Categories
প্রবন্ধ

সুমনা রহমান চৌধূরীর প্রবন্ধ

মিঞা কবিতা: স্ফুলিঙ্গ যখন মশাল

পাঁচটি মিঞা কবিতার অনুবাদ:

 লিখে নাও আমি একজন মিঞা
কবি: ড. হাফিজ আহমেদ
(মূল কবিতা ইংরেজিতে লেখা)

লিখো
লিখে নাও
আমি একজন মিঞা
এন আর সি-তে সিরিয়াল নং ২০০৫৪৩।
দুই সন্তানের বাবা আমি
সামনের গ্রীষ্মে জন্ম নেবে আরও একজন
তাকেও তুমি ঘৃণা করবে কি
যেভাবে ঘৃণা করো আমায়?

লিখো
আমি একজন মিঞা
সেই জলা জমিকে
আমি সবুজ ক্ষেত বানিয়েছি
তোমাকে খাওয়াতে,
ইটের পর ইট বয়ে এনেছি
তোমার বাড়ি বানাতে,
তোমার গাড়ি চালিয়েছি
তোমার আরামের জন্য,
খাল নালা পরিষ্কার করেছি
তোমার স্বাস্থ্যের জন্য,
তোমার খাটুনি খাটার জন্য
আমি হাজির যে-কোনো সময়ে।
তবু যদি মন না ভরে
লিখে নাও
আমি একজন মিঞা।

এই গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষ, প্রজাতন্ত্রের
অধিকারের জন্য অধিকার ছাড়া এক নাগরিক।
আমার মা-কে ডি ভোটার বানানো হল,
তার মা-বাপ যদিও ছিল ভারতীয়।
ইচ্ছে হলেই প্রাণে মেরে দিতে পারো আমায়, লাথ মেরে
তাড়িয়ে দিতে পারো আমার গ্রাম থেকে,
আমার সবুজ ক্ষেত কেড়ে নিতে পারো,
রোলার দিয়ে পিষে দিতে পারো আমাকে,
তোমার গুলি
আমার বুক ফুঁড়ে দিতে পারে,
জানি, তোমার কোনো শাস্তি হবে না।

লিখো
আমি একজন মিঞা
ব্রহ্মপুত্রে বেঁচে আছি
তোমার নির্যাতন সইতে সইতে,
আমার শরীর কালো হয়ে গেছে
চোখ আগুনে লাল।
দাঁড়াও!
রাগ ছাড়া ভাড়ারে কিছু নেই।
দূর হটো!
না হলে
ছাই হয়ে যাও।

যদি আৰ কোনো ভাষা না থাকে দুনীয়ায়
কবি: কাজী নীল
(মূল কবিতা মিঞা দোয়ানে লেখা)

যদি আর কোনো ভাষা থাকে না পৃথিবীতে
যদি হারিয়ে যায় সব অক্ষরমালা
যদি ভেসে যায় খাতা কলম, কবিতার উপমা

যদি কোনো সাংকেতিক ভাষায় আর না বলতে পারি
তোমাকে আমার এই নীরব দুঃখ

এই মরে যাওয়া মন যদি
আর খুঁজে না পায় গানের ঠিকানা
যদি না লিখতে পারি চিঠি এই আগুন জ্বলা বসন্তে

যদি বোবা হয়ে যাই, যদি আমাদের চোখ
আর না বলে কোনো কথা

যদি নদী থাকে নদীর মতন, ঢেউয়ের কোনো শব্দ নাই
যদি পাখি থাকে গাছের ডালে, ঠোঁটে কোনো বাঁশি নাই

যদি আমরা ছটফট করি সারা রাত
না বলা কথাগুলি উড়ে বেড়ায় শিমুল তুলার মতন
আর আমরা বুঝতে না পারি বুকফাটা মেঘের বিষাদ

যদি সব ভাষা হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে
যদি থেমে যায় এই কলম

ভালোবাসার কথা কি আমি বলব না, বলো?
আমি কি বলব না এই নীরব দুঃখের কথা

অন্য কোনো আদিম ভাষায়?

 সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না
কবি: কাজি নীল
(মূল কবিতা মিঞা ‘দোয়ানে’ লেখা)

যে-দেশ আমার বাবাকে বিদেশি বানায়
যে-দেশ আমার ভাইকে গুলি করে মারে
যে-দেশে আমার বোন মরে গণধর্ষণে
যে-দেশে আমার মা বুকে আগুন চেপে রাখে
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে-দেশে লুঙ্গি পরার অধিকার নাই
যে-দেশে কান্না শুনার মানুষ নাই
যে-দেশে সত্য বললে ভূত কিলায়
যে-দেশ আমার আজীবন দাসত্ব চায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে-দেশে টুপি মানেই মৌলবাদী
যে-দেশে মিঞা মানে নীচজাতি
যে-দেশে ‘চরুয়ারা’ সব বাংলাদেশি
যে-দেশ টাটা বিড়লা আম্বানীর হাতে বিক্রি হয়ে যায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে-দেশে আমাদের লাশের পর লাশ কুপিয়ে কেটে
নদীতে ভাসিয়ে দেয়
যে-দেশে ৮৩তে মানুষ মেরে শালার বেটারা জল্লাদের
মতো উল্লাস নৃত্য নাচে
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে-দেশে আমার ভিটা বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়
যে-দেশে আমার অস্তিত্বকে বাতিল করা হয়
যে-দেশ আমাকে অন্ধকারে রাখার ষড়যন্ত্র চালায়
যে-দেশ আমার থালাতে পান্তার বদলে পাথর ঢালতে চায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে-দেশে আমি গলা ছিঁড়ে চিৎকার করলেও কেউ শুনে না
যে-দেশে আমার খুনের জন্য কেউ দায়ী না
যে-দেশে আমার ছেলের কফিন নিয়ে রাজনীতি চলে
যে-দেশ আমার বোনের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলায়
যে-দেশে আমি জানোয়ারের মতো বেঁচে থাকি
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

ওই জেলে আমার মা থাকে
কবি: গাজি রহমান
(মূল কবিতা মিঞা ‘দোয়ানে’ লেখা)

আমার মা আমাকে খুব ভালোবাসে
এখন বাসে না
কীভাবেই-বা বাসবে
আমার মা তো বাড়িতেই নেই…
ওই জেলে আমার মা থাকে!

আমার মা নাকি বিদেশি
ওই দেশ থেকে এসেছে
আমার খালা, আমার মামা
এখানেই থাকে
আমার নানি তো নেই
নানা মারা গেছেন অনেক বছর হল
আমি দেখিনি
নানার নামে কাগজ আছে
ওরা বিদেশি না
শুধু আমার মা…
আমার মাকে কেউ ইশকুলে দেয়নি
ছোটোবেলাতেই বিয়ে দিয়েছিল
বাড়িতে খুব অভাব!

আমি জানি আমার মা কাঁদে
আমার জন্যে
আমিও কাঁদি মা-র জন্যে
আমি আগে জলদি ঘুমাতাম রাতে
এখন ঘুম আসে না
আমার মা নেই যে..!
মাথায় হাত বুলিয়ে
আমার মা গুনগুনিয়ে গান গাইত
আমি কখন ঘুমিয়ে পড়তাম
বুঝতেই পারতাম না

এপাশ ওপাশ করি
আমার মা নেই!
কীভাবেই-বা থাকবে
আমার মা যে ওই জেলে থাকে
আমি জানি আমার মা-র অনেক দুঃখ
আগেও ছিল
গরিব মানুষ আমরা
আমার বাবা মানুষের বাড়িতে কামলা খাটে
ভালো মন্দ খেতে পারি না
আমার মাকে সেই ঈদের সময়
একটা দেড়শো টাকা দামের শাড়ি দেয়
এখন তাও দিতে পারে না
কীভাবেই-বা দেবে
আমার মা যে বাড়িতেই নেই
ওই যে একটা জেল
ওই জেলে আমার মা থাকে!

জানেন
আমার শরীরে এখন ময়লার আস্তরণ পড়ে গেছে
আমার মা ঘাটের মধ্যে বসিয়ে
শরীর ঘষে ঘষে
স্নান করিয়ে দিত
আমি এখন একা একাই স্নান করি…
শরীর ঘষতে পারি না
আমি অনেক সুন্দর ছিলাম
এখন কালো হয়ে গেছি
বাবার তো সময় নেই
কামলা খাটতে লাগে
না হলে খাব কী
আবার আমার জন্যে ভাত রাঁধে
আমার বাবারও অনেক দুঃখ
মাঝে মাঝে একা একাই কাঁদে
আমারও চোখ দিয়ে জল পড়ে…!

