Categories
2021-JUNE-KOBITA কবিতা

অমিতাভ মৈত্র

শর্টকাট

যদি ক্রাচ সঙ্গে থাকে
অস্তিত্ব স্রেফ দু-মিনিটের হাঁটা পথ

যে ভাবে মিথের জন্ম হয়

রাতে তারা দু-জন কবরখানার প্রধান ফটক থেকে
নেমে আসে নিঃশব্দে
আর অন্ধকার রাস্তায়
নরম থাবা ফেলে ঘুরে বেড়ায়।

লোকে বলাবলি করে
ধুলোমাখা শিরীষ গাছের আড়ালে
মাঝে মাঝে তারা পেচ্ছাপ করার জন্য থামে।

বুড়ো আর সূর্য

মাটির পাত্রে জ্বলন্ত কাঠকয়লা জুটত না বলে
শীতে অসাড় বুড়োটা চাইত
সূর্য যেন না ডুবে যায় কখনো।

সূর্যই জানে আসলে এক অবাস্তব ধর্মযাজক সে
মৃত্যুদণ্ডের আগে যে দণ্ডিতের সামনে
অনুভূতিশূন্য কিছু কথা
কাগজ দেখে অন্যমনস্কভাবে পড়ে যায়।

নিরাপত্তা

দেয়ালে শক্তভাবে জুড়ে থাকা প্রতিটি ইট
তৃপ্ত থাকে তাদের নিরাপদ সুসংবদ্ধ জীবনের জন্য।

বাতাস মাঝে মাঝে বিদ্রূপ করে তাদের জীবনকে

তারা কানে তোলে না।

আউটডোর টেবিল

উপুড় হয়ে শুয়ে আছে নিঃসাড় আকাশ
আর তার পিঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে
আস্তে আস্তে, সারাদিন ধরে এগিয়ে যাচ্ছে লাল স্টেথোস্কোপ

সম্ভবত অসুখ খুঁজছে।

সিদ্ধি

একজন মানুষকে হত্যা করার পর
কয়েকদিনই শুধু হাত কেঁপেছিল আমার
কিন্তু তারপর আবার যখন ছবি আঁকায় ফিরলাম
আমার কল্পনা আর রং
অনেক বেশি গভীর ও সাহসী হয়ে উঠেছিল

আমার মনঃসংযোগ আর তুলি ধরার ক্ষমতাও বেড়ে যায়

অনুতাপের ঘরের দেয়ালে যা লেখা ছিল

এমন জীবাণুশূন্য করে নিয়ো না নিজেকে, যাতে মনে হয়
সাদা সাবানের ওপর কালো ফিনাইল দিয়ে
                        লেখা হয়েছে তোমাকে

ঈশ্বরের হাতে, ঈশ্বরের লেখার খাতায়

শপিং মল-এ একজন আধ্যাত্মিক

ট্রায়াল রুমের ভেতর থেকে লাল কর্সেট পরা মহিলাটি
চাপা গলায় বললেন— গাধা কোথাকার!

আর ব্লেজার বাড়িয়ে ধরে একজন ঝকঝকে বিক্রেতা
                                            তখন বলছেন—
নিন এই দুর্দান্তকে! শুধু আপনার আগের জীবন আমাকে
                                            দিন।

মনে হয় এই শহরে সবাই
ঘরের আলো নিভিয়ে
স্ট্যাচু হয়ে থাকার খেলা পছন্দ করে
আর কোনোভাবে সেই খেলা আমাকেও টেনে নিচ্ছে হয়তো।

ঘষা কাচের ওপাশ থেকে আর একজন লাল কর্সেট
          খসখসে গলায় বলে উঠলেন— গাধা কোথাকার!

Categories
2021-June-Swaron

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

চলচ্চিত্র সম্পর্কিত একটি ব্যক্তিগত গদ্য

ছোটোবেলায় বেলা বালাজের ‘Theory of the Film’-এ একটা লাইন পড়ে বেশ উত্তেজিত হয়েছিলাম Cinema is the tenth muse। বইটি কেউ পড়তে নিয়ে দীর্ঘকাল বাদে ফেরত দিয়ে যাবার পর সেদিন নাড়াচাড়া করে দেখলাম। ওই লাইনটির তলায় সেই দাগ আজও আছে।

বাসে যেতে যেতে এদিক ওদিক তাকালাম। একটা বিজ্ঞাপন এখনও চোখে পড়ল। ইংরেজিতে। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘প্রেম করে যাও, বাচ্চা উৎপাদন কোরো না’। চোখে পড়ল ‘ফুলশয্যা’ ‘এক যে ছিল দেশ’ ‘জাল সন্ন্যাসী’। সন্ন্যাসীর হাতে ছুরি। বাংলা ছবি। হুড়মুড় করে নামল বৃষ্টি। ঝপ ঝপ বাসের ভেতর জানলা বন্ধ হতে লাগল। জলে ধুয়ে যাওয়া কাচের ওপারে দেখলাম বৃষ্টির ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসছে তৃপ্ত ও সুখী, বাংলা ছবির দর্শক ও তাদের মা মাসি বউ বোনেরা। মনে পড়ল, আমি একটা বড়ো ছবি করার কথা ভাবছি। জানলা তুলে দেখলাম। বাসের ভেতর দেখলাম। ভয়ে শিউরে উঠলাম। একটি মুখও মনে হল না আমার ছবির দর্শকের। দেখলাম, ফাঁকা চেয়ারের সার, কাউন্টারে হাই তোলা টিকিটবাবু। মাছি। কিলবিল করতে করতে চলা উদাসীন, ভ্রূক্ষেপহীন মানুষ-মানুষি।

এই দুঃস্বপ্নের ছবি দেখেন প্রায় প্রত্যেকেই। যাঁরা ছবি করতে চাইছেন নিজের মতন করে, যাঁরা নিজেদের ভাবনা-চিন্তা-বিশ্বাসের কাছাকাছি থাকতে চাইছেন, যাঁরা নিরুপায় ও চমৎকৃত এক ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই স্বপ্নতন্তু জাল ছিঁড়ে এই দুঃস্বপ্নেরা ঝাঁকে ঝাঁকে ঢুকে পড়ে। আর তাঁদের বুকের ভেতর গুটিয়ে রাখা কয়েক লক্ষ ফুট আন-এক্সপোজ্ড ফিল্ম নেগেটিভে যে-সব ছবি ফুটে ওঠে, মাঝরাতে উঠে একা অন্ধকারে জেগে থেকে তাঁদের দেখতে হয় সেইসব। ফাঁকা, বহুদূর চলে যাওয়া রাস্তা, দূর থেকে গরগর শব্দ করে একটা বিন্দুর মতো প্রথমে দেখা দিয়ে সামনে দিয়ে ছুটে চলে যাচ্ছে একটা মোটরসাইকেল। আবার। ফাঁকা রাস্তা বহুদূর পর্যন্ত, গরগর করে ছুটে আসছে এক মোটরসাইকেল। যে চালাচ্ছে সে পাথরের মতো, তার মুখ উলটো দিক করে বসানো আর তার চোখদু-টি অদ্ভুত আয়ত, কেন-না কাচের।

মানুষ বিয়ে করে সুখী হয়। বাচ্চা উৎপাদন করে বা না করে সুখী হয়, রাশ রাশ পদ্য লিখে ফেলে সুখী, হাঁ হয় ও দাঁত খোঁটে ও আবার রাশ রাশ পদ্য লিখে ফেলে, চাকরি করে সুখী হয়, সমালোচনা লিখে সুখী হয়। কেউ ব্রিজ বানায়। সুখী হয়। কেউ আদর্শের জন্য দালাল ও তার ভেড়ুয়াদের দ্বারা কবলিত হয়েও প্রাণ ভিক্ষা করে না— স্বপ্ন দেখে বদলে দেবার লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে। কেউ-বা মরা মাছের চোখ নিয়ে আরও অনেক ভেসে ওঠা মাছের সঙ্গে থেকে গিয়ে দেখে যায় সবকিছু ও সুখী হয়। ফিল্ম ভালোবেসে একজন যা করে তা হল লাফ দিয়ে সে উঠে পড়ে এক তাতানো তাওয়ায়। বা তা হল এক জ্যান্ত ইঁদুর গিলে ফেলার ব্যাপার। একদিন ঘুমাতে যাবার আগে সে ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে বিছানায়, তার হাড়ের কুচি ও গুঁড়ো সে স্পষ্ট দেখতে পায় শেষবারের মতো। কিংবা শেষ-ভাজা হয়ে মাথা পর্যন্ত চাদর টেনে দেয় সে নিজেই। দেশ, ভারতবর্ষ।

