লেখক নয় , লেখাই মূলধন

অচিন্ত্য মাজীর গুচ্ছকবিতা

জাতিস্মর

অবিন্যস্ত দেহভার এই বিপুল পললে থিতিয়ে যায়
বহুকাল কেউ নেই, পড়ে আছে গুটোবার কৌশল
বিরাট হলদে দানব জীবাশ্মের ভেতর কুটস্থ
অতিকায় জিভের কাঁটা ও রোঁয়া এখনো সজাগ
নিমজ্জমান আঁধার পাতাল থেকে কুবো পোড়া সেনবংশীয় যুবক
উত্তরীয় খুলে মাথার খুলি নামিয়ে রাখে মাটিতে
অগুনতি মুষিক চলাফেরা করে ফাঁপা মাটির ভাঁজে
দ্রাবিড় পুরুষ ধাতব বর্ষা ফেলে হাড় ও পাথরের ইজ্জত বোঝে
মহেঞ্জোদাড়োর অতীব সুন্দরী ঘন কৃষ্ণাঙ্গী নারী
ভারী পাথরের গয়না পরে আরও জমকালো আর রহস্যময়ী
আলো আর আরকের প্রত্ন খেয়ালে এলোমেলো হয়ে
সেই আদিম নিরামিশাষী ম্যাজিক নাছোড় ঝঞ্ঝাট চেপে ধরে
টগবগ করে ফুটতে থাকে
বিশ শতকের ফুলে ওঠা গালপাট্টার দেমাকে।

***

অষ্টাবক্র

পঞ্চপ্রদীপের আলোয় ঈষৎ কামাতুর হয়ে উঠল যজ্ঞবেদী
নাকছাবি থেকে খরশান পীত আলো ভূমিষ্ঠ হবার আগেই
জল্লাদ খাঁড়া তোলে, ভয় নয় ত্রাস নয়
চোখের কোল থেকে পলকা বিস্ময় আধবুনো জটা হয়ে
আদিম অরণ্যে ভেজা গুহাপতনের দিকে ধাবিত হয়
আর একটু পরেই গুরুশব্দ উঠবে
সোহাগী বুড়ি অভিশাল দিতে এলে
প্রতিমার শুকনো মুখ থেকে ছিটকে আসে গর্জন তেল

তুমি এখনও পুরোনো গোঁত খাওয়ার অভ্যাস ভোলোনি
মিউ মিউ করে রজস্বলা মার্জার
কালো চিটে রক্ত শুঁকতে এসে খাবি খায়।

দেখে থাবার নিচে উন্মুখ হিংস্র নখটি
কখন যেন সাঁড়াশির মতো ফেঁসে গেছে গুহ্য দ্বারে।

***

নজরবন্দী

এতটা পথ বগলদাবা করে নিয়ে এলে ভৌত গুহায়
চুনাপাথরের থামের আড়ালে গ্রানাইটের কালো স্তর
সরু সুড়ঙ্গে হাওয়ার ঝাপটা খেলে সোঁ সোঁ শব্দ হয়
সাদা গুম্ফায় উলঙ্গ হয়ে নাচে সপ্ত ত্রিশুল
বালি চুন খড়ি আর পাথর চাকলার নরম ডাঁইয়ে
ছশো বছরের নিষ্পাপ আলো উঁকিঝুকি মারে
ধাতব দেওয়ালে ল্যাজ বের করে আছে লোমশ পোকা
এরই মাঝে নষ্ট সেই প্রেতাত্মা খিলখিল করে হেসে ওঠে
তার ভারী বুনো ছায়া ঘোরে জন্তুদের আধপোড়া হাড়ের খুরপিতে
প্রাচীন হত্যা আর অন্তর্ঘাতের নগ্ন মন্ত্র থিতিয়ে আছে গুহাগাত্রে
আরও একটু অতল হলে দেখতে পাই
প্রত্ন কিংবদন্তী আরশির ভেতরে উপুড় হয়ে আছে
তার বিরাট হাঁ মুখে ফোঁপায় ছশো বছরের গর্জন
আশ্চর্য সম্মোহনের ফাঁকে বন্দী হয়ে আছেন
গুপ্ত নজরবন্দীর খেলায়।

