Categories
2021-June-Golpo গল্প

চয়ন দাশ

চল্লিশ মেঝে

 ১
বেদকে পাশের রুমে ঘুমোতে দেখে এ-ঘরে এলাম। এ-ঘর আমার আর বেদের নতুন। ঘরটা আমার নতুন হাবির, কিংশুকের। পাঁচতলার উপর। সকালের দিকটা ভালো লাগে, সামনেই একটা বস্তি আছে। সিমেন্টের রাস্তা, খোপ করে টাইম কল। বস্তির মাথাগুলো কমলা আর লাল ত্রিপল মোড়ানো। মাটির কাছাকাছি মানুষের যাবতীয় আয়োজন-প্রয়োজন ছেড়ে আমরা উপরে উপরে এড়িয়ে যাচ্ছি, কেমন যেন মিলিয়ে যাচ্ছি। দুপুরের দিকে ব্যালকোনির গ্রিলে কাক আসে, শালিখ, পায়রা— এতখানি উঠে এসে ক্যামন যেন হাঁপায় মনে হয়। আমায় দ্যাখে, একা ঘরে আমি একা। কিংশুক অফিসে, বেদও স্কুল-কোচিং- এন্ট্রান্সের প্রিপ্যারেসন নিয়ে ব্যস্ত। বাকি থাকল, আমার পরিচয়? আমি আমার নিজের একটা নাম দিয়েছি, ‘ফালতু’।

ডিভোর্সি মহিলা, চল্লিশ হতে চলল অথচ নিজস্ব একটা জীবনের পথ খুঁজে পেলাম না, চেষ্টা করিনি এমন তো নয়, জীবনের চেষ্টার ব্যর্থতার খেসারত অন্যরকম হয়। সময় পেরোয়। স্রেফ সময় পেরোয়। আশপাশের গাছগুলোর ছায়া কমে, বাবা মরে যায় মা মরে যায়, মরে যেতে পারে ভাবতেই পারিনি কোনোদিন, আজও পারি না।

ফাঁকা ঘর, ধু ধু। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। খুব সাজি। ভ্রূ আঁকি। লিপগ্লস লাগাই। আস্তে আস্তে পেটের সামনের কাপড় খুলে ফেলি, তুলে দিই। নাভির নীচে স্ট্রেচমার্কগুলো হাত বুলাই। তলপেট যোনি খুব অস্পষ্ট। কেউ কোথাও নেই। আমার নাভি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অপরাহ্ণকে দেখতে পাচ্ছি। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। আবার দেখতে পাচ্ছি কোনো একজন মেয়ের নরম হাত— পেট আর বুক নিয়ে আমার দিকে আসছে। বলছে যেন, ‘কোনোদিন এমন নরম হতে পারবে? হতে পারলে থাকো আমার সাথে…, নয়তো যা বলেছি সেটা করো’। অপরাহ্ণ আমায় থ্রিসামে ইনভল্ভ হতে বলেছিল। অপরাহ্ণর বয়স বাড়ছে, ওর শরীর যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে, ওর মনের ভেতরকার লিঙ্গ জেগে উঠছে, অপরাহ্ণ মনের মুখটা ওর যমজ ভাইয়ের মতো। আমায় যেন আয়নার ভেতর থেকে ডাকতে থাকে… হাত দাও, হাত বাড়াও।

অপরাহ্ণের সাথে সব সম্পর্কই মিটে গেছিল। আমার পক্ষে যতদূর যাওয়া সম্ভব হয়েছিল, গেছিলাম, হাঁপ লাগলে ছেড়ে দিলাম। হল না। বেদ আমাদের ডাইভোর্সের কারণ জানে না। বেদকে জানাবও না কোনোদিন। বেদ ওর পাপাকে খুব ভালোবাসত। ওর সাথে কিংশুকের আলাপ হয়েছে, কিংশুকও চেষ্টা করছে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড হতে, পাপার জায়গাটা পাপারই থাকুক।


বেদ ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে এলাম কিংশুকের রুমে, কেন-না কিংশুক আমায় নিঃশব্দে ডেকেছে। আমি জানি ও কেন ডেকেছে। আমার জন্মদিন, ফার্স্ট উইশ করবে। বিছানা থেকে ওঠার আগের মুহূর্তেও একবার অপরাহ্ণকে মনে পড়ল, ভুলতে পারিনি, যতই সে পাপ কিংবা অন্যায় করুক আমার সাথে।

কিংশুককে আমি এভাবে কোনোদিন পাইনি। আশাও করিনি এতটা কাছ থেকে ওকে দ্যাখার। ওর ধীরে ধীরে এক-একটা গিফ্ট আমায় অবশ করে দিচ্ছে। আমার দু-হাত দু’দিকে ছিটকে পড়ে আছে, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। ওর নাক ঠোঁট চোখ আমার নাভির নীচে নামতে থাকলেই মাথা ঝনঝন করতে লাগল। মনে হতে লাগল— আমি পুনরায় একা হয়ে গেছি। বাথরুমের লাল মেঝেতে উলঙ্গ হয়ে বসে আছি, মৈথুন করছি, শিরশির আওয়াজ বেরিয়ে যাচ্ছে মুখে, দরজার ঠিক ওপারে ভাই কান পেতেছে, তবু সামলাতে পারছি না নিজেকে। একসময় দেখছি বাথরুমের বন্ধ ঘরের ভেতর চুপিচুপি কারা এসে দাঁড়িয়েছে। উলঙ্গ পুরুষ, কামার্ত সবজন। অপরাহ্ণ-অপরাহ্ণের সাথে একটা বেঁটে লোক, বস্তির ভ্যানওয়ালাটা, মাছওয়ালির বরটা, কনুই গোঁতানো বাস কন্ডাকটর, বায়োলজির স্যার… সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে। সবার লিঙ্গের মাথায় লার্ভার চাক ভেঙে টাটকা মাছি ভ্যান ভ্যান করছে। বুঝতে পারছি— কিংশুক আমার হাঁটু দুটো মুড়ে দিচ্ছে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে— বেদ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আমার নিঃশ্বাস শুনে ফেলছে— বেদ যেন সেই বাথরুমের ভেতর ঢোকার জন্য বাথরুমের দরজায় টোকা দিচ্ছে।


কিংশুককে ঠেলে সরিয়ে আমি এ-ঘরে এসেছি। বেদ ঘুমাচ্ছে। ওর চোখের পাতার নীচে মণিগুলো অস্থির। হয়তো স্বপ্নে ও কোনো ইশকুলবাড়ির ভেতর আটকে গেছে, ওর একাকিত্বের সুযোগ নিতে এগিয়ে আসছে একটা রঙিন উট, ওকে ভালোবাসছে, আদর করতে করতে শূন্যের দিকে গড়িয়ে দিচ্ছে। ও আমার দিকে হাত বাড়াচ্ছে খাদের ভেতর থেকে, আমি হাত বাড়াচ্ছি, হাতড়াচ্ছি… কেউ নেই আমার জন্য। চাই সমস্ত পুরুষ, মানুষ থেকে গাছ হয়ে আমার কাছে আসুক। আমার তলপেটে আঙুল দিক ঠোঁট ছোঁয়াক অ্যান্ড্রোপজ একজন। আঁকড়ে ধরুক

Categories
2021-June-Golpo গল্প

শমীক ষাণ্ণিগ্রাহী

সবাই মিথ্যে বলে

আমার লেখা এটা প্রথম গল্প। গল্পটা লিখে আমার নিজেরই খুব ভালো লেগেছে।

আমার লেখা এটা প্রথম গল্প। তাই অনেক ভাবনাচিন্তা করে, সময় নিয়ে, দু-দিন অফিস কামাই করে লেখাটা শেষ করেছি।

প্রথমে গল্পটা আমি রিয়াকে পড়তে দিলাম।

রিয়া পড়ল। একবার দু-বার তিনবার। শেষে বলল, ভালো লেগেছে।

শুনে আমি খুশি হলাম। কথাটা বলতে রিয়া গতকাল রাত্রের রান্না বন্ধ রেখেছিল। এই কথাটা শুনতে আমাকে গতকাল রাত্রের খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে আনতে হয়েছে। যাইহোক গল্পটা রিয়ার ভালো লেগেছে।

গল্পটা বাবাকেও একদিন পড়তে বললাম।

পরদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কেমন লাগল?

বাবা ছোট্ট উত্তর দিয়ে বললেন, পড়ছি। তারপর হাঁটতে বেরিয়ে গেলেন।

তার পরদিন আবার জিজ্ঞেস করতে বাবা, পড়ছি। বলেই হাঁটতে বেরিয়ে গেলেন।

এভাবে একদিন দু-দিন তিনদিন করে করে পুরো সপ্তাহ কেটে গেল।

রোববার সকালের দ্বিতীয় দফা চা খেতে খেতে বাবা জানালেন গল্পটা তিনি পড়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগল? বাবা সেই আগের মতো ছোট্ট উত্তর দিলেন, ভালো। বলে খবরের কাগজে মন দিলেন।

গল্পটা বউয়ের ভালো লাগল

গল্পটা বাবার ভালো লাগল

গল্পটা লিখে আমার নিজেরই খুব ভালো লেগেছে।

কয়েকদিন পর গল্পটা পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে পাঠালাম।

আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম গল্পটা মনোনীত হবার জন্য।

অপেক্ষা করতে করতে একমাস কেটে গেল।

প্রায় ভুলেই গেছিলাম যে, আমি কোনো গল্প লিখেছি। ভুলেই গেছি যে, আমার লেখা প্রথম গল্পটা আমি কোনো পত্রিকার দপ্তরে পাঠিয়েছিলাম।

রিয়া ভুলে গেছে আমার গল্পটা কখনো পড়েছে কিনা।

বাবা ভুলেই গেছেন আমি একটা গল্প লিখেছি বলে।

বাড়িতে একদিন চিঠি এল আমার নামে। আমার নামে চিঠি প্রায় আসে না বললেই চলে। যা আসে সব বাবার নামেই। যাইহোক চিঠিতে পত্রিকার সহকারী সম্পাদক জানিয়েছেন যে, গল্পটা তাদের মনোনীত হয়েছে। এবং সেটা জুলাই সংখ্যায় ছাপা হবে। পত্রিকা প্রকাশিত হলে যথা সময়ে লেখক কপি আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

গল্পটা ছাপা হবে জেনে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। সঙ্গে আরও একটা নতুন খবর।

গল্পটার জন্য আমাকে সাম্মানিক দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে মিশিয়ে আমি খুব খুশি। আমার লেখা প্রথম গল্পটা শহরের সেরা পত্রিকায় প্রকাশিত হবে।

রিয়া হাসি হাসি মুখে বলল, খুব ভালো খবর। টাকাটা পেলে আমাকে একদিন খাওয়াতে নিয়ে যেতে হবে।

বাবা শুনে বললেন, ভালো খবর। সামনের মাস থেকে তুমি তাহলে নতুন গল্প লিখতে শুরু করে দাও।

প্রথম গল্পটা লিখে আমি খুব মজা পেয়েছি।

গল্পটা লিখে আমার নিজেরই খুব ভালো লেগেছে।

আমি অপেক্ষা করছিলাম আমার দ্বিতীয় গল্পটার জন্য।

জুলাই এল। শহরে গরম বাড়ল। লোডশেডিংও বাড়ল। মিউনিসিপ্যালিটির সাপ্লাই জলের টানাটানি বাড়ল। হিসেব করে জল খরচ করার কথা বাবা বার বার মনে করিয়ে দিতে লাগলেন।

পত্রিকা প্রকাশিত হল। অতি উৎসাহে আমি বইয়ের দোকানে গিয়ে এক কপি কিনেই আনলাম।

সূচিপত্রে আমার নামটা জ্বলজ্বল করছে।

সামনের মাস থেকে আমাকে আরও নতুন গল্প লিখতে হবে।

আমি অপেক্ষা করছিলাম আমার দ্বিতীয় গল্পটার জন্য।

 

Categories
2021-June-Golpo গল্প

অনুপম মুখোপাধ্যায়

আন্ডারপাস এবং প্লাস্টিকের চেয়ার

বাড়ির কাছে একটা আন্ডারপাস। সন্ধ্যের পর সেটা একরকম শুনশান থাকে। মাথার উপর দিয়ে বিরাট বিরাট লরি যায়, বাস যায়, টেম্পো, ম্যাটাডোর, পিক আপ ভ্যান, ফিনফিনে মোটরবাইক যায়, রয়্যাল এনফিল্ড যায়। আন্ডারপাসের ভিতরে একঠায় একটা আলো জ্বলে থাকে, খাঁ-খাঁ করে। ওটা তৈরি হয়েছিল স্কুলের ছেলেমেয়েদের সুবিধার জন্য। এক বছরের উপর হয়ে গেল স্কুল বন্ধ।

কিছুদিন আগেও দেখতাম সন্ধ্যেবেলায় চেয়ার পেতে আন্ডারপাসটার মুখে একজন দশাসই পুরুষ বসে আছেন। বাড়ির সামনে। কিন্তু ওঁর বাড়ির লোককে ওঁর পাশে কখনো দেখিনি। একদম একা। বিরাট চেহারা। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে প্রায় সমান। ঘাড়টা ঝুঁকে থাকত বুকের উপর। একটা লুঙ্গি কোনোক্রমে কোমরে আটকানো। মাঝেমধ্যে পায়চারি করতেও দেখতাম, মনে হত কষ্ট করে পা ফেলছেন। আজ শুনলাম তিনি কয়েকদিন হল মারা গেছেন।

“স্ট্রোক?”

“না। কোভিড। বডি দ্যায়নি পুলিশ।”

ঠিক বিশ্বাস হল না। পাড়ার আর একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলল, “আরে ওর তো বিভিন্নরকমের প্রবলেম ছিল। হার্ট। কিডনি। সে-জন্যই গেছে।”

“পুলিশ বডি দিল না কেন?”

“সে পুলিশ আজকাল অমনই করছে। সন্দেহ হলেই কোভিড পেশেন্ট বলে বডি দিচ্ছে না।”

“সন্দেহ কেন? টেস্ট হয়নি?”

“অত জানি না।”

মৃত্যু এমনই একটা অবাক শূন্যস্থান তৈরি করে। আজ থেকে বছর কুড়ি আগে একটা দোকান থেকে রোজ রাত্তিরে সিগারেট কিনতাম। নিয়মিত অভ্যাস ছিল। একদিন দেখলাম দোকান বন্ধ। পাশের দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী ব্যাপার? এর কি শরীর খারাপ-টারাপ?”

“মরে গেছে।”

“সে কী! কী হয়েছিল?”

“বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বিষ খেয়েছে।”

সেই চমক আমার আজও কাটেনি। দিব্য হাসিখুশি লোক। বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারে এটাই বিশ্বাস করা মুশকিল। সে ঝগড়া তো করলই, আবার বিষ খেল, মরেও গেল! সেই রাত্তিরে মাথার উপর তারায় ভরা আকাশটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল ওর দোকান থেকে কেনা আমার সব সিগারেটের আগুন যেন সেখানে জ্বলছে, ইয়ার্কি মারছে।

এখন আন্ডারপাসটার কাছে গেলে একটা ফাঁকা প্লাস্টিক চেয়ার চোখে পড়বে।

লোকটার ওজন ঐটুকু একটা চেয়ার কী করে রাখত, তখন অবাক হতাম, এখনও অবাক হয়েই ভাবছি।

সন্ধ্যেবেলায় একটু হাঁটতে না বেরোলে চলে না। লকডাউন চলছে। সব দোকানপাট বন্ধ থাকে। লোকজন রাস্তায় নেই। যারা মহামারিকে ভয় পায় না, তারাও পুলিশকে ভয় পায়। পুলিশের মার পুরোদমে চলছে শহরে। কোনো কিছু না ভেবেই তারা লাঠি চালিয়ে দিচ্ছে শুনছি। আমাকে বেরোতেই হয়। সন্ধ্যেবেলায় একটু বাইরের হাওয়ায় না বেরোলে দম আটকে আসে। যতই অসামাজিক হোক, আত্মবিধ্বংসী হোক, কিছু ক্ষেত্রে তো করার কিছু থাকে না।

আন্ডারপাসটা পেরিয়ে দেখলাম প্লাস্টিকের চেয়ারে আজ ভদ্রলোকের ছেলে বসে আছে। অশৌচের পোশাক পরে আছে। এরও চেহারাটা খুব মোটার দিকে। হয়তো একদিন বাবার মতোই ওবেসিটি ধরবে একেও। অমনই মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকবে, কষ্টেসৃষ্টে নড়াচড়া করবে।

একবার এই ছেলেটার সঙ্গে আমার রাস্তায় তর্ক হয়েছিল। হঠাৎ করে আমার মোটরবাইকের সামনে এসে হাজির হয়েছিল। আমি ব্রেক কষতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। ছেলেটা নিজের দোষ স্বীকার করেনি।

সেই থেকে এর সঙ্গে দেখা হলেই মনটা কিছুটা তেতো হয়ে যায়।

আজ তবু দাঁড়ালাম। বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে। ছেলেটা মুখে মাস্ক পরে নেই। বাড়ির সামনে রাস্তা থাকলেও সেখানে কেউ মাস্ক পরতে চায় না। বাড়ি আর নিরাপত্তা যেন দুটো অবিচ্ছেদ্য ধারণা।

বললাম, “খবরটা আমি আজ শুনলাম। উনি কি তাহলে কোভিডেই…”

“না না, বাবার অনেকরকমের অসুস্থতা ছিল। কোত্থেকে কোভিডের গুজবটা রটেছে কে জানে! আসলে এখন কেউ মারা গেলেই কোভিড ভেবে নিচ্ছে লোকজন।”

“তবে যে শুনলাম বডি… ইয়ে… দেহ দ্যায়নি পুলিশ!”

