Categories
অন্যান্য

সেলিম মন্ডল

অদৃষ্ট

হাওয়ায় পুড়ে গেল ঈশ্বরের ছায়া, এখন নীল রঙের রোদ হাতে নিয়ে
ঈশ্বর ঘুরে বেড়ান মাঠে ঘাটে, ধুলোর আলপনা জমে তাঁর গায়ে,
নব্য প্রেমিক প্রেমিকারা তাঁকে পাথর মনে করে নিজেদের নাম
যত্ন করে লিখে রাখে— ঈশ্বর সব দেখেন আর মুচকি হাসেন,
নতুন অলংকার পেয়ে, আহ্লাদে, আবার পুড়ে যান ঈশ্বর…

বধূবরণ

সেদিন চৌকাঠ ডিঙিয়ে রোদ্দুর এলো, এলো আলো বাতাস জল—
একটা আস্ত সমুদ্র এসে ভাসিয়ে দিল খাট, আলমারি, ঘরের সমস্ত আসবাব…
এখন খোলা জানলার পাশে ভ্যান গখের হলুদ গম ক্ষেত,
আর রাতের বেলায় ছাদ জুড়ে মুনলাইট সোনাটা…
তোমার অর্ধেক আকাশ ‘এই শুনছ…’ বলে আলতো টোকা দিল আমার অর্ধেককে,
দু-চারটে তারা খসে পড়ার পর—

সেদিন তোমার সঙ্গে চৌকাঠ ডিঙিয়ে গোটা পৃথিবী এলো আমার ঘরে
আর আস্ত একটা সূর্য এসে আটকে রইল আমাদের বাড়ির আশমানে

Categories
অন্যান্য

উৎসব সংখ্যা ২০২০

প্রচ্ছদ ছবি: ইনামুল কবীর

সম্পাদকীয়

আমরা কেউ ভালো নেই। ভালো থাকার চেষ্টা করেও ভালো থাকতে পারছি না। আসলে সময়টাই এমন। একদিকে করোনা অতিমারি আরেকদিকে রাষ্ট্রের শোষণ। এত মানুষ কর্মহীন! আজ মানুষ ঠিক আছে তো কাল কী হবে জানে না। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যে যার মতো লড়ে যাচ্ছে। এবছর ‘উৎসব সংখ্যা’ প্রকাশ করতে পারব ভাবিনি। ‘টিম তবুও প্রয়াস’ তিনমাস ধরে দীর্ঘ পরিশ্রম করেছে, যাতে  ‘উৎসব সংখ্যা ২০২০’ প্রকাশ করা যায়। সমস্ত  অন্ধকার বা বিপর্যয়ের মধ্যে আমাদের এটুকুই আলো। এবারের উৎসব সংখ্যায় আমরা কিছু বিষয়কে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়েছি। চেষ্টা করেছি— অনেকগুলো নতুন মুখকে পত্রিকার পাতায় রাখতে। সেইসঙ্গে পাঠকদের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের সংযোগ ঘটাতে। উৎপলকুমার বসুর অগ্রন্থিত লেখা ও অরুণেশ ঘোষের অপ্রকাশিত চিঠি এই সংখ্যাকে পাঠকের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে বলে আশা করা যায়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখককে এ সংখ্যায় রাখতে পারিনি। আগামীতে তাঁদের নিয়ে পরিকল্পনা আছে।

মুদ্রিত সংখ্যার মতো এই সংখ্যার পিছনে ‘টিম তবুও প্রয়াস’ একই শ্রম দিয়েছে। কোনোভাবেই যাতে গুণগতমান নষ্ট না হয় সেদিকে রাখা হয়েছে খেয়াল। পাঠকদের কাছে অনুরোধ করছি লেখার নীচে মন্তব্য জানাবেন। আপনাদের মতামত আগামীদিনে আমাদের কাজ করতে আরও উৎসাহ দেবে। লেখকদেরও অনুরোধ করছি আপনার ও পছন্দের লেখা শেয়ার করতে— যাতে বহু সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছায়।

