Categories
2021-Aug-Poem

অর্ঘ্য চক্রবর্তী

ভীষণ পূর্ণিমা রাত

জলে ডুবে চাঁদ মরে পড়ে আছে।
ছুঁয়ো না;
খানা তল্লাশি হোক,
পুলিশে মারুক আঠারো ঘা—
পরে না হয় “হরি বোল” বলে
কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে যেয়ো দ্বিরাগমনে।

কাল রাতেও দেখেছি তাকে—
কলসী হাতে মুখ-গোমড়া করে বসে আছে,
ঘাটের কাছে।

প্রেম

থেমে যাক সময়!
থেমে যাক সর্পিনী হাওয়া;
এমন সময় আলো নিভে যাক,
থেমে যাক মানুষের কণ্ঠস্বর—
আর রাত্রির নিস্তব্ধতা খান-খান করুক—
রবীন্দ্রসংগীত।
তখন তুমি, হে প্রেম—
আমার পাশে এসে বসো চুপচাপ
ঘুমন্ত নিরীহ বেড়ালছানার মতো।

মৃত্যুভয়

মাঝে মাঝে মনে হয়, মৃত্যু এসে টেনে নিয়ে যাবে। তাই আপোস করে বন্ধুত্ব পাতাচ্ছি তার সাথে। এমনকী চালাকির ছলে দিচ্ছি ঘুষও! আর এই শরীর, তুলোর মতো নরম শরীর বিছানায় কুঁকড়ে শিথিল হয়ে পড়ে আছে— তাকে দিচ্ছি ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ, মাছ। জল খাওয়াচ্ছি সময়ে সময়ে; পড়াচ্ছি জামা, ঢেকে রাখছি শাল-চাদরে। যাতে ওই শয়তান মৃত্যু এসে টেনে না নিয়ে যায়।

উল্কাপিণ্ড

তুমি যেন লুব্ধক,
উজ্জ্বল হয়ে আছ পুব আকাশে।
দ্রুত ছুটে চলেছ শুক্রাণু-বেগে।

তুমি নিশ্ছেদ্র অতল;
অবলা মহাজাগতিক স্তনপিণ্ড এক।
ক্রমশ দূরতর, নিভু-নিভু—

আমারই নক্ষত্রবিলাপ নিহত দিনের পাশে।

উদ্বৃত্ত সময়

কিছুটা সময় আমি জমিয়ে রেখেছি
ফাটা, চ্যাপ্টা টিনের কৌটোয়।
সময়মতো বাগানে নিয়ে যাই,
উঁচু করে ধরি টিনের কৌটোর হাতল—
চারাগাছেদের গায়ে ঝরে ঝরে পড়ে,
ঝিরিঝিরি সময়।
ধুলোয় মলিন গাছের পাতার মাঝে
ছোট্ট বিন্দু, আমার সময়।

 

Categories
2021-Aug-Poem

আকাশ মুখার্জী

ন্যাড়া পোড়া

খানিকটা দূরে একটা মাঠ
ঠিক তার পাশেই শ্মশান

কালো আকাশের বুক চিরে
সাদা ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে…

দু-জনেই পুড়ছে
একজন শুয়ে
অপরজন
দাঁ
ড়ি
য়ে

নববর্ষ

পয়লা বৈশাখ, চারিদিকে কেনাকাটা চলছে
আট বছরের সুদীপ্তর নতুন জামা হয়ছে
তাও আবার হলুদ রঙের…

দোকানের পাশেই শুয়ে একটা ভিখিরি বাচ্ছা।
জন্ডিস হয়েছে।
চোখ-মুখ হলুদ হয়ে এসেছে

সমুদ্র

আমি জন্মাইনি
আমি মরবও না..

আমি পৃথিবীতে শুধু ছুটি কাটাতে এসেছি
কিছু বছর ছুটি কেটে গেছে

আর কিছু বছর বাকি…

ছুটি শেষ হলেই,
সমুদ্র আমার পায়ের ছাপ ধুয়ে দেবে

বাৎসরিক

সময়ের উত্তাপ সমস্ত ঘড়িকেই গলিয়ে দিয়েছে…
সমস্ত পাহাড়কেই ক্ষয় করেছে….

প্রতিটা বছর যায়, সময়ের চিতা আরও কতকিছুকে পুড়িয়ে দেয়…

এই চিতা কোনোদিনও নেভে না…
শুধু মানুষ খেয়ে নিজের খিদে মেটায়

মধ্যবিত্ত

প্রতিদিনই একটু একটু করে
শান্ত হচ্ছি।

শুধু ততটা শান্ত হচ্ছি না
যতটা হলে আমাকে মৃতপ্রায় মনে হবে।

ভিতরে একটা ড্যাম্প খাওয়া দেশলাই রেখে দিচ্ছি…
যাতে বারুদে বারুদে ঘষা খেলে,
আগ্নেয়গিরির মতো একবার জ্বলে উঠতে পারি

 

