
পাখিরাও জানে কোমল বাতাস
তির্যক রোদ্দুরে এলোমেলো ছায়াপথ

চলে যান তিনিও
ভূমির সমান্তরাল আর নিসর্গ নিশ্বাস
যাত্রাপথে বেজে ওঠে নীল সেমিকোলন

চিৎশোয়া মহাকাশ নিয়ে
টেরাকোটা পেন্সিলে আঁকিনি কিছুই
খয়েরি ইচ্ছায় বসে থাকি প্রার্থনা আশ্রয়

 

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

অনিকেশ দাশগুপ্ত

পরিহার

একটি বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতার জন্য শত অব্দের এই ধীর মৃত্যু
মেষপালিকার নীল চক্ষু থেকে পাহাড়ি ঝোরার দিকে
চাপা গোঙানির মতো অনুশীলনের ত্রিকোণ বর্ণমালা বয়ে গেছে
এই-ই সেই রাত্রিকালীন প্যারেডের অগভীর কণ্ঠস্বর,
ঝিলাম খেত—
বজ্রভরতি উপত্যকার একটি সেলোফেন ফুলের প্রদোষে আমাদের
চিহ্নিত মুখ অবনমিত হতে হতে রেখাঙ্কিত চৌরাস্তার ড্রিলগুলি
এখনও ছিনিয়ে নেয় বহু কাঙ্ক্ষিত অস্ত্র, উচ্ছ্বল পাত্রের ভেতর তারই ছায়া
একক সত্তার দাগে দ্যাখো অবরুদ্ধ যত আকাশ-নীল এরোড্রোমে
দীর্ঘ রোবোটিক প্রস্রাবের স্ব-হুঙ্কার, সিজদার অমলিন কড়িকাঠজুড়ে
সন্দিগ্ধ আগুনের ভাষান্তর কেবলই উন্মত্ত
ক্রেতা-বিক্রেতার বিগত স্বর্ণালী, ধুলো-কোটের ভেতর উবু হয়ে বসে
সূর্যের নশ্বর স্বাদ খাদানে গড়ে তোলে মনোহর উপনিবেশ

পসরা

দুঃসহ এই অ্যাম্ফিথিয়েটারে সুদূর বাতাসের
বুদ্বুদ একদিন হাজির হয়েছিল
আমাদের প্রস্তাবসমূহ নিয়ে—
স্বপাতুর আগুনে দ্যাখো, আমি পুড়ে যাচ্ছি না
ছিঁড়ে যাচ্ছে না আমার তন্তুময় উপাদান

ধ্বংস শৃঙ্খলের ওই যে বাঁশিটি
অণু মুক্ত, যেভাবে বাঁক নেয় প্রগাঢ় অন্ধকারের দিকে
ধীর গতিময়তা, ধরাচক্র, এক নিমেষের যত আলোয়
জোনাকি সদৃশ তুমিও কি দেখোনি মৃত গর্ভের আনোখা ঊর্ণা
এক পাক্ষিক অমরতা এমনও তো আছে খানিক
স্নেহ গ্রন্থিজুড়ে যত ব্যবচ্ছেদকাম

আপামর ভগ্নাবশেষের ভেতর জনাকীর্ণ ছায়াগুলির মতো
অচঞ্চল, নিবিড় ছড়ে ওঠে মেলোডি,
কাঠুরের লন্ঠন চিড়ে ফেলে অরণ্য অনুষঙ্গ
এখানে উচ্চারণের মতন নিঃসঙ্গ
পড়ে থাকে চন্দ্রারোপিত চাতাল
পাশবালিশের ছিদ্র বেয়ে মিথুন অশ্বেরা গ্রহান্তরের সেই
অকল্পে, নিয়ত ব্যঞ্জনায় নিজেদের বিনিময় করে