তবুও প্যাঁচা জাগে। আর জেগে থাকে সে। স্ক্রিপ্টের পাতা উলটে যায়। কাটে, লেখে, কাটে। তারপর একদিন তার বাঁ-দিকে ডান দিকে অশেষ দুর্ভোগ দাঁড় করিয়ে রেখে সে তার জীবনের প্রথম বড়ো ছবির শুটিং-এর দিনটির সামনাসামনি এসে দাঁড়ায়। যতদিনে ছবি শেষ হয়, ততদিনে কবিতা থেকে পাঠক সরে গেছে আরও দূরে, ছবি থেকে দর্শক সরে গিয়ে আরও ভুল ও সংক্রামক এক অপ-ছবির অন্ধকারে জড়ো হয়েছে দলে দলে। সে মর্মাহত হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু খুব গোপনে অন্তত একবার নিজের কাঁধে হাত রেখে সে বলতে পারে যে, যথাসম্ভব কম নুয়ে সে কিছু করতে চেয়েছিল। রাত যায়, একদিন প্যাঁচাও ঘুমিয়ে পড়ে। জেগে থাকে সে।

সে কী করতে পারত? সে নিশ্চয়ই ঠোঙা ভরা বাদামভাজা নিয়ে বসে থাকতে পারত না কেন-না সে ভালোবেসেছে ছবি তৈরি করার ব্যাপারটাকে। তার ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের দ্বন্দ্ব সে তুলে ধরতে চেয়েছে এখানেই। তাই ভেঙে পড়া অতল খাদের ভেতর থেকে কালো বেড়ালের হাতছানির ডাকে একেবারে সামনে এগিয়ে গিয়েও সে শেষপর্যন্ত পিছিয়ে আসে। চোয়াল শক্ত করে সে আবার বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে সে জানতে চায় ইয়োরিস ইভেন্‌স-এর ‘The Camera and I’, বইটি আছে? তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি তরুণ চলচ্চিত্রকার ও তাঁদের দর্শকদের ভীষণ কাছের মানুষ ইয়োরিস৷ লেনিন ও মাও-এর দেশের বহু অতুলনীয় তথ্যচিত্রের পরিচালক। একদিন দেখেছিলাম কয়লাখনির শ্রমিকদের দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘট নিয়ে তাঁর ছবি ‘বোরিনেজ’— না, নেই, সব, সব ফুরিয়ে গেছে। বিক্রেতা সখেদে জানান। বইটি না পেয়েও সে খুশি হয়ে বেরিয়ে আসে। সে ভাবতে থাকে তাদের, যাদের হাতে হাতে বইটি ঘুরছে। সে কেনে ডটপেন ও কাগজ। ফুটে ওঠে আবার নতুন ছবির দৃশ্য। তার চোখের সামনে না থাকলেও আছে, হয়তো অজস্র নয় তবু কিছু নতুন প্রাণের দর্শক, যাদের জন্য আপাতত কষ্টেসৃষ্টে হলেও সে বাঁচিয়ে রাখবে অন্তত তার ছবি করার ইচ্ছেটাকে। সে লিখতে থাকে। লেন্স ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে দেখাতে থাকে প্রথম দৃশ্য। বহুদূর কালো এক রাস্তা দিয়ে গরগর করে ছুটে আসছে উলটো মাথার সেই মটোর সাইকেল-চালক তার আয়ত কাচের চোখ নিয়ে। একটার পর একটা হলে ঢুকে দৌড়ে চলে যাচ্ছে ওপরে, ভুল ও মিথ্যাকে বিশ্বাস করানোর জন্য সাদা ও রঙিন ছবির ক্যান খুলে গোটানো রিলের প্রথমটুকু হাতে ধরে সে নীচে ফেলে দিচ্ছে সে-সব, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, কেন-না নীচ থেকে একজন আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রথম দৃশ্য শেষ হয়। হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে।

আমরা সত্তরের যীশু, ১৯৭৭ (পত্রিকা), স্বপ্ন, সময় ও সিনেমা (গ্রন্থ)

ঋণ: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

Categories
2021-June-Haiku

মো. মুহাইমীন আরিফ

নভোমণ্ডল
দূরবীক্ষণে চোখ
বৃত্তদর্শন

চাঁদে গ্রহণ
জোয়ারে উপচানো
জলপেয়ালা

সমুদ্রজল
সৈকতে লাবণিক
লবণস্তূপ

চন্দ্রালোকিত
জলের আয়নায়
কে চাঁদমুখ

মুখে আহার্য
পিপীলিকার দল
শীত আসন্ন

বরফরোদ
প্রতিবিম্বিত সূর্য
ডিমকুসুম

পাহাড়শীর্ষে
গলাধঃপ্রক্রিয়ায়
গোধূলি সূর্য

পশ্চিমা বায়ু
পুবে পাতার স্তূপ
ভঙ্গুর বৃক্ষ

শ্রাবণবিন্দু
দিঘির ক্যানভাসে
জ্যামিতি বৃত্ত

১০

মাছের ঝাঁক
বক জেলের কানে
জলের গান

Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক

শতদল মিত্র

মস্তানের বউ


রূপা সকালে আগে দেওয়াল থেকে তার কৃষ্ণের ফোটোটা নামায়। পেছনে জমা ঝুলকালি পরিষ্কার করে। পরম মমতায় নিজের আঁচল দিয়ে আস্তে আস্তে ছবির ওপর জমা তেলকালির ধূসরতা মুছে দিতে থাকে সে। যেন তার কৃষ্ণের পরশ পায় সে-আদরে। হ্যাঁ, আদরই দেয় রূপা কৃষ্ণকে, তার রাজাকে কত-কত দিন পর। চোখ ভিজে ওঠে তার। ফোটোটা যথাস্থানে ঝুলিয়ে একটা গোড়ের মালা পরিয়ে দেয় ছবিতে। তার ঝাপসা চোখে গোড়ের মালা অতীত আঁকে।

উঠ ছুঁড়ি তোর বিয়েই যেন! এক সন্ধ্যেবেলা কৃষ্ণ হাজির তাদের বাড়ি।

— কাল সকালে রেডি থাকবে। সকাল দশটা। এই নাও।

একটা সুদৃশ্য, কলকাতার বড়ো দোকানের ব্যাগ তার হাতে ধরিয়ে দেয় কৃষ্ণ।

— শাড়ি আছে। গয়নাও। কাল সকালে রেডি থাকবে। কাল বিয়ে করব আমরা। কালিঘাটে।

রূপা কী বলবে? সে নির্বাক প্রস্তরমূর্তি যেন বা। শুধু বুকের ভেতরটা তিরতির কেঁপে জানান দিচ্ছিল যে, সে বেঁচে আছে, মরেনি। যদিও ভয়, ভালোবাসা, জয়— জীবনের তীব্রতম আকুতিতে সে মরেই যেতে চেয়েছিল সে-সাঁঝে!

ফ্যালফ্যাল দৃষ্টির নিথর বাবার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে বলেছিল কৃষ্ণ— এটা রাখুন। সামান্য টাকা। বড়োমেয়ের বিয়ের ঠিক করুন। সব দায় আমার।

কাটা-কাটা স্বরে উচ্চারণ ভাসিয়ে কৃষ্ণ পিছন ফিরেছিল। এমনই কাটা-কাটা কথাতে অভ্যস্ত ছিল সে। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই বলাই তার অভ্যাস। ঘরের চৌকাঠে পা দিয়ে চকিতে মুখ ঘুরিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল সে কথা ক-টাও—রামুকে দু-দিন পর দেখা করতে বলবেন আমার সঙ্গে। আমার ঠেকে। সকাল আটটায়। সাবান কলে লোক নেবে।

বেরিয়ে যায় কৃষ্ণ আঁধার ঠেলে বস্তির কয়েক জোড়া অদৃশ্য চোখকে পাত্তা না দিয়েই। রাত চিরে বাইক গর্জে উঠেছে ততক্ষণে।

পরের দিন সকালে সাদা প্যান্টের ওপর ঘি-রঙা সিল্কের পাঞ্জাবিতে আর গোড়ের মালায় কী অপূর্বই দেখতে লেগেছিল তার কৃষ্ণকে— যেন স্বয়ং কেষ্ট ঠাকুরটিই!

কালিঘাট মন্দির থেকে ওরা সদলবলে পার্ক স্ট্রিটে বড়ো হোটেলে গিয়েছিল। রূপার জীবনে প্রথম অত বড়ো হোটেলে খাওয়া। মুগ্ধ দৃষ্টিতে বার বার আড়চোখে দেখেছিল সে তার রাখাল রাজাকে। আনন্দে-আহ্লাদে!

গোড়ের মালায় আর সকালের নবীন রোদে কৃষ্ণের ফোটোটা ঝলমল করে ওঠে। যেন হাসে রূপার দিকে তাকিয়ে। এমনিতে গম্ভীর, চোখজোড়া সদা চঞ্চল, যা আভাস দেয় তার মন কোথাও স্থির না, ডাঙা পাচ্ছে না এমনই ভাসমান— সে গম্ভীর কৃষ্ণ হাসত খুবই কম। তবু রূপার মনে হত একমাত্র তার কাছে এলে যেন দাপুটে লোকটা কোথাও ডাঙা পেত, যা ভরসা, আশ্রয়ই হয়তো। তার মুখে হাসির সজল মায়া জাগৎ রূপার সান্নিধ্যেই যেন। তেমনি তো হেসেছিল সেদিন। যেদিন কৃষ্ণ প্রথম মায়া এঁকেছিল তার মনে, তার পরের দিন কলেজে ফি দিতে গিয়ে দেখে তার সারা বছরের ফি মেটানো হয়ে গেছে। তবে কি সে, সে-ই! সদ্য ফোটা রূপার মনে দোলা ছিল! লজ্জায় মাথা তুলতে পারে নি কলেজের অফিস কাউন্টারে। ক্লার্ক নৃপতিবাবু কি হেসেছিল!

