Categories
কবিতা

সঞ্চালিকা আচার্যের কবিতা

চিকন বিলাপ কিছু


গর্ভ নিজেকে গিলে অতল হয়েছে।
সবকিছু মনে পড়ে গেলে বমিভাব

Categories
গদ্য ধারাবাহিক ফর্মায়েসি

অনিন্দ্য রায়ের ধারাবাহিক: ফর্মায়েসি

তৃতীয় পর্ব

পিঙ্গল/ ফিবোনাচ্চি কবিতা
(The Fib)

গণিতে ফিবোনাচ্চি রাশিমালার কথা আমরা জানি।

Categories
অনুবাদ কবিতা

ওয়ার্সান শায়ারের কবিতা

ভাষান্তর: সুদীপ ব্যানার্জী

[কবি পরিচিতি: সমকালীন যুবা কবিদের মধ্যে অন্যতম ওয়ার্সান শায়ার ১৯৮৮ সালে কেনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। সোমালিয়ান দম্পতির সন্তান ও ব্রিটিশ নাগরিক

Categories
কবিতা

সোহম চক্রবর্তীর কবিতা

প্রেমের স্লোগান হবে

সারারাত জেগে থাকা মেয়েটির নখে
লিখে যাব প্রেমিকের কোঁকড়ানো চুল, কাটাকুটি খেলা—

Categories
গল্প

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

প্রত্যাশা নিরোধক

ধ্রুবর কোনোদিনও প্রত্যাশা ছিল না। আমার মনে প্রত্যাশা জন্মাক— তাও চায়নি। অথচ আমি অসাবধানে প্রত্যাশাধারণ করে ফেললাম। রাতে একা ছাদে বসে বসে নিজেকে বোঝাতাম, “আসলে কেউ কাউকে ভালোবাসিস না। প্রথম প্রথম, তাই ঘোর লাগছে। নেশা… অ্যাডিক্ট হয়ে গেছিস। বেরিয়ে আয়… না হলে এরপর বাংলা সিরিয়ালের মতো হবে। আজ গিফটের কথায় ইমোশনাল হয়েছিস, কাল অন্য কোনো কারণে হবি। ঠিক ততটাই সময়ে চেয়ে বসবি যতটা ধ্রুব ওর পরিবারকে দেয়… ন্যাকামো এবং শয়তানী একসাথে করা হবে সেটা!”

আসলে, আজকাল ধ্রুবকে সত্যিই খুব চালাক মনে হয়। ওর ইমোশনাল উইকনেস নেই। নিজের জীবনের স্বাদ বদলাতেই আমাকে এভাবে অ্যাপ্রোচ করেছিল— অসমবয়সী বন্ধু, হেলদি রিলেশনশিপ। আর পরিণত বয়সের ইন্টেলেকচুয়াল, ইমপ্রেসিভ ব্যক্তিত্বদের প্রতি আমার দুর্বলতা আমাকে মারল। ধ্রুব আমার কাছে অবশ্যই এমন কিছু… যা সমবয়সী কোনো পুরুষ-বন্ধু কোনোদিন হতে পারেনি।

“You who suffer because you love, love still more. To die of love, is to live by it.”

— তুমি আমার কাছে ফাদার-ফিগার নও… আর আমিও তোমার মেয়ের মতো নই। তাহলে সমস্যাটা কোথায় বলো তো?

— বাবার মতো, মেয়ের মতো… এ-সব লেবেলিং না থাকলে কনসার্ন ফুরিয়ে যায় না।

— ও… কনসার্ন?! কেমন কনসার্ন শুনি? পেশেন্টের জন্য ডাক্তারের? না… কনসার্নটা ঠিক কেমন… হেল্প মি?

— তোকে এখন যা-ই বলব… ভুল মানে করবি। তিক্ততা বাড়বে।

— না, তুমিই তো বলছ কনসার্নের কথা। কোনোভাবে আমি কনসিভ করলে এই কনসার্নটা থাকত তো? আর আমি অ্যাবর্ট করতে না চাইলে?

আসতে আসতে অনেক কিছুই অপছন্দ হচ্ছিল মানুষটার। জড়াতে চাইছিলাম না… অথচ প্রত্যাশাটা ঘন হচ্ছিল। অনেকদিন পর দেখা হলে লম্বা একটা ইন্টারকোর্স… দু-তরফে কাঙ্ক্ষিত অর্গ্যাজম। তারপরেই ও উঠে বসে সিগারেট ধরাত, অথবা মোবাইলে ম্যাসেজ দেখতে শুরু করত। যেন ক্লায়েন্ট, মিটে গেছে… এবার আমি চাইলে কিছুক্ষণ থাকতে পারি, না হলে আসতে পারি। নিজেকে ডিট্যাচ করার চেষ্টাও করছিলাম… ভাবতে পারিনি এভাবে একটা ধাক্কা আসবে। দু-তিন দিন কনডম না ব্যবহার করার জন্য ওকে দোষ দিইনি… ইচ্ছে আমারও ছিল। কিন্তু যখন কাঁধে মাথা রেখে জানতে চাইলাম, “টেস্ট পজিটিভ এলে কী করবে?”… নিরাসক্ত ভাবে বলল, “কেন? অ্যাবর্ট করে দেবে?”

