Categories
গল্প

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

প্রত্যাশা নিরোধক

“For every hundred crimes committed in the name of love, only one is committed in the name of sex.”

Categories
গল্প

অরিন্দম রায়ের গল্প

হতে পারত একটি ভূত
কিংবা একটা বাঞ্চোৎ-এর কাহিনি

“বল মাগি…”

চমক ভাঙল। ভূতটা যেন স্বপ্ন-জগতে ছিল এতক্ষণ।

ভূতেও স্মৃতি হাতড়ায়? এটা ভেবে এ অবস্থাতেও বাচ্চু যেন কিয়দ পরিমাণ হেসে ফেলল। স্মৃতি বড়ও নিঠুর। বোকাও। সময় অসময় না বুঝে নাক গলায়। বাচ্চু তারপর ভাবতে থাকল…

ভূতটা দ্যাখে, নীলুকে দেওয়ালে ঠেসিয়ে দেওয়া হয়েছে যেমন-তেমন করে। কিছুটা কাত হয়ে সব নিগ্রহ সহ্য করছে নীলু। তাকে অর্ধ-বিবস্ত্র করা হয়েছে। ওর রক্তশূন্য স্তন মর্দন করছে দু-জন দু-পাশে দাঁড়িয়ে। আর হোঁৎকাটা বন্দুকের নল এগিয়ে দিচ্ছে সায়ার দিকে। নীলুর চোখে জল। বাচ্চু স্পষ্ট দেখে ভূতটা কিছুই করতে পারে না। নিঃশব্দে অশ্রাব্য খিস্তি দেয় কেবল। বালের সমাজ শালা ভূতে ভয় পায়। ভূত নিয়ে ভয়ঙ্কর সিনেমা বানায়। ঘণ্টা! ভূত শালা কেবল দেখতে পারে। করতে পারে না কিছুই। করতে পারলে তো সমাজটাই শালা বদলে যেত। নীলুর উপর অত্যাচার বাড়ে। বাচ্চুর ভূত খুঁজে পায় না কী করবে!

দেওয়ালে ঠেস দেওয়া বাচ্চু বোঝে ভূতের ফোকালাইজার কেটে যাচ্ছে এবার। নীলুর এভাবে যন্ত্রণা পাওয়া, নিগ্রহ, ও কল্পনা করতে পারছে না আর। অথচ, ও নিশ্চিত জানে এমনই হবে, এমনই হয়। তাই আবার ফিরে যায় বাকিটা দেখতে। অদমনীয় কৌতূহলে…

নীলুর বাঁ ভ্রুতে সিগারেট গুঁজে দিল কে একজন। বোবা নীলু যন্ত্রণায় কাতরায় কেবল। বেঁকে যাওয়া ঠোঁট রক্তাভ। বাচ্চু তার শেষ স্মৃতিচিহ্ন এঁকেছে কিছু আগে। এমন সময় পাশের ঘর থেকে কে আঁতকে উঠে হাঁক পাড়ল— “স্যার! এখানে একটা মেয়ের বডি…”

— নাহ! নীলুকে মরতেই হবে। নইলে বাচ্চুর মরেও মুক্তি নেই। বাচ্চু স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। নীলুকে রেখে যাওয়া চলবে না কিছুতেই। কিন্তু গুলি তো দুটো। তবে তো মেয়েকে থাকতে হয়… বাচ্চু প্রাজ্ঞ এক ঋষির ন্যায় ধ্যানস্থ হয় মনের তপোবনে… নতুন করে সাজায় মরণ-ঘুঁটি…

ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বাচ্চু পড়ে মেঝেয় চিৎ হয়ে। থকথকে ঘিলু ছিটকে আছে। রক্ত-ঘিলুর উপর ভারী বুটের ছাপ পড়ছে। এ-ঘর থেকে ও-ঘর হেঁটে ফিরছে কতকগুলো পা। একটা হোঁৎকা মতন বিশ্রী লোক। মুখে সিগারেট। বাচ্চুর দিকে ঘৃণিত চোখে একবার দেখে নিয়ে সম্মুখের ঘরে এগিয়ে এল। এসে বসল চেয়ার নিয়ে। বলল—

“কোনো ভয় নেই মামণি। এই, এর মুখের কাপড়টা খুলে দে…”

ঘণ্টা দেড়েক পর বন্ধনমুক্ত হয়। মেয়েটা ভেঙে পড়ে কান্নায়। ও জানে না বাচ্চু মরে পড়ে আছে পাশের ডাইনিং-এ।

“আমার বাবা কোথায়? মা?”

“তোমার বাবা একটা আস্ত শুয়োরের বাচ্চা ছিল। বুঝলে মা? তুমি জানতে না তোমার বাবা কী করত? মালটা খোচর ছিল। কত লোকসান…”

“না, না। বাবা এমন ছিল না”

“চোওপ! ন্যাকামো না। বল তোর বাবার কোথায় সিক্রেট রুম? কী কী এভিডেন্স পেয়েচে দেখতে হবে”

“জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি তো হোস্টেলে থাকতাম। দু-দিন হল বাড়ি এসেছি”

“ধ্যুৎ! কেন যে শালা সহজে কেউ কিছু বলে না! ভালো লাগে না বাল! এই, একটু নাড়াচাড়া কর…”

বাচ্চুর ভূত বোবা হয়ে দেখে যাচ্ছে সব। কান্নার ভাব আসছে। কিন্তু অশ্রু না।

একজন পিস্তল ঠেকায় মেয়ের কপালে।

হোঁৎকাটা আঁতকে উঠে বলে— “এই! এ শালা, কেরে! একটা কচি ডাবকা মেয়ের মাথায় পিস্তল ধরা হচ্চে? বালটা জানো না প্যান্টের নীচে কামান আছে?”