ছেলেটা বিরক্ত মুখে বলল, “কে বলল? আমি নিজে মুখাগ্নি করেছি। বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।”

“ওহো…”

আমি আর না দাঁড়িয়ে পা বাড়ালাম। আজ সম্ভবত ছেলেটার সঙ্গে তিক্ততা আরও বাড়ল। এরপর রাস্তাঘাটে দেখা হলে মুখটা আরও বিস্বাদ লাগবে।

ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছি। নিজের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। দু-পাশে বাড়িঘর পড়ছে। ভিতরে আলো জ্বলে আছে। কথাবার্তা আবছা শুনতে পাচ্ছি। রান্নাবান্নার আওয়াজ। টিভির শব্দ। রাস্তায় কুকুরগুলো এখন কেউ গেলেই মুখ তুলে দেখে নিচ্ছে লোকটা কে। এখন সন্ধ্যের পর থেকে সারা শহরের রাস্তায় কুকুরগুলোই প্রভুত্ব করে।

নদীর ধারে এসে পড়ল রাস্তাটা। একদম নির্জন। এখানে কুকুরও নেই। শুনশান হাওয়া দিচ্ছে একটা।

একটু কাশলাম। সেই শব্দ নদীর ওপার থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।

কী খেয়াল হল, হাততালি দিলাম।

নদীর ওপার থেকে হাততালিটা ফিরে এল।

জানতাম আসবে।

Categories
2021-June-Golpo গল্প

শুভ্র মৈত্র

একটি নিখোঁজ মেয়ের কাহিনি

ঠিকঠাক বলার জন্য আর একটু কাছে থাকার দরকার ছিল। মাঝে ঐ গাড়াটার জন্য তা সম্ভব নয়। স্থানীয় মুখে গাড়া, আসলে ছিল একটা খাঁড়ি। শোনা যায় একসময় নাকি কালিন্দ্রি নদী এই খাত দিয়েই বইত, তারপর লক গেট করে দেওয়ায় নদী আর নেই, শুধু খাতটা থেকে গেছে। এখন দূর থেকে দেখলে মজা লাগে।মানুষগুলি যেতে যেতে হঠাৎ হাপিশ, তারপর একটু বাদে হুশ করে ভেসে উঠল আবার। মানে ওই গর্তের মধ্যে নেমে আবার উঠে যাওয়া। গ্রামে ঢোকার মুখে এই গাড়া যেন মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে রেখেছে ওদের। মানে সবাইকে টাউনে যেতে নামতে হয়, আবার উঠতে হয়। গাঁয়ে ফেরার সময়ও তাই। জলের স্মৃতি শুধু ঝালিয়ে দেয় বর্ষার সময়। জল জমতে জমতে আস্ত একটা নদী হয়ে দাঁড়ায় যেন। সে-সময় রোডে যাওয়া খুব দিকদারি। এই গ্রামের মানুষ তা জানে। প্রথমে কয়েকদিন কাদা জল পার হয়ে, তারপর অঞ্চলের দেওয়া নৌকা। সেও তো আবার রমেশ ঘাটোয়ালের মর্জির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এই খাঁড়ি এ গাঁয়ের সাথে জুড়ে আছে। যে-কারণে মানুষ চট করে বেরোতে পারে না, মানে টাউনে যাওয়ার জন্যও একটা আলস্য ঝাড়তে হয়। আবার ওই গাড়াটার জন্যই সহজে পুলিসও ঢুকতে পারে না। অবশ্য পুলিস এসেছিল সেই কবে, যখন রাসু-র বাবার গলাকাটা শরীরটা সকালে ওর নিজেরই দাওয়ায় দেখেছিল সবাই। পুলিস কে সেই উত্তর দিকের নঘরিয়া গিয়ে তারপর পিছন দিয়ে ঢুকতে হয়েছিল গ্রামে। তাও নেহাৎ ধুলা ছাড়া কিছু ছিল না, নইলে জলের সময় কাদাতেই আটকে যেত গাড়ির টায়ার। ঐ বিরক্তিতেই বুঝি পুলিস আর আসে না, গাঁয়ের বিচার গাঁয়েই করে নেয় মানুষ।

তা ওই গাড়াটার জন্যেই পদ্মর মাকে ঠিকঠাক ঠাহর করা যায়নি। শেষমেষ কতদূর যেতে পেরেছিল পদ্মর মা, তা নিয়ে কেউই তেমন নিশ্চিত নয়। তবে মন্ত্রীর কাছে যাওয়ার জন্য বাসে উঠতে পদ্মর মাকে দেখেছে এ-তল্লাটের বেশ কয়েকজন। “হামি কী কহ্যেছি তবে, পষ্ট দেখনু, পমিস এল, মেলাই ভিড়, তাও বুড়ি ঘুস্যে গেল”। মানে ওই ‘প্রমিস’ বাসের পা-দানিতে পা রাখা পর্যন্ত জামিলের স্বাক্ষ্যই প্রামাণ্য। তারপরে হেল্পার ছোঁড়া ওকে ভিতরে ঢুকিয়েছিল কিনা, বা কন্ডাক্টর বলেছিল কিনা পরের স্টপ নারায়ণপুরে জায়গা হবে, পদ্মর মা ওর ওই কাঁধের ঝাপসা ব্যাগটা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল কিনা রড ধরে, না বসতে পেরেছিল সীটে— সেটা কেউ বলতে পারে না।

তবে তপনা, মানে সুধা মাস্টারের ছেলে তপোধন, বলেছিল, “পদ্মর মা বাসে একবার পা ঠেকাতে পারলে, বসার জায়গাও পেয়্যা লিবে।” তা এই ঢিমে আঁচের সাঁঝবেলাতে তপনার কথায় আপত্তি করার মতো কিছু খুঁজে পেল না গণেশের চাটাইয়ে বসা মানুষগুলি। আসলে পদ্মর মাকে যারা চেনে— অবশ্য পাঁচকড়িটোলার কেই-বা ওকে চেনে না—সবাই জানে, রিলিফের ত্রিপল হোক বা চিড়া-গুড়, বা হাজরা বাড়ির কালীপূজার ভোগের মাংস— পদ্মর মা কখনো খালি হাতে ফেরে না। তূণে বুড়ির নানান অস্ত্র। প্রথমে ছেঁড়া শাড়িটা আরও খানিক ছিঁড়ে নিয়ে কান্নাকাটি, চোখের জল এমনিই আসে, কাজ না হলে পদ্মর নামে মানত চড়ানোর অজুহাত এমনকী স্বপ্নে পাওয়া আদেশও আছে পদ্মর মায়ের ব্যাগে। যত সব ঢ্যামনামি! মেয়েমানুষরা গলতে পারে, ব্যাটাছেলেদের জানা আছে এ-সব নাটক। কেউ পাত্তা দেয় না। অবশ্য না দিয়েই-বা উপায় কী? এর পরেই তো রাখা আছে ওদের জন্য শাপশাপান্ত। লাইনে ওর সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তার বাপ ঠাকুর্দা যৌবনে ঠিক কী কী অনাচার করেছিল, বা কার বউয়ের স্বভাব কতটা খারাপ, ঠিক কতদিনের মধ্যে ওলাওঠা হয়ে মৃত্যু হবে তার— নাহ্, এর পরে আর ফিরে তাকাতে হয় না পদ্মর মাকে।

তা এহেন পদ্মর মা ভিড় বাসে উঠে ঠিকই বসতে পারবে এ নিয়ে খুব সন্দেহ প্রকাশ করার লোক পাওয়া গেল না। কিন্তু সংশয়টা অন্য জায়গায়, ঠিক সংশয় না বরং ভরসা বালা যায়। সদার মুখের বিড়ির ধোঁয়ার সাথে সেটাই বেরিয়ে আসে, “গাঁয়ের মাতব্বরি কী আর সবখানে চলব্যে? মন্ত্রী কি আর গাঁয়ের সুবল মেম্বার যে গেনু আর সরসরিয়ে ঘুঁস্যে গেনু!” এমনিতে সদার কথায় সায় দেওয়ার লোক হাতে গোনা, কিন্তু এই কথাটায় নড়ে উঠল অনেকগুলো মাথাই। আসলে কেউই চায় না সত্যি মন্ত্রীর কাছে যাক পদ্মর মা। নিজের চোখে মন্ত্রী দেখার অভিজ্ঞতা এখানে কারোর নেই ঠিকই, কিন্তু সবজি নিয়ে শহরের রাস্তায় বিক্রি করা তারিকুলকে তো জানাতেই হবে টাউনের হালচাল সে অনেক জানে, “মনতিরির সাথে দেখা করব্যে! হুঁহ, কতটি পুলিস থাকে মনতিরি এল্যে, জানা আছে?” মাথাগুলি আবারও নড়ল খানিক। তাতে অবশ্য জানা আছে না নেই তা ঠিক বোঝা গেল না। এটাও তেমন নিশ্চিত নয় যে, পুলিস দেখে পদ্মর মা খানিক থমকাবে কিনা। “আরে পুলিসের কথা ছেড়্যাই দাও, দুই দিনের জন্য মনতিরি জেলায় পা দেছ্যে, তার কত কাম! এ-সব প্যাঁচাল শুনার সময় আছে? ডাকব্যেই না”, আফতাবের সারুভাই নাকি টাউনের এক নেতার গাড়ি চালিয়েছিল কয় মাস, ফলে আফতাবের মতামতকে ফেলে দেওয়া যায় না। সবাই বেশ ভরসা পেতে চায়।

বুড়িকে পছন্দ করে না কেউ। করবেই-বা কী করে? একা মেয়েছেলে, তবু একটুও সম্ভ্রম আছে কারো প্রতি? সে মেম্বার হোক আর মাস্টার, কাউকে রেয়াত করে না পদ্মর মা। ডিলার যে ডিলার, সবাই এত তোয়াজ করে, পদ্মর মা যেন খড়গহস্ত, “ক্যানে পাব না ডাল? চাল মেপ্যে দিবা, কহ্যে দিনু!” কেউই সাহস করে তর্ক জুড়তে পারে না পদ্ম’র মায়ের সাথে, ফের কী থেকে কী বেরিয়ে আসে! ভয় শুধু সেটাই নয়, আসলে এই নিস্তরঙ্গ গাঁয়ে শেষ যে-ঘটনা ঘটেছিল, সেটাও তো এই বুড়ির সাথেই। আর সেটা নিয়েই এবারে মন্ত্রীর কাছে দরবার করবে পদ্মর মা।

পদ্মর মা নাকি এমন ছিল না কয়েক বছর আগেও। গ্রামের বয়স্করা বলে। তারাও কেউ পদ্মর বাবাকে দেখেনি, তবে পদ্ম হারিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত, যখন গাঁয়ের ইশকুলে যেত ও, জামাটা অত টাইট হয়নি, তখনও নাকি ওর মা মেয়ের জন্য দুধ চাইতে যেত ঘোষেদের বাড়ি মাথায় ঘোমটা দিয়েই। কেউ কেউ মুখ ঝামটা দিয়েও নাকি পার পেয়ে যেত। যেটুকু গালিগালাজ তা বরাদ্দ থাকত তা ওই পদ্ম আর ওর মরে যাওয়া বাবার জন্য। মেয়েকে নিয়ে কীভাবে চলতো পদ্মর মায়ের তা অবশ্য কেউ হলফ করে বলতে পারে না। চার কুড়ি পার করে দেওয়া হারানের ঠাকুমা বা সুকেশ জ্যাঠাও না— চলে যেত আরকী! দিন তো আর থেমে থাকে না, চলেই! কিন্তু এখন চাটাইয়ে বসা লোকগুলোর এ-সব কথা শুধুই শোনা। ওরা জানে পদ্ম যখন ইশকুল থেকে ফিরত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত পদ্মর মা, কোনো চিল শকুন যেন ভিড়তে না পারে। শুধু কি তাই, ছুটি হতে দেরি হলে সটান ইশকুলে গিয়ে হাজির হয় পদ্মর মা, “মিয়াছেল্যাদের ছেড়্যে দাও মাস্টার!” সব মেয়েদের কথা মুখেই বলা, আসলে পদ্মকে ছেড়ে দিক। সাধন-নিত্যদের স্পষ্ট মনে আছে, মাথায় প্রায় তাদের ছুঁয়ে ফেলা পদ্ম লজ্জা পেত।

সেবারের বৃষ্টিটাই সব ওলটপালট করে দিল মা-মেয়ের জীবনে। মণ্ডলবাড়ির ছাগল নিয়ে চড়াতে গেছিল পদ্মর মা, রোজকার মতোই। ফিরেও আসত ঠিক সময়েই মানে পদ্মর ইশকুল থেকে ফেরার আগেই, কিন্তু বৃষ্টিটাই সব ভণ্ডুল করে দিল। গাঁয়ের মাথায় পাকুড় গাছের তলায় ছাগল নিয়ে দাঁড়ানো পদ্মর মাকে নাকি বাড়ি ফেরতা অনেকেই দেখেছিল। তবে কিছু কথা হয়নি, ওই বৃষ্টির মধ্যে কী কথাই-বা হবে, সবার তো ঘরে ফেরার তাড়া। বৃষ্টি একটু ধরলে, মণ্ডলবাড়ি ছাগল ঢুকিয়ে, কাঁঠাল পাতা বাবুদের মুখের কাছে ধরে ফিরতে ফিরতে প্রায় অন্ধকার। গাঁয়ের সব পথ মুখস্থ, অন্ধকারে যা কিছু নিয়ে গাঁয়ের মানুষ ভয় পায়, তারা অবশ্য তখনও পদ্মর মাকেই ভয় পেত। তাই ঘরে ফিরতে কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু ঐ অন্ধকারে চোখে খানিক ঘোলা লেগেছিল বটেই। নইলে দাওয়ায় রাখা ডালের বড়ি যে ঘরে তোলা হয়নি, সে কি আর নজরে পড়ত না? পদ্ম আর তার মরা বাপের পূর্বপুরুষরা কি আর ছাড় পেত সেই সন্ধ্যায়?

ঘরে কুপি জ্বলেনি, সেটা টের পেয়েছিল পদ্মর মা। আর টের পেতেই “ক্যারে পদ্ম, কোন নাগরের জন্য ঘর আন্ধার কর‍্যে…?” বলে সম্ভাষণটা করতেই যাবে, কিন্তু গলাটা যেন তার আগেই চেপে ধরল কেউ। মনের ভিতর কু গাইল কেউ। শুধু ডেকে উঠতে পেরেছিল “পদ্ম…”। স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নরম ছিল সেই ডাক, পদ্মর শুনতে পাওয়ার কথা নয়, কেউই শুনতে পায়নি। কিন্তু পদ্মর মা নিজের বুকে নিজের ডাক শুনেছিল বার বার। সাড়া পায়নি।

বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর কাদা রাস্তায় ছপছপ করে পায়ের শব্দ শোনা গেছিল, বাড়ি ফিরেছিল আটকে থাকা মানুষ। বৃষ্টি থেমে গেলে মেঘগুলোর বড়ো গায়ে লাগে, ক্ষোভে গড়গড় করতে থাকে, ওই শব্দেই বোধহয় বড়ো মৌলবীর আজানের আওয়াজ শোনা যায়নি এ-পাড়া থেকে, তবে শাঁখের শব্দ শুনেছিল এই হাজরাপাড়ার মানুষ। শুধু পদ্মর মা যে-আওয়াজটা শুনতে চাইছিল, তা শোনা গেল না কিছুতেই। ঘরের ভিতর থেকে না, পিছনের জঙ্গল থেকে না, পায়ের সাথে লেপ্টে যাওয়া কাদার থেকে, পাকুড় গাছের ভেজা শরীর— পদ্মর গলাটা শোনা গেল না কোথাও।

গাঁয়ের মানুষ অবশ্য সেই জল কাদা ভেঙেও বেরিয়েছিল, খোঁজাখুঁজি করেছিল এদিক সেদিক। আর পদ্মর মায়ের সাথে হ্যারিকেন নিয়ে গেছিল ঠিক ছয়জন। খোঁজাখুঁজির ফাঁকে সবার মুখেই এসেছিল মেয়ের চালচলনের কথা। ঢলানি স্বভাবের কথা বলেছিল। বলেনি আরও অনেক কিছু, পদ্মর ময়লা জামার নীচে এর মধ্যেই উঁচু হয়ে যাওয়া বুকের কথা বলেনি, গায়ের সাথে সেঁটে যাওয়া ভেজা জামার নীচে খাঁজের কথা বলেনি, বেটি বলে ডেকে গায়ে হাত বোলানোর কথা বলেনি, পদ্মর সিঁটিয়ে যাওয়ার কথা— নাহ্, ভেবেছিল শুধু, মুখে বলেনি। জঙ্গলে, ঝোপের আড়ালে খুঁজছিল পদ্মকে, ওর বেমক্কা বেড়ে যাওয়া শরীরটাকে। খুঁজতে খুঁজতে গাড়ার কিনার অবধি এসে থমকে যায় সবাই। তখন অনেক জল। অবশ্য ডিঙিটা বাঁধাই ছিল ঘাটে। রমেশ ঘাটোয়ালকে বললে সে কি আর নফরকে ডিঙি খুলতে দিত না? কিন্তু কেউ আর সাহস করেনি। পদ্মর মা নিজেও কেমন থম্ মেরেছিল, হাঁটছিল খানিক ঘোর লাগা মানুষের মতো। আর মেয়েকে ডাকছে না, ওর হয়ে পদ্মর নাম ধরে ডাকার দায়িত্ব তখন ওই ছয়জনের। ডাকের তেমন জোর ছিল কিনা তা অবশ্য জানা যায়নি। কালকেও নিজের বউয়ের পাশে রাতে শোয়ার সময় কতজন পদ্মর ডবকা শরীরটাকে ভেবেছে, সেটাও যেমন জানা যায়নি।

শোনা যায় ঠিক তখনই নাকি ওই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটেছিল। ঘোরের মধ্যে চলতে চলতে গাড়ার কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পদ্মর মা, আর সবার মতোই। দাঁড়িয়ে ছিল অন্ধকার জলের দিকে তাকিয়ে। হ্যারিকেনের আলোয় কয়েকজন দেখার চেষ্টাও করেছিল জলে কিছু ভাসতে দেখা যাচ্ছে কিনা। মানে পদ্মর ডবকা শরীরটা, উঁচু হয়ে ওঠা প্রাণপণ লুকিয়ে রাখা বুকদুটো, পায়ের উপর থেকে অনেকটা সরে যাওয়া ফ্রক— উঁকি মেরেছিল সবাই। আর ঠিক তখনই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল পদ্মর মা। স্থির চোখে তাকিয়েছিল মানুষগুলোর দিকে। কেমন ছিল সেই চোখ, তা কেউ পরে বর্ণনা করেনি, তবে সেই দৃষ্টিতে নাকি এমন কিছু ছিল, যা মুহূর্তে স্থবির করে দেয় সবাইকে। সবার পা আটকে গেছিল মাটিতে, কিছুক্ষণ নড়তে পারেনি কেউ।

সব ঘোরই কেটে যায়। বাড়িও ফিরেছিল সবাই। কিন্তু ফেরার পথে কেউ কোনো কথা বলেনি। পদ্মর মাকে নিয়ে নয়, পদ্মর স্বভাব চরিত্র নিয়েও নয়। এমনকী নিজেদের মধ্যেও কথা বলেনি কেউ। সেদিন গাড়ার পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলির স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছিল। না, স্বাভাবিক বলতে যা বোঝায়, তা ওরা হতে পারেনি। ঘরের বউরা জানে, তাদের মরদরা সেই রাত থেকেই আর স্বাভাবিক হয়নি। সে-জন্য তারা পদ্মর মাকে দায়ী করে কিনা জানা না গেলেও, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই পদ্মর মা যে একা হয়ে গেল তা সবাই জানে। গাঁয়ের বাকি লোক যে কেউ পরদিন সকাল থেকে পদ্মকে খুঁজতে যায়নি, সেটার পিছনে ছিল ওই দৃষ্টিটা। সেই আবছা অন্ধকারে চোখ দেখতে পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু তবু ছয়জনই নাকি দেখেছিল পদ্মর মায়ের সেই ঘোলাটে চোখদুটো কী এক আশ্চর্য রং নিয়েছিল সেই রাতে!

