Categories
গল্প

মুক্তিপ্রকাশ রায়ের গল্প

দাগ

অমল গোমড়া মুখে বসে ছিল। দেওয়ালে একটা হিজিবিজি দাগের দিকে তাকিয়ে। দেখলেই বোঝা যায় কোনো বাচ্চা প্যাস্টেল হাতে ইচ্ছেমতো ইকড়ি-মিকড়ি কেটেছে। আধুনিক কোনো সমালোচকের কাছে অ্যাবস্ট্রাক্টস চিত্রকলা হিসেবে এর কদর হতে পারে;

Categories
গল্প

শান্তনু ভট্টাচার্যর গল্প

হেমন্তের জোছনাবেলা

তিনি: এ-ক-শো বছর! এই একশো বছরে পৃথিবীতে কী কী হতে পারত বলে আপনার মনে হয়, যেগুলো হয়নি?

আপনি: এই গ্রহের সব মানুষ ক্রমশ দীর্ঘ হতে-হতে শেষে দৈত্যাকৃতি হয়ে উঠতে পারত, অথবা সবাই ধীরে ধীরে খর্বাকৃতি হতে-হতে শেষ অবধি হয়ে পড়তে পারত একেবারে পোকাতুল্য।… কোনো এক কারণে মনের আনন্দে সব মানুষ এমন হেসে উঠতে পারত, যে-হাসি একশো বছরেও থামত না, কিংবা কোনো নিদারুণ দুঃখে প্রত্যেকটা মানুষ এমন কেঁদে ফেলতে পারত, যে-কান্না থামত না একশো বছরেও! তারপর…

তিনি: তারপর?

আপনি: দেখুন, যে-শব্দটা আমি একেবারেই পছন্দ করি না, সেই ‘তারপর’ শব্দটাই আবার এসে গেল। ‘এসে গেল’ বলাটা ভুল; এসে যাচ্ছে, এসে যায়! সত্যি বলতে কী, শব্দটাকে আমি এখনও ভীষণ ঘৃণা করি।

বাতাস বইছে। সিক্ত বাতাস। বাতাসে মিশে আছে কুয়াশা। এমন বাতাস নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যায়। হয়তো অনেক বছর আগে এখানে একটা নদী ছিল। গলায় গান নিয়ে সে-নদীর বুকে নৌকো বেয়ে যেত মাঝিমাল্লারা। কুয়াশা জড়ানো ভিজে বাতাস বয়ে যেত নদীর ওপর দিয়ে। সেই নদীটা এখন নেই। কিন্তু সেই নদী-বাতাস রয়ে গেছে এখনও!

তুমি: ঠিক কোন সময়ে আপনি চেয়ারের গুরুত্ব বুঝেছিলেন, আজ তা মনে আছে?

আপনি: সালটা মনে নেই। ওটা গুরুত্বপূর্ণও নয়। তবে তারিখটা মনে আছে— ৩৩শে ফেব্রুয়ারি।

তুমি: ফেব্রুয়ারি মাসের ৩৩ তারিখ!

আপনি: বোকার মতো অবাক হয়ো না। অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় এটা নয়। ফেব্রুয়ারি মাসটা নিয়ে কখনো ভেবেছ! সবচেয়ে ছোটো এই মাসটা, অথচ কী সুন্দর! সেই সুন্দর মাসটাকে অহেতুক ছোটো করে রাখা হয়েছে। মানুষের তো এটা বিরাট ভুল! আমি সেই ভুলটা সংশোধন করেছি, পরের পাঁচটা মাস থেকে একটা করে দিন টেনে এনে। তোমাকেও বলছি, ভুলটা সংশোধন করার চেষ্টা করো।

তুমি: এই ভুল-সংশোধনের সিদ্ধান্তটা কি ওই কালো চেয়ারে বসে নিয়েছিলেন?

আপনি: আজ আর তা মনে পরে না, জানো— চার দেওয়ালের মধ্যে বসে, নাকি খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে নিয়ে ফেলেছিলাম ওই মূল্যবান সিদ্ধান্তটা। তবে, আশ্চর্যজনকভাবে এটা মনে আছে, যখন সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম, তখন আমার গায়ে একটা চাদর জড়ানো ছিল। যদিও সে-দিন শহরে খু-ব শীত ছিল কি না, আজ আর তা মনে নেই। এখনও স্পষ্ট মনে আছে, গায়ের সেই চাদরটা ছিল লাল রঙের। মৃত্যুর সময় লেনোর মুখ থেকে যে-লাল রঙের রক্ত বেরিয়ে এসেছিল, সেই লাল!… লেনোর মৃত্যুতে আমার মনে এখন আর কোনো শোক নেই, তবে আক্ষেপ আছে— আমার আক্ষেপ ওর শরীর থেকে বেরিয়ে আসা ওই রক্তটুকু নিয়ে। ওই কয়েক ফোঁটা রক্ত না-বেরিয়ে এলে আমি ওর শরীরটা ওষুধ মাখিয়ে রেখে দিতাম একটা কাচের বাক্সে। সবাই এসে দেখত। একটা ইতিহাস নির্মাণ হত!

তুমি: ইতিহাস ছাড়া মানুষ আর ঠিক কী কী নির্মাণ করতে পারে?

আপনি: মানুষ আদপে কোনো কিছুই নির্মাণ করতে পারে না‌। অনেক কিছু নির্মাণের চেষ্টা করে এবং অনিবার্যভাবে ব্যর্থ হয়। তার চরম ব্যর্থতা ইতিহাস নির্মাণে, কারণ ওই কাজে মানুষের চেষ্টা সবচেয়ে বেশি।… শুধু দুটো সত্য সে ঠিকঠাক নির্মাণ করে— প্রথমত, একটা দিন ও দ্বিতীয়ত, একটা রাত। অনেক পরিশ্রমের বিনিময়ে মানুষ এই নির্মাণ-কৌশল আয়ত্ত করেছে। অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে মানুষ তো বুঝে ফেলেছে, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দিন-রাত্রি নির্মাণের এই কৌশল আয়ত্ত না করে তার আর কোনো উপায় নেই!

তুমি: দিন ও রাত!… আচ্ছা, দিন-রাতের সর্বোত্তম সংজ্ঞাটা কি আপনি খুঁজে পেয়েছেন, কিংবা চেষ্টা করেছেন নিজে নির্মাণ করতে?

আপনি: না। খুঁজেও পাইনি, নির্মাণের চেষ্টাও করিনি। ব্রজ বসু মানা করেছিলেন। বলেছিলেন, দিন-রাতের সংজ্ঞা নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন এক কাজ। এতে জীবন দগ্ধ হবার সম্ভাবনা আছে— এ-কথা শোনার পর আমি আর এগোইনি।

তুমি: ব্রজ বসু! আপনি যাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সময় বদলের সংকল্প করেছিলেন?

আপনি: হঁ— তবে সময় বদলের নয়, সময়কে ছোঁয়ায়। এবং তা সংকল্প নয়, তা ছিল প্রকল্প!

তুমি: প্রকল্প?

আপনি: প্রকল্প। প্রজেক্ট। মানুষ খুঁজে, তার দাম মেপে, দামের মূল্যে স্থান নির্ধারণ করে, সময়কে ছুঁয়ে দেখার অতি বৈজ্ঞানিক এক প্রকল্প।

বাতাস বইছে। উষ্ণ বাতাস। বাতাসে লেগে আছে তাপ। এমন বাতাস মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যায়। বহু যুগ আগে হয়তো এখানে ছিল এক মরুভূমি! বেদুইনদের ক্ষিপ্র পদক্ষেপে বালি উড়ত এখানে। তাপ লেগে থাকা উষ্ণ বাতাস বয়ে যেত মরুতলের ওপর দিয়ে। এখন সেই মরুভূমি নেই। কিন্তু এখনও রয়ে গেছে সেই মরু-বাতাস!

: আমরা এখন ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি বলো তো?

: আমরা তো দাঁড়িয়ে নেই।

: তাহলে কি আমরা হাঁটছি?

: জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় পর্ব— হাঁটা। হাঁটা মানেই তো কোনো এক গন্তব্য! এখন প্রশ্ন, কোথায় সেই গহিন গন্তব্য-বলয়?

: আমরা কি গন্তব্য হারিয়ে ফেলেছি?

: আমাদের কি এমন কোনো গন্তব্য ছিল, যা হারিয়ে গেছে?

: হয়তো ছিল এক ধ্রুব-গন্তব্য! ছিল এক দিক, এক দিশা!

: কিংবা ছিল শুধুই এক মেঘচিহ্ন!

: চিহ্ন! চিহ্নটাই রয়ে যায়।

: শেষ অবধি চিহ্নটাও থাকে না। চিহ্নটা মুছে গিয়ে রয়ে যায় একটা ক্ষত।

: ক্ষতটা মোছে না!

: ঠিক। ক্ষতটা মোছে না সময়ের বুক থেকে, মানুষের মন থেকেও না।

: এই ক্ষত ধারণ করে রাখার জন্য আমরা কি আমাদের মনটাকে অনেক আগেই মজবুত ধাতবে নির্মাণ করে নিয়েছিলাম?

: তুমি খুব সুন্দর করে ‘নির্মাণ’ শব্দটা উচ্চারণ করলে। শব্দটাকে আমরা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারছি না, তাই-না!

: আমরা কি আমাদের সেই মনটাকে আজ আর ছুঁয়ে দেখতে চাই না?

: কী পদ্ধতিতে আমরা আমাদের জীবন, আমাদের সময়, আমাদের চারপাশ, এবং আমাদের সেই মনটাকে নির্মাণ করেছিলাম, তা তোমার মনে পড়ে?

: মনে পড়া— মানে স্মৃতি!… তা যদি বলো, তাহলে বলতে হয়, হ্যাঁ, কিছু স্মৃতি সংগ্রহে আছে বটে; বহু কষ্টে, চেষ্টায় আগলে রেখেছি। বলতে পারো, লুঠ হবার ভয়ে ভরে রেখেছি গুপ্ত সিন্দুকে।

: খুব দামি একটা কথা বললে— এটা আমিও অনুভব করছি যে, একটু একটু করে আমার স্মৃতি লুঠ হয়ে যাচ্ছে। আমি প্রতিহত করতে পারছি না লুঠেরাদের। বুঝতে পারছি, ক্রমশ গরিব হয়ে যাচ্ছি আমি।… একটা গুপ্ত সিন্দুক আমাকেও সংগ্রহ করতে হবে, এখনও রয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে আগলে রাখতে।

: লুঠেরাদের চিনতে পারছ তুমি?