‘‘হাঃ হাঃ হাঃ হা…”

মেয়ে চিৎকার করতে গেল… আর তখনই এক থাপ্পড়। ভয়ে কুঁকড়ে গেল ও। হোঁৎকাটা মেয়ের গালে, গলায়, পিঠে, ঠোঁটে, বুকে হাত ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে গেল। আবার। আবার।

“বলো মা, বলো… কামরা দেখিয়ে দিলেই হল। ল্যাটা চুকে যায়”

“বিশ্বাস করুন আমি কিচ্ছু জানি না’ কান্নায় ভেঙে পড়ল মেয়ে।”

“এই, এ মালটাকে মেঝেতে ফ্যাল।”

বাবা বাচ্চু, ভূতের চোখ দিয়ে মেপে নিতে চায় আগামী ঘটনা-প্রবাহ…

পিস্তলের নল তাক করা। না থাকলেও ক্ষতি ছিল না। তবু রাখে। একটা প্যান্টির পাশে সাময়িক ও ধারাবাহিকভাবে জমা হচ্ছে কতকগুলো জাঙিয়া। ভূতের তো চোখের পাতা থাকে না। তাই নিষ্পলক তাকিয়ে ও। ওঁরাওদের পাহাড় দেবতার মতো নিশ্চল। মেয়ের কোমরের নীচ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ভূতের মনে পড়ল প্রথম কয়েকবার ঋতুস্রাবের সময় মেয়েকে কিছুতেই চুপ করাতে পারেনি ও। সারাক্ষণ কেঁদেছিল। ভয়ে। আর তিনমাস পর, ও আঠারোর হতে পারত…

“লোকসান পুষিয়ে নে ভালো করে তোরা”— মেঝেতে হাঁটু দিয়ে কোলা ব্যাঙের মতো বসল হোঁৎকাটা। হোঁৎকাটার কাঁধের উপর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভূতটা দেখল ওই বিপুল মেদের পাহাড় থেঁথলে দিয়েছে কচি শরীরটা। মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বুকের দিকে ভূতটা চেয়ে রইল পাথর চোখের নিষ্পলক ঈশ্বরের মতো…

দেওয়ালে ঠেস দেওয়া বাস্তবের বাচ্চু ভাবে ছেলেবেলায় শালা ফালতু ভয় পেত ভূতকে। প্রকৃতপক্ষে ভূত বড়ো অসহায়। একটা গাছ, একটা ধৃতরাষ্ট্র যেন। কিন্তু চক্ষুষ্মান। বাচ্চু বুঝল ওর পক্ষে আর দেখা সম্ভব নয়। ফোকালাইজার কেটে যাচ্ছে। কিন্তু তখন তার আর কিছু করার নেই। মনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে ও। তাই বাচ্চু দেখব না দেখব না স্থির করেও দেখতেই থাকল…

ইতিমধ্যে আরও এক হায়না ছোপ ছোপ রক্তে, পায়ের ছাপ এঁকে এগিয়ে এল অর্ধমৃত উলঙ্গ শরীরটার দিকে। মাত্র সতেরোটা বসন্ত… তার মধ্যে কতটুকুই-বা উপভোগ করেছে মেয়েটা! এমন সময়— ‘স্যার! বাচ্চু যে-দরজার মুখে পড়েছিল তার দরজা ভেঙে দেখলাম বোধহয় ওর বউয়ের লাশ…”

— নাহ! কিছুতেই মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। ও যদি প্রকৃত পিতা হয় তবে মেয়েকে ওই নরক যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে মারতেই হবে তাকে। কোনো দ্বিধা নয়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল রিভালভারেতো মাত্র দুটো গুলি। বউ, মেয়েকে মারার পর তবে ও নিজে ধরা পড়বে… আর একবার যদি ধরা পড়ে…

আলো-অন্ধকারময় একটা ঘর। উলঙ্গ বাচ্চু হাত বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে। তার পুরুষাঙ্গ রক্তাক্ত, কিছু চামড়া, মাথার চুল, দু-হাত আর পায়ের ছ-টা নখ ঘরের মেঝেয় ছড়ানো… ডেঁয়ো পিঁপড়ে লাইন দিয়েছে… বাচ্চু এ-সব দেখে আর শিউরে ওঠে। দেখে আর শিউরে ওঠে। কিন্তু দেখে… জ্বর অনুভব করে গায়ে। কিন্তু কী করবে ও? সিদ্ধান্ত নিতে পারে না! কাকে বাঁচাতে পারবে না? স্ত্রী? কন্যা? নাকি, নিজে? সব ওলোট-পালোট হয়ে যায় আবার। দেওয়াল ঘেঁষে বসে বাচ্চু। চূড়ান্ত অসহায় হয়ে কাঁদতে থাকে। দেওয়াল, যা প্রতিবন্ধকতার রূপক হিসাবে বহুল ব্যবহৃত হয় সাহিত্যে, তার গায়ে কিল মারে, মাথা ঠোঁকে… যেন এখুনি ত্রাতা হয়ে আসবে নরসিংহ… বালের ফিল্মে এমন হয় দেখেছিল কখনো। তাই কিল, চড়, থাপড় মারতেই থাকে দেওয়ালে… আর কাঁদতে থাকে… কাকে আরাম-মৃত্যু দেওয়া যায়… কিন্তু তা বলে নিজের বউকে খুন করবে? নিজের মেয়েটাকে… যাকে দেবশিশুর মতো বড় করেছে… অথচ মারা দরকার… কাকে মেরে বাঁচানো যায়… বাচ্চু চোখের জল না মুছে এবার আরও স্থির, ফোকাসড্‌ আর শান্ত হয়। সচেতনতার ঠুলি পরে পুনরায় সাজাতে চেষ্টা করে দৃশ্যপট। এবং পুনঃ তপস্বী হয়… কার কার মৃত্যু প্রয়োজন… ওদিকে বিড়াল পায়ে লোকগুলো উঠে এসেছে হয়তো বারান্দায়— বাচ্চু ভাবে। সময় নেই। দ্রুত ভেবে নিতে হবে বাচ্চুকে… সিদ্ধান্তে পৌঁছুতেই হবে। দুটো গুলি আর তিনটে মানুষ। বদ্ধ গুমোট ঘরে বাচ্চু ভাবতে থাকে…