কোনো সংকোচ নেই… দ্বিধা নেই… রাস্তার ধারে গাছের ডাল ছেঁটে দেওয়ার মতো কোল্ড অ্যান্ড ইজি সলিউশন।

তুমি তো জানতে আমার ওভারিয়াল সিস্টের কথা? তুমি তো জানতে আমাকে ডিপ্রেশনের জন্য ওষুধ খেতে হয়? ডাক্তার ধ্রুব… তখন কোথায় ছিল তোমার কনসার্ন?

একটা আপাত উষ্ণ মনের মানুষকে এমন বেনিয়া ক্লায়েন্টের মতো ঠান্ডা মাপা উত্তর দিতে দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। ডাক্তারি করতে করতে কি সবরকম কাটা-ছেঁড়াতেই এরা সাবলীল হয়ে যায়?

সেদিন ফিরে এসে দুটো ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম… প্রায় এক সপ্তাহ রোজ ঘুমের ওষুধ খেতে হত। বাবা আলাদা থাকা শুরু করার পর বাড়িতে লুকিয়ে যার কাছে কাউনসেলিং করতে যেতাম… আবার তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম। আবার অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট, নার্ভের ওষুধ— এ-সব দিল। তাকে সব কথা ভেঙে বলতে পারিনি… একটা কাল্পনিক বয়ফ্রেন্ডের নামে দোষ চাপিয়ে দিলাম। দুঃস্বপ্ন দেখা, হাত কাঁপা, ইনসিকিওরিটি— এ-সব বললাম।

ধ্রুবর মতো কারো জন্য নিজের জীবনের স্বাভাবিকতা নষ্ট করছি— এটা ভেবে সব থেকে বেশি রাগ হত নিজের ওপর।

কলকাতার বাইরে পিএইচডি করতে যাচ্ছি— জানিয়েছিলাম ধ্রুবকে। আমার এই স্পেসটা দরকার ছিল… শুধু ধ্রুব না, চেনা জানা সবার থেকে… সবকিছুর থেকে। ইচ্ছে করেই কলকাতার বাইরে অ্যাপ্লাই করলাম। খুব সাফোকেটিং লাগছিল চারপাশের সবকিছু। একরকম মোনোটোনাস মানুষগুলোকে। অসহ্য লাগছিল বোনকে, মাকে। মনে-প্রাণে চাইছিলাম পালিয়ে যেতে।

ধ্রুব বারণ করল না। শুধু বলল— তুই বুঝবি না, জানি। বাট আই রিয়েলি ফিল ওরিড ফর ইয়ু। দূরে থাকবি, একা থাকবি… দুশ্চিন্তা হবে— কেউ না কেউ তোকে এক্সপ্লয়েট করছে। কোনো না কোনোভাবে তুই ব্যথা পাচ্ছিস।

“এক্সপ্লয়েট তুমিও করেছ ধ্রুব। ব্যথাও দিয়েছ… ব্যথা দিতে ভালোই লাগত তোমার।”— এ-সব চেপে রেখে বললাম, “ও সব ফালতু চিন্তা ছাড়ো। হাজারটা ছেলেমেয়ে পড়তে যাচ্ছে। নো বিগ ডিল। যাদের চিন্তা করার তাদের জন্য করো।”

ধ্রুব কথা বাড়াল না। যোগাযোগ রাখার জন্যে জোরও করল না। শুধু বলল, “খোঁজখবর রাখিস… এলে জানাস। কিছুই তো তোর অজানা নয়।”

ফর আ চেঞ্জ… সেদিন আমরা ক্লিনিকে না, দেখা করতে গেছিলাম বাগ বাজার ঘাটের ওদিকে। পিএইচডি-তে চান্স পেয়েছি বলে ট্রিট দিয়েছিল… খেয়েওছিলাম নির্লজ্জের মতো।

“‎And yet I have had the weakness, and have still the weakness, to wish you to know with what a sudden mastery you kindled me, heap of ashes that I am, into fire.”

বাসন মাঝতে মাঝতেই আমার রুম-মেট দিশারীর লাউড মোনিং শুনতাম। এত কাছ থেকে অন্য কাউকে এভাবে গোঙাতে শুনিনি। নিজে মোন করা আর অন্যরটা শোনা এক নয়। তবে এ-সব সয়ে গেছিল। আমার প্রয়োজনটা ছিল অন্যরকম। খুব ইচ্ছে করত পুরোনোদের কাবার্ডে বন্ধ রেখে বেশ কিছু নতুন বন্ধুদের মাঝে বাঁচতে। অ্যাডিকশন ছাড়াতে অনেক সময়ে যেমন বিকল্প কিছু ধরিয়ে দেওয়া হয়… হয়তো সেরকম। ধ্রুবকে ভোলার চেষ্টা করলে ভেতরে একটা চাপা কষ্ট হত। সেক্স স্টার্ভড মনে হত নিজেকে। কাউকে বলতে পারতাম না। হয়তো মিডল এজ ক্রাইসিসের মতো শোনাত… লোকে হাসত শুনে, আলোচনা করত আড়ালে।

