লেখক নয় , লেখাই মূলধন

রবিন এস নাংগম-এর কবিতা।। অনুবাদ: সঙ্গীতা দাস

[এই মুহূর্তে ভারতবর্ষে সবচেয়ে জীবন্ত কাব্য রচিত হচ্ছে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে। তেমনই একজন মণিপুরের কবি Robin S Ngangom. ১৯৫৯ সালে ইম্ফলে জন্মেছেন। ইংরেজি আর মনিপুরী ভাষায় কবিতা লেখেন। নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভারসিটিতে সাহিত্য পড়ান। তিনটি প্রকাশিত কবিতার বই আছে। Words and the Silence, Time’s Crossroads আর The Desire of Roots. তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে The New Statesman, Verse, The Literary Review ইত্যাদি পত্রিকায়। তাঁর মতে তিনি একজন ‘তৃতীয় বিশ্বের ফাটল ধরা কোণ থেকে বেরিয়ে আসা ঐতিহাসিকভাবে বিস্মৃত, রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত কবি, যে বিশ্বাস রাখে প্রেমহীন কোন কাব্য হয় না।’]

জোসেফ এর জন্য কবিতা

‘বাড়ি ফেরার পথ কখনও দীর্ঘ হয় না’।
আমাকে আমার মাতৃভূমি দাও
যেখানে আমি চিনে নিতে পারি নিজেকে।
একটা মানচিত্র…
অন্তত একটা গাছ অথবা একটা পাথর
যাতে ফেরার স্থানবিন্দু চিহ্নিত করতে পারি,
যেভাবে বাসা চিনে নেয় তাড়া খাওয়া জন্তু।
যদিও এই সত্য,
বড়োরা সব পালিয়ে গেলে
অনেক অনেক দিন পর
আবরণ খসে পড়ে।
কঠিন মৃত্তিকায় চাপা দিয়ে রাখা
শিশু সব,
গর্ত ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে, খনির কয়লার মতো।
তুমি বলো, কোনো খেদ নেই তোমার।
কীভাবে রাষ্ট্রীয় শুদ্ধবাদ ঠকিয়ে নিয়েছিল
তোমার তৈরি নতুন বাড়িটা।
সেখানে এখন খনন কার্য
অতীতের দিকে দীর্ঘ পথ
বিশুদ্ধ রক্তের খোঁজ।
পঁচিশ বৎসরাধিক সময়ে অর্জিত
আকাঙ্ক্ষিত বস্তু সকল
ছেড়ে আসতে দ্বিধা করোনি কোনো।
কীভাবে বাস করছ ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী সন্তান নিয়ে,
খুনে ইমফলে, অনুভূতিহীন মানুষের মাঝে
যারা আমারই স্বীয়!
এখন একটি ছবিতে তোমার শোকের প্রকাশ
একটি সিপিয়া রঙের পরিবার।
তোমার পিতা,
বেঁচে ছিলেন তোমার দিকে চেয়ে।
কে আর বিশ্বাস করবে এখন যে,
তুমি আদতেই বেঁচে ছিলে?

