Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

জয়ন্ত ঘোষালের প্রবন্ধ

‘এই রহস্যকে সহ্য করতে হচ্ছে’

অন্তর আর বাহির। আশাকরি তাঁর নগ্নতার প্রেক্ষিতটা কেমনভাবে দেখা উচিত কিছুটা বোঝা গেল।

উওমেন স্টাডিস, সোসিওলজি এইসব ডিসিপ্লিনের পোকা মাথায় রেখে লাল দেদের বাক পড়তে গেলে খণ্ড দর্শন হবে। তিনি দল গড়েননি, ভক্তও দলও নন। তিনি মুখে মুখে বাক রচনা করেছেন কিন্তু প্রথাগত ঢং-এ কাব্য লেখেননি। কিন্তু মুখে মুখে যা বলেছেন সেইসব বাকের কাব্য সুষমা বজায় রাখতে একজন সচেতন কবির সৃষ্টির মতোই শব্দের নিপুণ প্রয়োগ করেছেন, ছন্দ বেঁধেছেন। তাঁর বাক গভীর দর্শন ও ভাবের সুতোয় গড়া তবু প্রথাগতভাবে তিনি কবি বলে পরিচিত নন তার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন কবীরও তো দোঁহা বলার কারণে নিছক কবি পরিচয়ে সুখ্যাত নন কিন্তু তাঁর দোঁহা কী কাব্য মাধুর্যহীন? হলে’তো কেবল একজন গুরুর মতাদর্শের দাসত্ব করার কারণেই অনেক আগেই লোকমানসের হৃদয় থেকে ঝরে যেত। লাল দেদ, কবি এবং একজন ইন্টেলেকচুয়ালের সব বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতায় শিশুকাল থেকে একটি নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিনের মধ্যে বড়ো হয়েছেন এবং সেই পরম্পরার টানে সাধিকা হয়েছেন, কিন্তু সেটা ছিল তার জীবনের অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু একজন একাধারে বড়ো কবি ও ইন্টেলেকচুয়াল তো কোনো ডিসিপ্লিনকে নিছক রিপ্রেজেন্ট করে ক্ষান্ত হতে পারেন না, সে-সব বিপ্লবী বা রিফর্মিস্টদের কাজ। এমন মন নিয়ে অনেকেই লাল দেদ, কবীর পড়েন, কিন্তু বিশ্বাসের কাব্যময়তাকে না বুঝে আবোলতাবোল বলেন, লেখেন।

“ইম পাড় লাল্লি ভা’নি তিম হৃদি আঁখ”

লাল্লা যা বলেছে—

“তোমার হৃদকমলে তা আখর চিহ্ন হয়ে আছে”

এরপরে যেটা বলার লাল দেদ গান লেখেনেনি এবং তিনি যে গান গাইতেন এমন কোনো তথ্য কোনো মান্য সংকলনে নেই। অনেক পরে মুখে মুখে চলে আসা তাঁর বাক কাশ্মীরের সুফিয়ানা কালাম-এ গীত হত, তার মানে এই নয় এগুলো গান অথবা লাল দেদ গান গাইতেন। জয়লাল কাউলের কথায়, “কখনো কখন গ্রীয়ারসন বাকগুলোকে, গান বলে উল্লেখ করেছেন। এটা বলা দরকার যে-কোনো পদ এবং সে-প্রেক্ষিতে, বা কোনো টেনে আনা গদ্যাংশও সুর লাগিয়ে গীত হতেই পারে, এবং তা গানে পর্যবসিত হয়, কিন্তু যে-অর্থে নানকের স্তব গুরুবাণী, বা মীরার ভজন বা অন্যান্য ভক্তিবাদী সাধক-কবিদের গান, সেই নিরিখে লাল দেদের বাক গান হিসেবে গীত হবে সেই উদ্দিষ্টের কারণে ‘গান’ নয়। বা বলা যেতে পারে প্রচলিত লোকগান (চকরি) বা কাশ্মীরি ভস্তন গানগুলো যেমন নিজেরাই শিল্পানুগ জিগিরেই গান হয়ে ওঠে, এই বাকগুলো নিজেরাই গান হয়ে ওঠে না। লাল দেদের বাকগুলো প্রধানত ভারী ভাবনার নিগূঢ়তায় আর গভীরতায়, কিন্তু সে-অর্থে সাংগীতিক গুণসম্পন্ন নয়। এগুলো গান হয়ে বিস্ফোট ঘটানোর চেয়ে আমাদের অন্তরের দিকে তাকাতে বলে, বলে চিন্তা করতে আর প্রতিবিম্বিত হতে। যদিও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাকগুলি প্রায়শই আমাদের আতুর অনুভবকে নাড়া দেয়।”

“আমি সাতবার হ্রদটিকে দেখেছি শূন্যে উধাও হয়ে যেতে”

কাশ্মীরি ভাষাকে গড়ে তোলার গড়ার কারিগর হিসেবে, এবং ভাষা ও সাহিত্যে এই দুই ক্ষেত্রে লাল দেদের যা ভূমিকা তার প্রেক্ষিতে আধুনিক কাশ্মীরির জননী হিসেবে লাল দেদকে দাবি করার যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কারণ আছে। কেবল মাত্র কালানুক্রমে নয়, বরং আধুনিক কাব্যের মেজাজ ও শৈলীর নিরিখে তিনি কাশ্মীরি ভাষার আধুনিক কবিদের মধ্যে প্রথমা। তাঁর কবিতা আধুনিক, কারণ তা জায়মান আজও। বস্তুত তিনি কাশ্মীরিদের, তাঁদের মাতৃভাষাকে এবং গণজন হিসেবে নিজেদের আত্মাকে আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছেন। লাল দেদের জীবনকালের পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে কাশ্মীরি ভাষা হয়তো সুলতানদের বা সামন্ত প্রভুদের কৃপা পায়নি, হয়তো এটি সরকারি ও উচ্চকোটির ভাষা, ফারসির, দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও একে দাবিয়ে রাখা যায়নি, কারণ, এর পিছনে ছিল গণজনের সমর্থন এবং লালা দেদের বাকের প্রভাবে, সাধারণ কাশ্মীরি লোকেরা, যারা এতদিন নিজেদের মাতৃভাষায় লেখা পদগুলোকে কেবল গুপ্তবিদ্যা মনে রাখার কারণে, অথবা সেইসব গুপ্তবিদ্যাকে ধরে রাখতে, স্মৃতিবৃদ্ধির ব্যবহারিক হিসেবে লিখত, তাদের গভীরতম ভাবনা আর অনুভবকে নিজেদের মাতৃভাষায় ব্যাক্ত করতে, ব্যবহার করতে শুরু করল। সে-কারণেই হিন্দু কী মুসলমান এমন একজনও কাশ্মীরি নেই যার জিভের ডগায় লালা দেদের কোনো-না-কোনো বাককে খুঁজে পাওয়া যাবে না, অথবা এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে না। লালা দেদের বাকেই প্রথমবার কথ্য ও লৌকিক কাশ্মীরি ভাষা ও বুলি, ধর্মীয় বা রাজকার্যের ধরাবাঁধা পথে নয়, ব্যবহৃত হয়েছিল আকাঙ্ক্ষা, অভিজ্ঞতা ভাবনা ও অনুভবকে ব্যক্ত করতে। জয়কাল কাউলের ভাষায়, “উচ্চকোটির সঙ্গে সাধারণের, বিশেষত সাধারণের নিজেদের মধ্যে, যোগাযোগের তিনি নতুন নতুন প্রণালী খুলে দিয়ে ছিলেন। তাঁর গুরুত্ব কেবলমাত্র ঐতিহাসিক নয়। অন্তর্নিহিত কারণ হল, তিনি কাশ্মীরি ভাষার আজও অবধি মান্য অগ্রগণ্য কবিদের একজন হিসেবে রয়ে গেছেন এবং কাশ্মীরি ভাষার এক কারীগর, যা একজন অসাধারণ মৌলিক কবিই পারেন, এমন একজন কবি যাঁর কবিত্ব, স্যার রিচার্ড টেম্পলের ভাষায় ‘বহ্নিমান, পোড়ায় এমন এক ভাবনার রক্তিম আগুন।” আর গ্রীয়ারসনের বিচক্ষণ পর্যবেক্ষণে, লাল দেদের বাক হল, “পূর্বে কেবল যা তত্ত্বে আবদ্ধ ছিল তেমন এক ধর্মের বাস্তবিক অনুশীলন করে দেখানো, প্রাণবন্ত ও চিত্রল ভাষার এক বিবরণে। ভারতবর্ষের অন্যতম অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রণালীর ভবিষ্যতের ইতিহাস রচনার প্রামাণিকতাকে কায়া দিতে, যা অবশ্যই ভিত্তি গড়ে দেবে, এর অবদান অনন্য। এখানেই আধ্যাত্মিকতার দস্তাবেজ বা প্রমাণ হিসেবে এর স্বাতন্ত্র্য নিহিত, এবং আপনি যদি, একইসঙ্গে কবিতা ও আধ্যাত্মিকতার ব্যবহারিক মূল্যের প্রতি তীব্র অন্বেষী হন, তবে মৌলবী রুমির ভাষায়, নিহিত যা—

“এমন দৃষ্টি দিয়ে, যা বাকের শক্তিকে বৃদ্ধি করে
অনুপ্রাণিত বাক দিয়ে, যা দৃষ্টিকে আরও তীক্ষ্ণ করে।”

এবং এটা আমাদের হৃদয়ের গরাদহীন জানালাগুলো খুলে দেয় আত্মার “পরিরেখাহীন অপরিমেয় দৃশ্যমানতা”-র দিকে।

লাল দেদ কোথায় আলাদা, এটা বুঝতে তাঁর মানস-শিষ্য নুর-উদ-দিন ঋষি বা নুন্দ ঋষির সুরুখ বা বাকের (যা ঋষিনামা বা নুরনামা পুঁথি হিসেবে লিখিত হয় নুন্দ ঋষির মৃত্যুর প্রায় দু-শো বছর পরে, এবং সুফি সাধকদের ক্ষেত্রে এমনটা প্রায়শই হতে দেখা গেছে) সঙ্গে তুলনা করলে দেখব, বিষয়ের দিক থেকে তাঁর সুরুখ ছিল মুখ্যত নীতিমূলক এবং স্বরের দিক থেকে উপদেশমূলক যেখানে তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জীবনের অনিত্যতা নিয়ে বলেছেন, বলেছেন এর সুখময়তা নিয়ে এবং মানুষকে আত্মসংযম ও ভক্তি কীভাবে কর্ষণ করতে পারে সে-ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রাজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি আর বলিষ্ঠ কথনে ঋদ্ধ করেছে ভাষাকে এবং প্রবাদতুল্য হয়ে উঠেছে। রহমান রাহির ভাষায়, “কিন্তু লাল দেদ হলেন আলাদা: এ হল আন্তরকিতার মোহর ছাপ আর রহস্যালোপদ্ধির প্রাবল্য আর কাব্যিক প্রকাশের সত্যতা, যা প্রকাশিত হয়েছে বাগধারার শক্তিতে, এবং ঘরোয়া কিন্তু বাহুল্যবর্জিত বাক্যালংকার আজও অতুলনীয় যা তাঁর বাককে মানুষের মনে ও কাশ্মীরি সাহিত্যে চিরায়ত করেছে… তাঁর বাকে পাই রহস্যময় সত্যের প্রতি এক স্বপ্রত্যয়নকারী প্রগাঢ় চেতনাকে, যা ঈশ্বর-উপলদ্ধিকারী সন্তের পরিচায়ক।” রহমান রাহি, আরও স্পষ্ট তুলনা টেনেছেন তার ভাষায়, “এমনকি শেখ নুর-উদ-দিন’এর বাক, যাকে সুরুখ বলে, ভাবের দিকে ভাসা ভাসা এবং বিষয়বস্তু লাল দেদের বাকের সঙ্গে মেলে, যদিও লালা দেদের বাকের সঙ্গে তুলনীয় নয়। লাল দেদের বাক যাপিত আলিঙ্গন, যেখানে শেখের সুরুখ গতায়ু ছাইয়ের স্ফুলিঙ্গ। উভয়ের প্রেক্ষাপট হয়তো প্রায় এক কিন্তু কাব্যিক ভাষা নির্মাণে, কিছু একটা প্রভাবিত করেছে যা বিরাট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে এই দুই রহস্যবাদী কবির। শেখের সুরুখে যতটা নীতিমূলক ততটা জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলে না, তাঁর সুরুখ আমাদের মর্মে আঘাত করে হৃদয়ে আলোড়ন তোলে না। যে-উপমা ও রূপক তিনি ব্যবহার করেছেন তা বিশদকারী ও ব্যাখ্যামূলক কিন্তু যাপিত অভিজ্ঞতার প্রাঞ্জল প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি।” “এর বাইরেও, ছন্দোগত তফাত আছে, লাল দেদের বাকের তুলনায়, সুরুখগুলো অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নির্ভুল, স্পষ্টত ফারসি বাহার (মাত্রিক)-এর ধাঁচায় নির্মিত। লাল দেদের বাকগুলো অনেকখানি নমনীয় ও শিথিল, এবং স্যার গ্রীয়ারসন তাঁর বাকে বাচনভঙ্গির (শ্বাসাঘাতের) ওপর জোর দেওয়াটাকে বুঝতে পেরেছেন, প্রতি প্যারা বা লাইনের ওপর চারবার শ্বাসাঘাত। যদিও লালা দেদের বাকের ক্ষেত্রে যা হয়ছে তা নুন্দ ঋষি বা অন্যদের ক্ষেত্রেও হয়েছে, অর্থাৎ, অনুগামীরা, চারণেরা, নকলনবীশিরা, নুন্দ ঋষির মৃত্যুর সময় থেকে দু-তিনশো বছর গত হবার পরেও যখন সুরুখগুলো নুরনামায় লিখিত হল, সেই একই দূষণ ঘটিয়েছিল। পরিচিত শব্দ দিয়ে মূল শব্দের বদল, এমনকী কখনো আরও ‘উত্তম’ কোনো শব্দ, যেমন, এমনটা একটা শব্দ যা ধর্মীয় গোঁড়ামির পক্ষে বেশি উপযুক্ত, এতে সুরুখটিকে ছন্দের দিক থেকে আরও নির্ভুল করে তোলে, যদিও তা পদটির অন্তর্গতভাবকে উন্নতভাবে প্রকাশ করতে দরকারি ছিল না।

“সুই মাস মে’ লাল্লি কভ পানুনুই বাক”

“আমি, লাল্লা, আমি নিজের বাকের সুরা পান করেছি।”

মানুষ পুরোনো কিছু রাখে না, লাল দেদ প্রাচীন কিন্তু পুরোনো হয়নি, যেমনটা পাহারের গুহার ছবি প্রাচীন কিন্তু পুরোনো হয়নি বলে দেখি, আর এটাই চলমান নতুনত্ব। লাল দেদের কবিতা মধ্যযুগের অন্যান্য ভক্তিবাদী কবিদের বচন বা কবিতা থেকে আলাদা, তিনি কৃষ্ণের বঁধুয়াদের, যেমন দক্ষিণ ভারতের সন্ত অন্ডাল এবং রাজপুতানার রাজকুমারী মীরার প্রেক্ষিতে ছিলেন এক সম্পূর্ণ বিপরীত গোত্রের। তিনি সম্ভবত, আমরা বলতে পারি, সমস্ত ‘স্ত্রী’ ঈশ্বর অন্বেষীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুরুষালী। ভক্তিবাদী কবিতার চেয়ে বরং লালা দেদের অবদান হল আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সংকলনে আর অন্তরদৃষ্টিতে। তিনি লোকজনকে অনায়াসে প্রাপ্ত কোনো ধর্ম দেননি, তিনি যাকে বলে, “অনতিশীল সন্ত-কবি” ছিলেন না। তিনি মধ্যযুগের প্রথম নন বরং প্রাচীন ভারতের সন্তদের শেষ প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁর বাক অনেকখানি উপনিষদের মতো, ডঃ ভি রাঘবন যেমন বলেছেন, “‘মধ্যযুগের সন্ত-কবিদের’ ভক্তিবাদী গানের মতো নয়, বরং প্রবচনাত্বক এমনকী কখনো বিরল আধ্যাত্মিক পর্যবেক্ষণে অঙ্গীভূত রহস্যপূর্ণ।” লাল দেদের বাক যাপিত আলিঙ্গন, মধ্যযুগের অন্যান্য ভক্তিবাদী সন্তদের প্রেক্ষাপট হয়তো প্রায় এক কিন্তু লাল দেদের কাব্যিক ভাষা নির্মাণে, কিছু একটা প্রভাবিত করেছে যা বিরাট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে অন্যান্যদের থেকে। লাল দেদের জীবনের কেন্দ্রীয় ঘটনা হল প্রতিভাস, তার সর্বোত্তম পাওয়া, কিন্তু তিনি সেখানেই থামেন না। তবুও তিনি যেন নিজের সঙ্গে তর্ক জোড়েন, এই রহস্যকে সহ্য করতে হচ্ছে, কিছু একটা আছে, যা আমাদের জানতে হবে। জয়লাল কাউলের ভাষায়, “… তাঁর বাকের ছন্দ অনেক অবিন্যস্ত আর অন্তমিলের বিন্যাস অনেক বেশি অসম। এ-কারণে সম্ভবত অনুমানপূর্বক ঝুঁকি নিয়ে বলা যায় লাল দেদের বাক, এমনি মূলের গঠনেও, কাশ্মীরি ভাষার পুরোনো থেকে নবরূপে রূপান্তরে একটা গুরুত্বপূর্ণ আখর চিহ্ন… নিছক ভাবনা কী মতবাদ বা অভিজ্ঞতা কবিতা নয়। তারা তখনই কবিতা হয়ে ওঠে যখন কবির কল্পনার “শরীরি জোর” থাকে, সেটাই সে-সবকে মূর্ত করে, এবং “আকার দেয়”। এখানে কল্পনা ভিন্ন চেহারায় গভীর আধাত্মিকবোধের শব্দ ও রূপকে আর তাদের দীপ্তিতে একজনের অনুভূত সংবেদনশীলতা দিয়ে প্রকাশিত। এছাড়া অন্য আরেকটা ভাব আছে যা সত্যি। তাঁর বাকগুলো বারে বারে পড়লে, অন্তরে একটা শ্রদ্ধার ভাব উদ্ভুত হয় এবং শোধনের নীরব প্রক্রিয়ায় গহন আত্মোপলব্ধি জায়গা করে নেয়।” সে-কারণেই তাঁর প্রভাব এমন কালোত্তীর্ণ ও সুদূরপ্রসারী, যদিও তিনি কোনো কৌম, উপদল বা সম্প্রদায় গড়েননি, যেখানে তাঁর অগ্রপথিক, মহান শৈব দার্শনিক ও গুরুরা একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ ছিলেন। লাল দেদ এক পৃথক গোত্রের যাঁর কাছে জীবন তার অর্থ হারিয়েছে, আর মৃত্যু হারিয়েছে তার আতঙ্ক। লাল দেদের স্বয়ং এই ব্যাপারে প্রতক্ষ্য উপলব্ধি ছিল, ‘সহজ’, সবকিছুকে নিয়ে, এক সত্তার মধ্যে সার্বিক ঐক্যের একাত্মতা। “তসু না বো না ধ্যায়ে না ধ্যান…” এখানে না সে আছে, না আমি/না, ‘ভঙ্গি চিন্তার’,/না দরকার নেই ধ্যানের,/এমনকী সবকিছুর স্রষ্টাও ভুলে গেছেন।

লাল দেদ সাহিত্যে বা দর্শনে ইচ্ছাকৃত কোনো অবদান হিসেবে বাকগুলো রচনা করেননি, না তিনি গেয়েছিলেন এইসব বাক, না ভক্তিমূলক শ্লোক বা গান কীর্তনের জন্যে কিছু করেছিলেন, যেমনটা করেছিলেন পরবর্তীর সাধক-গায়কেরা। তিনি না ছিলেন ধর্মপ্রচারক বা সংস্কারক। তাঁর বাকগুলো ছিল প্রধানত তাঁর আত্মার প্রসারণ, তাঁর অন্তরের অভিজ্ঞতার এক প্রকাশ, বা কখনো, সেটা যদিও খুবই কম ঘটেছে, তা হল তাঁর চারপাশের বহির্জগতের ঘটমানতা। এ হল আন্তরকিতার মোহর ছাপ আর রহস্যোপলদ্ধির প্রাবল্য আর কাব্যিক প্রকাশের সত্যতা, যা প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনন্যসাধারণ বাগধারার শক্তিতে। ঘরোয়া কিন্তু বাহুল্যবর্জিত, এক অতুলনীয় বিভা তাঁর বাককে মানুষের মনে ও কাশ্মীরি সাহিত্যে চিরায়ত করেছে। তিনি শিব ও শক্তিকে দূর থেকে অমৃত সারসের মতো মিলিত হতে দেখেন কিন্তু তিনি সেখানেই থামেন না। প্রকৃতি আর পুরুষ, নাম আর রূপের সদা পরিবর্তনের প্রকাশ আর স্ব-স্থায়ীত্বের নির্লিপ্ততার সাক্ষী হওয়া, সম্পূর্ণ দুটো অসম বাস্তবতা নয়, না অখণ্ড চিৎ নিষ্ক্রিয়। লাল দেদের ‘স্বয়ং’-এর ব্যাপারে প্রতক্ষ্য উপলব্ধি ছিল, ‘সহজ’। সবকিছুকে নিয়ে, এক সত্তার মধ্যে সার্বিক ঐক্যের একাত্মতা। তিনি বলেন—

“তারপর, আমি ভেতরের আলো বাইরে ঝাড়লাম।”

না, লাল দেদ বিতৃষ্ণা থেকে মানব শরীর অন্তর্নিহিত পাপী এবং দুষ্ট এমন কিছু বলেন এবং না তিনি কঠোর সংযম বা শরীরের রিপুদমনের পরামর্শও দেন, বরং বলেন—

“শীত থেকে বাঁচতে কাপড় চাপাও
খুদা নিবৃত্ত করতে খাবার খাও”

তিনি বলেন শরীর আধ্যাত্মিক বিকাশের এক যান, এটা একটা ধর্মাক্ষেত্র, ধর্মের জমিন।

“যখন বেঁচে, তখন তাঁকে দেখতে পাও না
তবে মরার পর তাঁকে দেখবে কেমনে”

অথবা

“এটাই ঈশ্বরের আবাস
আমি দেখেছি তাঁকে আমার নিজের গেহে”
‘এই যে শরীর’ তিনি বলেন, “এর আলো আর দ্যুতি আছে।”

প্রথম পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

জয়ন্ত ঘোষালের প্রবন্ধ

‘এই রহস্যকে সহ্য করতে হচ্ছে’

“সামসারাস আয়াস তাপসি
বোধা-প্রকাশা লো বুম সহজ”

“এসেছি বসুন্ধরায় এক তপস্বিনী আমি,
‘আমি’-র পথে ‘বোধ’ আলো দেখিয়েছে আমাকে”

লাল দেদের সঙ্গে কিংবদন্তি আর আশ্চর্য গল্পের সহবাস জন্ম থেকেই। পণ্ডিত আনন্দ কাউল (১৮৬৮-১৯৪১), তাঁর জন্ম সম্পর্কিত এমন কিছু অদ্ভুত কিংবদন্তি সংগ্রহ করেছিলেন। যেমন, তাঁর পূর্বজন্মে লাল দেদের বিয়ে হয়েছিল পানদ্রেনথানের জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে, যেখানে তিনি এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। সন্তান প্রসবের এগারোতম দিন, কহ্নেথুর অনুষ্ঠানে, তাঁদের পারিবারিক পূজারী সিদ্ধা শ্রীকান্তকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘এই শিশুটা আমার কে?’— ‘কেন?’, সিদ্ধা বলেন, ‘এ তো তোমার ছেলে’।— ‘না’, লাল দেদ বলেন, ‘আমি অতি সম্প্রতি মারা যাব আর মারহম গ্রামে এক বাচ্চা ঘোটকি হয়ে জন্ম নেব, এই এই চিহ্ন নিয়ে। যদি আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর জানতে উৎসুক হন, এক বছর পরে মারহম গ্রামে এসে দেখতে পারেন।’ শ্রীকান্ত সেই গ্রামে গিয়েছিলেন এবং সেখানে সেই চিহ্ন-সংবলিত বাচ্চা ঘোটকির সন্ধানও পান। তাকে প্রশ্ন করতেই, সেই বাচ্চা ঘোটকি তাঁকে বলল যে, সে এখুনি মারা যাবে। সে বলে, আরও ছয় মাস পর ভেজিব্রর গ্রামে কুকুরছানা হয়ে সে জন্ম নেবে আবার, আর তিনি সেখানে গিয়েই তখন তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেতে পারেন। অবিলম্বে, হঠাৎ করে, নিকটবর্তী ঝোপ থেকে একটি বাঘ তীব্র বেগে এসে বাচ্চা ঘোটকিটিকে খেয়ে ফেলে। শ্রীকান্তের উৎসুকতা অত্যন্ত প্রবুদ্ধ হয়ে পড়ায়, তিনি কেবল ভেজিব্রর গ্রামে নয় তাঁকে অনুধাবন করতে যেখানে চিহ্ন-সংবলিত কুকুরছানা দেখতে পাওয়া গেল সেখানে গেলেন আর সেখানে গিয়ে তিনি কুকুরছানাটিকে আবার কোন জন্মে অন্য কোথায় দেখা হবে, এই প্রশ্ন করতে লাগলেন, আর এটা চলল তাঁর ষষ্টজন্ম অবধি। তারপর, সপ্তমবার, লাল দেদের পুনর্জন্ম হল পানদ্রেনথানের সেই একই পরিবারে, যেখানে তিনি প্রসবের এগারোতম দিবসে মারা গিয়েছিলেন। যেখানে বারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হল পাম্পোরের দ্রাঙ্গাবালমহলে বসবাসকারী নিচাভাট নামের ব্রাহ্মণ পরিবারের এক যুবকের সঙ্গে। যে-পাম্পোর হল রাজা অজতপুরার মন্ত্রী পদ্মর (৮১২-৮৪৯ খ্রিস্টাব্দ) স্থাপন করা প্রাচীন পদমপুর। এটা তখন, যখন তাঁর বাপের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে, বধূবেশী লাল্লা শ্রীকান্তকে ফিসফিসিয়ে বলেন: ‘ছেলেটি আমার কোনো এক পূর্বজন্মে আমার কোলে জন্ম নিয়েছিল, আপনি জানেন সেই আজ এখানে আমার বর।’ শ্রীকান্তের সব মনে পড়ে যায় আর বিস্মিত হয়ে পড়েন।