[মার্জনা করবেন। কে খবর দিল? কারা, কেন বাচ্চুকে চায়ছে?— জানি না। বাচ্চু একটা চুতিয়া হয়তো। গণতান্ত্রিক সমাজের ক্ষতি করছিল। কাঁধে লোগো লাগানো হোঁৎকাটা রক্ষক হতে পারে। আবার হোঁৎকাটা বড়ো ব্যবসাদার হতে পারে, রাজনৈতিক নেতাও হতে পারেন বৈকি। কিংবা… যে কেউই হতে পারে। আপনি খামোখা ও-সব ভাববেন না। বরং ভেবে নিতে পারেন, আপনিই হোঁৎকাটা। শরীর একটু স্থূল হল? তা হোক। মজা নিন। আর ভেবে নিন— বাচ্চু অন্য ধর্মের, অন্য পার্টির, অন্য বর্গের, অন্য বর্ণের বা টিভি, চায়ের দোকানে তক্ক করা, প্রশ্ন তোলা অন্য মতাদর্শের বা ট্রেনের সিটে কমপ্রোমাইজড না করা একটা পিওর বাঞ্চোৎ।]

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

অরিন্দম রায়ের গল্প

হতে পারত একটি ভূত
কিংবা একটা বাঞ্চোৎ-এর কাহিনি

শ্রমজীবী সূর্যটা প্রাত্যহিক দহনে বড়ো অবসন্ন এখন। এক পরিযায়ী শ্রমিকের মতো সে এলিয়ে পড়ছে ক্রমশ পৃথিবীর পশ্চিম কোলে। এদিকে গা ঘেঁষা-ঘেষি করে উঠে যাওয়া

Categories
গল্প

শুভদীপ ঘোষের গল্প

নিরুদ্দেশ

সারা গা চেটে দিচ্ছে কেউ এরকম একটা কিছু দেখতে দেখতে অনিমেষ শুনতে পায় রুপা জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে ‘অনি ওকে পাওয়া যাচ্ছে না, অনি’। ঘুম ভাঙার সময় ধাতস্ত হতে একটু সময় লাগে,

Categories
গল্প

শুভাঞ্জন বসুর গল্প

ধাক্কা

এক-একটা দিন এমন হিসেবের বাইরে দিয়ে চলা শুরু করে যে, চেষ্টা করেও আর হাতে আনা যায় না। গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবছিল শিতাংশু। যেগুলো করলে মন মেজাজ ভালো থাকে সবকিছুই প্রায় করা হয়ে গেছে।

Categories
গল্প

অনুরাধা মুখার্জির গল্প

ডেথ সার্টিফিকেট

কিন্তু ডাক্তারবাবু তখনও জানতেন না যে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে আরও দুর্ভোগ, আরও অনেক যন্ত্রণা। বহু অপমান ভোগ করতে হবে তাঁকে। আজীবন দুঃখ ভোগ আছে তাঁর কপালে। সুলিখিত চিত্রনাট্যের সবেমাত্র প্রথম দৃশ্যের অভিনয় সাঙ্গ হয়েছে ‌গত রাতে।

দশটা বাজতে না বাজতেই আবার পুলিশ আসে ওয়ারেন্ট নিয়ে। ডাক্তারবাবু গ্রেফতার হন ভূয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার অপরাধে। পাড়ার মধ্যে অজস্র কৌতূহলী ও আশঙ্কিত দৃষ্টির সামনে দিয়ে মাথা নীচু করে পুলিশের জিপে চড়ে চলে যান ডাঃ রায়। বেশ কয়েকদিন হাজতবাসের পর জামিনে মুক্ত হন তিনি। আদালতে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হয়। কিন্তু কী পরিস্থিতিতে তাঁকে ভূয়ো সার্টিফিকেট দিতে হয়েছিল তা আদালতের বিচার্য বিষয় ছিল না। শাস্তিস্বরূপ তাঁর রেজিস্ট্রেশন নাকচ হয়, তিনি হারান তাঁর পেশা, তাঁর চিকিৎসার অধিকার। লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, বিতাড়িত চিকিৎসক এতটা আঘাত নিতে পারলেন না। সিভিয়ার করোনারি এ্যাটাকের ফলে তাঁকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়। শয্যাশায়ী ডাক্তারবাবু জানতেও পারেন না যে, তাঁর দুই ছেলের জীবনে কী পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।


ডাক্তারবাবুর ছেলেদের কথা বলার আগে তাঁকে শেষ করে দেওয়ার জন্য যে-নাটক সাজানো হয়েছিল সেই নিয়ে দুই একটি কথা বলে নেওয়া যাক। এই নাটকের রচয়িতা যদিও সেই ওসি কিন্তু উপাদান যোগাড় করে দিয়েছিলেন ওসিকে তাঁর পৃষ্ঠপোষক এক ধনাঢ্য স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি। মৃতা মহিলা তাঁর আশ্রিতা অসহায় আত্মীয়া। ইচ্ছেমতো ভোগ করার পর মহিলা যখন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন ও অনাগত সন্তানের পরিচয়ের জন্য দাবি জানান তখনই তাঁকে ইহলোক থেকে সরিয়ে দেবার জন্য পরিকল্পনা করা হয় দারোগাবাবুর জ্ঞাতসারে। আর এই হত্যাকাণ্ড তাঁর হাতে তুলে দেয় ডঃ রায়ের উঁচু মাথাটা ধুলোয় লুটিয়ে দেবার সুযোগ। তাই ডাঃ রায় বাড়ি ফিরে আসার পর মহিলার শব গেল শ্মশানে ও পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক রেড হল সেখানে, পুলিশের ডাক্তার রায় দিলেন বিষক্রিয়ায় মৃত্যু, শববাহকরাও গ্রেফতার হল। তবে পুলিশি তৎপরতায় আদালতে আত্মহত্যা প্রমাণিত হওয়ায় তারা মুক্তি পেল জরিমানা দিয়ে। জরিমানার টাকাও কিছু দিনের হাজতবাসের খেসারতস্বরূপ তারা ভালো টাকা পেয়েছিল। এ-সব তথ্য সামনে আসে অনেক পরে। তার আগেই ডাক্তারবাবুর জীবনে চরম সর্বনাশ ঘটে গিয়েছে।