অরিঘ্ন ছিল এক চমৎকার থেরাপি। বিন্দাস… গাঁজা খেয়ে পড়ে থাকে। নিজের ফ্ল্যাটে ঘর অন্ধকার করে, নীল-লাল এলইডি-চেইন জ্বালিয়ে ট্রান্স মিউজিক শোনে। শখের গিটার বাজায়। চাকরি করে… কিন্তু দায় নেই উন্নতি করার। কমিটমেন্টের ধারে কাছেও যাবে না… ঠিক করে রেখেছে। ওর ঘরে বসে হুঁকো টানতাম… রেট্রো মিউজিক শুনতাম… বাইরে থেকে যা হোক আনিয়ে খেতাম… সঙ্গে রাম। অরিঘ্নও আসত আমাদের ফ্ল্যাটে। রুম-মেট বুঝত আমারও কেউ আছে… শুধু আমিই একতরফা মোনিং শুনতে বসে নেই। ভালো জেল করত আমাদের মধ্যে। এমনকী আমার টপ ওর গায়ে হত, আর ওর পাঞ্জাবী আমি পরে বসে থাকতাম। ওই আমাকে অ্যাডভাইস দিত— তুই চুল ছোটো করে ফেল… আমি লম্বা করি। তুই কালার্ড লেন্স নে, আমি কাজল পরি। তুই ট্যাটু কর… আমি পিয়ার্সিং করি। ধ্রুবর ছায়া থেকে আমাকে টেনে সরিয়ে আনছিল ছেলেটা। অরিঘ্নকে আমি থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করেছিলাম, কিন্তু ঠকাতে চাইনি। নিশ্চিন্ত ছিলাম, ওর কমিটমেন্ট নেই… ও আমার ওপর মানসিকভাবে নির্ভর করে না। অবাক হতাম… বন্ধুত্বর থেকে শারীরিক সম্পর্কের এই কেমিস্ট্রিটা এত ম্যাচিওরভাবে সামলাতে দেখে।

ওই দিনগুলোতে অরিঘ্ন পাশে না থাকলে হয়তো ম্যানিক ফেজটা আবার জাঁকিয়ে বসত, স্ট্রেসটা আমাকে পিষে ফেলছিল।

দু-তিন সপ্তাহর গ্যাপ হলে অ্যাডিক্টদের মতোই একটা কষ্ট হত। ধ্রুবকে তত বেশি ঘেন্না করতাম। বেসিনে গিয়ে থুতু ফেলতাম ধ্রুবর মুখটা মনে করে… দায়ী করতাম সব কিছুর জন্য। অরিঘ্নকে ডেকে পাঠাতাম, বা ওর ফ্ল্যাটে চলে যেতাম… হয়তো না জানিয়েই। দরজায় তালা থাকলে সিঁড়িতে কিংবা রাস্তায় বসে অপেক্ষা করতাম। কিছুক্ষণ ফোরপ্লের পরেই মাথাটা একদম খালি হয়ে যেত। ধ্রুব যেমন পছন্দ করত, সেভাবেই এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলাম। ধ্রুব নিজেকে বাঘ ভাবত, আর পরাজিত শিকারের মতো অসার হয়ে যেত শেষের দিকে। অরিঘ্নকে পেয়ে মাঝে মাঝে আমার বাঘ-নখ বেরিয়ে আসত। ও সামলাতে পারত না। মুখটা অন্যদিকে সরিয়ে নিত, নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার ভান করত। ধ্রুব বলত, “তোকে অন্য কেউ ফোর্স করবে, তোর কষ্ট হবে— ভাবলে আমারও কষ্ট হয়, বিশ্বাস কর?”… এগুলো মনে পড়লে আরও বেশি জোর করতাম অরিঘ্নকে, ডমিনেট করতাম ভীষণ রকম। “ব্লোজব পেলে তো এনজয় করিস! চাটার সময় হেজিটেট করছিস কেন? চাট?!” দু-তিনবার চড়ও মেরে দিয়েছি, মৃদু আপত্তি করছিল বলে। সরি বলেছি পরে। মুড ঠিক করতে নিজের এল শরীরে এলইডি চেইন জড়িয়ে বলেছি— চল ফটোশুট কর!

ও ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে পারত… বা সোজা বলে দিতে পারত— পোষাচ্ছে না। তার বদলে শুধু জল খাওয়া, সিগারেট খাওয়া, জয়েন্ট বানানো… এসবের নামে পালিয়ে বাঁচত। একবার শুধু গায়ের দাগগুলো দেখিয়ে বলেছিল, “এরপর অ্যান্টিসেপ্টিকটাও নিজেই আনবি। কলকাতা গেলে মা-র সামনে জামা খোলা চাপ হয়ে যায়!”

সহ্য, কিংবা সাহায্য… কেন অরিঘ্ন এটা করত, জানি না। ওর পক্ষে সম্ভব ছিল আমাকে বিছানা, ফ্ল্যাট কিংবা জীবন থেকে লাথি মেরে সরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু ও ধ্রুব নয়। তাই, সচেতনভাবেই পারতাম না ওকে আঘাত দিতে। আবার ভয়ও হত… আর একটা ডুবো নির্ভরতায় ধাক্কা খাব।

কলকাতায় যিনি কাউনসেলিং করতেন, তাঁকে ফোন করলাম… ভিডিয়ো-কলে কাউনসেলিং শুরু করলেন। এছাড়া আর উপায় ছিল না।

“If you loved someone, you loved him, and when you had nothing else to give, you still gave him love.”

