Categories
2021-May-Translation অনুবাদ

ডোনাল্ড বার্থেলমে

রেবেকা

ভাষান্তর: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

রেবেকা লিজার্ড তার নামের— কুচ্ছিৎ, সরীসৃপীয়, একেবারে অগ্রহণযোগ্য— শেষের অংশটুকু বদলানোর চেষ্টা করছিল।

‘লিজার্ড’, বিচারক বললেন। ‘লিজার্ড, লিজার্ড, লিজার্ড, লিজার্ড। আপনি যদি এটুকু অনেকবার উচ্চারণ করেন তাহলে এতে আর কোনো সমস্যা থাকে না। এ-সব তুচ্ছ উপদ্রবে আপনি আদালতের ক্যালেন্ডার তছনছ করে দিতে পারেন না। অনেকেই সম্প্রতি তাদের নাম বদলেছে। নাম পরিবর্তন টেলিফোন কোম্পানি, বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সর্বোচ্চ স্বার্থের সাথে যায় না। প্রস্তাবটি নাকচ করা হল।’

লিজার্ড কেঁদে ফেলল। নাকের নীচে চেপে ধরল চন্দ্রমল্লিকার সুবাস মাখা ক্লিনেক্স টিস্যু।

‘দুর্বল মহিলা’, একজন বলল, ‘আপনি কি স্কুলশিক্ষক?’

অবশ্যই তিনি একজন স্কুলশিক্ষক, নির্বোধ কোথাকার। দেখতে পাচ্ছ না, বেচারি ভেঙে পড়েছেন? তাকে একলা থাকতে দিচ্ছ না কেন?

‘আপনি কি সমকামী লেসবিয়ান নারী? এই কারণেই কি আপনি কখনো বিয়ে করেননি?’

ওহ্ যিশু, হ্যাঁ, তিনি সমকামী লেসবিয়ান নারী, তুমি যেমনটি বললে। তুমি কি তোমার মুখটা একটু বন্ধ করবে?

রেবেকা জঘন্য এক চর্মবিশেষজ্ঞের কাছে গেল (নতুন এক জঘন্য চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ), কিন্তু তিনিও আগের বিশেষজ্ঞদের মতো একই কথা বললেন। ‘সবুজাভ’, তিনি বললেন, ‘ত্বকের হালকা সবুজ, এটা বংশগত অস্বাভাবিকতা, কিছুই করার নেই, আমার শঙ্কা হচ্ছে মিসেস লিজার্ড।’

‘মিস লিজার্ড।’

‘কিছুই করার নেই মিস লিজার্ড।’

‘ধন্যবাদ ডাক্তার। বিরক্ত করার জন্য কি আমি সামান্য কিছু আপনাকে দিতে পারি?’

‘পঞ্চাশ ডলার।’

বাড়ি ফিরল রেবেকা। মেইলবক্সে পেঁচিয়ে থাকা বাড়িভাড়া বাড়ানোর নোটিস তার জন্য অপেক্ষায় ছিল। বর্ধিত এই ভাড়া আবার আগের মাসগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ব্যাপারটা একেবারে ধর্মঘটী নাছোড় শিক্ষার্থীদের মতো।

অবশ্যই আরও কিছু ক্লিনেক্স লাগবে। কিংবা একটা পিএইচডি। কোনো উপায় নেই আর।

চুলায় মাথা ঢুকিয়ে রাখার কথা ভাবল সে। কিন্তু তারটা তো ইলেক্ট্রিক ওভেন।

রেবেকার প্রেমিকা হিল্ডা ফিরল দেরি করে।

‘কেমন কাটল?’ দিনটা কেমন ছিল তাই জানতে চাইল হিল্ডা।

‘বিচ্ছিরি।’

‘হুমম’, বলল হিল্ডা। চুপচাপ সে দু-জনের জন্য কড়া একটা পানীয় তৈরি করল।

হিল্ডা দেখতে খুব সুন্দরী। রেবেকাও সুন্দরী। তারা একে-অপরকে ভালোবাসে— আমরা যেমন জানি, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও সুনিপুণ ব্যাপার। হিল্ডার চুল সুদীর্ঘ ও সোনালি, একটু ছায়াময়তা সেই সোনালি চুলের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রেবেকারও আছে ধ্রুপদী এবং আবেদনময় গঠন। যেই দেখে সেই তার প্রশংসা করে।

‘দেরি করলে কেন’, বলল রেবেকা, ‘কোথায় ছিলে?’

‘স্টেফানির সাথে একটু পান করছিলাম।’

‘স্টেফানির সাথে পান করলে কেন?’

‘সে আমার অফিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। এসে বলল।’

‘কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?’

‘বার্কলেতে।’

‘স্টেফানি কেমন আছে?’

‘সে ভালো আছে।’

‘স্টেফানির সাথেই তোমার পান করতে হবে কেন?’

‘আমিও একটু পান করতে চাইছিলাম।’

‘স্টেফানি হালকা সবুজাভ নয়, তাই তো? চমৎকার, গোলাপি রং স্টেফানির?

হিল্ডা উঠে গেল। সিঅ্যান্ডডব্লিউ-র চমৎকার একটা অ্যালবাম চালিয়ে দিল রেকর্ড প্লেয়ারে। এটা ড্যাভিড রজার্সের ‘ফেয়ারওয়েল টু দ্য রায়মান’ আটলান্টিক এসডি সেভন টু এইট থ্রি। এতে আছে ‘ব্লু মুন অব কেন্টাকি’, ‘গ্রেট স্পিকেল্ড বার্ড,’ ‘আই এম মুভিং অন’, এবং ‘ওয়াকিং দ্য ফ্লোর ওভার ইউ’-র মতো জনপ্রিয় গানগুলো। ন্যাশভিলের সেরা সব ব্যক্তিত্বের সমাবেশ ঘটেছে এই রেকর্ডে।

‘গোলাপি রংটাই সব কিছু নয়’, বলল হিল্ডা। ‘এবং স্টেফানি কিছুটা বিরক্তিকরও। তুমি তো তা জানো।’

‘এতটা বিরক্তিকর নয় যে, তুমি তার সাথে পান করতে যেতে পারো না।’

‘স্টেফানির ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই।’

‘আদালত থেকে বেরিয়ে আসার সময়’, রেবেকা বলল, ‘একটা লোক আমার জিপার খুলে ফেলেছিল।’

ড্যাভিড রজার্স গাইছেন ‘ওহ্, প্লিজ রিলিজ মি, লেট মি গো।’

‘কী পরে ছিলে তুমি?’

‘এখন যা পরে আছি।’

‘তাহলে তো বলতে হয়’, হিল্ডা বলল, ‘পাছার ব্যাপার লোকটার ভালোই রুচি আছে।’

রেবেকাকে সে সোফায় ফেলে জড়িয়ে ধরল। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, বলল সে।

‘সরো’, ঠান্ডা গলায় বলল রেবেকা। ‘যাও, স্টেফানি সাসারের সাথে সময় কাটাও গিয়ে।’

‘স্টেফানি সাসারের ব্যাপারে আমার আগ্রহ নেই’, দ্বিতীয়বারের মতো বলল হিল্ডা।

কেউ যেটাকে সবচেয়ে বেশি আঁকড়ে ধরতে চায় সেটাকেই আবার প্রায়শ ‘দূরে ঠেলে’ দেয়, ঠিক প্রেমিকের মতো। খুবই সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু খুব পীড়াদায়ক, মনোস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এক্ষেত্রে (আমার মতামত) এমন এক ব্যাপার ঘটে যে, যা প্রকাশ করা হল তা যেন ‘বিশুদ্ধভাবে’ প্রকাশ করা হল না। যেন ছোটো একটা ক্ষত থেকে গেছে তাতে, থেকে যায় কোথাও মারাত্মক কোনো একটা জায়গা। এমনকী, ঘটতে পারে ভয়ংকর কোনো কিছু।

‘রেবেকা’, হিল্ডা বলল, ‘আমি আসলেই তোমার এই হালকা সবুজ রংটা পছন্দ করি না।’

‘লিজার্ড’ শব্দটি টিকটিকি, গুইসাপ, গিরগিটি, আঞ্জিনার মতো নানা কিছুর সাথে যুক্ত। ‘লারোস এনসাইক্লোপিডিয়া অব অ্যানিমেল লাইফ’-এর তথ্য অনুযায়ী এই ধরনের প্রাণীর অন্তত বিশটি পরিবার এখনও বিদ্যমান। বিলুপ্ত হওয়া আরও চারটির কথা জানা যায় জীবাশ্ম থেকে। এই প্রাণীগুলোর রয়েছে অন্তত আড়াই হাজার প্রজাতি। এরা হাঁটা, দৌড়ানো, আরোহন করা, গর্ত খোঁড়া— এই ধরনের নানা অভিযোজনে সক্ষম হয়েছে। অনেকগুলোর আবার আকর্ষণীয় নামও আছে। যেমন— রঙিন টিকটিকি, চ্যাটালো পা টিকটিকি, কটিবন্ধ টিকটিকি, দেওয়াল টিকটিকি।

‘বেশ কয়েক বছর ধরে আমি সেটা এড়িয়ে গেছি, কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি আসলে এটা খুব একটা পছন্দ করি না’, হিল্ডা বলল। ‘এটা কিছুটা—’

‘জানি আমি’, বলল রেবেকা।

রেবেকা বেডরুমে গেল। কোনো একটা কারণে চালিয়ে দিল রঙিন টেলিভিশনটা। সবুজ একটা আভা ছড়িয়ে ‘গ্রিন হিল’ ছবিটা তখন টিভিতে শুরু হচ্ছে মাত্র।

আমি অসুস্থ, আমি অসুস্থ।

আমি এক চাষী হব।

আমাদের ভালোবাসা, আমাদের যৌনপ্রেম, আমাদের সাধারণ প্রেম!

হিল্ডা বেডরুমে ঢুকল। বলল, ‘খাবার রেডি আছে।’

‘কী খাবার?’

‘পর্ক আর রেড ক্যাবেজ।’

‘আমি এখন মাতাল’, বলল রেবেকা।

আমাদের নাগরিকদের অনেকেই মাঝে মাঝে এমন একটা সময়ে মাতাল হয় যখন আসলে তাদের মাথা ঠান্ডা রাখা দরকার। এই যেমন রাতের খাবারের সময়টায়। মাতাল হলে ঘড়ি কোথায় রাখতে হয়, চাবি কোথায় থাকবে, মানি ক্লিপটা কোথায় রাখবে— এ-সব তোমনে থাকে না। অন্যের সুস্বাস্থ্য, প্রশান্তি, প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। অতিমাত্রায় অ্যালকোহল নেওয়ার কারণগুলো অ্যালকোহলের প্রতিক্রিয়ার মতো তত পরিষ্কার নয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা সাধারণত মনে করেন যে, মদ্যপান খুব গুরুতর সমস্যা হলেও কিছু ক্ষেত্রে তার চিকিৎসাও আছে। বলা হয়ে থাকে, এক্ষেত্রে অ্যাঅ্যা (মদ্যপান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং চিকিৎসা সংস্থা ‘অ্যালকোহলিক্স অ্যানোনিমাস’) বেশ জনপ্রিয় ও কার্যকর। আসল ব্যাপার হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি।

‘এখন উঠো’, হিল্ডা বলল। ‘যা বলেছি তার জন্য আমি দুঃখিত।’

‘তুমি তো সত্যিই বলেছ।’

‘হ্যাঁ, তা সত্য’, স্বীকার করল হিল্ডা।

‘কিন্তু শুরুতেই এই সত্যটুকু তুমি আমাকে বলোনি। শুরুতে তুমি বলেছ আমার এই রংটা সুন্দর।’

‘শুরুতে আমি তোমাকে সত্যটাই বলেছিলাম। আমি মনে করেছিলাম যে তা সুন্দর। তখন।’

হিল্ডার সংক্ষিপ্ত তিনটি বাক্যের মধ্যে এই ‘তখন’টা চরম শব্দ। যখন শব্দটি এভাবে ব্যবহৃত হয় তখন এটি মানুষের শব্দভাণ্ডারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা উস্কে দেওয়া শব্দ। বিগত হয়ে যাওয়া সময়! সেই সময়ের সাথে বিগত হয়ে যাওয়া অবস্থা! মানুষের যন্ত্রণাকে কীভাবে পরিমাপ করা হবে? কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, হিল্ডা এই অবস্থায়ও রেবেকার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করছে, কিন্তু, পাঠক, হিল্ডার এই অবস্থানকেও ঈর্ষণীয় বলে বিবেচনা করা যায় না, সত্য হচ্ছে, বের্গসঁ যেমন জানতেন, এক কঠিন আপেল কঠিনই, তা সে কেউ ধরুক আর কেউ ছুঁড়ুক।

‘তাহলে আর কী?’ পাথরকণ্ঠে বলল রেবেকা।

‘তারপরও আমি তোমাকে ভালবাসি—’

তোমার এই তারপরও যে-ভালোবাসা সেটি কি আমি চাই? তুমি চাও? কেউ কি তা চায়? তারপরও আমরা কি কিছুটা তেমনই নই? আমাদের সবার মধ্যেই কি এমন ব্যাপার নেই যা বলতে গেলে আমাদের অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। আমি তোমার কিছু বিষয় দেখেও দেখি না, তুমি একইভাবে আমার কিছু দিককে নজরের বাইরে রাখো, আর এই কিছু বিষয়ে আমাদের পরস্পরের অন্ধ থাকা, এই বন্ধ রাখা চোখের চোখাচোখি, ১৯৬০ দশকের শুরু থেকে এই অভিব্যক্তির ব্যবহার, আমরা আমাদের কড়কড়ে আর সুরভিত জীবনযাপন বজায় রেখে চলেছি, নিশ্চয়ই এটাকে বলে ‘সেরাটা করা’। যেটিকে আমি বরং সবসময় বিবেচনা করেছি আমেরিকার আদর্শের ম্যাড়ম্যাড়ে ধারণা হিসেবে। আমার এই সমালোচনাকে অন্যদের পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখতে হবে। উদাহরণ হিসেবে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ম্যাকিনলের কথা বলা যায়। যিনি মেনে চলতেন যে, সবসময় হাসিখুশি থাকা সম্ভব না হলেও ভালো মেজাজ বজায় রাখাটা মূল্যবান এবং সঠিক।

রেবেকার মাথায় হাত রাখল হিল্ডা।

‘তুষার পড়তে শুরু করেছে’, বলল সে। ‘তুষারপাতের মৌসুম আসছে শিগগিরই। আগের সেই তুষারের দিনগুলোর মতোই আবার আমরা একসাথে। আগুনের পাশে বসে বাস্টহ্যাড পান করা। সত্য হচ্ছে এক বদ্ধ ঘর। যে-ঘরে দরজায় মাঝে মাঝেই আমরা ঠকঠক করি এবং সেটি বন্ধই থেকে যায়। আগামীকাল তুমি আমাকে আবার দুঃখ দেবে এবং আমি তোমাকে আবার বলব যে, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ এবং তারপর আবার দুঃখ দেবে, তারপর আবার। জাহান্নামে যাক। এসো হে নীলচে সবুজ রঙের বন্ধু আমার, এসো আমার সাথে বসে রাতের খাবার খাও।’

তারা একসাথে খেতে বসল। তাদের সামনে রাখা পর্ক আর রেড ক্যাবেজ থেকে ভাঁপ উঠছে। তারা ম্যাককিনলে প্রশাসন নিয়ে ধীরে ধীরে আলাপ করছে। সংশোধনবাদী ইতিহাসবিদরা বিষয়টি সংশোধন করছিলেন। কাহিনি এখানেই শেষ। এই কাহিনি লেখা হয়েছে বিভিন্ন কারণে। কারণগুলোর মধ্যে নয়টিই গোপন। দশমটি হচ্ছে, মানব প্রেমের বিষয়ে— যা সবসময়ই ভীষণ এবং সোনালি— বিবেচনা কখনোই বন্ধ করা উচিত নয়, উষ্ণ ত্বকের পাতায় যে রং আর নকশার উল্কিতেই তা খচিত থাকুক না কেন।

Categories
2021-May-Translation অনুবাদ ধারাবাহিক

ফা-হিয়েন

ফা-হিয়েনের ভ্রমণ

প্রথম অধ্যায়

ফা-হিয়েন পূর্বে যখন চঙান প্রদেশে ছিলেন, বৌদ্ধ গ্রন্থের তিনটি ভাগের মধ্যে শৃঙ্খলা বিষয়টির অসম্পূর্ণ অবস্থা নিয়ে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। এবং পরবর্তীতে হাঙ শির দ্বিতীয় বছর অর্থাৎ কিনা ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হুই সিঙ, টাও চেঙ, হুই জিঙ ও আরও কয়েকজন মিলে ভারতবর্ষ ভ্রমণ স্থির করলেন। উদ্দেশ্য, বাকি বৌদ্ধ শৃঙ্খলাগুলি সংগ্রহের চেষ্টা করা। চঙান থেকে যাত্রা শুরু করে পর্বত পেরিয়ে তাঁরা এসে পৌঁছলেন সিয়েন কুই রাজার রাজ্যে। ইতিমধ্যে বর্ষা আগত, তাই বর্ষাকাল তাঁরা এখানেই কাটালেন। বর্ষা শেষে আবার শুরু হল পথচলা। এবার এসে থামলেন নু তান রাজার রাজ্যে। সেখান থেকে ইয়াং লু পর্বতশ্রেণি অতিক্রম করে সৈন্য কবলিত স্যাঙ ইয়ে শহরে এসে উঠলেন। স্যাঙ ইয়েতে তখন চলছে রাজদ্রোহ, এবং পথ দুর্লঙ্ঘ্য। ফলত তার বৌদ্ধ অতিথিদের বিষয়ে রাজা বেশ উদবিগ্ন হয়ে পড়লেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষক স্বরূপ তখন তিনি নিজস্ব ব্যায়ে তাঁদের সেখানেই রেখে দিলেন। সেখানে দৈবক্রমে তাদের সাক্ষাৎ হল পথ চলতে চলতে পূর্বে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া চি ইয়েন, হুই চেন, সেং শাও, পাও উন, সেং চিঙ এবং অন্যান্যদের সঙ্গে। এবারের বর্ষাকাল অতিবাহিত হল এখানেই। তারপর বর্ষা অন্তে আবার চলতে থাকা। এবার এসে পৌঁছানো গেল তুন হুয়াং। এখানে রয়েছে সংরক্ষিত শিবির; পূর্ব থেকে পশ্চিমে আশি ফুটের মতো, আর উত্তর থেকে দক্ষিণে চল্লিশ ফুটের কাছাকাছি এই শিবির। মাসাধিক সময় এখানে অতিবাহিত করার পর ফা-হিয়েন-সহ পাঁচজন পরিব্রাজক এবার যাত্রা আরম্ভ করে সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন। বাকিরা রইলেন সেখানেই। এভাবে পাও উন আর তার সাথীদের সঙ্গে আর একবার বিচ্ছেদ হল ফা-হিয়েনের।

