Categories
2021-June-Prose গদ্য

দেবব্রত শ্যামরায়

বাবাকে নিয়ে, ব্যক্তিগত

একজন সাধারণ মানুষ কত নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারে। নিঃশব্দ৷ আড়ম্বরহীন। বড়ো মানুষ চলে গেলে কাগজে লেখালেখি হয়। তাঁর কাজ নিয়ে কত আলোচনা। যুবা নায়ক আত্মহত্যা করলে গুণমুগ্ধরা দীর্ঘদিন কাঁদে। স্বাভাবিক। নামহীন মানুষের সে-সব বিড়ম্বনা নেই। তার জীবনের মতোই তার মৃত্যুও বড়ো মূল্যহীন৷ সে আর কোথাও নেই, দেহে নেই, আত্মায় নেই, তার জড় উপাদানগুলি ভেঙেচুরে পঞ্চভূতে লীন। সারা জীবন সংসার ঠেলে যাওয়া ছাড়া তার বৃহত্তর কোনো কাজ নেই। প্রিয়জনের স্মৃতি ছাড়া তার আর কোনো বাসভূমি নেই। সেই স্মৃতিও ক্রমশ ধূসর হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে একদিন। পুরোনো জামাকাপড় দিয়ে দেওয়া হবে একে-তাকে৷ চশমাটা শুধু পড়ে থাকবে তাকের কোণায়। এই নিভৃত, নিরুপদ্রব মুছে যাওয়াটাই প্রকৃতির ভারি পছন্দের জিনিস। এই মহাবিশ্বে বিরাট বিপুল নক্ষত্র বা ধরা যাক ছোটো কোনো ফুল, সবই টুপটাপ ঝরে যায়। এই লেখাটি লিখিত হওয়ার সময়েও খুব কাছে, হয়তো-বা বহু আলোবছর দূরে খসে গেল কেউ, তার খবর পৌঁছোল না কোথাও। এই নীরবতা যাপনই প্রকৃতির অভ্যেস। একমাত্র মানুষই ব্যতিক্রম— স্বজনবিয়োগে মানুষই বোধহয় সবচেয়ে বেশি কাঁদে, কেঁদে কেঁদে আঁকড়ে ধরতে চায়।

কোভিড আমার বাবাকে সহসা এই নীরবতা এনে দিল। কোভিড-মৃত্যু, তাই কোনো শ্মশানবন্ধু নেই। রাত দুটোর কোভিড-নির্ধারিত শ্মশান প্রায় জনশূন্য, শুধু ভাগীরথীতীরে দু-একটা কুকুর আর ভিনগ্রহী জীবের মতো পিপিই-পরা দু-জন শ্মশানকর্মীর ঘোরাফেরা যেন কোনো অচেনা ভবিষ্যতের এক ডিসটোপিক পৃথিবীর ছবি আঁকছে। এই নীরব প্রস্থান পিতার কাঙ্ক্ষিত ছিল কিনা জানি না, তবে স্বীকার করে নেওয়া ভালো, আচার-অবিশ্বাসী সন্তান সামান্য স্বস্তি পেল। মুখাগ্নি নেই, মন্ত্রপাঠ নেই, ব্রাহ্মণ নেই। নির্জন পবিত্র শোক ছাড়া বাইরে থেকে আরোপিত কিছু নেই। মনে হল, নিজের জন্যেও ঠিক এমনই নিরাভরণ বিদায় চায় সে।

বিদায় মুহূর্তটি শান্ত, নিরুপদ্রব— এই ভুল ভেঙে যেতে বেশি দেরি হল না। পিপিই-পরা সৎকারকর্মীরা অচিরেই নানা পরিষেবার দরপত্র খুলে বসলেন। কালো প্লাস্টিক সরিয়ে মৃতের মুখ দেখার মূল্য পাঁচশো, দাহের পর মৃতের নাভিকুণ্ডটি সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে চাইলে তার জন্য নগদ হাজার দুয়েক। তাঁরা জানায় যে শোকার্ত পরিজনকে তাঁরা বিরক্ত করতে চায় না, কিন্তু অনন্যোপায়, কারণ, নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কোভিড বডি নিয়ে তাঁদের ঘাঁটাঘাঁটি করতে হচ্ছে, অতএব এই সামান্য উপরিটুকু তাঁদের প্রাপ্য। না, কোনো পরিষেবাই আমার দরকার নেই, শুধু বাবার চলে যাওয়াটুকু দূর থেকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে চাই। তা সম্ভব নয়, কেন-না ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। অতএব পকেটে যা ছিল তা দিয়ে বকশিস মিটিয়ে যখন বেরিয়ে আসি, ততক্ষণে স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ারে অমোঘ চুল্লির ভেতরে ঢুকে গেছে প্লাস্টিকসমেত বাবার শরীর। অবিভক্ত ভারতের নারায়ণগঞ্জ জেলার কুমুন গ্রামে একাশি বছর আগে যে-শিশুটির জন্ম হয়েছিল, দেশভাগের পর ছিন্নমূল হয়ে দিদির হাত ধরে এপারে এসে জীবনভর যে-সংগ্রামের শুরু, তার সৎ ও পরিশ্রমী জীবনের শেষতম পার্থিব চিহ্নটি এক শরতের রাতে পানিহাটির গঙ্গাতীরে একটি কোভিড শ্মশানে চিরতরে মুছে গেল। আর কোভিডকালে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ হতভাগ্য স্বজনহারা মানুষের সঙ্গে একই সুতোয় জড়িয়ে গেল আমার নাম।

ভিড় করে আসে স্মৃতি। স্মৃতিতে ভর করে আর আত্মীয়স্বজনের কাছে শোনা কথা থেকে নির্মাণ করে নিই মানুষটিকে। কোন মানুষটার কথা বলি, কোন মানুষটাকেই-বা বাদ দিই! যে-মানুষটাকে কচি বয়সেই দাদা-দিদিদের সঙ্গে উদ্বাস্তু কলোনির রাস্তায় জলের লাইনে দাঁড়াতে হত। স্কুলফেরতা গোবর কুড়োতে হত তাঁকে, মা ঘুঁটে দেবেন বলে। সেই মানুষটা ব্যারাকপুরে দেবীপ্রসাদ স্কুলে অনেকবার অংকে একশো পেয়েছে, নব্বইয়ের নীচে কোনোদিন পায়নি। যে-মানুষ উঁচু ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই নিজের খরচ চালাতে নিয়মিত টিউশনি করত, এমনকী নিজের ক্লাসের ছেলেদেরও পড়াতে পারত। সেই মানুষটাকেই একদিন বাড়ির ওপর চাপ কমাতে পড়াশুনোর পার্ট দ্রুত গুটিয়ে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হতে হয়, টেকনিকাল স্কুলের সার্টিফিকেট নিয়ে আপন দক্ষতায় চাকরি জোটে সাহেবি ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানিতে। পদোন্নতি হচ্ছিল, হঠাৎ সাহেবি কম্পানি এ-দেশে ব্যাবসা গুটোনোয় চাকরি যায়। আর পরের চাকরি না করে হাতেকলমে কিছু করার তাগিদে কিছু সেকেন্ডহ্যান্ড মেশিন কিনে শুরু হয় একান্ত নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক্স। ইতিমধ্যে জীবনে প্রেম এসেছে। কালো লোককে কোনোদিনই পছন্দ ছিল না মায়ের। ফুচকাওলার রং কালো বলে ফুচকা না খেয়ে পয়সা ফেরত নিয়েছিল বর্ণবৈষম্যবাদী মা। এহেন মায়ের কালো প্রেমিক ও স্বামী জুটল। অতঃপর একটি সন্তান। সব কিছুর মধ্যে হুগলি শিল্পাঞ্চলের কয়েকশো অতিক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগের মধ্যে একটি হয়ে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নেয় বাবার কারখানা। সংকটও আসে, কখনো অর্থনৈতিক, কখনো-বা রাজনৈতিক। উত্থানে-পতনে, ঘাতে-প্রতিঘাতে এইভাবেই জীবন এগিয়ে চলে। জীবন যেরকম…

জীবন এরকমই। উনিশ অথবা বিশ। জনমানুষের তুচ্ছ যাপনের ভিড়ে আরও একটি সামান্য জীবনের কথা আলাদা করে উল্লেখ করা কী-ই-বা প্রয়োজন? সন্তানের আগ্রহ থাকতে পারে, কিছুটা পক্ষপাতও। কিন্তু প্রতিটি মানুষের জীবনেই তো এমন কাহিনি আছে, তাতে জিত আছে, হার আছে, কিন্তু সে-সবই বড়ো আটপৌরে৷ তাতে কোনো অতিরিক্ত বীরত্ব নেই, সমাজ-সংসারে হইচই ফেলে দেওয়া প্রথাভাঙা কৃতিত্ব নেই, অ্যাডভেঞ্চার নেই, বরং কিছুটা অসহায় ভীরুতাই থেকে যায়, ঠিক যেমন নকশাল আমলে প্রতি রাতে আপিস ও তারপর টিউশনি সেরে ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরত বাবা আর গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করত এক নববধূ।

কিন্তু আজ যখন বাবা নেই, মনে হচ্ছে, বাবার সঙ্গে বসে আরও কিছুটা সময় কাটানো উচিত ছিল আমার। আরও কিছুক্ষণ সময় কাটানোর খাতিরেই না হয় পাশে বসে দেখা উচিত ছিল বাবার পছন্দের সিরিয়াল। জানা হল না বাবার অনেক কিছু! আমি জানতে পারলাম না, কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, বাবার পছন্দের রং কী? আদৌ ‘পছন্দের রং’ শব্দবন্ধটা নিয়ে কোনোদিন কিছু ভেবেছে কিনা আমার সাদামাটা বাবা। জানা হল না, এ-জীবনে তাঁর কোনো অপ্রাপ্তির বোধ রয়ে গেল কিনা! হ্যাঁ, আন্দামানের গল্প শুনে কথায় কথায় একবার ঘুরতে যেতে চেয়েছিল বাবা। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের হাজারো বাধ্যবাধকতার চাপে সে-সব নিয়ে কথা হয়নি আর। ঠিক যেমন জানা হল না, আর একটিবার বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে নিজের গ্রামের মাটিতে দাঁড়ানোর ইচ্ছে ছিল কিনা! সম্ভবত না, বাবা পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে ভালোবাসত না তেমন। সকালের বাজার, বসবার ঘরে নিজের চেয়ার ও টেবিলে খবরের কাগজ, চায়ের ফ্লাস্ক আর টিভির রিমোট নিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছিল অবসরের দিনগুলো। বাবার হাতে অনেক সময় ছিল কথা বলার জন্য, আমারই শোনার সময় ছিল না তেমন। তাই অনেক কিছুই ভালো করে জানা হল না, বাবা…!

ঠিক যেমন জানা হল না… কোভিড হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডে জীবনের শেষ সাতদিন একা একা শুয়ে, কষ্ট পেতে পেতে, চেতন থেকে অচেতনের দিকে ক্রমশ ডুবে যেতে যেতে, কার কথা ভাবছিল লোকটা? মায়ের কথা? উজানের কথা? কার মুখ দেখতে ইচ্ছে করছিল, শেষবারের মতো কার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল বাবার?

কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার পর বাজারে গেলে বাবা মাঝেমধ্যে হারিয়ে যেত। এক ঘণ্টা… দু-ঘণ্টা। আমি বাড়ি থাকলে মা-র ঘ্যানঘ্যান সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে পড়তাম। হন্যে হয়ে বাবাকে খুঁজতাম।

আমাদের সবুজ মফস্সলে রাস্তার দু-ধারে সকালের রোদে বাজার বসত। আশেপাশের গ্রাম থেকে তাজা শাকসবজি আর মাটিমাখা ডিম নিয়ে আসতেন চাষি-বউ। খুব ভোরে ঘোষেদের পুকুরে জাল পড়ত। ওপার বাংলার রোদে-জলে পুষ্ট বাবার নিয়মিত মাছ না হলে চলত না। শাকও কিনত প্রচুর। বাজারের থলে উপচে পড়ত কলমি, পালং, আলোরং কুমড়ো ফুলে। মা-র মুখ ভার হত। এত শাক আনো কেন? নষ্ট হয় তো! বাজারে গিয়ে বাবার প্রথম কাজ ছিল এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘোরা। বাজার করার এটাই নাকি প্রথম সূত্র। বাজার করার আগে বাজারকে হাতের তালুর মতো চিনে নিতে হয়। দেখতে হয় কার কাছে আজ ভালো কী কী এসেছে, কী তার দাম। তারপর বাজার করা শুরু।

শুরু হত বটে, কিন্তু বাজার করা শেষই হত না অনেক সময়। বাজারের মাঝখানে ঢুকে পড়ত গল্প। রাজনীতির আলোচনা। গরম চায়ের গেলাস। সকাল হলেই আমাদের শান্ত শহরতলির রাস্তা ভরে উঠত সাইকেলের ঘণ্টিতে৷ জার্মান সিলভারের সস্তা টিফিন বাক্স চটের ব্যাগে ঝুলিয়ে সাইকেল চেপে আশেপাশের কলকারখানায় পৌঁছে যেতেন পানিহাটি শিল্পাঞ্চলের মানুষজন। ঠিক আটটায় জুটমিলের ভোঁ বাজত। পাড়ায় কোনো-না-কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসত বিনুনিবাঁধা বালিকার গলা সাধার আওয়াজ৷ চায়ের দোকানের কয়লার উনুনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকত হেমন্তের অলস সকাল। রাস্তার পাশে সেদিনের গণশক্তি আটকানো থাকত বাঁশের চটায়। বাবা একাধিক খবরের কাগজ পড়ে, চা খেয়ে, চেনাজানা নানা মানুষের সঙ্গে আড্ডা মেরে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরত। বাড়ির কাছাকাছি এলে অবশ্য হাঁটার গতি বেড়ে যেত৷ অপেক্ষমান মায়ের রাগত মুখটা মনে পড়ত বোধহয়। যেদিন মনে পড়ত না আমি গিয়ে খুঁজে আনতাম। বাবাকে পেতাম কোনো চায়ের দোকানে, খবরের কাগজের ঠেকে অথবা ধীরে ধীরে সংখ্যায় কমতে থাকা বন্ধুদের আড্ডায়।

বহুদিন আর সাইকেলের ঘণ্টি কোরাস শোনা যায় না। মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে কবেই। বেশিরভাগ কারখানা ভেঙে তৈরি হয়েছে টাউনশিপ। বাস্তু-অনুমোদিত অ্যাপার্টমেন্ট্স। সত্তর শতাংশ গ্রিনারি। এছাড়া যে-সব কারখানার জমিজমা নিয়ে মামলা চলছিল, সেগুলোও এক এক করে কিনে নিয়েছেন এলাকার এমএলএ-র জামাই। গোডাউন তৈরি হবে। পথের দু-ধারে মাথা তুলেছে আরও কিছু শ্রীহীন আবাসন। রাস্তা থেকে উঠে এমনই এক আবাসনের নীচে ঢুকে গেছে পুর বাজার। কৃত্রিম আলোয় ছলকে উঠছে মৃত মাছের চোখ। অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে কাতলার ট্রাক ঢুকেছে রাতের শহরে।

আজ বাজারের সামনে ফ্ল্যাটের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে এইসব পুরোনো কথা মনে পড়ছিল। বাবার ক্রিমেশন সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে আমি তখন হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছি একটা জেরক্সের দোকান!

মানুষ বুড়ো হলে হঠাৎ একসময় আকাশের তারা হয়ে যায়। উজানের দাদা অর্থাৎ, ঠাকুরদাও তারা হয়ে গেছে— বছর পাঁচেকের শিশুটিকে শোকে কিছু আস্বস্ত করার তাগিদে বিষয়টা এইভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু তাকে এসব বলার পর থেকে আরেক নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছে৷ এখন সে যার নামই শোনে— মার্ক জুকেরবার্গ থেকে মমতা ব্যানার্জি— একবার জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নেয়, দুর্দৈবক্রমে এঁরা কেউ স্টার হয়ে গেছেন কিনা! বালাই ষাট!

