লেখক নয় , লেখাই মূলধন

ওসিপ ম্যান্ডেলস্তেমের কবিতা

ভাষান্তর: ঈশানী বসাক


নিদ্রাহীনতা। হোমার। টানা পাল।
তালিকার মধ্যিখান অবধি আমি সমস্ত জাহাজের নাম পড়ে ফেলেছি:
দিশেহারা পশুর পাল, সারসের স্রোত
যা একসময় হেলাসের থেকে বেশি উচ্চতা ছুঁয়েছে।

সারসের পাল পার হয়ে যায় কত অজানা সীমান্ত,
তাদের নেতারা ঈশ্বরের ফেনায় ভিজে চুপচুপে
তোমরা কোথায় চলেছ নৌকো নিয়ে?
একিয়ের পুরুষগণ,
তোমাদের কাছে ট্রয়ের,
হেলেন ছাড়া কী মূল্য থাকবে?

এই সমুদ্র— হোমার— এ-সবই ভালোবাসা নরম করতে পারে।
কিন্তু আমি কার কথা শুনব?
হোমারের কোনো উত্তর পাচ্ছি না,
এই কালো সমুদ্র কী যেন বলার জন্য গর্জন করে
সমুদ্র গর্ভ বিদ্যুৎ চমকায়।
[১৯১৫]


ত্রিস্তিয়া
বিদায় জানানোর যা কিছু কারিকুরি আমি তা শিখেছি।
রাতের নগ্ন কান্নার শব্দ ভেসে আসে।
এই অপেক্ষা বাড়তে থাকে যেমনভাবে ষাঁড় জাবর কাটে।
শহরের শেষ মৃত্যুঘণ্টায় আমি মাথা নোয়াই।
গভীর শেষ রাতের পর মোরগের অক্লান্ত ডাকে।
ওদের দুঃখের বোঝার ভারে লাল হতে থাকে চোখ
আর ওরা দিগন্তে তাকিয়ে দেখে
দূরের মহিলাদের শোক আর মিউজের গান মিলে মিশে একাকার।

বিচ্ছেদের কথা থেকে কে বলতে পারে
আমাদের জন্য আর কী কী যন্ত্রণা প্রতীক্ষারত?
অ্যাক্রোপলিসের উপর ফুটে ওঠা আলোয়
যখন কুক্রুকু শোনা যায়,
জেনো তা এক নতুন দিনের শুরু।
জিভ ঝুলিয়ে ষাঁড়টি তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে।
মোরগটি ইটের স্তূপ থেকে ডানা নেড়ে
ঘোষণা করে নতুন দিনের সূচনা।

এই চক্রাকার ঘূর্ণন সেলাই মেশিনের সুতোর:
অথবা প্যাডেলের আমাকে আকৃষ্ট করে।
কাপড় বোনার মাকু এগিয়ে আসে, পিছিয়ে যায়৷
গুনগুন করে সূঁচ। মেষপালিকা ডেলিয়া খালি পায়ে উড়ে আসছে
যেন ভেসে এগিয়ে আসছে রাজহাঁস আমাদের জীবন শিকড়ে।
কত দারিদ্র্য আনন্দের ভাষায়। যা কিছু আগে ঘটেছে তা আবার ঘটবে।
কিন্তু প্রতিবার যখন দেখা হয় বড়ো ভালো লাগে
যেন এক মিষ্টি জলের আবেশ।

আমেন। ওই যে একটা স্ফটিক চেহারা
শুয়ে আছে মাটির থালাতে
যেন কাঠবিড়ালির চামড়া টেনে বিছিয়ে রাখা।
একটি মেয়ে ঝুঁকে পড়ে মোম পরীক্ষা করছে—
আমরা কে গ্রিকদের এই নরক বুঝে নেওয়ার
মহিলাদের জন্য মোম, পুরুষদের জন্য ব্রোঞ্জ
আমরা যুদ্ধ জারি রেখেছি
কিন্তু মৃত্যু আসছে সৌভাগ্যের রূপে।
[১৯১৮]


আমাদের আবার দেখা হবে পিটার্সবার্গে,
যেন সেখানেই আমরা সূর্যকে সমাধিস্থ করেছি।
তারপর প্রথমবারের জন্য সেই পুণ্যতা ভরা
শব্দের উচ্চারণ যার কোনো অর্থ নেই।
এই সোভিয়েতের রাতে চারিদিকে মখমলে অন্ধকার
এই মখমলি অন্ধকারেও মহিলাদের ভালোবাসার গান ভেসে আসে,
ফুল ফোটে, কখনো মরতে পারে না।

রাজধানী বুনোবেড়ালের মতো মুখ তুলে দেখছে
একটা ব্রিজ, তার উপর প্যাট্রল
কোথা থেকে অন্ধকারে একটি গাড়ি
গর্জন করতে করতে মিলিয়ে যায়, কোকিলের মতো হর্ন বাজিয়ে।
এই রাতটা কাটা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয়।

কবি পরিচিতি:

ওসিপ ম্যান্ডেলস্তেম সোভিয়েতের একজন ইহুদি রুশ কবি। তিনি একমিস্ট স্কুলের সদস্য কবি। জোসেফ স্তালিনের সরকার ১৯৩০ সালের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাঁকে স্ত্রী-সহ গৃহবন্দী করেন। এই সময় লেখা তাঁর মস্কোর নোটবই। দান্তের সঙ্গে রাজগোভোর সংলাপ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। ভ্লাদিবভোস্তকের একটি ট্রান্সিট ক্যাম্পে তিনি মারা যান।

ওসিপ ম্যান্ডেলস্তেমের কবিতা

আমাদের নতুন বই