: হ্যাঁ, সবাইকে চিনি আমি। আমার প্রত্যেকটা সাফল্যকে যারা সবচেয়ে আগে কুর্ণিশ জানায়, আমার প্রত্যেকটা দুঃখের ওপর যারা মাখিয়ে দেয় সান্ত্বনার প্রলেপ, যারা উৎসাহের উষ্ণতা দেয় আমার প্রত্যেকটা ব্যর্থতার গায়ে, আমার প্রত্যেকটা ভুলকে যারা স্বীকৃতি জানায় ভবিষ্যতের আগাম পন্থা বলে, আমার প্রত্যেকটা বিপন্নতাকে যারা মুছে দেয় সাহস যুগিয়ে, তারাই একটু একটু করে লুঠে নিচ্ছে আমার মহার্ঘ স্মৃতিগুলো।

: সেই চিহ্নটা আবার ফিরে আসছে— যাকে ‘গন্তব্য’, কিংবা ‘দিক’, বা ‘দিশা’, যা-ই বলো! মানুষ যত সেদিকে এগোয়, ততই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় তার প্রতিপক্ষরা। অধিকাংশ সময়েই সাফল্যের নেশায় ও দৌড়ানোর ক্লান্তিতে সে চিনতে পারে না, তারা কে কাছের, কে দূরের‌।

: আসলে কিছু মানুষ, কিংবা হয়তো সব মানুষই, তার গন্তব্যটা নির্ধারণ করতে পারে না— দিক খুঁজে পায় না চলার পথে— দিশা হারিয়ে ফেলে হাঁটতে-হাঁটতে। বুঝতেই পারে না, একটা মেঘচিহ্নকে খোঁজার চেষ্টায় তার জন্য বরাদ্দ সময়টাকে সে ক্রমশ ক্ষয় করে ফেলছে তার নিজের হাতে। গন্তব্য, দিক, দিশা বলে সম্ভবত কিছু হয় না! এটা নিছকই এক অলীক মাইলস্টোন, যার পরেও অনন্ত হাঁটাপথ।

বাতাস থেমে গেছে। ভুল বলা হল— থামেনি, অন্য ধারায় বইছে। অচেনা ধারায় বয়ে চলা এ-বাতাস এক অদৃশ্য বর্ণ বহন করে— এই জাফরানি-বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছি আমি। ত্বকের ওপর এমন এক অনুভূতি হচ্ছে, যা আগে কখনো হয়নি বলেই মনে হয়।

এখন আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, কীসের গন্ধ বলো তো?

তুমি হয়তো বলবে, বারুদের।

সম্ভবত আমি তখন হতাশ হব; বলব, ইস, দেখেছ, এই চেনা গন্ধটাও আমি বুঝতে পারিনি!

বুঝতে না-পারার ব্যর্থতা থেকে বোধহয় আমি তখন চুপ হয়ে যাব। আমার নীরবতা নিশ্চুপ করে দেবে তোমাকেও। থেমে যাবে আমাদের যাবতীয় বিশুদ্ধ আলাপন।… ভুল বলা হল, থামা নয়— অসমাপ্ত রইবে। ‘থামা’ শব্দটা ভালো নয়, ‘অসমাপ্ত’ কথাটার মধ্যে একটা সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, যার রং সোনালি। সোনালি সম্ভাবনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে আরও তিনটি শব্দ— ক্ষমতা, আধিপত্য, এবং প্রেম।

বড়ো রহস্যময় এই শেষ শব্দটি! এটা নাকি প্রাণীদেহের এক বিশেষ অনুভূতি, যা মস্তিষ্কের গোপন অন্ধকারে ছড়িয়ে থাকা সূক্ষ্ম কোষের ভেতর অবিরত বয়ে চলা লাল রক্তে মিশিয়ে দেয় সাদা কুয়াশা। মনোবিকারের তা নাকি এক চূড়ান্ত পর্ব!

প্রেমকে বরং বাদ দেওয়া যাক। এই মহাপৃথিবীতে কত যুদ্ধ হয়ে গেছে প্রেমকে কেন্দ্র করে, আর যুদ্ধ মানেই তো বারুদ!… বারুদের গন্ধ বাতাস বইতে পারে না— আমরা, স্বপ্নবাহী নীল মানুষেরা ‘ক্ষমতা’ আর ‘আধিপত্য’ শব্দ দুটোকে বহন করতে-করতে এটা তো খানিকটা বুঝেছি— কী বলো?

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

শান্তনু ভট্টাচার্যর গল্প

হেমন্তের জোছনাবেলা

বাতাস বইছে। জোলো বাতাস। বাতাসে মিশে আছে শীত। এমন বাতাস সমুদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। হয়তো বহু যুগ আগে এখানে কোনো সমুদ্র ছিল! সেই সমুদ্রের বুকে নিয়ত জেগে থাকত প্রবল ঢেউ,

Categories
গল্প

সুজয় পালের গল্প

মনশোকরহিতা

“প্রত্নকীর্তিমপাবৃনু” এটি আমাদের ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের মোটো বা নীতিবাক্য; আপাবৃনু অর্থে উন্মোচন বোঝায়, আর আমি ঘরে বসে বসে এইসব ‘আগডুম বাগডুম’ ভাবছি। এই শব্দটার সাথে মনে পরে গেলো ছেলে ভোলানো ছড়াটার কথা— “আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে, ঢাল মৃদঙ্গ ঘাগর বাজে। বাজতে বাজতে চলল ঢুলি, ঢুলি গেল ওই কমলাফুলি”… তারপর কিছু একটা ‘বিয়েটা’ ছিল মনে পরছিল না, আর সাথে সাথে মনে পড়ল ভারতীয় জাদুঘরের গ্রন্থ বিভাগের গ্রন্থাগারিক সচিব ডঃ দেবনাথ স্যারের কথা। তিনি আমাকে এই ছড়াটার ব্যাখ্যা করেছিলেন।
শাশাঙ্কের পরে গৌড়ের দায়িত্ব নেন পুষ্যভূতি বংশীয় রাজা হর্ষবর্ধন ও কামরূপের বর্মনরাজ শ্রীকুমার ভাস্করবর্মন কিন্তু রাজধানী কর্ণসুবর্ণ থেকে তাঁদের নিজস্ব রাজধানী অনেক দূরে থাকায় সম্পূর্ণ শাসন ব্যাবস্থা শিথিল হয়ে পড়ে, এই মাৎস্যন্যায় কালে প্রথমে বঙ্গ অধিকার করে খর্গরাজারা তারপর শক্তভাবে সিংহাসনে বসেন পালরাজা গোপাল আনুমানিক ৭৫০ সালে, ধর্মপাল ও দেবপালের সময় কীভাবে কনৌজ অধিকার করে পাল রাজারা সেটা আমরা সবাই খুব ভালো মতোই জানি। পরবর্তী সময়ে বংশ গৌরব ক্রমশ শিথিল হয় আর অন্তর্দ্বন্দ্ব তুমুলে ওঠে দ্বিতীয় মহীপালের সময় আনুমানিক ১০৭২ সালে। পশ্চিমের বারেন্দ্রভূমী দখলের সাথে মল্ল রাজাদের চাপ ও বাড়তে থাকে তাই রাজধানী কানসোনা থেকে কামরূপের কাছে আত্রেয়ী ও তিস্তা নিদী ঘেরা দোয়াব অঞ্চলে ডোমনে স্থানান্তরিত করেন, ইতিমধ্যে কামরূপে বর্মণ রাজাদের সরিয়ে রাজত্ব চালাচ্ছে পৌরাণিক নরকাসুর বংশভূত ম্লেচ্ছ বংশীয় রাজারা অর্থাৎ এই অঞ্চলে রাজধানী অনেক বেশি সুরক্ষিত। বর্তমান বাংলাদেশের আসাম লাগোয়া উত্তরের জেলায় নীলফামারীর একটি উপজেলার নাম ডোমার, এরই আগের নাম ছিল ডোমন নগর। সন্ধাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ গ্রন্থে দেখতে পাই কীভাবে দ্বিতীয় মহীপাল সামরিক গৌরবে স্বল্পকালীন রাজত্ব করেছিলেন; ডোমন রাজ্যের সৈন্যদের বলা হতে ডোম সৈন্য যার বলে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন নিজেরই ভাই রামপালের বিরুদ্ধে, কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। সমগ্র পালবংশের রাজা হন রামপাল। এই ডোম সৈন্যদের সাহায্যে তিনি মল্লরাজ প্রকাশমল্ল ও সেনরাজ বিজয়সেনকে বহুবার পরাজিত করেছিলেন। কোনো কোনো গবেষক অনুমান করেন ছড়াটিতে ওই ডোম সৈন্যদের শোভাযাত্রা বা যুদ্ধযাত্রার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ‘আগডুম’ অর্থাৎ যে ডোমসৈন্য বাহিনী সবার আগে যায়, ‘বাগডুম’ হল যুদ্ধ কৌশলে সহজে বাগ মানাতে পারা সৈন্যদল, আর ‘ঘোড়াডুম’ হলে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ডোমসৈন্য। সঙ্গে বাজে তিন ধরনের যুদ্ধবাদ্য—ঢাক, মৃদঙ্গ এবং ঘাগর বা ঝাঁঝর। মধ্যযুগের ধর্মমঙ্গলেও ডোম সৈন্যদের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

ছেলে ভোলানো ছড়াতে প্রথম ছত্র দু-টিতে বেশ একটা বীরত্বের ছোঁয়া লেগে আছে, কিন্তু পরের ছত্রগুলো কিছু উৎসবমুখর পরিবেশ। মনে হয় দুটো পৃথক ছবিকে কেটে একসঙ্গে জোড়া দেওয়া হয়েছে ছায়াচ্ছন্ন মোহময় এক পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে, তবেই না ছেলে ভুলবে। পালরাজাদের কীর্তির কথা চিন্তা করতে গিয়ে মনে পড়ল; পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ আর তাঁদের সুবর্নযুগে তৈরিহয়েছিল অসংখ্য বৌদ্ধবিহার ও মঠ। রাজা ধর্মপাল বৌদ্ধধর্মের এক মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ওদন্তপুরী মঠ ও বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মের একটি মহান শিক্ষণ কেন্দ্র হিসাবে বিকশিত হয়েছিল। তাঁর সময়েই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বিখ্যাত সোমপুরা মহাবিহার যা ভারত ভূখণ্ডের সর্ব বৃহৎ বিহার হিসাবে আজও অধুনা বাংলাদেশের নওগাঁ জেলা পাহাড়পুরে বর্তমান। এই সময়ে আমরা পেয়েছিলাম বিখ্যাত বৌদ্ধ মহাগুরু চুরাশী-মাহাসিদ্ধগণকে যাঁদের সান্ধ্য ভাষায় লেখা চর্যাচর্যবিনিশ্চয় ও ডাকার্ণব আমরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পড়েছিলাম। আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীতে বঙ্গপ্রদেশে মাহাসিদ্ধ মহাগুরু সরহ পা নালন্দা থেকে শিক্ষা সম্পূর্ণ করে এক অভিনব বৌদ্ধদর্শন মতবাদ প্রবর্তন করেন যা বর্তমানে বজ্রযানদের মাহামুদ্রা হিসাবে বহুল প্রসিদ্ধ।

