Categories
সাক্ষাৎকার

বোলান শিল্পী শ্যামল প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার

বোলান গান নিয়ে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে দিন কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা আরও শুনতে ইচ্ছে করছে।

বোলানটা কমে গিয়েছিল একটা সময়। শ্যালোগুলো যখন বসে গেল, শ্যালোগুলো ফেল করছিল, তখন চাষিরা হন্যে হয়ে এমাট ওমাট তেলের টিন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পাঁচ সাত বছর বোলানটা প্রায় অ্যাবোলিস হয়ে গিয়েছিল। যারা প্রথাগতভাবে করে আসত তারাই করত। সে বীরভূমের দু-একটা দল। এখানে লোকাল দলগুলো উঠে গিয়েছিল। বীরভূমে জলের আরও ক্রাইসিস ছিল। লাভপুরের অঞ্চলের দিকে জল উঠতই না। তারপর সাবমারসেবল আসাতে সমস্যা একটু কমল। জলের চুক্তি হল। বামফ্রন্ট সরকার ফ্রিতে কারেন্ট দিল। অনেক নেতা ছিল যাদের একার হয়তো আটটা সাবমারসেবল হল। ওই করে একজন ভালো নেতা মারা গেল। ফাল্গুনী মুখার্জি। নাম শুনেছেন? যাইহোক, অত জলের চাহিদা গ্রীষ্মকালে না থাকার জন্য দলগুলো প্রতি গ্রামে চারটা পাঁচটা করে হল। দল ভেঙে গিয়েছিল। আবার হল। আমাদের গ্রামেই চারটে দল। গাড়ি ভাড়া করে আমরা চলে গিয়েছি নদিয়ার দিকে। বোলান যেন সাধারণ মানুষে গরিব মানুষের প্রাণের উৎসব। আস্তে আস্তে দুর্গাপুজো ঢুকেছে। এত বড়ো গ্রাম দুর্গাপুজো হবে না? ছিঃ ছিঃ লোকে কী বলবে!— এই ভাবনা থেকে এসেছে। বাড়ির পুজোয় আগে তো সাধারণে পুষ্পাঞ্জলিও দিতে পারত না। ওদের পেটোয়া ক-টা লোক ছিল তারা পারত। গ্রামের লোকে নবমীর দিনে দশমীর দিনে একটু সেজেগুজে দেখে আসত। কোনো জায়গাতে হয়তো মোচ্ছব দিত, লোক খাওয়াত। সেরকম ছিল। শহরে যারা ব্যবসা-বানিজ্য করত গ্রামে তাদের জমিদারগোচের ব্যাপার ছিল। তাদের আর তাদের কাছাকাছি দু-চারটে লোকের প্রভাবটা বেশি ছিল। ভক্তির জায়গা থেকে বারোয়ারিটাকে দেখত সাধারণে। পরবর্তীকালে ব্যাপারটা গণতান্ত্রিক হয়ে গেছে। কিন্তু বোলান সংস্কৃতিটা তা নয়। এটা বহুকাল থেকেই সবার। তবে বর্ধমান রাজার প্রভাবটা যেখানে ছিল সে-সব গ্রামে শিবের নামে দশ বিঘে বিশ বিঘে জমি ছিল। আর ওই যে সুন্দর ড্রেস পরতে হবে তাও নয়। সাজে হয়তো বোলানে। বাড়ির মেয়েদের একটা শাড়ি নিয়ে নিল, একটা ব্লাউজ নিয়ে নিল। দিয়ে সাজতে বেরিয়ে চলে গেল। আবার কেউ প্যান্ট জামা পরেই বেরোল। কেউ হয়তো ছেঁড়া বস্তা জোগাড় করল। ওই দল না গেলে গাজনটা সিদ্ধ হয় না। এইটা একটা নিয়ম চালু আছে। দলের কাছে দু-একটা শতরঞ্জি থাকে, মাইক থাকে, চারজার ফারজার থাকে। এখন আর লাঠি ঠ্যাঙা নেয় না। গাড়ি ভাড়া করে গেল। এখন যদিও সব জায়গায় মাইক রয়েছে। আগে আমরা যখন গেছি, একটা হ্যাজাক টানিয়ে দিত। মঞ্চ করাই আছে। কোন কোন বড়ো গ্রামে দুটো চারটে আছে। সেখানে যদি গাজনের জমি না থাকে, নিজেরাই চাঁদা তুলে নেয়। পাঁচ দশ হাজার টাকা তুলে নেয়। দল এলে তাদের পাঁচশো হাজার দিয়ে দল বিদেয় করে।

সন্ন্যাসীরা বাবার নাম ডাকল। ঠাকুর আসতে আসতে ডাঙায় উঠে পড়ল। এটা প্রচলিত কথা। নির্দিষ্ট পুকুর আছে যেখানে জলটা মরে না। সেখানে নির্দিষ্ট জায়গাতে ঠাকুরটাকে রেখে দিয়ে আসে। গাজনের সময় বাবার নাম ডেকে তারা শিব তুলে নিয়ে আসে। আর একটা হয়। শালগ্রাম শিলা। নির্দিষ্ট পুরোহিতের বাড়িতে থাকে। সে সারা বছর পুজো করে। শিব গাজনটা চার পাঁচ দিন হয়। প্রথম দিন ঢাক বাজিয়ে সন্ন্যাসীরা ঠাকুর বাড়িতে যায়। সেখান থেকে পুরোহিতকে ওই শিলাসমেত কাঁধে করে গাজন ঘরে নিয়ে আসে। সন্ন্যাসীরা হাতে একটা বেতের লাঠি নেয় দেখবে। কতগুলো বেত একগুচ্ছ বেঁধে, মাথাতে একটা পাক দেওয়া থাকে, ওইটা হাতে নেয়। ওটা চলে আসছে। আমার মনে হয় ওটা সিকিউরিটির জন্যে নেয়। আত্মরক্ষার জন্যই নেয়। বৌদ্ধিক জায়গা থেকে বলা আর আমার চাষির দৃষ্টি থেকে বলায় হয়তো পার্থক্য আছে। আগে গোষ্ঠীর ব্যাপারটা ছিল। শিবের গোষ্ঠী, মনসার গোষ্ঠী এই ব্যাপারগুলো ছিল আগে। পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ হত। মারধোর হত। শুধুমাত্র খালি হাতে শিবের জায়গাটা করা তাই সমুচীন ছিল না। ওই জন্যে লাঠিগুলো নিত। যেমন ধরো জামালপুরের ধর্মরাজের মেলা। পূর্বস্থলিতে নেমে জামালপুর যেতে হয়। মূল উৎসবটা বুদ্ধপূর্ণিমায় ছাড়া হয় না। তারপরে অন্য জায়গায় হয়। আমাদের চোত গাজনটা পূর্ণিমায় পড়ে না। হয় পাঁচদিন আগে নয় পাঁচদিন পরে হয়। চৈতের লাস্ট দিনটাই গুরুত্ব পায়, ওই দিনটায় চড়ক পুজো হয়। তার আগের দিন হয় নীল পুজো। তার আগের দিন জল সন্ন্যাসী। তার আগের দিনটায় হয় বোলান বা জাগরণ। মড়ার মাথা ফাতা নিয়ে জাগরণ। তার আগের দিন সাধগান। একটু সিদ্ধফিদ্ধ করে ভাত খাওয়া। তার আগের দিন হচ্ছে কামান। আবার কোথাও একমাসে কামায়। কোথাও পনেরো দিন আগে কামায়। আবার কোথায় চারদিন আগে কামায়। যেটা বলছিলাম, ওই জামালপুরে গেলে সব লাঠি ঠ্যাঙা নিয়ে যায়। আমার মনে আছে, এক জায়গায় গেছি, বলল দাদা চল অগ্রদ্বীপ যাই, পাঁঠা খেতে যাব। বললাম, তোমার ভগ্নীপতিরা কি পাঁঠা দেয় নাকি? বলল, না আমরা পাঁচ ছয় ভাই, ওদিন কেড়ে খাই। (হাসি) পাঁচ সাতটা পাঁঠা কেড়ে নেয়। সেই পাঁঠা কাড়তে গিয়ে রামদায় করে একটা লোককে চুটিয়ে দিলেও যায় আসে না। কেউ পাঁঠা বলি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, দিলে তার হাতে কোপ মেরে। আগে এ-সব বেশি হত। মার্ডার হয়ে গেছে। প্রশাসন এখন চেষ্টা করেছে। লাঠি টাঙ্গি যা থাকল তার মধ্যে আবার কেউ রিভলবার ঘোরাতে ঘোরাতে চলল টাউনের উপর দিয়ে। এই কাটোয়ার উপর দিয়েও গেছে।

আচ্ছা এই ধর্মের গাজন আর শিবের গাজন বিষয়টা কি এক?

