Categories
অনুবাদ কবিতা

কাশ্মীরের কবিতা

ভাষান্তর: সোহেল ইসলাম

এখানে পাঁচজন কাশ্মীরির দুটো করে মোট দশটা জবানবন্দি থাকল। গত সাত-আট মাস কাশ্মীর নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে কবিতাগুলোকে আমার জবানবন্দিই মনে হয়েছে। তাই তার উল্লেখ। কাশ্মীরে আমরা যা দেখি, তারচেয়ে বেশি কিছুই ঘটে প্রতিনিয়ত। গোটা কাশ্মীর জুড়ে মানুষের অভিজ্ঞতা একই। স্কুল বন্ধ, বাজারঘাট বন্ধ, ফোন বন্ধ, গণপরিবহন বন্ধ, রাস্তায় বেরোনো বন্ধ, এমনকী সবচেয়ে দরকারেও এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যায় না। এ তো গেল দিনের আলোর কথা। রাত তো আরও ঝুঁকি দিয়ে ভরা। ওষুধ কেনা এমনকী হাসপাতাল যাওয়ার মতো দরকারেও রাতের কাশ্মীর নিরাপদ নয় খোদ কাশ্মীরিদের কাছেও। কেন-না রাতের দখল থাকে সেনাবাহিনী আর পুলিশের হাতে। কাশ্মীরের অন্ধকার মানুষের অসহায়তার কথা বলে। ছাদের বুক থেকে চাঙর ভেঙে পড়লে যেমন ছাদ চুপচাপ থাকে, স্বাভাবিক হতে চায়, কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ঠিক একইরকমভাবে কাশ্মীরও শরীরে স্যালাইনের নিডিল নিয়ে ব্যথা, যন্ত্রণা, দুঃখ, না-পাওয়া একনিঃশ্বাসে ভুলিয়ে দিয়ে আবার বেঁচে উঠতে চায়। এই বেঁচে ওঠায় কোনো মিথ্যে নেই, কোনো নাটক নেই। থাকার মধ্যে আছে শুধু অপেক্ষা। সেই একই অপেক্ষা এখানকার ঘরবাড়ি, দরজা-জানলার এবং এখানকার মানুষের মতোই। একটু মন দিয়ে তাকালে দেখতে পাবেন, দেওয়ালগুলো বোমা আর বুলেটের অত্যাচার সহ্য করতে করতে নিথর হয়ে গেছে। আর দরজা-জানালাগুলো সেনাবাহিনীর নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতে নিতে বুড়ো হয়ে গেল। বাড়ির আলো ছুটে যে রাস্তায় বেরিয়ে আসবে তার কোনো উপায় নেই। এখানে মুক্তির একমাত্র পথ হল মরে যাওয়া। তবে মজার ব্যাপার যে মরে গেল, মুক্তি কেবল তার। কিন্তু তারপর বাড়ির লোক পড়বে যাঁতাকলে। তল্লাশি, প্রশ্ন, রাতবিরেতে গলা ধাক্কা, সুরক্ষার অভাব, হয়রানি এসবই যেন তখন ওই বাড়ির রোজকার জীবন হয়ে ওঠে। আবার নতুন করে তারা তখন মৃত্যুর অপেক্ষায়, মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে।

লকডাউন, মারধোর, হেফাজত, কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া, পুরোনো FIR দেখিয়ে এনকাউন্টার, হাত-পা ভেঙে দেওয়া, চেকিংয়ের নামে অসভ্যতা কাশ্মীরে নতুন কিছু নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এর সাক্ষী। আপনি যদি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে গিয়ে লাল কাশ্মীর দেখে ফেলেন, অবাক হওয়ার কিছু নেই। সত্যিই কাশ্মীর এখন দুঃখে, কাঁদতে কাঁদতে, ক্ষতবিক্ষত শিশুর মৃতদেহের মতোই লাল। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর তথ্য আর সরকারি আমলার বক্তব্যের উপর নির্ভর করে যে-কাশ্মীরের কথা আমরা মনে মনে কল্পনা করি তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। দেশের জনগণের কাছে কাশ্মীর মানেই ভিড়, উশৃঙ্খল, হাতে পাথর নিয়ে তেড়ে আসা জনতার ভিড়। কিন্তু উলটো দিকে দাঁড়িয়ে থাকাদেরও যে একটা ভিড়, তারাও যে রাইফেল, প্যালেট গান, গ্রেনেড হাতে ভিড় তৈরি করেছে তা আর দেখানো হয় না। এই যে বারবার কয়েনের একপিঠ দেখিয়ে বিচারপতি বসিয়ে বিচার করে নেওয়ার মানসিকতার বিরুদ্ধেই কাশ্মীরের কলম জ্বলে উঠেছে, জ্বলে উঠছে। আর তাই কাশ্মীরের কবিরা সরাসরি মানবাধিকারের কথা বলছেন, মানবজাতির পক্ষে কথা বলছেন। ফলে কাশ্মীরের কবিতায় আপনি যত এগোতে থাকবেন, দেখবেন― মা, কারফিউ, রক্ত, হ্যান্ড গ্রেনেড, কাঁটাতার, নিষ্ঠুরতা, গণকবরের মতো শব্দ উঠে আসছে বারবার। আসাটাই স্বাভাবিক। কাশ্মীর তার কবিতায় জীবন লেখে, বেঁচে থাকা, ঘুরে দাঁড়ানো, কাঁধে কাঁধ রেখে উঠে দাঁড়ানোর কথা লেখে। যা তাকে শিখতে হয়নি। জীবনচর্চার মধ্য দিয়েই তার কলম একে ধারণ করেছে।