ইত্যাদি চিন্তনের মাধ্যমে বজ্রের ন্যায় প্রত্যুৎপন্নমতিতে মাথায় এল দেবী মূর্তির মুকুটে ওই যোগীমূর্তির কথা, একহাত কোলে রেখে অন্য হাতে তিনি বরমুদ্রা প্রদর্শন করছেন, তিনি যে কোন সাধারণ যোগী নন; স্বয়ং ধ্যানীবুদ্ধ আমোঘসিদ্ধি। কথাটা মনে পড়তেই আমার মানসপটে এক এক করে সব পরিষ্কার হতে থাকল। দেবী মূর্তির সামনের মুখ্য দুই হাতে বজ্রহুংকার মুদ্রায় অবশ্যই ছিল বজ্র ও পাশ, আর অন্য ভগ্ন হাতে ছিল মন ও দেহ শোক হরণকারী অশোকমঞ্জরী, দেবীর পোষাকের ওইগুলো ময়ূরের পালক নয় বরং গভীর শিরাবিন্যাসযুক্ত পাতা, দেবীর পদতলে থাকা ওই মানুষের অবয়ব হল বিঘ্ন-মারি, তিনি বহুল প্রসিদ্ধ আমোঘসিদ্ধি কুলজাত দেবী পর্ণশবরী।
তৎকালীন সময়ে দুরারোগ্য ব্যাধি হতে মুক্তিপেতে সঙ্ঘে দেবীর উচ্চাঙ্গ মন্ত্রপাঠ ও বহুল ভেষজ সমিধ-সহ হোম করা হত, মনে করা হয় মন্ত্রের কম্পাঙ্ক ও হোমের ধোঁয়াতে পরিশুদ্ধ হত বায়ুমণ্ডল। বয্রযানের গঠনমূলক সময়ে বহু বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবতার বিকাশ হয় বঙ্গভুমে সাথে অজস্রও মূর্তিও খোদাই হয় বিভিন্ন বিহারের উপাসনা ও সৌন্দর্যায়নের নিমিত্তে। আর সাথে এটাও সিদ্ধান্তে এলাম ওই লিপি কূটাক্ষর না বরং বৌদ্ধআদি লিপি-সিদ্ধমাতৃকা, যার প্রচলন সুদূর সময়ে চলেছিল শুধু জ্ঞানসিদ্ধ সংরক্ষণের জন্য। অচিরেই মানচিত্র দেখে বুঝলাম প্রাপ্তিস্থল থেকে খুব কাছে আছে সেই বিখ্যাত সোমপুর মহাবিহার। নির্বিঘ্নে পায় হেঁটে দু-দিনেই চলে আসার মতো পথ, তৎকালীন যুগে খুব একটা অসুবিধার ছিল বলে মনে হয় না। তবে কি সেখান থেকেই দেবিমূর্তিকে কেউ নিয়ে এসেছে? যা অতি গোপনে পূজিতা হয়েছিলেন কোনো গুপ্তসিদ্ধগণ দ্বারা। অনুমান করতে দ্বিধা হয় না যে আনুমানিক ১১৬০ সালের দিকে বল্লাল সেন পালরাজাদের সম্পূর্ণ পরাস্ত করেছিলেন হিন্দুদের সাহায্যে, আর সাথে চলেছিল বৌদ্ধবিহারের সাথে অসহিস্নুতা, সম্ভবত এরম কোন সময়ে ওই মূর্তি কালের গ্রাসে চলে যায়। অনেক বিশেষজ্ঞ হিন্দু শীতলা দেবীর সাথে দেবী পর্ণশবরীর সামঞ্জস্যতা খুঁজে পান, মহামারির কালে শীতলাপুজার লগ্নে অপ্সরা রূপে দেবীর আগমন কি শুভ হেতু?

আজ এই অতিমারির দিনে যখন মানুষ তাঁর স্বাবাবিক সত্তাকে অস্বীকার করে ক্রমশ নিম্নপথে সমাজস্রোতের বিপক্ষে ছুটে চলেছে, শিক্ষার তকমা অশিক্ষিতদের কাছে হার মানছে, বিজ্ঞান যখন অজ্ঞতার বশীভূত, অযোগ্য যখন যোগ্যপদে আভিষিক্ত, সামাজিক দায়িত্ব যাঁদের হাতে তাঁরা নাট্যমঞ্চের কুশীলব সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের কি? উচিত না নতুন করে পৃথিবীটাকে নতুন চিন্তায় সুন্দর করে তুলি! কিন্তু সেই আমি নির্বিকার— ক্রমশ নিজের অস্তিত্বকে আলোকভেদী জলের মতো মনে করি; প্রদত্তপাত্রের আধারের আকৃতি ধারণ করি, আর বিশেষ আধারের অনুপস্থিতিতে ঘনীভূত হয়ে আত্মকেন্দ্রিক গোলক রচনা করি।

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

সুজয় পালের গল্প

মনশোকরহিতা

মেট্রো করে বাড়ি ফেরার পথে খেয়াল করলাম জনসংখ্যা অনেকটাই কম, সম্ভবত এই ভরদুপুর বলে, ইতিমধ্যে কানে এল ভাইরাস সংক্রমণের সতর্কীকরণ ঘোষণা। শরীরের সমতাপমাত্রা যুক্তজলে স্নান করলে যেমন শরীর বোঝে না ঘটনাটা, তেমনই আমিও বুঝতে পারছিলাম না কী করা উচিত বা না। বাড়ি এসে যথারীতি সবাই মশগুল পিসির বাড়ির পুজো নিয়ে গপ্প করতে, আমাদেরও গৃহদেবতা শীতলা আর তাই নিয়ে বাবা মা দু-জনেই গল্পের পসরা খুলল খেতে বসে। ঈশ্বর কী অদ্ভুত জিনিস, তার চিন্তাতে লোকে বাস্তব থেকে কতটাই না কল্পনার জগতে চলে যেতে পারে, এতক্ষণে কেউ প্রশ্ন করল না কেমন হয়েছে ইন্টার্ভিউ, যাকগে, যা হয় মঙ্গলের জন্যই হয়।

আমার কিন্তু একটা মঙ্গল হয়েছে, সরকার থেকে জানিয়েছে সামনের দুই সপ্তাহ ছুটি, বড়ো আপসোস হল দু-দিন আরও কাটিয়ে আসলে ভালো হত, আগামী রবিবার তো বন্ধই থাকবে সব; তারপরে আসলে ওই মূর্তিটা আবার খুঁটিয়ে দেখতাম। মূর্তির কথা মনে পরতেই মোবাইল খুলে ভালো করে দেখছিলাম, পোষাল না কম্পিউটারে ছবিটা বড়ো করে দেখলাম। ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ছবিটা কিছু বিশিষ্ট লোকজনকেও পাঠালাম, যারা এইসব নিয়ে পড়াশোনা করে। নিউজ-ফিডে আবার সতর্কবার্তা ভেসে এল, সাথে মৃত্যুর সংখ্যাও।
এখন সারা ভারতবর্ষব্যাপী বনধ্ ঘোষণা হয়েছে, তবুও বিক্ষিপ্ত জনসংখ্যা চারদিকে বেরিয়ে পড়ছে ইতস্তত, পুলিশ নাজেহাল সামলাতে, সাধারণ মানুষ নির্বোধের মতো আচরণ করছে, দীর্ঘ কর্ম ব্যাস্ততার মাঝে হটাৎ করে একটা এত বড়ো শূন্য সময় পেয়ে বস্তুত সবাই গুলিয়ে ফেলেছেন রোজনামচার সূচিপত্র। এই সময়টা নিজের ঘরে থেকে খুব কাছ থেকে নিজেকে চেনার, এই সময়টা নিজের ঘরে থেকে নিজের অতীতকে আবার ফিরে পাওয়ার, এই সময়টা নিজের ঘরে থেকে যাবতীয় পূর্বত্রুটি সংশোধনের, একমাত্র; এই সময়টাই নিজের ঘরে থেকে সারা পৃথিবীর মানুষের মঙ্গলার্থে, খুব সাধারণ কথাগুলো কেউ বুঝতেই চাইছে না। চারদিকে বেড়ে চলেছে রাশি রাশি মৃত্যু, আমারা যেন এখন পালন করছি এক অদৃশ্য মৃত্যুচক্রের ব্রত। সত্তার দুই দিক; জন্ম ও অজন্ম, চিরকাল তারা হরিহর আত্মা হয়ে মিলে মিশে আছে; মৃত্যু শুধু তাদের মেলবন্ধন করে।

এখন বাড়ি থেকে বেরোতে ভয় লাগছে। আবার বাইরের কেউ বাড়িতে এলেও ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকছি আমরা। সব যোগাযোগ বন্ধ, এই বুঝি সংক্রমিত হয়ে পড়লাম! এই আতঙ্কে কাটছে কিছুদিন ধরেই। কত রকম হোমিওপ্যাথি, ভেষজ, টোটকা, কবজ মাদুলি বা কোনো বিশিষ্ট জ্ঞানীদের বিশেষ নিরাময়য় পদ্ধতি দেখে খুব রাগ তারপর দুঃখ ও অন্তে মায়া হল, মনে মনে বললাম ‘মূর্খ ভারতবাসীও আমার ভাই’।
বিজ্ঞানের কি অগ্রগতি বা অজ্ঞগতি এইসবের আগে দরকার সামাজিক শিক্ষা; মানুষ মানুষকে মানুষ বলে চিনবে, থাকবে সামাজিক সাম্য। কোথায় এ-সব, এর মধ্যেই সাম্প্রদায়ীকতার তকমা লেগে গেল রোগের মধ্যে। আমাদের বাংলায় আমরা “যত মত তত পথ” শুনে বড়ো হলেও নিজেদের স্বাভাব, চরিত্র আর সংস্কৃতি বরাবর অপরেরটাই যেন অনুকরণ করতে পছন্দ করি, এরম বহু উদাহরণ জেনেও কালচারাল ফিউশন বলে আত্মতুষ্টি অনুভব করি, কিন্তু নির্বোধের মতো অপর ধর্মকে ছোটো করতে মন্তব্য করি এক দফা। কেউ পরেছিলেন কাঁটা মুকুট, কেউ নিয়েছিলেন বিষবান, খ্রীষ্ট আর ইষ্ট সবই তো সমান। প্রাচীন সাধুদের কথা গ্রন্থে পড়েছিলাম, ম্যাক্সমুলার যখন ঠাকুরের জীবনী লেখেন তখন প্রতাপ মজুমদার তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলেন, “রামকৃষ্ণ ভালো লোক ছিলেন। কিন্তু শেষের দিকে তিনি prostitute ও drunkard-দের সঙ্গে মিশে mixed up হয়ে যান”। ম্যাক্সমুলার শুনে আনন্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে বলেন, “এতেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি অবতার। যীশুও ঐভাবে পতিতাদের উদ্ধার করেছেন”। কথাটা বুকে বেঁধেছিল, সত্যইতো যদি পাথর যোনিতে জন্মাতে হত তবে আকার কী হত? যদি জন্ম হতে বেজন্মা হতাম তবে ধর্ম কী হত?

