লেখক নয় , লেখাই মূলধন

বঙ্কিমকুমার বর্মনের কবিতা

নমুনা

আমাদের বিবাহের পচাগলা সুর কেউ শুনছে না, না-একটা ফুল গাছ, না-একটি প্রজাপতি। সবাই কেটে পড়ছে দূর থেকে ভ্রূ কুঁচকে। অযথা আমরা বিবাহের খরচ বাড়িয়ে চলেছি দিনকে দিন। পূর্বপুরুষের ছত্রছায়ায় বসে চুপিচুপি শুনে যাচ্ছি মৃত আত্মাদের পায়চারি।

আধখাওয়া চুম্বনের পাশে কতগুলো কালো মাছির জন্মদিন ফুলেফেঁপে উঠেছে। আমরা ভয়ঙ্কর কান্নাকাটির জং সারিয়ে তেঁতো ত্রিভুজ পুঁতে দিচ্ছি টাটকা সম্পর্কে‌র নাভিমূলে। কতগুলো অকেজো ইশারা আমাদের গানে ভিড় ঠেলে বসে পড়ে, হাততালি দিয়ে উঠোনের পাখি তাড়ায়

আসন্ন শীতে

আসন্ন শীতে ঘোড়া ছুটিয়ে দেব চতুর্দিক

রণস্থল উড়ে বসে আমর কাঁধে। শত শত শঙ্খের আওয়াজ বেছে নেয় নৃত্যগীত। মুহুর্মুহু জয়গানের লকলক করে জিভ। ভাসমান জলে থৈ থৈ প্রাতঃকাল ফুটে আছে পাপড়ি মেলে। এসব বুঝেই ব‍্যবহৃত করছি ওঠানামায় ঘাসসিঁড়ি

জানি পৃথিবীর বাসিন্দারা আমাকে কখনোই বুঝতে দেবে না গুহাবাসীর মৌন মুখরতা। পিচ্ছিল পথের জাদুকর্ম ঝলকে উঠে। সহসা অনামী বন্দর হেঁটে নিয়ে যায় আমাকে নৌকার স্বরবৃত্তে।

বিপন্ন বিস্ময়

গোটাকয়েক ফুলের ভোঁতা গন্ধ টের পাই। দ্বিধাবোধে মুখ ঘুরিয়ে নিই পাখির কোলাহল থেকে। ছোট্ট মাথায় উড়ে বসে জ্বরগ্রস্ত সংগীত। আজ সাতদিন হল কোনো জিজ্ঞাসা নেই ঘনঘোর জঙ্গলের; সুরাহা মেলেনি পিপাসার ভিন্ন কণ্ঠে

খোলা গানের উল্কাপাত দেখছি না কোথাও, সেই থেকেই নিত‍্য সঙ্গী ক‍্যামেরাবন্দী বারান্দার পায়ের চাষ পদ্ধতি। খামখেয়ালিপনা ছিঁড়েখুঁড়ে সন্ধিপ্রস্তাব রাখি আগুনের জঠরে; ভীষণভাবে জমে উঠে আমাদের জম-জমাটি ভাব।

ভীষণভাবে ছড়িয়ে আছি

ভীষণভাবে ছড়িয়ে আছি। কোনোদিনই আমি সাজানো গোছানো হয়ে উঠতে পারিনি

নখের কোণায় গুঁজে রেখেছি উজ্জ্বল দুটি চোখ। বিদ্যুৎময় তীক্ষ্ণ কলরবগুলি কোথায় হারিয়ে ফেলে এসেছি দূর ভ্রমণে, আমার ব‍্যবহৃত পা ও জুতো জোড়া পড়ে আছে বাড়ির এককোণে। দৃষ্টির ছলাকলা অমীমাংসিত শীত ঘেঁটে চলেছে।

ছুটে গেছি উঁচু নিচু পাহাড়ের গায়ে, খেয়ে ফেলছে আমার এক কান পিঁপড়ায়। হাতগুলো খুলে রেখেছি দেওয়ালের টাঙানো দড়িতে; চা খাব বলে ঠিকঠাক সফলতা মেলেনি। অবিন‍্যস্ত চুলগুলো অবুঝ বাতাসে গা এলিয়ে রোদ পোহায়।

আবাদ

উত্তুরে হাওয়ায় শরীর ফলাতে দ‍্যাখি দুই মনোতীর; জেগে থাকে একাকী রাত্রিচূড়ায়। হঠাৎ জ্বেলে ওঠে আলিঙ্গনে বাতিঘর। আঁখিপল্লবে বৃষ্টিবহুল থৈ থৈ দৃষ্টিপ্রদীপ। ক্রমে ঢের অবগাহনের পর ফাটলে ঢুকে পড়ে ওষ্ঠের কম্পন। খসে পড়ে গাঢ় নীল পোষাক— অঢেল বিষয় ছুঁয়েছে বরফের হিম। নির্বিকার ধারালো ছুরির জগৎ নেমে যাচ্ছে খাদ বেয়ে।

সংশয়ে আঁকা হচ্ছে না নাগরিক আঁতুড়ঘর— অধিকৃত স্থির তরুণ ছায়া কেঁপে কেঁপে ওঠে। বদলে যায় বনস্পতির ডাকঘর। যথা ভ্রাম্যমাণ বেশে অজস্র বর্ণমালা জমিয়ে রাখে দেহে টলটলে স্নায়ুজল।

সৌজন্য

আপাতত যা লিখেছি সবটাই সৌজন্যে

ঊষা ঢেলে পাহারায় আছে ফুটপাত; মজেছে সুন্দর দরজা। ঢেউ দিচ্ছে সাবধানী নীরবতা। থিতিয়ে আসে মুঠোফোনের কথকতা; কাকে ডাকি আর চায়ের আড্ডায়, এসেছে অপ্রস্তুত বেলাভূমি।

অসাবধানে উঠে গেছি জানালার সহজপাঠে। তবুও যন্ত্রণাটা কীভাবে বাড়ে— এখানেই জটিলতা সব যুবতী রেখার। একাগ্রভাবে রৌদ্র দিনে শুধু ভোরের পাখি ধারণ করতে শিখেছি। যা নেই তা মেনে নিয়েছি সহজ উপায়ে স্বজন হারানোর শেষ যাত্রায়…

খিলখিল ভাবনার স্বচ্ছ জলে মাছ ছেড়ে দিই। আঁতকে ওঠে নিজহাতে লাগানো ফলবতী গাছ। যেহেতু ভালবাসার পাঠশালায় আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের সম্পূর্ণ ছুটি।

জলের স্লেটে

জলের স্লেটে অপরিমাণ সমুদ্রের নোনা দাগ হাঁ করে তাকিয়ে আছে।

এত জলের প্রলোভন পানকৌড়ির দূরদেশ আশ্চর্য হয়। মরে যাওয়া কাঁকড়ারা জীবিত সাজায়। হাঁটু গেড়ে বসে সমস্ত ডুবরির শিল্প জগৎ। কান পেতে শুনি, বৃহৎ আবেদন নিয়ে ঝিনুকের উদাস তলদেশ স্পর্শ করে নীবিড়।

আমার নেশা জাগে সমুদ্রভ্রমণে যাব। সম্ভাব্য উষ্ণ আদরে ডিম ফুটে বেরিয়ে আসে মাছ— ঢেউয়ের মেরুদণ্ডে রক্তের নিপুণ পাঠ। সহজ শর্তে মোহনার রচিত ভূমি চরিত্র বদলায় নাটকের মঞ্চের আলোয়।

বঙ্কিমকুমার বর্মনের কবিতা

আমাদের নতুন বই