তুন হুয়াং শিবিরের অধ্যক্ষ, গোবি মরুভূমি অতিক্রমের সমস্ত আবশ্যক সামগ্রী তাঁদেরকে দিলেন। মরুভূমিতে অশুভ আত্মার বাস আর হাওয়ায় উত্তাপ। এ-হাওয়ার সম্মুখীন হওয়ার অর্থ ভয়ংকর মৃত্যু। আকাশে নেই কোনো পাখির কলরব, মাটিতে নেই কোনো পশুপ্রাণী। একটি পথের চিহ্ন খুঁজে চেয়ে থাকো অনিমেষ। পথ মেলে না। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল মৃত মানুষের ক্ষয়াটে হাড়। এই যেন গন্তব্যের দিশা, এই যেন একমাত্র পথের সংকেত। সতেরো দিন প্রাণপণে হেঁটে প্রায় পনেরোশো লি পথ অতিক্রম করে অবশেষে এসে পড়া গেল মাখাই মরুভূমি।

দ্বিতীয় অধ্যায়

এ-ভূমি উষর, এবড়ো-খেবড়ো। চীনাদের মতো এখানকার লোকেদের পোশাকও মোটা, অমসৃণ; পার্থক্য একটাই এরা পশম আর টেকসই মোটা কাপড় ব্যবহার করে। এই রাজ্যের রাজা বৌদ্ধে ধর্মান্তরিত ব্যক্তি। এখানে প্রায় চার হাজার সন্ন্যাসী আছেন এবং সবাই হীনযান মতাবলম্বী।

রাজ্যের সাধারণ মানুষ এবং সাধু সন্তদের মধ্যে ভারতবর্ষের ধর্ম সর্বব্যাপী বর্তমান। কিন্তু তাদের অভ্যাসের ক্ষেত্রে রুক্ষতা ও পরিমার্জনার একটা প্রভেদ দেখা যায়। এ-অঞ্চল থেকে পশ্চিমে যত এগোনো যায়, যে-সব দেশ অতিক্রম করবে তা সবই প্রায় একরকম। প্রভেদ একটাই যে, টারটার উপভাষায় তারা কথা বলে তা সর্বত্র সমান নয়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীগণ সকলেই ভারতীয় পুথি অধ্যয়ন করেন, এবং ভারতীয় কথ্যভাষার চর্চা করেন। মাসাধিক কাল এখানে অতিবাহিত করার পর ফা-হিয়েন আর তাঁর সঙ্গীরা উত্তর-পশ্চিম দিক ধরে চলা শুরু করলেন। পনেরো দিন একটানা ভ্রমণের পর পোঁছলেন উ-ই নামের একটি দেশে। এই উ-ই প্রদেশের চার হাজারের অধিক সন্ন্যাসীগণ, সকলেই হীনযান মতাবলম্বী। ধর্মাচরণ যথাযথ পালন করা হত। চীন দেশ থেকে শ্রমণেরা যখন এখানে এসে পড়লেন, দেখা গেল এ-দেশীয় সন্নাসীদের আচার অনুষ্ঠানে তাঁরা খানিকটা অনভ্যস্ত। ফু সিং তাং ও কুঙ, সানের সুরক্ষা পেয়ে ফা-হিয়েন দুই মাসেরও কিছু বেশি সময় এখানে কাটিয়ে যান। এর পর তিনি পাও উন আর বাকি সঙ্গীদের কাছে ফিরে আসেন। এর পর সবাই মিলে এই সিদ্ধান্তে আসা গেল যে, এই প্রদেশের মানুষেরা নম্রতা, প্রতিবেশীর প্রতি কৃত্য এ-সবের কোনো চর্চা রাখে না। আগন্তুকের প্রতি এদের আচরণে বড়োই শীতলতা। পরবর্তীতে চি ইয়েন, হুই চিয়েন, এবং হুই ওয়েই ভ্রমণের উপাত্ত সংগ্রহের জন্য কাও চাং প্রদেশে ফিরে যান। তবে ফা-হিয়েন ও তাঁর দলের জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যেহেতু ফু আর কুঙ সান সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিলেন তাই তাঁরা অবিলম্বে দক্ষিণ-পূর্ব দিক ধরে যাত্রা আরম্ভ করলেন। জনশূন্য এ-প্রান্তর। স্থল বলো, আর জল, পথ কেবল দুর্গম। এ-পথের নির্মমতা তুলনা রহিত। এই রাস্তা পেরোতে যে-অসম্ভব কষ্ট তাঁরা ভোগ করেছিলেন তা উপমার অতীত। পথের নিষ্ঠুরতায় কেটে গেল এক মাস। তারও দিন পাঁচেক পর তাঁরা গিয়ে পৌঁছলেন উ টিয়েন।

তৃতীয় অধ্যায়

সমৃদ্ধশালী, সুখী দেশ। মানুষ সচ্ছল, শ্রীমন্ত। ধর্মবিশ্বাস তাঁদের কাছে স্বীকৃত, সকলেই বৌদ্ধ ধর্মে ধধর্মান্তরিত। ধর্মীয় সংগীতেই পরিতৃপ্তি খুঁজে পেত তারা। কয়েক হাজার সন্ন্যাসী, বেশিরভাগই মহাযান সম্প্রদায়ের। সকলের খাদ্যের যোগান আসত একটি সর্বজনীন তহবিল থেকে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসত করত মানুষ আর প্রত্যেক বাড়ির দরজার সামনে ছোটো প্যাগোডা তৈরি করত যার সবচেয়ে ছোটোটির উচ্চতা কুড়ি ফুট। পর্যটক শ্রমণদের জন্য ঘর তৈরি করে রাখত। যে-সব শ্রমণেরা তাদের অতিথি হয়ে আসত তাদের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব এই ঘরে রাখা থাকত। যারাই এসে পৌঁছত, সকলেই পেত আতিথ্য। দেশের রাজা, ফা-হিয়েন আর তাঁর সঙ্গীদের স্বাচ্ছন্দবাস স্থির হল চু মা টি নামক মঠে। মঠটি মহাযান সম্প্রদায়ের। বৌদ্ধ ঘণ্টার শব্দে তিন হাজার সন্ন্যাসী একত্রিত হলেন আহারের উদ্দেশ্যে। ভোজনকক্ষে প্রবেশ করলেন। তাঁদের আচরণ গভীর ও শিষ্টাচারপূর্ণ। সুবিন্যস্ত ক্রমান্বয়ে তাঁরা আসন গ্রহণ করলেন। এ-সবই হল নিঃশব্দে। আহারপাত্রে ঝংকার উঠল না কোনো, খাদ্যের জন্য সশব্দে ডাকলেন না কোনো পরিচারককে, কেবলমাত্র ইঙ্গিত করলেন হাত দিয়ে। হুই চিং, তাও চেং আর হুই তা কাশগরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল, কিন্তু ফা-হিয়েন আর অন্যেরা তিন মাস যাবৎকাল সেখানে রইলেন প্রতিমূর্তির শোভাযাত্রা দেখবার জন্য। ছোটোখাটো মঠগুলি বাদ দিলে এখানে বৃহৎ মঠের সংখ্যা তাও দাঁড়াবে গোটা চোদ্দোয়। পক্ষকাল অন্তর এ-সব মঠের সন্নাসীরা শহরের রাস্তায় জলছড়া দেন, ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করেন। এর পর মূল সড়কপথগুলিকে সাজিয়ে তোলেন। শহরে প্রবেশ দ্বারের উপর দিয়ে বিছিয়ে দেন অলংকৃত, সুদৃশ্য এক মস্ত শামিয়ানা। রাজা তাঁর রানঔফ এবং মহিষীদের নিয়ে এখানে বসত করেন কিছুকাল। চু মা টি মঠের সন্নাসীরা মহাযান সম্প্রদায়ের। আর রাজাও এই মহাযান তত্ত্বে গভীর শ্রদ্ধাবান। শোভাযাত্রার সূচনায় আছেন সন্নাসীগণ। শহর থেকে তিন চার লি দূরত্বে চতুঃচক্র বিশিষ্ট প্রতিকী যান তৈরি করা হত। তিরিশ ফুটের বেশি উচ্চতার এই যানটিকে দেখে মনে হত চলন্ত পটমণ্ডপ। সাতটি মূল্যবান দ্রব্যে খচিত এই সজ্জা, সোনা, রূপা, পান্না, স্ফটিক, চুনী, তৃণমণি, আর অকীক। চূড়ায় শোভা পাচ্ছে আন্দোলিত পতাকা আর কারুচিহ্নিত চন্দ্রাতপ। যানের একেবারে মধ্যভাগে স্থাপিত রয়েছে মূর্তি। সঙ্গী দুই সেবক বোধিসত্ত্ব। মূল বিগ্রহের পরেই রয়েছে বাকি উপদেবতাদের প্রতিমূর্তি। সোনা, রূপায় মণ্ডিত এই মূর্তিগুলি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে শূন্যে। শহরের প্রধান দ্বার থেকে বিগ্রহ যখন একশো কদম দূরে রাজা নামিয়ে রাখলেন রাজমুকুট, পরে নিলেন নতুন পোশাক। এর পর হাতে ফুল ও সুগন্ধি অর্ঘ্য সাজিয়ে খালি পায়ে চললেন প্রতিমা সন্দর্শনে। রাজ সেবকগণ রাজার অনুসারী হল। ফুল ছড়িয়ে, সুগন্ধি জ্বালিয়ে ভূমিতে আনত হলেন রাজা।

বিগ্রহ শহরে প্রবেশের মুখে রানি ও মহিষীগণ প্রবেশ দ্বারের উপর থেকে রংবেরঙের ফুল ছুড়তে থাকলেন দূর পর্যন্ত। যেন মেঘদল হতে বৃষ্টি হয়ে ঝরছে সে-ফুল। আর এভাবেই রচিত হচ্ছে পূজার অর্ঘ্য। প্রতিটি মঠের বিগ্রহযান ভিন্ন ভিন্ন। আর প্রত্যেকের জন্য ধার্য করা আছে আলাদা দিন। পক্ষকালের হিসেবে প্রথম চন্দ্রোদয়ের দিন থেকে শুরু হয় আর শেষ হয় চৌদ্দোতম দিনে। শোভাযাত্রার সম্পূর্ণ সমাপ্তি শেষে রাজা ও রানি ফিরে গেলেন তাদের রাজপ্রাসাদে। শহর ছাড়িয়ে সাত আট লি গেলেই পড়বে একটি মঠ। নাম তার ওয়াং সিন। আশিটি বৎসর আর তিন রাজার রাজত্ব ব্যায় হয়ে যায় এই মঠ নির্মাণে। দুইশো পঞ্চাশ ফুট উচ্চে খোদাই করে খচিত রয়েছে সোনা রূপা। এই সুউচ্চ নির্মাণের বিশালতাকে পরিপূর্ণ করেছে নানা রত্নের সমাহার। উচ্চ মিনারের পিছনেই আছে চমৎকার সজ্জিত একটি উপাসনা গৃহ।

কড়িবরগা, থাম, দরজা, জানালা সকলই স্বর্ণে মোড়া। আর আছে শ্রমণদের থাকার ঘর। সে-সবের সজ্জা ভাষার অতীত। পর্বতের পুব প্রান্তের ছয়টি রাজ্যের রাজা তাঁদের মূল্যবান মণিরত্নময় অর্ঘ্য দান করেন এই মঠে।

চিত্রঋণ: গুগল

Categories
অনুবাদ সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

দেবোরা: কেন আপনি রাজি হলেন?
মুরাকামি: তারা আমাকে বলেছিলেন যে আমি ইচ্ছামতো রেকর্ড বেছে নিতে পারি। এবং পঞ্চাশ মিনিট ধরে আমার পছন্দসই কথাবার্তা বলতে পারি। তো আমি ভাবলাম, কেন নয়! বিলি হলিডে থেকে ‘মারুন ৫’ পর্যন্ত সবকিছু থেকে আমি খুব বাছাই সংগীত পরিবেশন করি।

দেবোরা: মনে হয় আপনি একবার বলেছিলেন যে, জাপানে লেখক হওয়া খুব চটকদারি ব্যাপার। ভীষণ প্রকাশ্য জীবিকার প্রেক্ষাপটে আপনি নিজের সাধারণত্বে অবিচল থাকেন। এগুলো আপনি মেলান কীভাবে?

মুরাকামি: সত্যি বলতে শুরুর দিকে জাপানের সাহিত্য জগৎ সম্পর্কে আমি খুব একটা খুশি ছিলাম না। আমি ছিলাম একজন বহিরাগত। একটি কালো মেষ, মূলধারার জাপানি সাহিত্যে অনুপ্রবেশকারী। কিছু লোক বলেছিল যে, আমি জাপানি সাহিত্যে নতুন কণ্ঠ। এবং কিছু লোক আমাকে বাজে বলেছিল। তাই আমি একরকম বিভ্রান্ত ও বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। আমি জানতাম না কী হচ্ছে। আমি ‘ওয়ান্ডারল্যান্ডে এলিস’ এর মতো হয়ে পড়েছিলাম। তাই আমি জাপান থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে গেলাম। ইতালি এবং গ্রিসে গিয়ে দুই-তিন বছর কাটালাম। তারপর আমি লিখলাম ‘নরওয়েজিয়ান উড’। জাপানিরা বইটিকে ঘৃণা করেছিল।

দেবোরা: এটা দুই মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল!

মুরাকামি: এত বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও লোকে আমাকে ঘৃণা করেছিল। তাই আবার আমি বিদেশে চলে গেলাম। আমি নিউ জার্সির প্রিন্সটনে গিয়ে উঠেছিলাম। জায়গাটি ছিল বিরক্তিকর। সুন্দর, তবে বিরক্তিকর। তারপরে বোস্টনের টাফট্‌স ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। সেখানকার ফেনওয়ে পার্কটি ভালো ছিল।

দেবোরা: ভূমিকম্প এবং সারিন গ্যাস আক্রমণের পরে আপনি কি আবার জাপানে ফিরে যাওয়ার মন স্থির করলেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। ১৯৯৫ সালে আমি অনুভব করি নিজের দেশে ফিরে এসে মানুষের জন্য কিছু করতে পারি কিনা। দেশের জন্য নয়, জাতির জন্য নয়, সমাজের জন্য নয়, আমার বিশ্বাস ছিল জনগণের প্রতি।

দেবোরা: আপনার কাছে দেশ ও জনগণ, এই দু-টি জিনিসের মধ্যে পার্থক্য কী?

মুরাকামি: মানুষ আমার বই কেনে, দেশ না।

দেবোরা: আপনি কি জাপানি হিসেবে আপনার লেখালেখিকে বিচার করেন না পশ্চিমা সাহিত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন?

মুরাকামি: আমি সেভাবে ভাবি না। আমার গল্প আমারই। এগুলো কোনো বিভাগের বিষয় নয়। তবে আমি জাপানি ভাষায় লিখি এবং আমার চরিত্রগুলো বেশিরভাগই জাপানি। তাই আমি মনে করি আমি একজন জাপানি লেখক। আমি মনে করি আমার লেখার শৈলী অন্যত্র থেকে নেওয়া নয়।

দেবোরা: জাপানে আপনার প্রথম দিকের পাঠকেরা বেশিরভাগই তরুণ ছিলেন। তরুণদের মধ্যে আপনার বিরাট প্রভাব ছিল।

মুরাকামি: হ্যাঁ। এটা খুবই অদ্ভুত। আমি যখন লিখতে শুরু করি আমার পাঠকেরা বিশ বা তিরিশের কোঠায় ছিলেন। এবং চল্লিশ বছর পরে আমার পাঠকেরা বিশ বা তিরিশের কোঠাতেই থেকে গেলেন! ভালো কথা হল আমার প্রথম প্রজন্মের কিছু অনুরাগী এখনও আমার বইগুলি পড়ছেন এবং তাদের ছেলেমেয়েরাও সেগুলি পড়ছে। একই পরিবারের তিন-চারজন একই বই পড়ছেন শুনে আমি খুব আনন্দিত হলাম। আমার এক বন্ধু তার অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের সাথে এমনিতে কথা খুবই কম বলে। কিন্তু জেনে খুব ভালো লেগেছে যে, তারা যখন কথা বলে তখন বিষয় থাকে আমার বই।

দেবোরা: ‘কিলিং কমেন্ডটর’ থেকে থেকে একটা দৃশ্য আমি উদ্ধৃত করতে চাই:

কমেন্ডেটর নিজ হাতের তালু দিয়ে দাড়ি ঘষতে লাগলেন যেন কিছু মনে পড়েছে। “ফ্রানজ কাফকা ঢালু স্থান বেশ পছন্দ করতেন”, সে বলল, “সবধরনের ঢালু স্থান তাকে আকৃষ্ট করত। ঢালের মাঝখানে নির্মিত বাড়িগুলির দিকে চেয়ে থাকতে তিনি পছন্দ করতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার পাশে বসে তিনি ওই বাড়িগুলি দেখতেন। কখনোই এতে ক্লান্ত হয়ে উঠতেন না। প্রথমে মাথাটি একদিকে ঝুঁকিয়ে তিনি বসতেন পরে আবার সোজা করে নিতেন। অদ্ভুত মানুষের মতো ছিল তাঁর আচরণ। আপনি কি এটা জানতেন?” ফ্রানজ কাফকা এবং ঢালু স্থান? “না। আমি জানি না”। আমি বললাম। আমি এরকম কখনো শুনিনি। “তবে এটা জানার পর কি কেউ তাঁর কাজের আরো বেশি প্রশংসা করে?”

