Categories
গল্প

যশোধরা রায়চৌধুরীর গল্প

সেইসব বাড়িয়ে বলা গল্পগুলো

বাড়িয়ে বলা ছাড়া আমাদের হাতে আর কী-ই-বা ছিল, বলো। প্রতিদিন একশো হাজারটা আড়াল রচনা করা, প্রতিদিন ঊনসত্তরটা মিথ্যে বলা, প্রতিদিন আমাদের জীবনের গল্পকে একটু একটু করে ঘন করে দানাদার করে তোলা এবং জনসমক্ষে পেশ করা।
একটা নীল ফুল ছাপ ছাপ, বড়ো বড়ো ফুলের হালকা শাড়ি, ভয়েল না কী বলে যেন। সেই পরে গা ধুয়ে বিকেলে চুল আঁচড়ে আসত দিদিভাই। আর চোখ বড়ো করে করে গল্প বলত। গান গাইতে বসত তারপর। কিন্তু ওই বিকেলের ফেলা সময়টুকু ওর নিজের সঙ্গে কাটত, আমারও, আমরা বারান্দায় দাঁড়াতাম, আমরা হাসাহাসি করতাম, গল্প করতাম। “ছেলে দেখতাম।” ক্যাবলা ছেলে স্মার্ট ছেলে কালো ছেলে ফর্সা ছেলে সিগারেট খাওয়া ছেলে খেলোয়াড় ছেলে রোথো ছেলে সব দেখতাম।

দিদিভাই তখন এইভাবেই গল্প করত। কলেজের গল্প। যা ঘটেছে আর যা ঘটেনি সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে দিদিভাই বলত। আমি ইশকুলে তখন মাত্রই ক্লাস এইট। ভূগোল বইয়ের তলায় শরদিন্দুর প্রেমের গল্প লুকিয়ে পড়ছি। প্রতিভা বসু, আশুতোষ, বিভূতি মুখুজ্জে। প্রেমের শিহরণ আমার জানা নেই তখনও। দিদিভাই আমাকে ওর বন্ধুদের প্রেমের কথা বলত।

নিজে প্রেম করার সাহস ছিল না। ওর মা বাবা তাহলে পিঠের ছাল তুলে দেবে না? কলেজটা যে কো এড, তাতেই তো সবার কত আপত্তি। ঠিক বিকেল ছ-টার মধ্যে ঘাম মুছতে মুছতে গিয়ে কাকিমা দাঁড়ায় মোড়ের কাছে। দিদিভাই বাস থেকে নামলে গলির পথটা পাহারা দিয়ে দিয়ে নিয়ে আসবে। তখন কুলফিওয়ালার হাঁক শোনা যায়নি, কিন্তু রাস্তার বাতিগুলো জ্বেলে দিয়ে যাচ্ছে একটা আঁকশি হাতে লোক। ঝুপসি মতো সন্ধ্যে নামতে নামতে কলেজের সঙ্গে একটাই সংযোগ রক্ষাকারী বাস এসে দিদিভাইকে নামিয়ে দেয়। ঠিক কলেজ-টার শেষ ক্লাসের সঙ্গে বাস রাস্তাটুকুর সময় যোগ করলে যে-সময়টা হয় সেই সময়ে।

আমার হাসি পায়। দিদিভাই চাইলে তো ক্লাস ও কাটতে পারে। দিদিভাই দুষ্টুমি করে খাবার ফেলে, পাত থেকে ঝিঙে বা তেতো নিয়ে জানালার বাইরে ফেলতে পারে লুকিয়ে, এমনকী বাথরুমে দুধের গেলাস নিয়ে ফেলে দিতে পারে দুধ। সব কাকিমাকে লুকিয়ে। আর প্রেম করতে পারে না?

যার এত ইন্টারেস্ট অন্যদের প্রেমে?

দিদিভাই, নিজে প্রেম করত কিনা আমি আজ আর জানি না। জানি, একেবারে কিচ্ছু নেই যে-সম্পর্কে সে-সম্পর্ককেও বাড়িয়ে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলতে পারত ও। মুখচোরা, কালো, কোঁকড়ানো চুলের দিদিভাই বাড়িতে হম্বিতম্বি করে ভাইবোনেদের ওপরে। কলেজে চুপটি করে যেত আর নোট নিয়ে চলে আসত। বড়োজোর শেষ দিকের এক-দু-খানা ক্লাস কেটে ক্যান্টিনে গিয়ে চপ আর চা সাঁটাত, অনেক ছেলেমেয়ের মধ্যে চোরা চোখে চাইত নিজের পছন্দের পলাশদার দিকে। এই ছিল দিদিভাইয়ের দৌড়।

দিদিদের ক্লাসের তাপসীদি তখন হোস্টেলে থাকে। সে হোস্টেলের গল্প শুনে ততদিনে পুরো পেকে গেছি আমি। তাপসীদিদের দুষ্টুমি। সিগারেট খাওয়া। অবিবাহিতা মোটা আর কালো (এই মোটা আর কালো শব্দদুটো বলার সময়ে ছেলে আর মেয়ে সবার মধ্যে কী পৈশাচিক উল্লাস যে কাজ করে!) সুপার ম্যাডামের গোঁফ আছে কি নেই সে-গল্প… একদিন হুট করে দিদিমণির ঘরে ঢুকে পড়ে সুপার ম্যাডামকে ব্লাউজ খোলা অবস্থায় দেখে ফেলার উল্লাস আর নিষিদ্ধতা… সে-সব বলার মধ্যে কত যে পেজোমি আর গুল্লি গুল্লি চোখের মজা ঢেলে ফেলত দিদিভাই।

তবু ছাপোষা আমরা। আমাদের জীবন ছাপোষাই হয়ে গেল তাই, তাপ্পর।

দিদিভাইকে বিয়ে দেওয়া হল। কথায় বলে, হলুদ জব্দ শিলে, বউ জব্দ কিলে, দুষ্টু মেয়ে জব্দ হয় বিয়ে দিয়ে দিলে। দিদিভাই ঠিক সময়ে খেত না, সকালে দাঁত মাজতে ভুলে যেত। খবরের কাগজের হেডলাইন আর প্রথমপাতাটা উলটে দ্বিতীয় পাতার কোণায় রিপ কার্বি আর অরণ্যদেব পড়ে সকালে ওর কাজ সারা। হরলিক্স কোনোদিন তলানি খেত না। তা নিয়ে কাকিমা খিটখিট করত। দিদিভাই বিকেলে বারান্দা থেকে আমার সঙ্গে গল্প আর ছেলেদেখা শেষ করে গান নিয়ে বসত কিন্তু তাতেও ফাঁকি। পড়াশুনো তো চিরদিন অন্যমনস্কভাবেই করে গেল। ক্লাস্ত ওয়ান থেকে টেন অঙ্ককে ভয় পেয়ে পেয়ে ইলেভেনে হোম সায়েন্স…। এই আমার দিদিভাই।
তবু তার কী ভীষণ জাঁদরেল আর সুপণ্ডিত এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল। কে জানে কী কপালে। আসলে কাকা আর কাকিমার প্রচেষ্টায়।

যে-প্রচেষ্টায় কাকিমা দুপুরে ঘুমোত না, উদয়াস্ত পরিশ্রম করার পর, দুপুরে খেয়ে উঠে গল্পবই না পড়ে রাশি রাশি জ্যাম জেলি আর আচার বানাত, ছাতে দিত তারপর ছাত থেকে পাড়ার সমস্ত দুষ্টু ছেলে আর মেয়েদের খর চোখে নজরদারি করত, চশমার পাওয়ার বাড়িয়ে দুপুরের আধো অন্ধকার ঘরটিতে বসে সেলাই ফোঁড়াই করত, দূর থেকে ও বাড়ির টুম্পা ছেলেদের সঙ্গে চিরকুট চালাচালি করছে দেখে ভুরু কুঁচকে বলত হুঁ! সেই একই অধ্যবসায়ে ঘাম মুছতে মুছতে কাকিমা চলে যেতে ঠিক ছটায় আমাদের সরু গলি পেরিয়ে বাসরাস্তায়, দিদিভাইকে বাস থেকে নামিয়ে সঙ্গে করে আনতে। সেই অধ্যবসায়েই চেনা পরিচিত থেকে শুরু করে কাগজের বিজ্ঞাপন সর্বত্র নজরদারি করে দিদিভাইকে এক অসামান্য পরিবারের রূপহীন, অর্ধটাকওয়ালা, কোলকুঁজো, ভারী চশমার পড়ুয়া পাত্রে পাত্রস্থ করল। পাত্রের বাবা মা দু-জনেই অধ্যাপক এবং প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের। বাবা অবিশ্যি মারা গেছেন সম্প্রতি। মা একাই ছেলেকে ব্যবস্থা করে বিয়ে দিচ্ছেন।

বিয়ের সন্ধ্যেতে দিদিভাই যখন সাজছিল তখন বান্ধবী আর বোনেরা, পাড়ার মেয়েরা হই হই করে বর দেখতে গিয়েছিল। ফিরে এসেছিল মুখ চুন করে। এরকম গল্প করে তিলকে তাল করতে পারা দিদিভাইটা, ওর বর রাজেশ খান্না বা নিদেনপক্ষে আমাদের শমিত ভঞ্জ বা স্বরূপ দত্তের মতো দেখতে হতেই হবে। দিদিভাইয়ের চোখ খঞ্জনার মতো ছিল, নাক সরু আর মোটের ওপর মুখশ্রী তো ভালোই। সেই মিষ্টি দিদিভাই বরের ছবি দেখে কতটা কষ্ট পেয়েছিল এখন বুঝি। তখনও বুঝেছিলাম।

ভয় ও পেয়েছিল। এতদিনের সিনেমা দেখা, এতদিনের দারুণ সব গল্পবই, এতদিনের কলেজের প্রেম প্রেম ভাব, পলাশদার প্রতি চোরা চাউনি, সবের পর, এই পণ্ডিত, বয়সে আট বছরের বড়ো রাগি রাগি দেখতে বরের চেয়েও, তাদের ওই সুবিশাল নামডাকের পরিবারে গিয়ে ভর্তি হতে হবে ভেবেই দিদিভাই কুঁকড়ে গেসল।

দিদিভাইয়ের শাশুড়ি ছিলেন এম এ পাশ। সদ্য বিধবা, তবে একাই একশো। ভীষণ ব্যক্তিত্ব। চোখা চেহারা। অধ্যাপক হিসেবে দারুণ নামডাক।

অথচ দিদিভাইকে বি এ থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা দেবার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হল। বিদ্বান ছেলের বিয়ে দিতে ওঁরা সুশিক্ষিতা মেয়ে খোঁজেননি কেন? রূপসীও খোঁজেননি?

দিদির পাকাদেখার দিন আমি চারটে কমলাভোগ আর দুটো সিঙাড়া সাঁটাতে সাঁটাতে শুনেছিলাম দিদির হবু শাশুড়ি বলছেন, রূপ বিদ্যে দিয়ে কী করব আমি বলো তো? সে-সবের তো অভাব নেই আমাদের বাড়িতে? আমার শুধু একটা ঘরোয়া মেয়ে চাই, বাড়ির সব দায়িত্ব নিতে পারবে… নিজের মেয়ের মতো রাখব।

দিদিদের বাড়ির সদর দরজার চাবির দুটো ডুপ্লিকেট ছিল। একটা বাড়িতে থাকত। অন্যটা নিয়ে বেরুত জামাইবাবু। আর তৃতীয়টা দিদির ননদের কাছে থাকত। বেল টিপে মাকে বিরক্ত করবে না সে, সুন্দরী শিক্ষিতা উচ্চ পদে কর্মরতা ননদ দিনের যে-কোনো সময় “নিজের বাড়িতে” আসবে বলে ওর কাছে থাকত। ইয়েল লকের চাবি ঘোরালেই সে-বাড়ি ঢুকতে পারত।

দিদি বাজারে গেলে, শপিং, ছেলেকে স্কুলে দেওয়া… বা নিজের বাপের বাড়িতে কাকু কাকিমার সঙ্গে দেখা করতে এলেও… নাহ্, ফিরে গিয়ে বেল টিপে বসে থাকত সিঁড়িতে। ভেতরে, অনেক দূর থেকে হাওয়াই চটি, ঘরে পরার, ফটর ফটর আওয়াজ করে শাশুড়ি আসতেন। লেখাপড়ার টেবিল থেকে উঠে আসতে হয়েছে বলে রীতিমত বিরক্ত। তবু, দিদির হাতে কখনো আরেকটা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারেনি।

এই মুহূর্তে দিদিভাই শুয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। একা, সম্পূর্ণ একা। দিদিভাই মরণাপন্ন। একটু আগেই ফোন করেছিল ওদের কাজের লোক। দিদির মোবাইল ঘেঁটেই আমার নম্বর পেয়েছে।

ডাক্তার আমাকেই জিগ্যেস করলেন, ওঁর আধার কার্ড কোথায়? আইডেন্টিটি কার্ড কিচ্ছু আনেনি তো।

কে আনত? কাজের লোক ? জামাইবাবু? জামাইবাবু নিজের কার্ড ও খুঁজে পান কিনা সন্দেহ।

দিদি একা শুয়ে আছে। আমি এসেছি। আমার নিজের গল্প, নিজের সমস্যা, নিজের শ্বশুরবাড়ি, সব সামলে, পেছনে রেখে। দিদি টার্মিনাল। কত বোতল রক্ত যেন লাগবে। কতগুলো টেস্ট যেন করতে হবে। কে করায়, কে দায় নেয়?

এই শেষ সময়টা ওর বর পাশে নেই। ছেলেও বিদেশে। জামাইবাবুকে ফোন করি একটা। ওদিক থেকে বিস্রস্ত, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত গলা শোনা যায়। বয়স যেন এক লাফে অনেক বছর বেড়ে গেছে জামাইবাবুর।

কে?

আমি, টুনি। জামাইবাবু দিদির ত রক্ত লাগবে/
অ্যাঁ, রক্ত?
দিদির আই কার্ডটা কি কেউ এসে দিয়ে যেতে পারে নার্সিং হোমে?
কেউ- কেউ ত-তো নেই টুনি। আমার, আমার না, নার্ভ ফেইল করছে টুনি।
তাহলে-তাহলে-দু-মুহূর্ত ভেবে নিই আমি। আচ্ছা জামাইবাবু আমিই যাচ্ছি আপনাদের ওখানে।

যাই। দ্রুত ট্যাক্সি ডেকে নিই। মুখে হু হু করে হাওয়া লাগছে আর আমার কান্না আসছে। ছোটবেলার সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। দিদিভাইয়ের বানিয়ে বলা গল্পগুলো। বড় বড় চোখ করে। তেঁতুলের আচার চুরি করে এনে কাকির ভাঁড়ার থেকে।

ওদের বাড়িতে ছটা আলমারি। তার তিনটে লোহার। জামাইবাবু জানেন না দিদির আধারকার্ড কোথায় আছে। দিদিভাইই ত সব গুছিয়ে রাখে ।

ও-ও জানত।
পাস্ট টেন্স কেন বলছে জামাইবাবু? মাথাটা কি একেবারে গেছে?

চাবি কোথায় থাকে? চাবিগুলো? লকারে থাকা সম্ভব। দিদির বেডরুমে ঢুকে ড্রয়ার হাঁটকাই আমি।

সারাবাড়িতে, দিদির ঘরে, দেওয়ালে কত ফোটো। দিদির একটাও নেই। জামাইবাবুর অল্পবয়সের ডিগ্রি সেরিমোনির ছবি। ওদের ছেলের অসংখ্য নানা বয়সের। আর বাইরের ঘরে দেখে এসেছি মাসিমা মেসোমশাইয়ের ছবি। স্টুডিওতে তোলা মেধাবী মহিলাটি… শিক্ষিতা, সে যুগের এম এস সি। দিদির ননদের ও আছে। দিদি শুধু নেই। না ওই তো ভুটুকে জড়িয়ে ধরে একটা অস্পষ্ট।

ওহ, ওর বোধ হয় আধার হয়নি জানো টুনি। সেই সময়ে তো আসলে ভুটুর মাধ্যমিক, ও পড়াচ্ছিল। বলেছিল পরে কখনো করিয়ে নেবে। আর হয়নি।

দিদিভাইয়ের আধার নেই। আইডেন্টিটি কার্ড নেই। প্যান, ইলেকশন আই কার্ড? সেসব নেই? সেসব কোথায়?

হাত কাঁপছে জামাইবাবুর । করুণা হয় আমার ওঁর দিকে তাকিয়ে। জামাইবাবু বিদ্বান মানুষ। কোনোদিন জীবনের কোনো প্রাক্‌টিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে শেখেননি। ত্রিশ বছর বয়স অব্দি মায়ের শাসনে, মায়ের সিদ্ধান্তে চলেছেন। বিয়ের পরও, মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, মাতৃমুখাপেক্ষিতা ঘোচেনি।

দিদিভাই ধীরে ধীরে নিজের কালো হবার, বিদ্যাহীন হবার অপরাধ বোধ নিয়ে শ্বশুর শাশুড়ির সেবাতে সার্বিকভাবে আত্মনিয়োগ করেছিল। আর দক্ষতায়, যত্নে, প্রাণপণ চেষ্টায় পুতুলের মতো কর্মপটু আর অনিবার্যভাবে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল ওদের সংসারে।

ফলত জামাইবাবু কখনো কুটো নাড়েননি। বছর দশেক আগে দিদিভাইয়ের শাশুড়ি মারা যাবার দিন ওঁকে হাউ হাউ করে শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছিলাম। দিদিভাই সেদিন সমাগত আত্মীয়দের বড়ো বড়ো ট্রে ভর্তি করে চা আর সরবত এনে দিচ্ছিল। সে ব্যস্ততায় আমি শুধু লক্ষ করেছিলাম দিদিভাইয়ের মুখটা শুকনো। সাদা শাড়ির ভেতরে রুগ্ন একটা শরীর। কপালে দু-তিনটি চুল রুপোলি হয়ে এসেছে।

তুমি কিছু খাবে না?