সন্তবৃত্তের কিংবদন্তিগুলোর সূত্রের খোঁজ পাওয়া অথবা তাদের গুরুত্ব, যদি কিছু থাকে, অনুধাবন করা সবসময় সহজ হয়ে ওঠে না। মৃত্যুর পরে আত্মার দেহান্তরপ্রাপ্তি এবং পুনর্জন্মে লাল দেদ বিশ্বাস করতেন। তাঁর বাকেও নিজের পূর্বজীবনের ঘটনাবলির উল্লেখের নজির আছে। এই নিত্য সময়কালের ধারায় তিনি স্মরণ করেন, তিনি জগতের এবং অন্যান্য সব বিদ্যমান বস্তুর লয় প্রত্যক্ষ করেছেন, প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের পুনর্গঠনও। আরও অনেক কিংবদন্তি আছে লাল দেদকে নিয়ে, যেমন, শ্রীকান্ত ‘চান্দ্রায়ণ’ নিয়েছিলেন, এ হল চল্লিশ দিনের উপবাস আর রিপু দমনের উগ্র প্রায়শ্চিত্ত। একদিন সকালে লাল্লা তাঁর বাড়ি আসেন এবং জিজ্ঞেস করেন কোথায় ছিলেন তিনি। তিনি ধ্যানে মগ্ন ছিলেন এ-কথা জানার পর, লাল্লা মৃদু বিদ্রূপের সঙ্গে বলেন, ‘হ্যাঁ, দেখছিলাম তার ঘোড়াটা লাথাচ্ছে নন্দমার্গের তৃণভূমিতে।’ সামান্য ভিন্ন আরেকটি মন্তব্য পাওয়া যায়, ‘হ্যাঁ, নন্দমার্গে তার ঘোড়াটাকে নুন খাওয়াচ্ছিল।’ শ্রীকান্ত তার মন্তব্য শুনে অপমানিত বোধ করলেন, কারণ, তাঁর মন সত্যিই উদ্বিগ্ন ছিল এই ভেবে যে, গ্রীষ্মকালে তৃণভূমিতে তাঁর ঘোড়াটাকে অন্য একটা ঘোড়া লাথি মারছে। তারপর লাল দেদ সিদ্ধাকে প্রায়শ্চিত্ত প্রকৃত কেমন হওয়া উচিত তার নমুনা করে দেখান, তিনি মাথার উপর একটা মাটির হাঁড়ি রাখেন আর অন্য একটা হাঁড়ি পায়ের উপর এবং ক্ষীয়মান চাঁদের মতো, তাঁর শরীর ক্ষীয়মান হতে থাকে, পনেরো দিনের দিন ঘোর অমাবস্যায় তাঁর শরীরের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না এক ফোঁটা কম্পমান পারদ ছাড়া, তারপর শুক্লপক্ষের চাঁদের আলোয় তাঁর শরীর আবার পূর্ণতা পায় ধীরে ধীরে পূর্ণিমার দিনে। আশ্চর্য হয়ে গুরু জিজ্ঞাসা করেন, ‘হাঁড়ির মধ্যে সর্বদা পারদের মতো তরলটা কী ছিল?’ ‘এটা ছিলাম আমি,’ লাল দেদ উত্তর দেন। অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা মন ও অহম, শরীরের সব উপাঙ্গ কর্তিত করেও আমি কাঁপছিলাম এই ভেবে যে, আমি হয়তো গৃহীত হব না, নিছক আত্মরিপু দমনে কোনো মুক্তি নেই। শেষমেশ ঈশ্বরের কৃপায় তা মেলে। গুরু বুঝতে পারেন শিষ্যা গুরুকে পিছনে ফেলে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মুসলিম আখ্যানকার, পীর গুলাম হাসানও এই কাহিনির অন্য এক চেহারা দিয়েছেন। বলা হয় লাল দেদ শুদ্ধাচারি শব্দ আবৃত্তির প্রথাগত ভঙ্গির বদলে রহস্যময় আচার, নফি-ও-ইসবত, (অর্থাৎ, না বা ‘লা ইলাহ’, ও হ্যাঁ বা ‘ইল্ল-লাল-লাহ’), করে তাঁর প্রায়শ্চিত্তের নমুনা এক মুসলিমের কাছে পেশ করেছিলেন।

লাল দেদ ধার্য আচার আর অনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজনিয়তা এমনকী বিগ্রহ ও ছবি পুজোকেও ছাপিয়ে গেছিলেন। বস্তুত, মূর্তি পুজো, বলি, তীর্থযাত্রী হয়ে দেবতার থান ও পবিত্র স্থানে যাওয়া, নিছক শাস্ত্র আওড়ানো, উপবাস, বা নির্দিষ্ট আচার, এ-সব বাহ্যিক ক্রিয়া করেই যারা তৃপ্ত হতেন তাদের ভর্ৎসনাও করতেন। আসলে অসার ক্রিয়াকর্মকে গুরুত্ব না দেওয়াটা একজন শৈব যোগিনীর কাছে না ছিল কিছু অধর্ম, না ছিল অস্বাভাবিক। ত্রিক পন্থার গুরু বা আগমরাও এমনটাই বলছেন। যোগী তাঁর প্রাত্যহিক অর্চনা, মন্ত্রোচ্চারণ ও জল ব্যতিরেকেই করেন, তাঁর হোমও জপমালা ছাড়াই, তাঁর ধ্যান এমনি আচারহীন সম্পাদন, ফুল ও আনুষাঙ্গিক জিনিসের পুজো ব্যতিরেকেই তাঁর যজ্ঞ। ত্রিক মতে, মালা জপা কী ঠাকুরের নামোচ্চারণ এবং পুজোর নিমিত্তে শ্লোক আওড়ানো এ-সব নিম্ন স্তরের অর্চনা, আবার হোমে ও পুজোয় নৈবেদ্য চড়ানো আরও নিম্নের থেকেও নিম্ন স্তরের অর্চনা। নিম্ন মেধার লোকের কাছে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান বিগ্রহে অথবা প্রতীক চিহ্নে আর একইরকম নিরর্থক উপবাসের তুচ্ছ মান ও মূল্য। ঈশ্বরকে সাধনা করতে হবে সেই একজনের মতো ভেবে যার হাত পা পেট বা কোনো অঙ্গই নেই, কেবল সচ্চিদানন্দ ও প্রকাশ।

ধর্মের আনুষ্ঠানিক ভক্তির এই অন্তঃসারশূন্যতাকে লাল দেদ তাঁর বাকে এভাবে দেখান—

“হে মূর্খ, প্রকৃত কাজ নিহিত থাকে না
উপবাস বা কী অন্য অনুষ্ঠানিক আচারে
অথবা
মূর্তি নিছক পাথর
মন্দিরও পাথর বৈ কিছু না
মাথা থেকে পা অবধি পাথর।”

একদিন লাল দেদ বড়ো মাটির শঙ্কু আকৃতি (তাগারা) ঘড়ার মধ্যে বসেছিলেন আর মাথায় চাপিয়ে ছিলেন অনুরূপ আরেকটি ঘড়া, আর নিজে ছিলেন এই দুই-এর মধ্যে লুক্কিয়ায়িত। যারাই তাঁকে এমনটা করতে দেখেছিলেন হতভম্ব হয়েছিলেন এবং এর কিছুক্ষণ পরে ওপরের ঘড়াটা সরানো হলে তাঁরা দেখেন সেখানে আর কিচ্ছু নেই আর এই কিবংদন্তি অনুয়ায়ী এইভাবেই তাঁর মহাপ্রস্থান হয়।

লাল দেদ চলে গেলেন, কোনো প্রথাগত পরম্পরা না রেখেই। তাঁর দেহটি যেখানে পোড়ানো বা কবর দেওয়া হয়েছিল সেখানে কোনো সমাধি বা মন্দির অথবা মকবরা কিছুই গড়ে তোলা হয়নি। স্মৃতিচিহ্ন বলতে একটা তরাগ বা জলাশয়, এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যা লাল্লা তরাগ বলে পরিচিত ছিল, যেখানে অমরনাথ যাওয়ার পথে পুণ্যার্থীরা ডুবকি দিত।

“মারায়াম না কুনহ তা মারা না কাঁসি
মারা নেচ তা লাসা নেচ”

“আমার কাছে জীবন মৃত্যু সমান
আনন্দে বাঁচা আর আনন্দে মরা
আমি কারোর জন্যে শোকাহত নই,
না শোকাহত কেহ আমার জন্যে।”

আমার গুরু এক নিদান দিয়েছেন কর্মবিধির—

“চোখ না ফিরিয়ে চেয়ে থেকো অন্তরের দিকে,
সেঁটে রেখো অন্তরাত্মায় অটল।”

আমি, লাল্লা, হৃদয়ে নিয়েছি নিদানখানি, নগ্ন তাই জগৎময় আমি নৃত্য করেছি শুরু—

আমাদের পক্ষে লাল দেদের জীবন ও তাঁর বাকের সম্বন্ধে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। তাঁর জীবনকাহিনি রহস্যে আর কিবদংন্তির চাদরে ঢাকা, যাদিও আজও নানা কাশ্মীরি প্রবাদে ও লৌকিক বুলিতে এমন কিছু বাক্য পাওয়া যায় যা লাল দেদের জীবন সম্পর্কিত কোনো-না-কোনো কিবদংন্তির সঙ্গে জুড়ে আছে। তাঁর মুখে মুখে বলা বাক বলে যা পরিচিত সে-সবের প্রামাণিকতা নিয়েও নানা দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে।

লালা দেদ, না কিছু লিখে রেখে গেছিলেন, না কেউ স্বকর্ণে শুনে সে-সবের প্রতিলিপি করে রেখেছিলেন। তাঁর সমকালে তো দূর, যে-প্রাচীন কাশ্মীরিতে লাল দেদ বলেছিলেন, তা কখনো কেউ লিখে রেখেছিলেন এমন কোনো প্রমাণ নেই। যে-কাশ্মীরি ভাষায় লাল দেদের বাকগুলো প্রাপ্ত হয়েছিল তা আধুনিক কাশ্মীরি এবং কালের প্রভাবে, নিরক্ষর চারণ কবিদের বদলে যাওয়া ধর্মীয় আনুগত্যের চাপে, ফারসি শব্দের ভেজালে, হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের পূর্বতন যোগ ও ত্রিক পন্থায় ব্যবহৃত নানা শব্দ ও আচার বিস্মৃত হওয়ায় মূলের শব্দ ও বাক্য অর্থ হারিয়ে ফেলায় প্রাপ্ত বাকগুলো বহু ক্ষেত্রেই মূলের থেকে সরে এসেছিল এবং তাপ্পি বা গোঁজ শব্দ জায়গা করে নিল অনেকখানি, ফলত লাল দেদের বাকের প্রামাণিকতার দ্বন্দ্ব জারিই থাকল, এবং নুন্দ ঋষির ‘নুরনামা’ কী রূপ ভবানীর ‘রহস্যাপদেশা’-য় অন্তর্ভুক্ত অনেক বাকই লালা দেদের বাক বলেও প্রচারিত ও পরিচিত, এমনকী এর উলটোটাও ঘটেছে।

যদিও লালা দেদের পক্ষে কিছু লেখা বা লিখিত কোনো পাণ্ডুলিপি রেখে যাওয়া কোনো অসম্ভব কিছু ছিল না। তিনি লিখতে চাননি, হয়তো এটাই একমাত্র কারণ। উদাহরণস্বরূপ লাল দেদের প্রায় সমকালের শিথিকান্তার মহান্যায়াপক্ষার পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি যেমন পাওয়া গেছে। লালা দেদ না প্রকাশের জন্য কিছু লিখেছেন, না করেছেন বিজ্ঞ ব্যক্তির মতো জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অবদান রাখার মতো কিছু। বস্তুত, তিনি বাকগুলো শুধু আওড়াতেন এবং সে-সময়ের প্রথানুযায়ী, মুখে মুখে ছড়িয়েছে। এ-সবই আমাদের অনুমান। কেউ, হয়তো লিপিবদ্ধ করেছিলেন সে-সব বাকগুলো ছাড়াও আরও কিছু, অন্য কয়েকটি, যা তিনি হয়তো ঘটনাচক্রে নিজে অথবা অন্যের থেকে শুনেছিলেন। এবং এভাবেই চলেছে যতদিন না এ-সব কথকতার অঙ্গীভূত হয়ে গ্রাম্য ভ্রামণিক চারণদের গানে, এবং পরবর্তীতে আজও কাশ্মীরি ধ্রুপদি সংগীত, সুফিয়ানা কালামে মজলিস-এ-মা’রিফিম, বা সুফি বা আধ্যাত্মিক অন্বেষীদের জমায়েতের শুরুতে পবিত্র আবাহন হিসেবে গীত হতে শুরু করল। এত দুষণ সত্ত্বেও লাল দেদের বাক বেঁচে রয়েছে এবং এর মধ্যেও অন্তত প্রায় শ-দেড়েকের বেশি বাককে লালা দেদের বাক বলে চিহ্নিত করা যায়, কিন্তু কেউ কেউ বলতেই পারেন সেটারই বা কী প্রামাণিকতা?

আমাদের লালা দেদের বাকের অন্তর্গত নিজস্ব প্রমাণাদির কাছে ফিরে আসতে হবে, এর যা কিছু প্রমাণকারী বলো, নিহিত আছে এর ভাষ্যে ও শৈলীতে। তথাপী এরও অনেকানেক সীমাবধ্যতা আছে। রাজরাজাদের উত্থান পতনের সঙ্গে সম্পর্ক রহিত গ্রাম্য নারী লাল্লার বাকে সমসাময়িক ঘটনাবলীর কোনো ইশারা বা প্রাসঙ্গিক উল্লেখ নেই অথবা না আছে কোনো ঘটনার কোনো সুনির্দিষ্ট দিনাঙ্ক। তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণের, জন্য আমাদের কাছে পড়ে রয়েছে শুধু লাল দেদের কিছু রচনাশৈলীর প্রমাণ আর ছন্দ এবং চিন্তার বিন্যাস ও গুনাগুণ, যেভাবে এগুলো কোনো একটা ভাব প্রকাশে সংগঠিত হয়েছিল, এক কথায়, লাল দেদের শৈলীর বিশিষ্টতা। এগুলো আর অন্য কিছু নয়, তাঁর বাক থেকে, অন্যের দ্বারা রচিত বা ভ্রমবশত তাঁর নামে প্রচারিত বা লাল দেদের শৈলীর বৈশিষ্ট্য বহন করে না এমন রচনাগুলো থেকে তফাত করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, কোনো একটি বাক যে সামগ্রিক ছাপ রেখেছে তার বৈশিষ্ট্যগুলোর সামগ্রিকতার বিচারে। যে-কাশ্মীরি সাহিত্যই আমাদের সমকালে পাই না কেন, তার সঙ্গে লাল্লার বাকের পূর্বের ও পরবর্তীর ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক তুলনা করতে গেলে যেটা দরকার তা হল, তাঁর যুগের পূর্বের ও পরের কাশ্মীরি সাহিত্যের নানাবিধ গ্রন্থ পাঠের সক্ষম জ্ঞান, এছাড়া, প্রাচীন কাশ্মীরি ভাষা থেকে ছিঁড়ে আনা টুকরোগুলো যা ত্রিক দর্শনের বিবিধ পুঁথিগুলোর প্রশ্নাবলীগুলোর মধ্যে নিহিত। সন্দেহাতীতভাবে, লাল্লার বাক রচিত হয়েছিল, যাকে সঠিকভাবে বলতে পারি প্রাচীন কাশ্মীরিতে, কিন্তু এগুলো আমাদের কাছে এসেছে যে-ভাষায় তা আশ্চর্যজনকভাবে আধুনিক। এগুলো মুখে মুখে ছড়িয়েছে এবং বদল ঘটেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভাষার বদল ঘটেছে যেমন সেই মোতাবিক। তবু লালা দেদের বাক সমন্ধে স্যার গ্রীয়ারসনের অনুধাবন করেছেন, “লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গানগুলোর ছন্দময়তা অটুট রেখেছিল বহুসংখ্যক সেকেলে প্রকাশভঙ্গিগুলো। এবং আমি এখানে যুক্ত করতে পারি, এই সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছিল কারণ কিছু পুরুষ ও নারী গুরুশিষ্য পরম্পরার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, সেই সরাসরি সূত্র, অর্থাৎ, গুরু ও শিষ্যের পরম্পরা, বাকগুলোকে স্মৃতিতে সংরক্ষিত করেছিল, তাঁদের প্রাত্যহিক প্রত্যুষের প্রার্থনার অঙ্গ হয়ে, তাদের নিজ-পাঠের। স্পষ্টত, এঁরা, তাঁরা, যাঁরা এগুলোকে সংরক্ষণ করেছিলেন, ধার্মিক যত্নে ও যথার্থতায়, এমনি অনেক শব্দ ও বাক্যবন্ধের অর্থ না বুঝেও, “এবং তাদের সেই শততা ছিল, বিরত ছিলেন, বাকগুলোকে বোধগম্য করার জন্য কোনো অনুমানমূলক সংশোধন থেকে।” এ-কারণেই স্যার গ্রীয়ারসন বলেন, “এই ধরনের সরংক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে লিখিত পাণ্ডুলিপির চেয়েও বেশি মূল্যবান।”

লাল দেদ নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই উলঙ্গ হয়ে ঘুরতেন এমন একটা প্রসঙ্গকে সামনে রেখে আলোচনা করাটা একটা খারাপ সংস্কার। শুনেছি উলঙ্গিনীর গান বলে একটি গানের সিডিও বেরিয়েছে। এভাবে লাল দেদকে দাগানো অনুচিত বলে মনে করি, কেন-না লাল দেদের বাকগুলোর কাব্যগুণ বিচার করতে গেলে, প্রাচীন ভারতীয় কবিতার ছন্দকে চিনতে হবে, বুঝতে হবে যিনি বলেছেন, তাঁর মেধা ও মননকে, জানতে হবে তাঁর সময়কালীন ইতিহাস ও বাকগুলির সঙ্গে অদ্বৈতবাদী ত্রিকপন্থা শৈবসাধনার ‘প্রতি-অভি-জ্ঞান’-এর ধারণার সম্পর্ককে, যে-ধারা পুষ্ট হয়েছিল কাশ্মীরি শৈব তন্ত্রের বিখ্যাত দার্শনিক অভিনবগুপ্তের দ্বারা। আবার বুঝতে হবে, লাল দেদের বাকের কাব্য মাধুর্য ও গভীর দার্শনিক বোধ কেমন করে সুফি সিলসিলা ‘ঋষি পন্থা’-র বিশিষ্ট সাধক নুর-উদ-দিন ঋষি ও সামগ্রিকভাবে ঋষি সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করেছিল। সে-সব বুঝেই এগোতে হবে। সেখানে তাঁর পোশাক নিয়ে কাব্য আলোচনা শুরু হলে একধরনের শহুরে সাবঅর্ল্টান-স্টাডিসের চেহারা নেয়, ফলত সাহিত্য আলোচনা যে-পথে হওয়া দরকার সে-পথ হারিয়ে যায়। ভারতের শৈব সাধনার নানা ধারা সমন্ধে যাঁরা কিছুমাত্র খবর রাখেন তাঁরা জানেন লাল দেদ বা আক্কা মহাদেবীরা নগ্ন ছিলেন বা নগ্ন হয়ে ঘুরতেন এটা একটা তথ্য মাত্র না হলেও, সেইসব কাব্যধারার রসাস্বাদনের জন্য মূল বিচার্য বিষয় নয়। একটি ইংরাজি সংকলনও আছে ন্যাকেড সেইন্ট, এরকম নামে। এতে একটা ওপর ওপর দেখানো সহানুভূতি তৈরি করার চেষ্টা চলে, যে-সবের ধার ধারতেন না লাল দেদ। কিংবদন্তিগুলোর নির্যাস নিয়ে বাকগুলো পড়তে হবে কোন পূর্বনির্ধারিত কোনো মতবাদের তোয়াক্কা না করেই। প্রথাগত ধর্মের বিরুদ্ধাচারণ করেছে শৈব পন্থাগুলো, দার্শনিক বিতণ্ডা করেছে, খারিজ হয়েছে সমকালের ব্রাহ্মণ্যবাদী ইতিবৃত্তে বা সন্তবৃত্তে। আনন্দ কাউলের অনুবাদ ও টীকা থেকে দেখতে পাই তিনি সুলতানদের ক্ষমতার বলে ইসলামীকরণের নিমিত্তে নতুন ধর্মান্তরিতদের দিয়ে চরবৃত্তি করানোকেও কটাক্ষ করেছেন। দুই ধর্মের প্রথাগত মেইন্সট্রিম তাই তাঁকে শতকে পর শতক নাকচ করেছে। লাল দেদের সেই নগ্নতা, নিয়ে মানী গবেষক জয়লাল কাউল কি লিখেছেন দেখি— “একটা কিংবদন্তি গড়ে ওঠে, এবং নাছোড় হয়ে থাকে যে, তিনি ঘুরে বেড়ান নগ্ন হয়ে, নৃত্য করে, গান গেয়ে পরমানন্দ ক্ষিপ্ততায়, যেমন করতেন পুরাণের হিব্রু নবি আর তুলনামূলকভাবে এখনকার দরবেশরা, যে তিনি ঘুরে বেড়াতেন প্রায় নগ্ন হয়ে। সেটা সত্য হতেই পারে কিন্তু তিনি যে দরবেশদের মতন ঘূর্ণনাচ নেচে বেড়াতেন, এটা এমন এক প্রতিবেদন যে, কাশ্মীরি শব্দ নৎসুনের সঙ্গে যায় না। শব্দটা বোঝায়, কোনো কোনো প্রসঙ্গে নৃত্য করা, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার হয় উদ্দেশ্যবিহীনভাবে যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে ঘুরে বেড়ানো বোঝাতে; বাকের প্রেক্ষিতে পরের অর্থটাই বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তাঁর কাছে বেশি মূল্যবান ছিল যে, তাঁর অন্তরাত্মার জন্য তিনি আর নিজের বহিরাবরণের দিকে ফিরে তাকাবেন না। সেই জন্যই তাঁর কিছুই মনে হবে না, যদি তিনি নগ্ন হয়েই চলে যান যেদিকে খেয়াল তাঁকে নিয়ে যায়। কিন্তু এর মধ্যে কী-ই-বা আছে নৃত্য করার? যার জন্য তিনি অন্তরের দিকে চেয়ে থাকবেন? এটা ঠিক প্রত্যয়জনিতও নয়। পরে সত্যিই একটা সময় আসে যখন তাঁর নৃত্যের সেই প্রেক্ষিত তৈরি হয়ে যায়। “পরমানন্দে ঈশ্বরের সঙ্গে বিত্তবিনিময়ের”: মে’ সে’ তা পানাস দ্যুতুম শোহ। কিন্তু তখনও সেটা আসেনি, সে-সময় আসেনি। তখনও অবধি তাঁর গুরুর বাণী, আত্মজ্ঞান অর্জন করতে পার্থিব এই জগৎকে হারিয়ে ফেলতে হবে, যা ছিল তাঁর কাছে এক বেদনাদায়ক ‘সব হারানোর ফোসকা (রাভান তভ’ল)”। গ্রিয়ারসন যেমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তেমন ভাবাটা ভাষার ওপরে জুলুমই হবে অতিশয়। উপরন্তু, এই শ্লোকের কল্যাণেই এর পর থেকে পাম্পোরের পদ্মাবতী লাল দেদ (লাল ঠাকুরমা) বলে পরিচিত হয়ে ওঠেন তাঁর পেটের নীচ দিকের থলথলে ভাবের জন্য, যা ঢিলে হয়ে তাঁর তলপেটের নিম্নাংশের ওপরে ঝুলে থাকত। তাঁর নামের বিষয়ে এই তথ্য মেনে নেওয়া যদিও খুব কঠিন। বা, সাম্প্রতিক কিছু লেখকের যেমন অনুমান, লাল্লা লীলা বা লোল শব্দদ্বয়ের অপভ্রংশ। ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পক্ষে এমন ভাবনা অন্যায্য। লাল্লা, মনে হয়, প্রাচীনকালে ব্যবহৃত একটা নাম। আর, খুব সম্ভবত এটা ছিল তাঁর কুমারী নাম। তিনি এই নাম ব্যবহার করতেন তাঁর নিজের সম্বন্ধে বলার সময়, এই নামটা তিনি ব্যবহার করেছেন নিজেকে উল্লেখ করার সময়। যেমন, যখন তাঁর বন্ধুদের তিনি বলেছেন, “লালি নালাবথ সালি না যানহ”, যেখানে নিজেকে বললেন, লালি, (লাল্লাকে), সে-সময় লক্ষ করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন, একজন গৃহবধূ, ‘পরিব্রাজক তপস্বিনী’ নন। তাছাড়াও, নিজের বাকে নিজেকে যখন উল্লেখ করেছেন, তিনি এই একই নাম, লাল (বা লালি, লা’লি, যেটা কাশ্মীরি ব্যাকরণে অন্য আরেক রূপ) ব্যবহার করেছেন, আর এই নাম তাঁর ১৮৪টি বাকে অন্ততঃপক্ষে ২১বার উচ্চারিত হয়েছে, ১০৯টি গ্রিয়ারসনের, ৭৫টি আনন্দ কাউলের। শব্দচর্চায় এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মূল কাশ্মীরি ভাষায় লাল বা লাল্লা-র উচ্চারণ প্রায় অভিন্ন।”

