Categories
অনুবাদ উৎসব সংখ্যা ২০২০ সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

দেবোরা: কেন আপনি রাজি হলেন?
মুরাকামি: তারা আমাকে বলেছিলেন যে আমি ইচ্ছামতো রেকর্ড বেছে নিতে পারি। এবং পঞ্চাশ মিনিট ধরে আমার পছন্দসই কথাবার্তা বলতে পারি। তো আমি ভাবলাম, কেন নয়! বিলি হলিডে থেকে ‘মারুন ৫’ পর্যন্ত সবকিছু থেকে আমি খুব বাছাই সংগীত পরিবেশন করি।

দেবোরা: মনে হয় আপনি একবার বলেছিলেন যে, জাপানে লেখক হওয়া খুব চটকদারি ব্যাপার। ভীষণ প্রকাশ্য জীবিকার প্রেক্ষাপটে আপনি নিজের সাধারণত্বে অবিচল থাকেন। এগুলো আপনি মেলান কীভাবে?

মুরাকামি: সত্যি বলতে শুরুর দিকে জাপানের সাহিত্য জগৎ সম্পর্কে আমি খুব একটা খুশি ছিলাম না। আমি ছিলাম একজন বহিরাগত। একটি কালো মেষ, মূলধারার জাপানি সাহিত্যে অনুপ্রবেশকারী। কিছু লোক বলেছিল যে, আমি জাপানি সাহিত্যে নতুন কণ্ঠ। এবং কিছু লোক আমাকে বাজে বলেছিল। তাই আমি একরকম বিভ্রান্ত ও বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। আমি জানতাম না কী হচ্ছে। আমি ‘ওয়ান্ডারল্যান্ডে এলিস’ এর মতো হয়ে পড়েছিলাম। তাই আমি জাপান থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে গেলাম। ইতালি এবং গ্রিসে গিয়ে দুই-তিন বছর কাটালাম। তারপর আমি লিখলাম ‘নরওয়েজিয়ান উড’। জাপানিরা বইটিকে ঘৃণা করেছিল।

দেবোরা: এটা দুই মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল!

মুরাকামি: এত বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও লোকে আমাকে ঘৃণা করেছিল। তাই আবার আমি বিদেশে চলে গেলাম। আমি নিউ জার্সির প্রিন্সটনে গিয়ে উঠেছিলাম। জায়গাটি ছিল বিরক্তিকর। সুন্দর, তবে বিরক্তিকর। তারপরে বোস্টনের টাফট্‌স ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। সেখানকার ফেনওয়ে পার্কটি ভালো ছিল।

দেবোরা: ভূমিকম্প এবং সারিন গ্যাস আক্রমণের পরে আপনি কি আবার জাপানে ফিরে যাওয়ার মন স্থির করলেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। ১৯৯৫ সালে আমি অনুভব করি নিজের দেশে ফিরে এসে মানুষের জন্য কিছু করতে পারি কিনা। দেশের জন্য নয়, জাতির জন্য নয়, সমাজের জন্য নয়, আমার বিশ্বাস ছিল জনগণের প্রতি।

দেবোরা: আপনার কাছে দেশ ও জনগণ, এই দু-টি জিনিসের মধ্যে পার্থক্য কী?

মুরাকামি: মানুষ আমার বই কেনে, দেশ না।

দেবোরা: আপনি কি জাপানি হিসেবে আপনার লেখালেখিকে বিচার করেন না পশ্চিমা সাহিত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন?

মুরাকামি: আমি সেভাবে ভাবি না। আমার গল্প আমারই। এগুলো কোনো বিভাগের বিষয় নয়। তবে আমি জাপানি ভাষায় লিখি এবং আমার চরিত্রগুলো বেশিরভাগই জাপানি। তাই আমি মনে করি আমি একজন জাপানি লেখক। আমি মনে করি আমার লেখার শৈলী অন্যত্র থেকে নেওয়া নয়।

দেবোরা: জাপানে আপনার প্রথম দিকের পাঠকেরা বেশিরভাগই তরুণ ছিলেন। তরুণদের মধ্যে আপনার বিরাট প্রভাব ছিল।

মুরাকামি: হ্যাঁ। এটা খুবই অদ্ভুত। আমি যখন লিখতে শুরু করি আমার পাঠকেরা বিশ বা তিরিশের কোঠায় ছিলেন। এবং চল্লিশ বছর পরে আমার পাঠকেরা বিশ বা তিরিশের কোঠাতেই থেকে গেলেন! ভালো কথা হল আমার প্রথম প্রজন্মের কিছু অনুরাগী এখনও আমার বইগুলি পড়ছেন এবং তাদের ছেলেমেয়েরাও সেগুলি পড়ছে। একই পরিবারের তিন-চারজন একই বই পড়ছেন শুনে আমি খুব আনন্দিত হলাম। আমার এক বন্ধু তার অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের সাথে এমনিতে কথা খুবই কম বলে। কিন্তু জেনে খুব ভালো লেগেছে যে, তারা যখন কথা বলে তখন বিষয় থাকে আমার বই।

দেবোরা: ‘কিলিং কমেন্ডটর’ থেকে থেকে একটা দৃশ্য আমি উদ্ধৃত করতে চাই:

কমেন্ডেটর নিজ হাতের তালু দিয়ে দাড়ি ঘষতে লাগলেন যেন কিছু মনে পড়েছে। “ফ্রানজ কাফকা ঢালু স্থান বেশ পছন্দ করতেন”, সে বলল, “সবধরনের ঢালু স্থান তাকে আকৃষ্ট করত। ঢালের মাঝখানে নির্মিত বাড়িগুলির দিকে চেয়ে থাকতে তিনি পছন্দ করতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার পাশে বসে তিনি ওই বাড়িগুলি দেখতেন। কখনোই এতে ক্লান্ত হয়ে উঠতেন না। প্রথমে মাথাটি একদিকে ঝুঁকিয়ে তিনি বসতেন পরে আবার সোজা করে নিতেন। অদ্ভুত মানুষের মতো ছিল তাঁর আচরণ। আপনি কি এটা জানতেন?” ফ্রানজ কাফকা এবং ঢালু স্থান? “না। আমি জানি না”। আমি বললাম। আমি এরকম কখনো শুনিনি। “তবে এটা জানার পর কি কেউ তাঁর কাজের আরো বেশি প্রশংসা করে?”

দেবোরা: উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা যদি আপনার কৌশল জানি যে আপনি ঢালু স্থানের দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করেন, এতে কি আপনার কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে আমাদের সাহায্য করবে?

মুরাকামি: ফ্রানজ কাফকা ঢালু জায়গা পছন্দ করতেন, এটি মিথ্যা। এটি আমার তৈরি করা। তবে এটা করে কি ভালো করলাম? খুব সম্ভবত ফ্রানজ কাফকা ঢালু জায়গা পছন্দ করতেন।

দেবোরা: এটা সম্ভব।

মুরাকামি: কিছু লোক এই উদ্ধৃতি দেয়। তবে আমি এটি তৈরি করেছিলাম। আমি অনেক কিছুই তৈরি করেছি।

দেবোরা: কল্পকাহিনিতে আপনি এটা তৈরি করতেই পারেন। যদি আমরা জানতে পারি যে আপনি বিড়াল ভালোবাসেন, এটা কি আমাদের আপনার কাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে?

মুরাকামি: আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন।

দেবোরা: তিনি আপনাকে চেনেন বলে কি আপনার কাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন?

মুরাকামি: আমি জানি না। সে বলে আমি তাঁর প্রিয় লেখক নই। তবে সে সবসময় আমার কাজকে খুব গুরুত্বের সাথে সমালোচনা করে। সে আমার প্রথম পাঠক। সুতরাং আমি যখন লেখা শেষ করে পাণ্ডুলিপিটা তাকে পাঠাই সে পড়ে এবং দু-শো ত্রুটি-সহ ফিরিয়ে দেয়। এই ত্রুটিগুলো আমি খুব অপছন্দ করি। সে বলে, “তোমার এই অংশগুলো পুনরায় লেখা উচিত!”

দেবোরা: তখন আপনি আবার লেখেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। তারপরে সেটা আবার তার কাছে পাঠিয়ে দিই। এবার সে একশোটি ত্রুটি-সহ পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দেয়। আগের থেকে কম ত্রুটি থাকে বলে ভালো লাগে।

প্রথম পাতা

Categories
অনুবাদ উৎসব সংখ্যা ২০২০ সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

দেবোরা: আপনি যখন অনুবাদ করেন, আপনাকে অন্য লেখকদের কণ্ঠস্বর গ্রহণ করতে হয়। আপনাকে এক অর্থে ফিটসগেরাল্ড, চ্যান্ডলার বা শেভার হতে হয়। আপনি যখন নিজের একটি স্টাইল আয়ত্ত করে ফেলেছেন তখন কি এটি একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

মুরাকামি: হ্যাঁ। আমি স্কট ফিটসগারেল্ডকে ভালোবাসি। তাঁর অনেকগুলি বই অনুবাদ করেছি। তবে তাঁর শৈলী আমার থেকে অনেকটাই আলাদা, সুন্দর এবং জটিল। তবুও আমি তাঁর লেখা থেকে অনেক কিছু শিখেছি— তাঁর মনোভাব, বিশ্বজগতের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। রেমন্ড কার্ভারের শৈলী এবং তাঁর লেখার জগৎ আমার থেকে অনেক আলাদা। তবে আমি তাঁর থেকেও শিখেছি।

দেবোরা: জন শেভারের লেখা বর্তমানে আপনি অনুবাদ করছেন। কেন শেভার?

মুরাকামি: কেন শেভার? আমি বহু বছর ধরে তাঁর ছোটোগল্পগুলি আনন্দের সঙ্গে পড়ে আসছি। তবে শেভার জাপানে জনপ্রিয় নন। এখানে খুব কম লোকই তাঁর লেখা পড়েছে। কারণ, তাঁর শৈলী ভীষণ আমেরিকাপন্থী। আমার ধারণা, উনিশশো পঞ্চাশের দশক এবং এর মাঝামাঝি সময় আর মধ্যবিত্ত শ্রেণিই শুধু তাঁর লেখার উপজীব্য। আমি মনে করি না বেশি জাপানি পাঠক তাঁর লেখা পছন্দ করবে। তবে লেখাগুলো আমি খুবই ভালোবাসি। তাই এটি একধরনের চ্যালেঞ্জ।

দেবোরা: আপনি অন্য লেখকদের থেকে যা যা শেখেন সেগুলি আপনার লেখায় প্রবেশ করলে আপনি বুঝতে পারেন?

মুরাকামি: আমার মনে হয় একটু প্রভাব তো আছেই। আমি যখন লিখতে শুরু করি আমার কোনো পরামর্শদাতা ছিল না। আমার কোনো শিক্ষক ছিল না। আমার কোনো সাহিত্যিক বন্ধু ছিল না। আমার শুধু আমি ছিলাম। তাই আমাকে বই থেকে অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। ছোটোবেলায় আমি বই পড়তে পছন্দ করতাম। বাড়িতে আমি একমাত্র সন্তান ছিলাম। আমার কোনো ভাই বা বোন ছিল না। অবশ্যই আমার কাছে বই এবং বিড়াল ছিল। সংগীত তো অবশ্যই ছিল। আমি খেলাধুলা পছন্দ করতাম না, পড়তে পছন্দ করতাম। কৈশোর বয়সে আমি রাশিয়ান উপন্যাস পড়ি। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয় আমার প্রিয় ছিল। আর এদের বইগুলি থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এমন অনেক সহপাঠী ছিল যারা লেখক হতে চেয়েছিল। তবে আমি বিশ্বাস করতাম না যে, আমার প্রতিভা আছে। তাই আমি একটি জ্যাজ ক্লাব খুলি আর সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি।

দেবোরা: আপনি নিজে কখনো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছিলেন?

মুরাকামি: ছোটোবেলায় আমি পিয়ানো বাজাতাম। তবে এতে আমার বিশেষ প্রতিভা ছিল না। আমার বয়স যখন পনেরো বছর তখন আর্ট ব্লেকি এবং জ্যাজ মাসেঞ্জাররা জাপানে এসেছিলেন। সেই কনসার্টে আমি গিয়েছিলাম। এর আগে আমি জানতাম না, জ্যাজ কী, তবে সেই রাত থেকেই আমি একজন উৎসাহী জ্যাজ ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। আমি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে রেকর্ড সংগ্রহ করে গেছি। আমার স্ত্রী সবসময় অভিযোগ করত। আমার বাড়িতে কত যে জ্যাজ রেকর্ড রয়েছে! তবে আমি লেখার বিষয়ে সংগীত থেকেও অনেক কিছু শিখেছি। আমি মনে করি এতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে, ছন্দ, সাংগীতিক ঐকতান আর তাৎক্ষণিক উন্নতিকরণ। আমি সাহিত্য থেকে নয়, সংগীত থেকে এই জিনিসগুলি শিখেছি। এবং যখন আমি লিখতে শুরু করি তখন ভাবটা এমন থাকে যেন আমি গান বাজনা করি।

দেবোরা: আপনার মা-বাবা দু-জনেই সাহিত্যের শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁরা কি আপনার লেখার সিদ্ধান্ত বিষয়ে খুশি হয়েছিলেন? তাঁরা কি আপনাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে বলেছিলেন?