Categories
2021-Aug-Poem

মধুমিতা রায়

মধ‍্যাহ্ন সমীক্ষা


সাধ বলতে ভাত খাবে। খিদেকে দেবে ওম
ধূপ জ্বালে। ধুনো দেয়। মৃত কাঠে প্রাণ জড়ো করে
প্রদীপ জ্বালানো। ভর সন্ধ‍্যা। উবু হয়
হাঁটু গেড়ে বিশ্বাসের মালা জপা
কপালে হাত সরে না। হাত মুঠো হয় না।
মনে মনে রাগ। কলসি রাগে
খাবার গোছায় আকুতির জল


খিদে মায়া। আগুন জানে। জলের ছোঁয়ায়
দেখে না কেউ। বোঝে না কেউ। দূর থেকে দেখে
এমনি উপহার। রঙিন কাগজ
ছিঁড়ে করে টুকরো। খেদের গালিচা
মরা চাঁদ আরও মরে
শুকতারা বয়সের ভারে বোবা হয়ে যায়


জিভের কাছে যাই। বিস্বাদ চোখ
সব মিথ্যা। বাড়ে না। কাড়েও না
সার মেশাই। ফেলে রাখি
বর্ষা আসে। ভিজে গেছে
পুত্রের পোশাক। বারান্দায় ঝোলা
টপটপ শব্দ হলে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা
জল নাকি লোভ… লোভ… লোভ…


খুন্তির আওয়াজ জানে?
ঠিকঠাক নিয়ম ব‍্যাকরণ ধুনির
শব্দ, বর্ণ, বাক‍্য ব‍্যয়। খুচরো পয়সার মতো। ঝনঝনে আওয়াজ। মৌলিক শব্দ
ভাঙে না। জুড়ে যায়। রৌদ্রে কড়কড়ে

হঠাৎ ঘাড় বেয়ে নেমে আসে হলুদ শরীর


কলাগাছ বড়ো হয়। পাতার ফাটল
হাওয়া বাধে। ঝড় হয়
মন ভাঙে। আর কেন? এই তো সময়
মেয়েদের বয়স! বোকা তুমি
গাছ কাটো। গোড়া থেকে
কাঁদুনি নামার আগে নিজেকেই পিণ্ডদান করো


মধ‍্যবিত্ত শরীর। শরীর গড়ানো জল
আঁধার নামে। আহ্নিক গতি
বেগে মৃত্যু। প্রাণ নেই। মান নেই
আছে শানিত আওয়াজ। লোডশেডিং
নিজের রক্তের স্বাদ নিজেই চাটে
অর্ধেক জিভে সব নোনা লাগে


বৈপরীত্য নামে। ছেলেখেলা জাগে
থালাভরতি ভাত। দুপুর গড়ানো
গেলার আগে আমায় গেলো
আঁশটে গন্ধ। মেছুনির নাচ
গ্রাস চটকিয়ে অসহ‍্যকর
কাদা মাড়াই খালি পায়ে
মশার শব্দ। ঘুম ভাঙে


কিছুটা মিথ। সামান‍্য বিশ্বাস
সুখি করে অলীক মায়া
পিতৃমুখ ডুব দেয়। রাশিফল সাঁতরে যায়
গা হেলানো। জন্মসুখ

কর্মসুখ ভেসে যায়। ডুবুজলে মুখ খোঁজে
কোন মেয়ে? কার অসুখ?
কারসাজি কিচ্ছু নেই! অসুখ সাজাই মুখোশ দিয়ে


বৃষ্টিভেজা জামা। হ‍্যাঙারে ঝোলা জল
গড়িয়ে পড়ে, ভিজিয়ে দেয়
চেনা জন্মদাগ
মতভেদ জাগে। উগড়ে দেয়
জমানো গরল। মন্থনে ওঠা
ছলনা ভেজা দাগ। কানামাছি খেলা
কুড়িয়ে নেয়। সেলাই করে
খোলা বোতাম
ইচ্ছার সাথে অনিচ্ছার মিশ্রণ
হু হু করে ডাক। শুকনো পাঁজর

১০
হারিয়ে ফেলার সমার্থক শব্দ নেই
যত ভাবি, ক্ষয়ে যায়
সরে যায়। নিজের থেকেই
ডাকটিকিট নিয়ে যায়, খোলা চিঠি
একনিঃশ্বাসে লিখে রেখেছিল যক্ষ
মেঘও ব‍্যর্থ হয়। পাথর বানায়
ঘুম পাড়িয়ে দেয় তুলোর মতো মেঘে

 

Categories
2021-Aug-Poem

অরিত্র সোম

অ্যাশট্রে প্রস্তুত রাখো

ডালটুকু দেখতে পেয়েছ; কিন্তু ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা পায়রাটিকে ভাবার মতো যোগ্য এখনও হয়ে ওঠোনি। আপাতত মনোযোগ দিই মঞ্চে। গিটার হাতে আলো করে রেখেছি কিছু নাগরিক। আমাদের গলায় ভাষা দাও, চলনে-বলনে সোচ্চার হও সংস্কৃতি।