শেষ পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

অলক রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্য সমন্বয় মাইহার ব্যান্ড

ভারতীয় সংগীতের প্রতিটি অলিগলি আলাউদ্দিনের শ্রুতিতে উজ্জ্বল তো ছিলই। তার সঙ্গে তিনি মিশিয়ে ছিলেন বাংলার লোকায়ত মেজাজকে। বাংলার মাঠ ঘাট এমনকী ফুটপাথেও তো তাঁর কেটেছে বহু বিনিদ্র রাত। এছাড়াও ছিল প্রত্যক্ষভাবে ব্যান্ডে বাজানোর অভিজ্ঞতা। দেশি ও বিদেশি যন্ত্রে। হাবু দত্তর থিয়েটারে বিভিন্ন দেশি যন্ত্রের বাজানোর অভ্যাস, ফোর্ট উলিয়ামের এক সাহেবের কাছে বেহালায় নিখুঁত পশ্চিমী হার্মনির শিক্ষা, উজির খাঁর থিয়েটার দলে পার্শ্বসংগীত সংযোজনার দায়িত্ব— এ-সবই চলছিল শাস্ত্রীয় গানবাজনা অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গেই। সে-অভিজ্ঞতা মাইহার ব্যান্ডে আশীর্বাদ হয়ে গেল। সারাজীবন ঘুরেছেনও প্রচুর। দেশের বাইরে অনেক জায়গায়। ভলগা নদীর পাড়ে বসে বেঁধেছিলেন ‘ভলগা ধুন’। সুরের সেই নিরীক্ষা অসামান্য। পাশাপাশি ‘কাফি ধুন’ (ওয়েস্টার্ন)— শুনতে কিছুটা সোনার পাথরবাটি মনে হলেও জ্যাজ-এর রিদম আর কাফির আরোহণ-অবরোহণের কাটাকাটি সুরানুলেপন— এতেই চমৎকার বৃন্দাবাদন। আসলে পাশ্চাত্য হার্মনিকে অত্মস্থ করতে আলাউদ্দিনের সময় লাগেনি বেশি। ‘দেশ’ রাগটিকে দুইভাবে ভাবলেন আলাউদ্দিন। প্রথমে ছয় মাত্রার সাধারণ দাদরায় কোমল বা শান্ত ছবি। এবং সেই অনুযায়ী সম্মিলিত বৃন্দবাদনে খানিক নমিত স্বরানুশীলন। তারপরে তার চেহারা অন্য। একই সরগমে ঝোড়ো ‘দেশ’। এ-হেন অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই আনকোরা। নিরীহ সব দেশি যন্ত্রে আমাদের অভ্যস্ত শ্রবণ একক যন্ত্রসংগীত শুনতেই শিখেছে কেবল। ব্যান্ড বা অর্কেস্ট্রা বলতে সাধারণভাবে এখন বোঝায় বিপুল গ্র্যাঞ্জারকে। রিলায়েন্স কাপ বা সাফ গেমসে কত যন্ত্রীর সহযোগিতায়, সর্বাধুনিক স্টুডিওতে কত লক্ষ টাকার বিনিময়ে কী মহৎ সৃষ্টি সম্ভব হল, সে নিয়ে কাগজে স্কুপ রিপোর্টিং-এর ছড়াছড়ি। তাদের পাশে মাইহার ব্যান্ডের জায়গা না হওয়ারই কথা।

একদিক থেকে তা বোধহয় ভালোই হল। বাংলার কীর্তনের অমন বিশ্বাসযোগ্য সমবেত রূপ এমন সান্তুর, অনুভূতিকে উসকে দেওয়া প্রসন্নতায় শোনাতে পারতেন কি তাহলে মাইহার ব্যান্ডের সদস্যরা? অ-প্রচারেই ওঁদের গৌরব। ‘সখি বহে গেল বেলা’-র আকর সংগীত বাংলা পুরাতনীর ‘উঠিতে যুবতী বসিতে যুবতী’। তাকে বন্দিশ করেই এই কম্পোজিশন। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত যে-নলতরঙ্গ বিপুল বিক্রমে ঝড়ের গতিতে দেখিয়েছে তার সাধ্যের নমুনা, এই মধ্যলয়ের দাদরা কম্পোজিশনে তার ভূমিকা তখন কেবলমাত্র মন্দিরায়। আশ্চর্য মমতায় কতিপয় মধ্যপ্রদেশীয় যুবক কীর্তনের মূল মেজাজের উজ্জ্বল উদ্ধারে নেমে পড়েছে যেন। চেলোর গাম্ভীর্যের পাশাপাশি সেতার, সরোদ আর বেহালার ক্ষীণ সুর (ইচ্ছে করেই আঙুলে তার চেপে ধরে স্বরকে অর্ধস্ফুট করছিলেন ওরা), প্রায় থেমে আসা তবলার শীতল সৌন্দর্য সুরস্রষ্টার ভাবনা আর শিল্পীদের অধ্যাবসায়ের জ্যান্ত প্রমাণ হচ্ছিল যেন। আর শুনেছি ‘মালকোষ’, ‘মালহূয়া কেদার’, ‘সিংহ’, ‘ইমন’, ‘হেমবেহাগ’। শুধু মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠানেই নয়, গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন বা কালীঘাট কালীবাড়ির আয়োজনেও। নিবেদনের মুনশিয়ানায় বাস্তবিকই চমৎকৃত হতে হয়।

অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাকেই ওদের এক-আধজনের সময় সুযোগ মতো পাকড়াও করেছি। রামলাখন পাণ্ডে। চোস্ত ইংরেজি বলেন। কোনো স্কোপ যদি পাওয়া যায়, এই আশায় এটা ওটা প্রশ্ন করতে করতে তাকিয়ে দেখি জুটে গেছে আমার মতো অনেকেই। তাঁদের একজন, আগ্রহের অতিশয্যেই সম্ভবত এগিয়ে দেয় এক নামি ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট। এবং সঙ্গে সঙ্গে— ‘না দাদা, বহুত শুক্রিয়া। আই লাইক দিস ভেরি মাচ’ বলেই জামার পকেট থেকে বের করেন আদি অকৃত্রিম একটি বিড়ি। ভিড় হটিয়ে ওঁকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পথে মনে হচ্ছিল, এইভাবেই বোধ করি ওঁরা সবরকম প্রলোভন জয় করে স্বস্থানে আছেন আজও। বাবা আলাউদ্দিনের কাছে শিখেছেন পাণ্ডেজি। কিছু স্মৃতিচারণ আশা করছিলাম। স্পষ্ট জানালেন— ‘না ভাই, বলার মতো তেমন কিছু নেই। দেখলেই পালাতাম। অসম্ভব ভয়। আমিও শিখব না, উনিও শেখাবেন’। বলেই পিঠের দিকে নির্দেশ করেন। বহু চড়-কিল আর অপার স্নেহস্পর্শের দাগ সেখানে। কথার মাঝেই হাজির শৈলেন শর্মা। মধ্য-ত্রিশের ছটফটে ব্যক্তিত্ব। ওঁর নলতরঙ্গ বাদনের মতোই। জানালেন— ‘আমার কিন্তু মনে আছে। বাবা প্রথমে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন সরোদ। তো, কিছুতেই সুর বেরোয় না। আর যা বেরোয় তাই বেসুরো। বাবা হঠাৎ এমন এক প্রশ্ন করলেন যা শুনে আমার মতো অনেকেই হতবাক। শুনবেন সে-কথা? ওঁর প্রশ্ন ছিল, শরীরে দুধ কোথায় থাকে? লজ্জায় কান-চোখ লাল, তবু মার খাওয়ার ভয়ে নির্দেশ অনুযায়ী দেখাই। ব্যাস, অমনি আমার কানটি ধরে বলেন, মা যেমনভাবে দুধ খাওয়ায় ছেলেকে, হাতে সরোদ নিতে হবে ঠিক সেই ভঙ্গিতে। এই হলেন বাবা’। বেশ গুছিয়ে বলে শৈলেন। ওঁকেই প্রশ্ন করি, আপনারা তো লেখাপড়া শিখেছেন, স্বরলিপি-পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তবে কেন এইসব অমূল্য সুরারোপকে নোটেশনে আনছেন না? ভেবেছিলাম, বেকায়দায় পড়ে যাবেন এ-প্রশ্নে। উলটে আমাকেই ফেলে দিলেন বেকায়দায়। পৃথিবীর প্রধান অর্কেস্ট্রা দলগুলির বিষয়ে সুনিশ্চিত খবর রাখেন ওঁরা। তুলনায় এলেন এইভাবে— ‘বাজানোর পদ্ধতি হল দুটো, একটা অ্যাকটিভিটিস, অপরটি আবহন। নোটেশন-ভিত্তিক বিবিধ ক্রিয়াকলাপে গড়ে ওঠে প্রথমে ধরনের পদ্ধতি। আর আমরা স্মৃতির দরজায় ঘা মেরে সুরকে আবাহন করি। দুইয়ের একটা পার্থক্য থাকবে না? এবার আসি আপনার প্রশ্নের উত্তরে। আমরা সকলেই বাজাতে জানি একাধিক যন্ত্র। মানে, আজ আমি যদি অসুস্থ থাকি, কাল রাম সুমন সেতারব্যাঞ্জো ছেড়ে নলতরঙ্গে এসে ঠিক কাজ চালিয়ে দেবে। এছাড়া, প্রতিদিনের অভ্যাসে কোনোরকম ভুলচুক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পণ্ডিতজিও এ-সবের বিরুদ্ধে। স্বরলিপি একবার হয়ে গেলে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে তার পরিবর্তন বিরাট প্রমাণ হিসাবে পরে গণ্ডগোল বাঁধাতে পারে। তার থেকে আমাদের শ্রুতিই বেশি অথেনটিক; আর সত্যি কথা বলতে কি, এতে মেধা বাড়ে, বাড়ে শ্রদ্ধাবোধ, সংগীতকে সর্বদাই ভালোবাসতে হয়। তাই, বাবার যা কম্পোজিশন ছিল তা আজও অটুট আছে। একটি সরগমও পালটে যায়নি। অনেকে বলেছেন, এর জায়গায় অমুক করলে ভালো শোনাত। আমাদের পণ্ডিতজি বলেন, গীতাকে কেউ পালটাতে পারবে? কেউই নয়। বাবার শেখানো সব কিছুই আমাদের কাছে সাক্ষাৎ গীতা। শত চেষ্টাতে তা পারব না পালটাতে’। চমৎকার কথা বলেন গিরিধারীলালও, অথচ কিছুতেই ওঁর সামনাসামনি হতে পারছি না। কোনোমতে পাওয়া গেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ৫৭ হরিশ মুখার্জি রোডে দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরেই ধরতে হবে গিরিধারীলালজিকে। খেয়েদেয়ে অনেকে বেড়িয়ে পড়বেন কলকাতা দেখতে। বিশ্রাম নেবেন খালি গিরিধারীলাল। বৃষ্টি মাথায় করে পৌঁছে যাই যথাসময়ে। কিন্তু কোথায় তাঁরা? শুনলাম বাহাদুর খাঁর বাড়ি গিয়েছিলেন সবাই। আর দুপুরে ধ্যানেশ খাঁর ওখানে সকলের নেমন্তন্ন। তবে, গিরিধারীলাল বলে গেছেন, এখুনি ফিরবেন। সুতরাং রকে বসে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা। অতঃপর ধ্যানেশ খাঁর বাড়ি থেকে খবর আসে, বাবা আলাউদ্দিনের দুর্লভ ভিডিয়ো দেখছেন ওঁরা। কেউ আসবেননা এখন। বিফল মনোরথ যাকে বলে। কিন্তু জাগছিল বিস্ময়ও। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বুঝেছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় ছোটো-বড়ো যে-কোনো শিল্পীর আগ্রহ ওপার। এখনও খ্যাতিমান গায়ক-বাদকের ছাপার হরফে কাগজের পাতায় নিজের নাম কিংবা ছবি দেখতে কী কাণ্ডই না বাধান! অথচ, মাইহারে এই মানুষগুলি, টিভি-র ক্যামেরা, সংবাদপত্রের শিরোনাম, বিদেশ ভ্রমণ— এ-সব লোভ থেকে মুক্ত আছেন! পরক্ষণেই ভাবি, বাবা আলাউদ্দিনকে দেখেছেন ওঁরা। এর পাশে যাবতীয় আকর্ষণ তো নিতান্তই তুচ্ছ!

সুতরাং পরদিন আবার দৌড়। দুরদর্শন জোগাড় করেছেন মাইহার সরকারের অনুমতি। প্রসাদ স্টুডিয়োতে করে রাখলেন রেকর্ডিং, তিনটি আইটেমের। তাই ন-টার আগেই বেড়িয়ে পড়েছেন ওঁরা। ভবানীপুরের প্রসাদ স্টুডিয়োতে আজ খালি অডিয়ো-রেকর্ডিং। পরে একদিন ছবি তোলা হবে। উপস্থিত অন্য সকলের সঙ্গে হতবাক হয়ে গিয়েছেন খোদ স্টুডিয়ো-কর্তৃপক্ষও। যে-রেকর্ডিং দিন গড়িয়ে সন্ধে পর্যন্ত নিত্যদিন বিরক্তি উৎপাদন করে, তা শেষ কয়ে গেল লাঞ্চের আগেই। রিহার্সাল দরকার হয়নি, একবারের জন্যেও কোনো যন্ত্র ভুল বাজেনি। তাই প্রথম টেকেই ওকে। সামান্য খাওয়া দাওয়া সেরেই ওঁরা ছোটেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে। স্বামী লোকেশ্বরানন্দজির ডাকে আজ বিবেকানন্দ হলে ওঁদের বাজনা। সুতরাং গিরিধারীলালকে আজ ছাড়ার প্রশ্ন নেই। আলাউদ্দিনের বাড়ি ‘মদিনামঞ্জরী’-তেই থাকেন উনি। আর তো কেউ দেখার নেই। সাত বছর বয়সে ধরেছিলেন বাবার হাত। তখন ওঁর সঙ্গী রাজা ব্রিজনাথ সিং। বয়সে ব্রিজনাথ অবশ্য অনেক বড়ো। ছিলেন আমাদের তিমিরবরণও। আর কার কার কথা মনে পড়ে? খানিক ঘুরেই বিস্তৃত করি প্রসঙ্গ। একটু যেন ভাবেন, খানিক থামেনও। তারপর— ‘আনোয়ার খাঁ, রামস্বরূপ, ঝুররালাল, দশরথ প্রসাদ… আউর কেউ কোই’। কীভাবে শেখাতেন বাবা? বলতে না বলতে উত্তর— ‘বহুত পিটতা’। তারপরই খানিক লজ্জা পেয়ে বোধহয়— ‘সকলকেই শিখতে হত সবকিছু। রিহার্সাল হত বাবার বাড়িতে। কেউ হয়তো রিহার্সালে ফাঁকি দিয়ে অন্যত্র গিয়েছে, বাবা ঠিক সেখানে হাজির। বাবাকে দেখে সে দৌড় লাগিয়েছে, দৌড়াচ্ছেন বাবাও। তাঁকে ধরে বকে-মেরে, যন্ত্রের সামনে বসিয়ে শেষে আদর। আর খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকি সর্বক্ষণই শুধু এই বাজনা। বাবা শেখাতেন গান গেয়ে। আমাদের তা তুলতে হত যন্ত্রে, গলাতেও। না পারলে দেখিয়ে দিতেন যন্ত্রেই। ভোরবেলা নিয়ম করে রোজ শুরু করতাম পরপর ‘আহির ভায়রো’ আর ‘যোগিয়া’ দিয়ে।

অনেকের কাছেই আছে এক বড়ো মাপের ভুল ধারণা, মাইহার ব্যান্ডের মোট সদস্য সংখ্যা না কি আশি-পঁচাশি। সে-প্রসঙ্গ তুলতেই ফোকলা দাঁতে হেসে ফেলেন গিরিধারীলাল। মোট পনেরোজন, ঝুররালালই শুধু আসতে পারেননি। মাইহার সরকারের অবশ্য একটা স্কুল আছে। তবে তার সঙ্গে এঁদের সম্পর্ক একেবারেই নেই। সরকার ওঁদের দিয়েছেন রিহার্সালের জায়গা। সেখানে অনুশীলন চলে রোজ, সকাল আটটা থেকে এগারোটা। ছুটির দিনেও। যন্ত্র দেন সরকার। ‘শুধু একটা জিনিসই সেই মাপে পাই না আমরা,’ বলছিলেন দুই তবলিয়া। অনুষ্ঠানের টাকায় তাঁদের কোনো অধিকার নেই। ব্যক্তিগতভাবে বাজানোর ক্ষেত্র কম। সারা মাসের পরিশ্রমের বদলে ওঁরা পান গ্রাসাচ্ছাদনের ন্যুনতম ভাতা— সরকারি স্কেলে। ওঁদের দাবি অবশ্য কিছু বেশিই। এ নিয়ে অসন্তোষ যে ক্রমশ দানা বাঁধছে, তা কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম।

সেতারব্যাঞ্জোর তার পরীক্ষা করছেন রামসুন্দর চৌরাশিয়া। চন্দ্রসারং সারাঙ্গা— এইসব যন্ত্র নিয়ে কথা চালানোর ইচ্ছে। বললেন— ‘বাহাদুর খাঁর বাবা আয়েত আলী খাঁ মাইহারে গিয়ে বাবাকে উপহার দিলেন ওঁর উদ্ভাবন সেতার-সারোদ। একটিই যন্ত্র। বাবা তাতে লাগালেন চামড়া, দিলেন ব্যাঞ্জোর এফেক্ট। তৈরি হল নতুন যন্ত্র সেতার-ব্যাঞ্জো। প্রথমে বাজাতেন রামস্বরূপ। এখন আমি। ‘হেমন্ত’, ‘হেম বেহাগ’, ‘মরাগ মঞ্জরী’— এ-সবই ছিল বাবার প্রিয়। আমিও শিখেছি ওঁর কাছে’। কোনো বিশেষ ঘটনা? মহাজাতি সদনের কথা আগেই জানি। উনি দিলেন আর এক খবর। আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পরে গুরুপূর্ণিমায় সকলে গিয়েছেন ওঁর বাড়িতে বাজাতে। পাণ্ডেজি (রামলাখন পাণ্ডে) হঠাৎ বলে বসলেন, আমরা ‘মেঘ’ বাজালেই বৃষ্টি হয়। ‘অমনি সকলের ধরাধরি। বেকায়দায় ফেলা যাবে, এমনটাও কেউ কেউ ভেবেছিলেন নিশ্চিত। রোদ আর আকাশের নীলে বৃষ্টি বা মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। মুখ কাঁচুমাচু করে বাজনা সুরু করেছি, অর্ধেকও হয়নি বাজানো। এমন বৃষ্টি নামল যে, ঘরদোর সব বানভাসি। অনুষ্ঠানই চালানো যায়নি।’ কী এর ব্যাখ্যা?

সে-প্রশ্নে বা প্রসঙ্গে যাওয়ার কোনো দরকারও বোধহয় থাকে না। বিশেষত, যারা সামনাসামনি শুনছেন মাইহার ব্যান্ড। প্রচলিত রাগ-রাগিণীর অচেনা বন্দিশের পাশাপাশি মাইহার ব্যান্ডের পাঁচ যুগের যত্নসঞ্চিত যক্ষের ধনে আড়াইশোরও বেশি রাগিণী, যেগুলির সৃষ্টিকর্তা বাবা আলাউদ্দিন। কাজে কাজেই এ-সিদ্ধান্তে আসা বোধহয় অনুচিত হবে না। পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্য সংগীতকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এসে তাদের মধ্যে মিলমিশ খাওয়ানোর সাম্প্রতিক যে-চেষ্টা ক্রমবর্ধমান, তা সার্থকতায় সম্পূর্ণ করে গেছিলেন বাবা আলাউদ্দিন খাঁ, তার জন্য গাল বা বগল বাজানোর দরকার পড়েনি। মাইহার ব্যান্ডের এখনকার প্রজন্ম সেই মিশ্রণকে শুদ্ধ এবং অবিকৃত রাখার কাজে দৈনিক মহড়ায় প্রাণপাত করেছেন। আত্মপরিচয়ের গ্লানি ছাপিয়ে সংগীতকেই ওঁরা করে তুলেছেন পরিচয়ের হাতিয়ার। পৃথিবীর গানবাজনার ইতিহাসে এ-উদাহরণ দ্বিতীয়টি মিলবে কি? সেই পরিণাম স্বীকৃতি অবশ্য ওঁরা আজও পাননি। যেমন পাননি বাবা আলাউদ্দিন। আর তাই আলাউদ্দিন খাঁর জন্মের একশো পঁচিশতম বর্ষে সুদূর মাইহার থেকে ছুটে এসে যাঁরা শুনিয়ে গেলেন অবিস্মরণীয় সংগীত, তাঁরা হয়তো দেখেও গেলেন, মহাজাতি সদন অর্ধেক ভরেনি। এই বিস্মৃতির কোনো ক্ষমা নেই।

প্রথম পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

অলক রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্য সমন্বয় মাইহার ব্যান্ড

‘মালকোষ’ বা ‘কাফি’ আমাদের জানা বা শোনা রাগ। কিন্তু ‘মালকোষ’ কিংবা ‘কাফি’ কতটা ওয়েস্টার্ন? কী এবং কেন? আপাত দৃষ্টিতে যা সোনার পাথরবাটি, সেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শাস্ত্রীয় সংগীতরসের মূল বার্তায় ঐক্য খুঁজে পেয়েছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। বলা যায়, সৃজনী ইমপ্রোভাইজেশনে নিজস্ব ভাবনায় রাঙিয়ে নিতে পেরেছিলেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মেলোডি এবং হার্মনিকে। তাই ‘কাফি ওয়েস্টার্ন’ ‘ভল্গা ধুন’— রাগ-রাগিণীর এমন আপাত অশাস্ত্রীয় নামকরণ আজও উৎসাহীর অনিঃশেষ কৌতূহলের কারণ।