মুরাকামি: তা আমি মনে করি না। আমি জানি না তারা আমার কাছ থেকে কী আশা করেছিল।

দেবোরা: শেষবার আমরা যখন কথা বলেছিলাম আপনি বলেছিলেন, ৯/১১ বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। কেবল আসল পৃথিবীকেই নয়, আপনি যে পৃথিবী নিয়ে লিখতে চান সেখানেও এই সংকটগুলি প্রভাব ফেলেছিল মনে হয়। আপনি কি মনে করেন যে, জাপানের সুনামি এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের মতো ঘটনাগুলি আপনার কল্পকাহিনিগুলোকে বদলে দিয়েছে?

মুরাকামি: হ্যাঁ। ১৯৯৯ সালে কোবে ভূমিকম্পের পর আমি ‘আফটার কোয়েক’ নামে ছোটোগল্পের একটি সংকলন লিখেছিলাম। আমার মা-বাবার ঘর-সহ পুরো কোবে শহরটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন ম্যাসাচুসেটসে ছিলাম। তারপর চার বছর কাটিয়েছি যুক্তরাজ্যে। বলতে গেলে তখন আমি একপ্রকার প্রবাসীই হয়ে পড়েছিলাম। তবে টিভিতে দেখেছিলাম দৃশ্যগুলো। ঔপন্যাসিক হিসেবে তখন আমি ভাবছিলাম, এই ভূমিকম্প বিষয়ে আমি কী করতে পারতে পারি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যা করতে পারি তা হল ভূমিকম্পের সময়টায় ঠিক কী হয়েছিল তা শুধু কল্পনা করতে। তাই এটা আমার কাছে কল্পনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি যখন কোনো উপন্যাস লিখি তখন গবেষণা করি না। কারণ, কল্পনা আমার সম্পদ, আমার উপহার। আমি এটি পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাই। ওই একই বছর, এর দুই মাস পরে টোকিওর একটি পাতাল রেল ট্রেনে সারিন-গ্যাস দ্বারা আক্রমণ হয়েছিল। আমি তখন জাপানে ছিলাম না। আমি খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনে এই বিষয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি যা পড়তে চেয়েছিলাম তা ওই লেখায় পাইনি। আমি জানতে চেয়েছিলাম সত্যি কী ঘটেছিল সেদিন ওই ট্রেনে। ভরতি ট্রেনে গ্যাসের গন্ধ নেওয়ার মতো বাস্তব অবস্থাটা আমি জানতে চেয়েছিলাম। তাই আমি নিজের মতো এই জিনিসগুলি খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি সারিন-গ্যাসে ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি এবং তাদের প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছি আসল ঘটনা। তারা আমাকে বলে আসলে কী ঘটেছিল। আমি এই বিষয়গুলি নিয়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ নামে একটি প্রবন্ধধর্মী বই প্রকাশ করি। অন্য কেউ এটা করেনি বলে আমাকেই এটা করতে হয়েছে। তাছাড়া আমার নিজস্ব জিজ্ঞাস্য আর কৌতূহলও ছিল। এই সাক্ষাৎকারগুলি নিতে আমার একবছর সময় লেগেছিল। আমি মনে করি ওই একবছর আমাকে বদলে দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাটা ছিল দারুণ। সেই একবছর আমি কিছুই লিখিনি। আমি কেবল সেই কণ্ঠস্বরগুলো শুনেছি। সেগুলি এখনও আমার মনের মধ্যে আছে। আমি সেই শুদ্ধ স্বরগুলোকে বিশ্বাস করি। ট্রেনে চড়া মানুষগুলো ছিল সাধারণ মানুষ। তারা টোকিয়োর এক সকালে ট্রেনে চড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই কেউ সারিন গ্যাসে ভরতি প্লাস্টিকের ড্রাম দ্বারা আক্রমণ করে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা যায়। পরিস্থিতি ছিল এমনই অতিবাস্তবিক। তবে তাদের কণ্ঠস্বর ছিল সাধারণ। আউম শিনরিকো সম্প্রদায়ের মানুষেরা (যারা আক্রমণ করেছিল) সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাঁরা হয়তো এর মাধ্যমে একরকম সত্য বা পরম সত্যের সন্ধান করছিলেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তরা সাধারণ যাত্রী ছিলেন। আমি শিনরিকো সম্প্রদায়ের মানুষদেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁদের কথা আমার মনে ধরেনি।

দেবোরা: গ্যাস আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় আপনি কঠিন সত্যের খোঁজ করেছিলেন, কিন্তু ভূমিকম্পের কথা বলতে গিয়ে আপনি কেন আংশিক কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন?

মুরাকামি: কারণ, কোবে আমার নিজের শহর এবং ঘটনাটা খুবই বেদনার। সেখানে আমার অনেক বন্ধু আছে। আমি যদি এই লোকগুলির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতাম তবে আমি খুব হতাশ হয়ে পড়তাম। কিন্তু কাহিনিতে আমি আমার নিজস্ব জগৎ তৈরি করতে পারি। তাই এটি আমার পক্ষে সহজতর ছিল। সহিংসতা আপনার মন আর শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছুর বিনাশ হয়ে যেতে পারে এর ফলে। ভূমিকম্পের আগে আমরা ভেবেছিলাম ভূমিস্তর খুব শক্তপোক্ত। কিন্তু এখন আর তা নেই। এটা হয়ে উঠতে পারে অস্থির, অনির্দিষ্ট, নরম। আমি হয়তো এটাই লিখতে চেয়েছিলাম।

এরপর ৯/১১, সুনামি-সহ আরও অনেক বিপর্যয় ঘটেছিল। আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বিপর্যস্ত মানুষগুলির জন্য আমি কী করতে পারি। উত্তরটা এইরকম যে, আমি শুধু পারি ভালো সাহিত্য রচনা করতে। কারণ, আমি যখন একটি ভালো গল্প লিখি তখন আমরা একে অন্যকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। আপনি যদি পাঠক হন আমি একজন লেখক। আমি আপনাকে চিনি না। তবে সাহিত্যের অন্তর্জগতে আমাদের মধ্যে এক গোপন যোগাযোগের পথ রয়েছে। আমরা অবচেতন পথে একজন অন্যকে বার্তা পাঠাতে পারি। এইভাবে আমি মনে করি অবদান রাখতে পারি।

দেবোরা: আপনি লেখার মাধ্যমে বার্তা পাঠান। কিন্তু আপনি নিজে বার্তা ফিরে পান কী করে?

মুরাকামি: আমি জানি না। একটি উপায় হয়তো আমরা বের করতে পারব।

দেবোরা: ‘কাফকা অন দ্য শোর’ উপন্যাসটি প্রকাশের পর আপনার ওয়েবসাইটে বইটি সম্পর্কে পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। আপনি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছিলেন। আপনি কেন এটা করলেন? শুধু এই বই নিয়ে কেন?

মুরাকামি: আমি পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে উৎসুক ছিলাম (২০১৫ সালেও এইরকম করেছিলাম)। সীমিত সময়ের জন্য ছিল এই ব্যবস্থা। তবে আমি অনেকগুলো মেইল পেয়েছিলাম। আমার মনে নেই কতগুলো। ত্রিশ হাজার হবে সম্ভবত। তবে আমি সেগুলো পড়েছি এবং চোখের ক্ষতি করেছি। আমি সম্ভবত তিন হাজারের উত্তর দিয়েছি। খুব পরিশ্রমের ছিল ব্যাপারটা। তবে আমার মনে হয় আমি এটা জানতে পেরেছি যে, কী ধরনের পাঠক আমার বই পড়ছে। এবং আমার লেখা সম্পর্কে তারা কী ভাবছে সে সম্পর্কে আমি একটা অস্পষ্ট ধারণা পেয়েছি। তাদের মধ্যে কিছু বোকা বোকা প্রশ্নও ছিল। একজন আমাকে স্কুইডের কর্ষিকা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। স্কুইডের দশটি কর্ষিকা রয়েছে এবং সে জানতে চেয়েছিল তাদের হাত পা আছে কিনা। তিনি কেন সে এইরকম প্রশ্ন করলেন? আমি উত্তর দিয়েছিলাম এইভাবে: স্কুইডের বিছানার পাশে আপনি দশটা গ্লাভ অথবা দশটা মোজা রেখে দিন। সে যখন জেগে উঠবে তখন হয় গ্লাভ নয়তো মোজা বেছে নেবে। এইভাবে আপনি আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন। আমি অবশ্য জানি না স্কুইড বিছানায় ঘুমায় কিনা। তবে আমি বেশিরভাগ প্রশ্নই উপভোগ করেছিলাম।

দেবোরা: এটা ছিল পাঠকদের সংস্পর্শে থাকার একটা উপায়। আমি জানি যে আপনি জাপানে কোনো অনুষ্ঠান বা সেখানে কথাবার্তা বলতে পছন্দ করেন না। কেন এমন?

মুরাকামি: আমি একজন লেখক। এবং আমার কাছে লেখাই একমাত্র কাজ। আমি একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, লেখালেখি ছাড়া আমি আর কিছুই করব না। তবে সম্প্রতি আমি ডিস্ক-জকির কাজ করছি। টোকিয়োর একটি এফএম রেডিয়ো স্টেশন থেকে আমাকে ডিস্ক-জকির কাজ করতে বলা হয়েছিল। আমি এখন ওই কাজটি করছি।

শেষ পাতা

Categories
অনুবাদ উৎসব সংখ্যা ২০২০ সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

দেবোরা: আপনি বলেছেন যে আপনার প্রথম বই দু-টি লেখা খুব সহজ ছিল। তারপর লেখা কঠিন হয়ে পড়ে। আপনি কীরকম সমস্যার সম্মুখীন হন?

মুরাকামি: আমার প্রথম দুটো বই ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’, ‘পিনবল ১৯৭৩’ লিখতে আমার সহজ মনে হয়েছিল। কিন্তু বইগুলো নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। এ-দুটো লেখার পর আমি উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠি। তারপর আমি লিখেছিলাম, ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’, আমার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের উপন্যাস (অন্য দু-টি উপন্যাসিকার মতো ছিল)। এটি লিখতে আমার তিন-চার বছরের মতো সময় লেগেছিল। আমার ধারণা, ওই প্রস্রবনের জন্য আমাকে সত্যি একটা গর্ত খুঁড়তে হয়েছিল। সুতরাং, আমি মনে করি ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ আমার কেরিয়ারের প্রকৃত সূচনাবিন্দু ছিল। প্রথম তিন বছর আমি জ্যাজ ক্লাবের মালিক হিসেবে কাজ করার সময় লিখেছিলাম। রাত দুটোয় ক্লাবের কাজ শেষ করে রান্না ঘরের টেবিলে লিখতে বসে যেতাম। এটা ছিল আমার পক্ষে খুব কষ্টের। প্রথম দুটো বইয়ের পর আমি সিদ্ধান্ত নেই যে ক্লাব বিক্রি করে দেব এবং পূর্ণ সময়ের লেখক হব। কিন্তু ক্লাবটি তখন ভালোই চলছিল এবং সবাই আমাকে ওটা বিক্রি করতে বারণ করেছিল। তারপরে আমি লিখতে পারলাম ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’। আমি এই ধরনের একটি বড়ো বই লিখতে চেয়েছিলাম।

দেবোরা: বড়ো বই লেখা সহজ ছিল, না আরও চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে উঠেছিল?

মুরাকামি: আমি যখন ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ লিখছিলাম তখন আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। কারণ, আমি জানতাম না যে এর পরে কী ঘটবে। পরবর্তী ঘটনা জানার জন্য আমি পরের দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম না। আমি পরের পৃষ্ঠাগুলি ওলটাতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরে কোনো পৃষ্ঠা ছিল না, তাদেরকে আমায় লিখতে হয়েছিল।

দেবোরা: আপনার কি এমন কখনো হয়েছে যে, পরে কী ঘটবে তা আপনার অজানা ছিল এবং সেদিন আর লিখতে পারেননি?

মুরাকামি: আমি কখনো রাইটার্স ব্লক অনুভব করিনি। একবার আমি ডেস্কে বসতে পারলে জানি যে পরে কী ঘটবে। আমি লিখতে না চাইলে লিখি না। পত্রিকা সবসময় আমাকে কিছু না কিছু লিখতে বলে এবং আমি প্রতিবারই ‘না’ বলে দেই। আমি যখন লিখতে চাই তখনই লিখি।

দেবোরা: আপনি কি মনে করেন আপনার ঘুমের মধ্যেও প্লটগুলি সক্রিয় থাকে?