এমনতর ইচ্ছের মধ্যেই ভিড় বাড়ে। গাড়ি আর সানগ্লাস যথাস্থানে রেখে মাননীয় উঠে যাচ্ছেন দেওয়ালে। এটুকু আওয়াজ সহ্য করে রাখো অন্তত। শুনেছি তোমার তো এখন কাজ-টাজ নেই বিশেষ কিছু…

নাগরিক সোচ্চার হয়। লাল-নীল মরসুমে আরও কৌতুক খোলে আকাশে। ছাদের দড়ি শুকনো সব; পাঁজরের বদলে পোস্টার উড়ছে। মাঝরাস্তা পেরোলেই সাফসুতরো মেজাজ। শ্লোগান নেই তবে দমকা কাশি ওঠে। সঙ্গে চাপ চাপ গন্ধ। রক্ত বেরোনোর মতো বোধহয় বিপ্লবী হয়নি ঠিক। বরং পলাশ কুড়িয়ে এগিয়ে দাও পাশের সিটে। আড়ালে খুচরো কয়েন— মানুষ, তাকিয়ে থাকে মানুষের দিকে।

মানুষ অকপট ঘুমিয়ে থাকে মানুষের পাশে
মানুষ ঘুম থেকে উঠে, লাঠি মারে
মানুষের মুখে

অতএব ইন্টারনেট চালাও। তুমি নাগরিক, শিক্ষিত ছন্দ মিলিয়ে গড়ে তোলো পবিত্র আশ্রয়…
আর পায়রার
ছাই উড়ে
উড়ে
উ ড়ে

অ্যাশট্রে, প্রস্তুত রাখো।

নিজস্ব শহরের ওপার হতে— ৫

স্বপ্নের মতো কিছু একটা যেন উড়ে যাচ্ছে। রিকশাস্ট্যান্ডের ঠুমরি ছায়া ফেলেছে গোটা ঘরে। মোটে সাতজন মানুষ— অ্যাশট্রে কালো করে পুড়েছে সব। শ্মশানযাত্রীর দল, হবিষ্যি ভুলে, এখনও চেয়ে আছে নদীটির দিকে। ওদের সবার বুক ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে দুটো আলতা-ছাপ। পথ ভুল করে দৃশ্যে ঢুকে পড়েছে বিড়াল। কাউকে তোয়াক্কা না করে ফিরে যাচ্ছে পুরোনো চেয়ারে। আস্তে আস্তে একটা বিকেল চলে এল ছাদে। মিস্তিরিরাও ফিরে গেছে যে যার মতো, স্বপ্নে। আমি ফিরতে পারছি না কেন— এই খচখচানি নিয়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। অস্থি ভাসান দিতে গিয়ে সে শক্ত করে চেপে ধরেছে হাত। ছাড়াতে চাই না; কিন্তু…

ঢিলের বৃত্তাকার যাপন বুঝিয়ে দিচ্ছে— তৈরি হও।

ঈশ্বরের সাদা পেরেক


দেওয়াল থেকে সজারুর মতো তাকিয়ে আছেন ঈশ্বর
একটা পেরেক পেলেই পাশের জমিটি
বেদখল হয়ে যাবে


গত পরশু থেকে পাপোষের কোণে রাখা
সাংসারিক ছবিটি


যিশুর পা থেকে, আপাতত
একটাই পেরেক তুলে নেওয়া হয়েছে

কাজ চালানোর জন্য

রক্তবীজ— ১

প্রতিটা জানলা বেয়ে, অজস্র পাতা আসে ঘরে
জড়ো হয়; চলেও যায় একসময়— মেনিটির মতো
ঘরে ঘুরে বেড়ায় মর্গের হাওয়া
তার গন্ধ নিতে
নিতে নিতে
দেওয়াল ভরে উঠেছে রক্তে

কাশির দমক যেখানে শেষ রাত্রির নিশ্বাসের মতো

রক্তবীজ— ২

তারপর পাগলেরও সাধ হল শেষ হওয়ার—
খানিক ট্রেনে, খানিকটা কাটাকলের পথে ছুঁড়ে দিয়ে
দেখে নিতে চাইল পৃথিবীর গন্ধ
কোনো বৃষ্টি এল না। শব্দ হল না।
শুধু কিছু কুকুর একে অপরের গা শুঁকে
চলে গেল বস্তির জঙ্গলে…

এতক্ষণে
গা বেয়ে উঠে পড়েছে মা-পিঁপড়ে ছেলে-পিঁপড়ে
ভিতরে ভিতরে চলছে
মাংস খাওয়ার প্রস্তুতি

Categories
2021-Aug-Poem

সোহম চক্রবর্তী

আমি

শহর থেকে অনেক দূরে গেলে ছোটো মফস্সল,
যেয়ো না অত দূর।
মফস্সল থেকে আরও অনেক দূরে অজ পাড়াগ্রাম,
যেও না অত দূর।

বরঞ্চ, দ্যাখ—

শহর থেকে অনেক দূরে ছোটো মফস্সল,
মফস্সল থেকে আরও অনেক দূরে অজ পাড়াগ্রাম
ছুটে যায় জাতীয় সড়ক।

জাতীয় সড়কের পাশে ফালি ফালি রোদের মতন
বসার জায়গা—
শানবাঁধানো, ছাউনি দেওয়া পঞ্চায়েতের; ছোট্ট দেয়ালে
গা-ঘেঁষা অক্ষরে লেখা: ‘দাঁড়াও, পথিক-বর…

…তিষ্ঠ ক্ষণকাল!’

