Categories
2021-Utsob-Story

মধুময় পাল

কলোনি ডায়েরি

[এই লেখা একটি ডায়েরির কয়েক পৃষ্ঠা৷ ডায়েরির লেখক অতুলকথা বাঙাল৷ কারো কৌতূহল হতে পারে এমন অদ্ভুত নাম কেন? পূর্ববঙ্গের কিশোরগঞ্জে তিনপুরুষের ভিটে থেকে উচ্ছেদ হবার পর নলিনীকুমার বসু ভারতে আশ্রয় নেন৷ বিখ্যাত কোনো নেতা বা গুরুর আশ্রয় নেওয়ার মতো নয় একেবারেই৷ প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে শেয়ালদা স্টেশনে লক্ষ দেশভিখারির ল্যাপটালেপটি ভিড়ে নিজেদের কোনোরকমে গুঁজে দেওয়া৷ ‘নিজেদের’ মানে নলিনীকুমার, তাঁর স্ত্রী, কন্যা ও নাতি৷ পালানোর সময় নাতির বয়স ছিল চারমাস৷ এই স্টেশনেই দীনভিখারি-অনুষ্ঠানে নামকরণ হয় তার৷ কোটালিপাড়ার ডাকসাইটে ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান অব্যয়ানন্দ শিশুর নাম রাখেন ‘অতুলকথা’৷ আর নলিনীকুমার নতুন পদবি দেন ‘বাঙাল’৷ ছিলেন ‘বসু’৷ যার দেশ যায়, তার সব যায়৷ পুরোনো পদবি থাকে কীভাবে? তাছাড়া, এরপর তো সবাই ‘বাঙাল’ ডাকবে, শোনার অভ্যাস হয়ে যাক শিশু থাকতেই৷ অব্যয়ানন্দও খেদা-খাওয়া৷ তিনি ১৯৫২ সালে নলিনীকুমারের কাছ থেকে দু-টাকার পুরোহিত-প্রণাম আদায় করেন এই নামকরণের জন্য৷ ডায়েরিতেই এ-কথা লিখিত আছে৷ অতুলকথার ডায়েরি তিরিশ পরিচ্ছেদের৷ এখানে তার একটি দেওয়া গেল৷ নামকরণ স্বয়ং অতুলকথার৷]

উত্তরের জানালা খোলা৷ আশ্বিনের আকাশে মেঘের জমায়েত আলো শুষে নিচ্ছে৷ বৃষ্টি নামবে কোনো সময়৷ শোবার আগে পর্দা আধাআধি টেনে দিয়েছে শিশির৷ বালিশে মাথা রেখে নাটকের বইটা পড়তে পড়তে চোখের পাতা ভারী হবে, হাই উঠবে, পাশ ফিরে আরামের কোল নেবে শরীর, ভাতঘুমে ডুবে যাবে— এরকম ভেবেছিল সে পর্দা টানতে টানতে৷ বিছানায় বসে বইয়ের সতেরো নম্বর পৃষ্ঠা খোঁজে৷ সতেরো পায়৷ কিন্তু সেই দৃশ্য ও সংলাপ নেই৷ তবে কি পনেরো, নাকি উনিশ? ডান দিকের পৃষ্ঠায় আছে ভুবনপ্রসাদের সংলাপ: তোমাকে আমি সম্মান দিয়েছি, মর্যাদা দিয়েছি, অধিকার দিয়েছি, ভাষা দিয়েছি৷ ভুলে যেয়ো না তুমি ভাষাহীন ছিলে৷ তোমাদের কখনো ভাষা ছিল না, থাকে না৷ আমি, এই ভুবন সিংহ দিয়েছি৷ কথা ফুটিয়েছি করতলে রেখে যত্নে আদরে৷

ডান দিক ধরে খুঁজতে খুঁজতে সংলাপটা পায় শিশির আরও ছ-পৃষ্ঠা পর৷ একবার ভুবনপ্রসাদ হওয়ার চেষ্টার মধ্যে দু-বার হাই ওঠে৷ ভুবনপ্রসাদের ভারী আওয়াজে হাইয়ের হাওয়া ঢুকে পড়ে৷ বই সরিয়ে রাখে সে৷ দূর থেকে ভেসে আসে আকাশের গুমগুম৷

আধোঘুমে সে শুনতে পায় নীলিমার সংলাপ: ভাষা যখন দিয়েছ, কথা যখন ফুটিয়েছ, শুনতে তো হবেই৷ শুনবে না কেন? আমি অন্য কাউকে শোনাব? তোমার ভাষা, তোমার কথা, মালিক তুমি৷ তোমারই হাতে তুলে দেব তোমার দান৷ যদি আর কাউকে শোনাই, যদি আর কারো সামনে বেজে উঠি, সইতে পারবে কি? পারবে না৷ গর্জন করে উঠবে৷ বলবে, তুমি আমার৷ শুধু আমার৷ তোমার দখলের কথা মনে করিয়ে দেবে৷ মনে করিয়ে দেবে আমি তোমার একার সম্পত্তি৷ হে প্রিয়, হে অন্তরতম, তুমি অধিকার দিয়েছ, ভাষা দিয়েছ, সে-সবই তোমার ভোগের জন্য৷

শিশির একটা ছবিতে দাঁড়ায়৷ সে নিলীমাকে দেখতে পায়৷ তার খুব কাছে৷ পরিপাটি শরীরের ওপর রচিত মুখশ্রী৷ চোখ তুলে বলে, আমার সবই তোমার জন্য৷

ঘুমটা সরে সরে যায়৷ নিলীমার রোল-টা লাভলি পেতে পারে৷ লাভলিকে পেতে পারে শিশির৷ ক্লাবে দু-বার এসেছে লাভলি৷ এক কর্মকর্তার পছন্দের নারী৷ পরিচয়ে বলে, অমুকের বোন, আমারও বোনের মতো৷ মধ্যবিত্ত বাঙালির ঢ্যামনামি৷ কর্মকর্তা লাভলিকে খাবে৷ জানা কথা৷ এরকম হয়ই৷ এরকমই হয়৷ শিশিরও খাবে৷ সে সিলেক্ট করেছে৷ ডিরেক্টররা পেয়ে থাকে৷ শিশির ডিরেক্টর৷ উচ্চারণ পরিষ্কার৷ রিফিউজি মেয়ে হলেও পূর্ববঙ্গের টান নেই৷ গলার জোর আছে৷ কলেজে পড়ার বয়স৷ পড়ে কিনা জানা নেই৷ পড়বার কথা নয়৷ গরিবের ঘরে বই বড়ো আপদ৷ মেয়েটি হয়তো শেখেনি অনেককিছুই, আড়ষ্টতা নেই চলাফেরায়৷ প্রথম দিনের রিহার্সালেই বুঝিয়ে দিয়েছে৷ হে প্রিয়, হে অন্তরতম, তুমি অধিকার দিয়েছ, ভাষা দিয়েছ, সে-সবই তোমার জন্য৷ পরিপাটি শরীরের ওপর রচিত মুখশ্রী৷ এরকম শরীর শিশিরের খুব লাগে৷ হাসি হতে পারেনি৷ রূপ থাকাটাই যথেষ্ট নয়, রূপকে দাঁড়াতে হয়৷

গুমগুম আরও ভারী হয়ে কাছাকাছি৷ উত্তরের জানালা দিয়ে অন্ধকার ঢুকছে ঘরে৷ ভর দুপুরে ঘনিয়ে এল সন্ধ্যে৷ আকাশ তোলপাড় করে মেঘ ডাকল৷ বৃষ্টি হবে৷ খুব বৃষ্টি হতে পারে যদি হাওয়ার টানে কেটে না যায়৷ ভোর থেকে আকাশ মেঘের হাট হয়ে ছিল৷ বেলায় বেলায় বেড়েছে ভিড়৷ ভাতঘুমের হাই মিলিয়ে গেছে৷ বেশ চনমনে লাগছে৷ বাদলদিনের একটা অন্যরকম এফেক্ট তো আছেই৷ হাসি আসতে পারে এখন৷ এখনও কি ঠাকুরঘরে? বয়স যত বাড়ছে, ঠাকুরবাতিকও বাড়ছে৷ হয়তো এখনও খাওয়া হয়নি৷ তারপর বাসন মাজতে বসবে৷ কাজের লোকের বাসনমাজা পছন্দ হয় না৷

মেঘের জমায়েত এ-মাথা ও-মাথা তখনই, সবেদুপুরে শিশির যখন মান্নার চায়ের দোকানে, অন্যদিনের মতো কাগজে ছোটো খবর খুঁজছিল৷ যেমন আইন-আদালত, মধুচক্র, অবৈধ সম্পর্ক৷ কুচো কুচো খবরে মুঠো মুঠো প্রাণ৷ চায়ের দোকান একটু হালকা হলে শিশির কুচোতে ঢুকে যায়৷

মান্না এটা জানে৷ সে পাখা বন্ধ করে দেয়, জোরে ঝাঁটা চালিয়ে ধুলো ওড়ায়, ঝুল ওড়ায়৷ উনুনে কাঁচা কয়লা গুঁজে দেয়৷ চোখ-জ্বালানো নাক-জ্বালানো ধোঁয়া ওঠে৷ তারই মধ্যে বসে শিশির রস খোঁজে৷ আজ মান্না বলেছে, শিশিরবাবু, আকাশ ভাইঙা পড়তে চায়৷ নামলে ছাড়া অনিশ্চিত৷ আমারে ঘরে যাইতে হবে হাইট্যা৷ পড়লেন তো আধাঘণ্টা৷ পাইছেন নিশ্চয় কিছু৷ ঘরে গিয়া ভাবেন৷ বউদির লগে গল্প করেন৷ শিশির মান্নার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছে৷ বলেছে, সাহস বাড়ছে তোমার৷ আজকের কাগজ সাদা৷ কোনাখামচিতেও কিছু নেই৷

নীল আলো ঝলসে উঠল জানালায়৷ চড়চড় শব্দে আছড়ে পড়ল বাজ কাছেপিঠে৷ শিশির কুঁকড়ে যায়৷ সন্ন্যাসীর মা ঝলসে দাঁড়িয়ে আছে নিমগাছে৷ প্রায় ছ-ফুট, চওড়া কাঠামোর শরীর বিদ্যুতের আলোয় আংশিক দেখে নাথুরামের কাঠের দোকানের পাল্লায় ছিটকে পড়েছিল শিশির৷ সেদিনও দুপুরে রাত্রি নেমেছিল৷ জানালাটা বন্ধ করা দরকার৷ বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে আপাতত পর্দা টেনে দেয়৷ আকাশে মেঘের কুরুক্ষেত্র৷ বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে শিশির৷

‘খুট’ শব্দটা কানে এল৷ হাসি এল তবে৷ সদ্য বিয়ের পর এভাবেই শুতে আসত রাতে৷ শ্বশুর-শাশুড়ি কয়েকদিন ছিল তখন এখানে৷ ননদ ছিল৷ এখন তারা নেই৷ শ্বশুর-শাশুড়ি তো সপ্তাহখানেক বাদেই পাকিস্তানে৷ শেরপুরে বিরাট ব্যাবসা৷ বারোপাল্লার দোকান৷ অবিনাশের ওপর ছেড়ে দিয়ে আসা৷ খুবই বিশ্বস্ত অবিনাশ৷ তবু৷ দেশভাগের পর দেশটা আর আগের মতো নেই৷ ছেলের বিয়ে দিয়ে তারা চলে গেছে৷ ননদ চলে গেছে নিজের বাছাই-করা যুবকের সঙ্গে৷ শিশিরের এখন দুই মেয়ে৷ ওরা স্কুলে থাকলেও হাসি এমনভাবে ঘরে ঢোকে যেন এতটুকু শব্দ না হয়৷ সদ্য বিয়ের সহবাসের সেই লজ্জা আজও ডিঙোতে পারেনি৷ স্বামীর বিছানায় শব্দহীন এই আসার চেষ্টার একটা ‘খুট’ শব্দ কী ভীষণ রমণীয় ও কামনাতুর৷ হাসির স্তন দুই সন্তানের ধকলের পরও তেমনই সুডোল, পাণিগ্রাহী৷ শিশিরের বড়ো প্রিয় খেলার জিনিস৷ বড়ো প্রিয় হাসির ঠোঁট, সুগঠিত পা, কম্পনময় যৌনযাপনভঙ্গি৷ স্তনের ভাঁজে শিশিরের মাথা সে টেনে নেয়৷ ঝুঁকে পড়ে সবটুকু আদর নিয়ে৷ লাভলিরা কিছুক্ষণের৷ ঘরের বাইরের৷ সব সম্পর্ক ঘরের হয় না৷ শিশির মুখ গুঁজে চুপ করে পড়ে থাকে হাসি ছোঁবে বলে৷

বৃষ্টি নেমেছে৷ মেঘের যুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত৷ পাশের বাড়িতে বিরুদের টিনের চালে ঝমঝম হচ্ছে৷ কুকুরের কুঁইকুঁই শোনা গেল৷ কারো বারান্দায় বা রান্নাঘরের দাওয়ায় উঠেছে ভেজা এড়াতে৷ তাড়ানো হচ্ছে তাকে৷ শিবরামদের বাড়ি থেকে কাঁসরের আওয়াজ এল৷ ধনাদের গোয়ালে গোরু ডাকল৷ নিমুখুড়ো কাশছে আর বউকে ডাকছে চেঁচিয়ে৷ দ্বিতীয় পক্ষ, বয়স কম, সাড়া দিতে চায় না৷ খুড়ো এরপর খিস্তি ছোটাবে৷ হাসি তবে কি আসেনি? ‘খুট’ শব্দটা মনের ভুল? শিশিরের চাওয়ার মধ্যে বেজে উঠেছিল? হয়তো এখনও ঠাকুরঘরে৷ কিংবা খেতে বসেছে৷ নিজের হাতে বেড়ে একা একা খাওয়া৷ কিংবা খাওয়ার পর বাসন মাজতে বসেছে৷ এমনও হতে পারে শুকনো কাপড় তুলে গুছিয়ে রাখছে আর ভেজাগুলো মেলে দিচ্ছে বারান্দায়৷ কোনো ভাড়াটে হয়তো বলল, বউদি, ঘরে জল পড়ছে৷ কোনো ভাড়াটে হয়তো বলল, বউদি, ভাঙা পাল্লা দিয়ে ঘরে জল ঢুকছে৷ কেউ বলল, দিদি, দেয়াল চুঁইয়ে জলে মেঝে ভাসছে৷ টালি ভেঙেছে কয়েকটা৷ জানালার পাল্লাও ভেঙেছে৷ সারাবে কীভাবে শিশির? ভাড়াটেরা বকেয়া ভাড়া “আজ দেব কাল দেব” করে৷ পাকিস্তান থেকে টাকা আর আগের মতো নিয়ম করে আসে না৷ পিচচট দিয়ে সাময়িক মেরামতের চেষ্টা হয়েছে৷ টেকেনি৷ দেওয়ালে জল চোঁয়ানো ঠেকাতে খানিকটা জায়গা প্লাস্টার করা হয়েছে৷ কাজে লাগেনি৷ জানালার নতুন পাল্লা বানাতে অনেক খরচ৷ টাকা আসবে কোথা থেকে? ছয় ভাড়া-ঘরের মালিক হলেও শিশির গরিব৷ যেটুকু আছে তা বাড়িওলার ঠাট রাখতে খরচ হয়ে যাচ্ছে৷ মেয়েদের স্কুলের খরচ যোগানো এরপর সমস্যা হয়ে পড়বে৷ এসব ভাবতে শিশিরের একদম ভালো লাগে না৷ একটা দুশ্চিন্তা তাকে অস্থির করে, একটা অসহায়তা তাকে স্থবির করে৷