যারা শাস্ত্র ফাস্ত্র পড়ে তারা ধর্মরাজের সঙ্গে যমের মিল করে দেয়। আবার বেশিরভাগ জায়গাতে ধর্মরাজের সঙ্গে শিবের যে-পার্থক্যটা এটা জনমানসে আবার মুছে গেছে। যার ফলে দেখা গেছে অনেক ধর্মরাজের থানে শিবের মূর্তি বসিয়ে দিয়েছে। আমার যেটা মনে হয়, যেটা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন, ধর্মরাজ বৌদ্ধদের দেবতা ছিলেন। সেখানে সেবায়েতরা দেখবেন কোথাও হাজরা, কোথাও হাড়ি, কোথাও ডোম, কোথাও দাসেরা। এরাই ধর্মরাজের মূলত সেবাইত। ডোমেরা হাজরারা একটা সময় বৌদ্ধ হয়ে ছিল। ডোমেরা ধর্মপণ্ডিত টাইটেলটা পেয়েছিল। হাজরাদের বড়ো সম্মান ছিল। কোটাল, প্রধান টাইটেল যাদের, তাদের একটা ভালো পজিশন ছিল বৌদ্ধধর্মের সময়ে। পরবর্তীকালে ওরা বদলে যায়। যার ফলে হিন্দুরা বলে কোটালদের ছুঁলে ডুব দিতে হয়। এখন সব মুছে গিয়েছে। আমার গ্রামেও আর ডোম বলে বিচার কিছু নাই। জাতটা আছে হয়তো। বিয়ে হয়ে গেলে হয়তো হয়েই গেল। সাধারণ চাষি, হয়তো ছেলের বিয়ে হচ্ছে না, বলছে, ভাইপো, তাহলে কি চাষ আবাদ ছেড়ে দেব নাকি? এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে যারা জয়পুর দিল্লি তাদের বিয়ে হচ্ছে আর আমাদের ছেলে জমি নিয়ে পড়ে আছে বলে বিয়ে হবে না? তুমি যা হোক একটা দেখ গা। ডোম বাগদি যে-কোনো ঘরের মেয়ে একটা দেখ। হয়তো বললাম, আছে, বিধবা। বলছে তাই দেখ, তবে তাই দেখ। সমাজটা ক্রাইসিসে পড়ে বদলাচ্ছে। চেতনার জায়গা থেকে ততটা নয়। এমন করলে আলাদা করে দেওয়ার মতো জায়গাটা ভেঙে গেছে ওপর তলা থেকে। আগে হলে তাকে ছুঁত না। গ্রামের লোকে আগল দিত। এখন আর ও-সব কিছুই নাই। হয়তো কোন গ্রামে এখন বাউনদের একটা বড়ো গুষ্টি রয়ে গিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রভাবটা আছে। কিন্তু সাধারণ গ্রামগুলিতে নেই। তবে গোয়ালাদের মধ্যে এখনও খানিকটা আছে। ওরা সংগঠিত আছে এখনও। অনুষ্ঠান থাকলে, একটা গ্রামের মোড়ল অন্য গাঁয়ের মোড়লকে এসে বলে যেত, গোয়ালাদের। এর ফলে ওদের মধ্যে গোষ্ঠীগত ব্যাপারটা যেমন বরাবর ছিল, এখনও খানিক রয়ে গেছে। মাহিষ্য সদগোপদের মধ্যে অত তীক্ষ্ণ ব্যাপারটা নেইকো।

চৈত্রের গাজন ও বোলান গান

আচ্ছা কিছু শিবলিঙ্গ শুধুই লম্বা পাথর আর কিছু এই গৌরীপট্ট দেওয়া এটা কেন? এই দুটোর তফাৎ কী? কেন আলাদা?

ওটা যোনি বলে। ওইটাই নাকি বলে শান্তি। পুরুষ আর প্রকৃতির মিলন। নানান জন নানা ব্যাখ্যা করে। গ্রামের লোক অত ভাবে না। ওটাই শিব মনে করে পুজো করে। তবে কেন আলাদা বলতে পারব না। জানি না। আগের থেকে পেয়েছে। গোল পাথর কোথাও উঠেছে। ওটাই ভাবল শিব। জলে পেয়েছে। স্বপ্নে দেখেছে। পায়ে ঠেকেছে হয়তো। বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা পুরোনো দিনে কম ছিল। সাদা ডাকে চলত। জীবন সংগ্রামটা এখন বিজ্ঞানের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। তখন ওরকম পর্যায়ে ছিল। কেউ হয়তো বলল এই অমুক ঠাকুর পেয়েছে রে। সে গিয়ে বটতলায় গড়াতে শুরু করল। আরও একজন বলল পেয়েছে। দিয়ে বটতলায় দু-জনে দখল নিয়ে মারামারি লেগে গেল। এখনও কোথাও কোথাও হয়। বিশজন একশো জন জমে যায়।

আবার বিষয়ে ফিরে আসছি। আপনি কেমন করে বোলান গান লিখতে শুরু করলেন?

উত্তর: আমার গ্রামে একজন রেল শ্রমিক ছিলেন। তার নাম হচ্ছে সুদর্শন চক্রবর্তী। উনি খুব ভালো গান লিখতে পারতেন। তার কাছাকাছি থাকতে থাকতে আমার মানসিকতাটা ওই দিকে ঝুঁকে যায়। পরবর্তীকালে আমার মনে হয়, যে— গ্রামের লোকেরা নিজের দুঃখ যন্ত্রণা সব বোলানের মাধ্যমে বলে। কিন্তু কীভাবে চলা যাবে সেই কথাটা তারা নির্দিষ্ট করতেন না। কিন্তু আমার একটা নির্দিষ্ট ভাবনার জায়গা থেকে মনে হয়েছিল। আমি যখন এগুলো ভাবি দেখেছি সাধারণ মানুষের জীবনেও যে-ধারাগুলো রয়েছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা, সংস্কৃতির রূপ— সেগুলো নিয়েই তাদের কাছে যাওয়া গেলে তাদের কাছে গ্রহণীয় হবে। এবং গ্রহণীয় হয়েছিল। হয়েওছে। এখনও পর্যন্ত যদি বাধ-ঘাটে যাই পাঁচজনে বলে। খুব ভালো না হলেও জীবনটা নানাভাবে কেটে গেছে। হয়তো ধারাটা সবসময় বজায় থাকেনি। আমার এটা এত ভালো লাগে, এখনও মনে হয় ভালো করে শিখি। সেটার সুযোগটা হয়তো হয়নি। আমি আমার মানসিক জায়গা থেকে কিছু কিছু লিখি। আবহাওয়াটা যেমন দেশে চলে সেইমতো হয়তো লেখাটা চলে। সবার হয়তো সেটা ভালো লাগে না। শাস্ত্রের উপর পালাটা তারা চাইল। এবার হয়তো চাষি-বাসি লোকেরা দল করছে। তারা ডাকল, দাদা তুমি এসো গো। গতবারেও গেছি তাদের সঙ্গে। ওদের হয়তো পুরোনো সুর, পুরোনো গান ভালো লাগে। আমি কখনো ইম্পোস করিনি তাদের উপর যে, এই গানটা করতে হবে। হয়তো নিজে একটা পাঁচালী গাইলাম লিখে দিয়ে। সেই গানটা হয়তো তারা খুব ভালোবাসল। এইভাবে হয়।