যেহেতু তুমি একটা-দুটো কবিতা পড়েছ, তাই ভাবছ
কেউ তো দাঁড়ায়, কেউ তো দাঁড়াবেই—
আরও অনেকগুলো পড়লে বুঝতে

আসলেতে দাঁড়ায় না কেউ।

কাম

জোনাকিকে পিষে মারলেও
আলো তার পেছন ছাড়ে না—

ফুলে ওঠে কপালের রগ,
জ্বর আসে— আর
তোমার না-আসা শুধু

দপ্ দপ্ করে গোটা দেহে।

আত্মঘাতরীতি

‘তোমাকে না-পেলে আর বাঁচব না আমি’।

এ-সহজ সত্যের বুকে
তৃতীয় শ্রেণির কিছু বাংলা সিনেমা
যুগে-যুগে ছুরি মেরে গেছে।

আমরা নায়ক নই, নায়িকাও নই,
একটি জীবনে
সাইড-রোলের বেশি আমাদের বরাত মেলে না।
রংচঙে মুখে তাই তোমাকে ও-কথা
জানাব, তা চিত্রনাট্যে নেই।

তোমাকে না-পেয়ে তাই নিশ্চিত মৃত্যুটি খুঁজি
একা-একা। খুঁজে আনি কবেকার
ব্লেড, দড়ি, ফলিডল— তবে
তৃতীয় শ্রেণির কিছু বাংলা সিনেমা
এইসব উপায়ের প্রতি আমাকে সন্দিহান করে।

তোমাকে না-পেয়ে আমাকে তো মরতেই হ’ত,
তাই আমি কবিতা লিখেছি।
তৃতীয় শ্রেণির কোনো বাংলা সিনেমা, ভাগ্যিস
ও-পথে হাঁটে না!

গতরাত্রে বৃষ্টি হয়েছিল। ঝরেছিল ফুল…

আমার বিছানায় এক শিউলিগাছ আছে।

এমনিতে চোখেও পড়ে না, শুধু
খরতপ্ত ঘুমে
সারা শরীর দিয়ে আমি শিউলিগাছ হই—

ডেঁয়োপিঁপড়েরা হাঁটে, সকরুণ
গানের পাখিরা
ঠুকরে ঠুকরে চলে এ-ডাল ও-ডাল;

গতরাত্রে বৃষ্টি হয়েছিল। ঝরেছিল ফুল।
এ-সকালে রোদ তাই চিকন-চিকন— ভ্রমরের মতো

কুসুম কুড়োতে আসে বালিকাটি কুসুমতুলহ,
ঝুঁকে পড়ে চোখের পাতায় এই দৃশ্যটিকে

আমি সবিশেষ ঈর্ষা করি, এই দৃশ্যে
প্রভু আমি অন্ধ হয়ে যাই…

গতরাত্রে বৃষ্টি হয়েছিল। ঝরেছিল ফুল

…একাই, একাই!

ফেব্রুয়ারি

একটি হাওয়া মনখারাপের, একটি হাওয়া সর্বনাশী—
একটি হাওয়া পার ক’রে ফের তোমায় কেবল দেখতে আসি…

একটি হাওয়া দূর শহরের বাসন্তী রং সরস্বতী,
কার হাতে কোন হাতের বাঁধন দেখেই আমার কী দুর্গতি

বুঝলে না আর, সব কথা কার কে-ই-বা কখন বুঝতে পারে…
একটি হাওয়া বছর ঘোরায়, বান্ধবীদের বয়স বাড়ে।

একটি হাওয়া দূর বয়সের সাইকেলে ঠেশ একলা ছেলে,
একটি হাওয়া গন্ধপুষ্পে পারফিউমের আভাস ফেলে

ঝড় তুলে যায় বুকের ভিতর দূর শহরের হলদে শাড়ি—
ফিরিয়ে দেওয়া সেই মেয়েটির চোখের মতন ফেব্রুয়ারি…

Categories
2021-Aug-Poem

রঙ্গন রায়

জানুয়ারি মাসের কবিতা


প্রিয় কবির কবিতা পড়ছি
প্রথম দিক কার কবিতা
তাঁর মেয়ের সাথে আমার
এক অলৌকিক বন্ধুত্ব আছে
কবিতায় ওর ছোটোবেলা দেখা যাচ্ছে
কবিতায় আমাদের অলৌকিক বন্ধুত্বের ছোটোবেলা দেখা যাচ্ছে


যে-সব কবিতাগুলোয় তুমি আছ
সে-সব কবিতা তোমার বাবা পড়ে
বলে, এত সুন্দর কবিতা তুমি লেখো কী করে!