বোনের গায়ে হাত তুললে বোনও আমাকে ছেড়ে দেবে না। আর, মা মানসিকভাবে অভিভাবক নেই আর। কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। এভাবেই কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাবে মেয়েটা। এটাই ওর ভবিষ্যৎ।

একবার কথায় কথায় বলে ফেলেছিলাম ঠাট্টার ছলে— “আয়নায় গিয়ে নিজের মুখটা দেখ আগে!” তারপরই মনে পড়ল— একবার তিন দিন স্কুলে যায়নি ও… একজন টিচার ক্লাসে এই কথাটা ওকে বলেছিলেন বলে। ও মুখে কিছু বলল না, দেওয়ালে ঝোলানো আয়নাটা নিয়ে ছাদ থেকে নীচে ফেলে দিল।

অথচ বোনকে কিছুটা হলেও আমি ধ্রুবর কথা বলেছি। প্রফেসর আর কলেজের বন্ধুদের কথা বলেছি। অরিঘ্নর কথা বলেছি।

যদি আমি দুটো কথা বললে, ও একটা কথা বলে। এতে শুধু আমার সিক্রেট জেনেছে, আমি তেমন কিছুই পাইনি ওর থেকে ব্ল্যাকমেল করার মতো। তাও ছোটো বোন… আত্মকেন্দ্রিক আর ঢ্যাঁটা হলেও কিছুটা ভরসার জায়গা। মা-বাবার থেকে বেশিই ভরসার জায়গা। দিদিমা চলে যাওয়ার পর আর কেউই নেই কথা শেয়ার করার মতো।

এইরকম একটা ঢ্যাঁটা, অকৃতজ্ঞ এবং আত্মকেন্দ্রিক ভরসার কথা উপেক্ষা করেই ধ্রুবর কাছে গেলাম। বেড়ালের নখ লেগেছে— এটা মিথ্যে নয়।

দুপুর নয়, সন্ধ্যেবেলা… পাঁচজন পেশেন্টের পর। মানিকদা জিজ্ঞেস করল কেমন আছি। ভাগ্যিস বলেনি— কদ্দিন পর এলে!

ধ্রুবর মধ্যেও তেমন পরিবর্তন লক্ষ করলাম না আমাকে দেখার পর। হাতে আঁচড়টা দেখে বলল, “এমন কিছু না। এর থেকে বেশি আঁচড় লাগে মানুষের।”

— জন্তুর আঁচড়।

— হ্যাঁ জন্তুর আঁচড়… মানুষের আঁচড়… চিন্তা করার মতো কিছু না।

— ইনজেকশন লাগবে না? সিরিয়াসলি বেড়ালের নখ লেগেছে!

— নিয়ে রাখো তাহলে… সেফটি। মানিককে বলে দিচ্ছি। আর একটা অ্যান্টিসেপ্টিক লিখে দিলাম। এনাফ।

— ইচ্ছে করে আঁচড়ায়নি, লেগে গেছে অ্যাক্সিডেন্টালি।

— হুম, অ্যাক্সেন্ডান্টালিও আঘাত লাগে… নাম?

‘নাম’ জিজ্ঞেস করতে থমকে গেলাম। প্রায় এক বছর কোনো যোগাযোগ নেই, রাখতেও চাই না। কিন্তু এতটা?!

চুপ থাকতে পারলাম না, বলে ফেললাম, “কিছুই মনে পড়ছে না?”

প্যাডে আমার নামটা লিখল, পদবিটা লিখল না। লিখতে লিখতেই বলল, “কিছুই ভুলিনি।”

চুপচাপ দেখলাম… প্রেসক্রিপশন লিখে গেল ভাবলেশহীন মুখে। ফ্যানের হাওয়ায় কপালের সামনে এসে পড়া চুলগুলো উড়ছিল। আগে হলে সরিয়ে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেতাম। প্রেসক্রিপশনটা হাতে দেওয়ার আগে আবার নামের কাছে নিয়ে গেল কলমটা, জিজ্ঞেস করল— “পদবিটা যেন কী?”

— ডু ইয়ু ইভেন নো মি?!

— পদবি মনে থাকে না… মানুষ থেকে যায়।

কোনো রকমে ফিজটা দিয়েই প্রেসক্রিপশনটা হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। আমার ভুল, পুরোপুরি আমার ভুল। ধ্রুব অনুতপ্ত হওয়ার কোনো কারণই খুঁজে পায়নি এই এক বছরে।

ঘরে ফিরতেই বোনকে দেখলাম থমথমে মুখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে উঠল, “আমায় তো কিছু বলিসনি!” টপ-টা চেঞ্জ করতে করতে নিতান্ত বিরক্তি নিয়েই জানতে চাইলাম— কীসের কথা, কী জানানো হয়নি। তখনও ইঞ্জেকশনের জন্য হাতটা ব্যথা করছিল। নখের আঁচড়ের থেকে ছুঁচ ফোটানোর ব্যথা বেশি। “অরিঘ্নদাকে ফোন করেছিলাম।” কথাটা শুনেই বোনের দিকে ঘুরে চেঁচিয়ে উঠলাম, “কী?!”

— চিল! নম্বর ছিল… কল করেছিলাম।

— আমার ফোন ঘেঁটে ওর নম্বর নিয়েছিস?

— সো হোয়াট?

