Categories
2021-May-Essay প্রবন্ধ

সোমা মুখোপাধ্যায়

বাংলার পুতুল ও লোকপ্রযুক্তি

বাংলার পুতুল নিয়ে অনেকেই গবেষণালব্ধ সুন্দর কাজ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন তারাপদ সাঁতরা, আশিস বশু থেকে সাম্প্রতিক সময়ের বিধান বিশ্বাসের মতো নামিদামি মানুষেরা। পুতুল নিয়ে বই লিখতে গিয়ে আর শিল্পীদের জীবনচর্চা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লক্ষ করেছি এই পুতুলের মধ্যেই রয়েছে বাংলার লোক প্রযুক্তির এক মূল্যবান দলিল যা অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতোই এক যুগ থেকে অন্য যুগে প্রবাহিত হয়েছে।

আগুনের ব্যবহার থেকেই মানুষের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শুরু হয়। একসময় অরণ্যচারী যাযাবর মানুষ কৃষি আবিষ্কার করে স্থায়ী বসতি বিস্তার করে। বাংলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। পাণ্ডুরাজার ঢিপি থেকে আবিষ্কৃত খৃপূ আনুমানিক ১২০০ অব্দের মাটির টেপা পুতুল আর একসার জালবন্দি মাছ ও মুখে সাপ ধরা ময়ূরের চিত্রায়িত মাটির তৈজসপত্রের ভাঙা টুকরো থেকেই প্রমাণ হয় যে, সেই সময় এই অঞ্চলে মনুষ্য বসতি গড়ে উঠেছিল।

চাষের সঙ্গে বাসের যে একটা সম্পর্ক তা সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, মানুষ যাযাবর জীবন থেকে চাষের বা কৃষিকাজের মাধ্যমেই স্থায়ী জীবনে থিতু হয়ে বসে। নিপুণ হাতে গড়ে তার গৃহস্থালী আর সেই গৃহস্থালির নানা কিছু বা চারপাশটাকে সুন্দর করে তোলে তার নান্দনিক ভাবনার দ্বারা। নব্য প্রস্তর যুগ থেকেই মানুষের মনে কৃষি কাজের সঙ্গে সঙ্গে এই নান্দনিক ভাবনার আগমন হয়েছিল এ-কথা জানা যায় ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট গবেষকদের রচনায়। মানুষ তার জীবনের তাগিদে নানা প্রযুক্তিকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল। ঠিক যেমন অরণ্যচারী মানুষ শিকারের তাগিদে পাথরের হাতিয়ার বানিয়েছিল আর কৃষিকার্যের ফলে মানুষ তার কৃষিকাজের নানা সরঞ্জামের সঙ্গে সঙ্গে ঘর-গৃহস্থলির নানারকম সরঞ্জাম তৈরির জন্য নানা প্রযুক্তির আবিষ্কার করেছিল। তেমনি তার নান্দনিক ভাবনার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি অদ্ভুতভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

কৃষিজীবী মানুষ তার ঘর গৃহস্থালীকে সাজাতে প্রথমে এই নান্দনিক ভাবনার রূপায়ণ করেছিল ছবি আঁকার মধ্যে দিয়ে। এরই সঙ্গে সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়েছিল ধর্মাচরণ যেখানে বিভিন্ন ব্রত কথাতে আলপনা তার মনোভাবকে ফুটিয়ে তুলেছিল। প্রকৃতির চারপাশের বিভিন্ন উপাদান ছিল তার এই ভাবনার মূল বিষয়। এর পর এসেছিল নিজের অবয়বকে ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা। মানুষ তার নিজের অবয়বকে ফুটিয়েছে ব্রত আলপনার বিভিন্ন রেখার মাধ্যমে। দশ‌ পুতুল ব্রতের আলপনায় বা সেঁজুতি ব্রতের আলপনায় কয়েকটি রেখার মাধ্যমে মনুষ্য শরীরের একটা অবয়ব আমরা দেখি। এর থেকেই ধীরে ধীরে তা মাটির পুতুলের মাধ্যমে একটা মূর্তির রূপ নিতে পেরেছিল।

একখণ্ড নরম মাটির তাল থেকে হাতের সাহায্যে টিপে টিপে প্রথমে মাতৃকা মূর্তি রচনা করেছিল মানুষ। এই মাতৃকামূর্তিগুলোর শুধু বাংলায় নয় সারা পৃথিবীতেই বহু বছর ধরেই খোঁজ পাওয়া যায়। লক্ষ করলে দেখা যায় প্রথমে এগুলোর কোনো চোখ নাক মুখ ছিল না। প্রকটিত স্ত্রীঅঙ্গ, অর্ধ সমাপ্ত দু-টি হাতের অংশ আর নীচের অংশটা বসানোর জন্য একটু ঘাগড়ার মতন করা। এরপর কাঠি দিয়ে তাতে অলংকরণ করা হয়েছিল। পেছনে থাকত একটা খোঁপার মতো বস্তু আরও পরে দু-টি ছোট্ট মাটির অংশ দিয়ে তৈরি হয়েছিল চোখ। হাতের ওপর জুড়ে দেওয়া হয়েছিল বা কোলে দেওয়া হত ছোটো ছোটো একইরকম প্রতিকৃতি যা তার শিশু বলে মনে করা হত। সারা বাংলার নানা জায়গাতেই এই মাটির টেপা পুতুল তৈরি হতে দেখা যায়।

কিন্তু কাঁচা মাটি তো বেশি দিন স্থায়ী হয় না। তাই মানুষই আবিষ্কার করেছিল তাকে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করতে। প্রথমে এখনকার কুমোরদের যে-ভাটি বা পোন‌ বলি তা ছিল না। একটা ছোটো জায়গায় বিভিন্ন জ্বালানির মধ্যে দিয়ে এই পুতুলগুলো পোড়ানো হত। এখনও পশ্চিম মেদিনীপুরে পটুয়ারা ছোটো মালশায় বিভিন্ন জ্বালানি খরকুটো ও তুষের আগুনে এই পুতুলগুলো পোড়ান। এছাড়াও প্রত্যন্ত গ্ৰামাঞ্চলে অনেক গৃহস্থবাড়িতে নাতি-নাতনিদের জন্য মা ঠাকুরমারা রান্না শেষে পরন্ত উনুনের আঁচে এই মাটির পুতুল পুড়িয়ে থাকেন। মানুষ নিজেই নিজের নান্দনিক ভাবনাকে যথাযথ রূপ দেয়ার জন্য নিজের মতো করে তার প্রযুক্তিগত কৌশল আবিষ্কার করেছিল এ-কথা বলা যেতে পারে।

টেপা পুতুলগুলো হাতে করে করতে অনেক সময় লাগত। তাই একটা সময় পর দেখা যায় যে, কীভাবে একইসঙ্গে অনেকগুলো পুতুল তৈরি করা যেতে পারে। সেই ভাবনার প্রতিফলনে তৈরি হয়েছিল মাটির ছাঁচ। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে এমন ছাঁচের সন্ধান মিলেছে। প্রথমে একখোল পরে দু-খোল ছাঁচে এই পুতুল তৈরি এখনও পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন কুমোরপাড়ায় বা কুমোরপরিবারের বাড়িগুলোতে গেলে।

সংখ্যায় যখন অধিক এই পুতুলগুলো তৈরি হতে থাকে তখন কুমোররা আর ছোটোখাটো জায়গায় তাদের পোড়ানোর জন্য রেখে দিত না। মাটির অন্যান্য সরঞ্জাম পোড়ানোর জন্য যে-ভাটি ব্যবহার করা হয় সেখানে এই পুতুলগুলোকে পোড়ানোর প্রচলন হতে থাকে। এতে একসঙ্গে অনেক পুতুল অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা যায়। পূর্ব মেদিনীপুরের পটুয়াদের মধ্যে এইরকম ছাঁচের পুতুল দেখা যায়। আবার হাওড়ার নরেন্দ্রপুর এর রানী পুতুল বা বিভিন্ন দেবদেবীর যে-পুতুল সেগুলো এই একখোল ছাঁচে তৈরি হয়। অনেক পুতুলে চাকের ব্যবহার দেখা যায়। যেমন এখনও উত্তর দিনাজপুরের কুনুরে রাজবংশী মেয়েরা যে-ষষ্ঠী পুতুল করেন তার নীচের অংশটা তৈরি হয় তাকে বাকিটা হাত দিয়ে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক প্রযুক্তির ছাপ পড়ে এই পুতুল নির্মাণে একইসঙ্গে হাত, চাক আর ছাঁচের ব্যবহারে সুন্দর নান্দনিক পুতুল তৈরি দেখা যায় পশ্চিম মেদিনীপুরের মির্জা বাজারে দেওয়ালি পুতুলের ক্ষেত্রে। পুতুলের মুখ আর দেহের নীচের অংশটা তৈরি হয় চাকে, মুখটা ছাঁচে আর বাকি অংশটা এবং চক্রাকারে লাগানো প্রদীপ সবটাই তৈরি হয় হাতে। মুর্শিদাবাদের কাঁঠালিয়ার পুতুল এই একই পদ্ধতিতে তৈরি হয়।