আর একটা কথা আতহার জিয়া এবং হুজাইফা পণ্ডিতের সাহায্য না পেলে কাশ্মীরকে আমার জানাই হত না সেভাবে। শাম্মি কাপুরের ‘ইয়া হু’ বলে বরফে ঝাঁপিয়ে পড়া কাশ্মীর নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু তা যে হওয়ার নয়, বেশ বুঝতে পারছি এখন।

আসিয়া জহুরের কবিতা

[পরিচিতি: আসিয়া জহুর বর্তমানে কাশ্মীরের বারামুল্লার একটি কলেজে মনোবিজ্ঞান পড়ানোয় কর্মরত। কাশ্মীরি সাহিত্য, কবিতা, মনোবিজ্ঞান বিষয়ক বই এবং নিবন্ধ লিখেছেন।]

মিলিটারাইজড জোন

জিভ কেটে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে দেওয়ার আগে
কিছু বলা যাক

মাথায় হাতুড়ির আঘাত নেমে আসার আগে
কিছু চিন্তার ফসল ফলানো যাক

ঘুমের দেওয়াল
বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার আগে
কিছু স্বপ্ন বোনা যাক

অন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই
চলো, অন্ধকারকেই আয়না বানিয়ে ফেলি

শব্দ মুছে দেওয়ার আগে
হাতের তালুতেই
লিপিবদ্ধ করি কাশ্মীরি ইতিহাস

নদী

একদিন নদী রাস্তা ভুল করে
ঢুকে পড়ল পাড়ায়
বাড়িতে
স্কুলে
দরজায় কড়া নাড়তে আরম্ভ করল
যত রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি
তত বাড়তে থাকে রাগ
সে কী একগুঁয়ে জেদ নদীর
দরজা-জানালার ফাঁকফোঁকর দিয়ে
ফাটা দেওয়াল দিয়ে ঢুকতে লাগল ভেতরে
প্রথমে বইগুলো তাকে তুললাম
তারপর আসবাবপত্র
শেষে নিজেরাও
কিন্তু নদীর জেদ…
বই থেকে শব্দগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল
পাড়া থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল প্রতিবেশী

আমরা এখন
হাসি-কান্না ভাগ করে নিতে নিতে
এক দেওয়ালহীন বিশ্বের বসবাসকারী

আমজাদ মজিদের কবিতা

[পরিচিতি: আমজাদ মজিদ ইনভার্স জার্নালের সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে দক্ষিণ কাশ্মীরে থাকেন। সেখানে বসে চীন, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সমালোচনা বইয়ের উপর কাজ করছেন।]

কাশ্মীরে কারফিউ

কারফিউ রাস্তায়
স্কুলে
ঘরবাড়িতে
রেডিয়ো, সংবাদপত্রে
ইন্টারনেটে
টিভি চ্যানেলে
আমাদের বক্তব্যে
আন্দোলনে
প্রতিবাদে
শোকে
এমনকী যে-স্বাধীনতার কথা আপনারা বলেন
কাশ্মীরে তাতেও কারফিউ
তবুও আমরা আশা ছাড়িনি
জীবনকে বাজি রেখে
মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে
উন্মাদনা ভাগ করে
লড়াই জারি রেখেছি—
ঠিক একদিন কারফিউ মুক্ত কাশ্মীর গড়ব আমরা

পরিচয় পত্র

দরখাস্তের ভিড় থেকে আলাদা হয়ে
সেও প্রিন্ট হল অন্যদের মতো
নোটারিযুক্ত হয়ে
দেশের স্ট্যাম্প নিয়ে
ল্যামিনেশনে মুড়ে
এক সরকারি দপ্তর থেকে
আরেক সরকারি দপ্তরের টেবিলে চক্কর কাটতে লাগল
তারপর সত্যি সত্যিই একদিন
দাগী আমলাদের হাত থেকে মুক্তি ঘটল তার

আজও স্পষ্ট মনে আছে
সেই দিনটির কথা
কাগজের ভিড়ে মাথা তুলে তাকানো দরখাস্ত
লম্বা কিউয়ে উলঙ্গ মজিদ
আর তার রক্ত-মাংস দেশীয় হওয়ার প্রমাণ দিচ্ছে

তখন আমি বাড়ি থেকে অনেক দূরে
কাচের জানলা দিয়ে দেখছি দেশ

শাবির আহমেদ মীরের কবিতা

[পরিচিতি: শাবির আহমেদ মীর কাশ্মীরের পুলওয়ামায় থাকেন। একজন গদ্যকার, কবি ও ছোটোগল্প লেখক। বর্তমানে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত।]

