নিকানো পারা’র গুচ্ছকবিতা

ভাষান্তর: সোনালী চক্রবর্তী

সতর্কীকরণ

আগুন লাগলে
এলিভেটর ব্যবহার না করে
সিঁড়িটাই খুঁজে নিও,

যতক্ষণ না অন্যরকম নির্দেশ আসে…

কোনো ধোঁয়া টোয়া ছেড়ো না
জিনিসপত্র এদিক-ওদিক ছিটিয়ো না
বর্জ্যত্যাগ তো নয়ই
রেডিওকে বোবা করে রাখ,

যতক্ষণ না অন্যরকম নির্দেশ আসে…

প্রতিবার ব্যবহারের পর
অবশ্যই টয়লেটের ফ্লাশ টেনো
শুধুমাত্র কোনো স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকার সময় টুকু ছাড়া।
খ্রিস্টের নামধারী যোদ্ধাকর্মী হওয়ার দিকে এগিয়ে চলা পরবর্তী যাত্রীটির কথা চিন্তা কোরো
যারা দুনিয়াকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসবে।
আমাদের হারানোর কিছুই নেই (অপ্রাসঙ্গিক)
তবুও আমরা জীবনের সবটুকুই
পিতা আর তার পুত্র আর তাদের পবিত্র ভূত-প্রেতের গৌরবে কাটিয়ে দিই,

যতক্ষণ না অন্য রকম নির্দেশ আসে…

সে যাই হোক,
কিছু সত্যকে আমরা তো স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই ধারণ করি,
যেমন,
সমগ্র মানবজাতির (অপ্রাসঙ্গিক)
জীবন, স্বাধীনতা আর আনন্দের অনুবর্তনের মতো
নির্দিষ্ট অবিচ্ছেদ্য অধিকারগুলোর
যোগান দেয় তাদের সৃষ্টিকর্তা,
আর সবশেষে উল্লেখ করলেও
দুই এর সঙ্গে দুই যোগ করে যে চারই হয়,
তার গুরুত্ব তো কমে যায় না,

যতক্ষণ না অন্যরকম নির্দেশ আসে…

***

তরুণ কবি

লেখ লেখ,
যা প্রাণে আসে,
যে ভঙ্গীতে ইচ্ছা করে,

একটি মাত্র সড়কের শেষেই যে সঠিক ঠিকানা আঁকা এই বিশ্বাসে সেতু গর্ভ দিয়ে বহু রক্ত বয়ে গেছে

কবিতায় সব কিছু জায়েজ

অবশ্যই তার একটিই মাত্র শর্ত,
সাদা পাতাটির মানোন্নয়ন।

***

কাল নিরূপণ

চিলির সান্তিয়াগোতে,
দুপুরগুলো অফুরন্ত দীর্ঘ,
একটা মাত্র দিনেই যেন অজস্র অমরত্ব।

ঠিক খচ্চরের পিঠে ভ্রাম্যমাণ
সামুদ্রিক আগাছা বিক্রেতাদের মতই
তোমার হাই ওঠে— উঠতেই থাকে ক্রমাগত।

যদিও সব সপ্তাহই সংক্ষিপ্ত,
মাসেরা ভীষণ গতিতে ধাবমান,
আর বছরগুলোর তো ডানা আছেই।

***

শেষ পেয়ালা

তুমি মানো বা না মানো,
নির্বাচনের জন্য আমাদের কাছে
মাত্র তিনটে বিকল্প থাকে,
গতকাল, আজ আর আগামিকাল।

এমনকী তিনটেও নয়,
কারণ দার্শনিকেরা যেমন বলে থাকেন আর কী,
গতকাল হলো শুধুই অতীত,
একমাত্র স্মৃতি ছাড়া এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
যে গোলাপকে ইতিমধ্যেই উপড়ে ফেলা হয়েছে,
তাতে কি আর নতুন করে পাপড়ি আঁকা যায়?

সুতরাং খেলার মতো তাস মাত্র দুটো,
বর্তমান আর ভবিষ্যত।

এমনকী দুটোও নয়,
কারণ এটা তো জানা কথা,
বর্তমানের কোনো অস্তিত্বই নেই,
শান দিতে দিতে কখন যে ক্ষয়ে যায়
যৌবনের মতো।

শেষমেষ,
আমরা শুধু পড়ে থাকি আগামীকাল নিয়ে,
চশমা এঁটে তাকিয়ে থাকি সেই দিনটার দিকে যা কখনো আসে না।
আর এটুকুই শুধুমাত্র বরাদ্দ থাকে হস্তান্তরের জন্য।

***

ফিরিয়ে নিচ্ছি সমস্ত কথা যা আমি বলেছিলাম

চলে যাওয়ার আগে,
আমারও একটা শেষ ইচ্ছা থাকার কথা।
হে অকৃপণ পাঠক,
আমার বইটা পুড়িয়ে দিন।
এটা একেবারেই তা নয় আমি যা বলতে চেয়েছিলাম,
যদিও রক্ত দিয়েই লেখা
তবুও এগুলো আমার কথা নয়।
কোন অদৃষ্টই আমার অধিক বিষাদগ্রস্ত নয়,
আমি পরাভূত হয়েছি নিজেরই ছায়ার কাছে,
আমার সঙ্গে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে আমারই শব্দেরা।
ক্ষমা করে দিন পাঠক, নিবিড় পাঠক যত…
যদি উষ্ণ আলিঙ্গন দিয়ে আপনাদের ছেড়ে যেতে অক্ষম হই,
একটা আরোপিত আর যন্ত্রণাময় হাসি ফেলে রেখে অবশ্যই বিদায় নেব।
সম্ভবত এটাই আমি।
কিন্তু আমার শেষ কথাগুলো দয়া করে শুনুন,
আমি ফিরিয়ে নিলাম আমার সমস্ত কথা যা আমি বলেছিলাম।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম তিক্ততাটিকে সম্বল করে,
আমি ফিরিয়ে নিলাম আমার সমস্ত কথা যা আমি বলেছিলাম।

কবি পরিচিতি:

নিকানো সেগান্দো পারা সাদোভাল ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী কবিদের একজন। ‘বিরুদ্ধ-কবিতা’র প্রবক্তা চিলির এই প্রবাদপ্রতিম পুরুষ একাধারে ছিলেন গণিতজ্ঞ ও পদার্থবিদ। ১৯১৪ থেকে ২০১৮ অব্দি ১০৩ বছরের দীর্ঘ জীবনে পেয়েছেন অজস্র সম্মান। সৃষ্টি সাপেক্ষে তাঁর তুলনায় প্রায়শই পাবলো নেরুদাকে আনা হয়।

নিকানো পারা’র গুচ্ছকবিতা

আমাদের নতুন বই