মেঘের ডাক আর শোনা যাচ্ছে না৷ শিশির বালিশ থেকে মুখ তোলে৷ বৃষ্টির ছাঁটে জানালার পর্দা খানিক ভিজেছে৷ হাসি আসেনি৷ নাকি এসেছিল? শিশিরকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতে দেখে হয়তো ভেবেছে ঘুমিয়ে আছে৷ ডাকেনি৷ না, সেরকম হতে পারে না৷ হাসির অত সাহস নেই৷ থাকলে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারত এতদিনে৷ যে-ঘর থেকে হাসিকে আনা হয়েছে, সেখানে সাহস থাকে না৷ ছোটোবেলা থেকে মেয়েদের বাধ্যতার শিক্ষা দেওয়া হয়, মুখ বুজে মেনে চলার শিক্ষা দেওয়া হয়, ভয়ের শিক্ষা দেওয়া হয়৷ গোড়ার দিকে কখনো কখনো অন্যরকম কথা বলতে চেয়েছে হাসি, প্রতিবাদ করতে চেয়েছে৷ শিশির শাসন জানে৷ সুশাসন৷ শেরপুরের ব্যাবসা থেকে তখন প্রয়োজনের অনেক বেশি টাকা আসে৷ শিশিরের জন্মদিনে উঠোনে মেহবুব ব্যান্ড বাজে৷ ঝুলন পূর্ণিমায় রাধা-কৃষ্ণের পুতুল সোনার গয়না পরে দোল খায়৷ কালীপুজোয় বসনতুবড়ি ভুস করে জ্বলে উঠে আলোয় ভরে দেয় মুহুর্মুহু৷ রানাঘাটের রিফিউজি ঘরের বাবা-হারা মেয়ে কোনোদিন ভেবেছিল তার গায়ে এত সোনা উঠবে? শিশির শাসন জানে৷ সুশাসন৷ এখন আর সেই জাঁক নেই৷ কিন্তু শাসন পোক্ত হয়ে আছে প্রতি ধাপে৷ তোমার যে-ভাষা, সে আমার দান৷ তোমার যে-অধিকার, সে আমারই দেওয়া৷ নাটক জমে যাবে৷ লক্ষ্মীবিলাস রিক্রিয়েশান ক্লাব শিশিরকে ডিরেক্টর হিসেবে চেয়েছে৷ লাভলিকে নিলীমার পার্টটা দিতেই হবে৷ হাসি তবে আসেনি৷ বৃষ্টিভেজা হাওয়া আসছে ঘরে৷ বিছানা থেকে আকাশ যতটুকু দেখা যায় এখনও মেঘলা৷

নাটক নিয়ে মজে থাকার মধ্যে হাসি এল কীভাবে? হাসির আসবার কথা নয়৷ শিশির ভাবে৷ নাটকের সংলাপ পড়ছিল সে৷ হাই উঠছিল৷ ঘুমোবে ভাবছিল৷ মেঘ জমছিল৷ জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছিল অন্ধকার৷ ঘুমটা ছোঁয়া দিয়ে চলে গেল৷ মেঘ ডাকল৷ বিদ্যুৎ চমকাল৷ কাছেপিঠে বাজ পড়ল৷ ভেসে উঠল সন্ন্যাসীর মায়ের দীর্ঘকায় ঝলসানো মূর্তি৷ সে ভয় পেল৷ বালিশে মুখ চাপা দিল৷ একটু পরে দরজায় খুট শব্দ হল৷ হাসিকে চাইল শিশির৷

আবার বৃষ্টি ঝরছে৷ দাপট তুলনায় কম৷ আবহাওয়া দপ্তর বলেছে, দফায় দফায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হবে৷ বজ্রপাতের সম্ভাবনা৷ ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে৷ বিছানা থেকে উঠে শিশির জানালার পর্দা সরায়৷ আলো জ্বালে৷ চোখে পড়ে টেবিলের ওপর একটা খাম৷ চিঠি এল? শেরপুর থেকে? পোস্টাফিসের স্ট্যাম্প নেই৷ হাতে এল কি? খামের ওপর ইংরেজি হরফে শিশির চৌধুরীর নাম৷ খামের একপ্রান্ত সন্তর্পণে ছেঁড়ে৷

বউদি, মেঝে ভেসে গেল৷ এসো দেখে যাও কী অবস্থা ঘরের৷ সারারাত জেগে বসে থাকতে হবে৷

দিদি, আমাদের ঘরটাও দেখে যাও৷ ভাঙা জানালা দিয়ে জলের ছাঁট এসে তক্তপোষ ভিজিয়ে দিয়েছে৷ সরাব কোথায়? শাশুড়িকে রাখি কোথায়? দিদি, আমরা মাসের ভাড়া মাসে মাসে দিই তো! তবু এত ছিদ্দৎ কেন কপালে৷

শিশিরবাবু কই? একমাস ভাড়া দিতে দেরি হইলে কী চোটপাটই না করেন৷ এখন কই তিনি? দরজার সামনে দিয়া বাথরুমের জল যায়৷ আসেন, শুইঙ্গা যান কেমন গন্ধ ছাড়তাছে৷ কী কমু আপনেগো, বড়োলোক মানুষ, পাকিস্তান থেইকা আপনেগো ট্রাংকভরতি টাকা আসে, সোনাগয়না আসে৷ আমরা খেদাখাওয়া পোড়াকপাল, ইচামাছ টুকাইয়া খাই আর বিছার লগে শয়ন যাই, মানুষ ছিলাম পার্টিশনের আগে, পরে আর নাই৷ নেহরু-জিন্নার লালসা আমাগো সব খাইছে৷ ওই শয়তানগুলা না জন্মাইলে দেশের মানুষ দেশেই থাকতে পারতাম৷ এই নরকে উঠতে হইত না৷ শিশিরবাবু, আপনেরা বড়োমানুষ নিজেগো জায়গা কী সুন্দর গুছাইয়া নিছেন৷ আপনেগো ঘরে জল পড়ে? পড়ে না৷ আপনেগো দরজায় গু ভাসে? ভাসে না৷

বাবা থামো৷ কাশি উঠবে৷ ও-সব বলে লাভ কী?

শিশিরের কানে আসে৷ চেয়ারে বসে সে খাম থেকে চিঠি বের করে৷ মায়ের হাতের লেখা৷

মা লিখেছে: আদরের খোকা, প্রথমে তোমরা আমাদের প্রীতি ও শুভকামনা জানিবে৷ আশা করি তোমরা সকলে সর্বকুশলে আছ৷ এইখানকার পরিস্থিতি বিশেষ সুবিধার নহে৷ দিনে দিনে খারাপ হইতেছে৷ পরিস্থিতি অবগত করাইবার জন্য তোমার পিতাঠাকুরের নির্দেশে চিঠি লিখিতেছি৷ কিছুদিন পূর্বে আমাদের দোকানের সম্মুখে বড়োরকমের গোলমাল হয়৷ রাজিবুল মণ্ডলের বড়োছেলে দোকানে আসিয়া বলে যে, তাহার ভাইয়ের জামা ও প্যান্টের অধিক মূল্য লওয়া হইয়াছে৷ তাহারা দল বাঁধিয়া আসে৷ অবিনাশ তাহাদের বুঝানোর চেষ্টা করে৷ তাহারা অবিনাশকে চড়চাপড় মারে৷ ইতিপূর্বে এইরূপ ঘটনা কখনো ঘটে নাই৷ রাজিবুল মণ্ডল আমাদের পুরানা খরিদ্দার৷ তাহার নিকট বহু টাকা পাওনা আছে৷ তোমার পিতাঠাকুর রাজিবুল মণ্ডলকে দেখা করিতে বলিয়াছে৷ সে আসে নাই৷ মাসুদুর রহমান বলিয়াছে, এইরূপ আরও ঘটিবে৷ লোকঠকানো ব্যাবসা আর চলিবে না৷ দরকার হইলে দোকান উঠাইয়া দিবে৷ মারধরও হইতে পারে৷ মাসুদুর প্রকাশ্যে এইসব বলিতেছে৷ তোমার পিতাঠাকুর থানায় গিয়াছিলেন৷ বড়োবাবু ভরসা দিতে পারেন নাই৷ বলিয়াছেন, সাধারণ মানুষ আপনাদের উপর ভীষণ চটিয়া আছে৷ আমাদের দোকান হইতে একমাইল উত্তরে করিমসাহেবের মোকাম৷ শুনা যায়, করিমসাহেব এই গণ্ডগোলের পিছনে৷ তিনি অবশ্য স্বীকার যান নাই৷

খোকা, দেশটা আর আমাদের নাই৷ খাতায় কলমে আমরা নাগরিক৷ কিন্তু এই দেশের মানুষ আমাদের স্বীকার করে না৷ বহুকালের চেনাজানা মানুষদের মুখের ভাষা পালটাইয়া গিয়াছে৷ উহারা চায় আমরা যেন এখনই চলিয়া যাই৷ কেন যাইব সে-উত্তর নাই৷

বেশি দূরে নয় বাজ পড়ল৷ শিশির দেখতে পেল সন্ন্যাসীর মায়ের ঝলসানো দীর্ঘ দেহ নিমগাছের হেলানে খাড়া৷

মা লিখেছে: মহাজনের ঘর হইতে আমাদের দোকানে মাল আনিতে বাধা দেওয়া হইতেছে৷ পথে মালের গাড়ি আটকানো হইতেছে৷ পুরাতন খরিদ্দারদের ভয় দেখানো হইতেছে৷ ধারের টাকা আদায়ের আশা আর নাই৷ ধারের টাকা মিটাইতে নিষেধ করিতেছে পাড়ার গউণ্ডাপ্রকৃতির ছেলেরা৷ বারোপাল্লার দোকানের চারিপাল্লা পূর্বেই বন্ধ হইয়াছে৷ এরপর কী হয় ঈশ্বরই জানেন৷ অবিনাশ ভারতে চলিয়া যাইবে বলিয়া মনস্থ করিয়াছে৷ তাহার মেয়ে বড়ো হইয়াছে৷ সেদিনের ঘটনায় সে মর্মাহত৷ সন্তানের মতো ছেলেপুলেদের হাতে চড়চাপড় খাইতে হইবে ইহা সে কোনোকালে ভাবে নাই৷ সেলিম ভাইরা ভরসা দিতে পারিতেছেন না৷ প্রতিবেশীদের মতিগতি ভালো নহে৷ বিভিন্ন জায়গা হইতে খবর পাই হিন্দুরা দেশত্যাগ করিতেছে৷ কোনো কোনো পাড়া হিন্দুশূন্য হইয়াছে৷ আমাদের দেশ আর আমাদের জন্য নিরাপদ নহে৷

শিশিরবাবু, ব্যবস্থা কিছু তো করবেন৷ নাকি এই অবস্থা চলবে৷ শোবার জায়গায় জল, রান্নার জায়গায় জল৷ থাকি কীভাবে? তুলে দিতে চান? আমাদের তুলে দিয়ে বেশি ভাড়ার ভাড়াটে বসাবেন? ঘর মেরামত না হলে আমি আর ভাড়া দেব না, স্পষ্ট বলে দিলাম৷ ক্লাবের কিছু ছেলে আমাকেও চেনে৷

মা লিখেছে: পাড়ায় একটা দমবন্ধ ভাব৷ আমরা প্রায় নিঃসঙ্গ৷ হিন্দুঘর যাহারা আছে তাহারা আমাদের এড়াইয়া চলে৷ বুঝিতে পারি, তাহারা বাঁচিতে চায়৷ কিন্তু বাঁচিতে পারিবে কি? তোমার পিতাঠাকুর উমেশবাবুদের সঙ্গে কথা বলিয়াছিলেন৷ তাঁহারা হুঁ হাঁ করিয়া কাটিয়া পড়েন৷ বুঝা যাইতেছে আমাদের কোনো অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়িতে হইলে কেহ আসিবে না৷ মোহনবাবু পরিষ্কার বলিয়া দিলেন, আমাদের ঘরের মেয়েরা বড়ো হইয়াছে৷ তাহাদের বিপদে ফেলিতে পারি না৷ আপনি তো আপনার পুত্রকন্যাকে ইন্ডিয়ায় আগেভাগে সুব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন৷ তখন তো আমাদের ঘরের কথা ভাবেন নাই৷ এইপ্রকার ভয়প্রদ অবস্থার মধ্যে আছি৷ তোমার পিতাঠাকুরের মতো শক্ত মনের মানুষও ভাঙিয়া পড়িতেছেন৷ তাঁরই নির্দেশে এই পত্র লিখিলাম৷ তোমাদের দুশ্চিন্তা বাড়িবে, জানি৷ তোমার পিতাঠাকুর কহিলেন, দেশ ছাড়িলে উপার্জন বন্ধ হইবে৷ ঘরবাড়ি বেচিয়া ন্যায্য দাম পাইবার সম্ভাবনা নাই৷ বারোপাল্লার দোকানও জলের দরে বেচিতে হইবে৷ নানারকম পাকেচক্রে ফেলিয়া উহারা ন্যায়সংগত দাম দিবে না৷ এইরকম অবস্থায় পড়িতে হইবে কখনো ভাবি নাই৷ জীবনের শেষভাগে আসিয়া এইরূপ হইল৷ ঠাকুর কপালে আরো কী লিখিয়াছেন কে জানে! আমরা ইন্ডিয়ায় গেলে কী অবস্থায় পড়িতে হইবে তাহাও তোমার পিতাঠাকুর ভাবিয়াছেন৷

শিশিরবাবু কি ঘরে আছেন? থাকলে একটু বাইরে আসেন৷ নিজের চোখে দেখে যান৷ বউদিমণিকে বলে কী লাভ! উনি তো আমাদের সুরাহা দিতে পারবেন না৷ দেখে যান জল পড়ে উনুনের মাটি গলে গেছে৷ দুটো ভাত-ডাল ফুটিয়ে নেবার উপায় নেই৷ কিছু মনে করবেন না আপনি নাটক ভালো করেন৷ আমরা নাটক করি না৷ ভাড়া দিই থাকি৷ আমাদের নাটকে নামালেন কেন? ভাড়া কম দিই এই অপরাধে? কত নাটক করেন৷ হাততালি পান৷ দশ-বিশটা টালি বদলে দিতে পারেন না৷

সন্ন্যাসীর মায়ের ঝলসানো দেহটা ভেসে ওঠে৷ শিশির ভাবে, ভাড়াটেরা যদি একসঙ্গে তার ঘরের দরজায় জড়ো হয়, সে কী করবে?