ডাক্তারবাবুর দুই ছেলে, বড়ো কানু ও ছোটো শানু। এই নামেই তারা এই তল্লাটে পরিচিত। সহদর ভাই হলেও স্বভাবের দিক দিয়ে তারা দু-জন বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। কানু জীবনকে নিয়েছিল খুব হালকা চালে, লক্ষ্যহীনভাবে সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া হল তার প্রকৃতি। সেই রাতের অত্যাচার আর বাবার এই লাঞ্ছনা দেখে সে হয়ে গিয়েছিল ভীত, সন্ত্রস্ত ও সদাসশঙ্ক।

আর উচ্চ-মাধ্যমিকের ছাত্র শানু দাদার একদম বিপরীত, অত্যন্ত গম্ভীর ও সিরিয়াস ছেলে। তার স্বপ্ন বাবার মতো ডাক্তার হবে সে, আর সেই লক্ষ্যেই নিজেকে গড়ে তুলছিল সে। কিন্তু সেই অভিশপ্ত রাতের অত্যাচার আর বাবার অবমাননা আর দুর্গতি তার মধ্যে জ্বালিয়ে দিল প্রতিহিংসার আগুন। সে ঠিক করে এই অত্যাচারের, অসহ্য লাঞ্ছনার আর বাবার অপমানের বদলা তাকে নিতেই হবে। বহু চেষ্টায় সে যোগাযোগ করে তাদের সঙ্গে যারা মাঝে মাঝেই গভীর রাতে চিকিৎসার জন্য তার বাবার চেম্বারের দরজায় টোকা দিত। তারাও শানুকে লুফে নিল। ওই অত্যাচারী পুলিশ অফিসারের নাম অনেকদিন যাবৎ তাদের হিটলিস্টে ছিল। এখন শানুর মুখে ডাক্তারবাবুর লাঞ্ছনার সম্পূর্ণ বিবরণ জানতে পেরে তাদের মাথাতেও আগুন জ্বলে উঠল। তৈরি হল প্ল্যান অফ আ্যকশন। এবার ফাঁদ পাতল তারা, মূহূর্তের ভুলে সেই ফাঁদে পা রাখলেন সেই অফিসার আর সেই ভুলের খেসারত দিতে হল তাঁকে নিজের প্রাণ দিয়ে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম— অত্যাচারীর ক্ষমা নেই।

কিন্তু পুলিশের গায়ে হাত পড়লে সমস্ত বাহিনী আহত বাঘের মতো হিংস্র হয়ে ওঠে। এই ঘটনার পর পুলিশ বাহিনী অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। সন্দেহভাজনদের তালিকায় শানুর নাম ছিল তাই সর্বপ্রথম কানুকে এনে হাজতে ঢোকায়। পুলিশের অত্যাচার কানুর মতো দুর্বল চিত্তের ছেলের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। তাই সে যতটুকু জানত, যা আন্দাজ করত সব বলে দিল পুলিশকে।

পুলিশ এবার হানা দিল শানুদের গোপন ডেরায়। অতর্কিত আক্রমণে কয়েকজন পালিয়ে যেতে পারলেও শানু ও আরেকটি ছেলে নিহত হল পুলিশের গুলিতে। শানুর দেহ সনাক্তকরণের জন্য হাজত থেকে বার করে আনা হল কানুকে। ভাইয়ের মৃতদেহ দেখে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়া কানুর চোখের সামনে দিয়ে যখন শানুর মৃতদেহের একটা পা ধরে টেনে হিঁচড়ে তোলা হল শববাহী গাড়িতে তখন কানু আর সইতে পারল না। অত্যাচারিত হয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দি ও তার ফলে শানুর হত্যা ও আদরের ছোটো ভাইয়ের মৃতদেহের নিদারুণ লাঞ্ছনা, বাবার ওপর নির্যাতন ও তাঁর নিদারুণ অসুস্থতা, এতগুলি আঘাত সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি ছিল না কানুর, ফলে পাগল হয়ে গেল সে। ডাক্তারবাবু যখন সুস্থ হলেন তখন তাঁর দুই ছেলের মধ্যে একজন মৃত ও অন্যজন বিকৃত মস্তিষ্ক। আর পরিস্থিতির শিকার হতবাক, হতচকিত তাঁর স্ত্রী আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছেন। ডাক্তারবাবু নিজেও শয্যা আশ্রয় করলেন, পণ করলেন আর কখনো চিকিৎসা করবেন না।

কিন্তু জীবন তো শুধুই তমসাচ্ছন্ন নয়। তাই দিনের পর দিন চলে তাঁর দরজায় ধর্ণা। মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত রোগী যেমন আছে তেমনই আছে তাঁর বিনা ভিজিটের রোগীরা। সবাই প্রত্যহ সোচ্চারে জানিয়ে যায়— আমরা কাগজ জানি না, নম্বর চিনি না। আমরা শুধু আপনাকেই জানি। আপনার ওষুধই আমাদের কাছে মৃতসঞ্জিবনী। এগিয়ে আসে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারা বেকার যুবকরা, জানায় তারা ডাক্তারবাবুর নির্দেশ অনুযায়ী কম্পাউন্ডারের কাজ চালিয়ে নেবে। আগেকার কম্পাউন্ডারবাবুরা কাজ ছেড়ে দিলেও কাজ চালিয়ে নিতে পারবে তারা ও এই কাজের জন্য বেতনাভিলাষী নয় তারা। তাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা যে, চেম্বার খুলুন তিনি, আগের মতো রোগী দেখুন। আর পারলেন না ডাঃ রায়, আবার স্টেথোস্কোপ ধরতে বাধ্য হলেন নামকাটা ডাক্তার।