কলেজ ছুটির পরে ফেরার পথে লজ্জায় মুখ নামিয়েই রূপশ্রী হল পার হচ্ছিল সে। কেন-না এই হলের আশেপাশেই তো ওদের আড্ডা। তখন বিকেল মায়া সাজাচ্ছে আকাশে। সে-মায়ায় এক কালো ছায়া ঢেকে নেয় তাকে— কেমন চমক দিলাম!

হে ধরণী দ্বিধা হও— এমনই যেন রূপার ভঙ্গিমা তখন। তবু অপাঙ্গে তার ঝিলিক হেনেছিল এক নিরুচ্চার হাসির উদ্ভাস। সে-উদ্ভাসই যেন আজ এই সকালে ঝিলিক হানে পৌঢ়া রূপার চোখে। ঝাপসা চোখে সহসা সকাল মুছে সাঁঝমায়া! রূপশ্রী হল আলো ঝলমল সুর বোনে— দশ কা বিশ! দশ কা বিশ! হারু হিমসিম খায় খদ্দের সামলাতে!

রূপার সজল চোখে ছায়া ফেলে সে-জলরঙা ছবির মায়ালু পেলবতাও। কৃষ্ণ কথা রেখেছিল। তার দিদির বিয়ের সব খরচ কৃষ্ণই দিয়েছিল। রামু সাবান কলে আজও চাকরি করে। ভালই মাইনে পায়। শুধু তাই-ই নয়, তার পরের বোনের বিয়ে, ছোটোভাইয়ের ল্যাম্প ফ্যাক্টরিতে চাকরি— সব দায়িত্ব যেন কৃষ্ণেরই। অথচ…। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে পৌঢা রূপা।! আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। ফলে সকল সজলতা মুছে আলো ঝলমল সে-সন্ধ্যা হারিয়ে যায়। সকালের নবীন সে-রোদ তখন খর। দোকান সাজায় রূপা খদ্দেরর আশায়।

দু-একজন করে খদ্দের আসে। চা চায় তারা, খায়। গুলতানি মারে। বৃদ্ধ কিছু মানুষের আড্ডাখানাও যেন তার এই দোকান। রিটায়ার্ড, ঘরে সময় কাটে না। দোকানে আসে, ঘণ্টাখানেক গল্পগুজব করে। বাঘ মারে, হাতি মারে— বাতের গল্প আর নিজেদের বাতিল জীবনকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার গল্প। বার দুয়েক চায়ের অর্ডার দেয়। রূপা কিছু বলে না। রূপশ্রী হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেমন খদ্দের হয় না আর। বাজার এলাকা তো নয়! ওই স্থানীয় লোকজন, পাশের পার্টি অফিসের লোকজন আর পথ চলতি দু-একজন— এই তো তার খদ্দের! বুড়ো লোকগুলো এলে ফাঁকটা অনেকটাই ভরে ওঠে। ভালো লাগে রূপার। ভালো লাগে যখন এমনই কথা ভেসে ওঠে ওদের চায়ের তৃপ্ত চুমুকে মিশে। কাটা। কাটা।

— মানুষ ছিল একটাই সে-সময়! আর নাই।

— হ্যাঁ, রাজা মানুষ। যে কোনো সমস্যায় তার দরবারে একবার হাজির হলেই হল।

ফলে গল্প গজায়, পল্লবিত হয়, মিথের মাহাত্ম্য ডানা মেলে।

— ওই তো সেবার! হালদার পাড়ার পাঁচু রিকশাঅলা, মেয়ের বিয়ের জন্য ধরলে— এমন বিয়ে হল যে তেমন তেমন বড়োলোকও হার মেনে যায়!

— আর দীনু মিস্ত্রির বাগানের ওই অনন্ত গো! জাহাজ কলে কাজ করতে করতে মরে গেল যে। তার বিধবা কৃষ্ণকে ধরতেই এক মাসের মধ্যে চাকরি পাকা তার ছেলের।

— ফতেপুরের শিবু ছেলেটা! ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেল। ভর্তির টাকা দিল তো কৃষ্ণই!

এমনতর গল্পের মাহাত্ম্য দোকানের চিলতে ঘরে মাথার ওপর পাক খায়, খেয়েই যায় ঘুর্ণিয়মান পাখার সঙ্গে! আর সে মাহাত্ম্যে হঠাত্‍ একফালি উড়ো সাদা মেঘ সূর্যকে ঢাকে যেন। সে-সকাল মলিন হয় সহসা। সে-ছায়ায় কথারা গলা নামায়। যেন কৃষ্ণের বিধবা না শোনে। দুঃখ না পায়!

— ও তো মস্তানি করতো ডকে, কারখানার চৌহুদ্দিতে। ওটা ছিল তার রাজপাট।

— পাড়ায় কিন্তু সে কোনোদিন কিছু করেনি। তার জন্য পাড়ায় আমরা শান্তিতেই ছিলাম সে সময়। ফোস করে সমবেত নিঃশ্বাস পড়ে যেন। সে-নিঃশ্বাসের অভিঘাতেই যেন মেঘ ভেসে যায়, সূর্য স্বমহিম হয়।

আর ঠিক সে সময়েই কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ছায়া বিলিয়ে সূর্য ঢোকে। সূর্য মিত্র। নকশাল ছিল নাকি সে! আলজাইমার রুগি। হাত-দুটো সবসময় কাঁপে। তবুও ডান হাতটা তার সর্বদা পকেটে গোঁজা থাকে। বোমা ফেটে ডানহাতের তালুটা নাকি তার নেই। যদিও সে তালুহীন হাত কেউ কোনোদিন দেখেনি। না দেখলেও ওটা সত্যই।

অন্যেরা শশব্যস্ত হয়ে সরে বসে বেঞ্চে জায়গা করে দেয় তাকে। সমীহ করে সবাই তাকে। নাকি মায়া! যেমন রূপার মায়াই হয় জীর্ণ লোকটাকে দেখে! ব্যর্থ বিপ্লব! ব্যর্থ মানুষ। শুধু সমাজ পালটানোর স্বপ্নে যৌবনটাকে পচিয়ে দিয়েছে জেলে! রূপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তার কৃষ্ণও তো তাই! না, বিপ্লব সে করেনি। কিন্তু রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল সেও তো! যদিও ক্ষমতার রাজনীতি, তবুও যথাসাধ্য গরিবকে সাহায্য তো কৃষ্ণও করত! তবুও কৃষ্ণ খুনি, গুন্ডা, মস্তান! যদিও এলাকার লোকের চোখে কৃষ্ণ কোনোদিন বিকৃত হয়ে কেষ্টা হয়নি। লোকের মুখে কৃষ্ণদা সম্বোধনে সমীহই ছিল। তবুও…।

রূপা জানে সূর্য মানুষটা চিনি ছাড়া লিকার চা খায়। ও চা এগিয়ে দেয় সূর্যের দিকে। টেবিলে নামিয়ে রাখে। সঙ্গে প্লেটে দুটো ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুটও।

মাথার ওপর পুরোনো পাখাটা নিশ্চুপ কথার জাল বোনে। সে নিঃশব্দতাকে বাড়িয়ে সূর্য ম্লান হাসি হাসে মুখ তুলে। ফলে নৈঃশব্দ্য জমাট বাঁধে আরও।

অগত্যা রূপই এগিয়ে আসে সে জেকে বসা নৈঃশব্দ্য তাকে ভাঙতে অন্য দিনের মতোই।

— সূর্যদা শরীর এখন ভাল তো?

— ওই চলে যাচ্ছে বোন। কাঁপা কাঁপা গলা এ-উচ্চারণও বোনে,— তোমরা সব ভাল তো!

— হ্যাঁ, দাদা চলে যাচ্ছে, চালাতে তো হয়ই!

কথা পড়তে পায় না আর। একজন লুফে নেয় কথাখানা।

— এই-ই হল আসল কথা! দিন চলে যায়, চালাতে হয়।

ফলে কথার টানে কথা বাড়ে।— সত্যি কী দিন ছিল বলো তো তখন?

— এই যে সূর্য বিপ্লব করেছিল ধান্দার জন্য? না, সমাজের ভালোর জন্যই তো!