বেশ কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল, এই অবস্থায় নিজের আর পরিবারের সকলকে সুস্থ রাখতে আপমর প্রচেষ্টায় সারাবিশ্ব। ঘরে বসে সুস্থ স্বাভাবিক খাবার ও দৈনন্দিন অভ্যসের এক গাদা ফর্দ ধরিয়েছেন মানবকল্যাণে যা এই দুঃসময়ে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতাকেও শক্তিশালী করে তুলবে।সেই ফর্দে আছে কাঁচা হলুদের ও নাম, এতে ‘কারকিউমিন’ নামক একটি যৌগের গুণে সমৃদ্ধ। এটি নানা ধরনের প্রদাহ কমায়। আমরা ভারতীয়রা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হলুদ ব্যাবহার করে থাকি বিভিন্ন সংস্কার আর আচারে। প্রাচীন সমাজব্যাবস্থা কত সহজ আর সরল ছিল, অজানেতেই কত কিছু আরোপ করেছে মানবকল্যাণে, যেমনটা ধরুন এই শেতলার হাতে ঝ্যাঁটা আর জলভরা কলসি, ব্যাপারটা যদি এভাবে ভাবা যায় বসন্তকালে যদি সমাজ পরিষ্কার রাখা যায় তবে বসন্তরোগ থেকে মুক্তি। কী অদ্ভুত! এই করোনার জন্যও তো এরমই নির্দেশনা দিচ্ছে W.H.O। প্রাচীন কালের ভালো মানুষগুলো বিজ্ঞানী না হলেও দার্শনিক ছিলেন সে সন্দেহ নেই, দেশ বিদেশ থেকে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতেন বহু বিদেশী, যেমনটা এখন আমরা যাই বিদেশে পড়তে। এই একটা প্রমাণই যথেষ্ট ভারতের আকরহানীর ও ভারতীয় সমাজের চরম অবমাননার। বহু যুগ ধরে ক্ষমতার শীর্ষে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপোষণ ও সহজে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির মাশুল গুনছি, ঘরে বসে। যোগ্য পদে অযোগ্য প্রতিস্থাপনের ফলে সর্বত্র এক হাহাকার চলছে, মানুষ রোগের থেকে বেশি দারিদ্র্যতার ক্ষোভে মরছে। এই অতিমারি বিপদেও লোকে ধর্মের সংঘর্ষ, রাজনৈতিক কটুক্তি, চাল চুরি, আর্থিক সাহায্য লুট চালিয়ে যাচ্ছে, আর শ্রমিকশ্রেণির জন্য চুড়ান্ত অসহযোগিতা সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি, খবরের মাধ্যমে আজ আর খবর নেই আছে একরাশ সত্যিকারের অজস্র সাজানো ঘটনা। আমরা আর মানুষনেই, ভগবান এবার এসে নিঃস্ব করুক সবাইকে, ধ্বংস হোক তোষণবাদী সমাজ।

যত ঘন কালো মেঘ তত বেশি বজ্রপাত, সারা পৃথিবীব্যাপী মৃত্যুহার ক্রমশ বেড়ে চলছে। খবরের কাগজে পড়লাম ‘প্রতিষেধক তৈরির প্রতিযোগিতায় প্রথম চারে আগেই নাম তুলেছে আমেরিকা, চিন, গ্রেটব্রিটেন ও জার্মানি। এবার নতুন সংযোজন ইটালি। তবে তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবদেহের উপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হতে আরও কিছুদিনের অপেক্ষা। ইটালির গবেষকদের দাবি, তাঁরা এমন একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন, যা কিনা মানবকোষে নোভেল করোনা ভাইরাসের কার্যকলাপ নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। রোমে সংক্রামক ব্যাধির জন্য থাকা বিশেষ হাসপাতাল স্পাল্লানজ়ানিতে ইঁদুরের উপরে অ্যানিম্যাল ট্রায়াল সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। ভ্যাকসিন প্রয়োগে দেখা গিয়েছে, ইঁদুরের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশা, মানুষের শরীরেও একইভাবে কাজ দেবে প্রতিষেধকটি’। খুবই খুশির খবর, যখন আমাদের দেশে সবাই দাঙ্গা করে মরছে তখন করোনা রুখতে সম্ভাব্য চিকিৎসার তালিকায় রয়েছে আমেরিকার ওষুধ ‘রেমডেসিভিয়ার’, ব্রিটেনের ‘চ্যাডক্স ১’ ভ্যাকসিন। ‘ইটালির গবেষক দলটির সঙ্গে যুক্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার সিইও লুইজি আউরিজ়িক্কিয়ো-র কথায়, ‘‘সম্ভাব্য প্রতিষেধক আরও রয়েছে। কিন্তু আমাদের মতো এতটা অগ্রগতি মনে হয় না আর কেউ করেছে।’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘ভাইরাসটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার কাজটা আমরাই প্রথম করে দেখালাম। আশা করছি, মানুষের দেহেও এটি একইভাবে কাজ করবে।’’ আউরিজ়িক্কিয়ো জানান, এই গরমের পরেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হবে। সেই জন্য জোরকদমে প্রস্তুতি চালাচ্ছেন তাঁরা। ইটালির নিজস্ব গবেষকদল ও প্রযুক্তির সাহায্যে ভ্যাকসিনটি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও ইটালিতে দেশের মানুষের উপরেই করা হবে। তবে তিনি জানা নেই, তাঁদের গবেষণা সম্পূর্ণ সফল হলে, গোটা বিশ্বকেই ব্যবহার করতে দেওয়া হবে তা’।

তবে এর থেকেও বেশি খুশি হয়েছি প্রকৃতির পরিবর্তনের জন্য, দীর্ঘকাল ধরে মানব সভ্যতার অসভ্যতার গ্রাসে যে-বন্যপ্রাণ তটস্থ ছিল; তারা এখন স্বাধীন আর মুক্তহয়ে সর্বত্র ঘুরে বেরাচ্ছে, বায়ুর দূষণকনা মুক্ত হয়ে আকাশ নিযুত নক্ষত্রের রাজবেশ পরেছে, মেরুপ্রদেশের ওজন গহ্বর লোপ পেয়েছে, পশ্চিমের সন্ধ্যাতারা যেন শতগুণে উজ্জ্বল হয়ে প্রকৃতির বিজয়কেতন ওড়াচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের কাজে জীবজগৎ ও উদ্ভিদ জগতের পরিবেশের সামঞ্জস্য বাস্তববিদ্যার প্রয়োজনে বাস্তব্যবিদ্যা-বিশেষজ্ঞগণ ২০০৭ সালে ‘Earth Hour’ মডেলের কথা বলেছিলেন। এটি বিশ্বব্যাপী আন্দোলন যা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (WWF) দ্বারা আয়োজিত হয়। এই ইভেন্টটি প্রতিবছর মার্চ মাসের শেষ শনিবারে রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার জন্য অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ করতে উৎসাহিত করে গ্রহের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক নির্দেশ করাবে মানবসমাজকে। আমরা এইসব ভাবধারা কতজনে জানি তা সন্দেহ, আর জানলেও মানি না, মানতে পারি না, মানতে দেওয়া হয় না। আমাদের দেশে সেইসবই মানা হয় যা ভোট বাক্স বাড়াবে, ভাবতেও অবাক লাগে স্বয়ং বুদ্ধদেব সঙ্ঘের অধ্যক্ষ নির্বাচণের জন্য নাকি এই ভোট ব্যবস্থা করেছিলেন। আর আজ দেখো কী হাল! আমাদের আবার উচিত বিজ্ঞানের সাথে আবার দর্শনশাস্ত্রের পড়াশোনা শুরু করা, ১৯৭০ নাগাদ রসায়নবিদ জেমস লাভলক ও মাইক্রোবায়োলজিস্ট লিন মারগুলিস এক দর্শনতত্ত্ব শিখিয়েছিলেন বিশ্বকে— ‘The Gaia hypothesis’। বলা হয়েছিল, জীবিত উদ্ভিদ ও প্রাণীরা পৃথিবীতে তাদের অজৈবপরিবেশের সাথে যোগাযোগ করে একটি অতিক্রিয়া এবং স্ব-নিয়ন্ত্রক, জটিল ব্যবস্থা তৈরি করে যা গ্রহের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অবস্থাকে বজায় রাখতে এবং স্থায়ী করতে সহায়তা করে। প্রকৃতি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিজস্ব মতামতে চলে, পৃথিবীতে সমস্ত ঘটনা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র যা প্রকৃতির ইচ্ছানুযায়ী চলে; এর ওপর কারো কোনো হাত নেই। টেকনোলজির মোহমায়ায় অন্ধ হয়ে আমরা বলেছিলাম, বিজ্ঞানের সর্বোচ্চস্থিতিবাদ, সমস্ত দার্শনিকদের চিন্তায় বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছিলাম স্বেচ্ছাচারে, আজ তার অভিশাপে আমরা আছাড় খেয়ে পরেছি, এখনও সংযত না হলে হয়তো আরও রুদ্রমূর্তি দেখাবে প্রকৃতি।