কেউ আসেনি, কাউকে ডাকেওনি। কিন্তু সেই রাত থেকে যে-খোঁজটা শুরু হয়েছিল, সেটা থামেনি আজও। গ্রামের মানুষ জানে। এত বছর পরেও কোন মুলুকে কোন নতুন গুরুদেব এসেছেন, কে শুধু মায়ের কপাল দেখেই বলে দেবে মেয়ে কোথায়, কোন থানে মানত করলে নির্ঘাৎ ফল— পদ্মর মায়ের বিরাম নেই। থানা পুলিস তো সেই কবেই শেষ, আর যায় না। গ্রামে না আসার নানান অজুহাত দিয়েছিল পুলিস। টাউনের থানায় কোন পুলিস নাকি পদ্মর স্বভাব নিয়ে খারাপ ইঙ্গিত করেছিল, পদ্মর মা থানায় বসেই সেই ‘আবাগির ব্যাটা’-র বাপ মায়ের ঠিকুজি কুষ্ঠি খুলে বসে। পুলিসের আশা ছেড়ে দিতে হল, কিন্তু খোঁজ থামল না বুড়ির। গাঁয়ের মানুষের বাপ-বাপান্ত করা সেই যে শুরু হল, খোঁজ পাওয়ার নামে কত-না মুল্লুক ঘুরে বেড়ায় আজও। কোন কোন থানে যে মানত করেছিল বুড়ি, নিজেরও মনে নেই আর।

বছরের চাকা তো একবার ঘুরে থামে না, ঘুরেই চলে। সেই রাতে পদ্মকে খুঁজতে যাওয়া মানুষগুলির গায়ের চামড়া কুঁচকে আসে, কেউ কেউ মায়া কাটিয়েও ফেলে বউ বাচ্চা সংসার, গ্রাম— সব কিছুর। এত বছরে আর কেউ সেই রাতের কথা তোলেনি। ঝাপসা হয়ে এসেছে স্মৃতি। বগলের কাছে সেপ্টিপিন লাগানো ফ্রকে পদ্মর মুখ-চোখ সব আবছা হয়ে যায় সবার কাছে, উঁচু হয়ে ওঠা বুকদুটোও। শুধু পদ্মর মা এখনও খোঁজে, মাঝে মাঝে গ্রামের বাইরে যায় কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে, দুই তিনদিন দেখা যায় না। তারপরে একদিন আবার ভুস করে জেগে ওঠে গাড়ার ভিতর থেকে।

সেই বর্ষার পরে অনেকগুলি হা-ঘরে গ্রীষ্ম গেছে, গাড়ার জল শুকিয়ে নীচের ফাটা চামড়া বেরিয়েছে কতবার, সেই শুকনো গর্তে বাচ্চারা খেলার সময় লুকিয়েছেও কত! আবার ভরেও গেছে জলে। থইথই নৌকা। দু-একটা সরপুঁটি ছাড়া ভরা বর্ষাতেও কিছু দেয় না গাড়া। তবু পদ্মর মা ঘুরেফিরেই দোষ দিত এই গাড়াকে। আর মাঝে মাঝে অদ্ভুত চোখে তাকাত গাঁয়ের ব্যাটাছেলেদের দিকে। যেন ভেতরটা পড়ে ফেলতে চায়। দেখে নিতে চায় পদ্মর শরীরের একটুও দেখা যাচ্ছে কিনা কারো বুকের ভিতর।

নাহ্, পদ্মকে কে খেয়েছে তা এখনও বলেনি বুড়ি, কিন্তু পদ্ম হারিয়ে যাওয়ার পরে কথা ফোটা ছেলেরাও মাঝে মাঝে নিজেদের দায়ি ভাবে ওই না দেখা বৃষ্টির রাতটার জন্য।

আধন্যাংটো বাচ্চার দল অবশ্য কোনোদিনই নিয়ম মানেনি, আর তাদের হিংস্রতারও কোনো পরিসীমা নেই। মাঝে মাঝে পিছনে ধাওয়া করে বুড়িকে ক্ষেপাত, ক্ষেপানো খুব সোজা, শুধু পদ্মর নাম বলতে হয়, আর তাতেই বুড়ি শাপশাপান্ত করে বাচ্চাদের বাপ-ঠাকুর্দা-সহ কয়েক প্রজন্মকে। তবে বেশিক্ষণ চলে না এই গালিবর্ষণ। বড়োরা দেখতে পেলে শাসন করে শিশুদের, ধমক দিয়ে নিয়ে যায় ঘরে। নিজের মনেই কথা বলতে বলতে একসময় শান্ত হয় পদ্মর মা।

এ-মুলুক সে-মুলুক ঘুরতে ঘুরতেই সেদিন খবর নিয়ে এল টাউনে মন্ত্রী আসবে। আসছে সোমবারের পরের সোমবার। গাঁয়ের কেউ জানে না। এমনকী সুবল মেম্বারও না। জানার কথাও না। মেম্বার শুধু মাঝে সাজে ঐ নঘরিয়া অঞ্চল অফিসে যায়। কিন্তু পদ্মর মা যাবে। দেখা করবে মন্ত্রীর সাথে। এ-সব কথা কেউ জিজ্ঞেস করে নি, বুড়ি নিজে থেকেই বলেছিল। রেশন দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে বলেছে, পুকুরে চান করতে গিয়ে বলেছে। সবাই জেনেছে। কিন্তু সাহস করে বলতে পারেনি, কী জিজ্ঞেস করবে মন্ত্রীকে। শুধুই কি পদ্মর খোঁজ নেবে না আরও কিছু নালিশ আছে গাঁয়ের লোকের বিরুদ্ধে। আর এত বছর পরে পদ্মকে পাওয়া গেলেও, ওকে চিনতে পারবে কেউ? গ্রামের কেউ প্রশ্ন করেনি, আসলে মন্ত্রী মানে কী ওরা জানে না কেউ। পুরোনো মানুষগুলি নেই, কিন্তু পুরোনো ভয়টা যেন ফিরে এসেছিল মন্ত্রীর নাম শুনে।

সন্ধ্যা আরও জাঁকিয়ে বসছে গ্রামের পশ্চিম কোণের আমগাছটার মাথায়।সাধন-তারিকুল-সদারা নিজেদের মধ্যে যে-কথাগুলো দিনের আলোয় বলাবলি করে—যেমন এ-বছর আমের ফলন, মাটি কাটার কাজ— এখন সেগুলো নেই। এই চাটাইয়ের আলাপ থাকে মেয়েছেলে আর গোপন ইচ্ছেগুলি নিয়ে। নিজেদের ঘরের পানসে বিবিদের কথা তুলতে চায় না কেউ। “মণ্ডলের ছোটোবিবির রস হয়েছ্যে খুব। মরদটা তো বিদেশ, ঝরাব্যি নাকি সদা?”, খ্যাক খ্যাক করে হাসে সবাই। মতিন মিয়াঁর বেওয়া বিটি বাচ্চাটাকে নিয়ে বাপের ঘরেই থাকে। সাধন নাকি নিজে চোখে দেখেছে কার্তিক গয়লার সাথে গুজুরগুজুর করে। “ক্যানে বে, গেরামে কি আমরা নাই? চান্স দিয়্যাই দেখুক না একবার!”, আবার হাসি। ক্রমশ গভীর হয় গলা।

টিনের মগ থেকে খুড়িতে ঢেলে দিচ্ছে গণেশ, “জামিলচাচা তোমার তিন খুড়ির দাম বাকী আছে কিন্তু!”— আব্বে, পেয়ে যাব্যি, হামি কি ভেগ্যে গেনুৈ ঠিকই তো, গনেশ ছাড়া সবাই মাথা নাড়ে। আর গনেশও জানে, এখন বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, বলতে নেই যে, এই এক কথা কতদিন ধরে শোনাচ্ছে জামিল। সকালেই চেয়ে চিনতে নিতে হবে। সবটাই যে পাওয়া যায় তা নয়, তবে খানিক লস ধরেই এ-ব্যাবসায় নামতে হয়। সম্পর্ক ভালো রাখা বেশি জরুরি। এই যেমন জামিলের ভাইই তো রেশনের চালটা জোগাড় করে দেয়!হিসাব কি আর গণেশ জানে না, এতদিন ধরে এ-লাইনে আছে! কাচের গেলাস তো কবেই বাদ দিয়েছে, এখন মাটির খুড়ি। প্রথম প্রথম আপত্তি উঠেছিল, কিন্তু তারপর তো অভ্যাসও হয়ে গেল সবার। “হ্যাঁ রে গণশা, এত ফিকা লাগছে ক্যানে? দুইটা টেনেও নেশাই জমে না”, সাধনের কথায় হাঁ হাঁ করে উঠল সবাই— “ঠিক ঠিক, একবারে ধক নাই। ফিকা!” গণেশ জানে এখন চুপ করে থাকতে হয়, প্রায় রোজই এই সময়টা এমন কথা ওঠে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারা সবাই বলবে, “নেশাই হল না” আর পরদিন সন্ধ্যা লাগতেই আবার এসে ভিড় করবে।

এতক্ষণ ধরে কেউ অবশ্য পদ্মর মাকে নিয়ে আর রা করেনি। বুড়ি যে মন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাবে না, সেই বিশ্বাসটা অনেকটাই ঘন এখন। হেজে যাওয়া শরীরগুলোর উপর পড়ে থাকা ছেঁড়া কাঁথার মতো অন্ধকার নেমে এসেছে।

দূরে বড়ো রাস্তাটা দেখা যায়। ওখানে আলো আছে। মাঝে মাঝে এক-আধটা গাড়ি দাঁড়ায়, কাউকে নামিয়ে দিয়ে যায়। অবশ্য সন্ধ্যার পরে এই স্ট্যান্ডে নামার লোক প্রায় থাকেই না।

— “ক র‍্যে জগা, উঠব্যি না?”— হ্যাঁ রে এই তো এইটা মেরেই উঠি। অবশ্য দু-জনের কারো মধ্যেই ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। গণেশ জানে, এখন তিন চার বিড়ি ধরে চলবে এই উঠি উঠি খেলা, চাটাই খালি হতে হতে পিছলি বিলে শেয়ালের ডাক।

শেষমেষ ঘরের দিকে রওনা দেয় সবাই। গণেশের চট খালি হল। এদিকে আলো নেই, তাতে অবশ্য বয়েই গেছে ওদের। সদারা সবাই গন্তব্য জানে। ঘরে কুপি জ্বালিয়ে বসে আছে বউ, ভাতের মতো ঠান্ডা। জড়ানো গলায় আফতাব ধরে, “বলম পিচকারি যো তুনে মুঝে মারি…” টাউনের হলে হিন্দি বই দেখার নেশা আছে ওর। পা খুব সোজা পড়ছে না কারো। তাতে অবশ্য অসুবিধা নেই। মুখস্থ এই গাঁয়ের রাস্তা। ঐ সামনের পাকুড় গাছটা থেকে তারিকুলরা উত্তর দিকে চলে যাবে। এদিকে বাড়ি ঘর খুব বেশি নাই। মাঠের মধ্যে দিয়েই আসছিল সবাই এতক্ষণ। শর্টকাট। এবার রাস্তায় উঠবে। রাস্তায় উঠেই কচুর ঝোপের এই জায়গাটায় এসেই সবার একসাথে পেচ্ছাপ পায়… ছড়ছড়…। ছোটোবেলার কাটাকুটি খেলার কথা তোলে সাধন, একসাথে হেসে ওঠে সবাই। “তোর অজগর তো একবারে ঢোঁড়্যা হয়্যে আছে বে, ঝিম ধরা, মুত ছাড়া আর কিছু নাই”, আবার খ্যাকখ্যাক হাসি। ফিকে চাঁদ আকাশে, কোনো শব্দ নেই কোথাও। মুখ দেখা যাচ্ছে না কারো, একটা ছায়া। দূর থেকে রোডে এখনও দু-একটা আলো দেখা যাচ্ছে, আসলে শহরের ঘড়িতে এখনও সন্ধ্যা, গ্রামেই রাত। কেউ আর বাড়ির বাইরে নেই। অনেকের এতক্ষণে একঘুম সারা।

গণশের ঘর থেকে ফেরা ওদের মনে অবশ্য রঙের কমতি নেই। “আফতাবের ঘোড়া পুরা রেডি, বিবিকে নিদ পারতে দিব্যে না”, আবার হাসি। “আব্বে ছাড়, সেই ধক নাই আর বিবির। পদ্মর মতো ডাঁশা মাল কি আর আমাদের নসিবে জুটবে?” সেই পদ্ম চলে এল আবার। কেউ দেখেনি, তবু আসে। ওই বুক, থাই, শরীরের খাঁজ সব আসে ওদের চোখে। অনেকদিন আগে দেখা, বা না দেখা, শরীরটা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় ওদের। দিনের আলোয় আসে না, আসতে দেয় না, কিন্তু রাতের এই ছমছমে আবছা অন্ধকারে এসে ঘাই মারে বুকের ভিতর। “গেরামে আর তেমন মাগী কোথায়?” আর্তনাদের মতো শোনায় জগার গলা। কী একটা উড়ে গেল পাকুড় গাছটা থেকে। রাতজাগা কোনো বাদুড় হবে বোধহয়। কেমন শিরশির করে ওঠে সবার। এতক্ষণের খুশি ভাবটা হঠাৎ উধাও। চুপ করে গেছে সবাই। মুখে কিছু বলে না কেউ, কিন্তু ঘরের রাস্তাটা আজকে যেন বেশিই লাগছে, কীভাবে যেন পায়ে জোর আনার চেষ্টা করে সবাই। ঝিঁঝির ডাক আরও জোরে বাজছে কানে।

— “আব্বে, সদা… কে ব্যে ওটা?”— সাধনের জড়ানো গলাতেও কী যেন ছিল। শুধু ওর হাত অনুসরণ করেই সবার চোখ আটকে গেল সামনে। গাড়া থেকে উঠে আসছে একটা শাড়ি পড়া শরীর, কাঁধে ব্যাগ। স্পষ্ট দেখা না গেলেও বলতে হবে না ওটা কে। উঠে আসছে, যেমন করে হাঁটে। ঘাড় তেড়িয়ে একবগ্গা। কাছে আসছে ক্রমশ। দাঁড়িয়ে পড়েছে সবাই, কেউ আর এগোতে পারছে না। চোখটায় নজর আটকেছিল সবারই। একটা অদ্ভুত রং, এই দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। সদা’র পা’টা বোধহয় আটকে গেল। সারাদিনের ভ্যাপসা গরম ভাবটা আর নেই। কেমন একটু শীত শীত করছে। আফতাব-তারিকুল কেউ কারো দিকে তাকায়নি, নইলে দেখতে পেত, মাটিতে পা বসে গেছে সবারই। বুকের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। সাধনের জিভে নোনতা স্বাদ, বমি হওয়ার আগে যেমন হয়। এগিয়ে আসছে ওই মূর্তিটা গ্রামের দিকে, ওদের দিকে। সদারা এই রাতে ছয়জন, হাতে লণ্ঠন নেই শুধু…।

Categories
2021-June-Golpo গল্প

দেবকুমার সোম

প্রতিটা খুনই আসলে রাজনৈতিক

হোম মিনিস্টারের মোবাইল ফোনটা কাকে ডাকাতি করেছে। রোববার সকাল। শীতরোদের আমেজ নিতে ব্যালকনিতে নিউজপেপার আর গরম চা নিয়ে মন্ত্রীমশাই বসেছিলেন। পাশেই ছিল অ্যান্ড্রয়েড ফোন। ব্যালকনির গ্রিল ছিল খোলা। তিনতলার ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটের ব্যালকনি ঘোঁষে দাঁড়িয়ে আছে পাশের আবাসনের নধর নারকোলগাছ। মন্ত্রীর মন ছিল কাগজ আর চায়ে। এর মধ্যে সুযোগ বুঝে ধাঁ করে নারকোলগাছ থেকে উড়ে এসে কাকটা মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে গেল। গেল, গেল, গেল। ধর, ধর। হোম মিনিস্টার চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর তীব্র চিংকারে ভয় পেয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন তাঁর গিন্নি। ছেলেটা তখনও বিছানায় ল্যাদ খাচ্ছিল। সেও তড়াক লাফিয়ে এক ছুটে ব্যালকনিতে। মন্ত্রীর বউমা মনযোগ দিয়ে হাতে নেলপলিশ লাগাচ্ছিল। শ্বশুরের আর্তস্বরে তার হাত থেকে নেলপলিশের শিশিখানা পড়ে গেল। সে সোফা থেকে ঘাড়টা জিরাফের মতো দীর্ঘ করে একবার বোঝার চেষ্টা করল। মন্ত্রীর পাঁচ বছর বয়সের নাতি,— সেও ছুটে এল বাথরুম থেকে হেগো পোঁদে।

সকলেরই চোখ গোল গোল। মাগো! এও কি কেউ কখনো শুনেছে? কাকে চামচ চুরি করে, ছুরি চুরি করে, তা বলে মোবাইল! তুমি এত বেখেয়ালে থাকো কী করে? তোমার চোখের সামনে থেকে কাকটা মোবাইলটা তুলে নিয়ে গেল। মন্ত্রীর বউ আর পাঁচজন বাঙালি বউ থেকে পৃথক নন।

আর নিল তো নিল, একেবারে ধাঁ। বাবা, ইউ আর নো মোর আ সাধারণ পারসেন। তুমি এখন হোম মিনিস্টার।

তাহলে বল এখন লোকের কাছে মুখ দেখানো যাবে? ছেলের কথায় মা জনসমর্থন পান।

মন্ত্রীমশাইয়ের বিরক্ত বোধ হয়। মালটা চুরি হয়ে গেল, আর তোমরা দাঁত ক্যালাচ্ছ! তাঁর মাথা ঠিক থাকে না। আর থাকবেই-বা কী করে? ফোনের মধ্যে কত কী যে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী থেকে রাজ্যের সব নেতা-নেত্রীদের গোপন হোয়াট্সঅ্যাপ। শিঞ্জিনির কিছু হট ছবি। পানু ভিডিয়ো। অনেকগুলো গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেইল্স। সবচেয়ে বড়ো কথা ডকুমেন্ট। প্রচুর ডকুমেন্ট। হায় হায় কারো হাতে পড়লে কী হবে। দাদু, তুমি তো পুলিশ মন্ত্রী। গুলি ছুড়তে পারলে না: নাতিটা মন্ত্রীমশাইয়ের হাত ধরে টান দেয়। বউমা, ও বউমা, দেখছ না তাতান হেগো পৌঁদে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে ছুচিয়ে দাও। মন্ত্রীগিন্নি চিল্লে ওঠেন।

কাকটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। নারকোলগাছের লম্বা লম্বা পাতার মধ্যে ওর বাসা। সেখানে সেঁদিয়ে গেছে। মন্ত্রীমশাইয়ের ছেলে তার ফোন থেকে ফোন করে। মন্ত্রীর ফোনটা বেজে যায়। ওঁ জয় জগদীশো হরে। সোয়ামি জয় জগদীশো হরে। ওঁ জয় জগদীশো হরে। ব্যালকনি থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ফোনের চিৎকারে কাকটা তার পাতাঘেরা বাসার বাইরে আসে।

ওই তো। ওই তো হারামজাদাটা। নামা মালটাকে। হোম মিনিস্টার খেঁকিয়ে ওঠেন।

কিন্তু কে নামাবে? কাকে নামাবে?

তখনই চাঁদুদাকে বলেছিলাম, ও-সব নারকোলগাছ-টাছ হাটাও। তুমি তখন শুনলে না আমার কথা। এবার বোঝো। ছেলে সুযোগ পেয়ে পুরোনো ঝাল ঝাড়ে।

হ্যাঁরে হারামজাদা। তোর চাঁদুদা ফ্ল্যাট তৈরি করতে গিয়ে পাশের বাড়ির নারকোলগাছটা কাটত আর গাছ খুন করার দায়ে আমার পোলিটিক্যাল কেরিয়ারটা মায়ের ভোগে যেত। এই যে ঘরে বসে বেকার ফুটুনি ঝাড়িস, তখন পারতিস ম্যাও সামলাতে। শালা, ছেলে না অপজিশন পার্টির লোক। দাদু, ওই কাকটাকে চিনতে পেরেছ? তাতানের ফের মঞ্চে প্রবেশ। গত মাসে ওর বাসাটাতেই আমরা গুলতি মেরেছিলাম।

কাকপরিবারের সঙ্গে হোম মিনিস্টারের ঝামেলা নতুন নয়। এখন যেখানে আবাসনটা দাঁড়িয়ে আছে একসময় সেখানে পুকুর ছিল। পুকুর পাড়েই অন্য গাছেদের মধ্যে ছিল এই নারকোলগাছটা। প্রমোটার চাঁদুদা রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে ক্রমে পুকুর ভরাট করে বিল্ডিং তোলেন। হোম মিনিস্টার প্রায় জলের দামে বারোশো স্কোয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাট পেয়ে যান। কিন্তু তাঁর পড়শি থেকে যায় নারকোলগাছসমেত কাক পরিবার। অনুমান এই কাক পরিবারটা উদ্বাস্তু নয়। আর তারা উদ্বাস্তু হতেও চায় না। ফলে প্রথম থেকেই দু-তরফেই আকচা-আকচি শুরু হয়। মানুষগুলো উড়ে এসে জুড়ে বসায় শুরু হয় অন্তর্ঘাত। মন্ত্রীমশাইয়ের স্ত্রী ব্যালকনিতে ফুলের টব রাখলে কাকগুলো বিনা প্ররোচনায় উড়ে এসে ফুল ছিঁড়ে নষ্ট করে। রোদে বাসন শুকাতে দিলে চামচ-ছুরি উধাও করে দেয়। কাকের জ্বালাতন থেকে বাঁচতে ব্যালকনিতে লোহার গ্রিল লাগানো হল। ফলে কাকেরা সপরিবারে চিৎকার আর লাফান-ঝাপান শুরু করে দিল। সুযোগ পেলেই চোরাগোপ্তা গেরিলা ফাইট চলতেই থাকল। ফলে দাদু আর নাতি শঠ করে একদিন একটা গুলতি জোগাড় করলেন। ছাদে উঠে এলোপাথাড়ি গুলতি চালিয়ে কাকের কিছু ডিমও ভাঙলেন। এমন রাষ্ট্রবাদী প্রতিঘাতে কাকেরা মুষড়ে পড়েছিল। আজ আবার বেশ কিছুদিন পরে চরম আঘাত।

হোম মিনিস্টারের চিৎকার-চেঁচামিচিতে তাঁর দেহরক্ষীরা ফ্ল্যাটে চলে এল। মন্ত্রী নির্দেশ দিলেন, একটা লোক জোগাড় করতে যে কিনা ভালো গাছি। সে নারকোলগাছে উঠে মোবাইলটা কাকের বাসা থেকে উদ্ধার করে আনবে। কিন্তু শহরে হুট বলতে গাছি পাওয়া যাবে কোথায়? খবর ছুটল ওলা-উবেরের বেগে। শেষে লোকাল থানার বড়োবাবু একটা ক্ষীণজীবী লোককে ধরে নিয়ে এলেন। একে কোথ থেকে পাকড়াও করলেন। মন্ত্রী বেশ অবাক।

আর বলবেন না ছ্যার। থানার লক্-আপে ছিল। ছিঁচকে মাল। তবে ভালো গাছি। বড়োবাবু বুক ফুলিয়ে জবাব দেন। এই কেষ্টা এই নারকোলগাছটার মগডালে উঠে ছ্যারের মোবাইলটা ফিরিয়ে আন।

দেখিস বাবা, সাবধান। কাকগুলো বড়ো খচ্চর। হোম মিনিস্টারের সাবধান বাণী। তবে গাছি লোকটা যতই করিৎকর্মা হোক, কাকের সঙ্গে পেরে ওঠে না। তাকে গাছে উঠতে দেখে প্রথমেই তারা পিরিচ-পিরিচ করে ও ছড়াতে লাগল। লোকটার খালি গায়ে সাদা সাদাটে-হলদে গুয়ে ভরতি হয়ে গেল। লোকটা তবুও অদম্য। তাকে কাছাকাছি উঠে আসতে দেখে কাক পরিবার সাঁ করে নীচে নেমে লোকটার চোখ খুবলে নিতে চাইল। পিঠে নখের আঁচড়ে রক্ত বইয়ে দিল। লোকটা দক্ষ। কিন্তু এমন গেরিলা ফাইটে সে দিশেহারা হয়ে ওপর থেকে ঝুনো নারকোলের মতো ধপ্ করে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। ফলে ফের আর একটা কেলেঙ্কারি। মিডিয়া জানলেই চিত্তির!