দিদিভাই জামাইবাবুর সামনেও চা ধরেছিল। জামাইবাবুর চোখ দুটো ফুলে লাল, জবাফুলের মতো। মাথা নেড়ে না বলেছিল। সবাই ঘিরে ধরেছিল তাকে। আহা উহুর বন্যা। দিদিভাইয়ের পিসিশাশুড়ি বলেছিলেন, বউমা ওকে ডাবের জল টল কিছু দাও। এত বড়ো আঘাত…

ঐদিন মনে হয়েছিল দিদিও আর বেশিদিন বাঁচবে না। কিন্তু ঐ যে আমাদের বাড়িয়ে বলা স্বভাব। আমরা সবকিছু নাটকীয় করে ফেলি। সবকিছুকে বানিয়ে তুলি গল্পের মতো…

সেইদিনের পর দিদির শাশুড়ির শ্রাদ্ধের দিন, তার পরদিন, খুব খাওয়া দাওয়া হয়েছিল। জামাইবাবু নিজের মায়ের সম্বন্ধে বই বার করেছিল একটা। আত্মীয়রা, নিজে , লিখেছিল স্মৃতিকথা। কত পন্ডিত, শিক্ষিত মানুষ ওই পরিবারে। ওঁর ছাত্রছাত্রীরাও লিখেছিল বইকি। দেশে দেশে ছড়িয়ে আছে মাসিমার ফ্যান ক্লাব।

দিদির ছেলে ভুটু ঠাকুমার ডিজিটাল ছবির কোলাজ বানিয়ে ল্যাপটপে লাগিয়ে লুপে চালিয়ে রেখেছিল।

দিদিভাই মারা গেলে ওর ছবির কোলাজ বানাবে, ভুটু?

Categories
গল্প

হিন্দোল ভট্টাচার্যর গল্প

ভয়

“তুমি তো গল্প লিখতে বসে কোনও গল্পই রাখোনি। পাতার পর পাতা লিখে গেছ! একটি কাক তোমাকে লক্ষ্য করছে, এটা তোমার ব্যক্তিগত ডায়েরির বিষয়বস্তু হতে পারে, কিন্তু এটা কোনো গল্প নয়”
“কিন্তু তরুণদা, আমি সকালবেলা উঠে দেখলাম একটা পোকা হয়ে গেছি, সেটা যদি একটা…”
“আরে সব বিষয়ে যদি তোমার কাফকা এসে পড়েন, কাম্যু এসে পড়েন, তার্কোভস্কি এসে পড়েন, তাহলে তো মুশকিল হে! তুমি তো এই কলকাতায় বসে গল্পটা লিখছ একটা খবর কাগজের সাহিত্যপত্রের জন্য। বাঙালিদের জন্য। বাঙালি পামুক পড়ে, দস্তুভয়স্কি পড়ে কিন্তু চায় শরৎরচনাবলি। তোমাকে আসল পাঞ্চটা করতে হবে এখানে। শরৎ এবং জয়েসে। না হলে তো এখানে জায়গাই পাবে না। কথাটা বলবে কোথায়?”

“কিন্তু দাদা, আমার জীবনে তো গল্প নেই। আমি আর বানিয়ে বানিয়ে লিখতে পারব না”।

“আহা! লক্ষ করো। ঢুকে যাও মানুষের ভিতরে। বস্তির মানুষেরা কেমনভাবে বেঁচে আছে। সাব অলটার্ন মানুষের জীবন কেমন! তোমার জীবন সম্পর্কে কারো কোনো আগ্রহ নেই। আর কোন কাক কার দিকে ঘৃণাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তা বাংলা সাহিত্যের বিষয় হতে পারে না।”

“কিন্তু তরুণদা, যদি, বিষয়টা একটা রিভেঞ্জ হয়”

“ওরে বাবা, হিটলারের বার্ডস নাকি?”

গল্পটা ছাপা হয়নি। পার্থর একমাত্র এমন একটা লেখা সেই গল্প, ছাপা হয়নি। অবশ্য ছাপা যে হবে না, তা রুমেলা বলে দিয়েছিল আগেই। কারণ, গল্পের মধ্যে এমন কিছুই ছিল না, যা গল্পটাকে গল্প করে উঠতে পারে। কিন্তু পার্থর নিজের আর যে-কোনো কাহিনি নেই। আর যে গল্পও নেই। সে গল্প লিখবে কেমন করে? পার্থ শুধু জানে, সে ঠিক যেমনভাবে দেখে, তা অন্যদের চেয়ে আলাদা। আর সে যে-জীবনযাপন করে না, সেই জীবন সম্পর্কে লেখার অধিকারীও সে না।

“নিজের থেকে বেরোও পার্থ। কত চরিত্র, তাদের মধ্যে আত্মার মতো ঢুকে পড়। একজন লেখক তো আসলে একটি বিদেহী আত্মা, যে, মানুষের ভিতরে ঢুকে পড়ে। তার পর তার পোশাকগুলো পড়ে থাকে। সে থাকে না। সেই পোশাকগুলো কী? তার লেখা বিভিন্ন চরিত্র।”

“মানছি তরুণদা, কিন্তু, এত চরিত্র যার আশেপাশে কোনোদিন ছিল না, তার জীবনে গল্প নেই বলছেন? মানে, তার একটা বাগানের গাছ বা পোষা কুকুর কিংবা অপরিচিত কাক তার গল্পের চরিত্র হতে পারে না?”

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। একটা অসম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ নিয়ে পার্থর গল্প পার্থর ব্যাগের মধ্যেই ঘুরতে থাকল। কারণ, পার্থর মতোই পার্থর গল্পেরও আর অন্য কোথাও যাওয়ার ছিল না।

কিন্তু এগুলিও পার্থর ভয়ের কারণ নয়। অবশ্য রুমেলা ঠিকই ধরেছিল, পার্থ আজকাল নিজেকেই ভয় পাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, তত যেন আরও বেশি করে এই ভয় চেপে বসছে পার্থর মনের ভিতরে। যেমন শীতকালের হালকা লাল রঙের রাস্তার আলোর সঙ্গে কুয়াশা মিলেমিশে একধরনের আলোর জন্ম দেয়। সেই আলোর চরিত্র একটাই। আর তা হল বিষাদ। পার্থ যে মানুষের চেয়ে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, এ-কথা পার্থর নিজের কাছে অজ্ঞাত ছিল না। বরং, সে ক্রমশ বুঝতে পারল মানুষের প্রতি তার একধরনের বিদ্বেষ জন্ম নিয়েছে মনের ভিতরে। কিন্তু তাকে দেখতে কাক কিংবা শেয়াল বা কুকুরের মতো হয়ে যায়নি।
“কী বলছ, তোমাকে তোমার মতো দেখতে লাগছে কিনা?”

“হ্যাঁ, মানে, আমাকে কি আমার মতোই দেখতে লাগছে রুমেলা?”

আর ঠিক সে-সময়ে ডেকে উঠবে একটি কোকিল অযাচিতভাবে, সেটা পার্থ বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারেনি বলেই সে চমকে উঠেছিল। রুমেলা উঠে পড়েছিল চেয়ার ছেড়ে আর তার পরেই তার সেই মন্তব্য, যা শুনে অস্বস্তিতে পড়ে গেছিল পার্থ। আর সেটি হল— “তুমি কি নিজেকে ভয় পাচ্ছ?”

এইটুকু পড়ার পরে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন একটা বিভ্রান্তিকর গদ্য ছাড়া আর কিছুই পড়তে পারছেন না। কারণ, লেখাটি প্রথম বাক্য ছেড়ে আদৌ কোথাও এগোয়নি। পার্থও এগোত না, যদি না সেদিন রাতেই বাড়ি ফেরার সময়ে সে বুঝতে পারবে পাড়ার কুকুরগুলো আর তাকে দেখে তেড়ে আসছে না। আর এ-কথা খেয়াল করা মাত্র, তার শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যাবে একটা অদ্ভুত ঠান্ডা হাওয়ার স্রোত। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে সব। আস্তে আস্তে পরিচিত সকলের কাছ থেকেই তার তৈরি হয়েছে এক দূরত্ব। এমনকী মানুষ দেখলে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে তার নিজেরও অস্বস্তি হচ্ছে আজকাল। একধরনের বমি আসছে। জ্বর আসছে। বুকের মধ্যে ধুকপুক ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। তরুণদা হোক বা রুমেলা বা বাজারের শংকরদা, বা, বাসের ভিড়। মানুষের কাছ থেকে দূরে একা থাকলেই সে স্বস্তি পাচ্ছে। যদি প্রকৃতির রোষ গিয়ে পড়ে মানুষের উপর, তাহলে সেও সেই রোষের কবলে পড়বেই। হয়তো একদিন সারিবদ্ধভাবে আক্রমণ করবে সমস্ত পাখি, সব কুকুর, সব বাঘ এমনকী সব ছাগল। এমন একধরনের অবাস্তবিক বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য কোনও রূপকথা বা কোনো গল্প বা কোনো চলচ্চিত্রও তৈরি থাকবে না নিশ্চয়। ফলে, না লিখতে পারার একাকিত্ব পার্থকে ঘিরে ধরবে। রাত একটার ফাঁকা রাস্তায় বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট দূরে দাঁড়িয়ে এ-সব কথা ভাবতে ভাবতেই তার মনে পড়ছিল রুমেলার সেই প্রশ্ন— “তুমি কি নিজেকে ভয় পাচ্ছ?”

রাস্তাটা মোটামুটি ফাঁকাই থাকে। অন্তত রাত একটায়। রাস্তার মোড়ের মাথায় ওই চার পাঁচটা কুকুরের ঠিকানা। সেখান থেকে ঠিক পাঁচশো কি এক কিলোমিটার তাদের সীমা। এই সীমার মধ্যেই তাদের জন্ম, যুদ্ধ, প্রেম, যৌনতা, মৃত্যু। রাতে যখন পার্থ ফেরে, তখন চেনা মানুষ হলেও তার দিকে তাকিয়ে একবার মুখ তোলে কুকুরগুলো। গলার ভিতর দিয়ে একটা চাপা ক্রোধের গরগর শুনতে শুনতে ঘামতে থাকে পার্থ। সেজানে, তাকে যদি আক্রমণ করে কুকুরগুলো, তাহলে, তার কিছুই করার নেই। কিন্তু প্রায় দশ বছর হয়ে গেল, কুকুরগুলো এবং তাদের সন্তানসন্ততিরা তাকে আক্রমণ করেনি কখনো। কিন্তু সেদিন ওই মোড়ের মাথা টিপে রোবার সময় যখন কুকুরগুলো একবার মুখ তুলেও তার দিকে তাকালো না, তখন পার্থ আন্দাজ করতে পারছিল কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যে। আর সে-সিদ্ধান্ত বদ্ধমূল হল, যখন দূর থেকে একটা তারই উচ্চতার লোক তার দিকে এগিয়ে এল ক্রমশ। ওই ফাঁকা রাস্তায়, সাধারণত কেউ উলটো দিক থেকে আসে না। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো বিষয়টি ছিল অন্য। লোকটিকে অবিকল তার মতোই দেখতে। আর তাকে দেখেই আবার তার বুকের মধ্যে ধুকপুকানি বেড়ে গেল পার্থর। এটা তো কোনো কাহিনি নয়, একেবারে একটি গল্প হয়ে যাচ্ছে। একটি অত্যন্ত খারাপ মাথামুণ্ডুহীন গল্প। কিন্তু ঘটনাটি ঘটছে। সেভাবে ভাবতে গেলে, আমাদের জীবনও একটা অত্যন্ত খারাপ মাথামুণ্ডুহীন গল্পের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা হয়তো সেইসব গল্পগুলিকে নানা রঙের নানা দৈর্ঘ্যের সুতোয় বেঁধে সেগুলিকে একটা যুক্তির রূপ দিই মাত্র। ভাবতে ভালোবাসি, যে জীবনের একটা কোনো মানে আছে। কিন্তু প্রকৃতির সে-দায় নেই। পার্থর মনে হল প্রথমে, এই দেখাটা সম্পূর্ণভাবেই আজগুবি। কিন্তু তার এই মনে হওয়া পালটে গেল তখন, যখন সেই লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, “এটা ঠিক করছ না পার্থ। তুমি মানুষ না, ক্রমশ একটা জন্তু হয়ে যাচ্ছ। আমি তো মাকে জন্তু হতে দেব না”।

পার্থ প্রাণপণে বোঝাতে চাইল একবার, যে সে জন্তু হতে চাইছে না। পরমুহূর্তেই তার মনে হল, এই ভুলটা সে করতে পারে না। সে ফিসফিস করে বলে উঠল— আমি জন্তু। তুমিও জন্তু। তুমি আমাকে ধ্বংস করছ। আর আমি তোমার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছি।

পার্থর কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই সে শুনতে পেল পাড়ার সমস্ত কুকুর একসঙ্গে চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসছে। পার্থর মতোই দেখতে কিন্তু পার্থ নয় লোকটিকে একযোগে কুকুরগুলো আক্রমণ করল। লোকটি পালাতে পালাতে গলিটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে হারিয়ে গেল। লোকটির সঙ্গে হারিয়ে গেল কুকুরগুলোও।

পরদিন সকালে রুমেলা চা দিতে দিতে পার্থকে বলল— কাল রাতে এ-পাড়ায় নাকি চোর এসেছিল। তবে এ-পাড়ার কুকুরগুলো বাঘের বাচ্চা। লোকটাকে ছাড়েনি।

“মানে?” পার্থর বুকের ধুকপুকানি আবার বেড়ে গেল।

“লোকটার টুঁটি ছিঁড়ে নিয়েছে। ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। পুলিশ শণাক্ত করেছে দাগী চোর।

“চোর?”

“হ্যাঁ”

“কী করে শণাক্ত করল? লোকটা তো ভালো লোকও হতে পারে। একটা আস্ত মানুষকে কুকুরগুলো ছিঁড়ে ফেলল?”

“তুমিও তো রাতে ফেরো। অবশ্য কুকুরগুলো চেনা মানুষকে কিছু করে না”।

“আমি মানুষ?”

“কেন? কী যে হয় তোমার!”

“তুমি নিশ্চিত আমি মানুষ? জন্তুনই?”

‘‘তুমি কি নিজেকে ভয় পাচ্ছ?”

প্রশ্নটা শুনে, একটু মনে মনে অস্বস্তিতেই পড়ে গেল পার্থ। আসলে, রুমেলার এই এক সমস্যা। যখন তখন এমন সব প্রশ্ন করে বসে, যেগুলি সে খুব ভেবেচিন্তে করছে বলে মনে হয় না, অথচ, হয়তো ভেবেচিন্তেই করে রুমেলা। কারণ, রুমেলাকে খুব একটা বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। রুমেলা যে-সব বোঝে, তার প্রমাণ রাখতে একটা বাক্যাংশই যথেষ্ট। কিন্তু ও বেশিক্ষণ একবাক্য নিয়ে পড়ে থাকে না। যেমন, জামাকাপড় গোছাতে গোছাতে রুমেলা প্রসঙ্গই পালটে ফেলে বলল, “দেওয়ালের গায়ে কেমন মানুষের মুখ ফুটে ওঠে, তাই না?”

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

হিন্দোল ভট্টাচার্যর গল্প

ভয়

‘তুমি কি নিজেকে ভয় পাচ্ছ?’

প্রশ্নটা শুনে, একটু মনে মনে অস্বস্তিতেই পড়ে গেল পার্থ। আসলে, রুমেলার এই এক সমস্যা। যখন তখন এমন সব প্রশ্ন করে বসে, যেগুলি সে খুব ভেবেচিন্তে করছে বলে মনে হয় না, অথচ, হয়তো ভেবেচিন্তেই করে রুমেলা। কারণ, রুমেলাকে খুব একটা বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। রুমেলা যে-সব বোঝে, তার প্রমাণ রাখতে একটা বাক্যাংশই যথেষ্ট। কিন্তু ও বেশিক্ষণ এক বাক্য নিয়ে পড়ে থাকে না। যেমন, জামাকাপড় গোছাতে গোছাতে রুমেলা প্রসঙ্গই পালটে ফেলে বলল, ‘দেওয়ালের গায়ে কেমন মানুষের মুখ ফুটে ওঠে, তাই না?’

পার্থ বলল, হুঁ। কিন্তু তার মনে রুমেলার কথাটি গুনগুন করছে। যেন এক চেপে রাখা আশ্চর্য দমকা বাতাস আবার হুহু করে উঠছে বুকের ভিতর।

‘তুমি কি নিজেকে ভয় পাচ্ছ’?