তাঁর আত্মীয় বন্ধুরাও চুপচাপ বসে ছিলেন না, অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন তাঁর হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। পুনর্বিচারে তিনি ফিরে পেয়েছেন তাঁর চিকিৎসার অধিকার।

সত্তরের দশকের পর কেটে গেছে আরও দুই দশক। রুগ্ন, জীর্ণ শীর্ণ ডাক্তারবাবু তাঁর পুরোনো মান্ধাতার আমলের এ্যাম্বাসেডর গাড়ি চড়ে প্রত্যহ সকালে বাড়ি বাড়ি কলে যান। তবে এখন ওই একবারই কলে বার হন দিনে। আগেকার মতো যখন-তখন বার হতে পারেন না শরীরের জন্য। তবে চেম্বারে দু-বেলাই বসেন। সাহায্যের জন্য একজন জুনিয়র চিকিৎসক নিয়োগ করেছেন। কিন্তু আর কখনো ডেথ সার্টিফিকেট তিনি দেন না। প্রয়োজন হলে নবীন ডাক্তার সেই কাজ করেন। সার্টিফিকেট লিখতে গেলেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে জীবনোচ্ছ্বল তাঁর দুই কিশোর পুত্র কানু, শানুর মুখ। যাদের একজন পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গিয়েছে আর অপরজন আছে মানসিক হাসপাতালে। অথচ এই দু-জনকে যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই তিনি নিজের সব নীতি, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে জীবনে প্রথম ও শেষ বারের মতো ভূয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দিতে বাধ্য হয়েছিলেন আর আজ তাদের স্মৃতিই তাঁর হাত চেপে ধরে, সার্টিফিকেট লিখতে দেয় না।

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

অনুরাধা মুখার্জির গল্প

ডেথ সার্টিফিকেট

বেলা এগারোটা। প্রতিদিনের মতো ডাঃ রায়ের চেম্বারে রোগীর ভিড় ওয়েটিং রুমে, বাইরের বারান্দা ছাপিয়ে সদর রাস্তা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। নিত্যদিনের এই এক চিত্র।

Categories
গল্প

অনুরাধা মুখার্জির গল্প

ডেথ সার্টিফিকেট

বর্ষার রাত। ডঃ রায়ের চেম্বারের দরজায় জোর ধাক্কা। এ ধাক্কা তো নির্যাতিত, আহত তরুণদের মৃদু সশঙ্ক করাঘাত নয়, এই শব্দ কোনো বলদর্পী, গর্বান্ধ ব্যক্তির সজোরে পদাঘাতের শব্দ। ডাক্তারবাবু নিজেই দরজা খুললেন। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন জনাচারেক কনস্টেবল-সহ সেদিনের সেই থানা ইনচার্জ।

— ডঃ রায় আপনাকে তো একটু থানায় যেতে হবে, নিজের করতলে রুলার ঠুকতে ঠুকতে বললেন ওসি।

— এত রাতে! এই বর্ষায়! বিস্মিত প্রশ্ন ডঃ রায়ের।

— আপনি চিকিৎসক, চিকিৎসা আপনার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। তাই আপনার আপত্তি করার তো কোনো কারণ নেই। ব্যঙ্গের কশাঘাত হানেন থানা-অফিসার।

— কিন্তু থানায় তো আর রোগী দেখতে যেতে হবে না। এসেছেন তো আমায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে। তা সেটা তো কাল সকালেও করা যেতে পারে, তাতে তো কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। বিদ্রূপের প্রত্যুত্তরে বলেন ডাক্তারবাবু।

— ওহ্! সরি! থানা বলাটা আমার স্লিপ অব টাঙ্‌। থানা নয়, থানার কাছাকাছি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে এক রুগ্না মহিলাকে দেখার জন্য আপনাকে নিতে এসেছি। ব্যঙ্গের রেশ তাঁর কথায় বেশ স্পষ্ট।

বিপদের আভাস পেলেও ডাক্তারবাবু শান্তভাবে প্রশ্ন করেন, “তিনি কি খুব অসুস্থ, কাল সকালে গেলে চলবে না?”

— না ডক্টর, তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। আপনি এখনি চলুন।

— চলুন তাহলে, আমি ভিতরে একটু বলে আসি। “পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে তিনি জিপে ওঠেন। নিদ্রাতুর ভীত চোখে তাঁর স্ত্রী এসে দরজা বন্ধ করেন।

দারোগাবাবুর সঙ্গে ডাঃ রায় এসে ঢুকলেন একটা ছোটো একতলা বাড়িতে যেটা মোটেও থানার কাছে নয়। যে-ঘরে তাঁরা ঢুকলেন সেখানে একটি তক্তাপোশের উপর এক মহিলা দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছেন ও রোগীর আশেপাশে কেউ নেই। ডাক্তারবাবুর অভিজ্ঞতা তাঁকে পুরো ঘটনার অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে সচেতন করল। তিনি এগিয়ে গিয়ে রোগিনীর মুখ দেখলেন, অনাবশ্যক জেনেও রোগিনীর নাড়ি, আঙুল ও নখের রং পরীক্ষা করলেন ও স্পষ্ট বুঝলেন রোগিনীর মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়, এবং তাঁকে ডেকে আনার নিহিতার্থ তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। ধীরে রোগিনীর হাতটা নামিয়ে রেখে ওসির মুখোমুখি দাঁড়ালেন— “এই মহিলার মৃত্যু অন্তত ঘণ্টা তিনেক আগেই বিষক্রিয়ায় হয়েছে, তবে আমাকে এভাবে ডেকে আনা হল কেন?”