আমার মাকে কে এনে দেবে?
মাকে ছাড়া কেমন যেন লাগে আমার
আমার মা আমাকে ইশকুলে এগিয়ে দিতে যেত
অনেক দূরে আমাদের ইশকুল
রাস্তার মাঝখানে কয়েকটা কুকুর শুয়ে থাকে
আমি আবার কুকুর দেখলে ভয় পাই
আমি এখন ইশকুলে যাই না
আমার পড়তে অনেক ভালো লাগে
কিন্তু পারি না
কীভাবেই-বা যাব
আমার মা যে বাড়িতেই নেই
ওই যে একটা জেল
ওই জেলে আমার মা থাকে!

আমার মা শুকিয়ে গেছে অনেক
এখন মা-র শরীরে মাংস নেই
শুধু কয়েকটা হাড্ডি
তাও গোনা যায়!

আমি আমার মা-র কাছে যাব
আমিও জেলেই থাকব
আমি বলব যে আমি বিদেশি
হ্যাঁ আমিও বাংলাদেশি
কে নিয়ে যাবে আমাকে
আমার মা-র কাছে?
বাবাকে অনেকবার বলেছি
নিয়ে যায় না
বাবার বুঝি কান্না আসে
আসবেই তো
আমার বাবা আমার মাকে
অনেক ভালোবাসে, আমিও বাসি
আমার মাও বাসে, আদর করে
এখন করতে পারে না
কীভাবেই-বা করবে
আমার মা তো এখানে নেই
ওই যে একটা রাক্ষস জেল
ওই জেলে আমার মা থাকে!

একটা সন্দেহজনকেৰ পোলা
কবি: কাজী নীল
(মূল কবিতা মিঞা ‘দোয়ানে’ লেখা)

একটা সন্দেহজনকের ছেলে
খুব বেশি একটা কবিতাই লিখতে পারে
না হলে খুব দুঃখ রাগে বলে দিতে পারে
এই দেশ আমার আমি এই দেশের না

একটা সন্দেহজনকের ছেলে খুব বেশি হলে
মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলি খেতে পারে
বা প্রাণের মমতায় জুতা স্যান্ডেল ফেলে দৌড় দিতে পারে
তার চাইতে অল্প বেশি হলে
একটা সন্দেহজনকের ছেলে
জঙ্গলে যেতে পারে মুক্তির অন্ধ নেশায়
একটা সন্দেহজনকের ছেলে কিছুই করতে পারে না
রাজভবনের সামনে চিৎকার দিয়ে গলা ফাটানো ছাড়া
বা রাষ্ট্রের মুখে ছুঁড়ে ফেলা ছাড়া বৈধতার নথিপত্র
একটা সন্দেহজনকের ছেলে খুব বেশি একটা
কবিতাই লিখতে পারে
তার চাইতে ভালো পারে শহীদের বাচ্চারা
দেশটাকে দুই টুকরো করে বিলিয়ে দিতে পারে
যা কোনো সন্দেহজনকের ছেলে কোনোদিনই পারে না।

প্রথম পাতা

Categories
প্রবন্ধ

সুমনা রহমান চৌধূরীর প্রবন্ধ

মিঞা কবিতা: স্ফুলিঙ্গ যখন মশাল

কবিতা যেভাবে মশালে পরিণত হল:

‘মিঞা’ কবিতা নির্মাণের প্রথম ধাপ ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে। ‘আবাহন’ পত্রিকায় প্রকাশিত মৌলানা বন্দে আলি মিঞার অসমীয়া ভাষায় লিখিত ‘এক চরুয়ার শপথ’ কবিতা দিয়ে এই ধারার যাত্রা শুরু। বন্দে আলি মিঞা লিখেছিলেন—

“কোনে বোলে বঙ্গদেশ মোৰ জন্মভূমি
লভি যাৰ তিক্ত নির্যাতন
আহিছিলোঁ ঘৰ এৰি হই দেশান্তৰী
পিতৃ আৰু কতজন…
অহমিয়া আপোন আমাৰ
নহওঁ চৰুয়া মই নহওঁ পমুৱা
আমিও যে হলো অহমিয়া,
অহমৰ জল-বায়ু অহমৰ ভাষা
সকলোৰে সমান ভগীয়া…”

বাংলা:

(“কে বলে বঙ্গদেশ আমার জন্মভূমি
যার তিক্ত নির্যাতনে
এসেছিলাম ঘর ছেড়ে হয়ে দেশান্তরী
পিতা এবং কয়েকজন…
অসমীয়া আপন আমাদের
নই চরুয়া আমি নই পমুয়া
আমরাও যে অসমীয়া,
অসমের জল-বায়ু অসমের ভাষা
সকলের সমান ভাগী…”)

উপরের লাইনগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, কবি বন্দে আলি মিঞা চরুয়া, পমুয়া বা পূর্ববঙ্গীয় পরিচয় সরিয়ে একজন অসমীয়া হিসাবে বৃহত্তর অসমীয়া সমাজ-সংস্কৃতি-জনগোষ্ঠীর সাথে এক হতে চাইছেন। বন্দে আলি মিঞার এই চাওয়া সমস্ত মিঞা ভাষাভাষী মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আবার ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে যখন ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা নেলীতে হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে খবীর আহমেদ ‘বিনীত নিবেদন এই যে’ নামক একটি কবিতায় লিখেন—

“বিনীত নিবেদন এই যে
মই এজন পমুয়া, এজন লাঞ্চিত মিঞা
যিয়েই নহওক কিয় মোৰ নাম
ইসমাইল শেখ, ৰমজান আলি কিংবা মজিদ মিঞা
জ্ঞাতব্য বিষয় মই অহমৰই অহমীয়া।”

বাংলা:

(“বিনীত নিবেদন এই যে
আমি একজন পমুয়া, একজন লাঞ্চিত মিঞা
যাই হোক না কেন আমার নাম
ইসমাইল শেখ, রমজান আলি কিংবা মজিদ মিঞা
জ্ঞাতব্য বিষয় আমি অসমেরই অসমীয়া”)

খুব সম্ভবত এই কবিতাটিই আজকের মিঞা কবিতার জন্মদাতা। ভ্রূণ অবস্থা থেকে তার ব্যাপ্তি শুরু হয় ২০১৬ নাগাদ অসমের সরকার বদলের হাত ধরে। ২০১৬ সালে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস সরকারের পতন এবং বিজেপির অসম দখল। সেই সময় থেকেই ভয়াবহভাবে শুরু হল এন আর সি, বিদেশি, খিলিঞ্জিয়া, বাংলাদেশি, ডি-ভোটার, ১৯৭১-১৯৫১ বিতর্ক, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের জুমলা, সিটিজেনশিপ বিলের পক্ষে সাম্প্রদায়িক প্রচার। এই সমস্ত কিছু নতুন করে আবারও বিপন্নতার আবর্তে ঠেলে দেয় এই জনজাতিকে। মূলত এই সময়েই চরম রাগ আর হতাশা থেকে ড. হাফিজ আহমেদ ফেসবুকের পাতায় লিখলেন ‘লিখি লোয়া, মই এজন মিঞা’। এই কবিতার হাত ধরেই একটা আন্দোলন জন্ম নিল আসামের বুকে। ব্রহ্মপুত্র এলাকার মুসলমান তরুণ প্রজন্ম, যাদের পূর্বপুরুষ কোন এক সময়ে বাঙালি ছিলেন, এই নবীন কবিরা ফেসবুকে একের পর এক মিঞা কবিতা লিখতে শুরু করেন। অসমীয়া, ময়মনসিংহি, কামতাপুরি-সহ নানা স্থানীয় ভাষা-উপভাষা মিলে সৃষ্টি মিঞা দোয়ানের লিপি অসমীয়া বর্ণমালা। সেই দোয়ানেই ফেসবুকের পাতায় মিঞা কবিরা লিখে চললেন তাঁদের দীর্ঘ দিনের যন্ত্রণার ইতিহাস। কবি রেজওয়ান হুসেন সেই যন্ত্রণার বিষে নীল হয়েই লিখেন ‘আমাগো বিপ্লব’ কবিতায়—

“আমাদের তোমরা গালি দেও
হাতের নাগালে পেলে লাথিও মার
নীরবে কিন্তু আমরা তোমাদের
অট্টালিকা, রাস্তা, দালান বানাতে থাকব
তোমাদের অস্থির, ঘামে ভেজা, চর্বিযুক্ত
শরীরটাকে আমরা কিন্তু রিকশায় টানতে থাকব…”