***

আলাদিন ও প্রদীপ

কিছুই রাখিনি নিজের ছড়িয়েছি বাইরে
প্রতীক্ষায় আছি স্বচ্ছ শুনশান কখন নিরলস বিস্তারে
কমণ্ডলু থেকে লুটিয়ে নামবে অঘোরপন্থী প্রেতনাদে
জন্মান্তর ভেদ করে ভ্রষ্টস্মৃতি পুনরায় চাঙ্গা হবে
আধিভৌতিক গেরুয়া খুলিতে অপদেবতা গর্জায়
বিরাট কালো কৌপিন অকস্মাৎ দিগ্বলয় ঢেকে দেয়
দেখি কেমন করে চতুরঙ্গে কেন্নোর মতো গুটিয়ে যায় সভ্যতা
লিকলিকে খড়্গে গাঁথা কাটামুণ্ড ছটফট করে
পঙ্গপালের ফিকে সবুজ ডানায় ঢেকে যায় মহাদেশ
শিশ্নের শিখাটি ক্রমশ আঁধারের দিকে বেঁকে গেলে
মাদুলি নিবদ্ধ মোম একসময় সরে যায়
এই আমাদের শেষ আলো, আলাদীনের প্রদীপ থেকে
তৈলসিক্ত সলিতাখানি বেরিয়ে বৈজয়ন্তি ফুলের মতো
টলোমলো হয়ে ফুটে রয়েছে পান ও কর্পুরের আড়ালে
তা দেখে অপরাহ্নের ধীরগামী ছায়া
শিস দিতে দিতে চলে যায় নিবিড় বনের নীলিমায়।

***

সন্ধিকাল

যেখানে আকাশ শেষ ছন্নছাড়া নিখাদ কালো
ভারী শেকলের মতো মোটা আর চিৎ হয়ে আছে
অথচ কোথাও কোনো আয়তন নেই, গূঢ় অভ্যন্তর নেই
বিরাট ভোঁ ভোঁ’-র ভেতর অতিকায় শাল্মলি নিষিদ্ধ কুহক মেখে হি হি করে
জল না পেয়ে চিড়িয়া ঝোপের খট্টা শিকড় কালচে হলুদ
মরণের আহুতি থেকে ঘনিয়ে উঠছে জড়িবুটির প্রাচীন ভেষজ বৈভব
সেই রাক্ষুসে কালো আরও দূর নক্ষত্রের ফেনা মেখে মুখ ভ্যাংচায়
মাটির দিকে তার রোগা হলদে পা ঝুলে আছে
অনবদ্য জারক রসে মাখানো মদির জিহ্বা ও উলঙ্গ দাঁত
ঝাঁপির ভেতরের ফুটো থেকে উঁকি মেরে তোতলায়।

আমি সর্বশক্তিমান পুরুষের উপাস্য দিয়ে তুলে আনি
আহত তৃষাতুর আলোর সৌরভ
অতর্কিতে ছদ্মবেশি বুনো শিকারীর ভল্ল
তীব্র বেগে ধেয়ে এসে মরণ কামড়ে বিঁধে
আকাশে তখন অবিমিশ্র অশান্ত ঊর্ণা
ঐ লাস্যতার কাছে সমস্ত স্থবিরতা গলে যায়
সমস্ত দেমাকী আয়োজন নিভে গেলে টের পাই
মায়াহীন সূর্য মগ্ন গিরির ত্যাগ নিয়ে অস্ত যাচ্ছে।

অচিন্ত্য মাজীর গুচ্ছকবিতা

আমাদের নতুন বই