— ইয়েস ডঃ রায় সে-তথ্য আমার জানা আর আপনাকে ডেকে এনেছি কারণ, আমার একটা নর্মাল ডেথের সার্টিফিকেট চাই আর সেটা আপনাকেই দিতে হবে।

— অসম্ভব। গর্জে ওঠেন ডাঃ রায় “এ তো ক্লিয়ার কেস অফ পয়জনিং, মে বি মার্ডার অর সুইসাইড। আর তার তদন্ত তো আপনার এক্তিয়ারভুক্ত। আমি সার্টিফিকেট দেব না।”

— দিতে তো আপনাকেই হবে ডাক্তার। চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন ওসি, “অসম্ভবকে সম্ভব করার পদ্ধতি আমার জানা আছে।”

— আমি দেব না। দৃঢ় স্বরে জানান ডাক্তারবাবু।

এরপর ঘরের মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন ডঃ রায় আর পিঞ্জরাবদ্ধ পশুর মতো পদচারণা করতে থাকেন দারোগাবাবু। আর শয্যায় পড়ে থাকে বিষজর্জর মহিলার মৃতদেহ। এইভাবেই কেটে যায় ঘণ্টাখানেক। এবার থানা ইনচার্জ চীৎকার করে ওঠেন— “আপনি সার্টিফাই করবেন কিনা?

“কখনোই নয়।” শাণিত স্বরে উত্তর শোনা যায়।

“আপনাকে করতেই হবে ডাক্তার। না শুনতে আমি অভ্যস্ত নই।”

— আমি করব না, কী করবেন আপনি? এ্যারেস্ট করবেন? টর্চার করবেন? করুন আপনার যা খুশি। কিন্তু আমার এক কথা সার্টিফিকেট আমি দেব না।

এবার তীব্র ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে ওসির কণ্ঠস্বরে— দেবেন ডাক্তার দেবেন। দাওয়াই আমার জানা আছে। ডাক্তারকে নিয়ে এবার থানায় আসেন তিনি। এএস আই-কে বলেন, “যাও। ডাক্তারের দুই ছেলেকেই তুলে আনো।”

— এ আপনি করতে পারেন না। ডাক্তারবাবু চীৎকার করে ওঠেন।

— আমি সব পারি ডাক্তার। এখন ইমার্জেন্সি চলছে। মিসায় তুলে আনব আপনার ছেলেদের আর প্রমাণ করে দেব যে, তাদের সঙ্গে বেআইনি রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ আছে। ইচ্ছে করলে এনকাউন্টারও করতে পারি। ছাদ কাঁপিয়ে অট্টহাস্য করে ওঠেন দারোগাবাবু।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর দুই কিশোর পুত্রকে হাজতে পুরে দেওয়া হয়। তারপর চলে নির্মম অত্যাচার। ছেলেদের আর্তচিৎকারে কানে হাত চাপা দিয়ে বসে থাকেন ডাক্তারবাবু। তাদের প্রতিটি আর্তনাদ যেন তাঁকে কশাঘাতে বিদ্ধ করে। তিনি জানতেন তাঁর অস্বীকৃতির মূল্য তাঁকে চোকাতে হবে, তিনি সমস্ত দুর্যোগের কল্পনা করেছিলেন নিজেকে ঘিরে আর তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতও ছিলেন। কিন্তু কোনো নরপিশাচ যে তাঁর নিরপরাধ কিশোর পুত্র দু-টির উপর এরকম নির্মম অত্যাচার করতে পারে তা ছিল তাঁর স্বপ্নাতীত। এই দুঃসহ অবস্থায় কেটে যায় অনেকটা সময়। আর পারেন না তিনি সহ্য করতে। পিতৃহৃদয়ের অনাবিল স্নেহের কাছে মাথা নত করে তাঁর আদর্শ, চিকিৎসকের নীতি, তাঁর মূল্যবোধ। ডাক্তার কাঁপা হাতে লিখে দেন সার্টিফিকেট। অফিসারের উচ্চ হাস্যে ফুটে ওঠে তাঁর বিজয়োল্লাস। দুই পুত্র-সহ ডাক্তার মুক্তি পান ভোররাতে। অনেক কষ্টে আহত, পীড়িত দুই পুত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন যখন, তখন রাজপথে যান চলাচল শুরু হয়েছে। প্রাথমিক শারীরিক চিকিৎসার পর (মানসিক ক্ষতের চিকিৎসা করার মতো মানসিক সুস্থতা তখন তাঁর নিজের ছিল না) পুত্রদের নিয়ে তিনি যখন বিশ্রাম নিতে গেলেন, তখন তাঁর দরজায় রোগীর আগমন সবে শুরু হয়েছে। এই প্রথম তাঁর চেম্বারের দরজা বন্ধ রইল রোগীদের জন্য। কম্পাউন্ডারবাবুরা জনে জনে তাঁর অসুস্থতার সংবাদ দিতে থাকল।

শেষ পাতা

Categories
গল্প

তীর্থঙ্কর নন্দীর গল্প

ক্রম ঘূর্ণন

আজ বিকালে লহমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরবার কথা। কোথায় ঘুরবে! আনলকডাউনে দেখতে বেরবে কোন কোন মল খুলল! কী কী নিয়ম মেনে মলে ঢুকতে হচ্ছে এইসব। লহমায় সঙ্গে দেখা করার কথা পাঁচটায়। নতুন পাড়ায় বাস স্ট্যান্ডে। নালক বিকালে ঘড়ি দেখে বেরিয়ে পড়ে। এখন চারটে। রোদ অল্প কম। তাপ আছে। শরীরে কেমন চিটচিটে ভাব। বাতাসে জলীয় বাষ্প আছে। বর্ষা এসে যাবে কিছুদিনের ভিতর। লহমা আসবে তো! নাকি নতুন পাড়ায় বোকার মতন দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবে! লহমা তো গতকাল বলল আসবে। তবুও চিন্তা হয় যদি না আসে। কথা দিয়েও যদি কথা না রাখে! ইদানীং লহমা খুবই কথা কম রাখে। নালক অযথা লহমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। সময় নষ্ট করে। লহমার পাকে ঘুরতে থাকে। ঘুরে যায়।