দেবোরা: উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা যদি আপনার কৌশল জানি যে আপনি ঢালু স্থানের দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করেন, এতে কি আপনার কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে আমাদের সাহায্য করবে?

মুরাকামি: ফ্রানজ কাফকা ঢালু জায়গা পছন্দ করতেন, এটি মিথ্যা। এটি আমার তৈরি করা। তবে এটা করে কি ভালো করলাম? খুব সম্ভবত ফ্রানজ কাফকা ঢালু জায়গা পছন্দ করতেন।

দেবোরা: এটা সম্ভব।

মুরাকামি: কিছু লোক এই উদ্ধৃতি দেয়। তবে আমি এটি তৈরি করেছিলাম। আমি অনেক কিছুই তৈরি করেছি।

দেবোরা: কল্পকাহিনিতে আপনি এটা তৈরি করতেই পারেন। যদি আমরা জানতে পারি যে আপনি বিড়াল ভালোবাসেন, এটা কি আমাদের আপনার কাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে?

মুরাকামি: আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন।

দেবোরা: তিনি আপনাকে চেনেন বলে কি আপনার কাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন?

মুরাকামি: আমি জানি না। সে বলে আমি তাঁর প্রিয় লেখক নই। তবে সে সবসময় আমার কাজকে খুব গুরুত্বের সাথে সমালোচনা করে। সে আমার প্রথম পাঠক। সুতরাং আমি যখন লেখা শেষ করে পাণ্ডুলিপিটা তাকে পাঠাই সে পড়ে এবং দু-শো ত্রুটি-সহ ফিরিয়ে দেয়। এই ত্রুটিগুলো আমি খুব অপছন্দ করি। সে বলে, “তোমার এই অংশগুলো পুনরায় লেখা উচিত!”

দেবোরা: তখন আপনি আবার লেখেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। তারপরে সেটা আবার তার কাছে পাঠিয়ে দিই। এবার সে একশোটি ত্রুটি-সহ পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দেয়। আগের থেকে কম ত্রুটি থাকে বলে ভালো লাগে।

প্রথম পাতা

Categories
অনুবাদ সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

দেবোরা: আপনি যখন অনুবাদ করেন, আপনাকে অন্য লেখকদের কণ্ঠস্বর গ্রহণ করতে হয়। আপনাকে এক অর্থে ফিটসগেরাল্ড, চ্যান্ডলার বা শেভার হতে হয়। আপনি যখন নিজের একটি স্টাইল আয়ত্ত করে ফেলেছেন তখন কি এটি একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

মুরাকামি: হ্যাঁ। আমি স্কট ফিটসগারেল্ডকে ভালোবাসি। তাঁর অনেকগুলি বই অনুবাদ করেছি। তবে তাঁর শৈলী আমার থেকে অনেকটাই আলাদা, সুন্দর এবং জটিল। তবুও আমি তাঁর লেখা থেকে অনেক কিছু শিখেছি— তাঁর মনোভাব, বিশ্বজগতের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। রেমন্ড কার্ভারের শৈলী এবং তাঁর লেখার জগৎ আমার থেকে অনেক আলাদা। তবে আমি তাঁর থেকেও শিখেছি।

দেবোরা: জন শেভারের লেখা বর্তমানে আপনি অনুবাদ করছেন। কেন শেভার?

মুরাকামি: কেন শেভার? আমি বহু বছর ধরে তাঁর ছোটোগল্পগুলি আনন্দের সঙ্গে পড়ে আসছি। তবে শেভার জাপানে জনপ্রিয় নন। এখানে খুব কম লোকই তাঁর লেখা পড়েছে। কারণ, তাঁর শৈলী ভীষণ আমেরিকাপন্থী। আমার ধারণা, উনিশশো পঞ্চাশের দশক এবং এর মাঝামাঝি সময় আর মধ্যবিত্ত শ্রেণিই শুধু তাঁর লেখার উপজীব্য। আমি মনে করি না বেশি জাপানি পাঠক তাঁর লেখা পছন্দ করবে। তবে লেখাগুলো আমি খুবই ভালোবাসি। তাই এটি একধরনের চ্যালেঞ্জ।

দেবোরা: আপনি অন্য লেখকদের থেকে যা যা শেখেন সেগুলি আপনার লেখায় প্রবেশ করলে আপনি বুঝতে পারেন?

মুরাকামি: আমার মনে হয় একটু প্রভাব তো আছেই। আমি যখন লিখতে শুরু করি আমার কোনো পরামর্শদাতা ছিল না। আমার কোনো শিক্ষক ছিল না। আমার কোনো সাহিত্যিক বন্ধু ছিল না। আমার শুধু আমি ছিলাম। তাই আমাকে বই থেকে অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। ছোটোবেলায় আমি বই পড়তে পছন্দ করতাম। বাড়িতে আমি একমাত্র সন্তান ছিলাম। আমার কোনো ভাই বা বোন ছিল না। অবশ্যই আমার কাছে বই এবং বিড়াল ছিল। সংগীত তো অবশ্যই ছিল। আমি খেলাধুলা পছন্দ করতাম না, পড়তে পছন্দ করতাম। কৈশোর বয়সে আমি রাশিয়ান উপন্যাস পড়ি। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয় আমার প্রিয় ছিল। আর এদের বইগুলি থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এমন অনেক সহপাঠী ছিল যারা লেখক হতে চেয়েছিল। তবে আমি বিশ্বাস করতাম না যে, আমার প্রতিভা আছে। তাই আমি একটি জ্যাজ ক্লাব খুলি আর সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি।

দেবোরা: আপনি নিজে কখনো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছিলেন?

মুরাকামি: ছোটোবেলায় আমি পিয়ানো বাজাতাম। তবে এতে আমার বিশেষ প্রতিভা ছিল না। আমার বয়স যখন পনেরো বছর তখন আর্ট ব্লেকি এবং জ্যাজ মাসেঞ্জাররা জাপানে এসেছিলেন। সেই কনসার্টে আমি গিয়েছিলাম। এর আগে আমি জানতাম না, জ্যাজ কী, তবে সেই রাত থেকেই আমি একজন উৎসাহী জ্যাজ ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। আমি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে রেকর্ড সংগ্রহ করে গেছি। আমার স্ত্রী সবসময় অভিযোগ করত। আমার বাড়িতে কত যে জ্যাজ রেকর্ড রয়েছে! তবে আমি লেখার বিষয়ে সংগীত থেকেও অনেক কিছু শিখেছি। আমি মনে করি এতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে, ছন্দ, সাংগীতিক ঐকতান আর তাৎক্ষণিক উন্নতিকরণ। আমি সাহিত্য থেকে নয়, সংগীত থেকে এই জিনিসগুলি শিখেছি। এবং যখন আমি লিখতে শুরু করি তখন ভাবটা এমন থাকে যেন আমি গান বাজনা করি।

দেবোরা: আপনার মা-বাবা দু-জনেই সাহিত্যের শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁরা কি আপনার লেখার সিদ্ধান্ত বিষয়ে খুশি হয়েছিলেন? তাঁরা কি আপনাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে বলেছিলেন?

মুরাকামি: তা আমি মনে করি না। আমি জানি না তারা আমার কাছ থেকে কী আশা করেছিল।

দেবোরা: শেষবার আমরা যখন কথা বলেছিলাম আপনি বলেছিলেন, ৯/১১ বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। কেবল আসল পৃথিবীকেই নয়, আপনি যে পৃথিবী নিয়ে লিখতে চান সেখানেও এই সংকটগুলি প্রভাব ফেলেছিল মনে হয়। আপনি কি মনে করেন যে, জাপানের সুনামি এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের মতো ঘটনাগুলি আপনার কল্পকাহিনিগুলোকে বদলে দিয়েছে?

মুরাকামি: হ্যাঁ। ১৯৯৯ সালে কোবে ভূমিকম্পের পর আমি ‘আফটার কোয়েক’ নামে ছোটোগল্পের একটি সংকলন লিখেছিলাম। আমার মা-বাবার ঘর-সহ পুরো কোবে শহরটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন ম্যাসাচুসেটসে ছিলাম। তারপর চার বছর কাটিয়েছি যুক্তরাজ্যে। বলতে গেলে তখন আমি একপ্রকার প্রবাসীই হয়ে পড়েছিলাম। তবে টিভিতে দেখেছিলাম দৃশ্যগুলো। ঔপন্যাসিক হিসেবে তখন আমি ভাবছিলাম, এই ভূমিকম্প বিষয়ে আমি কী করতে পারতে পারি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যা করতে পারি তা হল ভূমিকম্পের সময়টায় ঠিক কী হয়েছিল তা শুধু কল্পনা করতে। তাই এটা আমার কাছে কল্পনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি যখন কোনো উপন্যাস লিখি তখন গবেষণা করি না। কারণ, কল্পনা আমার সম্পদ, আমার উপহার। আমি এটি পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাই। ওই একই বছর, এর দুই মাস পরে টোকিওর একটি পাতাল রেল ট্রেনে সারিন-গ্যাস দ্বারা আক্রমণ হয়েছিল। আমি তখন জাপানে ছিলাম না। আমি খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনে এই বিষয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি যা পড়তে চেয়েছিলাম তা ওই লেখায় পাইনি। আমি জানতে চেয়েছিলাম সত্যি কী ঘটেছিল সেদিন ওই ট্রেনে। ভরতি ট্রেনে গ্যাসের গন্ধ নেওয়ার মতো বাস্তব অবস্থাটা আমি জানতে চেয়েছিলাম। তাই আমি নিজের মতো এই জিনিসগুলি খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি সারিন-গ্যাসে ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি এবং তাদের প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছি আসল ঘটনা। তারা আমাকে বলে আসলে কী ঘটেছিল। আমি এই বিষয়গুলি নিয়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ নামে একটি প্রবন্ধধর্মী বই প্রকাশ করি। অন্য কেউ এটা করেনি বলে আমাকেই এটা করতে হয়েছে। তাছাড়া আমার নিজস্ব জিজ্ঞাস্য আর কৌতূহলও ছিল। এই সাক্ষাৎকারগুলি নিতে আমার একবছর সময় লেগেছিল। আমি মনে করি ওই একবছর আমাকে বদলে দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাটা ছিল দারুণ। সেই একবছর আমি কিছুই লিখিনি। আমি কেবল সেই কণ্ঠস্বরগুলো শুনেছি। সেগুলি এখনও আমার মনের মধ্যে আছে। আমি সেই শুদ্ধ স্বরগুলোকে বিশ্বাস করি। ট্রেনে চড়া মানুষগুলো ছিল সাধারণ মানুষ। তারা টোকিয়োর এক সকালে ট্রেনে চড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই কেউ সারিন গ্যাসে ভরতি প্লাস্টিকের ড্রাম দ্বারা আক্রমণ করে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা যায়। পরিস্থিতি ছিল এমনই অতিবাস্তবিক। তবে তাদের কণ্ঠস্বর ছিল সাধারণ। আউম শিনরিকো সম্প্রদায়ের মানুষেরা (যারা আক্রমণ করেছিল) সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাঁরা হয়তো এর মাধ্যমে একরকম সত্য বা পরম সত্যের সন্ধান করছিলেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তরা সাধারণ যাত্রী ছিলেন। আমি শিনরিকো সম্প্রদায়ের মানুষদেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁদের কথা আমার মনে ধরেনি।

দেবোরা: গ্যাস আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় আপনি কঠিন সত্যের খোঁজ করেছিলেন, কিন্তু ভূমিকম্পের কথা বলতে গিয়ে আপনি কেন আংশিক কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন?

মুরাকামি: কারণ, কোবে আমার নিজের শহর এবং ঘটনাটা খুবই বেদনার। সেখানে আমার অনেক বন্ধু আছে। আমি যদি এই লোকগুলির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতাম তবে আমি খুব হতাশ হয়ে পড়তাম। কিন্তু কাহিনিতে আমি আমার নিজস্ব জগৎ তৈরি করতে পারি। তাই এটি আমার পক্ষে সহজতর ছিল। সহিংসতা আপনার মন আর শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছুর বিনাশ হয়ে যেতে পারে এর ফলে। ভূমিকম্পের আগে আমরা ভেবেছিলাম ভূমিস্তর খুব শক্তপোক্ত। কিন্তু এখন আর তা নেই। এটা হয়ে উঠতে পারে অস্থির, অনির্দিষ্ট, নরম। আমি হয়তো এটাই লিখতে চেয়েছিলাম।

এরপর ৯/১১, সুনামি-সহ আরও অনেক বিপর্যয় ঘটেছিল। আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বিপর্যস্ত মানুষগুলির জন্য আমি কী করতে পারি। উত্তরটা এইরকম যে, আমি শুধু পারি ভালো সাহিত্য রচনা করতে। কারণ, আমি যখন একটি ভালো গল্প লিখি তখন আমরা একে অন্যকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। আপনি যদি পাঠক হন আমি একজন লেখক। আমি আপনাকে চিনি না। তবে সাহিত্যের অন্তর্জগতে আমাদের মধ্যে এক গোপন যোগাযোগের পথ রয়েছে। আমরা অবচেতন পথে একজন অন্যকে বার্তা পাঠাতে পারি। এইভাবে আমি মনে করি অবদান রাখতে পারি।

দেবোরা: আপনি লেখার মাধ্যমে বার্তা পাঠান। কিন্তু আপনি নিজে বার্তা ফিরে পান কী করে?

মুরাকামি: আমি জানি না। একটি উপায় হয়তো আমরা বের করতে পারব।

দেবোরা: ‘কাফকা অন দ্য শোর’ উপন্যাসটি প্রকাশের পর আপনার ওয়েবসাইটে বইটি সম্পর্কে পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। আপনি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছিলেন। আপনি কেন এটা করলেন? শুধু এই বই নিয়ে কেন?

মুরাকামি: আমি পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে উৎসুক ছিলাম (২০১৫ সালেও এইরকম করেছিলাম)। সীমিত সময়ের জন্য ছিল এই ব্যবস্থা। তবে আমি অনেকগুলো মেইল পেয়েছিলাম। আমার মনে নেই কতগুলো। ত্রিশ হাজার হবে সম্ভবত। তবে আমি সেগুলো পড়েছি এবং চোখের ক্ষতি করেছি। আমি সম্ভবত তিন হাজারের উত্তর দিয়েছি। খুব পরিশ্রমের ছিল ব্যাপারটা। তবে আমার মনে হয় আমি এটা জানতে পেরেছি যে, কী ধরনের পাঠক আমার বই পড়ছে। এবং আমার লেখা সম্পর্কে তারা কী ভাবছে সে সম্পর্কে আমি একটা অস্পষ্ট ধারণা পেয়েছি। তাদের মধ্যে কিছু বোকা বোকা প্রশ্নও ছিল। একজন আমাকে স্কুইডের কর্ষিকা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। স্কুইডের দশটি কর্ষিকা রয়েছে এবং সে জানতে চেয়েছিল তাদের হাত পা আছে কিনা। তিনি কেন সে এইরকম প্রশ্ন করলেন? আমি উত্তর দিয়েছিলাম এইভাবে: স্কুইডের বিছানার পাশে আপনি দশটা গ্লাভ অথবা দশটা মোজা রেখে দিন। সে যখন জেগে উঠবে তখন হয় গ্লাভ নয়তো মোজা বেছে নেবে। এইভাবে আপনি আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন। আমি অবশ্য জানি না স্কুইড বিছানায় ঘুমায় কিনা। তবে আমি বেশিরভাগ প্রশ্নই উপভোগ করেছিলাম।

দেবোরা: এটা ছিল পাঠকদের সংস্পর্শে থাকার একটা উপায়। আমি জানি যে আপনি জাপানে কোনো অনুষ্ঠান বা সেখানে কথাবার্তা বলতে পছন্দ করেন না। কেন এমন?

মুরাকামি: আমি একজন লেখক। এবং আমার কাছে লেখাই একমাত্র কাজ। আমি একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, লেখালেখি ছাড়া আমি আর কিছুই করব না। তবে সম্প্রতি আমি ডিস্ক-জকির কাজ করছি। টোকিয়োর একটি এফএম রেডিয়ো স্টেশন থেকে আমাকে ডিস্ক-জকির কাজ করতে বলা হয়েছিল। আমি এখন ওই কাজটি করছি।

শেষ পাতা

Categories
অনুবাদ সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

দেবোরা: আপনি বলেছেন যে আপনার প্রথম বই দু-টি লেখা খুব সহজ ছিল। তারপর লেখা কঠিন হয়ে পড়ে। আপনি কীরকম সমস্যার সম্মুখীন হন?