— ঠিক করিসনি। আই অ্যাম নট ওকে উইথ ইট। এখনই স্ক্রিনলক মারব…

— সে তোর প্রাইভেসি নিয়ে তুই চাট… বাট ইয়ু শুড হ্যাভ টোল্ড মি! এক্সপেক্ট করেছিলাম জানাবি যে ইয়ু হ্যাভ মুভ্ড অন।

কথাটা মনের ভেতর থিতিয়ে নিতে কিছুটা সময় চলে গেল। অরিঘ্নর ব্যাপারে বোনকে হালকাভাবে বলেছিলাম। প্রোফাইল ঘেঁটে পোস্ট-কমেন্ট এ-সব দেখে ও-ই ধরে নিয়েছিল আমরা রিলেশনে আছি। আমিও বলে দিয়েছিলাম ফার্স্ট স্টেজ… কেমন এগোয়ে দেখি।

অরিঘ্নর সঙ্গে বোনের কতদিন ধরে কথা চলছে কিছুই জানি না… আজ জানলাম ওদের মধ্যে কথা হয়। অরিঘ্ন আমাকে জানায়নি, অথচ বোনকে জানিয়েছে— ও বিদিশার সঙ্গে রিলেশনে আছে; আমাদের মধ্যে আর কিছু নেই। অথচ আমি জানলাম না… আমারই ব্যাচমেট বিদিশার সঙ্গে ও রিলেশনে আছে!

একবার মনে হল— বোনকে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য পুরোটাই ব্লাফ দিয়েছে অরিঘ্ন। বা আমাদের দু-জনকেই কাটিয়ে দেওয়ার জন্য…

বিদিশা বা অরিঘ্নর প্রোফাইলে ওদের দু-জনের সম্পর্কে এমন কিছুই পাইনি… যার থেকে আন্দাজ করা যায় ওদের মধ্যে কিছু brew করছে।

আমার এই ফ্যান্টম রিলেশনের শেষ হয়ে যাওয়ার খবরটা আমার একেবারেই পাত্তা দেওয়ার কথা না। অরিঘ্ন আর বিদিশা দু-জনকেই চিনি… জিজ্ঞেস করলেই হয়। তাও কেমন বারবার মনে হচ্ছিল— বিদিশার জন্য অরিঘ্ন আমাকে ডিচ করল। লুকিয়েছে আমার থেকে ইচ্ছে করেই। বিদিশাও নিশ্চয়ই জানে না— আমি ওর ফ্ল্যাটে যাই, ও আমার ফ্ল্যাটে আসে।

অরিঘ্নও যেন কীভাবে ধ্রুব হয়ে উঠল হঠাৎ… শুধু বোনের মুখ থেকে শোনা একটা কথায়…

বুকের ভেতর থেকে একটা কান্না ঠেলে আসছিল। পারলাম না। অরিঘ্নর ম্যাসেজ দেখতে বা ওকে ফোন করতেও ইচ্ছে হল না। ফোনটা সুইচ অফ করে ছাদে বসে একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছিলাম। বোন মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল… বিচ্ছেদের সান্ত্বনা। লুকিয়ে কেনা রামের বোতলটা ব্যাগ থেকে বার করে রাখল। যেমন স্নেহময়ী মা সন্তানের সামনে মন খারাপের সময়ে প্রিয় খাবার এনে রাখে।

রামের বোতলটা শেষ করতে করতেই মনে পড়ল… কাল আমার কাউন্সেলিং-এর শেষ দিন। উনিই বলেছিলেন ধ্রুবকে একবার ফেস করে দেখতে… ওভারকাম করতে পারছি কি না। ফেস করতে বলেছিলেন, আমি বাঁশ নিয়ে এলাম। কাল দিদিমার কথা বলব। মাঝে মাঝে দিদিমাকে স্বপ্নে দেখি। দিদিমার মৃতদেহ ফুল-দিয়ে সাজানো, শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইলেকট্রিক চুল্লি না, নিমকাঠে দাহ হচ্ছে। দাহ হওয়ার মাঝে যখন সবাই অন্য দিকে… দিদিমা আমার হাত ধরে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে আছে। কেউ ওভাবে আমার হাত ধরেনি। ধরে না। আমাদের কথা হয় না। আগুনের শিখা অন্ধকার আকাশের দিকে ভেসে ভেসে যায়। ঝিঁঝিঁ ডাকে একটানা, আর দূরে শেয়াল… মাঝে মাঝে। দিদিমা নিজের সৎকার দেখে চশমা না পরেই… এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে। যেভাবে দশমীর দিন মায়ের বরণ দেখত তাকিয়ে তাকিয়ে।

ছ্যাঁকা লাগতেই সিগারেটটা আঙুলের ফাঁক থেকে পড়ে গেল। বোন ছাদে চিৎ হয়ে পড়ে আছে আউট হয়ে… বিড় বিড় করছে। ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তোর দিদুনকে মনে পড়ে?” চোখ খুলে তাকাল, তারপর আকাশের চাঁদের দিকে দেখিয়ে হাতটা ফেলে দিল আবার।

দিদুন বলেছিল—

“ব্যথার নিজস্ব স্মৃতি থাকে। যে ব্যথা দিয়েছিল, যে ব্যথা ভুলিয়েছিল, অথবা সারিয়েছিল— তাদের স্মৃতি। তোর দাদু আমার গায়ে দু-একবার হাত তুলেছিল, সে-ব্যথার দাগ নেই। কিন্তু একবার একজন হাতটা পিছমোড়া করে এমন মুচড়ে দিলে!… মনে করলেই কবজিটা এখনও টনটন করে। এখন কেমন দেখতে হয়েছে কে জানে!”