আমার কাছে প্রধান উৎসব বোলান। পাড়ায় যারা উৎসাহী লোক আছে ঢোল বাজলেই তারা চলে আসবে। এসে এবার তারা চার পাঁচজন উদ্যক্তা যুক্তি করল। গান একটা আনতে হবে। একটা পালা আনতে হবে। কার কাছে যাবে? মৃগেনের জ্যাঠামশাই গোবর্ধন দাস ভালো গান লিখতেন, খুব ভালো গান করতেন। পড়েছেন হয়তো দু-তিন ক্লাস। কিন্তু গান লিখতেন। কাটোয়া সাবডিভিশন, কান্দি সাবডিভিশন বা নদিয়া কালিগঞ্জ থানা এইসব এলাকার দু-তিনটে গ্রামে বাপ্রায় গ্রামেই একজন দু-জন করে লোক রয়েছে যারা কিন্তু শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক, নিজে লিখতে পারে না, হয়তো তারা মুখে মুখে বলে দেবে। বলবে, খাতা নাও, ধরো। নানান সুর বসিয়ে গান লেখাটা এদিকে চালু রয়েছে। আমিও লিখি। কিন্তু আমার চেয়ে ভালো ভালো লেখে তারা। যেমন বীরভূমে রয়েছে চন্দ্রশেখর। তোমার দাঁইহাটের রঞ্জিত দাস। তারপর, মারা গেলেন, বান্দরার মানিক ঘোষ। আমি এখন এই গ্রামেই বাস করছি। কাটোয়ার কোশিগ্রামে দশজন, বারোজন আছে। আছে তপন ভটচাজ থেকে শুরু করে সনৎ সাহা থেকে শুরু করে; ওখানে তো অনেক কবি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যেমন ধরো কাশীরাম দাস। কাটোয়ার আশে-পাশে এমন অনেক আছে। কুমুদরঞ্জন মল্লিক, দাশরথি রায়— এমন কবি সব প্রচুর রয়েছে। বৈষ্ণব কবি প্রচুর ছিল। আমাদের এখানে ছিল মনোহর দাস। পাশের গ্রামে শ্রীখণ্ডে ছিল নরহরি দাস। কান্দরায় ছিল জ্ঞানদাস। ঝামটপুরে ছিল কৃষ্ণদাস কবিরাজ। এরকম প্রচুর ছড়ান ছিল। যার ফলে একটা সাংস্কৃতিক বাতাবরণ এই অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই ছিল। তারই ছিটেফোঁটা হয়তো আমার ভিতরে ঢুকেছে।

শিশু কিশোর বিকাশ মেলায় বোলান গান‌ শেখাচ্ছেন

বোলান গানের বিষয়, সুর ও গায়ন ভঙ্গি বিষয়ে জানতে ইচ্ছে করছে। আপনার গানও শুনব এবার।

আসরে প্রথমে বন্দনা হবে। তারপর বিষয়ে যাবে। শাস্ত্রের বিষয় হলে শাস্ত্রের বিষয়। সামাজিক বিষয় হলে সামাজিক বিষয়। ঐতিহাসিক বিষয় হলে ঐতিহাসিক বিষয়। পালা একটা। সেই পালাটাই চলবে বিষয়ে। কলির শেষ হয়ে গেলে ছক্কা বলে। তারপর আবার বিষয় শুরু হয়। শেষে যবনিকা হল। তারপরে সময় থাকলে পাঁচালী হল। বোলান যেখান থেকে খুশি সুর নিয়ে নেয়। কখনো হিন্দি গানের সুর নিয়ে নিচ্ছে, কখনো কীর্তনের সুর নিয়ে নিচ্ছে। কখনো ভাদুর সুর নিচ্ছে। অনেকগুলো সুর নিয়ে একটা ধারা করছে। ভাদুর যেমন স্পেশাল সুর আছে, বোলানকে তেমন বলা যাবে না। যেমন ধরুন ভাদু গানে গাইছে, (গেয়ে শোনান)—

ভাদু মাগো কলেজ যাবা, ও মামুড়ি চারটি বেঁধে দে।
চিকন চিকন আলু ভাজা সুজি একটু রেঁধে দে।
বাবা তোমার বড়ো গরিব, করে বেড়ান হকারি
ট্রেনে বাসে রাস্তা ঘাটে, বেচে বেড়ায় ঝালমুড়ি।
মোমো মোগলাই চাউমিন এগরোল কোথায় পাব হর দিনে
মাগো পুজোর সময় পয়সা দেব কিনে খাবে ভাই বোনে।
ভাদু মাগো কলেজ যাবা, ও মা মুড়ি চারটি বেঁধে দে।
চিকন চিকন আলু ভাজা সুজি একটু রেঁধে দে।
মাগো ছেঁড়া কাপড় ঘুরিয়ে পরি তোদের নতুন দিই কিনে
সত্যি কারের মানুষ হবা বড়ো আশা এই মনে।

লাস্টে লাইন ক-টা ভুলে গেছি। আমারই লেখা। আবার একটা গান, যেমন—

ভাদু ভাদর মাসে, কী আনন্দ হল সোনার বাংলা দেশে।
ভাদু আমার কচি ছেলে গো, কাপড় পরতে জানে না।

এই ধরনের সুরগুলো ভাদু গানের। বোলানের যখন দরকার পরে সুরটা নেয়। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভাদু একটা সুরেই গানটা গাইতে গাইতে আসে। আর বোলানে নানান ধরনের সুর পর পর লাগিয়ে গানটা চলে। যেমন বন্দনা করছে (গেয়ে শোনান)—

ও বাবা বুড়ো শিবের চরণে আজ করিগো প্রণাম।
সবাই বলে সুফল ফলে, নিলে বাপের নাম।
ও বাবা বুড়ো শিবের চরণে গো করি আজ প্রণাম।

দুটো অংশ হয়। মূল একজন ধরে, তারপর দোয়ারিরা ধরে। যেমন মূল গায়ক যেই গাইল—

ওগো মনের কথা বলতে আমরা বাঁধলাম বোলানেরই গান।
তখন বাকিরা গাইল,
এই মনের কথা বলতে আমরা বাঁধলাম বোলানেরই গান।
বাঁধলাম বোলানেরই গান, দুখেতে ফাটেগো পরাণ।
গাইতে বোলানেরই গান, দুখেতে ফাটেগো পরাণ।
মনের কথা বলতে আমরা বাঁধলাম বোলানেরই গান।

তারপর ধরুন মূল গায়ক ধরল—

মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
বসুমতী বন্দী আজও কংস কারাগারে, গরিব চাষির প্রাণে হাহাকার।
ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।

পিছে শেষ করল, সামনে ধরল—

হেই, একমন ধানে একমন বাড়ি, বৌ বিটি যায় বাবুর বাড়ি।
এই, একমন ধানে একমন বাড়ি, বৌ বিটি যায় বাবুর বাড়ি।
ধন্য দেশের স্বাধীনতা, এই কি নজর সরকার তোর-ই।
এই, একমন ধানে একমন বাড়ি, বৌ বিটি যায় বাবুর বাড়ি।
সরকার যত আইন জারি করে, ঘুরে ফিরে চাপে বোঝা গরিবের ঘাড়ে।
ধনী লোকের গায়ে দেখ হাত না পড়ে, হেটকার চাপে দাদা মুসুরি মরে।
সরকার যত আইন জারি করে, ঘুরে ফিরে চাপে বোঝা গরীবের ঘাড়ে।