সূচিপত্র দেওয়ার পর আমাদের কাছে অনেক অনুরোধ এসেছিল— সংখ্যাটি যেন প্রিন্ট করা হয়। সত্যি বলতে এত বড়ো কলেবরে সংখ্যা এই মুহূর্তে ছাপা সম্ভব নয়। অনলাইনে যে-কেউ ফ্রি পড়তে পারবেন সংখ্যাটি। তবে কারো যদি ইচ্ছে হয় পত্রিকার উন্নতিকল্পে আর্থিক সহায়তা করতে পারেন। প্রচ্ছদ, প্রুফ, ওয়েবজিন পরিবেশকদের আমরা যথাযথ মূল্য দিতে পারব। এমনকী লেখকদেরও।

মোনালিসা ও রাজদীপ পুরীকে বিশেষ ধন্যবাদ। তাঁদের কারিগরী সহায়তা সংখ্যাটিকে আরও প্রাণ দিয়েছে।

সকলে ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

♦ প্রবন্ধ

পুজোর গানের গৌরবময় অতীত
গোপাল দাস

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্য সমন্বয় মাইহার ব্যান্ড
অলক রায়চৌধুরী

কলকাতা একটি শ্রমতালুক
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

এই রহস্যকে সহ্য করতে হচ্ছে
জয়ন্ত ঘোষাল

মুর্শিদাবাদের বোলান গান
সুজিৎ দে

মিথ ও ট্যাবুতে সাত সংখ্যা: আফ্রিকান মিথোলজি
রবিউল ইসলাম

গল্প

লক্ষ্মী দিঘা পক্ষী দিঘা কুলদা রায়

সেইসব বাড়িয়ে বলা গল্পগুলো যশোধরা রায়চৌধুরী

জলময়ূরীর সংসার পাপড়ি রহমান

ভয় হিন্দোল ভট্টাচার্য

শীতঘুম শুভদীপ ঘোষ

দংশন বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

হাতটি সেলিম মণ্ডল

 গদ্য

একটি রক্তিম মরীচিকা পঙ্কজ চক্রবর্তী

কে জন্মায় হে বিপ্লব? তমাল রায়

বাল্যকাল কিংবা এক কাল্পনিক অতিভুজ রণজিৎ অধিকারী

অতিমারির উৎসব ও এক ছদ্মকবি শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

সাদা রোগ ঈশিতা দেসরকার

অগ্রন্থিত গদ্য

শিশুসাহিত্য প্রসঙ্গে উৎপলকুমার বসু

কবিতা

বিজয় দে  •  বিপ্লব চৌধুরী  •  পল্লব ভট্টাচার্য   কমলকুমার দত্ত  •  কল্যাণ মিত্র  •   অনিন্দ্য রায় • সুদীপ্ত মাজি  অগ্নি রায়কুন্তল মুখোপাধ্যায়  নির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়  •  শৌভ চট্টোপাধ্যায় •  হাসনাত শোয়েব  • ইন্দ্রনীল ঘোষ  • শাশ্বতী সান্যাল  • প্রীতম বসাক  • পঙ্কজকুমার বড়াল •  তথাগত  • দেবোত্তম গায়েন  • শতানীক রায়  • শুভম চক্রবর্তী  • শাশ্বতী সরকার • প্রবীর মজুমদারগৌরাঙ্গ মণ্ডল  • সঞ্চিতা দাস  তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