যেদিন যুদ্ধ শেষ হবে

যুদ্ধ শেষ হলে
একবার আসুন আমাদের এখানে
বুলেট কিংবা প্যালেট গানে ফুটো হয়ে যাওয়া জায়গায়
আঙুল ঢুকিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে নেবেন
কতটা আহত
কতটা আঘাত সহ্য করেছি আমরা

যুদ্ধ থেমে গেলে
আপনাকে এনে দেব গন্ধ
ভয়ের গন্ধ
ধ্বংসস্তূপের গন্ধ
দেখে নেবেন কী জমকালো সেইসব অন্ধকারের গন্ধ

যুদ্ধ থেমে গেলে
বুটের দৌড়ঝাঁপের আবহ শোনাতে নিয়ে যাব আপনাদের
উপত্যকা ভাগ করা
কাঁটাতারের গর্জন শোনাতে নিয়ে যাব

যুদ্ধ থেমে গেলে
আপনাকে নিয়ে যাব ভেরিনাগ
সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সুখনাগ
তারপর আমরা যাব ডাল লেকে
একটি দিন কাটাব বন্দুকের পাহারা ছাড়া
দেখবেন কী শান্তিপূর্ণ সেই ভ্রমণ

যুদ্ধ শেষ হলে
গণকবর খনন বন্ধ হলে
আপনাকে যোগদান করতে বলব
কাশ্মীরি সংগীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে
আপনি অনুভব করবেন
আমরা ঠিক কতটা খুশিতে থাকি
নিজেদের নিয়ে

সত্যি সত্যিই যেদিন যুদ্ধ থেমে যাবে চিরতরে
আপনাকে চায়ের আমন্ত্রণ জানাব
নোনতা, গোলাপি চা
আশা করি সেদিন বুঝবেন
আমরা কোনোদিনই
একে-অপরের শত্রু ছিলাম না

সিরিয়ায়

সোমবার,
আশার দিন
অপেক্ষা শেষ হওয়ার দিন
জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে
চকচকে রুপোর বাটিতে খাবার পরিবেশনের দিন
যেন একটা বিশেষ মুহূর্ত
যার জন্য আমরা
একে অন্যের মুখ চাওয়াচায়ি করে থাকি
ওই তো রূপকথা থেকে
আল্লাহ আর তাঁর দূত
আমাদের বাঁচাতে আসছেন
                           অবশেষে

মঙ্গলবার,
সতর্ক থাকার খবর আসছে
জরুরী সামান হাতের কাছে গুছিয়ে রাখার সতর্কবার্তা
যে-কোনো সময়
সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যেতে হতে পারে

রেহানার কপাল
তাই তো পালিয়ে যেতে পেরেছে
চোখের মণি, আইলানকে মানুষ করার সুযোগ পেয়েছে
যে কি না এখন রেহানার একমাত্র ভরসা

বুধবার,
প্রথম মা হওয়া গাভীর মতো ছটফট করছি
স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছি না
গুজব ছড়িয়ে পড়ছে
বন্দুকের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে
বোমায় টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরবাড়ি
বাইরে কারফিউ
এখন ধৈর্য্যই একমাত্র পথ
আমাদের অপেক্ষা করতে হবে
জুতসই পালানোর মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত

বৃহস্পতিবার,
আমাদের দুঃখের দিন
ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের মাঝখান থেকে
জিভের টুকরো
গোল গোল চোখ
ছোটো সরু হাড় কুড়িয়ে
বাড়ি ফেরার দিন

শুক্রবার,
আমাদের শোক এতটাই দগদগে যে
আমরা শিষ্টাচার ভুলে যাই
আপনি চান
আমরা দেওয়ালে মাথা ঠুকি
হাত দিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে থেমে যাই
জিভ অসাড় হয়ে আসুক
জল শুকিয়ে যাক চোখেই
কিন্তু আমাদের হাহাকার এতটাই নাছোড় যে
থামতে জানে না

শনিবার,
ক্ষোভ প্রকাশের দিন
এও এক নেশার মতো
আকাশের দিকে দু-হাত তুলে চিৎকার

দর্শকরা প্রথম প্রথম
সমবেদনা জানান
মাথা নীচু করে বিড়বিড় করেন
তারপর একটা সময় বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন
কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন
আমরা দিন শেষে
ঝাঁকে ঝাঁকে যে যার বাড়ি ফিরে আসি

রবিবার,
আমাদের নীরবতার দিন
নতুন সপ্তাহের প্রস্তুতির দিন

কায়সার বশিরের কবিতা
[পরিচিতি: কায়সার বশির কাশ্মীরের অনুবাদক, লেখক এবং কবি। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।]