ঘণ্টা খানেক ভালো মতো শুশ্রূষা করার পরে লোকটাকে ফের লক্-আপে চালান দেওয়া গেল। পার্টির ছেলেরা এর মধ্যে খবর পেয়ে গেছে। তারা দল বেঁধে এসে নারকোলগাছটাকে গোড়া থেকে বাঁকাতে লাগল। উদ্দেশ্য ঝাঁকুনির চোটে যদি ফোনটা নীচে পড়ে।

শালা, গান্ডু আর কাকে বলে। রাগে ফেটে পড়েন হোম মিনিস্টার। ওরে শুয়োরগুলোকে কেউ বোঝাও অত ওপর থেকে পড়লে আমার ফোনটার আর কিছু থাকবে না।

দাদা, ফায়ার বিগ্রেড ডাকব? পার্টির তরুণ-তুর্কি নেতা কানের কাছে ফিশফিশ করে।

কেন ভাই! হোম মিনিস্টার ঘাবড়ে যান। আমার পোঁদে কি আগুন লেগেছে? না, ছোটোবেলায় টিনটিন কমিক্সে পড়েছিলাম, কুট্টুস এমন তিনতলায় আটকে যেতে ফায়ার বিগ্রেড এসে তাকে উদ্ধার করে। আমাদের কুটুস নেই, মোবাইল আছে।

এই কে আছিস, এই আঁতেলটাকে হাটা তো এখান থেকে।

দেখতে দেখতে সূর্য মাথার ওপরে উঠতে থাকে। নারকোলগাছের ছায়াও ক্রমে ছোটো, আরও ছোটো। কাকগুলো মোবাইল পাহারা দিচ্ছে। বাসা ছেড়ে নড়ার নাম নেই।

স্যার, আমি একটা ডিভাইস ইনভেন্ট করেছি। মন্ত্রীর সেক্রেটারি আই.এ.এস. বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকস ছাত্র ছিলেন। হোম মিনিস্টারের পড়াশুনো খুব বেশি দূর নয়। ফলে লোকটাকে এড়িয়ে চলতেই তিনি পছন্দ করেন। তবুও সেক্রেটারির কথায় তাঁর চোখ চিক্ চিক্ করে ওঠে।

ডিভাইসটা আর কিছুই নয়, দুটো লম্বা বাঁশকে পরপর দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে। তার এক মাথায় বেশ বড়ো একটা মেটালের আঁকশি। অনেকটা মানুষের পাঁচ আঙুলের থাবার মতো। কৌশল হল, বাঁশটা নারকোলগাছে কাকেদের বাসা বরাবর নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর আঁকশি দিয়ে সম্পূর্ণ বাসাটা তুলে আনা হবে।

পরিকল্পনা দেখে সকলেই ফের উৎসাহী হয়ে ওঠে। প্রথমে ছাদ থেকে। তারপর বারান্দা থেকে অনেকবার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দেখা যায় দুটো বাঁশ জোড় দিয়েও কাকের বাসার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সাকুল্যে পাঁচটা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বাঁশ বাঁধা হয়। তারপর কাকের বাসা অবধি যখন আঁকশি পৌঁছাল, ততক্ষণে মড় মড় শব্দ উঠেছে। বাঁশের বাঁধন পলকা হয়ে গেছে। সেক্রেটারি আই.এ.এস. ফলে ফের তিনি ত্রুটিগুলো ঠিক করলেন। আবার আঁকশি ওঠানো গেল। কিন্তু এতদূর থেকে আঁকশিতে বাসা তুলে আনা গেল না।

শালা বিজ্ঞানের ব জানে না বালের সেক্রেটারি হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতা পেছন থেকে ফুট কাটে। ডাইনামিক্স পড়েছে! পলিটিক্যাল সায়েন্স আর ফিজিক্স এক হল!

মরার আগেই যার মড়ার খবর করে দেয়, সেই মিডিয়াকূল এর মধ্যে এসে হাজির। আজ বিকেলে হোম মিনিস্টারের একটা প্রেস কনফারেন্স রয়েছে। গত পরশু পুরুলিয়ায় ফসলের দাম না পাওয়া চাষিরা হাই-ওয়ে আটকালে পুলিশের গুলিতে তিনজন মারা যায়। বিরোধীরা হোম মিনিস্টারের রেজিগনেশন দাবি করেছে। আজকে বিকেলে সেই নিয়ে প্রেস কনফারেন্স। তারপর সন্ধ্যেবেলায় টিভি চ্যানেলে প্যানেল ডিসকাশন। আবাসনের ভেতরে দু-চারটে ওবি ভ্যান আর বুম হাতে ছেলেমি মেয়েগুলো হামলে পড়েছে। চলছে লাইভ টেলিকাস্ট। সঙ্গে রানিং কমেন্ট্রি। এরই মধ্যে একটা চ্যানেল আবার স্টুডিয়োতে কিছু আঁতেল জোগাড় করে ঘটনার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানবিক, মানসিক এবং যৌবিক বিশ্লেষণ শুরু করেছে। পায়ে পায়ে পার্টির নেতারাও এসে হাজির। এত লোকের জন্য চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করতে প্রমোটার চাদু আর তাঁর সিন্ডিকেটের লোকজনের হাঁপ ধরে গেল।

এভাবে দেখতে দেখতে সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিমে। কিন্তু বিজ্ঞান, ঝাড়-ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্রপতঞ্জলিতেও না উদ্ধার হল হোম মিনিস্টারের মোবাইল ফোন। না পারা গেল কাকেদের অবস্থান ধর্মঘট থেকে সরাতে। ফলে, একে একে উদ্দেশ্য ও বিধেয়ও নিয়ে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা ক্রমে কেটে পড়লেন। হোম মিনিস্টার আজ সকাল থেকেই গৃহবন্দি। মাঝে একবার মুখ্যমন্ত্রীর ফোন এসেছিল। তিনি খিস্তি করে মা-বোন এক করে দিয়েছেন।

ফলে সকলে চলে গেলে মন্ত্রীমশাইয়ের আবাসন ফের স্বাভাবিক হয়ে আসে। সারাদিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার পরে হোম মিনিস্টার ক্লান্ত, হতাশ, রিক্ত তাঁর বারোশো স্কোয়ার ফুটের ভূগোলে ফিরে আসেন।

সারাদিন এ তাকে, সে একে বিস্তর দোষারোপ করে পরিবারের সকলেই এত ক্লাস্ত আর নতুন কোনো প্রসঙ্গ উঠে আসে না। সারাদিন প্রায় খাওয়া-দাওয়া হয়নি। ছেলে হোটেল থেকে রাতের খাবার নিয়ে আসে। সকলেই আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। সারাদিন নারকোলগাছ-নারকোলগাছ করে হোম মিনিস্টারের মাথা এখন ঘুরছে।

রাত তখন ঠিক কত জানা নেই। হঠাৎ কাকের চিৎকারে হোম মিনিস্টারের ঘুম ভেঙে যায়। ধড়মড় করে বিছানায় জেগে ওঠেন। নাইট ল্যাম্পের আলোয় দেখেন তাঁর স্ত্রী খুব কুৎসিংভাবে ঘুমিয়ে। কাকটা ব্যালকনি থেকে ডাকছে। তিনি উঠে যান। এ কি সকালে যেখান ফোনটা তুলে নিয়েছিল কাকে, সেটা সেখানেই! কাকটা তাহলে এত কাণ্ড করে শেষমেষ ফেরত দিয়ে গেল। তিনি খুব দ্রুত হাতে তুলে নেন মোবাইল ফোনটা। সুইচ্ড অফ। অন করার জন্য সুইচ টিপতেই অন্ধকার ব্যালকনি আলো ঝলমল করে ওঠে। সেই ঝলমলে আলোর ছিটে লাগে হোম মিনিস্টারের দু-চোখে। কিন্তু এ কী! ফোনটাকে রি-সেট করে দিয়েছে। না আছে মুখ্যমন্ত্রী থেকে রাজ্যের সব নেতা-নেত্রীদের গোপন হোয়াট্সঅ্যাপ। শিঞ্জিনির হট ছবিগুলো। পানু ভিডিয়ো। গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেইলস। কিংবা ডকুমেন্ট। মন্ত্রীমশাইয়ের ফোন ফ্যাকটরি রি-সেট হয়ে গেছে। কেবল স্ক্রিন সেভার হিসেবে স্ক্রল হচ্ছে গোটা গোটা বাংলায় লেখা একটা বাক্য— প্রতিটা খুনই আসলে রাজনৈতিক।

Categories
2021-May-Story গল্প

আদিদেব মুখোপাধ্যায়

এখন ভস্মের অধ্যায় শেষ হচ্ছে

অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আমি একভাবে শুয়ে আছি, নড়তে চড়তে পারছি না। চাইছিও কি নড়তে, হয়তো না। আমার পেটে আবছা ব্যথা ছড়িয়ে যাচ্ছে, কেন করছে ব্যথা?সাতসকালেই খারাপ কিছু খেয়েছি কি আমি? মনে পড়ছে না। ব্যথাটা ছড়িয়ে যাচ্ছে, ফিরে আসছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে ফের। এটা আসলে একটা ঘূর্ণি, একটা প্যাঁচানো রাস্তায় ব্যাপারটা চলে; ছড়িয়ে পড়া, ফিরে আসা, আবার ছড়িয়ে পড়ার পথে এটা শুরু আর শেষ আর ফিরে শুরু হতে থাকে, এটা, মানে এই ব্যথাটার কথা বলছি আরকী। ব্যথা আমাকে শুধু ব্যথার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, ব্যথার কথা মনে করাচ্ছে ঘূর্ণির কথা, ঘূর্ণি আবার ব্যথায় বদলে যাচ্ছে, ব্যথা আমায় আর অন্য কিছুই মনে করাচ্ছে না। রক্তশূন্যতায় শাদা একটা নিথর সিলিং, তার দিকে একভাবে চেয়ে আছি আমি। চোখের পাতাও কি পড়ছে, হয়তো পড়ছে, হয়তো পড়ছে না। কোনো কিছু স্থির করে মনে করতে যে কতদিন পারিনি। রোদের একটা রেখা নাক বরাবর চলে গ্যাছে, তার ভেতরে চকচকে ধুলো ঘুরে ঘুরে উঠছে। কোথায় পৌঁছেছে রেখাটা? আমি বলতে পারি না। আমি ঘাড় তুলতে পারি না, আমি নড়তে পারি না, আমি চড়তে পারি না, আমি চেয়ে থাকতে পারি কেবল। হয়তো রেখাটা কোথাও মিশে গ্যাছে। কিংবা হারিয়ে গ্যাছে। হয়তো সেখানে, যেখান থেকে ফোঁপানিটা উঠে উঠে আসছে। উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে। কোথায়? যেখান থেকে উঠে আসছে, সেখানেই কি? জানি না। কী করেই-বা জানব। দিক সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আচ্ছা, আমি কোথায় আছি? এই বালিশের নরম, এই বিছানার নরম আমায় ছুঁয়ে আছে। আমার ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে আমি তোমাকে কী বলব? যা কিছু নরম তাদের মধ্যে আমি শুয়ে থাকি আর ততটুকুই আমি বুঝি যতটুকু আমায় ছুঁয়ে থাকে? কিন্তু না, আমি এ-সব ভাবব না। আমি এখন মুখ ডুবিয়ে দিয়েছি আলোতে। তাপ শুষে নিচ্ছি। রক্ত কলকল করে উঠছে আমার মধ্যে, কোলাহলে আমি ভরে যাচ্ছি। ঘাসের মধ্যে নিবিড় একটা সাপ অতি ধীরে তার খোলস ছাড়ে আর স্থির হয়ে শুয়ে থাকে আর শুয়ে শুয়ে তোমার কথা ভাবে। তুমি, ওহ্‌ তুমি, সামান্য জিভ কাঁপানোর ক্ষমতাও আমার নেই, ফিশফিশ করা, তাও কি আছে, তোমার গাল অপর দিকে ফেরাতে কি আমায় হাত ব্যবহার করতে হবে? সহসা হাওয়া দিলে অন্ধকার দুলে দুলে ওঠে, ঘনত্ব পাতলা হয়ে আসে, অন্ধকারের প্রথম কণা তার দ্বিতীয় কণার থেকে আলগা হয়, সরে যায়, অপেক্ষাকৃত পাতলা অন্ধকার এসে সেই মাঝখানের জায়গা দখল করে নেয়। তুমি মুখ নীচু করে একভাবে বসে থাকো, নড়ো না, চড়ো না, চেরা চেরা শুকনো জিভ কেঁপে ওঠে। শিরশিরে হাওয়া দেয়, রেখা বেঁকে যায়, বিন্দুরা অবস্থান পালটায়, বক্রতলে বদলে যায় সমতল, বাতাস এসে বক্রিমার শূন্যতাকে ভরাট ও অবলুপ্ত করে। আমি নিঃশ্বাস চেপে রাখি। আড়াল থেকে গোয়েন্দা কিংবা চোরের মতো আমি দেখছি তোমায়। দেওয়ালের প্লাস্টারে নখগুলো বসে যাচ্ছে। বাস্তবতা সময়ের মধ্যে তার ঝুরিগুলো নামিয়ে দিয়েছে, ঝুরিরা ক্রমাগত নিজেদের বিন্যাস পালটাতে থাকে। সামান্য পালটে যাওয়া, ব্যাস, তাতেই স্মৃতি দুমড়ে যায়, আকার মুচড়ে যায়, অস্ফুটে কঁকিয়ে ওঠার শব্দ আসে। এতক্ষণের নৈঃশব্দ্য ভেঙে পড়ে। ইতস্তত পড়ে থাকে মুহূর্ত, মাড়িয়ে এগোলে তারা কাচ ফেটে যাওয়ার শব্দ করে ওঠে। আস্তে আস্তে তোমার চুল ছড়িয়ে পড়ে আর মিশে যেতে থাকে নরম অন্ধকারে। সাপ নড়েচড়ে ওঠে, ঘাসের ওপর তার নিথর খোলসচিহ্ন পড়ে আছে। আমি কাঁপা কাঁপা আঙুল বাড়িয়ে দিই ভাঙা ছবিদের আর অস্পষ্ট শব্দদের গুলিয়ে-যাওয়া দিকে। দপ্ করে লাফিয়ে ওঠে শিখা, অল্প অল্প অন্ধকার পুড়ে ছাই হয়ে ঝরে যেতে থাকে। আমার কামনা এখন জ্বলন্ত মোমবাতি হয়েছে, গলে-যাওয়া তার একটি ফোঁটা আসলে একটি অশ্রুবিন্দু, মোমবাতির গোড়ায় এসে অশ্রু জমে কামনা হতে থাকে। এই বদলে-যাওয়া দেখে অস্পষ্ট হেসে ওঠো তুমি। বা হয়তো ভুল দেখি, তুমি হাসছ না, শুধুই চেয়ে আছ, বা হয়তো হাসছ, বা আমি জানি না ঠিক। আলো-আঁধারিতে কেবলই ভ্রম তৈরি হয়। আমি আলতো করে ছুঁই তোমাকে। পাথরের ঠান্ডা উঠে আসে আঙুলের ডগায়। আবার হাওয়া দেয়, ঘুরে ঘুরে ওঠে, আলোছায়া কাঁপতে কাঁপতে সন্ত্রস্ত দানব হয়ে যায়। আমি দু-হাত দিয়ে চেপে ধরি তোমার মুখ। নখ বসে যায় গালে। এটা কী, মুকুট, হ্যাঁ, মুকুটই তো। একটা কাঁটার মুকুট পরানো তোমার মাথায়, কে পরিয়েছে, কেন পরিয়েছে? আমি বুঝতে পারি না। থিরথির করে চেরা জিভ কেঁপে ওঠে। স্রিক স্রিক শব্দ হয়। টিক টিক করে একটা ঘড়ি কোথা থেকে প্রতিবাদ জানায়। দেখি, তোমার চোখের কোণা দিয়ে রক্ত নেমে আসছে। না-বলা ব্যথায় তোমার চামড়া নীল হয়ে গ্যাছে। আমি রোধ অনুভব করি। গরাদের মতো সে জেগে ওঠে, সর্বস্ব দিয়ে আমাকে নিরস্ত করে। আমি আমার রোগা হাতেদুটো দিয়ে শিক ধরে থাকি। শিকের ওপর বিদ্যুৎ পিছলে যেতে থাকে। ক্রুদ্ধ, ফোঁসফোঁস শব্দ ওঠে। ঘাসের ওপর দুটো নুড়ি রৌদ্রে ঝকঝক করতে থাকে। আমার কামনার জ্বলন্ত শীর্ষ আমি হাতের আড়ালে ধরি। বাতাসের অভাবে সে ছটফট করে। নিভে যায়। লুপ্ত চরাচরে আমি একা, একমাত্র অস্তিত্ব বজায় রাখি। শুধু অস্তিত্ব, যার দৈর্ঘ্য নেই, প্রস্থ নেই, হয়তো উচ্চতাও নেই। হয়তো সে বিন্দুর মতো, কে জানে, আমি বুঝতে পারি না। সে কি স্থির, না কি সে অসীমের দিকে উঠে যাচ্ছে, না কি ঢুকে আসছে এক অতল কুয়োয়? আমি নিশ্চিত হতে পারি না। হয়তো আমি শুধুই একটা বিন্দু, কেবলই বিন্দু, যে-আমি একবিন্দু ব্যথা হয়ে বিন্দু-আমার ভেতরে ঢুকে পড়েছে কখন। অতলতা এক ঘূর্ণি, তার প্রথম বলয় থেকে অনন্ত বলয়ের দিকে ব্যথা নেমে আসে। ব্যথা স্থির হয়। ব্যথা উঠে আসতে থাকে। অসীম, অতল ও স্থিরতার মধ্যেকার যে-রাস্তা তার প্যাঁচগুলো আমার অস্তিত্ব কিংবা ব্যথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে থাকে। এই একঘেয়েমি আমাকে সহ্য করে নিতে হয়। এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারি না। জিভ নাড়াতে পারি না। ফিশফিশ করতে পারি না। একটা ঘড়িও থাকে না যে, সময় জানব। আমাকে ছুঁয়ে থাকে নরম। সিলিং-এর রক্তশূন্যতায় তোমার মুখ কল্পনা করি। পারি না। একটা আঁচড়ও কাটতে পারি না। এটা আসলে একটা অনন্ত সাদা, অনন্ত শীতলতা, এখানে কোনো প্রশ্ন নেই, উত্তরও নেই, প্রশ্ন উত্তরের মাঝামাঝি কিছু, বিবৃতি, তাও কি আছে? হয়তো নেই। আঃ। নতুন করে কিছুই আর ভাবতে পারি না। ব্যথা শুধুই ব্যথা আর ঘূর্ণি হয়ে জেগে থাকে। শ্বাসপ্রশ্বাস জেগে থাকে শ্বাসপ্রশ্বাস হয়ে। রক্তের কোলাহল কোলাহলের বেশি কিছু বলে না। আমি বরং এক দুই তিন গুনি। মনে মনে। সংখ্যাগুলো সহসা থমকে দাঁড়ায়। সিঁড়ির ধাপে বুটের শব্দ, থমকে যায়। দরজায় আঘাতের শব্দ, এবার, এবার। গেস্টাপোরা এক্ষুণি ঢুকে পড়বে ঘরের ভেতর। একটা দুটো না, প্রতিটি সকালে এই ভয়ে তুমি ঘুমোতে পারতে না। মনস্তাত্বিক লাকঁ তোমার চিকিৎসা করেছিলেন। গেস্টাপোর কাছাকাছি একটা ফরাসি শব্দের মানে হল স্পর্শ। ছোঁয়া, কিন্তু আলতো করে। বেশ, তুমি তাহলে ঘুমিয়ে পড়ো এবার। বালিশের নরম তোমায় ছুঁয়ে থাকবে। ২০০২ সালে গুজরাতের একটি হাসপাতালে মুকেশ ঠাকুর আর বশির আহমেদ পাশাপাশি বেডে শুয়ে ছিল। তাদের রক্ত গড়িয়ে পরস্পর মিশে যাচ্ছিল মেঝেতে। তারা প্রায় একইরকম ছোঁয়া পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ছিল। শুধু শব্দের মানে পালটে দেওয়া। একটা চিহ্ন, তার ঈষৎ বদল। না, এ-সব কথা তোমার উদ্দেশে আমি বলি না। আমি জানি না আর কোনো কথার কোনো মানে আছে কি না। কথারা অতিদ্রুত কথা বাড়িয়ে তোলে। শূন্যতাকে দুমড়ে দেয়। নৈঃশব্দ্যকে ভেঙে ফ্যালে। থাক, বরং মুহূর্তেরা মুহূর্তের মতোই থাক। তাদের কথায় বদলে দিও না। অর্থ খোঁজা এক ভয়াবহ জুয়োখেলা। ঐ আড্ডায় আমি আর কিছুতেই যাব না। এরা কোথা থেকে উঠে আসছে, এইসব কথারা? আমি বলতে পারি না। হয়তো যেখানে আবার এরা মিশে যাবে সেখান থেকেই। আমি জানি না। আমি বিড়বিড় করতে পারি না। আমি নড়তে চড়তে পারি না। ফিশফিশ করতে? তাও না। আমি শুধু তোমার কথা ভাবতে থাকি। হায় তুমি, সর্বত্র তুমি ব্যাপন করে আছ, সুতরাং সবকিছু তুমিই হয়েছ। আবার সবকিছুরই রূপ হয়ে তুমি বসে আছ নরম অন্ধকারের কেন্দ্রে। তোমার গাল কী করে ছোঁব আমি, কী করে বসিয়ে দেব নখ? তোমার চোখের রক্ত কী করে আমি মুছে নেব কাঁপা কাঁপা আঙুলে? দ্যাখ, আমার কামনা কখন বদলে গ্যাছে প্রেমে, আমার প্রেম তার নিষ্কম্প শীর্ষে উদাসীনতা হয়ে জ্বলে আছে। তোমার দিকে এবার একটু ঝুঁকে পড়ি আমি, প্রথমবারের মতো লক্ষ করি এটা একটা হুইলচেয়ার, যার ওপর তুমি বসে। এখানে কি ভূমিকম্প হয়েছিল কোনো? মেঝে ফাটলো কী করে? তোমার হুইলচেয়ার ঢুকে গ্যাছে মেঝেতে। আমি ঝুঁকে বসি আর দু-হাত দিয়ে তুলতে থাকি একটা চাকা। আমার ঘাম হয়, পরিশ্রম হয়। মনে হয় কেউ আমায় লক্ষ করছে আড়াল থেকে, কখন মুণ্ডু লুটিয়ে দেবে ভূঁয়ে। কই, চাকা তো এতটুকু উঠছে না! আমি আকুল হয়ে উঠি, গালি দিতে যাই নজরদারের উদ্দেশে, ডাকতে যাই তার নাম ধরে। থমকে যাই। রোধের গরাদ ওঠে। কিছুই মনে পড়ে না আমার। কার নাম, কাকে ডাকব, কী বলে ডাকব, কিছুই মনে আসে না। দু-মুঠোয় শিকের ধাতবতা, আমি চেয়ে থাকি। ঘাসের মধ্যে সাপ আবার তার মুখ নামিয়ে নেয়। রোদ্দুরে দুটো নুড়ি শুধু চকচক করে। আস্তে আস্তে আবার নরমে মিশে যাই। ধুলোরা এলোমেলো ঘুরে ওঠে। এক বিন্দু ব্যথা হয়ে ঢুকে আসি বিন্দুসত্তার ভেতরে। কী খাবার খেয়েছি মনে আসে না। হয়তো খাওয়াই হয়নি সকাল থেকে। জানি না। বুঝতে পারি না। ব্যথা শুধু ব্যথার কথা মনে পড়িয়ে দেয়। ঘূর্ণি মনে পড়ায় ঘূর্ণির কথা। ব্যথা আর ঘূর্ণি কখন একাকার হয়ে যায়। বাস্তবতা সময়ের মধ্যে তার ঝুরিগুলো নামিয়ে দিয়েছে, তাদের বিন্যাস প্রতি পলে বদলে বদলে যায়। রক্তশূন্য সিলিং তার রক্তশূন্যতায় ছড়িয়ে থাকে। প্রশ্ন ও উত্তরের অতীত তার শীতলতা, তার অবরোধ। তারই মধ্যে চূড়ান্ত বিবৃতি খুঁজি। মেলে না। ও কার ফোঁপানি? বুঝতে পারি না। ভাঙা ছবি আর অস্পষ্ট শব্দেরা একটু একটু করে মুছে যায়। শ্যাওলায় আচ্ছন্ন প্রাচীন কুয়ো দিয়ে আমি অতলতার দিকে ঘুরে ঘুরে নেমে যেতে থাকি।