অনুবাদ গল্প

আসল-নকল
ভাষান্তর: গৌরব বিশ্বাস

অনুবাদ গদ্য

পাওলো কোয়েলহোর গদ্য
ভাষান্তর: অমিতাভ মৈত্র

লেভ তলস্তয়ের একটি আত্মজ্ঞানের খসড়া
ভাষান্তর: রূপক বর্ধন রায়

অনুবাদ কবিতা

জেন কবিতা
ভাষান্তর: রাজীব দত্ত

কাশ্মীরের কবিতা
ভাষান্তর: সোহেল ইসলাম

লোকগল্প

আরও কিছু আছে বাকি
সুব্রত ঘোষ

সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকার
ভাষান্তর: রিপন হালদার

অপ্রকাশিত চিঠি

অরুণেশ ঘোষের লেখা গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি

চিত্রকলা

তন্ময় মুখার্জীর চিত্রকলা

——————————————————————————————————————–

সকলের সুবিধার্থে সংখ্যাটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কোনো সাবক্রিপশন মূল্য রাখা হয়নি। যদি কেউ মনে করেন সংখ্যাটি মূল্য দিয়ে পড়বেন সেক্ষেত্রে আপনার খুশিমতো ৮৬৮১৯৩৭৩৫৬ নম্বরে phonePay বা gPay করতে পারেন। অথবা অ্যাকাউন্টেও পে করতে পারেন। 

ব্যাঙ্ক  অ্যাকাউন্ট
TOBUO PROYAS PROKASHONI
Bank Of India
Chapra Branch
IFSC- BKID0004123
CHAPRA BRANCH
Account No- 412320110000151

Categories
অন্যান্য

একটি পুনরাধুনিক সন্ধ্যা

অনুপম মুখোপাধ্যায়ের ‘স্বনির্বাচিত কবিতা’ প্রকাশ

অংশগ্রহণে কবি ও কথাসাহিত্যিক মলয় রায়চৌধুরী, কবি ও কথাসাহিত্যিক অনুপম মুখোপাধ্যায়, কবি ও প্রচ্ছদ শিল্পী রাজীব দত্ত এবং কবি ও প্রকাশক সেলিম মণ্ডল

Categories
অন্যান্য

মধুময় পালের সাক্ষাৎকার

এক দেশভিখারির মাটি অন্বেষণ

[লেখক মধুময় পালের সঙ্গে আলাপচারিতায় শতদল মিত্র]

আর ‘মরিচঝাঁপি’?

আগেই বলেছি বাম দলগুলো উদ্বাস্তুদের নিয়ে রাজনীতি করেছে, কিন্তু তাদের সমস্যার সমাধানে কতটা আন্তরিক ছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ আছে। বাংলার মাটির বিপরীত ভূমি দণ্ডকারণ্য, সেখানে উদ্বাস্তুদের যেতে দিল। অথচ আন্দামানে যেতে দিল না। ওখানে বাঙালিদের আর একটা রাজ্য পেতাম। বামপার্টিরা পার্টি লাইনের বাইরে গিয়ে বাস্তবকে স্বীকার করতে পারল না। সবকিছু চেপে দেওয়া হতে লাগল। সাবিত্রী রায়ের ‘স্বরলিপি’ চেপে দেওয়া হল। গোপাল হালদার মন্বন্তর নিয়ে লিখলেন, কিন্তু দেশভাগ নিয়ে লিখলেন না। মরিচঝাঁপির রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেও চেপে দেওয়া হল। এখন দণ্ডকারণ্যের ওই রুক্ষ পাথুরে বাংলার বিপরীত ভূমি থেকে তারা তাদের পরিচিত জল-পলির দেশে ফিরে আসতে চেয়েছিল। এটাই ছিল তাদের একমাত্র অপরাধ। ১৯৭৮— নতুন ক্ষমতায় আসা একটা বাম সরকারের এমন বর্বরতা মানা যায় না! দণ্ডকারণ্য থেকে ওরা এসেছিল বাম সরকারের ভরসাতেই। নেতাজিভক্ত, তাই মরিচঝাঁপির নাম দিয়েছিল— নেতাজিনগর। আমি উদ্বুদ্ধ হই এ-ইতিহাস খুঁড়ে বার করতে, বাঙালি হিসাবে এ আমার দায়ই ছিল। সে-সময় তো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বা সোস্যাল মিডিয়া ছিল না। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে নথি যোগাড় করতে হয়েছিল। দণ্ডকারণ্যের মালকানগিরির নির্মল কান্তি ঢালি বা রাধিকা রঞ্জন বিশ্বাসের ‘নিজের কথায় মরিচঝাঁপি’ থেকে প্রচুর তথ্য পাই। এ-প্রসঙ্গে নাম করতে চাই বিখ্যাত সাংবাদিক সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত ও স্টেটসম্যান কাগজের ফোটোগ্রাফার সুব্রত পত্রনবিশের।

নানা ধরনের সম্পাদনামূলক কাজ করতে গিয়ে আপনার নিজের মৌলিক লেখালেখি কি কিছুটা হলেও খর্ব হল না?