— আমাদের কৃষ্ণর কথাই ধরো না কেন? গরিবের কত উপকার করেছে ও।

— আর এখন? রাজনীতি মানে ধান্দা, নিজের আখের গোছানো শুধু! গাড়ি-বাড়ি-ব্যাঙ্ক ব্যালান্স-প্রমোটিং! ছিঃ ছিঃ! সমাজটা উচ্ছন্নে গেল একেবারে।

কথারা এমনই জাগে ঘরময়। পাখার হাওয়ায় লাট খায়। রূপার কানে গুঞ্জন তোলে। কিন্তু কিছুই সে শোনে না। তার মন অন্য ভাবনা বোনে। কী পেল ওরা? কৃষ্ণ-সূর্য! কৃষ্ণ তো নেই-ই আর। সূর্য থেকেও নেই। জেল ফেরত লোকটা রাজনীতির রা আর কাড়ে নি। সব স্বপ্নকে হারিয়ে মৃত মানুষই যেন সে। জেল তার সকল জীবনীশক্তিকে নিংড়ে ছিবড়ে করে দিয়েছিল। অথচ সে আগুনে সময়ে সূর্য যেন জ্বলন্ত সূর্যই, মধ্যাহ্নের। তার বিভায় মেয়েরা পাগল ছিল। তার পরে সূর্যগ্রহণ কালে সে আলো জেলের অন্ধকারে হারিয়ে গেলে, মুছে গিয়েছিল সকল জীবন্ত গান। শুধু জেগেছিল মনীষা। প্রতীক্ষায় ছিল তার সূর্যের গ্রহণমুক্তির। গ্রহণ কেটে গেলে সে সূর্যকে বরণ করে নিয়েছিল। অতদিন পরও। ততদিনে মনীষা সরকারি চাকুরে। এলাকার পাঁচজনে ধন্য ধন্য করেছিল এ প্রেমের শুভ পরিণতিতে। তারপরেও কিন্তু থেকেছিল। মনীষা জ্বলন্ত সূর্যকেই ভালবেসেছিল বোধহয়! গ্রহণলাগা এ সূর্য হয়তো আকাঙ্ক্ষিত ছিল না তার! ফলে প্রেম উবে গিয়েছিল কবছরেই, শুধু দাম্পত্যের অভ্যাসটুকুই টিকেছিল— করুণায়, দয়ায়। যা টিঁকে আছে আজও পরগাছার মতো। মনীষা তো জেনেবুঝে ভালবেসেই গ্রহণ করেছিল লোকটাকে। সরকারি চাকরি। যা মাইনে পায় তাতে তো স্বচ্ছলতা উপচে পড়ার কথা সংসারে। যেমন পুরুষ মানুষরা একার আয়েই তো স্বচ্ছল! তবে কি বিদুষী, বিপ্লবী মনীষার মনেও পুরুষতান্ত্রিকতার থাবা! রূপা ভাবে। মনীষা কি অন্য কিছু আশা করেছিল মানুষটার কাছে! বড়ো নেতা হবে? মন্ত্রী হবে? কে জানে? ভাবনারা পাক খায় দোকানের আলো আঁধারিতে, টাল খায় পাখার একঘেয়ে ঘুরে চলায়।

রূপাও কি কিছু চেয়েছিল তার কৃষ্ণের কাছে? নিভন্ত মন কোনো সংকেত আঁকে না। সামান্য নারী সে শুধু চেয়েছিল তার মানুষটা ঠাকুর-ঠাকুর করে বেঁচে থাকে যেন। কিন্তু…! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রূপা গোপনে। পাখার হাওয়া ভারী হয়ে ওঠে। পরগাছা জীবন, তবুও সূর্য মানুষটা তো বেঁচে আছে! মনীষার হয়ে রূপা মনে মনে আদর দেয় জীর্ণ মানুষটাকে! দেওয়ালে ঝোলানো মানুষটা হাসে যেন— তেমনই মনে হয় রূপার!

ভাবে আর টুকটাক খদ্দের সামলায় রূপা। বেশিরভাগ জনই বাইরে দাঁড়িয়ে চা খায়। চা ফুটে উঠতে থাকে আগুনে। উথলায়। রূপা অভ্যস্ত হাতে হাতা দিয়ে উথলে ওঠা ডেকচির চাকে থিতু করে। কিন্তু তার মন! উথলে ওঠে, উথলে উঠতেই থাকে। খদ্দেরের আনাগোনা ছায়া আঁকে দোকানের আবছায়া পরিসরে। কথারা জেগে ওঠে, ভাসে। অভ্যাস্ত হাত তার মনহীন যন্ত্রের মসৃণতায় যেন খদ্দের সামলায়। মন তার ভেসে চলে যায় সেই সত্তরে! মনে মনে হাসে রূপা! রোগা-প্যাংলা লোকটা, দোখনের কোনো এক গ্রামে, কাঁধে রাইফেল মাঠের আল ভেঙে রাত চিরে হাঁটছে! দৃশ্যটা মনে হতেই মনের হাসি অজান্তেই রূপার ঠোঁটে আশ্রয় পায়। সচেতন রূপা সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলে তা। খুবই সরল সাধসিধে সূর্যদা! এই লোকটা বিপ্লবী! মানুষ খুন করেছে? করতে পারে অমন নরম লোকটা! অথচ রটনা তো তেমনই!

যেমন রটনা এও যে কৃষ্ণ নাকি খুনি! খুন করে কত লাশ নাকি শান্তিনগরের হোগলাবনে, ব্রূকলিন, সিকলেনের ঝিলে গুম করে দিয়েছে! ওরা নাকি সব ছিল তার বিরোধি দলের গুণ্ডা! কৃষ্ণের বিরোধি, নাকি পার্টির বিরোধি! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রূপা। মাথার ওপর পুরোনো পাখাটা একঘেয়ে একটানা ঘুরেই চলে গরম হাওয়ার ঘূর্ণি তুলে। ঘূর্ণি ওঠে রূপার মনেও। কিন্তু কে খুন হল, কার লাশ গায়েব হল কেউ জানে না তা! পুলিশও কোনো রা কাড়েনি। তবুও রটনা— কৃষ্ণ খুনি! পার্টির প্রশ্রয়ে খুন হওয়া মানুষগুলো সমাজ-সংসার থেকে মুছে যায়। পুলিশের ডায়েরি থেকে যায় সফেদ-সাদা!

রূপার ভাবনা টাল খায়, কেন-না টলতে টলতে সূর্য কাঁপা হাতে পকেট থেকে টাকা বার করে কাউন্টারে রাখে। তারপর দোকানের আলো-আঁধারিকে দুলিয়ে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যায় বিপ্লবী সূর্য। রূপা তাকিয়ে থাকে টলায়মান সে-অতীতের ছায়ার দিকে। তাকিয়েই থাকে, কিন্তু চোখ তার ছবি আঁকে না, সেখানে তখন অন্য আলো-আঁধারির ছায়া— খুনি সূর্য বিপ্লবী! আর তার কৃষ্ণ গুণ্ডা! মস্তান! খুনি!

রূপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আবারও। রাস্তায় গরম হাওয়া বয়। সে-হাওয়ায় প্লাস্টিকের বাতিল এক প্যাকেট উড়তে উড়তে ঠেক খায় রূপার দোকানের চৌকাঠে।

প্রথম পর্ব

Categories
অন্যান্য

ফা-হিয়েন

ফা-হিয়েনের ভ্রমণ

চতুর্থ অধ্যায়
পক্ষকাল শেষে শোভাযাত্রার অবসান হতেই শেং শাও নামক দলটি শি পিনের দিকে রওনা দিল। সঙ্গী হল ওইগার প্রদেশের এক বৌদ্ধ শিষ্য। পঁচিশ দিনের অবিরাম পথ চলা শেষে ফা-হিয়েন ও তাঁর অন্য সাথীরা এসে পৌঁছোলেন জু হো প্রদেশে। এ-দেশের রাজা বৌদ্ধধর্মের উপাসক। সহস্রাধিক সন্ন্যাসী আছেন এখানে আর সকলেই মহাযান ধর্মাবলম্বী। দিন পনেরো বিশ্রাম অন্তে আবার যাত্রা। দক্ষিণ দিক লক্ষ করে চার দিন পথ চলা শেষে দলটি এসে পড়ল পলান্ডু পরিসরে। এবার আবার এক নতুন দেশ ইউ হি। আবার দিন কয়েকের বিরতি। এবারের যাত্রা হবে দীর্ঘ, বিরামহীন। একটানা পঁচিশ দিন ভ্রমণ শেষে এবার এসে পৌঁছোনো গেল চি চাহ প্রদেশে। হুই চিং আর অন্য সাথীদের সঙ্গে এসে পুনরায় মিলিত হলেন তাঁরা।