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

প্রত্যাশা নিরোধক

“For every hundred crimes committed in the name of love, only one is committed in the name of sex.”

Categories
কবিতা

কৌশিক দাসের কবিতা

শম

সুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালের
কথাগুলো মনে পড়ে।

Categories
কবিতা

রঞ্জন মৈত্রের কবিতা

সাইকেল-১

জানি সেই ছাদ কলমে আসবে না
মাঝে আর শব্দটি সরিয়ে দিয়েছি
ছাদ ছন্দ ছত্রাকার না হোক

Categories
গদ্য

কুণাল বিশ্বাসের গদ্য

বাজো গান, রাত্রিসহচর

“রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, ধর্ম, সাহিত্য ও শিল্পের উন্নতি অর্থনৈতিক উন্নতির উপর নির্ভর করে। তবে সমাজের সার্বিক উন্নতির ক্ষেত্রে অর্থনীতি কোনো একক ভূমিকা নিতে পারে না।”

—সারকেনবার্গকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি (জানুয়ারি ২৫, ১৮৯৪)

Categories
অন্যান্য

মধুময় পালের সাক্ষাৎকার

এক দেশভিখারির মাটি অন্বেষণ

[লেখক মধুময় পালের সঙ্গে আলাপচারিতায় শতদল মিত্র]

আর ‘মরিচঝাঁপি’?

আগেই বলেছি বাম দলগুলো উদ্বাস্তুদের নিয়ে রাজনীতি করেছে, কিন্তু তাদের সমস্যার সমাধানে কতটা আন্তরিক ছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ আছে। বাংলার মাটির বিপরীত ভূমি দণ্ডকারণ্য, সেখানে উদ্বাস্তুদের যেতে দিল। অথচ আন্দামানে যেতে দিল না। ওখানে বাঙালিদের আর একটা রাজ্য পেতাম। বামপার্টিরা পার্টি লাইনের বাইরে গিয়ে বাস্তবকে স্বীকার করতে পারল না। সবকিছু চেপে দেওয়া হতে লাগল। সাবিত্রী রায়ের ‘স্বরলিপি’ চেপে দেওয়া হল। গোপাল হালদার মন্বন্তর নিয়ে লিখলেন, কিন্তু দেশভাগ নিয়ে লিখলেন না। মরিচঝাঁপির রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেও চেপে দেওয়া হল। এখন দণ্ডকারণ্যের ওই রুক্ষ পাথুরে বাংলার বিপরীত ভূমি থেকে তারা তাদের পরিচিত জল-পলির দেশে ফিরে আসতে চেয়েছিল। এটাই ছিল তাদের একমাত্র অপরাধ। ১৯৭৮— নতুন ক্ষমতায় আসা একটা বাম সরকারের এমন বর্বরতা মানা যায় না! দণ্ডকারণ্য থেকে ওরা এসেছিল বাম সরকারের ভরসাতেই। নেতাজিভক্ত, তাই মরিচঝাঁপির নাম দিয়েছিল— নেতাজিনগর। আমি উদ্বুদ্ধ হই এ-ইতিহাস খুঁড়ে বার করতে, বাঙালি হিসাবে এ আমার দায়ই ছিল। সে-সময় তো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বা সোস্যাল মিডিয়া ছিল না। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে নথি যোগাড় করতে হয়েছিল। দণ্ডকারণ্যের মালকানগিরির নির্মল কান্তি ঢালি বা রাধিকা রঞ্জন বিশ্বাসের ‘নিজের কথায় মরিচঝাঁপি’ থেকে প্রচুর তথ্য পাই। এ-প্রসঙ্গে নাম করতে চাই বিখ্যাত সাংবাদিক সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত ও স্টেটসম্যান কাগজের ফোটোগ্রাফার সুব্রত পত্রনবিশের।

নানা ধরনের সম্পাদনামূলক কাজ করতে গিয়ে আপনার নিজের মৌলিক লেখালেখি কি কিছুটা হলেও খর্ব হল না?

লেখক হিসাবে তেমন স্বীকৃতি পাইনি সম্পাদনার কাজ করতে গিয়ে— এটা সত্য। কিন্তু তার জন্য কোনো আফসোস নেই। মৌলিক লেখার চেয়ে সম্পাদনার কাজটা বাঙালির দায় হিসাবে নিয়েছি বলেই।

‘আখ্যান পঞ্চাশ’ গত বইমেলায় প্রকাশিত হল। তার আগে ‘আরণ্য রজনী’, ‘কহনবেলা-১, ২’। উপন্যাস ‘আলিঙ্গন দাও, রানি’, ‘রূপকাঠের নৌকা’। আপনার ভাষার চলন অনন্য। কবিতার মতো চিত্রকল্পময়, আবার ছবির মতো ছায়াতপের মায়া— স্পেসের খেলা, কখনো নাটকের বয়নই যেন! এ ভাষা এতই আপনার নিজস্ব যে, সেখানে আমি অন্য কারো প্রভাব খুঁজে পাইনি। যদি পেয়ে থাকি তা রূপকথার কথনভঙ্গি! এ-ভাষানির্মাণ কিছুটা সহজাত যদিও হয়, বেশিরভাগটাই তো সচেতন প্রয়াস। এ বিষয়ে…