মুরাকামি: আমার প্রথম দুটো বই ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’, ‘পিনবল ১৯৭৩’ লিখতে আমার সহজ মনে হয়েছিল। কিন্তু বইগুলো নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। এ-দুটো লেখার পর আমি উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠি। তারপর আমি লিখেছিলাম, ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’, আমার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের উপন্যাস (অন্য দু-টি উপন্যাসিকার মতো ছিল)। এটি লিখতে আমার তিন-চার বছরের মতো সময় লেগেছিল। আমার ধারণা, ওই প্রস্রবনের জন্য আমাকে সত্যি একটা গর্ত খুঁড়তে হয়েছিল। সুতরাং, আমি মনে করি ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ আমার কেরিয়ারের প্রকৃত সূচনাবিন্দু ছিল। প্রথম তিন বছর আমি জ্যাজ ক্লাবের মালিক হিসেবে কাজ করার সময় লিখেছিলাম। রাত দুটোয় ক্লাবের কাজ শেষ করে রান্না ঘরের টেবিলে লিখতে বসে যেতাম। এটা ছিল আমার পক্ষে খুব কষ্টের। প্রথম দুটো বইয়ের পর আমি সিদ্ধান্ত নেই যে ক্লাব বিক্রি করে দেব এবং পূর্ণ সময়ের লেখক হব। কিন্তু ক্লাবটি তখন ভালোই চলছিল এবং সবাই আমাকে ওটা বিক্রি করতে বারণ করেছিল। তারপরে আমি লিখতে পারলাম ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’। আমি এই ধরনের একটি বড়ো বই লিখতে চেয়েছিলাম।

দেবোরা: বড়ো বই লেখা সহজ ছিল, না আরও চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে উঠেছিল?

মুরাকামি: আমি যখন ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ লিখছিলাম তখন আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। কারণ, আমি জানতাম না যে এর পরে কী ঘটবে। পরবর্তী ঘটনা জানার জন্য আমি পরের দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম না। আমি পরের পৃষ্ঠাগুলি ওলটাতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরে কোনো পৃষ্ঠা ছিল না, তাদেরকে আমায় লিখতে হয়েছিল।

দেবোরা: আপনার কি এমন কখনো হয়েছে যে, পরে কী ঘটবে তা আপনার অজানা ছিল এবং সেদিন আর লিখতে পারেননি?

মুরাকামি: আমি কখনো রাইটার্স ব্লক অনুভব করিনি। একবার আমি ডেস্কে বসতে পারলে জানি যে পরে কী ঘটবে। আমি লিখতে না চাইলে লিখি না। পত্রিকা সবসময় আমাকে কিছু না কিছু লিখতে বলে এবং আমি প্রতিবারই ‘না’ বলে দেই। আমি যখন লিখতে চাই তখনই লিখি।

দেবোরা: আপনি কি মনে করেন আপনার ঘুমের মধ্যেও প্লটগুলি সক্রিয় থাকে?

মুরাকামি: না, এটা মনে করি না। আমি স্বপ্ন দেখি না। গল্প লেখা আর স্বপ্ন দেখা আলাদা জিনিস। আর আমার কাছে লেখা স্বপ্ন দেখার মতোই। আমি যখন লিখি তখন ইচ্ছা করে স্বপ্ন দেখতে পারি। শুরু করতে পারি আবার থামতেও পারি। এমনকী পরের দিনও সেটা চালিয়ে নিতে পারি। আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হয়তো একটি ভালো মাংসের খাবার, একটি ভালো বিয়ার বা একটি সুন্দর মেয়ের স্বপ্ন দেখেন এবং যখন জেগে ওঠেন তখন সব শেষ হয়ে যায়। আমি কিন্তু পরের দিন সেটা চালিয়ে নিতে পারি।

দেবোরা: কয়েক বছর আগে আপনি বলেছিলেন যে, আপনি যখন কোনো উপন্যাস লেখেন তখন কিছু ধারণা বা বাক্যাংশের একটি তালিকা তৈরি করে নেন, যেমন, ‘কথাবলা বানর’ বা ‘সিঁড়িতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া লোক’ প্রভৃতি। আপনি যখন লিখতে বসেন, আপনি বলেছিলেন “প্রতিটা গল্পে অবশ্যই এই তালিকা থেকে দুই বা তিনটি জিনিস থাকতে হবে”। আপনি কি প্রায়শই এভাবে কাজ লেখালেখি করেন?

মুরাকামি: আমি তখন এক সময়ে ছয়টি গল্প লিখেছিলাম। তাই ওই লেখাগুলির সাহায্য নিতে হয়েছিল। উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটা দরকার হয় না। আমার চেষ্টা থাকে প্রতিবার নতুন কিছু করা। আমার বেশিরভাগ বই আমি প্রথম পুরুষে লিখেছিলাম। ‘১৯৮৪’ (1Q84)-তে আমি তিনটি চরিত্র প্রথম পুরুষে লিখেছি। এটা আমার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রায়শই আমার গল্পের কথক প্রধান চরিত্রটি এমন একজন ব্যক্তিতে পরিণত হয় যে কিনা আমি হতে পারতাম। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সেটা হয় না। পরিবর্তে পরিণত হয় আমার একধরনের বিকল্পে। অবশ্যই বাস্তবে আমি নিজে অন্য মানুষে পরিণত হতে পারি না। তবে সাহিত্যে আমি যে কেউ হতে পারি। আমি অন্যের জুতোতে পা রাখতে পারি। একে একধরনের থেরাপি বলতে পারেন। আপনি যদি লিখতে পারেন তবে আপনার মধ্যে এমন এক সম্ভাবনা তৈরি হবে যে আপনি স্থির থাকতে পারবেন না, অন্য যে-কেউ হয়ে যেতে পারেন।

দেবোরা: আপনি যখন লিখতে শুরু করেছিলেন সেই একই সময়ে আপনি দৌড়ানোও শুরু করেন। আমি জানি কিছু মানুষ চলতে চলতে আপন মনে লিখতে পছন্দ করেন। হাঁটার ছন্দ তাদের এই কাজে সাহায্য করে। আপনি দৌড়ানোর সময় কখনো লেখার কথা ভেবেছেন?

মুরাকামি: একদম না। আমি দৌড়ানোর সময় শুধু দৌড়াই। তখন আমি মনকে খালি রাখি। দৌড়ানোর সময় আমি কী ভাবি সেই সম্পর্কে আমার কোনো পরিকল্পনা থাকে না। হয়তো কিছুই ভাবি না। তবে আপনি অবশ্যই জানেন যে দীর্ঘ সময় ধরে লিখতে গেলে আপনাকে দৃঢ় হতে হবে। একটি বই লিখে ফেলা এমনিতে কঠিন নয়, তবে অনেক বছর ধরে লেখা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আপনার একাগ্রতা আর সহনশীলতার শক্তি প্রয়োজন। আমি মাঝে মাঝে খুব আস্বাস্থ্যকর আর অদ্ভুত জিনিস লিখি। আমি মনে করি আপনি অস্বাস্থ্যকর জিনিস লিখতে চাইলে আপনাকে খুব স্বাস্থ্যবান হতে হবে। এটি একটি প্যারাডক্স, তবে সত্যি। বোদল্যেরের মতো কিছু লেখক খুব অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেছিলেন। তবে আমার মতে সেই দিন আর নেই। এখনকার বিশ্ব খুব কঠোর আর জটিল। এগুলো কাটিয়ে উঠে বেঁচে থাকতে হলে আপনাকে শক্তপোক্ত হতে হবে। আমি যখন তিরিশ বছর বয়সী তখন আমি লেখা শুরু করেছি। আমার যখন বত্রিশ বা তেত্রিশ বছর বয়স তখন দৌড়তে শুরু করি। আমি প্রতিদিন দৌড়ানো শুরু করলাম। কারণ, এর ফলে কী হয় তা আমি দেখতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয় জীবন একধরনের পরীক্ষাগার, যেখানে আপনি যা কিছু করতে পারেন। এবং শেষ পর্যন্ত এটি আমার পক্ষে লাভদায়ক হয়ে উঠেছিল। আমার শরীর এতে দৃঢ় হয়ে উঠেছিল।

দেবোরা: লেখা দৌড়ানোর মতো একটি নির্জন সাধনা। আপনি একটি জ্যাজ ক্লাবের মালিকের জীবন থেকে লেখায় চলে এসেছিলেন। সেখানে সবসময় আপনার চারপাশে লোকেরা ভিড় করে থাকত। কিন্তু তারপর লেখা আর পড়াশুনায় একদম একা হয়ে থাকতে কি আপনার ভালো লাগত?

মুরাকামি: আমি খুব একটা সামাজিক জীব নই। আমি প্রচুর রেকর্ড এবং সম্ভবত বিড়ালদের সাথে শান্ত জায়গায় একা থাকতে চাই। আর বেসবল খেলা দেখার জন্য কেবল টিভি। ব্যাস, আমি এইটুকুই চাই।

দেবোরা: আপনি একবার বলেছিলেন যে, আপনার জীবনের স্বপ্ন ছিল কূপের তলদেশে বসা। আপনার বেশ কয়েকটি চরিত্র ঠিক তেমনটি করেছে। ‘কিলিং কমেন্ডেটোর’-এ মেনশিকিও এমন করেছে। কেন?

মুরাকামি: আমি কূপ খুব পছন্দ করি। আমি ফ্রিজ, হাতি এমন অনেক জিনিস পছন্দ করি। আমি যা পছন্দ করি সে-সম্পর্কে লিখে খুব আনন্দ পাই। আমি যখন ছোটো ছিলাম তখন আমাদের বাড়িতে একটি কূপ ছিল এবং আমি সবসময় সেই কূপটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তাতে আমার কল্পনাশক্তি বেড়ে গিয়েছিল। শুকনো কূপে পড়ে যাওয়া নিয়ে রেমন্ড কার্ভারের একটি ছোটোগল্প আছে। আমি সেই গল্পটি খুব পছন্দ করি।

দেবোরা: আপনি কখনো কোনো কূপের নীচে যাবার চেষ্টা করেছেন?

মুরাকামি: না না। এটা বিপজ্জনক। এটা আমার কল্পনায় ঘটে। তবে আমি গুহাও পছন্দ করি। আমি যখন বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ করি, তখন যদি কোনো গুহা দেখি আমি তার মধ্যে প্রবেশ করি। উঁচু স্থান আমার পছন্দ হয় না।

দেবোরা: আপনি উপরে না উঠে নীচে যেতে চান?

মুরাকামি: কেউ বলে এটা অবচেতন মনের একধরনের রূপক। তবে আমি ভূ-গর্ভস্থ বিশ্ব সম্পর্কে খুবই আগ্রহী।

দেবোরা: কয়েক বছর আগে প্যারিস রিভিউ সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন যে, আপনার গল্পের চালিকাশক্তি হল “হারিয়ে যাওয়া এবং অনুসন্ধান এবং খুঁজতে থাকা”। আপনি কি এখনও এতে বিশ্বাস করেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। হারানো কিছুর সন্ধান করা আমার সাহিত্যের খুব গুরুত্বপূর্ণ থিম। আমার চরিত্রগুলো প্রায়শই হারিয়ে গেছে এমন কিছুর সন্ধান করে থাকে। কখনো একটি মেয়ে, কখনো একটি কারণ, কখনো বা এটি একটি উদ্দেশ্য। কিন্তু তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু খোঁজে, যা হারিয়ে গিয়েছিল। তবে সেটা খুঁজে পেলে একরকম হতাশা সৃষ্টি হবে। কেন তা আমি জানি না, তবে কোনো কিছুর অনুসন্ধান আমার গল্পের একধরনের মোটিফ। যদিও এটা কোনো আনন্দদায়ক সমাপ্তি নয়।

দেবোরা: প্রায়শই আপনি যে-পুরুষদের সম্পর্কে লেখেন তারা আবেগগতভাবে বা অস্তিত্বহীন হয়ে কোনোরকমভাবে হারিয়ে যায়। এগুলো পৃথিবীতে খুব একটা হয় বলে মনে হয় না।

মুরাকামি: আপনি অবশ্যই জানেন যে, গল্পের মূল চরিত্র যদি সুখী হয় তবে কোনো গল্প তৈরির সম্ভাবনা থাকে না।

দেবোরা: আপনার উপন্যাসগুলি সাধারণত একটি রহস্যের চারদিকে ঘোরে। কখনো আপনি সেই রহস্যটি সমাধান করেন এবং কখনো সমাধান না করে ছেড়ে দেন। আপনি কি পাঠকদের জন্য বিষয়গুলি উন্মুক্ত রাখতে চান, না আপনি নিজে সমাধান বিষয়ে নিশ্চিত থাকেন না?

মুরাকামি: আমি যখন কোনো বই প্রকাশ করি মাঝে মাঝে আমার বন্ধুরা ফোন করে জিজ্ঞাসা করে, “এর পরে কী হবে?” আমি বলি, “এখানেই শেষ”। তবে পাঠকেরা এর সিক্যুয়েল আশা করে। ‘১৯৮৪’ (1Q84) প্রকাশিত হবার পর গল্পের পরবর্তীতে কী ঘটবে তার সমস্ত কিছুই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আমি একটি সিক্যুয়েল লিখতে পারতাম কিন্তু লিখিনি। আমি ভেবেছিলাম এটি ‘জুরাসিক পার্ক ৪’ বা ‘ডাই হার্ড ৮’-এর মতো হতে পারে। তাই আমি সেই গল্পটি কেবল আমার মনের মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম এবং এটি আমি খুব উপভোগ করেছি।

দেবোরা: আপনি কি মনে করেন সেটা কখনো লিখবেন?

মুরাকামি: আমি তা মনে করি না। আমি শুধু জানি এটি আমার মনের মধ্যে থাকবে। তেঙ্গোর ষোলো বছরের মেয়ে সিক্যুয়েলের মূল চরিত্র হবে, এটি খুব আকর্ষণীয় গল্প।

দেবোরা: তারপরেও এটা কোনো ‘ডাই হার্ড ৮’ নয়!

মুরাকামি: এবং সেই বইয়ের একটি প্রিক্যুয়েল রয়েছে।

দেবোরা: শুধু আপনার মনের মধ্যে?

মুরাকামি: হ্যাঁ।

দেবোরা: কিছু লেখক প্রতিটি বইয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। এবং কিছু লেখক যে পদ্ধতি তার পক্ষে সবচেয়ে ভালো হবে সেটাই চেষ্টা করেন। আপনি কোনটির পক্ষে?

মুরাকামি: কাজুয়ো ইশিগুরোর লেখা আমি পছন্দ করি। সে আমার বন্ধু। যতবারই সে নতুন বই প্রকাশ করে সেটি আগের থেকে আলাদা হয়। এটি খুব আকর্ষণীয় বিষয়। তবে আমার পক্ষে থিম আর মোটিফগুলো এত আলাদা নয়। আমি সিক্যুয়েল লিখতে পছন্দ করি না। তবে বইগুলির পরিমণ্ডল একে-অপরের চেয়ে আলাদা নয়। আমি শুধু একজন ব্যক্তি এবং আমার নির্দিষ্ট উপায় আছে বলে মনে করি। এটা আমি পরিবর্তন করতে পারি না। তবে আমি একই জিনিস বারবার লিখতে চাই না।

দেবোরা: আপনার নিজস্ব শৈলীতে প্রায়শই জটিল বা গভীর কল্পনা থাকে কিন্তু লেখা সেরকম হয় না। বাক্যগুলি বেশ সহজ এবং হালকা। এই বৈপরীত্য কি উদ্দেশ্যমূলক?

মুরাকামি: অনেক লেখক জটিল জটিলতর স্টাইলে তুচ্ছ অগভীর জিনিস লেখেন। আমি চাই কঠিন ও জটিল জিনিসগুলি খুব সহজ শৈলীতে লিখতে, যা পড়া সহজতর এবং আরামদায়ক। এই কঠিন জিনিসগুলি লিখতে গেলে আপনাকে আরও গভীর আর গভীরতর হতে হবে। সুতরাং চল্লিশ বছর ধরে লিখতে লিখতে আমি তার জন্য একটি কৌশল তৈরি করেছি। এটি একটি শারীরিক কৌশলের মতো, কোনো বৌদ্ধিক কৌশল নয়। আমি মনে করি আপনি যদি কোনো কথাসাহিত্যিক হন এবং আপনি যদি খুব বুদ্ধিমান হন তবে আপনি লিখতে পারবেন না। আপনি যদি নির্বোধ হন তাহলেও লিখতে পারবেন না। এর মধ্য থেকে আপনাকে একটা অবস্থান খুঁজে নিতে হবে। এটা খুব কঠিন।

দেবোরা: আপনি কি মনে করেন আপনার লিখনশৈলী অনুবাদে ধরা পড়েছে?

মুরাকামি: হ্যাঁ। কেন জানি না, তবে যখন আমি আমার বইগুলি ইংরেজিতে পড়ি তখন আমার মনে হয়, ওহ্‌, এ তো আমিই! ছন্দ, গদ্যশৈলী একই— প্রায় একই।

দেবোরা: আপনি নিজেই একজন অনুবাদক। আপনি এফ. স্কট ফিটজগারেল্ড, ট্রুম্যান কাপোতে, রেমন্ড চ্যান্ডলার এবং অন্যন্যদের লেখা জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এখন আপনি অনুবাদ করছেন জন শেভারের লেখা। লেখকদের কোন দিকগুলি আপনাকে অনুবাদে প্রণোদিত করে?