গেল শতকের গোড়ার ঘটনা। মাইহারের রাজা ব্রিজনাথ সিং ডেকে পাঠালেন ওঁর সভা-গায়ক এবং গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-কে। মাইহারের সাম্প্রতিক দুর্ভিক্ষে দেশ ছেড়েছেন অনেকে। বাস্তুহারা, পরিচয়হীন কতিপয় শিশু শুধু অনাদরে অনাথ অবস্থায় এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। তাদের দেখবার কেউ নেই। রাজার অনুরোধ, সুর শেখাতে হবে এদের। মানে, নাড়া বাঁধিয়ে জবরদস্তি গানবাজনার পাঠ। জুটে গেল আঠাশটি ছেলে। নিতান্তই কিশোর সব। সংগীত কী এবং কেন, সেটাই জানা নেই অনেকের। ওঁদের বাবা হলেন আলাউদ্দিন। কী যে খেয়াল মাথায় চেপে গেল ওঁর। প্রথমে কোলে বসিয়ে, হাতে ধরে যন্ত্রের প্রাথমিক পাঠ। তারপরে সকলকে একসঙ্গে নিয়ে বাজানো। দলের নামও হল জবরদস্ত। ‘মাইহার ব্যান্ড’। মাইহার ব্যান্ড— এ আবার কী নাম? দুই শব্দের জোড়টি যেন কেমন অসঙ্গত। এ নিয়ে নানা প্রশ্নের সামনেও পড়তে হয়েছে আলাউদ্দিনকে। একবার বলেছিলেন তিমিরবরণ— ‘আসলে, বাবার চিন্তা ছিল একদম আলাদা। অতটুকু সব দামাল ছেলে, লেখা জানে না, পড়া জানে না, তাদের ধরে বেঁধে যদি শুদ্ধ শাস্ত্রীয় গান-বাজনার পাঠ দেওয়া হয়, সে-জবরদস্তি কি তারা শুনবে? বাবা ভাবলেন তাই অন্য পথে। শ্যামও থাকুক, কূলও। সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার ধাঁচে মাইহার ব্যান্ড। আলাপের দিকটা একদম বাদ গেল। উনি মন দিলেন তালের এক-একটি পকড় ধরে সুর রচনায়। ছোটোদের মনের উপযোগী করে শেখাতেন। খুব ভালো বুঝতেন তাদের চাহিদা। প্রথমে বন্দিশটি গলায় তুলে দেওয়া। সকলকেই গাইতে হবে, বাধ্যতামূলকভাবে। সে এক দেখার জিনিস। গলায় উঠলে পরে যন্ত্রের পাঠ। এবং সেখানেই ওঁর দূরদৃষ্টির পরিচয়। সকলকেই সব বাজনা বাজাতে হত। রিহার্সালের সময় সকাল আটটা থেকে। এখনও সে-রেওয়াজ আছে বলে শুনেছি’। শুধু বাজনাই নয়, মাইহার ব্যান্ডের গোড়ার পর্বে গানের ভূমিকাও ছিল। স্বর-সাধনা করতেন আটজন, পাঁচজন হাতে ধরতেন সরোদ, সেতারেও পাঁচজন, একটি করে বাঁশি এবং সানাই, তিনটি তবলা, একজোড়া বেহালা। চেলো, ক্ল্যারিওনেট, স্যাক্সোফোন, ইত্যাদি সবই একটি করে। একটা ব্যাপার আপাত দৃষ্টিতে পরিষ্কার। দু-একটি পাশ্চাত্য যন্ত্র, এমনকী কণ্ঠ ব্যবহারের যে-নিরীক্ষা আলাউদ্দিন করেছিলেন, তা কিন্তু ব্যান্ডের সনাতন ধারণার বিপরীতেই যায়। ধীরে ধীরে অবশ্য সে-ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। আজকের ব্যান্ড, দল হিসেবে অনেক সংহত, ছোটোও। সেখানে কণ্ঠের ব্যবহার নেই, অনুপস্থিত অত্যাধুনিক পাশ্চাত্যের যন্ত্রও। এবং সবচাইতে বড়ো কথা, যন্ত্রগুলি সবই প্রায় তার-যন্ত্র। এই অবস্থা অবশ্য একদিনে আসেনি। কয়েক দশকের অবিরাম ও সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনার ফসল তা।

একটু পিছনে ফেরা যাক। ১৯২৬-এ লখনৌর ভাতখণ্ডে সংগীত মহাবিদ্যালয়ে বসল ব্যান্ডের প্রথম আসর। আঠাশটি দুরন্ত বালক তখন রীতিমতো তুখোড় বাজিয়ে। তাঁদের দিয়ে অসাধ্য সাধন করেছেন বাবা আলাউদ্দিন। এক-আধ ঘণ্টার কম্পোজিশন মনে রাখতে তাঁদের না দরকার হয় কোনো কন্ডাকটারের, না স্ট্যান্ডে ঝোলানো নোটেশন-বোর্ডের। কাজে কাজেই সংগীতচর্চা স্মৃতিনির্ভর। অধিকাংশেরই অক্ষরজ্ঞান হয়নি। এইভাবে সাত-আট বছর ধরে চলল ঘষামাজা। তারপর একদিন আলাউদ্দিন সকলকে নিয়ে সটান কলকাতায়। ১৯৩৪-এর সেই অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অতঃপর দীর্ঘ বিরতি। ব্যাঙ্গালোর, দিল্লী, বোম্বাই, সার্ক সম্মেলন— হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠানে কেবল অংশগ্রহণ। বাকি ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন অধ্যাবসায়ের।

আর তাই, পাঁচ বছর ‘মদিনা মঞ্জরী’-র ঘরে বাবা আলাউদ্দিনের কাছে শিক্ষাগ্রহণ শেষে কলকাতায় ফিরে তিমিরবরণ সেই আদর্শেই তৈরি করলেন ওঁর ‘ফ্যামিলি অর্কেস্ট্রা’। অমিয়কান্তি, শিবব্রত, ললিতা, সবিতা প্রমুখ ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নী সমাবেশে তিমিরবরণের পারিবারিক অর্কেস্ট্রা সমাদৃত হয় সারা ভারতবর্ষে। উৎসাহিত হন স্বয়ং উদয় শংকরও। কিন্তু, সে-অন্য কাহিনি। বাবা আলাউদ্দিনের মাইহার ব্যান্ডের ধাঁচে গুণী ছেলে আলী আকবর খাঁ-ও দেশান্তরে গড়ে তুলেছেন এমনই এক সংস্থা। জর্জ রুকার্ট, ভি-জি-যোগ প্রমুখের সাহায্য এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি গড়ে তুললেন ‘দ্য নিউ মাইহার ব্যান্ড’ সংস্থাটি। পশ্চিমী কিছু যন্ত্র এবং কণ্ঠের ব্যবহারে আলী আকবর খাঁ মাইহার ব্যান্ডের আদি রূপটি চালু রাখার যে-পরিকল্পনা নিয়েছেন, তা ডকুমেন্টেশনের কাজে আসবে। আমেরিকায় জনাদশেক ছাত্র এই নিউ মাইহার ব্যান্ডের ক্রমাগত অনুশীলনে তৈরি হয়ে উঠেছেন। এখানেই অবশ্য শেষ নয়। সুইজারল্যান্ডে কেন জুকারম্যানও আশির গোড়ায় তৈরি করলেন ‘বাসেল মাইহার ব্যান্ড’। ভারতীয় সংগীতের বিপুল ঐশ্বর্য এইভাবেই বিদেশের দরবারেও পরম আদরণীয় হয়ে উঠল।

বাহাত্তরে সুরলোকে গেলেন আলাউদ্দিন। ৮০-র গোড়ায় দু-বার; তারপর ফের ৮৭-র নভেম্বরে কলকাতায় এলেন মাইহার ব্যান্ড। উপলক্ষ, বাবা আলাউদ্দিনেরই জন্মের ১২৫ বছর পূর্তি স্মারক উৎসব। তাঁদের ডেকেছেন যথারীতি আলী আকবর কলেজ অব মিউজিক। ১২ নভেম্বর। হাওড়া স্টেশন। সকলেই নামলেন ট্রেন থেকে। কিন্তু কোথায় সেই দু-জন? বলতে না বলতেই কামরার দরজায় এক বৃদ্ধ। ‘ম্যায় হুঁ গিরিধারীলাল’। দেখে আলী আকবর কলেজ অফ মিউজিক-এর নবীন প্রজন্ম আহ্লাদে আটখানা। ১৯৮৪-র সেই ভয়ংকর সুন্দর বৃষ্টির সন্ধ্যাকে যে ওঁরা ভুলতে পারেননি। সে-আলোচনা না হয় পরে। কিন্তু কোথায় গেলেন ঝুররা মহারাজ? না, আসেননি তিনি। আসার জন্য সবরকম চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও শরীরে অনুমতি মেলেনি। তাহলে কে বাজাবেন নলতরঙ্গ? সে-উত্তর অবশ্য মিলেছে যথা সময়েই।

৫৭, হরিশ মুখার্জি রোডের ছিমছাম একতলায় বসে গল্প শোনাচ্ছিলেন শেখর রায়চৌধুরী। মাইহার ব্যান্ডের স্থানীয় ম্যানেজার থেকে কেয়ার-টেকার— সবই তিনি। ব্যান্ডের চোদ্দজন সদস্য ট্রেনের ক্লান্তিতে কিছুটা অবসন্ন। ভাদুয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি আর নিখুঁত নিরামিষ রান্নার গন্ধ ভাসছে। ইতিমধ্যে দু-জন গোঁ ধরেছেন— ‘শেখরবাবু, ভায়োলিন খরিদ করনে হোগা। বহুৎ জরুরত’। ওঁদের থামিয়ে ফের একবার শুরু করেন শেখরবাবু— ‘৮৪-তে মহাজাতি সদনে ওঁদের শেষ আইটেম, রাগ ‘মেঘ’। অনুষ্ঠান শেষ হল; আর আপনাকে কী বলব, বৃষ্টিতে মানুষ সমান জল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে। রিক্‌শা করে একে একে ওঁদের ডেরায় ফেরত পাঠাই। এরই মধ্যে হারিয়ে গেলেন ঐ দু-জন, ঝুররা মহারাজ আর গিরিধারীলাল’। বলেই বেহালার খোঁজে ছোটেন শেখরদা।

ঝুররালাল থেকে ঝুররা মহারাজ— দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সাধনার দুই প্রান্ত। সাধারণ রাগের আরোহণ-অবরোহণে যাঁর গা দিয়ে ঘাম ছুটত, সেই ঝুররালালকে আলাউদ্দিন প্রায় সব যন্ত্রেই পারদর্শী করিয়েছিলেন। তিনি আর গিরিধারীলাল— প্রথম আঠাশের মধ্যে বেঁচে আছেন তো মাত্র এই দু-জনই। কত বয়স হল আপনার? জিজ্ঞাসা করি গিরিধারীজিকে। ছিপছিপে, ঋজু অবয়ব। মাথায় গান্ধি টুপি। দৃষ্টি সিধে। মাইহার ব্যান্ডের সকলের ‘পণ্ডিতজি’। কানে বোধহয় ইদানীং শুনছেন একটু কম। দ্বিতীয়বার বলতে হল একগাল হেসে— ‘ইয়াদ নেহি। সত্তর সে কুছ যাদাই হোগা’। কী কী বাজাতে পারেন আপনি? প্রশ্নের পরেই বুঝেছি, একেবারে সাদামাটা মেঠো হয়ে গেল ব্যাপারটা। পণ্ডিতজি বলেননি কিছু। বললেন দলের অন্যান্য সদস্যরা। সব, সব যন্ত্রে সমান অধিকার ওঁর। এখন অবশ্য বসেন দলের মাঝখানে হারমোনিয়াম হাতে। সাধারণ তিন অক্টেভের অতি নিরীহ-দর্শন একখানি যন্ত্র, মাইহার ব্যান্ডের প্রাণ যা।

রামলখন পাণ্ডে (সেতার), সুশীলকুমার শুক্লা (হারমোনিয়াম), রামলখন শর্মা (সরোদ), গুণাকর শামলে (হারমোনিয়াম), বিজয়কুমার শুক্লা (বেহালা), গোকারণ প্রসাদ পাণ্ডে (বেহালা), সুরেশকুমার চতুর্বেদী (এসরাজ), রামসুমন চৌরাশিয়া (সেতারব্যাঞ্জো), অশোককুমার বডোলিয়া (তবলা), বিজয় দেব সিং (চেলো), রামায়ণ প্রসাদ চতুর্বেদী (সেতার), শৈলেন শর্মা (নলতরঙ্গ) এবং গিরিধারীলাল (হারমোনিয়াম)— চোদ্দজন যন্ত্রি। তিনটি হারমোনিয়াম আর একজোড়া তবলা, একটি নলতরঙ্গ। বাদবাকি সব তারের যন্ত্র। ১৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় মহাজাতি সদনে ওঁদের শুরুর নিবেদন রাগ ‘শ্যামকল্যাণ’। কিন্তু, শ্রোতা ক-জন? বড়োজোর শ-চারেক। এরকম কেন? চমৎকার জবাব দিলেন আলী আকবর কলেজ অব মিউজিকের বর্তমান প্রধান উমা গুহ— ‘বিনি-পয়সার অনুষ্ঠান তো! বাড়ি-বাড়ি গিয়ে কার্ড দিয়ে এসেছি। লোক কেন হবে ভাই?’ বাস্তবিকই আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। প্রায় একক চেষ্টায় এই নিয়ে তিনবার মাইহার ব্যান্ডকে উমা গুহ কলকাতায় আনলেন। এবং আনলেন মধ্যপ্রদেশ সরকারের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধ করে। মাইহার ব্যান্ড মধ্যপ্রদেশ কলা পরিষদের পরিচালনাধীন। সরাসরি সরকারি সংস্থা এটি। সুতরাং তাঁদের অনুমতি পাওয়াটা যে কী কঠিন বিষয় তা উমা গুহর থেকে বেশি কেউ জানেন না। সম্পূর্ণ অ-ব্যবসায়িক এই সাংগীতিক দৌড়-ঝাঁপকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন এবং দায় তাই ছিলই। বাস্তবে কী হল? কাগজের বিজ্ঞাপনের জন্য পাওয়া যায়নি স্পনসর, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে অনেকেই আগাগোড়া নিলেন নীরব শ্রোতার ভূমিকা।

রাগ ‘শ্যামকল্যাণ’। চৌতালের আদিতে দুই মাত্রা যোগ করে চোদ্দ মাত্রার আড়া চৌতাল। তাতে সুর বেঁধেছেন আলাউদ্দিন। লয় মধ্য। যুগল তবলার ঠেকা আর বেহালা-সারোদ-সেতারের একমুখী ওঠানামা। বন্দিশটি চমৎকার। মাঝে নলতরঙ্গ। ছোটো-বড়ো বাইশটি বন্দুকের নল। সাধারণ লোহার শিক দিয়ে তাতে ঘা মেরে শুদ্ধ, কড়ি, কোমল অনুষঙ্গ কানে মেপেছিলেন আলাউদ্দিন। ঘষে, মসৃণ করে সুর অনুসারে তা বসানো কাঠের পাটাতনের ওপর। সেখান থেকে আসছে জলতরঙ্গের সুরাভাষ। একটু কড়া, হয়তো কিছুটা ধাতব, সব মিলিয়ে নিখুঁত সুরের উন্মাদনা, যা ব্যান্ডের লয়কে প্রতি মুহূর্তে বাড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ বাড়ানোর সেই মুহূর্তটিকে আলাদা করে ধরা যাচ্ছে না। এই যন্ত্রই তাহলে বাজান ঝুররা মহারাজ। শৈলেন শর্মা কিন্তু কখনোই তার অনুপস্থিতি মনে করাচ্ছে না। অনবদ্য ভঙ্গি। দ্রুতলয়ে যখন একের পর এক কঠিন-কঠিন মাত্রায় দুরূহ তেহাইয়ের কাজে ব্যস্ত শিল্পীরা তখন হঠাৎ করেই মনে এল একজন ভারতীয় জুবিন মেহেতার কথা। তার দলে শত জোড়া বেহালা, স্যাক্সোফোন, ড্রাম সেট, পারকাশান, বিবিধ বাঁশি— এ-সবের সামনে আড়াল হয়ে থাকে পাতার পর পাতা নোটেশন। বিশেষ মাইক্রোফোন, বিশেষভাবে তৈরি মঞ্চ এবং বিশেষ প্রবেশমূল্য ছাড়া অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রশ্ন ওঠে না। অথচ এই সাধারণ পোশাকের অতি-অসাধারণ ভারতীয় সংগীতজ্ঞরা শুধুমাত্র শ্রুতিতে ধরে রেখেছেন আলাউদ্দিনের রচনাকে, বংশ পরম্পরায়। এক চুল এদিক ওদিক হয়নি। ওরাই বলছিলেন, অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন এটাসেটা বদল করতে। পণ্ডিতজি অবশ্য সে-পরামর্শ মানেননি। অনুষ্ঠানের পরদিন জানালেন গিরিধারীলালও— ‘দেওয়ার আছে এখনও অনেক কিছু। বয়স হয়েছে, সেটাই ভয়। স্মৃতি তঞ্চকতা করবে না তো?’

শুধু মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠানেই নয়, কালীঘাট কালীবাড়ি-প্রাঙ্গণ, গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন— সর্বত্রই শুনে বুঝেছি, ওঁদের পরিবেশনের গায়ে সেঁটে আছে অরিজিনালিটির শিলমোহর। যেমন, ‘পুরিয়া ধানেশ্রী’। মুখ্য যন্ত্র বেহালা, নলতরঙ্গ যেন খানিকটা চাপা। সেরকমই কম্পোজিশন। আর শুধু লয় নয়, তালের পরিবর্তনও প্রতিমুহূর্তে। তিনতালে শুরু, মাঝে হঠাৎই দাদরায় কম্পোজিশনকে আমূল পালটে নেওয়া। আবার শেষ প্রান্তে তিনটি জবরদস্ত তেহাইয়ের সাহায্যে ফের তিনতালে আসা। আর সবই ওঁরা করছিলেন একে-অপরের দিকে না তাকিয়েই। সুরে সামান্যতম বিচ্যুতি নেই। তার প্রশ্নই ওঠে না। হঠাৎই নিখুঁত সরগম শুরু করলেন ওরা, পুরিয়া ধানেশ্রীতেই। যেন স্বরসাধনার প্রথম পাঠ। ক্রমশ ধরা যাচ্ছিল ব্যান্ডের কেন্দ্রীয় কৌশলটিকে।

শেষ পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

সুজিৎ দে’র প্রবন্ধ

মুর্শিদাবাদের বোলান গান: সাধারণ পরিচয়

বোলানের অন্য রূপটি হল পোড়ো বোলান বা পালা বোলান। বর্তমানে এই বোলানই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে বিবর্তিত হয়েছে। উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক গানই হল এ-ধরনের বোলান। বোলান গাওয়ার কৌশলটাও আগে ছিল একটু অন্যরকম। দলের সব সদস্যরা আসরে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে বোলান পরিবেশন করত। মাঝখানে থাকত বাদক, প্রম্পটার প্রমুখরা। দু-টি সারিতে দাঁড়িয়ে বন্দনা গান গাওয়া হত। প্রম্পটার প্রাধান গায়কের কানে কানে গানের পরবর্তী কলিটি শুনিয়ে দিত। প্রথম সারির গান গাওয়া হলে ওই একই লাইন গাইত পরের সারির সদস্যরা। আর ছিল দোহারী। দু-টি সারির লোকেদের একবার করে গান গাওয়ার পর দলের অন্যান্য সদস্য যারা আসরে বসে থাকত তারা গান ধরত।

মূল গায়কদের বিরতি দেওয়ার জন্যই এই প্রথা। বন্দনা থেকে শুরু করে পালা অংশ, সমাপ্তি গান সবই সংগীতের মধ্য দিয়ে পরিবেশিত হত।

বর্তমানে যে-বোলান পালা প্রচলিত আছে তা পোড়ো বা পালা বোলানের বিবর্তিত রূপ। এর কয়েকটি বিভাগ স্পষ্ট চোখে পড়ে—

১। বন্দনা
২। বোলান পালা
৩। পালার সমাপ্তি সূচক গান
৪। রং পাঁচালী।

বোলান পালা পরিবেশন করার আগে বিভিন্ন দেবতার বন্দনা করা হয়; যে-আসরে বোলান গাওয়া হয় সেখানে প্রকাশ হতে প্রার্থনা জানানো হয়—

“আমরা প্রথম আসরে মাগো করি বন্দনা
বাগবাদিনী বীণাপাণির চরণ দুখানা।
তুমি বিনে বাক্য কহে কোন জনের শক্তি নহে
ব্যাসাদি বাল্মিকী কহে গুণের বর্ণনা।
এস, সিদ্ধিদাতা গণপতি, পিতা যাহার পশুপতি
সিংহপৃষ্ঠে ভগবতীর চরণ দুখানা
এস ইন্দ্র চন্দ্র যম হুতাসন, যত আছেন দেবতাগণ
অরুণ বরুণ ষড়াণন করুন বন্দনা।” [৮]

কিংবা বন্দনা গাওয়া হয় এরকম—

“মঙ্গলময় তুমি শ্রীমধুসূদন
সঁপিলাম এই প্রাণ তব চরণতলে
তব কৃপা পাব বলে
এস মা সরস্বতী করি নতি করি নতি
এই আসরে দয়া করে।” [৯]

বন্দনা গাওয়ার পরেই দর্শকদের জানিয়ে দেওয়া হয় আসরে কোন পালা পরিবেশিত হবে। এই ব্যাপারটাতে এখন অনেকটা যাত্রার ঢং এসে গেছে—

“শ্রী শ্রী ভোলানাথের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে আমরা শুরু করতে চলেছি এক সম্পূর্ণ পৌরাণিক বোলান পালা শঙ্খচূর বধ। রচনা গৌর নন্দী। নির্দেশনা সুবল নন্দী, পরিচালনায় বিমান নন্দী। সূধী দর্শকমণ্ডলীর শ্রীচরণধূলি মাথায় নিয়ে শুরু করছি এ বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ পৌরাণিক পালা শঙ্খচূড় বধ।” [১০]

এছাড়া কখনো কখনো অভিনেতাদের নাম ঘোষণা করতেও দেখা যায়।

এরপর শুরু হয় মূল বোলান পালা অর্থাৎ, কাহিনি অংশ। ঐতিহাসিক, পৌরাণিক ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে রচিত হয়ে থাকে তা।

বোলান পালা অভিনয়ের সময় যতটা সম্ভব গম্ভীর ও জোড়ালো কণ্ঠস্বরের আশ্রয় নেওয়া হয়। এই কারণেই স্বগতোক্তি প্রাধান্য পায়। চরিত্রের মনের প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ স্পৃহা অথবা তার পরবর্তী কার্যকলাপের প্রকাশ ঘটে সেখানে। এটা গানের মাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়। লোকশিক্ষা বা নীতিশিক্ষা থেকেই যায় বোলানে। যেমন ‘শঙ্খচূড় বধ’ পালায় দর্পে অন্ধ তুলসীর স্বামীকে তুলসী পরনারীর প্রতি লোভ প্রদর্শন করতে বারণ করে। বলে—

“যে পরের নারীকে মায়ের মত দেখে, পরের জিনিসকে মাটির ঢিলা ভাবে, যে সবাইকে আপন ভাবে সেই তো পণ্ডিত।” [১১]

অথবা, চণ্ডাল হয়ে রাজার মন্দিরে পূজা দেওয়ার জন্য যার হাত কেটে দেয় রাজা; সুযোগের পরিস্থিতিতে সেই রাজার দুর্দিনে চণ্ডাল ছেলেটি জাত পাতের ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে কথা বলে এবং প্রতিবাদ করে—

“যখন দু-মুঠো ভাতের জন্য মানুষ হাহাকার করে, তখন দুঃখের কথা কেউ শোনে না। ভগবানের কাছে মনের ব্যথা জানায় যখন তখন আপনার জাতভেদ কোথায় থাকে মহারাজা।” [১২]

বোলান পালা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেই মুহূর্তে আসরে যে-ক-জন কুশীলব উপস্থিত থাকেন তারাই সমাপ্তি গান গেয়ে থাকে। একদিকে যেমন দর্শকদের জানিয়ে দেওয়া হয় বোলান পালা শেষ হয়েছে; তেমনি জানিয়ে দেওয়া হয় ‘বই বলে’ তথা প্রম্পটার, দলপতি, রচনাকারের নাম-সহ দলের ঠিকানা। যেমন ‘শঙ্খচূড় বধ’ পালার সমাপ্তি গানটি এইরকম—

“মোদের বোলান সাঙ্গ করিলাম
তপন নন্দী দলপতি বই বলে বিমান
রাজাপুরে মোদের বাড়ি ঠিকানা দিলাম
কয়েকজনা মিলে মোরা এদল গড়িলাম
মোদের বোলান সাঙ্গ করিলাম।।” [১৩]

এই গান গাওয়ার সময় অভিনেতাদের গোল করে ঘুরে ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করতে দেখা যায়। চরিত্রের অবস্থান অনুযায়ী আচরণ এখানে আশা করা বৃথা। এই গানগুলি প্রায় একইরকম হয়ে থাকে। অন্য একটি পালার সমাপ্তি গান এইরকম—

“এখানেতে গান করি সমাধান
মহুলাতে মোদের বাড়ি।
জ্ঞানে অজ্ঞানে গাহি গো বোলান
সবে হয় যে আনাড়ি।
মহুলাতে মোদের বাড়ি।
সুখেনের রচনা করুন গো মার্জনা
হরি নামে যাবে ত্বরী।
মহুলাতে মোদের বাড়ি।” [১৪]