পঞ্চম অধ্যায়
দেশের রাজা পঞ্চ শীল ধারণ করেছেন। এ হল পাঁচ বছরের মহাসমাবেশ। সব শ্রমণদের রাজা আমন্ত্রণ জানান এই সমাবেশে। আর বিপুল সংখ্যায় তাঁরা যোগও দেন। তাঁদের বসার আসনগুলি পূর্ব হতেই সুসজ্জিত করে রাখা হত, ছোটো ছোটো পতাকা আর স্বর্ণ রৌপ্যের সুতায় পদ্মফুলের নকশা করা শামিয়ানা দিয়ে। আসনের পিছন দিকে একেবারে নিদাগ, ঝলমলে ঝালর দিয়ে সাজানো হত। রাজা তার সব মন্ত্রী অমাত্যদের নিয়ে যাবতীয় আচার মেনে পূজার অর্ঘ্য দিতেন। এক, দুই কখনো-বা তিন মাস পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান পর্ব চলত এবং সাধারণত বসন্তকালেই বসত আসর। রাজার সভা শেষ হলে তিনি অমাত্যদের আহ্বান জানাতেন। এবার তাঁদের পূজার অর্ঘ্যদানের পালা। এই পর্বটি চলত দু-তিন, কখনো পাঁচ দিন ধরে। সকল নৈবেদ্য সারা হলে, এইবার রাজার আদেশমতো তাঁর মন্ত্রী, অমাত্যদের নিজস্ব ঘোড়ার সমকক্ষ কিছু ঘোড়ায় লাগাম, জিন পরিয়ে সাজানো হল। আনা হল অতি শুভ্র বস্ত্র, সকল প্রকারের রত্ন সম্ভার, শ্রমণদের যেমনটি প্রয়োজন। রাজা তাঁর অমাত্যবর্গ-সহ শপথ নিয়ে এ-সব সামগ্রী শ্রমণদের দান করলেন। এভাবে সন্ন্যাসীদের থেকে ভিক্ষা সামগ্রীর মাধ্যমে মুক্ত হল শ্রমণগণ। দেশটি তো পর্বতসংকুল এবং যথারীতি শীতল। গম ছাড়া আর কোনো শষ্য জন্মায় না। শ্রমণগণ তাঁদের প্রাপ্ত সামগ্রী গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ হয়ে এল মেঘলা, ফলস্বরূপ হিমশীতল হল সকাল। এই জন্যেই এ-দেশের রাজা প্রতিনিয়ত সন্ন্যাসীদের কাছে প্রার্থনা করে গেছেন যাতে তাঁদের প্রস্থানের পূর্বে খেতের গম পেকে ওঠে। বুদ্ধের ব্যবহৃত একটি পিকদানি আছে এ-দেশে। তাঁর ভিক্ষাপাত্রের মতো এটিও একই রঙের পাথরে তৈরি। আর আছে বুদ্ধের একখানি দাঁত। এবং এই দাঁতের সম্মানে এ-দেশের মানুষ তৈরি করেছে একটি প্যাগোডা। সহস্রাধিক সন্ন্যাসী আছেন এই স্থানে, তাঁরা প্রত্যেকেই হীনযান মতাবলম্বী। যত পুবে পর্বত ঘেরা স্থানে যাওয়া যায়, সেখানে মানুষ চীনাদের মতোই মোটা, খসখসে পোশাক পরে, যদিও তাদের পশম আর গরম বস্ত্রের ব্যবহার ভিন্ন। শ্রমণদের আচার অনুষ্ঠানও এখানে বিচিত্র আর অগণিত। এই দেশটি যেন পামীর, হিন্দুকুশের কোলে শিশুর ন্যায় রয়ে গেছে। আর এখান থেকে গাছপালা, ফুল, ফলের চরিত্রও যায় বদলে। চীনের সাথে মিল পাওয়া যায় কেবল বাঁশ, পেয়ারা আর আখ গাছের।

ষষ্ঠ অধ্যায়
এই স্থান থেকে পশ্চিমে এগোও, মিলবে ভারতবর্ষের উত্তর খণ্ড। পথ মধ্যে হিন্দুকুশ, পামীরের বিস্তার। বুনো পেঁয়াজের ভারী ফলন এ-অঞ্চলে। এক মাস যাবৎ যাত্রা শেষে সফল হলেন তীর্থযাত্রী দল। পার করলেন এই ‘পেঁয়াজ পরিসর’। বরফের এই দেশে শীত গ্রীষ্মে ভেদ নাই কোনো। আর আছে বিষধর ড্রাগন। সামান্য প্ররোচনায় ঢেলে দেয় বিষময় বাতাস, বৃষ্টি, তুষার, বালি ঝড় বা পাথর। এমন বিপদের মুখে দশ হাজারে একজন পালাতে পারে না, এমনই ভয়ংকর। এ-দেশের মানুষকে ‘তুষার শৃঙ্গের মানব’ নাম দেওয়া চলে অবলীলায়। এ-সকল পর্বত পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছোলেন উত্তর ভারত। একেবারে সীমান্তে তো লি জাতির মানুষের বসতি। এঁদের মধ্যে শ্রমণেরা আছেন। প্রত্যেকেই হীনযান মতাবলম্বী।

বুদ্ধের ছিল আঠারো জন ব্যক্তিগত শিষ্য। আর জানা যায় যে, তাঁদেরই একজন নিষ্ক্রমণ শক্তি দ্বারা এক কুশলী শিল্পীকে স্বর্গরাজ্যে নিয়ে যান, সেখানে মৈত্রেয় বোধিসত্ত্ব মূর্তির (চীনের মন্দিরে হাস্যরত ঈশ্বরের বিগ্রহ) দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বর্ণ ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে ফিরে এসে তাঁকে দিয়ে কাঠের উপর নিজের একখানি মূর্তি উৎকীর্ণ করানো যায়। এই পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে সর্বমোট তিনবার স্বর্গলোক যাত্রা করেন। অবশেষে সম্পূর্ণ করলেন আশি ফুট উচ্চতার বিশালাকায় একটি কাঠের মূর্তি, যার চরণ দু-খানিই ছিল আট ফুট লম্বা। ব্রত, উপবাসের দিনগুলোতে উজ্জ্বল দীপ্তিতে ঝলমল করে উঠত এই মূর্তি। এইখানে পূজার অর্ঘ্য দেবার জন্য এ-প্রদেশের রাজাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত।

সপ্তম অধ্যায়
পর্বতের ইশারায় এগিয়ে যাও দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্ত ধরে,পাবে কঠোর, দুর্গম, অতি ভয়ংকর এক পথ। পনেরো দিন এই পথে একটানা চললেন যাত্রীদল। পাথর প্রাচীরের মতো নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে এক-একটি পর্বত। মোটামুটি একহাজার জেন তাদের উচ্চতা। দৈবাৎ প্রান্তে এসে পড়লে চোখের দৃষ্টি হয় বিহ্বল। দুর্মর সাধ জাগে এগিয়ে যাই সামনে, আর সত্যিই যদি সাড়া দাও সে-ইশারায়, হারিয়ে ফেলবে মাটি, হারিয়ে ফেলবে শূন্য। নীচে স্রোতস্বিনী সিন-তন। প্রাচীন সময়ের মানুষেরা পাথর কেটে পথ তৈরি করেছিল। পর্বতপ্রান্ত ধরে সাতশো ধাপের একটি সোপান। সে-সিঁড়ি বেয়ে যদি নীচে নামা যায়, দেখা যাবে নদীর উপরে ঝুলে আছে দড়ির সেতু। নদীর দু-টি তীরের মাঝের দৈর্ঘ্য আশি কদমের কম। চিঙ-ই-র মতে হুন সাম্রাজ্য থেকে আসা ছাং চিন বা কান ইং এই স্থানে পৌঁছোতে পারেনি। সন্ন্যাসীগণ ফা-হিয়েনের কাছে জানতে চাইলেন, পুবের দেশগুলিতে বৌদ্ধধর্মের প্রসার কোন সময় থেকে শুরু হয়। ফা-হিয়েন বললেন, “যার কাছেই আমি জানতে চেয়েছি সকলেই বলেছে যে, ভারতবর্ষের শ্রমণেরা প্রাচীন রীতি মেনে, মৈত্রেয় বোধিসত্ত্বের মূর্তি স্থাপনের দিন, নদী অতিক্রম করে বৌদ্ধ সূত্রাবলী এবং শৃঙ্খলাগুলি এখানে নিয়ে আসেন”। বুদ্ধের নির্বাণের তিনশ বছর পর এই মূর্তি স্থাপনা হয়। তখন চৌ সাম্রাজ্যের পিং ওয়াং রাজার শাসনকাল। এই সময় থেকেই বুদ্ধের উপদেশাবলি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মহান মৈত্রেয় ছাড়া আর কেউ বুদ্ধের ত্রিকায়া এবং তার উপদেশাবলির এমন সম্যক প্রচার করতে পারেননি। বিদেশিদের কাছে এই ধর্মবিশ্বাস এভাবেই পরিচিতি পায়।

হুন সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা মিং টি বৌদ্ধধর্ম প্রচারের স্বপ্ন লালন করেছিলেন। আর ফলস্বরূপ পবিত্র গ্রন্থগুলি ফিরিয়ে আনার জন্য অভিযান শুরু হয়। বুদ্ধের প্রচলিত অনুশাসনগুলির উৎস যে কী, তা মিং টির স্বপ্নের মতো একরকম অমীমাংসিত রহস্যই হয়ে রইল।

প্রথম পর্ব

Categories
Editorial

সম্পাদকীয়

অনেকদিন ধরেই আমরা পরিকল্পনা করছিলাম ‘তবুও প্রয়াস ওয়েবজিন’ মাসে মাসে প্রকাশ করার। ধীরে ধীরে সেই কাজের প্রস্তুতিও চলছিল। শেষপর্যন্ত মে মাসে এসে বাস্তবায়িত হল। আমরা বরাবর ভালো লেখা, নতুন লেখার সন্ধানে থেকেছি। এই সংখ্যাতেও আমরা চেষ্টা করেছি সদ্য লিখতে আসা কোনো তরুণের লেখা যেমন প্রকাশ করার, পাশাপাশি তেমন নানা বিষয় বৈচিত্র‍্যের নিরিখে অভিজ্ঞ কলমচির লেখা।