মুরাকামি: না, এটা মনে করি না। আমি স্বপ্ন দেখি না। গল্প লেখা আর স্বপ্ন দেখা আলাদা জিনিস। আর আমার কাছে লেখা স্বপ্ন দেখার মতোই। আমি যখন লিখি তখন ইচ্ছা করে স্বপ্ন দেখতে পারি। শুরু করতে পারি আবার থামতেও পারি। এমনকী পরের দিনও সেটা চালিয়ে নিতে পারি। আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হয়তো একটি ভালো মাংসের খাবার, একটি ভালো বিয়ার বা একটি সুন্দর মেয়ের স্বপ্ন দেখেন এবং যখন জেগে ওঠেন তখন সব শেষ হয়ে যায়। আমি কিন্তু পরের দিন সেটা চালিয়ে নিতে পারি।

দেবোরা: কয়েক বছর আগে আপনি বলেছিলেন যে, আপনি যখন কোনো উপন্যাস লেখেন তখন কিছু ধারণা বা বাক্যাংশের একটি তালিকা তৈরি করে নেন, যেমন, ‘কথাবলা বানর’ বা ‘সিঁড়িতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া লোক’ প্রভৃতি। আপনি যখন লিখতে বসেন, আপনি বলেছিলেন “প্রতিটা গল্পে অবশ্যই এই তালিকা থেকে দুই বা তিনটি জিনিস থাকতে হবে”। আপনি কি প্রায়শই এভাবে কাজ লেখালেখি করেন?

মুরাকামি: আমি তখন এক সময়ে ছয়টি গল্প লিখেছিলাম। তাই ওই লেখাগুলির সাহায্য নিতে হয়েছিল। উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটা দরকার হয় না। আমার চেষ্টা থাকে প্রতিবার নতুন কিছু করা। আমার বেশিরভাগ বই আমি প্রথম পুরুষে লিখেছিলাম। ‘১৯৮৪’ (1Q84)-তে আমি তিনটি চরিত্র প্রথম পুরুষে লিখেছি। এটা আমার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রায়শই আমার গল্পের কথক প্রধান চরিত্রটি এমন একজন ব্যক্তিতে পরিণত হয় যে কিনা আমি হতে পারতাম। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সেটা হয় না। পরিবর্তে পরিণত হয় আমার একধরনের বিকল্পে। অবশ্যই বাস্তবে আমি নিজে অন্য মানুষে পরিণত হতে পারি না। তবে সাহিত্যে আমি যে কেউ হতে পারি। আমি অন্যের জুতোতে পা রাখতে পারি। একে একধরনের থেরাপি বলতে পারেন। আপনি যদি লিখতে পারেন তবে আপনার মধ্যে এমন এক সম্ভাবনা তৈরি হবে যে আপনি স্থির থাকতে পারবেন না, অন্য যে-কেউ হয়ে যেতে পারেন।

দেবোরা: আপনি যখন লিখতে শুরু করেছিলেন সেই একই সময়ে আপনি দৌড়ানোও শুরু করেন। আমি জানি কিছু মানুষ চলতে চলতে আপন মনে লিখতে পছন্দ করেন। হাঁটার ছন্দ তাদের এই কাজে সাহায্য করে। আপনি দৌড়ানোর সময় কখনো লেখার কথা ভেবেছেন?

মুরাকামি: একদম না। আমি দৌড়ানোর সময় শুধু দৌড়াই। তখন আমি মনকে খালি রাখি। দৌড়ানোর সময় আমি কী ভাবি সেই সম্পর্কে আমার কোনো পরিকল্পনা থাকে না। হয়তো কিছুই ভাবি না। তবে আপনি অবশ্যই জানেন যে দীর্ঘ সময় ধরে লিখতে গেলে আপনাকে দৃঢ় হতে হবে। একটি বই লিখে ফেলা এমনিতে কঠিন নয়, তবে অনেক বছর ধরে লেখা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আপনার একাগ্রতা আর সহনশীলতার শক্তি প্রয়োজন। আমি মাঝে মাঝে খুব আস্বাস্থ্যকর আর অদ্ভুত জিনিস লিখি। আমি মনে করি আপনি অস্বাস্থ্যকর জিনিস লিখতে চাইলে আপনাকে খুব স্বাস্থ্যবান হতে হবে। এটি একটি প্যারাডক্স, তবে সত্যি। বোদল্যেরের মতো কিছু লেখক খুব অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেছিলেন। তবে আমার মতে সেই দিন আর নেই। এখনকার বিশ্ব খুব কঠোর আর জটিল। এগুলো কাটিয়ে উঠে বেঁচে থাকতে হলে আপনাকে শক্তপোক্ত হতে হবে। আমি যখন তিরিশ বছর বয়সী তখন আমি লেখা শুরু করেছি। আমার যখন বত্রিশ বা তেত্রিশ বছর বয়স তখন দৌড়তে শুরু করি। আমি প্রতিদিন দৌড়ানো শুরু করলাম। কারণ, এর ফলে কী হয় তা আমি দেখতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয় জীবন একধরনের পরীক্ষাগার, যেখানে আপনি যা কিছু করতে পারেন। এবং শেষ পর্যন্ত এটি আমার পক্ষে লাভদায়ক হয়ে উঠেছিল। আমার শরীর এতে দৃঢ় হয়ে উঠেছিল।

দেবোরা: লেখা দৌড়ানোর মতো একটি নির্জন সাধনা। আপনি একটি জ্যাজ ক্লাবের মালিকের জীবন থেকে লেখায় চলে এসেছিলেন। সেখানে সবসময় আপনার চারপাশে লোকেরা ভিড় করে থাকত। কিন্তু তারপর লেখা আর পড়াশুনায় একদম একা হয়ে থাকতে কি আপনার ভালো লাগত?

মুরাকামি: আমি খুব একটা সামাজিক জীব নই। আমি প্রচুর রেকর্ড এবং সম্ভবত বিড়ালদের সাথে শান্ত জায়গায় একা থাকতে চাই। আর বেসবল খেলা দেখার জন্য কেবল টিভি। ব্যাস, আমি এইটুকুই চাই।

দেবোরা: আপনি একবার বলেছিলেন যে, আপনার জীবনের স্বপ্ন ছিল কূপের তলদেশে বসা। আপনার বেশ কয়েকটি চরিত্র ঠিক তেমনটি করেছে। ‘কিলিং কমেন্ডেটোর’-এ মেনশিকিও এমন করেছে। কেন?

মুরাকামি: আমি কূপ খুব পছন্দ করি। আমি ফ্রিজ, হাতি এমন অনেক জিনিস পছন্দ করি। আমি যা পছন্দ করি সে-সম্পর্কে লিখে খুব আনন্দ পাই। আমি যখন ছোটো ছিলাম তখন আমাদের বাড়িতে একটি কূপ ছিল এবং আমি সবসময় সেই কূপটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তাতে আমার কল্পনাশক্তি বেড়ে গিয়েছিল। শুকনো কূপে পড়ে যাওয়া নিয়ে রেমন্ড কার্ভারের একটি ছোটোগল্প আছে। আমি সেই গল্পটি খুব পছন্দ করি।

দেবোরা: আপনি কখনো কোনো কূপের নীচে যাবার চেষ্টা করেছেন?

মুরাকামি: না না। এটা বিপজ্জনক। এটা আমার কল্পনায় ঘটে। তবে আমি গুহাও পছন্দ করি। আমি যখন বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ করি, তখন যদি কোনো গুহা দেখি আমি তার মধ্যে প্রবেশ করি। উঁচু স্থান আমার পছন্দ হয় না।

দেবোরা: আপনি উপরে না উঠে নীচে যেতে চান?

মুরাকামি: কেউ বলে এটা অবচেতন মনের একধরনের রূপক। তবে আমি ভূ-গর্ভস্থ বিশ্ব সম্পর্কে খুবই আগ্রহী।

দেবোরা: কয়েক বছর আগে প্যারিস রিভিউ সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন যে, আপনার গল্পের চালিকাশক্তি হল “হারিয়ে যাওয়া এবং অনুসন্ধান এবং খুঁজতে থাকা”। আপনি কি এখনও এতে বিশ্বাস করেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। হারানো কিছুর সন্ধান করা আমার সাহিত্যের খুব গুরুত্বপূর্ণ থিম। আমার চরিত্রগুলো প্রায়শই হারিয়ে গেছে এমন কিছুর সন্ধান করে থাকে। কখনো একটি মেয়ে, কখনো একটি কারণ, কখনো বা এটি একটি উদ্দেশ্য। কিন্তু তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু খোঁজে, যা হারিয়ে গিয়েছিল। তবে সেটা খুঁজে পেলে একরকম হতাশা সৃষ্টি হবে। কেন তা আমি জানি না, তবে কোনো কিছুর অনুসন্ধান আমার গল্পের একধরনের মোটিফ। যদিও এটা কোনো আনন্দদায়ক সমাপ্তি নয়।

দেবোরা: প্রায়শই আপনি যে-পুরুষদের সম্পর্কে লেখেন তারা আবেগগতভাবে বা অস্তিত্বহীন হয়ে কোনোরকমভাবে হারিয়ে যায়। এগুলো পৃথিবীতে খুব একটা হয় বলে মনে হয় না।

মুরাকামি: আপনি অবশ্যই জানেন যে, গল্পের মূল চরিত্র যদি সুখী হয় তবে কোনো গল্প তৈরির সম্ভাবনা থাকে না।

দেবোরা: আপনার উপন্যাসগুলি সাধারণত একটি রহস্যের চারদিকে ঘোরে। কখনো আপনি সেই রহস্যটি সমাধান করেন এবং কখনো সমাধান না করে ছেড়ে দেন। আপনি কি পাঠকদের জন্য বিষয়গুলি উন্মুক্ত রাখতে চান, না আপনি নিজে সমাধান বিষয়ে নিশ্চিত থাকেন না?

মুরাকামি: আমি যখন কোনো বই প্রকাশ করি মাঝে মাঝে আমার বন্ধুরা ফোন করে জিজ্ঞাসা করে, “এর পরে কী হবে?” আমি বলি, “এখানেই শেষ”। তবে পাঠকেরা এর সিক্যুয়েল আশা করে। ‘১৯৮৪’ (1Q84) প্রকাশিত হবার পর গল্পের পরবর্তীতে কী ঘটবে তার সমস্ত কিছুই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আমি একটি সিক্যুয়েল লিখতে পারতাম কিন্তু লিখিনি। আমি ভেবেছিলাম এটি ‘জুরাসিক পার্ক ৪’ বা ‘ডাই হার্ড ৮’-এর মতো হতে পারে। তাই আমি সেই গল্পটি কেবল আমার মনের মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম এবং এটি আমি খুব উপভোগ করেছি।

দেবোরা: আপনি কি মনে করেন সেটা কখনো লিখবেন?

মুরাকামি: আমি তা মনে করি না। আমি শুধু জানি এটি আমার মনের মধ্যে থাকবে। তেঙ্গোর ষোলো বছরের মেয়ে সিক্যুয়েলের মূল চরিত্র হবে, এটি খুব আকর্ষণীয় গল্প।

দেবোরা: তারপরেও এটা কোনো ‘ডাই হার্ড ৮’ নয়!

মুরাকামি: এবং সেই বইয়ের একটি প্রিক্যুয়েল রয়েছে।

দেবোরা: শুধু আপনার মনের মধ্যে?

মুরাকামি: হ্যাঁ।

দেবোরা: কিছু লেখক প্রতিটি বইয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। এবং কিছু লেখক যে পদ্ধতি তার পক্ষে সবচেয়ে ভালো হবে সেটাই চেষ্টা করেন। আপনি কোনটির পক্ষে?

মুরাকামি: কাজুয়ো ইশিগুরোর লেখা আমি পছন্দ করি। সে আমার বন্ধু। যতবারই সে নতুন বই প্রকাশ করে সেটি আগের থেকে আলাদা হয়। এটি খুব আকর্ষণীয় বিষয়। তবে আমার পক্ষে থিম আর মোটিফগুলো এত আলাদা নয়। আমি সিক্যুয়েল লিখতে পছন্দ করি না। তবে বইগুলির পরিমণ্ডল একে-অপরের চেয়ে আলাদা নয়। আমি শুধু একজন ব্যক্তি এবং আমার নির্দিষ্ট উপায় আছে বলে মনে করি। এটা আমি পরিবর্তন করতে পারি না। তবে আমি একই জিনিস বারবার লিখতে চাই না।

দেবোরা: আপনার নিজস্ব শৈলীতে প্রায়শই জটিল বা গভীর কল্পনা থাকে কিন্তু লেখা সেরকম হয় না। বাক্যগুলি বেশ সহজ এবং হালকা। এই বৈপরীত্য কি উদ্দেশ্যমূলক?

মুরাকামি: অনেক লেখক জটিল জটিলতর স্টাইলে তুচ্ছ অগভীর জিনিস লেখেন। আমি চাই কঠিন ও জটিল জিনিসগুলি খুব সহজ শৈলীতে লিখতে, যা পড়া সহজতর এবং আরামদায়ক। এই কঠিন জিনিসগুলি লিখতে গেলে আপনাকে আরও গভীর আর গভীরতর হতে হবে। সুতরাং চল্লিশ বছর ধরে লিখতে লিখতে আমি তার জন্য একটি কৌশল তৈরি করেছি। এটি একটি শারীরিক কৌশলের মতো, কোনো বৌদ্ধিক কৌশল নয়। আমি মনে করি আপনি যদি কোনো কথাসাহিত্যিক হন এবং আপনি যদি খুব বুদ্ধিমান হন তবে আপনি লিখতে পারবেন না। আপনি যদি নির্বোধ হন তাহলেও লিখতে পারবেন না। এর মধ্য থেকে আপনাকে একটা অবস্থান খুঁজে নিতে হবে। এটা খুব কঠিন।

দেবোরা: আপনি কি মনে করেন আপনার লিখনশৈলী অনুবাদে ধরা পড়েছে?