যখন ভাবলাম নিজের লেখা লিখব, তখন তো মোটামুটি আমার ধারণায় ছিল কী লিখব। কিন্তু প্রশ্ন— কীভাবে লিখব? আমি আমার নিজস্ব ভাষা নির্মাণে সচেষ্ট হলাম। আমাকে প্রভাবিত করে বঙ্কিম, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, দেবেশ রায়, মতি নন্দী। আর ওয়ালীউল্লাহ। না, রবীন্দ্রনাথের গদ্য, এমন কী কমলকুমার বা অমিয়ভূষণও নয়। আমি বিশ্বাস করি ভাষা দিয়ে ব্যক্তিত্বকে চেনা যায়। যতদিন না নিজের ভাষা তৈরি করতে পেরেছি ততদিন লিখিনি। ঠিকই বলেছ আমার গদ্যে ছবি-কবিতা-নাটকের প্রভাব আছে। একসময় প্রচুর ছবির প্রদর্শনী দেখেছি, নাটক দেখেছি, কবিতা তো আজও পড়ি। আর গীতবিতান। এ-সব দিয়ে পটো যেমন মূর্তি গড়ে পরতে পরতে— সেরকম মায়ায় আমি আমার ভাষাকে গড়ে তুলি। আসলে যে-ভাষার সঙ্গে আমি ঘর করব, তাকে তো আদর দিতেই হবে, ভালোবাসা দিতে হবে। সে যে আমার প্রেমিকা, ঘরণি— তাকে তো সুন্দর করে সাজাবই।

অনেকেই কিন্তু আপনার লেখাকে ‘জাদুবাস্তবতা’ বলে দেগে দেয়। অবশ্য এই দেগে দেওয়াটা আমাদের বহুকালের বদ অভ্যাস… সেই আধুনিক সাহিত্যের শুরুর যুগ থেকে আমাদের সাহিত্যকে ৫০ কি ১০০ বছরের তামাদি বিদেশি কোনো তত্ত্বে দাগিয়ে না দিলে আমাদের পিচুটিচোখো সমালোচকদের ভাত হজম হয় না যেন!

ঠিকই বলেছ, বিদেশি তকমা না জুটলে আমাদের সাহিত্য যেন কল্কে পায় না। জাদু বাস্তবতা! আমার গদ্যে জাদুবাস্তবতা নেই, যা আছে তা হল ভয়ংকর বাস্তবতা। একজন দেশভিখারি নিজের মাটি খুঁজছে— এখানে জাদু কোথায়, এ তো ঘোর বাস্তবতা। ডি. জে.-র আওয়াজের কম্পনে মায়ের পেটের বাচ্চা বেরিয়ে আসতে চাইল— এটা জাদু নয়, নগ্ন বাস্তব। আর প্রত্যেক দেশের রূপকথাই তো জাদুবাস্তবতা, যা আসলে বাস্তবতাই। আমাদের রূপকথা, পুরাণ, মঙ্গলকাব্য— জাদু ও বাস্তবতার সোনার খনি। আমাদের রূপকথায় ছোট্ট টুনটুনি রাজাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, রাজাকে দুয়ো দিয়ে জানাচ্ছে— রাজা খায় ব্যাঙ ভাজা! রাষ্ট্রশক্তিকে এনকাউন্টার করছে। ভাবা যায়! চণ্ডীমঙ্গলের কালকেতুর আনা স্বর্ণগোধিকা রূপ পালটে হয়ে যায় অসামান্য সুন্দরী নারী। ওই মঙ্গলকাব্যেই সমুদ্রমাঝে এক নারী হাতি গিলে খায়, ওগরায়। একে যদি জাদুবাস্তবতা বলো সে তো আমাদের ঐতিহ্যে! তবে একটা কথা বলতে চাই— সচেতনভাবে সবসময় চেষ্টা করেছি গল্পের মধ্যে থেকেও তথাকথিত গল্পের ধাঁচের বাইরে থাকতে। কতটা পেরেছি পাঠকই বলবেন।

তাছাড়া আমার মনে হয় প্রত্যেক দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি তার মাটির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জন্ম নেয়। সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকা নিজের ভাষা-সংস্কৃতিকে হারিয়ে, তাকে খুঁজছে— তার বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের বাস্তবতা মিলবে কীভাবে?