এই সময়টা কতটা সাহিত্যের জন্য অনুকূল, তা হয়তো প্রশ্ন রাখতে পারে। তবে ঘরবন্দি মনের সুদূর আকাশ সাহিত্যপাঠের বিকল্প কিছু হতে পারে না। কোথাও যদি এই সাহিত্য সংখ্যা আমাদের একটুও মুক্তির আলো এনে দিতে পারে, একটি পত্রিকা সফল।

পাঠে থাকুন। আনন্দে থাকুন।
আলো আসবেই।

 

Categories
Rule

লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী

 

১। যেকোনো সময় লেখা পাঠানো যাবে।
২। লেখা পাঠাতে হবে ইউনিকোডে লিখে ওয়ার্ড ফাইলে বা ডিরেক্ট মেলবডিতে।
অন্য কোনো ফর্মাটে লেখা গৃহীত হবে না।
৩। অধিক বানান ভুল থাকলে সেই লেখা বাতিল হবে।
৪। কবিতার ক্ষেত্রে গুচ্ছকবিতা পাঠাতে হবে।
৫। লেখা পাঠানোর মেল আইডি tobuo.proyas2013@gmail.com
৬। তিনমাসের মধ্যে একই বিভাগে লেখা পাঠানো যাবে না।
৭। লেখার সঙ্গে বিভাগের নাম, নিজের ছবি, পরিচিতি ও যোগাযোগ নং অতি অবশ্যই পাঠাবেন।
৭। লেখা নির্বাচন হয়েছে কিনা বারবার সম্পাদককে জিজ্ঞাসা না করে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
৮। পত্রিকার নিয়মাবলী না মেনে লেখা পাঠালে তা বাতিল হবে।
প্রয়োজনে ৮৬৪১৯৩৭৩৫৬ নম্বরে হোয়াটস্অ্যাপ করতে পারেন।

Categories
2021-May-Poem কবিতা

নম্রতা সাঁতরা

বালি

অবাক; স্তম্ভিত আমি!
তোমাকে আদরে তপ্ত করি গোটা দিন,
আলো নিভলে হঠাৎ ঠান্ডা একেবারে।
হাতে নিলে পিছলে যেতে চাও
অথচ, পালাতে চাইলে বুঝতে পারি,
কতটা বিপরীতমুখী বল দিতে হয়।

তাঁবু

জানি, তোমার ভেতর অনেক অনিশ্চয়তা।
অনেকটা সিনথেটিক কাপড় পরে আগুন পোয়ানো।
হিমেল রাতে মাঝে মাঝে ওই কাপড়ই তাঁবু হয়,
নিশ্চিন্ত নিদ্রাযাপন।

বনফায়ার

আগুন জ্বালাতে পারবে যতক্ষণ, সেঁকে নিয়ো যে-কারো মাংসল উপস্থিতি।
তবু সুন্দরী বাঘিনীরা ভয় পাবে সেই আগুন
সব নিভিয়ে ফেলে কাছে টানতে হবে সারমেয়দের।
আগুন না পেলেও পাঁশ মাখতে কাছে আসবে।

জেলেনৌকা

আমাদের কৈশোরপ্রেম মনে আছে তোমার, একটু গুপ্ত—
বালির চরে রাখা নৌকোর মতো তাতে লেখা থাকে—
“বিনা অনুমতিতে নৌকায় ওঠা বারণ”
তবু লুকিয়ে উঠে পড়ি, ক্যামেরার ঝলকানি অনস্বীকার্য।

আঁশটে গন্ধ

অনাদিকালের তুমি আর আমি, আর আমাদের পুরোনো প্রেমটা শুকিয়ে শুঁটকির মতো।
উগ্র আঁশটে গন্ধ ছাড়ে—
তবু বিশ্বাস করি রান্না করলে সুস্বাদু হবে।

সঙ্গম

ডাঙার যত পাখি আছে তাদের নাম অনেক, রং অনেক।
সঙ্গমের অতল জলের তীরে, সকল যাত্রীর অভিন্ন নাম— ‘তীর্থের কাক’।।

Categories
2021-May-Poem কবিতা

রাজীব মৌলিক

রোপণ

আমাকে ছড়িয়ে দাও বীজধান ভেবে
যদি বেড়ে উঠি
মরশুম শেষে

চিতার অনলে নয়
অভাবের রাতে

যেন জ্বলে উঠি…

মূল

মাটি খেয়ে বড়ো হলে গাছ
শাখা, ডাল, পাতা, ফুল, ফল
যতই আকাশচুম্বী হোক

হৃদয় ছড়িয়ে থাকে তার

সানুতলে…

আলপথ

কিছু কথা হোক
অকথা কুকথা
এভাবে হঠাৎ থেমে গেলে
যাতায়াত
ফসলের মাঠে

যত ঘাস চাপা পড়ে আছে
আল ফেটে বেরিয়ে আসবে—

আমাদের পুঁতে রাখা কাঁটা

অস্থায়ী

মনে মনে আমিও পা মেলে
বসি, শ্যামলীর পাশে
লুডু খেলি, খেলি পাশা

ওর দাঁত ঠিক যেন মাগুর চোয়াল
সোহাগের টোপ দিয়ে গিলে নিতে জানে

আমিও চেয়েছি শতবার
গিললে গিলুক দেহখানি

মন না জুটুক তবু
কিছুক্ষণ পচেগলে গেলে থাকি ওর

মায়াবী গজালে

জীবন

পথে রেখে এসেছি তোমায়
আমার জীবন

এখন বিরহ করো
দুঃখ করো

কেউ বলবে না
থামো

কেউ বলবে না
কান্না করলে তোমায় বড়ো বিশ্রী লাগে

Categories
2021-May-Essay প্রবন্ধ

কিংকর দাস

পুরাতনী প্রজ্ঞা অথবা পরম্পরাগত জ্ঞান

১৯৬৯ সালের ২১শে জুলাই ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৬ মিনিটে মার্কিন চন্দ্রযান অ্যাপোলো ইলেভেন ঈগল যন্ত্রাংশ থেকে বেরিয়ে চঁদের মাটিতে পা রাখলেন প্রথমে নীল আর্মস্ট্রং এবং পরে এডউইন অলড্রিন। আমার বয়স তখন সাত। আমার দাদার সতেরো। তখন অডিয়োভিসুয়াল মিডিয়ার দবদবা শুরু হয়নি। বিশ্ব ও পারিপার্শ্বিক সচেতনতা সম্পর্কে ছাত্রসমাজ ততখানি সবজান্তা সর্বস্ব মানসিকতা সম্পন্ন হয়ে ওঠেনি। তবে চাঁদে মানুষের পদার্পণ ছিল একটা যুগান্তকারী ঘটনা— সে-ঘটনায় সারা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় উঠেছিল। আমার দাদাও তার ব্যতিক্রম নয় এবং দাদা কৌতূহলবশত আমার ছোটো দাদুকে ঈষৎ টিপ্পনি কেটে বলেছিল— কই দাদু, তোমার চন্দ্রদেবের দেশে তো মানুষ গিয়ে পৌঁছাল— তো সেখানে তোমার চন্দ্রনাথ তো দূরের কথা প্রাণের টিকিটি পর্যন্ত দেখা মিলল না। দাদার এমনতর প্রশ্ন শুনে অশীতিপর আমার ছোটো দাদু মুচকি হেসে বলেছিল— অর্বাচীন কিশোর, পুরাণে দ্বাদশ চন্দ্রের উল্লেখ আছে, যে-চন্দ্রগৃহে চন্দ্রদেবের বাস সেখানে মানুষের সাধ্য কী পা রাখার। এ-বিষয়ে আমার দাদু একা নয়। এরকম অনেক মানুষের সন্ধান পেয়ে যাবেন যাদের বৌদ্ধিক ধারণায় বিশেষ বিশেষ বিষয় সম্পর্কে পুরাতনী প্রজ্ঞাটি এমনই অটল এবং অনড় যে, সেই সম্পর্কিত ধারণাটি তাঁরা লালন পালন করেন এমন নয়, তাকে অভ্রান্ত বলে মনে করেনও এবং তাকে নির্বিশেষ করে তুলতে চান— বংশপরম্পরাগত বা যুগ যুগ ধরে লালিত সাবেকি বা চিরাচরিত জ্ঞানচর্চার ফলশ্রুতির নিরিখে।