Categories
2021-May-Story গল্প

বনমালী মাল

পাথুরে আঁধার

— ভাতারছাড়ি তোর ক-টা ভাতার লাগে রে? ভাতার ছেড়ে এখানে বাপের ঘরে এসে পড়ে আছু!

টালি আর টিন দিয়ে ছাওয়া আটচালা ঘর থেকে একটা গোঙানির আওয়াজ দাঁত কড়মড় করতে করতে বেরিয়ে আসে। স্বর শুনে মনে হয়, গলার শিরা ফুলিয়ে, স্বর সপ্তমে চড়িয়ে না বলতে পারার জন্য বক্তার রাগ-বিরক্তি দানা বাঁধতে বাঁধতে দুঃখ-কষ্টে পাথর হয়ে যাচ্ছে। চেঁচিয়ে বললে পাড়ার লোক, রাস্তার লোকও মুখ চাপা দিয়ে হাসবে। শুকনো মুখে পরামর্শ দিয়ে কিংবা হা হুতাশ করে মনে মনে ঘাই দেবে—

— এত দ্যামাক ভালো নয়, আগেই বলছিলাম।

— ভাতারের ঘর ছেড়ে কতদিন পড়ে আছে!

বলে কেউ কেউ বাতাসের দিকে একটা সাজানো নাটকের সূত্রধরকে ছুঁড়ে দেয়।

বছর সাতেকের একটা ছেলে খালি গায়ে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ভোটের আগে আগেই নতুন রাস্তা তৈরির মহড়া চলছে যেন। এই ক-দিন আগে পর্যন্ত যে-রাস্তাটার ওপর দিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে এগিয়ে যেত গোটা কয়েক গাড়ি, বাসসমেত, যাত্রীদের বিরক্তি অগ্রাহ্য করে, প্রায় রাতারাতি রাস্তাটা হয়ে গেছে তকতকে ঝকঝকে। ছেলেটার পেছন পেছন তার মা।

— মরবে…

দরজা পেরিয়ে রাস্তার দু-দিক দায়সাড়াভাবে দেখেই কুশি বিকৃত গলা ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে যায় সজনে গাছটার দিকে—

— এরকম করেই একদিন মরবি গাড়ির তলায় চাপা হয়ে।

শীতের সকালের একঝাঁক দাগী কুয়াশা হনহন করে ঢুকে যাচ্ছে খোলা দরজা দিয়ে ঘরের মধ্যে। ভেতরের সেই চাপা গলার শিরা তখনও ফুলে ফুলে ফুঁসছে।

— কতবার তো আনতে আসছিল, যাওনি কেন?

— ছ্যানাটা বড়ো হইছে, লজ্জা করেনি তোর!

ছেলেটা ততক্ষণে কয়েকটা কুয়াশা আর ধুলামাখা সজনে ফুল হাতে নিয়ে গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। কুশি প্রথমে একটু থমকে যায়। হাতখানেক দূরত্বের জিনিসও অস্পষ্ট। একটু ঝুঁকে দৃষ্টি পরিষ্কার করে সে। সদ্য মৃত সজনে ফুলগুলো তার কাছে কত স্পষ্ট! গাছের দিকে তাকিয়ে কুয়াশার ঝরনায় অন্ধ হয়ে গেল সে। ফুল ফুটে আছে নিশ্চিত। অথচ এখন তারা মৃত। শুধু আলোর দুর্বলতায় কত নরম জীবনও ফ্যাকাশে।

কুয়াশা কেটে কেটে একটা লরি উত্তর থেকে দক্ষিণে মিলিয়ে গেল। অজান্তেই জোর করে ছেলেটার সেই হাত ধরে কুশি, যে-হাতে ফুলগুলো কাফনের স্বপ্ন দেখছিল, চটকে দুঃস্বপ্ন হয়ে গেল তারা।

— মরলে দেখতে পাই… সবাই খাক করে দিল মোর জানটাকে…

এখন আরও একটু সচেতন কুশি। তার গলা নিয়ে। গলার জোর নিয়ে।

কুয়াশার আবরণে তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু তার গলা যে-কেউ শুনতে পারে!

তাকে নিয়ে আবার কেউ ভাবনার একটা ফাঁদ পাততে পারে এখুনি!

জোড়া জোড়া চোখ মায়া মিশিয়ে দেখতে দেখতে কুশির শরীর আর চরিত্র ভেদ করবে!

এখুনি চটকে যাওয়া ফুলগুলোর মতন তার গলা ভিজে ভ্যাপসে নেতিয়ে গেল, কিন্তু একটা জলজ্যান্ত বিরক্তি তাকে দমাতে পারল না। একটা শিশু হাতটানা খেতে খেতে সেঁধিয়ে গেল ঘরের ভেতর। ভেতর থেকে আসতে থাকা সেই বাখান গোঙানি থেকে এখন বোঁটায় কুয়াশা লাগা সজনে ফুল হয়ে ঝুলে আছে। এখুনি খসে পড়বে নিস্তব্ধ অসহায় খাদে।

আলো আর তাপ ক্রমে তাদের রূপ ছড়িয়ে দিচ্ছে কুয়াশা উবিয়ে। দিনের প্রথম আলো পড়ে কুশির মায়ের ঘরে। দরজা পেরিয়ে আলো ছাড়িয়ে আলোর আভা ঘরের দুয়ার মাতিয়ে তোলে। আলোর পিঠে আলো চাপতে শুরু করলে কুশি বিন্দু থেকে বিন্দু হতে হতে মিলিয়ে যায় ঘরের এককোণ অন্ধকারে। আলো মুখে নিয়ে বাইরে বের হওয়ার সময় পেরিয়ে এসেছে কুশি… রাতদিন নিজের বানানো একটা নৌকায় চড়ে বসে থাকে সে। পালহীন। দাঁড় নেই। স্থির কালো জল বা স্রোতের দৃশ্য তাকে ভাবিয়ে ভাবিয়ে ক্লান্ত করে, তারপর নিশ্চল পড়ে থাকে সেও ওই নৌকোটার মতন।

জানালার আলো পেরিয়ে বসে থাকে কুশি। দিনের বেশিরভাগ সময় এখানে বসে থেকে ভাবে আর ভাবে সে। দেখতে পায়, রাস্তার অপর প্রান্তের ঢাল নেমে গেছে নিরীহ সমতল জমির বুকে। সবুজ ঘাস কিংবা ধানখেত ভরা চোখ কুশির মধ্যে স্থায়ী একটা প্রভাব ফেলে রেখেছে। স্বামীর বাড়ি থেকে যেদিন প্রথম চলে আসে সে, সেদিনের সেই সবুজ আর আজকের সবুজে কোনো তফাত নেই। সেদিনের কুয়াশাবিহীন সকাল চরাচরে যে-গোপন মুখরোচক কথার বীজ বুনেছিল, আজ তারা কিছু সময় আগে অবধি কুয়াশায় ঢাকা ছিল, রোদে রোদে তারা জ্বলে পুড়ে গন্ধ তুলছে। ঘাস আর ধানের গা থেকে কুয়াশা উবে গিয়ে কাঠখোট্টা বাদামি কিংবা বিবর্ণ করে তুলছে তাদের।

একটা দোমড়ানো টেলিগ্রাফ পোস্টের দেহ পড়ে আছে। তারবিহীন। মুচড়ে যাওয়া সাইকেলের টায়ার জাপটে ধরে আছে মুথা ঘাস। এইসব স্থির চিত্রকণা কুশির গা সওয়া হয়ে গেছে। আগে এক-একটা সময় স্থির দাঁড়িয়ে থেকে কুশিকে শৈশব মনে করাত এরা। মুখ থুবড়ে পড়ার পরও দল বেঁধে থাকা যায়!

কুশির মুখ বেয়ে একটা গলায় দড়ি দেওয়া গোরুর ছায়া রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেল।

তিনজন সন্ন্যাসী একহাতে উত্তরীয় গলায় তুলতে তুলতে আর অন্য হাতে পোক্ত একটা লাঠি ঠুঁকতে ঠুঁকতে—

“গৃহস্থের কল্যাণ হোক…”

অন্যমনা হয়েও কুশি যেন সহজাতভাবেই তার নিজের আবছায়াকে চিতায় তুলে অপেক্ষা করতে থাকল লাঠির শব্দ মরে যাওয়া অবধি। এখন সে আরও আরও অন্ধকার আঁকড়ে ধরতে চায়।

একটা সাদা পাখি আটচালার টঙে এক টুকরো হাসি আর ছেনালিই বোধহয়, ফেলে দিয়ে উড়ে গেল দূর মাঠের বাবলা গাছটাতে।

প্রতিদিন নতুন করে রোদ ভূমিষ্ঠ হলে একটা কুয়াশার যেন অগস্ত্য যাত্রা শুরু হয়। প্রতিদিন কুশির স্বপ্নের আর যাপনের বয়স বাড়ে। শরীর এগিয়ে যায় মৃত্যুর কাছে। ভাবনার সঙ্গে। হাঁক দিতে দিতে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে একটা বাঁক কাঁধে লোক। জানালা দিয়ে রাশি রাশি মন টানা শব্দ কুশির কানে আসে।

পাথর বাটি বিক্রির সোনালি চিৎকার দোল দোল ভাসা খাচ্ছে ছন্দে।

নকশা কাটা
কালা পাথর
পূজায় দেবেন যজ্ঞে দেবেন

কুশির জানালার সামনে এসে সেই সুর হুমড়ি খেয়ে খেয়ে পাথর হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা ভ্রূকুটি সত্ত্বেও বেরিয়ে যায়। কুশির মা দরজার বাইরে পা রাখলেই আগন্তুক বিক্রেতা গতি থামিয়ে শূন্য হয়ে গেল। পাহাড়ি চেহারায় একটা রুক্ষ হাসি খেলিয়ে বিক্রেতা এই সকালেও কপাল থেকে একআঙুল ঘাম টেনে এনে ফেলল রাস্তার উপর। পায়ে পায়ে হাঁটা পথ আর ক্লান্তি সরিয়ে জনপদে প্রথম খরিদ্দার পাওয়ার আশায় পসরা বিছিয়ে দিল রাস্তার মরে যাওয়া জায়গাটায়।

— নিজের হাতে গড়া মা…

— পাহাড় থেকে নিজে হাতে কেটে ছেনি মারিছি…

— এই ফুল ফুল নকশাগুলানকে চোখের সামনে বড়ো হতে দেখিছি আর তেমন করেই তুলিছি এখ্নে…

বড়ো থেকে ছোটো সাতটা মাপের পাথরবাটি একে-অপরের ভেতর সাজানো আছে। কাঠ-হাতে বের করে করে দেখায় সে। যেন হাতে করেই সে জানালার ওপাশে অদেখা একটা উঁকি দেওয়া মুখের ভাব পালটে দিচ্ছে। লোকটার কথার টুকরো টুকরো শুনতে শুনতে কুশি ভাবনার ছায়ায় ডুবে যাচ্ছে। তার খেয়াল নেই, রোদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। স্পষ্ট।

পাহাড়ের বুক চিরে পাথরের একটা একটা টুকরো গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে! লাল দগদগে ছিন্ন একটা নাড়ি নিয়ে সে হয়তো রাতদিন স্বপ্ন দেখে গর্ভবতী হওয়ার! ছবির পর ছবির গয়না সাজিয়ে… কী সুখ আর স্বপ্ন! এরপর হয়তো ঘরের অন্ধকারে কিংবা কুয়াশা ঘেরা একান্তে পড়ে থাকবে দিনের পর দিন! সবার আড়ালে। একটা পুজোর প্রয়োজনে সাজো সাজো গন্ধ তুলে, পেটে ধরবে কত কত প্রসাদ। খালাস করবে… আবার রাতভোর অপেক্ষা করবে আরও একটা প্রসাদ চড়ানোর!