অথবা চান মিঞা লিখেন “আইজকা আমি আমার নাম জানি না” কবিতায়—

“আবার ডিটেনশন ক্যাম্পে বসে মনে পড়লো
হায়রে, এই বিল্ডিংটা তো আমিই বানিয়েছিলাম
এখন আমার কিছু নাই
মাত্র আছে একজোড়া পুরানো লুঙ্গি, আধপাকা দাড়ি
আর দাদার নাম থাকা ছেষষ্টি’র ভোটার
লিস্টের এফিডেফিট কপি।”

ইতিহাসের শুরু থেকেই এই জনগোষ্ঠী বারবার অবজ্ঞা, উৎপীড়ন, অপমান, হেনস্থার শিকার হয়ে গেছেন। তাই এরা যখন এদের কথা বলতে শুরু করলেন, যুগ যুগ ধরে জমিয়ে রাখা সেই যন্ত্রণার ধরাভাষ্যই প্রতিফলিত হল তাদের কবিতায়। যে-‘মিঞা’ ডাক ব্যবহৃত হত তাদের অপমান, হেনস্থা করার জন্যে, সে-ডাককেই অহংকারের সাথে মাথায় তুলে নিয়ে তারা তাদের কবিতার ঘরানার নাম দিলেন ‘মিঞা কবিতা’। ‘ইটমগুর’ (চর-চাপরির ভাষায় চাষের ‘হাল’) নামক ফেসবুক পেইজে একের পর এক ‘মিঞা কবিতা’ লিখে গেলেন বিভিন্ন কবিরা। অচিরেই তা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সীমানা ছাড়িয়ে দেশ এবং বিদেশেও তা ছড়িয়ে পড়লো। ইংরেজি-সহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হল কবিতাগুলো। আন্তর্জাতিক স্তরে মিঞা কবিতা, তার পটভূমি, চর অঞ্চলের মানুষের হালহকিকত ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা শুরু হল। এক নতুন ঘরানার কবিতা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

এনআরসি-র যাতাকলে পিষ্ট এক অসহায় বাবার দলা পাকানো অভিমানের বিস্ফোরণ ঘটে ড. হাফিজ আহমেদের কবিতায়—

“লিখো
লিখে রাখো
আমি একজন মিঞা
এনআরসি-র ক্রমিক নং ২০০৫৪৩
দুই সন্তানের বাবা আমি
সামনের গ্রীষ্মে জন্ম নেবে আরও একজন
তাকেও তুমি ঘৃণা করবে কি
যেভাবে ঘৃণা কর আমায়?”

এন আর সি-র অত্যাচারে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী এক প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়ার বিবরণ কবি চান মিঞা দিয়েছেন—

“আবাৰ ডিটেনশন ক্যাম্পে বইসা মনে পৰলো
হাৰে, এই বিল্ডিংডা তো আমিই বানাইছিলাম
এহন আমাৰ কিছু নাই
মাত্র আছে একযোৱা পুৰান লুংগী, আধপাকা দাড়ি
আর দাদাৰ নাম থাকা ছয়ষট্টীৰ ভোটাৰ লিস্টৰ
এফিডেভিট কপি।”

বাংলা অনুবাদ:

(“আবার ডিটেনশন ক্যাম্পে বসে মনে পড়লো
হায় রে, এই বিল্ডিংটা তো আমিই বানিয়েছিলাম
এখন আমার কিছুই নেই
মাত্র আছে একজোড়া পুরানো লঙ্গি, আধপাকা দাড়ি
আর দাদার নাম থাকা ছেষট্টি’র ভোটার লিস্টের
এফিডেভিট কপি।”)

বৃহত্তর অসমীয়া জনজাতির কাছে নিজের প্রাপ্যটুকু পেতে, অসমীয়া মায়ের সৎমা সুলভ আচরনে তীব্র অভিমানে রেহানা সুলতানা লিখছেন—

“হাজাৰ লাঞ্চনা-বঞ্চনা সহ্য কৰিও মই চিঞৰি
চিঞৰি কও—
আই! মই তোমাকেই ভাল পাঁও।”

বাংলা:

(“হাজার লাঞ্চনা-বঞ্চনা সহ্য করেও আমি চিৎকার
করে বলি—
মা! আমি তোমাকেই ভালোবাসি।”)