যাইহোক, শিশুদিবসে উজানের ইশকুল থেকে অনলাইনে বাড়ির কাজ এসেছিল— এক পাতা হাতের লেখা— আই লাভ চাচা নেহেরু। চাচা নেহেরু কে? চাচা নেহেরু কি তারা হয়ে গেছে? হ্যাঁ, তা হয়েছে। করোনায়? না না, অনেকদিন আগেই। চাচা নেহেরুর সঙ্গে কি আমার দাদার দেখা হয়েছে? আমি ভাবতে চেষ্টা করি, নেহেরু যখন রাণাঘাটে উদ্বাস্তু শিবিরে এসেছিলেন, বাবারা ততদিনে ব্যারাকপুর সদরবাজারে, মুসলিমদের খালি করে চলে যাওয়া মহল্লায়। অর্থাৎ, জীবিত অবস্থায় কারো সঙ্গে কারো দেখা হয়নি। কিন্তু উজান আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দেয়, ওই যে চাচা নেহেরু আর দাদা গল্প করছে। আমি সন্ধ্যের আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাই। দেশভাগের ক্ষত পুষে রাখা ও একসময় সক্রিয়ভাবে আরএসএস করা আমার বাবা আজ নেহেরুকে দেখে খুশি হচ্ছেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। নাকি আজকের রামরাজত্বে নেহেরুকে সামনে পেয়ে তিনি একটু খুশিই হচ্ছেন? মনে আছে, আঠাশ বছর আগের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি-ভাঙাকে জাস্টিফাই না করতে পারলেও আমার মতো বিষণ্ণ ও ক্রুদ্ধ হতে পারেননি আমার বাবা। তারপর থেকে ক্রমশ বুড়ো হতে থাকা বাবাকে যত আঁকড়ে ধরেছি আমি, পুত্রের থেকে পিতা, রাজনৈতিক বোধে ও দৃষ্টিকোণে, ততই দূরতর হয়েছেন। সে-দূরত্ব আর ঘোচেনি।

উজান আঙুল দিয়ে দেখায়, দাদার পাশে অন্য ছোটো তারাটা কে বলো তো বাবাই? কে রে? ওটা পদ্মাপিসির শাশুড়ি। আমি হেসে ফেলি। পদ্মাদি, উজানের পদ্মাপিসি আমাদের পরিবারের গৃহপরিচারিকা। সম্প্রতি বৃদ্ধা শাশুড়ি মারা যাওয়ায় অশৌচ পালনের জন্য পদ্মাদি কাজে আসতে পারেনি বেশ ক-দিন। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, দুই বিরুদ্ধমতের পুরুষ কথা বলছেন, তর্ক করছেন। আর এক অনামা বৃদ্ধা চুপচাপ তাঁদের জন্য দু-কাপ গরম চা করে দিচ্ছেন। মৃত্যুর পরেও গৃহপরিচারিকার জীবন থেকে তাঁর মুক্তি হল না, এই ভেবে তিনি দুঃখিত হচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘশ্বাসে তারার আলো কাঁপছে।

সকালের বৃষ্টিধোয়া গঞ্জের বাজার। কাঁচা আমলকি একশো গ্রামের দাম পঁচিশ টাকা। অর্থাৎ, আড়াইশো টাকা কিলো। বেশ দাম! আমি আমলকি কোনোদিনই পছন্দ করতাম না তেমনভাবে। বাবা ভালোবাসতেন। দুপুরে খাবার পর আমলকি কেটে অল্প অল্প নুন ছুঁইয়ে খেতেন। মাকে দিতেন৷ আমাকেও জোর করতেন খাওয়ার জন্য। কখনো খেতাম, কখনো খেতাম না। আমলকি খাওয়ার পর এক গেলাস জল খেলে মুখটা মিষ্টি হয়ে যায়। আজ হঠাৎ আমলকি খেতে ইচ্ছে করল। বাবার স্মৃতি ক্রমশ ধূসর হচ্ছে। আমি খুব চেষ্টা করেও আজকাল আর মনে করতে পারছি না বাবার সবগুলো ওষুধের নাম। এক বছর আগেও যা ঠোঁটস্থ ছিল। অন্য দিকে আমি আস্তে আস্তে বাবার মতো হয়ে যাচ্ছি। সেই একইভাবে চুলে পাক ধরছে আমার। একইভাবে বাজার ঘুরে ব্যাগভরতি সবজি নিয়ে বাড়ি ফিরছি। বাবা প্রায় সব সবজিওয়ালা মাছওয়ালাদের নামে চিনতেন। তাঁদের বাড়ির খবরাখবর জানতেন। আমিও চিনতে শুরু করেছি অনেককেই। একটাই কারণ— বৎসরাধিক কোভিডকালে ও বাবার অবর্তমানে আমার বাজার যাওয়াটা অনেকটাই বেড়ে গেছে। সৌমেন সকালে ডিম বিক্রি করে৷ বিকেলে টোটো চালায়। গত লকডাউনে ব্যাবসা লাটে ওঠায় বাজারে মাছ নিয়ে বসেছিল কেউ কেউ। তাঁদের অনেকে এ-বছর ফিরে গেছে পুরোনো পেশায়। অটো বন্ধ ছিল যখন, সিনেমাহলের সামনে চিকেন তন্দুরের ঠেলা বসিয়েছিল রতন। বেশ সস্তা। ভালো রোজগারও হচ্ছিল। কিন্তু ওরা চিরকালের মার্কামারা বাম পরিবার বলেই নাকি তৃণমূল-নিয়ন্ত্রিত ব্যাবসায়ী সমিতি আনলকের শুরুতেই তন্দুর উঠিয়ে নিতে বলেছে, রতন সেদিনই বলছিল।

যে-কথা বলছিলাম, আমি বাবার মতো বুড়ো হয়ে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। আত্মা জলে ভেজে না, আগুনে পোড়ে না…। আত্মা বুড়ো হয় শুধু। ক্রমশ আমার হাঁটার গতি কমবে। শান্ত হয়ে আসবে হরমোন। মাঝেমধ্যে খিটখিট করব। ফুল সাউন্ড দিয়ে টিভি দেখব, এতটাই যে বিরক্ত হবে বাড়ির লোক। আর আমলকি খেতে ভালো লাগবে খুব। একশো গ্রাম ওজনে পাল্লায় চারটে মাত্র আমলকি। তাদের সবুজ শরীরে সবে হলুদ রং ধরেছে। আজ খাওয়া-দাওয়া সেরে অল্প নুন লাগিয়ে খাব৷ বসার ঘরে রাখা কাঠের চেয়ারটা ফাঁকা। সপ্তাহ মাস বছর গড়িয়ে যাচ্ছে। বর্ষা আসতে এখনও কয়েকদিন দেরি। একটুকরো অসময়ের মেঘ ঝুলে রইল শেষ দুপুরের আকাশে।

Categories
2021-May-Prose গদ্য

তন্ময় ভট্টাচার্য

বাঁ-হাতে ছুড়ে দেওয়া লেখা

সময় আর দিনকাল— এ-দুই নিয়ে ভারি ভ্রান্ত ধারণা কাজ করে মনে। অবশ্য দুয়ের মধ্যে ফারাকও কি আছে কোনো? নিজস্ব অবস্থান অনুযায়ী বিচার করি। মনে হয়, এখনকার মতো খারাপ সময় আর আসেনি। নাকি সময় বরাবরই খারাপ, আমি-অবধি এসে পৌঁছোয়নি বলে নিশ্চিন্ত ছিলাম এতদিন?

সমাজের দিকে তাকাই। বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে খারাপ আর কীই বা হতে পারে! ‘আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়ো’— এই স্পর্ধামাখানো বাক্য বলার সাহসই-বা দেখাতে পারছে কে! চরমতম পরিণতি যা— মৃত্যু— সেই সুন্দরই আজ ওঁৎ পেতে রয়েছে চারপাশে। মৃত্যুচিন্তার শরীর থেকে খসে পড়ছে বহুকল্পিত সৌন্দর্যও। কদর্য ডাক আর তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা— জীবৎকালের হিংস্রতম চোর-পুলিশ খেলার সামনে দাঁড়িয়ে, আর কোন চেতনাই-বা জরুরি হয়ে উঠবে!

যদি সমাজবিচ্ছিন্ন হতাম, কিংবা মারিসীমানার বাইরে নিরাপদ অবস্থান কোনো, সময় ‘কু’ হত না ততখানি। বরং দূর থেকে বিচার করতে পারতাম; কে জানে, হয়তো নিগূঢ় কোনো দর্শনও উঁকি দিত অবরে-সবরে। কিন্তু প্রবলভাবে জড়িয়ে থেকে এটুকু বুঝেছি, পেট আর পিঠ বাঁচানোর লড়াই-এর থেকে কঠিন কিছুই নেই। নিজের ও আত্মস্বজনের পিঠ বাঁচাতে বাঁচাতে, না-পেরে, সর্বাঙ্গে চাবুকদাগ নিয়ে আর যাইহোক, সাহিত্যবিলাস হয় না। তাও এই স্বল্প সময়ে— যখন ধাতস্থ বা অভ্যস্ত হতে অনেক দেরি, চাইছিও না হতে, বরং অসম লড়াইয়ে বার বার হার মানাতে চাইছি মৃত্যুকে। শব্দ খুঁটে-খুঁটে লেখার মন আজ মৃত। তবে মনের সুবিধা এই, উপযুক্ত সঞ্জীবনী ছিটিয়ে তাকে বাঁচিয়ে তোলা যায় আবার। দৈহিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে সেই বিকল্প নেই। ফলে, বেঁচে থাকলে, মনকে ফিরিয়ে আনা দুষ্কর হবে না ততটাও। আপাতত এই কেঠো, অপরিকল্পিত ও চলনসই গদ্যেই সময়ের কাছে নতিস্বীকার।

বিপরীতে অন্য চিন্তাও যে উঁকি দিচ্ছে না, তা নয়। এতখানি সীমাবদ্ধ হয়ে গেলাম? বর্তমান ও তার সমস্ত নেতি-কে অতিক্রম করার যে-পথ, তা থেকে পিছলে গেলাম এতখানি! আমারই অবহেলা এর জন্যে দায়ী, সন্দেহ নেই। নিজেকে ভেসে যেতে দিয়েছি, ঝাঁপিয়ে পড়েছি বাইরের কলরোলে। কিন্তু ভয়ংকর এ-বাহিরের সামনে আত্মসমর্পণ না করেই-বা উপায় কী! সমাজ তো বটেই, ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে— মৌলিক ‘আমি’-র অস্তিত্বেও যখন ভয় ঢুকে পড়ে, মনে হয়, রেহাই নেই এবার। শিল্প-সাহিত্য সেই স্তর অবধি পৌঁছোতে পারবে না। অন্তত, স্বল্প জীবনকালে এমন সংকট এর আগে দেখিনি আমি। যে-মানুষ নিজের বা অন্যের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত, সমস্ত শৈল্পিক সৌকর্য সে ঢেলে দেয় মুহূর্তের ওই ক্রিয়াতেই। কোনো কবিতা-গান তখন অস্ত্র হয়ে আসে না। অস্ত্র হয় না শব্দব্যবহারের অপার্থিব সূক্ষ্মতা। বরং, শিল্পের চোখে যা ‘স্থূল’, সেসবই বাঁচাতে পারে মানুষের প্রাণ।

তাহলে শিল্পের ভূমিকা কী? বার বার খুঁজছি এর উত্তর। মারিতে আক্রান্ত বা মৃত কোনো মানুষকে কেন বাঁচাতে পারল না শিল্প? কেন নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা-উচ্চারণেই থেমে গেল তার দৌড়?
উত্তর দিয়েছে শিল্প নিজেই। মনের সঙ্গে কারসাজি তার। এবং, মনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যেটুকু শরীর, তার সঙ্গে। শরীরের শরীর সে ভেদ করতে পারে না। ভাইরাস পারে।

এবং, এতদিনকার আলোড়িত সেই কথাই প্রতিধ্বনিত হল আবার। সামান্য ভাইরাসের কাছে আমাদের চর্চা কৃষ্টি বোধ সূক্ষ্মতা সব অসহায়। ফলে, যে-অস্ত্র অবশ্যম্ভাবী, তাকেই তুলে নিতে হত। আর এই লেখা? থেকে যাক সময়ের অভিশাপ হয়েই। এর বেশি কোনো ভূমিকাই নেই এর। দুঃসময় কাটলে, হয়তো ফিরে পড়ব। অস্তিত্বের চরমতম সংকটে, না, কবিতা পাশে এসে দাঁড়ায়নি। দাঁড়িয়েছিল চিকিৎসা। বন্ধু। ‘বন্ধুর কবিতা থেকে আমাকে আবার দেখা যায়।’ এই মারিকালে, বেঁচে থাকার চেয়ে বড়ো কবিতা আর নেই। ‘জীবন’ নামের সেই কবিতাই প্রতিফলিত করছে আমাকে-তোমাকে। বেঁচে থাকা দেখতে পাচ্ছি আমি। তোমার মধ্যে। আয়নায়। লিখে-ফেলা এই অসংলগ্নতায়।

মনে পড়ে চাঁদ সওদাগরের কথা। অনিচ্ছুক হয়েও মনসার পূজা। বাঁ-হাতে ছুড়ে দিয়েছিলেন ফুল। পরিবর্তে, ফিরে পেলেন বাণিজ্যতরী। আমার এ-লেখাও তেমনই, বাঁ-হাতে ছুড়ে দেওয়া। যতই তাৎক্ষণিক হোক, না-লিখে উপায় নেই। অধরা রইল নীরস তরুবরও। কিন্তু শুষ্কং কাষ্ঠং থেকে যাওয়ার সামর্থ্যটুকু ছিনিয়ে নিতে পারবে না কেউ।

বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, আবার স্বাভাবিক হবে সব। ফিরে পাব আগেকার ডুব। কোনো-না-কোনো মুহূর্তে, কারো কবিতা পড়ে আফশোস জন্মাবে আবার। মনে হবে, যদি লিখতে পারতাম এমনটি। বেঁচে থাকা সেই অতৃপ্তি উপভোগের জন্যেই। জীবন— কবিতা— এক-একটা হাতছানির নাম। সমুদ্রের বুকে বাড়তে থাকা ঘূর্ণিঝড়ের মতো। ডাঙায় আছড়ে পড়বে, ধ্বংসও আনবে; তবু না-পড়া অবধি, শান্তি নেই, শান্তি নেই তার…

Categories
2021-May-Prose গদ্য

সুপ্রিয় মিত্র

জনহিত মে জারি

মৃত নক্ষত্র থেকে নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়। ভুল কথা। মৃত নক্ষত্র একা সেই জন্ম দিতে পারে না। দু-টি মৃত নক্ষত্র তাদের ধুলোবালি, হাওয়া নিয়ে মহাশূন্যের সংসারে এমন এক সংঘর্ষের মুখোমুখি হয় যে, তারা ফের জ্বলে ওঠে। এ এক পলিটিকাল ইনকারেক্টনেস। এত ঝামেলা আছে, তাই আমি-তুমি আছি। বা ছিলাম। কারণ, নক্ষত্র হয়ে ওঠা মাত্র তারা আবার একে-অপরের থেকে দূরে সরে যায়। তাদের চারপাশে গ্রহ ঘোরে ফেরে। এমনকী, ঘুরপাক খায় গ্রহদোষ। এ দোষ উদ্ভাসের। যেভাবে কথায় কথা বাড়ে। আলোও তেমন। আলো সতত ঘনিষ্ঠ নয়, যতটা অন্ধকার। এমনকী এককও নয়। নিজের উৎসের মধ্যেই বন্দি হয়ে পড়ে। সময় ও পরিসরের বক্র অভিসারে মহাসংসারের খেলা জমে ওঠে।

নক্ষত্রজগতের মতো, আমরা নিঃসঙ্গ। একক হওয়ার তাড়নায় একা। যেভাবে শিকারিকে তাড়া করে শিকারের প্রত্যাশা। আমাদের দূরে সরে যাওয়া, আমার-তোমার গুণ। ওই যে নিকটস্থ ভার্গো তারাজগৎ, সেকেন্ডে ১২০০ কিমি বেগে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ওই যে দূরতর নক্ষত্রদ্বীপ ‘থ্রি সি-২৯৫’ ১ লক্ষ ৫০ হাজার কিমি প্রতি সেকেন্ড বেগে সরে যাচ্ছে আমাদের থেকে— এও কি আলোহীনতা নয়? যত দূরের, তত দ্রুত সরে যাওয়া। যত কাছের, তার গতি তত কম। তবু, সরে যাওয়া থেকে এর ছুটি নেই।

শ্মশানে বন্ধুর মুখাগ্নি করতে গিয়ে, কবরিস্তানে বন্ধুকে নুন-মাটি দিতে গিয়ে, এ-সত্য জ্বলে ওঠে। জ্বলে ওঠে সোডিয়াম লাইট। সম্পর্কের, অনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে। আর নিয়ন্ত্রণে যা থাকে, তা কেবল সংঘর্ষ। আছে বলে, জ্বলে ওঠা আছে। আছে— এই থাকাটাই অনঙ্গ নিয়তি।

আর, এ-সবের থেকে কিছু দূরে, বসে আছে গাছ। টাটানো সিলিন্ড্রিকাল দেহ। পাখি এসে মায়া বাড়িয়ে দিচ্ছে, ঋতু এসে পিঠ চাপড়ে দিয়ে যাচ্ছে— চালিয়ে যাও, আরও থাকো, চুপ করে বেঁচে থাকতে হবে, দোস্ত!