কৃষিভঙ্গিমা

আধ শতাব্দীর পুরোনো নোঙর থেকে মৃত বুদ্বুদ ওঠে
সমবায় ছায়ার পাশ দিয়ে তির্যক বেরিয়ে পড়েছি আমি
যৌনপরবশ দোয়াবে চমৎকার গাঁথা হয়েছে বর্শাবিদ্ধ সেই আঙ্গিক
সমুদ্রের নোনা চুম্বনে ধূসর মমির মতন
উষ্ণতম ঊর্ণার দিকে উড়ে গিয়েছিল যে-পাথরখণ্ড
সময়ের ত্রিকোণ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে সে বিভ্রান্ত ফার্নেসে
নীল অবগাহনে চিত্রল হয়ে ওঠে নগরশেষের জ্ঞানলোক
অপ্রাকৃত গোধূলি পারে আর্চের মতো তার অধিষ্ঠান

দর্শক

কাঠগড়ার নীলিমা এভাবেই গল্পে-গল্পে ফুরিয়ে আসে
ক্ষমার্হ অন্ধকারের দিকে
একভাবে চেয়ে আছি যারা
গিলোটিন-অনুরক্ত প্রতিটি ভোরে সময়ের নিঃসঙ্গতা টের পাই

আত্ম-বিহ্বল দর্শকের গা থেকে ঝরে পড়া নির্ভার পালকটিকে
স্থাপন করেছি মন্ত্রমুগ্ধের মতো অন্য কোনো ইতিহাসে
স্তম্ভিত জানলার মুখে ঘুরে যাচ্ছে মুগ্ধ বাতি

সামুদ্রিক পঙ্‌ক্তি আর সোঁদা গন্ধের পৃষ্ঠার ফিকে আলো নিয়ে
ঠিক এভাবেই অপ্রিয় দূরত্বের অযুত কৃষ্ণরথ
পেরিয়ে যাব অমোঘ ভোরে

যন্ত্রণা

অন্ধকারে দাউদাউ জ্বলে ওঠা বাড়িটির জন্য
একটি বিস্মিত চাহনির গৈরিক টুকরোগুলো জড়ো করছি আশৈশব
মৃত ঘাসফুলের ওপর দিয়ে হেলেদুলে চলে গেছে সরীসৃপ
সর্বৈব অযৌন লাল ফুলের কৌটায় আকাঙ্ক্ষিত প্রসবের জন্য

ধোঁয়ার মতো চারপাশের দৃশ্যে একটি বালখিল্যতার মরু
সাদা ফ্রকের দহন, আর বিকেলের টিলার কদর্য আঙুলেরা
কীভাবে অপ্রস্তাবে ফিরে আসে আগুনে, একইরকম দগ্ধ

মৃদু স্বরের কুয়োপারে কেউ
এমন বিচ্ছিন্ন দৃশ্যগুলিকে বুঝে নিতে চাইছে
চাবিঘরের ত্রস্ত প্রসন্নতা অন্তত একটিবার
ঝলমল করে উঠছিল তখন, অনুনয়ের সুরে