১৯৮৩ সালের ইতিহাসের বর্বরতম নেলী গণহত্যা, এক রাতে সম্পূর্ণ মুসলমান গ্রামটি শ্মশানে পরিণত হয়েছিল, একটা বাচ্চাকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। সেই মর্মান্তিক ক্ষোভ, স্বজন হারানোর ব্যথা থেকেই কবি কাজী নীল লিখেছেন—

“যে-দেশে ৮৩তে মানুষ মেরে শালার বেটারা জল্লাদের
মতো উল্লাস নৃত্য নাচে,
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।”

মিঞা গালি শুনতে শুনতে শেষে রুখে দাঁড়ানো চর অঞ্চলের যুবকদের বিদ্রোহী সত্তার জানান দিয়েছেন কবি আব্দুর রহিম—

“আমাৰে আর মিঞা বিলা
গাইল দিয়েন্না
মিঞা বিলা পরিচয় দিতে
এহন আৰ আমাৰ
সৰম কৰে না
ভাল যুদি নাই পাইন
ছলনা আৰ কইৰেন্না
কাঁটাতাৰেৰ দাগ বিছৰায়েন্না
তিৰাশি, চোৰানবৈ, বাৰ, চোদ্দৰ
কথা ভুইলা যায়েন্না
অই আগুনেৰ পোৰা দাগৰে
কাঁটাতাৰেৰ দাগ কৈয়েন্না—”

বাংলা:

(“আমাকে আর মিঞা বলে
গালি দেবেননা
মিঞা বলে পরিচয় দিতে
এখন আর আমার
লজ্জা করে না
ভালো যদি না ই বাসেন
ছলনা আর করবেন না
কাঁটাতারের দাগ খুঁজবেন না
তিরাশি, চুরানব্বই, বারো, চৌদ্দ’র
কথা ভুলে যাবেন না
ওই আগুনে পোড়া দাগকে
কাঁটাতারের দাগ বলবেন না—”)

এন আর সি আতঙ্ক তাড়া করা এক সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের কাছে শেষ আবেদনের বয়ান কবি আব্দুর রহিম দিয়েছেন—

“আমাকে এত ভয়, শঙ্কার মধ্যে
জীবিত রাখার চেয়ে
আমাকে গুলি করে মেরে ফেলা হোক।
মহাশয়, গুলি করে মেরে ফেলা হোক।”

উগ্র ভাষিক নেতাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেষ স্পর্ধিত উচ্চারণ করেছেন রেহানা সুলতানা—

“নাই নাই, শুনক
মিঞাই আপোনাক কাহানিও গোলাম কৰিব বিচৰা নাই
কিন্তু আপোনাৰ গোলামিও আৰু মিঞাই না খাটে সেৱে,
মিঞাৰ পোয়ালীৱে আজি আপোনাক সঁকিয়াই দিছে
আপুনি যুদ্ধ কৰিব অস্ত্রৰে
মিঞাই যুদ্ধ কৰিব কলমেৰে
কাৰন শুনামতে
অস্ত্রৰ ধাৰতকৈ কলমৰ ধাৰ বেশি চোকা
বেশি শক্তিশালী।
‘জয় আই অহম’।”

বাংলা:

(“না না, শুনুন
মিঞারা আপনাকে কখনো গোলাম করবে বলে ভাবে নি
কিন্তু আপনার গোলামিও আর মিঞারা করবে না
মিঞার মেয়ে আজ আপনাকে সাবধান করছে
আপনি যুদ্ধ করবেন অস্ত্র দিয়ে
মিঞারা যুদ্ধ করবে কলম দিয়ে
কারণ শোনামতে
অস্ত্রের ধার থেকে কলমের ধার বেশি তীক্ষ্ণ
বেশি শক্তিশালী।
‘জয় আই অহম’।”)

তীব্র রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক দমন-পীড়নের মাঝেও মিঞা কবিরা দু-চোখে প্রত্যয় আর ক্রোধ নিয়ে জানান দিচ্ছেন—

“মোৰ দুচকুত জমা হৈ আছে
যুগ যুগান্তৰৰ বঞ্চনাৰ বাৰুদ
আঁতৰি যোয়া
নতুৱা
অচিৰেই পৰিণত হ’বা মূল্যহীন ছাইত!”