মা লিখেছে: তুমি রোজগারের ব্যবস্থা করিতে পারো নাই৷ চাকরির বয়স আর নাই৷ ব্যাবসা করিয়াছিলে৷ লোকসানে ডুবিয়াছ৷ তোমার স্ত্রী ও দুই কন্যা আছে৷ তাহাদের খরচ ভাড়ার টাকায় কোনোক্রমে এখন চলিয়া যায়৷ কন্যাদের লেখাপড়ার খরচ বাড়িলে চালাইবে কোন উপায়ে? তোমার স্বভাবের দরুন খুকুর ভালো বিবাহ হইতে পারে নাই৷ সে নিজে পাত্র বাছিয়া পালাইয়াছে৷ জামাইয়ের এখন চাকরি নাই৷ তাহাদের কীভাবে চলিতেছে ভগবানই জানেন৷ দোকানের অনেক টাকা তোমাকে দেওয়া হইয়াছে৷ সে-সবই কি নষ্ট করিয়াছ? তোমার পিতাঠাকুর আবার কিছু টাকা পাঠাইবেন৷ আশরফ সাহেবের হাতে৷ একমাত্র তিনিই আমাদের শুভানুধ্যায়ী৷ তিনি কথা দিয়াছেন দোকানের ভালো দাম মিলিবে৷ সম্ভবত তিনিই কিনিবেন৷ এই পত্রও তাঁহার হাতেই পাঠানো হইল৷ তুমি শীঘ্র একটা উপার্জনের ব্যবস্থা করো৷ মনে রাখিবে, গহনায় হাত দিবে না৷ কোনো কারণেই না৷

হাসিকে ও দুই নাতনিকে আমাদের শুভাশিস জানাইবে৷ পত্র দীর্ঘ হইল৷ তোমার পিতাঠাকুরের নির্দেশমত লিখিলাম৷
ইতি— আশীর্বাদিকা মা৷

তার মানে, হাসি ঘরে এসেছিল৷ চিঠি রেখে গেছে৷ শিশিরকে ডাকেনি৷ সাহস বেড়েছে৷ এরকম চিঠি আগেও এসেছে৷ তার কোনো একটি বা দু-টি কি পড়েছে হাসি? শিশিরই হাসিকে পড়তে শিখিয়েছিল। সে তখন বালিকা বধূ৷ সাহসটা তবে শিশিরই দিয়েছে?

আমি অতুলকথা বলছি:
বাজবাদলের দুপুরে শিশির চৌধুরীর ঘরের ভেতরকার ঘটনা শুনেছি কানুদার মুখে৷ গোলামালিকের ছেলে কানু দাশের সঙ্গে বিশেষ সখ্য ছিল শিশির চৌধুরীর৷ দু-জনে অস্থানে কুস্থানে যেত৷ টাকা জোগাত কানুদা৷ বাজবাদলের দুপুরের ঘটনার বিবরণে কিছু প্রক্ষেপ থাকতে পারে৷ যেমন, কানুদা নিজের মতো করে কিছু অংশ ঢুকিয়ে দিয়েছে৷ আমিও হয়তো কিছু মিশিয়েছি৷ শিশির চৌধুরীর স্ত্রী হাসিকে আমি বহুবার দেখেছি৷ খুবই সুন্দরী৷ মুখে সবসময় হাসি৷ কথা বলতে শুনেছি কমই৷ আর পাঁচজনের থেকে আলাদা৷ সন্ন্যাসীর মা-র দীর্ঘ ঝলসানো শরীর আমি দেখেছি৷ ভয়ংকর৷ চিঠিটাও হয়তো দেখেছি৷ কারণ, একটা প্রশ্ন আমার মাথার ভেতর মাঝে মাঝেই গুঁতো মারে, হিন্দু আর মুসলমানদের সম্পর্কটা হঠাৎই এতটা বিষিয়ে গেল? এতদিনের মানুষ পরিচয়টা মুছে গেল? এরকমটা হতে পারল কেন? শুধুই রাজনীতির প্রতিক্রিয়া? নাকি এতদিনের সম্প্রীতির ন্যারেটিভটা নিছক মনভোলানো?

Categories
2021-Utsob-Art

হিরণ মিত্র

সিরিজ নাম: শৈশব

 

Categories
2021-Utsob-Translation

বিনোদ কুমার শুক্ল

ভাষান্তর: রূপায়ণ ঘোষ

আমিই সেই মানুষ

আমিই সেই মানুষ
যে এই নিস্তব্ধ উপত্যকায়
মানুষের আদিম অনুভূতিগুলির মধ্যে
ক্রমাগত প্রশ্বাস নিতে থাকি।
খুঁজতে খুঁজতে একটি পাথর তুলে ফেলি
যেন সুদীর্ঘ অতীতের প্রস্তরযুগ থেকে তুলে আনা সেই পাথর!
কলকল্লোলে বয়ে যাচ্ছে যে নদী
হাতের আঁচলে তার ঠান্ডা জল পান করি,
যেন প্রাচীন পৃথিবীর জলে-
লুপ্ত স্বাদ জমা হয় অনিঃশেষ সময়ের মতো।
নদীতীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি
ইতিহাস-রহস্য ভাঙি, সম্মুখে প্রকৃতির বিবিধ পাকদণ্ডী
এই নিঃশব্দ প্রান্তরে সন্ধ্যা এলে
তার প্রথম নক্ষত্রগুলি রাখা থাকা কেবল আমার জন্য…
এখানে চতুর্দিকে শুধু প্রকৃতির নিসর্গধ্বনি
এই বিপুল চরাচরে যদি কোনো শব্দ বলে উঠি অজ্ঞাত স্বরে
জেনো সে আমার ভাষা নয়,
সে-ভাষা বেঁচে আছে মানুষের নিসর্গ-বিভঙ্গে…

যারা কখনো আমার ঘরে আসবে না

যারা কখনো আমার ঘরে আসবে না
আমি সাক্ষাতের জন্য
তাদের সকলের কাছে চলে যাব
দূরের স্রোতস্বিনী নদী কখনো আমার ঘরে আসবে না
নদীর মতো মানুষের সঙ্গে পরিচয় করতে
আমি নদীতীর ধরে হাঁটব…
সেখানে কিছুটা সাঁতার কেটে, ডুবে যাব অকস্মাৎ!

পাহাড়, টিলা, পাথুরে প্রান্তর এমনকী সরোবর
অসংখ্য বৃক্ষ, শস্যখেত—
কখনো আমার ঘরে আসবে না
শস্য আর প্রান্তরের মতো মানুষদের জেনে নিতে
গ্রামে গ্রামে, অরণ্যে-গলিতে চলে যাব।

যারা ক্রমাগত শ্রমের কারুকার্যে ব্যস্ত
অবসর দেখে নয়
আমি তাদের সঙ্গে পরিচয় করব জরুরি শ্রমের মতো…

এইসমস্ত অভিলাষগুলিকে আমি, অন্তিম চাহিদারূপে
প্রারম্ভ ইচ্ছের মতো সাজিয়ে রাখব…

আমার জঠরে আমার মগজ

আমার জঠরে আমারই মগজ
পেটের ভিতর নিজস্ব সঙ্গমে গর্ভস্থ।
এই কায়াবিদ্ধ উদর,
নিজেরই উচ্ছিষ্ট খেয়ে খেয়ে
বেড়ে উঠি—
প্রতিনিয়ত ছুঁয়ে যাওয়া এই জীবন।
ক্রমশ মাংসের বিশ্বাসে খেয়ে ফেলি হাতের নখর
চেতনার মায়ায় ভাসে ক্ষুধা ও আস্থার কারুকাজ!

এখানে আমার জঠরে আমারই মগজ
মাংসাশী অরণ্যের মতো বেড়ে ওঠে…

হতাশায় এক ব্যক্তি বসে পড়েছিল

হতাশায় এক ব্যক্তি বসে পড়েছিল
ব্যক্তিটি সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না
হতাশা সম্পর্কে জানতাম,
সে-কারণেই আমি লোকটির কাছে গিয়ে
ধরবার জন্য নিজের হাত এগিয়ে দিলাম
আমার হাত ধরে লোকটি উঠে দাঁড়াল
লোকটি আমার সম্পর্কে জানত না
আমার হাত এগিয়ে দেওয়াটা জানত।
দু-জনে পাশাপাশি অনেকটা হেঁটে গেলাম
আমরা দু-জনে কেউ কাউকে জানতাম না
পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া সম্পর্কে জানতাম…

একটি অচেনা পাখি

একটি অচেনা পাখিকে দেখে
পাখিদের প্রজাতির মতো মনে হল
যুদ্ধের আগেই বারুদের বিস্ফোরণের আওয়াজে
ভীত সন্ত্রস্ত যে এখানে এসে পৌঁছেছে।

হাওয়ায় এক অচেনা গন্ধ ছিল
প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য
কয়েক পা দ্রুত হেঁটে গিয়ে
আবার শ্বাস নেওয়া গেল।
যে-বাতাসে প্রশ্বাস নেওয়া সম্ভব
সে-বাতাস বায়ুর প্রজাতির মতো…

একটি মানুষ, মানুষের প্রজাতির মতো
সাইরেনের শব্দ শুনতে শুনতে
গর্তের গভীরে নেমে গেল—
গর্তের মুখেই পায়চারি করা এক গর্ভবতী নারী
মানুষের মতোই একটি জীবের জন্ম দেওয়ার জন্য
গভীর সন্তর্পণে সেই বিপুল কুহরের ভিতর নেমে যায়,
অথচ শোনা যায় কোনো এক মানুষের মৃত্যুধ্বনি।

এভাবে মানুষ হয়ে থাকার একাকিত্বে
মানুষের প্রজাতির মতো সমস্ত লোকেরা অচেনা হয়ে যায়…

রাস্তায় চলার জন্য

রাস্তায় চলার জন্য
যখন উঠে দাঁড়ালাম
পায়ের জুতোর বদলে দেখি
আমি রাস্তায় পা গলিয়ে দিয়েছি।
একটা নয়, দুটো নয়
এরকম হাজারও পথ পালটে পালটে
এবড়ো-খেবড়ো অজস্র রাস্তা ছেড়ে দিই…
অথচ বহু পথ পেরিয়ে
জীবনের কাছে ফিরে আসার ইচ্ছেরা জড়ো হয়,
হয়তো জীবনের শরীর ছুঁয়ে
কোনো রাস্তা চলে গেছে অনির্দ্দেশে—
আমি এবার এমন কোনো জুতো জোগাড় করে নেব
আমার অবাধ্য পা-দুটো যাতে নিখুঁত পরিমাপে ঢুকে যাবে…

নদী কেবল এপারে

নদী কেবল এপারে রয়েছে
অথবা ওপারে;
অদ্ভুত স্বপ্নের ভিতর দেখি
নদী ও প্রেমের মধ্যপ্রবাহ জুড়ে ছায়া পড়ে থাকে-
নদীতে ভিজে গেলে মনে হয়
বর্ষার অবিরল জলে ভিজে উঠি।
ছাতা ফেলে রেখে যদি কখনো বেড়াতে বেরিয়েছি
উন্মাদ বন্যায় উল্টে যাওয়া নৌকোর নীচে দেখি
আমাদের ঘর ভেসে আছে…

ঈশ্বর এখন পরিমাণে বেশি

ঈশ্বর এখন পরিমাণে বেশি
সর্বত্র সে অধিক হয়ে উঠেছে
নিরাকার, সাকার কিংবা তারও অধিক
ঈশ্বর এখন প্রতিটি মানুষের কাছে বেশি পরিমাণে সঞ্চিত
অজস্র ভাগাভাগি শেষে
এখনও অসংখ্য বাকি আছে…
পৃথক পৃথক মানুষের কাছে
ভিন্ন ভিন্ন অধিক, বাকি রয়ে গেছে!
এই অফুরান অধিকের মাঝে
আমার শূন্য ঝোলাটি আরও নিঃশেষ করার জন্য
এক নিখুঁত ভয়-সহ ঝাড়তে থাকি
যেন তা থেকে অনন্ত নিরাকার কিছু ঝরে যায়…

এক বিশাল পাথরের উপর

এক বিশাল পাথরের উপর
আরেকটি পাথর এমন বিভঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল
যেন এই মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে
সে-পাথরের এই মুহূর্তে গড়িয়ে পড়া— অতি পুরাতন ঘটনা
এই মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে— এ এক শাশ্বত ঘটনা
এই মুহূর্তে গড়িয়ে যাবে— এও‌ এক ভবিষ্য-বিবরণ…
অথচ যে-পাথরটির এখনই গড়িয়ে পড়ার কথা
তা যেন কত অযুত সময় থেকে গড়িয়ে পড়ে না,
আর তার নীচ দিয়ে যে নতুন রাস্তা চলে যায়
সে-পথ ধরেই এক রাখাল এসে দাঁড়ায়
কখনো গড়িয়ে না পড়া পাথরের নরম ছায়ায়।

দেওয়ালে একটা জানালা থাকত

দেওয়ালের গায়ে একটা জানালা থাকতো
একটি কুঁড়েঘর, দু-টি ধূসর টিলা, একটি নদী
আর দু-একটি পুকুর থাকত
একটা আকাশের সঙ্গে জুড়ে থাকত সবার ছোটো ছোটো আকাশ
কখনো কখনো মানুষের আসা-যাওয়া ছিল
বৃক্ষ ও পাখিরা ছিল;
জানালার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু থাকত
না থাকার মধ্যে একটা জানালা খোলা থাকত না
থাকার মধ্যে একটা জানালা খোলা থাকত

আর জানালা থেকে দূরে সরে
দেওয়ালের গায়ে একটা মানুষ লুকিয়ে থাকত…

 

Categories
2021-Utsob-Prose

সুদীপ্ত মুখোপাধ্যায় ও সোহেল ইসলাম

জেলের ডায়েরি

আপনি হয়তো কারো কাছে তার বয়স জানতে চাইলেন, যা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন। এবং যে-কেউ খুব সহজেই তার উত্তর দেবে। কিন্তু আপনি যদি কোনো প্যালেস্তানীয়কে তার বয়স জিজ্ঞেস করে বসেন, তার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা বেশ কঠিন ঠেকবে। সে অবাক হয়ে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে, ঠিক যেভাবে ঠান্ডায় জমে যাওয়া গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে পাখি। তারপর নিজে থেকেই বিড়বিড় করে বলতে থাকবে, “সত্যিই তো আমার বয়স কত? আমি কতদিন এই গ্রহে আছি এবং কতদিন বেঁচে আছি?” কিছুটা থেমে সে অবশ্য আপনার প্রশ্নের উত্তরও দেবে, কেন-না প্যালেস্তানীয়রা জন্মের পর থেকে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে অভ্যস্ত হয়ে যান। ও আর একটা কথা ওরা কিন্তু আপনাকে স্যার বলে সম্বোধন করবেন। প্রতিটা কথার শেষে একটা করে স্যার যোগ করতে প্যালেস্তানীয়রা বাধ্য। আর এর অন্যথা হলেই ওদের মার খেতে হয় নয়তো যেতে হয় জেলে। ইজরায়েলি দখলদারদের অত্যাচারে নাজেহাল সারা প্যালেস্তাইন এই চিত্রই দেখে আসছে ১৯৪৮-র পর থেকে। আবার ওই বয়সের প্রশ্নে ফিরে আসি। হ্যাঁ, ওরা আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলে উঠবে, “আমাদের বয়স তিন যুদ্ধ আর দুই ইন্তিফাদা, স্যার। আমি জানি আপনি আমার কথা কিছুই বুঝতে পারছেন না। বুঝতে পারার কথাও না। কিন্তু যে-প্যালেস্তাইনে আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকা… সে-প্যালেস্তাইনে জন্মের পর থেকে যুদ্ধ আর দখলদারিত্বই দেখে আসছি আমরা। আমাদের শৈশব নেই, কৈশোর নেই, আপনাদের বলতে পারার মতো কোনো সুখকর স্মৃতিও নেই। শুধু আছে, ১৯৪৮-এ ‘ইজরায়েল-আরব যুদ্ধ’, ১৯৬৭-তে ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’, ২০০৮-এ ‘অপারেশন কাস্ট লিড বা গাজা যুদ্ধ’, প্রথম ইন্তিফাদা যা ইজরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ১৯৮৭-১৯৯৩ এবং দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা আল-আকসা বা ইজরায়েলের হিংসার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ২০০০-২০০৫। এই ৭৩ বছরের জীবনে প্যালেস্তাইন এত শহিদ দেখেছে, এত ধ্বংস দেখেছে, এত জবরদখল দেখেছে যে নিজের কথা বলতে গিয়ে তার চোখ কান্নায় ঝাপসা হয়ে আসে। স্যার, আমরা শুধু সংখ্যা নই। আমাদেরও তো বেঁচে থাকার অধিকার আছে, ইশকুলে যাওয়ার অধিকার আছে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার অধিকার আছে অথচ ইজরায়েল আমাদের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে তাড়িয়ে দিতে চাইছে আমাদের জন্মভূমি থেকে।