এ যেন এক নীতিশিক্ষা— যত চুপ করে থাকা, তত প্রাণ। একদম চুপ করে যাও। কেবল হাওয়া এসে চুল আঁচড়ে দিয়ে যাবে। তাকে তুমি ঘেঁটে দেওয়া ভেবো না। তারপর দ্যাখ, তোমার সমস্ত দেহ ও দেহবুদ্ধি থেকে বেরোচ্ছে শ্বাসবায়ু। তোমার নিশ্বাস নিয়ে আর একজন কথা-বলা-দেহ বেঁচে আছে। তুমি তাকে অক্সিজেন জোগাচ্ছ।

তাই বলে, তুমি যেন মরে যেয়ো না। কিংবা, মরে গেলেও কী আর হবে।

এভাবেই সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

চোখে জল নেমে আসে। উড়ে আসে ঝড়। আমি থেমে আছি। আর, সকালে পর্বতের হাওয়া, দুপুরে সমুদ্রের, ভোররাতে মরুবায়ু আমায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। এও কি ভ্রমণ নয়, এ কি নয় প্রকৃতির কাছে যাওয়া? আসে না কেবল অরণ্যের সমূহ বাতাস। পড়শির বাগানের ফল-ফুল-মূল না খেয়েও, অক্সিজেন ভোগ করে যেভাবে মানুষ এবং অজান্তে দ্রাক্ষাবনের শেয়াল হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে ধোপার কাঁধে গাধা, হয়ে ওঠে জনমদুখী বাপের বাস্তুশোক— অরণ্যের দুঃস্বপ্ন নিয়ে, বনানীর নিশ্বাসচিন্তা বয়ে, সেও একদিন ভাবে— আর ক-টা দিন পর মৃতবন্ধুর সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাবে। এবং সংঘর্ষ হয়ে পড়বে পুনর্নিয়তি। মানুষের চলে যাওয়া থেকে মানুষ এই আশ্বাস কুড়োয়।

এবং সে কাঁদে। বিশ্বাস আছে বলে কাঁদে।

জানলা-দরজার নাম রুদালি। হাওয়ার সঙ্গে সংযম অভ্যাস করে যারা, তারা একসময় সেই হাওয়ার প্রতি ক্লান্তবোধ করে বা নিজেরাই হাওয়া হয়ে ওঠে। ঝড় যেন সেই তালে থাকে। সম্পর্ক তো এমনই। হম রহে না হম, তুম রহে না তুম। কিংবা, পদ্মাবতীর বিবাহমঙ্গল। নিজেকেই তার প্রেমিক মনে হয়, নিজেই সে প্রেমিকা। প্রেমিককে মনে হয় সে। আলম্বন, উদ্দীপন।

জানলা এখন হাওয়া। হাওয়া এখন দরজা। ঘরে ঢুকে পড়ছে। বাইরে থেকে বন্ধ হয়, না কি ভেতর থেকে খোলে, কেউই সবটা বলতে পারে না। কিংবা সবই একপ্রকার হাওয়া। ধুলো জমাট হলে আকার আছে, নয়তো নেই।

ঘরে হাওয়া খেলানোর যারা রিংমাস্টার, সেই জানলা আর দরজা এখন বুক চাপড়ায়। মানুষের থেকে তারা একটা জায়গার নামই উচ্চারণ করতে শিখেছে। দমদম। দ্দম দ্দম দ্দম দ্দম। এয়ারপোর্ট? সেখানেও হাওয়ার আখ্যান। বার্নৌলির নীতি দিয়ে বাড়িকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন? জানলা দরজা এখন বাড়িদের ডানা। উড়তে পারে না। কিন্তু এই ক্ষুদ্র সাহসদের বরাবর ভয় পেয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠান। কৃষককে ভয় পায় রাজধানী, শ্রমিককে ভয় পায় কারখানা, পৌরুষ-শূন্যতাকে ভয় পায় পুরুষতন্ত্র, লিট্ল ম্যাগাজিনকে এড়িয়ে থাকে স্যর-ম্যাডামদের পত্র-পত্রিকা, রাস্তার হোটেলকে ভয় পায় বড়ো রেস্তোরাঁ। তেমনই হাওয়াকে ভয় পায় ঘর। ফলে ততটুকু, যতটা বিলাসের। কিন্তু বিলাস একসময় মুক্তি পেয়ে বিধ্বংসী হয়ে ওঠে।

গরম ভাত কে না চায়। কিন্তু আঙুল তাকে সমঝে চলে। ফুঁ-সহযোগে তার গরাস ওঠে। ফুঁ বেড়ে গেলে ভাত ছিটকে যাবে। কিন্তু ভাত শুকিয়ে গেলে শুকনো বিপদ। গলা দিয়ে নামতে কষ্ট।

ওই যে, আধপেটা শ্রমিক, ফ্যানভাতে বাঁচে। কিন্তু, সতত জল বিনা কে চলিতে পারে? সতত জল যেভাবে জীবন, সেই জীবনখানি জলের ধর্মে উচ্চ থেকে নীচে ছুটে যায় যেহেতু, প্রতিষ্ঠান চায় একে পৃথিবীর অভিকর্ষ-দোষ বলে চালিয়ে দাও। জীবন যে বাধ্যত জল, সে-কথাটি এখানে উচ্চারণ কোরো না। পাঁচশো-হাজার কিলোমিটার অনুল্লিখিত সে ছুটে যাক, বাস্তুভিটের নামে, শিকড়ের নামে, আশ্রয়ের নামে, অপলাপের নামে, সে যাক। তার পরিধি যতটুকু বড়ো হয়েছে, যেন গোল্লাপাক খেতে খেতে বিন্দুতে গিয়ে গুমখুন হয়ে ক্ষান্ত হয়। জীবনের পিয়াসায়, প্রাণবায়ু যেন বড়ো হয়ে ওঠে, যেন ভবঘুরে শাস্ত্রস্নিগ্ধ নয়, গড়িয়ে যাওয়া শেষত পাথরের ধর্ম পায়। কেবল বেঁচে থাকাটাই যেন অনঙ্গ অভিজ্ঞতা লাগে। এইরূপে ঝড় প্রলয়ের হাওয়া-সহ আসে। অতিথি হয়ে নয়। কোল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে আসে, হে ধর্ম, তোমার সন্তান। সন্তানের ধারক বা বাপ-মা এখানে সন্তানের জাগরণ, জ্বালানি। যেহেতু তাদের ক্ষয় অবশ্যম্ভাবী, যে-কোনো অপত্যের স্নেহে।

ঝড়ের জ্বালানি কি বৃষ্টি? ততক্ষণ, যতক্ষণ মেঘের পেটে সে রয়েছে? ফুরালে ঝড়ও ফুরিয়ে আসে? বাচাল হাওয়া এ-সব বোঝে না। মেঘ চুরি করে আনে। বিপদ সে চায়, কিন্তু শুকনো বিপদ চায় না। জলকে দলে টানে। জল, যা মরণোত্তর। হাওয়া, যা জীবনবিমুখ।

কেন এতক্ষণ ধরে পড়ছেন? যান, দেখুন, দরজা-জানলা-সিলিন্ডারে কোনো লিক রয়ে গেল না তো?

Categories
গদ্য

উৎপলকুমার বসুর অগ্রন্থিত গদ্য

শিশুসাহিত্য প্রসঙ্গে

কোথায় যেন পড়েছিল— বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। বহু অর্থহীন প্রবচনের মতো এরও আছে যুক্তিহীন অবিস্মরণীয়তা। এভাবে আমরা চমৎকার উপায়ে সমাজকে চিরদিনের মতো,  ছকে ফেলে, ভাগ করে দিতে পারি— জেলেরা জলে সুন্দর, ধোপারা সাইকেলের পিছনে বা শত্রুরা কারাগারে সুন্দর, নাগরিকতা ধর্মতলায়। হেন সৌন্দর্যবোধ ব্যতিক্রমকে অগ্রাহ্য করে। সঠিক ব্যতিক্রম-চিন্তা মাথায় না থাকার ফলে আকাশ থেকে খসে পড়া বহু আকর্ষণীয় ঘুড়ি আমরা শেষ পর্যন্ত ধরতে পারিনি। শুধু গতিবিক্রম এর জন্য দায়ী নয়, এর পিছনে ছিল ভুল জ্যামিতি জ্ঞান, ভুল উচ্চতা নির্ণয় এবং গ্রামের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছেলেটি, যে একইসঙ্গে ছিল বায়ুবিজ্ঞানী ও হঠকারী, মসজিদ হইতে পতনের ফলে যে ভবিতব্যতার দেখা পেয়েছিল— তাহলে তার সম্বন্ধে বলতে হয়, সে ছিল ছাদের সুন্দর। মুঙ্গেরের ভূমিকম্প অবশ্য মুঙ্গেরে সুন্দর বলা চলে না।

অনুরূপ, ব্যতিক্রমী একটি তালিকা যদি তৈরি করি তবে দেখা যাবে কত-না ভুল ধারণা আমরা বাস্তুসাপের মতো পুষে আসছি যেমন, আমরা ভাবি শিশুদের জন্য, কিশোরদের উপকারার্থে একটি বিশেষ ধরনের সাহিত্য আছে বুঝি, যার নাম শিশুসাহিত্য। অতীতে যে রামায়ণ মহাভারত বুড়ো-বুড়িরা শুনত, তাই বালকের বা বালিকার পক্ষে ছিল পর্যাপ্ত। যে-নিসর্গের সঙ্গে চিরদিন প্রাপ্ত বয়স্করা যুদ্ধ ও মৈত্রী ঘোষণা করেছিল— ওরা তারই রণক্ষেত্রে অকুতোভয়ে ঘোরাফেরা করেছে। তার আলাদা জগৎ তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি— কারণ, আলাদা জগৎ বলে কিছু নেই। যেমন, নেই বিশেষ সাহিত্য— শিশুসাহিত্য বা মহিলা সাহিত্য বা রেল কর্মচারীদের জন্য সাহিত্য।

শিশু সাহিত্য আসলে এক মরালিটি বোধ থেকে জাত শিল্প প্রচেষ্টা। এবং ভিক্টোরিয়ান আমলে এর বহুল প্রচার ঘটে। পাপবোধ বুঝি পাপের চেয়েও দুর্বল। তাই ভিক্টোরিয়ান দুর্নীতির সঙ্গে সঙ্গেই ‘শিশুসাহিত্য’ নামে এক সুনীতি প্রচার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। লিউইস ক্যারল গোপনে কিশোরীদের ফটোগ্রাফ তুলতেন সদ্য আবিষ্কৃত একটি বিস্ময়কর যন্ত্রের সাহায্যে যার নাম ক্যামেরা। তাঁর ডায়েরি এবং সমসায়িকদের চিঠিপত্র থেকে জানা গেল এই অকৃতদার, স্বল্পবাক্ অধ্যাপকের ঘরে ‘লজেন্স টফি’-র লোভে বালিকাদের আনাগোনা ছিল। অপর দিকে তাঁরই রচিত শিশুসাহিত্যে— যা মনোমোহন কাব্যের মতো উদার, জটিলতাময় ও উন্মুখর— সেই ভিক্টোরিয়ান যুগেরই নীতিসঞ্চান দেখতে পাই। ব্রহ্মা সুকুমার রায় সে-ধারার প্রচলন ঘটালেন আমাদের সাহিত্যে।

আজ মনে পড়ে, প্রবাসী বা ভারতবর্ষে একদা যে-কাহিনিগুলি ছাপা হত তা ছিল আকর্ষণীয়। কিন্তু, অর্ধনগ্না মহিলাদের ছবিগুলির কথা ভুলিনি। আমাদের যে সেনসুরালিটি তৈরি হয়েছিল— তাতে উভয়েরই অকৃপণ হস্তক্ষেপ ছিল। বুঝি-বা মনে হয়েছিল দূর আজমিড় পাহাড়ের মতো কোনো এক রহস্যময় উপত্যকায় ওই স্বপ্নময়ীদের সন্ধ্যাজল থেকে উঠে আসা।

শিশুসাহিত্যের আশ্চর্য ও অফুরন্ত প্রকাশ ঘটেছিল ওই ভিক্টোরিয়ান আমলে। অধুনালুপ্ত ‘বয়েজ ওন বুক’ জাতীয় কিশোর পত্রিকার এক্ষেত্রে উল্লেখ প্রয়োজন। আধুনিক কমিক‍্স— এর আদি রূপ এবং সামাজিকতা দেখা যায় এই সংগ্রহগুলিতে। সেকালের অরণ্যদেব ছিলেন শ্বেতাঙ্গ, অসমসাহসী এবং প্রায়শ আফ্রিকার জঙ্গলে অভিযানরত। তিনি বশংদ আফ্রিকানদের ত্রাণকর্তা— কিন্তু বিদ্রোহীদের যম। এই ঔপনিবেশিক আদর্শ পুরুষের আরেকটি রূপ দেখতে পাই পরবর্তীকালে টার্জান চরিত্রে এবং ফিল্মজগতে মূক পশুদের সাহায্যে সে, শ্বেতাঙ্গদের উপকারার্থে, কত-না অসম্ভব সম্ভব করেছে। সে-ও কিন্তু বর্ণবৈষম্যবাদী। চীন-বিরোধী ‘ফু-মান্-চু’ গল্পগুলিতে ছিল ওই জাতির বিরুদ্ধে অবজ্ঞা, ঘৃণা ও অপপ্রচার। গোয়েন্দা শার্লক হোমসের হাতে ধরা-পড়া দুষ্কৃতকারীরা তো প্রায়ই স্বীকার করত যে, তাদের অভিনব কর্মপদ্ধতির নৃশংসতা আসলে ভারতীয় নেটিভদের কাছে শেখা। সাহেব-বালকদের যে-ঔপনিবেশিকতা শিক্ষা দেওয়া হত— তার প্রথম পাঠ ছিল তথাকথিত অ্যাডভেঞ্চারে।

অপরের কাছ থেকে গ্রহণ করায় আমরা, বাঙালিরা, বড়োই অপরিনামদর্শী। তাই বাংলা সাহিত্যে চালু হল ওই কাহিনিগুলির জাতিবর্ণ নির্বিশেষ অনুকরণ।

আজ এগুলি ফেলে দেওয়ার সময় এসেছে। শিশুসাহিত্য বা কিশোর সাহিত্য রচনার জন্য আর আমাদের বুড়ো-খোকা সাজার প্রয়োজন নেই। বড়োদের সাহিত্যে যে-আধুনিকতা, যে-সমসমায়িকতা প্রকাশ পেয়েছে তারই জ্যোতির্বিকাশ ঘটুক আজ যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাদের চোখের উপর। তাদের যেন আমরা খোলাখুলি বলতে পারি বাঘ দেখে ভয় পেয়ো না— তাকে সহজেই পুরোনো অস্ত্রে মারা যায়। কিন্তু সমাজের যারা অহরহ ক্ষতি করে চলেছে, যারা ভণ্ড, যারা শোষণবাদী, তাদের মারার জন্য নব নব হাতিয়ার তোমরা কল্পনাপ্রবণতার সাহায্যে তৈরি করে নাও।

ঋণ:
মহাযুদ্ধের ঘোড়া। প্রথম সংকলন, মে-জুন ১৯৭৮। সম্পা. দীপান্বিতা রায়।
(দাহপত্রের ফাইল থেকে)

Categories
অনুবাদ গদ্য

একটি আত্মজ্ঞানের খসড়া

তলস্তয়

ভাষান্তর: রূপক বর্ধন রায়

জানুয়ারি ০১

বিস্তর অকেজো আর মধ্যবিত্ত জিনিসের থেকে অল্প কিছু উত্তম এবং প্রয়োজনীয় জিনিস জানা ভালো।

একটা ছোটো, নির্বাচিত বইয়ের পাঠাগারে কত বিরাট সম্পদ লুকিয়ে রাখা যায়! হাজার বছর ধরে, পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতিবান দেশগুলির সর্বোচ্চ বুদ্ধিমান এবং সর্বাধিক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের একটা অনুষঙ্গ, তাদের পড়াশোনা এবং জ্ঞানের ফল আমাদের কাছে উপলব্ধ হতে পারে। অপর শতাব্দীর কিছু মানুষ, যে-ভাবনা হয়তো তারা তাদের প্রিয়তম বন্ধুদের কাছেও প্রকাশ না করে থাকতে পারে তা আমাদের জন্য এখানে স্পষ্ট শব্দে লিখে রাখা আছে। হ্যাঁ, আমাদের শ্রেষ্ঠ বইগুলোর জন্য, আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অর্জনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

— রালফ ওয়াল্ডো এমার্সন

বহুল পরিমাণে বই আমাদের মনকে কেবল আনন্দ দেওয়ার জন্য মজুত রয়েছে। তাই, শুধু সেই বইগুলোই পড়ো যেগুলো কোনো প্রকার সন্দেহাতীতভাবে উৎকৃষ্ট।

— লুশিয়াস আন্নাইয়াস সেনেকা

শ্রেষ্ঠতম বইগুলো আগে পড়ো, না হলে দেখবে তোমার হাতে আর সময় নেই।

— হেনরি ডেভিড থরু

প্রকৃত জৈবিক বিষ ও বৌদ্ধিক বিষের মধ্যে পার্থক্য হল, বেশিরভাগ জৈবিক গরল অত্যন্ত বিস্বাদ, কিন্তু বৌদ্ধিক বিষ, যা কি না সস্তা খবরের কাগজ বা নিকৃষ্ট বইয়ের আকার নেয়, দূর্ভাগ্যক্রমে কখনো কখনো আকর্ষণীয় হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি ১৫

প্রাকৃতিক সরলতা হয়, এবং আত্মজ্ঞানের সরলতা হয়। উভয়ই প্রেম এবং সম্ভ্রম দাবি করে।

যে-কোনো মহৎ সত্যই হল সরলতম।

মানুষ যখন অত্যন্ত বিস্তৃত এবং পরিশীলিতভাবে কথা বলে, তখন হয় সে মিথ্যে বলছে অথবা নিজের স্তুতি করতে চাইছে। এমন মানুষদের বিশাস কোরো না। ভালো অভিভাষণ সর্বদাই স্পষ্ট, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সর্বজনবিদিত।

সরলতা পরিশোধিত আবেগের একটি পরিণতি।

— জঁ ড’আলেমবার্ট

শব্দ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। তাই, স্পষ্টভাবে কথা বলতে চেষ্টা করো, এবং শুধু সত্যিটা বলো, কারণ, সত্য আর সারল্যের চেয়ে আর কোনো কিছুই মাবুষকে সংঘবদ্ধ করতে পারে না।

এপ্রিল ২৮

সুখের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তটি হল কাজ। প্রথমত, প্রিয় এবং স্বাধীন কাজ; দ্বিতীয়ত, কায়িক শ্রম যা তোমার খিদে বাড়ায় এবং পরবর্তীকালে তোমাকে শান্ত ও গভীর ঘুম প্রদান করে।