ল্যাটিন আমেরিকার জীবনযাত্রা অন্য ধরনের। উদ্দাম। আমরা ১৮০ কিলোমিটার বেগের ঝড় সামলাতে একযুগ সময় নিই, তাও পারি না। আর ওরা ২৫০-৩০০ কিলোমিটার বেগের সাইক্লোন, রুক্ষ-উগ্র প্রকৃতিকে নিয়ে ঘর করে। ওদের ভোজ্য-পেয় আলাদা। ওদের উত্সব-যৌনতা ঝড়ের মতনই উদ্দাম। ওদের সঙ্গে যুদ্ধহীন-ভেতোবাঙালির তুলনা চলে? সুতরাং ওদের সাহিত্যের যে-‘জাদুবাস্তবতা’, তা আমাদের সাহিত্যে ব্যর্থ অনুকরণই মাত্র।

ভাষার জাদুর বাইরে গিয়ে আমি বলতে চাই যে, আপনার প্রতিটি লেখাই আদ্যন্ত রাজনৈতিক। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করছে, রাষ্ট্রকে টার্গেট করেছে। আমাদের সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, শরত্‍চন্দ্র থেকে শুরু করে আজকের নবারুণ ভট্টাচার্য, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুময় পাল… একটা রাজনৈতিক সাহিত্যের সমান্তরাল ধারা প্রবাহিত। কিন্তু বর্তমান সাহিত্যে রাজনীতি, মানে প্রত্যক্ষ রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে আপনার মনে হয় না?

দেখো, আমি যৌবনে, ছাত্রজীবনে নকশাল রাজনীতি করেছি। আমাদের রাজনীতি ছিল একটা আদর্শের, যা বর্তমানের কামিয়ে নেওয়া দলীয় রাজনীতি থেকে আলাদা। আগেই বলেছি আমাদের রাজনীতির সঙ্গে বরং স্বদেশি আন্দোলনের মিল, স্বদেশি আন্দোলনেরও তো একটাই চাওয়া ছিল দেশের পরাধীনতার মুক্তি। এই আদর্শবাদী রাজনীতি থেকেই আমার যাবতীয় লেখালেখি, মানুষের জন্য লেখা। সুতরাং আমার লেখা পরিকল্পিতভাবেই রাষ্ট্রবিরোধী। রাঘব, নবারুণ রাষ্ট্রকে সরাসরি টার্গেট করেছে, সাধ্যমতো আমিও— সেটাই তো প্রকৃত লেখকের ধর্ম। আর বর্তমানের বাজারি সিরিয়ালধর্মী লেখা? যেখানে শ্রমিক-কৃষকের জীবন যন্ত্রণা, তার লড়াই নেই, মানুষের সমস্যা নেই— সেখানে রাজনীতি আশা না করাই ভালো। ওগুলো তো ইতরামি লেখা, ফাত্‍রামিও বলতে পার— বালখিল্য প্রেম, যেন বাচ্চাদের নুনু-নুনু খেলা। এই লেখকরা এন্টারটেনারও নয়। সমরেশ বসু এন্টারটেনার ছিলেন, তার জীবন অভিজ্ঞতা ছিল, তাই বিটি রোডের ধারের মতো উপন্যাসও লিখতে পেরেছিলেন। ‘শোলে’ সিনেমার মতো এন্টারটেইনিং সিনেমা করতে গেলে দক্ষতা লাগে। এইসব বাজারি লেখকদের সে-দক্ষতা কোথায়? সব তো প্রতিষ্ঠানের পোষ্য। পুরস্কার নয়, টাকাই কাম্য— স্কিম করে সেটিং সাহিত্য। এর জন্য দায়ী সংবাদপত্রের কর্পোরেট কালচার। আমাদের সাহিত্য সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রিত। যতদিন কর্পোরেট ছিল না, তখন সতীনাথ ছাপা হয়েছে। এখন যা ছাপা হয়, তা খায় না মাথায় দেয়— কেউ জানে না। এরা শুধু সাহিত্যকে ধ্বংস করছে না, পাঠকও নষ্ট করছে। অধিক ফলনের কারণে মাটির প্রজননের মতো মেধার প্রজননও কমতে লাগল। ওই যে বলেছি— ভারতীয় বাঙালিরা নিজের ভাষাকে ভালোবাসে না, তারা নিজেকেই ভালোবাসে না। কিন্তু ওপার বাংলায় পাঠক আছে, তাই সাহিত্য পত্রিকা আছে, কেন-না তারা নিজের জাতিসত্তাকে ভালোবাসে।

তবে একেবারে জীবনবিমুখ, রাজনীতিবিমুখ লেখাই শুধু হচ্ছে তা নয়, জীবনের, তার রাজনীতির লেখাও হচ্ছে— তুমিই তো তার উদাহরণ।

এখন কী লিখছেন? বড়ো লেখা…

পেশার চাপে উপন্যাস তেমন লিখতে পারিনি। এই লকডাউন সময়ে লিখলাম। প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস— ‘একদেশ ভাইরাস’। শুরুটা এরকম— ‘চারুবালা দেখল আগুনের গোলার মতো একটা মাছ আকাশে উঠল, শরীর ত্যাগ করে বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেল’।

বাঃ! চমত্কার! সেই মধুময় জাদু! আবারও কিন্তু জাদু কথাটা এসেই গেল— ভাষার জাদু!

হ্যাঁ, ভাষা নিয়ে খেলি আমি। তবে বর্ণনাটা ঘোর বাস্তবের— আসলে জলা ছিল, তা বর্তমানে উবে গিয়ে বহুতল… তা, মাছটা যাবে কোথায়? এখানে জাদু নেই কোনো, আছে ভয়ংকর এক বাস্তবতা।

অপেক্ষায় থাকলাম এ-লেখার। সাবধানে থাকুন, ভালো থাকুন। আর আরও আরও লেখা দিয়ে পাঠক আমাদের মননকে সমৃদ্ধ করুন— এই কামনা করি।

তুমিও ভালো থেকো।

প্রথম পাতা