অভিষেক মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

নির্বাণ

সর্বভূতে ভবঃ চক্র! অর্ধভূতে শাঁসালো বক্রিম
সফনা ভুজঙ্গ জিহ্বা চেরা যমুনার জলে থই থই ভাসে
মাতনে ছোবল মারে, সে চুম্বনে গরল ছড়ায়।

ফুলে ওঠে আংশিক চণ্ডীমন্ত্র সত্রবোধি ধারা
নিধিভণ্ড দেহ থেকে অনিবার্য পদ্মধূমাদলে
রেখামুখ ভেঙে নামে দুর্বিষহ তাতালপ্রহরা

বেসিনে রক্তের ক্বাথ, পেট-কাটা নীল ফ্লাইওভার—
গণেশ টকিজ সন্ধ্যা-দুটি ট্যাক্সি, ‘ম্যাও ম্যাও’-ঘাড়ে ওঠাউঠি
ন্যাতানো শ্বাপদলিঙ্গ, ষাঁড়ধাক্কা- ফলতঃ দেউটি

ব্যাথা করে। ব্রহ্ম টিপে বসে থাকা ছাড়া আর নির্বাণ কোথায়?
সে দক্ষিণে থাকে নাকি অজ্ঞেয় বিদ্যার মতো ভূর্বলোকে থাকে?

***

ল্যাবেরটরি

অফুরন্ত ভূতবাদ, এক দিকে কাত হওয়া খুলির বর্তুল উৎসারিত দুধকান্নায়, ছত্রাকার হয়ে গেছে ব্রহ্মাণ্ডের আণুবীক্ষণিক মুক্তবাহ! সশস্ত্র জীবাণুযুদ্ধ মাথার বিন্যাস কেটে গৃহবন্দী করেছে তোমাকে। তোমার সম্মুখে এখন থালাভর্তি ফুটকড়াই, মদমাংসহীন সন্ধ্যেবেলা! তারবার্তা আসেনি এখনও! হঠাৎ আবিষ্কার করলে দেহগন্ধে পায়ের গোছে জড়ো হয়েছে দু একটি ম্যাগটপোকা। কবেকার প্রত্যাখ্যাত আখড়াবাড়ি, প্রথম যেখানে নাকি নাভি থেকে জিরেনকাঠের মায়াডাল ফুটে উঠতে দেখে লুটিয়ে পড়েছিলে তুমি; ইদানিং লোকে বলে তোমার স্নানঘরও নাকি সেরকম দোতারাকেন্দ্রিক। সাবানে সোমত্ত চিত্র মণিকর্ণিকার… রক্তের ঝোরার নিচে বুদ্বুদে সংরক্ষিত নাদমূর্তি বাসুদেব, ভেজা তোয়ালের মধ্যে বাটাম লুকনো; আবার চিৎকার। নাও গর্ভে গেঁথে নাও, অঙ্গে ধরো সোনা। ঈশ্বরহত্যার সাক্ষী এই সাদা স্নানঘরে ফিরে আসছে দত্তাত্রেয়। ক্রমে ঠাণ্ডা রব উঠছে পততভেশ কায়ো; যেন গুপ্ত মাকড়ের জালভাঙা ডিম্বঅবয়ব-পীত এই জন্মকুণ্ডলীর ছাল নমস্তে, নমস্তে শৈশবের প্রেতযোগ বর্ণিত টোটেম! তারপর মরিয়া বৃষ্টি, তোমাকে সন্ত্রস্থ করে মুখোশ খুলতেই… নিষেধাজ্ঞার মতো বেজে উঠছে চুম্বনের অসূয়াবিরোধ, হাই ফিডেল!

***

শ্রাদ্ধকাজ

লুকিয়ে রাখা যৌনবার্তা তুমি পড়ে ফেলেছ, এরপর কি শুকিয়ে যাওয়া রুগি পুরুষের মুখ ঊরুর ওপরে নিয়ে বসে থাকা যায়? চুলের মুঠি ধরে প্রথমে থুতুর কুণ্ডে নামিয়ে দেবে ঘুম না ভাঙিয়ে। ধাতব পিচ্ছিল রগ, দুটি জলস্রোত বেয়ে নামছিল। এই ডিসেম্বরেও ঘামি! ভাবতে ভাবতে ততক্ষণে তুমি হাতপাখার বদলে বোঝাই করেছ আম পাতা। গাছের দুপাশে ঘোর অনাভুত পিত্তিপ্রেত জিভ লকলক করছে…
বার দুয়েক বমি হল, আশশ্যাওড়া কঙ্কালের রস ছিল না একফোঁটা। তবু তুমি আরও শূন্য হবে বলে দু এক বার গলার ভেতরে ভেজা দেশলাই ঠুসে দিয়েছিলে। বুড়ো ম্যামথের দাঁত ঠুসে দিয়েছিলে। অথচ কী আশ্চর্য এই মুক্ত মারুৎতত্ত্বের ক্রীড়া দ্যাখো, তোমার নিশ্বাস প্রসঙ্গে সে অবিচল পায়রাধারী। মূর্তির বর্ণাভা শুদ্ধ করতে করতে এখনও সে হিলফিগার একটি থকথকে নাভির হংসের গলায় ভোঁতা টাইপরাইটারের নখ বুলিয়ে দেয়। মাথার খরখরে সাদা আঁচড়ে আদর করে।
মাটিতে টাটানো মুণ্ডে পোকা ধরতে শুরু করেছিল ততক্ষণ। তোমার খেয়াল ছিল না কারণ কোনো আলফা পতঙ্গের হুল সম্পর্কে তুমি সারবত্তাহীন কামড় পেয়েছিলে। ভেবেছিলে ভালবাসাহীন… আপেলের মতো লালা শীতগ্রস্থ, চ্যাপ্টা অসাড় কোনো কামানের খোলা মুখে ঈশ্বরচেতনা পেতে দেওয়া। দেহভার হালকা হয়ে আসে। আয়ুর ভেতরে ঘোরে শয়তানিপনা। এমন প্লাস্টিক তুমি আবিস্কার করোনি কোনদিন যা দিয়ে… সমুহ চেবানো মাথা সারাৎসার রুদ্ধ করে ধ্বংস করা যায়। ফলত পিস্তল তুলে নিলে…
তোমার মনে হয়েছিল অস্তিত্ব আঁচিয়ে নিক আর লেহন ভালো লাগছেনা। দাঁত কিড়মিড়-দাঁত কিড়মিড়, আন্ত্রিকবিশুদ্ধ দেহে, রক্তচোষা ওই দৃষ্টি ভালো লাগছেনা! উফ্‌ এই ডিসেম্বরেও এতটা তরল এই আড় না ভাঙা পুংলালা, আর বনশৃগালের একা উল্বদেশ থেকে কর্তনমুদ্রার ঝোঁক আঙুরের পেষণে চেপেছে। তুমি আজ পৃথকান্ন হবে ব্রহ্মসার। এক মালসায় ভস্ম খাবে, অথচ কেউ কারুর তামাটে মুখের দিকে তাকাবেনা।