এই সত্যি কথাটা রুমেলার সামনে স্বীকার করার ক্ষমতা পার্থর নেই। বিকেলের আলোটা ক্রমশ মায়াবী হয়ে উঠেছে। এই সময়টা এমন হয়। আবাসনের পশ্চিম দিক এখনও খোলা। তাই অনেকটা আকাশ দেখা যায়। জীবনানন্দের পাখিদের দেখাও যায়। রুমেলা অবশ্য একদিন ভুল ভাঙিয়ে বলেছিল, ওরা বিকেলের ঘরে পেখা পাখি, জীবনানন্দ দেখেছিলেন।

পার্থ যে রুমেলাকে ভয় পায়, তার কারণ যে, রুমেলা পার্থর স্ত্রী তা নয়। বরং, তাদের দু-জনের মধ্যে একটা আশ্চর্য সম্পর্ক। আর সে-সম্পর্কের কথা রুমেলা জানে না। পার্থও জানত না। কিন্তু একদিন রাতে সব হিসেব পালটে গেল।

পার্থ যে কয়েকদিন ধরেই একটু ভয়ে ভয়ে আছে, এ-বিষয়ে সন্দেহ ছিল না তার নিজেরও। কিন্তু ঠিক কাকে ভয় পাচ্ছে, এ-বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ ছিল না। হতে পারে, তার কাগজের অফিসের সম্পূর্ণ পরিবেশ, আবার হতে পারে সেই চিফ রিপোর্টার। আবার এও হতে পারে, মাথার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো ঘনিয়ে আসা চাকরি চলে যাওয়ার ভয়।

অফিস থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউইয়ে চা খেতে বেরিয়েছিল পার্থ। ক্রসিং-এর জায়গাটায় গাড়ি সিগন্যাল পেলেই খুব জোরে চলতে শুরু করে দেয়। সেদিনও শুরু করে দিয়েছিল। চা-টা সবে এক সিপ দিয়েছে, আর শুনতে পেল একটা গাড়ির ব্রেক কষা আর একটা কুকুরের চিৎকার।

এমন একটা জায়গায় চায়ের দোকানটা, যেখান থেকে রক্তাক্ত সেই কুকুরটার দেহ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। একটা কুকুরই তো মারা গেল, বিশেষ কিছুই নয়। একটা সাধারণ রাস্তার নেড়ি কুত্তা। অল্প পাঁচ থেকে সাত মিনিটের জন্য থেমেছিল ট্র্যাফিক। কিন্তু তার বেশি কিছুতেই নয়। সাধারণ একটা রাস্তার নেড়িকুত্তার জন্য বেশিক্ষণ থেমে থাকা যায় না। কিন্তু পার্থর বুকের ভিতরে ভয়টা যেন আরও বেড়ে গেল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে ধরে রাখতে পারছিল না পার্থ। গরম চা চলকে গেল। আঙুলের উপরে গরম চা-টা পড়তেই আর ভাঁড়টা হাতে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না পার্থর পক্ষে।

পায়ের তলার মাটি সরে যেতে সাধারণত কেউই দেখেনি। কিন্তু পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়া একটা চেনা বাক্য হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে। পার্থ এটুকু বুঝেছিল সেদিন, পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে ক্রমশ। অথচ, কোনো কারণ ছিল না এই অহেতুক ভয়ের। কেউ তাকে শাসানি দেয়নি, কোনো টার্মিনাল লেটার আসেনি, বাড়ি ভাড়া দিতে হয় না, পরিবারের কারোর সামনে অপারেশন নেই, হাসপাতালে ভর্তি নয় কেউ, পরকীয়া ঘটেনি জীবনে, রুমেলাও বলেনি ডিভোর্সের কথা, যদিও তার এ-কথা বলে ওঠার অনেকগুলো যুক্তি থাকাটা খুব স্বাভাবিক। এ-সব কিছুই হয়নি।

কিন্তু পার্থর পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। বুকের ভিতরে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত ছটফটে অস্থির ভাব। এক শূন্যতা মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকে অধিকার করে নিয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত জানলাকে তার মনে হচ্ছে যে-কোনো সময়ে ভেঙে পড়ে যেতে পারে। যেন জল উঠে এসেছে বিপদসীমায় আর একটা গোটা শহর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে ঘাটে। কিন্তু এত সব রুমেলাকে বোঝানো সম্ভব নয়। রুমেলা আশাবাদের মতো করে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে উড়ে উড়ে বেড়ায়। কাজ না থাকলেও কোনো-না-কোনো কাজের মধ্যে ডুবে যায়। অথবা অকারণ তর্কের বিষয় খুঁজে বের করে। তা, সে মাছের বাজারদর হোক বা পরিবেশ দূষণ। রুমেলার এই চরম পজিটিভ এনার্জিও মাঝেমধ্যে সহ্য হয় না পার্থর। এক-একদিন ঘুমন্ত রুমেলার মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় লাগে। মনে হয়, এই কি সেই রুমেলা, নাকি বহু আগে সে পরিবর্তিত হয়ে গেছে?

এই কথা পরদিন রুমেলাকে জিজ্ঞেস করতেই রুমেলা বলেছিল, “আমরা কি কেউ কখনোই একইরকম থাকি? তুমিও কি আছ? আজকের তুমি কি কালকের তুমিই থাকবে? এক ঘণ্টা পরেও কি তুমি এক ঘণ্টা আগের মতো থাকবে?”

“আমি তার কথা বলিনি রুমেলা। আমি তোমাকে কি হারিয়ে ফেলছি?”

“এ তো একটা প্রেমের গল্প হয়ে গেল। দাম্পত্যে আস্তে আস্তে নেমে আসা শীত। মাল্যবান আর কারুবাসনা থেকে একটু বেরোলে হয় না? ইলিয়াসেও তো ঢুকতে পার একটু!”

“তোমার কি মনে হয় আমাদের জীবনটা একটা ফিকশন?”

“আবার একটাতে আটকে আছ পার্থ। একটা নয়, অনেকগুলো ফিকশন। যেমন, কোনো নদীই আসলে অনন্তকাল ধরে একা নয়, অনেক। নদী মরে যাচ্ছে, আবার জন্ম নিচ্ছে। আবার সে-নদী প্রবাহিতও হচ্ছে। অনেক, অনেক, অনেক।”

“আমাদের চরিত্রগুলো তো আলাদা”।

“আমাদের জন্ম মৃত্যু বেঁচে থাকা ভালোবাসা যৌনতা সবকিছুই আলাদা। অনুভূতিই আলাদা। ফলে ফিকশনও আলাদা।”

“একটা কোনো গল্প নয়?”

“মনে হয় না”

কিন্তু এই এতকিছুর সঙ্গে পার্থর ভয় পাওয়ার কোনো সম্পর্কই তৈরি হত না, যদি না, পার্থ বুঝতে পারত গোটা মানবসভ্যতাই রয়েছে আর কয়েক মাসের জন্য। বেশ কিছুকাল ধরেই সে বুঝতে পারছিল সমস্ত জন্তু জানোয়ার তার দিকে ঘৃণা আর তিক্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আবার কারো কারো চোখে রয়েছে এক অতিরিক্ত বিদ্রূপ। যেমন, যে কাকটা রোজ সকালে আসে বিস্কুট খেতে, সে আসার পর, পার্থ বিস্কুট দিল। কিন্তু কাকটা বিস্কুট মুখে তুলল না। বরং মুখ তুলে রাগত স্বরে কয়েকবার কা কা করে ডেকে চলে গেল। এমনকী কুকুরগুলিও এড়িয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হল। অফিস যাওয়ার পথে সমস্ত কাক বা শালিখ বা কুকুর বা বিড়াল তার দিকে তির্যকভাবে তাকাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল পার্থর। সে সেদিন এর কারণ বুঝতে পারছিল না। আর ঠিক তার পরেই কুকুরটার অমন দুর্ঘটনা। কুকুরটা মরে পড়েছিল, কিন্তু তার তির্যক দৃষ্টি ছিল তারই দিকে। রাস্তায় থেঁতলে যাওয়া কুকুরটার সেই মৃত অথচ অর্থবহ চোখের দৃষ্টি পার্থ সম্ভবত যতদিন বেঁচে থাকবে, মনে থাকবে। যদিও ভুলতে পারলেই ভালো লাগবে তার।

রুমেলা এত সব কিছুই জানে না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারে পার্থর মধ্যে একধরনের পরিবর্তন হয়েছে। কেমন যেন ফ্য্যাকাশে হয়ে গেছে পার্থ। এমনকী, পার্থর ভিতরে আর সেই স্পৃহা নেই, যে-স্পৃহা, তাকে একসময়ে বেশ উজ্জ্বল ছাত্র করে তুলেছিল। শুধু উজ্জ্বল ছাত্রই না, যে-কোনো বিষয়ে পথে নামতে যে একবিন্দু ভাবত না, কলেজস্ট্রিটের প্রায় প্রতিটি লিফলেটে যার অদৃশ্য কলম থেকে ঝরে পড়তে যুক্তি আর ভাবনার অনুচ্ছেদ, সেই পার্থ এখন কলমের দিকে ঘেঁষতে পারছে না। টেবিলের সামনে বসে কেমন যেন শব্দহীন একটা অস্তিত্ব হয়ে গেছে। সমস্ত আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে। এর আগে, রাতে, ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় কখনো ঘরের আলো জ্বালত না পার্থ। কিন্তু গত এক মাস ধরে ঘরের আলো জ্বেলে তারপর বাইরের আলো জ্বালছে পার্থ। পার্থ ঘুম থেকে উঠলে গোটা ফ্ল্যাটের আলো জ্বলে ওঠে। কাকে ভয় পাচ্ছে পার্থ? কেন ভয় পাচ্ছে?

“জানো, রুমেলা, পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্তত এই মানবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। এই ধ্বংসের পিছনে আছি আমরাই। আমার বারবার মনে হয় এই পৃথিবীটা আমাদের উপরে প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু কীভাবে তা জানি না। হয়তো পাখিরা আক্রমণ করবে। একদিন দেখব মাটি ফেটে সব সাপেরা শহরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথবা কুকুরেরা আর মানুষকে ভালোবাসছে না। সমস্ত জন্তুজানোয়ার-পাখিরা ব্যারিকেড করে দিয়েছে। ঘিরে ধরে আমাদের আক্রমণ করছে। ওরা কত সহজেই আত্মহত্যা স্কোয়াড গড়ে তুলতে পারে জানো না। কারণ ওরা মরতে ভয় পায় না। জাটিঙ্গা পাখিদের দেখনি? নিদেনপক্ষে পিঁপড়ের যখন পাখা গজায়, তখন?”

রুমেলাকে জড়িয়ে ধরে এক ছুটির গোধূলিতে বলেছিল পার্থ। রুমেলা বুঝতে পারছিল অবস্থা বেশ ভয়ংকর। পরিচিত ডাক্তার পরিতোষদাকে ফোন করাও হল। কিন্তু পার্থ গেল না।

“তুমি গেলে না কেন ডাক্তারের কাছে? বুঝতে পারছ না তোমার একধরনের অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজর্ডার তৈরি হয়ে গেছে?”

“ওহ্‌ রুমেলা, আমরা বড়ো বেশি অসুখ সম্পর্কে জেনে গেছি। কিন্তু আমরা নিজেরাই অসুখ নয় তো?”

পার্থ, এই ভাবে এবং এইভাবে ক্রমশ নিশ্চিত হয়ে পড়েছিল যে সে নিছক এক হত্যাকারী ছাড়া আর কিছু নয়। আর এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে। কারণ, তার মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির আর মানুষের প্রতি কোনো দয়ামায়া অবশিষ্ট নেই। থাকতে পারে না। এই কথা রুমেলাকে বারবার বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পার্থ বলাই ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ, রুমেলা স্থির করে নিয়েছিল এইসব কথায় আর সে পাত্তাই দেবে না। কথাগুলো যত সত্যই হোক না কেন, তা যদি ক্রমশ তার মনের ভিতরে গেঁড়ে বসে যায়, তাহলে তার পক্ষে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা মুশকিল।

ফলে, রুমেলা আর পাত্তা দিত না পার্থর এই সব কথাবার্তায়। পার্থও ক্রমশ একা হয়ে পড়তে শুরু করে নিজের ভিতরে ভিতরে। তার পক্ষে আর কারো সঙ্গে এইসব বিষয়ে আলোচনা করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ক্রমশ এবং ক্রমশ তার মনে হয় একটি আরশোলা মায় একটি পিঁপড়েও তাকে ঘৃণা করছে। শুধু তাকে নয়, গোটা মানবসমাজকেই ঘৃণা করছে। কিন্তু এক আশ্চর্য লজিক অনুসরণ করে তাকেই বেছে নিয়েছে ঘৃণা প্রকাশের জন্য।

— এইসব তুমি কী লিখেছ পার্থ? সম্পাদক করুণ এবং কিছুটা রাগী চোখে তাকিয়েছিলেন পার্থর দিকে।

সম্পাদক শ্রী তরুণ সামন্ত। তাদের কাগজের সাহিত্যবিভাগের একজন নামজাদা লোক। নিজে ভালো গদ্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার। মানে, একধরনের ফিল গুড ব্যাপার তাঁর লেখার মধ্যে কাজ করায়, তাঁর লেখা বেশ পপুলার। পার্থ যে-দু-চারটে গল্প লিখতে পেরেছে, তার কারণ তরুণবাবুর সাহচর্য। তিনি পার্থকে যথেচ্ছ প্রশ্রয় দিয়েছেন। অবশ্য এও শুনিয়ে বা বুঝিয়ে দিতে ছাড়েননি, যে এইসব পরীক্ষামূলক লেখালেখিরও একটা সীমা আছে। গল্প থেকে বেরোতেই পারো তুমি, কিন্তু কাহিনি থেকে বেরিয়ে গেলে চলবে না। ফের তোমাকে ঘুরে আসতে হবে গল্পের ভিতরেই। কারণ, পাঠক শেষ পর্যন্ত একটা নিটোল গল্প চায়।

শেষ পাতা

Categories
গল্প

বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প

দংশন

মৈনাক খুব আদর করে রুমির মাথায় হাত বোলাচ্ছিল, ঘেঁটে দিচ্ছিল এদিক ওদিক। এই চুল নষ্ট হয়ে যাবে, এটা করছ কি?

আমি ক-দিন ছুটি নিই রুমি? 

এই তো এতদিন ছুটি নিলে আমার অ্যাক্সিডেন্টের পরে? বেড়াতে যেতে চাও কোথাও?

না, না এমনিই, তুমি বড়ো একা থাকো সারাদিন।

একা কোথায়? এই যে বললাম কুমড়ো পটাশের সঙ্গে কীরকম ভাব হয়েছে আমার! বলতে বলতে থমকে গেল রুমি। মৈনাক, তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করোনি? ভাবছ ডিপ্রেশানে পাগল হয়ে যাচ্ছি? নিজের অজান্তেই গলা উঁচুতে চলে গেল, চিঁরে গেল উপরে উঠে। হাতের কাছে কিছু থাকলে ছুঁড়েই দিত বুঝি।

তেমন কিছু করল না রুমি, আবার বললও না শিঞ্জিনির কথা। এরকম ভারী নামের প্রাণীটি আসলে একটা ফড়িং। এত সুন্দর ফড়িং আগে কোনদিন দেখেনি রুমি। তুঁতে রঙের শরীরে কালো রঙ্গের ডানা, হয় না কি এমন? ঠিক মনে হয় তুঁতে পাড়ের কালো তাঁতের শাড়িতে কোনো সুন্দরী মেয়ে। ওর ডানা চালানোর ঝিনঝিন আওয়াজেই হয়তো শিঞ্জিনি নামটা টপ করে মাথায় এসে গেছিল। ফড়িংটা প্রথমে বুঝতেও পারেনি যে, এটা ওরই নাম। এর তো আবার গোল্লা দুটো চোখ ছাড়াও মাথার উপরে তিনটে। তবু যতদূর সম্ভব সব চোখকেই নিজের মায়ায় জড়ানোর চেষ্টায় রুমি ফিসফিস করে ডেকেছিল শিঞ্জিনি, শিঞ্জিনি! বারবার, অনেকবার। আঙুলের ডগায় একদানা চিনি রেখে লোভাতেও চেষ্টা করছিল। এখন রোজ আসে। তার যেমন ইচ্ছে হুকুমও তামিল করছে শিঞ্জিনি। হাতের তালু বাড়িয়ে দিলে সেখানেই বসে পড়ে। রুমির গালের কাছে ঘুরে ঘুরে তার ডানার গান শোনানোর চেষ্টা করে। তারপর রুমি যেই বলে, ব্যাস অনেক হয়েছে তখুনি আবার শান্ত হয়ে হাতের পাতায়। রুমি কি ওকে সত্যিই জাদু করেছে? না হলে আসে কেন রোজ সকাল হলেই? ফুলে ফুলে বসা ভুলে কিছুটা সময় কাটিয়ে যায় রুমির সঙ্গে!

এদের কথা মৈনাককে আর বলে না রুমি। এরা তার গোপন ঘর। না হলে মৈনাক সকালে কফি ঢালতে ঢালতে যখন জিজ্ঞেস করল আর কার কার সঙ্গে আলাপ হল তোমার রুমি? কোনো পাখি বন্ধু হয়নি?

শিঞ্জিনির কথা বলেনি রুমি, বলেনি কানাইয়ের কথাও। কানাই একটা কেন্নো, কিন্তু ছোটোবেলায় দেখা কেন্নোগুলোর থেকে একটু আলাদা। গায়ের রং গাঢ় বাদামি, পায়ের রং হলদে মতন। দুটো দাঁড়া আছে। একদিন টেবিলের গা বেয়ে উঠছিল। ছোটোবেলায় কেন্নো দেখলে গা ঘিনঘিন করত রুমির। একবার মা গল্প শুনিয়েছিল কার না কি কানের ফুটো দিয়ে কেন্নো ঢুকে গেছিল আর সেই কেন্নো মাথায় ঢুকে ঘর সংসার পেতেছিল। তারপর বহুদিন রুমি কানে আঙুল চাপা দিয়ে শুয়েছে, সুযোগ পেলেই জুতোর তলায় পিষে মেরেছে পথ চলতি কেন্নোকে। আজ কিন্তু নিজের ক্ষমতা যাচাই করার লোভ সামলাতে পারল না। হুইল চেয়ার থেকে ঝুঁকে নিজের মাথাটা ওর কাছে নিয়ে এসে ফিসফিস করেছিল, এই তুই কে রে? কেন্নোটা চলা থামিয়ে শুঁড় ঘুরিয়েছিল রুমির দিকে। দেখেই রুমির শরীরে এক খুশির ঝিলিক। বুঝতে পারছে! রুমির চোখের দৃষ্টি ছুরির ধার পেল যেন। একা থাকলে মাথার ভাবনারা সরাসরি চোখে পৌঁছে যায় অনায়াসে।

কেন্নো যে এমন করে পোষ মানবে ভাবলেই অবাক হয় রুমি। ওর প্রতিটা কথা বোঝে। আঙুল বাড়িয়ে দিলে সুড়সুড় করে হাতে উঠে আসে। আঙুলে করে চোখের সামনে তুলে আনে ওকে, আমাকে যেন আবার দাঁড়া বসিয়ে দিস না কানাই। নিজের মনেই হেসে খানখান হল রুমি।

বাইরে এসবের কোনো প্রকাশ নেই রুমির।

তুমি আজকাল এত কম কথা বলো, কেন রুমি?