কলি শেষ হয়ে গেল হয়তো। শেষে ছক্কা ধরল—

ও সে শোষণের সমাজ, মনরে,
ও সে শোষণের সমাজ ভাঙিতে গো নারাজ চড়েছে গদির পরে।

এই সুরটা গেল। তারপর আবার শুরু হল। এক-একটা সুরের এক-একটা ভাগ হচ্ছে বোলানে। এরা মুখটা ধরছে, সেই ক্ষেপটা শেষ হলে ওরা বাকিটা ধরছে, ধরে শেষ করছে। দিয়ে এরা আবার নতুনটা ধরছে। সুরে সুরে এগোচ্ছে। যদি আসরে গাজনের দলের ভিড় থাকে তখন ছেড়ে দেয়। হয়তো দশটা বিশটা দল দাঁড়িয়ে আছে গাজনটা গাইবে বলে। কেউ অন্য পাড়ার দিকে চলে গেল। নীল পুজোর দিন আবার গাজনটা গাওয়ার সুযোগ পেল। সেইদিন আর শ্মশান বোলানটা হয় না। যেটা মড়ার মাথা নিয়ে হয়। ডাকিনী যোগিনী সেজে একটা গান আছে। আর একটা বোলান আছে। সেটা হচ্ছে, কেষ্ট যাত্রা দেখেছেন? ওই টাইপের বোলান আছে। নদিয়ার দিকে আছে। আবার পাঁচালীর সুরে বোলান আছে। বোলানটা হয়ে যাওয়ার পরে, যদি সময় অবকাশ থাকে, দল না থাকে যদি, তখন পাঁচালী গানটা করা যায়। পয়ারে বাঁধা পাঁচালী একটা গেয়ে শোনাই— (গান গেয়ে ওঠেন) ‘ও লাগিয়ে কলার বাগান’ (থেমে)— গোদার পাল জানেন তো? হনুদের দুটো দল আছে। শুধু পুরুষ বিশাল বিশাল চেহারা— সেটা একটা দল। আর আছে শুধু নারী, যাদের দলে একটা পুরুষ থাকে। যদি কোনো নারীর প্রসব হয়, তবে পুরুষটা বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। আর ওই মা বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, বাঁচার চেষ্টা করে। এটা হচ্চে হনুমানের সাধারণ দল, মেয়েদের দল। আর ঐ গোদার পাল। ভয়ঙ্কর। সে যদি কোন জায়গায় ঢোকে উৎপাত করে ছাড়ে। এই দুটো দলে মারামারি লাগলে বাগানে সারাদিন মারপিটই চলে। (গেয়ে শোনান)—

ও লাগিয়ে কলার বাগান, গোদার পালের আনাগোনা।২
ও কলা খাচ্ছে গোদা, বাঁধছে ছাঁদা গো। ও বলি কিসে শুধি চাষের দেনা?
লাগিয়ে কলার বাগান…
চাঁপা আর সিঙ্গাপুরি, কাঁঠালে চারশ বুড়ি
(গান থামিয়ে আক্ষেপ, ‘আমার গলাটা চলে গেছে’)
চাঁপা আর সিঙ্গাপুরি, কাঁঠালে চারশ বুড়ি
ছিঁড়ছে গোদা ঝুড়ি ঝুড়ি গো। ও দেখ কাঁচা পাকা আর বাছে না।
লাগিয়ে কলার বাগান…
কখনো মিঠে বাণী, কখনো দাঁত খিঁচুনি
পড়ে গোলকধাঁধায় আমাদের গাধার দশা গো।
ও শুধু মহাজনের বস্তা টানা গো। লাগিয়ে কলার বাগান…
ওরে স্বদেশী বিদেশী গোদা, কেউ বা রঙিন কেউ বা সাদা।
স্বদেশী বিদেশী গোদা, তারা কেউ বা রঙিন কেউ বা সাদা
ও যত এল খুবলে খেল গো।
ওরে সার করেছে লেংটি খানা। লাগিয়ে কলার বাগান…
ওগো মরছি টানে মরছি বানে (গান থামিয়ে, ‘টান মানে, খরা’)
আমরা মরছি টানে মরছি বানে, এত দুঃখ সয় না প্রাণে,
বাঁচা যায় কি দয়ার দানে গো?
বল বাঁচা যায় কি দয়ার দানে গো গোদার পালের আটক বিনা?
লাগিয়ে কলার বাগান…
লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ হয় খাতে,
সেই বরাদ্দের খাস্তা লুচি যাচ্ছে কাদের পেটে?
ওগো পর্বতের হয় মূষিক প্রসব আপনারা জানেন তো সব,
গো সাজান হয় না আমার পরে।
সত্যি ওরা আপন বটে, বালতি হাতে আসে ছুটে,
লাগিয়ে আগুন মোদের পুরে ঘরে।
ওগো বলব কারে দুখের কথা গো?
আমরা সব জেনে গো হই না জানা।
লাগিয়ে কলার বাগান গোদার পালের আনাগোনা গো।

শেষ পাতা

Categories
সাক্ষাৎকার

বোলান শিল্পী শ্যামল প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সুব্রত ঘোষ

শিল্পী: শ্যামল প্রামাণিক, বয়স ৬৬, বান্দরা, কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান।

Categories
সাক্ষাৎকার

বোলান শিল্পী শ্যামল প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার

চৈত্রের গাজন ও বোলান গান

আপনার বোলান গানে দেখছি সমসময়, সমাজ, রাজনীতি অনায়াসে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আপনার প্রিয় কিছু গানের উল্লেখ করলে বিষয়টা আরও বুঝতে পারব আমরা।

বোলানের প্রাথমিক ব্যাপারটা শিব সংক্রান্ত। কিন্তু আমার ঠাকুরদার সময় থেকে, আমার জ্যাঠা ফ্যাটাদের সময় থেকে তখন দেশ সম্বন্ধে নানা বিষয় বোলানের মধ্যে শুনতে পাই। বোলানে স্বদেশী ব্যাপার ছিল। আমার জ্যাঠা স্বদেশী আন্দোলনে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। পরে উনি ১৯৪৬-৪৭ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির অনুরক্ত হয়ে পড়েন। তখন উনি জাপান সম্বন্ধে, রেঙ্গুনের মেয়েদের সম্বন্ধে ইত্যাদি বিষয় বোলানে নিয়ে আসেন। সেই হতে হতে এবার সামাজিক নানা বিষয় চলে আসে। মেয়েদের আধুনিকতা যেটা গ্রাম সমাজ নিতে পারত না, সেই বিষয়গুলো সম্পর্কেও তারা তুলে ধরত। গান পাঁচালী লেখা হত। তার মধ্যে রগরগে ভাষাও চলে এসেছিল। আবার সমাজটা যেভাবে হোক ধাক্কা খেয়েছে। আবার পালাবন্দী গানে ফিরে গেছে। শ্রী কৃষ্ণর উপরে হোক, দুর্গার উপরে হোক ইত্যাদি, কী মহাভারতের যুদ্ধ ইত্যাদির উপরে গানে ফিরে গেছে। তবে আমার দলে দেড়শোজন মতো প্লেয়ার ছিল, তিরিশ চল্লিশজন রিহার্সাল দিত, বাকিরা ঠ্যাকান দিত। শ্যামলদার দল, তারা ঢুকে পড়বে। বারণ করা যাবে না। ব্যাপারটা উৎসবের মতো। দু-তিন গাজন গাইতে গাইতে গলা মিলিয়ে তুলে নিত। সাধারণত এই ধরনের গানগুলো লিখতে আমি পছন্দ করতাম। (গানের খাতা খুলে বলেন)—