এবার আসা যাক পুতুলের রঙের প্রসঙ্গে। মানুষ দীর্ঘদিন কিন্তু বিবর্ণ পুতুল তার খেলার সামগ্রী হোক বা পুজোর উপকরণ তা দেখতে পছন্দ করেনি। সেই কারণেই ভেষজে রঙে রাঙিয়ে নিতে শুরু করে এই মাটির পুতুল। আতপ চালের গুঁড়ো দিয়ে সাদা রং, শিম পাতা থেকে সবুজ, হাঁড়ির ভুসো থেকে কালো তেলাকুচ ফল থেকে লাল, হলুদ বেটে হলদে এমন সমস্ত রং দিয়ে পুতুলকে রাঙাতে থাকেন শিল্পী। তবে এরও একটা পদ্ধতি আছে। খড়িমাটির সঙ্গে তেতুল বিচির আঠা মিশিয়ে তার একটা প্রলেপ দেওয়া হয় প্রথমে। তারপর তাতে এই রংগুলো ধরানো হয়। বর্তমানে অবশ্য অনেকেই বাজারি রং ব্যবহার করে থাকেন, কারণ, ভেষজ রং দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

তবে একেবারে প্রাথমিক দিকে এই পুতুলের রংটা কেমন ছিল তা বোঝা যায় কাঠালিয়ার পুতুলের ক্ষেত্রে। এখানে মূলত তিনটি প্রাথমিক রং লাল সাদা কালো এই দিয়েই পুতুলকে রাঙিয়ে নেন শিল্পী দুধের সঙ্গে মাটি মিশিয়ে তাকে মোলায়েম করা হয় আর সাদা রঙের সঙ্গে অভ্র দিয়ে তার একটা চকচকে ভাব আনা হয়। ডোরাকাটা অলংকরণ যা পৃথিবীর সর্বত্রই একেবারে প্রাথমিক অলংকরণ হিসেবে আমরা জানি তা এই কাঁঠালিয়ার পুতুলেও দেখা যায়। একসময় বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের একেবারে পারদ এর খনিজ হিঙ্গুল নামের এক লাল পদার্থ মেশা মাটি দিয়ে পুতুল তৈরি হত সেই পুতুল পুতুল যদিও এখন তাতে নানা রঙের ব্যবহার হতে দেখা যায়।

এর পাশাপাশি শুধু মাটির রংকে মজবুত করে তাকে পুরোপুরি পুতুল তৈরি চল রয়েছে বাঁকুড়া জেলার পাঁচমুড়া-সহ বিবরদা উলিয়ারা আর নানা জায়গায়। এইখানে এক বিশেষ বনক রং তৈরি করেন শিল্পী। জঙ্গল থেকে আনা বিশেষ মাটি থেকে এক পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে এই হলুদ রং তৈরি হয়। পুতুলের অবয়ব কাঁচা মাটিতে তৈরি করে তার ওপরে এই বনক লাগিয়ে রোদে শুকিয়ে ভাটিতে পোড়ালে এক অদ্ভুত চকচকে রং ধারণ করে পুতুলগুলো। শিল্পী নিজেই এক আবিষ্কারে এই ভাটির ধোঁয়া বেরোনোর জায়গাটি বন্ধ করে দিয়ে তৈরি করেন কালো রঙের মাটির পুতুল। পাঁচমুড়ার ঘোড়া ষষ্ঠী পুতুল-সহ বর্তমানে আরও নানারকম পুতুল বিশ্বের বাজারেও বাংলার মুখ উজ্জ্বল করে চলেছে। যদিও আশপাশের পূর্বোল্লিখিত কেন্দ্রগুলোতেও ওই একইরকমভাবে এইসব পুতুল তৈরি হয়। পাঁচমুড়ায় বিশাল বিশাল ভাটিতে যৌথভাবে কুমোররা তাদের সমস্ত মাটির পুতুলগুলো একসঙ্গে পুড়িয়ে থাকেন। অর্থাৎ এটি যে একসময় গ্রামীণ কৌম জীবনের যৌথ প্রযুক্তি ছিল তা বলতে আর দ্বিধা বোধ হয় না।

ডোকরা

মাটির পুতুলের পাশাপাশি শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য ধীরে ধীরে আরও অনেক মাধ্যমে পুতুল তৈরি হয় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তালপাতার সেপাই। তালপাতা কেটে তাকে মানুষের আকৃতি বা পশুপাখির আকৃতি দিয়ে সুতা দিয়ে সেলাই করে একটা বাঁশের কঞ্চিতে এমনভাবে আটকে দেয়া হয় যাতে কঞ্চিটি নাড়ালেই সেই পুতুলটির হাত পা ছুঁড়তে থাকে। এছাড়া মাটির মূল অবয়বের ওপর ধাতুর ঢালাই করে তৈরি হয় ডোকরা শিল্প। যদিও তার খুবই জটিল মাধ্যম তবুও একেবারে খাঁটি লোকায়ত প্রযুক্তিতে তা তৈরি হয়। পুরোনো কাপড় দিয়ে তার ভেতরে পুরে সুঁচ সুতো দিয়ে সেলাই করে মা দিদি মায়েরা অবসরে বানাতেন কাপড়ের পুতুল। তোমার নেট তাকেই আধুনিকভাবে রূপ দান করা হয়। তেমনি পূর্ব মেদিনীপুরের দীঘা অঞ্চলে সমুদ্র ধার থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ঝিনুককে বাক্যটিকে আঠা দিয়ে জুরে তাতে সামান্য বাজারি রং লাগিয়ে সুন্দর পুতুল তৈরি করেন ওইসব অঞ্চলের শিল্পীরা।

মাটির পরেই নমনীয় মাধ্যম হল কাঠ। এই কাঠ দিয়েও কিন্তু বাংলার নানা অঞ্চলের শিল্পীরা সুন্দর পুতুল তৈরি করে থাকেন বর্ধমানের নতুনগ্রাম কাঠের গৌরনিতাই রাজা-রানি পুতুলের জন্য বিশ্ববিখ্যাত তেমনি হাওড়া তো একসময় থোরের রস পড়ে এইরকম পুতুল হত। পুরুলিয়া বাঁকুড়া প্রতি জেলাতে আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন উৎসবে এই কাঠের পুতুলের সন্ধান মেলে। খুব সামান্য যন্ত্রের মাধ্যমে এই পুতুলগুলো তৈরি করেন শিল্পীরা আর একসময় ভেশজ রং ব্যবহার হত তাকে রাঙানোর জন্য পরে এসেছে বাজারি রং।

পুতুল নির্মাণশৈলীর প্রযুক্তি যদি লক্ষ করা যায় তাহলে সেখানে যুগের ক্রমবিবর্তন আমরা লক্ষ করতে পারি কীভাবে মানুষ নিজের জীবনযাপনের মান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে তা তার ব্যবহারিক জীবনেও কাজে লাগিয়েছে তা এই পুতুলগুলো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। বিষয়ে বৃষ্টিতেও গবেষণায় ভবিষ্যতে আরও অনেক তথ্যই সামনে নিয়ে আসতে পারবে।

তথ্যসূত্র:
১। তারাপদ সাঁতরা, পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ, লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র কলকাতা ২০০২।
২। সোমা মুখোপাধ্যায়, বাংলার পুতুল, প্রতিক্ষণ, কলকাতা, ২০১৮।

Categories
2021-May-Poem কবিতা

উমা মণ্ডল

সৃষ্টিরহস্য

উদাসীন দুপুরের গাছে বসে থাকা কোকিলের চোখে জল পড়ে। হয়তো শীত; ধূসরের শব্দগুচ্ছ পড়ে নিয়েছে সে। এখন কাঙাল হাতে দেনা, পাওনা। আরও নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। লাল ধুলা ভেসে যায় দেহ জুড়ে… নদী একটু থাক। এই প্রয়াগের জল মূর্তিমান যমদূত; স্মৃতিচিহ্ন বলে কিছু রেখে দেয় না… বকুল ফুল

ভ্রমরের আদিনৃত্য দেখেছ? যেভাবে জেগে ওঠে শক্তি শবের মধ্যমা থেকে। দারুণ আগুনে ধোঁয়া ওঠে আকাশের দিকে। শেষ থেকে প্রারম্ভের ধারাপাত রিং হয়ে ছুটে যায় পৃথিবীর কোলে; মা ডাকে সন্তান… বুক থেকে খসে পড়ে সুধারস, তার যাপনের ইতিকথা; সেই শূন্য থেকে গড়া চিন্ময়ীর চোখ। জল আসে…

কেঁদো না কোকিল; এই উদাসীন চোখে তানালাপ একতারা নিয়ে বসে আছে একান্তের বোধে…

নিরাময়

পেয়েছি জন্মদিনের চিঠি…
পার হয়ে গেছে কয়েকটা সূর্যওঠা নাম আর ঘন রাত। আমার অসুখে ঢাকা রোদ জলজ গম্ভীর। আঙুলের ফাঁকে যতটুকু আশা, ততটুকু দিন দেখা যায় জানালার শেষে। সেই ঠোঁটে রাখা আহির ভৈরব দেখি পাখিদলে, আকাশের খুব কাছে। একতারা বুকে ভাসে
চিঠি এসে গেছে অবশেষে…
সাদা খামে ভরা এই পাতাগুলি একটি সিন্দুক। আধো বোল, খানিক রহস্য; গাছেদের ডালে ডালে ইচ্ছে বাঁধা সুতোর ঢিলেতে। তাপ দেওয়া অক্ষরের গা-গরম, ছুঁলে পুড়ে যায় চোখ। শিরা বেয়ে বেয়ে জলের আকুতি। বাড়ন্ত জীবন। হয়তো চণ্ডালিকার বংশধর। হাঁটি ডোমপাড়া দিয়ে; সন্ধানে, সন্ধানে।
অক্ষরের গর্ভ বেশ প্রাচীন; আবিষ্কারের দেশে এই অতীতের রেখা সমুদ্রের খুব কাছে। অতল দেখি শুধু অতল; স্রোতে স্রোতে ডাক দিয়ে যায় গাঙচিল। তোমার চিঠি এসে গেছে