কুশির চোখ নির্বাক ভাষায় মায়া ছড়াচ্ছে।

কুশির মা পাথরবাটি নাড়াচাড়া করে দেখছে। পরখ করে নিচ্ছে, বাটির মুড়ি বা অন্য কোথাও কোনো খুঁত আছে কিনা।

—ঢাঙ্গিকুসুমের বিল পাহাড়ের নিজের কোল থিকে চিরে আনা মা…

—লিয়ে লিন। ঠইকবেননি মা…

কুশি ভাবে, পাহাড় তার অসহায়তা বিলিয়ে দিয়েছে যেন। পাহাড় জানে, এভাবেই সবাই পাথর নিয়ে যায়, এতে কোনো শঠতা নেই। না নিয়ে গেলেই যত অনিয়ম।

ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে একআকাশ স্তব্ধতা আর স্থিরতা নিয়ে। কেনা বেচার মাঝে সামান্য এক দর্শক, যার কাছে পাথর মানে খেলনা, কুয়াশা মানে সজনে ফুল-খেলা।

সন্ধ্যা নামে। রাতের ভেতর দিয়ে গভীর ভাবনাগুলো হেঁটে যায়। কুশির শোবার ঘরের এক টুকরো বিছানার পাশে ঠাকুর পুজোর বাসন। পাথর বাটিগুলো সাজানো আছে কোলে কোলে। জীবনের অনেকটা সময় সে পেরিয়ে এসেছে সকল দেবতার পথ এড়িয়ে। ইদানীং তাকে সেঁধিয়ে যেতে হচ্ছে কুয়াশার মতো ঘন আবছায়ার একটা দুর্ভেদ্য কোটরে। মায়ের কথার বাণ থেকে মুক্তি পেতে সে বেশিরভাগ সময় কাটায় দেবতার কাছে। মাকে দোষ দিতেও পারে না কুশি। কতগুলো রক্তহীন সাদা মুখ দাঁত খিঁচিয়ে গাছের সবুজ পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলছে। ছেলেটার মুখ আর আদুড় গায়ে চোখ বোলাতে বোলাতে কুশির চোখে অতীত ঝাঁক বেঁধে ভিড় করে।

ছোটোবেলার কত কথা আর খেলা মনে পড়ে কুশির। শুধু একটু ভয় ছাড়া অন্য কোনো বাধা ছিল না যেখানে। কাঁচা আম ছাড়ানোর জন্য ঝিনুক ঘষে ঘষে ধারালো করে নেওয়া, কলসি কাখে কলতলায় জল আনতে গিয়ে পাড়ার সবার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা কিংবা যত্ন করে মাটি তৈরি করে নিজে হাতে একটা চারাগাছ পুঁতে দেওয়া— এখনও কুশির মনে অমলিন হয়ে আছে।

বাইরে রাতের থমথমে নীরবতা ভেঙে একটু বাতাস শিরশিরিয়ে বয়ে গেল। এই সময়েই সজনে ফুলগুলো তাদের জীবনের চরম প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঘুম নেই কুশির চোখে। আজ কয়েকমাস সে বাপের বাড়িতে পড়ে আছে। কত বছর আগের কথা…

—আমরা মৃত্যু অব্দি কালপুরুষ আর লুব্ধক হয়ে থাকব…

বিছানার রাত উষ্ণ হয়ে উঠত এমনভাবে। কুশি আর তার স্বামীর দাম্পত্য রাতে রাতে একটা বীজ বোনে। স্বামীর বাড়ির পাশ দিয়ে রেল চলে যায় নৈঃশব্দ্য ভেদ করে। ঘুমেল রাত টের পায় না, কতখানি যন্ত্রণা পেল চরাচর, বাঁশির তীক্ষ্ম বাণে। কুশির সংসার পুরোনো হয় দিন দিন। সম্পর্কে শ্যাওলা পড়ে। একদিন একটা মেঘ এসে ঢেকে গেল লুব্ধক। কোনোদিন আবার কালপুরুষ গোটা ঢাকা পড়ে যায়। সমস্ত নিয়ম অগ্রাহ্য করে ঝাঁক ঝাঁক তারা ছোটাছুটি করতে করতে স্থির জমাট বাঁধা কথাগুলোকে ধাক্কা দিতে শুরু করে। একদিন স্পষ্ট চেয়ে দেখল কুশি, কালপুরুষের নীল কোমর বন্ধনী খুলে পড়েছে। তির আর ধনুক, যা এতদিন আগলে এসেছে উজ্বল লুব্ধককে, একটার পর একটা তির ছুটে যাচ্ছে আর সব তারার দিকে। মোলায়েম গতিতে।

এখন কুশি একা। বিছানা আর বালিশে লেগে আছে ঘরে জ্বলা মৃদু আলোর আদর। অস্থির কুশি বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। আজও কালপুরুষ আছে নিশ্চয় ভেবে। আছে। বিলম্বিত চাঁদ তখনও লজ্জায় তেজী হয়ে ওঠেনি। ওই তো… কালপুরুষ দাঁড়িয়ে আছে দুই পা উন্মুক্ত করে। পায়ের মাঝে এক অমোঘ কৃষ্ণগহ্বর যেন শুষে নিচ্ছে অগণিত তারাকে। তারাগুলোর দিগশূন্য গতি মাড়িয়ে দিচ্ছে লুব্ধকের আলো। রাস্তার দিকে তাকায় কুশি। শিহরণে টান পড়েছে চামড়ায়। এই রাস্তায়ই আজ সকালে একজন হয়তো ভুলিয়ে ভালিয়েই বিকিয়ে গেছে পাথর বাটিগুলো। সাজানো। প্রকৃতির মায়া আঁকা আলপনা গায়ে।

বিছানায় আবার কুশি। কালো কালো পাথর বাটিগুলো ঘরের আলোটুকু শুষে নিচ্ছে। কেবল সাদা রঙের আলপনাগুলোই চোখ মেলে জেগে আছে গর্বে। হয়তো থাকবে না বেশিদিন। ব্যবহৃত হতে হতে কোণ ভাঙবে। মেটে রঙের বিষণ্ণতা ধুয়ে মুছে দেবে নতুনের ঝলমলে ভাবকে।

—ফিরে কি যাবে কুশি? ওর কাছে? নিজের ঘরে?

—ভাঙা পাথরের টুকরোগুলো আর ফিরতে পারবে না কোনোদিন।

—যদি যায়ও, এখানের হাতের ছোঁয়া আর প্রসাদ মুছে চিরতরে, সেখানে পাহাড়ের কোল ওকে আর চাইবে না আগের মতন!

—পড়ে থাকবে এখানেই। কানাচে। ঢাঙ্গিকুসুমের মায়া মাখা স্বপ্ন জড়িয়ে।

কখন পাতা লেগে যায়, জানতে পারে না কুশি। একটা আলতো ঘুম গড়িয়ে গিয়ে খুব অল্প সময়ে ধাক্কা খায় সকালের সঙ্গে।

আবার সকাল। আবার কুয়াশা। সজনে ফুল ঝরে পড়ার মতন নিঃশব্দে গুমরে যাচ্ছে কতগুলো অকথন। এখনও কিছু সজনে ফুল পড়ছে। বাতাসে উড়ে গিয়ে কেউ পড়েছে রাস্তায়। থ্যাঁতলানো। ঠায় দরজার বাইরে ঘন কুয়াশার পেটে দাঁড়িয়ে আছে কুশি। প্রায় রাতজাগা চোখ মুদে আসছে কুয়াশার খাতিরে।

কী ভাবছে সে!

একটু পরই রোদ উঠবে…

প্রতিদিনের মতন সে গিয়ে বসবে ঘরের ভেতর, জানালার পাশে। জানালা থেকে যতটুকু বাহির দেখা যায়, দেখবে। ফল্গুস্রোতের মতন অন্তর ফেঁড়ে চিরে যাবে মায়ের কথাগুলো। মাঝে মাঝে আগুন উসকে যাবে স্বামীর ঘরের আটটা বছর।

তারপর কুশির চোখ গিয়ে পড়বে রাস্তা পেরিয়ে একটা চৌকো মতন বাঁজা জমির উপর। বাঁশের বাতা দিয়ে ঘেরা। একটা গামছা কাঁধে প্রৌঢ় লাঠি উঁচিয়ে গবাদিপশু ঠেসে দিয়ে যাবে সীমানার ভেতর। এ-সব পেরিয়েও কুশি দেখবে, একটা কোকিল আর একটা কোকিলের ঠোঁটে পালক গুঁজে বুঝে নিচ্ছে বসন্ত আসার সঠিক দিনক্ষণ।

আজ মুমূর্ষু কুয়াশার ওপর রোদের জন্ম হলেও, কুশি ঘরে গেল না। স্থির চোখে সে দেখছে ওই প্রৌঢ়ের দিকে। কোকিলগুলো আজ সেখানে নেই। বিচলিত নয় কুশি। ছেলেটা ততক্ষণে সজনে ফুলে মশগুল। যন্ত্রচালিতের মতন ছেলেটার এক হাত ধরে কুশি। আর এক হাতে একটা পাথর বাটি।

বাস আর পুরুষের অপেক্ষা না করেই রাস্তা বরাবর মিলিয়ে যাচ্ছে কুশি।

Categories
2021-May-Story গল্প

শুভংকর গুহ

নৌকোপাখি

একটি পাখি উড়ে এসে নৌকো হয়ে বসল সৈয়দ দ্বীপে।

বালুচরে হলুদ সর্ষেখেতের ওপরে একটি মেয়ে গান গেয়ে গেয়ে বাতাসের তরঙ্গ ভাসিয়ে দিয়েছে। মাঠের ওপরে হলুদ সর্ষেফুল ঠুকরে ঠুকরে ফেলে রেখেছে দ্বীপের নৌকোপাখি।

সৈয়দ দ্বীপের খেয়াঘাটের নাম শালু মিঞ্চার ঘাট। খেয়াঘাট মানে কাদার ওপরে যাত্রীর ওঠা-নামার দাগ মাত্র। জোয়ার এলে জল টিপটিপের মতো শালু মিঞ্চার ঘাট পিট পিট করে তাকায়, ভাঁটা পড়লে আবার দিব্য ঘুমিয়ে পড়ে। নদীর বড়োই উজান মায়া, সোমত্তের মতো গোপনে লজ্জাহীনা। ঝোড়ো বাতাসে ভরা আবেগে যৌবনের তুফান টের পায়। ঝড়বৃষ্টি, আষাঢ় শ্রাবণ সৈয়দ দ্বীপ বা শালু মিঞ্চার ঘাটকে কাত করতে পারেনি। সৈয়দ দ্বীপে কানসারি ঘাটের যাত্রীরা অবাক হয়ে শব্দ করে ‘ব’, খানিক দম নেওয়ার অবসরে ‘ঠ’, বলে বসে পড়ে, সৈয়দ মিয়াঁর দোকানে।

দোকান মানে দরমার ও শুকনো পাতার ছাওনির ফোকরে কয়েকটা জলচৌকির মতো আসন পাতা। খরিদ্দার এলে ফুঁ দিয়ে উনান উসকোয় সৈয়দ মিয়াঁ। বাকি সময় উনানের আগুন ঝিম মেরে ঘুমিয়ে থাকে। সৈয়দ মিয়াঁর বিবি ছিল, কিন্তু সে কোথায়? কেউ প্রশ্ন করলে, সৈয়দ বলে, নদীর পানিতে থাকে। আমার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কুটিরে আর ফেরে না। সাথে আছে দুইটা ছাগল। আর আছে এক দ্বীপের কন্যা, কিন্তু সে মাঠেই থাকে। যেন জলখালি পাখিরালয়ের কন্যা। জল যেমন মেঘের ছদ্মবেশ ধরে থাকে, এই কন্যা সেইরকম।

বিশ্রামের জন্য কাদা পার হয়ে সৈয়দ মিয়াঁর বিশ্রামখানায় জিরোলে, সুদূরে নদীর দিকে তাকিয়ে দেখলে, নদীর বাঁকা দিকটা পাখি শিকারির ভাঙা ধনুকের মতো পড়ে আছে। সৈয়দ মিয়াঁ প্রথমে বলবে— একঘর জন্নতের সময় নিয়ে, বসে বসে বেলার রোদ পার করে নাও মাতব্বর। তা কোথাকার গো তুমি?

লিঙ্কা হোসেন বলে— চাঁদপালের।

নীলকণ্ঠর বিহারের লঞ্চে এলে বুঝি?

কানসারি যাব। কাজের সন্ধানে।

অ। বুঝেছি। তুমি কারিগর?

বসাকের নৌকার কারখানায় যাব।

বসাকদের তিনটা নৌকার কারখানা আছে। কোন কারখানায় যাবে?

যে-কারখানায় কাজ পাব সেখানেই যাব।

তুমি নৌকার কারিগর।

কানসারির খেয়া কখন আসবে?

কিছুক্ষণ আগেই খেয়া গেল কানসারির ঘাটে।

কতক্ষণ পরে আসবে?

ওবেলায় আসে। সৈয়দ দ্বীপ থেকে যাত্রী শুধু যায়। কানসারি থেকে খালি খেয়া আসে। আচ্ছা কী নিবে বলো?

লিঙ্কা হোসেন আবার তাকালো সৈয়দ মিয়াঁর দিকে। যেন বলতে চাইল, তোমার কৌতূহল আমার কাছে প্রবল ঠেকছে মিয়াঁ। শুনেছি, কানসারি যেতে হলে, সৈয়দ দ্বীপে নামতে হয়। মিয়াঁর দিকে তাকিয়ে লিঙ্কা হোসেন বলল— লঞ্চ কানসারির ঘাটে যায় না তাও জানি।

হ্যাঁ, কানসারি যেতে হলে, একবার আমার দোকানে সব যাত্রীই ‘ঠ’ দেয়। খেয়া আসে। খেয়া কানসারি যায়।

চাঁদপাল থেকে সৈয়দ দ্বীপে লঞ্চে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। সেই ভোর থেকে জলের বুরবুরি আর লঞ্চের মোটরের ঘর ঘর শব্দে কান মাথা ঝি ঝি করছে। গলা শুকিয়ে এসেছে।

গারুতে নদীর পানি আছে। পাতালের খোদার পানি কোথায় পাব? একা থাকি। একজনের জন্য কি আর সরকার মাতব্বর পাতালের পানির ব্যবস্থা করবে?

খোদার ইচ্ছা থাকলে একজনকেই কৃপা করেন।

ছাগলের দুধ আছে। এট্টু চা দেই?

খাবার দাওনের কিছু আছে? আচ্ছা আগে চা দাও।

কানসারির খেয়া ফিরত আসতে এখন অনেক অনেক দেরি। আগে একটু চা নাও। তারপরে খাবার কিছু নাও। খাবারের আয়োজন করা আছে। কড়াইয়ে তেল ঢেলে নেড়েচেড়ে দিব।

তাই করো। আগে চা দাও। গোরুর দুধ নাই।

গত পূর্ণিমার রাতে ভরা কোটালে গোরু ভাসিয়ে নিয়ে গেল নদীর পানি। দুইটা ছাগল ঘরে ছিল। একটাই গোরু ছিল, নদী খেল। দুইটা ছাগল দোকানদারির জন্য কোনোরকমে সামলে রেখেছি।

এখানে একা একা এই নির্জন দ্বীপে দোকান পেতে রেখেছ, অন্য কোথাও চলে যাও। একদিন না একদিন নদীর পানি ফুঁসে উঠে তোমার সর্বস্ব নিয়ে নিবে। তখন?

যাওয়ার হলে কি এই নির্জন দ্বীপে একা দোকান পেতে বসে থাকতাম? লঞ্চ যাওয়ার সময় কানসারি যাওয়ার খেয়ার যাত্রী নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। সেই লঞ্চ আবার ফেরার সময় সৈয়দ দ্বীপে আসে না। চাঁদপালের লঞ্চের সইদ দ্বীপে আসা আছে কিন্তু ফেরা নাই। কানসারির যাত্রী নামিয়ে দিয়ে লঞ্চ চলে যায়। খেয়া এই ঘাটে এলে যাত্রী চলে যায়। সেই একবারই দোকানের দান পাই। তোমার মতো কয়েকজন এলে, একটু বেচাকেনা হয়। তাহলে এট্টু চা দিই?


সৈয়দ দ্বীপে চমৎকার সর্ষের খেতের হলুদ গালিচা দেখে চোখ জুড়িয়ে নিচ্ছিল লিঙ্কা হোসেন। আর ভাবছিল, চাঁদপাল থেকে লঞ্চে আসার সময় নদীর পাড়ে জমি জুড়ে, চমৎকার সর্ষেখেতের ফুলের হলুদের সঙ্গে এখানকার হলুদের অনেক অনেক তফাত আছে। এই হলুদের মধ্যে খোদার মহিমার স্পর্শ আছে যেন। স্পর্শ আছে চমৎকার খেত সেলাইয়ের।

সৈয়দ দ্বীপের সর্ষে খেতের হলুদ বড়োই চমৎকার। কেমন শীতের কাঁথার মতো ছড়িয়ে আছে চারধার। সোঁ সোঁ বাতাসের ব্যতিক্রমী উল্লাস চারধারে, একটি বালিকার বিন্দু যেন খামারের জন্মবীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সর্ষেখেতের চারধারে ছুটে বেড়াচ্ছে লাল পোশাকের আন্দোলন। লিঙ্কা হোসেন দেখছে, বালিকা ছুটে ছুটে যাচ্ছে পাখির উড়ানের সাথে। সৈয়দ দ্বীপের আয়তনকে ছুটে ছুটে বালিকা, খাটো করে আনছে। পিছনে দোকানদারের চায়ের আয়োজনের পাত্রের ঠোকাঠুকির শব্দ ভেসে আসছে। একদিকে মানুষের সংসারের ঠোকাঠুকির শব্দ। অন্য দিকে সর্ষেখেতের বাতাসের অন্তহীন সোঁ সোঁ শব্দ বিন্যাস এনেছে ফকির অনন্তের।

লিঙ্কা হোসেন সারাজীবন ধরে, মাচা বেঁধে ক্ষেতের ফসল পাহারা দিয়েছে, খেত বুনেছে, কাঠের তক্তা পরের পর পাশাপাশি ফেলে, নৌকো বানানোর কাজ শিখেছে। সারারাত খেত পাহারায় সে আবিষ্কার করেছে, সজারু আসে ঠিক মধ্যরাতে, মাঠের ওপরে লতিয়ে থাকা কদু কুমড়া সাবার করে দিয়ে মাঠ খালি করে দিয়ে যায়। গোটা কয় আসে। পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার আলোতে ধারালো কাঁটার মতো জীব মাঠের অধিকার নেয়।

জীবনে অনেক মাঠ দেখেছে। কিন্তু এমন মাঠ জন্নতের কোথায় আছে? চমৎকার হলুদ মখমল পেতে রেখছে খোদার দরবার। লিঙ্কা হোসেনের খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, একা মানুষের হাতে যদি এমন চমৎকার মাঠ ফসলের আবাদ হয়, তাহলে পাখির ডাকে পুণ্যির ফল আসে।

নদীর ওপারে কানসারির খেয়াঘাট ধোঁয়ার মতো অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। আর দূরে বহু দূরে নৌকো কারখানার ছাওনি ও কলকারখানার চিমনি দেখা যাচ্ছে। ঘন বসতি, বাড়িঘর, নগর, মাঝে মাঝে যানবাহনের ক্ষীণ হাওয়া হর্নের শব্দ ভেসে এসে এসে সৈয়দ দ্বীপে তুলোর মতো নরম হয়ে গেছে। বড়োই মোলায়েম এই দ্বীপ। পিছনে মিয়াঁর দোকান, সামনে সর্ষেফুলের খেত, দুই পাশে নদীর প্রবাহের হু হু বাতাস।

লিঙ্কা হোসেন বুঝতে পারেনি, সৈয়দ মিয়াঁ কখন তার পিছনে দাঁড়িয়েছে, মাটির পাত্র থেকে চায়ের ধোঁয়া, ছাগলের ঘন দুধের লোমশ গন্ধ আনছে। সৈয়দ মিয়াঁর ছায়া তার শরীর জড়িয়ে যেতেই, লিঙ্কা হোসেন, পিছনে তাকিয়ে বলল— সর্ষের খেত বড়োই সোন্দর।

কানসারির বাজার থেকে খেয়ার মাঝি, সর্ষে এনে হাতে তুলে দিয়েছিল, তাই ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। যেভাবে সর্ষে ছড়িয়েছিলাম, বীজ নিজে থেকেই সারি সারি হয়ে যায়। হাতে ধরে মাটিতে পুঁতে দিলেও এত সুন্দর হয় না। কিন্তু সবই হাওয়া বাতাসের খোদার ইচ্ছা। প্রাণ ভরে দৃশ্য নাও। যারা আসে সবাই দৃশ্য নিতে জানে না। তুমি নিতে পারছ। তাই আমার অন্তর শান্তি পাচ্ছে।

সর্ষেফুলের মধ্যে কন্যা ভেসে যাচ্ছে? তোমার কন্যা মিয়াঁ?

মাঠ ফসলের।

তোমার ঘরে থাকে না?

মাঠে থাকে।

মাঠে মাঠে থাকে? ঘরদুয়ার নাই কন্যার?

এত সুন্দর সর্ষেফুলের মাঠ, এত ফুল, জগৎ সংসারে তার কি আর ঘর চাই?