স্মরণ করি বরণ করি নয়ন বারি দিয়ে।
তোমার অধম ছেলে মেয়ে।
ওমা বসুন্ধরা, হও মা খুশি হৃদয় অর্ঘ্য নিয়ে।
বলি নয়ন বারি দিয়ে।
মনের কথা বলতে আজকে গাইব বোলানের গান।
গাইতে বোলানের গান ক্ষোভেতে জ্বলেগো পরাণ।
মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার, ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
দেবকী মা বন্দী যেন কংস কারাগারে, গরীব চাষির প্রাণে হাহাকার।
ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
ধনীদের ফোলে ভুঁড়ি গদিতে বসে, চাষা ভাই মরে মাটি চষে।
ও তার পরনে নাইকো ত্যানা, পেটে নাই দানা,
সদা দুখে আঁখি জলে ভাসে, চাষা ভাই মরে মাটি চষে।
খাস জমি সব হাইকোর্টেতে মারাংবাবু দল নেতা।
সব ভরসা হয় ফরসা তারাই নেতা তারাই দাতা।
আমি যাই বাজারে মরি ঘুরে ঘুরে সস্তায় বুঝি কিছু মেলে না,
কানা বেগুন কিনে খুশি মনে মনে তরকারি আজ মন্দ হবে না।

আরও একটা গান।

ব্যাঘ্র মশাই খোঁয়াড়ের মালিক, গবাদিরা পাবে গো রিলিফ,
মন্ত্রী আমলায় শালা সামলায় ওরা সব শ্বশুরের কলিগ,
গবাদিরা পাবে গো রিলিফ।

মানে বাঘ খোঁয়াড়ের মালিক হয়েছে। (হাসি) আরও শোনো—

যে আসে সে বসায় শিলা, শিলা শিলা মজার খেলা,
যে বোঝে তার ঘরে জ্বালা, বলেনা মুখে, লাফানি দেখে।
পতিত জমি থাকতে পড়ে খেতের ফসল নেয়গো কেড়ে
গেঁয়ো চাষি ভয়ে মরে, ভয়ে কাঁপুনি বুকে।
যে বোঝে তার ঘরে জ্বালা, বলে না মুখে।
সরকার যত আইন জারি করে, ঘুরে ফিরে চাপে বোঝা গরিবের ঘাড়ে।
ধনী লোকের গায়ে দেখ হাত না পড়ে, হেটকার চাপে দাদা মুসুরি মরে।
পুরির শেকলে বাধা আজও এ সমাজ, মানুষ পশুর সম হয় হাল আজ।
মুনাফায় লালসায় খাবারেতে ঢালে বিষ, দেবগণ অন্ধ কী আজ?
পুরির শেকলে বাধা আজও এ সমাজ।
লীলাচলে পড়ে দাদা গো মোরা আজ বিষ হারা ঢোঁরা।
বুকেতে যাতনা ভরা, কি করি ফোঁস করা ছাড়া।
অধম শ্যামল ভাবে কেবল রুখবে কেবা ক্ষতি গো রুখবে কেবা ক্ষতি।
জাতের নামে ভাইয়ে ভাইয়ে চলছে লাঠালাঠি।

একদল গাইছে। ছাড়ছে। বাজনা চলছে। আবার একদল গিয়ে ধরছে। যার ফলে কনটিনিউশনে ব্রেকটা হয় না। শেষ হচ্ছে। আবার নতুন গানে লাফিয়ে ধরছে। দলটা দুটো ভাগে ভাগ করা থাকে। দুটো খাত থাকে। একদল ছাড়ে একদল ধরে।

এই এরকম সমাজচিত্র আগেও এসেছে বোলানে। আমার গ্রামের একজন গরিব চাষি। সে লিখতে পড়তে জানত না। সে গান বেঁধেছে। শোন—

একে চিনি মেলে না, তাতে আগুন দর ছানা,
মিষ্টিতে মেশায় গেঁড়ো সানা গো,সানা গো।
ভাগীরথী তীরে হোমগার্ডে চাল ধরে,
গর্ভবতী নারী ছিঃ ছিঃ লাজে মরি,
ওগো চাল বলে মারে রুলের গুঁতো গো, গুঁতো গো।
একে চিনি মেলে না, তাতে আগুন দর ছানা,
মিষ্টিতে মেশায় গেড়ো সানা গো, সানা গো।

কবে ছোটোবেলায় শুনেছি এই গানগুলো। ছানার দর আগুন হয়ে গেছে। গেঁড়ো সানা মানে কচুর গেঁড়ো। মুকিটা যেখানে ধরে। যেখান থেকে কচুটা ছিঁড়ে নেওয়া হয়, দেখেচেন নিশ্চয়ই। ওইটা ছেনে চালের গুঁড়ো আর ছানার সঙ্গে পাইল করে সন্দেশ হত একটা সময়। আমি নিজেও ছোটো বেলায় খেয়েছি। কালিগঞ্জের মেলায় যেতাম। কলাইয়ের ডাল থেকে ছানা তৈরি করে সেটা দিয়ে রসগোল্লা হত। কেসরী আলু যেটা মিষ্টি আলু সেটা দিয়ে রসগোল্লা। এই গানটা উনিশশো চৌষট্টি পঁয়ষট্টি ছেষট্টি সালের। নদিয়ায় তখন চালের খুব ক্রাইসিস। চাল ব্ল্যাক হত তখন। এমারজেন্সির সময় শুধু নয়, তার আগেও এ-সব হয়েছে। গরিব মহিলারা পেটের মধ্যে চাল বেঁধে নিয়ে যেত। এখন সত্যি সত্যি গর্ভবতী নারীর পেটে খোঁচা মেরে দিয়েছে রুল দিয়ে। তখন চাল নিয়ে গেলে ঘাটে পুলিশ আটকাত বলে মানুষ ভাত রেঁধে নিয়ে যেত। তাহলে ধরতে পারত না। হোমগার্ডরা ভাতগুলো কেড়ে ফেলে দিত অনেক সময়। এটা সেই মৃগেনের জ্যাঠা, গোবর্ধন দাস লিখেছে। আমি অবাক হয়ে যাই শুনে। আবার দেখো লিখেছে, বনানীর জেড়শ্বশুর, বসে বসে ঘটি তৈরি করত, সে গান বেঁধেছে—

চিরদিন পুরুষ আর প্রকৃতি এই দুয়ে হয় পিরিতি।
গোপনে কিছুদিন তো ঢাকা রয়, সময়েফেরে ফিরে প্রকাশ হয়।
ফাগুন মাসে দখিনা হাওয়ায় কোকিলের কুহু সুরে প্রাণ জুড়ায়।
সময়ে ফেরে ফিরে প্রকাশ হয়।

একটা ভূমিহীন লোক। মানে লেবার। তার মুখ দিয়ে যে এই কথাটা বেরিয়েছে। কোথা থেকে পাচ্ছে! আমি অবাক হয়ে যাই। (হাসি)

আমাদের কথোপকথন এখানেই শেষ করব। তবে কোন দিকটা আলোচনায় বাদ পড়ে গেছে মনে হলে বা আমার প্রশ্ন করে জানা উচিত ছিল মনে করলে আপনি এই আলোচনায় যোগ করতে পারেন।