আমার যেখানে বাড়ি— সেই খড়গপুরের মালঞ্চগ্রামের চণ্ডিপুর পাড়ায়। সেই পাড়াতে বাড়ি রহমত মিঞার। রহমত একজন ধর্মপ্রাণ সরল মনের মানুষ। মক্তব পর্যন্ত তার পড়াশোনা। আপনি রহমতকে জিজ্ঞাসা করুন— চাঁদে মানুষ যাওয়ার প্রসঙ্গে, তা হেসে কুটোকুটি হবে সে। কারণ, মৌলবী সাহেবের পুরাতনী প্রজ্ঞা মোতাবেক বিদিত— চাঁদে গিয়েছিল মাকড়শা আর মহম্মদ আকবর। আর রহমতের সাবেকি জ্ঞানে— সে-ধারণা অটুট এবং চিরস্থায়ী। দু-টি ক্ষেত্রে পুরাতনী প্রজ্ঞা ও সাবেকি বা চিরাচরিত জ্ঞান আপ্তবাক্য তুল্য হয়ে গেছে এবং তা অনুশীলিত হয়েছে— পরম্পরাগত বিশ্বাস—বশবর্তী হয়ে। কোনো ক্ষেত্রেই সত্যতার যাচাই, কার্য-কারণের শৃঙ্খলাগত সূত্রে পরীক্ষিত হয়নি এবং তাদের ধারণায় বৌদ্ধিক স্তরে বিষয়টি প্রজ্ঞা বলে বিবেচিত হয়েছে আর সে-প্রজ্ঞা যেহেতু প্রাচীন ও সনাতন বলে মান্যতা পেয়েছে— তাই যুক্তি শৃঙ্খলা খুঁজতে যাওয়া তাদের কাছে অবান্তর বলে মনে হয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে এদের কাছে যুক্তি শৃঙ্খলাক্রমটি সর্বতোভাবে বীজগণিতীয় আংকিক পদ্ধতির সমস্যা সমাধানের জন্য ধার নেওয়ার মতো কিছু একটা, যেমন x = y কিন্তু x = y কখনো হতে পারে না। x ও y দু-টি ভিন্ন বস্তু বা অবস্থা বা পরিচায়কবাহী সত্তা, সুতরাং x ও y স্বতন্ত্র। কোন মতেই অভিন্ন নয়। একে-অপরের পরিপূরক বা সম্পূরকও নয়, তবুও একটিকে অপরটির কোনো এক অর্থে সর্বতোসমান ধরে সত্যের সমীপবর্তী হওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু সত্য নামক বিষয়টি যে চূড়ান্ত কোন বিষয় বা সিদ্ধান্ত নয়— তা আমার দাদুর বা রহমত মিঞার বোধে ধরা পড়ে না। এ-জন্য নচিকেতা যখন যমকে প্রকৃত সত্য কাকে বলে এমনতর প্রশ্ন করে বসে, তখন যম বাবাজীবনের তো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি-র মতো অবস্থা; কেন-না সত্যের সেবক-পালক ও ধারক ধর্মরাজ যম ভালোভাবেই জানতেন— ‘সত্য’ নামক বিষয়টা বড়োই গোলমেলে— তা সরল ও একরৈখিক নয় বরং বহুমাত্রিক জটিল ও কূট; তাই আমতা আমতা করে জোড়াতালি গোছের কিছু একটা বলে, ভুজুং ভাজুং করে নচিকেতাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কেন-না তিনি তো জানেন— তিনি এমন বলতে পারছেন না যে, সত্য মানে যাহা প্রকাশমান, তাহলে সত্যের অপলাপ করা হবে, যেহেতু অপ্রকাশমান সত্য বলেও তো একটা ব্যাপার আছে— যাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার বা বর্জন করতে হয়; আবার এমনও বলতে পারছেন না যাহা সত্য তাহাই সত্য, তাহলে এক্ষেত্রে কার্যকারণের যুক্তি শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করতে হয়। তাই পুরাতনী প্রজ্ঞা আর সাবেকি জ্ঞানের অভ্রান্ততা বিষয়ে আলোচনাক্রমটি সত্যতার যথার্থতা চেয়ে বসে।

পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ ও বিশ্লেষণে বিজ্ঞানী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সত্যের বন্ধনটি যদি সোজা না হয়— তাহলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যে কতখানি ভ্রমাত্মক হতে পারে তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জার্মান বিজ্ঞানী কখ্‌-এর জীবাণুর জন্ম সংক্রান্ত পরীক্ষাটি, কখ্ একটুকরো খড় ফ্লাস্ক বন্দি করে দেখিয়েছিলেন বাইরের কোনোরূপ সংস্পর্শ ছাড়াই ফ্লাস্কের ভিতরে জীবাণুরা কীভাবে আপনা-আপনি জন্মাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু কখ্-এর পরীক্ষণে কার্যকারণ সূত্রের সত্যটি যথাযথভাবে অনুশীলিত না হওয়ায়— বিষয়টি যে অভ্রান্ত নয়— তা অচিরেই প্রমাণ করেছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর। কখ্-এর সিদ্ধান্তরূপ প্রজ্ঞাটি ততদিন অভ্রান্তরূপে বিবেচনা পেয়েছিল, যতদিন পর্যন্ত না পাস্তুর কখ্-এর ঐ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে দেখিয়েছিলেন— ফ্লাস্কের ভিতরে ঢোকানো খড়ের কুটোটি জীবাণু মুক্ত ছিল না। ফলে ট্রাডিশনাল নলেজ এবং পুরাতনী প্রজ্ঞার বিষয়টি যে সর্বাত্মক নির্বিরোধ— নিঃসংশয়— সন্দেহহীন— অভ্রান্ত এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং এ-দুয়ের মধ্যে যুক্তি প্রতিযুক্তির শৃঙ্খলাক্রমটি যত বেশি বেশি করে সংঘটিত হতে থাকবে— তত বেশি করে সত্যের সমীপবর্তী হওয়া সম্ভবপর হবে। আর তা যদি বেদবাক্য তুল্য আপ্তবাক্যরূপে প্রতীতি লাভ করে, তাহলে বিষয়টি আপাত বিরোধশূন্য বলে পরিগণিত হলেও তা সত্য থেকে (কেন্দ্রাভিগ) সেনট্রিফুগাল হয়ে পড়ে এবং যুগ যুগ ধরে এমন ভ্রমময় প্রজ্ঞাকে সত্য রূপে গ্রহণ করে বসে আর ট্র্যাডিশেনাল থটপ্রসেস তা লালিত হতে হতে ধ্রুবরূপে বিশ্বাস লাভ করে অনুশীলিত হতে থাকে। এ-কথা তো ঠিক যে কোপারনিকাস ও গ্যালিলিও, পূর্ব পৃথিবীতে যারা জন্মেছেন এবং পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন— তারা এটাই জেনে গেছেন সূর্য নামক জ্যোতিষ্কটি পৃথিবী নামক গ্রহের চারপাশ জুড়ে ঘুরে চলেছে। আদপে ‘সত্য’ শব্দটি সম্পর্কে জনমানসে আজন্মলালিত ভ্রান্ত বদ্ধমূল ধারণাটি— সত্য সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞানলাভে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে— ফলে wisdom এবং knowledge এ-দু-টি বিষয় একধরনের চরম ও চূড়ান্ত বা পরম মান্যতা লাভ করে বসে। প্রকৃতপক্ষে বস্তুগত জগৎ থেকে আদিম মানুষ কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে আকস্মিক ঘটনাকাণ্ডে জ্ঞান অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল, তারপর সেই অধীত জ্ঞানকে অনুশীলন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানী প্রজ্ঞায় পরিণত করে— সেই বিশেষ জ্ঞানকে সাধারণ জ্ঞানে পর্যবসিত করেছে। এই বিশেষকে সবিশেষ বা নির্বিশেষ করে তোলাই ছিল primitive society-র সভ্যতার সাথে অগ্রসর হওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্যে কিন্তু তা সচেতনকৃতভাবে সংঘটিত হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। বরং কিছুটা জ্ঞানে, কিছুটা ব্যবহারিক প্রয়োজনে এবং কিছুটা অজানিতভাবে সাধিত হয়ে থাকলেও— সে-প্রয়াস নিশ্চয় বা অনড় ছিল না— তা মন্থর হলেও গতিশীল ছিল। গতিশীলতার এই প্রেক্ষিতটি গড্ডালিকা প্রবাহ অনুসরণকারী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত জনমানসে অনুভূত হয়নি। হয়নি বলেই আজও অধিকাংশ জনমানসে বিজ্ঞান ও সত্য সমার্থকবাচক অভিধার প্রতীতি জন্ম দেয়। আমরা কলকাতার দেওয়ালে বড়ো বড়ো হরফে লিখিত লেখন দেখেছি— মার্কসবাদ সত্য— কারণ, ইহা বিজ্ঞান। যাঁরা এটা লেখেন তাঁরাও ‘সত্য’ সম্পর্কিত বিষয়টির অর্ধসত্যকেই প্রতিষ্ঠা করে। কেন-না সামাজিক সত্য কখনোই পদার্থবিদ্যা বা রসায়ণ বিদ্যার সত্যের ধ্রুবকের মতো সমপদবাচ্য হতে পারে না। তাছাড়া সত্য চির-অব্যাভিচারী বিষয়ও নয়। নিয়ত ব্যাভিচারী বলেই তার স্থিরাঙ্ক নির্ণীত হতে পারে না। আসলে সত্য সম্পর্কিত এই যে স্থাণু ধারণা— তার এইরূপ প্রেক্ষিতটি তৈরি হয়— অন্ধভাবে— হওয়ায় এবং সত্যকে একটি চরম ধ্রুবকরূপে গণ্য করার মধ্য দিয়েই। ফলে অনেক সময় আপাত সত্যকেই চূড়ান্ত সত্য বলে বিবেচনা করে বসে। এর ফলে দৃষ্টিগোচর জগতেও যেমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে— তেমনি আপাত দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়— এমন ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। দৃশ্যগ্রাহ্যতার ক্ষেত্রে ভ্রান্তি নিরসনের বিষয়টি আপাত দৃশ্যগ্রাহ্য নয়— এমন ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিভ্রান্তির স্থায়িত্ব যত দীর্ঘতাপ্রাপ্ত হবে তার ফলও যে তত মারাত্মক বা বিষময় হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে। শরবতওয়ালা তার কাচের জলভরা গ্লাসে ক্ষুদ্র আকারে শরবতী লেবুটিকে রেখে প্রকৃত আয়তন সম্পর্কে গ্রাহকের মনে যেরূপ ভ্রান্তির সৃষ্টি করে সে-ভ্রান্তি আপতিক; কেন-না লেবুর প্রকৃত অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত সংগোপন থাকছে যতক্ষণ পর্যন্ত লেবুটি জলভরা পাত্রের মধ্যে নিমজ্জমান। জল থেকে লেবুটি তুলে ফেললেই ভ্রান্তির নিরসন ঘটে। এক্ষেত্রে আপাত দৃশ্যমানজনিত যে-বিভ্রম তা সুদূরপ্রসারী নয়। কিন্তু আজও আমাদের সমাজ জীবনে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলির জন্ম পুরাতনী প্রজ্ঞার যথার্থ স্বরূপ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না থাকার ফলে সামাজিক জীবনে যে-বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে— তার বিষফল আমরা এখনও ভোগ করে চলেছি। সেইরকম একটি সামাজিক প্রেক্ষিত এই আলোচনার প্রতিপাদ্য।