নালক নতুন পাড়ার বাস স্ট্যান্ডে না গিয়ে সোজা বিমানবন্দরের বাস ধরে। অনেকদিন বিমানবন্দরে যায় না। লকডাউনে সব বিমান ওঠা নামা বন্ধ থাকে। লহমা যদি না আসে শুধু শুধু বিমানবন্দরে যাওয়াটাও আটকে যাবে। আনলকডাউনের চিত্রটি দেখা থেকে বঞ্চিত হবে। বাস বিমানবন্দরের প্রায় কাছে এসে থামে। নালক নামে। একটু হাঁটতে হবে। হাঁটা শুরু করে। চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বন্দর এলাকা কেমন ফাঁকা ফাঁকা। লোকজন বেশ কম। অ্যাপ ক্যাবও বিশেষ দাঁড়িয়ে নেই। ধুলোহীন বন্দর কেমন ছবির মতন ফুটে ওঠে। নালক বন্দরের এদিক ওদিক ঘোরে। একটু দূরে দুটো বিমান দাঁড়িয়ে। মনে হয় একটা ছাড়বে। নালক হাঁ করে বিমানের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছাড়ায় বিমানে মানুষ উঠে পড়ে। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। একটু পরে ধীরে ধীরে পাখা দুটো ঘুরতে শুরু করে। নালক ঘুরন্ত পাখার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকে। পাখা দুটো ঘুরে চলে। ঘুরতেই থাকে। ক্রমাগত ঘুরে যায়। নালক ক্রম ঘূর্ণন পাখা দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

বাইরের রাতটা বেশ ভালো। আধঘণ্টা বৃষ্টি হয়। গরমের ভাপটা কেটে গেছে। অরুনিমা বারান্দায় বসে দিব্যকে ফোনে ধরে। আজ দিব্যর জন্মদিন। উলটো দিকে ফোনে দিব্য। অরুনিমা প্রথমেই ফোনে একটি চুম্বন পাঠায়। আশীর্বাদের চুম্বন। বলে আরও বড়ো হও। দীর্ঘজীবী হও। সিলভিয়ার খবর নেয়। কবে আসবি জিজ্ঞাসা করে। দিব্য এক নিঃশ্বা সে মা-র সব কথা শোনে। পরে জবাব দেয় এখানে সবাই ভালো। তোমরা ভালো থেকো। আগামী বছর যাওয়ার খুব চেষ্টায় আছি। মোট কুড়ি মিনিট অরুনিমা দিব্য কথা বলে। তারপর অরুনিমা ঘরে চলে আসে। রাত এখন বারোটা। বাইরেটা আস্তে আস্তে চুপ হয়ে আসে। মানুষ ঘুমের জন্য তৈরি হয়।

অরুনিমাও তৈরি হতে শুরু করে। রাতে। ঠাকুর দর্শন এক দীর্ঘদিনের অভ্যাস। দর্শনের পর আসনের পর্দা টেনে দেয়। ঠাকুরও অরুনিমার সঙ্গে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। সামনের বছর হয়ত দিব্য নিশ্চয়ই আসবে। আজ যখন বলল চেষ্টা ঠিকই করবে। অরুনিমা বাথরুম সেরে ঘরে ফিরে আসে। মশারি টানায়। এক গ্লাস জল খায়। মাথার ওপর পাখাটা বনবন করে ঘোরে। রাতে এই পাখাটা থেকে ঠান্ডা হাওয়া নামে। সেই ঠান্ডা হাওয়ায় অরুনিমার জোড়া চোখে ঘুম নামে। সেই ঘুম রাত কাটিয়ে ভোরে এসে থামে। অরুনিমা ঠান্ডা পাখার হাওয়ায় শান্তিতে পুরো রাতটা কাটায়।

পাখাটা বোধহয় দিব্যই কিনে ছিল। বহু বছর আগে। পাখার বয়স এখন পনেরো বছর হবেই। দিব্য তখন এই শহরেই। প্রথম চাকরিতে ঢোকে। মাইনের প্রথম টাকাতেই দুটো পাখা কেনে। পাখা দুটোও অত্যন্ত ভালো। এখনও ভালো মতন ঘোরে। পাখা দুটো ঘোরার সময় ব্লেডে কোনো আওয়াজ বা শব্দ হয় না। খুব মসৃণভাবে ঘোরে। অরুনিমা পাখার মসৃণ ঘূর্ণন দেখতে দেখতে বিছানায় ঢুকে পড়ে। মাথার ওপর ঘুরতে থাকে মসৃণভাবে তিনটে ব্লেড। অরুনিমা ঘুরন্ত ব্লেড দেখতে দেখতে দিব্যর কথা ভাবে। দিব্যর চেহারা মনে পড়ে। পাখাও ঘুরতে থাকে। পাখার ক্রম ঘূর্ণনে অরুনিমার চোখে ঘুম এসে যায়।

অনুষ্টুপ দু-দিনের জন্য কাছে পিঠে কোথায় বেড়াতে যেতে চায়। মনটা একদম ভাল নেই। ইন্টারভিউ দিতে দিতে ক্লান্ত। তাই বন্ধু পপকে নিয়ে কোথাও যেতে চায়। এই শহরের ধারে কাছে বলতে ওই সমুদ্র। চার ঘণ্টার মতন লাগে। পপকে ফোন করে। শনিবার সমুদ্রে যাবি! পপ রাজি হয়ে যায়।