হ্যাঁ, আমার চিঠি এসে গেছে। জন্মদিন শেষে অবশেষে; অসুখ সারাতে…

সীমারেখা

মেঝেতে গুটিয়ে থাকা বড়ো অসহায়
পাশ দিয়ে চলে যায় সময়ের চাকা
অথচ কেমন নির্বিকার
এতকাল পার হয়ে গেল, ভয় নেই
তবু এই গণ্ডি এই সীমা…
বেড়া বাঁধা উঠানের ধারে বকুল ফুলের গাছ
গন্ধে সেই নেশা যাযাবর ডাক;
পৃথিবীর তলপেটে যে-মাধ্যাকর্ষণ আছে
জানে গুটিকয় জাতি
ওদের পোশাকে শীত গন্ধ, বরফ আতর
এইসব অভিধানে নেই

ডুব দিলে উঠে আসে লুপ্তপ্রায় ডাকঘর
চিঠিতে প্রাচীন শব্দ হরপ্পার; এইসব
গল্পকথা, উত্তরের পথ
ধূমায়িত গরমের চা ‘ঠিক বুঝবে না’
তবু কথা যুধিষ্ঠির… পাক খেয়ে খেয়ে ঠিক
পায়ে ধরে; মেরুদণ্ড বেয়ে গলা

এরপর ডাক এলে উঠে যাব বাঁকে
রহস্যের কাঁচাঘরে
আলতামিরার গুহাপথ ছেড়ে হয়তো বা
নতুন পথের গন্ধ পাব…

খরা

কতদিন এ-পাড়ায় বৃষ্টি নেই। সেই কবে আকাশের ঘর কালো করে দু-একফোঁটার স্বাদ… চাতকের কান্না শুনে প্রাচীন বটের ঝুরি বলে অভিশপ্ত কাল। সেই থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া পাতা হলুদের কোপে ঝরে যায়। গোটা একটা গাছ পোকাদের হাতে চলে গেছে। ছায়ারা হারিয়ে গেছে। তার সাথে পাখিদের বৈঠকী আড্ডাও

ও-দিকে কাঙাল ধানখেত… জ্বলে গেছে হলুদের বেশ। কালো গুঁড়ো ঝুরঝুরে হাওয়া হাতে লেগে; পেটে জ্বালা ধরে। মাতৃদুগ্ধের আস্বাদ অধরা মাধুরী। হাঁড়ি পেতে বিষন্নতা। তার ব্যক্তিগত খাতা থেকে কেউ জল নামক শব্দটি তুলে নিয়ে গেছে। এ-দিক-ও-দিক মুড়ে নৌকা তৈরি করে না খেয়ালি মন। গতি নেই, নেই চলাচল। বড়ো বিষণ্ণতা মাগো। সামনে অন্নপূর্ণার বেদী শূন্য। নীচে ডুবে যাচ্ছে দিনকাল

সেইসব শব্দ

গভীরতা থেকে সৃষ্টি হওয়া শব্দ আসলে ডুবুরি
আতসকাচের চোখে কথা বলে আকারে ইঙ্গিত
দূরদূরান্তর থেকে আগত ইথার
একহাতে লুফে নেয়। তেজ শুধু তেজ
আলো থেকে উদ্ভাসিত পথে বিশ্রামের ছায়া
সকালে ভৈরব
রাতে ছায়ানট…

তীব্র এক আকর্ষের টানে ওঠে ঢেউ
মধুলোভে ছুটে আসে কামুক পৃথিবী
নেশা শুধু নেশা…
সীমান্তের কাঁটাতার ডাকে বেহালার ছড় টেনে
ক্ষত বাঁধা খাদ ভুলে যায় রক্তের প্রচ্ছদ
আসলে ডুবুরি ঐ শব্দ; এক একটি মায়ারোগ
আতসকাচের চোখে কথা বলে আকারে ইঙ্গিতে

খেয়ে নিতে পারে গোটা কৃষ্ণগহ্বরকে

Categories
2021-May-Poem কবিতা

রঘু জাগুলিয়া

তখন দুপুর। গাছের পাতা দিয়ে ঝরে পড়ছে এপ্রিলের রোদ। অবসন্ন পাতার কথা ভাবছি সারাক্ষণ। ভাবি জীবন কি কয়েক ফোঁটা জল। পিপাসার্ত পথিকের মতন অতিক্রান্ত বেলা। পাঁচিলের উপর দিয়ে মাঝে মাঝে একটা-দুটো কালো বিড়াল হেঁটে যায়। আর্দ্রতাহীন একটা বাতাস ধীরে-ধীরে কণ্ঠরোধ করে। আর বাবলাগাছের গুঁড়ি রাস্তা আগলে পড়ে থাকে এমনি
যেন মৃত্যুর পর আরও অবাধ্য হয়ে উঠছে কেউ

তখন দুপুর, চলে যাচ্ছে পরকালে…

গাছের কাছে ছায়া থাকে যেন পুরোনো বন্ধুর মতো। পুরোনো দিনগুলোর মতো। কত পথ চলে যায়, কত অজানা সিঁড়ি দিয়ে চলে যায় আলো। আমার মনের থেকে দ্রুতগামী সেই পাখি, আমি তাকে খুঁজি। সবুজ-হলুদ ধানখেতের উপর দিয়ে একটা হাওয়া চলে যায় নিঃসঙ্গ।

ভাবি, নিঃশ্বাসের কাছাকাছি আসে না কেন আজ, পুরোনো স্মৃতিগুলোর গন্ধ।

জানলার পাশে বসে রোদে ডুবে থাকা লাল বাড়িটাকে দেখি। গৃহবাসীনি পর্দায় হাওয়া লেগে মাঝে মাঝে গায়ের উপর এসে পড়ে— যেন কবেকার তাঁর হারানো স্নেহ, মমত্ব…

একটা, দুটো, জোনাকি ঢুকে পড়ে ঘরে…

অথচ আশ্চর্য সেই রাত, ফ্যানের শব্দে কখন যে ঘুম ভেঙে গেল— দেখলাম বাড়ি তো কোথাও নেই, একা একটা বেড়াল আঁচড় কাটছে অন্ধকারে। তারপর অন্ধকার আরও অন্ধকারের ভিতর কারা যেন করাত দিয়ে গাছগুলো কেটে ফেলছে, ঝরে যাচ্ছে ফুল—
অরণ্য কেঁপে উঠছে ভয়ে…

এক-এক সময় শীত করত, জ্বরে তখন ভীষণ গা পুড়ে যেত।

মৃত্যু হয়তো ঘুমের পাহাড়
যার সমস্ত পথই ধুলো—
ছাদের উপর মাংস ঠুকরে খাওয়া কাক যেন একটা আগুন নিয়ে খেলছে…

সূর্যাস্তবেলায় নদীর পাড়ে দেখি কীভাবে আগুন স্পর্শ করছে জল। শুনি ঢেউ-এর আর্তরব। মনে হয় একদিন আমাকেও জলের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলবে জল।

তবু কিছু সুর, কিছু নিজস্ব পথ আছে জেনেই— নক্ষত্রের শুয়ে থাকা দেখি।

পাগলটা অভিমানে শুয়ে থাকত ওখানে
ঝড়বৃষ্টি রাতেও দেখেছি কতবার
তার ছেঁড়া কাঁথাকাপড় থেকে ঠিকরে আসছে আলো
আর আমরা, পাগল বাইরে আছে জেনেও
দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম

তারপর একা আরও একটা বর্ষাকাল চলে গেল…

Categories
2021-May-Poem কবিতা

কৌশিক সেন

চারুলতা

গোবিন্দ মেসো যেদিন সন্ধ্যেয় দ্বিতীয় পক্ষ নিয়ে ঘরে তুলল,
সেদিন দুপুরে চারুমাসির বাড়ি গিয়েছিলাম। মা পাঠিয়েছিল,
একবাটি কুচো মাছের চচ্চড়ি দিয়ে।

চারুমাসি শুয়েছিল বিছানায়। আমায় দেখে মাসি বলেছিল,
আমার কপালে হাত রেখে দ্যাখ না বুধু, বড়ো গা ম্যাজ ম্যাজ করছে।
আমি দেখেছিলাম মাসির সারা শরীরে ডালপালা মেলছে
মস্ত একটা কলকে ফুলের গাছ। ঝুমঝুম করছে ফুলে…

চচ্চড়ির বাটিটা রেখে এসেছিলাম গাছের ছায়ায়। পেছনে ফিরে
দেখেছিলাম কুচো মাছগুলো লকলকে সাপ হয়ে গাছের শরীর বেয়ে
উপরে উঠছে…

উত্তরকাণ্ড

অমিত্রাক্ষর ছন্দে বাবা যখন একটা মহাকাব্য লেখা শেষ করেছে,
মা তখন সবেমাত্র ফোড়ন দিয়েছে ডালে।
বাবা ডাকে, শুনছ একবার এসো না গো, নতুন লেখা কাব্যখানা পড়ে শোনায়!