চাঁদের হাসি বাধ ভেঙে যায়


করলা নদীর ধারে
সদর বালিকা বিদ্যালয়—
এই স্কুলে তুমি কোনোদিন পড়োনি
তবুও সন্ধ্যার মৃদু অন্ধকারে এখানে এলে
তোমাকে তীব্র রূপসী মনে হয়


যোগমায়া কালীবাড়ির চাতালে চশমা খুলে রাখো
উত্তল লেন্সে মন্দির বড়ো হয়ে ওঠে
বড়ো হওয়া লক্ষ্য করে তাকাই তোমার দিকে
শ্বেতপাথরের মেঝেয় গোলাপি আঁচল
ঈশ্বর ধন্য হয়ে ওঠে


ইঞ্জেকশন নিতে হাসপাতালে এসেছি
শরীরের ভেতর কুলকুল করে ভয় ছড়িয়ে পড়ছে—
একদিন ইঞ্জেকশন নিয়ে ফিরে এসে তুমি
আমার দিকে তাকিয়েছিলে—
স্কার্ফের আড়াল দিয়ে কেয়োকার্পিনের গন্ধ
হাসপাতালকে পবিত্র করে তুলেছিল
আমাদের যাবতীয় তর্ক একপাশে রেখে
নদীর কাছে গিয়েছিলাম
ঘাসের শিষ মুখে দিয়ে বলেছিলে
বিড়াল তোমার সবচেয়ে প্রিয় প্রাণী


আবেগপ্রবণ হওয়া আমাকে মানায়
তুমি অঙ্কের লোক, চুড়ির দর করতে জানো সঠিকভাবে
বাজারের হিসেব করতেও দক্ষ
আমি একদিন শিখে নেব এ-সব
তখন বাংলা হরফে চিঠি দেব
তুমি কমলালেবুর গন্ধ পাঠিও খামে ভরে


এই কবিতাগুলোর ভেতর তোমাকে রেখে দিলাম
পৃথিবী জুড়ে ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়বে

Categories
2021-Aug-Poem

জাতিস্মর

বিড়ালচরিত


যা অদৃষ্ট তার কাছে গোপন করিনি
সন্দিগ্ধ আতর।

আমার প্রাণময়বিড়ালটি মৎস্য ধর্ম
ছেড়েছুড়ে বসে আছে— রোদসন্নিকটে—
আমার সন্দেহবিড়ালটি শিউরে উঠছে
স্বগন্ধহীন— দর্পণের দিকে…

ওই দর্পণ যেন প্রসব করছে তার চতুর্থ শ্বদন্ত


নীল চোখ বন্ধ রাখার স্বভাব
দরজার ওপারে গেলে আর থাকবে না

এমনই শিক্ষা দিয়েছি আমার ভক্তিবিড়ালটিকে

কাঁধের থেকে এক খাবলা মাংস
তুলে নিয়ে খেতে খেতে
আচমন মন্ত্র গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে
সুষুম্নাবিড়ালটির


পাথর হয়ে যাবার নির্দেশ অমান্য করে
স্বয়ং পাথরদেবতা আমাকে দান করেন
প্রচণ্ডবিড়ালটি

আমার বাহু দু-টি যে মজবুত হয়েছে আরও
এ ব্যাপারে আমার বাহুদ্বয় এখনও সন্দিহান

যেন প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসা
মর্মনখরের কাছে তারা
এখনও অভিসম্পাত মার্জনা চায়…


আমার ভ্রমণবিড়ালটি দেখি এখনও আমার
দু-চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে চলছে

সারাদিন জলের ওপর জল
নষ্ট ঢেউ, অশ্লীল পদচারণা
তারপরে বালি আর কাঁকড়ার আশ্চর্য মৈথুন দেখে
আমার চোখ কি ক্রমে ক্রমে

যৌনাঙ্গের মতো দৃঢ় হয়ে উঠছে?


এমন মন্দির আমি কখনো যাইনি
যেখানে যন্ত্রণার গর্ভগৃহ আছে

তবে আমার মস্তিষ্কবিড়ালটি
বার ছয়েক ঘুরে এসে আমার সুপ্রাচীন কানে
ফিসফিস করে জানিয়ে গেছে

যন্ত্রণা আসলে পদদলিত ফুল

Categories
2021-Aug-Poem

শীর্ষা মণ্ডল

অথ যাত্রাকথা


আমাদের সুরেলা কান্নার শব্দ শুষে নেয় কুকুরের গলা– দিন মরে যাওয়ার প্রলাপে এপাড়া-ওপাড়া জুড়ে বাজতে থাকে নিকষ শোকের বীণ, সমস্ত অন্ধকারের স্তন জুড়ে ফুটে ওঠে বেদনার বৃন্তকুসুম— এরকম অপরূপ সমাধিস্থলে জেগে থাকা চোখ গুনতে থাকে অগুনতি প্রহরের ছায়া; আর বেদনার্ত শিউলির ফ্যাকাশে শরীর মাতৃচ্যুত হয়ে রজনীদাইয়ের কোলে নির্বাক শ্মশানযাত্রা করে। এরূপ অনুপম যাত্রার পথে পড়ে থাকা খইয়ের মতো আমাদের সফেদ সুরেলা কান্নার শব্দ শুষে নেয় কুকুরের গলা। শুষে নেয় যুধিষ্ঠিরের একাকিত্ব শুঁকতে থাকা লেজ।