মুরাকামি: এটি বলা সহজ। আমি যা পড়তে চাই তা অনুবাদ করি। আমি রেমন্ড চ্যান্ডলারের সমস্ত উপন্যাস অনুবাদ করেছি। আমি তাঁর স্টাইলটি পছন্দ করি। আমি পাঁচ বা ছয়বার ‘দ্য লং গুডবাই’ পড়েছি।

তৃতীয় পাতা

Categories
অনুবাদ গদ্য

একটি আত্মজ্ঞানের খসড়া

তলস্তয়

ভাষান্তর: রূপক বর্ধন রায়

জানুয়ারি ০১

বিস্তর অকেজো আর মধ্যবিত্ত জিনিসের থেকে অল্প কিছু উত্তম এবং প্রয়োজনীয় জিনিস জানা ভালো।

একটা ছোটো, নির্বাচিত বইয়ের পাঠাগারে কত বিরাট সম্পদ লুকিয়ে রাখা যায়! হাজার বছর ধরে, পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতিবান দেশগুলির সর্বোচ্চ বুদ্ধিমান এবং সর্বাধিক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের একটা অনুষঙ্গ, তাদের পড়াশোনা এবং জ্ঞানের ফল আমাদের কাছে উপলব্ধ হতে পারে। অপর শতাব্দীর কিছু মানুষ, যে-ভাবনা হয়তো তারা তাদের প্রিয়তম বন্ধুদের কাছেও প্রকাশ না করে থাকতে পারে তা আমাদের জন্য এখানে স্পষ্ট শব্দে লিখে রাখা আছে। হ্যাঁ, আমাদের শ্রেষ্ঠ বইগুলোর জন্য, আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অর্জনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

— রালফ ওয়াল্ডো এমার্সন

বহুল পরিমাণে বই আমাদের মনকে কেবল আনন্দ দেওয়ার জন্য মজুত রয়েছে। তাই, শুধু সেই বইগুলোই পড়ো যেগুলো কোনো প্রকার সন্দেহাতীতভাবে উৎকৃষ্ট।

— লুশিয়াস আন্নাইয়াস সেনেকা

শ্রেষ্ঠতম বইগুলো আগে পড়ো, না হলে দেখবে তোমার হাতে আর সময় নেই।

— হেনরি ডেভিড থরু

প্রকৃত জৈবিক বিষ ও বৌদ্ধিক বিষের মধ্যে পার্থক্য হল, বেশিরভাগ জৈবিক গরল অত্যন্ত বিস্বাদ, কিন্তু বৌদ্ধিক বিষ, যা কি না সস্তা খবরের কাগজ বা নিকৃষ্ট বইয়ের আকার নেয়, দূর্ভাগ্যক্রমে কখনো কখনো আকর্ষণীয় হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি ১৫

প্রাকৃতিক সরলতা হয়, এবং আত্মজ্ঞানের সরলতা হয়। উভয়ই প্রেম এবং সম্ভ্রম দাবি করে।

যে-কোনো মহৎ সত্যই হল সরলতম।

মানুষ যখন অত্যন্ত বিস্তৃত এবং পরিশীলিতভাবে কথা বলে, তখন হয় সে মিথ্যে বলছে অথবা নিজের স্তুতি করতে চাইছে। এমন মানুষদের বিশাস কোরো না। ভালো অভিভাষণ সর্বদাই স্পষ্ট, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সর্বজনবিদিত।

সরলতা পরিশোধিত আবেগের একটি পরিণতি।

— জঁ ড’আলেমবার্ট

শব্দ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। তাই, স্পষ্টভাবে কথা বলতে চেষ্টা করো, এবং শুধু সত্যিটা বলো, কারণ, সত্য আর সারল্যের চেয়ে আর কোনো কিছুই মাবুষকে সংঘবদ্ধ করতে পারে না।

এপ্রিল ২৮

সুখের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তটি হল কাজ। প্রথমত, প্রিয় এবং স্বাধীন কাজ; দ্বিতীয়ত, কায়িক শ্রম যা তোমার খিদে বাড়ায় এবং পরবর্তীকালে তোমাকে শান্ত ও গভীর ঘুম প্রদান করে।

কায়িক কাজ বৌদ্ধিক ক্রিয়া বর্জিত নয়, বরং তার গুণবর্ধক এবং তাকে সাহায্যও করে।

অবিরাম আলস্যকে নরকের অত্যাচারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, কিন্তু পক্ষান্তরে, সেটিকে স্বর্গের আমোদগুলির একটি বলে বিবেচিত করা হয়।

— চার্লস দি মন্টেসকিউ

একজন মানুষ যখন কাজে প্রবৃত্ত হয়, সে যতই সর্বোচ্চ পর্যায়ে অযোগ্য, আদিম, সহজ কাজই হোক না কেন, তার আত্মা শান্ত হয়। কাজ আরম্ভ করার সাথে সাথেই, সমস্ত অপদেবতা তাকে ছেড়ে যায় এবং কাছাকাছি ঘেঁষতে পারে না। একজন মানুষ, মানুষ হয়ে ওঠে।

— থোমাস কার্লায়েল

কাজ প্রয়োজনীয়। যদি তুমি তোমার মানসের সুস্বাস্থ প্রত্যাশা করো, পরিশ্রান্ত হওয়া অবধি কাজ করো। তবে অত্যধিক বেশি নয়। তুমি ব্যয়িত হওয়া অবধি নয়। আত্মিক সুস্বাস্থ্য অত্যধিক কাজের পাশাপাশি আলস্যেও বিনষ্ট হতে পারে।

জুন ১১

আমাদের আত্মিক জীবনের পরিবর্তনগুলোর তুলনায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত বস্তুবাদি পরিবর্তনগুলো ক্ষুদ্র। অনুভূতি ও কাজে একটা পরিবর্তন হতে পারে, চিন্তা ও ধারণায় একটা বদল আসতে পারে। তোমার চিন্তা ও ধারণায় পরিবর্তন আনতে হলে, তোমার সচেতন মনকে তোমার আত্মিক প্রয়োজনীয়তাগুলোর উপর কেন্দ্রীভূত করতে হবে।

প্রত্যেকটি চিন্তা যার উপর মানুষটির আবাস, তা সে প্রকাশ করুক অথবা না করুক, তার জীবনকে হয় ক্ষতিগ্রস্ত করে অথবা উন্নত করে।

— লুসি মালোরি

পাপকে পরাস্ত করতে হলে, তোমাকে মানতে হবে যে, প্রতিটি পাপের মূল একটি বদ ভাবনা। আমরা সকলে শুধুমাত্র আমাদের ভাবনারই অনুসারী।

— বুদ্ধ

আমরা একটি টাকাভরতি থলি হারানোয় অনুতাপ করি, কিন্তু একটা খাঁটি ভাবনা যা আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে, যা আমরা শুনেছি অথবা পড়েছি, একটা চিন্তা যা আমাদের মনে রেখে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করা উচিত ছিল, যা পৃথিবীকে উন্নত করতে পারত— আমরা এই ভাবনাটিকে হারিয়ে ফেলি এবং তৎক্ষণাৎ সেটির ব্যাপারে ভুলে যাই, এবং তার ব্যাপারে অনুতাপ করি না, যদিও চিন্তাটি লক্ষগুণে মূল্যবান।

জুন ১৬

ব্যক্তির নৈতিক উন্নতির মধ্যে দিয়েই সমাজের উম্মতি অর্জন করা সম্ভব।

আমরা শৃঙ্খল, সংস্কৃতি ও সভ্যতার যুগে বসবাস করি, কিন্তু নৈতিকতার যুগে নয়। বর্তমান পরিস্থিতে, আমরা বলতে পারি যে, মানুষের সুখ বৃদ্ধি হয়, তবু তার সাথে মানুষের অসুখের পরিমাণও বাড়ছে। আমরা মানুষকে কীভাবে সুখি করব যখন তারা উচ্চতর নৈতিকতার জন্য শিক্ষিত হচ্ছে না? তারা জ্ঞানী হয় না।

— ইমানুয়েল কান্ট

জীবনের যা কিছু সাধারণ অশুভতা তার সাথে লড়াই করার একটাই উপায় হতে পারে, তা তোমার জীবনের নৈতিক, ধার্মিক, এবং আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার মধ্যেই বিদ্যমান।

আগস্ট ০৬

মেধা মানব জীবনের একমাত্র উপযুক্ত পথপ্রদর্শক।

চোখ হল দেহের আলো: সুতরাং তোমার চোখ যখন একক তোমার সমস্ত শরীর আলোয় পূর্ণ; কিন্তু তোমার চোখ যখন দুর্বৃত্য, শরীরটাও অন্ধকারে পরিপূর্ণ। কাজেই সাবধান হও, তোমার মধ্যে যে-আলো রয়েছে তা যেন অন্ধকারে পরিবর্তিত না হয়।

— লিউক ১১: ৩৪-৩৫

বৌদ্ধিক জীবন যাপনকারী মানুষটি এমন একজন মানুষের মতো যে নিজের পথ আলোকিত করার জন্য সামনে একটি লণ্ঠন বহন করে। এমন একজন মানুষ কখনো অন্ধকার জায়গায় পৌঁছাবে না, কারণ, তার মেধার আলো তার সামনে সামনে চলে। এমন জীবনে কোনো মৃত্যুভয় নেই, কারণ, যে-লণ্ঠনটি তোমার সামনে চলেছে সে শেষ মুহূর্ত অবধি তোমার পথ আলোকিত করে, এবং তুমি তাকে শেষ অবধি অনুসরণ করো যেমন সারাজীবন ধীর স্থিরভাবে করে এসেছ।

কিছু মানুষ নিজের ভাবনা অনুসারে বাঁচে এবং কাজ করে, আর কিছু মানুষ অন্যের চিন্তা অনুসরণ করে; এটাই মানুষের মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

সেপ্টেম্বর ১৭

বিস্তীর্ণ জমির স্বতন্ত্র মালিকানা অন্য মানুষের মালিকানার মতোই অন্যায্য।

ভূমি মালিকানা সংক্রান্ত বিদ্যমান নিয়মকানুনগুলো আইনসঙ্গত তা তুমি বলতে পারো না। এই আইনগুলির মধ্যেই রয়েছে হিংসা, অপরাধ এবং ক্ষমতার উৎস।

— হার্বার্ট স্পেন্সার

মানুষের মাঝের প্রাকৃতিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে নয়, বরং দস্যুতার মধ্যে দিয়েই ভূমির স্বতন্ত্র মালিকানা এসেছে।

— হেনরি জর্জ

অন্যান্য অবিচারের মতই, বড়ো জমির টুকরোগুলোর স্বতন্ত্র মালিকানার অবিচার, তাকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত অন্য আরও অবিচারের সাথে অপরিহার্যভাবে সংযুক্ত।

নভেম্বর ০৯

আত্মপ্রশংসা অহংকারের প্রারম্ভ। অহং-বোধ হল অপসারিত আত্ম-উপাসনা।

যারা নিজের স্বার্থপরতাকে, নিজেদের বাকি পৃথিবীর থেকে উচ্চাসনে স্থাপন করাকে ঘৃণা করে না, তারা অন্ধ, কারণ, এই ক্রিয়া সত্যের বিরোধিতা করে।

— ব্লেইজ পাসকাল

একটি বস্তু যত হালকা এবং যত কম ঘনত্বের, সে তত সীমিত জায়গা অধিকার করে। এর সাথে একজন অহংকারী মানুষের নিজের চরিত্রের তুলনা করা চলে।

— প্রাচ্যের পাণ্ডিত্য

এমন বহু মানুষ রয়েছে যাদের নিজেদের প্রথমত শিক্ষাগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নিজেদেরকে অপরের শিক্ষক বলে দাবি করে।

জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পথ হল পরিপূর্ণতার পথ, এবং কোনো মানুষ যদি নিজেকে নিয়ে গর্বিত ও সন্তুষ্ট থাকে তবে কী ধরনের পরিপূর্ণতা অধিষ্ঠান করতে পারে?

ডিসেম্বর ১১

ভূমি কর্ষণে লিপ্ত চাষির শ্রমের মতো আনন্দদায়ক আর কিছুই নয়।

তুমি বা তোমার সন্তান নিজে হাতে যে-খাদ্য উৎপাদন করো তাই পরম খাদ্য।

— মহম্মদ

যারা নিজেদের খাবারের যোগান নিজেরাই করে তারা ধার্মিক বলে দাবি করা মানুষের থেকে বেশি সম্মানের যোগ্য।

— তালমূদ

জমির কাজ ও নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করা সব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, তবে অন্য কোনো ধরনের কাজ মানবতার জন্য বেশি জরুরি নয়, এবং অন্য কোনো ধরনের কাজ বৃহত্তর মাত্রায় স্বাধীনতা এবং ভালোত্ব প্রদান করে না।

ডিসেম্বর ২৮

মানবজীবনের রীতি উদ্‌ঘাটনের কাজে ব্যবহৃত হলে বিজ্ঞান অত্যাবশ্যক রূপে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতে হলে, আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, কাজটি উপযোগী। সাধারণত বিজ্ঞানীরা দেখান যে, ওঁরা কিছু একটা করছেন এবং হয়তো কোনো সময়, কোনো একদিন, এটি ভবিষ্যতে মানুষের কাজে লাগবে।

মহাবিশ্ব সীমাহীন, এবং কারো পক্ষেই তাকে সম্পূর্ণরূপে বোঝা অসম্ভব। সুতরাং, আমাদের পক্ষে আমাদের দৈহিক জীবনকেও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

— ব্লেইজ পাসকাল

“বিজ্ঞান” তেমন কোনো ধারণা নয় যেভাবে মানুষ এই শব্দটিকে শনাক্ত করে ব্যবহার করে; এটি আমাদের বোধগম্যের জন্য সর্বোচ্চ, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু।

Categories
অনুবাদ গদ্য

পাওলো কোয়েলহোর গদ্য

ভাষান্তর: অমিতাভ মৈত্র

মরুভূমির চোখের জল
[The Tears of the Desert]

মরক্কো থেকে আমার এক বন্ধু ফিরে এল একজন মিশনারির গল্প নিয়ে, মারাকেশে পৌঁছে যে-মিশনারি মনস্থ করেন প্রতিদিন খুব সকালে শহরের বাইরের মরুভূমিতে হাঁটবেন। প্রথম দিন বেরোনোর সময় তিনি দেখলেন মরুভূমির বালিতে কান পেতে শুয়ে একজন কোমলভাবে থাবা দিচ্ছে মরুভূমির বালিতে।

— ‘লোকটা নিশ্চয়ই উন্মাদ,’ মিশনারি ভাবলেন।

প্রতিদিন এই দৃশ্য চোখে পড়ত তাঁর, আর একমাস পরে এই দৃশ্যের অভিসন্ধি ও আকর্ষণ যেন হারিয়ে দিল তাঁকে। তিনি ঠিক করলেন কথা বলবেন লোকটার সাথে। আরবের ভাষায় তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। লোকটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাই থেমে থেমে জানতে চাইলেন।

— ‘কী করছ তুমি?’

— ‘এই মরুভূমি খুব নিঃসঙ্গ। তার এ নিঃসঙ্গতা ও কান্নায় আমি একটু সঙ্গ দিচ্ছি, সান্ত্বনা দিচ্ছি, চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছি।’

— ‘মরুভূমি কাঁদে আমি জানতাম না।’

— ‘ও স্বপ্ন দেখে মানুষের সাহায্যে আসার, বিশাল একটা বাগান হতে চায় যেখানে তারা শস্য ফলাবে, ফুলের বাগান তৈরি করবে, ভেড়া চরাবে।’

— ‘বেশ, তুমি মরুভূমিকে বলো ও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে,’ মিশনারি বললেন। ‘যখনই আমি এই মরুভূমির সাথে থাকি, মানুষের সত্যিকারের আকার আমি বুঝতে পারি। তার অপরিমেয়তা আমাকে বলে যায় ঈশ্বরের কাছে আমরা কত ক্ষুদ্র, কত তুচ্ছ। যখন একটি বালুকণার দিকে তাকাই, আমি কল্পনা করি কোটি কোটি মানুষ যারা জন্মের মুহূর্তে সবাই ছিল সমান, কিন্তু পরে পৃথিবী যাদের সাথে সুবিচার করেনি। এখানকার পাহাড়েরা ধ্যানস্থ করে আমাকে, আর যখন দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো দেখা যায়, আনন্দে ভরে যায় আমার মন এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্যে হারিয়ে যাই আমি।’

লোকটিকে ছেড়ে মিশনারি তাঁর কাজের জগতে ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে সবিস্ময়ে দেখলেন লোকটি সেই জায়গায়, একইভাবে কান পেতে শুয়ে আছে বালির ওপর।

— ‘তোমাকে যে-সব কথা বলেছিলাম, মরুভূমিকে বলেছ?’

মানুষটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

— ‘আর এখনও সে কাঁদছে?’

— ‘তার প্রতিটি ফুঁপিয়ে ওঠা শুনতে পাচ্ছি। এখন ও কাঁদছে এ-জন্য যে, হাজার হাজার বছর ও নিজের অস্তিত্বকে অর্থহীন মনে করে নিজের ভাগ্য আর ঈশ্বরকে দোষ দিয়ে এসেছে শুধু।’

— ‘ঠিক আছে, এবার মরুভূমিকে বলো মানুষ হিসেবে আমাদের জীবনের সময় খুব কম, তবু আমাদের সেই মহার্ঘ সময়ের অনেকটা নিজেদের অর্থহীন মনে করে নষ্ট করি। আমাদের নিয়তি আমরা জানি না আর ভাবি ঈশ্বর অন্যায় করেছেন আমাদের সাথে। নিজেকে জানার সেই মুহূর্তটি শেষ পর্যন্ত আসে যখন আমরা জীবনের উদ্দেশ্য অনুভব করতে পারি, তখন অনুতাপ হয় সময় নেই ভেবে জীবনকে ঠিক পথে চালিত করার। মরুভূমির মতো আমরা তখন অভিশাপ দিই, নিজেদের সময় এভাবে নষ্ট করার জন্য।’

— ‘জানি না মরুভূমি শুনবে কি না এই কথা,’ লোকটি বলল। ‘সে যন্ত্রণাতেই অভ্যস্ত, অন্যভাবে দেখার চোখ তার নেই।’

— ‘তাহলে এসো, সেই কাজটাই করি আমরা, যে-কাজ বহুবার করতে হয় আমাকে। যখন টের পাই সবরকম আশা হারিয়েছে মানুষ— প্রার্থনা করি দু-জনে।’

হাঁটু মুড়ে বসে প্রার্থনা শুরু করল দু-জনে। লোকটি ছিল মুসলিম, তাই তার মুখ মক্কার দিকে। মিশনারি ক্যাথলিক, দু-হাত জোড় করে প্রার্থনা শুরু করল। নিজেদের ধর্মের, নিজেদের ঈশ্বরের কাছে যিনি আসলে একই।

পরের দিন প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে মিশনারি দেখলেন লোকটি সেখানে নেই। শুধু যেখানে সে বালির ওপর কান পেতে শুয়ে থাকত, সেখানে বালি মরুভূমির ভেতর থেকে ভিজে উঠেছে। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর জন্য মরুভূমি কাঁদছে।

কয়েকমাস পরে যখন জলস্রোত বেড়ে গেল অনেক, শহরের লোক তখন একটা কুয়ো তৈরি করল সেখানে আর বেদুইনরা তার নাম রাখল ‘মরুভূমির অশ্রু’। লোকে বলে এই কুয়োর জল যে খাবে, তার দুঃখের কারণ বদলে যাবে আনন্দে, আর এভাবেই নিজের জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে তার কাছে।

ভোরের মুহূর্ত
[The Moment of Dawn]

একজন ইহুদি শিক্ষক তার চারপাশের ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন:

‘রাত্রি শেষ হয়ে দিনের শুরুর সঠিক মুহূর্তটি কীভাবে জানতে পারি আমরা?’