বোলান পালার শেষে হাস্যকৌতুক সমৃদ্ধ আদিরসাত্মক পাঁচালী পরিবেশিত হয়। তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অশ্লীল হয়ে ওঠে। খিস্তি, খেউর স্বভাবতই স্থান করে নেয় সেখানে। কিন্তু গ্রামের মাটিতে লালিত, গ্রামের পুথিগতভাবে অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত গ্রামবাসীকে আনন্দ দিতে সাহায্য করে এ-ধরনের পাঁচালী।

বর্তমানকালে শিক্ষার আলোয় আলোকিত একদল মানুষ বোলান দল গঠন করে লোকনাট্যের ধারাটি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও রং পাঁচালীর আদি রস থেকে তারা বেরিয়ে আসতে চাইছে। আসরে বোলান পালা পরিবেশন করে দর্শকদের তারা খুব মুগ্ধ করে। কিন্তু ‘মোদের বোলান সাঙ্গ করিলাম’ বলার সাথে সাথে যখন তারা আসর ছাড়তে উদ্যোগী হয়, তখনই দর্শকদের চিৎকার ধ্বনি আসরে আছড়ে পড়ে— ‘রং পাঁচালী, রং পাঁচালী’ তাই ‘না, না’ করেও পার পাওয়া যায় না। কিছু একটা করতেই হয়। লোকনাট্যের একটা অন্যতম ধারা কিন্তু এই রং পাঁচালী। গ্রামীণ প্রহসন বললে খুব ভুল বলা হয় না। নিতান্তই হাস্যরসের সঙ্গে গ্রামীণ জমিদার, পাড়ার মোড়ল প্রভৃতি চরিত্রগুলিকে ব্যঙ্গ করা হয় এখানে। সে-ব্যঙ্গের ভাষায় অবশ্যই থাকে অতিরঞ্জনের সুর।

এবার আসা যাক বোলানের সঙ্গে যুক্ত লোকগুলির কথায়। কোনো তথাকথিত শিক্ষিত লোক বোলান রচনা করেন না। গ্রামেরই কোনো অল্পশিক্ষিত লোক যে সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখেছে, পৌরাণিক গল্প শুনে শুনে জেনেছে তিনিই তার আগ্রহ থেকে বোলান রচনা করেন। মূল পাঠের বানান বিভ্রান্তিই বোধ হয় তার বড়ো একটা প্রমাণ।

বোলানের কুশীলব বা শিল্পীরা দক্ষ অভিনেতা নন, অভিনয় এদের পেশা নয়, নেশা। শ্রমজীবী, কৃষিজীবী মানুষগুলি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মহড়া শুরু করেন। পারিশ্রমিক যা পায় তার হিসেব করলে পুরোটাই ‘লস’। এরা হয়তো বছরের এগারো মাস লাভ ক্ষতির হিসেব করেই চলে বা চলতে চায়। কিন্তু বোলানের সময় এরা খুশির জোয়ারে ভেসে ভুলে যায় লাভ ক্ষতির পাটিগণিত। সাধারণত পুরুষেরাই অভিনয় করে। তবে ইদানীং মহিলাদের প্রবেশ ঘটলেও তা অবাধ নয়। অন্য কোনো লোকনাট্যের দল (আলকাপ, কৃষ্ণযাত্রা প্রভৃতি) থেকে মহিলাদের ভাড়া করতে হয়। স্বভাবতই পারিশ্রমিক পুষিয়ে নেয় তারা। আর এদের অভিনয় পেশাগত।

প্রম্পটার বোলানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। অল্প কয়েকদিনের মহড়ায় বিশেষ কিছু হয় না। আসরে যেখানে অভিনয় হয় তার এককোনে প্রম্পটার বসে থাকে। বেশ জোড়েই সংলাপ ও গানের কথা বলতে হয়। তা শুনেই শিল্পীরা সংলাপ বলে ও গান করে।

মঞ্চ পরিকল্পনার ব্যাপারটিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বাঁধাধরা সুনির্দিষ্ট মঞ্চ থাকে না বোলানের অভিনয়ের জন্য। মঞ্চসজ্জাও থাকে না কিছুই। শুধু কয়েকটি মাইক্রোফোন ঝোলানো হয় দড়ির সাহায্যে। শিব পূজার মণ্ডপের সামনে এর অভিনয় হয়। দর্শকেরা চারিপাশে সুবিধামতো বসে। মাঝখানে যে-অংশটুকু ফাঁকা থাকে সেখানেই বোলান পরিবেশিত হয়। চারিদিকের একটা দিকেই বোলান দল তথা গায়ক, বাদক, অভিনেতারা বসে থাকে। এটিই তাদের গ্রিনরুম। এক আসর থেকে আর এক আসরে এভাবেই বোলান গান করে মানুষকে আনন্দ দেয় তারা।

পৌরাণিক বা সামাজিক যে-কোনো পালার ভাষায় থাকে আঞ্চলিকতার ছাপ। রচনাকার যথাসম্ভব শুদ্ধ লিখতে চাইলেও কুশীলবরা আঞ্চলিক ভাষাকেই ব্যবহার করে সচেতনভাবেই। যেমন লিখিত পালায় আছে— ‘তুই ছাড়া আমার যে আর কেউ নায়’। [১৫] উচ্চারণে হয়ে যাচ্ছে— ‘তু ছাড়া আমার আর কেউ নাই’। সাধু চলিতের মিশ্রণটিও লক্ষণীয়—

“আমি তোমার অভিশাপ শিরোধার্য করিলাম, তবে আমি তোমায় অভিশাপ দেব না’। [১৬]

শ্রমজীবী, কৃষিজীবী মানুষগুলি বোলানকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়, বোলান দল গড়ে ওঠে। ক্ষুদ্র, তুচ্ছ বিবাদ এ-সময় মিটে যায়। এক প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয় তারা পস্পরের সঙ্গে। হয়তো কোনো বছর নিতাই সাজে মহিমের বৌদি, সারা বছরের জন্য মহিম নিতাইকে বৌদি বলেই ডাকে, সঙ্গে গ্রামের আরও পাঁচজন। রসিকতার সঙ্গে সঙ্গে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বলা বাহুল্য গ্রামের মানুষগুলোও নাওয়া খাওয়া ভুলে বোলান শোনে; আর শেষ হলে অপেক্ষা করে পরের বছরের।

নাগরিক সভ্যতা থেকে বহু দূরে, শহরের প্রান্তসীমার নাগালের বাইরে পল্লির মুক্তাঙ্গনের গীত বোলান গান। মোবাইল আর ইন্টারনেটের যুগের প্রভাব আজ গ্রামেও পড়েছে। তাই বোলান সেখানে অনেকটা মর্যাদা হারিয়েছে। তবে লোকসমাজের বাসিন্দারা আজও প্রাণপণে চেষ্টা করে চলেছে বোলান গানকে টিকিয়ে রাখার। আর এ-জন্যই এত পরিবর্তনের ঘটা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সহযোগিতার অভাব আজ বৃহত্তর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি গ্রামীণ মানুষগুলির ভালোবাসা না থাকলে এ প্রকার সহযোগিতা সম্ভব নয়। অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত চাষাভুষো লোকগুলোকে মর্যাদা দিতে চায় না উচ্চবিত্তেরা। কিন্তু এরাই বাংলার এরকম এক ঐতিহ্যকে যেভাবে ধরে রাখবার চেষ্টা করছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। লোকসাহিত্যের অঙ্গনে তাই আজও বেঁচে আছে ‘বোলান’। বেঁচে থাকবে যতদিন এই লোকসমাজ থাকবে আর বাঁচবে। তাই তো বিশ্বকবির আবেদন—

“সাহিত্যের ঐক্যতান সংগীত সভায়
একতারা যাহাদের তারাও সম্মান যেন পায়।” [১৭]

বলা বাহুল্য লোকসাহিত্যের অঙ্গনে ‘বোলান’ গান মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। শুধু চাই গ্রামীণ মানুষগুলির এর প্রতি ভালোবাসা আর সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস। একমুঠো ছাতু আর আধখানা রুটি বা একমুঠো ভাতের সংস্থান এরা নিজেরাই করতে পারে। প্রয়োজন শুধু সম্মান আর মর্যাদা। তাহলেই লোকসংগীত ও লোকনাট্যের বিমিশ্র এই রূপ টিকে থাকবে, পা বাড়াবে যুগ থেকে যুগান্তরের পথে।

তথ্যসূত্র:
১। বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ/ আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা, ড দুলাল চৌধুরী সম্পাদিত/ প্রথম প্রকাশ-২০০৪/ পৃষ্ঠা-১৭০।
২। তদেব।
৩। তদেব।
৪। তদেব। পৃষ্ঠা-১৭১।
৫। সতীশ কুণ্ডু রচিত ‘ভিখারী ঈশ্বর’ নামক বোলানপালা/ পৃষ্ঠা-৩।
৬। বাংলার লোকসাহিত্য–প্রথম খণ্ড/ আশুতোষ ভট্টাচার্য/ পৃষ্ঠা-৫৯৭।
৭। বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ/ আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা, ডঃ দুলাল চৌধুরী সম্পাদিত/ প্রথম প্রকাশ-২০০৪/ পৃষ্ঠা-১৭২।
৮। গৌড় নন্দী রচিত ‘শঙ্খচূড় বধ’ বোলান পালা/ পৃষ্ঠা-১।
৯। সতীশ কুণ্ডু রচিত ‘ভিখারী ঈশ্বর’ নামক বোলানপালা/ পৃষ্ঠা-১।
১০। গৌড় নন্দী রচিত ‘শঙ্খচূড় বধ’ বোলান পালা/ পৃষ্ঠা-২।
১১। তদেব/ পৃষ্ঠা-১৫।
১২। সুখেন হাজরা রচিত ‘চণ্ডাল রাজা’ বোলান পালা / পৃষ্ঠা-২২।
১৩। গৌড় নন্দী রচিত ‘শঙ্খচূড় বধ’ বোলান পালা/ পৃষ্ঠা-২৭।
১৪। সুখেন হাজরা রচিত ‘সোনার সংসার’ বোলান পালা / পৃষ্ঠা-৫১।
১৫। তদেব/ পৃষ্ঠা-৮।
১৬। গৌড় নন্দী রচিত ‘শঙ্খচূড় বধ’ বোলান পালা/ পৃষ্ঠা-২৫।
১৭। সঞ্চয়িতা–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ সাহিত্যম/ সংস্করণ, জানুয়ারি ২০০৩/ পৃষ্ঠা-৬২২।

সহায়ক গ্রন্থ:
১। বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ-ড দুলাল চৌধুরী সম্পাদিত-আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা।
২। লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞান-তত্ত্ব, পদ্ধতি ও প্রয়োগ-শেখ মকবুল ইসলাম-বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ।
৩। বাংলার লোকসাহিত্য-শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য-প্রথম খণ্ড।
৪। বাংলার লোকসংস্কৃতি-শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য-ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট-ইন্ডিয়া, নয়াদিল্লি।
৫। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস-সুকুমার সেন-প্রথম খণ্ড।
৬। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত-অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়-দ্বিতীয় খণ্ড-মডার্ণ বুক এজেন্সী।

প্রথম পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

সুজিৎ দে’র প্রবন্ধ

মুর্শিদাবাদের বোলান গান: সাধারণ পরিচয়

চৈত্র মাস শেষের দিকে। বছর শেষ হবে। সারা বছর ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষগুলির মনে কীসের এত ফুর্তি! ও শিবের গাজন আসছে। শরতের চারদিন যেমন বাঙালির ঘরের মেয়ে ঘরে ফেরে; চৈত্রের শেষ চারদিন তেমনি বুড়ো শিবের। এই শিবের গাজন আর তাকে কেন্দ্র করে ‘বোলান’ গান পল্লিমায়ের চিরদুঃখী সন্তানগুলিকে মাতিয়ে রাখে এ-সময়।

এমন চিত্র ছিল আগের বছর পর্যন্ত। আর এ-বছর করোনার মৃত্যু ভয়ে কুঁকড়ে আছে তারা। বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে জীবন আর জীবিকার তাগিদে আজ তারা অসহায়। একটা একটা করে উৎসবকে ছেড়েছে তারা। মনমরা হয়ে ভাতে মরার দিন যেন সামনে এগিয়ে আসছে। থেমে যাওয়া উৎসবের স্মৃতিচারণায় এই প্রবন্ধের আয়োজন।

বোলান= বোল + আন। যার অর্থ কথা বলা, প্রতিবচন, উত্তর। বাংলা সাহিত্যের আদি মধ্য যুগের অনেক ক্ষেত্রে ‘বোলান’ কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়—

“বোলান বুলিতে গেল ময়না বসতি” (রূপরাম চক্রবর্তী/ধর্মমঙ্গল) [১]

“ঘরে গেল্যা না দিয়া বুলান” (কবিকঙ্কণ) [২]

“ডাকিলে বোলান ন দেও” (মনসামঙ্গল/বিজয়গুপ্ত) [৩]

রূপরামের ধর্মমঙ্গলে ‘বোলান’ হল মানসিক ব্রত। কবিকঙ্কণ ও বিজয়গুপ্তের রচনায় ‘বোলান’-এর অর্থ উত্তর-প্রত্যুত্তর বা কথা বলা। নাথপন্থী শৈব যোগী, পশ্চিম ভারতের নিরঞ্জন নাথপন্থী প্রমুখ ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে ‘বোলান’-এর প্রচার দেখা যায়। ডঃ সুকুমার সেন মহাশয় তাঁর ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে উত্তর রাঢ়ের মনোহরশাহি পরগণা থেকে একটি ‘বোলান’ গানের নমুনা তুলে এনেছেন—

“যতগুলি বললাম বোলান গো
আরও বলতে পারি
ওস্তাদের নাম অকিঞ্চন
তেঁতুল তলায় বাড়ি
যার বাড়িতে জমি
তোমরা এবার বোলান বল
আমরা এবার বসি।।” [৪]

বর্তমানে মুর্শিদাবাদে যে-বোলান গান প্রচলিত আছে তা মূলত শিবের গাজনকে কেন্দ্র করেই। তবে কখনো কখনো অন্য কোনো অনুষ্ঠান বা মেলায় বোলানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। চৈত্রের শেষ চারদিন যে-শিবের গাজন হয় তার কিছুদিন আগে থেকেই বোলান দলগুলির মধ্যে সাজ সাজ রব ওঠে। তারা তিন-চার দিন ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে বোলান গান করে বেড়ায়। এ হল পালা বোলান। আর এক প্রকার বোলান আছে তাকে বলে ‘সাধলে বোলান’; বা ‘সাজলে বোলান’। শিবের গাজনের বা ধর্মরাজের ভক্তরাই এ-বোলান করে। অন্যদের এ-বোলান করার অধিকার নেই। শিবের গাজন ছাড়াও ‘সর্বমঙ্গলা’ বা ‘শেতলা’ পুজোর সময়ও বোলানের আয়োজন করা হয় অনেক সময়।

সাজলে বোলান ও পালা বোলান উভয়ই প্রচলিত আছে এখন। শিবের ভক্তরা করে সাজলে বোলান। তা মূলত পূজা পদ্ধতির অঙ্গ। আর পালা বোলানে একদিকে যেমন থাকে পালাবন্দী নাটক অন্য দিকে সংগীতের বহুল প্রয়োগ। আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে নারীবেশী পুরুষের চটুল নৃত্য। বন্দনা গান, পালা অভিনয় আর রং পাঁচালির মধ্য দিয়ে দর্শকের মনোরঞ্জন করে থাকে কুশীলবরা। গানগুলি অবশ্যই লোকসংগীতের ধারাটিকে বজায় রেখে চলেছে।

বোলান গানকে বলতে হয় আনুষ্ঠিক বা পূজাকেন্দ্রিক লোকসংগীত। পালার প্রয়োজনে গানগুলি লোকসমাজের দ্বারাই রচিত হয়। কোনো একক ব্যক্তির দ্বারা এ-গান রচিত হয় না। দলের বিভিন্ন সদস্যদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক প্রসূত এই গান। গানগুলির প্রচার ও প্রসার ঘটে লোকমুখে। তাই পাঠভেদ লক্ষ করা যায় অনেক ক্ষেত্রেই। সুরে থাকে আঞ্চলিকতার ছোঁয়া। প্রেম, আনন্দ, অভিমান বা চরম দুঃখ প্রকাশে এর প্রয়াগ। ‘ভিখারি ঈশ্বর’ নামক একটি সামাজিক পালায় দাদা ঈশ্বর তার ভাইয়ের বিয়ের আনন্দে গান গাইছেন—

“আজকে আমার ভায়ের বিয়ে খুশীর সীমা নায়
আয়রে তোরা সবাই মিলে আয়রে ছুটে আয়
আনন্দেতে সবাই যখন শাঁক বাজাবে
পালকি এসে ভায়কে আমার নিয়ে যাবে।” [৫]

এর ভাষা নিতান্ত সহজ সরল। আর সুরে আঞ্চলিকতা থাকলেও বাংলা বা হিন্দি সিনেমার গান কিংবা প্রচলিত জনপ্রিয় কোনো গানের সুরকে অনুসরণের চেষ্টা করা হয় লোক আকর্ষণের জন্যই। পদ বা পদসমষ্টির পুনরাবৃত্তি অবশ্যই থাকে গানে। মুর্শিদাবাদ, নদিয়া এবং বর্ধমানের কিছু অঞ্চলের লোকসমাজই এ লোকসংগীতের জন্মদাতা ও পৃষ্ঠপোষক।

সামাজিক নানা বিষয়, মনগড়া নানা কাল্পনিক কাহিনির পাশাপাশি পৌরাণিক কাহিনির দেখা মেলে বোলান পালায়। অবশ্যই লোকমুখে প্রচলিত পুরাণ। তাই কোনো গ্রন্থের সাথে এর সত্যতা যাচাই করা অর্বাচীনের কাজ হবে। শিল্প শাসনের বাধা মানে না বোলান। তাই লোকরুচি ও চাহিদা অনুযায়ী এর পরিবর্তন ঘটে চলেছে। নৃত্য এর একটি জরুরি অঙ্গ। সূক্ষ্ম ভাবের প্রকাশ করতে গিয়ে সুনিপুণ অভিনয় সেখানে হয় না। জোড়ালো ও গম্ভীর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে সংলাপ ও গান পরিবেশিত হয়। পূজা মণ্ডপের মাঝে একটু জায়গা করে নিয়ে, চারিদিকে দর্শকের উপস্থিতিতে কুশীলবরা অভিনয় করে চলে।

একইসঙ্গে গান ও অভিনয়ের প্রাধান্যে বোলান লোকসংগীত ও লোকনাট্যের বিমিশ্র রূপ হয়ে উঠেছে। গানের মধ্য দিয়েই বোলানের সূচনা, গানের মধ্য দিয়েই সমাপ্তি। মূল পালার মাঝেও সংগীতের ব্যবহার একটু বেশিই। বোলানের প্রাচীন রূপে সংগীত ছিল প্রধান। সংলাপ ছিল সংগীতের মেলবন্ধনকারী। বর্তমানে সংলাপের প্রাধান্য এলেও সংগীত তার নিজের জায়গাটি ছেড়ে দেয়নি। গীতিপ্রধান এই বোলানকে গীতিনাট্যও বলা যায়—

“বোলান গান গীতি প্রধান রচনা। সেই জন্য ইহাদের গীতিনাট্য বলিয়া উল্লেখ করা যাইতে পারে”। [৬]

ধর্মঠাকুর ও শিবের গাজনকে কেন্দ্র করে মূল সন্ন্যাসী গাঁয়ের পথে পথে ঘুরে যে-তর্জা, ছড়া বলে তার নাম বোলান। শিবের গাজনের ভক্তরা তাদের পূজার অঙ্গ হিসেবে লোকের বাড়ি বাড়ি কিংবা তাদের ইষ্ট দেবতার সামনে যে-গান বা ছড়া পরিবেশন করে তাই সাজলে বোলান। ডঃ সুকুমার সেন মনে করেছেন সাজলে বোলানই হল বোলানের আদি রূপ। সাজলে বোলানের একটি নমুনা—

“আরে সাজলে
ধুল ধুল সাজলে ধুল ধুল ধুল
পড়েছে মায়ের পাতা উদম করে চুল।
আরে সাজলে
শ্মশানে গিয়েছিলাম মশানে গিয়েছিলাম
সঙ্গে গিয়েছিল কে ?
কার্তিক গণেশ দুই ভাই সঙ্গে সেজেছে।
আরে সাজলে কাল বাঞ্ছা খেয়েছিল টুকই ভরা মুড়ি
আজ বাছার মুণ্ডু যায় ধুলায় গড়াগড়ি।।
আরে সাজলে
তুই তো মেরা ভাই সাজলে তুই তো মেরা ভাই
তোর সাথে গেলে সাজলে শিব দর্শন পাই।
আরে সাজলে
ভাল বাজালি ঢেকো ভেয়ে
তোর মা আমার মামি…” [৭]

সাজলে বোলান কেবলমাত্র গাজনের ভক্তরাই গাইতে পারে। অন্যদের অধিকার নেই। সাজলে বোলানের রূপটি বেশি পরিবর্তন হয়নি। দেবতাদের উদ্দেশে প্রণাম জানাতে এবং গ্রামবাসীর মঙ্গল কামনায় আজও এ-ধরনের গান গাওয়া হয়।

শেষ পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

রবিউল ইসলামের প্রবন্ধ

মিথ ও ট্যাবুতে সাত সংখ্যা: আফ্রিকান মিথোলজি

সাত সংখ্যাটিকে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে কখনো পবিত্র আবার কখনো অপবিত্র হিসাবে দেখা হয়েছে। আবার এটা বললে ভুল হবে না যে, পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে সাত সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। এই কারণে প্যাট্রিসিয়া ফারা তাঁর ‘Science: Four Thousand Year History’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন—

“Seven has always been a very special number. Sanskrit’s most ancient holy book, the Rig Veda, describes seven stars, seven concentric continents, and seven streams of soma, the drink of the gods. According to the Jewish and Christian Old Testament, the world was created in seven days and Noah’s dove returned seven days after the Flood. Similarly, the Egyptians mapped seven paths to heaven, Allah created a seven-layered Islamic heaven and earth, and the new-born Buddha took seven strides. […] For numerologists, seven signifies creation, because it is the sum of the spiritual three and the material four; for alchemists, there are clear parallels between the seven steps leading up to King Solomon’s temple and the seven successive stages of chemical and spiritual purification. Iranian cats have seven lives, seven deities bring good luck in Japan, and a traditional Jewish cure for fever entailed taking seven prickles from seven palm trees and seven nails from seven doors.”