Categories
2021-NOVEMBER-POEM

অমিতরূপ চক্রবর্তী

আরশি

আমার অন্ধকার থেকে কয়েকটা কুকুর চিৎকার করে ওঠে তোমার উদ্দেশে। শেষ সন্ধ্যার রং এখন ফেটে, থেতলে যাওয়া জামের মতোই। কান্নার মতো টিপটিপে বৃষ্টি ধরে গিয়ে এখন শুধু উষ্ণ, উষ্ণতর নিঃশ্বাস জেগে আছে সবদিকে। মানুষের মুখ মানুষেরই মতো, ইতিউতি আলোয় দেখা যায়। আরও দেখা যায় মমতা চুইয়ে পড়া স্তন, সস্তা বাক্যের শেষে বসে থাকা আরক্তিম ঠোঁট। ইতিউতি আলোয় দেখা যায় জাহাজে চড়ে রাত্রি পাড়ি দেবার আগে এমন সব মানুষের ভিড়, দু-হাতে ডিম আঁকড়ে আছে। আজ হয়তো আমাদের পায়ে পা লেগে আলো আলো হবে না কোনো দিক। সবকিছুই অচঞ্চল থাকবে। ঠোকা খেয়ে খেয়ে একটি ক্যালেন্ডার ট্রাপিজ খেলোয়াড়ের মতো উড়বে। আকাশ থাকবে পাখির বুকের মতো সাদা হয়ে। তাতে কালো চাঁদ মরু অতিক্রম করবে। এই তো, এমনই সবকিছু। অচঞ্চল, অনুমেয়। রাত্রি পেরোলে যে নতুন ডাঙা, পায়ের নীচে মাটি— তা কি অন্যরকম? গলিতে নিশ্চয়ই তেমনই ইউরিনাল— যার কোনো দেওয়াল নেই। চাষাড়ে জঙ্ঘার মতো সব বাড়ির দেওয়াল। রাস্তায় কথা ছুটছে আগুনকে পরাস্ত করে, আলোকে পেছনে ফেলে— এমনই? বিরাট গহ্বরের মতো যোনি লোকসমক্ষে আড়াল করা? কতগুলি জিনিস আজ চিরদিনের জন্য লুপ্ত হয়ে গেল। অথচ আমার মনে হচ্ছে দ্যাখো, এই তো, এখানেই রাখা ছিল। এভাবেই বোধহয় মানুষ সহনশীল হয়। লোহার চেয়েও সহনশীল পাথর অপেক্ষা পাথর। শীতল অপেক্ষা শীতল। নৈঃশব্দ্য অপেক্ষা নৈঃশব্দ্য

নিজের ছিরিছাঁদ ছুঁয়ে দেখি বিমর্ষ গালে আমার কোনো জন্মের কাটা দাগটি এখনও আছে। তার ইতিহাস উইয়ের পেটে গিয়ে এখন হয়তো বিশাল চড়ার মতো পড়ে আছে। তাতে ঘরবাড়ির আগমনও বিস্ময়কর নয়। কবেকার কথা, নয়? আজ কান্নার মতো বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দেখলাম পৃথিবী নতজানু হয়ে ভিজছে। গাছপালার গা বেয়ে একটি দিনের কাঁচা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কাটা দাগের জন্ম থেকে এ-জন্মে এসেছি তোমার কনিষ্ঠা ধরে। খানিকটা অন্ধের মতো। তাই পথঘাট-অলিগলি আমার মনে নেই। পেছনে কী কী রেখে এলাম— তাও মনে নেই। এখন তো আমি পাথর অপেক্ষা পাথর। শীতল অপেক্ষা শীতল। নৈঃশব্দ্য অপেক্ষা নৈঃশব্দ্য— নয়? অবশিষ্ট মানুষের সঙ্গে আমার বহু মিল আছে। ওদের চোখের মতোই আমারও চোখ। ঠোঁটের ফাটল। পায়ুকামী ঘোড়ার মতো সব হাতের আঙুল। ঝুরি নামানো বটগাছের মতো একটা অভিজ্ঞ দেহ। কপালে, চুলে পরিমিত তাপ— যা তোমার পছন্দের। এখন এই পড়ে, থেতলে যাওয়া জামের মতো সন্ধ্যার পথ ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখছি উড়ন্ত কানের পেছনে মানুষ অকারণে ছোটে। এই যে অ্যাত প্রাঞ্জল আয়োজন— তা কি যথেষ্ট নয়? ফটকের আড়ালে সিঁড়ি। সিঁড়ির পরে একটু ক্ষুদ্র বারান্দা, তারপরেই সেই দেওয়ালে মাংস লেপা ঘর। তোমার নির্বোধ আচরণ। শক্ত দড়িতে বাঁধা নুন-ভাতের শরীর। গাধার পিঠে চড়ে কেমন বসে থাকা একটা বিমূঢ় চাঁদ। এই কি যথেষ্ট নয়? নিরাবরণ হবার পর তোমার সেই বিশাল গহ্বরের মতো যোনি— যাতে শুধু সিঁড়ি দিয়ে নামা-ওঠা চলে

এই কি যথেষ্ট নয়? সব দেশে, সব কালে এই কি যথেষ্ট নয়?