কায়িক কাজ বৌদ্ধিক ক্রিয়া বর্জিত নয়, বরং তার গুণবর্ধক এবং তাকে সাহায্যও করে।

অবিরাম আলস্যকে নরকের অত্যাচারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, কিন্তু পক্ষান্তরে, সেটিকে স্বর্গের আমোদগুলির একটি বলে বিবেচিত করা হয়।

— চার্লস দি মন্টেসকিউ

একজন মানুষ যখন কাজে প্রবৃত্ত হয়, সে যতই সর্বোচ্চ পর্যায়ে অযোগ্য, আদিম, সহজ কাজই হোক না কেন, তার আত্মা শান্ত হয়। কাজ আরম্ভ করার সাথে সাথেই, সমস্ত অপদেবতা তাকে ছেড়ে যায় এবং কাছাকাছি ঘেঁষতে পারে না। একজন মানুষ, মানুষ হয়ে ওঠে।

— থোমাস কার্লায়েল

কাজ প্রয়োজনীয়। যদি তুমি তোমার মানসের সুস্বাস্থ প্রত্যাশা করো, পরিশ্রান্ত হওয়া অবধি কাজ করো। তবে অত্যধিক বেশি নয়। তুমি ব্যয়িত হওয়া অবধি নয়। আত্মিক সুস্বাস্থ্য অত্যধিক কাজের পাশাপাশি আলস্যেও বিনষ্ট হতে পারে।

জুন ১১

আমাদের আত্মিক জীবনের পরিবর্তনগুলোর তুলনায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত বস্তুবাদি পরিবর্তনগুলো ক্ষুদ্র। অনুভূতি ও কাজে একটা পরিবর্তন হতে পারে, চিন্তা ও ধারণায় একটা বদল আসতে পারে। তোমার চিন্তা ও ধারণায় পরিবর্তন আনতে হলে, তোমার সচেতন মনকে তোমার আত্মিক প্রয়োজনীয়তাগুলোর উপর কেন্দ্রীভূত করতে হবে।

প্রত্যেকটি চিন্তা যার উপর মানুষটির আবাস, তা সে প্রকাশ করুক অথবা না করুক, তার জীবনকে হয় ক্ষতিগ্রস্ত করে অথবা উন্নত করে।

— লুসি মালোরি

পাপকে পরাস্ত করতে হলে, তোমাকে মানতে হবে যে, প্রতিটি পাপের মূল একটি বদ ভাবনা। আমরা সকলে শুধুমাত্র আমাদের ভাবনারই অনুসারী।

— বুদ্ধ

আমরা একটি টাকাভরতি থলি হারানোয় অনুতাপ করি, কিন্তু একটা খাঁটি ভাবনা যা আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে, যা আমরা শুনেছি অথবা পড়েছি, একটা চিন্তা যা আমাদের মনে রেখে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করা উচিত ছিল, যা পৃথিবীকে উন্নত করতে পারত— আমরা এই ভাবনাটিকে হারিয়ে ফেলি এবং তৎক্ষণাৎ সেটির ব্যাপারে ভুলে যাই, এবং তার ব্যাপারে অনুতাপ করি না, যদিও চিন্তাটি লক্ষগুণে মূল্যবান।

জুন ১৬

ব্যক্তির নৈতিক উন্নতির মধ্যে দিয়েই সমাজের উম্মতি অর্জন করা সম্ভব।

আমরা শৃঙ্খল, সংস্কৃতি ও সভ্যতার যুগে বসবাস করি, কিন্তু নৈতিকতার যুগে নয়। বর্তমান পরিস্থিতে, আমরা বলতে পারি যে, মানুষের সুখ বৃদ্ধি হয়, তবু তার সাথে মানুষের অসুখের পরিমাণও বাড়ছে। আমরা মানুষকে কীভাবে সুখি করব যখন তারা উচ্চতর নৈতিকতার জন্য শিক্ষিত হচ্ছে না? তারা জ্ঞানী হয় না।

— ইমানুয়েল কান্ট

জীবনের যা কিছু সাধারণ অশুভতা তার সাথে লড়াই করার একটাই উপায় হতে পারে, তা তোমার জীবনের নৈতিক, ধার্মিক, এবং আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার মধ্যেই বিদ্যমান।

আগস্ট ০৬

মেধা মানব জীবনের একমাত্র উপযুক্ত পথপ্রদর্শক।

চোখ হল দেহের আলো: সুতরাং তোমার চোখ যখন একক তোমার সমস্ত শরীর আলোয় পূর্ণ; কিন্তু তোমার চোখ যখন দুর্বৃত্য, শরীরটাও অন্ধকারে পরিপূর্ণ। কাজেই সাবধান হও, তোমার মধ্যে যে-আলো রয়েছে তা যেন অন্ধকারে পরিবর্তিত না হয়।

— লিউক ১১: ৩৪-৩৫

বৌদ্ধিক জীবন যাপনকারী মানুষটি এমন একজন মানুষের মতো যে নিজের পথ আলোকিত করার জন্য সামনে একটি লণ্ঠন বহন করে। এমন একজন মানুষ কখনো অন্ধকার জায়গায় পৌঁছাবে না, কারণ, তার মেধার আলো তার সামনে সামনে চলে। এমন জীবনে কোনো মৃত্যুভয় নেই, কারণ, যে-লণ্ঠনটি তোমার সামনে চলেছে সে শেষ মুহূর্ত অবধি তোমার পথ আলোকিত করে, এবং তুমি তাকে শেষ অবধি অনুসরণ করো যেমন সারাজীবন ধীর স্থিরভাবে করে এসেছ।

কিছু মানুষ নিজের ভাবনা অনুসারে বাঁচে এবং কাজ করে, আর কিছু মানুষ অন্যের চিন্তা অনুসরণ করে; এটাই মানুষের মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

সেপ্টেম্বর ১৭

বিস্তীর্ণ জমির স্বতন্ত্র মালিকানা অন্য মানুষের মালিকানার মতোই অন্যায্য।

ভূমি মালিকানা সংক্রান্ত বিদ্যমান নিয়মকানুনগুলো আইনসঙ্গত তা তুমি বলতে পারো না। এই আইনগুলির মধ্যেই রয়েছে হিংসা, অপরাধ এবং ক্ষমতার উৎস।

— হার্বার্ট স্পেন্সার

মানুষের মাঝের প্রাকৃতিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে নয়, বরং দস্যুতার মধ্যে দিয়েই ভূমির স্বতন্ত্র মালিকানা এসেছে।

— হেনরি জর্জ

অন্যান্য অবিচারের মতই, বড়ো জমির টুকরোগুলোর স্বতন্ত্র মালিকানার অবিচার, তাকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত অন্য আরও অবিচারের সাথে অপরিহার্যভাবে সংযুক্ত।

নভেম্বর ০৯

আত্মপ্রশংসা অহংকারের প্রারম্ভ। অহং-বোধ হল অপসারিত আত্ম-উপাসনা।

যারা নিজের স্বার্থপরতাকে, নিজেদের বাকি পৃথিবীর থেকে উচ্চাসনে স্থাপন করাকে ঘৃণা করে না, তারা অন্ধ, কারণ, এই ক্রিয়া সত্যের বিরোধিতা করে।

— ব্লেইজ পাসকাল

একটি বস্তু যত হালকা এবং যত কম ঘনত্বের, সে তত সীমিত জায়গা অধিকার করে। এর সাথে একজন অহংকারী মানুষের নিজের চরিত্রের তুলনা করা চলে।

— প্রাচ্যের পাণ্ডিত্য

এমন বহু মানুষ রয়েছে যাদের নিজেদের প্রথমত শিক্ষাগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নিজেদেরকে অপরের শিক্ষক বলে দাবি করে।

জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পথ হল পরিপূর্ণতার পথ, এবং কোনো মানুষ যদি নিজেকে নিয়ে গর্বিত ও সন্তুষ্ট থাকে তবে কী ধরনের পরিপূর্ণতা অধিষ্ঠান করতে পারে?

ডিসেম্বর ১১

ভূমি কর্ষণে লিপ্ত চাষির শ্রমের মতো আনন্দদায়ক আর কিছুই নয়।

তুমি বা তোমার সন্তান নিজে হাতে যে-খাদ্য উৎপাদন করো তাই পরম খাদ্য।

— মহম্মদ

যারা নিজেদের খাবারের যোগান নিজেরাই করে তারা ধার্মিক বলে দাবি করা মানুষের থেকে বেশি সম্মানের যোগ্য।

— তালমূদ

জমির কাজ ও নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করা সব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, তবে অন্য কোনো ধরনের কাজ মানবতার জন্য বেশি জরুরি নয়, এবং অন্য কোনো ধরনের কাজ বৃহত্তর মাত্রায় স্বাধীনতা এবং ভালোত্ব প্রদান করে না।

ডিসেম্বর ২৮

মানবজীবনের রীতি উদ্‌ঘাটনের কাজে ব্যবহৃত হলে বিজ্ঞান অত্যাবশ্যক রূপে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতে হলে, আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, কাজটি উপযোগী। সাধারণত বিজ্ঞানীরা দেখান যে, ওঁরা কিছু একটা করছেন এবং হয়তো কোনো সময়, কোনো একদিন, এটি ভবিষ্যতে মানুষের কাজে লাগবে।

মহাবিশ্ব সীমাহীন, এবং কারো পক্ষেই তাকে সম্পূর্ণরূপে বোঝা অসম্ভব। সুতরাং, আমাদের পক্ষে আমাদের দৈহিক জীবনকেও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

— ব্লেইজ পাসকাল

“বিজ্ঞান” তেমন কোনো ধারণা নয় যেভাবে মানুষ এই শব্দটিকে শনাক্ত করে ব্যবহার করে; এটি আমাদের বোধগম্যের জন্য সর্বোচ্চ, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু।

Categories
অনুবাদ গদ্য

পাওলো কোয়েলহোর গদ্য

ভাষান্তর: অমিতাভ মৈত্র

মরুভূমির চোখের জল
[The Tears of the Desert]

মরক্কো থেকে আমার এক বন্ধু ফিরে এল একজন মিশনারির গল্প নিয়ে, মারাকেশে পৌঁছে যে-মিশনারি মনস্থ করেন প্রতিদিন খুব সকালে শহরের বাইরের মরুভূমিতে হাঁটবেন। প্রথম দিন বেরোনোর সময় তিনি দেখলেন মরুভূমির বালিতে কান পেতে শুয়ে একজন কোমলভাবে থাবা দিচ্ছে মরুভূমির বালিতে।

— ‘লোকটা নিশ্চয়ই উন্মাদ,’ মিশনারি ভাবলেন।

প্রতিদিন এই দৃশ্য চোখে পড়ত তাঁর, আর একমাস পরে এই দৃশ্যের অভিসন্ধি ও আকর্ষণ যেন হারিয়ে দিল তাঁকে। তিনি ঠিক করলেন কথা বলবেন লোকটার সাথে। আরবের ভাষায় তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। লোকটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাই থেমে থেমে জানতে চাইলেন।

— ‘কী করছ তুমি?’

— ‘এই মরুভূমি খুব নিঃসঙ্গ। তার এ নিঃসঙ্গতা ও কান্নায় আমি একটু সঙ্গ দিচ্ছি, সান্ত্বনা দিচ্ছি, চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছি।’

— ‘মরুভূমি কাঁদে আমি জানতাম না।’

— ‘ও স্বপ্ন দেখে মানুষের সাহায্যে আসার, বিশাল একটা বাগান হতে চায় যেখানে তারা শস্য ফলাবে, ফুলের বাগান তৈরি করবে, ভেড়া চরাবে।’

— ‘বেশ, তুমি মরুভূমিকে বলো ও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে,’ মিশনারি বললেন। ‘যখনই আমি এই মরুভূমির সাথে থাকি, মানুষের সত্যিকারের আকার আমি বুঝতে পারি। তার অপরিমেয়তা আমাকে বলে যায় ঈশ্বরের কাছে আমরা কত ক্ষুদ্র, কত তুচ্ছ। যখন একটি বালুকণার দিকে তাকাই, আমি কল্পনা করি কোটি কোটি মানুষ যারা জন্মের মুহূর্তে সবাই ছিল সমান, কিন্তু পরে পৃথিবী যাদের সাথে সুবিচার করেনি। এখানকার পাহাড়েরা ধ্যানস্থ করে আমাকে, আর যখন দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো দেখা যায়, আনন্দে ভরে যায় আমার মন এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্যে হারিয়ে যাই আমি।’

লোকটিকে ছেড়ে মিশনারি তাঁর কাজের জগতে ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে সবিস্ময়ে দেখলেন লোকটি সেই জায়গায়, একইভাবে কান পেতে শুয়ে আছে বালির ওপর।

— ‘তোমাকে যে-সব কথা বলেছিলাম, মরুভূমিকে বলেছ?’

মানুষটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

— ‘আর এখনও সে কাঁদছে?’

— ‘তার প্রতিটি ফুঁপিয়ে ওঠা শুনতে পাচ্ছি। এখন ও কাঁদছে এ-জন্য যে, হাজার হাজার বছর ও নিজের অস্তিত্বকে অর্থহীন মনে করে নিজের ভাগ্য আর ঈশ্বরকে দোষ দিয়ে এসেছে শুধু।’

— ‘ঠিক আছে, এবার মরুভূমিকে বলো মানুষ হিসেবে আমাদের জীবনের সময় খুব কম, তবু আমাদের সেই মহার্ঘ সময়ের অনেকটা নিজেদের অর্থহীন মনে করে নষ্ট করি। আমাদের নিয়তি আমরা জানি না আর ভাবি ঈশ্বর অন্যায় করেছেন আমাদের সাথে। নিজেকে জানার সেই মুহূর্তটি শেষ পর্যন্ত আসে যখন আমরা জীবনের উদ্দেশ্য অনুভব করতে পারি, তখন অনুতাপ হয় সময় নেই ভেবে জীবনকে ঠিক পথে চালিত করার। মরুভূমির মতো আমরা তখন অভিশাপ দিই, নিজেদের সময় এভাবে নষ্ট করার জন্য।’

— ‘জানি না মরুভূমি শুনবে কি না এই কথা,’ লোকটি বলল। ‘সে যন্ত্রণাতেই অভ্যস্ত, অন্যভাবে দেখার চোখ তার নেই।’

— ‘তাহলে এসো, সেই কাজটাই করি আমরা, যে-কাজ বহুবার করতে হয় আমাকে। যখন টের পাই সবরকম আশা হারিয়েছে মানুষ— প্রার্থনা করি দু-জনে।’

হাঁটু মুড়ে বসে প্রার্থনা শুরু করল দু-জনে। লোকটি ছিল মুসলিম, তাই তার মুখ মক্কার দিকে। মিশনারি ক্যাথলিক, দু-হাত জোড় করে প্রার্থনা শুরু করল। নিজেদের ধর্মের, নিজেদের ঈশ্বরের কাছে যিনি আসলে একই।

পরের দিন প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে মিশনারি দেখলেন লোকটি সেখানে নেই। শুধু যেখানে সে বালির ওপর কান পেতে শুয়ে থাকত, সেখানে বালি মরুভূমির ভেতর থেকে ভিজে উঠেছে। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর জন্য মরুভূমি কাঁদছে।

কয়েকমাস পরে যখন জলস্রোত বেড়ে গেল অনেক, শহরের লোক তখন একটা কুয়ো তৈরি করল সেখানে আর বেদুইনরা তার নাম রাখল ‘মরুভূমির অশ্রু’। লোকে বলে এই কুয়োর জল যে খাবে, তার দুঃখের কারণ বদলে যাবে আনন্দে, আর এভাবেই নিজের জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে তার কাছে।

ভোরের মুহূর্ত
[The Moment of Dawn]

একজন ইহুদি শিক্ষক তার চারপাশের ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন:

‘রাত্রি শেষ হয়ে দিনের শুরুর সঠিক মুহূর্তটি কীভাবে জানতে পারি আমরা?’