এতক্ষণ যা শুনলেন তা কেবলমাত্র কোনো একজন প্যালেস্তানীয়র বক্তব্য নয়। ১৯৪৮-এর পর ইজরায়েলের দখলদারিত্বে থাকা ৫,১০১,৪১৪ সংখ্যক (জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ি, ২০২০) প্যালেস্তানীয় এবং ইজরায়েলি দখলদারদের অত্যাচারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থীর জীবন কাটানো ৫৬,০০,০০০ সংখ্যক (UNRWA তথ্য অনুযায়ি, ২০১৯) প্যালেস্তানীয়, সকলেই ইজরায়েলের সেনাবাহিনীর অত্যাচারের শিকার। শরণার্থীর কথা যখন উঠলই, তখন চলুন একটু ঘেঁটে দেখা যাক জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত শরণার্থী তথ্যপুঞ্জি। ১৯৪৮ সাল। আপনারা জানলে শুধু অবাক নয়, চমকে উঠবেন, সে-বছর যুদ্ধশেষে প্যালেস্তাইনে বসবাসকারী ৮৫% মানুষের ঠাঁই হয়েছিল জাতিসংঘের তৈরি করা তাঁবুর ঘরে। ১৯৬৭ সালে ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ শেষে দেখা যায়, জাতিসংঘ শুধুমাত্র প্যালেস্তানীয় শরণার্থী রাখার জন্য ৫৯টি ক্যাম্প বানিয়ে ফেলেছে। কেন-না ১৯৬৭-র যুদ্ধ শেষে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া প্যালেস্তানীয়র সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮০,০০০ থেকে ৩২৫,০০০। দীর্ঘদিন ধরে প্যালেস্তানীয়দের শরণার্থী বানানোর খেলায় মত্ত ইজরায়েলকে থামানোর চেষ্টা হিসেবে ১৯৯৩ সালে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপস্থিতিতে ‘অসলো চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। সে-সময়ে ‘অসলো চুক্তি’-কে শান্তি অর্জনের প্রক্রিয়া মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দখলদারির লোভ বেশিদিন চাপা থাকেনি। মন্ত্রণালয়ের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু দখলকৃত জায়গা থেকে সেনা প্রত্যাহার অস্বীকার করে। চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আগের ফর্মেই ফেরে। শান্তিপ্রক্রিয়া অথই জলে ডুবে যায়। কেউ কেউ ‘অসলো চুক্তি’ ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে ‘দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান নীতি’-কেই দায়ী করেন। তবে ইজরায়েলের দখলদারিত্বে নেতৃত্ব দেওয়া এবং প্রিয় যুদ্ধনীতির কারণে এতগুলো মানুষ আজও ঘরছাড়া, দেশহারা। ইজরায়েল তো এই নিয়ে কথা তুলতেই চায় না, একইরকমভাবে তাঁর মিত্র দেশ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ভারত সবাই চুপ। চুপ থেকে এই দেশগুলো শুধু যে ইজরায়েলকেই সমর্থন করছে এমনটা নয়। আসলে সমর্থন করছে ইজরায়েলের প্যালেস্তানীয়দের শরণার্থী বানানোর প্রক্রিয়াকে।

প্যালেস্তাইনের শরণার্থীদের কথা এত অল্পতে বলে শেষ করা যাবে না। দুঃখ যেভাবে বর্ণনা করে বোঝানো যায় না, অনুভব করতে হয়, ঠিক তেমনই হাল প্যালেস্তানীয় শরণার্থীদের। এবার চলুন জেনে নেওয়া যাক, ইজরায়েলের অত্যাচার, হিংস্রতা, অবিচার সহ্য করেও অধিকৃত প্যালেস্তানীয় অঞ্চলে (OPT— Occupied Palestinian Territories) থেকে যাওয়া মানুষগুলোর কথা। যাদের কোথাও যাওয়ার নেই, তাদের কথা। যারা দেশকে একা রেখে, ইজরায়েলের হাতে তুলে না দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিরোধ করে যাচ্ছেন, তাদের কথা। কেমন আছে প্যালেস্তাইন, কেমন আছেন প্যালেস্তানীয়রা― এই প্রশ্নের জবাব এককথায় বললে, “এখানে জন্মের চেয়ে মৃত্যুদিন বেশি”। ক্রমাগত বোমা ফেলে ঘরবাড়ি ধ্বংস, জবরদস্তি দখলদারি, সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে জায়গায় জায়গায় চেকপয়েন্ট (প্যালেস্তাইনের শুধুমাত্র ওয়েস্ট ব্যাঙ্কেই চেকপয়েন্টের সংখ্যা ৫৩৯) বসিয়ে কাগজ দেখার নামে হয়রানি, দিনের পর দিন কোনোরকম চার্জ বা বিচার ছাড়াই ‘প্রশাসনিক বন্দি’ করে রাখার মতো শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত ইজরায়েল তার ন্যূনতম বিবেককেও বিসর্জন দিয়েছে। ইজরায়েলের বর্তমান কার্যকলাপ দেখলে বা নারীদের উপরে, শিশুদের ওপর অত্যাচার দেখলে আপনার মনে প্রথমেই যে-কথা উঠে আসবে, তা হল ‘ইজরায়েলের কি মন নেই?’ যদিও তাতেও ইজরায়েলের কিছু যায় আসে না। আপনি ভাবতেও পারবেন না, একটা রাষ্ট্র ও তার রাষ্ট্রপ্রধান কী করে এত নীচে নেমে মানবাধিকারের গলা টিপে ধরে কণ্ঠরোধ করতে পারে। না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইজরায়েলই পারে। তাই তো তারা ৭৩ বছর ধরে একটা দেশকে টুকরো টুকরো করে থালায় সাজিয়ে নিয়ে হাপিস করে দিচ্ছে। ইজরায়েল অধিকৃত প্যালেস্তানীয় অঞ্চলে নাগরিকদের তো বলার অধিকার নেই, একইরকমভাবে বলার অধিকার নেই সাংবাদিকদের, মানবাধিকার কর্মীদের, বলার অধিকার নেই সমাজবিদদের, বিজ্ঞানীদেরও। না, শিশুদেরও বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছে ইজরায়েল। একটা তথ্য তুলে ধরলে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে। ২০২০ সালে ইজরায়েল দেশের জন্য যে-বাজেট পাশ করেছে, তাতে তো দখলকৃত প্যালেস্তানীয় অঞ্চলে বসবাসকারীদেরও অধিকার থাকার কথা। কেন-না, তুমি ওদের জন্মভূমি দখল করেছ, দখল করেছ ওদের বসতভিটে সঙ্গে ওদেরও। তাহলে তো ওদের ভরণ-পোষণেরও দায় তোমাকেই নিতে হবে। অথচ যেখানে ইজরায়েলে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার ২০%-এরও বেশি প্যালেস্তানীয়, প্রায় ১৩৯টি গ্রাম-শহরে এখনও প্যালেস্তানীয়দের বাস। সেখানে তাদের জন্য বাজেটের বরাদ্দ মাত্র ১.৭%। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, কেমন আছে প্যালেস্তাইন।

প্যালেস্তানীয়দের দুর্দশার কথা আর বলব না। বলব না স্বাধীনতা নিয়েও কোনো কথা। কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই প্যালেস্তাইনে। বরং বলি কী আশ্চর্য দেখুন, এতকিছুর পরও মানুষগুলো কী অদম্য জেদ নিয়ে রোজ ঘুমোতে যায়, ঘুম থেকে ওঠে। রুগ্ন চোখজুড়ে লালন করে স্বাধীনতার স্বপ্ন। দেশ আর নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য অবলীলায় করে চলেছে কারাবাস। জানেন ইজরায়েলিরা যখন প্যালেস্তানীয়দের ধরে ধরে জেলবন্দি করাকে উৎসবে পরিণত করেছে, ঠিক তখন প্যালেস্তানীয়রাও জেলে অনশন করাটাকে উৎসবে পরিণত করেছে। প্রতি মুহূর্তে সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে, জিজ্ঞাসাবাদের অজুহাতে, আইন-লঙ্ঘনের অজুহাতে যত প্যালেস্তানীয়কে আটক করা হয়, সেই সংখ্যাটা আপনার-আমার কল্পনাতে অতীত। জেলের কথা যখন উঠলই চলুন একবার ওদিকটায় ঢুঁ মারা যাক।

প্যালেস্তাইনের কিছু NGO সংস্থা, যারা বন্দি প্যালেস্তানীয়দের অধিকার রক্ষা এবং মানবাধিকারের জন্য লড়াই করে তারা প্রতি বছর জেলবন্দিদের নিয়ে একটা করে বাৎসরিক সমীক্ষাপত্র প্রকাশ করে। যেখান থেকে আপনি অনায়াসেই জানতে পারবেন, বছরে কতজন ইজরায়েলের হাতে বন্দি হচ্ছেন, কতজন মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, চিকিৎসা পাচ্ছেন না, শেকল বাধা অবস্থায় সন্তান প্রসব করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা এখানে সেই NGOগুলোর সমীক্ষা থেকেই শেষ তিন বছরের কিছু তথ্য আপনাদের পড়ে শোনাই। ২০১৯-এ রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যাটা ছিল ৫৪৫০ জন, প্রশাসনিক বন্দি ৪৯৫, মহিলা বন্দি ৫৩, শিশু বন্দির সংখ্যা ২১৫ এবং প্যালেস্তানীয় আইন পরিষদের বন্দি সংখ্যা ৭। একইরকমভাবে ২০২০-র পাতা ওলটালে দেখা যাবে ২০২০ সালে রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন ৫০০০, প্রশাসনিক বন্দি ৪৬১, মহিলা ৪১, শিশুর সংখ্যা ১৮০ এবং প্যালেস্তানীয় আইন পরিষদের বন্দি সংখ্যা ৪। এবার আসা যাক ২০২১ সালে। ২০২১ সালের অগাস্ট অনুযায়ী রাজনৈতিক বন্দি ৪৭৫০ জন, প্রশাসনিক বন্দি ৫৫০, মহিলা বন্দি ৪২, শিশু বন্দি ২০০ এবং প্যালেস্তানীয় আইন পরিষদের বন্দি সদস্য ১২। এবার বুঝতে পারছেন তো কেন ‘জেলের ডায়েরি’ শিরোনামে এই লেখা লিখতে বসা। আসলে পুরো প্যালেস্তাইনকেই বড়ো বড়ো কংক্রিটের দেওয়ালে মুড়ে বৃহৎ এক জেলখানায় বদলে ফেলেছে ইজরায়েল।

ইজরায়েলি আইন অনুযায়ী প্যালেস্তানীয়দের গ্রেফতার করতে কোনো ওয়ারেন্ট লাগে না, তেমনি জেলবন্দি করে রাখতেও লাগে না কোনো চার্জশিট। ইজরায়েল প্যালেস্তাইনের সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে একটুও চিন্তিত নয় এবং তারা চায়ও না প্যালেস্তানীয়রা অধিকার নিয়ে কথা বলুক। তারা বন্দিদের সঙ্গে আইনজীবী কিংবা পরিবারের লোকজনকে দেখা করতে দিতে চায় না। ইজরায়েলের জেলে প্যালেস্তানীয় বন্দিদের জন্য সূর্যের আলোর বরাদ্দ নেই, বিছানার বরাদ্দ নেই, বরাদ্দ নেই কাগজ, কলম, পেন্সিল এমনকী বইয়েরও। ইজরায়েলের জেলে এমনও হাজার হাজার বন্দি রয়েছেন, যাঁরা ২০ বছর জেলে কাটানোর পরও জানেন না, কেন তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাহলে বুঝতেই পারছেন ইজরায়েলের জেল থেকে কোনো চিঠি বা ডায়েরির বাইরে আসাটা কতটা কষ্টকর এবং একইসঙ্গে অসম্ভবও বটে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইনজীবীর হাত ধরেই জেলের বাইরের আলো দেখে চিঠি বা ডায়েরির পাতা। আজ আমরা তেমনি চারটে পাতা, চার বন্দির জেল যাপন আপনাদের সামনে রাখলাম।

ইব্রাহিম মিস আল

১৯৯০-এর ২৮ মার্চ আমি ধরা পড়েছিলাম। ইজরায়েলি সেনারা বিস্ফোরক এবং কুকুর নিয়ে আমার বাড়িতে ঢুকেছিল। বাড়িতে যে ছোটো বাচ্চারা ছিল তা নিয়ে তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপই ছিল না। আমার ছেলের বয়স তখন মাত্র ২ বছর আর মেয়ের ১ বছর। এবং আমার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা। সেদিন যা ঘটেছিল সেটা সত্যিই ওদের জন্য ভয়াবহ ছিল; শুধু তাই নয়, সেই ঘটনার এক বছর পরও আমার মেয়ে কথা বলতে পারেনি।

সেই মুহূর্তগুলো, আমার পরিবারের মুখগুলো― আমি কখনো ভুলতে পারব না, ঠিক যখন আমার বাড়ির সমস্ত দেওয়াল, পুরো বাড়িটা, বাড়ির সবকিছু ওরা ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওরা আমাকে অন্য একটা জেলে নিয়ে গিয়েছিল, আর পথে রাইফেল-সহ যা কিছু ওদের হাতে ছিল তা দিয়ে লাগাতার আমাকে মারার কাজটা চালিয়ে গিয়েছিল।