মুরাকামি: হ্যাঁ। কেন জানি না, তবে যখন আমি আমার বইগুলি ইংরেজিতে পড়ি তখন আমার মনে হয়, ওহ্‌, এ তো আমিই! ছন্দ, গদ্যশৈলী একই— প্রায় একই।

দেবোরা: আপনি নিজেই একজন অনুবাদক। আপনি এফ. স্কট ফিটজগারেল্ড, ট্রুম্যান কাপোতে, রেমন্ড চ্যান্ডলার এবং অন্যন্যদের লেখা জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এখন আপনি অনুবাদ করছেন জন শেভারের লেখা। লেখকদের কোন দিকগুলি আপনাকে অনুবাদে প্রণোদিত করে?

মুরাকামি: এটি বলা সহজ। আমি যা পড়তে চাই তা অনুবাদ করি। আমি রেমন্ড চ্যান্ডলারের সমস্ত উপন্যাস অনুবাদ করেছি। আমি তাঁর স্টাইলটি পছন্দ করি। আমি পাঁচ বা ছয়বার ‘দ্য লং গুডবাই’ পড়েছি।

তৃতীয় পাতা

Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ সাক্ষাৎকার

হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

[২০০৮ এবং ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘দি নিউ ইয়র্কার ফেস্টিভ্যাল’-এ হারুকি মুরাকামির সঙ্গে কথপোকথন থেকে এই সাক্ষাৎকার সংকলিত। ‘দি নিউ ইয়র্কার’-এর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দেবোরা স্টেইনম্যান।]

মুরাকামি: আমি যখন দশ বছর আগে শেষবারের মতো সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম এবং এই দশ বছরে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। যেমন, এই দশ বছরে আমি দশ বছর বড়ো হয়েছি। এটা খুব গুরুতপূর্ণ বিষয়, অন্তত আমার কাছে। দিনের পর দিন আমি বয়স্ক হয়ে উঠছি আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজেকে কৈশোরের দিনগুলো থেকে অন্যরকম মনে হচ্ছে। আজকাল আমি ভদ্রলোক হবার চেষ্টা করছি। আপনি জানেন যে, ভদ্রলোক এবং ঔপন্যাসিক একইসঙ্গে হওয়া সহজ নয়। একজন রাজনীতিবিদের একইসঙ্গে ওবামা এবং ট্রাম্প হবার চেষ্টা করার মতো। তবে আমার কাছে ভদ্রলোক ঔপন্যাসিকের সংজ্ঞা আছে। প্রথমত, তিনি যে আয়কর দিয়েছেন সেই বিষয়ে কথা বলেন না। দ্বিতীয়ত, তিনি তাঁর প্রাক্তন বান্ধবী বা প্রাক্তন স্ত্রী সম্পর্কে লেখেন না। এবং তৃতীয়ত, তিনি সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ সম্পর্কে ভাবেন না। সুতরাং, দেবোরা, দয়া করে আমাকে এই তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন না। আমি সমস্যায় পড়ে যাব।

দেবোরা: আপনি আমার প্রশ্নভাণ্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন। আসলে আমি আপনার অতি সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘কিলিং কমেন্ডোটোর’ দিয়ে শুরু করতে চেয়েছিলাম। বইটি এমন এক ব্যক্তির বিষয়ে, যার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। সে এক পুরোনো চিত্রশিল্পীর বাড়িতে থাকা শুরু করে। সে যখন সেই বাড়িতে গিয়ে থাকা শুরু করল তখন অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। এর মধ্যে একটা হল কিছুটা কূপের মতো দেখতে একটি গর্তের দেখা পাওয়া। আমি ভাবছি আপনি কীভাবে উপন্যাসের এই ভিত্তিটি নির্মাণ করলেন?

মুরাকামি: আপনি জানেন যে এটি একটি বড়ো বই এবং এটা লিখতে আমার দেড় বছর বা তার বেশি সময় লেগেছিল। তবে এটি শুরু হয়েছিল একটি বা দু-টি অনুচ্ছেদ দিয়ে। আমি সেই অনুচ্ছেদগুলো লিখে আমার ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম এবং একসময় ভুলেও গিয়েছিলাম। তারপর, সম্ভবত তিন বা ছয় মাস পরে আমার ধারণা হয় যে, আমি ওই অনুচ্ছেদ্গুলো দিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে পারি। তারপর আমি লিখতে শুরু করি। আমার কোনো পরিকল্পনা বা প্লটও ছিল না। তারপর গল্পটি আমাকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেল। যদি আপনার কোনো পরিকল্পনা থাকে, আপনি শুরু করার সময়ে যদি পরিণতি জানেন, উপন্যাস লিখে কোনো আনন্দ নেই। আপনি হয়তো জানেন, কোনো চিত্রশিল্পী চিত্রকর্ম শুরু করার আগে রূপরেখা এঁকে নেয়, তবে আমি তা করি না। আমার কাছে আছে একটি সাদা ক্যানভাস এবং একটি ব্রাশ। তাই দিয়ে আমি ছবি আঁকি।

দেবোরা: উপন্যাসটিতে একটি চরিত্র বা ধারণা আছে, যা মোজার্টের অপেরা ‘ডন জিওভান্নি’ থেকে গড়ে উঠেছে। এই ধারণা বা চরিত্রটি বইয়ের কেন্দ্রে থাকার কারণ কী?

মুরাকামি: সাধারণত আমি আমার বইগুলি শিরোনাম দিয়ে শুরু করি। এই ক্ষেত্রে ‘কিলিং কমেন্ডেটোর’ শিরোনাম আর প্রথম অনুচ্ছেদটা নিয়ে আমি ভাবলাম যে এগুলি দিয়ে আমি কী ধরনের গল্প লিখতে পারি! জাপানে ‘কমেন্ডেটোর’ বলে কোনো কিছু নেই। তবে আমি এই শিরোনামটির অদ্ভুতুরে মেজাজটি অনুভব করে মনে মনে পুলকিত হয়েছি।

দেবোরা: আপনার কাছে ‘ডন জিওভান্নি’ অপেরা কি গুরুত্বপূর্ণ?

মুরাকামি: চরিত্র আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি সাধারণত মডেল ব্যবহার করি না। আমার কেরিয়ারে একবার মাত্র একটি চরিত্রের জন্য মডেল ব্যবহার করেছি। লোকটি খারাপ ছিল এবং তাকে আমি বেশি পছন্দ করতাম না। ওই লোকটি সম্পর্কে আমি লিখতে চেয়েছিলাম। তবে মাত্র একবার। আমার বইগুলির অন্য সমস্ত চরিত্র আমি শূন্য থেকে তৈরি করেছি। আমি কোনো চরিত্র তৈরি করার পরে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নড়াচড়া করতে থাকে এবং আমাকে তারপর তার চারপাশে ঘোরাফেরা করে তার সাথে কথা বলে যেতে হয়। একজন লেখক হিসেবে যখন আমি লিখি একইসঙ্গে আমার মনে হয় আমি কোনো আকর্ষণীয় বইও পড়ছি। এইভাবে আমি লেখাটি উপভোগ করি।

দেবোরা: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, বইটির মূল চরিত্র অপেরার পাশাপাশি অন্যান্য সংগীতও শোনে। প্রায়শই আপনার চরিত্রগুলি দেখি কোনো নির্দিষ্ট ব্যান্ড ও জোনারের সঙ্গীত শুনে থাকে। এগুলি কি আপনাকে লিখতে সাহায্য করে?

মুরাকামি: আমি লেখার সময় গান শুনি। সুতরাং সংগীত খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার লেখায় আসে। কী ধরনের সংগীত এটা নিয়ে আমি বেশি ভাবি না, তবে সংগীত আমার কাছে একধরনের খাদ্য। সংগীত আমাকে লেখার শক্তি যোগায়। তাই আমি প্রায়শই সংগীত সম্পর্কে লিখি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি আমার পছন্দের সংগীত সম্পর্কেই লিখি। আমার স্বাস্থ্যের পক্ষেও এটা মঙ্গলজনক।

দেবোরা: সংগীত কি আপনাকে সুস্থ রাখে?

মুরাকামি: হ্যাঁ, খুব। সংগীত এবং বিড়াল। তারা আমকে প্রচুর সাহায্য করেছে।

দেবোরা: আপনার কাছে কতগুলি বিড়াল আছে?

মুরাকামি: একটাও না। আমি প্রতিদিন সকালে আমার বাড়ির চারপাশে ঘুরতে গেলে তিন-চারটি বিড়াল দেখতে পাই, এরা আমার বন্ধু। আমি তাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়ি এবং তাদেরকে অভিবাদন জানাই। তারা আমার কাছে আসে। আমরা একে-অপরকে খুব ভালোভাবেই চিনি।

দেবোরা: যখন ‘নিউইয়র্কার’ ‘কিলিং কমেন্ডেটোর’-এর একটি অংশ প্রকাশ করেছে, আমি তখন আপনাকে আপনার কাজের অবাস্তব উপাদানগুলি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। আপনি বলেছিলেন, “আমি যখন উপন্যাস লিখি, বাস্তবতা আর অবাস্তবতা একসাথে মিশে যায়। এটা আমার পরিকল্পনা মাফিক নয় এবং লেখার সাথে সাথে আমি এটি অনুসরণ করি। তবে আমি যতই বাস্তবতাকে বাস্তবসম্মতভাবে লেখার চেষ্টা করি ততই অবাস্তব পৃথিবীর উদয় হয়। আমার কাছে উপন্যাস পার্টির মতো। যে-কেউ যোগ দিতে চাইলে দিতে পারেন। এবং যখনই তাঁরা চলে যেতে চাইবেন, যেতে পারেন”। সুতরাং আপনি কীভাবে এই পার্টিতে অতিথি এবং অন্যান্য বিষয়গুলোকে নিয়ে আসেন, অথবা আপনি যখন লিখছেন সেখানে কীভাবে এরা বাধাহীনভাবে আসতে পারে?

মুরাকামি: পাঠকেরা প্রায়শই আমাকে বলে থাকেন যে আমার কাজগুলিতে এমন একটা অবাস্তব জগৎ রয়েছে, যে-জগতে নায়ক অনায়াসেই যায় এবং আসল পৃথিবীতে ফিরেও আসে। তবে আমি সবসময় অবাস্তব বিশ্ব আর বাস্তববাদী বিশ্বের মধ্যে সীমারেখা দেখতে পাই না। সুতরাং, অনেক ক্ষেত্রে তারা মিশে গেছে। আমি মনে করি জাপানে এই অন্য বিশ্ব আমাদের বাস্তব জীবনের কাছাকাছি। এবং আমরা যদি সেই অন্য পৃথিবীতে যেতে চাই সেটা আমাদের পক্ষে অতটা কঠিন হয় না। আমার মনে হয় পশ্চিমা বিশ্বে এটা করা অত সহজ নয়, সেখানে অন্য বিশ্বে যেতে হলে আপনাকে কিছু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তবে জাপানে আপনি যেতে চাইলে সহজেই যেতে পারেন। সুতরাং, আমার গল্পগুলিতে, আপনি যদি কোনো কূপের নীচে যান, দেখতে পাবেন সেখানে একটা অন্য বিশ্ব আছে। এবং আপনি সেখানে দুই বিশ্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পাবেন না।

দেবোরা: অন্য দিকটা সাধারণত অন্ধকারের জায়গা, তাই তো?

মুরাকামি: না-ও হতে পারে। আমার মনে হয় এটা আগ্রহের ব্যাপার। আপনি যদি কোনো দরজার সন্ধান পান এবং সেটা যদি খুলতে সক্ষম হন তবে আপনি সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন। এটি কেবল আগ্রহ থেকেই হতে পারে। ভিতরে কী? সেখানে কী আছে? এই প্রশ্ন করা আমার প্রতিদিনের অভ্যাস। আমি যখন কোনো উপন্যাস লিখি তখন ভোর চারটের দিকে উঠে আমার ডেস্কে গিয়ে লেখা শুরু করি। বাস্তব বিশ্বে এটা ঘটে। আমি আসল কফি পান করি। কিন্তু একবার লেখা শুরু করলে আমি অন্য কোথাও চলে যাই। আমি দরজাটা খুলি, সেখানে যাই এবং সেখানে কী ঘটে দেখতে পাই। আমি জানি না বা জানতে চেষ্টা করি না, এটা বাস্তব না অবাস্তব। যতই আমি লেখার মধ্যে গভীরভাবে ডুবে যাই ততই সেখানে ওদ্ভুত কিছু দেখতে পাই। আমি স্বাভাবিকভাবেই তাদের দেখতে পাই বলে মনে হয়। সেখানে যদি কোনো অন্ধকারও থাকে তবে সেই অন্ধকারের কিছু বার্তা থাকে অবশ্যই। আমি সেই বার্তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। আমি সেই বিশ্বকে ঘুরে দেখি, তার বর্ণনা করি, শেষে আমি ফিরে আসি। এই ফিরে আসাটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি ফিরে আসতে না পারেন তবে ভয়ের ব্যাপার। তবে যেহেতু আমি পেশাদার, আমি ফিরে আসতে পারি।

দেবোরা: এবং আপনি ওই জিনিসগুলি সঙ্গে নিয়ে আসেন?