প্রাথমিক বিদ্যালয়

আমার কেবল ছাইভস্ম স্কুলের কথা মনে আসে
সেখানে ভয় শিখেছিলাম।
দিদিমণিদের বিশ্বাস ছিল একক ক্ষমতায়,
লিখিত শব্দে, শাস্তিতে।
সবের মাঝে একটি ছেলে
বাবার সই জাল করেছিল একবার
যাতে অঙ্ক পরীক্ষার দিন ডুব মারতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেমেটারিতে
ঘুমিয়ে ছিল সে সারাদিন গোলাপ আর এপিটাফের মাঝে।
গ্লাসগো থেকে আসা বই এর প্ররোচনায়
বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করেছিল।
এসবেই পড়ল গিয়ে ঝালমুড়ি, গাঁজা
আর প্রাপ্তবয়স্ক গল্পের রহস্য-আবর্তে।
গোলাপি ঘর আর টানা হাতের লেখা থেকে দূরে।
ছেলেবেলার ‘ইনা মিনা মাইনি মো’ থেকে দূরে।
কেয়ারি লতায় সাজানো দেয়াল টপকে
এলাম কর্ক গাছ, ব্যাঙ আর সারসের স্বাধীনতায়।
একটা দুর্গন্ধী, জলময় পৃথিবী,
গুলতি আর সর্দি ভরা নাক,
যা জড়িয়ে ধরে পালিশ করা জুতো আর নীতিমালা।
একটা মেঘলা সন্ধ্যা ঘনিয়ে তোলে ঝড়ের রাত,
বাড়ি ফিরে মাদুরে নির্বাসন, হ্যারিকেনের আলোয়
শ্লেট, চক আর বড়ো হলে কালির দোয়াত, বাঁশ পত্র।
এই তার শৈশবের স্মৃতিচিহ্ন।
মশার ঝড়, ঠান্ডা মেঝে গোবর মাটিতে লেপা
ভগ্ন দেয়ালে সবজে ঝোপ আর মস।
মনে পড়ে যায় ব্রিটিশ সৈন্য পরিত্যক্ত
বিশাল জলের ট্যাঙ্ক, পান করতে আসে বিষধর সাপ
আর দেবীগণ।
আমি দেখি সেই অবোধ বালক,
যৌনসঙ্গকামী কৈশোরের হস্তাক্ষরে
মাটিতে লিখে রাখা যৌন শব্দ পড়তে পারে না ভালো করে।
আর পরে সেই অস্পষ্ট ভেজা কল্পনা দিয়ে
আবিষ্কার করে বাড়ির বোনেদের, নিবিড় আকুলতায়।
তারপর স্কুল বাসের পীড়নহীন
সেই চিত্রিত ক্লাসিক সাহিত্যের
দীর্ঘ রম্য, স্বাস্থ্যজ্জ্বল দুপুর।
শোনা যায় কেবল অদূরে কামারশালায়
হাতুড়ির ঘুমন্ত ঠংঠং শব্দ,
যেখানে জীবন পুড়ে যায় ধীরে,
ক্যালরির মতো এমনকী যখন ঘুমিয়ে আছ,
এমনকী যখন কারো জীবন শেষ হয়ে আসছে, আয়োজনহীন।

জন্মভূমি

দুঃস্বপ্নের ভিতর প্রথম শুনলাম
মৃত্যু চিৎকার।
তারপর রেডিও, সংবাদপত্রে খবর এল:
ছয় জন গুলিবিদ্ধ, পঁচিশটি বাড়ি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে,
যোল জনকে একটি চার্চে হাত পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে
ধড় থেকে আলাদা করা হয়েছে মাথা..
দিন যত ক্ষয়ে যেতে থাকে,
বাড়তে থাকে শিকারি আর শিকার।
আমি কঠিন চামড়ার নীচে
নিজেকে পাকিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছি
যতক্ষণ শেষ না হয় আমার পাতলা ঝ্যালঝ্যালে মনুষ্যত্ব।
ভাবনার পথ রূদ্ধ করেছি আমি
গনগনে ছাইয়ের নীচে পরিত্যক্ত শিশু
এখনও বাপ মায়ের অপেক্ষায়।
ঘুমন্ত মৃত্যুর দিনে
ঠাকুরমার বলা শীতের আগুনে হাত সেঁকা সেই গল্প
মনে পড়ে ওদের?
জানতে চাইনি
বর্ণমালার জাদু কোনোদিন শেখা হবে কিনা ওদের।
আর বীজ ভারাতুরা নারী,…
শস্য বৃন্তের মতো কেটে ফেলা হল
তাদের গীতিময় ফসল তোলার দিনে।
তাদের পুরুষের প্রতীক্ষায়
চুলে বুনোফুল গুঁজেছিল কিনা
তাতে আর কিছু এসে যায় না আমার।
তাদের সাথে আমি আমার সত্যকে পুড়িয়ে দিয়েছি।
সমাধিস্থ করেছি অস্থির পৌরুষ।
কোন সুদূর দিনে আমি বিড়বিড় করে বলেছিলাম,
‘সবকিছুর সীমা আছে’;
কিন্তু সময় যখন সেই কসাইদের নির্দোষ ঘোষণা করেছে,
আমি নিরন্তর বেঁচে আছি,
যেন কিছুই ঘটেনি, আমার জন্মভূমি।