জিজ্ঞাসাবাদের নামে টানা ৫০ দিন ধরে আমার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। ওরা আমাকে ঘুমোতে দিত না, পিছমোড়া করে হ্যান্ডক্যাপ পড়িয়ে আমাকে অদ্ভুতভাবে বসিয়ে রাখত। প্রচণ্ড গরম এবং ঠান্ডা দুই পরিস্থিতির মুখোমুখিই আমাকে হতে হয়েছে। এর ফলে আমার ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছি তা হয়তো সঠিক বলতে পারব না। পরে জেনেছিলাম আমার স্ত্রীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে আমাকে জেলে পাঠানো হয়। সেখানে প্রতিটি বন্দির মতোই আমারও হাতে পায়ে শেকল পড়িয়ে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যে-ঘরে দেওয়াল ছাড়া কিছুই ছিল না। আমি লাগাতার কষ্ট পাচ্ছিলাম। জেলে আমাদের অবস্থার উন্নতির জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে আবেদন-নিবেদন চালিয়ে গেছি। ওরা আমাদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি করেছিল বটে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। যখন আমাকে আদালতে পাঠানোর বিষয়টি এসেছিল ততদিনে আমার জীবন নরকে পরিণত হয়েছিল। সাধারণত ওরা খুব ভোরে দু-জন বন্দিকে হাতকড়া পরিয়ে বাসে করে রামাল্লায় একটা ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যেত। ওখানে আমরা টানা কয়েকদিন মাটির নীচের একটা ঘরে থাকতাম, আর সে-ঘরটা একেবারে ভিড়ে ঠাসাঠাসি থাকত। জল নিকাশের পাইপগুলো ছিল সিলিঙের ওপরে আর সারাক্ষণ সেগুলো থেকে জল চুইয়ে পড়ত। সেখানে ইঁদুর, আরশোলার উৎপাতের পাশাপাশি ছিল দম বন্ধ করা দুর্গন্ধ, একেবারে নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসার জোগাড়।

সে-কারণেই আমরা অবস্থার উন্নতি করতে চেয়েছিলাম, আর আমাদের একমাত্র পদক্ষেপ ছিল অনশন ধর্মঘটে যাওয়া। অনশনের পথটা কঠিন হলেও ওটাই ছিল আমাদের একমাত্র পথ। যদিও এই পথটাকে অনেকেই নেতিবাচক মনে করেন। ওরা আমাদের সেলের বাইরে যে-সমস্ত খাবার দেওয়ার চেষ্টা করত, আমরা সেগুলোকে ছুড়ে দিতাম। এতে আমাদের যে শুধু খিদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাই নয়, ইজরায়েলিরা ধরে ধরে আমাদের মেরেছে পর্যন্ত। কিছু বন্দিকে অন্য জেলে পাঠানো হয়েছিল, আর অন্যদের নির্জন সেলে রাখা হয়েছিল। অনশন ধর্মঘট আর মৃত্যুর মধ্যে কোনো তফাত নেই জানা সত্ত্বেও আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য অনশনকেই আমরা ব্যবহার করতাম, যখন আমাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেত। অনশন ধর্মঘটের সময় অনেক বন্দিই মারা গিয়েছিলেন।

অনশন ধর্মঘটের ফলে আমরা যে-অধিকারগুলো অর্জন করতাম কিছুদিনের মধ্যে আবার সেগুলো ওরা কেড়ে নিত ফলে বছরে এক-দু-বার আমাদের অনশন করতেই হত কারণ জেলের পরিস্থিতি ছিল দুর্বিষহ। প্রতিটি বন্দির জন্য বরাদ্দ জায়গার পরিমাণ ছিল মাত্র ১ বর্গমি যেখানে তাকে সবকিছু করতে হত।

আমি প্যালেস্তানীয় জনগণের প্রতিরোধের বিষয়ে কথা বলতে চাই। আমরা হত্যা করতে পছন্দ করি না৷ ইজরায়েলি দখলদারি আমরা প্রতিহত করেছি, কারণ, আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, আমরা আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম। ইজরায়েলিরা বলে আমাদের হাত রক্তে রাঙানো, আমরা সন্ত্রাসী। কিন্তু মজার বিষয়টা হল তাদের নেতারা প্যালেস্তানীয়দের রক্তে ডুবে গেছে, বিশেষত শ্যারন এবং নেতানিয়াহু। প্যালেস্তানীয় জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সমস্ত ইজরায়েলি নেতারাই যুক্ত। ২৩ বছর ধরে যে-যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন আমি কাটিয়েছি তা এই অল্প সময়ের মধ্যে ব্যক্ত করা সত্যিই অসম্ভব।

ইবতিসাম ইসাবী

আমি ৪ মেয়ে ও ২ ছেলের মা। আমার ১৫ বছরের সাজা হয়েছিল, আমি ১০ বছর জেলে কাটিয়েছি। জেল যদি একজন পুরুষের পক্ষেই এতটা অসহনীয় হয়, তবে ভাবুন একজন মেয়ের পক্ষে জেল কতটা বিভীষিকার। ইজরায়েল সর্বদা দাবি করে মধ্যপ্রাচ্যের তারাই একমাত্র দেশ যেখানে নারী ও পুরুষদের সমান অধিকার রয়েছে, তবে এটা আমরা শুধুই শুনেছি কিন্তু প্রত্যক্ষ করতে পারিনি।

জেল থেকে জেলে বা আদালত থেকে জেলে স্থানান্তরের সময় আমি যে একজন নারী, বা একজন পুরুষ আর একজন নারী প্রয়োজনের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে সে-বিষয়ে তারা কখনো কোনো আমলই দেয়নি। কখনো কখনো এই স্থানান্তরের কাজটা করতে একদিনের বেশি সময় লাগত। জেলে আমাদের কোনো গোপনীয়তা ছিল না। তল্লাশির নামে ওরা যখন তখন সেলে ঢুকত এবং কখনো কখনো আমাদের উলঙ্গ করে তল্লাশি চালাত।

শুরুতে আমি রামালের জেলে ছিলাম। সেখানে একজন বন্দি হিসেবে নয়, একজন অপরাধী হিসেবে আমাকে দেখা হত। ঠিক একজন হত্যাকারীকে যেভাবে দেখা হয় বা ডাকাতি বা বেশ্যাবৃত্তির দায়ে কাউকে যেভাবে দেখা হয়। ওরা সর্বক্ষণ আমাদের তল্লাশি চালাত, ওদের দাবি ছিল আমরা নাকি জেলে মাদক পাচারের কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। সে-জন্য আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য অনশন ধর্মঘটে যেতে হয়েছিল। আর সে-কারণেই আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের পাশাপাশি অনশন ধর্মঘট ভাঙার জন্য কখনো কখনো জোর করে গ্লুকোজ ইঞ্জেকশন দিত।

আমার পরিবার জর্ডনে বাস করে। আর বাবা বয়স্ক হওয়ার কারণে আমাকে দেখতে আসতে পারেননি। আমি বাবার সঙ্গে কমপক্ষে একবার ফোনে কথা বলার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি, কিন্তু ওরা অস্বীকার করেছে এবং বলেছে পরিবারের কেউ মারা গেলেই নাকি একমাত্র ফোন কলের অনুমোদন রয়েছে।

জেলে আমরা ছুটির দিনগুলো নিজেদের মতো করে উদযাপন করতাম, তবে ইদ উদযাপনের দিনেও ওরা কোনো অনুমতি দিত না। ওরা সবসময় বলত ভুলে যেয়ো না এটা হোটেল নয়, তোমরা জেলে আছ।

প্যালেস্তানীয় বন্দিরা সুশিক্ষিত হিসেবে পরিচিত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, আর সে-কারণেই জেলটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার ব্যবস্থা করেছিলাম। এমনকী আমরা যখন পড়াশুনো করতাম সেটা যাতে করতে না পারি তারও চেষ্টা চলত। আমাদের অনশন ধর্মঘট করার পেছনে সেটাও একটা কারণ। আমাকে দু-সপ্তাহের জন্য মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং তারা আমার ওপর একগুচ্ছ বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিয়েছিল। যেমন আমাদের ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে প্রবেশের অনুমতি নেই। আর আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হল আমার পরিবার এবং ভাইয়েরা বেশিরভাগজনই সেখানে বাস করে। তারা জেরুজালেমে আসতে পরে না এবং আমি তাদের সঙ্গে দেখা করতে যেতেও পারিনি… পারি না।

নাসের আবেদ রাব্বো

১৯৮৮-র ৯ ফেব্রুয়ারি, ২৩ বছর আগে আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম। আমি এখনও জিজ্ঞেস করি… কেন আমাকে আমার শহর জেরুজালেম থেকে এবং আমার প্রিয়জনের থেকে আমাকে দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? আমি এর উত্তর চাই, কারণ, আমি এখনও জেলবন্দি, কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই।

আমাকে আমার বাড়ি থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং আমাকে গ্রেফতার করার সময় ওরা আমার বাড়ির সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল। সে-সময় আমাকে হাতকড়া আর চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার গ্রেফতার মোটেই স্বাভাবিক ছিল না, আমাকে সোজাসুজি আমার বাড়ি থেকে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়নি। তারা আমাকে প্রায় ২ কিমি দূরে গ্রামের বিভিন্ন প্রতিবেশীদের দেখাতে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। আমি আঘাত পেয়েছিলাম, বিশেষত মাথায়। প্রত্যেকেই মাথা থেকে রক্তপাত হতে দেখেও চুপ ছিল। আমি মনে করি আমার সঙ্গে এইসব ঘটনা ঘটানোর পেছনের মূল উদ্দেশ্য হল দখলদারির বিরুদ্ধে কেউ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গেলে তার পরিণাম কী হতে পারে সেই সংক্রান্ত একটা উদাহরণ তৈরি করা।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমাকে জেলে পাঠানো হয়। ওই সময়টা জেল কর্তৃপক্ষ এবং গোয়েন্দাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওরা সকলেই জেল থেকে আদালতে পাঠানোর সময় আমাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করত। আসলে বিচারপর্ব দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা এবং চার্জগুলো যাতে আমরা অস্বীকার করতে না পারি সেটাই ছিল ওদের মূল লক্ষ্য। ওরা আমাদের বোঝাত, তুমি যদি এসব মেনে নাও তবে অত্যাচার এবং আমাদের সঙ্গে যে খারাপ ব্যবহার করা হত সেটা বন্ধ হয়ে যাবে।

ইজরায়েলিরা সবসময় মিডিয়ায় বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে যে, তারা একটি সন্ত্রাসবাদী দলকে গ্রেফতার করেছে যারা বিশাল সংখ্যক ইজরায়েলিদের হত্যার জন্য দায়ী। আমাদের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখাটা কেবল আমাদের শরীরকে আটকে রাখা নয়, মনকে আটকে রাখা। এবং আমাদের সমাজে যে-সক্রিয় অংশ রয়েছে তা থেকে আমাদের দূরে নিয়ে যাওয়া। আসলে ওরা আমাদেরকে সবসময় একটা সামাজিক ঘেরাটোপের মধ্যেই রাখতে চায়। এবং ওরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের আমাদের সঙ্গে দেখা করতে পর্যন্ত বাধা দেয়। বিশেষত পরিবারের বাবা-মা, ভাইবোন, সন্তান, অর্থাৎ, পরিবারের নিকট আত্মীয় সদস্য ছাড়া কারোরই সাক্ষাতের অনুমতি মেলে না।

আমরা যে-টিভি চ্যানেলগুলো দেখতাম তার সংখ্যাও ওদের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করত, এমনকী রেডিয়োগুলো পর্যন্ত অ্যান্টেনা ছাড়া কাজ করত না। যদিও আমাদের টিভি দেখার অনুমতি ছিল কিন্তু কোন চ্যানেলগুলো আমরা দেখব তার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। প্যালেস্তাইনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনো করার ক্ষেত্রেও ওরা আমাদের বাধা দিত। এই সবকিছুই করা হত আসলে আমাদের সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে।

প্যালেস্তানীয় বন্দিদের মধ্যে প্যালেস্তাইনের সকল অংশের মানুষ রয়েছে। এছাড়াও জেলে এমন কিছু বন্দিও রয়েছে যারা আরবের অন্য দেশ থেকে আসা, অন্য রাজনৈতিক দল থেকে আসা। দখলদারিত্বের শুরু থেকেই বন্দিরা রাজনৈতিক দলের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, কারণ, তারা জানত, ন্যায়সংগত উদ্দেশ্যের জন্যই তাদের লড়াই। প্রত্যেকের মধ্যেই এই অনুভূতি ছিল যে, আমাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, এমনকী সেটা জেলের ভেতরেও। আর এটাই প্যালেস্তানীয় বন্দি আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। ইজরায়েলিরা অবশ্য এই আন্দোলনকে একেবারেই পছন্দ করেনি এবং যথেষ্ট কঠোরভাবে দমন করেছিল।

১৯৭০-এর দশকে বেশ কয়েকটি জেলকে ট্যাঙ্কের শক্ত আবরণ, অর্থাৎ, শিল্ড তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হত। যে-ট্যাঙ্কগুলো আবার আমাদের প্যালেস্তানীয়দের মারার জন্য ব্যবহৃত হত। তারা আমাদের আন্দোলনকে ধ্বংস করতে এবং তাদের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বন্দিদের কারখানায় কাজ করতে বাধ্য করেছিল। তবে জেলের ভেতর বন্দিদের দৃঢ়তার কারণেই সকলকে নিয়ে এক বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। আমাদের সেই আন্দোলন যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। যদিও ইজরায়েল জেল কর্তৃপক্ষ সবসময় সেটাকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে।

অনশন ধর্মঘটের মধ্যে দিয়ে আমরা বেশ কিছু অধিকার অর্জন করি, কিন্তু যারা বলে জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের সেই অধিকার দিয়েছে তারা মিথ্যা বলে। আমরা লড়াই করে এবং নিজেকে অভুক্ত রেখে কিছু অধিকার পেয়েছি। আসলে অনশনই আমাদের কৌশলগত অস্ত্র যা আমরা আমাদের অধিকার পেতে জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারি।

আলি মাসলামানি

৩০ বছর… ৩০ বছর জেলে কাটিয়েছি আমি। আর সেই ৩০ বছর নিত্যদিন সার্চলাইটের নজরদারির ভেতর নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই করতে হয়েছে। দেশ হিসেবে প্যালেস্তাইনের জাতীয় সম্মান ও অধিকার পুনঃস্থাপনের জন্য আমাদের লড়াই জারি রয়েছে। জেলে থাকা সত্ত্বেও আমরা আশাবাদী, কারণ, এই ভূখণ্ডের ধারক আমরা। আমরা আশাবাদী কিন্তু তাই বলে আমরা পারফেকশনিস্ট নই, কারণ, বাস্তব সত্যটা আমরা জানি।

আমরা শারীরিকভাবে অনেক কিছুই জয় করেছি কিন্তু তার থেকেও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হল নৈতিকতার সাফল্য। কারাগারের জীবন এক অন্য জীবন, সেখানে প্রত্যেকে একে-অপরকে সম্মান করে। আমাকে বলতেই হবে আমি এখন সত্যিই সুখী। আমার মনের অবস্থা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়, আমি এখন মুক্ত, আমি এখন আমার পরিবার, আমার বন্ধুদের মধ্যে রয়েছি।

মুক্তি পাওয়ার পর থেকে আমি আবার সময় বিষয়টা অনুভব করতে শুরু করেছি। জেলের সমস্যা হল আপনি সেখানে সময়ের হিসেব কষতে পারবেন না। জেলে সময় যেন থমকে যায় সে কিছুতেই এগোতে চায় না, কারণ, সেখানে নতুন কোনো ঘটনা ঘটে না, প্রতিটা দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা সেই একই আবর্ত। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর আমি সারাদিনে কী কী করব, কোথায় কোথায় যাব সব মাকে বলি, আসলে স্বাধীনতার এটাই তো মজা।