মৃতদেহ

ওই দেখুন একটা মৃতদেহ
কোথায়?
ওই তো স্রোতে ভেসে আসছে
আমি তো দেখতে পাচ্ছি না
ওটা কী?
ওই দেখুন লাশ! আখরোট গাছের নীচে
ওটা দুর্ঘটনা না খুন, আপনি কী মনে করেন?
ওই দেখুন একটা বুলেট
কোথায় বুলেট?
এটা তো একটা মাথা
পাকা তুঁতের মতো ছেঁতরে গেছে
আমি বুঝতে পারছি না… একটু গুছিয়ে বলুন
শুনতে পাচ্ছেন?
কী?
মায়েরা উঠোনে বসে কাঁদছে
মৃতদেহের জন্য?
হতে পারে
চলুন, সান্ত্বনা দিয়ে আসি
কী করে, ওটা তো রেড জোন
আমি বিশ্বাস করি না
বিশ্বাস করতে হবে আপনাকে
শুনুন
কী?
কণ্ঠস্বর
হ্যাঁ, একটা আওয়াজ
কণ্ঠস্বর না, ওটা চিৎকার
কীসের?
মিছিলের
ওরা কি লাশ তুলতে আসছে?
আমি জানি না
তবে, এদিকেই আসছে― যেন একটা হিংস্র নদী
চলুন, দৌড়ান
তা না হলে আমরা খুন হয়ে যাব
কেন? এটা ঠিক না
জানি, আপনি চলুন
লাশের কী হবে?
ভুলে যান, চলুন…
কোথায়?
যেখানে নিরাপদ মনে হবে
আমি দৌড়তে পারি না
আমার পা সেই কবে থেকে ঘুমিয়ে আছে
কেমন স্বপ্ন পছন্দের আপনার?
কার?
লাশের…
ভুলে যান, চলুন
ওরা এদিকেই আসছে
কোথায়?
আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না
এত কুয়াশা কেন?
কোথায় কুয়াশা, এগুলো ধোঁয়া
আগুন ধরিয়ে দিয়েছে
কারা?
আমি জানি না
চলুন, পালাই
আপনি যান, আমি থাকব
কেন?
ওরা যে আমার ভাইয়ের মৃতদেহ নিয়ে আসছে
ভাইকে একা ফেলে কোথায় যাব?

আমি

বৃষ্টির পরে
আগস্টের আকাশে রামধনু উঠল
আমি তার কাছ থেকে
কিছুটা লাল রং ধার করলাম
আমাদের দুঃখ লিখব বলে

সিদরা নাজিরের কবিতা

[পরিচিতি: সিদরা নাজির কাশ্মীরের কবি। কাশ্মীরের আন্তিপোড়ার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন। সিদরার কাছে কবিতা একটা প্রার্থনা, যা তাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।]

কাশ্মীর

দাসের মতো বাঁচা কাকে বলে― আপনি কি জানেন?
বাইরে বেরোলেই কাঁটাতারের ঘেরা
হায়নার চোখের মতো বন্দুকের নল
আপনার দিকে তাক করা
তখন কেমন অনুভব হয়
আপনি কি জানেন?

যখন কোনো কাশ্মীরি যুবক নিখোঁজ হয়ে যায়
সেই বাড়ির মুকুট থেকে নিশ্চিত
একটা পালক খুলে পড়ে
মায়ের চোখ থেকে ঝরে পড়ে নোনা জল
জল নয় অভিশাপ
আপনি কি জানেন― কেমন সেই অনুভূতি
প্রতিটি কাশ্মীরি বোনের মনে ক্রোধের বাস
বাবাদের হাতে কবরের মাটি
আপনি কোনোদিনই জানতে পারবেন না
এই শাসন দেখতে দেখতে
কাশ্মীর আস্ত একটা কবরে পরিণত হচ্ছে

কবরের রাস্তায়

সাদা কাফন এল
আতরের গন্ধ এল নাকে
হাসি নিমেষে বদলে গেল কান্নায়
সেই বীরের সম্মানে
ইনকিলাবের নাড়া দিতে দিতে চলে গেল একদল যুবক
শুধু,
একজন বাবা কেঁদে উঠলেন
একজন মা কেঁদে উঠলেন
আর চারজনের কাঁধে করে
একটা কাঠের ফ্রেম চলল―
                       শীতের দেশে

Categories
কবিতা

কল্যাণ মিত্রের কবিতা

নখর দিনের কবিতা

স্নানঘর থেকে উড়ে যাচ্ছে বৃষ্টি
বোঝার ভুলে
          বয়স বাড়ছে আমার

এত ভুল আসছে কোথ্থেকে
ভুলের কি কোনো পূর্বপুরুষ আছে !
পশ্চিমপুরুষ?

স্নানঘর থেকে উড়ে যাচ্ছে বৃষ্টি
ছোট হয়ে আসছে চোখ
বিন্দুজলে বৃত্ত ভাসছে…

সে – ২

সন্তুর বাজিয়ে আসে
শিকারা ভাসিয়ে চলে যায়

রমণের ছদ্মবেশে যে জ্যা-টানি শব্দের চেতনা জাগ্রত করে
মুদিখানা দোকানের মাসকাবারি খাতার মতো
তার জের কি কখনও মেটে?