লেখক হিসাবে তেমন স্বীকৃতি পাইনি সম্পাদনার কাজ করতে গিয়ে— এটা সত্য। কিন্তু তার জন্য কোনো আফসোস নেই। মৌলিক লেখার চেয়ে সম্পাদনার কাজটা বাঙালির দায় হিসাবে নিয়েছি বলেই।

‘আখ্যান পঞ্চাশ’ গত বইমেলায় প্রকাশিত হল। তার আগে ‘আরণ্য রজনী’, ‘কহনবেলা-১, ২’। উপন্যাস ‘আলিঙ্গন দাও, রানি’, ‘রূপকাঠের নৌকা’। আপনার ভাষার চলন অনন্য। কবিতার মতো চিত্রকল্পময়, আবার ছবির মতো ছায়াতপের মায়া— স্পেসের খেলা, কখনো নাটকের বয়নই যেন! এ ভাষা এতই আপনার নিজস্ব যে, সেখানে আমি অন্য কারো প্রভাব খুঁজে পাইনি। যদি পেয়ে থাকি তা রূপকথার কথনভঙ্গি! এ-ভাষানির্মাণ কিছুটা সহজাত যদিও হয়, বেশিরভাগটাই তো সচেতন প্রয়াস। এ বিষয়ে…

যখন ভাবলাম নিজের লেখা লিখব, তখন তো মোটামুটি আমার ধারণায় ছিল কী লিখব। কিন্তু প্রশ্ন— কীভাবে লিখব? আমি আমার নিজস্ব ভাষা নির্মাণে সচেষ্ট হলাম। আমাকে প্রভাবিত করে বঙ্কিম, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, দেবেশ রায়, মতি নন্দী। আর ওয়ালীউল্লাহ। না, রবীন্দ্রনাথের গদ্য, এমন কী কমলকুমার বা অমিয়ভূষণও নয়। আমি বিশ্বাস করি ভাষা দিয়ে ব্যক্তিত্বকে চেনা যায়। যতদিন না নিজের ভাষা তৈরি করতে পেরেছি ততদিন লিখিনি। ঠিকই বলেছ আমার গদ্যে ছবি-কবিতা-নাটকের প্রভাব আছে। একসময় প্রচুর ছবির প্রদর্শনী দেখেছি, নাটক দেখেছি, কবিতা তো আজও পড়ি। আর গীতবিতান। এ-সব দিয়ে পটো যেমন মূর্তি গড়ে পরতে পরতে— সেরকম মায়ায় আমি আমার ভাষাকে গড়ে তুলি। আসলে যে-ভাষার সঙ্গে আমি ঘর করব, তাকে তো আদর দিতেই হবে, ভালোবাসা দিতে হবে। সে যে আমার প্রেমিকা, ঘরণি— তাকে তো সুন্দর করে সাজাবই।

অনেকেই কিন্তু আপনার লেখাকে ‘জাদুবাস্তবতা’ বলে দেগে দেয়। অবশ্য এই দেগে দেওয়াটা আমাদের বহুকালের বদ অভ্যাস… সেই আধুনিক সাহিত্যের শুরুর যুগ থেকে আমাদের সাহিত্যকে ৫০ কি ১০০ বছরের তামাদি বিদেশি কোনো তত্ত্বে দাগিয়ে না দিলে আমাদের পিচুটিচোখো সমালোচকদের ভাত হজম হয় না যেন!