মৈনাকের অস্থির কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করল রুমি। তোমার আর আমার জগৎ যে আলাদা হয়ে গেছে মৈনাক। আমাকে ছাড়িয়ে চলে গেছ তুমি। যেটা বলল না সেটা হল তুমি চলমান, আর আমি একটা হুইল চেয়ারে বন্দী। তোমার মহান হওয়া মানায়, লোক দেখানো বউ সোহাগ করে বাহবা পাবে। আমার জন্য শুধুই আহা উহু। এ-সব অবশ্য কিছুই বলল না রুমি, ভাবনাগুলো অনেক গভীরে টগবগ করে ফুটল শুধু।

আর ক-দিন রুমি, সেদিন ডাক্তার কী বললেন? তোমার পা সেরে এসেছে একদম। আর মাসখানেক হয়তো, তারপর তোমার প্রস্থেটিক পা লেগে গেলে তুমি আবার আগের মত—

আগের মতো কিছুই হবে না আর, রাত্রে শোবার সময় খুলে রেখেই তো শোব, তাই না?

নিজের অজান্তেই বাঁ-পাটাকে চেয়ারের আড়ালে লুকোনর চেষ্টা করে মৈনাক। আচ্ছা আমি কী করতে পারতাম বলো তো?

আমি কি কিছু বলেছি? তোমার যেমন লিয়ার সঙ্গে কফি শপে বসে গল্প করার করো না বসে। বারণ করেছি?

মানে?

ছন্দাদি আছে মৈনাকের অফিসে, সেদিন ফোন করে কথায় কথায় বলছিল, এই তো সেদিন মৈনাককে দেখলাম সাদা ছুঁড়িটার সঙ্গে কফি খাচ্ছে। ওইভাবেই কথা বলে ছন্দাদি সাদা ছুঁড়ি, কাল্লু ভাই, চিঙ্কি চামকি। আগে সবার সঙ্গে বসে এইরকম কথায় রুমির ঠোঁটে হাসি খেলত না, মনে মনে বিরক্ত হত। কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল বোধহয় এই খবরটা দেওয়ার জন্যই ছন্দাদি আরও ফোন করেছে। তাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, নামও জেনেছিল। লিয়া।

রুমির নৈঃশব্দ্যে আরও রেগে গেল মৈনাক। তুমি কি বাড়িতে বসে বসে এই সবই ভাবছ রুমি? অফিসে কতজনের সঙ্গে কথা বলতে হয়, আগেও বলেছি তো। অফিসের কাফেটারিয়াতেও এমনি অনেক মিটিং থাকে।

চাপা কথার কয়েক ফোঁটা পাথর ঠেলে ছিটকে বেরোল এবার। তোমার বুদ্ধদেবপনাগুলো লিয়া, ক্যাথি আর শর্মিলাদের জন্য তুলে রাখো। আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমার হুইল চেয়ারে বসে থাকার কপাল, থাকব। তাই বলে কৃষ্ণলীলা বন্ধ করতে বলিনি তোমায়।

মৈনাক রুমির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ওর বাঁ-হাত রুমির ডান হাঁটুতে, ডান হাত রুমির গালের উপর আলতো করে রাখল মৈনাক। আজকে অফিসের ধড়াচুড়ো চাপায়নি, হাফপ্যান্ট আর টি শার্টে এখনও। তাই ঘাসে প্যান্ট ভিজে যাওয়ার ভয় নেই। না হলে বসতে তুমি এমন করে? নিজের মনেই বলল রুমি। এরকম গা বাঁচানো আলগা আদর করা সহজ। যার হয়েছে শুধু সেই বোঝে। মৈনাকের আবেগ কিছুতেই উষ্ণ করতে পারছিল না রুমিকে। মৈনাকের সকাল বেলার উপচে পড়া ভালোবাসায় গা রিরি করে রুমির। কই রাত্রে শোবার সময় তো তাকে খুঁজতে আসে না মৈনাকের হাত, বরং সে এগোতে চাইলেও সরে যায়। বলে আরও ক-দিন যাক। আমার পায়ে ব্যথা লেগে যাওয়ার ভয় না হাতি! বোঝে না যেন রুমি। তার চেয়ে বলুক না কেন মুখে, এক পা না থাকা মেয়ের শরীর বিছানায় বিসদৃশ লাগে তার।

আমি কী করলে তুমি খুশি হও রুমি? যতদিন তুমি নিজের পা না পাচ্ছ, আমি বাড়ি থেকে কাজ করি?

হ্যাঁ, নিজের পা! এই উপহাসটা বুকের মধ্যে চেপে মুখে বলল, সে তো করবেই, না হলে আর আমার উপর নজর রাখা হবে কী করে?

মৈনাকের চোখ বিস্ময়ে স্তিমিত হয়ে গেল, একটু কি জলের ছোঁয়া? তাহলে তোমাকে আমি অফিসে পৌঁছে দিই, তুমি আবার অফিস শুরু করো।

আমি ঘণ্টা দুয়েকের বেশি বসে থাকতে পারি না মৈনাক, ক্লান্ত হয়ে পড়ি। না হলে বাড়ি থেকেই অফিস শুরু করতাম। মৈনাকের উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিল রুমি, বেশি তাকালেই ওর মনটা নরম হয়ে যাচ্ছিল। মৈনাক ওর মাথা গুঁজে দিয়েছে রুমির কোলের মধ্যে, ওর মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে ইচ্ছে করছিল। ওকে জড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করছিল, তুমি হয়তো সত্যিই ভালো মৈনাক, আমিই আর পারছি না। এই পৃথিবীটা ঘুরে বেরাচ্ছে, আর আমি স্থবির হয়ে আছি। ভালো লাগছে না আমার। কিন্তু এ-সব কিছুই না বলে চোখ সরিয়ে নিল রুমি। তখনই দেখল গুটি গুটি পায়ে কানাই আসছে। ঘাস সরিয়ে সরিয়ে টেবিলের পায়া অতিক্রম করে। একটু ঝুঁকে পড়ল রুমি, হাতের পাতা রাখল এবার মৈনাকের মাথায়। আদর বুঝে মৈনাক নিজের মাথাটাকে আরও গুঁজে দিল রুমির কোলের মধ্যে। কেমন অদ্ভূত একটা ঝিলিক এবার রুমির চোখে। ফিসফিস করে বলল, দে কানাই দে।

এমন বাধ্য ছেলে! দিল ঠিক দাঁড়াটা বসিয়ে মৈনাকের পায়ে।

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প

দংশন

বাগানের ঘাসগুলো এখনও ভেজা। ভোরের শিশির নয়, বাগানের মাঝে মাঝে রাখা স্প্রিনক্লারগুলো সকালের আলো ফোটার আগেই জল ছড়িয়েছে খুব। হোস্টাস, ব্লু বেল আর অ্যানিমোনের সদ্য ফোটা পাপড়িগুলোয় জল টলমল করছে। পেরিয়ে যেতে যেতে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে রুমির। বিশেষ করে অ্যানিমোনের ঝুঁকে পড়া গোলাপি পাপড়িতে। হয়তো সেই ইচ্ছেটা শরীরে সামান্য চাঞ্চল্য জাগায়, না থাকা পায়ের কড়ে আঙুলটা একটু ঝুঁকে পড়ে বাঁ-দিকে। মৈনাকের দেখতে পাওয়ার কথা না, তবু কী করে বুঝল কে জানে! মাথা ঝোঁকাল রুমির কানের কাছে, ফুল তুলে দেব তোমায় ক-টা?

মৈনাকের এই সময়ে বেরোনোর তাড়া থাকে। এরপর ইন্টারস্টেটে বড্ড ভিড়। অফিসের ব্যাজ বুকে, কাঁধে ল্যাপটপ ঝুলিয়ে এই সময় হন্তদন্ত হয়ে বেরোত মৈনাক। রুমির যাওয়া থাকত আরও এক ঘণ্টা বাদে। রুমি মৈনাকের গলায় সেই ব্যস্ততা চাইছিল। নিস্তরঙ্গ অবয়বের অভ্যন্তরে কুয়ো খুঁড়ে খুঁড়ে খোঁজার প্রচেষ্টায় সেটাই মনে করিয়ে দেয়, তোমার দেরি হয়ে যাবে না?

মৈনাকের গলা ব্রিয়সে বানের মতো নরম। হাসিটাও। সকালবেলা বাগানে বসে তোমার সঙ্গে কফি খাওয়াটা সারাদিনের জন্য টনিকের কাজ দেয়।

বাব্বা, কথায় কী মাখন! কই আগে তো বসতে না। রুমি জানে। রুমি বোঝে এত নরম কথা, এটা ভালোবাসার উষ্ণতা নয় কিছুতেই। দয়া। পবিত্র, শীতল।

বাগানের অনেকটা জুড়ে হিকরির ডালপালা ছড়ানো। তার ঠিক নীচেই লোহার টেবিল, দু-দিকে মুখোমুখি দুটো চেয়ার। অনেক সাধ করে রুমি কিনেছিল, কিন্তু এতদিন ব্যবহার হত না সেরকম। রুমির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মৈনাক হুইল চেয়ারটা টেবিলের অন্য দিকে লাগিয়ে দিল। টেবিলের উপর কফির পট, দুটো কাপ, দুধের পাত্র, একটা প্লেটে কফি কেক আর ব্লু বেরি স্কোন রেখে গেছিল আগেই। মৈনাক চেয়ার টেনে লম্বা দুই কাপে কফি ঢেলে রুমির কফিতে দুধ মেশায় মন দিয়ে। নিজের কফিতে দুধ খায় না কোনোদিনও।

রুমির কোলে টপ করে একটা বাদাম পড়ল। গাছের তলায় এই সময় অনেক বাদাম পড়ে। যদিও এগুলো বিটারনাট, তেতো। ওদের জন্য অখাদ্য। কিন্তু কাঠবেড়ালিদের আনাগোনা লেগেই থাকে। কফিতে প্রথম চুমুক দেওয়ার আগেই এক জোড়া কাঠবেড়ালি ছুট্টে চলে গেল মৈনাকের পায়ের তলা দিয়ে।

দেখো, তোমার কুমড়োপটাশ গুড মর্নিং বলতে চলে এসেছে সকাল সকাল।

এই কথাটা রুমিকে আর গোমড়া থাকতে দিল না। পরিচিতির তৃপ্তি মুখে ছড়িয়ে বলল, না, না এরা কুমড়োপটাশ না। কুমড়োর চোখটা লালচে, একেবারে অন্য রকম। ওরা আমাকে দেখলে পালায় না কক্ষনো।

ওরে ব্বাস, তুমি তো ওদের উপরে তোমার বশীকরণ মন্ত্র চালিয়েছ দেখছি। মৈনাকের গলা থেকে হাসি উঠে এল। দিন দিন ওরা আমার কম্পিটিটার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মানে? ভ্রূ কুঁচকে তাকাল রুমি।

হাসিটাকে তবু ধরে রেখে রুমির চোখে চোখ রাখল মৈনাক, আমি সব সময়েই জানি তোমার চোখে জাদু আছে। মনে নেই, মা বিয়ের পরে পরে মেজোমাসিকে বলেছিল আমার ছেলেটাকে কী মন্ত্র যে পড়িয়েছে, শুধু বউয়ের কথায় ওঠে বসে। তুমিই তো শুনতে পেয়ে আমাকে বললে। তখন সে কী রাগ তোমার।

আগেও মৈনাক এরকম কথা বলেছে আর ওরা দু-জনে সেই নিয়ে কত হাসাহাসি। এখন শুধুই রুমির বাঁ-পায়ের হাটুর নীচে চুলকানি পায়। কিন্তু চুলকানো কিংবা হাত বোলানোর কোন উপায় না থাকায় মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে ওঠে। কফিতে হালকা চুমুক দিতে দিতে মৈনাক চেয়ে থাকে, রুমির মুখের আলো ছায়ার কারণ জানতে পালটা প্রশ্ন করে না। বরং এই সময়ে ছুরি দিয়ে কফি কেক স্লাইস করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বেশি বেশি। রুমির মুখের রেখাগুলো একটা একটা করে মুছে গেলে এক খণ্ড কেক ধরে রুমির মুখের সামনে। অপেক্ষা করে থাকে রুমির পাতলা ঠোঁটের আড়াল পেরিয়ে মুক্তোদানা দাঁতের ফাঁক হওয়ার জন্য। রুমি মুখ যতসম্ভব চেপে মৈনাকের চোখে চোখ বিঁধিয়ে প্রশ্ন করল, আচ্ছা আমার একটা পা না হয় নেই, কিন্তু হাত তো আছে। নিজে খেতে পারি না?

কোনো কার্পণ্য না করেই হাসল মৈনাক। সেটা তো আমাকে খাওয়ানোর জন্যে।

আমাকে এত বেশি বেশি ভালোবাসছ কেন মৈনি? আমার বাঁ-পাটা কাটা গেছে বলে?

এই প্রশ্নটা তো প্রথম শুনল না। তাই কেক ধরা মৈনাকের হাত একটুও কাঁপল না। মৈনাক রুমির চোখ থেকে চোখ না সরিয়েও দৃষ্টিটা ছড়িয়ে দিল। রুমির চুলে জড়ানো দুলহীন কানের লতি, গলায় না বলা শব্দের ওঠানাবা, ঠেলে আসা কণ্ঠার হাড়, পেস্তা সবুজ ছোটো হাতা টি শার্ট যার বুক জোড়া অ্যান আরবার ম্যারাথন ২০১৮ লেখাটা কালো সাদা চেক ফ্লানেলের পাজামার নেতিয়ে পড়া বাঁ-পায়ের সঙ্গে অহেতুক কৌতুক জুড়েছে— এই সমস্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে মৈনাকের চোখ রুমির অন্তঃকরণে ঢুকতে চাইছিল। থেমে থেমে যখন বলল, আমি তোমাকে আনতে যেতে পারতাম, যাইনি। তাই দোষটা আমার ছিল বলে ভাবতেই পারো। কিন্তু ভালোবাসা ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কষে হয় না রুমি। কথাটায় গোপন কৃষ্ণ গহ্বরের আলগোছ টান। তাই তাড়াতাড়ি মুখের হাসিতে নতুন কথা মেশালো মৈনাক, তোমার বাঁ-পাটা সত্যি তো যায়নি, তুমি তো ওর নড়া চড়া বেশ টের পাও এখনও।

ডক্টর হিল তো বলে ফ্যান্টম লেগ। না থেকেও রয়ে গেছে। নতুন পা লাগানোর পরেও থাকবে কী না কে জানে! কবে লাগাবে ওরা?

রুমির প্রস্থেটিক্স লেগ তৈরি হয়ে গেছে, কিন্তু হাঁটুর তলাটা পুরোপুরি সেরে না ওঠা অবধি দেবে না। তিন মাস তো হয়ে গেল, দেখো আর ক-দিন। ডক্টর হিল তো ছ-মাসের কথা বলেছিল। বলতে বলতে মৈনাক উঠে দাঁড়িয়েছে। এবার ঝুঁকে পড়ে রুমির গালে হালকা চুমু এঁকে দিল। রোদ উঠে গেলে ঘরে চলে যেও কিন্তু। না হলে মুখ পুড়ে যাবে একদম।

হিকরির ছায়া অনেক দূর ছড়ায়। তাছাড়া রুমি হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছায়া খুঁজে নিতে পারে চাইলেই। কিন্তু মৈনাক গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অবধি টেবিলের পাশ থেকে একটুও নড়ে না রুমি। মৈনাকের গাড়ি এখন ছুটবে ইন্টারস্টেটের গতিময়তায়, মৈনাক দেখতে দেখতে সেঁধিয়ে যাবে একটা কর্মব্যস্ত দিনের পেটের ভিতর। রুমির দিন আস্তে আস্তে সরতে থাকবে রোদের সঙ্গে। রুমি হাতের স্কোনের বাকিটা ছুঁড়ে ফেলে দিল বাগানের ঘাসে। একটু বাদে গিয়ে তুলে গার্বেজ বিনে ফেলতে হবে আবার। নোংরা একদম সয় না রুমির।

ক-দিন আগে রুমিরও একটা ছোটার জীবন ছিল। মৈনাকের থেকেও বেশি। সেরকমই এক ব্যাস্ত দিনের শেষে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছিল। নতুন কিছু নয়, সপ্তাহে দুই একবার তাকে তো যেতেই হত। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই ইকোরস রোডে এমনভাবে অ্যাকসিডেন্টটা হল। তিন মাস হয়ে গেছে, তবু ভাবলেই ভয়ে ভিতর থেকে চেপে ধরে। বাগানের চেয়ারে বসেও সিঁটিয়ে যায় রুমি।

সেদিন একটু বেশিই টায়ার্ড ছিল, খুব সকালের ফ্লাইটে ফ্লোরিডা গেছিল। ফোনে মৈনাক বলল, আমি আসব তোমায় নিতে? মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল, তার হয় ওরকম মাইগ্রেনের থেকে। কিন্তু গাড়ি পারকিং-এ, সেটাই-বা কি করে হয় বলে রুমি না করে দিয়েছিল। মৈনাক যদি আর একটু জোর করত সেদিন! কেন করলে না মৈনাক?