একটি বসন্তকে ছেড়ে দ্বিতীয় বসন্তের দিকে যাত্রা— অনেকটা যুধিষ্ঠির আর অনুগামী সারমেয়র যাত্রার মতোই। ক্ষীণ মৌন দৃষ্টি, ধীর পদক্ষেপ— একটি লোক থেকে দ্বিতীয় লোকে। একটি ইন্দ্রিয় থেকে দ্বিতীয় ইন্দ্রিয়ের দিকে। এমনই যাত্রা অনন্তের স্রোতে— আমরা চলেছি। হাঁটছি। পথ আর অনন্তকে সমার্থক করে তুলছি। মাতৃপক্ষীকুল ফিরে আসছে গার্হস্থ্যে। সুতো বুনে বুনে আরও নিবিড় করে তুলছে গার্হস্থ্যের রং। একটি বসন্তকে ছেড়ে দ্বিতীয় বসন্তের দিকে চলমান মানুষ সেই শিল্পীসত্তার নাগাল পেতে অসমর্থ— যাবতীয় প্রাণীজাতির প্রতি অক্লান্ত আক্ষেপ-দৃষ্টি মানুষকে নিরাসক্ত করে তুলছে। কিংবা আসক্তি অব্দি পৌঁছোতে না পারার যন্ত্রণাকাতরতা। নির্লিপ্ত যন্ত্রণা। যেহেতু যন্ত্রণার কোনো গন্ধ নেই। যন্ত্রণা নিজেই একটি শমীবৃক্ষ। জল বা সার ছাড়াই যে নিজেকে চড়চড় করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে আকাশ ছোঁয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেখে। স্বর্গের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মাতৃপক্ষীকুল তার গায়ে উপেক্ষা মাখিয়ে চলে যায়। ফুল ফোটে। ফুলের ছায়া পর্যন্ত যন্ত্রণা পৌঁছে যায়। যন্ত্রণাফুল অনেকটা রংহীন, গন্ধহীন মনে হয়। আপাত মনে হওয়া। আদতে যন্ত্রণাগাছের জাইলেম-ফ্লোয়েম দিয়ে নুন-জল নয়, বসন্ত যাত্রা করে। একটি বসন্তের খোলস যন্ত্রণাগাছের পায়ের কাছে মরে পরে থাকে। যুধিষ্ঠিরের পার্থিব ত্যাগ করা কুকুরের হিসি লেগে থাকে সেই মরা বসন্তের শরীরে। দ্বিতীয় বসন্তটি তখন ঘাড় গুঁজে ওঠানামা করছে। আড়াল হচ্ছে সেই অসীম যাত্রার নিঃশব্দ বাঁশিটি। একটি স্বর্গীয়ফুলের দিকে যাত্রা করছে যুধিষ্ঠির আর তার সারমেয়। একটি অনন্ত লোভের দিকে যাত্রা করছে যুধিষ্ঠির আর তার সারমেয়। একটি অনন্ত যাত্রার দিকে যাত্রাপালা করছে জগতের সমস্ত যুধিষ্ঠির আর তাদের অস্থির সারমেয়দল।


যে-যাত্রার কথা এখানে বলা হচ্ছে, তা দ্ব্যর্থক হতে পারত। কিংবা বহু-অর্থক? পাঠক নিজেই তার সাব্যস্তকারী। লেখকের দোয়াতে ব্যাখ্যার লাশ নির্বাক। লেখকের আস্ত কলমটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে তাঁরই হৃৎপিণ্ড। রক্ত পাম্প করার যে-প্রত্যাশিত যন্ত্রটি লেখকের প্রতি শিরায় প্রতি কোশে জীবন পৌঁছে দিচ্ছে মিলিসেকেন্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, সেই যন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা পড়ে থাকে সাদা পাতায়— একটি বিকল জাহাজ যেন একবুক অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। ডেকে দাঁড়িয়ে লেখক। কিংবা রবিনহুড। হাতে দূরবিন। মগজে বাঁচার নিরুত্তাপ চিন্তা তার হাত-পা-লেজ কুকুরের মতো গুটিয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অলস। জাহাজের চারিপাশে শুধুই নৌকা। লাইফবোট নয়, নিছক কাগজের সাদা সাদা নৌকা। যেন এক-একটি শ্বেতশুভ্র রাজহংস। সরস্বতীর কাপড় ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়েছে দেশান্তরে। ডেকের রবিনহুড স্থিরনেত্রে দেখছে কীভাবে অজস্র সাদা রাজহাঁস দেশান্তরে চলেছে। কীভাবে তারা যাবতীয় রঙের পালক খসিয়ে ফেলে কষ্টের বজরা বানিয়ে নিজেদের ছুড়ে দিচ্ছে আকাশে। একে একে। দূরে পাহাড়ের মাথায় স্তব্ধ কুটির। কালিদাস একমনে যক্ষ রচনা করে চলেছে। মৃন্ময় যক্ষ। সারি দিয়ে দাঁড়ানো। তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ভাঁজ হওয়া সাদা মেঘের দল। ওরফে রাজহংস। ওরফে কাগজের নৌকো। রবিনহুডের দূরবিনের কাচ ঝাপসা হয়ে উঠছে জমাট বাঁধা উপেক্ষার ধোঁয়ায়। এরকম অবস্থায় সিগারেট ছাড়া রবিনহুডের আর কোনো সঙ্গী থাকার কথা না। এরকম অবস্থায় একটি যাত্রা কত-অর্থক হয়ে উঠতে পারে? রবিনহুড তা জানতে চায় না।