কলি

অন্য কোনোদিনও হয়তো তোমার দিকে তাকিয়ে দেখব এমন-ই একটা শীর্ণ হলুদ আলো একা একা জ্বলে আছে। আশেপাশের অন্ধকার তাতে খানিকটা পীতাভ। অন্য দিনটি হতে পারে এই বছরের ছোটো ছোটো মাছের মতো দিন, সপ্তাহ বা মাসগুলি পেরিয়ে গেলে। প্রগলভ ঘোড়ার মতো এইসব দিন, সপ্তাহ বা মাসগুলি পেরিয়ে গেলে। যে-হাওয়া আসন্ন কাল থেকে উচ্ছ্বসিত ডালপালা অতিক্রম করে আসে, তার গায়ে কেমন বোটকা গন্ধ। যেন গরম রক্তের পশু তাকে ছেড়ে এইমাত্র উঠে গেল। আসন্ন কাল যেন কতগুলি উন্নাসিক জাহাজের পল্টন। মানুষকে ক্ষুদ্র করে দেয় বা ক্ষুদ্র করে দেখায়। তোমার ঊরুতে কখনো হাত রাখলেও আমার এমনই মনে হয়। তোমার অকূল সব বিস্তারের কাছে কী ক্ষুদ্র, কী অসহায় আমি। তোমার অননুমেয় উচ্চতার কাছে, তোমার পরিণামদর্শিতার কাছে। তাই প্রগলভ ঘোড়ার মতো এই দিনগুলো। ছুটন্ত, বেপরোয়া ক্ষুরের মতো এই দিনগুলো। তোমার চোখে তাই হয়তো একটা শীর্ণ হলুদ আলো নিঃস্ব থেকে ঝুল খেয়ে নেমে একা একা জ্বলে, জ্বলে থাকে। চারপাশের ভুষো চাদরের মতো অন্ধকার তাতে একটু বুঝি পীতাভ হয়। হয়তো এই-ই আঁকড়ে কেউ কেউ যেন-বা ধীবর জাতির— বেঁচে থাকে। এমনই একটা শীর্ণ হলুদ আলোর দিকে তাকিয়ে, লতানো গলার সাহায্যে সবটুকু ঔৎসুক্য নিয়ে। গুটিয়ে যাওয়া ছোট্ট লিঙ্গ নিয়ে অথবা পরিত্যক্ত পাখিবাসার মতো হাড়-পাঁজর নিয়ে। আমিও কি তেমনই? শীর্ণ হলুদ আলো? অগণন তারার নীচে দুঃখিত কোনো ছায়া?

অথচ পৃথিবীতে তুষারপাত হয়। কর্তব্যনিষ্ঠ নদীর পাশে ঝরে থাকে কত প্রবাদ, কত রঙিন গাছের পাতা। পরনের হাওয়াই তাতে রেখে দিলে, তাকেও রঙিন তৃপ্ত পাতাদের মতোই মনে হয়। গরিষ্ঠ দেশে একি খুব আশ্চর্যের? খুব বিস্ময়ের? দরজায় যারা আড়ি পেতে ভেতরের নৈঃশব্দ্য শোনে— তাদেরও দেহকাণ্ড দু-পায়ের ভরে উঁচু হয়ে থাকে। অন্য মুখের মতো তাদেরও কি মুখ নয়? নীল শিরায় ঢাকা মস্তিষ্ক নয়? ভবনের মতো শরীরের গাঁথুনি নয়? অথচ পৃথিবীতে তুষারপাত হয়। জল জমাট বাঁধে, আবার গলেও যায়। নেটের বোরখা পরা মসলিন মহিলার মতো রোদ আসে। আকাশে আনন্দিত কাটাকুটি রেখে ওড়ে পাখি। প্রগলভ ঘোড়ার মতো এই দিনগুলি হয়তো-বা বহুদূরে অরবে ছুটতে থাকবে। ট্রেনের জানালা দিয়ে তাদের হয়তো-বা মনে হবে কোনোদিন আদ্যন্ত শিশুতোষ গল্পের মতো। মনে হবে? লতানো গলার সাহায্যে সবটুকু ঔৎসুক্য নিয়ে, এগিয়ে দিয়ে যারা বেঁচে আছে— তারাও কি এমনই ভাবে? মাছের অন্তর বোঝার মতো তারাও কি বুঝতে পারে এসব? এই গরিষ্ঠ দেশের ভাষা? ও শীর্ণ হলুদ আলো, আমি কি কোনো ধূর্ত শিকারিকে অনুকরণ করি বা করছি? তার রঙে, তার রেখায় আত্মাকে অলংকৃত করি? কূট বিষ রাখি দাঁতে? অতিকায় পাহাড়ের মতো পরিণামদর্শিতা, মমতাময় স্তনের দিকে কখনো হেঁটে ওঠা কাঠপিঁপড়ে বা জানালার বাইরে কখনো কুয়াশায় মোড়া ভোর দেখা দিলে মানুষ কি দেহবদল করে দেহান্তরে যায়? গরিষ্ঠ দেশের ভাষা পিঙ্গল, সবুজ বা কখনো রক্তবর্ণ। কখনো-বা পরিচ্ছন্ন ধূসর