মুরাকামি: না। এটা ভীতিজনক হবে। আমি যেখানেই সব ছেড়ে দেই। আমি যখন লিখি না, আমি খুব সাধারণ মানুষ। প্রতিদিনের রুটিনটাকে আমি মেনে চলি। আমি খুব সকালে উঠি এবং বেসবল খেলা না থাকলে রাত ন-টার দিকে শুতে যাই। সঙ্গে থাকে আমার দৌড় এবং সাঁতার কাটা। আমি একজন সাধারণ মানুষ, সুতরাং রাস্তায় যখন আমি হেঁটে চলি তখন যদি কেউ বলে, “মিস্টার মুরাকামি, আপনার সাথে দেখা হয়ে খুব ভাল লাগল”, আমি বিব্রত বোধ করি। আমি এমন কিছু না। তাহলে কেন সে আমার সাথে দেখা হওয়ায় খুশি হল? তবে আমি যখন লেখার মধ্যে থাকি তখন অবশ্যই আমি একজন বিশেষ, অন্তত অদ্ভুত মানুষ।

দেবোরা: চল্লিশ বছর আগে, বেসবল খেলার মাঠে আপনি কীভাবে লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন, গল্পটি বহুবার বলেছিলেন। হঠাৎ আপনি ভেবেছিলেন, “আমি একটা উপন্যাস লিখতে পারি”। যদিও এর আগে আপনি লেখার চেষ্টাও করেননি। এবং আপনি আপনার স্মৃতি কথা, “হোয়াট আই টক আবউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং”-এ বলেন, “মনে হয়েছিল আকাশ থেকে কোনো কিছু নেমে এসেছিল এবং সেটা আমি হাতে পেয়েছি”। আমরা ধরে নিতে পারি ওই জিনিসটি ছিল আপনার লেখার ক্ষমতা। সেটা কোথা থেকে এসেছিল বলে আপনার মনে হয়? আর আপনি এত সাধারণ হলে কেন এটা আপনার কাছে এসেছিল?

মুরাকামি: সেটা একধরনের বোধোদয় ছিল বলে মনে হয়। আমি বেসবল পছন্দ করি এবং আমি প্রায়শই বলপার্কে যাই। ১৯৭৮ সালে ঊনত্রিশ বছর বয়সে আমি টোকিয়োর বেসবল পার্কে আমার প্রিয় দল ‘ইয়াকাল্ট স্যালোজ’ (Yakult Swallows)-এর খেলা দেখার জন্য গিয়েছিলাম। সেই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনটায় ছিল খেলার উদ্বোধন। আমি খেলাটি দেখছিলাম এবং প্রথম খেলোয়াড় একটি ডাবল মারল এবং সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম যে, আমি লিখতে পারি। তখন প্রচুর বিয়ার পান করেছিলাম বলে কিনা জানি না। তবে তখন আমার মনে হয়েছিল যেন আমার মধ্যে একধরনের বোধের উদয় হয়েছে। এর আগে আমি কিছু লিখিনি। আমি একটি জ্যাজ ক্লাবের মালিক হিসেবে সান্ডুইচ আর ককটেল তৈরিতে ব্যস্ত ছিলাম। আমি খুব ভালো সান্ডুইচ তৈরি করি। তবে সেই খেলার পরে আমি একটা ষ্টেশনারি দোকানে গিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনলাম এবং শুরু করলাম লেখা। তারপর আমি লেখক হয়ে যাই।

দেবোরা: সেটা চল্লিশ বছর আগে। সেই সময় লেখা আপনাকে কীভাবে বদলে দিল?

মুরাকামি: আমি অনেক বদলে গিয়েছিলাম। লেখা শুরু করার সময় আমি লিখতে জানতাম না। আমি খুব অদ্ভুত উপায়ে লিখেছিলাম। তবে পাঠক এটা পছন্দ করেছিল। এখন আমি আমার প্রথম বই ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’-এর জন্য তেমন একটা যত্ন নিই না। তখন আমি লেখা প্রকাশের উপযুক্ত ছিলাম না। বহুবছর আগে টোকিয়োর ট্রেনে বসে আমি একটি বই পড়ছিলাম এবং খুব সুন্দর একটি মেয়ে আমার কাছে এসে বলল, “আপনি মিস্টার মুরাকামি?” “হ্যাঁ, আমি মিস্টার মুরাকামি”। “আমি আপনার বইয়ের বড়ো ফ্যান”। “তোমাকে অনেক ধন্যবাদ”। “আমি আপনার সমস্ত বই পড়েছি এবং আমি সেগুলো খুব ভালোবাসি”। আমি ধন্যবাদ জানাই। তারপর সে বলেছিল, “আমি আপনার প্রথম বইটা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। ওটাই আমার কাছে সেরা”। “ওহ্‌, তুমি তাই মনে করো?” সে বলল, “আপনার লেখা এখন খারাপ হয়ে যাচ্ছে”। এইভাবে আমি সমালোচনায় অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। তবে আমার লেখা আগের থেকে খারাপ হয়ে যাচ্ছে তা মনে করি না। আমি মনে করি সময়ের সাথে সাথে আরও ভালো হচ্ছে আমার লেখা। চল্লিশ বছর ধরে আমি আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা করেছি এবং আমার বিশ্বাস যে, আমি সফল। ট্রেনের সেই মেয়েটি আমাকে জিন কুইল নামে এক জ্যাজ সংগীতকারের কথা মনে করায়। তিনি স্যাক্সোফোন বাজাতেন। উনিশ-শ পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকে বিখ্যাত ছিলেন। সেই সময় যে-কোনো স্যাক্সোফোন বাদকের মতো তিনিও চার্লি পার্কার দ্বারা খুব প্রভাবিত ছিলেন। একরাতে তিনি নিউ ইয়র্কের একটি জ্যাজ ক্লাবে বাজাচ্ছিলেন এবং যখন তিনি ব্যান্ডস্ট্যান্ড থেকে নামলেন তখন এক যুবক এসে বলল, “আরে, আপনি তো চার্লি পার্কারের মতো বাজাচ্ছেন!” জিন বললেন, “কী?” “আপনি চার্লি পার্কারের মতো বাজাচ্ছেন!” জিন তখন তাঁর অলটো সাক্সোফোন যন্ত্রটি তার কাছে তুলে বললেন, “এই যে, আপনি চার্লি পার্কারের মতো বাজিয়ে দেখান!” আমি মনে করি, এই গল্পটির তিনটি বিষয় আছে— এক, কারো সমালোচনা করা সহজ। দুই, মৌলিক কিছু তৈরি করা খুব কঠিন। তিন, কিন্তু কারো এটি করা দরকার। আমি চল্লিশ বছর ধরে করে আসছি। এটা আমার কাজ। আমি মনে করি, আমি এমন একজন লোক যে অন্যদের মতো কিছু কাজ করে চলেছে, যেমন নোংরা পরিষ্কার করা বা কর সংগ্রহ করা। সুতরাং, কেউ যদি আমার প্রতি কঠোর হয় তবে আমি আমার যন্ত্রটি তাকে ধরিয়ে বলব, “এই যে, আপনি এটা বাজিয়ে দেখান!”

দ্বিতীয় পাতা

Categories
সাক্ষাৎকার

প্রজিত জানার সাক্ষাৎকার

সাদা পাতা, কবিতা ও সময়-চিহ্নেরা

কবি প্রজিত জানার মুখোমুখি হলেন অর্পণ বসু

কবিতার কাছে আবার ফিরে আসার প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল?

আটের দশকের মাঝামাঝি সময় পার করে একটু একটু করে হয়তো আবার কবিতার কাছে আমি ফিরে আসতে শুরু করলাম। তা অবশ্য করলাম যথেষ্ট দ্বিধা ও আড়ষ্টতা নিয়েই… এবং নিঃসন্দেহে এটা লক্ষ করলাম যে, ইতিমধ্যে বাংলা কবিতাও আমায় ছেড়ে এগিয়ে গেছে বেশ কিছুটা পথ।

বেশ কিছুটা, তবে অনেকটা বলে আমার মনে হয়নি। এক সময় সেই আড়ষ্টতা কিছুটা কাটতে শুরু করল, আমি ক্রমে অনুভব করলাম দূরত্ব যা তৈরি হয়েছে আমার কাছে তা আর অনতিক্রম্য নয়, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও আমার পূর্বপ্রস্তুতি ও স্বাভাবিক প্রবণতা সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে আমাকে সাহায্যই করেছিল।

Categories
সাক্ষাৎকার

প্রজিত জানার সাক্ষাৎকার

সাদা পাতা, কবিতা ও সময়-চিহ্নেরা

কবি প্রজিত জানার মুখোমুখি হলেন অর্পণ বসু

Categories
সাক্ষাৎকার

প্রজিত জানার সাক্ষাৎকার

সাদা পাতা, কবিতা ও সময়-চিহ্নেরা

কবি প্রজিত জানার মুখোমুখি হলেন অর্পণ বসু

মোটামুটি আটের দশক থেকেই আপনার লেখালেখির পরিচিতি। আচ্ছা, এই যে বললাম ‘আটের দশক’, এরকম কবিতার দশক ভাগ কি সঙ্গত বলে আপনার মনে হয়?

এটা প্রধানত ব্যবহারিক এবং সম্পূর্ণ হাস্যকর একটা বিভাজন। জীবনানন্দকে তুমি কোন দশকের কবি বলবে? তিরিশের দশকের নিশ্চয়ই। কেননা তিনি তিরিশের দশকে কবিতা লিখতে এসেছেন। কিন্তু তাঁর প্রধান প্রায় সব কবিতাই তো চল্লিশের দশকের। ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘বেলা-অবেলা কালবেলা’-এর প্রায় সব কবিতাই তো চল্লিশের দশকের। তুলনায় তাঁর তিরিশের দশকের অধিকাংশ কবিতা অনেক কম উল্লেখযোগ্য ও দুর্বল… যে জীবনানন্দ দাশের কথা আমরা বলি, যে কারণে বলি, তাঁর ওই সময়ের (তিরিশের দশকের) কবিতা তাঁর প্রতিনিধিত্ব প্রায় করে না বললেই চলে।

একই কথা রিলকে বা পাউন্ডের ক্ষেত্রেও অনেকটাই প্রযোজ্য। তাঁদের সমস্ত প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান কবিতা ৩৫-৪০ বছরের পরে লেখা। রিলকে যদি আঠাশ বা তিরিশ বছর বয়সে মারা যেতেন, আদৌ তাঁকে কেউ মনেই রাখত না। একই কথা সুধীন দত্ত বা সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। অধিকাংশ কবিকেই তাঁর নিজস্ব কবিতার ভাষা বা টেমপ্লেট খুঁজে পেতে এক বা দু-দশক অপেক্ষা করতে হয়। একজন র‍্যাঁবো বা একজন জন কীটস্ ব্যতিক্রম, এমন দু-চারজন ক্ষণজন্মা বড়ো প্রতিভার তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘজীবী বড়ো প্রতিভার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রথম বা দ্বিতীয় গ্রন্থ থেকে আলোড়ন তুলে দেওয়া কবিদের তুলনায়, সাধারণত তৃতীয় ও চতুর্থ বা পঞ্চম গ্রন্থেই উত্তীর্ণ হওয়া প্রধান কবিদের সংখ্যা সারা পৃথিবীতেই একটু বেশি, অর্থাৎ ওই এক-দু’দশকের প্রতীক্ষা এঁদের অধিকাংশকেই করতে হয়েছে নিজস্ব ভাষা বা ‘সিগনেচার’ খুঁজে পেতে! যে কারণে এলিয়ট বা পাউন্ড উনবিংশ শতাব্দীর কোন দশকের কবি, এহেন প্রশ্ন কেউ কখনও করে না, এমনকী তাঁরা তেমন বিখ্যাত হওয়ার আগেও কোনো দীক্ষিত পাঠক বা সমালোচক এ ধরনের প্রশ্ন করেননি।

২০১১ সালে আপনার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রলাপ-সরণি’ বীরেন্দ্র পুরস্কার পায় এই পুরস্কার পেয়ে আপনার কীরকম লেগেছিল? আপনাকে কি পরবর্তী সময়ে তা লিখতে আরও অনুপ্রাণিত করেছিল?

যে পুরস্কারের সঙ্গে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শক্তিমান কবি ও খাঁটি মানুষের নাম জড়িত, সে পুরস্কার পেতে তো ভালোই লাগার কথা। আমার কাছেও সেটাই প্রধান কারণ ভালো লাগার। তবে আমি নিজেকে যতটুকু জানি, কোনো পুরস্কার আলাদা করে লেখালেখির ব্যাপারে আমাকে কোনো অতিরিক্ত অনুপ্রেরণা দেবে বা দিয়েছিল, এমন আমার মনে হয়নি। বীরেন্দ্র পুরস্কারের ক্ষেত্রেও সে কথা প্রযোজ্য। আমার কাছে কবিতা-যাপন বা লেখালেখি সম্পূর্ণ ভিতরের ব্যাপার। বাইরের কোনও ঘটনা, সেটা পুরস্কারই হোক বা অন্য কিছু… আমাকে খুব প্রবলভাবে আলোড়িত করে না। তবে উৎসাহিত হয়তো কিছুটা করে, সবচেয়ে বেশি যেটা উৎসাহিত করে তা হল পরিণত বা দীক্ষিত পাঠকের ভালো লাগা, পাঠ-মুগ্ধতা বা মনোযোগ। প্রকৃত পাঠকের মনোযোগ আমার কাছে সবসময়ই একটা বড়ো প্রাপ্তি।

কবিতার দীক্ষিত বা প্রকৃত পাঠক কারা?