হিন্দু-ইসলাম-খ্রিস্টান-সহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে সাত সংখ্যার গুরুত্ব আমরা দেখতে পাই। সাত সংখ্যাটি এমনভাবে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে যে, আমরা কথাতেও ‘সাত’ সংখ্যাটিকে ব্যবহার করি। যেমন— ‘সাত সতেরো’ ও ‘সাতে পাঁচে’— যার অর্থ হল বহুবিধ বা নানারকম। তবে আলোচ্য নিবন্ধে আমরা আফ্রিকার দেশগুলিতে প্রাচীনকাল থেকে ‘সাত’ সংখ্যাটিকে ঘিরে যে-মিথ ও ট্যাবু গড়ে উঠেছে তা নিয়ে আলোচনা করব।

প্রাচীন সভ্যতা বললেই আমাদের সামনে মিশরীয়দের কথা ভেসে ওঠে। মিশরীয় ভাষায় সাতকে ‘Sephet’ বা ‘Seshat’ বলা হয়। আর সেশাত হল প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘Thoth’-এর সঙ্গিনী। সেশাত হলেন সময় ও উত্তরণের দেবী। সেশাতের মাথায় সাতটি ফুলের পাপড়ি দেওয়া একটি মুকুট থাকে এবং তার চামড়া চিতাবাঘের। সেশাত জনসাধারণ দ্বারা পূজিত হতেন না। ইনি মূলত মিশরের ফ্যারাওদের দ্বারা পূজিত হতেন।

মিশরীয় মিথে সাত অর্থাৎ সেশাত সংখ্যাটি মূলত জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, সেশাতের আরেক নাম ছিল ‘প্রথম গ্রন্থাগারিক’ এবং তার ভূমিকা ছিল মূলত তার স্বামীর বই সংরক্ষণ করা। এখানে লক্ষ করার মতো যে, সেশাতের মাথায় কিন্তু সাতটি ফুলের পাপড়িযুক্ত মুকুট পরা থাকত। এই কারণেই সেশাত অর্থাৎ সাতকে মিশরের ফ্যারাওরা পূজা করত।

মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব ও মিথে সাত সংখ্যাটিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী সাতটি প্রাথমিক শক্তির কথা বলা হয়েছে। এই প্রাথমিক শক্তিগুলি হল: অন্ধকার, আলো, বাতাস, পৃথিবী, জল, আগুন এবং রক্ত। মিশরীয় মিথ অনুযায়ী সাতটি হ্যাথোর (হ্যাথোর হলেন প্রাচীন মিশরীয় প্রেমের দেবী), সাতটি আত্মা, মিশরের সাতটি জেলা বা অংশ, সোলার বার্কের সাতটি স্তর। (সোলার বার্ক বলতে— the bark in which the sun is said to be carried across the sky-কে বোঝায়।), হ্যাথোরের সাতজন কর্মচারী, মেরুপ্রদেশে সাতজন আনুবিস, অটাম-রা-এর সাতটি আত্মা, মাত-এর সাতজন সহকারী কর্মচারী এমন অসংখ্য বিষয়ে সাত সংখ্যাটি মিশরীয় মিথে জড়িয়ে আছে। এমনকী মৃতদেহ সৎকারে সাতরকম তেল ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

পশ্চিম আফ্রিকার বামবারা ও ডোগোন জাতির মানুষদের মধ্যে ৭ সংখ্যা নিয়েও মিথ লক্ষ করা যায়। বামবারা ও ডোগোনদের মতে সাত হল ভারসাম্যের প্রতীক এবং এই ভারসাম্য হল নারী ও পুরুষের। ৩ সংখ্যাটিকে বামবারা ও ডোগান জাতিরা পুরুষত্ব ও ৪ সংখ্যাটিকে নারীত্বের প্রতীক হিসাবে তারা দেখে। আর দু-টি সংখ্যার মিলনে ৭ সংখ্যা সৃষ্টি হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পিরামিডকে ৭ সংখ্যার ভারসাম্যের নিদর্শন হিসাবে ধরা হয়। কারণ, পিরামিডের তলদেশ চতুর্ভুজ এবং তার উপরে ত্রিভুজ আকৃতির পিরামিড অবস্থিত। এই চতুর্ভুজ ও ত্রিভুজ মিলেই ৭ সংখ্যা নির্দেশ করছে।

আফ্রিকার আকান জাতিদের মধ্যে ৩ হল রানির সংখ্যা এবং ৪ হল রাজার সংখ্যা। এই দুইয়ে মিলিয়ে হল ৭ সংখ্যা। আকানদের ভবিষ্যৎ কথনের যে-প্রথা আছে সেখানেও ৭ সংখ্যা বিজোড় হিসাবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

ডোগোন সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে সাত সংখ্যাটির গুরুত্ব আছে। তাদের মতে পূর্বপুরুষদের সপ্তম আত্মা এই বিশ্বব্যবস্থার জন্য দায়ী। এই আত্মাটি একটি কাপড় বুনে মানবজাতিকে দেয় এবং এই কাপড়ে ‘soy’ নামের শব্দ লেখা ছিল। যার অর্থ হল— ‘এটি হল মৌখিক শব্দ’। এই ‘Soy’ শব্দটির আরেকটি অর্থ হল সাত। এখানে আরও বলা যায় যে, ডোগানদের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী যখন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হচ্ছিল তখন তাদের প্রধান দেবদেবী ‘আম্মা’ (Amma) এই বিশ্বকে সাত খণ্ড উপরে ও সাত খণ্ড নীচে কেটে ভাগ করেছিল। এখানে আরও বলা যায় যে, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম বীজ ‘পো’-এর মধ্যে সাতবার কম্পন হয়েছিল। আর প্রতিটি কম্পন জীবনের এক-একটি স্তরকে নির্দেশ করে। ডোগোনদের এই সাত নারী ও পুরুষের মিলন হিসাবে দেখা হয়। সেখান থেকে নতুন প্রাণের জন্ম হয়।

সাত সংখ্যাটি মিশরীর গণিতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মিশরীয় মৌলিক সমীকরণ অনুযায়ী সাত হল— ১+২+৪=৭। এবং এই গণণার মূল ভিত্তি হল সংখ্যাকে দ্বিগুণ করা। আবার যখন সাতকে দ্বিগুণ করা হয় তখন প্রথম তিনটি সংখ্যা একই থাকে। এই সমীকরণটি মিশরের পিরামিড মাপার সময় ব্যবহার করা হত। এই হিসাব দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, সাত সংখ্যাটি মিশরীয় সভ্যতায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

দক্ষিণ-মধ্য ও দক্ষিণ নাইজেরিয়া ও গুয়েনাতে বসবাসকারী ইবো (Igbo) উপজাতিদের মধ্যেও সাত সংখ্যাটিকে নিয়ে নানা ধরনের বিশ্বাস আছে। ইবো উপজাতিরা মনে করে যে, মানুষের মৃত্যু সাতটি কারণে হয়ে থাকে। আফ্রিকান আরেকটি উপজাতি বামবারারা মনে করে যে, আমাদের জীবন সাতটি স্তরে বিভক্ত। এছাড়াও সাতটি স্বর্গ, সাতটি পৃথিবী, সাতটি সমুদ্র ও বৃদ্ধির সাতটি স্তর থাকে।

আফ্রিকারই আরেকটি উপজাতি হল টেডা উপজাতি। টেডা উপজাতিরা সাধারণত পূর্ব ও মধ্য সাহারার চাদ, নাইজের ও লিবিয়াতে বসবাস করে। এই টেডা উপজাতিদের ভাষার নামও টেডা। টেডা উপজাতিদের সাত নিয়ে মিথ আছে। টেডা উপজাতির মানুষেরা মনে করে বিয়ের পর নতুন দম্পতিদের সাত দিন বাইরে না বেরোলে মঙ্গল হয়। তাই নতুন দম্পতির বিয়ের পরের সাতদিন বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ। আবার আফ্রিকার বুইগুয়িনি জাতির মানুষেরা প্রতি সাত বছর পর পর তাদের দীক্ষা নেবার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। আকান উপজাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটিকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করে। আকান সাতটি বংশ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি গোষ্ঠী সাতটি গ্রহের প্রতিনিধিত্ব করে। এদের সাত দিনে এক সপ্তাহ হয় এবং প্রতিটি দিন একজন করে দেবতা সামলায়।

তবে সাত যে শুধুমাত্র উন্নতি কিংবা সাতকে শুভ হিসাবেই ধরা হয় না। আফ্রিকার অনেক উপজাতি আছে যারা এই সাতকেই অশুভ মনে করে। ভুগুয়াস উপজাতির মানুষেরা সাতকে অশুভ ভাবে। জুলু উপজাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটিকে আবার দু-ভাবে দেখে। যদি পণ সংক্রান্ত কোনো বিষয় হয় তাহলে সাত সংখ্যাটিকে অশুভ ধরা হয় আর যদি মহিলা বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে সাত সংখ্যাটি আসে তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। কোলোকুমা জো জাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটিকে এড়িয়ে চলে। কারণ, তারা মনে করে সাত সংখ্যাটি দেবতাদের সঙ্গে জড়িত। তাই সাত সংখ্যাটি এড়িয়ে চলাই ভালো। মালিঙ্কে উপজাতির মধ্যেও সাত সংখ্যাটি একেবারে নিষিদ্ধ। এরা গণনার সময় সাত সংখ্যাটি উচ্চারণ পর্যন্ত করে না। এরা সাত উচ্চারণ করার পরিবর্তে ‘ছয়-এক’ উচ্চারণ করে। মালিঙ্কা উপজাতিরা মনে করে যে, সাত সংখ্যাটি উচ্চারণ করলে দুই কথকের মধ্যে বিবাদ হতে পারে। এই কারণেই এরা সাত সংখ্যাটি উচ্চারণ থেকে বিরত থাকে। কিকুয়ি (kikuyu) উপজাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটির পরিবর্তে ‘Mugwanja’ ব্যবহার করে এবং কখনোই সাত সংখ্যা দিয়ে কোনো কিছু ভাগ করে না। এমনকী বাচ্চারা গ্রুপে কোথাও বেড়াতে গেলে এক-একটি দলে সাতজনের পরিবর্তে অন্য কোনো সংখ্যায় দল করা হয়। কারণ হিসেবে এই উপিজাতিদের মধ্যে বিশ্বাস যে, যদি সাতজন বাচ্চা একসাথে যায় তাহলে সাতটি অভিশাপকে আহ্বান করা হয়। এই সাতটি অভিশাপ সাতটি লাঠিকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং অভিশপ্ত মানুষটির দিকে নিক্ষেপ করে। যদি কখনো দৈবজ্ঞ কাজে সাতটি পদ পরিবেশন করা হয় তাহলে সেটা মৃত্যুর সংকেত হিসাবে এই উপজাতির মানুষেরা ধরে নেয়।

কেনিয়ার কাম্বা বা আকাম্বা উপজাতিদের মধ্যে সাত সংখ্যাটিকে নিয়েও ট্যাবু আছে। কাম্বা উপজাতির মানুষেরা মনে করে বিজোড় সংখ্যা হল সঙ্গীহীন সংখ্যা। তাই কখনোই তারা বিজোড় সংখ্যার গ্রুপের সঙ্গে নিজেদের সন্তানদের কোথাও যেতে দেয় না। গোরুর রাখালদের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম আছে। কোনো গোরুর রাখাল টানা ৬ দিনের বেশি গোরুকে দেখভাল করতে পারবে না। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে সাত সংখ্যাটিকে এখানে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কাম্বা চাষীরা আঁখের গায়ে সাতটি শাজারুর কাঁটা জুলিয়ে রাখে যাতে চোরে ফসল না নিতে পারে। তবে কাম্বা জাতিদের মধ্যে সুন্নত-অনুষ্ঠান পর্বটি সাত দিন ধরে হয়। এছাড়া হাতি শিকারীরা চাবুককে সাতবার ভাঙে এতে না কি তাদের হাতি শিকারে সাফল্য এনে দেয়।

পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে, সাত সংখ্যাটি আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কখনো শুভ বা কখনো অশুভ হিসেবে এসেছে। আমরা যদি প্রাচীনতার নিরিখে দেখি তাহলে দেখা যাবে আফ্রিকার এই জনগোষ্ঠীরা যে-ধর্ম পালন করে তা বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে পালিত ধর্মগুলির চেয়েও প্রাচীন। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে আফ্রিকান মিথোলজির সংখ্যাতত্ত্বে কি অন্যান্য ধর্মে অনুসৃত হয়েছে না কি ‘সাত’ সংখ্যার মহত্ব অন্য কোনো স্থানে লুকিয়ে আছে? এ নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন আছে।

তথ্যসূত্র:
Fara Patricia, Science: Four Thousand Year History
Molefi Kete Asante (Ed), Ama Mazama, Encyclopaedia of African Religion
Encyclopaedia of Britannica (Online Edition)

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

কলকাতা শ্রমতালুক

বাংলার কুটিরশিল্পের সমৃদ্ধি ও বৈভবের সাক্ষ্য হিসাবে বারবারা ও টমাস মেটকাফ-এর লেখা ‘এ কন্সাইজ হিস্ট্রি অফ মর্ডান ইন্ডিয়া’ বইটির একটি উচ্চারণ পেশ করব। মেটকাফ-দ্বয় মন্তব্য করেন যে, গাঙ্গেয় উপত্যকার এই অঞ্চলটি থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ৭৫ ভাগ পণ্য সংগৃহীত হত সে-সময়ে। তৎকালীন বাংলার অর্থনৈতিক হাল সম্বন্ধে মেটকাফ-এর অভিমত হল— ‘Bengal’s wealth was thus at once made to appear nearly boundless, and made familiar by evoking Italy’s canal-laced ‘mistress of the seas’. it is not by accident that the figure representing Calcutta in The East Offering its Riches is placed at the centre of painting with the richest gift… From such images came an enduring picture of India for the British’— সুতরাং, অনস্বীকার্য যে, দেশীয় বাণিজ্যের আকার নেহাতই বিশাল মাপের ছিল, যে-কারণে শুধুমাত্র ইংরেজ নয়, পর্তুগিজ-ডাচ-ফরাসি-তুর্কি-দিনেমার-চীনা-আর্মেনি ইত্যাদি-প্রভৃতিরাও হাজির হয়েছিলেন কিপলিঙয়ের chaotic ও মুরহাউসের marshland of Bengal-এ।

শুরুতেই জানিয়েছি যে, জন্মলগ্ন থেকেই কলকাতা একটি রপ্তানি-ভিত্তিক শহর। এ এমন এক শহর, জেন জেকবের ধারণার নিখুঁত প্রতিলিপির মতন যা— ‘create their own dynamic regions, and absorbs into new jobs the rural workers made redundant by improvements into agricultural productivity’. অ্যাডাম স্মিথের থেকে খানিক ভিন্নমত পোষণ করে প্রখ্যাত মার্কিনী শহর বিশেষজ্ঞ জেন তাঁর ‘সিটিজ অ্যান্ড ওয়েলথ অব নেশনস’ বইতে লিখেছেন— ‘increases in wealth of nations arise mainly from the expansion of import-replacing cities: cities in which people repeatedly create their own superior versions of goods… and then begin to export those superior goods (such import-replacing cities) we see the five great forces “unleashed”: markets, jobs, transplanted industry, technology and capital.’— প্রিয় পাঠক, আদি কলকাতা কি এই উদ্ধৃতির পাশে একেবারেই বেমানান? (জেকবের উদ্ধৃতিটি পেয়েছি চার্লস টিলির ‘গিলগামেশ’ প্রবন্ধের সূত্রে)। নগর কলকাতার ‘ডাইনামিক রিজিওন’ বা বিশাল হিন্টারল্যান্ড নিশ্চিতই কোনো কল্পকাহিনি নয়। রপ্তানি বাড়লে ধনবৃদ্ধি হয়— এ তো অর্থনীতির গোড়ার কথা। সুরাট, মসলিপত্তনম, সপ্তগ্রাম-কলকাতা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। শ্রমের বাজারও যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি বর্ধিত মুনাফার কারণে মূলধনের বৃদ্ধি ঘটে, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিবিদ্যার বিস্তার ঘটে। জেন বলছেন ‘রিপিটেডলি ক্রিয়েট’ বা বিরামহীন উৎপাদন— যে-নিরবচ্ছিন্নতার জন্যই ১৭৫২-র হলওয়েলীয় কলকাতায় চার লাখ নয় হাজার মানুষ! সারা বিশ্বের কোন উঠতি-উদ্যমী-উন্নতিকামী এবং (মোর ইম্পর্টানটলি,) সদ্যজন্মলব্ধ কোন জনপদে, ১৭৫০-এর উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে, এমন প্রাণসম্পদে ভরপুর জীবনজিজ্ঞাসা ছিল বা এ যুগেও আছে বা রয়েছে? খোদ লন্ডনেই ছিল কি? মিল ছিল না, মেশিনও না। এম.জে. টৌমের ‘এমপ্লয়মেন্ট ইন নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল’ বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কেম্ব্রিজ অধ্যাপক তীর্থঙ্কর রায় লিখেছেন—‘আঠারো শতকের শেষে ভারত ৫০ মিলিয়ন গজ বস্ত্র রপ্তানি করত। ভারত জুড়ে ১৮০০ থেকে ২০০০ মিলিয়ন গজ কাপড় তৈরি হত।’ সে-সময়ের বস্ত্র রপ্তানিকারক প্রধান অঞ্চলগুলো ছিল পাঞ্জাব-করোমণ্ডল-গুজরাট-বাংলা। এই প্রয়াসের জন্য জরুরি ছিল সচল মানি-মার্কেট। সেই প্রয়জন মেটাতে বাংলায় সক্রিয় ছিল হুন্ডি-চিরকুট কিংবা সেদিনের অর্থজগতে প্রবেশের ভিসা, ক্রেডিট-কার্ড বিলিকারী মাণিকচাঁদ, উমিচাঁদ নামধারী জগতশেঠ কোম্পানি।

১৫৩০-এ হুগলি-সপ্তগ্রামে পর্তুগিজদের পৌঁছে যাওয়া ছিল এক শ্রমসৃজনকারী অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। রাতারাতি তারা সেখানে আসার সিদ্ধান্ত নেয়নি। টলেমির ‘গঙ্গারিডি’, অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ-সমতট-হরিকেলার যাপনচিত্রটি, বস্তুত, বহু শতাব্দী পুরোনো। বসত ছিল, বাণিজ্য ছিল। রোম-পারস্য-মালাক্কা-পূর্ব এশীয় অঞ্চল। সেই বাণিজ্য পরম্পরার সূত্র ধরেই পর্তুগিজরা এ-দেশে আসে। কৃষিশস্য-বস্ত্রপণ্যের জগতে বাংলার বহুকালের পরিচিতি। ১৬৩০-এ জলদস্যুতা, রাহাজানি, লুটমার প্রভৃতি অনর্থনৈতিক কাজকর্মের স্বাভাবিক বিক্রিয়ায় তারা বিতাড়িত হয়। তাদের শূন্যস্থান দখল করে নেয় স্থানীয় মুঘল শাসকবৃন্দ আর অন্যান্য ইওরোপীয় বণিকদল, যাদের মধ্যে ব্রিটিশরাও ছিল। বাংলার সুবাদার সুজা, মীরজুমলা, শায়েস্তা খাঁ, ঢাকা আর কটকের নবাব, ওড়িশার দেওয়ানের পাশাপাশি হুগলির হাবিলদারও জড়িত ছিলেন।

এই প্রবন্ধে বারংবার উচ্চারিত সন-তারিখের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়টি হল ১৭৬০, ১৭৫০, ১৮৪০। তারিখগুলোর ভিতরেই কিছু কাহিনি লুকিয়ে রয়েছে। ১৭৬০: ইংলন্ডে শিল্পবিপ্লবের শুরু। বাংলায় একশো দশ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছে ব্রিটিশবাহিনী। কাকতালীয় মনে হবে কি যদি উল্লেখ রাখি যে, কাপড়ের কল দিয়েই ইংলন্ডে শিল্পবিপ্লবের শুভ মহরৎ হয়েছিল। আর সেই একই কালখণ্ডে ভারতে অবশিল্পায়নের ঘূর্ণিব্যাতাও হাজির হতে শুরু করে। ১৮৩৫: লর্ড বেন্টিঙ্ক ভারত-প্রশাসক। ইংলন্ডের সুতো-ব্যবসায়ীদের স্বার্থে তিনি কটন- আইন প্রণয়ন করেন। বিপদের মুখে পড়ে ভারতের সুতো-ব্যবসায়ী, চাষিরা। আর ১৭৫০: ভারত একাই পৃথিবীর ২৫ ভাগ পণ্য উৎপাদনকারী। কাপড় উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রটি ছিল বাংলায়।

আর ঠিক এর উলটো অবস্থাটাই হল ডি-ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালাইজেশন বা অবশিল্পায়ন। সেই সূত্রে রপ্তানিহীনতা, বাজার হারানো, কাজ খোয়ানো অগুনতি মানুষের চাপ। (পরিকল্পিত) দৈন্য-দুর্দশায় ধ্বস্ত হয় নফরসমাজ। পরিকল্পনাহীন যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা মধ্যয়ুগীয় ঘরবাড়ি, আটচালা, ঘরেলু কারখানার ঢের। চওড়া জলীয় হাইওয়ের ধারে বিশাল বাজার, কুটির লাগোয়া গোয়াল-ধানক্ষেত। ভোরের চাষি, সাঁঝবেলার তাঁতি। ব্রিটিশবণিকের দ্বিতীয় আবেদন— সেইসূত্রে
কলকাতার লাগোয়া ৩৮-টি গ্রামও দখলে নেওয়ার দাবিপত্র পেশ। কেন ওই সকল ৩৮-টি গ্রাম? কেন-না, ওখানেই ছিল কুটিরশিল্পের আদত ঠিকানা। সি আর সাহেব তো আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছেন যে— সন ১৭০৪-এ কলকাতার লোকবল যেখানে ১৫০০০, শহরতলিতে তখনই দ্বিগুণ, ৩০০০০। তাহলে কি এই আবেদনও পরিকল্পিত যোজনা ছিল? ছলা-কলা-কৌশলহীন সাদামাটা খামখেয়াল অথবা নেহাতই ঘর গোছানোর ব্যাপারস্যাপার ছিল কি? প্রচুর শস্য জন্মাত। সত্য। কিন্তু স্রেফ উদরপূর্তি-তে মন দিলে ‘কলকাতা’-র সৃষ্টি হত? কবি কৃষ্ণরামদাস লিখেছিলেন, চার্ণক আসার একযুগ আগে— ‘অতি পুণ্যময় ধাম/সরকার সপ্তগ্রাম/ কলিকাতা পরগনা তায়/ধরণী নাহিক তুল/জাহ্নবীর পূর্বকূল/নিমিতা নামেতে গ্রাম যায়।’ পরগনা কলকাতার প্রশংসায় কবি পঞ্চমুখ। সেক্ষেত্রে, কবি কৃষ্ণরামদাস কথাটি কেন গুরুত্ব পাবে না যেভাবে বিবেচিত হয় মিল-বেন্থাম-মেকলে-ম্যালথাস?

সমুদ্রবণিকেরা আসার জন্য বস্ত্রশিল্পে আগের চেয়ে আরও বেশি মাত্রায় পুঁজিনিবেশ ঘটল, বিদেশি পুঁজির সঙ্গে যুক্ত হল গ্রামীণ পুঁজি আর মেশিনলুমের অবর্তমানে বর্ধিত চাহিদার যোগান সামাল দিতে আরও বেশি মাত্রায় হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানবসম্পদ নিয়োজিত হল। লোকলস্কর বাড়ল। নগর-বন্দর গড়ে ওঠাও শুরু হল। বর্ধিত বাণিজ্যের সূত্রে নদীর দু-পাড় যেমন ত্রিবিণী, রিসড়া, মগরা, চুঁচুড়া বা নদীর পুবপারে খড়দহ, ব্যারাকপুর ইত্যাদি এলাকা জনবহুল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, জনবল।

মানবসম্পদ। সুতরাং, অস্তিত্বের পূর্ণাবয়ব অনুসন্ধানে রাজি হয়ে যাই। দেহ-খাঁচাটির দ্বি-বাহুবিস্তারী হিমালয়-সদৃশ কলারবোন থেকে বিঘৎ-দেড়েক ওপরে— দর্শক, শ্রোতা, কোচ, দোভাষী, ভাষ্যকার, ইন্টারপ্রেটার, জজ, নার্স, ডাক্তার ইত্যাদি। এছাড়াও, বিনিময়-প্রথার অন্তিম প্রহরে ষোড়শ শতকীয় হাওয়ামোরগ— শ্রেষ্ঠী, ফড়ে, দালাল, মিডলম্যান, মজুতদার, পাইকার; কলারবোন থেকে বিঘৎখানেক নীচে, খাঁচাবন্দি হিসাবরক্ষক, চিত্রকর, নাটুয়া, সাক্ষী, গোলাম-লেখক আর কলারবোন জাতীয় হ্যাঙ্গারটির দু-পাশের ঢাল বেয়ে নেমে ঘড়ির আদিতম সংস্করণ— কর্মক্ষম দু-টি হাত, ঋজু অথবা স্থুল, যোড়হস্ত কখনো অথবা পূর্ণবিস্তৃত কায়িক পরিশ্রমীজন— নফরসমাজ: মুটে-মজদুর, লোহার-সোনার-ছুতোর-কর্মকার-ব্যাপারি-কৃষক-বাস্তুকার; এক কথায় বিশাল মাল্টিপ্লেক্স, জনবহুল। অবশিল্পায়নের মারপ্যাঁচে এরাই পোশাক বদলিয়ে রঙ্গমঞ্চে হাজির পুনর্বার। নতুন নির্দেশনায় তারা কেউ খানসামা, কেউ বাটলার, হরকরা, মশালচি, সহিস, দর্জি, ভিস্তি, মুচি-মেথর-হুঁকোবরদার। থরে থরে মজুত বিনিময়যোগ্য সময় ও শ্রম, ভিন্ন-বিভিন্ন দর ও মোড়কে— পণ্য অঢেল… খরজনস্রোতে, স্পন্দমান আসমুদ্র হিমাচল। পুনর্জন্মে এঁদেরই মধ্যে কেউ নিওন জ্যোৎস্নাসম চন্দ্রাতপের নীচে ‘আউটসোর্সিং’ রাতজাগা হুতোম, ভারতীয় অর্থনীতির সেবাধর্মী চুয়ান্ন পার্সেন্ট— নজরে রেখেছে ভিন গোলার্ধের সূর্যকিরণ।

মুম্বইয়ের সাইনবোর্ডে ‘সিটি নেভার স্লিপস’ ব্যবহৃত হতে দেখেছিলাম। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ‘যা নিশা সর্বভূতানাং, তস্মাৎ’ জেগে কাটান আই-টি-কর্মী। সুমন্ত ব্যানার্জী উক্ত নবযুগের ‘সাইবার-কুলি’, তথ্যপ্রয়ুক্তির ‘আই-টি’ বাহিনী।

