লেখক নয় , লেখাই মূলধন

রঞ্জন ভট্টাচার্যের গুচ্ছকবিতা

ডাকাডাকি ১

তুমি জঙ্গল পেরিয়ে ভালোবাসা পেরিয়ে নিস্পলক চেয়ে আছ। তোমার নৌকার মতো ঠোঁটের দিকে চেয়ে আছি আর অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। আমি ভেজা শরীরে পারিপার্শিক হাজার ঝামেলা দু’হাতে দূরে ঠেলার চেষ্টা করি, ব্যর্থ হই। কে যেন কাঁধের ওপর বন্দুক রেখে গেছে। মাঝে মাঝে এক-একজন আসে আর বন্দুক চালিয়ে চলে যায়। কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না। তুমি স্থিরচিত্র এক। ডাকবে না জানি। তবু কান খাড়া রাখার তাগিদে বন্দুক নামাতে চাইছি। গুলির শব্দে কান ঝালাপালা। জানি তুমি ডাকবে না তবু গুলির শব্দ সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। এই উদ্বিগ্ন অবস্থায় তোমাকে পাব না জেনে সুপ্রসন্নকে ডেকেছি। ওকে আজ হাত জোর করে অনুরোধ করব। বলব ভাই এই ভার সহ্য করতে পারছি না। দয়া করে আমাকে সাহায্য কর। কাঁধ থেকে বন্দুকটা নামিয়ে দে যেকোনো উপায়ে।

আমি প্রান ভরে তার ডাক শোনার অপেক্ষা করি।

ডাকাডাকি ২

সুপ্রসন্ন আসতে দেরি করলে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করি। সসঙ্কোচে দূর থেকে শুনে নিই কন্ঠস্বর। অল্পকিছুক্ষণ অপেক্ষা করার দূরবর্তী নির্দেশ আসে। দুটো চোখ চলে যায় বাড়ি রাস্তা গাড়ি ধুলো ভেদ করে সুপ্রসন্নর বাড়িতে। কখনও সরব কখনও নীরবে চোখ দিয়ে ডেকে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। বিষণ্ণতা প্রকট হয়। প্রকট হয় চাহিদার অন্তর্লীন আলো। দিন কাটে না। সময় মুষরে পড়ে গুলির শব্দে। হাঁটু বন্দক রেখেছি চায়ের দোকানে। এই সময় আমার এগিয়ে যাওয়ার কথা নিষ্প্রয়োজন। হাত পেতে বসে আছি। সহ্য করতে বলছি বিগত দিনের বেয়াদব দাম্ভিক অসহ্য এক গোলমেলে মানুষকে।

তবু বলি মানুষটা আজ প্রেমে পড়েছে।
ভালোবাসায় মাখামাখি করছে।

ডাকাডাকি ৪

দূর থেকে ধরা পড়ে অস্পষ্ট সুখী মুখখানা। শুধু ওই সৌন্দর্যের কাছে হার মানে বেয়ারা যুবক । সকালের ফাঁকা ঘরে কি আপোদ আসমানী সুখ।ডানা মেলে উড়ে যাওয়া সহজ হবে না। গাছপালা ঘেরাটোপ ফাঁকা পথে বাসর সাজানোও। তিন দিনে মেলা শেষ। কতদূরে পুরুলিয়া জীবন জানে না। ফাঁকা মাঠে পড়ে আছি। আর বাড়িও যাব না। তুমি দূরে তুই দূরে, অসময়ে কাউকে পাব না!

সুপ্রসন্ন ডেকে দেখ। চেয়ে থাক। ফাঁকা মাঠে পরে আছে খুনের আসামী।

ডাকাডাকি ৫

ডেকে তো দেখিনি তাকে! সাহস হবে না। দেখে নেব বহুদিন পর। আড়চোখে দেখে নেব গোপন বাসনা। জ্বর আসে হাওয়া বয় এলোমেলো জীবন কাহিনি। দেখো! তুমি সুখে আছ। ভালো মন্দ কিছুই বোঝো না। হাওয়া খাও ওরে চুল, তুমি কি উড়েছ। ডানা দুটো সোজা হলে, ভাসা যায় কখনো ভেবেছ! একা একা ফাঁকা পথে গান গাওয়া যায়। পাখিদের সাথে দুম করে নেচে ওঠা যায়। একা একা ফাঁকা মাঠে ডিগবাজি মেরে ফেলা যায়। বিছানায় থালা রেখে মাছ ভাত খেয়ে ফেলা যায় ।

আমাকে অসহ্য লাগে যে বন্ধুর, তেমন সুপ্রসন্ন বন্ধুকেও বুকে টেনে নেওয়া যায়।

ডাকাডাকি ৮

শেষ পর্যন্ত তোমাকে ডেকেছি। জঙ্গলের আলোছায়া ডিঙিয়ে গভীর নির্জন পথে চলেছ একাকী। সময়ের অনুচর আমাকে ডাকোনি। জঙ্গলের স্রোতহীন চোরা জলে ভিজিয়েছ দুই হাত নীল জামা। সঙ্গী-সাথী তোমাকে পেয়েছে, মালুম করেনি। এতটা অভাবী জীবন ছুঁতেও পারি না। দুটো চোখ জলাভূমি উঁচুনীচু জলপ্রবাহ খুঁজেও পাব না। খুঁজে দেখি পথ ভুলে ফাঁকা ট্রেন ছেড়েই দিয়েছি। কোথায় চলেছি ছায়া নেই আলো নেই, এ কেমন মহাঘোর।

যদিও রশদ কিছু নেই, জিতিনি তেমন কোনো খেলা। কথা রয় গাছের ফাঁকে ফাঁকে, দেউলিয়া হচ্ছে সারাবেলা। দেখে যাই জীবন গোটা রাত, ধরবে কি এমনি ধুলো হাত। আমারও চালাক চতুর ভাব, মিলবে না মতের সাথে মত। এভাবেও চলতে পারে নাকি! এ জীবন কেমন করে রাখি। এই জীবন কেমন করে রাখি। হল না তেমন কোনো কাজ।

ডেকে দেখি কেউ এলো না আজ। চলে গেল সময় মহারাজ।

রঞ্জন ভট্টাচার্যের গুচ্ছকবিতা

আমাদের নতুন বই