***

ফাটামুণ্ডু শাওরারের নিচে

অঙ্গ সংরক্ষণের কথা পড়লাম; প্রায় এগারো রকমের স্টাইগিয়ান জল। প্রথমে প্রাণীটির শরীর থেকে রক্ত মেদ চুষে নিতে হবে তোমাকে। অথচ চিৎকার করতে পারবে না। অর্গ্যাজম তো নয়ই। তেতে উঠত উইজ্যা বোর্ড— তোমার হয়ত ভয়ে মাথাখারাপ হয়ে যেতে পারত সারশূন্য, যখন ওর চোপসানো আস্তরণ, যার নিচে আটকে আছে চটচটে খয়েরি মাংসের প্রতিস্বর, নিভে যায়; হে প্রতীশ্বর, রক্ষা করো! এরপর কড়িবল্লভ যে মোম রাখবে চামড়ার ওপর! রক্ষা করো! তোমাকে রবারনল আলগা করে দিতে হবে কেবল। আর নাভিপ্রদেশ ছিঁড়ে ওই গলাগলা মোম ঢেলে দেবেন মহামান্য কড়িবল্লভ। তোমার জ্যামিতিক বিষাদরতি প্রকাশিত, তুমি ওই বৃত্তটির ব্যাসনির্বাচক মাত্র। মনে পড়ে, স্বতঃসিদ্ধ উপপাদ্যের দেহভাঁজ? মত্ততা তোমায় আঙুলহীন করেছিল; ঊরুহাড়ের বিভাজিকা পুঁতে দিয়েছিল রাগে। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে হেটে গিয়েছিল বর্ণিকার কোনো নিধুজঙ্গলে— আলেয়া বাষ্পায়নপর্বের পুরাণে; যেখানে কেবিন ছিল, প্রেতভাবনা ছিল। অথচ তুমি ওই খ্যাপা প্রাণীটিকে আর ছুঁতেও পারোনি। একটি দীর্ঘকায় ক্রেনদাঁড়া ওকে ডুবিয়ে দেয় সিলিন্ডারের ভেতর। মড়ার বাপ্তিস্ম করা হয়। কিন্তু এসবের মধ্যে মেষজাতক, বৃষজাতিকার অন্তিম অস্তিত্ব আর কে কবে জিজ্ঞেস করে! কোথায় গেল জড়ুল? কোথায় লাগানো ছিল গোপন ক্যামেরা? দিগ্বিদিক চিরলোকায়ত। সানাইবন্দনা এতক্ষণ তোমার ঘাড়ে জোঁকের মতন ধরেছিল। কোনো এক রৌদ্রোজ্জ্বল ডিসেম্বরে তুমি হয়তো টেনে নিয়েছিলে রাক্ষসচক্রের নিচুপর্দা। উল্টোদিকে দোতলা বাড়ির ভেতর হরিদ্রাপ্রক্রিয়া চলতো, ধুনো পুড়তো! হাহাস্বর! রোগা পুরুতঠাকুর তখন পাঠ করছেন বৈধব্যের নান্দী।

***

ভ্রূণ

লাল নয়। ফলতঃ অনুচ্চার আত্মমুখীনতা আছে
টানের অতলে। অন্ধকারে
ধীর নাড়ি-চক্রবদ্ধ আয়ুমিড়, রক্ত ভেঙে জল।

আছে চিরহরিতের নিচে মরা কার্তিক মাসের
ভূতগ্রস্থ দোলক্রিয়া। সম্মোহন মোহিনীঅট্টম-
চৈত্রের ঘুঙুর নাচে ইন্দ্রিয় সমীপে।

নিবিড় কপাল থেকে ফেট্টি খুলে জলপট্টি রাখো।
রাখো নীল গ্রহপোকা, সূর্যশুঁয়োঘাম…
মন্ত্রপূত বামতেল-থালাপড়া বিনয়পিটক

অসাড় অক্ষরবাদ্য- মনোরম জাদুকল বাজে
স্মৃতিলুপ্ত শিরায় শিরায়। ছন্দপতনের দিন
বিলাবলে কেঁদেছে মুদারা।

তোমার দোতারা থেকে মড়ার দোতারা
আলাভোলা— গন্তব্যবিহীন…
নুড়িপাথরের ডাঙাজমি।

অভিষেক মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

আমাদের নতুন বই