বোঝে তা? সবাই লহমা খরচ করে বুঝে ফেলে?

ট্রাপিজ

দ্যাখো কেমন শূন্যে ঝুলে আছি। বিমানের জানালা থেকে মাটিকে যেমন পার্সিয়ান মাদুরের মতো মনে হয়, তেমনই দেখতে পাচ্ছি আমি আমার সংসারটিকে। আমার ধ্যাস্টানো বিছানা, মাথার চাপে চেপ্টে থাকা বালিশ, চারপেয়ে কাঁকড়ার মতো টেবিলটা বা নীরবে জল-তাপ সহ্য করে যাওয়া নকল ফুলগুলো। আর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত হেঁটে বা উড়ে বেড়ানো তোমাকে। উইয়ের ঢিবির মধ্যে একটি মানুষ বসে থাকে— তাকে। শূন্যে হাতড়ে হাতড়ে আমি সংসারের ওপরে যেতে চেষ্টা করি। ছায়া যদি পড়ে, একচিলতে সীসে রং মেঘের ছায়া। তুমি একটু শান্তি পাবে। ঘন ঘন আঁচলে মুখ মুছতে হবে না আর। এভাবে ঘন ঘন মুখ মুছতে মুছতে কখন যে তোমার মুখে বাঘের আঁচড়ের মতো লম্বা, তির্যক দাগ পড়েছে, তুমি তো জানোই না। চোখের নীচে কী বিশাল চরাচর। বাথরুমের মাথায় কেমন আদুরে একটা কী পাখি যেন এসে বসেছে। মাথা কাত করে জানো, তোমাকেই বোধহয় দেখছে। একটি ঘরে একা একা আলো-পাখা ঘুরে যাচ্ছে। বসার কৌচে সাদা কভারের ঝুল উড়ছে তাতে। তুমি দ্যাখোনি? শোনো, তোমাকে বলি বুকের কিন্তু ওপরের দিকে অনেকটা হাঁ। আমাদের ধস্তাধস্তি, হাঁচর-কামড়ের সব দেখা যাচ্ছে। পাখিটা যদি কোনো আত্মা হয়? সব কথা কিন্তু চাউর হয়ে যাবে! মৃতরাও পরলোক থেকে ফিরে এসে শুনে যাবে সে-কথা! উইয়ের ঢিবির ভেতরে যে-মানুষ, তার শর্করাহীন খাওয়া হল? জানো, গতরাতে তোমার চোখ উপড়ে নিতে যে-আঙুল ব্যবহার করেছিলাম— সে-আঙুলে এখন তীব্র ব্যথা