তেমন কোনো কাজ না থাকায় আত্মীয়পরিজন ও প্রিয়জনদের ফোন করে খবর নিচ্ছি, সদ্য ফেলে আসা গৌড়ের কথা মনে করে পিসির বাড়ি ফোন করলাম, সব কিছুই কুশল মঙ্গল ওদের, তেমন নাকি রোগ ছড়ায়নি কিন্তু ওই মূর্তিটাকে নিয়ে নাকি অল্পবিস্তর সাম্প্রদায়িক কুটিলভাব ছরিয়েছে, অনেকে দাবিও করেছে মসজিদের গর্ভ খুঁড়ে মন্দিরটা বার করতে। তবে পুলিশের সুচারু পদক্ষেপে সব তুষের আগুনের মতো চাপা পরেগেছে। আবার ওই মূর্তিটার কথা মাথায় এলো, যাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম কেউই তেমন স্পষ্ট বলতে পারল না বা বলতে চাইল না। এবার নিজেই বসলাম দেখতে, প্রথমে মূর্তিটার ভাঙাটা দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল, তারপর যখন দেখেছিলাম সেটা শুধু তাকানো ছিল, তার সাথে মন বা মস্তিষ্কের সংযোগ ছিল না। কোনো কিছুকে দেখতে গেলে মনের সংযোগ খুবই প্রয়োজন, এখন অনেক সময় নিয়ে দেখতে হবে, পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দেবী মূর্তি নাচের ভঙ্গিমাতে পদ্মমণ্ডলের ওপর একটা ছোট্ট মানুষের অবয়বের ওপর দাঁড়ানো, কোমরে যে কাপর পরানো তাতে ময়ূরের পালকের মতো কিছু রেখা বোঝা যাচ্ছে, অধিকাংশ হাত ভাঙা, বুকের কাছে সম্ভবত দুটো হাত ছিল; ভগ্নসংযুক্তি স্পষ্ট, ডানদিকের দুটো হাতের নীচেরটা গোটা তাতে কুঠার ধরা, ওপরটা তির ধরা ছিল কারণ, বামদিকের নীচের এক হাতে ধনুক ধরা, অপরটা কব্জির পর থেকে নেই, সাথে চালের অনেকটা ভাঙা। কাঁধ থেকে আবার ওই ময়ূরের পালকের মতো রেখা, কাদামাটির জন্য সূক্ষ্ম রেখাগুলো প্রায় অস্পষ্ট কিন্তু দেবীর ভ্রূকুটি কুটিল ত্রিনেত্র আর দেবীর তিনটি মুখ যার বামদিকেরটা ভাঙা, মাথার মুকুটে অলঙ্করণ স্পষ্ট আর তাতে ফল, ফুল, একজন যোগীমূর্তি, আর আবার ওই ময়ূরের পালক। মূর্তির পিছনে কিছু লেখা; লেখাটা সংস্কৃত না, ভালো করে দেখলাম সেটা কুটিল লিপি। মূর্তির আদলতা দেখে স্পষ্ট হলাম এটা কোনো তান্ত্রিক দেবীমূর্তি। কিন্তু বাংলায় তান্ত্রিক দেবীমূর্তির এরম কোনো রূপ দেখেছি বলে মনে পড়ে না, তার ওপর কুটিলাক্ষর বহুল প্রচলিত ছিল দক্ষিণপূর্ব বাংলার নাথ, রাত ও খর্গ রাজাদের লিপিতে এবং ভাস্করবর্মার নিধানপুর-তাম্রশাসনে কুটিল লিপির প্রচলন ঘটে কামরূপ প্রদেশেও, আর সেই সময়ে তান্ত্রিক মূর্তির ততটা বিকাশ লাভ হয়নি।

শেষ পাতা

Categories
গল্প

সুজয় পালের গল্প

মনশোকরহিতা

সারাদিন পর ঢাকঢোল বাজিয়ে পূর্ণাহুতির মাধ্যমে শীতলাপূজা শেষ হল, ঠাকুরমশাই বেশ গর্বের সাথে বললেন, “লিন, এ বসরের মতো শেতলাষ্টমীর মায়ের পুজো নির্ভিগ্নে শেষ হোলো,

Categories
গল্প

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

প্রত্যাশা নিরোধক

ধ্রুবর কোনোদিনও প্রত্যাশা ছিল না। আমার মনে প্রত্যাশা জন্মাক— তাও চায়নি। অথচ আমি অসাবধানে প্রত্যাশাধারণ করে ফেললাম। রাতে একা ছাদে বসে বসে নিজেকে বোঝাতাম, “আসলে কেউ কাউকে ভালোবাসিস না। প্রথম প্রথম, তাই ঘোর লাগছে। নেশা… অ্যাডিক্ট হয়ে গেছিস। বেরিয়ে আয়… না হলে এরপর বাংলা সিরিয়ালের মতো হবে। আজ গিফটের কথায় ইমোশনাল হয়েছিস, কাল অন্য কোনো কারণে হবি। ঠিক ততটাই সময়ে চেয়ে বসবি যতটা ধ্রুব ওর পরিবারকে দেয়… ন্যাকামো এবং শয়তানী একসাথে করা হবে সেটা!”

আসলে, আজকাল ধ্রুবকে সত্যিই খুব চালাক মনে হয়। ওর ইমোশনাল উইকনেস নেই। নিজের জীবনের স্বাদ বদলাতেই আমাকে এভাবে অ্যাপ্রোচ করেছিল— অসমবয়সী বন্ধু, হেলদি রিলেশনশিপ। আর পরিণত বয়সের ইন্টেলেকচুয়াল, ইমপ্রেসিভ ব্যক্তিত্বদের প্রতি আমার দুর্বলতা আমাকে মারল। ধ্রুব আমার কাছে অবশ্যই এমন কিছু… যা সমবয়সী কোনো পুরুষ-বন্ধু কোনোদিন হতে পারেনি।

“You who suffer because you love, love still more. To die of love, is to live by it.”

— তুমি আমার কাছে ফাদার-ফিগার নও… আর আমিও তোমার মেয়ের মতো নই। তাহলে সমস্যাটা কোথায় বলো তো?

— বাবার মতো, মেয়ের মতো… এ-সব লেবেলিং না থাকলে কনসার্ন ফুরিয়ে যায় না।

— ও… কনসার্ন?! কেমন কনসার্ন শুনি? পেশেন্টের জন্য ডাক্তারের? না… কনসার্নটা ঠিক কেমন… হেল্প মি?

— তোকে এখন যা-ই বলব… ভুল মানে করবি। তিক্ততা বাড়বে।

— না, তুমিই তো বলছ কনসার্নের কথা। কোনোভাবে আমি কনসিভ করলে এই কনসার্নটা থাকত তো? আর আমি অ্যাবর্ট করতে না চাইলে?

আসতে আসতে অনেক কিছুই অপছন্দ হচ্ছিল মানুষটার। জড়াতে চাইছিলাম না… অথচ প্রত্যাশাটা ঘন হচ্ছিল। অনেকদিন পর দেখা হলে লম্বা একটা ইন্টারকোর্স… দু-তরফে কাঙ্ক্ষিত অর্গ্যাজম। তারপরেই ও উঠে বসে সিগারেট ধরাত, অথবা মোবাইলে ম্যাসেজ দেখতে শুরু করত। যেন ক্লায়েন্ট, মিটে গেছে… এবার আমি চাইলে কিছুক্ষণ থাকতে পারি, না হলে আসতে পারি। নিজেকে ডিট্যাচ করার চেষ্টাও করছিলাম… ভাবতে পারিনি এভাবে একটা ধাক্কা আসবে। দু-তিন দিন কনডম না ব্যবহার করার জন্য ওকে দোষ দিইনি… ইচ্ছে আমারও ছিল। কিন্তু যখন কাঁধে মাথা রেখে জানতে চাইলাম, “টেস্ট পজিটিভ এলে কী করবে?”… নিরাসক্ত ভাবে বলল, “কেন? অ্যাবর্ট করে দেবে?”

কোনো সংকোচ নেই… দ্বিধা নেই… রাস্তার ধারে গাছের ডাল ছেঁটে দেওয়ার মতো কোল্ড অ্যান্ড ইজি সলিউশন।

তুমি তো জানতে আমার ওভারিয়াল সিস্টের কথা? তুমি তো জানতে আমাকে ডিপ্রেশনের জন্য ওষুধ খেতে হয়? ডাক্তার ধ্রুব… তখন কোথায় ছিল তোমার কনসার্ন?

একটা আপাত উষ্ণ মনের মানুষকে এমন বেনিয়া ক্লায়েন্টের মতো ঠান্ডা মাপা উত্তর দিতে দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। ডাক্তারি করতে করতে কি সবরকম কাটা-ছেঁড়াতেই এরা সাবলীল হয়ে যায়?

সেদিন ফিরে এসে দুটো ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম… প্রায় এক সপ্তাহ রোজ ঘুমের ওষুধ খেতে হত। বাবা আলাদা থাকা শুরু করার পর বাড়িতে লুকিয়ে যার কাছে কাউনসেলিং করতে যেতাম… আবার তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম। আবার অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট, নার্ভের ওষুধ— এ-সব দিল। তাকে সব কথা ভেঙে বলতে পারিনি… একটা কাল্পনিক বয়ফ্রেন্ডের নামে দোষ চাপিয়ে দিলাম। দুঃস্বপ্ন দেখা, হাত কাঁপা, ইনসিকিওরিটি— এ-সব বললাম।

ধ্রুবর মতো কারো জন্য নিজের জীবনের স্বাভাবিকতা নষ্ট করছি— এটা ভেবে সব থেকে বেশি রাগ হত নিজের ওপর।

কলকাতার বাইরে পিএইচডি করতে যাচ্ছি— জানিয়েছিলাম ধ্রুবকে। আমার এই স্পেসটা দরকার ছিল… শুধু ধ্রুব না, চেনা জানা সবার থেকে… সবকিছুর থেকে। ইচ্ছে করেই কলকাতার বাইরে অ্যাপ্লাই করলাম। খুব সাফোকেটিং লাগছিল চারপাশের সবকিছু। একরকম মোনোটোনাস মানুষগুলোকে। অসহ্য লাগছিল বোনকে, মাকে। মনে-প্রাণে চাইছিলাম পালিয়ে যেতে।

ধ্রুব বারণ করল না। শুধু বলল— তুই বুঝবি না, জানি। বাট আই রিয়েলি ফিল ওরিড ফর ইয়ু। দূরে থাকবি, একা থাকবি… দুশ্চিন্তা হবে— কেউ না কেউ তোকে এক্সপ্লয়েট করছে। কোনো না কোনোভাবে তুই ব্যথা পাচ্ছিস।

“এক্সপ্লয়েট তুমিও করেছ ধ্রুব। ব্যথাও দিয়েছ… ব্যথা দিতে ভালোই লাগত তোমার।”— এ-সব চেপে রেখে বললাম, “ও সব ফালতু চিন্তা ছাড়ো। হাজারটা ছেলেমেয়ে পড়তে যাচ্ছে। নো বিগ ডিল। যাদের চিন্তা করার তাদের জন্য করো।”

ধ্রুব কথা বাড়াল না। যোগাযোগ রাখার জন্যে জোরও করল না। শুধু বলল, “খোঁজখবর রাখিস… এলে জানাস। কিছুই তো তোর অজানা নয়।”

ফর আ চেঞ্জ… সেদিন আমরা ক্লিনিকে না, দেখা করতে গেছিলাম বাগ বাজার ঘাটের ওদিকে। পিএইচডি-তে চান্স পেয়েছি বলে ট্রিট দিয়েছিল… খেয়েওছিলাম নির্লজ্জের মতো।

“‎And yet I have had the weakness, and have still the weakness, to wish you to know with what a sudden mastery you kindled me, heap of ashes that I am, into fire.”