একটা সময় পার্টির রাজনৈতিক লাইনটা আমার আর বিশ্বাস হচ্ছে না। তবে মনে হত হবে, একটা কিছু হবে। সাধারণ মানুষকে নিয়ে হবে। মানুষ বিপদে পড়ে গেলে আমাকে ডাকতে আসত। দাদা চলো একটুখানি। তখন মনে হত, এটা যদি না করি তবে কী করব? সারাজীবনে অনেক ঘটনা ঘটেছে। গুণ্ডা বদমাইশের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। নানানভাবে তারা বদলা নিয়েছে। আমার ঠাকুমা বলছিল তুই যদি পার্টি ছাড়িস আড়াই ভরি সোনা, আড়াই বিঘে জমি তোকে দেব। পার্টি তখনও ছাড়িনি। পঁচিশ কাঠা মতো জমি আমায় দিয়েছিল। পরবর্তীকালে আমার শ্বশুর মারা গিয়েছিল। বাবাও মারা গিয়েছিলেন। আমার শ্বশুর আমার স্ত্রীকে একটু জায়গা দিয়েছিল বাড়ি করার জন্য। কাজে লেগেছিলাম, সেখানে কনট্রাক্টরের আন্ডারে কাজ করতাম। কিছু টাকা করে ভায়রা ভাইদের কিছু টাকা দিয়ে বাড়তি জমি কিছুটা কিনে নিয়েছিলাম। তারপর টিবি হয়ে গেল। এক বছরে ভালো হয়নি। প্রায় চার বছর লেগেছিল। কাটোয়ার ডাক্তার জবাব দিয়েছিল। তখন পিজিতে ট্রিটমেন্ট করে ঠিক হয়ে গেছি। ওটা করতে করতে আমার একটা মেয়ে মারা গেল নানান চক্রান্তে। সেই সমস্ত লোকেরা যারা খুব বদমাইশ ছিল, মায়ের কোল থেকে মেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করত তাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমার মেয়েটাকে শেষ করে দিল। ব্ল্যাকমেল করে হত্যা করল। বুঝতে পেরেছি। আমার উপর মানুষের বিশ্বাসটা তারা মানতে পারত না। মনে করত এই আমাদের বাধা। ছেলেটার তো এঙ্কেফেলাইটিস হয়ে মাথা গণ্ডগোল হয়ে গেল। পরে সেও মারা গেল। স্ত্রী মারা গেল। একটা মেয়ে আছে। ওর বিয়ে দিয়েছি। ছেলেটা ভালো। নাতনি আছে। মেয়েটা প্যারাটিচারের কাজ পেয়েছে। সেখান থেকে চলছে। গ্রামের জায়গাটা বেচে দিয়েছি। নারকেল গাছ, দুটো আম গাছ ভালো ভালো। বাড়ি ছিল। চোখের জল মুছতে মুছতে বেচে দিয়েছি। ওই টাকা কিছুটা মেয়েকে দিয়েছি। কিছুটা আমার আছে। এখন আমি বান্দরা গ্রামে থাকি। কাটোয়া সংলগ্ন বান্দরা গ্রাম। আর বোলান গানের শিল্পী হিসেবে হাজার টাকা ভাতা পাই সরকার থেকে। সেখানে যারা ছিল গান শুনে খুশি হয়েছে। তাই দিয়েছিল। পোগ্রাম আমি নিই না। অসুস্থ ছিলাম। লাঠি নিয়ে হাঁটতাম। এখন একটু ঠিক আছি। আর নিজের দলটাকে গোছ করতে পারিনি। এখন আমি একা মানুষ।

স্থান: বাথানগাছি উচ্চ বিদ্যালয়, বাথানগাছি, দিগনগর, নদিয়া
ঋণ স্বীকার: ২১তম শিশু কিশোর বিকাশ মেলা, ২০১৮।

চিত্রঋণ: স্বপন ঠাকুর, অনুপ ঘোষ, সুব্রত ঘোষ

প্রথম পাতা

Categories
কবিতা

মুহম্মদ মতিউল্লাহ্-র কবিতা

শীতের কবিতা

গ্রীষ্মের দীর্ঘ বিকেলে যে কিশোরী প্রতিদিন আমার বাগানে আসত
সে এখন তুষারাবৃত শীতঘুম

Categories
অনুবাদ কবিতা

হাফিজ়ের কবিতা: শাসনের বিরোধাভাস

ভাষান্তর: রূপায়ণ ঘোষ

[হাফিজ় শিরাজী। ১৩১৫ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পারস্যের শিরাজ শহরে তাঁর জন্ম। হাফিজ় মূলত একজন সুফি কবি, তথাপি যে-কোনো প্রকার অন্ধবিশ্বাস,

Categories
কবিতা

বন্ধুসুন্দর পালের কবিতা

ভাসান

গভীর, তোমাকে যে গভীর ভাবে না, সে তোমার কাছে ডুবে মরতে ভয় পায় না

মায়ের মাটির শরীর

Categories
কবিতা

দেবজ্যোতি রায়ের কবিতা

শ‍্যামকল‍্যাণ

বিবাহবাসরে ডালিমের রক্তস্রোতে
শুনেছি মুলতানি, তিলক-কামোদ
শিকারির হারপুন বিঁধে আছে

Categories
গল্প

অনুরাধা মুখার্জির গল্প

ডেথ সার্টিফিকেট

কিন্তু ডাক্তারবাবু তখনও জানতেন না যে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে আরও দুর্ভোগ, আরও অনেক যন্ত্রণা। বহু অপমান ভোগ করতে হবে তাঁকে। আজীবন দুঃখ ভোগ আছে তাঁর কপালে। সুলিখিত চিত্রনাট্যের সবেমাত্র প্রথম দৃশ্যের অভিনয় সাঙ্গ হয়েছে ‌গত রাতে।

দশটা বাজতে না বাজতেই আবার পুলিশ আসে ওয়ারেন্ট নিয়ে। ডাক্তারবাবু গ্রেফতার হন ভূয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার অপরাধে। পাড়ার মধ্যে অজস্র কৌতূহলী ও আশঙ্কিত দৃষ্টির সামনে দিয়ে মাথা নীচু করে পুলিশের জিপে চড়ে চলে যান ডাঃ রায়। বেশ কয়েকদিন হাজতবাসের পর জামিনে মুক্ত হন তিনি। আদালতে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হয়। কিন্তু কী পরিস্থিতিতে তাঁকে ভূয়ো সার্টিফিকেট দিতে হয়েছিল তা আদালতের বিচার্য বিষয় ছিল না। শাস্তিস্বরূপ তাঁর রেজিস্ট্রেশন নাকচ হয়, তিনি হারান তাঁর পেশা, তাঁর চিকিৎসার অধিকার। লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, বিতাড়িত চিকিৎসক এতটা আঘাত নিতে পারলেন না। সিভিয়ার করোনারি এ্যাটাকের ফলে তাঁকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়। শয্যাশায়ী ডাক্তারবাবু জানতেও পারেন না যে, তাঁর দুই ছেলের জীবনে কী পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।


ডাক্তারবাবুর ছেলেদের কথা বলার আগে তাঁকে শেষ করে দেওয়ার জন্য যে-নাটক সাজানো হয়েছিল সেই নিয়ে দুই একটি কথা বলে নেওয়া যাক। এই নাটকের রচয়িতা যদিও সেই ওসি কিন্তু উপাদান যোগাড় করে দিয়েছিলেন ওসিকে তাঁর পৃষ্ঠপোষক এক ধনাঢ্য স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি। মৃতা মহিলা তাঁর আশ্রিতা অসহায় আত্মীয়া। ইচ্ছেমতো ভোগ করার পর মহিলা যখন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন ও অনাগত সন্তানের পরিচয়ের জন্য দাবি জানান তখনই তাঁকে ইহলোক থেকে সরিয়ে দেবার জন্য পরিকল্পনা করা হয় দারোগাবাবুর জ্ঞাতসারে। আর এই হত্যাকাণ্ড তাঁর হাতে তুলে দেয় ডঃ রায়ের উঁচু মাথাটা ধুলোয় লুটিয়ে দেবার সুযোগ। তাই ডাঃ রায় বাড়ি ফিরে আসার পর মহিলার শব গেল শ্মশানে ও পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক রেড হল সেখানে, পুলিশের ডাক্তার রায় দিলেন বিষক্রিয়ায় মৃত্যু, শববাহকরাও গ্রেফতার হল। তবে পুলিশি তৎপরতায় আদালতে আত্মহত্যা প্রমাণিত হওয়ায় তারা মুক্তি পেল জরিমানা দিয়ে। জরিমানার টাকাও কিছু দিনের হাজতবাসের খেসারতস্বরূপ তারা ভালো টাকা পেয়েছিল। এ-সব তথ্য সামনে আসে অনেক পরে। তার আগেই ডাক্তারবাবুর জীবনে চরম সর্বনাশ ঘটে গিয়েছে।