‘যখন আলো এমন থাকে যে, ভেড়া থেকে কুকুরকে আলাদা করতে পারে আমাদের চোখ,’ একটি ছেলে বলল।

আরেকটি ছাত্র বলল: ‘যখন জলপাই গাছ আর ডুমুর গাছকে আলাদা করতে পারে আমাদের চোখ।’

‘না, কোনো উত্তরই তেমন ভালো হল না।’ বললেন শিক্ষক।

‘ভালো উত্তর তাহলে কী?’ জানতে চাইল ছাত্ররা।

শিক্ষক বললেন: ‘যখন কোনো অচেনা মানুষ এগিয়ে আসে আর মনে হয় সে আমাদের ভাই, তখনই রাত্রি ভোর হয় আর আলো আসে।’

ধনুকের পথ
[The Way of the Bow]

পুনরাবৃত্তির প্রয়োজনীয়তা
চিন্তাকে যখন প্রকাশ করা হয়, তখন কর্মের শুরু। ভঙ্গির ন্যূনতম পরিবর্তনও প্রতারণা করে আমাদের, সে-জন্য সবকিছু নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, প্রতিটি অনুপুঙ্খ যেন মনে থাকে। দক্ষতাকে নিয়ে যেতে হবে যান্ত্রিকতার এমন পর্যায়ে যেখানে স্বয়ংক্রিয় জ্ঞানই সব। কোনো নির্দিষ্ট নিয়মিত অনুশীলনে নয়, এই স্বয়ংক্রিয় জ্ঞান এক এমন মানসিক স্থিতি যা ভেতর থেকে জেগে ওঠে।

দীর্ঘ অভ্যাসের পর প্রয়োজনীয় সঞ্চালনগুলো নিয়ে আর ভাবার প্রয়োজন হয় না। অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে তারা। কিন্তু এই জায়গায় আসতে হলে অনুশীলন আর পুনরাবৃত্তি দরকার। সেটাও যথেষ্ট না হলে পুনরাবৃত্তি আর অনুশীলন শুরু করো।

যে নাল পরায় ঘোড়ার ক্ষুরে, তাকে মন দিয়ে লক্ষ করো। অনভিজ্ঞের চোখে মনে হবে একইভাবে হাতুড়ি পিটছে সে। কিন্তু দেখার চোখ আছে যার সেই শুধু বোঝে প্রতিবার হাতুড়ি তোলা আর আঘাত করার মধ্যে অনেক সূক্ষ্ম তারতম্য থাকে। প্রতিবার লোহার ওপর নেমে আসার সময় হাত জানে কখন তাকে জোরে আর কখন কোমলভাবে আঘাত করতে হবে।

হাওয়াকলের দিকে মাত্র একবার যে তাকায় তার মনে হবে কলের পাখাগুলো একই গতিতে, একই রকম ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু যে অভিজ্ঞ সে জানে বাতাসের গতির তারতম্যে হাওয়াকলের পাখার গতি বদলে যায়।

যে নাল পরায় সে এই যান্ত্রিকতা আয়ত্ত করেছে হাজার হাজার বার হাতুড়ি ব্যবহার করে। জোরে বাতাসের সময় হাওয়াকলের পাখা দ্রুত ঘোরে, আর বোঝা যায় তার গিয়ার ঠিক আছে।

চাঁদমারির বাইরে যদি কিছু তির উড়ে যায় তিরন্দাজ বোঝে সেটা স্বাভাবিক। ধনুক, তির, ধনুকের ছিলা, চাঁদমারি, তার ধনুক ধরা আর তির নিক্ষেপের ভঙ্গি— সবকিছুর নিখুঁত যান্ত্রিক সমন্বয় আয়ত্ত হতে পারে হাজার হাজার বার একাগ্র অনুশীলনে। তারপর আসে সেই মুহূর্ত যখন সে নিজেই হয়ে ওঠে ধনুক, তির, চাঁদমারি গলে মিশে তৈরি হওয়া নতুন এক অস্তিত্ব।

ছুটে যাওয়া তিরকে কীভাবে দেখতে হয়
শূন্যে কোনো অভিপ্রায়ের দাগ হয়ে তির ছুটে যায়। তির ছোঁড়ার পর সেই তিরের গতিপথ ও লক্ষ্যস্থল অনুসরণ করা ছাড়া আর কোনো কাজ তিরন্দাজের নেই। ছোঁড়ার মুহূর্তের তীব্র টানটান অনুভূতি সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গেছে। স্থিরচোখে তাই সে অনুসরণ করছে তিরকে, তার মন বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন হাসি লেগে আছে তার ঠোঁটে।

যদি যথেষ্ট হয়ে থাকে তার অনুশীলন, আর নিয়ন্ত্রণে থাকে তার সহজাত প্রবৃত্তি, তির ছোঁড়ার সময় তার মন যদি একাগ্র ও সহজ থাকে, মহাবিশ্বকে সে অনুভব করবে তার অস্তিত্বে। তার হাত যখন প্রস্তুত হচ্ছে, শ্বাস হয়ে উঠছে ধীর, আর চোখ স্থির হচ্ছে লক্ষ্যে— তার প্রশিক্ষণ আর দক্ষতা তখন কাজ করছে। কিন্তু তির নিক্ষেপের সঠিক মুহূর্ত তাকে জানায় তার সহজাত প্রবৃত্তি।

পাশ দিয়ে যেতে যেতে যদি কেউ এই মুহূর্তের তিরন্দাজকে দেখে তার এলিয়ে থাকা চিন্তাহীন হাত আর বাতাস কেটে ছুটে যাওয়া তিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে— তার মনে হবে কিছুই ঘটছে না। কিন্তু তার সঙ্গীরা জানে তির ছোঁড়ার পর তার মনে সমুদ্র পরিবর্তন ঘটে গেছে। সারা ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ছে তার মন। মন কাজ করে যাচ্ছে, তির ছোঁড়ার মুহূর্তে তার সক্রিয়তা, ইতিবাচকতা, ভুলের সম্ভাব্যতা বুঝে নেওয়া আর দেখা তিরের আঘাতে লক্ষ্যবস্তুর প্রতিক্রিয়া কেমন।

যখন তির ছোঁড়ে সে, তখন তার ধনুকে মহাবিশ্বকে অনুভব করে সে। যখন লক্ষ্যবস্তুর দিকে তির ছুটে যায়, মহাবিশ্ব যেন আরও কাছে চলে আসে তার, জড়িয়ে রাখে তাকে আর ঠিকভাবে সমাধা করা কাজের জন্য সুখী করে তাকে।

যখন তার কাজ শেষ, তার অভিপ্রায় যখন সফল, একজন আলোকিত যোদ্ধার আর কোনো ভয় নেই তখন। সে শেষ করেছে তার কাজ। নিজেকে ভয়ে অসাড় হতে দেয়নি সে। যদি লক্ষ্যস্থলে আঘাত নাও করে তার তির, তার সুযোগ থাকবে পরের বারের জন্য— কেন-না ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ায়নি সে।

মিয়ামি বন্দরে
[In Miami Harbour]

‘মাঝে মাঝেই মানুষজন সিনেমায় কিছু দেখে এত মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে, শেষ পর্যন্ত আসল ঘটনাই মুছে যায় তার স্মৃতি থেকে।’ মিয়ামি বন্দরে যখন একসাথে দাঁড়িয়েছিলাম বন্ধুটি বললেন, ‘তোমার টেন কমান্ডমেন্টস মনে আছে?’

অবশ্যই মনে আছে। এক জায়গায় মোজেস— মানে চার্লিয়ন হেস্টন— হাতের লাঠি তুলে ধরেন আর জল দু-দিকে সরে যায়। ইজরায়েলের সন্তানরা তখন পার হয়ে যায়।’

‘বাইবেলে কিন্তু অন্য গল্প,’ বন্ধু বলল। ‘সেখানে ঈশ্বর, মোজেসকে বলেন, ‘ইজরায়েলের সন্তানদের বলো যেন তারা এগিয়ে যায়।’ তারা এগিয়ে যাবার পরেই তিনি মোজেসকে বলেন হাতের লাঠি তুলে ধরতে। আর তখন লোহিত সাগর দু-দিকে সরে যায়। পথের জন্য সদিচ্ছাই পথ তৈরি করে।’

মানুষ যখন মজারু
[The Funny Thing About Human Beings]

আমার বন্ধু জেসি কোহেনকে একজন প্রশ্ন করেছিল:

‘মানুষের সব থেকে মজাদার বিশেষত্ব কী?’

কোহেন বলেছিল, ‘আমাদের স্ববিরোধিতা। বড়ো হবার জন্য বিষম তাড়া থাকে আমাদের, পরে হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলায় ফিরতে চাই আবার। টাকা উপার্জনের মরিয়া চেষ্টায় শরীরকে শেষ করে ফেলি, পরে সব অর্জন খরচ করি আরোগ্যের জন্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা এত উদ্বেগে থাকি যে, বর্তমানকে গ্রাহ্য করি না আমরা— আর এভাবে বর্তমান বা ভবিষ্যৎ কিছুই আর জানা হয় না আমাদের। যখন বেঁচে থাকি তখন মনে করি আমাদের মৃত্যু নেই। আর এমনভাবে মরি, যেন আমরা আদৌ বেঁচে ছিলাম না কখনো।’

হারানো ইট
[The Missing Brick]

আমি ও আমার স্ত্রী যখন ছুটিতে ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম আমার সেক্রেটারির থেকে একটা ফ্যাক্স এল।

‘রান্নাঘর সারানোর জন্য কাচের একটা ইট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আপনাকে মূল নকশা আর নির্মাণ সংস্থা যে-পরিবর্তিত নকশা দিয়েছে এই ক্ষতি সামলাতে, আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ সেক্রেটারি জানিয়েছেন।

একদিকে আমার স্ত্রীর তৈরি করা নকশা: ইটের সুসংবদ্ধ রেখা আর বাতাস চলাচলের জন্য খোলা জায়গা। অন্য দিকে হারিয়ে যাওয়া ইটের সমস্যা থেকে মুক্তির নতুন নকশা: একটা সত্যিকারের জিগ্ স পাজল যেখানে গ্লাস ব্রিকসগুলো সাজানো হয়েছে জোড়াতালি দিয়ে নান্দনিকতাকে অগ্রাহ্য করে।

‘আর একটা কাচের ইট কিনুন,’ লিখে জানালেন আমার স্ত্রী। তাঁরা করলেন সেটা, আর আগের নকশাও বহাল থাকল।

সেদিন বিকেলে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম বিষয়টি নিয়ে। মাত্র একটা ইট নেই বলে কতবার আমরা আমাদের জীবনের মূল নকশাটিকে বিকৃত করে তুলি।

Categories
গদ্য

রণজিৎ অধিকারীর গদ্য

বাল্যকাল কিংবা এক কাল্পনিক অতিভুজ


শুশুনিয়া পাহাড়ের পায়ের কাছে রাস্তা, আর রাস্তার পর থেকেই গ্রাম শুরু হয়েছে। ঢালু রাস্তা নেমে গেছে, রাস্তার দু-দিকেই ছড়িয়ে বাড়ি, এইভাবে কিছু দূর গ্রাম ছাড়িয়ে গেলেই গন্ধেশ্বরী নদী। গ্রীষ্মে প্রায় জল থাকে না, অতি শীর্ণ। এই গ্রামে একবার মাসাধিক কাল ছিলাম এক দরিদ্র মূর্তিশিল্পীর বাড়িতে। শুশুনিয়া পাহাড়ের গা থেকে পাথর কেটে এনে বাড়িতে বাড়িতে এই মূর্তিশিল্প। রোজগারের একটা সহজ শিল্পিত পথ। এখানে অনেক রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পীর বাড়ি ঘুরে ঘুরে তাঁদের কাজ করা দেখেছি বসে বসে। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে প্রায় প্রতি ঘর থেকেই পাথর কাটার ঠুকঠুক শব্দ কানে আসবে।

যাঁরা খুব নিপুণ শিল্পী তাঁরা খুব ছোটো ছোটো মূর্তি আর সূক্ষ্ম কাজ করেন।

আমার সংগ্রহে আছে তেমন কিছু মূর্তি। কিন্তু যাঁদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি আমরা তাঁরা শিল্পী হিসেবে তেমন কিছু নন, ভালো করে দেখলে তাঁদের কাজের অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে। প্রায় দিন আনি দিন খাই অবস্থা।

শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে যেখানে মন্দির আর প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড়, সেখানে তাদের পাতা দোকান। যতটুকু যা বিক্রি।

তো ওঁদের বাড়িতেই দেখেছি মূর্তি তৈরির আগে ছোটো ছোটো করে মাপমতো পাথর কেটে রাখা— তারপর একেকটাতে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলা হয় একেক দেব দেবীর মূর্তি।

মাত্র দুটো ঘর, আর ঘেরা দুয়ার নিয়ে কানু কর্মকারের বাড়িখানা, সামনে বেড়া দেওয়া সামান্য উঠোন। স্ত্রী আর দুই ছেলে নিয়ে সংসার।

বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ঠুকঠুক করে পাথর কাটেন শিল্পী, কিছুক্ষণ পরই একটা মূর্তি হয়ে যায়, স্ত্রী সেটাকে সরিয়ে রাখেন। তেমন সৌখিন কাজ নয় তাঁর।

রাতে একটা ঘরে তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে আমি আর বাবা শুই।

একদিন খুব রাতে ঠুকঠুক শব্দে ঘুম ভেঙে গেল, বিছানা থেকে নেমে দুয়ারের কোণের ছোট্ট কুঠুরিটাতে উঁকি দিই, এত ছোটো যে সেখানে একজন বসে কেবল কাজ করতে পারে, বাকিটা নানা আকারের পাথরে ভরতি।

একটা হ্যারিকেন-এর আলোয় শিল্পী কানু যেন একটা ঘোরের ভেতর ঝুঁকে পড়ে পাথর কাটছেন।

আমিও পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। জগতে যেন আর কোথাও কিছু ঘটছে না, খুব দূর থেকে কোনো মাতালের জড়ানো চিৎকার নৈঃশব্দ্যেরই একটা অংশ মনে হয়, আর এখানে ঠুক ঠুক…।

পাথরের টুকরো আর সাদা গুঁড়ো শিল্পীর দু-পায়ের ফাঁকে জমছে। কিছুক্ষণ পরই মূর্তিটা একটু রূপ পেল, ক্রমে শিল্পীর হস্তচালনা আরো সাবধানী হয়ে উঠল।

খুব মগ্ন হয়ে কাজ করছেন তিনি, কোনো দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন এক মস্ত বড়ো সাধনা। আরও একটু পরে যখন মূর্তিটা সম্পূর্ণ হয়ে এল, তখন সেই অল্প লালাভ আলোয় দেবী মূর্তি যেন ঝিকমিক করে উঠল। একটু আগে যা ছিল পাথরের টুকরো, তারও আগে পাহাড়ের ভেতর স্তব্ধ জমাট অন্ধ, কোটি কোটি বছর… আজ তার মুক্তি ঘটল। অল্পবয়সী চোখে দেখা সেই দৃশ্য সেই উপলব্ধি আজও আমার কাছে অলৌকিক।

সেই জ্যোতিতে ভরে যাওয়া মলিন কুঠুরি, সেই মুহূর্ত আমি কখনো ভুলব না। দিনের আলোয় পরে ওই মূর্তি দেখে হতাশই হয়েছি। ত্রুটি ধরা পড়ে যে-চড়া বাস্তবের আলোয়, সেই বাস্তবই তো আমাদের জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যায়, তার থেকে মুক্তি নেই। তবু একেকটি দিনের উদ্ভাস অবাস্তব সুন্দর হয়ে থেকে যায় মনে।


শুশুনিয়া গ্রামের এক দিকে পাহাড়, উলটো দিকে গন্ধেশ্বরী নদী। সন্ধ্যের আগে আগে বাবার সঙ্গে নদীর দিকে নেমে যাই। নদীর দিকটাতে বেশ কয়েকটি বড়ো পুকুর। বিকেলের দিকে যাতায়াতের পথে দেখেছি— পুকুরের একদিকে নারীরা স্নানের জন্য ব্যবহার করে, কিছু দূরে পুরুষেরা। আমাদের যাতায়াতের পথে স্নানের জায়গাগুলো পড়ে। আর এখন বিকেলের পর মহিলাদের ভিড় জমে পুকুরে। উঁচু আলপথ দিয়ে আমি একটু আগে আগে চলেছি। বাবা বেশ পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু কেনই-বা আমি সেদিন অতখানি এগিয়ে গিয়েছিলাম এতদিন পর আর বলা সম্ভব নয়। মনে কোনো পাপচিন্তা ছিল!—

মনের অন্য দিকটা আজও তা মানতে চায় না। স্নানরতা নারীকে দেখার অনীহা সাধুতার পর্যায়ে পড়ে, আর আমি সাধু নই। সামনের ঝোপটা পেরোলেই পুকুর, সমবেত নারীদের হাসি আর কথার শব্দ আসছে।

তবে আমি যে অন্যমনস্ক ছিলাম— সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আলপথ থেকে নীচে নেমে কিছুটা জমি পেরিয়েই পুকুরপাড়। পা-টা নামাতে গিয়েই চকিতে তুলে নিলাম আর স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।

ভাবলে এখনও গা শিউরে ওঠে, শ্বাস বন্ধ করে আমি দাঁড়িয়ে— ফণা তুলে যে আমার সামনে— অত বড়ো বিষধর কি জীবনে আর কখনো দেখেছি?