লিঙ্কা হোসেন দেখছিল কানসারির ঘাট থেকে খেয়া সৈয়দ দ্বীপের দিকে আসছে। খেয়ার পিছনে কানসারি নগর ঝাপসা রেখার মতো। যে-খেয়াটি আসছে, খুব মন্থর তার গতি। আসতে চাইছে কিন্তু আসছে না এমন এমন। ভাঁটার মধ্যে নৌকোছবি যেন স্থির। মাঝে রোদের বিস্তার কেটে দিচ্ছে, খেয়ার মন্থর স্থির গতি। লিঙ্কা হোসেন উদর থেকে চাল ডালের ঢেঁকুর তুলে, খেয়ার ফেরার দৃষ্টি থেকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল সর্ষেফুলের ওপরে খেত কন্যা পাখির মতো ডানা মেলেছে।

খেয়া এসে সৈয়দ দ্বীপের শালু মিঞ্চার ঘাটপাড়ে স্থির হল। খেয়া থেকে মাঝি গণেশ মোদক চিল্লিয়ে উঠল— ক-জনা গো মিয়াঁ?

সৈয়দ মিয়াঁ উত্তর করল— মাত্র একজন। চাঁদপুরের যাত্রী নেমেছে।

কাদা শুকিয়ে উঠলে ফলার মতো খোঁচা খোঁচা হয়ে যায়। শীতকালে কাদার ফলা ধারালো হয়ে ওঠে। লিঙ্কা হোসেন সাবধানে পা ফেলে ফেলে খেয়ার মধ্যে উঠে গেল। লিঙ্কা হোসেন বলল— কানসারির ঘাটে যেতে কতক্ষণ লাগবে গো মাঝি?

গণেশ মোদক বলল— একটু অপেক্ষা করি। জোয়ার আসছে। বুঝতে পারছ না? জোয়ার এলে, খেয়া বাতাসের এক টানে চলে যাবে ওপারের ঘাটে। একটু অপেক্ষা করি। কানসারির কোথায় যাবে?

বসাকদের নৌকার কারখানায়।

কাজ আছে বুঝি? নৌকার বায়না আছে?

আমি নৌকার কারিগর। যাচ্ছি কাজের সন্ধানে।

তোমার মতো অনেক নতুন কারিগরকে সৈয়দ দ্বীপ থেকে নিয়ে গেছি কানসারির ঘাটে।


কানসারি শিল্পাঞ্চলের ইট-পাথরগুলি, রাস্তা যানবাহন, পেট্রল পাম্প, বড়ো বড়ো পেল্লাই আকাশছোঁয়া ইমারত সময়ের সঙ্গে কথা বলতে থাকল। দূরের গির্জা থেকে ঔপনিবেশিক সান্ধ্য ঘণ্টার ঢং ঢং শব্দ লিঙ্কা হোসেনের মনে চাঁদপুর ঘাটের অতীতের নৌকার কারখনার ছাউনি এঁকে দিল। কী অলস সময় ছিল। নৌকার কারখানার কাঠ তক্তা কবে যে ফুরিয়ে এল। সেই সেদিন প্রথম যেদিন কানসারি ঘাটে নেমে এসেছিল লিঙ্কা হোসেন, সেদিন কাঠ পুড়ে যাওয়ার গন্ধ তার নাকে আকুল কাজের সন্ধানের আগুন ব্যস্ততা এনে দিয়েছিল। নৌকা বানানোর কাজ তাকে জীবিকার সন্ধান দিয়েছিল। ঘাটে পড়ে ছিল কয়েকটি মাত্র খড়ের চালার মতো কুটির।

লিঙ্কা হোসেন ঘাটের একপাশে দাঁড়িয়ে দূরে দেখছিল, সৈয়দ দ্বীপটিকে। খোঁজার চেষ্টা করছিল গভীর জোয়ারে কাছিমের পিঠের মতো ভেসে থাকা সামান্য ভূমিখণ্ডকে। সৈয়দ দ্বীপ অনেক বছর হল মুছে গেছে। মাত্র কুড়ি বছরের ব্যবধানে নদী, সাগরের খারিকে আহ্বান করে এনেছে নিজের শরীরে। কত দূর দেশের জাহাজ কানসারি ঘাটে সারি সারি নোঙর ফেলেছে। আলোতে ঝলমল করছে নদীর চারধার। নাবিকরা জাহাজের খালাসি কানসারি বাজারে পণ্যের সন্ধান করছে। কেউ কেউ পতিতালয়ের রাস্তার। কানসারি ঘাটের বাজারে এখন মোহরের শব্দ। লিঙ্কা হোসেন কিং সাইজ ফরাসি হালকা সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে নিজের বাসখানার দিকে এগিয়ে গেল।

কিছুটা দূরে যেতেই লিঙ্কা হোসেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল শিপবিল্ডার্স কোম্পানির পর্তুগিজ মালিক কোলাম্বো ব্রগেঞ্জার সঙ্গে। লিঙ্কা হোসেন এগিয়ে গিয়ে সান্ধ্য অভিবাদন জানালো— গুড ইভিনিং।

কোলাম্বো ব্রগেঞ্জা বিনম্র উত্তর দিল— গুড ইভিনিং মিস্টার হোসেন।

কোলাম্বো ব্রগেঞ্জা সামান্য কয়েক পা এগিয়ে যেতেই পানামা টুপিটিকে নদীর প্রবল বাতাসে সামলে নিয়ে, হাঁটা থামিয়ে, লিঙ্কা হোসেনকে কী যেন বলতে যাচ্ছিল।

লিঙ্কা হোসেন একটুও বিলম্ব না করে, বলল— হ্যাঁ মিস্টার ব্রগেঞ্জা ডেক অফিসারকে সমস্ত নির্দেশ আমাদের সংস্থার তরফ থেকে দেওয়া আছে, এরিনা কর্পোরেশনের জাহাজ আগামীকাল ফ্লোট করছে। আপনি বিচলিত হবেন না।

ধন্যবাদ মিস্টার হোসেন।

লিঙ্কা হোসেন নিজের বাসখানার ফুলের উদ্যান অতিক্রম করে, এগিয়ে যেতে থাকল আর দেখতে থাকল আকাশে পাখির মতো উড়ে যাচ্ছে সারি সারি ডিঙি নৌকোর মিছিল।

Categories
গল্প

পাপড়ি রহমানের গল্প

জলময়ূরীর সংসার

মাদারজানি গ্রামের সকলে কালেভদ্রে কদমফুল চোখে দেখে! এ-তল্লাটেই কোনো কদমের গাছটাছ বিলকুল নাই। অথচ ঝুলমুলির কিনা খামাখাই কদমফুলের কথা স্মরণে আসে! তার সইয়েরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর ঝুলমুলির আঙুলে চোখ ধরা মেয়েটির কপালে তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আলতো টোকা মেরে যায়! ঝুলমুলি তাকে ছেড়ে দিলে সে চোখ কচলে তাকায়। কিন্তু কে তার কপালে টোকা দিয়ে গেছে সে তা কিছুতেই বলতে পারে না। এমনকী অনুমানও করতে পারে না।

ঝুলমুলি ফের অন্য একজন সইয়ের চোখ দুই হাতে আড়াল করে ডাক দেয়—

‘আয়রে আমার কদমফুল’

একই ফুলের নাম ধরে বারংবার ডাকাতে ‘ফুলটোক্কা’ খেলা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

ঝুলমুলির সইয়েরা বিরক্ত হয়। কিন্তু তা তারা প্রকাশ করতে চায় না। ফলে খেলা কেন ভুণ্ডুল হল তা ঝুলমুলিও ধরতে পারে না। সইয়েরা ঘরে ফেরার কালে আড়নয়নে ঝুলমুলির বিনুনির আগার পদ্মফুলের দুলুনি দেখে। বিকেলের মরা আলোতে ফুলটা ততক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঝুলমুলির গায়ের কুচকুচে কালো রংকে ওই ফুলটাই যেন গোলাপি আভাযুক্ত করে তুলেছে! মাদারজানির সকলেই দেখে, ছলিমুদ্দির কুচকুচে কালো মেয়েটা হঠাৎ করে গোলাপি রঙে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে!

বাঘিয়ার বিলে হঠাৎ করে এতসব ভজঘট শুরু হয় যে, ছলিমুদ্দির তৃতীয় মেয়েটির কথা মাদারজানির লোকেরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে যায়। এমনকী তার বিনুনির আগায় দেখা নেতানো পদ্মফুলের কথাও তাদের আর স্মরণ হয় না! বা হঠাৎ করে কেন তার কুচকুচে কালো মুখে গোলাপি আভা ফুটে উঠেছিল, সে-কথাও তাদের আর মনে থাকে না! অবশ্য ঝুলমুলির কথা বিস্মৃত না হয়ে তাদের উপায়ও থাকে না। কারণ, ততদিনে বাঘিয়ার বিলের পদ্মবনে নতুন কিছু পক্ষীর আগমন ঘটেছে। পানকৌড়ি, কানিবক আর ধলাবকের মাঝে ওইসব পক্ষীরা মাথা নেড়ে নেড়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের মাথায় ময়ূরের মতো ঝুঁটি আর লেজের দিকে ছড়ানো পুচ্ছও তখন নেচে ওঠে! এই পাখিগুলার গায়ে্র বরণ কোকিলের মতো কালো। কিন্তু কণ্ঠ বেসুরো! তারা পদ্মফুলের পাপড়ি খেয়ে বেঁচে থাকে। পদ্মপাতা জোড়া দিয়ে সংসার পাতে। পদ্মের বড়োসড়ো পাতার উপর তিড়িংবিড়িং করে নেচে বেড়ায়। আর জোড়া বেঁধে মিলন হলে নারী পাখিটার ডিম দিতে লাগে চব্বিশ দিন। এই চব্বিশ দিনই থাকে তার সংসারের আয়ু। ডিম পাড়া সারা হলে সংসার ফেলে অন্য পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে যায়। তখন নারীটির পরিত্যক্ত পুরুষসঙ্গীটি আর কী করে? নিয়ম করে সে-ই ডিমে তা দেয়। তা দিয়ে দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। মাদারজানির লোকেরা এমন আজব-গজব কায়-কারবার দেখে একেবারে তবদা মেরে যায়! ইতোপূর্বে এমন করে বিল জুড়ে পদ্মফুল ফুটতে তারা দেখে নাই। এমনকী ডিম না-ফুটিয়ে অন্য পুরুষের প্রতি আসক্ত পক্ষীও তারা দেখে নাই!

ঝুলমুলির চোখে বিস্ময়ের পাহাড় জমতে থাকে।

মেয়ের আনমনা ভাব লক্ষ করে আম্বিয়া খাতুন কী ভাবে সেই জানে? সে নিজ থেকেই মেয়েকে বলে— এইগুলা হইল জলময়ূরী। পানির মইদ্যে সংসার পাতে। পানিতই সংসার ভাঙে। ফের পানিতেই পয়দা দেয়। পানির ফুল খাইয়াই এরা বাঁইচা থাহে।

ঝুলমুলির চক্ষে তখন বিস্ময় গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। বাঘিয়ার বিলের রহস্য দেখতে দেখতে সে এতটাই বেভুলো হয় যে, নিজের তলপেটটা কখন ঢিবি হয়ে ওঠে সে খেয়াল করে না। ঢিবি হতে হতে ফুলে ওঠে। এতটাই ফুলে ওঠে যে, ঝুলমুলি সেই পেটের আড়ালে পড়ে যাওয়া নিজের দুইখানা পা-ও দেখতে পায় না।

আম্বিয়া খাতুন একদিন মেয়ের ওই বেঢপ পেট দেখে চমকে ওঠে!

ঝুলমুলির ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে কী ভাবে সেই জানে?

ঝুলমুলির কালো শরীরে মারের দাগ স্পষ্ট বুঝা না গেলেও কালসিটে চিহ্ন দেখে মাদারজানির লোকেরা জড়ো হয়ে যায়। ঝুলমুলিকে এমন মারধর কে করল তা জানতে তারা ছলিমুদ্দির উঠানে ভিড় জমায়। এত লোকজনের জমায়েত দেখে ঝুলমুলির মনে হয়— আইচ্ছা বিলের বাড়ন্ত পানির বেবাক কি আমাগোরে উডানে ঢুইক্যা পড়ল? নইলে এমুন কইরা ঢেউয়ের শব্দ হুনা যাইতাছে ক্যান?

ঝুলমুলি যাকে ঢেউয়ের শব্দ মনে করে তা আদতে আম্বিয়া বেগমের কান্না। মুখের ভেতর আঁচল গুঁজে দিয়ে সে চাপা কণ্ঠে কেঁদে চলে আর বলে—

হায় হায় গো! আমাগোরে এত বড়ো সব্বোনাশ কে করল গো?

অকস্মাৎ মাদারজানির লোকেদের ঝুলমুলির বিনুনির কথা মনে পড়ে। লম্বা বিনুনির আগায় ঝুলন্ত পদ্মফুলের কথা মনে পড়ে। এবং সেই সাথে তারা এটাও স্মরণ করতে পারে যে, একদা ছলিমুদ্দির কন্যা ঝুলমুলির মুখমণ্ডলে গোলাপি আভা দেখা দিয়েছিল। যার ফলে ছলিমুদ্দির কালোকিষ্টি মেয়েটা অপূর্ব লাবণ্যে ঝলমল করে উঠেছিল।


মাদারজানি গ্রামের লোকেরা যা হোক একটা কিছু বিহিতের চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয় না। ইস্কান্দারও অবশ্য প্রথম প্রথম কিছুই স্বীকার করতেই চাইল না। সেও নানান কিছুর দোহাই দিতে থাকে। যেমন—

দেইহুন তহন এমুন মাছ উজাইয়া আইল, ঝাঁকে ঝাঁক মাছ। এত মাছ! আমি তো কস্মিনকালেও এত মাছ দেহি নাই। এমুন মাছের আমদানি দেইখ্যা আমার মাথাত কিছু গণ্ডগোল পাহাইয়া থাকতে পারে। আমার কাছে তহন ওই কালি ঝুলমুলিরেই কিনা এক্করে পরি মনত অইছিল! দেইহুন মাইনষের হগল কামেই মাইনষের আত থাহে নাহি? এই যে বাঘিয়ার বিল পদ্মফুলে সয়লাব অইয়া গেল এইডাও তো আঁতকা ঘটনা মানে কুনু গায়েবী ব্যাপারেও অইতে পারে! তাই আমিও হয়তো মাছেগুলার কারবারে বা পদ্মফুলের ঘোরে পইড়া এই কামডা কইরা ফেলাইতে পারি।

মাদারজানির লোকেরা তখন একসাথে কথা বলে উঠে। এত লোক কথা বললে কিছুই বুঝার উপায় থাকে না, শুধু গমগম শব্দ শোনা যায়। আর ইস্কান্দার পলকে বুঝে যায় ঘটনা গুরতর! অবশ্য এমনও হতে পারে যে, সে হয়তো ঝুলমুলির ম্লান-মলিন-ক্লান্ত চেহারা দেখে নিজের সংযুক্তি স্বীকার করে নেয়। হয়তো ঝুলমুলির গর্ভস্থ শিশুটির জন্য তার মন দয়ার্দ্র হয়ে ওঠে। বা ঝুলমুলির নিঃশব্দ অশ্রুপাত তাকে বিচলিত করে তোলে! ইস্কান্দার নিজের সন্তানের জন্য এক অনির্বচনীয় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে ঘটনার ইতি ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সালিসি ক্রমশ নিষ্পত্তির দিকে এগোতে থাকলে জমির চেয়ারম্যান একেবারে বেঁকে বসে। ওই চালচুলাহীন ছলিমুদ্দির মেয়ে কোনোদিন তার ছেলের বউ হতে পারে না। সে ইস্কান্দারকে তেড়েফুঁড়ে মারতে গেলে গ্রামবাসী বাধা দেয়।

আরে করতাছুইন কী? ভাই না ভালা, হোনেন এইবার মাতাডা ঠান্ডা কইরা ভাইব্যা দেহুন। এহন এই মাইয়াডার গতিক কী অইব? মাইয়াডার তো জলে কুম্ভির আর ডাঙ্গায় বাঘ খাড়াইয়া রইছে। মাইয়াডা অহন যাইব কই?

লোকজনের এইসব উপযাচক কথাবার্তায় উপশম কিছু হয় না, উলটা চেয়ারম্যানের মেজাজ টঙ হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু জনরোষের ভয়ে তেমন গলা চড়ে না তার।

বাপের তোপের মুখে দাঁড়িয়ে ইস্কান্দার রা করতে পারে না। যেহেতু সেও এখনও বেকার, বিষয়টা সহসা সে একাকী সামলাতে পারবে তেমনও তার মনে হয় না। প্রায় বোবা হয়ে থাকা ইস্কান্দারকে জমির চেয়ারম্যান প্রায় হিড়িহিড়িয়ে টেনে নিয়ে যায়। কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ সে দেয় না! ইস্কান্দারও ঠিক সদ্যোজাত বাছুরের মতো বাপের পিছু পিছু হেঁটে চলে যায়। ইস্কান্দার জানে, জমির মিয়া এই বিষয় কিছুতেই মেনে নেবে না! ছলিমুদ্দির হাড়হাভাতে ঘরের ওই কালোকোলো মেয়েকে সে পুত্রবধূ রূপে কিছুতেই গ্রহণ করবে না।

জমির চেয়ারম্যান সত্য সত্যই তার রোখ থেকে এক পা-ও নড়ে না। মাদারজানির লোকেরা বিষম সংকটে পতিত হয়। এক্ষণে তারা কী করবে? ছলিমুদ্দির পাশে গ্রামের দুই/একজন দাড়িয়ে যায়। মেম্বার লস্করের পুত্র তাজুল লস্করও দাঁড়িয়ে যায়। সে-ই দুই/একজন সাংবাদিকের সাথে কথা বলে ঝুলমুলিকে মামলা ঠুকতে বলে। মামলা করার সংবাদ শুনে জমির চেয়ারম্যান রাতের অন্ধকারে ছলিমুদ্দির বাড়িতে আসে। যা হোক কিছু একটা যদি দফা রফা করা যায়— কোর্টকাছারি বড়ো হুজ্জতের ব্যাপার।

আম্বিয়া খাতুন আঁচলে মুখ ঢেকে বিনবিনিয়ে কাঁদে। এত বড়ো সব্বোনাশ কি টেকা দিয়াফয়সালা করন যায় নাহি? চেয়ারম্যান সাহেব কী কয় এইগুলা? মাইয়াডা এম্নেই কালা। এত বড়ো কলংকের পরে তারে আর বিয়া করব কেডায়?

রাগে-দুঃখে অপমানে আম্বিয়া খাতুন ঝুলমুলির পিঠে গাম্মুরগুম্মুর করে দুই ঘা বসিয়ে দেয়।

মরারশুকির কপালে কি আজরাইলও জুটে না? যা মর গিয়া। গলায় দড়ি দিয়া মর গিয়া। আমারই দুষ। আমিই তোরে আস্কারা দিয়া মাতায় উডাইছি।

ঝুলমুলি বুঝতে পারে না মা কেন তাকে মরতে বলছে? সে মারা গেলে গর্ভের বাচ্চাটার কী হবে? তাহলে তো সেও মারা যাবে।

বাংলা সিনেমায় কতবার সে দেখেছে নায়ক এসে ঠিকই নায়িকাকে উদ্ধার করে। ইস্কান্দার ঠিকই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। কিন্তু ঝুলমুলির এই আশা দিবাস্বপনের মতোই মিলিয়ে যায়। ইস্কান্দার আসে না। বদলে দুই লাখ টাকায় কিছু একটা রফা হয়। রফাটা কী হয় তা ঝুলমুলি জানতে পারে না।

আম্বিয়া খাতুনের ফোঁপানিও ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসে। আঁচল চেপে কান্নার বদলে তার মুখে পানের রস টসটস করে।


চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পাওয়া সেই দুই লাখ টাকায় তরমুজের ফলন বাড়ে। তবে এই ফলন ছলিমুদ্দির জমিতে নয়। আম্বিয়া খাতুনের বোনের ছেলে শফিকুল্লাহ সুদের বিনিময়ে ওই টাকাটা নিয়ে তরমুজের ক্ষেতিতে লাগিয়েছে। ঝুলমুলির ইজ্জতের দামে তরমুজের কালচে রূপ পরিমিত মাটি-সারে খোলতাই হয়। সবুজ সবুজ পত্র-শাখা ফনফনিয়ে বাড়ে। শফিকুল্লাহ সেদিকে তাকিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলে!