আজ ভোরের ট্রেন অনু্ষ্টুপ আর পপ সমুদ্র স্টেশনে নামে। নেমে হোটেল খোঁজে। বিচের সামনেই হোটেল পায়। দোতলার ঘরটি যেন সামুদ্রিক হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। ঘরটিও বেশ বড়। জানালা দিয়ে উইন্ড মিল চোখে পড়ে। উইন্ড মিল হাওয়ায় ঘুরতে থাকে। ব্রেকফাস্ট করেই পপ আর অনুষ্টুপ বিচে আসে। প্রচুর ছোটো বড়ো লাল কাঁকড়া বালি মাঠে ঘোরাঘুরি করে। দৌড়াদৌড়ি করে। পায়ের শব্দে সঙ্গে সঙ্গে বালু সুড়ঙ্গে হারিয়ে যায়। সমুদ্র ঢেউ বালি মাঠে এসে ভেঙে ফেনা গুঁড়ো হয়ে পড়ে। পপ আর অনুষ্টুপ গুঁড়ো ফেনা টপকে টপকে সমুদ্রের কাছে আসে। শরীরে ঢেউ মাখে। ঢেউ ভাঙে। ঢেউ টপকে আরও ভিতরে যায়। সিঁড়ির মতন সারি সারি ঢেউ আসে। ঢেউ চলে যায়। পপ আর অনুষ্টুপ যেন সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উঠতেই চায় না। একেই কী বলে যুবকের ধর্ম! জানি না।
বিকালে পপ আয় অনুষ্টুপ সম্রাট হোটেল থেকে বেরিয়ে আবার বিচে আসে। এখন বিচ অনেক শান্ত। মানুষজন কম। লাল কাঁকড়ারা বালুসুড়ঙ্গে ঘুমিয়ে। জানি না লাল কাঁকড়াদের সঙ্গমক্ষণ কখন! সন্ধ্যেবেলায়! না গভীর রাতে! অনুষ্টুপ বালি মাঠ ধরে সমুদ্রে এগোয়। ভাবে আবার কোথায় কবে ইন্টারভিউ দেবে। সব ইন্টারভিউই তো ব্যর্থ। চাকরি কি পাব না। অনুষ্টুপ আর পপ হাল্কা পানীয় নেয়।সমুদ্রের জলকে কত গম্ভীর দেখায়। গম্ভীর গর্জন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অনুষ্টুপের জোড়া কানে সেই গর্জন যন্ত্রণার মতন ঠেকে। সামনে ছায়ার মতন উইন্ডমিল। উইন্ডমিলের পাখা ঘুরে চলে। অনুষ্টুপ ভাবে পরের ইন্টারভিউতে আরও ভালভাবে তৈরি হয়ে যাবে। কোনো ফাঁক ফোকর যেন না থাকে। গর্জনের যন্ত্রণাশুনতে শুনতে দুজনে হাঁটতে থাকে। অনুষ্টুপ টের পায় উইন্ডমিটলের খুব কাছে যেন চলে আসে। চোখের সামনে মিলের পাখা ঘুরতে থাকে। সেই ক্রম ঘূর্ণন পাখার দিকে তাকিয়ে অনুষ্টুপ কেমন খেই হারিয়ে ফেলে। সমুদ্রের খুব কাছে চলে যায়।

বিয়ের পর দু-বার তমনার সঙ্গে দেখা হয়। প্রথমবার বড়বাজারের কাছে। তমনা শাড়ি কিনতে আসে। একাই। রেমন তমনাকে দেখে চোখ সরাতে পারেনি। চোখে চোখ আটকে যায়। কিছুক্ষণ বাদে দু-জনেই হেসে ফেলে। সেদিনই নতুন ফোন নাম্বারটা রেমন নেয়। দ্বিতীয়বার দেখা হয় বিয়ের চার বছর বাদে গোলপার্কের কাছে। তমনাকে দেখে সেদিন বেশ ভারী লাগে। রং যেন ফেটে বেরয়। রেমন তমনার ভারী চেহারা দেখতে দেখতে দত্তাবাগানের সেই ছোটো মেয়েটির কথা মনে পড়ে। ছোটো তমনা। তারপর রেমন তমনাকে নিয়ে চায়ের দোকানে ঢুকে গল্প করে। চা বিস্কুট খায়। টোল খাওয়া গালে একবার টোকাও মারে। তমনা লজ্জায় রঙিন হয়ে পড়ে। ফিরে যাওয়ার সময় রেমন বলে ফোন করব কিন্তু। তমনা রেমনের কথা শুনে হাসে। বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

রেমন কিন্তু ফোন করে। বহুবার। কিন্তু তমনা দেখা করেনি। একদিনও না। তবুও রেমন আশা ছাড়ে না। ভাবে তমনা ঠিকই কোনওদিন দেখা করবে। তমনাকে শৈশব থেকেই চেনে। অফিস থেকে রেমন আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোয়। বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করে। রাস্তায় বাস কম। তাছাড়া গাদাগাদি করে এই কঠিন সময় বাসে ওঠাও খুব বিপদের। এখনও মারণ ব্যাধির কোনো ওষুধ বেরোয় না। রেমন লালদিঘির কাছে এসে থামে। হাঁটার জন্য একটু ক্লান্তিও লাগে। তমনাকে একটা ফোন করবে! বলবে কি এই লালদিঘির কাছে চলে এস। দু-জনে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে বাড়ি চলে যাবে। ফোন করলেই কি তমনা আসে! আগে এসেছে কখনো!

রেলিঙের ধারে হাতে খেলনা বন্দুক নিয়ে এক বেলুনওয়ালা বসে ঝিমোয়। গোলাকার বড়ো চাকতিতে আটকানো থাকে নানা রঙের বেলুন। সবুজ মেরুন লাল নীল। রেমন গোলাকার চাকতির কাছে এসে বেলুন দেখে। ইচ্ছা করে সব বেলুনগুলো বন্দুকের গুলি দিয়ে ফাটিয়ে দেয়। বেলুনওয়ালা রেমনের হাতে বন্দুক তুলে চাকতিটা ঘুরিয়ে দেয়। বহুবর্ণের বেলুন নিয়ে চোখের সামনে চাকতি ঘুরতে থাকে। জোরে জোরে ঘোরে। রেমন চোখের সামনে ক্রম ঘূর্ণন চাকতির দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকে। হাতে বন্দুক থেকে যায়। কোনো গুলি বেরয় না। বেলুন ফাটে না। শুধু ঘুরে যাওয়া চাকতির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েই থাকে।

প্রথম পাতা

Categories
গল্প

তীর্থঙ্কর নন্দীর গল্প

ক্রম ঘূর্ণন

লোকে বলে হাওয়া থাকলে শিশুদের হাতে মেলা থেকে কেনা চড়কি পাখা ঘুরতে থাকে। মেলা থেকে ফেরার সময় শিশুরা বাবা মা-র হাত ধরে বাড়ি ফেরার পথে চড়কি পাখার ঘূর্ণন দেখে খুব মজা পায়।