বাবা এখনও কেন আসছে না! এত কান্না পাচ্ছে।

আর কখনো একা একা এভাবে এগিয়ে আসব না। পুকুর থেকে উঠে একজন প্রৌঢ়া এদিকে পা বাড়াতেই ফণা নামিয়ে সে চলে গেল। আমি তখনও দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। বাবা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে লক্ষ করিনি।— কী হল? চলো। আমি ভয়ে ভয়ে ঘটনাটির কথা বলতেই বাবা বলল— তোমার মনের মধ্যে কোনো কুচিন্তা ছিল। এসো।— বলেই বাবা এগিয়ে গেল।

আমি কিচ্ছু না বলে চুপচাপ বাবার পেছনে চলতে লাগলাম। তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে।

বাকি পথ, এমনকী নদী থেকে ফেরার পথেও বাবা এ-বিষয়ে আর একটি কথাও বলল না। কিন্তু তারপর থেকে যখনই বাবার সামনে যাই, মনে হয় আমার যা কিছু গোপন ভাবনা তার সবকিছুই বাবা স্পষ্ট পড়ে নিতে পারছে।


বর্ষায় শালবনের সে এক রূপ হয়। বেলপাহাড়ি পেরোলেই বৃষ্টিভেজা শালপাতার রং মনকে এক সজীবতায় ভরে দেয়। শুধু বাসের জানালার দিকে বসতে পাওয়া চাই, দক্ষিণ-পশ্চিমে তাকিয়ে মন কেমন করে ওঠে— থরে থরে মেঘের মতো পাহাড়ের শিরা। কিছুটা এগিয়ে বাঁ-দিকে রাস্তা গেছে ওদলচূয়ার দিকে— কী নির্জন আর রাস্তার দু-দিকে প্রকৃতির রূপ আশ্চর্য সুন্দর।

ভাবি, ভ্রমণবিলাসী বাঙালি কত কত দূর বেড়াতে যায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অথচ বাড়ির কাছে ওদলচূয়া কাকরাঝোড় দলমা পাহাড় অবহেলায় চুপ করে পড়ে থাকে অভিমানে।

যাক, বাঁ-দিকে না বেঁকে সোজা রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠে নেমে চলে গেছে ভূলাভেদা হয়ে বাঁশপাহাড়ি। বাঁশপাহাড়ি থেকে ঝিলিমিলি খুব কাছে। এইসব অঞ্চলের নিবিড় প্রকৃতির ভেতরে আমি দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছি।

ভূলাভেদার পরের ছোট্ট স্টপেজ তামাজুড়ি, দু-একটা দোকান ছাড়া তখন কিছু ছিল না, তবে বাঁ-দিকে যে-সরু পাথুরে রাস্তাটা ঢুকে গেছে তার দু-দিকে বেশ কিছু বাড়ি।

১৯৯০-৯১ সালে আমার বাবা এই নির্জন শান্ত পরিবেশে একটি আশ্রম গড়ে তোলে। বাবা তার কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে বছরের অনেকটা সময় এখানেই কাটাত।

আমি এই আশ্রমে আসি তারও দু-একবছর পরে।

স্কুলের ছুটি থাকলে আমি এখানে এসেই থাকতাম।

মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর প্রায় টানা দু-মাস ছিলাম মনে আছে। পরবর্তী কালে আমার মধ্যে যখন ধর্ম বিষয়ে সংশয় দেখা দিতে শুরু করে, উপবীত ত্যাগ করি, তারপর থেকে ওই আশ্রমে আর যাইনি বললেই চলে। কিন্তু সে-সব অনেক পরের কাহিনি।

বাল্যে মনের মধ্যে যখন এ-সব জটিলতা দেখা দেয়নি, সহজ দৃষ্টিতে চারপাশটাকে দেখি ও নির্মল আনন্দ পাই, তখনকার স্মৃতিগুলি এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে।

আশ্রমে সারাদিন শিষ্যদের আনাগোনা আর সন্ধ্যেতে কীর্তনের আসর বসে। এই আসরে গানের চেয়ে কথা বা তত্ত্ব আলোচনা হয় বেশি, শিষ্যদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেয় বাবা।

ফলে আমার ছুটি, বাজাতে হয় না। সারাদিনই প্রায় আমি লাগামহীন ঘুরে বেড়াই, আশেপাশের গ্রাম, কারুর উঠোনে গিয়ে বসে থাকি দড়ির খাটিয়ায়। কোথাও নির্জন একটা গাছের তলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। প্রকৃতপক্ষে এই সময়গুলোই আমার জীবনকে শান্ত এক তারে বেঁধে দেয়।

একটা ঘটনার কথা বলি। ওইসব অঞ্চলে দেখেছি পুরুষেরা খুব অল্পবয়স থেকেই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে।

এখানে যারাই বাবার শিষ্য হয়েছে, তাদের অধিকাংশই নেশায় আচ্ছন্ন থাকত এককালে, বাবার সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে নেশা থেকে মুক্ত হত।

অবশ্য এমন উদাহরণও আছে যে, কেউ পুনরায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে আবার কান্নাকাটি করে নেশা ছাড়ার শপথ করেছে… আবার… আবার।

এদের স্ত্রীদের যন্ত্রণার শেষ থাকত না। স্বামী নেশা করে সারা সারা দিন ঘরে, এদিকে হাঁড়ি চড়ে না। প্রায়ই তারা বাবার কাছে এসে পায়ে পড়ত। কিন্তু এ-সব ক্ষেত্রে বাবাই-বা কী করতে পারে— বুঝতাম না!

কখনো তারা স্বামীকে আশ্রমে আনত, বাবা সারাদিন ধরে তাদের বোঝাত, দেখেছি।

তবে একবার একটা ঘটনায় আমি আশ্চর্য হই, এবং বাবাকে অন্যভাবে আবিষ্কার করি।

পাশের গ্রাম থেকে একটি রুগ্ন বউ এক সন্ধ্যায় এসে কান্নাকাটি করে বাবার কাছে। বাবা তাকে কথা দেয় যে যাবে তার বাড়ি কোনো একদিন।

দু-একদিন পরেই বাবা সেখানে গেল, এবং আমাকে কোনোমতেই সঙ্গে নিতে চাইল না।

আমি সারা সকাল এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ালাম, দুপুরে স্নান করে খেলাম। কিন্তু দুপুর গড়ালে আর ভালো লাগল না। এক শিষ্যের সঙ্গে গেলাম সেখানে।

গিয়ে দেখি, তার ছোট্ট ঘর, সামনেটা ফাঁকা অনেকটা জায়গা। একদিকে অনেকগুলো মহিষ, অন্য দিকে একটা গাছের নীচে খাটিয়ায় বাবা শুয়ে, নীচে একটি লোক চোখ লাল, ইনিয়েবিনিয়ে কী সব বলে চলেছে।

বাবা কিছুক্ষণ পর বলল, তুই যদি নেশা না ছাড়িস এখানেই শুয়ে থাকব, জলগ্রহণও করব না তোর ঘরে।

স্পষ্ট সব কথা মনে নেই, তবে সন্ধ্যের পর আমরা ফিরে আসছিলাম, বাবা চুপচাপ সামনে হেঁটে যাচ্ছিল। বাবার মুখেই পরে শুনেছি, সে না কি নেশা ছেড়ে দিয়েছিল। যদিও অনেকেই পুনরায় আগের জীবনে ফিরে যেত সঙ্গদোষে— এরকম আক্ষেপ করতেও শুনেছি বাবাকে।

ধর্মে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু সেদিন সারাদিন রোদে খাটিয়ায় শুয়ে যে-চেষ্টা বাবা করেছিল, তার সাফল্য ব্যর্থতা মাথায় রেখেও বাবার ওই রূপকে শ্রদ্ধা না করে পারি না। কেন-না নেশা ধ্বংস করে দেয় এক-একটা সংসারকে— নিজের চোখে দেখেছি।


আরেকটি ঘটনার কথা বলি, তাকে দৃশ্য বলাই ভালো— যা আমাকে এক ঝটকায় অনেকটা বড়ো করে দিয়েছিল। যা ছিল এতদিন রহস্য আমার কাছে আর বাল্যের কৌতূহল মাত্র, শরীরে একটা অনুভূতি আনে কিন্তু কুয়াশাচ্ছন্ন হয়েই থেকে যায়— তা হঠাৎই স্পষ্ট প্রকট রহস্যহীন হয়ে ওঠে সেই দৃশ্য দেখবার পর।

একটা সাইকেল জোগাড় করতে পারলেই হল, তামাজুড়ি হয়ে যে-পিচ রাস্তা পশ্চিমে বাঁশপাহাড়ির দিকে চলে গেছে, ওই পথে কয়েক কিমি গেলেই চাকাডোবা। তার একটু আগে ডান দিকে রাস্তা ঢুকেছে, পায়ে চলা পথ, নুড়ি পাথরময় সেই পথে সাইকেল চালানো খুব কঠিন। ঘন জঙ্গল, দূরের কিছু দেখা যায় না।

দিনের বেলাও এত শান্ত চুপচাপ চারিদিক, মনে হয় একটা পাথরে বসে সারাদিন কাটিয়ে দিই। ওই পথে কিছুটা এগোলেই লালজল পাহাড়। অমন নাম কেন জানি না। পাহাড়ের অনতিদূরে একটি গ্রাম— পাহাড়ে উঠলে পুরো গ্রামটা ছবির মতো স্পষ্ট দেখা যায়। ছোট্ট পাহাড়, যেন বড়ো বড়ো আখাম্বা কালো পাথর এলোমেলোভাবে কেউ সাজিয়ে তুলেছে।

লোকবিশ্বাসের ওপর কথা চলে না। ওই পাহাড়ের গুহায় না কি কোনো সাধু এককালে সাধনা করত। আমি নিজে চোখে দেখেছি— সেই গুহা এত সংকীর্ণ যে, সেখানে বছরের পর বছর কারুর পক্ষে বাস করা অসম্ভব মনে হয়। তার ওপর লম্বা চ্যাটালো পাথরগুলোর বিন্যাস এমন যে, দেখলে মনে হবে এই বুঝি ধ্বসে পড়বে একটু ধাক্কা দিলেই। ভয়ে ভয়ে কতবার উঠেছি, কখনো একা, কখনো সঙ্গে দু-একজন থাকত।

একেবারে ওপরের পাথরটা এমনভাবে বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে, যেন একটা বারান্দা। একটু ঢালু কিন্তু বেশ বসা যায়। তাতে যে কত অজস্র প্রেমিক-প্রেমিকার আঁচড়! সবাই নিজেদের প্রেমকে স্থায়ী করতে চেয়েছে তাদের নাম লিখে। কিছু পড়া যায়, কিছু দুর্বোধ্য লিপির মতো, পড়া যায় না।

এর নীচেই একটা পাথর আছে, ওপর থেকে চট করে দেখা যায় না। সেবার একাই গিয়েছি, আনমনে পাথরটার ওপরে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাই।

কিন্তু যেন একটা ঘষটানির শব্দ আর ফিসফাস, খুব কাছেই।

কীসের শব্দ বুঝতে না পেরে পাথরের এক প্রান্তে সরে যাই— আর চমকে উঠি। যে-দৃশ্য দেখবার জন্য মন প্রস্তুত ছিল না তেমন কিছু যদি ঘটতে দেখা যায় তাতে মনের যে-অবস্থা হয়, আমার সেই বর্ণনাতীত অবস্থা তখন। সেইসঙ্গে বহুদিন মনের ভেতর জমতে থাকা শরীরী রহস্য— দুটো নগ্ন শরীরের আঁচড়কামড় আর ছন্দোময় ওঠানামায় যেন সেই রহস্য উন্মোচিত হয়ে যায়। ওরা তখন ভ্রূক্ষেপহীন, তাদের হুটোপাটিতে যেন আস্ত পাথরটাই ধ্বসে পড়বে অনেক পরে একটা লেখায় পড়েছিলাম, পিকাসো ষোলো বছর বয়সে গুস্তাভ কুর্বে-র আঁকা একটি নগ্ন ছবি (Origin of the World) দেখে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন, আমারও সেই দশা তখন।

একটা যৌনক্রিয়া— যা বালকের দেখা প্রথম যৌনদৃশ্য যে কীভাবে মস্তিষ্কে ক্রিয়া করে তা টের পেয়েছিলাম আমি। বহুদিন পর্যন্ত ওই দৃশ্য আমার মাথাজুড়ে উথাল-পাথাল করত। অমন উন্মুক্ত, অমন উদ্দামতা। যখনই একা থাকতাম তাদের শীৎকারধ্বনিগুলো আমাকে উত্তেজিত করে দিত।

ওই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে অমন মুক্ত যৌনতা এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা হয়ে থেকে গেছে আজও— এবং তা আমার মধ্যে এই ধারণার জন্ম দেয় যে, অর্গলবদ্ধ অন্ধকার ঘরের ভেতর ঘটে চলা যৌনক্রিয়া কখনো পূর্ণতায় উন্নীত হতে পারে না।

প্রথম পাতা

Categories
গদ্য

রণজিৎ অধিকারীর গদ্য

বাল্যকাল কিংবা এক কাল্পনিক অতিভুজ

কিন্তু হারমোনিয়ামটা গেল কোথায়! মালপত্র নামানোর সময় দেখা গেল বাকি সবই আছে— ডুগি তবলা, খোল, বাঁশির লম্বা ব্যাগ, তার সানাই, আমাদের পোশাক-আশাকের ব্যাগ… শুধু হারমোনিয়াম নেই।

এদিকে গানের আসরের সময় হয়ে এল, এখন উপায়!

গ্রামের নাম মনে নেই, ঝাড়গ্রাম থেকে শিলদা যাওয়ার পথে, শিলদার একটু আগের একটা বাস স্টপে নেমে ডান দিকে জঙ্গল পেরিয়ে কয়েক মাইল ঢুকে এসেছি আমরা। সন্ধ্যের আগে আগে আমাদের মালপত্র আনার জন্য এখান থেকে গোরুর গাড়ি পাঠানো হয়েছিল। সবকিছু গাড়িতে তুলে দিয়ে আমরা ঝাড়া হাত পা পেছনে হেঁটে হেঁটে আসছি। বাবা দলের অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটছে। আমি একটু আগে আগে। দু-দিকে শালের জঙ্গল ঘন হয়ে এসেছে, আধো জ্যোৎস্নায় সেই অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলেছে বছর পনেরোর চোখ। নুড়িভরা উঁচু নীচু পথে চলতে হোঁচট খেতে হয় কিন্তু কিছুক্ষণ পর চোখ সয়ে গেলে অসুবিধা হয় না। কথা বলতে বলতে আমরা কখনো গাড়ির চেয়ে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ি, আবার কাছাকাছি হই… বয়স্করা এত কথা বলে কেন?

ওরা দেখে কম, বলে বেশি।

গ্রাম থেকে যে-লোকটি আমাদের আনতে এসেছিলেন, তিনি শোনাচ্ছেন, কেমন ধর্মপ্রাণ তাঁর গ্রাম, কবে কোন কীর্তনীয়া এসে পরপর পনেরো দিন আসর করতে বাধ্য হয়েছিলেন, শ্রোতারা কেমন মুগ্ধ হয়ে রাত জেগে গান শোনে… দেখবেন আসন ছেড়ে কেউ উঠে যায় না… আপনার গান হবে বলে সকাল থেকে মাইকে প্রচার চলছে। টুকরো টুকরো এমন সব কথাই মনে আছে। অন্তত ২৬-২৭ বছর আগের কথা।

কিন্তু এখন উপায়? বাবার খুব সখের চেঞ্জার হারমোনিয়াম। চেঞ্জার হারমোনিয়ামে কীর্তন গাইতে তখন আর কোনো কীর্তনীয়াকে আমি দেখিনি।

সাধারণত কীর্তনে সিঙ্গল বা ডাবল হারমোনিয়াম ব্যবহৃত হত। শুধু জুড়ি বা জুড়ি হায়ার রিডের প্রচলন ছিল।

অবশ্য হারমোনিয়াম নিয়ে বাবাকে খুব চিন্তা করতে দেখলাম না। বলল— গ্রামে কোনো হারমোনিয়াম নেই? এনে দিন, তাতেই গান হবে।

পাওয়া গেল কেষ্টযাত্রার দলের একটা সিঙ্গল হারমোনিয়াম।

সারা গ্রাম ভেঙে লোক এসেছিল সেদিন পালাকীর্তন শুনতে। বাবা অনেকবার বলেছে আমাকে যে— সেদিন না কি আমি চমৎকার খোল বাজিয়েছিলাম। অবশ্য ওই বয়সে যা-ই বাজাই শ্রোতারা প্রশংসা করত। পরপর তিন দিন সেখানে আসর হল, তারপর আবার চললাম ফুলকুসমার পথে। কিন্তু সেদিনের সে-হারমোনিয়াম রহস্যের উন্মোচন আজও হয়নি।

এই মধ্যবয়স থেকে যখনই নিজের লম্বিত জীবনের দিকে তাকাই— অবাক হই। কেমন ছিল সেই বাল্যকালের চোখে দেখা জগৎ? আজকে যা দেখি, যেভাবে চারপাশের জগৎ আমার সামনে প্রতিভাত হয়— তা এতটাই আলাদা যে, বুঝি সেইসব দিনের সঙ্গে একটা বড়োসড়ো ফারাক ঘটে গেছে কীভাবে যেন! আমি, আমার দেখা দৃশ্য আর উপলব্ধির। সেদিনের ‘আমি’ থেকে আজকের ‘আমি’ পর্যন্ত যদি একটা রেখা টানা যায় আর সেদিনের ‘আমি’-র থেকে সেইসব দিনের উপলব্ধ জগৎ পর্যন্ত আরেকটা রেখা আঁকি— দুটো রেখা মিলে একটা কোণ তৈরি করে না কি? যত দিন যায় বাল্যে দেখা জগতের সঙ্গে এই আমি-র দূরত্ব বাড়তেই থাকে, যেন একটা ক্রমপ্রসারমান কাল্পনিক অতিভুজ… হায়, কখনোই যা যুক্ত হবে না, কোনো রেখা দ্বারাই!

কত কিছুই যে বদলে যায়! ধারণাগুলো পালটায়… মনোভঙ্গি, বিশ্বাসের ধরন…।

তবু সেইসব দিন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এক কোণে, হারায় না। আমার… আমাদের মতো সাধারণের তুচ্ছের জীবনেও তারা কত ঝলমলে। কোনটা লাল, কে-বা গাঢ় নীল, মুখ করুণ করে থাকা দিন, বাঁকাচোরা, বেদনার, তুমুল সুখের কিংবা হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করা ভালো লাগার দিন…। এক বালক শালবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একা, বনের দিকে তাকিয়ে থাকে, ভয় পায়, ছোটে… হয়তো এটুকুই মনে পড়ছে এত দূর থেকে, তার আগের পরের আর কিছুই মনে নেই, অন্ধকার।

তবু সেই ছবিটির কী অসীম মূল্য আমার কাছে!