বাংলা:

(“আমার দু-চোখে জমা হয়ে আছে
যুগ যুগান্তরের বঞ্চনার বারুদ
সাবধান হোও
নয়তো
শীঘ্রই পরিণত হবে মূল্যহীন ছাইয়ে!”)

শেষ পাতা

Categories
প্রবন্ধ

সুমনা রহমান চৌধূরীর প্রবন্ধ

মিঞা কবিতা: স্ফুলিঙ্গ যখন মশাল

“লিখো
লিখে রাখো
আমি একজন মিঞা

Categories
ধারাবাহিক প্রবন্ধ ফর্মায়েসি

অনিন্দ্য রায়ের ধারাবাহিক: ফর্মায়েসি

নবম পর্ব

লুক ভাত
(Lục bát)

ভিয়েতনামের পম্পরাগত আঙ্গিক ‘লুক বাত’। সে দেশে সমাজের সব স্তরে জনপ্রিয় এই কবিতা। লুক বাতের সিনো-ভিয়েতনামী শব্দার্থ ‘ছয় আট’। ছয় ও আট সিলেবলের পর্যায়ক্রমিক দু-লাইন জুড়ে জুড়ে রচিত হয় এই কবিতা।

Categories
জলসাঘর ধারাবাহিক প্রবন্ধ

অরূপ চক্রবর্তীর ধারাবাহিক: জলসঘর

সপ্তম পর্ব

গওহরজান: এক সুরেলা অধ্যায়

এর পর থেকে গওহরজানের জীবনে শুরু হল সোনালি অধ্যায়। গ্রামোফোন রেকর্ডে ওঁর গাওয়া গানে সারা দেশের মানুষ মাতোয়ারা।

Categories
চলচ্চিত্র প্রবন্ধ

সমন্বয়ের প্রবন্ধ

আফটার আসিফা: আমরা ছবি মাটি ও শরীরের কথা বলব

“…a text is made of multiple writings, drawn from many cultures and entering into mutual relations of dialogue,

Categories
ধারাবাহিক প্রবন্ধ সোনালি হরিণ-শস্য

পার্থজিৎ চন্দের ধারাবাহিক গদ্য: সোনালি, হরিণ-শস্য

অষ্টম পর্ব

দৃষ্টিবিভ্রমের হাতি ও বিস্ফোরিত বেদনার কাহিনি

সিঁড়িঘরের অন্ধকারে ফেলে রাখা ফাঁকা বিস্কুটের বাক্সের ভিতর থেকে তুলোর বলের মতো বিড়ালছানার ডাক নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে। মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখা যায় চোখ না-ফোটা সন্তানের কাছে গুটি মেরে বসে আছে সতর্ক মা, নিশ্চুপ— কিন্তু সতর্ক। চোখ দুটো জ্বলছে।

Categories
ধারাবাহিক প্রবন্ধ ফর্মায়েসি

অনিন্দ্য রায়ের ধারাবাহিক: ফর্মায়েসি

অষ্টম পর্ব

শব্দ-সনেট
(Word Sonnet)

আমরা জানি সনেট হল ১৪ লাইনের কবিতা, এর প্রতি লাইনে নির্দিষ্ট মাত্রা সংখ্যা, অন্ত্যমিলবিন্যাস এবং নবম লাইনে ভোল্টা বা পিভট থাকে।

Categories
প্রবন্ধ

রাহুল হালদারের প্রবন্ধ

স্পুটনিক ‘V’ বাঙালির রোয়াকের এক কাল্পনিক প্রলাপ

অবশেষে বহু কাঙ্ক্ষিত করোনা ভ্যাকসিন ১১/০৮/২০২০ তারিখ, ২৬শে শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দে শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিতে ধরাধামে আর্বিভূত হল। ভ্যাকসিন কতটা নিরাপদ আর কার্যকরী সেটা সময় বলবে কিন্তু আমরা চাইব কৃষ্ণ আর্বিভূত হয়ে যেভাবে দুষ্টের দমন

Categories
ধারাবাহিক প্রবন্ধ ফর্মায়েসি

অনিন্দ্য রায়ের ধারাবাহিক: ফর্মায়েসি

সপ্তম পর্ব

কৃত্তিকা
(Pleiades)

এই ফর্মটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়েছেন আমেরিকার কবি ক্রেগ টাইগারম্যান। সাতটি তারার সমষ্টি কৃত্তিকা (Pleiades)-র নামে এর নাম।