‘যখন আলো এমন থাকে যে, ভেড়া থেকে কুকুরকে আলাদা করতে পারে আমাদের চোখ,’ একটি ছেলে বলল।

আরেকটি ছাত্র বলল: ‘যখন জলপাই গাছ আর ডুমুর গাছকে আলাদা করতে পারে আমাদের চোখ।’

‘না, কোনো উত্তরই তেমন ভালো হল না।’ বললেন শিক্ষক।

‘ভালো উত্তর তাহলে কী?’ জানতে চাইল ছাত্ররা।

শিক্ষক বললেন: ‘যখন কোনো অচেনা মানুষ এগিয়ে আসে আর মনে হয় সে আমাদের ভাই, তখনই রাত্রি ভোর হয় আর আলো আসে।’

ধনুকের পথ
[The Way of the Bow]

পুনরাবৃত্তির প্রয়োজনীয়তা
চিন্তাকে যখন প্রকাশ করা হয়, তখন কর্মের শুরু। ভঙ্গির ন্যূনতম পরিবর্তনও প্রতারণা করে আমাদের, সে-জন্য সবকিছু নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, প্রতিটি অনুপুঙ্খ যেন মনে থাকে। দক্ষতাকে নিয়ে যেতে হবে যান্ত্রিকতার এমন পর্যায়ে যেখানে স্বয়ংক্রিয় জ্ঞানই সব। কোনো নির্দিষ্ট নিয়মিত অনুশীলনে নয়, এই স্বয়ংক্রিয় জ্ঞান এক এমন মানসিক স্থিতি যা ভেতর থেকে জেগে ওঠে।

দীর্ঘ অভ্যাসের পর প্রয়োজনীয় সঞ্চালনগুলো নিয়ে আর ভাবার প্রয়োজন হয় না। অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে তারা। কিন্তু এই জায়গায় আসতে হলে অনুশীলন আর পুনরাবৃত্তি দরকার। সেটাও যথেষ্ট না হলে পুনরাবৃত্তি আর অনুশীলন শুরু করো।

যে নাল পরায় ঘোড়ার ক্ষুরে, তাকে মন দিয়ে লক্ষ করো। অনভিজ্ঞের চোখে মনে হবে একইভাবে হাতুড়ি পিটছে সে। কিন্তু দেখার চোখ আছে যার সেই শুধু বোঝে প্রতিবার হাতুড়ি তোলা আর আঘাত করার মধ্যে অনেক সূক্ষ্ম তারতম্য থাকে। প্রতিবার লোহার ওপর নেমে আসার সময় হাত জানে কখন তাকে জোরে আর কখন কোমলভাবে আঘাত করতে হবে।

হাওয়াকলের দিকে মাত্র একবার যে তাকায় তার মনে হবে কলের পাখাগুলো একই গতিতে, একই রকম ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু যে অভিজ্ঞ সে জানে বাতাসের গতির তারতম্যে হাওয়াকলের পাখার গতি বদলে যায়।

যে নাল পরায় সে এই যান্ত্রিকতা আয়ত্ত করেছে হাজার হাজার বার হাতুড়ি ব্যবহার করে। জোরে বাতাসের সময় হাওয়াকলের পাখা দ্রুত ঘোরে, আর বোঝা যায় তার গিয়ার ঠিক আছে।

চাঁদমারির বাইরে যদি কিছু তির উড়ে যায় তিরন্দাজ বোঝে সেটা স্বাভাবিক। ধনুক, তির, ধনুকের ছিলা, চাঁদমারি, তার ধনুক ধরা আর তির নিক্ষেপের ভঙ্গি— সবকিছুর নিখুঁত যান্ত্রিক সমন্বয় আয়ত্ত হতে পারে হাজার হাজার বার একাগ্র অনুশীলনে। তারপর আসে সেই মুহূর্ত যখন সে নিজেই হয়ে ওঠে ধনুক, তির, চাঁদমারি গলে মিশে তৈরি হওয়া নতুন এক অস্তিত্ব।

ছুটে যাওয়া তিরকে কীভাবে দেখতে হয়
শূন্যে কোনো অভিপ্রায়ের দাগ হয়ে তির ছুটে যায়। তির ছোঁড়ার পর সেই তিরের গতিপথ ও লক্ষ্যস্থল অনুসরণ করা ছাড়া আর কোনো কাজ তিরন্দাজের নেই। ছোঁড়ার মুহূর্তের তীব্র টানটান অনুভূতি সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গেছে। স্থিরচোখে তাই সে অনুসরণ করছে তিরকে, তার মন বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন হাসি লেগে আছে তার ঠোঁটে।

যদি যথেষ্ট হয়ে থাকে তার অনুশীলন, আর নিয়ন্ত্রণে থাকে তার সহজাত প্রবৃত্তি, তির ছোঁড়ার সময় তার মন যদি একাগ্র ও সহজ থাকে, মহাবিশ্বকে সে অনুভব করবে তার অস্তিত্বে। তার হাত যখন প্রস্তুত হচ্ছে, শ্বাস হয়ে উঠছে ধীর, আর চোখ স্থির হচ্ছে লক্ষ্যে— তার প্রশিক্ষণ আর দক্ষতা তখন কাজ করছে। কিন্তু তির নিক্ষেপের সঠিক মুহূর্ত তাকে জানায় তার সহজাত প্রবৃত্তি।

পাশ দিয়ে যেতে যেতে যদি কেউ এই মুহূর্তের তিরন্দাজকে দেখে তার এলিয়ে থাকা চিন্তাহীন হাত আর বাতাস কেটে ছুটে যাওয়া তিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে— তার মনে হবে কিছুই ঘটছে না। কিন্তু তার সঙ্গীরা জানে তির ছোঁড়ার পর তার মনে সমুদ্র পরিবর্তন ঘটে গেছে। সারা ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ছে তার মন। মন কাজ করে যাচ্ছে, তির ছোঁড়ার মুহূর্তে তার সক্রিয়তা, ইতিবাচকতা, ভুলের সম্ভাব্যতা বুঝে নেওয়া আর দেখা তিরের আঘাতে লক্ষ্যবস্তুর প্রতিক্রিয়া কেমন।

যখন তির ছোঁড়ে সে, তখন তার ধনুকে মহাবিশ্বকে অনুভব করে সে। যখন লক্ষ্যবস্তুর দিকে তির ছুটে যায়, মহাবিশ্ব যেন আরও কাছে চলে আসে তার, জড়িয়ে রাখে তাকে আর ঠিকভাবে সমাধা করা কাজের জন্য সুখী করে তাকে।

যখন তার কাজ শেষ, তার অভিপ্রায় যখন সফল, একজন আলোকিত যোদ্ধার আর কোনো ভয় নেই তখন। সে শেষ করেছে তার কাজ। নিজেকে ভয়ে অসাড় হতে দেয়নি সে। যদি লক্ষ্যস্থলে আঘাত নাও করে তার তির, তার সুযোগ থাকবে পরের বারের জন্য— কেন-না ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ায়নি সে।

মিয়ামি বন্দরে
[In Miami Harbour]

‘মাঝে মাঝেই মানুষজন সিনেমায় কিছু দেখে এত মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে, শেষ পর্যন্ত আসল ঘটনাই মুছে যায় তার স্মৃতি থেকে।’ মিয়ামি বন্দরে যখন একসাথে দাঁড়িয়েছিলাম বন্ধুটি বললেন, ‘তোমার টেন কমান্ডমেন্টস মনে আছে?’

অবশ্যই মনে আছে। এক জায়গায় মোজেস— মানে চার্লিয়ন হেস্টন— হাতের লাঠি তুলে ধরেন আর জল দু-দিকে সরে যায়। ইজরায়েলের সন্তানরা তখন পার হয়ে যায়।’

‘বাইবেলে কিন্তু অন্য গল্প,’ বন্ধু বলল। ‘সেখানে ঈশ্বর, মোজেসকে বলেন, ‘ইজরায়েলের সন্তানদের বলো যেন তারা এগিয়ে যায়।’ তারা এগিয়ে যাবার পরেই তিনি মোজেসকে বলেন হাতের লাঠি তুলে ধরতে। আর তখন লোহিত সাগর দু-দিকে সরে যায়। পথের জন্য সদিচ্ছাই পথ তৈরি করে।’

মানুষ যখন মজারু
[The Funny Thing About Human Beings]

আমার বন্ধু জেসি কোহেনকে একজন প্রশ্ন করেছিল:

‘মানুষের সব থেকে মজাদার বিশেষত্ব কী?’

কোহেন বলেছিল, ‘আমাদের স্ববিরোধিতা। বড়ো হবার জন্য বিষম তাড়া থাকে আমাদের, পরে হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলায় ফিরতে চাই আবার। টাকা উপার্জনের মরিয়া চেষ্টায় শরীরকে শেষ করে ফেলি, পরে সব অর্জন খরচ করি আরোগ্যের জন্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা এত উদ্বেগে থাকি যে, বর্তমানকে গ্রাহ্য করি না আমরা— আর এভাবে বর্তমান বা ভবিষ্যৎ কিছুই আর জানা হয় না আমাদের। যখন বেঁচে থাকি তখন মনে করি আমাদের মৃত্যু নেই। আর এমনভাবে মরি, যেন আমরা আদৌ বেঁচে ছিলাম না কখনো।’

হারানো ইট
[The Missing Brick]

আমি ও আমার স্ত্রী যখন ছুটিতে ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম আমার সেক্রেটারির থেকে একটা ফ্যাক্স এল।

‘রান্নাঘর সারানোর জন্য কাচের একটা ইট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আপনাকে মূল নকশা আর নির্মাণ সংস্থা যে-পরিবর্তিত নকশা দিয়েছে এই ক্ষতি সামলাতে, আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ সেক্রেটারি জানিয়েছেন।

একদিকে আমার স্ত্রীর তৈরি করা নকশা: ইটের সুসংবদ্ধ রেখা আর বাতাস চলাচলের জন্য খোলা জায়গা। অন্য দিকে হারিয়ে যাওয়া ইটের সমস্যা থেকে মুক্তির নতুন নকশা: একটা সত্যিকারের জিগ্ স পাজল যেখানে গ্লাস ব্রিকসগুলো সাজানো হয়েছে জোড়াতালি দিয়ে নান্দনিকতাকে অগ্রাহ্য করে।

‘আর একটা কাচের ইট কিনুন,’ লিখে জানালেন আমার স্ত্রী। তাঁরা করলেন সেটা, আর আগের নকশাও বহাল থাকল।

সেদিন বিকেলে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম বিষয়টি নিয়ে। মাত্র একটা ইট নেই বলে কতবার আমরা আমাদের জীবনের মূল নকশাটিকে বিকৃত করে তুলি।

Categories
অনুবাদ কবিতা

কাশ্মীরের কবিতা

ভাষান্তর: সোহেল ইসলাম

এখানে পাঁচজন কাশ্মীরির দুটো করে মোট দশটা জবানবন্দি থাকল। গত সাত-আট মাস কাশ্মীর নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে কবিতাগুলোকে আমার জবানবন্দিই মনে হয়েছে। তাই তার উল্লেখ। কাশ্মীরে আমরা যা দেখি, তারচেয়ে বেশি কিছুই ঘটে প্রতিনিয়ত। গোটা কাশ্মীর জুড়ে মানুষের অভিজ্ঞতা একই। স্কুল বন্ধ, বাজারঘাট বন্ধ, ফোন বন্ধ, গণপরিবহন বন্ধ, রাস্তায় বেরোনো বন্ধ, এমনকী সবচেয়ে দরকারেও এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যায় না। এ তো গেল দিনের আলোর কথা। রাত তো আরও ঝুঁকি দিয়ে ভরা। ওষুধ কেনা এমনকী হাসপাতাল যাওয়ার মতো দরকারেও রাতের কাশ্মীর নিরাপদ নয় খোদ কাশ্মীরিদের কাছেও। কেন-না রাতের দখল থাকে সেনাবাহিনী আর পুলিশের হাতে। কাশ্মীরের অন্ধকার মানুষের অসহায়তার কথা বলে। ছাদের বুক থেকে চাঙর ভেঙে পড়লে যেমন ছাদ চুপচাপ থাকে, স্বাভাবিক হতে চায়, কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ঠিক একইরকমভাবে কাশ্মীরও শরীরে স্যালাইনের নিডিল নিয়ে ব্যথা, যন্ত্রণা, দুঃখ, না-পাওয়া একনিঃশ্বাসে ভুলিয়ে দিয়ে আবার বেঁচে উঠতে চায়। এই বেঁচে ওঠায় কোনো মিথ্যে নেই, কোনো নাটক নেই। থাকার মধ্যে আছে শুধু অপেক্ষা। সেই একই অপেক্ষা এখানকার ঘরবাড়ি, দরজা-জানলার এবং এখানকার মানুষের মতোই। একটু মন দিয়ে তাকালে দেখতে পাবেন, দেওয়ালগুলো বোমা আর বুলেটের অত্যাচার সহ্য করতে করতে নিথর হয়ে গেছে। আর দরজা-জানালাগুলো সেনাবাহিনীর নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতে নিতে বুড়ো হয়ে গেল। বাড়ির আলো ছুটে যে রাস্তায় বেরিয়ে আসবে তার কোনো উপায় নেই। এখানে মুক্তির একমাত্র পথ হল মরে যাওয়া। তবে মজার ব্যাপার যে মরে গেল, মুক্তি কেবল তার। কিন্তু তারপর বাড়ির লোক পড়বে যাঁতাকলে। তল্লাশি, প্রশ্ন, রাতবিরেতে গলা ধাক্কা, সুরক্ষার অভাব, হয়রানি এসবই যেন তখন ওই বাড়ির রোজকার জীবন হয়ে ওঠে। আবার নতুন করে তারা তখন মৃত্যুর অপেক্ষায়, মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে।

লকডাউন, মারধোর, হেফাজত, কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া, পুরোনো FIR দেখিয়ে এনকাউন্টার, হাত-পা ভেঙে দেওয়া, চেকিংয়ের নামে অসভ্যতা কাশ্মীরে নতুন কিছু নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এর সাক্ষী। আপনি যদি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে গিয়ে লাল কাশ্মীর দেখে ফেলেন, অবাক হওয়ার কিছু নেই। সত্যিই কাশ্মীর এখন দুঃখে, কাঁদতে কাঁদতে, ক্ষতবিক্ষত শিশুর মৃতদেহের মতোই লাল। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর তথ্য আর সরকারি আমলার বক্তব্যের উপর নির্ভর করে যে-কাশ্মীরের কথা আমরা মনে মনে কল্পনা করি তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। দেশের জনগণের কাছে কাশ্মীর মানেই ভিড়, উশৃঙ্খল, হাতে পাথর নিয়ে তেড়ে আসা জনতার ভিড়। কিন্তু উলটো দিকে দাঁড়িয়ে থাকাদেরও যে একটা ভিড়, তারাও যে রাইফেল, প্যালেট গান, গ্রেনেড হাতে ভিড় তৈরি করেছে তা আর দেখানো হয় না। এই যে বারবার কয়েনের একপিঠ দেখিয়ে বিচারপতি বসিয়ে বিচার করে নেওয়ার মানসিকতার বিরুদ্ধেই কাশ্মীরের কলম জ্বলে উঠেছে, জ্বলে উঠছে। আর তাই কাশ্মীরের কবিরা সরাসরি মানবাধিকারের কথা বলছেন, মানবজাতির পক্ষে কথা বলছেন। ফলে কাশ্মীরের কবিতায় আপনি যত এগোতে থাকবেন, দেখবেন― মা, কারফিউ, রক্ত, হ্যান্ড গ্রেনেড, কাঁটাতার, নিষ্ঠুরতা, গণকবরের মতো শব্দ উঠে আসছে বারবার। আসাটাই স্বাভাবিক। কাশ্মীর তার কবিতায় জীবন লেখে, বেঁচে থাকা, ঘুরে দাঁড়ানো, কাঁধে কাঁধ রেখে উঠে দাঁড়ানোর কথা লেখে। যা তাকে শিখতে হয়নি। জীবনচর্চার মধ্য দিয়েই তার কলম একে ধারণ করেছে।

আর একটা কথা আতহার জিয়া এবং হুজাইফা পণ্ডিতের সাহায্য না পেলে কাশ্মীরকে আমার জানাই হত না সেভাবে। শাম্মি কাপুরের ‘ইয়া হু’ বলে বরফে ঝাঁপিয়ে পড়া কাশ্মীর নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু তা যে হওয়ার নয়, বেশ বুঝতে পারছি এখন।