আমার পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমি জেলের দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার কাছে সবকিছুই অপ্রয়োজনীয় হয়ে গিয়েছে। আমি মনে করি প্যালেস্তানীয়দের সহায়তা করতে প্রয়োজনে আমি একজন যোদ্ধাও হব। আসলে প্যালেস্তানীয়রা মনে করে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই এমন এক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান যেখানে তারা তাদের সন্তানদের উৎসর্গ করে স্বাধীনতা আনার জন্য। আমরা প্রত্যেকেই এক বৃহত্তর মানবিক ঘটনার অংশীদার। আমি জীবনে অনেক সংবেদশীল ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি কিন্তু আমাদের জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার দৃশ্যটি ছিল সবচেয়ে আশ্চর্যময় এবং অনবদ্য। আমাদের পরিবার এবং বন্ধুরা আমাদের যেভাবে অভিনন্দন জানিয়েছিল তাতে আমরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের অনুভূতি কেমন ছিল সেটা ব্যাখ্যা করার জন্য সত্যিই বোধহয় একজন কবির প্রয়োজন।

জেলে প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনো মামলায় জড়িত, কেউ পাথর ছোড়ার জন্য তো কেউ কোনো বড়ো অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত, আবার কেউ-বা ইজরায়েলিদের হত্যার কারণে। কিন্তু সেই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে আমাদের কেউই কখনো বড়াই করে না। আমরা সবসময় বলি স্বাধীনতার জন্য, সম্মানের সঙ্গে বাঁচার জন্য, আমাদের দেশকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত ইজরায়েলের দখলদারিত্বকে প্রতিহত করে চলেছি। আমাদের অপরাধ আমরা সর্বদা আমাদের জনগণের জন্য শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছিলাম, কারণ, আমরা মনে করি রক্তপাত বন্ধ হওয়া উচিত এবং প্যালেস্তাইনের রাজধানী হিসেবে পবিত্র জেরুজালেমে প্যালেস্তানীয়দের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। ইউনেস্কো যেদিন থেকে প্যালেস্তাইনকে সদস্য দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেদিন আমাদের আশা আকাশ ছুঁয়েছে, আমরা এতটাই আশাবাদী।

আমি তিন প্রজন্মের একজন
যে গত ৪০ বছর ধরে
কত না উপায়ে শুধু স্মৃতি মুছে গেছি
অনেক স্মৃতি অবশ্য কেড়ে নিয়েছে বুলেটেরাও

ভুলভাল ধর্মের সব ভুলভাল লোক এসে
একচেটিয়াভাবে
আমাদের দেশটাকে সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে

আমরা তিন প্রজন্ম ধরে
একইরকম তাঁবুর বাড়িতে রয়েছি
তৈরি থেকেছি
এক সুটকেস আর চাবি সঙ্গে নিয়ে
আমরা জানতাম―
যে-কোনো সময় নেমে আসতে পারে আক্রমণ
রাত কাটাতে হতে পারে বিমানবন্দরের মেঝেতে
আমরা তৈরি অভিবাসনের প্রশ্ন-উত্তরের জন্য
মানচিত্রও মুখস্থ আমাদের

ভালোবাসতে গিয়ে পুরুষ নয়
আমরা বিপ্লবের প্রেমে পড়ে গেছি
বিবাহ দিনের ডাবকা নাচ
আমরা নেচে ফেলেছি শেষকৃত্যের দিনে

আমাদের আকাশ চুরি গেছে
চুরি গেছে তিন প্রজন্মের আনন্দ, ভালোবাসা
দখল হয়েছে শ্বাস-প্রশ্বাস
আমাদের দিন কেটেছে জানালার সামনে বসে
কেটেছে খাঁচায় ঘেরা ওয়েটিং রুমে
আমাদের আলিঙ্গনের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে সৈনিকের ছায়া
আমাদের হাত আজীবন ধ্বংসস্তূপ খুঁজে চলেছে
খুঁজে চলেছে মোমবাতি আর নোটবুক

আমাদের প্রতিটা রাগী চোখ চেকপয়েন্টের দিকে তাকিয়ে
আমাদের প্রতিটা গান ওদের বিরুদ্ধে গাওয়া
আমাদের প্রতিটা নিঃশ্বাস তৈরি হয়েছে
বিরোধিতা করবে বলে
আমরা ওদের তৈরি করেছি
তোমাদের বিরোধিতা করব বলে

Categories
2021-Utsob-Krorpotro

গৌতম সরকার

আইচুরা দে…

অন গোঁসাইকে বললাম, “গোঁসাই তোমরা তো আইচুরা জানেন? কেমন ছিল— কহ। কুনো ঠি নেখা নাই। কাহয় কহিবা পারেছে না”।

“দাউ”

“সব কি নেখা থাকে? মানুষের সাথে সাথে কিছু ইতিহাসও চলি যায়”।

এমন কথা শুনে মনে হয়, ইতিহাসও সব সত্য সবসময় সত্যি করে বলে না। আমাদের মতো যারা শুধুমাত্র ক্লাসের ইতিহাস বইয়ের পাঠক— তাদের কাছে এমনটা মনে হলেও অপরাধ নয়। একজন নিরক্ষর নিত্যানন্দ পন্থী বৈষ্ণবও এই সত্যকে অনুভব করেছেন। এমন কথা বলার পিছনে অনেকে কৌতূহল অনুভব করতে পারেন। অথবা মনে হতেই পারে— এটা একধরনের আত্মরক্ষার ঢাল। এ-প্রসঙ্গে আরও একটি বক্তব্য আয়োজন করে বলতে পারি যে, ক্ষেত্রসমীক্ষার পাঠক বলেই জানি, সব ক্ষেত্রকেই ক্ষেত্র করি না বরং নির্বাচন করি। এই নির্বাচন অনেকসময় সঠিক না-ও হতে পারে। এবং সিলেকশনও কিছু ভাঁড় তথ্য দিতে পারে। যে-প্রসঙ্গে এই কথা বলা— ইতিহাসে অনেক পরিব্রাজক ও গবেষকের খোঁজ পাই। তাঁরা নিরীক্ষণ করেছেন ভারতীয়দের নিবিড় যাপন— জাত, জাতি, ভাষা, পোশাক এমন আরও কত কী!! লিপিবদ্ধ করেছেন। এসবের এক একটা কঠিন কাজ। প্রায় অসম্ভব।

তাঁদের কৃতিত্বকে মেনে নিয়েও দেবেশ রায়ের একটি মতকে প্রতিষ্ঠা করতে ভীষণ লোভ হয়— “ভারতবর্ষের বিশালতার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ তৈরির ব্যক্তিগত অক্ষমতা বা সমষ্টিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছি ভারতবর্ষের কিছু টুকরো বা খণ্ড চেহেরা।… সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট, সেনাবাহিনীর মত আমাদের সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠানও বস্তুত কতটা সর্বভারতীয় সে-সম্বন্ধে আমি নিঃসন্দেহ নই”। অন্তত আমারও মনে এই ধারণা দৃঢ় হয়েছে।

উপরের আলোচ্য অংশ পড়ে অনেকেই ভেবে থাকতে পারেন— আমি আমার আলোচনার মূল থেকে সরে পরেছি। না, তা একেবারেই নয়। মূল বক্তব্যে যেতে গিয়ে কয়েকটা বিষয় আপাত সমস্যা তৈরি করেছে। কারণ, কোনো কিছু বলতে গেলে প্রথমেই প্রমাণ চেয়ে বসেন— ‘কিছু জন’। এইসব তথ্য কোন বইয়ে লেখা আছে? আগে কেউ কিছু বলে গেছেন? ইত্যাদি। তাঁদের কাছেও এই বার্তা দিতে যে— এখানে সবার ভারতবর্ষ আছে। সবারটা সবার মতো নয়। বরং বিষয়ীর কাছে দ্বিমতের বিষয়। ফলে যা যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়নি। অথবা কারো লেখায় পাওয়া যায়নি। তা সবসময় মিথ্যে— এখানে এমন ভাববার এবং বলবার যৌক্তিকতা থাকবে না।

দীর্ঘ সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রাচীন গৌড়ের একটা ভৌগোলিক এলাকায় নিজেরা নিজেদের ‘গৌড়-দেশি’ অথবা ‘দেশি’ বলে সম্বোন্ধিত করে। আরও ভালো করে বললে ‘দেশিয়া’। দেশে টিকে থাকার আত্ম-গৌরবও আছে। অথচ অনুল্লিখিত।

প্রাচীন কিছু দলিল কিংবা ভোটার তালিকা দেখলে পাওয়া যায়— এদের পদবি ছিল দেশি। এদের ভৌগোলিক সীমানা নিয়ে আমারই লেখা একটি প্রবন্ধে চিহ্নিত করেছি— “পূর্ণভবা নদীর পশ্চিম পাড় থেকে নাগর নদীর পূর্ব পাড় এবং মহানন্দা নদীর পূর্ব পাড় এই ভূখণ্ডটি ঐতিহাসিক ভূমি”২। খুব সম্প্রতিকাল থেকে এরা রাজবংশী হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। সাব-কাস্ট হিসেবে রাজবংশী লিখছে। অথচ আত্ম-পরিচয়ের সময় দেশি অথবা দেশিয়া বলে পরিচিত হচ্ছে। এদের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। ভাষা আছে। নিজস্ব আচার-আচরণে এখনও সমৃদ্ধ। তারই মাঝে কিছু লুপ্ত। কিছু হারিয়ে যাবার পথে…। আজকে আমাদের ‘আইচুরা’ নিয়েই মূল বক্তব্য। দেশিদের নিজস্ব উৎসব। নিজস্ব রীতিনীতিতে…

অন গোঁসাই বললেন— “আইচুরা হইল্‌ মহা উৎসব। যেইমত দুর্গাপূজা। ওইটা হইল হামারলার আত্মমর্যাদা”।

উৎসবটা কেমন?

উত্তরটা অন গোঁসাইয়ের বয়ানে লিখবার ইচ্ছে ছিল। লিখলে লিখাই যেত। তবে পাঠক ফাঁপরে পড়ত। কারণ, ঐ যে, প্রত্যেকেরই গল্প বলার নিজস্ব আচরণ আছে। গল্প বলতে বলতেই অন গোঁসাই জানতে চাইতেন— “কেনে দাউ, জানি করিবু?”। আবার কিছু বাদে বিড়ি ফুঁকতেন। শুরু করতেন অন্য প্রসঙ্গ। দীর্ঘ সাংসারিক জীবন ও তার ক্লান্তি নিয়ে কিছু কথা বলতেন। ফলে এইসব বক্তব্যকে গ্রিনরুমে রেখে সরাসরি মূল বিষয় আলোচনা করাই শ্রেয়। আর সেলিম দেবোত্তমরাও অধিকারবশত আমার মুখের শব্দকে কাটছাঁট করতে বলে দিয়েছে। বলেছে ঐ উৎসব সম্পর্কে অল্প কয়েকটি শব্দে লিখো। এবং আমার কঠিন সময়েও এই লেখাটি লিখিয়ে নিয়েছে— দুইরকম কৃতিত্বই ওদের প্রাপ্য। তবে মাঝে মাঝে অন গোঁসাইকে নিয়ে আসব আমার পরিশ্রম লুঘু করবার জন্যই।

‘দুর্গাপূজা’ এবং ‘আত্মমর্যাদা’ দুটোই মেদবহুল বিষয়। আছে জমজমাট আর স্বচ্ছলতা। আইচুরা তেমনি এক রমরমা পরব। সম্পদের প্রাচুর্য না থাকলে এই পরব করা সম্ভব নয়। তার কারণ, প্রতি বছরের একটা বিশেষ সময়ে মেয়ে-জামাই শ্বশুরবাড়ির সকলেরই সবকিছুরই (খাবার, পোশাক এবং ভ্রমণ) দায়িত্ব নেয় মাসাধিকের জন্য। অনুষ্ঠানের শেষে শ্বশুরবাড়ি যা দেয় সেও কম কী সে? গোরু ছাগল সোনা গহনা ভরতি। ফলে অন গোঁসাই দুর্গাপূজা ও আত্মমর্যাদা – বেশ চতুর ও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন বোঝা গেছে।

অন গোঁসাই— “খাবার দাবার বইল্‌তে কিন্তু ডাইল আর ভাত নাহায়। পত্যেক দিন মেলায় খাবার। নাহিরিও ভালো ভালো। মানে ঐ আর— খাবার-দাবারের বিহা বাড়ি”।

সে-কারণেই অন গোঁসাই প্রথম উপমা টেনেছেন দুর্গাপূজার সঙ্গে। অনেক আত্মীয় স্বজন কাকা কাকি ভাই বোন দিয়ে জনা তিরিশ থেকে পঞ্চাশেক। স্বভাবতই দুর্গাপূজার বিষয় আশয় চলে আসে। এই এতজন!! এতদিন!! আমাদের কাছে বিস্ময় বটেই। সম্প্রতি একটি গান লেখা হয়েছে। লিখেছেন অনিল কুমার সিংহ মহাশয়। সূর করেছেন নিমাই সরকার। খন ধর্মী গান।

“আইস কুটুম বইস আসনে
হামরা আছিক বেতালে
নবানি আষাঢ়ি মাইলা হামার
গেল যে কুনা
হাত মুখলা ধুবার টানে
জল দেও আনিয়া”

হাল আমলের লেখা এই গান হাল আমলকেই ধরেছে। বেতাল এখন হয়েছে। বেতালের সরল অর্থ ব্যস্ততা। আগে আত্মীয় আসা অর্থ রাজকীয় ব্যাপার স্যাপার। এই দেশিরা সেই নিয়ে আত্মমর্যাদায় অনুভূতিশীল ছিল।

জানতে চাইলাম “আর গোঁসাই কহিলেন যে— আত্মমর্যাদা অইখান কেমন?”

যে যতদিন শ্বশুরবাড়ি খাওয়াতে পারবে তার তত বেশি ধন-দৌলত আছে এই পরিচয় দেয়। অবশ্য তখন এমন কেউই ছিল না, যার কোনো সম্পত্তি ছিল না। টাকাপয়সা ছিল না। সবাই আইচুরা পালন করত। এবং যে পারত না সেও চেষ্টা করত। কারণ, এতেই তার পরিচিত। এতেই তার গৌরব। বংশমর্যাদা।

অর্থশাস্ত্রের লোকেরা, একে, তাদের পরিভাষায় হয়তো অপচয় জাতীয় বিশেষণ দেবে। ইতিহাস পড়ার যতটুকু সৌভাগ্য হয়েছে প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে অর্থশাস্ত্রে তাও হয়নি। ফলে অপচয় বিষয়কে একরকম না-পাত্তা দিয়েই সামাজিক পরিকাঠামো নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। এই যারা, এই আইচুরা পালন করত তারা এই এলাকায় ধনসম্পদের অধিকারী ছিল। জমিজমা সবই তাদের ছিল। নইলে বছরান্তে এমন পরব পালন করে, তেমন সাধ্য কার? ক্ষেত্রসমীক্ষাও তাই বলছে। এখানে অন গোঁসাই একক ব্যক্তি হলেও এক নয়। দেশিদের প্রতিনিধি। ক্ষেত্রসমীক্ষায় সাহায্যকারী সকল তথ্যদাতার সমাহার। উল্লেখিত ভৌগোলিক সীমানায় বসবাসকারী অন্য গোষ্ঠীরা হাল আমলের। আদিবাসী বাদে। সকলের বসবাসের ধরন দেখলেও বোঝা যায়। গুচ্ছাকারে সজ্জিত দেশিদের পাড়া-গাঁ। এক বাড়িতে ঢুকলে অন্য সমস্ত বাড়িতে যাওয়া যায়। যেন সুড়ঙ্গপথ। সমস্ত খবর সবাইকে পৌঁছে দেবার জন্য…। বাইরের শত্রু যাতে সহজে একক কোনো পরিবারকে আক্রমণ করতে না পারে। যেন গেরিলা শিবির। এমন গ্রামের দেখা এখনও মেলে।

“গোঁসাই এই অনুষ্ঠানগ্যালা কেনে হয়?”