এইসময় কাঠবেড়ালিটা আবার দৌড়ে এল। এবার কুমড়োটা। থমকে দাঁড়িয়ে লালচে চোখে জুলজুল করে চেয়ে আছে রুমির দিকে। রুমি হাতের কাছে বিটারনাট খুঁজে খুঁজে রাখে ওর জন্য, কে জানে তাকেই গাছ বলে ভাবছে কী না! গলার মধ্যে হাসল রুমি। হাত ঘষটে টেবিলের উপরে রাখা বিটারনাটগুলো থেকে দুটো তুলে নিল, চোখ সরাসরি কুমড়োর চোখে। কাঠবেড়ালির কি পলক পড়ে না? না কি রুমিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকে মৈনাকের মতো? এটা ভাবতেই নিস্তরঙ্গ সকালে দুষ্টুমি ছড়িয়ে পড়ল। আরও ঘন চোখে তাকাল কাঠবেড়ালিটার দিকে। কাঠবেড়ালির দুটো চোখ থাকে দু-দিকে, নিজের দৃষ্টিতে বেঁধে ওদের চাহনি ঠিক কপালের মাঝখানে আনার চেষ্টা করল রুমি। তারপর দুই হাতের বিটারনাট কুমড়োর দুই দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চোখের ইশারা করল ডান দিকে। কী আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে কুমড়ো মাথা ঘুরিয়ে ছুটল ডান দিকে!

ও কি সত্যিই ওর ইশারা বুঝতে পারল? সেকি কাঠবেড়ালি ট্রেন করতে পারছে? পারুক না পারুক সকালবেলার স্নিগ্ধতা বেড়ে গেল নিঃসন্দেহে। এই কথাটা রসিয়ে রসিয়ে বলেছিল মৈনাককে সন্ধ্যাবেলায়। ও হাসতে হাসতে বলল, বলেছিলাম না তোমার চোখে জাদু আছে। তুমি বাঁ-দিকে ছুঁড়ে ডান দিকে যেতে বললেও যেত ঠিক।

ধ্যাৎ, তাই আবার হয় না কি?

মুখে বললেও পরের দিন সকালে কথাটা বিনবিনিয়ে উঠল রুমির মাথায়। দেখি না কি হয় ভাব নিয়েই আজকে কুমড়োর জন্যে একটা বিটারনাট হাতে নিয়েছিল রুমি, চোখের ইশাড়ায় বাঁ-দিক দেখিয়ে ডান দিকে গড়িয়ে দিয়েছিল এবার। রুমির শরীরে একটা আনন্দের স্রোত কুলকুল করে বয়ে গেল যখন বোকা কাঠবেড়ালিটা ছুট্টে চলে গেল বাঁ-দিকে। কিছুক্ষণ বাদে লেজ তুলে ফিরে এল। ওর চাহনিতে তখন কেমন বোকা বোকা ভাব, যেন বলছে ঠকালে কেন? ওকে তখন কোলে তুলে গুচুম গুচুম করতে ইচ্ছে করছিল রুমির।

সত্যিই কি তার চোখ? না কি মনের থেকে কোনো তরঙ্গ সিঁধিয়ে যাচ্ছে কাঠেবেড়ালির মাথায়। কুমড়ো কি তার মনের কথা বুঝতে পারে? এইসব ভাবতে ভাবতে ডেকেই ফেলল একবার। প্রথমে আস্তে, ফিসফিস করে, তারপর জোরে। কুমড়ো কুমড়ো! ও যখন সত্যি লেজ তুলে দৌড়ে এল খুশির থেকেও অবাক হল বেশি। ওকে তো আগে কখনো ডাকেনি, ওর এই নাম নিয়ে মৈনাকের সঙ্গে আলোচনা করেছে শুধু। তাহলে ও রুমির কথা বুঝতে পারে? ওর লালচে চোখে চোখ রেখে বলল এবার, কোলে আয় কুমড়ো। রুমির ডান হাতের পাতা বাড়ানো ছিল ডান হাটুর উপরে। তার উপর ভিজে পায়ের ছাপ ফেলে এক লাফে কোলে চলে এল রুমির। কী নরম হয় ওদের শরীর, ঘন রোমের মধ্যে হাত চালাতে চালাতে বিস্ময়ে জেরবার হচ্ছিল রুমি। একটা কাঠবেড়ালি তার কথা বুঝতে পারছে? সেটা কি শুধু কুমড়ো বলে, ওর কোনো বিশেষ ক্ষমতা আছে? না কি সে-ক্ষমতা আসলে রুমির? যে-কোনো কাঠবেড়ালিই কি বুঝতে পারবে তার কথা? মনে হতেই এবার গলা ছেড়ে ডাক দিল পটাশ, পটাশ! পটাশ এমনিতে লাজুক, এমন কিছু গা ঘেঁষাঘেঁষি করে না কুমড়োর মতো। কিন্তু রুমিকে অবাক করে দিয়ে ছুটে এল পটাশও। দুই কাঠবেড়ালি কোলে নিয়ে কী বকবক করছিল রুমি সে কি নিজেই জানে?

শেষ পাতা

Categories
গল্প

কুলদা রায়ের গল্প

লক্ষ্মী দিঘা পক্ষী দিঘা

গোলরুটির চেয়ে গোলারুটিই বেশি মজার। বড়ো মামী এ ব্যাপারে ফার্স্টক্লাস। নানারকমের গোলারুটি বানাতে তার জুড়ি নেই। আটা গুলে তার মধ্যে পিঁয়াজ কুচি দিয়ে পিয়াজ রুটি। কাঁচা মরিচ দিয়ে মরিচ রুটি। আর কালো জিরা দিলে বেশ টোস্ট টোস্ট ভাব আসে।

আজিমার পছন্দ শুকনো মরিচ। এটা ছোটোদের জন্য একেবারে নো। তাদের জন্য গুড়ের ঢেলা। না পেলে ছেঁচকি শাক। কখনো পুঁই রুটি। পুঁইশাক কেটে গোলা রুটির মধ্যে ছেড়ে দেবেন। ভাপে সিদ্দ হবে। তার বর্ণ দেখে দেখে, ‌ওগো মা, আঁখি না ফেরে।

এ-বাড়ির পুরোনো আদ্যিকালের কড়াইটার একটা হাতল নাই। ৯ মাস পুকুরে চোবানো ছিল। সারা দিনমান পুকুরে ডুবে ডুবে খুঁজে বের করে এনেছিল নিমুইমামা। আজিমা পেয়ে মহাখুশি। বলেছিল, পলানোর সুমায় হাতলডাও ছেলো। দেখ, খুঁইজা পাস কি না। আবার ডুব দে মন কালী বলে।

মামা ডুবে ডুবে পিতলের ঘণ্টা পেয়েছিল। আজিমা মুখ ব্যাজার করে বলেছিলেন, এইটা দিয়া কী করুম।

— ক্যান পূজা করব। ঘণ্টা বাজাইয়া আরতি দিবা।

— পূজা তো হারা জীবন ভইরাই করছি। তবুও তো সব হারাইছি। ভিটা ছাড়ছি। বাপকাগারা বেঘোরে মরছে। পূজা কইরা লাভ কী রে বাপ। হাতলডা খোঁজ।

হাতলডা খুঁজে পাওয়া যায়নি। হাতল ছাড়াই এই কড়াইতে বড়ো মামী সুন্দর করে গোলারুটি ভাজতে পারে। ছেঁচকি শাক রানতে পারে। ভাতউয়া টাকির ঝোল বেশ তেড়মেড়ে হয়। সুযোগ হলে ফস ফস করে ফ্যান ত্যালানিও করা যায়। আর কী চাই। শুধু কড়াইটা ধরতে হবে একটু সাবধানে। সাবধানের মাইর নাই। নিমুই মামা বলে, সময় আইলে আরেকটা নতুন কড়াই কেনা হবে।

মামী ফিস ফিস করে বলে, ওগো সুমায়, তুমি সত্যি সত্যি আসিও। হ্যালা কইরো না বাপ।

আজামশাইর কিছু বাহ্যে সমস্যা আসে। তার জন্য গোলারুটির বদলে রান্না হয় নোঠানি। আটার ভাত। সঙ্গে থানকুনির ঝোল। শিংমাছ দিতে পারলে বেশ হয়।

আজা মশাই পেঁপে গাছটার নীচে বসে নোঠানি খেতে খেতে দেখতে পেলেন, আগামি ঋতু এলে মাঠে মাঠে ধান ফলবে। আর তরী বেয়ে রবীন্দ্রমশাই বেড়াতে আসবেন। ঘাটে এসে ঝরঝরে গলায় বলবেন, দুটো ফেনা ফেনা ভাত রাঁধতে বলো তো হে। মেলা দিন পরে জুত করে খেতে চাই।

খেয়ে দেয়ে তিনি গগন হরকরার খোঁজে বের হবেন। তার ইচ্ছে আজামশাই আজ তার সঙ্গে থাকুক। কিন্তু আজা মশায়ের মনটা আজ খারাপ। রবীন্দ্রমশাইকে তিনি বেশ মানেন। কিন্তু মাত্র পাঁচটি ছেলেমেয়ে। তিনটি আগেভাগে মরে গেছে। বউটাও নাই। চৌদ্দটি হলে আরেকজন রবীন্দ্রকে পাওয়া যেত। সেটা সম্ভব হল না। আজা মশাই অবশ্য নিজে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বারো-তে তাকে থেমে যেতে হয়েছে। আজ হাহাকার জাগে।

রবীন্দ্রমশাই রিনরিনে গলায় বলবেন, চিন্তা কোরো না বনিকবাবু। কেউ না কেউ পারবে। অপেক্ষা করতে হবে।

এই বলে কবিমশাই নাও ছেড়ে দেবেন। দাঁড় টানবেন। রাশি রাশি ধান তার নাও ভরা। ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোটো সে-তরী। একটু কাত হলেই জলের মধ্যে ভুস। এর মধ্যে আজামশাই চেঁচিয়ে বলছেন, সাবধানে যাইয়েন গো মশাই।

ধান কই। সব শুকনো খড়। বন্যায় সব শেষ। খড় ডুবলে ক্ষতি কী!

নৌকা ততক্ষণে আড়াল হয়ে হয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রমশাই শুনতে পেলেন কি পেলেন না বোঝা গেল না। শুধু দূর থেকে ভেসে এলো— আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। আসতে আসতে গানটি আবার বহু দূরেই ভেসে যাচ্ছে। এরপর খুব চুপ। কয়েকটা দাঁড় টানার শব্দ শুধু। ছপ। ছঅপ। ছঅঅপ।

এইবার আজা মশাইয়ের ডাক পড়েছে। আজিমার জন্য গন্ধ ভাদুল তুলতে যেতে হবে। দুপুরে ভাতউয়া টাকির সঙ্গে রান্না হবে। টাকি বঁড়শিতে ধরা পড়েছে। বড়মামী দুটো রসুন কোঁয়া খুঁজতে লেগেছে। সঙ্গে ধানী লঙ্কা। রসুন কোথায়? ঘরের চালের আড়ায়। আড়াটি দরমার বেড়ার। তার উপরে পুরোনো রসুন শুকিয়ে কড়কড়া। কবেকার বলা মুশকিল।

ততক্ষণে উত্তরপাড়ার সালাম মামা এসেছে। বরইতলা থেকে ঊঠোনে আসতে আসতে সামান্য হেঁকে বলছে, নিমুই, বাড়ি আছিস?

নিমুই মামা বাড়ি নেই। তালতলা গেছে। পথে জাঙ্গালিয়া যাবে। শেখ বাড়ি ঘুরে আসবে। তালতলায় ফেলা পাগলার থানে পৌঁছাবে।

সালাম মামার কাঁধে ধামা। আজা মশায়ের পেছন দিয়ে পা টিপে টিপে রান্নাঘরে এসেছে। কাঁধ থেকে ধামাটি রেখেছে। আজিমা চল্লায় ধানী লঙ্কা খুঁজছে। মামী রসুনের আশায় ঘরের মধ্যে আড়ার নীচে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে একটা টিকটিকির কঙ্কাল পায়ের কাছে ঝরে পড়েছে।

চুলার পাশে হাতল ভাঙা কড়াই। সেখানে একটা গোলারুটি ঢাকা দেওয়া। নিমুই মামা এলে খাবে। ঢেঁকির উপরে চোখ বুজে আছে তিলকি বিড়াল। ধামা দেখে বলল, মিঁয়াও।

এই বাড়িটির উঠোন পশ্চিমে নীচু হয়ে নেমেছে পুকুরে। সেখানে রোদ্দুর থিকথিক করছে। তারপর শূন্য মাঠ। দূরে জাঙ্গালিয়া গাঁও দেখা যায়। মেঘের পরে তালতলা। সেখানে নিমুই মামা গেছে।

সালাম মামা ঢাকনা তুলে এক টুকরো গোলারুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়েছে। মুখটা ভরে গেছে। এ-স্বাদের বাক্য নাই। আরেক টুকরো খাবে কি খাবে না ভাবতে ভাবতে দেখতে পেল, বড়ো মামী ঘর থেকে রান্নাঘরে এসে পড়েছে। সালাম মামাকে কড়াইয়ের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে বলল, খাও না সালাম দাদা, খাইয়া নেও।

— কার জন্যি রাখছিলা গো বড়ো ভাবী?

— নিমুই— নিমুইর জন্যি।

বড়ো মামীর খিদে পেয়েছে। তার কপালে ফোঁটা নেই। পেটের মধ্যে কে একজন গোটা গোটা উসক করছে। বলছে খিদে, খিদে খিদে। তবু রুটির টুকরোটি সালাম মামার হাতে গুঁজে দেয়। বলে, খাও।

সালাম মামা গোলারুটি খেতে খেতে বলে, তুমার হাতে অমেত্ত আছে। শিখলা কোথায়?

— ইন্ডিয়ায়। রিফুজি ক্যাম্পে। ৯ মাস ছিলাম।

— ও। সালাম মামা গোলারুটি চিবোয়। এক মাথা ঘুরিয়ে পেঁপে গাছটার দিকে আড়চোখে তাকায়। তারপর বলে, ও, ইন্ডিয়ায়। আমিও গেছিলাম। বছর তিন আগে।

আলগোছে হাঁটুর নীচু হাত রাখে। হাঁটুতে একটা গুলির দাগ আছে। মাঝে মাঝে টাটায়। শেখ বাড়ির বড়ো শেখই প্রথম দেখেছিল। রক্ত ঝরছে। সালাম মামা গুলি করতে ব্যস্ত। ব্যথা ট্যাথা টের পাচ্ছে না। নিমুই কাঁধে নিয়ে না ছুটলে সব শেষ হত। এর মধ্যে শকুন উড়ে এসেছিল। বুকটা শিউরে ওঠে। সালাম মামা আস্তে করে বলে, ফেলা পাগলা কী কয়?

— কিছু কয় না।

— এই অভাব কি যাবে?

— শুধু আশমান পানে চায়। মুখে বাক্যি নাই।

শুনে সালাম মামা দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে। রান্নাঘরের পিছনে বেড়াটা ভেঙে পড়েছে। উত্তরে নালাখালায় নলবন দেখা যায়। শুকনো পাকা। খটখটে। পটপট করে শব্দ হয়।

ধামাটি মামীর কাছে ঠেলে দিতে দিতে বলে, আম্মায় দিছে। লক্ষ্মী দিঘার পয়া চাল। আর নাই। কইছে, বিনার পোলা আইছে মামাবাড়ি। হ্যারে কি খালি গোলারুটি দেওন যায়? একটা কুড়হা হলে ভালো হত। কুড়হা আছেও। উমে বসেছে। এখন ক-দিন কুক কুক করে না। ক-দিন পরে বাচ্চা ফুটবে। এখন কুড়হা দেওন যায় না।

মামীর চোখ ভিজে আসে। পেটের মধ্যে কচি কুড়হা নড়েচড়ে। মাথাটি ঘুরিয়ে মাটির হাড়ির সন্ধান করে। মেলা দিন পরে দিঘা ধানের ভাত রান্না হবে। ভাতউয়া টাকির সালুন হবে। রসুন হলে স্বাদে গন্ধে হবে অমেত্ত। আড়ার উপরে রসুন। রোদে কড়কড়া। গন্ধে পোকা পলায়— পিশাচ দৌড়ায়। খাম বেয়ে কেউ না কেউ পেড়ে দেবে।

সালাম মামা তখন উঠে পড়েছে। বটবাড়ি যেতে হবে। সেখানে একটা লঙ্গরখানা খোলার আলাপ আছে। বড়ো মামীকে জিজ্ঞেস করল, বাপের বাড়ির খবর পাইছ কিছু?

— সেখানে শকুন নামছে। গেল সপ্তায় শুনতি পাইছি।

— চিন্তা কইরো না ভাবি। ফেলা পাগল বাক্যি দেবেন। শকুন তো শকুন— শকুনের বাপেও খাড়াতি পারবি না। চইল্যা যাবেআনে।

সালাম মামা পশ্চিম দিকে পুকুর পাড়ের দিকে নেমে যাচ্ছে। আজা মশাই ততক্ষণে গন্ধ ভাদুলের কথা কিছুটা ভুলে গেছেন। কিছুটা ঝিমুনিতে পড়েছেন। মাথার উপরে পেঁপে গাছে ফুল নাই। ক-টা দড়ি দড়ি পেঁপে ঝুলে আছে।

এ-সময় ঝিমের মধ্যে আজা মশাই মাথাটা নীচু রেখেই বলে উঠেছেন, সালাম আইছিস?

সালাম মামা পুকুর পাড় পার হয়ে যাচ্ছে। পেছন ফেরার ইচ্ছে নেই। যেতে যেতে বলছে, আমি আসি নাই। আসি নাই।

আজা মশাই আরও আরও গভীর ঝিমের মধ্যে ডুবে যান। ডুবে যেতে যেতে বলেন, কবে আসবি রে বাপ?