এটা একটু জটিল একটা বিষয়। যে কোনও কবিতা-‘পড়ুয়াই’ নিঃসন্দেহে কবিতা-‘পাঠক’ নন। কবিতা লেখক মাত্রই কবি নন, কবিতা পাঠক ও কবিতা-পড়ুয়ার মধ্যেও তেমন তফাত আছে। কবিও যেমন কেউ কেউ– সবাই নন; কবিতার পাঠকও তেমন কেউ কেউ– সবাই নন।

আপনি কি দীক্ষিত বা পরিণত পাঠকের জন্যেই কবিতা লেখেন?

আমার মনে হয়, আমি প্রধানত নিজের জন্য, বা নিজের মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্যই কবিতা লিখি। দীক্ষিত বা অদীক্ষিত কোনও পাঠকের কথা ভেবে নয়। লেখার টেবিলে আমি একেবারেই একা, নিঃসঙ্গ। সেখানে কোনো পাঠকের চেহারা চোখের সামনে ভাসার কথা নয়। তবে একটি কবিতা লেখা হয়ে যাওয়ার পর, লেখকের বোধহয় আর বিশেষ কোনও ভূমিকা নেই। এরপর তো পুরোটাই পাঠকের আওতায় চলে গেল। আর একজন দীক্ষিত পাঠকের পাঠ তো একটা কবিতাকে নতুন করে রচনা করে, নির্মাণ করে, পুনর্গঠিত করে। অতএব দীক্ষিত পাঠক নিছক কবিতাটিকে ‘পড়েন’ না, তিনি তাঁর পাঠের মধ্য দিয়েই লেখাটিকে নতুন করে ‘লেখেনও’। একজন কবি যদি সত্যিই সেরকম পাঠক পান, তাহলে সেটা তাঁর সৌভাগ্য বলতে হবে।

আপনার কবিতার পাঠক তো এই দীক্ষিত পাঠকরাই?

এখানে একটা কথা বলা দরকার। আমার কবিতা পছন্দ হলেই তিনি দীক্ষিত পাঠক, আর না হলেই তিনি অদীক্ষিত বা অপরিণত, এমন কোনও নির্বোধ ধারণা আমি পোষণ করি না। এ কথা বললাম এই কারণেই যে, এমন অর্বাচীনতা আমি কারো কারো মধ্যে দেখেছি। তাঁদের কেউ কেউ হয়তো কবি হিসাবেও সুপ্রতিষ্ঠিত।

সত্যি কথা বলতে কি পরিণত পাঠকদের মনোযোগ যেমন আমি পেয়েছি, তেমনি কখনও কখনও ততটা পরিণত নয়, এমন সাধারণ দীক্ষিত পাঠকের মনোযোগও আমার কোনো কোনো কবিতা হয়তো কখনও কখনও পেয়েছে। আবার অন্যদিকে দীক্ষিত পাঠকেরও কেউ কেউ হয়তো কোনও সময় আমার কোনো কবিতা পছন্দ করেননি। এটাই তো হওয়া স্বাভাবিক। অর্থাৎ, একজন পাঠক পরিণত বা অপরিণত, তা নির্ধারিত হওয়া উচিত তাঁর সামগ্রিক কবিতা-বোধ, রসবোধ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে, ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিশেষ কবিতার প্রতি তাঁর মুগ্ধতা বা উদাসীনতার নিরিখে নয়।

তবে হ্যাঁ, দীক্ষিত বা শিক্ষিত পাঠকের অনেকের মনোযোগ বা মুগ্ধতা আমি কখনও কখনও পেয়েছি, সেটা আনন্দের ও সৌভাগ্যের, কখনও কখনও এই সীমিত পরিমণ্ডলের বাইরের বৃহত্তর পাঠকেরও একাংশের মনোযোগ পেয়েছি… সেটাও কম আনন্দের নয়।

আপনার কি মনে হয় না বাংলা কবিতায় এই দীক্ষিত পাঠকের সংখ্যা একেবারেই সীমিত?

শুধু বাংলা কবিতা কেন, সারা পৃথিবীর কবিতাতেই দীক্ষিত পাঠকের সংখ্যা সীমিত। এবং ঐতিহাসিকভাবেই এটা শুধু এখন বলে নয়, চিরকালই। কবিতা তো চরিত্রগতভাবে পারফর্মিং আর্ট নয়। আর কবিরাও সিনেমার নায়ক বা এমনকি পার্শ্বচরিত্রের মতো কোনও পাদপ্রদীপের সামনে থাকা আলোকবর্তিকা নন।

কবিতা যবে থেকে সুর (গানের) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে তবে থেকেই তা মূলত পাঠকের, ততটা আর শ্রোতার নয়। সুরের ওপর ভর করে এক বিপুল সংখ্যক শ্রোতা-দর্শকের কাছে পৌঁছনো তো আধুনিক কবিতার কাজ নয়, উদ্দেশ্যও নয়। যে কারণে গানের লিরিক আর কবিতাও এক নয়। অবশ্যই গানের লিরিকও কখনও কখনও স্বতন্ত্রভাবেই, অর্থাৎ সুর নিরপেক্ষভাবে কবিতা হয়ে উঠতে পারে (রবীন্দ্রনাথের অনেক গানের লিরিকের ক্ষেত্রে সে কথা প্রযোজ্য), কিন্তু সেটা ব্যতিক্রমই। পৃথিবীর বহু শ্রেষ্ঠ গানের লিরিকই স্বতন্ত্রভাবে কবিতা হয়ে উঠতে পারে না, এবং সেটা হয়ে ওঠাটা তার লক্ষ্যের মধ্যেও পড়ে না। তা যেটা বলছিলাম, কবিতা মৌলিক চরিত্রের দিক থেকে পারফর্মিং আর্ট নয়, তা যত না শোনার এবং মঞ্চে উঠে পরিবেশন করার, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাক্তিগতভাবে পড়ার এবং অনুভব করার। নিঃসন্দেহে গদ্য বা গল্প-উপন্যাসের তুলনায় কবিতার পাঠক সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে সব ভাষাতেই সীমিত। এবং এই স্বল্প-সংখ্যক কবিতা পাঠকের মধ্যেও আরও একটা ছোটো অংশকেই দীক্ষিত পাঠক বলা যেতে পারে। এই দীক্ষিত পাঠকেরা নিজেরা কবিতা লিখুন বা না লিখুন, তাঁদের ভাবনা-চিন্তা ও অনুভূতির জগৎটা অনেকটাই একজন কবির মতো বলেই আমার বিশ্বাস।

একটা সময় দেশ, পরিচয়, কৃত্তিবাস প্রভৃতি বহু প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত নানান পত্রিকায় আপনার কবিতা নিয়মিত দেখা যেত। অনেক বছর ধরে তা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এর কারণ কী?

কারণ কিছুই নয়। একটা সময় বর্ষীয়ান কবি ও লেখকদের অনেকে এইসব পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এছাড়াও যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নামজাদা কবি বা লেখক না হলেও, লেখালেখির প্রতি মুগ্ধতাবোধ তখনও তাঁদের অনেকের মধ্যে যথেষ্টই অবশিষ্ট ছিল। তাঁরা যখন লেখা চাইতেন, তার মধ্যে এমন এক ধরনের আন্তরিকতা বা উদারতার আকর্ষণ থাকত, যে স্বভাব-আলস্য সত্ত্বেও তা অগ্রাহ্য করা আমার পক্ষে বেশ মুশকিল ছিল। ক্ষুদ্রতা কোথাও একেবারে যে ছিল না তা নয়, তবে তা হাতে গোনা যেত। পরবর্তীকালে সবকিছুই অনেকটা বদলে গেল।

বিনা আমন্ত্রণে লেখা পাঠানোর কোনও প্রশ্ন তো ছিলই না। কিন্তু পরবর্তীকালে আহ্বান বা আমন্ত্রণ সত্ত্বেও কোথাও কোথাও লেখা পাঠানোর তাগিদ আমি আর অনুভব করিনি। হয়তো বহু আগে কখনো লিখেছি, কিন্তু পরবর্তীকালে সেই একই পত্রিকায় আর লেখা পাঠানোর ইচ্ছা হয়নি।

এরমধ্যে কোথাও কোথাও অবশ্য, শুধু আলস্য বা তাগিদের অভাব থেকে নয়, সচেতনভাবেই আমি লেখা দিইনি। কারণ, এইসব ‘সম্পাদক’ বা পত্রিকা চালকদের অনেককেই আমার লেখালেখির কোনো লোক বলেই মনে হয়নি। একজন লেখককে তাঁর যোগ্য সম্মান দেওয়ার জন্য যে শিক্ষা বা উদারতা থাকা দরকার, তা এদের মধ্যে আমি দেখতে পাইনি। এতে অবশ্যই তাঁদেরও কিছু যায় আসেনি, এবং আমারও নয়। সৌভাগ্যক্রমে এইসব অনভিপ্রেত আমন্ত্রণের অত্যাচার থেকে আমি এখন অনেকটাই মুক্ত।

প্রথম পাতা

পরিচিতি:

কবি প্রজিত জানার জন্ম ২৯ জুন, ১৯৫৯, কলকাতায়। দুটি গদ্য-আকর সহ তাঁর এযাবৎ প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১১ টি। ২০১১ সালে ‘প্রলাপ সরণি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ‘বীরেন্দ্র পুরস্কার’। এছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে নানান বাংলা-ইংরেজী সংবাদপত্র ও পত্রিকায় লিখেছেন কবিতা ও চলচ্চিত্র বিষয়ক গদ্য।

Categories
সাক্ষাৎকার

প্রজিত জানার সাক্ষাৎকার

সাদা পাতা, কবিতা ও সময়-চিহ্নেরা

কবি প্রজিত জানার মুখোমুখি হলেন অর্পণ বসু

ঠিক কোন সময় আপনার প্রথম কবিতা লেখালেখির শুরু? শুরুর দিনগুলোতে কাদের কবিতা আপনাকে প্রভাবিত করেছিল?

কবিতা লেখার বদভ্যাস আমার মধ্যে দানা বেঁধেছিল বেশ বাল্যকাল থেকেই। প্রথম লেখা স্কুলের (পাঠভবন, কলকাতা) দেওয়াল পত্রিকায়। ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন। অতিরিক্ত স্নেহপ্রবণ স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশ্রয় ও প্রশংসা আমার বালকোচিত উৎসাহকে একটু বেশি মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে স্কুলের দেওয়াল ও ছাপা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। সাহিত্যসভায় কবিতা পড়তাম। সাহিত্য-প্রতিযোগিতায় কবিতা লিখে পুরস্কার-টুরস্কার পেতাম। ওই বয়সে ভালোই লাগত। ক্লাস টেন অবধি সম্ভবত এই পর্ব চলল। বছর পাঁচেক লেখালেখির, কবিতার… একটা প্রবল ঘোরের মধ্যে কেটে গিয়েছিল। তারপরে অবশ্য শুরু হয় এক দীর্ঘ বিচ্ছেদ-পর্ব। সে কাহিনি অন্য। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫-৮৬ অবধি আমি সম্ভবত একটি নতুন লাইনও লিখিনি। যে দু’চারটে লিখেছি— সেগুলো কিছুই হয়নি।

Categories
সাক্ষাৎকার

মধুময় পালের সাক্ষাৎকার

এক দেশভিখারির মাটি অন্বেষণ

[লেখক মধুময় পালের সঙ্গে আলাপচারিতায় শতদল মিত্র]

Categories
সাক্ষাৎকার

বোলান শিল্পী শ্যামল প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার

বোলান গান নিয়ে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে দিন কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা আরও শুনতে ইচ্ছে করছে।