জানা এবং অজানার মধ্যবর্তী যে-রাস্তা, তার সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকো তুমি। তোমার চোখ রবিনহুডের। পা-দুটো যুধিষ্ঠিরের। আর তোমার লেজ, যেটা আমি ছাড়া আর কেউ কখনো দেখতে পায়নি, তা সারমেয়র। একটি অজানার প্রতি নির্মিত অদৃশ্য সিঁড়ির দিকে উদাস তোমার চোখ। যাকে পড়তে চেয়ে রবিনহুড দূরবীন কিনে ফেলেছিল তার হৃৎপিণ্ড বন্ধক রেখে। তোমার যুধিষ্ঠির পা-দু-টি ঘুঙুরহীন— যে-অমৃতশব্দের ভারকে তুমি বিক্রি করেছ বসন্তরোগ চিকিৎসকের ক্যাম্বিসব্যাগের কাছে। অতঃপর তুমি একটি ভারহীন প্রাণী। সারমেয়র মতোই। জানা থেকে অজানার দিকে ধাবিত হওয়ার পথে তুমি ভারশূন্য। তোমার সারমেয় ভারশূন্য। বসন্তঋতুর বাতাসের মতো দায়হীন। আর সেই ভারশূন্যতার যাত্রাপথে দ্বিতীয় একটি তীব্র গতিসম্পন্ন হৃৎপিণ্ড কিংবা বসন্তকালীন নিঃসঙ্গতা তোমার গতিরোধ করছে। তোমার যুধিষ্ঠির পায়ের ছাপ নিঃসঙ্গতার শরীরে ধাক্কা লেগে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঘনিষ্ঠ সারমেয়র ডাক তোমাকে গন্তব্যের ফুল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারছে না। পথ দেখাতে পারছে না। একটি নিঃসঙ্গতার ভেতরে যে-স্থিতিশক্তির ভাণ্ডার, তা তোমার গতিজাড্যকে চূড়ান্ত হারিয়ে দিচ্ছে। তুমি হতাশার সিঁড়িতে ধপ্‌ করে বসে পড়ছ। তোমার সারমেয় তোমার পায়ের কাছে লেজ গুটিয়ে। তোমার এই পরাজয়ের আনন্দ, রবিনহুডের পরাজয়ের আনন্দ থালায় সাজিয়ে এগিয়ে আসছে দ্বিতীয় সেই জেদি বসন্তঋতুটি। রোগের পুষ্পবৃষ্টি দিয়ে তোমার বরণ হচ্ছে সুমধুর। হে প্রেমিকা, হে জগতের সমস্ত দুর্বার পতঙ্গপ্রেমিকার দল— একটি যাত্রা কি শুধুই নিছক একটি যাত্রা হতে পারে না?

Categories
2021-Aug-Poem

রাজর্ষি মজুমদার

পশ্চিমঘাটের গান


কারখানা আজকের মতো শেষ— ফেরবার পথে তুমি আমি চলো পাহাড়ের দিকে যাই— চলো নিঃশব্দে টিটি পাখিদের বাসা খুঁজে দেখে আসি তাদের বিশ্রাম।

পুরোনো মানুষের গুহা পার হয়ে ডান দিকে গেলে সমস্ত প্রান্তর দৃশ্যমান হয়ে আসে—
তুমি সে-সব জানো। তুমি জানো বৃষ্টির পর ঘনশ্যাম মেঘ করে আসে বিরহের গায়ে, দু-একটি পোকা ওড়ে চিরন্তন তাপের সন্ধানে— তুমি ঠিক জানো প্রত্যেকের নাম— বুকের নিকটে এনে তাদের যাত্রা পূর্ণ করে দাও।

আর আমি কাঠ জড়ো করে রেখেছি গুহায়—
বৃষ্টি নামলে ফের আগুন জ্বালাব।


টুংটাং ভেসে আসছে নির্মীয়মাণ বহুতল থেকে, তার পেছনের আকাশ এখনও ধূসর— এবার কি তবে বৃষ্টি হবে? এবার কি আমরা খাবারদাবার সাজিয়ে বসে থাকব বারান্দায়?