গোঁসাই— প্রীতির বন্ধন। ভাই-বোনের বন্ধন। যেমন ভাইফোঁটা। সেখানে ভাইয়ের মঙ্গলকামনা করে। তেমনি এই অনুষ্ঠান। তবে একটু ফারাক আছে। আই মানে দিদি বা বোন। “মুই আইয়ের বাড়িত যাম”। এটা বোন বা দিদি ফোঁটা। বোন ও দিদির মঙ্গলকামনার অনুষ্ঠান। আজকালকার দিনে অবশ্য এমন কয়েকটা দৃশ্য দেখা গেছে বোনেরা বোনদের ফোঁটা দিচ্ছে। তবে দেশিদের এই অনুষ্ঠান যে একটি সামাজিক দলিল তা বোঝা যায়। স্বতন্ত্রতা বোঝা যায়। যে-কারণে এদের আত্ম-গৌরব।

“গোঁসাই!! এমন কাথা কহিলেন কেহয় বিশ্বাসে করিবা চাহিবেনায়!!!”

“সেইটা ওমার ব্যাপার— ঐ যে একখান কাথা আহি— বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর-তে বো এই হচ্ছে হামার অনুষ্ঠান। এই হছে হামারাল গৌরব”।

তথ্যসূত্র:
১। রায়, দেবেশ (সম্পা.)। ২০১৫। দলিত। দিল্লী; সাহিত্য অকাদেমি। পৃ. ১।

২। সরকার, গৌতম। ২০১৯। অত্মানুসন্ধানে দেশি-র সমীক্ষা ও পর্যালোচনা। হোসেন, জাহাঙ্গীর (সম্পা.)।বাংলার জনসংস্কৃতি ও সংস্কৃতি। রাজশাহী; বাংলাদেশ ফোকলোর গবেষণা কেন্দ্র। পৃ. ১৭।

Categories
2021-Utsob-Translation

মিয়া কোউতো

আগুন

ভাষান্তর: শৌভ চট্টোপাধ্যায়

বুড়ি বসেছিল মাদুরের ওপর, নিশ্চল হয়ে অপেক্ষা করছিল কখন তার মরদ জঙ্গল থেকে ঘরে ফেরে। তার পা-দুটো দ্বিবিধ ক্লান্তিতে অসাড়— সময়ের ছোপলাগা গলিঘুঁজি ধরে হেঁটে আসার ক্লান্তি আর অতিক্রান্ত সময়েরও।

তার যা-কিছু পার্থিব সম্বল, ছড়ানো ছিল মাটির ওপরে: থালাবাটি, বেতের ঝুড়ি, একটা হামানদিস্তা। আর তার চারপাশে ছিল শূন্যতা, এমনকী হাওয়াও বইছিল সঙ্গীহীন, একা।

বুড়ো ধীর পায়ে ফিরে এল, যেমন তার অভ্যাস। রাখালের মতো, সে তার বিষণ্ণতাকে নিজের সামনে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে বহুকাল ধরেই, সেই যেদিন তার ছোট্ট ছেলেটাও না-ফেরার রাস্তা ধরে চলে গিয়েছিল, তাকে ছেড়ে।

‘মানুষটা কেমন কুঁকড়ে যাচ্ছে দিন-কে-দিন’, বুড়ি ভাবছিল। ‘যেন শুধু একটা ছায়া।’

হ্যাঁ, ছায়াই বটে। কিন্তু সে কেবল তার আত্মার ছায়া, কেন-না শরীর বলে আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই তার। কাছে এগিয়ে এসে, পাশে পড়ে থাকা আর একটা মাদুরে বুড়ো নিজের শীর্ণতাটুকু জড়িয়ে নেয়। মাথা তুলে, বুড়ির দিকে সোজাসুজি না তাকিয়েই সে বলে:

‘আমি ভাবছিলাম।’

‘কী ভাবছিলে গো?’

‘যদি তুই মরে যাস, তাহলে এই অসুস্থ, অশক্ত শরীরে আমি কীভাবে তোকে গোর দেব?’

কাঠির মতো আঙুলগুলো মাদুরের ওপর বোলাতে বোলাতে সে বলে চলল:

‘আমরা গরিব। থাকার মধ্যে তো শুধু এই না-থাকাটুকুই। বল-ভরসা বলতেও তিন কুলে কেউ নেই আমাদের। আমার মনে হয়, আমরা বরং এই বেলা, নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ে রাখি।’

আবেগের বশে, বুড়ি অল্প হাসে:

‘বড়ো ভালো মানুষ গো তুমি! কপাল করে এমন মরদ পেয়েছিলাম, আমার আর ভাবনা কীসের!’

বুড়ো চুপ করে চিন্তায় ডুবে গেল ফের। বেশ কিছুক্ষণ পর, আবার মুখ খুলল সে:

‘যাই, দেখি যদি একটা কোদাল জোগাড় করতে পারি।’

‘কোথায় যাবে তুমি কোদাল খুঁজতে?’

‘দেখি ওদের দোকানে পাওয়া যায় কিনা।’

‘সেই দোকান অবধি ঠেঙিয়ে যাবে এখন? সে তো অনেক দূর।’

‘রাত্তির নামার আগেই ফিরে আসব।’

এমনকী নৈঃশব্দ্যও দমবন্ধ করে বসে রইল, যাতে তার মরদ ঘরে ফিরলে বুড়ি টের পায়। যখন সে ফিরল, ধুলোর ছেঁড়াফাটা কানাতে তখন সূর্যের শেষ আভাটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে।

‘কী হল গো?’

‘অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেল’, আর সে তুলে ধরল তার হাতের কোদালখানা, যাতে বুড়ি ভালো করে দেখতে পায়। ‘কাল সকাল সকাল লেগে পড়ব তোর গোর খুঁড়তে।’

পাশাপাশি দুটো আলাদা মাদুরে শুয়ে পড়ল তারা। বুড়ির মৃদু গলা বুড়োকে বাধা দিল ঘুমে তলিয়ে যেতে:

‘কিন্তু, শোনো…’

‘কী?’

‘আমার শরীর এখনও ঠিকই আছে। খারাপ হয়নি তো!’

‘নিশ্চয় হয়েছে। বয়স কি কম হল?’

‘তাই হবে’, সে মেনে নিল। আর তারপর ঘুমিয়ে পড়ল দু-জনেই।

পরদিন সকালবেলা, বুড়ো খুব খর-চোখে নজর করছিল বুড়িকে।

‘তোকে মেপে দেখছি। যতটা ভেবেছিলাম, তুই দেখি তার চেয়ে আরও বড়ো।’

‘দুর, কী যে বলো! আমি তো এইটুকুন মোটে।’

কাঠের পাঁজার কাছে গিয়ে বুড়ি ক-টা লকড়ি টেনে বের করে।

‘কাঠ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। আমি যাই, জঙ্গল থেকে কিছু কাঠকুটো কুড়িয়ে আনিগে।’

‘তুই যা বউ। আমি এখানেই থাকি, তোর জন্যে গোর খুঁড়ি।’

বুড়ি বেরিয়েই যাচ্ছিল, হঠাৎ যেন একটা অদৃশ্য হাত তার কাপুলানা১ ধরে টানল। আর, থমকে দাঁড়িয়ে, বুড়োর দিকে পেছন ফিরেই সে বলল:

‘শোনো। একটা কথা জিজ্ঞেস করি…’

‘কী চাই আবার?’

‘খুব যেন গভীর করে খুঁড়ো না গর্তটা। আমি ওপরের দিকেই থাকতে চাই, ঠিক ভুঁইয়ের নীচটায়, যাতে মনে হয়, হাত বাড়ালেই জীবনকে ছুঁতে পারব আবার।’

‘ঠিক আছে। তোর কবরে না হয় মাটি একটু কম দেব।’

দু-সপ্তাহ ধরে বুড়ো উদয়াস্ত ব্যস্ত রইল কবর খোঁড়ার কাজে। কাজ যত শেষের দিকে এগোয়, তত তার কাজের গতি কমে আসে। তারপর, হঠাৎ বৃষ্টি এল একদিন। গর্ত জলে ভরে উঠল। দেখে মনে হল একটা নির্লজ্জ কাদাজলের ডোবা। বুড়ো মেঘগুলোকে শাপশাপান্ত করতে লাগল, আর আকাশকেও, যে তাদের এখানে এনে জড়ো করেছে।

‘বোকার মতো কোরো না, পাপ লাগবে তোমার’, বুড়ি তাকে সাবধান করল। বৃষ্টি পড়েই চলল, শেষে কবরের দেয়াল ধসে পড়ার উপক্রম। বুড়ো গর্তের চারিদিকে ঘুরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা আন্দাজ করার চেষ্টা করে। শেষে, ওইখানে দাঁড়িয়েই, সে সিদ্ধান্ত নেয় কাজ চালিয়ে যাবার। বৃষ্টির অবিশ্রান্ত ধারায় ভিজে একশা হয়ে, বুড়ো গর্তের মধ্যে নামে আর ওঠে, ক্রমশ বাড়ে তার গোঙানির আওয়াজ, আর খুঁড়ে তোলা মাটির পরিমাণ পাল্লা দিয়ে কমে আসতে থাকে।

‘বৃষ্টির মধ্যে থেকো না আর, চলে এসো। এভাবে পারবে না তুমি।’

‘বাজে বকিস না মাগি’, বুড়ো হুকুম করে। কিছুক্ষণ অন্তর, সে কাজ থামিয়ে দেখে নেয় আকাশের অবস্থা। আসলে সে দেখতে চায়, কার কাজ বাকি আছে বেশি, তার, না বৃষ্টির।

পরদিন, বুড়োর ঘুম ভাঙল তীব্র বেদনায়, যেন হাড়গুলো তার যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরের আরও ভেতরে টেনে নিতে চাইছে তাকে।

‘বড়ো যন্তন্না রে গায়ে। উঠতে পারি না।’

বউ তার দিকে ফিরে মুখ থেকে ঘামের ফোঁটাগুলো মুছিয়ে দেয়।

‘তোমার সারা গা যে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে একেবারে। কাল অত ভিজলে, ওই জন্যে।’

‘না রে বউ, তা নয়। আসলে আগুনের ঠিক পাশ ঘেঁষে শুয়েছিলাম কি না, তাই।’

‘কীসের আগুন?’

উত্তরে বুড়োর মুখ থেকে শুধু গোঙানির আওয়াজ বেরোয়। বুড়ি সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে: কোন আগুন দেখল তার মরদ, তারা তো কোনো আগুন জ্বালায়নি!

সে উঠল বুড়োকে একবাটি সেদ্ধ জাউ খেতে দেবে বলে। কিন্তু ঘুরে দেখে, বুড়ো ততক্ষণে উঠে পড়ে কোদাল খুঁজতে লেগেছে। সেখানা বাগিয়ে ধরে, পা ঘষটে বাইরে বেরোনোর তোড়জোড় করে। এক পা এগোয়, আর থমকে দাঁড়ায় শ্বাস নেবার জন্যে।

‘ওগো, যেয়ো না এভাবে। আগে মুখে কিছু দাও।’

বুড়ো শুধু হাত নাড়ল মাতালের মতো। বুড়ি তবু ছাড়ে না:

‘তোমার শরীরের এই হাল, ডান-বাঁয়ের হুঁশ নেই। বিশ্রাম নাও শুয়ে।’

বুড়ো ততক্ষণে গর্তের মধ্যে নেমে পড়েছে, আর কাজ শুরু করবে বলে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অসুখ তাকে তার জেদের শাস্তি দিতে ছাড়ে না, আচমকা মাথাটা ঘুরে যেতে তার মনে হল সারা দুনিয়া যেন চোখের সামনে নাচতে লেগেছে। হঠাৎ, সে চিৎকার করে উঠল হতাশায়:

‘বউ, বাঁচা আমাকে!’

গাছের কাটা ডালের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ল বুড়ো, মেঘ ডাকল এমন যেন আকাশখানা দু-ফাঁক হয়ে ফেটে যাবে এইবার। বুড়ি দৌড়ে গেল বুড়োকে সাহায্য করবে বলে।

‘শরীর তো বেজায় খারাপ তোমার।’

হাত ধরে টানতে টানতে বুড়োকে এনে সে মাদুরে শোয়ায়। শুয়ে শুয়ে বুড়ো বড়ো বড়ো শ্বাস টানতে থাকে। সমস্ত প্রাণশক্তি যেন জড়ো হয়েছে ওইখানে, হাপরের মতো ওঠা-নামা করা পাঁজরগুলোর মধ্যে। জীবন যেখানে ঔজ্জ্বল্যে ঝলমল করছে, মৃত্যু সেখানে আসে আচমকা বজ্রপাতের মতো, কিন্তু এখানে, এই নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে, মানুষ খুব চুপিসাড়ে ঢলে পড়ে মৃত্যুর ভেতর, যেভাবে পাখি তার ডানা ভাঁজ করে।

‘বউ’, কোথাও কোনো চিহ্ন রাখে না, এমন আবছা গলায় বুড়ো বলল, ‘আমি তোকে এভাবে ফেলে রেখে যেতে পারব না।’

‘কী করার কথা ভাবছ তুমি এখন?’

‘কবরটা তো ফাঁকা ফেলে রাখতে পারি না। তোকে মেরে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার।’

‘ঠিকই বলেছ। এত কষ্ট করে খোঁড়া গর্ত, যদি শুধুমুদু খালি পড়ে থাকে, তবে সে ভারি দুঃখের কথা।’

‘হ্যাঁ, তোকে মেরেই ফেলব আমি; কিন্তু আজ নয়, গতরে আজ জোর পাচ্ছিনে মোটে।’

বুড়ি তখন তাকে ধরে সোজা করে বসায়, আর এককাপ চা করে আনে।

‘আস্তে আস্তে খেয়ে নাও দিকি। খেলে ভালো লাগবে। কাল কত কাজ পড়ে আছে, তাকত না পেলে চলবে?’