আহা, জানালা দিয়ে কেমন একদল ময়ূরের মতো রোদ ঘরে ঢুকেছে। এই শূন্য থেকে সংসারটাকে মনে হচ্ছে অবিকল একটা নদীপাড়ের জঙ্গল। মাথায় কী প্রদীপ্ত আকাশ, সভ্যতাবিরোধী মেঘ। বিছানায়, ঘরের মেঝেতে বা বারান্দায় কত পাতা ঝরে ঝরে পড়ে আছে। সেখানেই কোনো একটা কিছুর সম্ভাবনায় মৌমাছি এসেছে। তুমি যেন বনরমণী। কালো পিঠে চকচক করা মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডে ভর দিয়েই তো তুমি আমাকে আক্রমণ করো। টিরানোসোরাসের মতো উড়ে আসো লম্বা লম্বা পাখা মেলে। আমি তো তেমন সশক্ত নই, তাই পাখার ঝাপটেই এমনভাবে টুকরো হয়ে যাই— যা কাউকে বলার নয়। যা একান্ত তোমার আমার। কোনো শাসক, কোনো রাষ্ট্রনায়কের নয়। কোনো ধর্মের নয়, কোনো দেশের নয়, কোনো শান্তি মিছিলেরও নয়। শুধু তোমার আমার। কুলুঙ্গিতে রাখা প্রদীপের মতো বা আড়ালের ওপারে জ্বলা মোমের মতো। আমি কখনো নীল অজস্র কণা দিয়ে তৈরি হাতে তোমাকে ছুঁই। তোমার ভাপ, অন্ধকার ছুঁই। নিতম্বে ছোটো ছোটো শাবকদের স্পর্শ করি— তা তো আমার সীমানা ছাড়িয়ে তোমারও সীমানায় পড়ে। তখনই তো তুমি শিউরে ওঠো, ওঠো না? সব রোমকূপ তাঁবুর মতো দাঁড়িয়ে যায়। নাকের অঞ্চল পেরিয়ে ঠোঁটে ঘাম চলে আসে, নোনতা নোনতা ঘাম— যা কোনো শাসকের নয়, রাষ্ট্রনায়কের নয়। কোনো ধর্মের নয়, কোনো দেশের নয়, কোনো কাঁটাতারের নয়। তুমিও তো ভাবো আমারই মতো, নয়?

শিউরে উঠতে উঠতে। আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে। শ্রান্ত, ধিকিধিকি আগুনের মতো কখনো বারান্দায় দেওয়ালে বন্ধনহীন ঠেস দিয়ে

Categories
2021-NOVEMBER-DHARABAHIK

ফা-হিয়েন

ফা-হিয়েনের ভ্রমণ

ষষ্ঠদশ অধ্যায়

আবার চলা শুরু। এবার দক্ষিণ-পূর্ব দিক ধরে। আশি ইউ ইয়েন-এর কিছু কম পথ অতিক্রমকালে তীর্থযাত্রীদল অনেক মঠ, অনেক মন্দির পার করে এলেন। আর পার করে এলেন সে-সব মঠের দশ সহস্র সন্ন্যাসী-সঙ্গ। এই সমস্ত স্থান পেরিয়ে অবশেষে তাঁরা এসে পৌঁছোলেন মথুরা রাজ্যে। এ-স্থানে পৌঁছাতে অতিক্রম করতে হল যমুনা নদী আর তার দুই তীরের কুড়িটি মঠ আর মঠের তিন সহস্র সন্ন্যাসী। বৌদ্ধধর্ম ক্রমেই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করল। সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরবর্তী ভারতীয় উপমহাদেশের ছোটো বড়ো সমস্ত রাজ্যে সকল রাজার রয়েছে বৌদ্ধধর্মে দৃঢ় বিশ্বাস। সন্ন্যাসীদের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদনকালে রাজাগণ প্রত্যেকেই খুলে রাখেন রাজমুকুট। এর পর রাজপরিবারের সকল সদস্য আর মন্ত্রীরা নিজেদের হাতে সন্ন্যাসীদের খাইয়ে দেন। আহার পর্ব সমাধা হলে সন্ন্যাসীদের মূল আসনের বিপরীতে মাটিতেই বেছানো হয় কার্পেট আর সেখানেই সকলে উপবেশিত হন। সন্ন্যাসীদের উপস্থিতিতে কেউই বসার জন্য বিশেষ আসন ব্যবহার করেন না। বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই এইসকল রাজাদের মধ্যে পূজার আচরণ বিধির চল শুরু হয়। এর দক্ষিণে আছে আর এক দেশ, নাম তার মধ্য রাজ্য। এখানে আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। বরফবিহীন এ-রাজ্যের মানুষ সচ্ছল, সুখী। নিষেধহীন জীবন। যারা রাজার জমি চাষ করে তারা যথেষ্ট পারিশ্রমিক পায়। এ-রাজ্য ছেড়ে কেউ চলে যেতে চাইলে যেতে পারে, ইচ্ছে হলে থাকতেও পারে। কোনো বিধিনিষেধ নেই। এ-রাজার শাসনব্যবস্থা শোষণহীন। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী কেবলমাত্র অপরাধীর জরিমানার বিধান র‍য়েছে। এমনকী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বারংবার বিদ্রোহের শাস্তি, ডান হাত কেটে নেওয়া। রাজার দেহরক্ষীদের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট বেতন। রাজ্যজুড়ে কেউ প্রাণ হত্যা করে না। পেঁয়াজ, রসুন ভক্ষণ বা মদ্যপান কোনোটাই করে না এ-রাজ্যের মানুষ।