— জানি না। জানি না।

আজা মশাই ঝিমের মধ্যে গড়িয়ে পড়তে পড়তে পড়ে যান না। দু-হাঁটুর মধ্যে মাথাটা গুঁজে দেন। কানদুটো হাঁটুতে চেপে ধরেছেন। গলা থেকে ঘড়ঘড় শব্দ বের হচ্ছে গলা থেকে। রোদ্দুর এইবার মাথার উপরে উঠে যায়। আকাশটা খনখনে করে ওঠে।

এই ছন্ন ভাবটা পেঁপে গাছটার পছন্দ নয়। শ্মশান শ্মশান লাগে। ফিস ফিস করে বলে, মাস্টার মশাই ঘুমাইলেন নি কি?

আজা মশাই হাউশী ছাড়েন। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মন খারাপ। দুটো ফেনা ভাত হলে রবীন্দ্র মশাইকে নেমতন্ন করা যেত। কবি মানুষ। কোনোদিন খেতে চান না। আজ চেয়েছিলেন। আজা মশাই হাঁটুর মধ্যে মাথা রেখেই উত্তর দেন— না, ঘুমাই নাই। ঘুমাই কী কইরা?

চারদিকে বিল। মাঝখানে এই বাড়িটা। খাঁ খাঁ করে। পেঁপে গাছ বলে, কিছু কথা কই আপনের লগে?

— আজা মশাই, মাথা নাড়ে। বলেন, কইয়া কইয়া তো জীবন গেল। কইয়া লাভ কী?

আজা মশাই বিড় বিড় করেন। পেঁপে গাছের গা শির শির করে। ফির ফির করে জানতে চায়—

এই গেরামে আপনেরা আইলেন কুন সুমায়?

— চার পুরুষ আগে।

— হ্যার আগে আছিলেন কোথায়?

— ভুষণায়। নদ্যা জেলায়। রানি ভবানীর কালে।

— সেখান থিকা আইলেন ক্যান?

— শকুন নামছেল।

— শকুন কী করে?

— মরা ধরা খায়।

— তারপর কী করে?

— আসমানে ওড়ে।

— আশমানে যাইয়া কি করে?

— আবার নাইমা আসে। মাঠে ঘাটে বাড়িতে নাইমা আসে।

— তারপর কী হয়?

— আমরা পলাই।

— পলান ক্যান?

— পলান ছাড়া এই জীবনে আর কুনো উপায় আছে রে বাপ?

এইটুকু শুনে পেঁপে গাছটার পাতা নড়া থেমে যায়। দড়ি দড়ি পেঁপেগুলো সামান্য কাঁপে। কাঁপতে থাকে। ঘরের আড়ায় রসুন শুকোচ্ছে। আরেকটা টিকটিকি গড়িয়ে পড়ে। গন্ধ ভাসে। আজা মশাই এইবার আর কোনো কথা বলেন না। মুখটা হাঁ। হাঁ-এর মধ্যে অন্ধকার। বহু পুরোনো। এই অন্ধকারের কটু কটু ঘ্রাণ আছে।

এই ঘ্রাণ লক্ষ্মী দিঘা ধানের। মাটির হাড়িতে ফেনা ভাতের মধ্যে এই ঘ্রাণ পটর পটর করে। পটর পটর থেকে টগবগ হয়ে যায়। শোনা যায়।

এইবার পাড়া জুড়াবে। রসুন শুকোচ্ছে।

Categories
চিঠি

অরুণেশ ঘোষের লেখা অপ্রকাশিত চিঠি

একটি কবিতার বই, কিছু চিঠি ও অম্লমধুর তথ্য

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

একটা মজার ঠিকানা— হাওয়ার গাড়ি, ঘুঘুমারি, কোচবিহার। মাত্র ৩৫ বছর আগে, ১৯৮৫ সালে গেছিলাম এক কবির সাথে দেখা করতে। কোচবিহারের উপকণ্ঠে তাঁর বাড়িতে যাবার সুযোগ ঘটেনি, কারণ কবির ইচ্ছায় মিলনক্ষেত্র স্থির হয়েছিল শহরের বড়ো বাজার পেরিয়ে যতদূর মনে পড়ে কলাবাগান এলাকায়— যেখানে শহরের দগদগে ঘা সীমান্তে এঁকে দাঁড়িয়ে থাকত যৌনদাসীরা। প্রথম আলাপেই বন্ধু শান্তিনাথ আর আমি মন্ত্রমুগ্ধ কবির আন্তরিকতায়। পক্ষান্তরে কবিও হয়তো!

আলাপ আবর্তিত হয়েছিল গভীর সম্পর্কে। কবির নিজস্ব কোনো ফোন ছিল না, শুধু রবিবাসরীয় বিকেলে কোচবিহারে তার এক বন্ধুর ল্যান্ডলাইনে কল করার অনুমতি ছিল মাত্র। আমারও কোনো ফোন ছিল না, আমাকে পাবলিক বুথ থেকে এস. টি. ডি কল করতে হত প্রায় রবিবারেই— শুধু মাত্র আড্ডা-আলোচনার তাগিদে।

সালটা ১৯৮৮। সিদ্ধান্ত নিলাম অরুণেশদা’র কবিতার বই বের করব, অরুণেশদা— আমাদের প্রিয় কবি অরুণেশ ঘোষ— যাঁর ছিল হাংরি জেনারেশন যোগ, সেই অরুণেশদার বই। অরুণেশদার কাছে প্রস্তাব রাখলাম, উনি গ্রহণ করলেন, পাঠিয়ে দিলেন ২২/২৪ টি কবিতার পাণ্ডুলিপি— যার থেকে সুনির্বাচিত ১৬টি কবিতা সাজিয়ে এক ফর্মার (তখন খুব চল ছিল) কবিতার বই প্রকাশের জন্য। ১২/১০/১৯৮৮-তে পোস্টকার্ডে লেখা চিঠিতে তিনি জানালেন— “…হ্যাঁ, ১ফর্মার বই বের করুন কিন্তু আমার দিক থেকে এ মুহূর্তে আর্থিক সাহায্য অসম্ভব।” আবার একটি চিঠিতে (৩/১/১৯৮৯) লিখলেন— “আমার উচিত, আপনাকে কিছু টাকা পাঠানো কারণ বই ও পত্রিকা বের করতে আপনার ওপর খুবই চাপ পড়বে।”

জানুয়ারি, ১৯৮৯— পুনরুত্থান কর্তৃক প্রকাশিত হল অরুণেশ ঘোষ এর ১ফর্মার কবিতার বই “সহজ সন্তান যারা”। অরুণেশদার মৌখিক নির্দেশ মেনে সাদামাটা কভারে/ যতদূর সম্ভব নির্ভুল এবং স্বাভাবিকের থেকে বেশি কপিই ছাপানো হয়েছিল। কবির আশা ছিল যেহেতু দীর্ঘ ব্যবধানে তার বই প্রকাশ হবে তাই তুড়িতে ৫০০ কপিও শেষ হয়ে যাবে। অরুণেশের এটি তৃতীয় কবিতার বই। তখনো অরুণেশকে নিয়ে ঠিক সেইভাবে আলোচনা শুরু হয়নি। তাঁর দীর্ঘ আলাপ, স্মৃতিচারণ, চিঠিপত্র এইসব থেকে যে সারাৎসার পাওয়া গেছিল তার ভিত্তিতে বন্ধু শান্তিনাথ একটি বড়োসড়ো ব্লার্ব লেখেন। ১/৫/১৯৮৯ তারিখে লেখা অরুণেশদার চিঠির কয়েকটি লাইন প্রণিধানযোগ্য— “বুঝতে পারছি, প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েছেন। একসঙ্গে এতোগুলো বই বের করা ঠিক হয়নি আপনার। আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন, কিন্তু ভেঙ্গে পড়লে চলবে কি?”

একটু বলতেই হচ্ছে যে, প্রতিমাসে একটি বিষয়ভিত্তিক পত্রিকা (ক্ষীণতম হলেও) প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট অর্থ-সময়-শ্রম ব্যয় করতে হত। তবু তারই মধ্যে সম্ভবত কোনো মফস্‌সল শহরে প্রথম একটা সমান্তরাল প্রকাশনীও শুরু করেছিলাম। উল্লেখ জরুরি যে, আমাদের পাঠকদের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে আমরা ব্যয়িত অর্থের সমানুপাতিক দাম নির্ধারণ করতাম এবং এর মধ্যে ‘লাভ’ নামক অর্থকে অনর্থ ঘটাতে দিতাম না। আমাদের সামর্থ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে আমরা মুদ্রিত সংখ্যা ৩০০ কপির বেশি রাখতাম না। এবং লেখকদের কাছ থেকেও কোনো আর্থিক সহায়তা আমরা পেতাম না।

‘পুনরুত্থান’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অরুণেশদার বইটি ছাড়াও শান্তিনাথ এর ‘গণতন্ত্র ও শিল্পভাষা’, গল্প সংকলন ‘বোকা বুড়োদের গপ্পো’ (অরুণেশদারও একটি গল্প ছিল), তপন ভট্টাচার্যের কবিতার বই ‘অগ্নিকীট’। ১৯৮৯ এর বইমেলা বেরিয়েছিল ১০টি পকেটবই— লেখক মণ্ডলীতে ছিলেন প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী (প্রবন্ধ), নিখিল বিশ্বাস (রেখাচিত্র), ফল্গু বসু (কবিতা), শান্তিনাথ (গল্প), গৌতম চট্টোপাধ্যায় (প্রবন্ধ) প্রমুখ।

এইটুকু ইতিহাস বলতেই হল কারণ একেবারে বিজ্ঞাপনহীন, মুনাফা বিরোধী, স্বল্প মূল্যের, মাসিক, বিষয়ভিত্তিক একটি ব্যতিক্রমী লিটল ম্যাগাজিন পুনরুত্থান ও তার প্রকাশনাগুলি প্রকাশ করতে গিয়ে আমিও ঋণে জর্জরিত হয়েছিলাম। অরুণেশদা আশাবাদী ছিলেন যে তাঁর বই প্রচুর বিক্রি হবে, তিনি প্রথমবারে ১০০ কপি বই বিক্রি করে দেবার জন্যে নিয়ে গেলেও হঠাৎ কেন জানি না সব যোগাযোগ হারিয়ে গেলেন। আমি নিয়মিত ডাকমাশুল ব্যয় করে নতুন সংখ্যা/চিঠি পাঠিয়েছি, কিন্তু উত্তর আসেনি। তার বই অবিক্রীত থেকে গেছে, আমার সংগ্রহের শোভা বেড়েছে, কিন্তু বিক্রি হয়নি। মাত্র দুই টাকা মূল্যের বইটি জোর করেই পাঠক/অপাঠক নির্বিশেষে বিনামূল্যে গছিয়ে দিয়েও অব্যাহতি পাইনি।

ইতিমধ্যে ১৯৯১ সালের মে মাসে ‘পুনরুত্থান’ পত্রিকার ‘ক্ষুধার্ত প্রজন্ম’ সংখ্যা বেরোয় যেখানে জনৈক সুশোভন বসুর লেখা একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ ছিল— “অরুণেশ, জাঁ জেনে, হাংরি”। হাইবার্নেশন কাটিয়ে উঠে অরুণেশদা ১২/৭/১৯৯১-এ একটি ইনল্যাণ্ড লেটার কার্ডে  বড়োসড়ো চিঠি লিখে জানালেন— “নাকি একসময় আমার একটি চিঠি যাচ্ছেতাই পদ্যপুস্তিকা গাঁটের পয়সায় বের করেছিলেন বলে, এই তিরস্কার/” চিঠি শেষ করলেন এই শুভেচ্ছা জ্ঞাপনে— “হে আমার লাল-লালাভ-গাঢ় রক্তবর্ণ নাগরবৃন্দ আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। হাজার বছরেও যেন আমাদের বোধোদয় না হয়। ধ্বংসের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যেন আপনাদের ভণ্ডামির জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে”।

আমি স্তম্ভিত। আমার অন্তর্গত “লাল-লালাভ…” (ক্রোধ সংবরণ করে বুঝেছিলাম নীরবতার সুশ্রুষা অন্যরকম। মাত্র তিনমাসের আমার নীরবতা (তবে পত্রিকা পাঠিয়ে গেছি)। ১৪/১০/১৯৯১-এ লেখা একটা পোস্টকার্ড পেলাম, যেখানে অরুণেশদা লিখলেন— “প্রিয় গৌতম, দীর্ঘদিন আগে একটি প্রায় ক্রুদ্ধ চিঠিতে আমার যে অবস্থার (রাস্তার গণিকা) বর্ণনা করে দিতাম।”… “আমার কথা মতন আপনাকে মুদ্রণ ব্যাপারে কিছু অর্থ দিতে পারলে আমার দিক থেকে স্বস্তি হত। আপনারও কষ্ট লাঘব হত”।

‘অর্থ অনর্থের মূল’ তত্ত্বের আরেক প্রতিভাস দেখেছি এই ঘটনায়। চেয়েছিলাম অরুণেশদার বইটা বেরক, আর উনি চেয়েছিলেন মুদ্রাব্যায়ের একটি অংশের অংশীদার হতে। কিন্তু যেহেতু তিনি আর্থিক অংশগ্রহণে অপারগ হচ্ছিলেন সেহেতু বারবার তিনি মর্মবেদনায় বিদ্ধ হয়েছিল। ফলে তিনি সম্ভবত নিরামিষ কাব্যলোচনাকেও ভেবে নিয়েছিলেন সেটি তাঁকে বিদ্ধকরার মধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছিল/ তবু মধুর কথাটা এই যে, শেষ পর্যন্ত তিনি অম্ল-পত্রটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন! শুধু আমি জানি তিনি ‘সহজ সন্তান যারা’ বইটির পিতৃত্ব অস্বীকার করেছিলেন! তা হোক, আমরা এখনো হাংরি জেনারেশনের অনন্য উজ্জ্বল প্রতিনিধি হিসেবেই অরুণেশ ঘোষকে চিনি।

অরুণেশ ঘোষের লেখা অপ্রকাশিত চিঠি:

১২/১০/৮৮

প্রিয় গৌতম,

আপনার চিঠি পেয়েছি, পত্রিকা এখনও পাইনি। হ্যাঁ, ১ ফর্মার বই বের করুন কিন্তু আমার দিক থেকে এ মুহূর্তে অর্থিক সাহায্য অসম্ভব। খুবই বাজে অবস্থায় কাটছে। আপনাকে কবিতা পাঠিয়ে দেব আরও কিছু, বেছে নেবেন। আলোচনা ইত্যাদি যা করার আপনারাই করবেন। শান্তির গদ্যের বইও এবারের বইমেলাতেই বের করে দিন। এখন আর যাওয়া হচ্ছে না, বইমেলার সময়েই কলকাতা ও রানাঘাট যাবো। গদ্য অবশ্যই পাঠাবো।

ভালোবাসা
অরুণেশ
১২/১০/০৮

♦♦♦

০৩/০১/৮৯

প্রিয় গৌতম,

মনে হচ্ছে, জয় ঠিকই বলেছেন, ওই নামটি, ‘সহজ সন্তান যারা’-ই রাখুন। আপনার কবিতা নির্বাচন যথাযথ হয়েছে। ‘পুরাণ’ পর্য্যায়ের আরও কিছু লেখা খাতার পাতায় আছে, হয়ত কিছু লেখাও হবে, সেসব আপনাকে পরে পাঠাবো, ‘পুরাণ সিরিজ’ সম্পর্কে পরে ভাবা যাবে। আমার উচিত আপনাকে কিছু টাকা পাঠানো কারণ বই ও পত্রিকা বের করতে আপনার ওপর খুবই চাপ পড়বে। চেষ্টাও করছি কিন্তু কোনমতেই জোটানো যাচ্ছে না। পরে আমি আপনাকে যা পারি পাঠাতে চেষ্টা করবো। হয়ত ২৬/২৭ জানুয়ারী কলকাতা যাবো। রানাঘাট যাওয়ার অনেক দিনের ইচ্ছে এবং একবার জয়ের সঙ্গে মুখোমুখি হবার। সেটা এবারও হবে কিনা বুঝতে পারছি না। বইমেলায় কি আপনাদের ষ্টল হচ্ছে? না হলেও যাবেন, ওখানেই আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। পরে ওখান থেকে চেষ্টা করবো আপনাদের সঙ্গে রানাঘাট যাবার। কলকাতায় আমি যে ঠিকানায় থাকবো, সেটা আগে ভাগেই জানিয়ে রাখছি: — Arun Basu, Flat- c/2, Rental. 30E Ramkrishna Samadhi Rd. Cal-54 (কাঁকুরগাছির সরকারী ফ্ল্যাট)। গল্পটা সম্পর্কে যা ভাল মনে হয় করবেন। শান্তি কেমন আছেন?