বোলানটা কমে গিয়েছিল একটা সময়। শ্যালোগুলো যখন বসে গেল, শ্যালোগুলো ফেল করছিল, তখন চাষিরা হন্যে হয়ে এমাট ওমাট তেলের টিন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পাঁচ সাত বছর বোলানটা প্রায় অ্যাবোলিস হয়ে গিয়েছিল। যারা প্রথাগতভাবে করে আসত তারাই করত। সে বীরভূমের দু-একটা দল। এখানে লোকাল দলগুলো উঠে গিয়েছিল। বীরভূমে জলের আরও ক্রাইসিস ছিল। লাভপুরের অঞ্চলের দিকে জল উঠতই না। তারপর সাবমারসেবল আসাতে সমস্যা একটু কমল। জলের চুক্তি হল। বামফ্রন্ট সরকার ফ্রিতে কারেন্ট দিল। অনেক নেতা ছিল যাদের একার হয়তো আটটা সাবমারসেবল হল। ওই করে একজন ভালো নেতা মারা গেল। ফাল্গুনী মুখার্জি। নাম শুনেছেন? যাইহোক, অত জলের চাহিদা গ্রীষ্মকালে না থাকার জন্য দলগুলো প্রতি গ্রামে চারটা পাঁচটা করে হল। দল ভেঙে গিয়েছিল। আবার হল। আমাদের গ্রামেই চারটে দল। গাড়ি ভাড়া করে আমরা চলে গিয়েছি নদিয়ার দিকে। বোলান যেন সাধারণ মানুষে গরিব মানুষের প্রাণের উৎসব। আস্তে আস্তে দুর্গাপুজো ঢুকেছে। এত বড়ো গ্রাম দুর্গাপুজো হবে না? ছিঃ ছিঃ লোকে কী বলবে!— এই ভাবনা থেকে এসেছে। বাড়ির পুজোয় আগে তো সাধারণে পুষ্পাঞ্জলিও দিতে পারত না। ওদের পেটোয়া ক-টা লোক ছিল তারা পারত। গ্রামের লোকে নবমীর দিনে দশমীর দিনে একটু সেজেগুজে দেখে আসত। কোনো জায়গাতে হয়তো মোচ্ছব দিত, লোক খাওয়াত। সেরকম ছিল। শহরে যারা ব্যবসা-বানিজ্য করত গ্রামে তাদের জমিদারগোচের ব্যাপার ছিল। তাদের আর তাদের কাছাকাছি দু-চারটে লোকের প্রভাবটা বেশি ছিল। ভক্তির জায়গা থেকে বারোয়ারিটাকে দেখত সাধারণে। পরবর্তীকালে ব্যাপারটা গণতান্ত্রিক হয়ে গেছে। কিন্তু বোলান সংস্কৃতিটা তা নয়। এটা বহুকাল থেকেই সবার। তবে বর্ধমান রাজার প্রভাবটা যেখানে ছিল সে-সব গ্রামে শিবের নামে দশ বিঘে বিশ বিঘে জমি ছিল। আর ওই যে সুন্দর ড্রেস পরতে হবে তাও নয়। সাজে হয়তো বোলানে। বাড়ির মেয়েদের একটা শাড়ি নিয়ে নিল, একটা ব্লাউজ নিয়ে নিল। দিয়ে সাজতে বেরিয়ে চলে গেল। আবার কেউ প্যান্ট জামা পরেই বেরোল। কেউ হয়তো ছেঁড়া বস্তা জোগাড় করল। ওই দল না গেলে গাজনটা সিদ্ধ হয় না। এইটা একটা নিয়ম চালু আছে। দলের কাছে দু-একটা শতরঞ্জি থাকে, মাইক থাকে, চারজার ফারজার থাকে। এখন আর লাঠি ঠ্যাঙা নেয় না। গাড়ি ভাড়া করে গেল। এখন যদিও সব জায়গায় মাইক রয়েছে। আগে আমরা যখন গেছি, একটা হ্যাজাক টানিয়ে দিত। মঞ্চ করাই আছে। কোন কোন বড়ো গ্রামে দুটো চারটে আছে। সেখানে যদি গাজনের জমি না থাকে, নিজেরাই চাঁদা তুলে নেয়। পাঁচ দশ হাজার টাকা তুলে নেয়। দল এলে তাদের পাঁচশো হাজার দিয়ে দল বিদেয় করে।

সন্ন্যাসীরা বাবার নাম ডাকল। ঠাকুর আসতে আসতে ডাঙায় উঠে পড়ল। এটা প্রচলিত কথা। নির্দিষ্ট পুকুর আছে যেখানে জলটা মরে না। সেখানে নির্দিষ্ট জায়গাতে ঠাকুরটাকে রেখে দিয়ে আসে। গাজনের সময় বাবার নাম ডেকে তারা শিব তুলে নিয়ে আসে। আর একটা হয়। শালগ্রাম শিলা। নির্দিষ্ট পুরোহিতের বাড়িতে থাকে। সে সারা বছর পুজো করে। শিব গাজনটা চার পাঁচ দিন হয়। প্রথম দিন ঢাক বাজিয়ে সন্ন্যাসীরা ঠাকুর বাড়িতে যায়। সেখান থেকে পুরোহিতকে ওই শিলাসমেত কাঁধে করে গাজন ঘরে নিয়ে আসে। সন্ন্যাসীরা হাতে একটা বেতের লাঠি নেয় দেখবে। কতগুলো বেত একগুচ্ছ বেঁধে, মাথাতে একটা পাক দেওয়া থাকে, ওইটা হাতে নেয়। ওটা চলে আসছে। আমার মনে হয় ওটা সিকিউরিটির জন্যে নেয়। আত্মরক্ষার জন্যই নেয়। বৌদ্ধিক জায়গা থেকে বলা আর আমার চাষির দৃষ্টি থেকে বলায় হয়তো পার্থক্য আছে। আগে গোষ্ঠীর ব্যাপারটা ছিল। শিবের গোষ্ঠী, মনসার গোষ্ঠী এই ব্যাপারগুলো ছিল আগে। পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ হত। মারধোর হত। শুধুমাত্র খালি হাতে শিবের জায়গাটা করা তাই সমুচীন ছিল না। ওই জন্যে লাঠিগুলো নিত। যেমন ধরো জামালপুরের ধর্মরাজের মেলা। পূর্বস্থলিতে নেমে জামালপুর যেতে হয়। মূল উৎসবটা বুদ্ধপূর্ণিমায় ছাড়া হয় না। তারপরে অন্য জায়গায় হয়। আমাদের চোত গাজনটা পূর্ণিমায় পড়ে না। হয় পাঁচদিন আগে নয় পাঁচদিন পরে হয়। চৈতের লাস্ট দিনটাই গুরুত্ব পায়, ওই দিনটায় চড়ক পুজো হয়। তার আগের দিন হয় নীল পুজো। তার আগের দিন জল সন্ন্যাসী। তার আগের দিনটায় হয় বোলান বা জাগরণ। মড়ার মাথা ফাতা নিয়ে জাগরণ। তার আগের দিন সাধগান। একটু সিদ্ধফিদ্ধ করে ভাত খাওয়া। তার আগের দিন হচ্ছে কামান। আবার কোথাও একমাসে কামায়। কোথাও পনেরো দিন আগে কামায়। আবার কোথায় চারদিন আগে কামায়। যেটা বলছিলাম, ওই জামালপুরে গেলে সব লাঠি ঠ্যাঙা নিয়ে যায়। আমার মনে আছে, এক জায়গায় গেছি, বলল দাদা চল অগ্রদ্বীপ যাই, পাঁঠা খেতে যাব। বললাম, তোমার ভগ্নীপতিরা কি পাঁঠা দেয় নাকি? বলল, না আমরা পাঁচ ছয় ভাই, ওদিন কেড়ে খাই। (হাসি) পাঁচ সাতটা পাঁঠা কেড়ে নেয়। সেই পাঁঠা কাড়তে গিয়ে রামদায় করে একটা লোককে চুটিয়ে দিলেও যায় আসে না। কেউ পাঁঠা বলি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, দিলে তার হাতে কোপ মেরে। আগে এ-সব বেশি হত। মার্ডার হয়ে গেছে। প্রশাসন এখন চেষ্টা করেছে। লাঠি টাঙ্গি যা থাকল তার মধ্যে আবার কেউ রিভলবার ঘোরাতে ঘোরাতে চলল টাউনের উপর দিয়ে। এই কাটোয়ার উপর দিয়েও গেছে।

আচ্ছা এই ধর্মের গাজন আর শিবের গাজন বিষয়টা কি এক?

যারা শাস্ত্র ফাস্ত্র পড়ে তারা ধর্মরাজের সঙ্গে যমের মিল করে দেয়। আবার বেশিরভাগ জায়গাতে ধর্মরাজের সঙ্গে শিবের যে-পার্থক্যটা এটা জনমানসে আবার মুছে গেছে। যার ফলে দেখা গেছে অনেক ধর্মরাজের থানে শিবের মূর্তি বসিয়ে দিয়েছে। আমার যেটা মনে হয়, যেটা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন, ধর্মরাজ বৌদ্ধদের দেবতা ছিলেন। সেখানে সেবায়েতরা দেখবেন কোথাও হাজরা, কোথাও হাড়ি, কোথাও ডোম, কোথাও দাসেরা। এরাই ধর্মরাজের মূলত সেবাইত। ডোমেরা হাজরারা একটা সময় বৌদ্ধ হয়ে ছিল। ডোমেরা ধর্মপণ্ডিত টাইটেলটা পেয়েছিল। হাজরাদের বড়ো সম্মান ছিল। কোটাল, প্রধান টাইটেল যাদের, তাদের একটা ভালো পজিশন ছিল বৌদ্ধধর্মের সময়ে। পরবর্তীকালে ওরা বদলে যায়। যার ফলে হিন্দুরা বলে কোটালদের ছুঁলে ডুব দিতে হয়। এখন সব মুছে গিয়েছে। আমার গ্রামেও আর ডোম বলে বিচার কিছু নাই। জাতটা আছে হয়তো। বিয়ে হয়ে গেলে হয়তো হয়েই গেল। সাধারণ চাষি, হয়তো ছেলের বিয়ে হচ্ছে না, বলছে, ভাইপো, তাহলে কি চাষ আবাদ ছেড়ে দেব নাকি? এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে যারা জয়পুর দিল্লি তাদের বিয়ে হচ্ছে আর আমাদের ছেলে জমি নিয়ে পড়ে আছে বলে বিয়ে হবে না? তুমি যা হোক একটা দেখ গা। ডোম বাগদি যে-কোনো ঘরের মেয়ে একটা দেখ। হয়তো বললাম, আছে, বিধবা। বলছে তাই দেখ, তবে তাই দেখ। সমাজটা ক্রাইসিসে পড়ে বদলাচ্ছে। চেতনার জায়গা থেকে ততটা নয়। এমন করলে আলাদা করে দেওয়ার মতো জায়গাটা ভেঙে গেছে ওপর তলা থেকে। আগে হলে তাকে ছুঁত না। গ্রামের লোকে আগল দিত। এখন আর ও-সব কিছুই নাই। হয়তো কোন গ্রামে এখন বাউনদের একটা বড়ো গুষ্টি রয়ে গিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রভাবটা আছে। কিন্তু সাধারণ গ্রামগুলিতে নেই। তবে গোয়ালাদের মধ্যে এখনও খানিকটা আছে। ওরা সংগঠিত আছে এখনও। অনুষ্ঠান থাকলে, একটা গ্রামের মোড়ল অন্য গাঁয়ের মোড়লকে এসে বলে যেত, গোয়ালাদের। এর ফলে ওদের মধ্যে গোষ্ঠীগত ব্যাপারটা যেমন বরাবর ছিল, এখনও খানিক রয়ে গেছে। মাহিষ্য সদগোপদের মধ্যে অত তীক্ষ্ণ ব্যাপারটা নেইকো।

চৈত্রের গাজন ও বোলান গান

আচ্ছা কিছু শিবলিঙ্গ শুধুই লম্বা পাথর আর কিছু এই গৌরীপট্ট দেওয়া এটা কেন? এই দুটোর তফাৎ কী? কেন আলাদা?

ওটা যোনি বলে। ওইটাই নাকি বলে শান্তি। পুরুষ আর প্রকৃতির মিলন। নানান জন নানা ব্যাখ্যা করে। গ্রামের লোক অত ভাবে না। ওটাই শিব মনে করে পুজো করে। তবে কেন আলাদা বলতে পারব না। জানি না। আগের থেকে পেয়েছে। গোল পাথর কোথাও উঠেছে। ওটাই ভাবল শিব। জলে পেয়েছে। স্বপ্নে দেখেছে। পায়ে ঠেকেছে হয়তো। বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা পুরোনো দিনে কম ছিল। সাদা ডাকে চলত। জীবন সংগ্রামটা এখন বিজ্ঞানের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। তখন ওরকম পর্যায়ে ছিল। কেউ হয়তো বলল এই অমুক ঠাকুর পেয়েছে রে। সে গিয়ে বটতলায় গড়াতে শুরু করল। আরও একজন বলল পেয়েছে। দিয়ে বটতলায় দু-জনে দখল নিয়ে মারামারি লেগে গেল। এখনও কোথাও কোথাও হয়। বিশজন একশো জন জমে যায়।

আবার বিষয়ে ফিরে আসছি। আপনি কেমন করে বোলান গান লিখতে শুরু করলেন?