২০২০ থেকে ফিরি বরং আদি সপ্তগ্রামে, ১৫৪০, ঔপনিবেশিকতার প্রথম প্রহরে। পুরোনো প্রশ্নে। শহর পদবাচ্য কি ষোড়শী কলকাতা? বাংলা কাব্যসাহিত্যের পাতায়, বিশেষত মঙ্গলকবিদের উচ্চারণে, নগরায়নের উল্লেখ পাওয়া যায়। মুকুন্দ লিখেছেন মুসলমানদের বসতি স্থাপনের কথা। কারিগরের গোষ্ঠীজীবন, দেবদেউল-মসজিদ ইত্যাদির নিপুণ বর্ণনা রয়েছে। মধ্যযুগীয় শহরের ব্যাখ্যা দিয়ে আবুল ফজল বলেছিলেন— a city may be defined as a place where artisans (pisha-var) of various kinds dwell। ঐতিহাসিক রত্নাবলী চট্টোপাধ্যায় মধ্যযুগের শহর সম্বন্ধে বাংলা কাব্যবিবরণীতে উচ্চারিত লক্ষণগুলোর উল্লেখ করার পাশাপাশি শহরের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বি.ডি. চট্টোপাধ্যায় চিহ্নিত পাঁচটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই শর্তগুলোর মধ্যে তিনটি প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক কলকাতায় ছিল যেমন মন্দির-রাস্তা –লোকজনের মেলামেশার জায়গা। সুরম্য হর্ম্য, অট্টালিকা-ই কি শহরের একমাত্র লক্ষণ? শ্রীমতী চট্টোপাধ্যায় মধ্যযুগের বাংলার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন যে, প্রাসাদ-অট্টালিকার বদলে বহুবিধ পণ্যের বাজার-বিশিষ্ট সুদক্ষ কারিগর শ্রেণির বসবাসের এলাকাকেই আদর্শ শহর বলা হত।

সংস্কৃত সাহিত্যে শহর হল রাজার বাসস্থান, ধনী ও অভিজাতদের আমোদ-প্রমোদ, বিলাসব্যসন, রঙ্গ-মেহফিল, খান-পানের জায়গা। আর বাংলা সাহিত্যে শহরের রূপ ভিন্ন। বাংলা সাহিত্যে শহর হল শিল্প-উৎপাদন, পণ্যসম্ভারের বাজার, ধর্মস্থান ও শাসককূলের আবাস নিয়ে গড়ে ওঠা এক নাগরিক-স্থল। এই পার্থক্যটি বিশেষ লক্ষণযুক্ত।

বাংলা সাহিত্যের শহরে সবার প্রবেশাধিকার। শিল্পকার সাধারণ মানুষও যেমন স্বীকৃত, তেমনই ধনিকশ্রেণির প্রতিনিধিবর্গ। কাজের সুযোগ এনে দিয়েছিল বহির্বাণিজ্য, দেশের আভ্যন্তরীণ চাহিদা। ষোড়শ-সপ্তদশে বাণিজ্যের আড্ডা–স্থলটির ক্রমাগত বদল ঘটছিল। নিম্ন-ভাগীরথী অববাহিকায় কেন্দ্রিত হচ্ছিল সেই হুড়হুজ্জত। তেমনতর পরিস্থিতিতে পলিমাটি সিঞ্চিত ভাগীরথীকূলে বিরল জনবসতির ছবিটি সে-সময়ের আর্থ-সামাজিক-ভৌগোলিক পটভূমিকার সাথে একেবারেই মানানসই নয়। সরল সত্যটি বরং কর্ম-সংস্থানের সুযোগে মানুষের ভিড় বাড়ছিল। প্রখ্যাত চিন্তক, অর্থনীতিবিদ আন্দ্রে গুন্দা ফ্রাঙ্ক-য়ের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য— ‘world development between 1400 and 1800 reflects not Asia’s weakness but its– particularly China’s and India’s economic strength, and not Europe’s non-existent strength but rather it’s relative weakness in global economy.’ Andre Gunder Frank (Economic & Political Weekly, July 1996, Vol-31, pp. 30)। ‘সন ১৪০০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত বিশ্ব উন্নয়নের গ্রাফচিত্র থেকে এশীয় দুর্বলতার কোনো চিহ্নই ফুটে ওঠে না— চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক সবলতাই বরং প্রতিভাত হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে ইওরোপীয় সামর্থ্যের অনস্তিত্ব নয়, আপেক্ষিক দুর্বলতাই তুলে ধরে।’

‘সিটি অফ প্যালেসেস’ শীর্ষকে (১৮২৪) কবি জেমস অ্যাটকিনসন একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতায় গ্রিক-পুরাণের হেস্পেরিডিসের বাগানের দেউড়িতে কলকাতার স্থান। এই বাগানের সোনালি আপেলের আশীর্বাদ=অমরত্ব লাভ। এই একটি উপমার যদি অর্থনৈতিক ভাবানুবাদ করা যায়, তবে দেওয়ানির সনদ পাওয়াই হল সেই সোনার আপেল হাতে পাওয়া যার দৌলতে কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার পেল। এতদিন ইংল্যান্ড থেকে টাকার যোগান আসত (সোনারুপায়) খরিদ্দারির খরচ মিটানোর জন্য। কিন্তু এই অধিকার পাওয়ামাত্র পাশা পালটে গেল। এখন থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে যে-সমস্ত পণ্য কেনাকাটা করত তার দাম সংগৃহীত রাজস্ব থেকে দেওয়া শুরু হল। উপরন্তু, এই মাল বিক্রয় করে যে-অর্থ পাওয়া যেত তা ভারতে বিনিয়োগ না হয়ে বরং ইংল্যান্ডের রাজকোষে জমা পড়ত। এভাবেই শুরু হয়েছিল সম্পদের নিষ্ক্রমণ, যার স্বাভাবিক পরিণতি হল অবশিল্পায়ন।

ভারী পরিতাপের বিষয় যে, তথ্যসমৃদ্ধির এই সুদিনেও কর্মচঞ্চল জনপদ নয়, বিস্তৃত পরগণাটি নয়, উইলসনের আদিম অ্যানালসে যেমন, ঠিক তেমনই স্যাম মিলার-এর ‘এ স্ট্রেঞ্জ কাইন্ড অফ প্যারাডাইস’-এ (২০১৪) বা এরিকা বারবিয়ানির (২০০২)-এর পর্যালোচনায়, বারংবার, তথাকথিত ‘অখ্যাত গ্রাম’-টিই কেবল পুনরালোচিত হয়। যদি, জনমানবশূন্য চোরাবালি-অরণ্যই ছিল সে-সময়ের কলকাতা, তবে প্রভূতপরিমাণ অর্থব্যয় করে নিছকই এক গণ্ডগ্রামে দুর্গ বসানো, শতেক আবেদন-নিবেদনের দৌলতে ঘাঁটি গাড়া— চতুর ব্যবসায় বুদ্ধিসম্পন্ন যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির দাপুটে শেয়ার হোল্ডারগণের অর্থনৈতিক বিচারবিমর্ষ বহির্ভূত সিদ্ধান্ত ছিল কি? মূল সত্য তো কৃষিপণ্যের বিশাল লাভ ক্রমে পুঁজিতে বদল হয়ে বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদনে/বস্ত্রবয়নে ব্যয়িত হত। এর ফলে কুটিরশিল্প প্রসার লাভ করেছিল। নেহাতই স্বল্পবিত্তের অধিকারী চাষিও বাণিজ্যের এ মহোৎসবে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখতে পারত। তাই মেশিনলুমের সাহায্য ছাড়াই, কেবল লোকলস্করের যোগান বাড়িয়ে বহির্বাণিজ্যের অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কৃষিসমৃদ্ধির এমনতর সাফল্যের যুগে ভাগীরথীপলিসিঞ্চিত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও জনহীন কলকাতা, গণ্ডগ্রাম কলকাতা, অর্থনৈতিক তৎপরতাহীন কয়ঘর-গুমটিবিশিষ্ট কলকাতা ইত্যাকার সুপ্রাচীন মন্তব্যগুলির আশু পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন, কেন-না, নদিয়ার আমিরাবাদ পরগনার অন্তর্গত ডিহি-মহাল-স্থানীয় শাসনকর্তাধীন নগর কলকাতা, ১৬৯০-এর শতবর্ষ পূর্বেই, খোদ নিজেই একটি পরগনা ছিল।

প্রথম পাতা

Categories
ই-ম্যাগাজিন উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

কলকাতা শ্রমতালুক

সে-সময়ের কিছু লেখা থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরে চার্ণকবাহিনীর ঘাঁটি গাড়ার মুহূর্তে প্রাচীন কলকাতার সম্ভাব্য জনসংখ্যার হিসাব দিয়েছেন কলকাতার প্রথম সেন্সাস ওফিসার শ্রী অতুল কৃষ্ণ রায়। ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা’-র (১৯০১)-এর ১৩০ সংখ্যক পৃষ্ঠায় হলওয়েল সাহেবের ১৯৫২ সালের সংগৃহীত রাজস্বের আনুপাতিক হিসাব করে শ্রী রায় সিদ্ধান্ত নেন যে, কলকাতার আনুমাণিক জনসংখ্যা ছিল— ১৬৯৬ সাল=(৮০৭৩), ১৭০৪ সাল=(৫১৬০০), ১৭০৮ সাল=(১০৮৭০০)। (স্মর্তব্য যে, ব্রিটিশ বয়ান অনুসারে (প্রারম্ভিক) কলকাতা তিনটি গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল)

প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রি বা গ্রামীণ পুঁজি বা ধনবাদী সমাজব্যবস্থার পূর্বসূরি হিসাবে পের্লিন-মেণ্ডেল-মারফানি-ভ্যান বস চিহ্নিত merchant capitalism পর্যায়ের জনবৃদ্ধি, খেটে খাওয়া গরীরগুর্বোর পাশাপাশি অর্থলগ্নিকারী ধনিকশ্রেণির স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের বাস্তবতা-তত্ত্ব-তথ্যকে অস্বীকার করা সম্ভব কি? উইলসন সাহেব বলছেন— ১৭০৪ সালে শহরের জনসংখ্যা ছিল ১৫০০০ আর জমিদার-শাসিত শহরসংলগ্ন এলাকায় ছিল ৩০০০০। (অর্থাৎ, শহরতলি সে-সময়েই জমজমাট। দ্বিগুণ জনসংখ্যা। উইলসন-তত্ত্বে ১৭০৬ সালে জনসংখ্যার হিসেব ছিল যথাক্রমে, ২২০০০ ও ৪১০০০। ১৭০৮-এ হয় ৩১০০০ ও ৩৬২০০ আর ১৭১০-এ ৪১০০০ ও ৮২০০০। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে হ্যামিল্টন অবশ্য বলেছেন যে, ১৭১০-এর কলকাতায় ১২০০০ লোকের বসবাস ছিল। কলকাতার ভারপ্রাপ্ত রাজস্ব সংগ্রাহক হলওয়েল সাহেবের মতে ১৭৫২ সাল নাগাদ কলকাতার জনসখ্যা ছিল চার লক্ষ নয় হাজার (৪০৯০০০)। ঐতিহাসিক সি.এ. বেইলি মনে করেন ১৭২০ সালের কলকাতায় ১২০০০০ (এক লক্ষ কুড়ি হাজার) মানুষ বসবাস করতেন। ‘ten cities that made an empire’ বইতে Tristram Hunt জানান যে— ‘আঠারো শতকের মাঝামাঝি লালদিঘি এলাকায় এক লাখেরও বেশি বাসিন্দার বাসভূমির গর্ব করতে পারত কলকাতা, যার ফলে কেবলমাত্র লন্ডন ছাড়া আর যে-কোনো ব্রিটিশ শহরের থেকে দীর্ঘকায় ছিল। (সুতরাং, জনপ্রাবল্যের দিক থেকেও আমরা (১৭৫০-এ) লন্ডনের সঙ্গে প্রায় একাসনে বসার গরিমা অর্জন করেছিলাম।) অথচ, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নজরে ১৬৯০-এর কলকাতা একটি গণ্ডগ্রাম হয়েই রয়ে গেছে! বিস্ময়জনক। উপরন্তু, রায়সাহেবের ৮০৭৩ হোক অথবা হ্যমিল্টনীয় বারো হাজার কিংবা হলওয়েলীয় চারলাখ— কোনো সংখ্যার পিছনেই ব্রিটিশ শাসনতান্ত্রিক গরিমা-মহিমা-ভঙ্গিমার কণামাত্রও অবকাশ নেই। সিরাজের কলকাতা অভিযানের মূল কারণ ছিল ব্রিটিশ বণিকের যথেচ্ছাচার, দুর্গনির্মাণ। অর্থাৎ, তখনও তারা প্রজা, শাসকপ্রভু নয়। কোম্পানির খাজনা জমা করতে হত তাদের। অর্থ হয়,— ঘরভরা ফসল, কুশলী কর্মক্ষম দু-টি হাতের সুদক্ষ শিল্পসৃজন ও অমেয় পণ্য ভাণ্ডারটিকে ‘বাজারজাত’ করার তীব্র অর্থনৈতিক চাহিদা, বণিকী তাড়না থেকেই কলকাতার জন্ম। অস্যার্থ, ষোড়শ-সপ্তদশ-আঠারো শতকীয় কলকাতা ‘স্বয়ম্ভু’ ছিল।

হান্ট ‘conurbation’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কেম্ব্রিজ অভিধানে শব্দটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে— ‘a city area containing large number of people, formed by various towns growing around and joining together’: উদাহরণ হিসাবে টোকিও, ওসাকা প্রভৃতি উচ্চারিত হয়েছে। সেই সূত্রানুসারে, প্রাথমিক গ্রাম তিনখানি নয় কেবল, পার্শ্ববর্তী শুঁড়া, কলিঙ্গা, মলঙ্গা, চিৎপুর, দখিনদাঁড়ি, উলটোডীঙ্গি, ব্রিজি, মাগুরা, চৌবাঘা, তিলজলা, ট্যাংরা, শালকে-ব্যাঁটরা, ইত্যাদি আরও ৩৮টি শ্রমঠিকানার জীবনস্পন্দনও তো কলকাতার উত্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এবং ১৭১৭-তেই।

মুরহাউস অবশ্য একটি প্রণিধানযোগ্য স্বীকারোক্তিমূলক মন্তব্য করেছেন যে, কলকাতার লাগোয়া যে-হিন্টারল্যান্ড/পশ্চাৎভূমি রয়েছে, সেটাই এর সম্পদকে সর্বদা আরও বর্ধিত আকার পেতে সহায়তা করেছে। (‘that in the first place provided the excuse for Calcutta being here at all’). অর্থাৎ, এখানে কলকাতা সৃষ্টি হবার প্রধান কারণ তো এইসব অঞ্চলগুলোই। সুতরাং, গ্রাম কলকাতা নয়, কলকাতাকে ঘিরে থাকা বিস্তীর্ণ উপকণ্ঠই হল কলকাতার উত্থানের পিছনে মুখ্য চালিকাশক্তি। কিন্তু এই সাযুজ্য-সহধর্মিতা-সমমর্মিতা কি ১৬৯০-এর পরে শেখা? এ-যুগের গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে ‘মাঝ অষ্টাদশে, এক লক্ষ বাসিন্দা, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ভারতীয়, সেই জনপ্রাবল্যহেতু শহর কলকাতার রূপরেখাটি ফুটে উঠতে শুরু করে।’ অতএব, গার্ডিয়ান অনুযায়ী, ইংরাজ অধিকৃত অঞ্চলটিই কেবল শহর পদবাচ্য আর স্থানীয় জনতা অধ্যুষিত এলাকায় যাঁরা বাস করতেন, যাঁরা উইলসন সাহেবের ভাযায় শুরুতেই ‘দ্বিগুণ’ কিংবা মুরহাউসের ‘হিন্টারল্যান্ড’ তাঁরা ধর্তব্য নন, ব্রাত্য?।

লক্ষণীয় হল ঐতিহাসিক হান্ট ‘এরাউন্ড লালদিঘি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। ১৭৫০ নাগাদ লালদিঘির আশেপাশেই যদি লক্ষজন বাসিন্দা থাকেন তো সেই সময়ের উপকণ্ঠ যার মধ্যে শিয়ালদহ, বাগমারি, মির্জাপুর, এন্টালি, ধলন্দা ইত্যাদি আরও ৩৮টি গ্রামের বাসিন্দার সংখ্যা আদতে কত ছিল? এ.কে. রায় মহাশয়ের দাখিলা অনুযায়ী ১৭০৬-এর সদ্যভূমিষ্ঠ ‘ব্রিটিশ’ কলকাতায় ৮০০৮টি বাড়ি। উইলসন সাহেবের হিসাবমতো ১৭০৬ সালে ২২০০০ বাসিন্দা। অর্থাৎ, বাড়িপিছু মোটামুটি আড়াইজন বাসিন্দা। ম্যালথাস সাহেবের জনসংখ্যা তত্ত্ব (১৭৯৮) ভূমিষ্ঠ হবার বিরানব্বই বছর আগেই শহর কলকাতায় পরিবার পরিকল্পনার ল্যাবরেটরি স্থাপন করাই কি তবে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রথম অবদান? কিংবা, হ্যামিল্টন সাহেবের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী বিচার করলে ৮০০০ বাড়িতে ১২০০০ লোক। অর্থ হয়, বাড়িপিছু গড়ে দেড়জন। গড়ে মাত্র দেড়জন লোক থাকার জন্যে কেন কয়েক হাজার বাড়ি গড়ে উঠবে? ১৬৯৮-এ ব্রিটিশরা জমিদারিত্ব পায়। রায়সাহেব নিজেই দাখিলা দিয়েছেন (এ শর্ট হিস্ট্রি… পৃ-২০৩) যে, প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রিটিশরা তাদের পত্তনিটিকে সুতানুটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, আর ১৬৯৬ সালে বাসস্থান বদল করে পাশের কলকাতা গ্রামটিতে ডেরা বানায়। নিজেরাই যখন থিতু হয়ে বসেনি, তখন অন্যকে বসে পড়ার হুকুমত জারি করেই-বা কী করে? ১৬৯৮-এ কলকাতা ইত্যাদির জাগিরদারি পাওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে কি ৮০০৮টি বাড়ি গড়ে উঠেছিল?

আট বছরে আট হাজার বাসস্থান! বছরপিছু গড়ে এক হাজার, দিনপিছু সাড়ে তিনটি। এতগুলো বাড়ি গড়ে উঠল, সেও এক সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তো বটেই, অথচ এ-ধরনের সামুহিক ক্রিয়াকলাপের বিবরণ সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক তথ্য সহজলভ্য নয় কেন?

১৭০৬-এ তিনটি গ্রামের জমি-জরিপ করায় ব্রিটিশ বাহিনী; সেই জরিপ অনুযায়ী চাঞ্চল্যকর তথ্য হল—
বাজার কলকাতায়— মোট ৪০১ বিঘা এলাকা
ডিহি কলকাতায়— মোট ২৪৮ বিঘা এলাকা
সুতানুটির ১৩৫ বিঘা এলাকা
গোবিন্দপুর ৫৭ বিঘা এলাকা
মোট ৮৪১ বিঘা এলাকা

• অর্থ হয়, নির্মিত বস্ত এলাকার শতকরা (প্রায়) ৪৮ ভাগ অঞ্চল ছিল বাজার-এরিয়ায়।

সুতরাং, বাজার ছিল জীবন-জীবিকা-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান অঙ্গ। বাজার অর্থাৎ, ট্রেডিং বা নিখাদ পণ্য কেনা-বেচা। বাজারে বিক্রি করার জন্য ঘাড়ে করে মাল বয়ে নিয়ে আসতেন খেটে খাওয়া মানুষজন। তাঁরা অবশ্যই সংখ্যায় ‘কয়েকঘর’ অল্প কয়েকজন ছিলেন না। উপরন্তু, বাজার এলাকায় বসতি গড়ে উঠতে পারে না। তাই জনবসতি ছিল সামান্য দূরের ৩৮-টি আধাশহুরে কুটিরগুলোয়, যেখানে তাঁতবস্ত্র বা হস্তশিল্পের বয়ন-বুনট-নির্মাণ হত। সবিশেষ উল্লেখনীয় হল যে, পের্লিন-মেণ্ডেল প্রভৃতি প্রোটো ইন্ডাস্ট্রির প্রবক্তারা সমবেত ঐকতানেই জানিয়েছেন যে, উপনিবেশপূর্ব গ্রামীণ (প্রোটো ইন্ডাস্ট্রিয়াল) অবস্থায়— সে-প্রাশিয়া হোক কিংবা বোহেমিয়া বা ইন্ডিয়া— পরিবারের সবাই মিলে এই ‘পারিবারিক’ কাজে অংশগ্রহণ করত। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থসারথি প্রসন্ননও জানিয়েছেন যে, দাক্ষিণাত্যে তাঁতি পরিবারের সবাই, ছেলে-মেয়ে-বাড়ির মহিলারা নির্বিশেষে রং লাগানো, সুতো ধোওয়া, সাফ-সাফাই বা সুতোর গুলি পাকানোয় যোগ দেয়।

২) দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এলাকার প্রাচীনত্ব।

রায়সাহেব লিখেছেন যে, খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে কালীক্ষেত্র ১২৮০ একর এলাকা জুড়ে পরিব্যাপ্ত ছিল এবং সতেরো শতকে তা হয়ে দাঁড়ায় ১৬৯২ একর। অর্থ হয়, ব্রিটিশবণিক হাজির হওয়ার মোটামুটি পাঁচশো বছর আগে থেকেই অর্থনৈতিক কাজকর্মের যোগান সামাল দিতে কলকাতার কলেবর ৪১২ একর এলাকায় বৃদ্ধি পেয়েছিল। একইসাথে, লক্ষ করার বিষয় হল যে, হুগলিতে ঘাঁটি গাড়ার পর থেকে ইওরোপীয় বনিকেরা ক্রমশ দখিনমুখী হয়ে পড়েছিল। ফরাসি—চন্দননগর, ডাচ— চুঁচুড়া, দিনেমার— শ্রীরামপুর এবং সবশেষে আসরে নামা ব্রিটিশবাহিনী= সুতানুটি। ভৌগোলিক দিক থেকে শতপ্রতিশত নিয়মতান্ত্রিকতা, স্ট্রেট লাইন মেথডিক সেটেলমেন্ট। সামান্য এক রুরাল বাজার, পের্লিনের ভাষায়, ‘rurban–type’ ‘বিকিকিনির হাট, ক্রমে অসামান্য এক গ্লোবাল বাজার হয়ে ওঠে। মোদ্দাকথায়, এ-জাতীয় ‘degree of specialisation’–এ পৌঁছতে মাসকয়েক বা বছরকয়েক নয়, শতাব্দীর শ্রম-মেধা-মনন প্রয়োজন হয়। স্মর্তব্য যে, মুঘল আমলে কলকাতা একটি মহাল বা পরগনা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল। সুতরাং, ব্রিটিশ আসার সঙ্গে কলকাতার বাড়িঘর গড়ে ওঠা শুরু হওয়ার আখ্যানটিও অনৈতিহাসিক। পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

ষোলো-সতেরো শতকের ভারতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ও অতি দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের মূল বিশেষত্ব হল স্থানীয় স্তরে merchant capitalism-এর উত্থান, যা উপমহাদেশীয় বিস্তার লাভ করে এবং অর্থব্যবস্থা-রাষ্ট্রবাদিতায় গভীর ছাপ রেখেছিল। এরই প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও পর্যাপ্ত কাঁচামালের কারণে বাণিজ্যিক হুড়হুজ্জত, চহলপহলের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয় বাংলা। সে-সময়ের ভারতীয় অর্থনৈতিকতার বিষয়ে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ইয়ান সেন্ট জন লিখেছেন— ‘what was the character of this India the British encountered in the 17th and early 18th centuries ? It had, to begin with, a vigorous commercial culture. Market systems were well developed and facilitated active trading links both within India itself and beyond to Persia, Africa, China and the spice Islands (latter day Indonesia)…. Calcutta was the company’s most thriving base. Silk, cotton textiles ,sugar and saltpetre were all purchased by the company from across Bengal and shipped towards London and East Asia. Exports to London alone amounted to £400000 per annum in the 1740’s.’ (p-15) vide ‘the making of the British Raj’ by Ian Saint John… সতেরো বা আঠারো শতকের শুরুর দিকে ভারতে পা দিয়ে ব্রিটিশরা কী দেখেছিলেন? শুরুতেই বলা যায় যে, সেখানে এক জোরদার বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ চালু ছিল। বাজার অর্থনীতি যথেষ্ট উন্নত ছিল যার ফলে ভারতের অন্তর্দেশীয় এলাকায় যেমন সক্রিয় লেনদেন চলত, ঠিক তেমনই বর্হিবাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পারস্যদেশ, চীন, আফ্রিকা আর ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এবং কলিকাতা ছিল সেই কর্মকাণ্ডের কোম্পানির সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী ভিত্তিভূমি। সেন্ট জন একইসাথে দিনক্ষণেরও উল্লেখ রেখে আঠারো শতকের শুরুর দিকের কথা বলেছে। কিন্তু ইতিহাস জানাচ্ছে ১৬৮৮-র গ্লোরিয়াস রেভ্যুলিউশনের পর ভারতে ব্রিটিশ বাণিজ্যের নামমাত্র অস্তিত্ব ছিল। এবং ১৭০৮ সালের পর তা পুনরায় শুরু হয়। সুতরাং, আঠারো শতকের শুরুতেই তো ব্রিটিশবণিকেরা বাণিজ্যকাজে মন দেয়। সেক্ষেত্রে, তৈরি বাণিজ্যকাঠামো-প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য ক্ষেত্র ছাড়াই কি একটি মার্কেন্টাইল কোম্পানির মনপসন্দ জুয়েল=সমৃদ্ধিশালী ভিত্তিভূমি হয়ে উঠতে পারে কি কোনো জায়গা?