ভালোবাসা
অরুণেশ

♦♦♦

২৮/০২/৮৯

গৌতম,

আমাকে আরও ১০ কপি বই পাঠানো যায় কিনা দেখো। যে বই এনেছিলাম তা প্রায় রাস্তায় শেষ হয়ে গেছে। এখানে বইমেলায় দু-এক কপি রেখেছিলাম বিক্রি হয়ে গেছে। এমন কি তোমাদের সাদা বাড়ী, শক্তির বই সব স্টলের ছেলেরা এসে নিয়ে গেছে। আমি পড়েও উঠতে পারিনি।

বই বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় পাঠিয়ে দেবে। আলোচনার জন্য, না হওয়াটাই স্বাভাবিক তবু পাঠাবে। আর পাতিরামে কিছু বই রাখতে পারো। আমার শব ও সন্ন্যাসী, গুহা মানুষ পাতিরাম থেকে ভালই বিক্তি হয়েছে।

ভালোবাসা
অরুণেশ
২৮/২

♦♦♦

০১/০৫/৮৯

গৌতম,

বুঝতে পারছি, প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো বই বের করা ঠিক হয়নি আপনার। আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে কি? লেখা-লেখির যে পথটা নিয়েছেন, সে পথে সারা জীবন ধরে দিয়েই যেতে হবে। এর বিপরীতে আছে প্রতিষ্ঠানের দাস হওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো। তাদের কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করা, সে পথে তো যাননি। গত ২৫ বছর আমি এই অসম যুদ্ধ চালিয়ে এসেছি, আজ আমি ও আমার স্ত্রী দুজনেই হাসপাতালে। প্রচণ্ড অসুস্থ। কিন্তু বিন্দুমাত্র হতাশ নই। কারন এক এক করে সমস্ত ক্রীতদাসকে প্রতিষ্ঠানের গহ্বরে ঢুকতে দেখেছি ও মিলিয়ে যেতে দেখেছি। আমি এই সময়কে জানি, আমি আমার আত্মায়, সত্তায় এই সময়ের নির্যাসটুকু তুলে নিতে পেরেছি। আমার দেবার আছে, নেওয়ার কিছু নেই। আমি আমার নিয়তি আগে থেকে জানি, কেন হতাশ হবো? আপনিও নিজেকে জানুন।

ভালবাসা
অরুণেশ

♦♦♦

১২/০৭/৯১

সবিনয় নিবেদন,

ছিঃ। আমার লেখা পদ্য ও গদ্য আবার আলোচ্য বিষয় হতে পারে! যে পুরষ্কার যোগ্য নয়, সে নিশ্চয়ই তিরস্কার যোগ্য— এ অনুমানে কি আপনারা আমাকে তিরস্কার করেছেন? নাকি একসময় আমার একটি চটি যাচ্ছেতাই পদ্য পুস্তিকা গাঁটের পয়সায় বের করেছিলেন বলে, এই তিরস্কার!— হ্যাঁ, সে অধিকার তো আপনাদের আছেই। ছোট মালিকও মালিক তো বটে! না জানি বড় বড় প্রতিষ্ঠানভুক্ত কবি শিল্পীদের কত না বকা খেতে হয়।

আগে ভাবতাম বড় বড় কাগজের কাছে বিক্রি হওয়া লেখক কবিরাই বুঝি বেশ্যা। আর বাইরে যারা তারা সৎ ও স্বাধীন। এখন দেখছি তা নয়। ওরা হল অভিজাত মাগী— দালাল বাড়িওলী আর প্রেমিক(!) পরিবেষ্টিত; এরা রাস্তার। যেমন আমি। রাস্তার গণিকা। তা রাস্তার বেশ্যা যদি সাততলার পয়সাওয়ালা মাগীর ছলা কলা এট্টু আধটু ধার করে— তাতে দোষ দেবেন না আমার ইয়ে, আদর্শবাদী নাগর! হাজার হোক আমরা মেয়েছেলে তো!

ওদের খদ্দের নাকি বুরজোয়া। আমাদের খদ্দের লাল-টুপী জিন্‌স্‌-জোব্বা ফ্রেঞ্চকাট। রাস্তার মালকে সস্তায়, সস্তায় কেন বিনে পয়সায় পাওয়া যায় বলে এরা বিপ্লবী, আহ্‌— আদর্শবাদী তা সেদিন এক অভিজাত মাগীর সঙ্গে পথে দেখা। কি লো কেমন আছিস, সে বলল, তোর কত সুখ, বাড়িওয়ালা নেই দালাল নেই কারুর তোয়াক্কা নেই— কত স্বাধীন তুই… যে খদ্দের খুশী…

আমি বললাম, স্বাধীন না কচু। তোর নাগর শুধু তোর রক্ত মাসেই খুশী। আত্মা কি করে মুঠোয় পুরতে হয় জানে না। আমার নাগরেরা রক্তমাখা তো শুষে নেয়ই সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়ায় আমার লুকিয়ে রাখা সর্বস্ব, আমার শেষ অবলম্বন আত্মার দিকে। দানবিক শক্তিতে পেষণ করতে করতে, বলে সে। আরে দূর আত্মা ফাত্মা বলে আবার কিছু আছে নাকি!

তফাৎ শুধু এইটুকু!

হে আমার লাল-লালাভ-গাঢ় রক্তবর্ণ নাগরবৃন্দ আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। হাজার বছরেও যেন আপনাদের বোধোদয় না হয়। ধ্বংসের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যেন আপনাদের ভণ্ডামির জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে।

বিনীত
অরুণেশ ঘোষ
১২/৭

♦♦♦

১৪/১০/৯১

প্রিয় গৌতম,

দীর্ঘদিন আগে একটি প্রায় ক্রুদ্ধ চিঠিতে আমার যে অবস্থার (রাস্তার গণিকা) বর্ণনা করেছিলাম। পৃথিবীর তাবৎ সৃষ্টিশীল ও প্রতিভাবান ব্যক্তির অবস্থা সত্যি তাই। চিঠিটি আপনি গভীর অর্থেই নেবেন আশা করছি। আমার কথামতন আপনাকে মুদ্রণ ব্যাপারে কিছু অর্থ দিতে পারলে আমার দিক থেকে স্বস্তি হোত। আপনারও কষ্ট লাগব হোত। যদি, এখন সম্ভব হচ্ছে না, আমার আর্থিক অবস্থা জঘন্য। তবে একবছর পরে হলেও আমি আপনাকে যতটা পারি দিতে চেষ্টা করবো। না, আমার পক্ষে সংগঠনমুখী হওয়া সম্ভব নয়। না না কারনেই। আমি লিখে যাচ্ছি— লিখতে পারছি— আমার লেখা ভালবেসে আমাকে যদি কেউ ভালবাসে— সেটাই বড় পুরষ্কার। অন্য কিছু নয়। পুনরুত্থান ২৩ পেরিছি। শংকর গুহ নিয়োগীকে নিয়ে আপনাদের উদ্যোগ শুভ। কিন্তু এই অশুভ ও ধ্বংস প্রবন সময়ের সঙ্গে শিল্প দিয়েই মোকাবিলা করা যায় গৌতম, আর কোন সংগঠন, রাজনীতি ও মহৎ আশা দিয়ে নয়। শিল্পই মানুষকে বাঁচাবে। যদি তার বাঁচার ইচ্ছে থাকে।

ভালবাসা জানবেন
চিঠি দেবেন। অরুণেশ

Categories
কবিতা

পল্লব ভট্টাচার্যের কবিতা

শাস্ত্র অনুযায়ী, সমস্ত ক্রিয়া কর্মের আগে ও পরে
হাত ধুয়ে নিতে হয়; যাতে
কৃতকর্মের কোনো দাগ না লেগে থাকে।

আমি হাত ধুয়ে নিয়েছি।

হাতের মাধ্যমে কিছু ত্রাণ মাত্র পৌঁছে যায় দাতা থেকে গ্রহীতার কাছে।
হাত যে কিছুই নয়, দাতা বা গ্রহীতা, একথা না জানা হলে,
আত্মপ্রচারের মূর্খ অহংকারে ভাঁড় হয়— বাঁচা।

তুলসীদাসজী থেকে একথা শেখার পর, লজ্জ্বায় নুয়ে আসে মাথা।

‘আমি নই, হত্যাকারী এ হাত ইন্দ্রের’— বলে পুরাণকথার সেই ব্রাহ্মণও
আমার মতোই স্বস্তি পেতে চেয়েছিল। অথচ, ‘এ পুষ্পিত উদ্যান
কার যে নির্মান!’ —বলে দাঁড়াতেই, সে যখন বলেছে, — ‘আমার’—

তখন ইন্দ্র মানে, আমিত্ব, অহং; তাকে নিতে হয় সৃষ্টি ও ধ্বংসের ভার।

‘পবিত্র বা অপবিত্র যে অবস্থাতেই হোক, তাঁকে যে স্মরণ করে,
সে-ই শুচি, অন্তরে বাহিরে।’ —এই উচ্চারণ শেষে, বিশাল বিস্তারে
এসে দাঁড়িয়েছে শুচি-শুদ্ধ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ।

তবু অবিশ্বাস টিপে ধরে আমাদেরই গলা ।

শ্রীমদ্ভাগবতে লেখা, ক্ষুধা ও প্রয়োজন অনুসারে
খাদ্য পাওয়ার অধিকার দেহীমাত্রেরই রয়েছে।
এর বেশি যে অধিকার করে, সে দন্ডযোগ্য।

দন্ডদাতার মূর্তি আমারা বানিয়ে নিয়েছি অপাণিপাদ।

Categories
কবিতা

বিপ্লব চৌধুরীর কবিতা

শকুন্তলা

একটা কৃষ্ণসার হরিণের দিকে যখন তাক করেছি আমার জার্মান মাউজার, ঠিক তখনই একটা গাছের আড়াল থেকে আমি দেখতে পাই তোমাকে। প্রথমে আমার নয়নে আসে তোমার বক্ষসৌন্দর্য, এবং অতঃপর মুখচন্দ্রিমায় মুগ্ধ হয়ে যাই। তখন অবাক হয়ে দেখি, যে হরিণটিকে হত্যা করব বলে আমি ভাবছিলাম, তুমি তাকে ধরে আদর করছো। সে তোমার সঙ্গে যেন কথা বলছে কোনো এক বনজ ভাষায়। আমি কিছু বুঝতে পারি না। তুমি সেই ভাষা বোঝো, ভালোবাসা দিয়ে।

বন্দুক মাটিতে ফেলে, তীর ও ধনুক পরিত্যাগ করে, আমি গিয়ে দাঁড়াই তোমার মুখোমুখি। দেহ থেকে চন্দনের, চুলের খোঁপা থেকে ফুলের সুবাস সুবাতাসে ভাসে। তোমার আশ্চর্য চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আজ থেকে আর শিকার আমার কাজ নয়। শুধু চাই, তোমার নরম বুকে আমার কঠিন হাড় ক্রমে মিশে যাক। আমাদের ঘিরে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে। তুমি আমার, আমি তোমার হাত ছুঁয়ে থাকি।

রাত ভোর হয়ে যায়। প্রেমের প্রেরণায়।

সেই আমি

গাছের ভিতরে গাছ হয়ে যাই যদি! তুমি কি তখনও চিনতে পারবে? মাছের ভিতরে যদি মাছ হয়ে যাই, কাঁটা বেছে বেছে খেয়ে ফেলবে নাতো! নদীর ঢেউ অথবা ভূপৃষ্ঠের মাটি, কোথায় আশ্রয় নেব ভাবছি এখন। আর তাই সমগ্র সত্তা-জুড়ে বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে সাড়া-জাগানো সব সংশয়। মনে হয়, একটা রূপান্তরের পথ বেয়ে হেঁটে চলেছি কোনো তেপান্তরের দিকে। সেখানে গিয়ে আমি পাব একটা সবুজ ফুসফুস। ডানা পাব দুটো। পাখি হব গভীর বনের। উড়ে এসে যখন বসব বাগানের গাছে, তুমি কি তখন চিনতে পারবে! শুনতে চাইবে বহুবার চেনা-শোনা কোনো প্রিয়তম গান?

নির্বিষ

তুমি বাজাবে বীণ। আমি সেই তালে তালে নাচাব আমার ফণা। গোবর-লেপা বাঁশের ঝাঁপিতে চেপে, তোমার কাঁধে কাঁধে ঘুরে বেড়াব মেলার পর মেলা— হাটের পরে হাট— কত কত শহর আর শত শত গ্রাম। আমার দৈনিক খেলা তোমার মুখে তুলে দেবে প্রতিদিনের ভাত-রুটি-মদ। বউয়ের জন্য শাড়ি, ছোটো ছেলেটির জন্য পিতলের ঘুনসি কিনে আনবে তুমি। আমৃত্যু আমি থেকে যাব তোমার সহায়।
সেই কবে বটের কোটর থেকে তুমি বন্দি করেছো আমাকে। এতদিন পরে তোমার সংশয়ী মন বলছে আমাকে, সেই প্রতিশোধ-স্পৃহা থেকে যদি কখনো তোমাকে ছোঁবল মারি আমি! ও জীবন-সাপুড়ে, কেন এসব অর্থহীন কথা আজ উঠছে বলো তো? প্রথম দিনেই তো তুমি ভেঙে দিয়েছো আমার বিষ-দাঁত।

চোখ

আছে, তাই দেখি। ওই তো শিমুলগাছ রঙে রঙে লাল। মাটিতে ফুল-সহ পড়ে আছে পলাশের ডাল। তোমার সুন্দর বিরাট দিঘি। ফুটে উঠলো গোলাপি শালুক। বিকশিত হতে দেখি ভোর থেকে রাত। ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। বড়ন্তীর ড্যামে বাবার সঙ্গে ঘুরতে আসা সেই ছোট্ট মেয়েটির ফুটফুটে মুখ। জঙ্গলের অন্দরমহলে জীর্ণ এক টেরাকোটার মন্দির। মাটি ফুঁড়ে, সরলবর্গীয় গতি নিয়ে জেগেছে পর্বত। তার শৃঙ্গের ওপর নীল নীল নীলাকাশ। নাম-না-জানা পাখিরা সব উড়ে যায় অজানার দিকে।

Categories
প্রবন্ধ

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

কলকাতা শ্রমতালুক

বাংলার কুটিরশিল্পের সমৃদ্ধি ও বৈভবের সাক্ষ্য হিসাবে বারবারা ও টমাস মেটকাফ-এর লেখা ‘এ কন্সাইজ হিস্ট্রি অফ মর্ডান ইন্ডিয়া’ বইটির একটি উচ্চারণ পেশ করব। মেটকাফ-দ্বয় মন্তব্য করেন যে, গাঙ্গেয় উপত্যকার এই অঞ্চলটি থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ৭৫ ভাগ পণ্য সংগৃহীত হত সে-সময়ে। তৎকালীন বাংলার অর্থনৈতিক হাল সম্বন্ধে মেটকাফ-এর অভিমত হল— ‘Bengal’s wealth was thus at once made to appear nearly boundless, and made familiar by evoking Italy’s canal-laced ‘mistress of the seas’. it is not by accident that the figure representing Calcutta in The East Offering its Riches is placed at the centre of painting with the richest gift… From such images came an enduring picture of India for the British’— সুতরাং, অনস্বীকার্য যে, দেশীয় বাণিজ্যের আকার নেহাতই বিশাল মাপের ছিল, যে-কারণে শুধুমাত্র ইংরেজ নয়, পর্তুগিজ-ডাচ-ফরাসি-তুর্কি-দিনেমার-চীনা-আর্মেনি ইত্যাদি-প্রভৃতিরাও হাজির হয়েছিলেন কিপলিঙয়ের chaotic ও মুরহাউসের marshland of Bengal-এ।

শুরুতেই জানিয়েছি যে, জন্মলগ্ন থেকেই কলকাতা একটি রপ্তানি-ভিত্তিক শহর। এ এমন এক শহর, জেন জেকবের ধারণার নিখুঁত প্রতিলিপির মতন যা— ‘create their own dynamic regions, and absorbs into new jobs the rural workers made redundant by improvements into agricultural productivity’. অ্যাডাম স্মিথের থেকে খানিক ভিন্নমত পোষণ করে প্রখ্যাত মার্কিনী শহর বিশেষজ্ঞ জেন তাঁর ‘সিটিজ অ্যান্ড ওয়েলথ অব নেশনস’ বইতে লিখেছেন— ‘increases in wealth of nations arise mainly from the expansion of import-replacing cities: cities in which people repeatedly create their own superior versions of goods… and then begin to export those superior goods (such import-replacing cities) we see the five great forces “unleashed”: markets, jobs, transplanted industry, technology and capital.’— প্রিয় পাঠক, আদি কলকাতা কি এই উদ্ধৃতির পাশে একেবারেই বেমানান? (জেকবের উদ্ধৃতিটি পেয়েছি চার্লস টিলির ‘গিলগামেশ’ প্রবন্ধের সূত্রে)। নগর কলকাতার ‘ডাইনামিক রিজিওন’ বা বিশাল হিন্টারল্যান্ড নিশ্চিতই কোনো কল্পকাহিনি নয়। রপ্তানি বাড়লে ধনবৃদ্ধি হয়— এ তো অর্থনীতির গোড়ার কথা। সুরাট, মসলিপত্তনম, সপ্তগ্রাম-কলকাতা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। শ্রমের বাজারও যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি বর্ধিত মুনাফার কারণে মূলধনের বৃদ্ধি ঘটে, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিবিদ্যার বিস্তার ঘটে। জেন বলছেন ‘রিপিটেডলি ক্রিয়েট’ বা বিরামহীন উৎপাদন— যে-নিরবচ্ছিন্নতার জন্যই ১৭৫২-র হলওয়েলীয় কলকাতায় চার লাখ নয় হাজার মানুষ! সারা বিশ্বের কোন উঠতি-উদ্যমী-উন্নতিকামী এবং (মোর ইম্পর্টানটলি,) সদ্যজন্মলব্ধ কোন জনপদে, ১৭৫০-এর উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে, এমন প্রাণসম্পদে ভরপুর জীবনজিজ্ঞাসা ছিল বা এ যুগেও আছে বা রয়েছে? খোদ লন্ডনেই ছিল কি? মিল ছিল না, মেশিনও না। এম.জে. টৌমের ‘এমপ্লয়মেন্ট ইন নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল’ বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কেম্ব্রিজ অধ্যাপক তীর্থঙ্কর রায় লিখেছেন—‘আঠারো শতকের শেষে ভারত ৫০ মিলিয়ন গজ বস্ত্র রপ্তানি করত। ভারত জুড়ে ১৮০০ থেকে ২০০০ মিলিয়ন গজ কাপড় তৈরি হত।’ সে-সময়ের বস্ত্র রপ্তানিকারক প্রধান অঞ্চলগুলো ছিল পাঞ্জাব-করোমণ্ডল-গুজরাট-বাংলা। এই প্রয়াসের জন্য জরুরি ছিল সচল মানি-মার্কেট। সেই প্রয়জন মেটাতে বাংলায় সক্রিয় ছিল হুন্ডি-চিরকুট কিংবা সেদিনের অর্থজগতে প্রবেশের ভিসা, ক্রেডিট-কার্ড বিলিকারী মাণিকচাঁদ, উমিচাঁদ নামধারী জগতশেঠ কোম্পানি।