এ-সকল আলোর মাঝেও রয়েছে একটি অন্ধকার। চণ্ডাল জাতির মানুষদের এখানে অচ্ছুৎ করে রাখা হয়। জনসমাজ থেকে এরা দূরে বাস করে। মূল নগরে বা বাজারে এলে এরা নিজেদেরকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে একটি কাঠের টুকরো দিয়ে নিজেদেরই শরীরে আঘাত করতে থাকে। এতে সবাই চিনে নেয় তাদের আর ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে দূরে দূরে থাকে। এ-দেশে শূকর বা পক্ষী জাতীয় প্রাণী পালন করে না কেউ। গবাদিপশুর বিষয়ে কারো কোনো আগ্রহ নেই। বাজারে না আছে কোনো মাংসের বিপণি, না কোনো ভাটিখানা। কেনাবেচা চলে কড়ির বিনিময়ে। কেবলমাত্র চণ্ডাল জাতির মানুষরাই শিকার করে এবং মাংস কেনাবেচা করে।

বুদ্ধের নির্বাণলাভের সময় থেকেই এইসকল দেশগুলির রাজা, বয়োজ্যেষ্ঠগণ, এবং মধ্যবিত্ত ভদ্রজনেরা নিজ নিজ স্থানে বিগ্রহ স্থাপনা করেন। উদ্দেশ্য ছিল সন্ন্যাসীগণের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন, গৃহ, ভূমি, বাগিচা ইত্যাদি দান করা। আর দেওয়া হত কর্মক্ষম ব্যক্তি ও বৃষ, চাষাবাদ করার জন্যে। এসবের স্বত্বাধিকারের দলিল লেখা হত এবং রাজাগণ পুরুষানুক্রমে তাঁর পরবর্তী রাজাকে এই দলিল সঁপে যেতেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম একইভাবে থেকে যেত এগুলি। এই দলিল ধ্বংস করার কথা ভাবে এমন দুঃসাহস হত না কারো। সন্ন্যাসীগণ যেখানেই যাক না কেন বাসগৃহ, শয্যা সামগ্রী, আহার্য, পোশাক কোনো কিছুরই অভাব হত না। তাঁরা ধর্মীয় দান ধ্যানের বদান্যতায়, অথবা ধ্যান-মগ্ন হয়ে এসবের দখল অনায়াসে পেয়ে যেতেন। কোনো আগন্তুক সন্ন্যাসী সহসা এসে উপস্থিত হলে, পুরাতন আবাসিক সন্ন্যাসীগণ তার সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ করতেন। ভিতর ঘরে বহন করে নিয়ে যেতেন তাঁর পোশাকআশাক আর ভিক্ষাপাত্র। পা ধোয়ার জল এবং প্রলেপ দেওয়ার জন্য তেল এনে দেওয়া হত এরপর। আর দেওয়া হত সন্ন্যাসীদের জন্য নির্ধারিত পরিমিত আহার্যের চেয়ে কিছু বেশি আহার-পানীয়। অচিরেই অতিথি সন্ন্যাসী যখন বিশ্রাম কক্ষে আসতেন, তাঁরা তাঁর বয়স আর সন্ন্যাস লাভের ক্ষণটি জানতে চান। এরপর কর্তৃপক্ষের নির্দেশমতো সকল শয্যা দ্রব্যাদি-সহ তাঁকে একটি কক্ষ দেওয়া হয়।