বাসন মাঝতে মাঝতেই আমার রুম-মেট দিশারীর লাউড মোনিং শুনতাম। এত কাছ থেকে অন্য কাউকে এভাবে গোঙাতে শুনিনি। নিজে মোন করা আর অন্যরটা শোনা এক নয়। তবে এ-সব সয়ে গেছিল। আমার প্রয়োজনটা ছিল অন্যরকম। খুব ইচ্ছে করত পুরোনোদের কাবার্ডে বন্ধ রেখে বেশ কিছু নতুন বন্ধুদের মাঝে বাঁচতে। অ্যাডিকশন ছাড়াতে অনেক সময়ে যেমন বিকল্প কিছু ধরিয়ে দেওয়া হয়… হয়তো সেরকম। ধ্রুবকে ভোলার চেষ্টা করলে ভেতরে একটা চাপা কষ্ট হত। সেক্স স্টার্ভড মনে হত নিজেকে। কাউকে বলতে পারতাম না। হয়তো মিডল এজ ক্রাইসিসের মতো শোনাত… লোকে হাসত শুনে, আলোচনা করত আড়ালে।

অরিঘ্ন ছিল এক চমৎকার থেরাপি। বিন্দাস… গাঁজা খেয়ে পড়ে থাকে। নিজের ফ্ল্যাটে ঘর অন্ধকার করে, নীল-লাল এলইডি-চেইন জ্বালিয়ে ট্রান্স মিউজিক শোনে। শখের গিটার বাজায়। চাকরি করে… কিন্তু দায় নেই উন্নতি করার। কমিটমেন্টের ধারে কাছেও যাবে না… ঠিক করে রেখেছে। ওর ঘরে বসে হুঁকো টানতাম… রেট্রো মিউজিক শুনতাম… বাইরে থেকে যা হোক আনিয়ে খেতাম… সঙ্গে রাম। অরিঘ্নও আসত আমাদের ফ্ল্যাটে। রুম-মেট বুঝত আমারও কেউ আছে… শুধু আমিই একতরফা মোনিং শুনতে বসে নেই। ভালো জেল করত আমাদের মধ্যে। এমনকী আমার টপ ওর গায়ে হত, আর ওর পাঞ্জাবী আমি পরে বসে থাকতাম। ওই আমাকে অ্যাডভাইস দিত— তুই চুল ছোটো করে ফেল… আমি লম্বা করি। তুই কালার্ড লেন্স নে, আমি কাজল পরি। তুই ট্যাটু কর… আমি পিয়ার্সিং করি। ধ্রুবর ছায়া থেকে আমাকে টেনে সরিয়ে আনছিল ছেলেটা। অরিঘ্নকে আমি থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করেছিলাম, কিন্তু ঠকাতে চাইনি। নিশ্চিন্ত ছিলাম, ওর কমিটমেন্ট নেই… ও আমার ওপর মানসিকভাবে নির্ভর করে না। অবাক হতাম… বন্ধুত্বর থেকে শারীরিক সম্পর্কের এই কেমিস্ট্রিটা এত ম্যাচিওরভাবে সামলাতে দেখে।

ওই দিনগুলোতে অরিঘ্ন পাশে না থাকলে হয়তো ম্যানিক ফেজটা আবার জাঁকিয়ে বসত, স্ট্রেসটা আমাকে পিষে ফেলছিল।

দু-তিন সপ্তাহর গ্যাপ হলে অ্যাডিক্টদের মতোই একটা কষ্ট হত। ধ্রুবকে তত বেশি ঘেন্না করতাম। বেসিনে গিয়ে থুতু ফেলতাম ধ্রুবর মুখটা মনে করে… দায়ী করতাম সব কিছুর জন্য। অরিঘ্নকে ডেকে পাঠাতাম, বা ওর ফ্ল্যাটে চলে যেতাম… হয়তো না জানিয়েই। দরজায় তালা থাকলে সিঁড়িতে কিংবা রাস্তায় বসে অপেক্ষা করতাম। কিছুক্ষণ ফোরপ্লের পরেই মাথাটা একদম খালি হয়ে যেত। ধ্রুব যেমন পছন্দ করত, সেভাবেই এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলাম। ধ্রুব নিজেকে বাঘ ভাবত, আর পরাজিত শিকারের মতো অসার হয়ে যেত শেষের দিকে। অরিঘ্নকে পেয়ে মাঝে মাঝে আমার বাঘ-নখ বেরিয়ে আসত। ও সামলাতে পারত না। মুখটা অন্যদিকে সরিয়ে নিত, নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার ভান করত। ধ্রুব বলত, “তোকে অন্য কেউ ফোর্স করবে, তোর কষ্ট হবে— ভাবলে আমারও কষ্ট হয়, বিশ্বাস কর?”… এগুলো মনে পড়লে আরও বেশি জোর করতাম অরিঘ্নকে, ডমিনেট করতাম ভীষণ রকম। “ব্লোজব পেলে তো এনজয় করিস! চাটার সময় হেজিটেট করছিস কেন? চাট?!” দু-তিনবার চড়ও মেরে দিয়েছি, মৃদু আপত্তি করছিল বলে। সরি বলেছি পরে। মুড ঠিক করতে নিজের এল শরীরে এলইডি চেইন জড়িয়ে বলেছি— চল ফটোশুট কর!

ও ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে পারত… বা সোজা বলে দিতে পারত— পোষাচ্ছে না। তার বদলে শুধু জল খাওয়া, সিগারেট খাওয়া, জয়েন্ট বানানো… এসবের নামে পালিয়ে বাঁচত। একবার শুধু গায়ের দাগগুলো দেখিয়ে বলেছিল, “এরপর অ্যান্টিসেপ্টিকটাও নিজেই আনবি। কলকাতা গেলে মা-র সামনে জামা খোলা চাপ হয়ে যায়!”

সহ্য, কিংবা সাহায্য… কেন অরিঘ্ন এটা করত, জানি না। ওর পক্ষে সম্ভব ছিল আমাকে বিছানা, ফ্ল্যাট কিংবা জীবন থেকে লাথি মেরে সরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু ও ধ্রুব নয়। তাই, সচেতনভাবেই পারতাম না ওকে আঘাত দিতে। আবার ভয়ও হত… আর একটা ডুবো নির্ভরতায় ধাক্কা খাব।

কলকাতায় যিনি কাউনসেলিং করতেন, তাঁকে ফোন করলাম… ভিডিয়ো-কলে কাউনসেলিং শুরু করলেন। এছাড়া আর উপায় ছিল না।

“If you loved someone, you loved him, and when you had nothing else to give, you still gave him love.”

বোনের গায়ে হাত তুললে বোনও আমাকে ছেড়ে দেবে না। আর, মা মানসিকভাবে অভিভাবক নেই আর। কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। এভাবেই কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাবে মেয়েটা। এটাই ওর ভবিষ্যৎ।

একবার কথায় কথায় বলে ফেলেছিলাম ঠাট্টার ছলে— “আয়নায় গিয়ে নিজের মুখটা দেখ আগে!” তারপরই মনে পড়ল— একবার তিন দিন স্কুলে যায়নি ও… একজন টিচার ক্লাসে এই কথাটা ওকে বলেছিলেন বলে। ও মুখে কিছু বলল না, দেওয়ালে ঝোলানো আয়নাটা নিয়ে ছাদ থেকে নীচে ফেলে দিল।

অথচ বোনকে কিছুটা হলেও আমি ধ্রুবর কথা বলেছি। প্রফেসর আর কলেজের বন্ধুদের কথা বলেছি। অরিঘ্নর কথা বলেছি।

যদি আমি দুটো কথা বললে, ও একটা কথা বলে। এতে শুধু আমার সিক্রেট জেনেছে, আমি তেমন কিছুই পাইনি ওর থেকে ব্ল্যাকমেল করার মতো। তাও ছোটো বোন… আত্মকেন্দ্রিক আর ঢ্যাঁটা হলেও কিছুটা ভরসার জায়গা। মা-বাবার থেকে বেশিই ভরসার জায়গা। দিদিমা চলে যাওয়ার পর আর কেউই নেই কথা শেয়ার করার মতো।

এইরকম একটা ঢ্যাঁটা, অকৃতজ্ঞ এবং আত্মকেন্দ্রিক ভরসার কথা উপেক্ষা করেই ধ্রুবর কাছে গেলাম। বেড়ালের নখ লেগেছে— এটা মিথ্যে নয়।

দুপুর নয়, সন্ধ্যেবেলা… পাঁচজন পেশেন্টের পর। মানিকদা জিজ্ঞেস করল কেমন আছি। ভাগ্যিস বলেনি— কদ্দিন পর এলে!

ধ্রুবর মধ্যেও তেমন পরিবর্তন লক্ষ করলাম না আমাকে দেখার পর। হাতে আঁচড়টা দেখে বলল, “এমন কিছু না। এর থেকে বেশি আঁচড় লাগে মানুষের।”

— জন্তুর আঁচড়।

— হ্যাঁ জন্তুর আঁচড়… মানুষের আঁচড়… চিন্তা করার মতো কিছু না।

— ইনজেকশন লাগবে না? সিরিয়াসলি বেড়ালের নখ লেগেছে!

— নিয়ে রাখো তাহলে… সেফটি। মানিককে বলে দিচ্ছি। আর একটা অ্যান্টিসেপ্টিক লিখে দিলাম। এনাফ।

— ইচ্ছে করে আঁচড়ায়নি, লেগে গেছে অ্যাক্সিডেন্টালি।

— হুম, অ্যাক্সেন্ডান্টালিও আঘাত লাগে… নাম?

‘নাম’ জিজ্ঞেস করতে থমকে গেলাম। প্রায় এক বছর কোনো যোগাযোগ নেই, রাখতেও চাই না। কিন্তু এতটা?!