১৫৩০-এ হুগলি-সপ্তগ্রামে পর্তুগিজদের পৌঁছে যাওয়া ছিল এক শ্রমসৃজনকারী অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। রাতারাতি তারা সেখানে আসার সিদ্ধান্ত নেয়নি। টলেমির ‘গঙ্গারিডি’, অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ-সমতট-হরিকেলার যাপনচিত্রটি, বস্তুত, বহু শতাব্দী পুরোনো। বসত ছিল, বাণিজ্য ছিল। রোম-পারস্য-মালাক্কা-পূর্ব এশীয় অঞ্চল। সেই বাণিজ্য পরম্পরার সূত্র ধরেই পর্তুগিজরা এ-দেশে আসে। কৃষিশস্য-বস্ত্রপণ্যের জগতে বাংলার বহুকালের পরিচিতি। ১৬৩০-এ জলদস্যুতা, রাহাজানি, লুটমার প্রভৃতি অনর্থনৈতিক কাজকর্মের স্বাভাবিক বিক্রিয়ায় তারা বিতাড়িত হয়। তাদের শূন্যস্থান দখল করে নেয় স্থানীয় মুঘল শাসকবৃন্দ আর অন্যান্য ইওরোপীয় বণিকদল, যাদের মধ্যে ব্রিটিশরাও ছিল। বাংলার সুবাদার সুজা, মীরজুমলা, শায়েস্তা খাঁ, ঢাকা আর কটকের নবাব, ওড়িশার দেওয়ানের পাশাপাশি হুগলির হাবিলদারও জড়িত ছিলেন।

এই প্রবন্ধে বারংবার উচ্চারিত সন-তারিখের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়টি হল ১৭৬০, ১৭৫০, ১৮৪০। তারিখগুলোর ভিতরেই কিছু কাহিনি লুকিয়ে রয়েছে। ১৭৬০: ইংলন্ডে শিল্পবিপ্লবের শুরু। বাংলায় একশো দশ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছে ব্রিটিশবাহিনী। কাকতালীয় মনে হবে কি যদি উল্লেখ রাখি যে, কাপড়ের কল দিয়েই ইংলন্ডে শিল্পবিপ্লবের শুভ মহরৎ হয়েছিল। আর সেই একই কালখণ্ডে ভারতে অবশিল্পায়নের ঘূর্ণিব্যাতাও হাজির হতে শুরু করে। ১৮৩৫: লর্ড বেন্টিঙ্ক ভারত-প্রশাসক। ইংলন্ডের সুতো-ব্যবসায়ীদের স্বার্থে তিনি কটন- আইন প্রণয়ন করেন। বিপদের মুখে পড়ে ভারতের সুতো-ব্যবসায়ী, চাষিরা। আর ১৭৫০: ভারত একাই পৃথিবীর ২৫ ভাগ পণ্য উৎপাদনকারী। কাপড় উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রটি ছিল বাংলায়।

আর ঠিক এর উলটো অবস্থাটাই হল ডি-ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালাইজেশন বা অবশিল্পায়ন। সেই সূত্রে রপ্তানিহীনতা, বাজার হারানো, কাজ খোয়ানো অগুনতি মানুষের চাপ। (পরিকল্পিত) দৈন্য-দুর্দশায় ধ্বস্ত হয় নফরসমাজ। পরিকল্পনাহীন যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা মধ্যয়ুগীয় ঘরবাড়ি, আটচালা, ঘরেলু কারখানার ঢের। চওড়া জলীয় হাইওয়ের ধারে বিশাল বাজার, কুটির লাগোয়া গোয়াল-ধানক্ষেত। ভোরের চাষি, সাঁঝবেলার তাঁতি। ব্রিটিশবণিকের দ্বিতীয় আবেদন— সেইসূত্রে
কলকাতার লাগোয়া ৩৮-টি গ্রামও দখলে নেওয়ার দাবিপত্র পেশ। কেন ওই সকল ৩৮-টি গ্রাম? কেন-না, ওখানেই ছিল কুটিরশিল্পের আদত ঠিকানা। সি আর সাহেব তো আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছেন যে— সন ১৭০৪-এ কলকাতার লোকবল যেখানে ১৫০০০, শহরতলিতে তখনই দ্বিগুণ, ৩০০০০। তাহলে কি এই আবেদনও পরিকল্পিত যোজনা ছিল? ছলা-কলা-কৌশলহীন সাদামাটা খামখেয়াল অথবা নেহাতই ঘর গোছানোর ব্যাপারস্যাপার ছিল কি? প্রচুর শস্য জন্মাত। সত্য। কিন্তু স্রেফ উদরপূর্তি-তে মন দিলে ‘কলকাতা’-র সৃষ্টি হত? কবি কৃষ্ণরামদাস লিখেছিলেন, চার্ণক আসার একযুগ আগে— ‘অতি পুণ্যময় ধাম/সরকার সপ্তগ্রাম/ কলিকাতা পরগনা তায়/ধরণী নাহিক তুল/জাহ্নবীর পূর্বকূল/নিমিতা নামেতে গ্রাম যায়।’ পরগনা কলকাতার প্রশংসায় কবি পঞ্চমুখ। সেক্ষেত্রে, কবি কৃষ্ণরামদাস কথাটি কেন গুরুত্ব পাবে না যেভাবে বিবেচিত হয় মিল-বেন্থাম-মেকলে-ম্যালথাস?

সমুদ্রবণিকেরা আসার জন্য বস্ত্রশিল্পে আগের চেয়ে আরও বেশি মাত্রায় পুঁজিনিবেশ ঘটল, বিদেশি পুঁজির সঙ্গে যুক্ত হল গ্রামীণ পুঁজি আর মেশিনলুমের অবর্তমানে বর্ধিত চাহিদার যোগান সামাল দিতে আরও বেশি মাত্রায় হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানবসম্পদ নিয়োজিত হল। লোকলস্কর বাড়ল। নগর-বন্দর গড়ে ওঠাও শুরু হল। বর্ধিত বাণিজ্যের সূত্রে নদীর দু-পাড় যেমন ত্রিবিণী, রিসড়া, মগরা, চুঁচুড়া বা নদীর পুবপারে খড়দহ, ব্যারাকপুর ইত্যাদি এলাকা জনবহুল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, জনবল।

মানবসম্পদ। সুতরাং, অস্তিত্বের পূর্ণাবয়ব অনুসন্ধানে রাজি হয়ে যাই। দেহ-খাঁচাটির দ্বি-বাহুবিস্তারী হিমালয়-সদৃশ কলারবোন থেকে বিঘৎ-দেড়েক ওপরে— দর্শক, শ্রোতা, কোচ, দোভাষী, ভাষ্যকার, ইন্টারপ্রেটার, জজ, নার্স, ডাক্তার ইত্যাদি। এছাড়াও, বিনিময়-প্রথার অন্তিম প্রহরে ষোড়শ শতকীয় হাওয়ামোরগ— শ্রেষ্ঠী, ফড়ে, দালাল, মিডলম্যান, মজুতদার, পাইকার; কলারবোন থেকে বিঘৎখানেক নীচে, খাঁচাবন্দি হিসাবরক্ষক, চিত্রকর, নাটুয়া, সাক্ষী, গোলাম-লেখক আর কলারবোন জাতীয় হ্যাঙ্গারটির দু-পাশের ঢাল বেয়ে নেমে ঘড়ির আদিতম সংস্করণ— কর্মক্ষম দু-টি হাত, ঋজু অথবা স্থুল, যোড়হস্ত কখনো অথবা পূর্ণবিস্তৃত কায়িক পরিশ্রমীজন— নফরসমাজ: মুটে-মজদুর, লোহার-সোনার-ছুতোর-কর্মকার-ব্যাপারি-কৃষক-বাস্তুকার; এক কথায় বিশাল মাল্টিপ্লেক্স, জনবহুল। অবশিল্পায়নের মারপ্যাঁচে এরাই পোশাক বদলিয়ে রঙ্গমঞ্চে হাজির পুনর্বার। নতুন নির্দেশনায় তারা কেউ খানসামা, কেউ বাটলার, হরকরা, মশালচি, সহিস, দর্জি, ভিস্তি, মুচি-মেথর-হুঁকোবরদার। থরে থরে মজুত বিনিময়যোগ্য সময় ও শ্রম, ভিন্ন-বিভিন্ন দর ও মোড়কে— পণ্য অঢেল… খরজনস্রোতে, স্পন্দমান আসমুদ্র হিমাচল। পুনর্জন্মে এঁদেরই মধ্যে কেউ নিওন জ্যোৎস্নাসম চন্দ্রাতপের নীচে ‘আউটসোর্সিং’ রাতজাগা হুতোম, ভারতীয় অর্থনীতির সেবাধর্মী চুয়ান্ন পার্সেন্ট— নজরে রেখেছে ভিন গোলার্ধের সূর্যকিরণ।

মুম্বইয়ের সাইনবোর্ডে ‘সিটি নেভার স্লিপস’ ব্যবহৃত হতে দেখেছিলাম। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ‘যা নিশা সর্বভূতানাং, তস্মাৎ’ জেগে কাটান আই-টি-কর্মী। সুমন্ত ব্যানার্জী উক্ত নবযুগের ‘সাইবার-কুলি’, তথ্যপ্রয়ুক্তির ‘আই-টি’ বাহিনী।

২০২০ থেকে ফিরি বরং আদি সপ্তগ্রামে, ১৫৪০, ঔপনিবেশিকতার প্রথম প্রহরে। পুরোনো প্রশ্নে। শহর পদবাচ্য কি ষোড়শী কলকাতা? বাংলা কাব্যসাহিত্যের পাতায়, বিশেষত মঙ্গলকবিদের উচ্চারণে, নগরায়নের উল্লেখ পাওয়া যায়। মুকুন্দ লিখেছেন মুসলমানদের বসতি স্থাপনের কথা। কারিগরের গোষ্ঠীজীবন, দেবদেউল-মসজিদ ইত্যাদির নিপুণ বর্ণনা রয়েছে। মধ্যযুগীয় শহরের ব্যাখ্যা দিয়ে আবুল ফজল বলেছিলেন— a city may be defined as a place where artisans (pisha-var) of various kinds dwell। ঐতিহাসিক রত্নাবলী চট্টোপাধ্যায় মধ্যযুগের শহর সম্বন্ধে বাংলা কাব্যবিবরণীতে উচ্চারিত লক্ষণগুলোর উল্লেখ করার পাশাপাশি শহরের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বি.ডি. চট্টোপাধ্যায় চিহ্নিত পাঁচটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই শর্তগুলোর মধ্যে তিনটি প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক কলকাতায় ছিল যেমন মন্দির-রাস্তা –লোকজনের মেলামেশার জায়গা। সুরম্য হর্ম্য, অট্টালিকা-ই কি শহরের একমাত্র লক্ষণ? শ্রীমতী চট্টোপাধ্যায় মধ্যযুগের বাংলার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন যে, প্রাসাদ-অট্টালিকার বদলে বহুবিধ পণ্যের বাজার-বিশিষ্ট সুদক্ষ কারিগর শ্রেণির বসবাসের এলাকাকেই আদর্শ শহর বলা হত।

সংস্কৃত সাহিত্যে শহর হল রাজার বাসস্থান, ধনী ও অভিজাতদের আমোদ-প্রমোদ, বিলাসব্যসন, রঙ্গ-মেহফিল, খান-পানের জায়গা। আর বাংলা সাহিত্যে শহরের রূপ ভিন্ন। বাংলা সাহিত্যে শহর হল শিল্প-উৎপাদন, পণ্যসম্ভারের বাজার, ধর্মস্থান ও শাসককূলের আবাস নিয়ে গড়ে ওঠা এক নাগরিক-স্থল। এই পার্থক্যটি বিশেষ লক্ষণযুক্ত।

বাংলা সাহিত্যের শহরে সবার প্রবেশাধিকার। শিল্পকার সাধারণ মানুষও যেমন স্বীকৃত, তেমনই ধনিকশ্রেণির প্রতিনিধিবর্গ। কাজের সুযোগ এনে দিয়েছিল বহির্বাণিজ্য, দেশের আভ্যন্তরীণ চাহিদা। ষোড়শ-সপ্তদশে বাণিজ্যের আড্ডা–স্থলটির ক্রমাগত বদল ঘটছিল। নিম্ন-ভাগীরথী অববাহিকায় কেন্দ্রিত হচ্ছিল সেই হুড়হুজ্জত। তেমনতর পরিস্থিতিতে পলিমাটি সিঞ্চিত ভাগীরথীকূলে বিরল জনবসতির ছবিটি সে-সময়ের আর্থ-সামাজিক-ভৌগোলিক পটভূমিকার সাথে একেবারেই মানানসই নয়। সরল সত্যটি বরং কর্ম-সংস্থানের সুযোগে মানুষের ভিড় বাড়ছিল। প্রখ্যাত চিন্তক, অর্থনীতিবিদ আন্দ্রে গুন্দা ফ্রাঙ্ক-য়ের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য— ‘world development between 1400 and 1800 reflects not Asia’s weakness but its– particularly China’s and India’s economic strength, and not Europe’s non-existent strength but rather it’s relative weakness in global economy.’ Andre Gunder Frank (Economic & Political Weekly, July 1996, Vol-31, pp. 30)। ‘সন ১৪০০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত বিশ্ব উন্নয়নের গ্রাফচিত্র থেকে এশীয় দুর্বলতার কোনো চিহ্নই ফুটে ওঠে না— চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক সবলতাই বরং প্রতিভাত হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে ইওরোপীয় সামর্থ্যের অনস্তিত্ব নয়, আপেক্ষিক দুর্বলতাই তুলে ধরে।’

‘সিটি অফ প্যালেসেস’ শীর্ষকে (১৮২৪) কবি জেমস অ্যাটকিনসন একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতায় গ্রিক-পুরাণের হেস্পেরিডিসের বাগানের দেউড়িতে কলকাতার স্থান। এই বাগানের সোনালি আপেলের আশীর্বাদ=অমরত্ব লাভ। এই একটি উপমার যদি অর্থনৈতিক ভাবানুবাদ করা যায়, তবে দেওয়ানির সনদ পাওয়াই হল সেই সোনার আপেল হাতে পাওয়া যার দৌলতে কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার পেল। এতদিন ইংল্যান্ড থেকে টাকার যোগান আসত (সোনারুপায়) খরিদ্দারির খরচ মিটানোর জন্য। কিন্তু এই অধিকার পাওয়ামাত্র পাশা পালটে গেল। এখন থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে যে-সমস্ত পণ্য কেনাকাটা করত তার দাম সংগৃহীত রাজস্ব থেকে দেওয়া শুরু হল। উপরন্তু, এই মাল বিক্রয় করে যে-অর্থ পাওয়া যেত তা ভারতে বিনিয়োগ না হয়ে বরং ইংল্যান্ডের রাজকোষে জমা পড়ত। এভাবেই শুরু হয়েছিল সম্পদের নিষ্ক্রমণ, যার স্বাভাবিক পরিণতি হল অবশিল্পায়ন।

ভারী পরিতাপের বিষয় যে, তথ্যসমৃদ্ধির এই সুদিনেও কর্মচঞ্চল জনপদ নয়, বিস্তৃত পরগণাটি নয়, উইলসনের আদিম অ্যানালসে যেমন, ঠিক তেমনই স্যাম মিলার-এর ‘এ স্ট্রেঞ্জ কাইন্ড অফ প্যারাডাইস’-এ (২০১৪) বা এরিকা বারবিয়ানির (২০০২)-এর পর্যালোচনায়, বারংবার, তথাকথিত ‘অখ্যাত গ্রাম’-টিই কেবল পুনরালোচিত হয়। যদি, জনমানবশূন্য চোরাবালি-অরণ্যই ছিল সে-সময়ের কলকাতা, তবে প্রভূতপরিমাণ অর্থব্যয় করে নিছকই এক গণ্ডগ্রামে দুর্গ বসানো, শতেক আবেদন-নিবেদনের দৌলতে ঘাঁটি গাড়া— চতুর ব্যবসায় বুদ্ধিসম্পন্ন যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির দাপুটে শেয়ার হোল্ডারগণের অর্থনৈতিক বিচারবিমর্ষ বহির্ভূত সিদ্ধান্ত ছিল কি? মূল সত্য তো কৃষিপণ্যের বিশাল লাভ ক্রমে পুঁজিতে বদল হয়ে বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদনে/বস্ত্রবয়নে ব্যয়িত হত। এর ফলে কুটিরশিল্প প্রসার লাভ করেছিল। নেহাতই স্বল্পবিত্তের অধিকারী চাষিও বাণিজ্যের এ মহোৎসবে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখতে পারত। তাই মেশিনলুমের সাহায্য ছাড়াই, কেবল লোকলস্করের যোগান বাড়িয়ে বহির্বাণিজ্যের অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কৃষিসমৃদ্ধির এমনতর সাফল্যের যুগে ভাগীরথীপলিসিঞ্চিত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও জনহীন কলকাতা, গণ্ডগ্রাম কলকাতা, অর্থনৈতিক তৎপরতাহীন কয়ঘর-গুমটিবিশিষ্ট কলকাতা ইত্যাকার সুপ্রাচীন মন্তব্যগুলির আশু পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন, কেন-না, নদিয়ার আমিরাবাদ পরগনার অন্তর্গত ডিহি-মহাল-স্থানীয় শাসনকর্তাধীন নগর কলকাতা, ১৬৯০-এর শতবর্ষ পূর্বেই, খোদ নিজেই একটি পরগনা ছিল।

প্রথম পাতা