এই সন্ন্যাসীদের বাসস্থানগুলির নিকটেই সারিপুত্র, মোগালান আর আনন্দের উদ্দেশে প্যাগোডা স্থাপন করা হয়। অভি ধর্ম, পঞ্চ শীল আর বৌদ্ধ সূত্রাবলীর সম্মানে গড়ে তোলা হত মিনার। মাসাধিক কাল একই স্থানে বসত করলে, ধর্মভুক্ত সকল পরিবারগুলি মিলে ঐ সন্নাসীর স্বীকৃতি দান ও পূজা নিবেদনের আয়োজন করতেন। তাঁরা ভোজনের বন্দোবস্ত করতেন আর সকল সন্ন্যাসীগণ সমবেত হয়ে বুদ্ধের শৃঙখলাগুলি ব্যাখ্যা করতেন। সব সমাধা হলে তাঁরা সারিপুত্রের প্যাগোডায় এসে বিচিত্র সব সুগন্ধি ধূপ আর ফুলের অর্ঘ্য নিবেদন করতেন। নিশিভোর জ্বালিয়ে রাখা হত দ্বীপ। এতে সকলের পূজায় যোগদানের পথ প্রশস্ত হয়। সারিপুত্র আদতে ছিলেন এক ব্রাহ্মণ সন্তান। একদা বুদ্ধের সাক্ষাৎ পেয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে চেয়ে কাতর মিনতি জানান। মোগালান আর কাশ্যপ, তাঁরাও একইভাবে বুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। অধিকাংশ মহিলা ভিক্ষুগণ আনন্দের প্যাগোডাতে গিয়ে নিজেদের পূজা নিবেদন করতেন, কারণ, আনন্দই বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে, মহিলাদের সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি
আদায় করেন। আর নবীন ব্রতী যাঁরা ছিলেন, তাঁরা মূলত আরহতের পূজা করতেন। অভি ধর্মের গুরু যাঁরা ছিলেন তাঁরা অভিধর্মের পূজা করতেন। শৃঙ্খলার গুরু পূজা করতেন শৃঙ্খলাকে। এই পূজা বছরে একবারই করা হত। প্রত্যেকের জন্য নিজস্ব একটি দিন ধার্য্য করা থাকত।

মহাযান মতে প্রজ্ঞাপারমিতা, মঞ্জুশ্রী, অবলোকিতেশ্বরের পূজা করা হত। সন্ন্যাসীরা যখন ফসল ঘরে তুলত, অগ্রজ, মধ্যবিত্ত, ব্রাহ্মণ, সকলেই বিভিন্ন উপচার, যেমন বস্ত্র ইত্যাদি সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন। শমনগণ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে একে-অন্যের হাতে উপহারগুলি তুলে দিতেন। বুদ্ধের নির্বাণ লাভের সময় থেকেই, পবিত্র ভ্রাতৃত্ব বোধের প্রতি এই মহান শিষ্টাচারগুলি চলতে থাকে অনিবার। সিন তো নদীর অগভীর অংশ থেকে দক্ষিণ সাগর দিয়ে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার লি পথ অতিক্রম করলে পরে এসে পড়বে দক্ষিণ ভারতের সীমানায়। এ-দেশ একেবারে সমতল। পর্বত গাত্র চিরে বেরিয়ে আসা সুগভীর ধারা স্রোত নেই এখানে, আছে কেবল ক্ষুদ্রকায় কিছু নদী।

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

চতুর্থ পর্ব