বাবার এক অল্পবয়সী শিষ্য, তার কথা মনে পড়ছে। তখন সে আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়ো, পড়া ছেড়ে দিয়েছে, বাড়িতে থাকে না, টো টো করে ঘুরে বেড়ায় তাই বাবা তাকে সঙ্গে নিয়েছে। কিন্তু আমার তাকে ভালো লাগেনা একটুও, একেবারেই সহ্য করতে পারি না।

সে বাবার আজ্ঞা পালন করে, আমাকে খুশি করার চেষ্টায় থাকে। বাবার কথামতো তার সঙ্গেই ঘুরতে বেরোতে হয়, একা কোথাও যাওয়ার সুখ নেই আর। বিরক্ত হয়ে থাকি তার ওপর। হারমোনিয়ামটা আমি তুলতে পারি না, সে অনায়াসে সেটা তুলে আসরের মাঝখানে রেখে আসে। আমি অল্পবয়সের ঈর্ষায় পুড়তে থাকি। মনে অশান্তি নিয়ে ঘুরে বেড়াই, খাই, বাজাই।

বাবা অবসরে তাকে তবলা শেখাতে বসে, তার খ্যাংরা কাঠি আঙুলে কোনো বোল ফোটে না দেখে আমার আনন্দ হয়। আড়ালে হাসি। কী বিচিত্র মানুষের মনের রূপ!

মেট্যালা থেকে লাল রাস্তা ঢুকে গেছে গভীর জঙ্গলের ভেতর, আমরা ওই পথেই সেদিন হুমগড়ের কাছাকাছি একটা গ্রামে যাচ্ছি। বড়ো শালগাছগুলো কেটে নেওয়ায় কোথাও কোথাও বেশ ফাঁকা। হয়তো কাছাকাছি কোনো গ্রাম আছে, কিন্তু দেখা যায় না, ছেলেদের চিৎকার ভেসে আসে, মহিষ চরে বেড়াচ্ছে। বিকেল শেষ হয়ে আসছে, তখন এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছই, রাস্তাটা নেমে গেছে, ঝোরামতো, জল পেরিয়ে যেতে হবে।

বাকিরা হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তুলে পেরোনোর প্রস্তুতি নেয়।

কিন্তু আমি? বাবা বলল— মনু, তুমি ভাইকে ধরে পার করে দাও। বলা হল ধরতে কিন্তু সে তখন আচমকাই আমাকে ঘাড়ে তুলে নিল, ওই শরীরে কী শক্তি তার!

কিন্তু আমি কেন পারলাম না একাই জল পেরোতে?

এই সুযোগে ও আমাকে কব্জা করতে চায়? কিন্তু কয়েক মিনিট ওর কাঁধে চেপে জল পেরোতে পেরোতেই ওকে ভালোবেসে ফেললাম। বাল্যকালের চোখের জল কী বিশুদ্ধ! তারপর থেকে সে যে কী আপন হয়ে উঠল আমার! যেখানে যাই, সে সঙ্গে যায়, যে-কোনো সমস্যা থেকে সেই উদ্ধার করে। যোগাযোগ ছিল অনেক দিন।

পরে একসময় খবর পাই বামফ্রন্ট সরকারের শেষ দিকে না কি মাওবাদীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়েও ছেড়ে দেয়। তারপর কিছুদিন তার খোঁজ কেউই পায় না। বেশ কিছুদিন পর জঙ্গলের ভেতর তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। কেন কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল? কে তার উত্তর দেবে?

তার কথা যখনই মনে পড়ে— বাল্যকাল থেকে আজকের এই আমি পর্যন্ত টানা যে-কাল্পনিক রেখা তা আরও টানটান হয়ে ওঠে, ব্যথায় টনটন করে ওঠে।

না, তার জন্য নয়, এই কান্না এক বিশুদ্ধ উপলব্ধির।


ঘটনাটি ঘটেছিল কোথায়— ছাতনা না কি বিষ্ণুপুরে?

ও-সব দিকে তখন রামায়ণ গান বা পালাগান শুনতে লোক হত দেখবার মতো। মাঝে মাঝে আমার ভয়-ভয়ই করত, বুক দুরুদুরু…। পারব তো এতজনের সামনে বাজাতে? অবশ্য গান শুরুর কিছুক্ষণ পরেই বেশ হাত জমে যেত, তখন এত এত দৃষ্টির সামনে বাজাতে ভালোই লাগত।

কিন্তু সেদিন গান শুরুর অল্প কিছু পরেই বিপত্তি ঘটল।

এমন আর কখনো ঘটেনি।

একজন সমীহ করবার মতো বনেদি চেহারার প্রৌঢ় হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে জোড় হাত করে বললেন— এভাবে আপনি পালাগান করতে পারেন না।

বাবা থামিয়ে দিলেন গান, ভালো করে বুঝতে চাইল তাঁর বক্তব্য।

যা বুঝলাম, বাবা গানের মধ্যে যে-রাগরাগিণীর আরোপ করছে, তা তাঁর পছন্দ হচ্ছে না। কৃষ্ণবিষয়ক গান বিশুদ্ধ সুরে গাওয়া উচিত ইত্যাদি।

বাবা কীর্তন শিখবার আগে কিছুকাল মার্গ সংগীতের চর্চা করেছে। শুনেছি, বাবার ঠাকুরদার আমল থেকে আমাদের বাড়িতে ধ্রুপদী সংগীতের চর্চা, তার প্রভাব পড়েছিল বাবার মধ্যে। আমি লক্ষ করতাম, একেকদিন বাবা একটু বেশিই রাগ-রাগিণীর ব্যবহার করত। আর সেদিন আমাকে খোল রেখে বেশি তবলা বাজাতে হত।

তবে সেদিনের মতো আর কখনো ঘটেনি। বাবা তৎক্ষনাৎ আসর ত্যাগ করল, একটা গুঞ্জন শুরু হল শ্রোতাদের মধ্যে। অনেকে সেই মানুষটির ওপর বিরক্ত হলেন। কর্তৃপক্ষ এসে বারবার অনুরোধ করলেও বাবা কারো কথাই শুনলেন না।


একটি মতে বাঁকুড়ার ছাতনা শহরে যে-বাশুলী মন্দির আছে, সেখানেই চণ্ডীদাস সাধনা করতেন। সেই মন্দিরের পিছনে একটি লাগোয়া ঘর, আমরা একবার ওই ঘরটিতে টানা পনেরো দিন থেকেছি। মন্দিরের সামনে আটচালা তারপর মাঠ, মাঠ ঘেঁষে পিচ রাস্তা চলে গেছে, রাস্তার ওপারে একটি ছোটো পুকুর। কথিত যে, ওই পুকুরেই রামী রজকিনী কাপড় কাচতে আসত। আমরা দিনের পর দিন ওই পুকুরে স্নান করেছি। কিন্তু সবসময়ই মনে হত, গল্পে শোনা পুকুর কেন এত ছোটো হয়! কল্পনা আমার বাধা পেত।

অবশ্য আমার এই বালকোচিত কল্পনার সঙ্গে ঐতিহাসিক সত্যের কীই-বা সম্পর্ক!

এখানে আসর বসত সন্ধ্যের মুখে মুখে এবং গান শেষ হত রাত দশটার মধ্যেই।

প্রচুর নানা বয়সের মহিলা গান শুনতে আসত।

তারা কখনোই বাজনার মান বিচার করত না।

একটি অল্পবয়সী ছেলে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে কখনো শ্রীখোল কখনো তবলা বাজাচ্ছে— এটাকে তারা বিস্ময়মিশ্রিত মুগ্ধতা দিয়ে দেখত।

পুরুষ শ্রোতারা এই ব্যাপারটিকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না। বরং তাদের মধ্যে অনেকেই থাকত কীর্তনের প্রকৃত সমঝদার।

তো তখন সাধিকা রাধার চরণ পাবে বলে কৃষ্ণের চূড়া বামে হেলছে…

চূড়া বামে-এ-এ হে-এ-লে-এ বামে হেলে-এ।

কৃষ্ণের চরণ পাবে বলে।

বামে হেলে চূড়া-আ-আ বা-আ-মে-এ হেলে-এ।

কৃষ্ণের চর-অ-অ-ণ পা-আ-বে-এ বলে…

আর গলার মালা তখন?

আপনি দোলে মালা আপনি দোলে

গলার গুণ কি মালার গুণ…

দোলে মালা সে যে

ধীর লয় থেকে পরের গানেই আমার হাত দ্রুত লয়ে বোল তুলত খোলে।

প্রাণ খুলে বাজিয়েছিলাম কি সেদিন? গানের আসর ভাঙতেই প্রৌঢ়া ক-জন মা মাসির মতো আদল তাদের— এসে আমাকে ছোঁ মেরে কোলে তুলে নেয়। আর বল লোফালুফির মতো এ-কোল ও-কোল হতে হতে কখন তুলনায় অল্পবয়সীদের কোলে পৌঁছে গেছি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল কিন্তু এমন একটা অনুভূতি যা আগে কখনো হয়নি, অজস্র নারীর চুম্বন আর তাদের শরীরের ঘনিষ্ঠ স্পর্শ আমাকে এক নতুন সুখানুভূতির কাছে নিয়ে গিয়েছিল— অনেক পরে যখন স্পষ্ট যৌন অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার, যৌবনের দিনগুলিতে তা যেন একটা আর্তিই বয়ে এনেছে আমার কাছে কিন্তু সেদিনকার সেই দমবন্ধ হয়ে আসা সুখানুভূতি আমাকে নতুন অপূর্ব একটা জগতের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে দিয়েছিল। তখন সপ্তম কি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি— সেদিনের সেই সমবেত আদরের কথা যখনই মনে পড়ে, আবিষ্ট হয়ে পড়ি। ভাবি যে, আমার এই ছোট্ট সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার হয়তো পেয়েছিলাম সেদিনই।

শেষ পাতা

Categories
গদ্য

তমাল রায়ের গদ্য

কে জন্মায় হে বিপ্লব?

‘লুকিং আউটসাইড ইজ ড্রিমিং, লুকিং ইনসাইড ইজ এওকেনিং’

দাদুর হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে, ছ-বছরের মেয়েটি। সম্পর্ক হয়তো একটা কিছু আছে। এও সত্য সব সম্পর্কের নাম হয় না। পথ যেমন হয় উঁচু বা নীচু। সব পথেরই শেষ থাকে। অথবা থাকে না। এও হাইপোথিসিস! সে তুমি গল্পই লেখো বা ছবি আঁকো বা মুভি নির্মাণের সময় কিছু স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন মাস্ট। কিন্তু চূড়ান্ত নয়! ধরো দাদুর নাম ইগো আর শিশুকন্যা কনসাসনেস। বাকিটা সময় বলবে। মানে কাহিনিতে রং ঢং লাগাবে সময়। ধরা যাক দাদুর স্ত্রী বিগত হয়েছেন প্রায় বছর ত্রিশ। তার নাম ছিল আনকনসাস। তার সন্তানদের কেউ ছিল লিবিডো, কেউ ইডিপাস বা ইলেক্ট্রা। সময় নামক গণৎকার এদের বড়ো করায় বাঁধা হননি। কেবল যার গর্ভ থেকেই কনসাসনেসের বাপ কাকার জন্ম, সেই আনকনসাসকে তুলে নিয়েছিলেন ঈশ্বর। ঈশ্বরও এক আপেক্ষিকতা। যে থাকলে আমাদের মত খেঁদা, প্যাঁচা বা টেঁপা, টেঁপিদের সুবিধে। যা বলার প্রয়োজন তা হল, যে-কোনো জার্নিই হল একটা ইনডেফিনাইট মেকিং! যাতে বাতাসের মিহিগুঁড়োর মতো অজান্তেই লেগে থাকে সাররিয়েল বা সুপার রিয়েল। দূরে একটা পাহাড়। ধরা যাক তারও উত্তরে জনপদ। পাহাড় টাহার যদি এনসার হয় খামখেয়ালির, তাহলে বলা যাক, এনারা উত্তরেই জেনারালি অভিষিক্ত। যেমন ধ্রুব তারা। যদিও ধ্রুব এক ফলস্‌হুড। এখানে বলা বাহুল্য মিসোজিনি আছে। মিথোজীবিতাও আছে। ধরা যাক পাহাড়ের কোলে একটি গ্রাম, গ্রামের নাম ইচ্ছেবাড়ি অথবা নকশালবাড়ি। আর ইগো নামক প্রৌঢ় কনসাসকে নিয়ে হেঁটে চলেছেন স্মৃতিসৌধ প্রদর্শনে। নাত্নি কনসাসনেস। আপাতত আঙুল তুলে দেখাচ্ছে একটি নদী। জল বয়ে যেত কখনো। এখন খটখটে শুকনো। দাদু অবশ্য আকাশ ভরা সূর্য তারার নীচে দাঁড়িয়ে সে-সব কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। কারণ, সন্ধ্যে নামছে, পাখিরা ঘরে ফিরছে। আর কুয়াশা জড়ো হয়েছে অনেক। শীত আসার আগে যেমন হয়। ধানক্ষেতে মৃত্যুর নোটিস বা বিপ্লব! কেবল কুয়াশায় হারিয়ে গেল কনসাসনেস। স্বজন হারানোর দুঃখে শোকে ইগো কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তোমার মহাবিশ্বে প্রভু হারায় না-কো কিছু। কুয়াশার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে চলেছেন: ‘কালেক্টিভ কনসাসনেসের কথা। আর কনসাসনেস শুকনো নদী পেরিয়ে ইগোকে খুঁজতে গিয়ে হাতে পেয়েছে চিরকুট। লেখা লুকিং আউট সাইড ইজ ড্রিমিং, লুকিং ইনসাইড ইজ এওকেনিং। শেষ আলোটুকু সম্বল করে, কনসাসনেস এপারে, আসতে চেষ্টা করছে। পেরে উঠছে না। বয়সোচিত কারণেই সে নিরুদ্বিগ্ন। ইগোকে এলোপাথাড়ি দৌড়াতে দেখে, সে হাসছে। ভাবছে এও এক খেলাই। সমাজ সভ্যতা বা বিপ্লবের ইতিহাসে যেমন হয় আরকী!

ফ্রেদরিকোর তেমন ভরসা ছিল না বর্ষায়। গ্রীষ্ম আরামদায়ক হলে সে বসে থাকত সমুদ্রতীরে। একা বসে থাকার সময় আলো আঁধারিতে চোখে পড়ত, একটা উজ্জ্বল আলোর অবিরাম ঘুরে যাওয়া। মার কাছেই শোনা, বাবা না কি অমনটাই ছিলেন, শুনে সরে যাওয়া আলোর সিঁড়ি বেয়ে সে পৌঁছতে চেয়েছিল টাওয়ারে। সেখান থেকে সমুদ্রকে চেনা যায়। দূরত্ব যেভাবে চেনায় সময়কে। একটানা সোঁ সোঁ সুরের মাঝে অক্ষরের পর অক্ষর গাঁথলে জন্ম নেয় ব্যালাড। যুদ্ধ তেমন বৃহৎ হয়ে ওঠে না কখনোই। কিন্তু লড়াইটা থেকে যায়। ফলে টবে লঙ্কা গাছ, তার পাশে নয়নতারা, তারও পাশে ক্রিসানথিমাম। চিঠি আর আসত না। পাগলের মতো মাথা নাড়াতে নাড়াতে ফ্রেদরিকো সময়ের কাঁটা কে উলটো করে দিতে চাইত। সে চাইত হাতদুটো হোক আরও লম্বা, প্রেম বা বিরহে দীর্ঘ হাতই একমাত্র অবলম্বন অথবা আলিঙ্গন। তারপর ফট ফট কিছু শব্দ। আর ঘুম ছড়িয়ে গেল শহরে। বৃষ্টির ছাঁট লাগতে যখন হুঁশ ফিরল টবে ফুটেছে মৃতদেহ। সমুদ্র থেকে টবের দূরত্ব মাত্র কয়েক মিটার। বাকিটা ক্যামেরায় দেখানো হয়নি। কেবল বিশাল তারাভরতি কসমিক এম্ফিথিয়েটারে তখন কেবল সমুদ্র গর্জন। ক্যাওসের জন্ম হচ্ছে ফ্রেদরিকো ফুলের পাশেই…

যে বা যারা ভীতু, সর্বদা দর্শনকে যুক্তি হিসেবে খাড়া করে, এছাড়া উপায়ই বা কী!