চুপ থাকতে পারলাম না, বলে ফেললাম, “কিছুই মনে পড়ছে না?”

প্যাডে আমার নামটা লিখল, পদবিটা লিখল না। লিখতে লিখতেই বলল, “কিছুই ভুলিনি।”

চুপচাপ দেখলাম… প্রেসক্রিপশন লিখে গেল ভাবলেশহীন মুখে। ফ্যানের হাওয়ায় কপালের সামনে এসে পড়া চুলগুলো উড়ছিল। আগে হলে সরিয়ে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেতাম। প্রেসক্রিপশনটা হাতে দেওয়ার আগে আবার নামের কাছে নিয়ে গেল কলমটা, জিজ্ঞেস করল— “পদবিটা যেন কী?”

— ডু ইয়ু ইভেন নো মি?!

— পদবি মনে থাকে না… মানুষ থেকে যায়।

কোনো রকমে ফিজটা দিয়েই প্রেসক্রিপশনটা হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। আমার ভুল, পুরোপুরি আমার ভুল। ধ্রুব অনুতপ্ত হওয়ার কোনো কারণই খুঁজে পায়নি এই এক বছরে।

ঘরে ফিরতেই বোনকে দেখলাম থমথমে মুখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে উঠল, “আমায় তো কিছু বলিসনি!” টপ-টা চেঞ্জ করতে করতে নিতান্ত বিরক্তি নিয়েই জানতে চাইলাম— কীসের কথা, কী জানানো হয়নি। তখনও ইঞ্জেকশনের জন্য হাতটা ব্যথা করছিল। নখের আঁচড়ের থেকে ছুঁচ ফোটানোর ব্যথা বেশি। “অরিঘ্নদাকে ফোন করেছিলাম।” কথাটা শুনেই বোনের দিকে ঘুরে চেঁচিয়ে উঠলাম, “কী?!”

— চিল! নম্বর ছিল… কল করেছিলাম।

— আমার ফোন ঘেঁটে ওর নম্বর নিয়েছিস?

— সো হোয়াট?

— ঠিক করিসনি। আই অ্যাম নট ওকে উইথ ইট। এখনই স্ক্রিনলক মারব…

— সে তোর প্রাইভেসি নিয়ে তুই চাট… বাট ইয়ু শুড হ্যাভ টোল্ড মি! এক্সপেক্ট করেছিলাম জানাবি যে ইয়ু হ্যাভ মুভ্ড অন।

কথাটা মনের ভেতর থিতিয়ে নিতে কিছুটা সময় চলে গেল। অরিঘ্নর ব্যাপারে বোনকে হালকাভাবে বলেছিলাম। প্রোফাইল ঘেঁটে পোস্ট-কমেন্ট এ-সব দেখে ও-ই ধরে নিয়েছিল আমরা রিলেশনে আছি। আমিও বলে দিয়েছিলাম ফার্স্ট স্টেজ… কেমন এগোয়ে দেখি।

অরিঘ্নর সঙ্গে বোনের কতদিন ধরে কথা চলছে কিছুই জানি না… আজ জানলাম ওদের মধ্যে কথা হয়। অরিঘ্ন আমাকে জানায়নি, অথচ বোনকে জানিয়েছে— ও বিদিশার সঙ্গে রিলেশনে আছে; আমাদের মধ্যে আর কিছু নেই। অথচ আমি জানলাম না… আমারই ব্যাচমেট বিদিশার সঙ্গে ও রিলেশনে আছে!

একবার মনে হল— বোনকে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য পুরোটাই ব্লাফ দিয়েছে অরিঘ্ন। বা আমাদের দু-জনকেই কাটিয়ে দেওয়ার জন্য…

বিদিশা বা অরিঘ্নর প্রোফাইলে ওদের দু-জনের সম্পর্কে এমন কিছুই পাইনি… যার থেকে আন্দাজ করা যায় ওদের মধ্যে কিছু brew করছে।

আমার এই ফ্যান্টম রিলেশনের শেষ হয়ে যাওয়ার খবরটা আমার একেবারেই পাত্তা দেওয়ার কথা না। অরিঘ্ন আর বিদিশা দু-জনকেই চিনি… জিজ্ঞেস করলেই হয়। তাও কেমন বারবার মনে হচ্ছিল— বিদিশার জন্য অরিঘ্ন আমাকে ডিচ করল। লুকিয়েছে আমার থেকে ইচ্ছে করেই। বিদিশাও নিশ্চয়ই জানে না— আমি ওর ফ্ল্যাটে যাই, ও আমার ফ্ল্যাটে আসে।

অরিঘ্নও যেন কীভাবে ধ্রুব হয়ে উঠল হঠাৎ… শুধু বোনের মুখ থেকে শোনা একটা কথায়…

বুকের ভেতর থেকে একটা কান্না ঠেলে আসছিল। পারলাম না। অরিঘ্নর ম্যাসেজ দেখতে বা ওকে ফোন করতেও ইচ্ছে হল না। ফোনটা সুইচ অফ করে ছাদে বসে একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছিলাম। বোন মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল… বিচ্ছেদের সান্ত্বনা। লুকিয়ে কেনা রামের বোতলটা ব্যাগ থেকে বার করে রাখল। যেমন স্নেহময়ী মা সন্তানের সামনে মন খারাপের সময়ে প্রিয় খাবার এনে রাখে।

রামের বোতলটা শেষ করতে করতেই মনে পড়ল… কাল আমার কাউন্সেলিং-এর শেষ দিন। উনিই বলেছিলেন ধ্রুবকে একবার ফেস করে দেখতে… ওভারকাম করতে পারছি কি না। ফেস করতে বলেছিলেন, আমি বাঁশ নিয়ে এলাম। কাল দিদিমার কথা বলব। মাঝে মাঝে দিদিমাকে স্বপ্নে দেখি। দিদিমার মৃতদেহ ফুল-দিয়ে সাজানো, শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইলেকট্রিক চুল্লি না, নিমকাঠে দাহ হচ্ছে। দাহ হওয়ার মাঝে যখন সবাই অন্য দিকে… দিদিমা আমার হাত ধরে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে আছে। কেউ ওভাবে আমার হাত ধরেনি। ধরে না। আমাদের কথা হয় না। আগুনের শিখা অন্ধকার আকাশের দিকে ভেসে ভেসে যায়। ঝিঁঝিঁ ডাকে একটানা, আর দূরে শেয়াল… মাঝে মাঝে। দিদিমা নিজের সৎকার দেখে চশমা না পরেই… এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে। যেভাবে দশমীর দিন মায়ের বরণ দেখত তাকিয়ে তাকিয়ে।

ছ্যাঁকা লাগতেই সিগারেটটা আঙুলের ফাঁক থেকে পড়ে গেল। বোন ছাদে চিৎ হয়ে পড়ে আছে আউট হয়ে… বিড় বিড় করছে। ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তোর দিদুনকে মনে পড়ে?” চোখ খুলে তাকাল, তারপর আকাশের চাঁদের দিকে দেখিয়ে হাতটা ফেলে দিল আবার।

দিদুন বলেছিল—

“ব্যথার নিজস্ব স্মৃতি থাকে। যে ব্যথা দিয়েছিল, যে ব্যথা ভুলিয়েছিল, অথবা সারিয়েছিল— তাদের স্মৃতি। তোর দাদু আমার গায়ে দু-একবার হাত তুলেছিল, সে-ব্যথার দাগ নেই। কিন্তু একবার একজন হাতটা পিছমোড়া করে এমন মুচড়ে দিলে!… মনে করলেই কবজিটা এখনও টনটন করে। এখন কেমন দেখতে হয়েছে কে জানে!”

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

প্রত্যাশা নিরোধক

“For every hundred crimes committed in the name of love, only one is committed in the name of sex.”

Categories
গল্প

অরিন্দম রায়ের গল্প

হতে পারত একটি ভূত
কিংবা একটা বাঞ্চোৎ-এর কাহিনি

“বল মাগি…”

চমক ভাঙল। ভূতটা যেন স্বপ্ন-জগতে ছিল এতক্ষণ।

ভূতেও স্মৃতি হাতড়ায়? এটা ভেবে এ অবস্থাতেও বাচ্চু যেন কিয়দ পরিমাণ হেসে ফেলল। স্মৃতি বড়ও নিঠুর। বোকাও। সময় অসময় না বুঝে নাক গলায়। বাচ্চু তারপর ভাবতে থাকল…

ভূতটা দ্যাখে, নীলুকে দেওয়ালে ঠেসিয়ে দেওয়া হয়েছে যেমন-তেমন করে। কিছুটা কাত হয়ে সব নিগ্রহ সহ্য করছে নীলু। তাকে অর্ধ-বিবস্ত্র করা হয়েছে। ওর রক্তশূন্য স্তন মর্দন করছে দু-জন দু-পাশে দাঁড়িয়ে। আর হোঁৎকাটা বন্দুকের নল এগিয়ে দিচ্ছে সায়ার দিকে। নীলুর চোখে জল। বাচ্চু স্পষ্ট দেখে ভূতটা কিছুই করতে পারে না। নিঃশব্দে অশ্রাব্য খিস্তি দেয় কেবল। বালের সমাজ শালা ভূতে ভয় পায়। ভূত নিয়ে ভয়ঙ্কর সিনেমা বানায়। ঘণ্টা! ভূত শালা কেবল দেখতে পারে। করতে পারে না কিছুই। করতে পারলে তো সমাজটাই শালা বদলে যেত। নীলুর উপর অত্যাচার বাড়ে। বাচ্চুর ভূত খুঁজে পায় না কী করবে!