মা গ্যাস কমাতে ভুলে যায়, বাবা কাব্যখানা পড়ে চলে…

উত্তরকাণ্ড আসতেই পোড়া গন্ধ আসে রান্নাঘর থেকে। মা ছুটে যায়।
দেখে ডালের কড়াইয়ে টগবগ ছুটে চলেছে অশ্বমেধের ঘোড়া

মেয়েমানুষের গল্প

যেদিন জবাকুসুম তেলের শিশিটা হাত থেকে পরে
ভেঙে গিয়েছিল, ও-পাড়ার ডলিবউদি নিখোঁজ হয়ে
গিয়েছিল, বাড়ি থেকে, ভরদুপুরে। শিলনোড়ায়
সর্ষের সাথে কাঁচালঙ্কা বাটতে বাটতে যেদিন কাকের
ডাল শুনেছিল মান্তুর মা, সেদিন মাঝরাতে নিশিতে
ডেকে নিয়ে গিয়েছিল পাশের বাড়ির বিয়ের বয়স
পেড়িয়ে যাওয়া শ্যামলী পিসিকে।

তারপর যেদিন দোল পূর্ণিমার রাতে আমার মাথায়
অনেকদিনের গল্প জমে উঠল, জ্যোৎস্নায় জবাকুসুম
তেলের গন্ধ পেলাম আর চোখে লাগল লঙ্কা সর্ষের
ঝাঁঝ। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, সোনালি আলোয়
আমার কলমের দিকে নির্ভার হেঁটে আসছে
ডলিবউদি, শ্যামলী পিসিদের মতো জ্যোৎস্নাময়ী মেয়েমানুষেরা

চাঁপাফুলের কথা

পুরোনো প্রেমিকার বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে
আজও ঠাকুরঘরের পাশে মরা চাঁপাগাছে
ফুল ফোটে। লক্ষ্মী আসনে গন্ধ ছড়ায়।

প্রেমিকার ভাইপো ভাইঝিরা কুড়িয়ে নেয় ঝরা ফুল
বলাবলি করে, মালা গাঁথবে এবার। পিসিকে পড়াবে
পুজোর ছুটিতে বেড়াতে এলে।

আঁশ

বাবার জামাকাপড় থরে থরে সাজানো, মায়ের আলমারিতে
মায়ের শাড়ির পাশে।
আগে আলমারি খুললে বাবার গায়ের গন্ধ আসত,
এখন আসে না।

এবার মায়ের আলমারি খুলে দেখেছিলাম,
মা ঝোল-ভাত রেঁধে রেখেছে আলমারির লকারে
বাবার ছেড়ে যাওয়া লুঙ্গিতে মাছের ঝোলের আঁশটে গন্ধ!

জন্মকথা

আমায় যেদিন জন্ম দিয়েছিলে, মাগো
অমৃত পয়স্বিনী গাভীর মতো স্নেহ নামিয়ে এনেছিলে
নিরাভরণ আলপথে, কাশবনে, সাত সকালেই…

যেদিন জন্ম দিয়েছিলে আমায়,
কমণ্ডলু থেকে শান্তিজল ছিটিয়ে ছিলেন কুলগুরু
নিকানো তুলসীমঞ্চ জুড়ে সেদিন রৌদ্রের উৎসব…

রোদ নেয়ে হেসে উঠেছিল শালুক ফুলের মেয়ে
মাগো কবে আবার তেমন জন্ম দেবে আমায়!

Categories
2021-May-Poem কবিতা

রাজদীপ পুরী

অদৃষ্ট

হাওয়ায় পুড়ে গেল ঈশ্বরের ছায়া, এখন নীল রঙের রোদ হাতে নিয়ে
ঈশ্বর ঘুরে বেড়ান মাঠে ঘাটে, ধুলোর আলপনা জমে তাঁর গায়ে,
নব্য প্রেমিক প্রেমিকারা তাঁকে পাথর মনে করে নিজেদের নাম
যত্ন করে লিখে রাখে— ঈশ্বর সব দেখেন আর মুচকি হাসেন,
নতুন অলংকার পেয়ে, আহ্লাদে আটখানা হয়ে পুড়ে যান ঈশ্বর…

বধূবরণ

সেদিন চৌকাঠ ডিঙিয়ে রোদ্দুর এল, এল আলো বাতাস জল—
একটা আস্ত সমুদ্র এসে ভাসিয়ে দিল খাট, আলমারি, ঘরের সমস্ত আসবাব…
এখন খোলা জানলার পাশে ভ্যান গখের হলুদ গমখেত,
আর রাতের বেলায় ছাদ জুড়ে মুনলাইট সোনাটা!
তোমার অর্ধেক আকাশ ‘এই শুনছ…’ বলে আলতো টোকা দিল আমার অর্ধেককে…
দু-চারটে তারা খসে পড়ার পর— সেদিন তোমার সঙ্গে চৌকাঠ ডিঙিয়ে
গোটা পৃথিবী এল আমার ঘরে আর আস্ত একটা সূর্য এসে
আটকে রইল আমাদের বাড়ির আশমানে

একটি বিধিসম্মত সতর্কীকরণ

পিরীত দিও গো কন্যে, দিও মন, মেলে দিও ডানা এক আশমান—
বাতাসে উড়েছে রঞ্জক, কদমের বনে দ্যাখো একা বিষণ্ণ কানহাইয়া…
সুর নেই তাঁর, লয় কেটে গেছে, বাঁশিতে ফিসফাস, কিসব গুঞ্জন!

ডানা থেকে খসে পড়ে ময়ূরকন্ঠী আলো, সেই আলো গায়ে মেখে
আর পোড়াইও না শ্রীঅঙ্গ

কোজাগরী

বিপদের ছায়ার মতো স্নিগ্ধ আর উদাসীন আমাদের বেঁচে থাকা,
মৃত্যুর চেয়েও রূঢ় চোখে আমরা তাকিয়ে থাকি অমরত্বের দিকে,
বাঘনখ দিয়ে প্রতিপক্ষকে ফালা ফালা করে ফেলার ভেতর
যে অদম্য উল্লাস কাজ করে… খুচরো পয়সার মতো তা জমিয়ে রাখি
লক্ষ্মীর ভাঁড়ে, জীবনকে মোচ্ছব বানাতে দেওয়ালে দেওয়ালে
টাঙিয়ে রাখি কাঁচা মেয়ের ছবি…

রূপোর থালার মতো চাঁদ উঠেছে, লক্ষ্মী ঠাকরুনের লাল আলতা পা ছাপে
গাঢ় চুমু এঁকে দিয়ে ফেরার হয়ে যান এক কবি

দাম্পত্য

আমাদের সারারাত খুনসুটি আর তুমুল ঝগড়াঝাটির পর
এই যে সূর্য ওঠে আর রোদ এসে ঝিলমিল করে
আমাদের ছোট ঘরে… আমাদের ছোট ছোট সুখ, ছোট ছোট রাগ অভিমান—
এই যে আমরা ভাগাভাগি করে নিই, কি নিই না বল?
আমাদের চারহাত দুহাত হয়ে যাওয়ার পরও এই যে
আমরা প্রেমিক প্রেমিকা সাজি, আর তালি বাজাতে বাজাতে
পার হয়ে যাই দিন মাস বছর, আস্ত ট্রাম লাইন…

হট প্যান্ট আর স্ট্রবেরী কন্ডোমে টগবগ করে আমাদের
খেজুর রঙের দাম্পত্য!

Categories
2021-May-Poem কবিতা

বাপি গাইন

 

ভেঙে পড়বার মতো এক কাঠের চেয়ার কেবল, মানুষ নই
সারাদিন বারান্দায় জানালার সামনে বসে থাকি
যেন জন্মের আগে থেকে এই চোখের অপূর্ব এক খিদে
যেন মৃত্যুর পরেও এই চোখের কোনো বিরাম নেই

সুখী ও সফল মানুষের পৃথিবীতে
ঋতু পরিবর্তন হয় তবু
কেবল প্রার্থনায় বসার এই ভঙ্গিমার
কোনো পরিবর্তন হয় না

অশ্রু হারানোর পর, চোখ নয় জেগে থাকে পাথুরে দৃষ্টির চর

আমার ভেতরে যত মেঘ, আমি ততটাই শুষ্ক মাটি চাইছি ঝরে পড়ার, তোমার কাছে। যতটা আগুন আমাকে ঘিরেছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ততটা জলীয় ত্রান চেয়েছি, তোমাকে হত্যা করতে আসিনি। অথচ তুমি আমার শোবার ঘর তুলে নিয়ে গেছ, তোমার বরদির কাছে। যে-আঘাতে আঘাতে পাথর তাকে তুমি এনেছ আমার শোবার ঘরে। ফলে আমার অসহ্য রাতদিন, আমার কুয়াশায় কুঁকড়ে যাওয়া ভাষা তারও সহজপাঠ হবে না স্বাভাবিক। এ-সমস্তই হালকাভাবে নিতে হবে। আমার ভেতরে যত মেঘ, হালকাভাবে নিতে হবে আমাকেই। আমার ভেতরে যে-আগুন, শেষপর্যন্ত আমাকেই নিতে হবে তার ছাইয়ের অধিকার।