আসিয়া জহুরের কবিতা

[পরিচিতি: আসিয়া জহুর বর্তমানে কাশ্মীরের বারামুল্লার একটি কলেজে মনোবিজ্ঞান পড়ানোয় কর্মরত। কাশ্মীরি সাহিত্য, কবিতা, মনোবিজ্ঞান বিষয়ক বই এবং নিবন্ধ লিখেছেন।]

মিলিটারাইজড জোন

জিভ কেটে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে দেওয়ার আগে
কিছু বলা যাক

মাথায় হাতুড়ির আঘাত নেমে আসার আগে
কিছু চিন্তার ফসল ফলানো যাক

ঘুমের দেওয়াল
বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার আগে
কিছু স্বপ্ন বোনা যাক

অন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই
চলো, অন্ধকারকেই আয়না বানিয়ে ফেলি

শব্দ মুছে দেওয়ার আগে
হাতের তালুতেই
লিপিবদ্ধ করি কাশ্মীরি ইতিহাস

নদী

একদিন নদী রাস্তা ভুল করে
ঢুকে পড়ল পাড়ায়
বাড়িতে
স্কুলে
দরজায় কড়া নাড়তে আরম্ভ করল
যত রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি
তত বাড়তে থাকে রাগ
সে কী একগুঁয়ে জেদ নদীর
দরজা-জানালার ফাঁকফোঁকর দিয়ে
ফাটা দেওয়াল দিয়ে ঢুকতে লাগল ভেতরে
প্রথমে বইগুলো তাকে তুললাম
তারপর আসবাবপত্র
শেষে নিজেরাও
কিন্তু নদীর জেদ…
বই থেকে শব্দগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল
পাড়া থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল প্রতিবেশী

আমরা এখন
হাসি-কান্না ভাগ করে নিতে নিতে
এক দেওয়ালহীন বিশ্বের বসবাসকারী

আমজাদ মজিদের কবিতা

[পরিচিতি: আমজাদ মজিদ ইনভার্স জার্নালের সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে দক্ষিণ কাশ্মীরে থাকেন। সেখানে বসে চীন, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সমালোচনা বইয়ের উপর কাজ করছেন।]

কাশ্মীরে কারফিউ

কারফিউ রাস্তায়
স্কুলে
ঘরবাড়িতে
রেডিয়ো, সংবাদপত্রে
ইন্টারনেটে
টিভি চ্যানেলে
আমাদের বক্তব্যে
আন্দোলনে
প্রতিবাদে
শোকে
এমনকী যে-স্বাধীনতার কথা আপনারা বলেন
কাশ্মীরে তাতেও কারফিউ
তবুও আমরা আশা ছাড়িনি
জীবনকে বাজি রেখে
মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে
উন্মাদনা ভাগ করে
লড়াই জারি রেখেছি—
ঠিক একদিন কারফিউ মুক্ত কাশ্মীর গড়ব আমরা

পরিচয় পত্র

দরখাস্তের ভিড় থেকে আলাদা হয়ে
সেও প্রিন্ট হল অন্যদের মতো
নোটারিযুক্ত হয়ে
দেশের স্ট্যাম্প নিয়ে
ল্যামিনেশনে মুড়ে
এক সরকারি দপ্তর থেকে
আরেক সরকারি দপ্তরের টেবিলে চক্কর কাটতে লাগল
তারপর সত্যি সত্যিই একদিন
দাগী আমলাদের হাত থেকে মুক্তি ঘটল তার

আজও স্পষ্ট মনে আছে
সেই দিনটির কথা
কাগজের ভিড়ে মাথা তুলে তাকানো দরখাস্ত
লম্বা কিউয়ে উলঙ্গ মজিদ
আর তার রক্ত-মাংস দেশীয় হওয়ার প্রমাণ দিচ্ছে

তখন আমি বাড়ি থেকে অনেক দূরে
কাচের জানলা দিয়ে দেখছি দেশ

শাবির আহমেদ মীরের কবিতা

[পরিচিতি: শাবির আহমেদ মীর কাশ্মীরের পুলওয়ামায় থাকেন। একজন গদ্যকার, কবি ও ছোটোগল্প লেখক। বর্তমানে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত।]

যেদিন যুদ্ধ শেষ হবে

যুদ্ধ শেষ হলে
একবার আসুন আমাদের এখানে
বুলেট কিংবা প্যালেট গানে ফুটো হয়ে যাওয়া জায়গায়
আঙুল ঢুকিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে নেবেন
কতটা আহত
কতটা আঘাত সহ্য করেছি আমরা

যুদ্ধ থেমে গেলে
আপনাকে এনে দেব গন্ধ
ভয়ের গন্ধ
ধ্বংসস্তূপের গন্ধ
দেখে নেবেন কী জমকালো সেইসব অন্ধকারের গন্ধ

যুদ্ধ থেমে গেলে
বুটের দৌড়ঝাঁপের আবহ শোনাতে নিয়ে যাব আপনাদের
উপত্যকা ভাগ করা
কাঁটাতারের গর্জন শোনাতে নিয়ে যাব

যুদ্ধ থেমে গেলে
আপনাকে নিয়ে যাব ভেরিনাগ
সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সুখনাগ
তারপর আমরা যাব ডাল লেকে
একটি দিন কাটাব বন্দুকের পাহারা ছাড়া
দেখবেন কী শান্তিপূর্ণ সেই ভ্রমণ

যুদ্ধ শেষ হলে
গণকবর খনন বন্ধ হলে
আপনাকে যোগদান করতে বলব
কাশ্মীরি সংগীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে
আপনি অনুভব করবেন
আমরা ঠিক কতটা খুশিতে থাকি
নিজেদের নিয়ে

সত্যি সত্যিই যেদিন যুদ্ধ থেমে যাবে চিরতরে
আপনাকে চায়ের আমন্ত্রণ জানাব
নোনতা, গোলাপি চা
আশা করি সেদিন বুঝবেন
আমরা কোনোদিনই
একে-অপরের শত্রু ছিলাম না

সিরিয়ায়

সোমবার,
আশার দিন
অপেক্ষা শেষ হওয়ার দিন
জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে
চকচকে রুপোর বাটিতে খাবার পরিবেশনের দিন
যেন একটা বিশেষ মুহূর্ত
যার জন্য আমরা
একে অন্যের মুখ চাওয়াচায়ি করে থাকি
ওই তো রূপকথা থেকে
আল্লাহ আর তাঁর দূত
আমাদের বাঁচাতে আসছেন
                           অবশেষে

মঙ্গলবার,
সতর্ক থাকার খবর আসছে
জরুরী সামান হাতের কাছে গুছিয়ে রাখার সতর্কবার্তা
যে-কোনো সময়
সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যেতে হতে পারে

রেহানার কপাল
তাই তো পালিয়ে যেতে পেরেছে
চোখের মণি, আইলানকে মানুষ করার সুযোগ পেয়েছে
যে কি না এখন রেহানার একমাত্র ভরসা

বুধবার,
প্রথম মা হওয়া গাভীর মতো ছটফট করছি
স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছি না
গুজব ছড়িয়ে পড়ছে
বন্দুকের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে
বোমায় টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরবাড়ি
বাইরে কারফিউ
এখন ধৈর্য্যই একমাত্র পথ
আমাদের অপেক্ষা করতে হবে
জুতসই পালানোর মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত

বৃহস্পতিবার,
আমাদের দুঃখের দিন
ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের মাঝখান থেকে
জিভের টুকরো
গোল গোল চোখ
ছোটো সরু হাড় কুড়িয়ে
বাড়ি ফেরার দিন

শুক্রবার,
আমাদের শোক এতটাই দগদগে যে
আমরা শিষ্টাচার ভুলে যাই
আপনি চান
আমরা দেওয়ালে মাথা ঠুকি
হাত দিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে থেমে যাই
জিভ অসাড় হয়ে আসুক
জল শুকিয়ে যাক চোখেই
কিন্তু আমাদের হাহাকার এতটাই নাছোড় যে
থামতে জানে না

শনিবার,
ক্ষোভ প্রকাশের দিন
এও এক নেশার মতো
আকাশের দিকে দু-হাত তুলে চিৎকার

দর্শকরা প্রথম প্রথম
সমবেদনা জানান
মাথা নীচু করে বিড়বিড় করেন
তারপর একটা সময় বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন
কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন
আমরা দিন শেষে
ঝাঁকে ঝাঁকে যে যার বাড়ি ফিরে আসি

রবিবার,
আমাদের নীরবতার দিন
নতুন সপ্তাহের প্রস্তুতির দিন

কায়সার বশিরের কবিতা
[পরিচিতি: কায়সার বশির কাশ্মীরের অনুবাদক, লেখক এবং কবি। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।]

মৃতদেহ

ওই দেখুন একটা মৃতদেহ
কোথায়?
ওই তো স্রোতে ভেসে আসছে
আমি তো দেখতে পাচ্ছি না
ওটা কী?
ওই দেখুন লাশ! আখরোট গাছের নীচে
ওটা দুর্ঘটনা না খুন, আপনি কী মনে করেন?
ওই দেখুন একটা বুলেট
কোথায় বুলেট?
এটা তো একটা মাথা
পাকা তুঁতের মতো ছেঁতরে গেছে
আমি বুঝতে পারছি না… একটু গুছিয়ে বলুন
শুনতে পাচ্ছেন?
কী?
মায়েরা উঠোনে বসে কাঁদছে
মৃতদেহের জন্য?
হতে পারে
চলুন, সান্ত্বনা দিয়ে আসি
কী করে, ওটা তো রেড জোন
আমি বিশ্বাস করি না
বিশ্বাস করতে হবে আপনাকে
শুনুন
কী?
কণ্ঠস্বর
হ্যাঁ, একটা আওয়াজ
কণ্ঠস্বর না, ওটা চিৎকার
কীসের?
মিছিলের
ওরা কি লাশ তুলতে আসছে?
আমি জানি না
তবে, এদিকেই আসছে― যেন একটা হিংস্র নদী
চলুন, দৌড়ান
তা না হলে আমরা খুন হয়ে যাব
কেন? এটা ঠিক না
জানি, আপনি চলুন
লাশের কী হবে?
ভুলে যান, চলুন…
কোথায়?
যেখানে নিরাপদ মনে হবে
আমি দৌড়তে পারি না
আমার পা সেই কবে থেকে ঘুমিয়ে আছে
কেমন স্বপ্ন পছন্দের আপনার?
কার?
লাশের…
ভুলে যান, চলুন
ওরা এদিকেই আসছে
কোথায়?
আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না
এত কুয়াশা কেন?
কোথায় কুয়াশা, এগুলো ধোঁয়া
আগুন ধরিয়ে দিয়েছে
কারা?
আমি জানি না
চলুন, পালাই
আপনি যান, আমি থাকব
কেন?
ওরা যে আমার ভাইয়ের মৃতদেহ নিয়ে আসছে
ভাইকে একা ফেলে কোথায় যাব?

আমি

বৃষ্টির পরে
আগস্টের আকাশে রামধনু উঠল
আমি তার কাছ থেকে
কিছুটা লাল রং ধার করলাম
আমাদের দুঃখ লিখব বলে

সিদরা নাজিরের কবিতা

[পরিচিতি: সিদরা নাজির কাশ্মীরের কবি। কাশ্মীরের আন্তিপোড়ার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন। সিদরার কাছে কবিতা একটা প্রার্থনা, যা তাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।]

কাশ্মীর

দাসের মতো বাঁচা কাকে বলে― আপনি কি জানেন?
বাইরে বেরোলেই কাঁটাতারের ঘেরা
হায়নার চোখের মতো বন্দুকের নল
আপনার দিকে তাক করা
তখন কেমন অনুভব হয়
আপনি কি জানেন?

যখন কোনো কাশ্মীরি যুবক নিখোঁজ হয়ে যায়
সেই বাড়ির মুকুট থেকে নিশ্চিত
একটা পালক খুলে পড়ে
মায়ের চোখ থেকে ঝরে পড়ে নোনা জল
জল নয় অভিশাপ
আপনি কি জানেন― কেমন সেই অনুভূতি
প্রতিটি কাশ্মীরি বোনের মনে ক্রোধের বাস
বাবাদের হাতে কবরের মাটি
আপনি কোনোদিনই জানতে পারবেন না
এই শাসন দেখতে দেখতে
কাশ্মীর আস্ত একটা কবরে পরিণত হচ্ছে

কবরের রাস্তায়

সাদা কাফন এল
আতরের গন্ধ এল নাকে
হাসি নিমেষে বদলে গেল কান্নায়
সেই বীরের সম্মানে
ইনকিলাবের নাড়া দিতে দিতে চলে গেল একদল যুবক
শুধু,
একজন বাবা কেঁদে উঠলেন
একজন মা কেঁদে উঠলেন
আর চারজনের কাঁধে করে
একটা কাঠের ফ্রেম চলল―
                       শীতের দেশে

Categories
অনুবাদ কবিতা

কোব্যায়শি ইশার জেন কবিতা

ভাষান্তর: রাজীব দত্ত

[কিছু কথা: কোব্যায়শি নব্যুয়কি থেকে কোব্যায়শি ইশা। ইশা মানে ‘এক কাপ চা’। এটা ছদ্মনাম। জাপানের অন্যতম যে-চারজন অন্যতম জেন কবি; ইশা তাদের একজন। বাকিরা হচ্ছেন বাশো, বুসোন এবং শিকি। ইশা কবিতা লেখা শুরু করেন শৈশবেই। মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর লেখা কবিতার সংখ্যা বিশ হাজারেরও বেশি। তার মধ্যে অধিকাংশই প্রকৃতি নিয়ে। একটা মাছি, মথ, ফড়িং, ব্যাঙ, শামুক, মাকড়শা, প্রজাপতি, চড়ুইপাখি, কোকিল, কুকুর, চেরিফুল সকলেই ইশার বিষয়। তাদের সবার সাথেই মিলে মিশে নিজের মনুষ্য জীবনের দিকে যেন তাজ্জব তাকায় আছেন। বিহ্বলভাবে। পড়তে পড়তে সেই বিহ্বলতায় আমরাও সংক্রমিত হচ্ছি। কল থেকে পানি পড়ার শব্দ, পুরোনো দরজার আওয়াজ, মরচে পড়া তালা সব রকম প্রাত্যাহিকতার মাঝেই যেন ইশা। আর এটাই বোধহয় জেন; জেন কবিতা। সীমার মধ্যে অসীমের সন্ধান।

এইবার অনুবাদ প্রসঙ্গ। হাইকুর যে-শব্দবিন্যাস, তার যে-নিয়ম, তাকে এখানে মানা হয়নি। কারণ, আমার ধারণা, জাপানি ভাষা-শব্দের যে-বিন্যাস চাইলেও বাংলায় তা মানা সম্ভব না। দুইটা দুই ভাষা। ভাষা ভিন্ন হবার কারণে তার ব্যাকরণ-উচ্চারণ ইত্যাদি বিষয়াদিও ভিন্ন হতে বাধ্য। জাপানি বর্ণমালার হিসেবে বাংলাকে সাজালে তা কাঠখোট্টাও হয়ে উঠতে পারে। তাই, স্বাধীনতা নিয়েছি যথেষ্ট। কারণ তথাকথিত মূলানুগত থাকার দায়ে পাঠক যেন হোঁচট না খান। যেন মনে না করেন তিনি ভিন ভাষার সামনে। বলতে পারেন, পাঠকের অজুহাতে নিজের দায় নিজেই কমিয়ে নিলাম। উপায় ছিল না আর। এর আগে ইশার কবিতার আরেক কিস্তি অনুবাদ আরেক জায়গায় ছাপা হয়।

আরেকটা বিষয়, সবগুলো কবিতাই ইন্টারনেট থেকে নানা জায়গা ঘুরে সংগ্রহ করা এবং বেশিরভাগেরই ইংরেজি অনুবাদক রবার্ট হ্যাস। যেহেতু জাপানি থেকে ইংরেজি, তারপর ইংরেজি থেকে বাংলা; তাই নিশ্চিন্তেই বলা যায় দুধ তো নাই-ই, ঘোলও বাকি নাই। তাই ভালো হয় যদি আপনি ইংরেজিটাই পড়েন এবং আমার ভুলগুলা ধরায় দেন।]


ও টুনটুনি—
এই দিক ওই দিক তাকায়া
কী খুঁজো?


কোকিলটা কানতেছে;
যেন মাত্র দেখল
পর্বতটারে।


বরফ গলতেছে;
আর গ্রামটা ভরে গেল
বাচ্চাকাচ্চায়।


কাকটা
এমনভাবে হাঁটতেছে
যেন চাষবাস করতেছে


এই গরমকালের রাইতে
তারারাও
কানাকানি করতেছে।


একটা বাছুর
এই হেমন্তের বৃষ্টিতে
ঘুরতেছে।


নতুন বছর, নতুন সকাল
হাঁসেরা পুকুরে
প্যাকপ্যাক।


নয়া বছর
নয়া নয়া ফুল;
আর আমার যাচ্ছে আর কী!

১০
শুয়েছিলাম দুপুরে;
কৃষকদের গান শুনে
লজ্জা পাইলাম।

১১
পুরাদিন
ঘুমায় কাটাই দিলাম;
কেউ-ই কিছু কইল না।

১২
মাছিরা
আমি বাইরে যাইতেছি
তোমরা ধুমায়া প্রেম করো

১৩
ঘুম থেকে উঠে
হাই তুলতে তুলতে
বিলাইটা প্রেম করতে চলে গেল

১৪
ও চড়াইপাখি
রাস্তা ছাইড়া দাও;
ঘোড়া আসতেছে

১৫
এমনকী পোকাদের সাথেও—
কেউ গাইতে পারে
কেউ পারে না।

১৬
এই দুনিয়ায়
নরকের ছাদে হাঁটতে হাঁটতে
ফুল বাগান দেখতেছি

১৭
মাকড়শারা,
টেনশন নিয়ো না
ঘর এরকমই থাকবে।

১৮
মাছিদের মাইরো না
তারা হাত জোড় কইরা
মাফ চাইতেছে

১৯
পয়সাওয়ালাদের জন্য
বরফ পড়া নিয়া হাবিজাবি লিখতেছি,
আর্ট-টার্টনা।

২০
একটা বড়োসড়ো ব্যাঙ আর আমি;
একজন অপরের দিকে
অপলক তাকায় আছি।

২১
কী অদ্ভুত!
এই ফুলে ভরা চেরির নীচে
বাঁইচা থাকা

২২
বুদ্ধের ছবির নীচে
বসন্তের ফুলও কেমন জানি
ঝিমাইন্না ঝিমাইন্না।

২৩
এই বসন্তের বৃষ্টিতে
সুন্দর একটা মাইয়া,
হাই তুলতেছে।

২৪
ভাবতেছি,
বাপের মুখের উপর থেকে
মাছিগুলা তাড়ায় দিব।

২৫
ও ফড়িং,
তুমি কি আসছ আমাদের
পথ দেখাইতে?