ডাক্তারবাবুর দুই ছেলে, বড়ো কানু ও ছোটো শানু। এই নামেই তারা এই তল্লাটে পরিচিত। সহদর ভাই হলেও স্বভাবের দিক দিয়ে তারা দু-জন বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। কানু জীবনকে নিয়েছিল খুব হালকা চালে, লক্ষ্যহীনভাবে সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া হল তার প্রকৃতি। সেই রাতের অত্যাচার আর বাবার এই লাঞ্ছনা দেখে সে হয়ে গিয়েছিল ভীত, সন্ত্রস্ত ও সদাসশঙ্ক।

আর উচ্চ-মাধ্যমিকের ছাত্র শানু দাদার একদম বিপরীত, অত্যন্ত গম্ভীর ও সিরিয়াস ছেলে। তার স্বপ্ন বাবার মতো ডাক্তার হবে সে, আর সেই লক্ষ্যেই নিজেকে গড়ে তুলছিল সে। কিন্তু সেই অভিশপ্ত রাতের অত্যাচার আর বাবার অবমাননা আর দুর্গতি তার মধ্যে জ্বালিয়ে দিল প্রতিহিংসার আগুন। সে ঠিক করে এই অত্যাচারের, অসহ্য লাঞ্ছনার আর বাবার অপমানের বদলা তাকে নিতেই হবে। বহু চেষ্টায় সে যোগাযোগ করে তাদের সঙ্গে যারা মাঝে মাঝেই গভীর রাতে চিকিৎসার জন্য তার বাবার চেম্বারের দরজায় টোকা দিত। তারাও শানুকে লুফে নিল। ওই অত্যাচারী পুলিশ অফিসারের নাম অনেকদিন যাবৎ তাদের হিটলিস্টে ছিল। এখন শানুর মুখে ডাক্তারবাবুর লাঞ্ছনার সম্পূর্ণ বিবরণ জানতে পেরে তাদের মাথাতেও আগুন জ্বলে উঠল। তৈরি হল প্ল্যান অফ আ্যকশন। এবার ফাঁদ পাতল তারা, মূহূর্তের ভুলে সেই ফাঁদে পা রাখলেন সেই অফিসার আর সেই ভুলের খেসারত দিতে হল তাঁকে নিজের প্রাণ দিয়ে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম— অত্যাচারীর ক্ষমা নেই।

কিন্তু পুলিশের গায়ে হাত পড়লে সমস্ত বাহিনী আহত বাঘের মতো হিংস্র হয়ে ওঠে। এই ঘটনার পর পুলিশ বাহিনী অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। সন্দেহভাজনদের তালিকায় শানুর নাম ছিল তাই সর্বপ্রথম কানুকে এনে হাজতে ঢোকায়। পুলিশের অত্যাচার কানুর মতো দুর্বল চিত্তের ছেলের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। তাই সে যতটুকু জানত, যা আন্দাজ করত সব বলে দিল পুলিশকে।

পুলিশ এবার হানা দিল শানুদের গোপন ডেরায়। অতর্কিত আক্রমণে কয়েকজন পালিয়ে যেতে পারলেও শানু ও আরেকটি ছেলে নিহত হল পুলিশের গুলিতে। শানুর দেহ সনাক্তকরণের জন্য হাজত থেকে বার করে আনা হল কানুকে। ভাইয়ের মৃতদেহ দেখে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়া কানুর চোখের সামনে দিয়ে যখন শানুর মৃতদেহের একটা পা ধরে টেনে হিঁচড়ে তোলা হল শববাহী গাড়িতে তখন কানু আর সইতে পারল না। অত্যাচারিত হয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দি ও তার ফলে শানুর হত্যা ও আদরের ছোটো ভাইয়ের মৃতদেহের নিদারুণ লাঞ্ছনা, বাবার ওপর নির্যাতন ও তাঁর নিদারুণ অসুস্থতা, এতগুলি আঘাত সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি ছিল না কানুর, ফলে পাগল হয়ে গেল সে। ডাক্তারবাবু যখন সুস্থ হলেন তখন তাঁর দুই ছেলের মধ্যে একজন মৃত ও অন্যজন বিকৃত মস্তিষ্ক। আর পরিস্থিতির শিকার হতবাক, হতচকিত তাঁর স্ত্রী আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছেন। ডাক্তারবাবু নিজেও শয্যা আশ্রয় করলেন, পণ করলেন আর কখনো চিকিৎসা করবেন না।

কিন্তু জীবন তো শুধুই তমসাচ্ছন্ন নয়। তাই দিনের পর দিন চলে তাঁর দরজায় ধর্ণা। মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত রোগী যেমন আছে তেমনই আছে তাঁর বিনা ভিজিটের রোগীরা। সবাই প্রত্যহ সোচ্চারে জানিয়ে যায়— আমরা কাগজ জানি না, নম্বর চিনি না। আমরা শুধু আপনাকেই জানি। আপনার ওষুধই আমাদের কাছে মৃতসঞ্জিবনী। এগিয়ে আসে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারা বেকার যুবকরা, জানায় তারা ডাক্তারবাবুর নির্দেশ অনুযায়ী কম্পাউন্ডারের কাজ চালিয়ে নেবে। আগেকার কম্পাউন্ডারবাবুরা কাজ ছেড়ে দিলেও কাজ চালিয়ে নিতে পারবে তারা ও এই কাজের জন্য বেতনাভিলাষী নয় তারা। তাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা যে, চেম্বার খুলুন তিনি, আগের মতো রোগী দেখুন। আর পারলেন না ডাঃ রায়, আবার স্টেথোস্কোপ ধরতে বাধ্য হলেন নামকাটা ডাক্তার।

তাঁর আত্মীয় বন্ধুরাও চুপচাপ বসে ছিলেন না, অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন তাঁর হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। পুনর্বিচারে তিনি ফিরে পেয়েছেন তাঁর চিকিৎসার অধিকার।

সত্তরের দশকের পর কেটে গেছে আরও দুই দশক। রুগ্ন, জীর্ণ শীর্ণ ডাক্তারবাবু তাঁর পুরোনো মান্ধাতার আমলের এ্যাম্বাসেডর গাড়ি চড়ে প্রত্যহ সকালে বাড়ি বাড়ি কলে যান। তবে এখন ওই একবারই কলে বার হন দিনে। আগেকার মতো যখন-তখন বার হতে পারেন না শরীরের জন্য। তবে চেম্বারে দু-বেলাই বসেন। সাহায্যের জন্য একজন জুনিয়র চিকিৎসক নিয়োগ করেছেন। কিন্তু আর কখনো ডেথ সার্টিফিকেট তিনি দেন না। প্রয়োজন হলে নবীন ডাক্তার সেই কাজ করেন। সার্টিফিকেট লিখতে গেলেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে জীবনোচ্ছ্বল তাঁর দুই কিশোর পুত্র কানু, শানুর মুখ। যাদের একজন পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গিয়েছে আর অপরজন আছে মানসিক হাসপাতালে। অথচ এই দু-জনকে যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই তিনি নিজের সব নীতি, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে জীবনে প্রথম ও শেষ বারের মতো ভূয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দিতে বাধ্য হয়েছিলেন আর আজ তাদের স্মৃতিই তাঁর হাত চেপে ধরে, সার্টিফিকেট লিখতে দেয় না।

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

অনুরাধা মুখার্জির গল্প

ডেথ সার্টিফিকেট

বেলা এগারোটা। প্রতিদিনের মতো ডাঃ রায়ের চেম্বারে রোগীর ভিড় ওয়েটিং রুমে, বাইরের বারান্দা ছাপিয়ে সদর রাস্তা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। নিত্যদিনের এই এক চিত্র।

Categories
গল্প

অনুরাধা মুখার্জির গল্প

ডেথ সার্টিফিকেট

বর্ষার রাত। ডঃ রায়ের চেম্বারের দরজায় জোর ধাক্কা। এ ধাক্কা তো নির্যাতিত, আহত তরুণদের মৃদু সশঙ্ক করাঘাত নয়, এই শব্দ কোনো বলদর্পী, গর্বান্ধ ব্যক্তির সজোরে পদাঘাতের শব্দ। ডাক্তারবাবু নিজেই দরজা খুললেন। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন জনাচারেক কনস্টেবল-সহ সেদিনের সেই থানা ইনচার্জ।