: কাম্যু।
: হুঁ
: সত্য বড়ো প্রকট, আলোর মতোই। চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মিথ্যে বরং দূর নক্ষত্রের মতো, যা আশপাশের অনেক কিছুই চেনায়।
: কে?
: বলো দেখি।
: বুঝি না।
: কে, সার্‌ত্র? সিমন দি বোভোয়া?
: কাম্যু।
: সত্যি বলে কি সত্যি কিছু আছে?
: জানি না।
: কেন?
: আর মিথ্যে?
: এত জেনে কী হয়?
: কিছুই হয় না হয়তো। তবু তো মানুষ জানে।
: ইয়ং ইটালি কে গঠন করেন?
: জানি না।
: মাৎসিনি।
: ইউ এন ও কবে প্রতিষ্ঠা হয়?
: জানি না।
: ১৯২০, ১০ জানুয়ারি।
: আচ্ছা!
: পৃথিবীর স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ কোনটি?
: জানি না।
: ১৮৯৬। ব্রিটেন আর জাঞ্জিবার। ৩৮ মিনিট। ব্রিটেন জিতেছিল।
: আচ্ছা!
: আমেরিকায় ক্রীতদাস প্রথার অবসান ঘটান কে?
: জানি না!
: আব্রাহাম লিঙ্কন।
: বুঝলাম। জাতি সংঘ বলে কি আদৌ কিছু আছে? না কি বড়োলোক দেশের দালালি করাই জাতি সংঘ!
: হুঁ
: কী হুঁ?
: যুদ্ধ কি শেষ হয় আদতে?
: কী জানি!
: ক্রীতদাস প্রথার অবসান হয়েছে? ইজ ইট?
: তোমার কী মনে হয়?
: এপ্রিল ১৪, ১৮৬৫। গুড ফ্রাইডের প্রেয়ারে তাকে কেন খুন হতে হল?
: বেশ!
: আর জানো, যুদ্ধ টুদ্ধ কখনোই শেষ হয় না। চলতেই থাকে।
: আর মৃত্যু?
: কী?
: কিস্যু না, যেদিন প্রেম থাকবে না। আত্মমর্যাদাবোধ থাকবে না, সেটাই মৃত্যু! সে তুমি যতই বেঁচে থাকো। আপাতত ছায়ার সাথে ছায়ার যুদ্ধ ল্যান্ডস্কেপে। কেবল বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে। কেউ হয়তো কাঁদছে। কেউ কান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগোপনে।

ভিজে ক্যানভাসে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট চড়াই। ধোঁয়া উঠছে। জীবন না মৃত্যুর কে জানে!


চলন্ত জানলার রডে আপাতত বসে একটি পাখি। ট্রেনের গতি খুব মন্থর! উপায়ও নেই। লাইনের দু-ধার জুড়েই অসংখ্য মানুষ অভিনন্দন জানাচ্ছে… ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে… পাখি খানিক ঘাবড়ে কামরার মধ্যে ঢুকে ওড়াউড়ি করল। ধাক্কা খেল, সার দিয়ে রাখা বন্দুকে। তারপর কী করে যেন উড়ে গেল বাইরে! যাবার আগে পিচিৎ করে খানিকটা পায়খানাও করে দিয়ে গেল। ভেতরে গান চলছে, চেনা সুর, মনে পড়ছে না কিছুতেই… কেউ খাবার ছুঁড়ে দিচ্ছে, কেউ-বা সদ্য কেনা জামা বা ট্রাউজার্স। মাইকিং হচ্ছে। ফুল ছুঁড়ছে লোকজন, কী উন্মাদনা। ওরা বিশ্বাস করে, এ-দেশ তাদের মাতৃভূমি, আর মাতৃভূমির বীর সন্তানরা এই ট্রেনে করে এগিয়ে চলেছে… প্রশস্তিমূলক কথা আর গানের মাঝেই পোয়াতি মেয়েটা কী কুক্ষণে কেঁদে উঠল এরই মাঝে, কে জানে! হঠাৎ ভাবগম্ভীর পরিবেশ! সকলের চোখেই জল। কুমারী মেয়েটা তার ইউ এস জি রিপোর্টের প্যাকেটটা ট্রেনের দরজায় দাঁড়ানো যার হাতে তুলে দিল তার বাম বগলের তলায় ধরা ক্রাচ! ট্রেন চলছে। আবার স্লো বিটে প্যাট্রিওটিক সং বাজছে। ট্রেন এগোচ্ছে, সামনে কিছু দূরেই তো ওয়ার ফ্রন্ট…

Categories
গদ্য

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তীর গদ্য

অতিমারির উৎসব ও এক ছদ্মকবি

মানুষের মন বিবর্তনশীল। ঠিক তেমনই তার সৃজনশীলতাও। মনের অনুভূতি ও সৃজনশীলতার প্রক্ষেপণ অভিন্ন। ঠিক তেমনই অভিন্ন মনের অবসাদ ও সৃষ্টির অবক্ষয়। মানবজীবন স্বল্পায়ু। তবু এই স্বল্পায়ু সম্বল করেই মানুষ বলতে পারে দার্শনিক রেনে ডেকার্টের মতো ‘আমি ভাবি, তাই আমার অস্তিত্বও আছে’। আবার কখনো-বা সে বলে ওঠে ‘এ মায়া প্রপঞ্চময়’। মানুষের আয়ুকাল সীমিত হলেও তার ভাবনার পরিধি ও কল্পনার ব্যাপ্তি মহাকাশের মতোই অনন্তপ্রসারী। মনোজগৎ ও বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিল্প, শিল্প ও সাহিত্যর মধ্যে কোনো অন্তরায় সভ্যতার জন্মলগ্নে ছিল না। এই সীমানা প্রতীষ্ঠা আধুনিক সভ্যতার অপচেষ্টা। প্রতিটি মানুষের মনের কোণে একজন কবি লুকিয়ে থাকেই। তিনি প্রবল হিসেবি গহনাকারই হোন, বা দোর্দণ্ডপ্রতাপ একনায়ক। সারাজীবন এক পঙ্‌ক্তি কবিতা না লিখলেও মানুষমাত্রই কবি। শুধু সেই কবিত্বকে পরিস্থিতি প্রবৃত্তি ঋণীঋতির আবর্তে কেউ কেউ চিরকালের জন্য কণ্ঠরোধ করে দেন। কবিতা যে শুধু লিখতেই হবে এমন কথা কে বলল? আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির সূত্র কি পৃথিবীর সুন্দরতম কবিতার একটি নয়? বা মোৎজার্টের যন্ত্রালেখ্য! কবিমন ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব অসম্ভব। তিনি যখন মা, তখনও তিনি কবি। আবার যখন শিশু, তখনও। তবু সেই কবি হওয়া কি সহজ? চারিপাশের অতিমারি। তার ভ্রূকুটি আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা কতটা নিস্পৃহ থাকতে পারবে সেই কবিসত্তাটি? কবি অরুণ মিত্র তাঁর ‘কবিতা, আমি ও আমরা’ প্রবন্ধ শুরু করছেন এইভাবে, ‘আমি মাঝেমধ্যে কবিতা লিখি। যে-সময়ে লিখি না, মাঝেসাঝে ভাবি কেন কবিতা লিখি। নিশ্চিন্ত হতে পারি এমন উত্তর কখনো পাই না। আধুনিক কবিতার কোনো লেখক কি পান? জনসমষ্টির সঙ্গে কবিতার যখন আর যোগ নেই তখন এক মোক্ষলাভ ছাড়া বস্তুত আর কোনো লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘এই ভয়াবহ সময় কে জানে, সেই ‘মোক্ষলাভ’-এর আশাতেই কি না, কয়েকটি লিখে ফেলা পঙ্‌ক্তি নিয়ে সাজিয়ে নিচ্ছি এই লেখাটি।’

তখন অতিমারির খবর সবে আসতে শুরু করেছে। ইউরোপে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। উড়ে উড়ে ভেসে আসছে ভয়ের শব্দ। কোথাও লটারি করে ঠিক হচ্ছে ভেন্টিলেটর কে পাবে, কোথাও গণকবরের ওপর তৈরি হচ্ছে রাস্তা। সেইরকম এক সময়ে হাসপাতালে রাতে ডিউটির সময় একচিলতে সুযোগ পেয়ে লিখেছিলাম এই কবিতাটি।

দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে

দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে যে-শব্দগুলি
আজ আমার কথোপকথন শুধু তাদেরই সাথে
আমি প্রশ্ন করি ওদের
ফাল্গুন ঝড়ের কথা
দখিনাবাতাসের কথা
জানতে চাই কবে আসবে তুষারপাত
উত্তর ফিরিয়ে দেয় রংচটা গোলাপি দেয়াল
আমি সেই উত্তর শুনতে পাই স্পষ্ট
কিন্তু তাদের অর্থ বুঝতে পারি না কিছুতেই

কবিতার সঙ্গে স্যানিটাইজার দিয়ে ভাবলাম অনেকগুলো ছোটো ছোটো স্কুলপড়ুয়া শিশুর ছবি আঁকব। কিন্তু কী হল কে জানে। ছবি শেষ হলে দেখলাম, প্রতিটি পড়ুয়ার চোখেমুখে ভয়। এটা তো আমি সচেতনভাবে চাইনি! তাহলে কি অবচেতনে আমারও মনের মধ্যে অনিশ্চয়তার ভয় ঢুকে বসেছে? যেমন লিখতে চাইনি ‘রংচটা গোলাপি দেয়াল’। আমি লিখতে চাইনি। তাহলে কে লেখাল! আমি কি তবে হ্যালুসিনেট করছি? অতিবায়বীয় অতিমারির জিনপরি ভর করছে আমার ভিতর!

এর কিছুদিন পর ঘটে গেল একটি দুঃখজনক ঘটনা। আমরা যাঁরা মাঝেমধ্যে শহরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য যাই, তাঁরা জানি, সেখানকার সেবায় ব্রতি নার্সরা অধিকাংশই হয় মণিপুরী, নয় কেরলবাসী। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই সেবিকারা অসম্ভব পরিশ্রমী ও মেধাবী হন। চব্বিশ ঘণ্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর অনায়াসে আবার আরও এক চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করতে পারেন। ভাষাগত যে-কাঠিন্যটুকু থাকে তা অতিক্রম করতে তাঁরা হয়ে ওঠেন অতিরিক্ত স্নেহশীলা। সংক্রামক ব্যাধিতে ভুগতে থাকা রোগিকে পরম যত্নে হাতে করে খাইয়ে দিতেও দেখেছি আমি। বিনিময়ে আমরা যারা ‘বুদ্ধিজীবী’ জাতি বলে মনে করি নিজেদের, কী দিয়েছি ওদের? সম্মান? স্বীকৃতি? অধিকার? সুরক্ষা? না। এর কোনোটাই হয়তো পারিনি দিতে। শপিংমলে ওদের দেখে আড়ালে ‘চিঙ্কি’ বলেছি, রিসেপশনে ওদের কথা বলার ধরন নকল করে টোনটিটকিরি কেটেছি। সেদিন তেমনই বেশ কিছু সিস্টারদিদিমণি অভিমান করে ফিরে গেলেন তাদের নিজের রাজ্যে। মন ভালো ছিল না আমার। একদিকে অতিমারির মনখারাপের লকডাউন। অন্য দিকে শহরের কোল খালি করে চলে যাওয়া এই সেবিকারা। সেদিন হঠাৎ লিখলাম।

পরবাস

ওরা চলে গেল শূন্য দেউল রেখে
দেউলের বুকে সময়হরণ চাকা
ওরা ছেড়ে গেল একবুক অভিমানে
যুদ্ধক্ষেত্রে রইল চাদর ঢাকা।

ওরা ছেড়ে গেল একবুক অভিমানে
আমাদের ব্রত বুদ্ধিজীবীর মতো
ময়না আর তদন্ত খুঁটে খাওয়া
দেউলের চাকা নিয়তি শরণাগত।

ময়না আর তদন্ত খুঁটে খাওয়া
আমাদের যত পথ্য শোধনাগার
ওদেরকে কেউ পিছুডাক দিল না তো
ওরা চলে গেল স্তব্ধ করল হাওয়া।

ওদেরকে কেউ পিছুডাক দিল না তো
এতোদিন শুধু পিছে ডাক দিয়ে গেছি
যাতায়াত পথে অপমান ভরে দিয়ে
ওদের দু-চোখ করেছি অশ্রুজাত।

যাতায়াত পথে অপমান ভরে দিয়ে
আমরা ওদের পরবাসে ঠেলে দিলেম
আমরা আবার নেমে আসি সমতলে
ওরা চলে যায় স্বপ্ন বোনার দেশে।

হাসপাতাল তো দেউলই আমার কাছে। মনে হল এই হঠাৎ চলে যাওয়া অনেকটা তৃতীয় পানিপথ যুদ্ধে ভরতপুরের জাঠ রাজা সুরজমলের মারাঠাদের একলা ফেলে চলে যাবার মতো। এরপর কী করে যুদ্ধে লড়ব আমরা!

ক্রমশ মৃত্যুর সরণি বয়ে আসছিল আমার দেশের দিকেও। প্রথমে কিছু বিখ্যাত মানুষ। তারপর পাশের রাজ্য। তারপর পাশের পাড়া। তারপর একদিন নিজের আত্মীয়স্বজন। মৃত্যু তখন ঘরে ঘরে। সে এক মৃত্যুনদীর স্রোত যেন। সেই বিষাদঘন আবেশে বয়ে এল নতুন মহামারি আইন। মৃত্যুর পর মৃতদেহ তার নিকটজন দেখতে পারবেন মাত্র তিরিশ সেকেন্ড। তারপর পলিথিন মুড়ে তাকে ফেলে দেওয়া হবে লাশঘরে। সেখানে মৃতদেহর স্তূপ। সেখান থেকে গণদাহর জন্য নিয়ে যাওয়া হবে তাদের। এই যন্ত্রণা অসহনীয়। মনোবিজ্ঞান বলে মৃত্যুর পর মৃতদেহ ঘিরে আপনজনদের আর্তি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক। সেই আর্তিতে যাঁরা স্বজনহারা হলেন তাঁরা অবচেতনে স্বীকার করে নেন বাস্তব। মনোবিদ এলিজাবেথ কুবলার রোজ এই ঘূর্ণিপাকের কথা বলেছেন। ত্রিশ সেকেন্ডে তা কতটা সম্ভব? তেমনই একটি ঘটনা ঘটে গেল। আমার শিক্ষকের শাশুড়িমা মা গেলেন অতিমারির সংক্রমণে। তার মৃতদেহ কাচের দেওয়ালের ওপার থেকে দেখার অনুমতি মিলল মাত্র ত্রিশমিনিট। কিন্তু তাঁরাই বা দেখবেন কী করে? তাঁরা নিজেরাও তো তখন ঘরবন্দি। তাঁদের দেহেও সংক্রমণ। সেদিন রাতে লিখলাম এই কবিতাটি।

চরণিক

তোমার জন্য সবুজ রেখে গেলাম
যাচ্ছি রেখে কৃষ্ণচূড়ার পাতা
আমার এ-পথ নদ হবে না জেনো
আমি হলাম শেষ না হওয়া খাতা

তোমার জন্য ফুলেল উঠোন রাখি
আমায় তুমি মুড়ছ পলিথিনে
আমার জন্য অন্তমিলের পদ
সাজিয়ে রেখো অন্য টুকিটাকি।

তুমি যাবে সদর সড়ক দিয়ে
তোমার জন্য খুলছি ব্যারিকেড
এতটুকুই আমার কণ্ঠনালি
আর কটা ধাপ বলব আশা নিয়ে।

তোমার জন্য সবুজ রেখে গেলাম
আমার চলা দখিন দুয়ার দিয়ে
ভোগ লেগেছে জগন্নাথের বাসায়
আমার কথা ফুরিয়ে গেল ঘিয়ে।

কবিতাটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হবার পর বেশ কিছু মানুষ প্রশংসা করলেন, কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া জানালেন। কিন্তু লক্ষ করলাম, আমার মন সেইসব স্পর্শ করছে না। নিস্পৃহ লাগছে সবকিছু। তবে কি এভাবেই শেষ হবে মানবসভ্যতা!

ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম আমরা। মহাকাশে চলতে থাকা যানের মতোই। আলাদা হয়ে গেল সম্পর্কর মডিউলগুলো। হাতে রসায়ন ঘষি, মুখে আবরণ পরি। এই আবরণের একটি সুবিধা। মনের অন্তরের দোলাচলকে আর কষ্ট করে লুকিয়ে রাখতে হয় না। কবিতা আসে না আর। কবিতা ফুরিয়ে আসে। ক্রমশ ক্লান্ত হই। ক্রমশ নিজেকে মনে হয় পরাভূত। তবু জাহাঙ্গীরের দরবারে একটি পাখির ছবি আমাকে জাগিয়ে রাখে। চারপাশে তাকিয়ে দেখি বিচ্ছিন্নতা তার মায়াজাল বিস্তার করেছে। ঘরে ঘরে অবিশ্বাস। ভাইয়ে ভাইয়ে পাড়ায় পাড়ায় অবিশ্বাস। এত বিষ নিয়ে কবি লিখতে পারেন। আমি লিখব কী করে? আমি তো ছদ্মকবি। যাত্রাপালার বিদুষকের মতো আমার বেশভূষা পাগড়ি জহরত, সবটুকুই যে ‘ছদ্ম’। ভাবতে ভাবতে লিখে ফেলি আমার শেষ কবিতা।

মস্যাধার

আমার আঙুলে আর লেখনিশক্তি নেই
তুমি সেই অন্ধকার আগলে রেখেছ কবি
আমি ভগ্ন রাজ উঠোনের একপাশে
ভগ্নচোয়াল ঘিরে জীর্ণ মলিন রাজবেশ।

আমার গোলাপবাগে বেদখল কলতান অসহ্য মনে হয় না আর।
ওদের বেড়ে উঠতে দেখি আমি আঙুলের কোনায় নিভৃতে
ওরা তুলে নেয় রং
আমারই মস্যাধার থাকে
আমার লেখনি নেই
অবিশ্বাস বাস করে সেই শূন্য ঘরটুকু জুড়ে।

লিখে ফেলি। কিন্তু মানবসভ্যতার ওপর বিশ্বাস হারাই না। মনে মনে ভাবি, আমরা কাটিয়ে উঠবই। সেদিন আবার লিখব। কারণ, যতই ছদ্মবেশ হোক, বিদূষকের চলনবলন আমার রক্তে, অনুভূতিতে প্রবিষ্ট হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবি। আমি আবার লিখব। নতুন সূর্যের দিনে লিখব। কারণ, লেখা ছাড়া আমার আর কোনো রাস্তা নেই। কোনো মানুষেরই হয়তো থাকে না।