সব সৌভাগ্যের মধুকোষে একজন নারী
সব উত্থানপতনের নেপথ্যে একজন নারী

‘নারীর কোনো উদাহরণ হয় না’

ভাষা

ভাষা আমার মাতৃদুগ্ধ                         ভাষা ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক
ভাষা আমার ভোরের স্বপ্ন                     ভাষা বুড়ো আঙুলের টিপছাপ
ভিড়ের মধ্যে যে-হাত ধরব বলে চলন্ত বাসের পিছনে
ছুটছি – সেই হাত সাপের ল্যাজের মতো
ক্রমশ সরু হয়ে আসছে…

আমার আর্তনাদ-ই আমার ভাষা।

Categories
কবিতা

পল্লব ভট্টাচার্যের কবিতা

শাস্ত্র অনুযায়ী, সমস্ত ক্রিয়া কর্মের আগে ও পরে
হাত ধুয়ে নিতে হয়; যাতে
কৃতকর্মের কোনো দাগ না লেগে থাকে।

আমি হাত ধুয়ে নিয়েছি।

হাতের মাধ্যমে কিছু ত্রাণ মাত্র পৌঁছে যায় দাতা থেকে গ্রহীতার কাছে।
হাত যে কিছুই নয়, দাতা বা গ্রহীতা, একথা না জানা হলে,
আত্মপ্রচারের মূর্খ অহংকারে ভাঁড় হয়— বাঁচা।

তুলসীদাসজী থেকে একথা শেখার পর, লজ্জ্বায় নুয়ে আসে মাথা।

‘আমি নই, হত্যাকারী এ হাত ইন্দ্রের’— বলে পুরাণকথার সেই ব্রাহ্মণও
আমার মতোই স্বস্তি পেতে চেয়েছিল। অথচ, ‘এ পুষ্পিত উদ্যান
কার যে নির্মান!’ —বলে দাঁড়াতেই, সে যখন বলেছে, — ‘আমার’—

তখন ইন্দ্র মানে, আমিত্ব, অহং; তাকে নিতে হয় সৃষ্টি ও ধ্বংসের ভার।

‘পবিত্র বা অপবিত্র যে অবস্থাতেই হোক, তাঁকে যে স্মরণ করে,
সে-ই শুচি, অন্তরে বাহিরে।’ —এই উচ্চারণ শেষে, বিশাল বিস্তারে
এসে দাঁড়িয়েছে শুচি-শুদ্ধ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ।

তবু অবিশ্বাস টিপে ধরে আমাদেরই গলা ।

শ্রীমদ্ভাগবতে লেখা, ক্ষুধা ও প্রয়োজন অনুসারে
খাদ্য পাওয়ার অধিকার দেহীমাত্রেরই রয়েছে।
এর বেশি যে অধিকার করে, সে দন্ডযোগ্য।

দন্ডদাতার মূর্তি আমারা বানিয়ে নিয়েছি অপাণিপাদ।

Categories
কবিতা

বিপ্লব চৌধুরীর কবিতা

শকুন্তলা

একটা কৃষ্ণসার হরিণের দিকে যখন তাক করেছি আমার জার্মান মাউজার, ঠিক তখনই একটা গাছের আড়াল থেকে আমি দেখতে পাই তোমাকে। প্রথমে আমার নয়নে আসে তোমার বক্ষসৌন্দর্য, এবং অতঃপর মুখচন্দ্রিমায় মুগ্ধ হয়ে যাই। তখন অবাক হয়ে দেখি, যে হরিণটিকে হত্যা করব বলে আমি ভাবছিলাম, তুমি তাকে ধরে আদর করছো। সে তোমার সঙ্গে যেন কথা বলছে কোনো এক বনজ ভাষায়। আমি কিছু বুঝতে পারি না। তুমি সেই ভাষা বোঝো, ভালোবাসা দিয়ে।

বন্দুক মাটিতে ফেলে, তীর ও ধনুক পরিত্যাগ করে, আমি গিয়ে দাঁড়াই তোমার মুখোমুখি। দেহ থেকে চন্দনের, চুলের খোঁপা থেকে ফুলের সুবাস সুবাতাসে ভাসে। তোমার আশ্চর্য চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আজ থেকে আর শিকার আমার কাজ নয়। শুধু চাই, তোমার নরম বুকে আমার কঠিন হাড় ক্রমে মিশে যাক। আমাদের ঘিরে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে। তুমি আমার, আমি তোমার হাত ছুঁয়ে থাকি।

রাত ভোর হয়ে যায়। প্রেমের প্রেরণায়।

সেই আমি

গাছের ভিতরে গাছ হয়ে যাই যদি! তুমি কি তখনও চিনতে পারবে? মাছের ভিতরে যদি মাছ হয়ে যাই, কাঁটা বেছে বেছে খেয়ে ফেলবে নাতো! নদীর ঢেউ অথবা ভূপৃষ্ঠের মাটি, কোথায় আশ্রয় নেব ভাবছি এখন। আর তাই সমগ্র সত্তা-জুড়ে বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে সাড়া-জাগানো সব সংশয়। মনে হয়, একটা রূপান্তরের পথ বেয়ে হেঁটে চলেছি কোনো তেপান্তরের দিকে। সেখানে গিয়ে আমি পাব একটা সবুজ ফুসফুস। ডানা পাব দুটো। পাখি হব গভীর বনের। উড়ে এসে যখন বসব বাগানের গাছে, তুমি কি তখন চিনতে পারবে! শুনতে চাইবে বহুবার চেনা-শোনা কোনো প্রিয়তম গান?