কতদিন লিখি না কিছুই
পর্ণমোচী বৃক্ষের মতো যেন সব কথা ঝরে গেছে, সব ব্যথা
জল থেকে উড়ে যাওয়া পাখি
জলে সামান্য ঢেউ এই মাটিতে আছড়ে পড়েছে।
হতভম্ব পাথরের মতো শুধু দেখে যাওয়া, এই চোখ
আর কোনো প্রশ্ন করে না।
এক্ষুনি অথবা একটু পরে মরে যাব
এই চেতনা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এখনও।

নিভৃত প্রশ্নের আলোয়
মৃত্যু নিয়ে অহেতুক কষ্ট পাচ্ছ তুমি
জীবন যেভাবে সম্ভব যায় নিজেকে অতিক্রম করে
প্রকৃতির গর্ভে সেভাবে কিছুই অপচয় হয় না।

প্রতিটা উত্তরের পর তাই
যে-প্রশ্নটির মৃত্যু ঘনিয়ে আসে
অজ্ঞানতাবশত তার জীবনপ্রণালী লক্ষ করি
দেখি জন্ম ও মৃত্যুকেই একমাত্র খিদে দিয়ে প্রশ্ন করা যাচ্ছে
অর্থাৎ এই প্রশ্নমুখর খিদের অজ্ঞানতাই জীবন
জীবন আমাকে ভুলতে বসেছে পথেঘাটে।

একমাত্র উৎসবের দিন এলে বোঝা যায়
উৎসবের মানুষ আমি না
আলো ও অন্ধকারের ভেতর— বেড়ালের গলায় আটকে থাকা ঘড়ির কাঁটা।

দিনের শেষে মানুষের তবু একটাই গল্প থাকে, উল্লেখ করার মতো।
গল্পের খাতিরে মানুষ ফুলপ্যান্ট পরা শেখে
দু-আঙুলে সিগারেট ধরার কৌশলও, অভ্যেস হয়ে যায় ঠিক একদিন।

গল্প এতটাই গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক
উঠতে বসতে তাকে নিয়ে ট্রেনে-বাসে-নেটে
এমনকী মন্দির আর বিধানসভায়ও মানুষের নিস্তার নেই।

ধর্মযুদ্ধ আর অজ্ঞাতবাসেও গল্পের মহিমা বহু প্রাচীন।

নেই নেই করেও অতিচর্চিত এক গল্পের আওতায়
প্রতি মুহূর্তে আমি মুদ্রিত হচ্ছি
যার স্বত্ব এখনও অরক্ষিত পৃথিবীর কাছে।

Categories
2021-May-Poem কবিতা

গৌতম সরকার

হরেশ কাকার স্যান্ডো আর শরীরে লবণ দিয়ে ভারতবর্ষ আঁকা।
সে-ম্যাপে আছে পাকিস্তান, চীন, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ।
সে যখন হাল দেয় তখন মাটির গন্ধ গায়ে মাখতে ঘুটকুরি আসে, দুধ সাদা বক, টেকেনাই…। এরা
কোন এক প্রাচীন কাল থেকে স্নান করে না। শরীরে তাদের শামুক খোলের মতো মেঠো গন্ধের আস্তরণ।
প্রতীক্ষা নিয়ে বসে থাকে… এক আড়াই আঙুলের লোভে।
আর সেই ডানপিটে আড়াই অন্ধকারকে দড়ি বানিয়ে বানিয়ে ভাগ করে— নুন, ভাত, ফ্যানা।

তোমাকে পেতে চেয়ে শরীর পেতেছি।
আর পেতেছি দুধ সাদা বুক…
তোমাকে চেয়ে উল্লেখযোগ্য উলঙ্গ হয়েছি। অথবা দৃষ্টান্ত হব বলে।
উপরে দিয়েছি ভেজা খড়। ছেঁড়া ধকর। ছোটো ছোটো টেকা দেখব বলে ভোরের আঁচল সরিয়েছি।
ছেনিতে ছুয়েছি জল। মুস দিয়েছি মাখিয়ে…
এত কাণ্ডের পর জুহুরি এসে যখন বল— ও তো খাস্তান!!
তবে পরাগও মিছামিছি মিলন করে। শরীর চেপে থাকে রস।

পাগলা গোরুটাকে অনেক কষ্টে বাগাতে পেরেছি।
সে এখন ডান বাম বোঝে। উঠস বইস বোঝে।
হাই তোলে না আর আগের মতো। লাঙল তুলে দিই ঘারে। তাল তাল সন্তান পাবার আশায় বীজ পুঁতে দিই জমির শরীরটাতে…
জানো নন্দ— এতে কতবার শরীর ভাঙে।
আমার, জমির, গোরুর।
আর তুমি শুধু উল্লেখযোগ্য ভাম ধরো। বাজে খেলো। নীতি করো। আমি কতটুকু তোমার নিয়েছি? আর তুমি কতটা পেয়েছ নন্দ?
চলো খেরোর খাতা খোলো…

মা বলে— বাসন একখানে থাকলে ওমন শব্দ হবেই।
রোজই রেগে ওঠে বড়ো মুখ ওয়ালা ডেকচি। ঝনাঝন শব্দ হয়। কেটলির কারি আর আগুন মোতা গরম সইতে পারি না বলে একা চলে যাই দূরে।
কেকারুদের বাগানে বড়ো গাছে গিয়ে লুকোচুরি হই। মা হয় হয়রান। বাবা হয় আগুন
মা বলল— একদিন দেখিস
সেই যে টুকুনটা ছিল। আমি তাকে বলতাম চিকনঠোঁটি। সে গতকাল হাতবদল হয়েছে। তার কান্না দেখে আমি ভান করেছি।

মা আর কিছু বলে না।
এখন শুধু ভাত হতে ইচ্ছে করে…

পিতা হওয়ার চিন্তা আঁকি। কিংবা আদরের কোল।
দুই থেকে বারো ঘরের নামতা মুখস্থ হয়নি কোনো কালেই। তাই, যোগ আর ভাগের সময় অনেক দাঁড়ি কেটেছি খাতায়।
বলে আপাত এই শ্বাশত বুক ছিঁড়ি। হাতের রেখায় মৃত্যু যোগ খুঁজে একের পর এক গুণ কষতে থাকি। ইনফিনিটি চিহ্ন ছেড়ে হাল কষি ততক্ষণ, যতক্ষণ না বুদ্ধের চরণ অবধি পৌঁছাতে পারি…

পুতুলনাচ এখন নতুন করে ভাবি…
কেমন এক অদৃশ্য সুতোয় ঝুলে আছে মেঘ।
যেমন থাকে জন্ম ও মৃত্যুর সম্পর্কের মাঝামাঝি। উলম্ব… কোনো মোহযুক্ত টান নেই অযথা ঝড়ে যাওয়ার। নেহাতই নিয়ম মেনে চলা ক্লাস সেভেনের ছাত্র সে…
ঘণ্টা-রুটিন-পোশাক…

সে যখন লাবণ্য খায়। বিয়ে হয়…।
খিদে বাড়ে আরও।
মনে হয় আর নয়। নয় আর…
তারপর আবার চরম হতে চায়। শক্ত হয় আটি… তুলতুলে হয় দানব। সে তো এক ভয়াবহ চক্রব্যূহে লড়াই!! লড়তে থাকা ক্লান্ত ভক্ষক চেটেপুটে খেতে থাকে রস।
এরপর না-থাকার এক দশর্ন পাঠ করে। আর না। না আর… সাধু হয়।
না-বাচকের পাঠক হয়।

Categories
2021-May-Poem কবিতা

অর্ণব রায়

ধ্বংসশহর: একটি অনুবাদ কবিতা

একবার আমাদের পুরোনো পিক আপ ভ্যান আর চার ক্রেট বিয়ার নিয়ে অসীমের প্রান্ত দেখব বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সে-প্রান্তটি, দেখা গেল, এক অচেনা মহিলার বাড়ির সামনে দুম করে থেমে গেল। ইতিমধ্যে ক্রেটের সব বরফ গলে জল হয়ে গেছে। অছিলা নয়, সত্যি সত্যি বরফ চাইতেই সেই বাড়ির সামনে থেমেছিলাম। আদিগন্ত গমের খেতের মধ্যে সেই একখানা একক কাঠের বাড়ি। ফিকে হলুদ আর কালচে রং করা।

আমি কোনোদিনও ভুলব না সেই সামনের কাঠের বারান্দা। ঝোলানো হ্যামক। আইসড টি। ভাই লুসি, অতদূর তুই কোনোদিন যাসনি। অতক্ষণ গাড়ি চালানোর পরে অমন একজোড়া চোখ, চোয়ালের ধার, নরম গ্রীবা আর কখনো কেউ দেখেনি। আর কেউ কখনো অমনভাবে কারোর বলা কথার দিকে হৃদয় পেতে রাখেনি।