দেওয়ালে ঠেস দেওয়া বাচ্চু বোঝে ভূতের ফোকালাইজার কেটে যাচ্ছে এবার। নীলুর এভাবে যন্ত্রণা পাওয়া, নিগ্রহ, ও কল্পনা করতে পারছে না আর। অথচ, ও নিশ্চিত জানে এমনই হবে, এমনই হয়। তাই আবার ফিরে যায় বাকিটা দেখতে। অদমনীয় কৌতূহলে…

নীলুর বাঁ ভ্রুতে সিগারেট গুঁজে দিল কে একজন। বোবা নীলু যন্ত্রণায় কাতরায় কেবল। বেঁকে যাওয়া ঠোঁট রক্তাভ। বাচ্চু তার শেষ স্মৃতিচিহ্ন এঁকেছে কিছু আগে। এমন সময় পাশের ঘর থেকে কে আঁতকে উঠে হাঁক পাড়ল— “স্যার! এখানে একটা মেয়ের বডি…”

— নাহ! নীলুকে মরতেই হবে। নইলে বাচ্চুর মরেও মুক্তি নেই। বাচ্চু স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। নীলুকে রেখে যাওয়া চলবে না কিছুতেই। কিন্তু গুলি তো দুটো। তবে তো মেয়েকে থাকতে হয়… বাচ্চু প্রাজ্ঞ এক ঋষির ন্যায় ধ্যানস্থ হয় মনের তপোবনে… নতুন করে সাজায় মরণ-ঘুঁটি…

ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বাচ্চু পড়ে মেঝেয় চিৎ হয়ে। থকথকে ঘিলু ছিটকে আছে। রক্ত-ঘিলুর উপর ভারী বুটের ছাপ পড়ছে। এ-ঘর থেকে ও-ঘর হেঁটে ফিরছে কতকগুলো পা। একটা হোঁৎকা মতন বিশ্রী লোক। মুখে সিগারেট। বাচ্চুর দিকে ঘৃণিত চোখে একবার দেখে নিয়ে সম্মুখের ঘরে এগিয়ে এল। এসে বসল চেয়ার নিয়ে। বলল—

“কোনো ভয় নেই মামণি। এই, এর মুখের কাপড়টা খুলে দে…”

ঘণ্টা দেড়েক পর বন্ধনমুক্ত হয়। মেয়েটা ভেঙে পড়ে কান্নায়। ও জানে না বাচ্চু মরে পড়ে আছে পাশের ডাইনিং-এ।

“আমার বাবা কোথায়? মা?”

“তোমার বাবা একটা আস্ত শুয়োরের বাচ্চা ছিল। বুঝলে মা? তুমি জানতে না তোমার বাবা কী করত? মালটা খোচর ছিল। কত লোকসান…”

“না, না। বাবা এমন ছিল না”

“চোওপ! ন্যাকামো না। বল তোর বাবার কোথায় সিক্রেট রুম? কী কী এভিডেন্স পেয়েচে দেখতে হবে”

“জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি তো হোস্টেলে থাকতাম। দু-দিন হল বাড়ি এসেছি”

“ধ্যুৎ! কেন যে শালা সহজে কেউ কিছু বলে না! ভালো লাগে না বাল! এই, একটু নাড়াচাড়া কর…”

বাচ্চুর ভূত বোবা হয়ে দেখে যাচ্ছে সব। কান্নার ভাব আসছে। কিন্তু অশ্রু না।

একজন পিস্তল ঠেকায় মেয়ের কপালে।

হোঁৎকাটা আঁতকে উঠে বলে— “এই! এ শালা, কেরে! একটা কচি ডাবকা মেয়ের মাথায় পিস্তল ধরা হচ্চে? বালটা জানো না প্যান্টের নীচে কামান আছে?”

‘‘হাঃ হাঃ হাঃ হা…”

মেয়ে চিৎকার করতে গেল… আর তখনই এক থাপ্পড়। ভয়ে কুঁকড়ে গেল ও। হোঁৎকাটা মেয়ের গালে, গলায়, পিঠে, ঠোঁটে, বুকে হাত ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে গেল। আবার। আবার।

“বলো মা, বলো… কামরা দেখিয়ে দিলেই হল। ল্যাটা চুকে যায়”

“বিশ্বাস করুন আমি কিচ্ছু জানি না’ কান্নায় ভেঙে পড়ল মেয়ে।”

“এই, এ মালটাকে মেঝেতে ফ্যাল।”

বাবা বাচ্চু, ভূতের চোখ দিয়ে মেপে নিতে চায় আগামী ঘটনা-প্রবাহ…

পিস্তলের নল তাক করা। না থাকলেও ক্ষতি ছিল না। তবু রাখে। একটা প্যান্টির পাশে সাময়িক ও ধারাবাহিকভাবে জমা হচ্ছে কতকগুলো জাঙিয়া। ভূতের তো চোখের পাতা থাকে না। তাই নিষ্পলক তাকিয়ে ও। ওঁরাওদের পাহাড় দেবতার মতো নিশ্চল। মেয়ের কোমরের নীচ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ভূতের মনে পড়ল প্রথম কয়েকবার ঋতুস্রাবের সময় মেয়েকে কিছুতেই চুপ করাতে পারেনি ও। সারাক্ষণ কেঁদেছিল। ভয়ে। আর তিনমাস পর, ও আঠারোর হতে পারত…

“লোকসান পুষিয়ে নে ভালো করে তোরা”— মেঝেতে হাঁটু দিয়ে কোলা ব্যাঙের মতো বসল হোঁৎকাটা। হোঁৎকাটার কাঁধের উপর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভূতটা দেখল ওই বিপুল মেদের পাহাড় থেঁথলে দিয়েছে কচি শরীরটা। মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বুকের দিকে ভূতটা চেয়ে রইল পাথর চোখের নিষ্পলক ঈশ্বরের মতো…

দেওয়ালে ঠেস দেওয়া বাস্তবের বাচ্চু ভাবে ছেলেবেলায় শালা ফালতু ভয় পেত ভূতকে। প্রকৃতপক্ষে ভূত বড়ো অসহায়। একটা গাছ, একটা ধৃতরাষ্ট্র যেন। কিন্তু চক্ষুষ্মান। বাচ্চু বুঝল ওর পক্ষে আর দেখা সম্ভব নয়। ফোকালাইজার কেটে যাচ্ছে। কিন্তু তখন তার আর কিছু করার নেই। মনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে ও। তাই বাচ্চু দেখব না দেখব না স্থির করেও দেখতেই থাকল…

ইতিমধ্যে আরও এক হায়না ছোপ ছোপ রক্তে, পায়ের ছাপ এঁকে এগিয়ে এল অর্ধমৃত উলঙ্গ শরীরটার দিকে। মাত্র সতেরোটা বসন্ত… তার মধ্যে কতটুকুই-বা উপভোগ করেছে মেয়েটা! এমন সময়— ‘স্যার! বাচ্চু যে-দরজার মুখে পড়েছিল তার দরজা ভেঙে দেখলাম বোধহয় ওর বউয়ের লাশ…”

— নাহ! কিছুতেই মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। ও যদি প্রকৃত পিতা হয় তবে মেয়েকে ওই নরক যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে মারতেই হবে তাকে। কোনো দ্বিধা নয়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল রিভালভারেতো মাত্র দুটো গুলি। বউ, মেয়েকে মারার পর তবে ও নিজে ধরা পড়বে… আর একবার যদি ধরা পড়ে…

আলো-অন্ধকারময় একটা ঘর। উলঙ্গ বাচ্চু হাত বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে। তার পুরুষাঙ্গ রক্তাক্ত, কিছু চামড়া, মাথার চুল, দু-হাত আর পায়ের ছ-টা নখ ঘরের মেঝেয় ছড়ানো… ডেঁয়ো পিঁপড়ে লাইন দিয়েছে… বাচ্চু এ-সব দেখে আর শিউরে ওঠে। দেখে আর শিউরে ওঠে। কিন্তু দেখে… জ্বর অনুভব করে গায়ে। কিন্তু কী করবে ও? সিদ্ধান্ত নিতে পারে না! কাকে বাঁচাতে পারবে না? স্ত্রী? কন্যা? নাকি, নিজে? সব ওলোট-পালোট হয়ে যায় আবার। দেওয়াল ঘেঁষে বসে বাচ্চু। চূড়ান্ত অসহায় হয়ে কাঁদতে থাকে। দেওয়াল, যা প্রতিবন্ধকতার রূপক হিসাবে বহুল ব্যবহৃত হয় সাহিত্যে, তার গায়ে কিল মারে, মাথা ঠোঁকে… যেন এখুনি ত্রাতা হয়ে আসবে নরসিংহ… বালের ফিল্মে এমন হয় দেখেছিল কখনো। তাই কিল, চড়, থাপড় মারতেই থাকে দেওয়ালে… আর কাঁদতে থাকে… কাকে আরাম-মৃত্যু দেওয়া যায়… কিন্তু তা বলে নিজের বউকে খুন করবে? নিজের মেয়েটাকে… যাকে দেবশিশুর মতো বড় করেছে… অথচ মারা দরকার… কাকে মেরে বাঁচানো যায়… বাচ্চু চোখের জল না মুছে এবার আরও স্থির, ফোকাসড্‌ আর শান্ত হয়। সচেতনতার ঠুলি পরে পুনরায় সাজাতে চেষ্টা করে দৃশ্যপট। এবং পুনঃ তপস্বী হয়… কার কার মৃত্যু প্রয়োজন… ওদিকে বিড়াল পায়ে লোকগুলো উঠে এসেছে হয়তো বারান্দায়— বাচ্চু ভাবে। সময় নেই। দ্রুত ভেবে নিতে হবে বাচ্চুকে… সিদ্ধান্তে পৌঁছুতেই হবে। দুটো গুলি আর তিনটে মানুষ। বদ্ধ গুমোট ঘরে বাচ্চু ভাবতে থাকে…

[মার্জনা করবেন। কে খবর দিল? কারা, কেন বাচ্চুকে চায়ছে?— জানি না। বাচ্চু একটা চুতিয়া হয়তো। গণতান্ত্রিক সমাজের ক্ষতি করছিল। কাঁধে লোগো লাগানো হোঁৎকাটা রক্ষক হতে পারে। আবার হোঁৎকাটা বড়ো ব্যবসাদার হতে পারে, রাজনৈতিক নেতাও হতে পারেন বৈকি। কিংবা… যে কেউই হতে পারে। আপনি খামোখা ও-সব ভাববেন না। বরং ভেবে নিতে পারেন, আপনিই হোঁৎকাটা। শরীর একটু স্থূল হল? তা হোক। মজা নিন। আর ভেবে নিন— বাচ্চু অন্য ধর্মের, অন্য পার্টির, অন্য বর্গের, অন্য বর্ণের বা টিভি, চায়ের দোকানে তক্ক করা, প্রশ্ন তোলা অন্য মতাদর্শের বা ট্রেনের সিটে কমপ্রোমাইজড না করা একটা পিওর বাঞ্চোৎ।]

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

অরিন্দম রায়ের গল্প

হতে পারত একটি ভূত
কিংবা একটা বাঞ্চোৎ-এর কাহিনি

শ্রমজীবী সূর্যটা প্রাত্যহিক দহনে বড়ো অবসন্ন এখন। এক পরিযায়ী শ্রমিকের মতো সে এলিয়ে পড়ছে ক্রমশ পৃথিবীর পশ্চিম কোলে। এদিকে গা ঘেঁষা-ঘেষি করে উঠে যাওয়া