ঠিকই বলেছ, বিদেশি তকমা না জুটলে আমাদের সাহিত্য যেন কল্কে পায় না। জাদু বাস্তবতা! আমার গদ্যে জাদুবাস্তবতা নেই, যা আছে তা হল ভয়ংকর বাস্তবতা। একজন দেশভিখারি নিজের মাটি খুঁজছে— এখানে জাদু কোথায়, এ তো ঘোর বাস্তবতা। ডি. জে.-র আওয়াজের কম্পনে মায়ের পেটের বাচ্চা বেরিয়ে আসতে চাইল— এটা জাদু নয়, নগ্ন বাস্তব। আর প্রত্যেক দেশের রূপকথাই তো জাদুবাস্তবতা, যা আসলে বাস্তবতাই। আমাদের রূপকথা, পুরাণ, মঙ্গলকাব্য— জাদু ও বাস্তবতার সোনার খনি। আমাদের রূপকথায় ছোট্ট টুনটুনি রাজাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, রাজাকে দুয়ো দিয়ে জানাচ্ছে— রাজা খায় ব্যাঙ ভাজা! রাষ্ট্রশক্তিকে এনকাউন্টার করছে। ভাবা যায়! চণ্ডীমঙ্গলের কালকেতুর আনা স্বর্ণগোধিকা রূপ পালটে হয়ে যায় অসামান্য সুন্দরী নারী। ওই মঙ্গলকাব্যেই সমুদ্রমাঝে এক নারী হাতি গিলে খায়, ওগরায়। একে যদি জাদুবাস্তবতা বলো সে তো আমাদের ঐতিহ্যে! তবে একটা কথা বলতে চাই— সচেতনভাবে সবসময় চেষ্টা করেছি গল্পের মধ্যে থেকেও তথাকথিত গল্পের ধাঁচের বাইরে থাকতে। কতটা পেরেছি পাঠকই বলবেন।

তাছাড়া আমার মনে হয় প্রত্যেক দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি তার মাটির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জন্ম নেয়। সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকা নিজের ভাষা-সংস্কৃতিকে হারিয়ে, তাকে খুঁজছে— তার বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের বাস্তবতা মিলবে কীভাবে?

ল্যাটিন আমেরিকার জীবনযাত্রা অন্য ধরনের। উদ্দাম। আমরা ১৮০ কিলোমিটার বেগের ঝড় সামলাতে একযুগ সময় নিই, তাও পারি না। আর ওরা ২৫০-৩০০ কিলোমিটার বেগের সাইক্লোন, রুক্ষ-উগ্র প্রকৃতিকে নিয়ে ঘর করে। ওদের ভোজ্য-পেয় আলাদা। ওদের উত্সব-যৌনতা ঝড়ের মতনই উদ্দাম। ওদের সঙ্গে যুদ্ধহীন-ভেতোবাঙালির তুলনা চলে? সুতরাং ওদের সাহিত্যের যে-‘জাদুবাস্তবতা’, তা আমাদের সাহিত্যে ব্যর্থ অনুকরণই মাত্র।

ভাষার জাদুর বাইরে গিয়ে আমি বলতে চাই যে, আপনার প্রতিটি লেখাই আদ্যন্ত রাজনৈতিক। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করছে, রাষ্ট্রকে টার্গেট করেছে। আমাদের সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, শরত্‍চন্দ্র থেকে শুরু করে আজকের নবারুণ ভট্টাচার্য, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুময় পাল… একটা রাজনৈতিক সাহিত্যের সমান্তরাল ধারা প্রবাহিত। কিন্তু বর্তমান সাহিত্যে রাজনীতি, মানে প্রত্যক্ষ রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে আপনার মনে হয় না?