বৈদিক সমাজে শ্রেণিবিন্যাসের বর্গ বিভাজন নির্ণয় হয়েছিল শ্রম-চরিত্র অনুসারে। কালক্রমে সেই শ্রেণি বর্গবিন্যাস জাতিসত্তায় সমার্থবাচক হয়ে উঠল। প্রজ্ঞা বলে সেদিনকার সেই বর্গীকরণ হয়েছিল সেবা ও কায়িক শ্রমের নিরিখে-জন্ম সূত্রে নয়। অর্থাৎ, ব্রহ্মবিদ্যা জানা ও বোঝা ও অধী করার বোধ সম্পন্ন মস্তিষ্কই ব্রাহ্মণ পদবাচ্য বলে গণ্য হবেন। আর এই মান্যতা সমাজই তাকে দিয়েছিল— ঈশ্বর নয়। তিনি ঈশ্বর-বিকল্প প্রতিভূরূপে গণ্য হচ্ছেন একটি সামাজিক তথা রাষ্ট্রের সুরক্ষার প্রয়োজনে, ক্ষত্রিয়বর্গের— চাষবাসের তথা খাদ্য উৎপাদনের শ্রমজীবি হিসেবে বৈশ্য বর্গের যেমন প্রয়োজন হয়েছিল— তেমনই দরকার ছিল সমাজের এই তিন বর্গের জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় অন্যান্য কায়িক শ্রমনির্ভর কাজকর্মের জন্য— শূদ্র বর্গের। মনে রাখতে হবে দ্রব্য বিনিময় প্রথার মধ্য দিয়ে সমাজ তথা রাষ্ট্র তখন প্রসারমান তাই তখনও পর্যন্ত বণিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটেনি, তাই জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণত্ব— ক্ষত্রিয়ত্ব— বৈশ্যত্ব বা শূদ্রত্ব অর্জন ঘটবে— শ্রেণি বর্গ বিভাজনের সময় এমনতর কোনো ঘোষণাই ছিল না। তাই ব্রাহ্মণের সন্তান ব্রাহ্মণই হবে— এমনতর বিধান বেদেও উল্লেখ নেই। কায়েমী চক্রের নিজ নিজ শ্রেণি-স্বার্থের তাগিদে মেধার বিষয়টি উপেক্ষা করে স্থিতাবস্থা বজায় রেখেছিলেন। ফলে যে-মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে চতুঃবর্গের সৃষ্টি হয়েছিল— তা পর্যবসিত হল জাতপাতের সংকীর্ণ জাতিবাচক শ্রেণিগোত্রে। সে-কারণে ব্রহ্মবিদ্যার লেশটুকু না থাকা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণের সন্তান— ব্রাহ্মণের পদবাচ্য হয়ে উঠল— ঠিক তেমনিভাবে ক্ষত্রিয়— বৈশ্য— শূদ্রদের বেলাতেও সেই বাস্তব সমানভাবে সত্য হয়ে উঠল। যুগ যুগ ধরে একটি প্রজ্ঞা (wisdom)-এর বিকৃত ব্যবহারে পরম্পরাগত (Traditional) জ্ঞানে (Knonwledge) প্রকৃত বাস্তবটি আড়ালে থেকে গেল। আমরা পেলাম জাতপাতের বিন্যাসে এক অভিশপ্ত সমাজ। যেখানে জন্মসূত্রে একধরনের মানসিক পঙ্গুত্বের শিকার হল শূদ্র বর্গের নবজাতকেরা। বিশেষ করে— সেবাদাস উপশ্রেণির শূদ্রেরা। আজও তার রকমফের ঘটেনি। রামমোহন রায় পুরোহিতদের বেদকেন্দ্রিক ভণ্ডামির মুখোশটিকে ছিঁড়ে ফেলতে চেয়ে সংস্কৃত না জানা আমজনতার জন্য বেদান্ত সমূহের বাংলাতে অনুবাদ করেছিলেন— সেই ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় অলস বাঙালিকুল সেদিকে মুখ তুলে তাকায়ওনি, ফলে ব্রাত্যজনদের হাহাকার বেড়েছে বৈ কমেনি। গান্ধীজি যতই তাদের হরিজন বলে আখ্যায় বিভূষিত করুক না কেন— সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘মেথর’ নামক কবিতাতে তাদের যতই শুচিশুভ্র বলে গৌরবান্বিত করুক না কেন— বর্গীকরণে বিষবৃক্ষের শিকড় এত গভীরে নিমজ্জিত যে, কেবল ব্রাত্যজনের পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে শ্রেণিকক্ষের বাইরের দালানে বসে পড়াশোনা করতে হয়েছে ভারতের সংবিধানের জনককে।

আসলে মূল সমস্যাটিকে বৌদ্ধিক স্তরে বিবেচনা করে তার সঠিক নিরসনের নির্দ্ধারণ না করে বাইরের দিক থেকে গৌরবের প্রলেপ দেওয়ার ব্যাপারটি মারাত্মক রকমের হাস্যকর ও ক্ষতিকারক। হাস্যকর সে-কারণে গান্ধীজির ‘হরিজন’-রা ফিরে গেছে দলিত ঘরে। আর ক্ষতি? আজও আমাদের শিশুপাঠ্যে ‘সমাজবন্ধু’ শীর্ষক একটা চ্যাপ্টার আছে— যেখানে ‘কুমোর-কামার-মুচি-মেথর-ছুতোর-ঝাড়ুদার-ডোম ইত্যাদি’ শ্রেণির কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা আছে এবং শিশুমনকে এও জানানো হচ্ছে যে, আপাত নিকৃষ্ট এইসব কাজগুলি ওইসব শ্রেণির লোকেরা করে বলেই তারা মহান। মহানত্ব প্রকাশের নমুনা এর চাইতে আর কি ভালো হতে পারে। অথচ ধরুন, কোনো একটি সরকারি স্কুলে লটারিতে এক ব্রাহ্মণের ছেলে এবং কোনো এক সাফাইকর্মীর ছেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও শ্রেণিকক্ষে যে-প্রতিস্পর্ধী সাহস নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তর ব্রাহ্মণ ছেলেটি যেভাবে মাথা তুলে দিতে পারে— ব্রাত্যজনের পরিবারের সন্তানটি ঠিক সেইভাবে মাথা তুলতে পারে না। পারে না অনেক সময় শিক্ষকদের কারণেও। কেন-না বহুকাল আগেই সমাজ তার মাথা নত করে দিয়েছে। এই নত করার পেছনে এক সচেষ্ট ভ্রান্তি আছে। যে-ভ্রান্তির জন্ম হয়েছিল wisdom-এর হাত ধরে। যে-wisdom আজ পোক্ত ও পুরাতন আর Traditional Knowledge তার ধারক ও বাহক। তাই wisdom মাত্রই চূড়ান্ত অভ্রান্ত এমনটা নাও হতে পারে— আবার সেই wisdom, traditional knowledge দ্বারা যুগ যুগ ধরে অনুশীলিত হলেও তা অভ্রান্ত না-ও হতে পারে। শবকে কাঁধে বহন করা হয় সৎকারের উদ্দেশ্যে, কিন্তু বহু যুগ ধরে আমরা জাতপাতের যে-শবকে কাঁধে বয়ে নিয়ে চলেছি তার সৎকার কবে হবে কে জানে। আর তাই তো আমার দাদু কিংবা রহমত মিঞার traditional knowledge-টি বেশ পাকাপোক্তভাবেই বেঁচে বর্তে থাকে— যুগ যুগ ধরে।