বুড়ো ঘুমিয়ে পড়ে, আর বুড়ি বসে থাকে ঘরের দোরগোড়ায়। তার বিশ্রামের ছায়ায়, সে দেখে, আলোর রাজাধিরাজ সূর্যের শরীরও কেমন আস্তে আস্তে বিবর্ণ হয়ে আসছে। সারাদিনের ঘটনাগুলো সে মনে-মনে নাড়াচাড়া করে, আর তাদের বৈপরীত্যের কথা ভেবে তার হাসি পায়: সে, যার জন্মের কোনো নথিপত্রই নেই, কী নির্ভুল নিশ্চয়তায় আজ জেনে ফেলেছে নিজের মৃত্যুর তারিখ। যখন চাঁদ উঠল, আর তার আলোয় জঙ্গলের গাছগুলো স্পষ্ট দেখা যেতে লাগল, বুড়ি তখন সেখানেই গা এলিয়ে দিল, আর তলিয়ে গেল ঘুমের ভেতর। সে স্বপ্ন দেখল এখান থেকে অনেক দূরের কোনো সময়ের: যেখানে তার ছেলেমেয়েরা রয়েছে, যারা মরে গেছে আর যারা বেঁচে আছে তারাও, মাচাম্বা২ ভরে উঠেছে ফসলে, সেই শ্যামলিমার গায়ে তার দৃষ্টি পিছলে যাচ্ছিল। বুড়োও রয়েছে সকলের মাঝখানটিতে, গলায় টাই বাঁধা, গল্প বলছে বিছানায় শুয়ে। সবাই রয়েছে সেখানে, তার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি। জীবন রয়েছে, ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হচ্ছে সে, কত অজস্র প্রতিশ্রুতির জন্ম হচ্ছে তার গর্ভে। সেই হাসিখুশির মেলায়, সবাই সত্যি বলে মেনে নেয় বড়োদের সমস্ত কথা, কারণ, ভুল তারা করতেই পারে না, আর কোনো মা-ই মৃত্যুর সামনে মেলে ধরে না নিজের রক্ত-মাংস। সকালের হরেক শোরগোল একসময়ে তাকে তার নিজের ভেতর থেকে ডেকে তুলতে চাইল, কিন্তু ঘুমের শেষ রেশটুকু ছেড়ে আসতে কী ভীষণ অনীহা তার। রাত্রিকে সে অনুনয় করে আরও কিছুক্ষণ থাকার জন্য, যাতে তার স্বপ্নগুলো আর একটু দীর্ঘস্থায়ী হয়। ঠিক ততখানি আকুতি ঝরে পড়ে তার গলায়, যতটা আকুতি নিয়ে সে একদিন জীবনের কাছে মিনতি করেছিল, তার সন্তানদের যেন সে তার কাছ থেকে কেড়ে না নেয়।

আলো-আঁধারির ভেতর, বুড়ি তার স্বামীর হাতখানা ধরতে চাইছিল, যদি এই তীব্র কষ্টের কিছুটা সুরাহা হয়। যখন তার হাত ঠেকল বুড়োর গায়ে, তখন দেখল তার শরীর একেবারে ঠান্ডা, এতটাই ঠান্ডা যে মনে হচ্ছিল বুড়ো বুঝি সেই আগুনের থেকে বহু দূরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, যে-আগুন কখনো জ্বালেইনি কেউ, কোনোখানে।


কাপুলানা: মেয়েদের লম্বাঝুলের পোষাক, কতকটা সারং-এর মতো
মাচাম্বা: ছোট একফালি চাষের জমি

Categories
2021-Utsob-Krorpotro

সূচনাকথা

গৌতম সরকার

এই ক্রোড়পত্রে দু-টি বিষয়কে তুলে আনবার চেষ্টা করা হয়েছে—

এক) ভারতবর্ষের চার ভাষা গোষ্ঠী হল ইন্দো-ইউরোপীয়, দ্রাবিড়, অস্ট্রিক এবং ভোট-বর্মী। এই চার ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের উৎসব তুলে আনা।

দুই) নিজেরা নিজের কথা বলবে। এখানে ভোট-বর্মী থেকে টোটো, রাভা, গারো। ইন্দো-ইউরোপীয় থেকে রাজবংশী। দ্রাবিড় থেকে ওঁরাও, অস্ট্রিক থেকে বাউরি- ওরা নিজেদের কথা বলেছে।

প্রশ্ন হতে পারে— এখানে তো আদিবাসীরাও বলেছে। তাহলে এই ক্রোড়পত্রের নাম ‘লোকজ উৎসব’ কেন? আদিবাসী উৎসব নয় কেন। অনেকের কাছে এই জবাবদিহি করতে হতে পারে। দ্বন্দে না গিয়ে, ক্রোড়পত্রের নাম ‘আদিবাসী ও লোকউৎসব’ করা যেত নিশ্চয়। তবে লোক বিষয়কেই যেহেতু লোক (সাধারণ)-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয় সেহেতু প্রবন্ধের বিষয়গুলো লোক। যাঁরা লিখেছেন তাঁরা সকলেই বিশেষ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। নিজস্ব সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ।

উৎসব মানেই মিলন। আদানপ্রদান। ব্যাবসা বাণিজ্য।

উত্তর দিনাজপুর জেলায় ‘কাঁদাকাটির মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। দেশভাগের পর থেকে এই উৎসব হয়ে আসছে। মেলার উদ্দেশ্য দেশের ওপারে থাকা আপনজনদের একপলক দেখা এবং কান্নাকাটি করে মিলিত হওয়া। স্বজনের সুখ-সমৃদ্ধি চেয়ে প্রশান্তি লাভ করে ঘরে ফেরা। এই হল লোকউৎসব। এই হল লোকমেলা।

সাধারণ মানুষ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে লোকউৎসব পালন করে, সেটা কখনো পারিবারিক, সামাজিক অথবা গোষ্ঠীগতভাবে। কথায় বলে ‘জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে’ ঈশ্বরের হাতে। তাকে কেন্দ্র করে নানা আচার তৈরি হয়েছে। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে আলাদা। সম্প্রদায়গতভাবে ভিন্ন। যন্ত্রণা-শোক-আনন্দ সবকিছুর মিশেল নিয়ে লোকউৎসব আয়োজিত হয়। লোকউৎসব একটি গোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরে। প্রাচীন ইতিহাস জানা যায়। জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস-ভয় ও সংস্কার নিয়ে লোকদেবতার প্রতিষ্ঠা হয়। তার পূজাচার, মন্ত্র, সংগীত, খাদ্যাভাস লোকসমাজকে যূথবদ্ধ করে তোলে। সংগীত খাদ্যাভাস পোশাক ইত্যাদি সবকিছু মিলেই এই লোকউৎসব।

এই সংখ্যায় আমাদের উদ্দেশ্যই হল ‘নিজেরা নিজের কথা বলবে’। আমরা সেটাই চেষ্টা করেছি। সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানে প্রাথমিক উপাত্ত সংগ্রহের অন্যতম পদ্ধতি হল ক্ষেত্রসমীক্ষা। সেই সমীক্ষা করি বিষয় অনুসারে। বিশেষ স্থান বিশেষ গোষ্ঠী নির্বাচন করি। সেখানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করি। আলোচনা করি। তবে বর্তমান সময়ের পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি একটু ভাবা প্রয়োজন আছে। যেখানে শিক্ষার প্রসারতা বেড়েছে। মনোরঞ্জন ওঁরাও সম্প্রতি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা করছেন। সঞ্চিতা টোটো একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। সংগীতা সাংমা যাদবপুরে পড়াশোনা ও গবেষণা করছেন। সুশীল কুমার রাভা ‘নাকচেংরেনি’ নৃত্য নিয়ে দিল্লির রাজপথে প্রজাতন্ত্র দিবসে অংশগ্রহণ করেন। ভাস্বতী রায় ভাষা গবেষণা করছেন। জয়দেব বাউরি লেখক। এতে বোঝা যায় নিজেরা নিজেদের কথা বলতে সক্ষম। তাঁদের দিয়েই এই উৎসবগুলো লেখানো হয়েছে। এইসব লেখায় প্রাথমিকভাবে কিছু ক্রুটি থাকবে যেমন বাক্যগত, শব্দগঠনগত, পরিচ্ছেদ বিন্যাস এবং ভাবপ্রকাশে। অর্থাৎ, বাংলা লিখার ব্যাকরণগত ক্রুটি। কারণ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষিক গোষ্ঠীর প্রাবন্ধিকত্রয় বাদে অন্যান্যদের ক্ষেত্রে বাংলা দ্বিতীয় ভাষা।

এই ক্রোড়পত্রে লিখেছেন টোটো থেকে সঞ্চিতা টোটো— ‘টোটোদের ‘অউচু’’। গারো থেকে সংগীতা সাংমা— ‘ওয়ানগালা একটি উৎসব’। রাজবংশী থেকে ভাস্বতী রায়— ‘নন্দোৎসব: দধিকাদো ও পুরাতন রাজবংশী সংস্কৃতির অবক্ষেপ’। ওঁরাও থেকে মনোরঞ্জন ওঁরাও— ‘ওঁরাওদের কয়েকটি উৎসব’। রাভা থেকে সুশীল রাভা— ‘লোকধর্মের পীঠস্থান: আদি কামাখ্যাধাম’। বাউরী থেকে জয়দেব বাউরি— ‘বাউরী জনগোষ্ঠীর পরব’। এবং আমি গৌতম সরকার দেশিদের ‘আইচুরা’-র কথা বলেছি।

যাঁরা প্রবন্ধ দিয়েছেন তাঁদেরকে কৃতজ্ঞতা জানালাম…

Categories
2021-Aug-Poem

সোহম বিশ্বাস

রোদ

এই শীতেও পোকা ঢোকেনি ঘরে

ওদের শিরদাঁড়া বেঁকে আছে,
ওরা শিখে গেছে,
ঠান্ডায় পচে যেতে হয়।

চামড়া ছিঁড়তে হয় তরল সূর্যাস্তের আগে

কবি

অঙ্ক বইটা বন্ধ করার পর,
চোখ গেল মাকড়সাটার দিকে।
বুঝলাম,
চার মিনিট আমার বইটা খুলতেই
নষ্ট হয়ে গেছে

সকাল

বয়স্করা পিছনে হেঁটে যাচ্ছে…

‘আমি একাই! যার পিছুটান নেই’
এবং
ছায়াটার হাসি পিষে গেল
ডোপামিন-এর ওজনে

দুপুর

অনেক দূর এসে গেছি
কয়েকজন বলেছিল, ফিরে যাও!
এখন এই ছায়াটার জায়গায়
এখন আমার স্বার্থপর পায়ের ছাপ

সন্ধ্যে

এখন সূর্যও আমার পিছনে।

পচা লিকলিকে অশরীরিগুলো
হাততালি দিচ্ছে…

তারায় মেশার আগে
ছায়াটা এগিয়ে দিয়ে আসছে
কোনো এক খেয়া পর্যন্ত…

আইনস্টাইন

আবার ব্যাসার্ধ বাড়ছে ঘড়িটার,
আজ ভগ্নাংশ জানি বলে
শবদেহগুলো দূরে হেঁটে বেড়ায়।

 

Categories
2021-Aug-Poem

অর্ঘ্য চক্রবর্তী

ভীষণ পূর্ণিমা রাত

জলে ডুবে চাঁদ মরে পড়ে আছে।
ছুঁয়ো না;
খানা তল্লাশি হোক,
পুলিশে মারুক আঠারো ঘা—
পরে না হয় “হরি বোল” বলে
কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে যেয়ো দ্বিরাগমনে।

কাল রাতেও দেখেছি তাকে—
কলসী হাতে মুখ-গোমড়া করে বসে আছে,
ঘাটের কাছে।

প্রেম

থেমে যাক সময়!
থেমে যাক সর্পিনী হাওয়া;
এমন সময় আলো নিভে যাক,
থেমে যাক মানুষের কণ্ঠস্বর—
আর রাত্রির নিস্তব্ধতা খান-খান করুক—
রবীন্দ্রসংগীত।
তখন তুমি, হে প্রেম—
আমার পাশে এসে বসো চুপচাপ
ঘুমন্ত নিরীহ বেড়ালছানার মতো।

মৃত্যুভয়

মাঝে মাঝে মনে হয়, মৃত্যু এসে টেনে নিয়ে যাবে। তাই আপোস করে বন্ধুত্ব পাতাচ্ছি তার সাথে। এমনকী চালাকির ছলে দিচ্ছি ঘুষও! আর এই শরীর, তুলোর মতো নরম শরীর বিছানায় কুঁকড়ে শিথিল হয়ে পড়ে আছে— তাকে দিচ্ছি ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ, মাছ। জল খাওয়াচ্ছি সময়ে সময়ে; পড়াচ্ছি জামা, ঢেকে রাখছি শাল-চাদরে। যাতে ওই শয়তান মৃত্যু এসে টেনে না নিয়ে যায়।

উল্কাপিণ্ড

তুমি যেন লুব্ধক,
উজ্জ্বল হয়ে আছ পুব আকাশে।
দ্রুত ছুটে চলেছ শুক্রাণু-বেগে।

তুমি নিশ্ছেদ্র অতল;
অবলা মহাজাগতিক স্তনপিণ্ড এক।
ক্রমশ দূরতর, নিভু-নিভু—

আমারই নক্ষত্রবিলাপ নিহত দিনের পাশে।

উদ্বৃত্ত সময়

কিছুটা সময় আমি জমিয়ে রেখেছি
ফাটা, চ্যাপ্টা টিনের কৌটোয়।
সময়মতো বাগানে নিয়ে যাই,
উঁচু করে ধরি টিনের কৌটোর হাতল—
চারাগাছেদের গায়ে ঝরে ঝরে পড়ে,
ঝিরিঝিরি সময়।
ধুলোয় মলিন গাছের পাতার মাঝে
ছোট্ট বিন্দু, আমার সময়।

 

Categories
2021-Aug-Poem

আকাশ মুখার্জী

ন্যাড়া পোড়া

খানিকটা দূরে একটা মাঠ
ঠিক তার পাশেই শ্মশান

কালো আকাশের বুক চিরে
সাদা ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে…

দু-জনেই পুড়ছে
একজন শুয়ে
অপরজন
দাঁ
ড়ি
য়ে

নববর্ষ

পয়লা বৈশাখ, চারিদিকে কেনাকাটা চলছে
আট বছরের সুদীপ্তর নতুন জামা হয়ছে
তাও আবার হলুদ রঙের…

দোকানের পাশেই শুয়ে একটা ভিখিরি বাচ্ছা।
জন্ডিস হয়েছে।
চোখ-মুখ হলুদ হয়ে এসেছে

সমুদ্র

আমি জন্মাইনি
আমি মরবও না..

আমি পৃথিবীতে শুধু ছুটি কাটাতে এসেছি
কিছু বছর ছুটি কেটে গেছে

আর কিছু বছর বাকি…

ছুটি শেষ হলেই,
সমুদ্র আমার পায়ের ছাপ ধুয়ে দেবে

বাৎসরিক

সময়ের উত্তাপ সমস্ত ঘড়িকেই গলিয়ে দিয়েছে…
সমস্ত পাহাড়কেই ক্ষয় করেছে….

প্রতিটা বছর যায়, সময়ের চিতা আরও কতকিছুকে পুড়িয়ে দেয়…

এই চিতা কোনোদিনও নেভে না…
শুধু মানুষ খেয়ে নিজের খিদে মেটায়

মধ্যবিত্ত

প্রতিদিনই একটু একটু করে
শান্ত হচ্ছি।

শুধু ততটা শান্ত হচ্ছি না
যতটা হলে আমাকে মৃতপ্রায় মনে হবে।

ভিতরে একটা ড্যাম্প খাওয়া দেশলাই রেখে দিচ্ছি…
যাতে বারুদে বারুদে ঘষা খেলে,
আগ্নেয়গিরির মতো একবার জ্বলে উঠতে পারি