২৬
দেখলাম
টেলিস্কোপ দিয়ে;
দশ পয়সার একটা ব্যাঙ

২৭
একটা কোকিল গান গাইতেছে;
আমারে শুনায়া,
পর্বতরেও শুনায়া।

২৮
পোকামাকড়ের কাছ থেকে ঘরটা
ধার নিয়া
ঘুমাইতে ছিলাম।

২৯
মানুষ কই?
সব মাছি আর
বুদ্ধ।

৩০
লোকটা মুলা তুলতে ছিল;
মুলা দিয়েই আমারে
রাস্তা দেখাইল।

৩১
হাঁস চরতেছে পুকুরে;
ওরাও কি আজকে
সুখ আাশা করতেছে?

Categories
অনুবাদ গল্প

আসল-নকল

সংগ্রাহক: রেভারেন্ড লাল বিহারী দে

ভাষান্তর: গৌরব বিশ্বাস

[সংগ্রাহক পরিচিতি: রেভারেন্ড লাল বিহারী দে। জন্ম: ১৮ই ডিসেম্বর ১৮২৪, বর্ধমানের সোনাপলাশী গ্রামে। কয়েকবছর গ্রামের স্কুলে পড়াশুনোর পর ছোটোবেলাতেই বাবার সাথে কলকাতায় এসে ভর্তি হন, রেভারেন্ড আলেকজান্ডার ডাফের স্কুলে (এখন স্কটিশচার্চ স্কুল)। ছাত্রাবস্থাতেই খ্রীস্ট ধর্ম গ্ৰহণ। স্কুল কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি করেছেন সাংবাদিকতাও। আর গ্রামবাংলার জীবন সংস্কৃতি নিয়ে নিরলসভাবে রচনা করেছেন গ্রন্থ। কৃষকদের দুরবস্থা, জমিদারদের অত্যাচার নিয়ে ইংরেজিতে লিখেছেন— ‘Govinda Samanta’, ‘Bengal Peasant Life’-এর মতো গ্রন্থ। সংগ্রহ করেছেন বাংলার উপকথা। দিদিমা ঠাকুমারা যে-সব গল্প শুনিয়েছেন বংশ পরম্পরায়, সে-সব উপকথাই সংগ্ৰহ করে ইংরেজিতে প্রকাশ করলেন— ‘Folk Tales of Bengal’s’। সম্ভবত এটিই বাংলার উপকথার প্রথম কোনো সংকলন। এই গ্রন্থেরই কাহিনি— ‘The Ghost-Brahman’-এর বাংলা অনুবাদ আমি করেছি। রেভারেন্ড লাল বিহারী দে মারা যান ১৮৯২ সালে কলকাতায়।]

সে বহুকাল আগের কথা। এক গাঁয়ে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বাস করতেন। ব্রাহ্মণ কুলীন ছিলেন না। তাই বিয়ে করে সংসার পাতা তাঁর জন্য বড়ো দুঃসাধ্য ব্যাপার। ব্রাহ্মণ গাঁয়ের স্বচ্ছল মানুষদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে অর্থ সাহায্য চাইতে লাগলেন, যাতে অন্তত বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালন করতে পারেন। বিয়ের জন্য অর্থের প্রয়োজন। বিয়েতে জন্য বেশি কিছু খরচ না করলেও মেয়ের বাপ মাকে কিছু অর্থ তো দিতে হবে! ব্রাহ্মণ তাই গাঁয়ের দোরে দোরে ঘোরেন, গাঁয়ের বড়ো মানুষদের তোষামুদি করে খুশি রাখার চেষ্টা করেন। শেষ অবধি এদিক-সেদিক করে বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় হল। তারপর এক শুভ দিনে বিবাহ সম্পন্ন করে নতুন বউকে ঘরে তুললেন। ব্রাহ্মণ তাঁর মা আর নবোঢ়াকে নিয়ে একসাথে বাস করতে থাকলেন।

কয়েকদিন বাদে ব্রাহ্মণ মাকে বললেন— ‘দেখো মা, এবার তো আমায় তোমার পাশে, বউয়ের পাশে দাঁড়াতে হবে। তোমাদের সুখে শান্তিতে রাখব এমন অর্থ তো আমার নেই। তার জন্য, দূর দেশে গিয়ে যা হোক কিছু কাজকম্ম করে আমি অর্থ উপার্জন করব। কয়েক বছর দূর দেশে কাটাতে হবে আমায়, যতদিন না পর্যন্ত বেশ কিছু টাকা হাতে আসে। আমার কাছে এখন যা আছে, তা তোমায় দিয়ে যাব। ততদিন এই দিয়েই কষ্টে করে চালিয়ে নাও। সেই সাথে তোমার বৌমাকেও একটু দেখে শুনে রেখো।’

তারপর একদিন মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ব্রাহ্মণ পথে বেরিয়ে পড়লেন। আর ঠিক সেই দিনই সন্ধ্যেবেলায় এক প্রেত হবহু ব্রাহ্মণের রূপ ধরে ব্রাহ্মণের বাড়িতে হাজির হল। নববধূ প্রেতকে নিজের স্বামী ভেবে বসল। সে তো অবাক হয়ে বলল— ‘এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে বড়ো! এই যে বললে, কয়েক বছর তুমি বাইরে থাকবে! এত তাড়াতাড়ি মন বদলে গেল!’

ব্রাহ্মণের রূপধারী প্রেত ইতস্তত হয়ে জবাব দিল— ‘মানে… ওই… যাত্রা করার জন্য আজকের দিনটা ঠিক শুভ নয়। তাই ফিরে এলাম আরকী! তাছাড়া হঠাৎ করে হাতে বেশ কিছু টাকাও চলে এল… তাই আর…।’

ব্রাহ্মণের মা-ও প্রেতকে নিজে ছেলে ভেবে বসলেন। তাঁর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহও জাগল না। প্রেত ব্রাহ্মণের ভেক ধরে বাড়ির কর্তা সেজে দিব্যি থাকতে লাগল— সেই-ই যেন আসল ব্রাহ্মণ। বৃদ্ধা মায়ের সন্তান, নবোঢ়ার স্বামী। ব্রাহ্মণরূপী প্রেতকে দেখতে একেবারে আসল ব্রাহ্মণের মতো। কড়াইশুঁটির দুই দানার মতো হবহু এক। আলাদা করার উপায় নেই। পাড়া প্রতিবেশীরাও তাই প্রেতকেই ব্রাহ্মণ ভেবে ভুল করল।

বেশ কয়েকবছর বাদে দূরদেশ থেকে আসল ব্রাহ্মণ বাড়ি ফিরলেন। বাড়ি ঢুকেই তো তাঁর চোখ কপালে। একি! বাড়িতে হুবহু তারই মতো দেখতে আরেকজন! প্রেত দাঁত কিড়মিড় করে ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞেস করল— ‘এই, তুই কে রে! আমার বাড়িতে তোর কী দরকার! ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে উত্তর দিল— ‘আমি কে মানে! আগে বলো তুমি কে? এটা তো আমার বাড়ি। ইনি আমার মা। এ আমার বউ’।

প্রেত ব্রাহ্মণকে বলল— ‘আরে, তুই তো আজব কথা বলছিস রে! গাঁয়ের সক্কলে জানে, এ আমার বাড়ি। এরা আমার মা, বউ। বহুদিন ধরে আমরা এ গাঁয়ে আছি। আর তুই আজ কোত্থেকে এসে এমন ভান করছিস, যেন এটা তোর বাড়ি, এরা তোর মা আর বউ! তোর মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি রে ব্রাহ্মণ! যা যা, দূর হ এখান থেকে!’ এ-সব বলে প্রেত ব্রাহ্মণকেই তাঁর নিজের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল।

এমন অদ্ভুত ঘটনায় ব্রাহ্মণ বাক্যহারা হয়ে গেলেন। এখন কী করা উচিত, হতবুদ্ধি ব্রাহ্মণ ভেবে কূল পেলেন না। শেষ অবধি ভেবেচিন্তে রাজার কাছে গিয়ে ব্রাহ্মণ সব ঘটনা খুলে বললেন। রাজা ঘটনার বিচার করতে এলেন। ব্রাহ্মণ আর ভেকধারী প্রেত দু-জনকে দেখেই রাজা অবাক বনে গেলেন। যেন দুই হবহু প্রতিলিপি। কী করে এ-দ্বন্দ্বের তিনি মীমাংসা করবেন সত্যিই তিনি কিছু ভেবে পেলেন না।

ব্রাহ্মণ দিনের পর দিন রাজার কাছে সুবিচারের আশায় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন। তাঁর বাড়ি ঘরদোর, বউ আর মাকে ফিরে পাওয়ার কিছু একটা ব্যবস্থা করতে, রাজাকে কত করে অনুরোধ করেন। রাজা ব্রাহ্মণকে কী বলে শান্ত করবেন বুঝে পান না। রাজা তাই প্রতিদিনই বলেন— ‘কাল এসো, দেখছি’। ব্রাহ্মণও প্রতিদিন রাজার দরবার থেকে বেরিয়ে কপাল চাপড়ে কাঁদতে থাকেন— ‘কলির কাল! আমাকেই কি না আমার বাড়ি থেকে দূর করে দেওয়া হল! অন্য একটা বাইরের লোক আমার ঘরদোর স্ত্রী সবকিছু দখল করে নিল… হে ভগবান… আর রাজাই-বা কেমন! প্রজাদের সুবিচার দিতে পারেন না? আমার কপাল পুড়ল…’।

ব্রাহ্মণ প্রায় প্রতিদিনই রাজার দরবার থেকে বেরিয়ে এভাবে কাঁদতে কাঁদতে পথ চলেন। পথের মধ্যে একটা ছোট্ট মাঠ পড়ে। সেই মাঠে একদল রাখাল ছেলে খেলে বেড়ায়। গোরুগুলোকে চড়তে দিয়ে, একটা বড়ো গাছতলায় জটলা করে রাখাল ছেলেরা খেলা করে। বড়ো অদ্ভুত তাদের খেলা। ছেলেদের মধ্যেই কেউ সাজে রাজা, কেউ হয় মন্ত্রী, কেউ আবার হয় কোতোয়াল। রাখাল ছেলেরা প্রায় প্রতিদিনই ব্রাহ্মণকে কাঁদতে কাঁদতে যেতে দেখে।

যে-ছেলেটি রাখালদের রাজা, সে একদিন মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল— ওই ব্রাহ্মণ প্রতিদিন কাঁদেন কেন? মন্ত্রী, তুমি কিছু জানো? মন্ত্রী ছেলেটি কিছু জানত না এ-ব্যাপারে। তাই উত্তর দিতে সে অপারগ। তখন রাখাল রাজা একজন কোতোয়ালকে নির্দেশ দিলেন, ব্রাহ্মণকে তার সামনে হাজির করতে। একজন কোতোয়াল তখন ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে বলল— ‘আমাদের রাজা একবার এক্ষুণি আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে চান’। ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে— ‘কেন কী ব্যাপার! এই তো রাজামশাইয়ের কাছ থেকে এলাম। উনি তো আমায় আগামীকাল আসতে বলে ভাগিয়ে দিলেন। এখন আবার আমায় ডাকছেন কেন?’

কোতোয়াল বলল— ‘না না রাজামশাই নন। এ আমাদের রাখাল রাজা।

ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে বলল— ‘রাখাল রাজা! তিনি আবার কে? বলছ যখন, চলো গিয়েই দেখি’।

ব্রাহ্মণ রাখাল রাজার কাছে এলেন। রাখাল রাজা ব্রাহ্মণের কাছে তাঁর প্রতিদিন এভাবে কাঁদার কারণ জানতে চাইল। ব্রাহ্মণ সবিস্তারে তাঁর দুঃখের কথা জানালেন রাখাল রাজাকে।

রাখাল রাজা সব কিছু শুনে বলল— ‘হুম। বুঝতে পেরেছি কী সমস্যা। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনি নিশ্চয়ই নিজের সব কিছু ফেরত পাবেন। আপনি শুধু রাজামশায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসুন, উনি যাতে আপনার এই সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব আমাকে দেন’।

ব্রাহ্মণ আবার গেলেন রাজামশাইয়ের কাছে। রাজমশাইকে অনুরোধ করলেন, রাখাল রাজাকে তাঁর এই সমস্যা সমাধানের অনুমতি দিতে। রাজামশাই এমনিতেই ব্রাহ্মণের এই বিচিত্র সমস্যার সমাধান নিয়ে তিতিরিক্ত ছিলেন। তাই ব্রাহ্মণের অনুরোধে কোনো আপত্তি করলেন না।

ঠিক হল, আগামীকাল সকালেই এই সমস্যার নিষ্পত্তি করা হবে। রাখাল রাজা সমস্ত ব্যাপারটাই বুঝতে পেরেছিল। সে এক বুদ্ধি বার করল।

পরের দিন সকালে রাখাল রাজা হাজির হল। সঙ্গে সরু মুখের ছোট্ট একটা শিশি। ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণের রূপধারী প্রেত দু-জনই রাখাল রাজার বিচার সভায় উপস্থিত। রাখাল রাজা সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখল। পাড়া প্রতিবেশীদের কথাবার্তাও শোনা হল। তারপর রাখাল রাজা বলল— ‘ব্যস, অনেক কথা শুনলাম। আমি যা বোঝার বুঝে গিয়েছি। এবার এক্ষুণি এ-সমস্যার নিষ্পত্তি করব। আমার হাতে এই যে-ছোট্ট শিশিটা সবাই দেখতে পাচ্ছেন, দু-জন বিচারপ্রার্থীর মধ্যে যিনি এই শিশির ভেতর ঢুকতে পারবেন, আমার আদালত তাকেই সমস্ত সম্পত্তির প্ৰকৃত অধিকারী বলে ঘোষণা করবে এবং তিনিই হলেন আসল ব্রাহ্মণ। এখন দেখা যাক, কে এর মধ্যে ঢুকতে পারে’।

রাখাল রাজার এমন বিচারে ব্রাহ্মণ হতভম্ব হয়ে গেলেন। দুঃখ করে বললেন— ‘নাঃ… রাখাল রাজা, তুমি সত্যিই ছেলেমানুষ। এ না হলে কেমন বিচার! এইটুকু শিশির ভেতর কোনো মানুষ কি ঢুকতে পারে?’

রাখাল রাজা নির্বিকার কণ্ঠে বলল— ‘ও, আপনি তাহলে এর মধ্যে ঢুকতে পারবেন না? ঠিক আছে। আপনি যদি এর ভেতর ঢুকতে না পারেন, তাহলে সম্পত্তি, বাড়িঘর কোনো কিছুই আপনার নয়’।

‘আপনি কি পারেবন?’ প্রেতকে জিজ্ঞেস করল রাখাল রাজা। ‘যদি আপনি পারেন, তাহলে প্রমাণিত হবে, সম্পত্তি বাড়ি ঘর, স্ত্রী, মা সব আপনার। আপনিই আসল ব্যক্তি’।

রাখাল রাজার প্রস্তাবে, প্রেত একগাল হেসে বলল— ‘এ আর এমন কী! এ তো আমার বাঁ-হাতের খেলা’।

পরমুহূর্তেই সবাই দেখল, প্রেতের শরীর ছোটো হতে হতে একটা ক্ষুদ্র কীটের মতো আকার ধারণ করল। তারপর টুক করে ঢুকে গেল শিশির ভিতর। আর রাখাল রাজা সঙ্গে সঙ্গে শিশির মুখে শক্ত করে ছিপি এঁটে দিল। ছিপির ভিতর আটকা রইল প্রেত।

রাখাল রাজা শিশিটা ব্রাক্ষণের হাতে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল— ‘যান, এই শিশিটা এবার ছুঁড়ে নদীতে ফেলে দিন। তারপর বাড়ি গিয়ে স্ত্রী আর মায়ের সাথে সুখে বাস করুন’।

এরপর ব্রাহ্মণ নিজের বাড়িতে সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলেন। সন্তান-সন্ততিতে তাঁর সংসার পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।
“আমার কথাটি ফুরোলো
নটে গাছটি মুড়োলো।।”

হতে হতে একটা ক্ষুদ্র কীটের মতো আকার ধারণ করল। তারপর টুক করে ঢুকে গেল শিশির ভিতর। আর রাখাল রাজা সঙ্গে সঙ্গে শিশির মুখে শক্ত করে ছিপি এঁটে দিল। ছিপির ভিতর আটকা রইল প্রেত।

রাখাল রাজা শিশিটা ব্রাক্ষণের হাতে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল— ‘যান, এই শিশিটা এবার ছুঁড়ে নদীতে ফেলে দিন। তারপর বাড়ি গিয়ে স্ত্রী আর মায়ের সাথে সুখে বাস করুন’।

এরপর ব্রাহ্মণ নিজের বাড়িতে সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলেন। সন্তান-সন্ততিতে তাঁর সংসার পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।
“আমার কথাটি ফুরোলো
নটে গাছটি মুড়োলো।।”