সেন্ট জনের ‘জোরদার বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ’ মন্তব্যটিতে বিশেষ নজর দেব। তাঁর মন্তব্যের পাশেই ঠুসে দিতে চাই মুঘল সম্রাট ঔরংজেবের প্রশংসাবাণী। তাঁর কাছে বাংলা ছিল ‘প্রদেশের স্বর্গ’। ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছাড়াও নিকট চীনসমুদ্র থেকে পারস্য-ভূমধ্যসাগর হয়ে প্রায় সমগ্র পশ্চিম ইওরোপে বাংলার বাণিজ্যসম্ভারের রীতিমতো ঈর্ষাজনক চাহিদা ছিল। অতএব, চার্ণকের দ্বি-প্রাহরিক খেয়ালের বশে হঠাৎই এঁদো জলাভূমিতে কিপলিঙেস্কু একটি শহর-নগর হিসাবে ছত্রাকের মতন কলকাতা গজিয়ে ওঠেনি! ব্রিটিশ লেখকেরাই তো মনে করেন কলকাতার জন্ম হয়েছিল কেবল বাণিজ্যের লক্ষ্যে, ব্যবসায়িক স্বার্থে! স্মর্তব্য— Geoffrey Moorehouse— ‘Nothing but commercial greed could possibly have led to such an idiotic decision; that is, to build a city in the marshland of Bengal.’

শেষ পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

কলকাতা শ্রমতালুক

শিল্পবিপ্লব সেই ধারার পরিবর্তন করে দেওয়ার ফলে পণ্যবস্তুর বদলে ভারত থেকে কাঁচামাল যেত ইংল্যান্ডের বাজারে। সোনারূপার পরিবর্তে, ব্রিটিশ পণ্য উপচে পড়ত ভারতীয় বাজারে। এক কথায়, ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল ভারতীয় কুটির শিল্পের মধ্যযুগীয়ত্ব। ইংলন্ডীয় শিল্পবিপ্লবের প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে ভারতবর্ষে অবশিল্পায়নের মতো এক নিকৃষ্টতম মূলগত ফেরবদল দেখা দিলে শ্রমিক শ্রেণি জীবিকা পরিবর্তনে বাধ্য হয়। স্বনির্ভর আত্মনেপদী রুজিরোজগার থেকে তারা নফরতন্ত্রের শিকার হয়ে যায়।

হিস্টোরিক্যাল অ্যান্ড ইক্লেস্টিকাল স্কেচেস-এ এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে যে, এক টাকায় ২৯১ কিলো চাল পাওয়া যেত সে-সময়ের বাংলায়। সন্দিগ্ধজন বলতেই পারেন এ-সবের সঙ্গে কলকাতার কী সম্পর্ক। তাঁদের বলি যে, সুঠাম দেহবল্লরীর সৌন্দর্য স্থানবিশেষে সুন্দর হয় না। তাগড়া বাইসেপ-ট্রাইসেপ-সিক্‌সপ্যাক— সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর, অথচ কাফ মাসলটি ল্যাকপ্যাকে, কব্জি কাঠিসার— কখনো হয় না কি তেমন? একুশের অধ্যাপিকা বললেন— শহরই ছিল না, শহর বানিয়ে নেবার দরকার ছিল! তবে কি তাঁরা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীও ছিলেন? সুঠাম শরীর সমান মাপেই সুবিন্যস্ত হয়। বাংলা তেমনই ছিল— পোর্তো গ্রান্ডা চাঁটগা-সোনারগাঁও-বাকলা টু হুগলী-মালদা-বর্ধমান। নদী সামীপ্যের কারণে চওড়া জলপথনির্ভর হাইওয়ের কোলে একটি নয়, দু-দু-টি বাজার কিংবা প্রাক্‌-ব্রিটিশ সাতটি নগর-বন্দর গড়ে ওঠা কি যথেষ্ট, যথাযোগ্য প্রমাণ নয়? (বর্ডারহীন), প্রি-মর্ডান যুগে, বিদেশিবাণিজ্য কি বিস্ময়জনক আধুনিকতা নয়? সুশিক্ষিত মানুষ তো বরং ‘ব্রেক্সিট’ করে! (৪০০ বছর আগে) কলকাতা সংলগ্ন দু-দুটো বাজার (বেতড়-সুতানুটি) থাকার প্রয়োজনীয়তা কী বা কেন?

ঐতিহাসিক অনিল কুমার দাস ইংরাজ দূতিয়াল টমাস রো-র নজরে দেখা বাংলায় ব্রিটিশবাণিজ্যের সম্ভাবনা সম্বন্ধে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন (সূত্র: ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেস, সংখ্যা ২৮,১৯৬৬) আমি কেবল কপি-পেস্ট করছি— ‘Sir Thomas Roe returned * that Bengalla should be poore I saw no reason; it feeds the countries with wheate and rise, it sends sugar to all India; hath the finest cloth and pintadoes, musek, civitt and amber, (besides) almost all raretyes from thence by trade from Pegu… the number of Portugalls residing is a good argument for us to seeke it, it is a signe there is good thing…’ পাশাপাশি উল্লেখ রাখব ঐতিহাসিক ওম প্রকাশ সম্পাদিত ‘হাউ ইন্ডিয়া ক্লোদড্‌ দি ওয়ার্ল্ড্‌’ বই থেকে একটি উদ্ধৃতির— ‘John Huyghen van Linschoten noted in his Voyage to the East Indies (1598) a “great traffique into Bengala, Pegu, Sian, and Malacca, and also to India”, adding that “there is excellent faire linnen of Cotton made in Negapatan, Saint Thomas, and Masulepatan, of all colours, and woven with divers sorts of loome workes and figures, verie fine and cunningly wrought, which is much worne in India, and better esteemed then silke, for that is higher prised than silke, because of the finenes and cunning workmanship.” লক্ষণীয় যে উদ্ধৃতিটিতে Bengala ও India পৃথকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। (তারিখ ১৫৯৮) চার্ণক প্রতিষ্ঠিত ডেটলাইনের একশো বছর আগে! (সেক্ষেত্রে, প্রশ্ন তুলব না— এই পৃথকীকরণ কেন?)

আর্লি অ্যানালস-এ শেঠ-বসাকদের গোবিন্দপুর অভিযানের কথা বলেছেন সি আর উইলসন। শেঠ মানে অর্থ, শেঠ মানে পুঁজি, অর্থকরী জ্ঞান, ব্যবসায়িক নো-হাউ। সপ্তগ্রাম থেকে গোবিন্দপুরে, ১৫৫১-য়, মানে চার্ণক চলে আসার দেড়শো বছর আগেই অনাগত-ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতম নমুনা হয়ে সপ্তগ্রামের চালু ব্যবসা ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন বণিক! অ-ব্যবসায়িক স্বার্থে কি? কোনোরকম প্ল্যান-পোগ্রাম ছাড়াই? প্রসঙ্গান্তর হলেও এমন মনে করা কি অনুচিত হবে যে, জগৎশেঠের পরিবারও ক্ষুরধার ব্যবসায়িক প্রবৃত্তির তাড়নায় বিদেশির পক্ষ নিয়ে সিরাজ-বিরোধিতায় নেমেছিল এবং সেই বাণিজ্যিক প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের প্রতিফল কী হয়েছিল তা সারা উপমহাদেশ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে যে, ‘প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ সে-সব জায়গাতেই সফল হয়েছে যেখানে আগে থেকেই শিল্পের মজুদগি ছিল, যা মূলধন, ব্যবসায়িক উপলব্ধি আর সংযোগের পটভূমি তৈরিতে সাহায্য করেছিল।

(মিল-মেশিনের যান্ত্রিক নিপুণতা-নির্ভুলতা-নির্ভরযোগ্যতার সূত্রে নয়) কর্মক্ষম দুটো হাতের সাহায্যেই কেবল শিল্পসম্মত এবং বিদেশি বাজারকে আকৃষ্ট করার মতো যে-কোনো পণ্য উৎপাদন করার সব চাইতে আগে জরুরি হল অভিজ্ঞতা, যা আদতে বহুদিনের মগ্ন আত্মাহুতি-মনীষীসুলভ নিবিষ্টচিত্ততার ফল, ফসল। সুতরাং, ঢাল-তলোয়ারযুক্ত নিধিরাম সর্দার আসিলেন (১৬৯০), বাকিবকেয়া দু-বছরের জিন্দেগীর পুরো সদ্‌ব্যবহার করে উদাত্ত কণ্ঠে সকলকে আহবান জানাইলেন, দলে–দলে অভিজ্ঞ লোক জড়ো হতেই আশেপাশে ৩৮-টি গ্রাম (মোরল্যাণ্ডের ভাষায়— টাউন) গড়ে উঠল। অমন ধারার চালু ইতিহাসের দাখিলা কন্টিনিউ করে বলা যেতেই পারে যে, সেইসব গ্রামগুলোতে অতঃপর পণ্য উৎপাদিত হইতে শুরু করিল। উৎপাদিত বস্তুগুলো অবশ্য, মেশিনের অভাবে, হাতেই তৈরি হত। এবং ইয়ান সেন্ট জন, ব্রিটিশ ঐতিহাসিক, বলছেন ১৭৪০-এর দশকে কেবল কলকাতা থেকেই (সেদিনের মূল্যমানে) বছরে ৪ লক্ষ পাউন্ডের মাল লন্ডনে পৌঁছত। (একটি ‘রিড্‌ল’-এর আশ্রয় নেব=সে-সময়ে শুধু ইংলন্ড নয়, সারা পশ্চিম ইওরোপেই পণ্য পৌঁছে যেত।) এত বিশাল পরিমাণ পণ্য শুধুমাত্র হাতে তৈরি হতে গেলে তো সবচেয়ে জরুরি উপাদান হল কায়িক শ্রম। অতএব, গাদাগুচ্ছের কর্মক্ষম মানুষ, একত্রে ও একই জায়গায় পাওয়ার অর্থ হল সেই জায়গাটি বা উৎপাদন-স্থলটি বহু প্রাচীন। ২৫% জি.ডি.পি. তো প্লুটো-দূরত্ব, তিয়াত্তর বছরে আমাদের জিডিপি ১০-এর দাগও ছুঁতে পারল না। আর মিল-মেশিনহীন দুনিয়ায় তাঁরা চার-দশকেই শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন? সরল সত্য বরং বহু প্রাচীনকাল থেকেই জাহ্নবীতীরে বসত গড়ে ওঠার রীত-রেওয়াজ ছিল। শ্র্মবিভাগকে মেনেই নিজ নিজ জাতি-বর্ণ-গোত্র অনুযায়ী মালোপাড়া-মুচিপাড়া-বামুনপাড়া-কাঁসারিপাড়া-কুমোরপাড়া-তাঁতিপাড়া গড়ে উঠেছিল। আই রিপিট, এই বিভাজন শ্রমের ঠিকানা বা ধম্মের হিসাব অনুযায়ী ছিল না।! আর এমন সুপ্রাচীনতার কারণেই নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, নগর কলকাতার জনপদ-জনবল-জনবহুলতা নিশ্চিতই চার্ণকের আহবানের অপেক্ষায় থাকেনি।

সুতানুটিতে বড়ো একটা বাজার ছিল। তথ্য বলছে বাজার এরিয়া ৪৮৮ বিঘা। অর্থাৎ, বেশ বড়োই বটে। এতটাই বড়ো যে, ১৭০৩ সালেই কোম্পানির রেকর্ডে চড়ে বসেছে। (সূত্র: পি থঙ্কপ্পন নায়ার, দি লিভিং সিটি, পৃ-২৩২) কিন্তু, বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি কী করে হল? ‘কয়েক ঘর মাত্র লোকের বাস’ (পি.টি নায়ার) ‘অখ্যাত গণ্ডগ্রাম’ (রাধারমণ মিত্র), তাহলে এত বড়ো বাজারের কী দরকার ছিল? উলটো পাড়েই তো বেতড় ছিল! বাণিজ্যের পরিমাণ সাপেক্ষে বেতড় যথেচ্ছ ছিল না? ১৭০৬–এর ব্রিটিশ জরিপ অনুযায়ী ৪৮৮ বিঘা এলাকা জুড়ে কলকাতায় ‘বাজার-এরিয়া’ ছিল। প্রশ্ন তোলাই যায় যে, ৪৮৮ বিঘাতে কতগুলো ইউনিট বসতে পারত? স্থানীয় জনতা, বিশেষত, বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিক্রেতা-আড়তদার-মহাজন-কুলি-খালাসি-যোগানদার ইত্যাদিরা ছাড়া অমন ঢাউস বাজারটি চলত কীভাবে? র‍্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম ছিল কি? যে-বাজারের মধু–মৌতাতের সুবাস সুদূর পশ্চিম ইওরোপে পৌঁছে গিয়েছিল, তা যদি এক গণ্ডগ্রামের অজ পাড়া গাঁয়ে হাটই হত, তবে তো ব্রিটিশের ফোর্ট গড়ারই তো প্রয়োজন পড়ত না। ৫০-৬০ বছর আগেই হুগলিতে ডেরা নিয়েছিল, ওরা দুর্গ বানায়নি তো! অভিধানে দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী বাজার হল একটি সর্বসময়ের বিকিকিনির স্থায়ী জায়গা, হাট হল নির্দিষ্ট সময়ান্তরে বেচাকেনার স্থল আর গঞ্জ হল অঢেল পরিমাণ (নির্দিষ্ট) জিনিসের পাইকারি বেসাতির জন্য চিহ্নিত এলাকা। যে-পরিমাণ ব্যবসা চলত, তা (স্ত্রী-পুত্র-পরিবার সমেত) দু-দশটি ‘straggling’ পল্লিগ্রামের দশ-বারো ঘর গাঁইয়া দেহাতির পক্ষে অবশ্যই সাধ্যাতীত ছিল। সুদৃঢ় বাণিজ্য কাঠামো ছিল, নিশ্চিতই, আর রূপকথা বা মিথে পরিণত গ্রাম কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চলের জনবহুল, বলিষ্ঠ সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমির ওপরই ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছিল ইওরোপীয় বণিকদল। বলা বাহুল্য, কেবল সমুদ্রবাণিজ্য নির্ভর (ষান্মাসিক) ব্যবসা চলত না বড়োবাজারের মতন সুপারবাজারে। ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যকথায় কবিকঙ্কণের দাখিলামতো অন্তর্দেশীয় এলাকায় যেমন কর্ণাট-অন্ধ্র-পাঞ্জাব-মালাবার অঞ্চলে অন্তত এক শতাব্দী আগে থেকেই বাংলার পণ্য পৌঁছত।

সলিলকির ঢঙ্গে কে যেন ফিসফিসালো— খ্রিস্টীয় তেরো শতক, ভারতীয় জীবনযাত্রায় ঘটেছিল আমূল পরিবর্তন। যুদ্ধবিগ্রহের পথ থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, চাষাবাদ, বস্ত্র-হস্ত-কুটিরশিল্পের দিকে মন দিল আশ্বস্ত সাধারণ মানুষ। গড়-দুর্গ-সেনানিবাসের বদলে অগুনতি কারখানা। পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন। গঞ্জ–মণ্ডি-কেন্দ্রীয় বাজার। নতুন নতুন আড়ং। ৩২০০-টি আধা-শহর। ১৫০ মিলিয়ন অধিবাসী। ১৫৩০-১৬৩৫-১৬৭৩; পর্তুগিজ-ডাচ-ফরাসি। তুর্কি-পার্শি-চীনা বণিকের আনাগোনা। ১৫৯৫, আখ্যা পেল পরগণা বা মহাল। নতুন নাম, ডিহি কলকাতা। প্রাক্‌ ১৭৫০ বাংলার নগর-বন্দর গড়ে ওঠা, বণিক শ্রেণির মহাজনী উত্থান, আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস সেভাবে নাড়াচাড়া করা হয়নি। অবশিল্পায়নের ইতিহাস রয়েছে, কিন্তু শিল্পায়নের বাখান নেই। হ্যামিলটনীয় জনবিরলতা থেকে হলওয়েলীয় জন-বহুলতার তত্ত্ব-তথ্যদিও কি সেভাবে প্রাপ্তব্য? লাখ চারেক লোক জড়ো হচ্ছেন মুষ্টিপ্রমাণ এক ‘বিশেষ’ এলাকায়, কেন-কী উপায়ে, কীসের বিনিময়ে— সে-ইতিহাস কোথায়? এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা (১৯০১)-য় এ.কে. রায় লিখেছেন (পৃ-২১৬)— ‘beyond that [Chitpore] road… spread jungles and pools, swamps and rice-fields, dotted here and there by the straggling huts and hovels of a small number of fishermen, falconers, wood-cutters, weavers and cultivators.’ আর ওই বইয়েরই ২৩ পৃষ্ঠায় শেঠ-বসাকদের সম্বন্ধে লেখেন যে, তাঁদেরই অনুপ্রেরণায় গোবিন্দপুর ও সুতানুটিতে ‘a large colony of weavers’ বসবাস করতে শুরু করে দেয় এবং ইংরাজ বণিকদের আকৃষ্ট করার মতো জমজমাট সুতোর ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল। আদি কলকাতার জনসংখ্যার সঠিক মূল্যায়নের জন্য এই মন্তব্যের ‘লার্জ’ ও ‘কলোনি’ শব্দ দু-টির মাহাত্ম্য অপরিসীম। পরের লাইনেই লিখেছেন ‘ইট ওয়াজ থ্রু দেম দ্যাট দি রেসিডেন্টস অফ ক্যালকাটা ফার্স্ট গট এ গ্লিম্পস অফ দি পর্তুগিজ ট্রেডিং অ্যাট বেতড়, ফ্রম হোয়্যার দে কেম টু ক্যালকাটা অ্যান্ড এস্টাব্লিশড্‌ এ কটন ফ্যাক্টরি (আলগোদাম)। এই আলগোদামই হচ্ছে আজকের ক্লাইভ স্ট্রিট। ১৫৪০-এ পর্তুগিজরা বেতড় বাজার হয়ে সপ্তগ্রাম চলে যেত। আর ১৬৩০-এ তারা সম্রাট শাহজাহানের রোষে পড়ে বিতাড়িত হয়। সুতরাং, চার্ণকের বহু আগেই কলকাতায়, অর্থাৎ, আজকের কয়লাঘাট/ক্লাইভ স্ট্রিট এলাকায় পা রেখেছিল পর্তুগিজরা।

‘আর্লি অ্যানালস’-এ ব্রিটিশ-বাণিজ্য স্থাপনের আদিপর্বের পর্যালোচনায় সি আর উইলসন-এর বক্তব্যের বঙ্গানুবাদ করেছি এরকম— ‘বহু খানাতল্লাশির পর দু-টি বিশেষ কারণের জন্য চার্ণক সুতানুটি (বা কলকাতাকে) ব্রিটিশ-বাণিজ্যের পক্ষে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা হিসাবে বেছে নেন: ১) সামরিক দিক থেকে জায়গাটির নিরাপত্তা এবং ২) ‘ইট ওয়্যাজ অলসো অ্যান এক্সেলেন্ট কমার্শিয়াল সেন্টার’। অর্থাৎ, এটি একটি উচুঁদরের বাণিজ্য-কেন্দ্র ছিল। ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও লিখেছেন যে— ‘দি সিটি ইজ দি গ্রোথ অব মেনি সেঞ্চুরিজ!’ অর্থ হয়, কলকাতা কিংবা হুগলি নদীর যে-অঞ্চলে এ-সময়ের কলকাতা অবস্থিত, তার একটি পূর্ব-ইতিহাস রয়েছে আর নগরটি বহু শতাব্দীর বৃদ্ধির ফল। নিম্ন-ভাগীরথীর অববাহিকা অঞ্চলের চেয়ে ছোটনাগপুরের এলাকায় জনবসতির ঘনত্ব, উপজ ফসলের অনুপাতে খামতি থাকাই বরং, তর্কাতীতভাবে, একটি আর্থ-ভৌগোলিক সত্য। দুই-তিন ফসলি জমির সুবাদে ভাগীরথী তীরবর্তী এলাকার প্রতি বর্গকিলোমিটার পিছু বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে, অগুনতি লোকের বসবাসের পাকাপোক্ত ঠিকানা হয়ে ওঠা, নিশ্চিতই, অতি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিণতি। আর তারই স্বীকৃতি হিসাবে ১৬৯৮-এর জমিদারি হস্তান্তরের বইনামায় ‘কলকাতা’ নামের ডিহি ও পরগনার ‘যৌথ’ সূচনা রয়েছে। হ্যামিল্টনীয় বারো হাজারের পাশে কবিকঙ্কণের ‘ডানি বামে যত গ্রাম, তার কত লব নাম’ কি খুবই বেমানান?

এ-সময়ের ব্রিটিশ স্থপতি-ঐতিহাসিক মার্টিন বিটি মন্তব্য করেছেন যে— ‘Indian cities were not distinguished conceptually and materially from the countryside’. সপ্তগ্রাম বা হুগলি বড়োসড়ো নগরে পরিণত হয়নি। প্রাগাধুনিক ভারতীয় নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সে-সময়ের গ্রামগুলো আধুনিক ইওরোপীয় ধাঁচের এক ঘনসন্নিবদ্ধ এবং বৃহদাকার নগরাঞ্চলে পরিণত হয়নি; বরং সংলগ্ন থেকেও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিল। ষোড়শ শতকীয় বাংলার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র (১৫৪০-এর) হুগলি থেকে (জলপথে) কলকাতার দূরত্ব ৩৩ কি.মি. মাত্র। অর্থাৎ, সহজেই প্রভাবিত হওয়ার মতো নৈকট্য। সুপ্রতিষ্ঠিত জনপদ হিসাবে মঙ্গলকাব্যে বা রাজস্বপ্রদায়ী অঞ্চল হিসাবে আইন-ই-আকবরী-তে উল্লিখিত শান্তিপুর-নবদ্বীপ-মাটিয়ারি-মুড়াগাছা-হালিশহর-নইহাটী–ব্যারাকপুর (বর্বকপুর)-খড়দহ কিংবা ত্রিবিণী-মগরা-রিষড়া-শ্রীরামপুর-কোন্নগর-কোতরং অথবা আদিগঙ্গার অববাহিকা এলাকা যেমন ছত্রভোগ-মেদনমল্ল প্রভৃতি এলাকা সন্নিহিত হয়েও নিজ নিজ ভিন্ন সত্তা-আইডেন্টিটি নিয়ে গয়ংগচ্ছতায় ডুবে থেকেছে। ভারতীয় রীতি-নীতির সঙ্গে তালমেল রেখেই যেন রাজধানী, প্রশাসনিক বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রভূমি হিসাবে গড়ে ওঠার কৌলিন্য ব্যতিরেকে কোনো এলাকাই তেমন বৃহদাকার নগরে পরিণত হয়নি। পের্লিন-মেণ্ডেল-মারফানি প্রভৃতি বিদেশি অর্থনীতিশাস্ত্রীরা প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রি বা বাণিজ্যিক মূলধনের সঙ্গে জনবৃদ্ধির, সাধারণের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের কথা পেড়েছেন। জিওফ্রে মুরহাউসের ‘দলে দলে’ শব্দবন্ধটিও তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সুতরাং, প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক পর্বের অর্থনৈতিকতার স্বরূপ উন্মোচনে জনবহুলতার বিষয়টি তাই সর্বাগ্রে বিচার্য: প্রাক্‌-ব্রিটিশ নগর কলকাতা কি সত্যিই ‘অখ্যাত গণ্ডগ্রাম’ ছিল?

‘কেন্দ্রীয় অঞ্চল’ তত্ত্বে ওয়াল্টার ক্রিস্টালার পাঁচ ধরনের জনবসতির উল্লেখ করেছেন। সবচেয়ে ছোটো এলাকাকে গণ্ডগ্রাম বা হ্যামলেট বলা হয়। জনসংখ্যার নিরিখে সেই এলাকাগুলো হল, পর্যায়ক্রমে— ১. গণ্ডগ্রাম; ২. গ্রাম; ৩. আধা-শহর (টাউন); ৪. নগর; ৫. অঞ্চলের প্রধানতম শহর বা রাজধানী।

উপরিউক্ত বিভাগ অনুসারে বলা যায় যে, ১৬৯০-এর কলকাতা, কমপক্ষে, একটি টাউন তো ছিলই, যেহেতু, বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্যের কেন্দ্র হিসাবে বড়োবাজারের মতন এক সুপারবাজার ও সেই বাণিজ্য অঞ্চল সংলগ্ন উপযুক্ত জনবসতি সৃষ্টি হওয়ার কারণে একশো বছর আগেই একটি পরগনা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আঞ্চলিক শাসনকর্তার বাসভূমি বা ‘ডিহি’-তে পরিণত হয়েছিল।

তৃতীয় পাতা