সকাল হলে এই কিশোর শহরটির রাস্তায় নেমে আসে উড়ুক্কু ভেড়ার পাল— আর্দ্র বাতাসের স্পর্শে তাদের ডানাগুলো অদৃশ্য হয়ে থাকে, আর মেষপালকটি ঠিক যেন মারাঠি যুবা— পশ্চিমঘাটের সবুজ ঢালগুলি বেয়ে সিধে নেমে এসেছে এই কংক্রিটের রাস্তায়। হলদেটে পশম নিয়ে তারা এগলি সেগলি চক্কর কাটে ক্রমাগত— মেঘ করে এলে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়।

সারাদিন আমরা এই ঘরে গান শুনি— শুয়ে শুয়ে ভেড়াদের গুনে চলি রোজ।


ছোটো শহরের মাঝে খুন হয়ে গেছে সদ্য যুবতি— সেই রহস্যকাহিনি আমাকে বিব্রত করে। অজানা গল্পে বুঁদ হয়ে অভ্যাসমতো খুঁজে বের করি কার কী অভিপ্রায়— কুয়াশায় কোন গাড়ির আলো দৃশ্যমান ছিল— কেনই-বা প্রেমিকটি বিছানা ছেড়ে সন্তর্পণে বেরিয়ে গেছিল বাড়ির থেকে।

নানান প্রশ্ন ও উত্তর জানালাভরা এই ঘরটিতে জেঁকে বসে— ধোঁয়ার মধ্যে ফুটে ওঠে কুহকের কল্পনাজাল। সাড়া নেই ভেবে তুমি এসে দেখ অনুতপ্ত যাজকটি এককোণে বসে কাঁদছে— গোয়েন্দা পরিষ্কার করে নিচ্ছে ব্যবহৃত পিস্তলখানি— ঝরনার মাঝে পড়ে থাকা মেয়েটির চোখ খেয়ে যাচ্ছে সোনালি মাছেরা।

Categories
2021-Aug-Poem

সুতপা চক্রবর্তী

গ্রামের নাম শঙ্খনীল, নদীর নাম স্যেন


আমাদের দু-জনার স্নানযাত্রার সাক্ষী একমাত্র এই নদী।

এখন মধ্যরাত। পৃথিবীর কেউ তা
জানে না। জানে না কোনো
আচাভুয়া পাখি। এই যে নদীর
ধারে বসেছি আমরা, আর সারা
আশমান জুড়ে বিকট পূর্ণিমা
অঝোরে ঝরে পড়ছে আমাদের শরীরে
দেখ, কেউই তা দেখছে না।
আমরা কীভাবে নিজেদের
আড়াল করেছি, কীভাবে একে
অপরের দিকে ছুড়ে মারছি মুঠো
মুঠো বৃষ্টিস্নান
তা দেখার কোনো চোখ নেই। তা
শোনার কোনো কান নেই।
পৃথিবী এখনও দৃষ্টিহীন।
পৃথিবী এখনও শ্রবণশক্তিহীন


এসো, এই নদীর ধারে দু-জনার
বৃষ্টি সাজাই। ধরো, একখানা
কুঁড়েঘর, বাঁশের বেড়ি। এ-গ্রামের
নাম শঙ্খনীল । নদীর নাম স্যেন।
সে-নদীর ধারে আমাদের সংসার।
অবিরাম জোছনা পড়ে। অবিরাম
বৃষ্টি পড়ে। আমাদের সাতপুত্র
ডাগর ডাগর। আমি তুমি জোছনা
খাই। বৃষ্টি খাই।
রাজা, ওগো রাজা, এসো এসো,
এই নদীর ধারে দু-জনার বৃষ্টি সাজাই


বৃষ্টি সাজাতে গিয়ে মনে পড়ল
এখানে, এই নদীর ধারে বসে
আমাদের সারারাত ভেজার কথা
ছিল। এখন কি বৃষ্টি হবে, রাজা?
তোমার শরীরে এত আমার গন্ধ
কেন? আমার শরীরে এত
তোমার গন্ধ কেন? যদি কেউ টের
পায়! লুকোও রাজা, নিমেষে
লুকোও। তোমার ভেতরে
লুকোও আমায়


শোনো না। দাঁড়াও এবার। একটা
চুমু খাই!

কত কত বিরহের পর আমাদের
দেখা হল, রাজা! যত বলি তত
যেন কম পরে ভাগে। আমার
ভাগে তোমার ভাগে, সব
মিলেমিশে একাকার এখন।
চারদিকে তুমুল বৃষ্টি। তুমুল
তুফান। রাজার শরীরে আমি
আঁকি সংসার। সংসার। নিরাকার।
রাজা, রাজা, ও আমার জন্মের
রাজা। এসো, আচমন করি তোমার


দেখ, এই নদী এই দীর্ঘ রজনী
আমাদের কীভাবে আগলে
রেখেছে!

তুমি পরজন্মের কাছে মানত
করো আমারে। অথচ প্রতিটা
জন্মেই আমি এসে ধরা দিয়ে
যাই। রেখে যাই আমার ছাপ।
তোমার শরীরে দিয়ে যাই
আমারই বৃষ্টি, বন্যা। কী আবেশে
সেখানে ঘাই মারো তুমি! ঘাই
দেও আমারে। বোঝো না জন্ম। বোঝো না ইঙ্গিত। আমিই তো
তোমার একমাত্র শেকল,
সাতনরী সোনার হার। ওহ্ রাজা,
মানত করো। মানত করো। মানত
করো আমারে বার বার