নির্বিষ

তুমি বাজাবে বীণ। আমি সেই তালে তালে নাচাব আমার ফণা। গোবর-লেপা বাঁশের ঝাঁপিতে চেপে, তোমার কাঁধে কাঁধে ঘুরে বেড়াব মেলার পর মেলা— হাটের পরে হাট— কত কত শহর আর শত শত গ্রাম। আমার দৈনিক খেলা তোমার মুখে তুলে দেবে প্রতিদিনের ভাত-রুটি-মদ। বউয়ের জন্য শাড়ি, ছোটো ছেলেটির জন্য পিতলের ঘুনসি কিনে আনবে তুমি। আমৃত্যু আমি থেকে যাব তোমার সহায়।
সেই কবে বটের কোটর থেকে তুমি বন্দি করেছো আমাকে। এতদিন পরে তোমার সংশয়ী মন বলছে আমাকে, সেই প্রতিশোধ-স্পৃহা থেকে যদি কখনো তোমাকে ছোঁবল মারি আমি! ও জীবন-সাপুড়ে, কেন এসব অর্থহীন কথা আজ উঠছে বলো তো? প্রথম দিনেই তো তুমি ভেঙে দিয়েছো আমার বিষ-দাঁত।

চোখ

আছে, তাই দেখি। ওই তো শিমুলগাছ রঙে রঙে লাল। মাটিতে ফুল-সহ পড়ে আছে পলাশের ডাল। তোমার সুন্দর বিরাট দিঘি। ফুটে উঠলো গোলাপি শালুক। বিকশিত হতে দেখি ভোর থেকে রাত। ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। বড়ন্তীর ড্যামে বাবার সঙ্গে ঘুরতে আসা সেই ছোট্ট মেয়েটির ফুটফুটে মুখ। জঙ্গলের অন্দরমহলে জীর্ণ এক টেরাকোটার মন্দির। মাটি ফুঁড়ে, সরলবর্গীয় গতি নিয়ে জেগেছে পর্বত। তার শৃঙ্গের ওপর নীল নীল নীলাকাশ। নাম-না-জানা পাখিরা সব উড়ে যায় অজানার দিকে।

Categories
কবিতা

বিজয় দে’র কবিতা

সান্ধ্য কবিতাগুচ্ছ

গেস্টাপো

যাকে নিয়ে এত কথা হচ্ছে সেই মিস্টার এক্সকে আমি কি চিনি? এই শতাব্দী থেকে আরেক শতাব্দীর দিকে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শতাব্দীর ওপার থেকেই যেন উত্তর এল “হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি নিশ্চয় চেনো”
আমার তো প্রশ্নের শেষ নেই।
“মিস্টার এক্স কি এই দেশেতেই থাকেন? বসবাস করছেন? নাকি অন্য কোনও দেশ থেকে এখানে আসবেন?”
কাটা কাটা উত্তর এল “ তিনি ভূত ও ঈশ্বরের মতো সর্বত্র বিরাজমান। তিনি ছিলেন। তিনি আছেন। তিনি থাকবেন”

“আমি কি ধর্ম ধুয়ে জল খাব?” চায়ের দোকানে বসে যিনি টেবিল চাপড়ে এই কথাটা বললেন, তার উলটোদিকেই আরেকজন, তিনি কিন্তু কথাটা শুনলেন তারপর, খুব শান্ত স্বরেই বললেন “চুপ। চুপ্। মিস্টার এক্স এসব কথা শুনলে খুবই রাগ করবেন, দেয়ালেরও দু-কান আছে। তিনি নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও আছেন”

“একটা পিয়ানোর তার গলায় পেঁচিয়ে যদি সিলিং থেকে আপনাকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, তবে আপনার কীরকম লাগবে? খরচ একেবারে নেই, সময়ও মোটামুটি কম, ধড় থেকে মুন্ডুটা কেটে বেরিয়ে আসতে যেটুকু। বিচ্ছিন্ন হওয়ার, এই ফাঁকে আপনি একটু ছোটোখাটো স্বপ্নও দেখে নিতে পারেন”

তিনি অন্ধকারে আছেন। মুখ দ্যাখা যাচ্ছে না। আমিও আরেক অন্ধকার থেকে এই প্রথম তাকে জিজ্ঞেস করলাম “তাহলে আপনিই মিস্টার এক্স? নাকি অন্য কিছু?
যেন শতাব্দীর ওপারের অন্ধকার থেকে একটি উত্তর ভেসে এল “আমি গেস্টাপো”

সাদা জামা
“একদিন এই বাড়িগুলো সব ভূতের বাড়ি হয়ে যাবে”

ইদানীং এরকম একটা কথা হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে
ম্যুনিসিপ্যালিটির লোকজন এই দিকে আসে। তাদের গায়ে সাদা পোশাক। হাতে সাদা চক