এইসব আগুনঝড় ভূমিকম্প পাতালের আগ্রাসন মিটে গেলে একদিন আমরা ওই বাড়িটার খোঁজে বেরিয়ে পড়ব। দড়জায় টোকা মেরে বলব, একটু বরফ পাওয়া যাবে আপনার কাছে? এক আধটা পিক আপ ভ্যান আর কয়েক ক্রেট বিয়ারও জোগাড় হয়ে যাবে নিশ্চই।

ভাই লুসি, ওই বুঝি শুরু হল। আগুনের হলকার মতো এক একটা বাতাসের ঝাপটা বুঝি আসতে শুরু করল। রাত থাকতে চক্রাকার লাল মেঘ বাবায়ারামের মাথার ওপর জমতে শুরু করেছিল। যেন আমরা জানতাম, শেষের শুরু এরকমটাই হবে।

আমরা এ-সব পাশে নিয়েই রাস্তায় হেঁটে বেরিয়েছি। কিছু যে হবে, তা আমরা জানতাম। কিন্তু বিশ্বাস করতাম, কিছুই হবে না। আমাদের জানা আর বিশ্বাসের মাঝে এখন গরম হাওয়া বইছে। গা যেন পুড়ে যাচ্ছে।

এখন কবরস্থানের পাশে গিয়ে প্রার্থনা করার সময়। যে যার পাপের জন্য নিজ নিজ মাপে শাস্তি চেয়ে নেওয়ার সময়।

কিন্তু যদি কেউই না দেখছে, প্রার্থনা করে কী করব? ঈশ্বর এ-শহর ছেড়ে স্মিথদের ওয়াগনে চেপে চলে গেছেন।

যেন এক বিষণ্ণ মেলায় মাঝরাতে এসে উপস্থিত হয়েছি। এখানে লোকের মুখ নিথর। নাগরদোলা থেকে বিষণ্ণতা উপচে পড়ছে। খেলনার দোকান থেকে দুঃখের ফেনা ভসভস করে বেরিয়ে আসছে। আলোগুলি উজ্জ্বল কিন্তু ফিনফিনে কালো চাদরে ঢাকা। ডাঁই করে রাখা খাবারগুলি পাথর হয়ে গেছে। ছুঁয়ে দিলে ভেঙে যাবে।

আমরা, মানে আমি মার্থা আর বাচ্চারা একবার এই মেলায় এসেছিলাম। প্রচুর জিনিস দু-হাত ভরে কেনার পর, এখানেই আমাদের মধ্যে কিছু একটা বিষয় নিয়ে তীব্র ঝাঁঝালো ঝগড়া শুরু হয়। সেই ঝগড়া শুরুর মুহূর্ত থেকে মেলাটি সেই অবস্থায় স্থির হয়ে আছে। আর ধীরে ধীরে ভঙ্গুর পাথর হয়ে যাচ্ছে।

ভাই লুসি, সেই থেকে একটি ঘামে চটচটে মেলায় আমি পথ হারিয়ে ফেলি। সম্পূর্ণ ফাঁকা মাঠে অসংখ্য গলিপথ সৃষ্টি হয়। অগুন্তি ফেরিওয়ালা তাদের বেলুন, বুদবুদ, খেলনা বাঁদর নিয়ে আমার মুখের ওপর ‘পিকাবু’ বলে উঁকি দিয়ে যায়। অচেনা মুখের পাথর আমি রোজ দেখি।
আজ তোর সাথে মেলায় এসেছি। আজ আবার মেলা চালু হবে। এ-পর্যন্ত সরল আজ আমরা হব।

প্রবীণ বয়সে এসে হোমার অন্ধত্বের গুরূত্ব বুঝলেন। সারাজীবন আলোর জন্য হাহাকার করেছেন। সারাজীবন তার কল্পিত জগৎকে একবার দেখার জন্য আকুলি বিকুলি করেছেন। শেষ জীবনে এসে বুঝলেন, আলো নয়, আলোয় উদ্ভাসিত প্রিয়মুখ, ঘরবাড়ি বস্তুপুঞ্জ— কিছু নয়। অন্ধকারই আসল রূপ। নিকষ সীমাহীন অবয়বহীন কালো। এখন তিনি সেই অন্ধকারের ওপর অন্ধকার দিয়ে আঙুল নেড়ে নেড়ে আলপনা আঁকেন।

ভাই লুসি, আমরাও কি সেরকমই কোনো অন্ধত্বে ডুবে গেছি? দেখতে পাচ্ছি কি পাচ্ছি না তা-ই বুঝতে পারছি না। আলো আঁধার গোধূলি সকাল সাদা কালো ধোঁয়া ধূসর— কিচ্ছুটি এখানে নেই। এখান বলতে ঠিক কোথায় তা-ও স্পষ্ট নয়। পৃথিবীর বুক থেকে আমাদের শহর স্বেচ্ছায় গুটিয়ে নেই হয়ে গেছে। শহরের স্মৃতিও আর আমাদের মধ্যে নেই।

লুসি, আমি তোকে ডাকছি, কথা বলছি বটে, তুই আদৌ আমার সাথে শোনার দূরত্বে আছিস কি না জানি না। গাধাটি কোথায় গেল? আমিই-বা কই?

এ-সবের মাঝে হোমারই-বা কী করছেন? কী লিখছেন?

প্রথম ক-দিন ওরা খুব ঈশ্বর ডেকেছিল। ওরা, যে যেরকম, মাটিপূজারী, পাখিবাদী, ব্যথাসঞ্চয়ী, অবিশ্বাসী— যে যার মতন করে প্রাণ থেকে আবেদন পৌঁছোনোর চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। একদিনও কোনো গাছতলা, গুহা, পাতালঘর, যাদুর মাধ্যমে রোগ সারানো— একটি দরবারের একটি সিটও খালি যায়নি। লোকে রাস্তায় হাঁটু ভেঙে ভেঙে বসে পড়েছে যখন তখন।

প্রথম যেদিন বাবায়ারামের মাথা নড়ে উঠল, তার প্রায় একমাস আগে থেকে চৌকো টেলিভিশনের ভেতরে থাকা মেয়েটি হাত পা নেড়ে আমাদের নীচে, মাটির তলায় সান্দ্র আগুনের চলাচলের কথা বলে আসছিল। শহরের কেউ শুনতে পায়নি। শহরের সকলে সকাল হলে গাড়ি নিয়ে ট্রাফিকের মধ্যে লাফিয়ে পড়তে, বিকেল হলে সেই ট্রাফিক ভেঙে ভেঙে বাড়ি ফিরতে, সপ্তাহ শেষে আবার সেই গাড়ি নিয়ে সমুদ্রের জলে পা ডোবাতে বেরিয়ে পড়তে ব্যস্ত ছিল। রেস্তোঁরাগুলি প্রতি সন্ধ্যায় মানুষের সমবেত গুনগুনানিতে গুনগুন করছিল। প্রথম যেদিন বাবায়ারামের মাথা নড়ে উঠল, টেলিভিশনের ভেতরে থাকা মেয়েটি সেদিন আর হাত পা নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা করল না। সেদিন তার ঠোঁটের একপাশে এক নীরব আধখানা হাসি ফুটে উঠল। সেদিনও গোটা শহরে তাকে দেখার কেউ ছিল না। সকলে, যে যেখানে ছিল, স্তব্ধ বিস্ময়ে বাবায়ারামের মাথার দিকে তাকিয়ে ছিল।
ঈশ্বর ডাকার পর্ব একদিন শেষ হলে সকলে শুঁড়িখানায় গিয়ে ভিড় জমাতে শুরু করে।

Categories
2021-May-Poem কবিতা

মণিশংকর বিশ্বাস

ফল

রোদের জটা থেকে ছিটকে ওঠে কয়েকটি শালিখ
‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’ কিশোরীর মতো ধানখেত একা শিস দেয়
গোলাপ ফুলটি আসলে ততটা বড়ো, যতদূর তার সুগন্ধ
বহুদূর হতে আকাশে জীবন্ত কোনো গ্রহ তাকে প্রেম নিবেদন করে।
এইসব মিলেমিশে থাকে আমার ভিতর—
বাইরে থেকে বোঝাই যায় না এই মিলমিশ—
একটি বৃহৎ সংখ্যা যেরকম দুই বা দুইয়ের অধিক ক্ষুদ্রতর সংখ্যার যোগফল।

অশোকনগর

ভালোবাসি— এই ব্যক্তিগত বোধগম্যতার আঁধারে
একটি জোনাকি ক্রমাগত জ্বলে বা নেভে।
বরষাঘন চোখের মতো পুকুরের ধারে
দাঁড়িয়ে রয়েছি, ভিজে কুকুরের আনুগত্য নিয়ে।
সাইকেলে বাঁধা বেলুনগুচ্ছের মতো
কী যেন একটা
ছটফট করে, উলটো দিকে ছুটে যেতে চায়।

তোমার চোখের বিন্দুবিসর্গ আমার ভালো লাগে

আমি চাই ও-দু-খানি চোখ জানালা দিয়ে এসে
আমাকে তুলে নিয়ে যাক

…নিয়ে যাক তোমার নিজ্‌ঝুমে, অশোকনগর।

কলাবউ

তোমাকেই পেতে চেয়ে বাকি সব আগডুম বাগডুম
এই শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকও চলে গেল
তুমি সেই দেহতত্ত্ব গান।
সুন্দরের জলে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে—