এইবার ফলন ভালো অইলে খালুজানরে সুদের কিছু টেকা বেশি দিয়া আইমু। বাচ্চাডার খায়-খইরচা আছে। মাইয়াডাও ঘাড়ের উপর চাইপ্যা আছে।

ঝুলমুলির কোলে কুসুমকলি খলখলিয়ে হাসে। কুসুমকলির উচ্ছ্বল হাসির মাঝেই মাদারজানিতে ফের বাদলার কাল এসে পড়ে। আসমান ফুটো করে অবিরাম জল ঝরে পড়ে। আর বাঘিয়ার বিলে জল থইথই করে। কচুরিপানার বেগুনি রঙের ঘোর পাশ কাটিয়ে এন্তার পদ্মফুলও ফোটে। মাদারজানির জোয়ান ছেলে-ছোকরারা ফের জাল-পলো-বঁড়শি নিয়ে বিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেম্বারের তাগড়া ছেলে তাজুল লস্কর কই-শিঙ্গির ঝাঁক তুলে খালুই ভরে ফেলে। কই-শিঙ্গির সাথে সে কিছু ভুতকিয়া মাছ জালে তোলে। ওই ভুতকিয়া মাছ মারার কোন ফাঁকে জলে ডুব দিয়ে সে একটা পদ্মফুলও তুলে আনে। সেদিন ঝুলমুলির লম্বা বিনুনির আগায় ফের গোলাপি রঙের আভা দেখা দেয়।

মাদারজানির লোকেরা চমকে ওঠে! তাদের পলকে মনে পড়ে যায় ঝুলমুলির কন্যা কুসুমকলি জন্মানোর পূর্বে তারা এ-মতো দৃশ্য দেখেছিল!

বাঘিয়ার বিলের জলস্তম্ভ দেখে ঝুলমুলি ফের উদাস হয়। ঢেউয়ের পর ঢেউ দেখে সে আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকে। এবার তার বিনুনির আগায় ঘন ঘন পদ্মফুলের শোভা দেখা যায়। এর কয়েকদিন বাদেই চেয়ারম্যান বাড়িতে আচনক শিশুর কান্না শোনা যায়। শিশুর কান্না শুনে মাদারজানির লোকেরা উন্মুখ হয়ে ওই বাড়ির দিকে ধাবিত হয়।

একদিন মেম্বারের ছেলে তাজুল লস্করকে মাদারজানির কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এদিকে ছলিমুদ্দির কন্যা ঝুলমুলিকেও কোথাও কেউ দেখে না।

বাঘিয়ার বিলে আগের মতোই ঢেউয়ের পর ঢেউ ওঠে। ঢেউয়েরা যখন ভেঙে পড়ে তখন পদ্মফুলের ছেঁড়াখোঁড়া পাপড়ি ভাসতে দেখা যায়। আর পদ্মের বিশাল বিশাল সবুজ পাতার উপর জলময়ূরীরা আনন্দিত চিত্তে নেচে বেড়ায়…

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

পাপড়ি রহমানের গল্প

জলময়ূরীর সংসার

জামগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দুই পা সামনে ছড়িয়ে বসেছিল ঝুলমুলি। তার চোখের সামনে বাঘিয়ার বিলের থইথই জলরাশি। হাওয়া বেগে বইলে সমস্ত বিল যেন মুহূর্তে দুলে ওঠে। তারপর তারা ঢেউ হয়। ইয়া বড়ো বড়ো মস্তপানা ঢেউ। ঢেউ হয়, আর ছুটে যায় দূরে, বহুদূর। একেবারে দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে। এ-মতো দৃশ্য শুধুমাত্র বাদলার কালেই দেখা যায়। উইন্যার মরশুমে কাদাপ্যাকলার রাজত্ব। তখন বিলের রুগ্ন চেহারা। কিছু জলজ উদ্ভিদ বেঁচে থাকার আশায় আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে। কিছু শাদা ঘাস তখন মাথাডগা বের করে ভালো করে দুনিয়া দেখতে চায়। এই ঘাসেরা বাদলার কালে জলের তলায় ডুবে থেকে নিজেদের সবুজ বরণ খুইয়ে বসে আছে। এতক্ষণে দুনিয়াদারি দেখতে দেখতে ফের তারা সবুজ হয়ে উঠবে। ফের তারা তরতরিয়ে বিস্তার করে চলবে নিজেদের বংশ। বাঘিয়ার বিলের এমন রকমসকম ঝুলমুলি কোমরে কালোতাগা বাঁধা অবস্থা থেকেই দেখে এসেছে। রোগবালাই দূরে রাখার জন্য মা একটা কালোতাগা ঝুলমুলির কোমরে বেধে দিত। তাগার সঙ্গে একটা ছোট্ট ঘুঙ্ঘুট। উঠানময় দৌড়ে বেড়ানোর সময় ওই ঘুঙ্ঘুট টুংটুং করে বেজে যেত। আর মা আম্বিয়া খাতুন কাজ ফেলে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত ঝুলমুলির উদোম গতর— মেয়েটার গায়ের রং মাজা হবে। গরিবের সংসারে কালো মেয়ের বড়ো অনাদর। কালো মেয়ে পরের ঘরে বিদায় করা বড়ো ঝক্কির। টিভি, মোটরসাইকেল দিতে চাইলেও কালো মেয়ের বাজারদর চড়া হয় না। সেরকম পাত্রও জোটে না। যদিও-বা জোটে তাও ম্যালাই দাবিদাওয়া নিয়ে হাজির হয় তারা! টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেলের সঙ্গে মোটা অঙ্কের যৌতুক দাবি করে বসে। ঝুলমুলির মা মেয়ের উদ্দাম চলা দেখেও তাই খুশি হতে পারত না। মনে শঙ্কা বাসা বাধত— কাইল্যা মাইয়াডারে পার করুম কেমতে?

কিন্তু ঝুলমুলির মায়ের নানান আশঙ্কা সত্ত্বেও ঝুলমুলি বড়ো হতে থাকে। তার দেহে লাবণ্য এসে হামলে পড়ে আর ঝুলমুলি সেয়ানা হয়ে ওঠে। আম্বিয়া খাতুনের মেয়ের এই ঝলমলে ছিরিছাঁদ দেখে মনে মনে আঁতকে ওঠে—

মরারশুকির গতরে য্যান বাইস্যা মাসের নয়া পানির মাছেগো খলবলানি। এত উজাইও না গো মা-জননী! বেশি উজাইলে বোয়াল মাছের প্যাডের ভিতর চইল্যা যাইবা, নইলে শইল মাছ তুমারে গিল্যা খাইব। তহন আর বারাইতে পারবা না। মাছের প্যাডের ভিতরের মাছ কবে আর তার নিজের পরান ফিরত পাইছে?।

না, আম্বিয়া খাতুন এমন ভাবে, কিন্তু তার ভাবনা সে মনের লাটাইয়ে পেঁচিয়ে রাখে। এই লাটাইয়ের সুতার সন্ধান সে কিছুতেই দেবে না ঝুলমুলিকে। দিলে মেয়েটা আর নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে পারবে না। তার বাড়বাড়ন্ত বাধাগ্রস্ত হবে। মেয়েটা অন্তত নিজের মতো করে বেড়ে উঠুক। জমিনে শুয়ে থাকা মিষ্টিকুমড়ার ডগা যেমন আপন গতিতেই বাড়ে, লকলকিয়ে তরতরিয়ে বাড়ে— ঝুলমুলি না হয় তেমনিভাবেই বেড়ে উঠুক। আম্বিয়া খাতুন এমন ভাবে, কিন্তু ছলিমুদ্দি এমন ভাবে না, বা ভাবতে পারে না। এর আগে দুই মেয়ে মঞ্জুলি আর ফুলকলি যখন সেয়ানা হয়েছিল, তখনও সে এমন ভাবে নাই। বা ভাবতে পারে নাই। দুই মেয়ের বিয়ে দিতে হালের চারটা বলদ ছলিমুদ্দিকে বিক্রি করতে হয়েছিল। গোয়াল ঘরের দিকে তাকালে আজও তার দুই নয়ন জলে ভরে যায়। গোরু বিক্রির টাকায় একটা হাতঘড়ি আর টেলিভিশন দেয়া গিয়েছিল। বাকি টাকায় ছেলেপক্ষকে শাদাভাতে গোরুর মাংসের সুরুয়া ঢেলে কোনোরকমে খাওয়ানো গেছে। এ নিয়ে মঞ্জুলি আর ফুলকলির শ্বশুরবাড়ি কম কথা শোনায় নাই!

‘মুরগার রুস্টের কতা কি আবার কইয়া বইল্যা নিতে অয় নাহি? বেবাক বিয়াতেই তো এইগুলা আকছার খাওন দেয়।’

ছলিমুদ্দি রা করতে গিয়েও যেন গিলে ফেলেছে। কষ্টেমষ্টে নিজেকে সামলেছে। মাইয়ার বাপ অইলে নীচা অইয়া থাকতে অয়! নীচা মাইনষেগো এত রাওউও করলে চলে নাহি?

নীচা মাইনষেগো মাতাডা আরও নীচা কইরা রাহন নাগে। মাতাডা মাটির লগে মিসমার কইরা রাহন নাগে। ছলিমুদ্দি তাই নীচা কইরাই রাখে নিজের মাথাডা। নীচাই রাখতে চায়। কিন্তু তাও কি মঞ্জুলি আর ফুলকলির সুখ মেলে? মেলে না! ছলিমুদ্দি তো কম চেষ্টা চালায় নাই। কথা সত্য, মুরগার রোস্ট সে খাওয়াতে পারে নাই। জনা পঞ্চাশেক লোক খাওয়ার পরেই মাংসের হাড়িতে টান পরে যায়। কিন্তু কী-ই-বা করবে ছলিমুদ্দি?

ভালো কোম্পানির টেলিভিশনের দাম তো তার একটা বলদ বিক্রির দামের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কাল্লা, ধলা, লাল্লি আর সফেদাকে বিক্রি করতে গিয়ে ছলিমুদ্দির বুক ফেটে গিয়েছে। ছলিমুদ্দির ঘরদোর এতদিনে শূন্য-ময়দান। সহায়-সম্পত্তির খুদকুঁড়োও কোথাও পড়ে নাই। দিনমান হা হা করে ছলিমুদ্দির দুয়ার-আঙিনা। বাঁশঝাড়ে হাওয়া জোরে বইলে মনে হয়, কে যেন কেঁদে চলেছে! কে যেন গুনগুনিয়ে অথচ গোপনে কেঁদেই চলে। ছলিমুদ্দির মন মিথ্যে বলে না বা হয়তো তার কানও ভুল শো্নে না। কাল্লা, ধলা, লাল্লি, সফেদার হাম্বা হাম্বা রবের সাথে মঞ্জুলি আর ফুলকলিও গলা মিলিয়ে কাঁদে। ছলিমুদ্দির কানে তেমনভাবেই পৌঁছায়। ছলিমুদ্দি ইদানীং মানুষ আর জন্তুর বিভেদ করতে পারে না। সে কীভাবেই-বা বিভেদ করবে? ছলিমুদ্দির কাছে তো মানুষ আর জন্তুর মূল্য প্রায় সমান কাতারে। আর তার ঘরদোরও শূন্য ময়দান। কাল্লা, ধলা, লাল্লি, সফেদার সাথে সাথে মঞ্জুলি আর ফুলকলিও তার চোখের আড়ালে চলে গেছে! এটা ভেবেও ছলিমুদ্দি্রমন বড়ো বেচান হয়।

‘যাগো এত্তদিন বুকে ধইরা আগলাইয়াছি, হেরা দেহি বেবাকেই আমারে ফালায়া থুইয়া গেলগা! আমার কুনদিহে লাভ কিডা অইল? আমার আপনার আর থাকল কী? লাল্লির চক্ষু দুইটা দিয়া ক্যামতে যে পানি পড়বার নাগছিল! বুবা জানোয়ার, কিছু কইয়া যাইতে পারে নাই। মাইয়া দুইটার চক্ষু দিয়া পানি পড়বার নাগছিল, হেরাও তো আমারে ভালা কি মন্দ কি কুনু কতাই কইয়া গেল না!’

এ-সব ভেবে ভেবে কোনো কোনো রাতে ছলিমুদ্দি একেবারে বেঘোর কেঁদে ওঠে। তখন হয়তো আম্বিয়া খাতুনের ঘুম ভেঙে যায়। ছলিমুদ্দি তখন জোর করে কান্নার ফুঁপানি বন্ধ করতে চায়, কিন্তু দম ফুরিয়ে যাবার মতো করে নতুন কান্না তাকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। আম্বিয়া খাতুন পরম মমতায় সোয়ামির পিঠে হাত রাখে। ধীরে ধীরে আঙুল বুলিয়ে বলে—

‘কীয়ের নাইগ্যা আফনে কাইন্দা মইরুন কন তো? হারাদিন তো ভালাই থাহুন। রাইত অইলেই কি জন্মের দুস্ক আফনেরে সজাগ কইরা তুলে? কীয়ের দুস্কে আফনে কাইন্দুন এমুন কইরা?’

ছলিমুদ্দি তখন বউয়ের এতসব প্রশ্নের জবাব দেবার অবস্থায় থাকে না। এত দুঃখ গলায় চেপে রেখে কোন মানুষই-বা কথা বলতে পারে? ছলিমুদ্দি আম্বিয়া খাতুনের উপর মনে মনে বিরক্ত হয়—

‘কীয়ের সোমসার যে আমি করি? হেয় তো বেবাকই জানে আর বুঝে, তাও কী না আমারে জিগায়? ঘুইরা ফিরা পত্যি আমার দুস্ক তালাশ করে! এই যে আমাগোরে বাড়িঘর, উঠান সব কেমতে ধূ ধূ ময়দান অইয়া গেল হের তালাশি তার মনে নাইক্কা। কিমুন বেহুশি মাইয়ানুক! যে কুনুদিন অন্তরের ভাও বুঝে না হের লগে জনমভর সোমাসার কেমতে করে মাইনষে?’

ছলিমুদ্দির অবিশ্রাম অথচ লুকানো কান্নার খোঁজখবর না করেই আম্বিয়া খাতুন ফের ঘুমে মরে যায়। নাকি দুম করে ঘুম এসে তাকে মেরে ফেলে? খানিক আগেই যে টসটসিয়ে কথা বলল, ভালোমন্দের খবরবার্তা জানতে চাইল, তার এমন আঁতকা ঘুমিয়ে পড়া দেখে ছলিমুদ্দির কান্না ফুরিয়ে যায়। ছলিমুদ্দি অনুভব করে, তার সকল কান্না কেমন ধুন্দুমার মিলিয়ে গেছে! তখন হয়তো পূবের আকাশে সামান্য শাদা শাদা আলো ফুটে উঠছে। ওই শাদাটে আলোর নীচে উঠানের জোয়ান শিউলি গাছটা বেশুমার ফুলেদের পাপড়ি মেলে দিয়েছে। ততক্ষণে আম্বিয়া খাতুনের খোঁয়াড়ের বড়ো রাতাটাও জেগে উঠেছে! জেগে উঠে ঘাড়ের কালো-সোনালি-খয়েরি রঙা পালক ফুলিয়ে সূর্যোদয়ের প্রথম বাগ দিচ্ছে।

এইবার আষাঢ় নামার সঙ্গে সঙ্গেই বাঘিয়ার বিলে জল একেবারে উপচে উঠতে লাগল। ঝুলমুলি বিলের এরকম বাড়-বাড়ন্ত রূপ ম্যালাদিন চক্ষে দেখে নাই। ঝুলমুলি দেখেছে, লিলুয়া বাতাসে বিলের ছোটো ছোটো ঢেউদের জেগে উঠতে। তারপর তারা মৃদুমন্দ গতিতে, আয়েশ করে ক্রমশ সরে গেছে তীরের দিকে। অথবা ঢেউদের বুকের ভেতর, ঢেউদের শরীরের ভিতর দুলে দুলে মিশে যেতে। কিন্তু এইবার বাদলার জল ঝরে পড়ামাত্রই বিলের চেহারা গেল আমূল পালটে! স্বচ্ছ জলের স্তম্ভ ভেঙেচুরে চক্ষে একেবারে ধান্দা লাগিয়ে দিল। বাঘিয়ার বিলে রুই-কাতলা আর মৃগেলের পাখনা-লেজের ঝাপটানিতে রুপালি ঝিলিক উঠল ঘনঘন। শিঙ্গি-মাগুর আর পুঁটির ঘাঁইয়ে বুরবুরি উঠতে লাগল পার ঘেঁষে। ফি বছর শাদা শাদা এন্তার শাপলার মাঝে কিছু বেগুনি পানার ফুল অনাহূতের মতো তাকিয়ে থাকে। এবার কি না একেবারে অন্য দৃশ্য! পদ্মফুলের বড়ো বড়ো পাতা ছাতার মতো ভেসে রইল বিলের চারধারে। আর ফুটল অগণন ফুল। শাদা শাপলার ফুটে থাকাকে ম্লান করে পদ্মের গোলাপি আভা ঢেকে দিল স্বচ্ছ জলের বিস্তীর্ণ চাদর। ঝুলমুলির চক্ষে বিস্ময় আর ধরে না! আচানক এতকিছু দেখে শুনে তার মাথাটাও যেন আর আগের মতো কাজ করে না!

‘ই-ই-রে! এইডা কুন জমানা আইল? এতকাল দেখতাছি এই বিলের ছুরত! আইজ কুন কারণে হে্র ছুরত বদলায়া যায় রে? কত মাছের ঝাইকের খলবলানি আর ল্যাজ নাড়ানি দেইখ্যাই না সিয়ান অইলাম, অহন কিনা দেখি মাছগুলান ফাল দিয়া টানে উইঠা আইবার চায়! জাল ফেলাইলেই অহন খালুই ভইরা নেওন যাইব মনে লয়! বঁড়শিতে আদার দিলেই টপাটপ মাছ উইডা আইব!’

ঝুলমুলির আন্দাজ একেবারে মিথ্যে নয়। ছলিমুদ্দি এর মাঝে জাল ফেলে খালুই দুই মাছ নিয়ে গেছে। মাদারজানির মানুষজন ঝাপ্পুরঝুপ্পুর করে মাছ ধরার কায়দা-কানুন আবিষ্কার করে চলেছে।

ঝুলমুলির চক্ষু ভরা বিস্ময়ের মাঝে মাদারজানির জোয়ান ছেলে-ছোকরারাও জাল ফেলে। বঁড়শিতে আদার দিয়ে টপাটপ মাছ টানে তুলে আনে। ওই দলে জমির চেয়ারম্যানের পুত্র ইস্কান্দারকেও দেখা যায়, সে-ও জলে নেমে খুইয়া জালে কইয়ের ঝাঁক তুলে আনে। মাছগুলার লাফালাফির ফাঁকে খুব সন্তর্পনে একটা পদ্মফুলও উপড়ে আনে সে। ওই পদ্মফুল শোভা পেতে দেখা যায় ঝুলমুলির লম্বা বিনুনির আগায়।

ইস্কান্দারের তুলে আনা পদ্মফুল কোন ফাঁকে-বা কেন ঝুলমুলি বিনুনির শোভা বাড়ায় তা কেউ খেয়াল করে না। এমনকী আম্বিয়া খাতুন ও ছলিমুদ্দির চোখেও তা পড়ে না। ঝুলমুলির কালো মুখে কোথা থেকে যেন হলদেটে আলোর ছটা এসে পড়ে! ঝুলমুলির সইয়েরা বহুদিন বাদে তাকে ‘ফুলটোক্কা’ খেলতে দেখে। এক সইয়ের চোখ দুই হাতের আঙুলে ভালো করে চেপে ধরে ঝু্লমুলি ডাক ছাড়ে—

টাপটুপানি লোহারকাঠি
বৃন্দাবনে টিয়াপাখি
ছুটলোরে ছুট!
কচুর পাতা হলদি
ছুঁইয়া আয় জলদি
কোন ঘরে চোর গেছে ‘সাবধান!’

বলেই জোরে ডাক দেয়—
‘আয়রে আমার কদমফুল!’

শেষ পাতা