দেখো, আমি যৌবনে, ছাত্রজীবনে নকশাল রাজনীতি করেছি। আমাদের রাজনীতি ছিল একটা আদর্শের, যা বর্তমানের কামিয়ে নেওয়া দলীয় রাজনীতি থেকে আলাদা। আগেই বলেছি আমাদের রাজনীতির সঙ্গে বরং স্বদেশি আন্দোলনের মিল, স্বদেশি আন্দোলনেরও তো একটাই চাওয়া ছিল দেশের পরাধীনতার মুক্তি। এই আদর্শবাদী রাজনীতি থেকেই আমার যাবতীয় লেখালেখি, মানুষের জন্য লেখা। সুতরাং আমার লেখা পরিকল্পিতভাবেই রাষ্ট্রবিরোধী। রাঘব, নবারুণ রাষ্ট্রকে সরাসরি টার্গেট করেছে, সাধ্যমতো আমিও— সেটাই তো প্রকৃত লেখকের ধর্ম। আর বর্তমানের বাজারি সিরিয়ালধর্মী লেখা? যেখানে শ্রমিক-কৃষকের জীবন যন্ত্রণা, তার লড়াই নেই, মানুষের সমস্যা নেই— সেখানে রাজনীতি আশা না করাই ভালো। ওগুলো তো ইতরামি লেখা, ফাত্‍রামিও বলতে পার— বালখিল্য প্রেম, যেন বাচ্চাদের নুনু-নুনু খেলা। এই লেখকরা এন্টারটেনারও নয়। সমরেশ বসু এন্টারটেনার ছিলেন, তার জীবন অভিজ্ঞতা ছিল, তাই বিটি রোডের ধারের মতো উপন্যাসও লিখতে পেরেছিলেন। ‘শোলে’ সিনেমার মতো এন্টারটেইনিং সিনেমা করতে গেলে দক্ষতা লাগে। এইসব বাজারি লেখকদের সে-দক্ষতা কোথায়? সব তো প্রতিষ্ঠানের পোষ্য। পুরস্কার নয়, টাকাই কাম্য— স্কিম করে সেটিং সাহিত্য। এর জন্য দায়ী সংবাদপত্রের কর্পোরেট কালচার। আমাদের সাহিত্য সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রিত। যতদিন কর্পোরেট ছিল না, তখন সতীনাথ ছাপা হয়েছে। এখন যা ছাপা হয়, তা খায় না মাথায় দেয়— কেউ জানে না। এরা শুধু সাহিত্যকে ধ্বংস করছে না, পাঠকও নষ্ট করছে। অধিক ফলনের কারণে মাটির প্রজননের মতো মেধার প্রজননও কমতে লাগল। ওই যে বলেছি— ভারতীয় বাঙালিরা নিজের ভাষাকে ভালোবাসে না, তারা নিজেকেই ভালোবাসে না। কিন্তু ওপার বাংলায় পাঠক আছে, তাই সাহিত্য পত্রিকা আছে, কেন-না তারা নিজের জাতিসত্তাকে ভালোবাসে।

তবে একেবারে জীবনবিমুখ, রাজনীতিবিমুখ লেখাই শুধু হচ্ছে তা নয়, জীবনের, তার রাজনীতির লেখাও হচ্ছে— তুমিই তো তার উদাহরণ।

এখন কী লিখছেন? বড়ো লেখা…

পেশার চাপে উপন্যাস তেমন লিখতে পারিনি। এই লকডাউন সময়ে লিখলাম। প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস— ‘একদেশ ভাইরাস’। শুরুটা এরকম— ‘চারুবালা দেখল আগুনের গোলার মতো একটা মাছ আকাশে উঠল, শরীর ত্যাগ করে বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেল’।

বাঃ! চমত্কার! সেই মধুময় জাদু! আবারও কিন্তু জাদু কথাটা এসেই গেল— ভাষার জাদু!

হ্যাঁ, ভাষা নিয়ে খেলি আমি। তবে বর্ণনাটা ঘোর বাস্তবের— আসলে জলা ছিল, তা বর্তমানে উবে গিয়ে বহুতল… তা, মাছটা যাবে কোথায়? এখানে জাদু নেই কোনো, আছে ভয়ংকর এক বাস্তবতা।

অপেক্ষায় থাকলাম এ-লেখার। সাবধানে থাকুন, ভালো থাকুন। আর আরও আরও লেখা দিয়ে পাঠক আমাদের মননকে সমৃদ্ধ করুন— এই কামনা করি।

তুমিও ভালো থেকো।

প্রথম পাতা

Categories
অন্যান্য

করোনার দিনগুলিতে: অংশুমান কর

কবি ঠিক কতখানি নিষ্ঠুর?

আমার ব্লগে একটি লেখা লিখতে গিয়ে আমি লিখে ফেললাম যে একজন কবি, একজন শিল্পীও একজন নিষ্ঠুর মানুষ। শুনলে খানিকটা ধাঁধার মতো লাগতে পারে। মনে হতে পারে তা কী করে হয়?