কোনো বাড়ি ভূতগ্রস্ত হলেই তারা নাকি দরোজায় দাগ দিয়ে যাবে

কিন্তু ভূত হবে কী করে? এখানে কেউ ভূত-প্রস্তুত প্রণালী জানে বলে শুনিনি

সকাল-বিকাল ব্যালকনি থেকে সামনের সরু গলিটির দিকে তাকিয়ে থাকি…
ওই, ওই বুঝি ওরা এল

গা শিউরে ওঠে। হাত-পা কাঁপতে থাকে। সজোরে স্ত্রী আমার হাত চেপে রাখে

এতটাই আতঙ্ক যে, সে ঘরের ভেতরের সব সাদা জামা কাপড় কোথাও না
কোথাও লুকিয়ে রাখে

“একটাও সাদা জামা যেন চোখের সামনে না থাকে”

আর আমি মনে মনে আমার সব সাদা জামাকে মৃত বলে ঘোষণা করি

চোপা

আপনি নিজের কবিতার ভেতরে নিজেরই আগাপাশতলা বমি আপনি জমি দখলের লড়াইয়ে একজন চতুর ও সহজ পলাতক
আপনি গর্তে গর্তে যতদূর আপনি ইঁদূরের ভেতরে ইঁদুরও ততদূর আপনি নিজের মৃতদেহের চামড়ায় লেগে থাকা স্বদেশের মানচিত্র

তুমি পুস্তকের একশো চল্লিশ পৃষ্ঠায় লিপ্ত গোপন সংক্রমণ তুমি হাজার মেঘের ভিড়ে একমাত্র মাছের বাজার
তুমি অন্ধকার বটপাতার ওপরে একাকী মূহ্যমান শামুক তুমি সবুজ পূর্ণিমার স্রোতে ভাসমান ভুতুম প্যাঁচার নির্যাস

তুই একটা ভাঙা দোতারা থেকে ছিট্‌কে-পড়া গানের কঙ্কাল তুই একটা কাচের বোতলের ভেতরে নষ্ট চাঁদের কুলকুচি
তুই সমস্ত হর্ষধ্বনির ভেতরে উড়তে থাকা ছাই-সমগ্র তুই দিনান্তে পাখিটোলার ভেতরে ডাহুক-শালিখের ওলাওঠা

অ্যান্টার্কটিকা

এই সুগন্ধ শিশু, সাদা ও সমৃদ্ধ। শিশুটির হাত ছুঁয়ে ফেলতেই সুগন্ধ সাতকাহন
তেঁতুলতলার মাঠ পেরিয়ে খোলাবাজারের দিকে চলে যায়
শিশুটি বলল “চলো তোমাকে একটা ধবধবে সাদা ও শীতল দেশ দেখাই ওখানে
আমি কখনও কখনও স্বর্গের গন্ধ হয়ে বসবাস করি
তখন এক সুদূরের বালক এসে আমার দুই হাতে নতুন নতুন পালক লাগিয়ে দিয়ে
চলে গেল, যেন আমি একটা পাখি। সুগন্ধ আমার পথপ্রদর্শক

এমন যে একটি দেশ আছে, জানতাম না, যেখানে গোটা দেশটাকেই সমাধিক্ষেত্র
মনে হয়। আমি এখানে পৌঁছে দেখি আগেই সুগন্ধ বরফ হয়ে বসে আছে

এতদিন আমি কোনও কথা বলিনি। আজ বললাম “তুমি কি শুধুই শিশু নাকি শুধু
সুগন্ধ নাকি সমাধিক্ষেত্রের চাতালে নিছক এক পাতা বরফ

উত্তর এল “আমিই একমাত্র দেশ, আমি একমাত্র সুগন্ধ, আমি একমাত্র শিশু
এই দেশ থেকে তোমাদের দেশের বাড়ি যেতে আমার মাত্র দেড় মিনিট

গাছবন্দি

গাছ কখনো জামা-কাপড় পরে না। তার কোনো লজ্জাবোধ নেই। গাছকে একদিন পোশাক-আশাকের
দোকানে অবশ্যই নিয়ে যেতে হবে

গাছ কি কখনো ঘেউ ঘেউ করতে পারে? আমি অন্তত শুনিনি। কিন্তু কেউ কেউ নাকি শুনতে পায়। এবং
তাদের কেউ কেউ গভীর রাতে গাছের মুখে জাল গলায় শেকল পরিয়ে দিয়ে আসে

গাছের কিন্তু খুব খিদে আছে। তবে তারা যা খায় সব অনুবাদ করে খায়। প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তারা
চাঁদ বা সূর্য গিলে খেতে পারে না

গাছে গাছে নাকি খুব প্রেম। যারা প্রেমের কবিতা লিখতে পারে না তাদের চিবুক ছুঁয়ে গাছ একটা ছোট্ট মন্ত্র
পড়ে “লেবুপাতা করম চা শরীর চায় গরম চা”। তারপর কবিতা আসে সপ্রেমে