দুপুরের নির্জন খয়েরিনীল কচুরিপানায়
যেরকম ডুবে থাকে রাজহাঁস।
মনে পড়ে গত শতকের আশির দশক—
মানুষের যা যা দরকার, সব আবিষ্কার হয়ে গেছে
দুপুরবেলা আমিও আবিষ্কার করেছি কখন
প্রতিদিন তুমি শাড়ি খুলে উড়াও পাখির ঝাঁক
পুকুরের জলে মেশে বৃত্তাকার হলুদ
ওই উদ্বৃত্ত নাভিদেশ পরক্ষণেই অন্য মহাদেশ
বৃষ্টিবন…
পঁচিশ বছর দেখা হোক বা না হোক

আজও তোমার মুখের ’পরে
আমার সকল যৌনইচ্ছা খেলা করে।

প্রাক্তন

পুরোনো দিনগুলিকে দুর্বোধ্য সংকেত মনে হয়।

কী যেন ভুলতে হবে—
সারাক্ষণ মনে পড়ে।
রক্তের গভীরে ফোটা এই রক্তজবার মালা
অতর্কিতে দেবতার পায়ের দিকে চেয়ে
হাড়িকাঠের মান্যতা চায়
অন্ধের চোখের সাদা অংশের মতো ভয়
ও কালো অংশের মতো উদ্দেশ্যহীনতা
ছাগশিশুটির ’পরে ভর করে।

আমাদের সম্পর্ককে, অতঃপর, জলে ধুয়ে ফেলা রক্তের দাগ মনে হয়।

নিজের পুরোনো কবিতার মুখোমুখি

যখন পিছন ফিরি তোমাকে দেখতে
মনে করি এ কোন সময়?
তুমি কি গভীর নও তত
তবে কেন এত জল, এত কান্না উপচে পড়ছে?
ফার্নপাতা, শ্যাওলায় ঢেকে গেছে প্রেমিকার চুল
পাথরের শ্বেতাভ হাসির দাগ লেগে আছে
ওই মর্মরজটিল বেদেনির ঠোঁটে…
লতানো ফুলের গাছ থেকে
ঝরে পড়ে ফুল, আরও শাদা ফুল।
একটি গোখরো হিলহিলে, সহসা উঁকি মারে
সবুজ পিচ্ছিল অক্ষরের ফাঁকে

অধীর প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতন।

Categories
2021-May-Translation অনুবাদ

ডোনাল্ড বার্থেলমে

রেবেকা

ভাষান্তর: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

রেবেকা লিজার্ড তার নামের— কুচ্ছিৎ, সরীসৃপীয়, একেবারে অগ্রহণযোগ্য— শেষের অংশটুকু বদলানোর চেষ্টা করছিল।

‘লিজার্ড’, বিচারক বললেন। ‘লিজার্ড, লিজার্ড, লিজার্ড, লিজার্ড। আপনি যদি এটুকু অনেকবার উচ্চারণ করেন তাহলে এতে আর কোনো সমস্যা থাকে না। এ-সব তুচ্ছ উপদ্রবে আপনি আদালতের ক্যালেন্ডার তছনছ করে দিতে পারেন না। অনেকেই সম্প্রতি তাদের নাম বদলেছে। নাম পরিবর্তন টেলিফোন কোম্পানি, বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সর্বোচ্চ স্বার্থের সাথে যায় না। প্রস্তাবটি নাকচ করা হল।’

লিজার্ড কেঁদে ফেলল। নাকের নীচে চেপে ধরল চন্দ্রমল্লিকার সুবাস মাখা ক্লিনেক্স টিস্যু।

‘দুর্বল মহিলা’, একজন বলল, ‘আপনি কি স্কুলশিক্ষক?’

অবশ্যই তিনি একজন স্কুলশিক্ষক, নির্বোধ কোথাকার। দেখতে পাচ্ছ না, বেচারি ভেঙে পড়েছেন? তাকে একলা থাকতে দিচ্ছ না কেন?

‘আপনি কি সমকামী লেসবিয়ান নারী? এই কারণেই কি আপনি কখনো বিয়ে করেননি?’

ওহ্ যিশু, হ্যাঁ, তিনি সমকামী লেসবিয়ান নারী, তুমি যেমনটি বললে। তুমি কি তোমার মুখটা একটু বন্ধ করবে?

রেবেকা জঘন্য এক চর্মবিশেষজ্ঞের কাছে গেল (নতুন এক জঘন্য চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ), কিন্তু তিনিও আগের বিশেষজ্ঞদের মতো একই কথা বললেন। ‘সবুজাভ’, তিনি বললেন, ‘ত্বকের হালকা সবুজ, এটা বংশগত অস্বাভাবিকতা, কিছুই করার নেই, আমার শঙ্কা হচ্ছে মিসেস লিজার্ড।’

‘মিস লিজার্ড।’

‘কিছুই করার নেই মিস লিজার্ড।’

‘ধন্যবাদ ডাক্তার। বিরক্ত করার জন্য কি আমি সামান্য কিছু আপনাকে দিতে পারি?’

‘পঞ্চাশ ডলার।’

বাড়ি ফিরল রেবেকা। মেইলবক্সে পেঁচিয়ে থাকা বাড়িভাড়া বাড়ানোর নোটিস তার জন্য অপেক্ষায় ছিল। বর্ধিত এই ভাড়া আবার আগের মাসগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ব্যাপারটা একেবারে ধর্মঘটী নাছোড় শিক্ষার্থীদের মতো।

অবশ্যই আরও কিছু ক্লিনেক্স লাগবে। কিংবা একটা পিএইচডি। কোনো উপায় নেই আর।

চুলায় মাথা ঢুকিয়ে রাখার কথা ভাবল সে। কিন্তু তারটা তো ইলেক্ট্রিক ওভেন।

রেবেকার প্রেমিকা হিল্ডা ফিরল দেরি করে।

‘কেমন কাটল?’ দিনটা কেমন ছিল তাই জানতে চাইল হিল্ডা।

‘বিচ্ছিরি।’

‘হুমম’, বলল হিল্ডা। চুপচাপ সে দু-জনের জন্য কড়া একটা পানীয় তৈরি করল।

হিল্ডা দেখতে খুব সুন্দরী। রেবেকাও সুন্দরী। তারা একে-অপরকে ভালোবাসে— আমরা যেমন জানি, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও সুনিপুণ ব্যাপার। হিল্ডার চুল সুদীর্ঘ ও সোনালি, একটু ছায়াময়তা সেই সোনালি চুলের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রেবেকারও আছে ধ্রুপদী এবং আবেদনময় গঠন। যেই দেখে সেই তার প্রশংসা করে।

‘দেরি করলে কেন’, বলল রেবেকা, ‘কোথায় ছিলে?’

‘স্টেফানির সাথে একটু পান করছিলাম।’

‘স্টেফানির সাথে পান করলে কেন?’

‘সে আমার অফিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। এসে বলল।’

‘কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?’

‘বার্কলেতে।’

‘স্টেফানি কেমন আছে?’

‘সে ভালো আছে।’

‘স্টেফানির সাথেই তোমার পান করতে হবে কেন?’

‘আমিও একটু পান করতে চাইছিলাম।’

‘স্টেফানি হালকা সবুজাভ নয়, তাই তো? চমৎকার, গোলাপি রং স্টেফানির?

হিল্ডা উঠে গেল। সিঅ্যান্ডডব্লিউ-র চমৎকার একটা অ্যালবাম চালিয়ে দিল রেকর্ড প্লেয়ারে। এটা ড্যাভিড রজার্সের ‘ফেয়ারওয়েল টু দ্য রায়মান’ আটলান্টিক এসডি সেভন টু এইট থ্রি। এতে আছে ‘ব্লু মুন অব কেন্টাকি’, ‘গ্রেট স্পিকেল্ড বার্ড,’ ‘আই এম মুভিং অন’, এবং ‘ওয়াকিং দ্য ফ্লোর ওভার ইউ’-র মতো জনপ্রিয় গানগুলো। ন্যাশভিলের সেরা সব ব্যক্তিত্বের সমাবেশ ঘটেছে এই রেকর্ডে।

‘গোলাপি রংটাই সব কিছু নয়’, বলল হিল্ডা। ‘এবং স্টেফানি কিছুটা বিরক্তিকরও। তুমি তো তা জানো।’

‘এতটা বিরক্তিকর নয় যে, তুমি তার সাথে পান করতে যেতে পারো না।’

‘স্টেফানির ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই।’

‘আদালত থেকে বেরিয়ে আসার সময়’, রেবেকা বলল, ‘একটা লোক আমার জিপার খুলে ফেলেছিল।’

ড্যাভিড রজার্স গাইছেন ‘ওহ্, প্লিজ রিলিজ মি, লেট মি গো।’

‘কী পরে ছিলে তুমি?’