উত্তর: আমার গ্রামে একজন রেল শ্রমিক ছিলেন। তার নাম হচ্ছে সুদর্শন চক্রবর্তী। উনি খুব ভালো গান লিখতে পারতেন। তার কাছাকাছি থাকতে থাকতে আমার মানসিকতাটা ওই দিকে ঝুঁকে যায়। পরবর্তীকালে আমার মনে হয়, যে— গ্রামের লোকেরা নিজের দুঃখ যন্ত্রণা সব বোলানের মাধ্যমে বলে। কিন্তু কীভাবে চলা যাবে সেই কথাটা তারা নির্দিষ্ট করতেন না। কিন্তু আমার একটা নির্দিষ্ট ভাবনার জায়গা থেকে মনে হয়েছিল। আমি যখন এগুলো ভাবি দেখেছি সাধারণ মানুষের জীবনেও যে-ধারাগুলো রয়েছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা, সংস্কৃতির রূপ— সেগুলো নিয়েই তাদের কাছে যাওয়া গেলে তাদের কাছে গ্রহণীয় হবে। এবং গ্রহণীয় হয়েছিল। হয়েওছে। এখনও পর্যন্ত যদি বাধ-ঘাটে যাই পাঁচজনে বলে। খুব ভালো না হলেও জীবনটা নানাভাবে কেটে গেছে। হয়তো ধারাটা সবসময় বজায় থাকেনি। আমার এটা এত ভালো লাগে, এখনও মনে হয় ভালো করে শিখি। সেটার সুযোগটা হয়তো হয়নি। আমি আমার মানসিক জায়গা থেকে কিছু কিছু লিখি। আবহাওয়াটা যেমন দেশে চলে সেইমতো হয়তো লেখাটা চলে। সবার হয়তো সেটা ভালো লাগে না। শাস্ত্রের উপর পালাটা তারা চাইল। এবার হয়তো চাষি-বাসি লোকেরা দল করছে। তারা ডাকল, দাদা তুমি এসো গো। গতবারেও গেছি তাদের সঙ্গে। ওদের হয়তো পুরোনো সুর, পুরোনো গান ভালো লাগে। আমি কখনো ইম্পোস করিনি তাদের উপর যে, এই গানটা করতে হবে। হয়তো নিজে একটা পাঁচালী গাইলাম লিখে দিয়ে। সেই গানটা হয়তো তারা খুব ভালোবাসল। এইভাবে হয়।

আমার কাছে প্রধান উৎসব বোলান। পাড়ায় যারা উৎসাহী লোক আছে ঢোল বাজলেই তারা চলে আসবে। এসে এবার তারা চার পাঁচজন উদ্যক্তা যুক্তি করল। গান একটা আনতে হবে। একটা পালা আনতে হবে। কার কাছে যাবে? মৃগেনের জ্যাঠামশাই গোবর্ধন দাস ভালো গান লিখতেন, খুব ভালো গান করতেন। পড়েছেন হয়তো দু-তিন ক্লাস। কিন্তু গান লিখতেন। কাটোয়া সাবডিভিশন, কান্দি সাবডিভিশন বা নদিয়া কালিগঞ্জ থানা এইসব এলাকার দু-তিনটে গ্রামে বাপ্রায় গ্রামেই একজন দু-জন করে লোক রয়েছে যারা কিন্তু শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক, নিজে লিখতে পারে না, হয়তো তারা মুখে মুখে বলে দেবে। বলবে, খাতা নাও, ধরো। নানান সুর বসিয়ে গান লেখাটা এদিকে চালু রয়েছে। আমিও লিখি। কিন্তু আমার চেয়ে ভালো ভালো লেখে তারা। যেমন বীরভূমে রয়েছে চন্দ্রশেখর। তোমার দাঁইহাটের রঞ্জিত দাস। তারপর, মারা গেলেন, বান্দরার মানিক ঘোষ। আমি এখন এই গ্রামেই বাস করছি। কাটোয়ার কোশিগ্রামে দশজন, বারোজন আছে। আছে তপন ভটচাজ থেকে শুরু করে সনৎ সাহা থেকে শুরু করে; ওখানে তো অনেক কবি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যেমন ধরো কাশীরাম দাস। কাটোয়ার আশে-পাশে এমন অনেক আছে। কুমুদরঞ্জন মল্লিক, দাশরথি রায়— এমন কবি সব প্রচুর রয়েছে। বৈষ্ণব কবি প্রচুর ছিল। আমাদের এখানে ছিল মনোহর দাস। পাশের গ্রামে শ্রীখণ্ডে ছিল নরহরি দাস। কান্দরায় ছিল জ্ঞানদাস। ঝামটপুরে ছিল কৃষ্ণদাস কবিরাজ। এরকম প্রচুর ছড়ান ছিল। যার ফলে একটা সাংস্কৃতিক বাতাবরণ এই অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই ছিল। তারই ছিটেফোঁটা হয়তো আমার ভিতরে ঢুকেছে।

শিশু কিশোর বিকাশ মেলায় বোলান গান‌ শেখাচ্ছেন

বোলান গানের বিষয়, সুর ও গায়ন ভঙ্গি বিষয়ে জানতে ইচ্ছে করছে। আপনার গানও শুনব এবার।

আসরে প্রথমে বন্দনা হবে। তারপর বিষয়ে যাবে। শাস্ত্রের বিষয় হলে শাস্ত্রের বিষয়। সামাজিক বিষয় হলে সামাজিক বিষয়। ঐতিহাসিক বিষয় হলে ঐতিহাসিক বিষয়। পালা একটা। সেই পালাটাই চলবে বিষয়ে। কলির শেষ হয়ে গেলে ছক্কা বলে। তারপর আবার বিষয় শুরু হয়। শেষে যবনিকা হল। তারপরে সময় থাকলে পাঁচালী হল। বোলান যেখান থেকে খুশি সুর নিয়ে নেয়। কখনো হিন্দি গানের সুর নিয়ে নিচ্ছে, কখনো কীর্তনের সুর নিয়ে নিচ্ছে। কখনো ভাদুর সুর নিচ্ছে। অনেকগুলো সুর নিয়ে একটা ধারা করছে। ভাদুর যেমন স্পেশাল সুর আছে, বোলানকে তেমন বলা যাবে না। যেমন ধরুন ভাদু গানে গাইছে, (গেয়ে শোনান)—

ভাদু মাগো কলেজ যাবা, ও মামুড়ি চারটি বেঁধে দে।
চিকন চিকন আলু ভাজা সুজি একটু রেঁধে দে।
বাবা তোমার বড়ো গরিব, করে বেড়ান হকারি
ট্রেনে বাসে রাস্তা ঘাটে, বেচে বেড়ায় ঝালমুড়ি।
মোমো মোগলাই চাউমিন এগরোল কোথায় পাব হর দিনে
মাগো পুজোর সময় পয়সা দেব কিনে খাবে ভাই বোনে।
ভাদু মাগো কলেজ যাবা, ও মা মুড়ি চারটি বেঁধে দে।
চিকন চিকন আলু ভাজা সুজি একটু রেঁধে দে।
মাগো ছেঁড়া কাপড় ঘুরিয়ে পরি তোদের নতুন দিই কিনে
সত্যি কারের মানুষ হবা বড়ো আশা এই মনে।

লাস্টে লাইন ক-টা ভুলে গেছি। আমারই লেখা। আবার একটা গান, যেমন—

ভাদু ভাদর মাসে, কী আনন্দ হল সোনার বাংলা দেশে।
ভাদু আমার কচি ছেলে গো, কাপড় পরতে জানে না।

এই ধরনের সুরগুলো ভাদু গানের। বোলানের যখন দরকার পরে সুরটা নেয়। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভাদু একটা সুরেই গানটা গাইতে গাইতে আসে। আর বোলানে নানান ধরনের সুর পর পর লাগিয়ে গানটা চলে। যেমন বন্দনা করছে (গেয়ে শোনান)—

ও বাবা বুড়ো শিবের চরণে আজ করিগো প্রণাম।
সবাই বলে সুফল ফলে, নিলে বাপের নাম।
ও বাবা বুড়ো শিবের চরণে গো করি আজ প্রণাম।

দুটো অংশ হয়। মূল একজন ধরে, তারপর দোয়ারিরা ধরে। যেমন মূল গায়ক যেই গাইল—

ওগো মনের কথা বলতে আমরা বাঁধলাম বোলানেরই গান।
তখন বাকিরা গাইল,
এই মনের কথা বলতে আমরা বাঁধলাম বোলানেরই গান।
বাঁধলাম বোলানেরই গান, দুখেতে ফাটেগো পরাণ।
গাইতে বোলানেরই গান, দুখেতে ফাটেগো পরাণ।
মনের কথা বলতে আমরা বাঁধলাম বোলানেরই গান।

তারপর ধরুন মূল গায়ক ধরল—

মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
বসুমতী বন্দী আজও কংস কারাগারে, গরিব চাষির প্রাণে হাহাকার।
ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।
মাটির বুকে দেখ সোনার বাহার ফলায় সোনা যে নয় মাটি তার।

পিছে শেষ করল, সামনে ধরল—

হেই, একমন ধানে একমন বাড়ি, বৌ বিটি যায় বাবুর বাড়ি।
এই, একমন ধানে একমন বাড়ি, বৌ বিটি যায় বাবুর বাড়ি।
ধন্য দেশের স্বাধীনতা, এই কি নজর সরকার তোর-ই।
এই, একমন ধানে একমন বাড়ি, বৌ বিটি যায় বাবুর বাড়ি।
সরকার যত আইন জারি করে, ঘুরে ফিরে চাপে বোঝা গরিবের ঘাড়ে।
ধনী লোকের গায়ে দেখ হাত না পড়ে, হেটকার চাপে দাদা মুসুরি মরে।
সরকার যত আইন জারি করে, ঘুরে ফিরে চাপে বোঝা গরীবের ঘাড়ে।

কলি শেষ হয়ে গেল হয়তো। শেষে ছক্কা ধরল—

ও সে শোষণের সমাজ, মনরে,
ও সে শোষণের সমাজ ভাঙিতে গো নারাজ চড়েছে গদির পরে।

এই সুরটা গেল। তারপর আবার শুরু হল। এক-একটা সুরের এক-একটা ভাগ হচ্ছে বোলানে। এরা মুখটা ধরছে, সেই ক্ষেপটা শেষ হলে ওরা বাকিটা ধরছে, ধরে শেষ করছে। দিয়ে এরা আবার নতুনটা ধরছে। সুরে সুরে এগোচ্ছে। যদি আসরে গাজনের দলের ভিড় থাকে তখন ছেড়ে দেয়। হয়তো দশটা বিশটা দল দাঁড়িয়ে আছে গাজনটা গাইবে বলে। কেউ অন্য পাড়ার দিকে চলে গেল। নীল পুজোর দিন আবার গাজনটা গাওয়ার সুযোগ পেল। সেইদিন আর শ্মশান বোলানটা হয় না। যেটা মড়ার মাথা নিয়ে হয়। ডাকিনী যোগিনী সেজে একটা গান আছে। আর একটা বোলান আছে। সেটা হচ্ছে, কেষ্ট যাত্রা দেখেছেন? ওই টাইপের বোলান আছে। নদিয়ার দিকে আছে। আবার পাঁচালীর সুরে বোলান আছে। বোলানটা হয়ে যাওয়ার পরে, যদি সময় অবকাশ থাকে, দল না থাকে যদি, তখন পাঁচালী গানটা করা যায়। পয়ারে বাঁধা পাঁচালী একটা গেয়ে শোনাই— (গান গেয়ে ওঠেন) ‘ও লাগিয়ে কলার বাগান’ (থেমে)— গোদার পাল জানেন তো? হনুদের দুটো দল আছে। শুধু পুরুষ বিশাল বিশাল চেহারা— সেটা একটা দল। আর আছে শুধু নারী, যাদের দলে একটা পুরুষ থাকে। যদি কোনো নারীর প্রসব হয়, তবে পুরুষটা বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। আর ওই মা বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, বাঁচার চেষ্টা করে। এটা হচ্চে হনুমানের সাধারণ দল, মেয়েদের দল। আর ঐ গোদার পাল। ভয়ঙ্কর। সে যদি কোন জায়গায় ঢোকে উৎপাত করে ছাড়ে। এই দুটো দলে মারামারি লাগলে বাগানে সারাদিন মারপিটই চলে। (গেয়ে শোনান)—

ও লাগিয়ে কলার বাগান, গোদার পালের আনাগোনা।২
ও কলা খাচ্ছে গোদা, বাঁধছে ছাঁদা গো। ও বলি কিসে শুধি চাষের দেনা?
লাগিয়ে কলার বাগান…
চাঁপা আর সিঙ্গাপুরি, কাঁঠালে চারশ বুড়ি
(গান থামিয়ে আক্ষেপ, ‘আমার গলাটা চলে গেছে’)
চাঁপা আর সিঙ্গাপুরি, কাঁঠালে চারশ বুড়ি
ছিঁড়ছে গোদা ঝুড়ি ঝুড়ি গো। ও দেখ কাঁচা পাকা আর বাছে না।
লাগিয়ে কলার বাগান…
কখনো মিঠে বাণী, কখনো দাঁত খিঁচুনি
পড়ে গোলকধাঁধায় আমাদের গাধার দশা গো।
ও শুধু মহাজনের বস্তা টানা গো। লাগিয়ে কলার বাগান…
ওরে স্বদেশী বিদেশী গোদা, কেউ বা রঙিন কেউ বা সাদা।
স্বদেশী বিদেশী গোদা, তারা কেউ বা রঙিন কেউ বা সাদা
ও যত এল খুবলে খেল গো।
ওরে সার করেছে লেংটি খানা। লাগিয়ে কলার বাগান…
ওগো মরছি টানে মরছি বানে (গান থামিয়ে, ‘টান মানে, খরা’)
আমরা মরছি টানে মরছি বানে, এত দুঃখ সয় না প্রাণে,
বাঁচা যায় কি দয়ার দানে গো?
বল বাঁচা যায় কি দয়ার দানে গো গোদার পালের আটক বিনা?
লাগিয়ে কলার বাগান…
লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ হয় খাতে,
সেই বরাদ্দের খাস্তা লুচি যাচ্ছে কাদের পেটে?
ওগো পর্বতের হয় মূষিক প্রসব আপনারা জানেন তো সব,
গো সাজান হয় না আমার পরে।
সত্যি ওরা আপন বটে, বালতি হাতে আসে ছুটে,
লাগিয়ে আগুন মোদের পুরে ঘরে।
ওগো বলব কারে দুখের কথা গো?
আমরা সব জেনে গো হই না জানা।
লাগিয়ে কলার বাগান গোদার পালের আনাগোনা গো।

শেষ পাতা