তোমরা কি কেউ তুতুলগাছ চেন? এই একটি গাছ, যার সামনে দাঁড়ালে মন ভালো। না দাঁড়ালেও। মন
খারাপ হলে দু’মিনিট দাঁড়াই; কথা বলি। তুতুলগাছের সাথে মন বিনিময় সব গাছ জানে

আমাকে গাউচ্ছা বলতে পারো কিম্বা গাছুয়া। অসুবিধে নেই। কিন্তু গাছকে কেউ বৃক্ষ বললে গাছ খুব লজ্জা
পায়। আর কেন যে আমার চোখমুখ লাল হয়ে আসে জানি না

টাঙ্কি

— তুমি একটু কুসুমবনে মেঘের ঘনঘটা… এই গানটা গাইতে পারবে?
— আহা, তোর বুকটা এত ফাঁকা ফাঁকা কেন রে? তুই কি অসুখ?
— তোমার মুখটা যেন ঠিক লবণদানি, এবার একটু পানিয়াল হয়ে যাও
— এবার বসন্তে আমরা সব হসন্ত বিসর্জন দিয়ে দেব

ব্যালকনির হুকে একটি নীল তোয়ালে ঝুলছে। ঝুলছে মানে ভেজা তোয়ালেটি
হাওয়ায় শুকোচ্ছে। নীল তোয়ালের লোমে বা পশমে অনেকদিনের ঘুম ও জাগরণ
তাদের গায়েও লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক হাওয়া

উলটোদিকের বারান্দায় একটি লাল রঙের তোয়ালে। তার গায়েও অনেক কথা লেখা। সে
কিন্তু একটু বেশিই বলতে চায়। সেইসব কথার অনেক চোখ আছে। সেইসব চোখের অনেক
মরিয়া দৃষ্টি আছে। সেইসব দৃষ্টি থেকে কুসুম কুসুম অনেক গল্প

আমি ওদের মাঝখানে যেতেই দু-টি তোয়ালে
আকাশের দু-রকম মুখ হয়ে গেল

নীল তোয়ালের বুক থেকে লজ্জ্বা আর
লজ্জ্বার বুক থেকে ব-ফলা খসে গিয়ে উড়ে গেল
লাল তোয়ালের বুকের দিকে

তোয়ালেও মানুষ; আর তোয়ালেকে মানুষ ভেবে
আমার জীবনে যে কত ভুল

কবি যখন

কবি যখন ছবি আঁকে তখন সেটা ট্রামলাইন না হয়ে আর উপায় থাকে না

আমার চোখের সামনে একটি ছবি; কাচ দিয়ে বাঁধানো ট্রামলাইন। চোখের সামনে থেকে
দৃশ্য শুরু হয় তারপর ট্রামলাইন ক্রমশ মিশে যায় দিগন্তের দিকে

ট্রামলাইন দেখতে দেখতে আমার ঘুমে অনেক চাঁদের উদয়, আবার দেখতে দেখতে
অনেক চাঁদের অস্ত। একটা ঘণ্টাধ্বনি টিংটিংটিং চলতে থাকে আমার ঘুমের সঙ্গে

আমাদের জলপাইগুড়িতে শেষে ট্রামলাইন পাতা হয়ে গেল? খবরটা শুনেই আমি রাস্তায়। ট্রামলাইন খুঁজতে আমি
এপথে-সেপথে। একটা দুর্ঘটনার আশঙ্কা আমার পিছে পিছে আসছে

কবি যখন ছবি আঁকে তখন ট্রামলাইন মুছে দেয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকে না

Categories
কবিতা

শান্তমের কবিতা

ইস্কুল

কেউই আসে না

না ফেরা মানুষ; ভালোবাসাগুলি
ঠিকানা বদলে নেয় বার বার

Categories
কবিতা

বঙ্কিমকুমার বর্মনের কবিতা

নমুনা

আমাদের বিবাহের পচাগলা সুর কেউ শুনছে না, না-একটা ফুল গাছ, না-একটি প্রজাপতি। সবাই কেটে পড়ছে দূর থেকে ভ্রূ কুঁচকে। অযথা আমরা বিবাহের খরচ বাড়িয়ে চলেছি দিনকে দিন।

Categories
কবিতা

মামনি সরকারের কবিতা

মায়া ফলক


প্রেমের কবিতা লিখতে বললে
মা-বাবাকে মেলাতে বসি।
কিছু কিছু রাতের বাতাস

Categories
কবিতা

কাজী ওয়ালী উল্লাহর কবিতা

জীবনভঙ্গি

আশ্চর্য জীবনভঙ্গি আমি রপ্ত করেছি
ঘুমাব না, ঘুমালে জাগবই না
কেবল রোদের পরাগায়নে ঝিমিয়ে দুপুর কাটিয়ে দিই,

Categories
কবিতা

বিক্রম ঘোষের কবিতা

ঠাকুমা ও মা


মা বলতো শেষের কয়েকটা দিন ঠাকুমা নাকি শৈশবে ফিরে যেতে চেয়েছিল,
বিকেল হলেই আয়নার সামনে বসে লাল ফিতে দিয়ে সাদা একমুঠো পটের চুলে বিনুনি বাঁধত,