— ডঃ রায় আপনাকে তো একটু থানায় যেতে হবে, নিজের করতলে রুলার ঠুকতে ঠুকতে বললেন ওসি।

— এত রাতে! এই বর্ষায়! বিস্মিত প্রশ্ন ডঃ রায়ের।

— আপনি চিকিৎসক, চিকিৎসা আপনার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। তাই আপনার আপত্তি করার তো কোনো কারণ নেই। ব্যঙ্গের কশাঘাত হানেন থানা-অফিসার।

— কিন্তু থানায় তো আর রোগী দেখতে যেতে হবে না। এসেছেন তো আমায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে। তা সেটা তো কাল সকালেও করা যেতে পারে, তাতে তো কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। বিদ্রূপের প্রত্যুত্তরে বলেন ডাক্তারবাবু।

— ওহ্! সরি! থানা বলাটা আমার স্লিপ অব টাঙ্‌। থানা নয়, থানার কাছাকাছি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে এক রুগ্না মহিলাকে দেখার জন্য আপনাকে নিতে এসেছি। ব্যঙ্গের রেশ তাঁর কথায় বেশ স্পষ্ট।

বিপদের আভাস পেলেও ডাক্তারবাবু শান্তভাবে প্রশ্ন করেন, “তিনি কি খুব অসুস্থ, কাল সকালে গেলে চলবে না?”

— না ডক্টর, তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। আপনি এখনি চলুন।

— চলুন তাহলে, আমি ভিতরে একটু বলে আসি। “পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে তিনি জিপে ওঠেন। নিদ্রাতুর ভীত চোখে তাঁর স্ত্রী এসে দরজা বন্ধ করেন।

দারোগাবাবুর সঙ্গে ডাঃ রায় এসে ঢুকলেন একটা ছোটো একতলা বাড়িতে যেটা মোটেও থানার কাছে নয়। যে-ঘরে তাঁরা ঢুকলেন সেখানে একটি তক্তাপোশের উপর এক মহিলা দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছেন ও রোগীর আশেপাশে কেউ নেই। ডাক্তারবাবুর অভিজ্ঞতা তাঁকে পুরো ঘটনার অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে সচেতন করল। তিনি এগিয়ে গিয়ে রোগিনীর মুখ দেখলেন, অনাবশ্যক জেনেও রোগিনীর নাড়ি, আঙুল ও নখের রং পরীক্ষা করলেন ও স্পষ্ট বুঝলেন রোগিনীর মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়, এবং তাঁকে ডেকে আনার নিহিতার্থ তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। ধীরে রোগিনীর হাতটা নামিয়ে রেখে ওসির মুখোমুখি দাঁড়ালেন— “এই মহিলার মৃত্যু অন্তত ঘণ্টা তিনেক আগেই বিষক্রিয়ায় হয়েছে, তবে আমাকে এভাবে ডেকে আনা হল কেন?”

— ইয়েস ডঃ রায় সে-তথ্য আমার জানা আর আপনাকে ডেকে এনেছি কারণ, আমার একটা নর্মাল ডেথের সার্টিফিকেট চাই আর সেটা আপনাকেই দিতে হবে।

— অসম্ভব। গর্জে ওঠেন ডাঃ রায় “এ তো ক্লিয়ার কেস অফ পয়জনিং, মে বি মার্ডার অর সুইসাইড। আর তার তদন্ত তো আপনার এক্তিয়ারভুক্ত। আমি সার্টিফিকেট দেব না।”

— দিতে তো আপনাকেই হবে ডাক্তার। চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন ওসি, “অসম্ভবকে সম্ভব করার পদ্ধতি আমার জানা আছে।”

— আমি দেব না। দৃঢ় স্বরে জানান ডাক্তারবাবু।

এরপর ঘরের মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন ডঃ রায় আর পিঞ্জরাবদ্ধ পশুর মতো পদচারণা করতে থাকেন দারোগাবাবু। আর শয্যায় পড়ে থাকে বিষজর্জর মহিলার মৃতদেহ। এইভাবেই কেটে যায় ঘণ্টাখানেক। এবার থানা ইনচার্জ চীৎকার করে ওঠেন— “আপনি সার্টিফাই করবেন কিনা?

“কখনোই নয়।” শাণিত স্বরে উত্তর শোনা যায়।

“আপনাকে করতেই হবে ডাক্তার। না শুনতে আমি অভ্যস্ত নই।”

— আমি করব না, কী করবেন আপনি? এ্যারেস্ট করবেন? টর্চার করবেন? করুন আপনার যা খুশি। কিন্তু আমার এক কথা সার্টিফিকেট আমি দেব না।

এবার তীব্র ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে ওসির কণ্ঠস্বরে— দেবেন ডাক্তার দেবেন। দাওয়াই আমার জানা আছে। ডাক্তারকে নিয়ে এবার থানায় আসেন তিনি। এএস আই-কে বলেন, “যাও। ডাক্তারের দুই ছেলেকেই তুলে আনো।”

— এ আপনি করতে পারেন না। ডাক্তারবাবু চীৎকার করে ওঠেন।

— আমি সব পারি ডাক্তার। এখন ইমার্জেন্সি চলছে। মিসায় তুলে আনব আপনার ছেলেদের আর প্রমাণ করে দেব যে, তাদের সঙ্গে বেআইনি রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ আছে। ইচ্ছে করলে এনকাউন্টারও করতে পারি। ছাদ কাঁপিয়ে অট্টহাস্য করে ওঠেন দারোগাবাবু।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর দুই কিশোর পুত্রকে হাজতে পুরে দেওয়া হয়। তারপর চলে নির্মম অত্যাচার। ছেলেদের আর্তচিৎকারে কানে হাত চাপা দিয়ে বসে থাকেন ডাক্তারবাবু। তাদের প্রতিটি আর্তনাদ যেন তাঁকে কশাঘাতে বিদ্ধ করে। তিনি জানতেন তাঁর অস্বীকৃতির মূল্য তাঁকে চোকাতে হবে, তিনি সমস্ত দুর্যোগের কল্পনা করেছিলেন নিজেকে ঘিরে আর তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতও ছিলেন। কিন্তু কোনো নরপিশাচ যে তাঁর নিরপরাধ কিশোর পুত্র দু-টির উপর এরকম নির্মম অত্যাচার করতে পারে তা ছিল তাঁর স্বপ্নাতীত। এই দুঃসহ অবস্থায় কেটে যায় অনেকটা সময়। আর পারেন না তিনি সহ্য করতে। পিতৃহৃদয়ের অনাবিল স্নেহের কাছে মাথা নত করে তাঁর আদর্শ, চিকিৎসকের নীতি, তাঁর মূল্যবোধ। ডাক্তার কাঁপা হাতে লিখে দেন সার্টিফিকেট। অফিসারের উচ্চ হাস্যে ফুটে ওঠে তাঁর বিজয়োল্লাস। দুই পুত্র-সহ ডাক্তার মুক্তি পান ভোররাতে। অনেক কষ্টে আহত, পীড়িত দুই পুত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন যখন, তখন রাজপথে যান চলাচল শুরু হয়েছে। প্রাথমিক শারীরিক চিকিৎসার পর (মানসিক ক্ষতের চিকিৎসা করার মতো মানসিক সুস্থতা তখন তাঁর নিজের ছিল না) পুত্রদের নিয়ে তিনি যখন বিশ্রাম নিতে গেলেন, তখন তাঁর দরজায় রোগীর আগমন সবে শুরু হয়েছে। এই প্রথম তাঁর চেম্বারের দরজা বন্ধ রইল রোগীদের জন্য। কম্পাউন্ডারবাবুরা জনে জনে তাঁর অসুস্থতার সংবাদ দিতে থাকল।

শেষ পাতা