‘এখন যা পরে আছি।’

‘তাহলে তো বলতে হয়’, হিল্ডা বলল, ‘পাছার ব্যাপার লোকটার ভালোই রুচি আছে।’

রেবেকাকে সে সোফায় ফেলে জড়িয়ে ধরল। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, বলল সে।

‘সরো’, ঠান্ডা গলায় বলল রেবেকা। ‘যাও, স্টেফানি সাসারের সাথে সময় কাটাও গিয়ে।’

‘স্টেফানি সাসারের ব্যাপারে আমার আগ্রহ নেই’, দ্বিতীয়বারের মতো বলল হিল্ডা।

কেউ যেটাকে সবচেয়ে বেশি আঁকড়ে ধরতে চায় সেটাকেই আবার প্রায়শ ‘দূরে ঠেলে’ দেয়, ঠিক প্রেমিকের মতো। খুবই সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু খুব পীড়াদায়ক, মনোস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এক্ষেত্রে (আমার মতামত) এমন এক ব্যাপার ঘটে যে, যা প্রকাশ করা হল তা যেন ‘বিশুদ্ধভাবে’ প্রকাশ করা হল না। যেন ছোটো একটা ক্ষত থেকে গেছে তাতে, থেকে যায় কোথাও মারাত্মক কোনো একটা জায়গা। এমনকী, ঘটতে পারে ভয়ংকর কোনো কিছু।

‘রেবেকা’, হিল্ডা বলল, ‘আমি আসলেই তোমার এই হালকা সবুজ রংটা পছন্দ করি না।’

‘লিজার্ড’ শব্দটি টিকটিকি, গুইসাপ, গিরগিটি, আঞ্জিনার মতো নানা কিছুর সাথে যুক্ত। ‘লারোস এনসাইক্লোপিডিয়া অব অ্যানিমেল লাইফ’-এর তথ্য অনুযায়ী এই ধরনের প্রাণীর অন্তত বিশটি পরিবার এখনও বিদ্যমান। বিলুপ্ত হওয়া আরও চারটির কথা জানা যায় জীবাশ্ম থেকে। এই প্রাণীগুলোর রয়েছে অন্তত আড়াই হাজার প্রজাতি। এরা হাঁটা, দৌড়ানো, আরোহন করা, গর্ত খোঁড়া— এই ধরনের নানা অভিযোজনে সক্ষম হয়েছে। অনেকগুলোর আবার আকর্ষণীয় নামও আছে। যেমন— রঙিন টিকটিকি, চ্যাটালো পা টিকটিকি, কটিবন্ধ টিকটিকি, দেওয়াল টিকটিকি।

‘বেশ কয়েক বছর ধরে আমি সেটা এড়িয়ে গেছি, কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি আসলে এটা খুব একটা পছন্দ করি না’, হিল্ডা বলল। ‘এটা কিছুটা—’

‘জানি আমি’, বলল রেবেকা।

রেবেকা বেডরুমে গেল। কোনো একটা কারণে চালিয়ে দিল রঙিন টেলিভিশনটা। সবুজ একটা আভা ছড়িয়ে ‘গ্রিন হিল’ ছবিটা তখন টিভিতে শুরু হচ্ছে মাত্র।

আমি অসুস্থ, আমি অসুস্থ।

আমি এক চাষী হব।

আমাদের ভালোবাসা, আমাদের যৌনপ্রেম, আমাদের সাধারণ প্রেম!

হিল্ডা বেডরুমে ঢুকল। বলল, ‘খাবার রেডি আছে।’

‘কী খাবার?’

‘পর্ক আর রেড ক্যাবেজ।’

‘আমি এখন মাতাল’, বলল রেবেকা।

আমাদের নাগরিকদের অনেকেই মাঝে মাঝে এমন একটা সময়ে মাতাল হয় যখন আসলে তাদের মাথা ঠান্ডা রাখা দরকার। এই যেমন রাতের খাবারের সময়টায়। মাতাল হলে ঘড়ি কোথায় রাখতে হয়, চাবি কোথায় থাকবে, মানি ক্লিপটা কোথায় রাখবে— এ-সব তোমনে থাকে না। অন্যের সুস্বাস্থ্য, প্রশান্তি, প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। অতিমাত্রায় অ্যালকোহল নেওয়ার কারণগুলো অ্যালকোহলের প্রতিক্রিয়ার মতো তত পরিষ্কার নয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা সাধারণত মনে করেন যে, মদ্যপান খুব গুরুতর সমস্যা হলেও কিছু ক্ষেত্রে তার চিকিৎসাও আছে। বলা হয়ে থাকে, এক্ষেত্রে অ্যাঅ্যা (মদ্যপান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং চিকিৎসা সংস্থা ‘অ্যালকোহলিক্স অ্যানোনিমাস’) বেশ জনপ্রিয় ও কার্যকর। আসল ব্যাপার হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি।

‘এখন উঠো’, হিল্ডা বলল। ‘যা বলেছি তার জন্য আমি দুঃখিত।’

‘তুমি তো সত্যিই বলেছ।’

‘হ্যাঁ, তা সত্য’, স্বীকার করল হিল্ডা।

‘কিন্তু শুরুতেই এই সত্যটুকু তুমি আমাকে বলোনি। শুরুতে তুমি বলেছ আমার এই রংটা সুন্দর।’

‘শুরুতে আমি তোমাকে সত্যটাই বলেছিলাম। আমি মনে করেছিলাম যে তা সুন্দর। তখন।’

হিল্ডার সংক্ষিপ্ত তিনটি বাক্যের মধ্যে এই ‘তখন’টা চরম শব্দ। যখন শব্দটি এভাবে ব্যবহৃত হয় তখন এটি মানুষের শব্দভাণ্ডারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা উস্কে দেওয়া শব্দ। বিগত হয়ে যাওয়া সময়! সেই সময়ের সাথে বিগত হয়ে যাওয়া অবস্থা! মানুষের যন্ত্রণাকে কীভাবে পরিমাপ করা হবে? কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, হিল্ডা এই অবস্থায়ও রেবেকার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করছে, কিন্তু, পাঠক, হিল্ডার এই অবস্থানকেও ঈর্ষণীয় বলে বিবেচনা করা যায় না, সত্য হচ্ছে, বের্গসঁ যেমন জানতেন, এক কঠিন আপেল কঠিনই, তা সে কেউ ধরুক আর কেউ ছুঁড়ুক।

‘তাহলে আর কী?’ পাথরকণ্ঠে বলল রেবেকা।

‘তারপরও আমি তোমাকে ভালবাসি—’

তোমার এই তারপরও যে-ভালোবাসা সেটি কি আমি চাই? তুমি চাও? কেউ কি তা চায়? তারপরও আমরা কি কিছুটা তেমনই নই? আমাদের সবার মধ্যেই কি এমন ব্যাপার নেই যা বলতে গেলে আমাদের অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। আমি তোমার কিছু বিষয় দেখেও দেখি না, তুমি একইভাবে আমার কিছু দিককে নজরের বাইরে রাখো, আর এই কিছু বিষয়ে আমাদের পরস্পরের অন্ধ থাকা, এই বন্ধ রাখা চোখের চোখাচোখি, ১৯৬০ দশকের শুরু থেকে এই অভিব্যক্তির ব্যবহার, আমরা আমাদের কড়কড়ে আর সুরভিত জীবনযাপন বজায় রেখে চলেছি, নিশ্চয়ই এটাকে বলে ‘সেরাটা করা’। যেটিকে আমি বরং সবসময় বিবেচনা করেছি আমেরিকার আদর্শের ম্যাড়ম্যাড়ে ধারণা হিসেবে। আমার এই সমালোচনাকে অন্যদের পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখতে হবে। উদাহরণ হিসেবে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ম্যাকিনলের কথা বলা যায়। যিনি মেনে চলতেন যে, সবসময় হাসিখুশি থাকা সম্ভব না হলেও ভালো মেজাজ বজায় রাখাটা মূল্যবান এবং সঠিক।

রেবেকার মাথায় হাত রাখল হিল্ডা।

‘তুষার পড়তে শুরু করেছে’, বলল সে। ‘তুষারপাতের মৌসুম আসছে শিগগিরই। আগের সেই তুষারের দিনগুলোর মতোই আবার আমরা একসাথে। আগুনের পাশে বসে বাস্টহ্যাড পান করা। সত্য হচ্ছে এক বদ্ধ ঘর। যে-ঘরে দরজায় মাঝে মাঝেই আমরা ঠকঠক করি এবং সেটি বন্ধই থেকে যায়। আগামীকাল তুমি আমাকে আবার দুঃখ দেবে এবং আমি তোমাকে আবার বলব যে, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ এবং তারপর আবার দুঃখ দেবে, তারপর আবার। জাহান্নামে যাক। এসো হে নীলচে সবুজ রঙের বন্ধু আমার, এসো আমার সাথে বসে রাতের খাবার খাও।’

তারা একসাথে খেতে বসল। তাদের সামনে রাখা পর্ক আর রেড ক্যাবেজ থেকে ভাঁপ উঠছে। তারা ম্যাককিনলে প্রশাসন নিয়ে ধীরে ধীরে আলাপ করছে। সংশোধনবাদী ইতিহাসবিদরা বিষয়টি সংশোধন করছিলেন। কাহিনি এখানেই শেষ। এই কাহিনি লেখা হয়েছে বিভিন্ন কারণে। কারণগুলোর মধ্যে নয়টিই গোপন। দশমটি হচ্ছে, মানব প্রেমের বিষয়ে— যা সবসময়ই ভীষণ এবং সোনালি— বিবেচনা কখনোই বন্ধ করা উচিত নয়, উষ্ণ ত্বকের পাতায় যে রং আর নকশার উল্কিতেই তা খচিত থাকুক না কেন।