Categories
অন্যান্য

করোনার দিনগুলিতে: মনোরঞ্জন ব্যাপারী

সামনে সময় ভয়ংকর

আমি ভালো নেই। মাথার মধ্যে সব-সময় দুশ্চিন্তা, রাতে ভালো ঘুম হয় না। চোখ বুজলেই ধেয়ে আসে নানান দুঃস্বপ্ন। প্রেশার সুগার খুব বেড়ে গেছে। আমি জানি কোভিদ-১৯-এর আক্রমনে কেউ আর ভালো থাকার কথা নয়।

Categories
অন্যান্য

করোনার দিনগুলিতে: সুস্নাত চৌধুরী

গ্রহে ও গৃহে ইতস্তত ঘুরে

অভিজ্ঞতা হল সেই জিনিস, যা আমাকে শেখায় আত্মোপলব্ধির পাঠ। ভুল ভেঙে মনে করিয়ে দেয় আমার অদক্ষতার কথা, অপারগতার কথা, অজ্ঞানতার কথা। মানুষের জীবন কোনোদিনই বেঁচে থাকার অনুকূল কিছু ছিল না। বলা ভালো, তার বেঁচে থাকাটাই এই মহাজগতের এক ব্যতিক্রম, ম্যাজিক। হয়তো অতিরিক্তও। তবু অতিমারির প্রকোপ যখন তার উপরে প্রত্যক্ষ প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল,

Categories
অন্যান্য

করোনার দিনগুলিতে: অমিতাভ মৈত্র

সিংহ, উট, মরুভূমি

ইচ্ছে ছিল না আক্রমণ করার, কেন-না ক্ষুধার্ত ছিলাম না আমি। বিকেলে মরুঝড়ের ভেতর দিয়ে দুলতে দুলতে, ঝড়ে প্রায় অদৃশ্য। আকার হারালে কোনো বস্তুর মতো, কোনো ওভারকোট বা ভ্রমণ পত্রিকা বিক্রেতার মতো দ্বিধাগ্রস্ত এগিয়ে আসছিল আর প্রথমে আমার মনে হয়েছিল বিরাট এক হাওয়া-ঠাসা বেলুনের পুঞ্জ সে।

Categories
অন্যান্য

করোনার দিনগুলিতে: প্রকল্প ভট্টাচার্য

কিসসা কোরেন্টাইন কা

আমি একজন শান্তশিষ্ট নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। আইন-কানুন মেনে চলি, বিশেষ করে, তাতে যদি পুলিশের বা প্রাণের ভয় থাকে। তাই লকডাউনের সময় নিজে নিজেই কোয়ারেন্টাইনের আইন মেনে ঘরবন্দী হয়ে আছি। মোটের ওপর, ভালোই আছি। বার-তারিখ গুলিয়ে যায়, তাই একটা হিসেব রেখেছি। সোমবার নিম-বেগুন খাওয়া হয়, তাই সকালে নিমপাতা আনতে নীচের বাগানে যাই। বুধবার কারিপাতা আনা হয়, আর যদি কুমড়োফুল জোটে।

Categories
অন্যান্য

করোনার দিনগুলিতে: পাপড়ি রহমান

লকডাউন দিনরাত্রির মর্সিয়া

অতিমারির এই দিনগুলোতে সবকিছুই কেমন ধীরে অথচ নিঃশব্দে বদলে যেতে শুরু করল। ধুপছায়া মেঘের একটা বিশাল চাঙারি উড়ে এসে যেন আচানক আড়াল করে দিল প্রত্যহের দেখা নীল আসমান। এখন ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নীলের সামান্য চূর্ণও আর নজরে পড়ে না, আসমান দূরে থাকুক। দৃষ্টির সীমানায় শুধু সারি সারি দালানের ম্লান-মূক দাঁড়িয়ে থাকা। সম্প্রতি অঢেল ক্লান্তি এসে তাদেরও যেন একেবারে গ্রাস করে ফেলেছে!