পর্বত

পর্বত, তুমি আর আমি
সেই জন্ম থেকে প্রত্যক্ষ করছি অভ্যুত্থান।
মহাজাগতিক জরায়ু ছিন্ন করে যখন আনা হল আমাকে,
প্রতিধ্বনিত করেছিলাম তোমার নীরব কান্না।
সময়ের হাতে খোদিত হয়েছ তুমি, যেমন হয়েছি আমি।
তোমার অরণ্যে জন্ম নিয়েছে বাঁশি,
গূঢ ভেরি এবং বনদেবী।
প্রবীণ মানুষেরা আজও সেই কথা বলে
যখন স্বর্গ -ক্লান্ত দেবতাগণ নেমে এল মর্ত্যে
আর কামুক আঙুলে, আদিম কাদায় গড়ল
তোমার দেহ আর বুক।
রুপোলি কেশভার তৈরি করতে
মেঘ ছেঁচে ঢেলে দিল তোমার চূড়ায়।
ভূমিজ, আদিম প্রবৃত্তি দিয়ে তুমি দেখেছিলে
সভ্যতা ও প্রজন্ম আসে, যায়।
শহরবাসীর সবুজ বাঁকে যখন নেমে আসো তুমি
সঙ্গে আনো কুয়াশার পোষাক, দেহাতি মাশরুম,
বুনোফুল আর পাখি।

শেষ শব্দ

তারা জানতে চাইল ‘কেমন কবি সে?’
বললাম, ‘আমি মাটি আর মহাশূন্যের কবি,
হয়তো বা জলের কবি, কিন্তু আগুনের নয়।
আমি আমার সীমানা জানি,
এই আসমান জমির ভিতরে আছে অযুত বস্তু
যার কোনো নাম দিতে পারি না আমি।
বোধের প্রতি আমার সুপ্রাচীন বাসনা,
অর্থহীনতা আমাকে ভীত করে।
তাই আমি ভালোবাসি সহজ,
যেমন কাঁধের উপর এসে পড়ে সূর্যরশ্মি
অথবা দৃঢ বক্ষ যুবতী,
আর বৃষ্টি-নিঃঝুম পাহাড়।’
তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে ফিসফিসিয়ে
‘তাহলে কীভাবে বুলেটে বুলেটে ঝাঁজরা ওর সব কবিতা?’
এবার বললাম,
‘আমি চেয়েছি আমার কবিতাসকল গন্ধ ঝরাবে প্রচণ্ড
কিন্তু তা হবে কেবল রক্তের সুমিষ্ট দাগ,
অথবা আমার কবিতা থেকে উদগত হবে পোড়া মাংস।’
এরপর তারা বলল,
‘ওর কবিতা সবসময় নেমে আসছে
উদ্ধত কোনো উচ্চতা থেকে।’
উত্তর দিলাম,
‘আমি চিরকাল চেয়েছি তারা ঝরে পড়ুক
পাতার মতো, মৃত্যু মুহূর্তের সুন্দর নিয়ে।’
কিন্তু তারা বলে উঠলো:
‘কবিতা যখন ঝরে, চূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে,
কারণ এই কবি তার সব ছুঁড়ে দেয় পাথুরে জমিতে।’
শুধু বলি:
‘আমি চেয়েছিলাম ওরা,
নুড়ির মতো পুকুরের জলে ঝাঁপ দিক টুংটাং।
হয়নি তা, আমি চিরকাল প্রতিকূল ভূমিতে
ছুঁড়ে দিয়েছি আমার শব্দ।’
অবশেষে তারা বলল,
‘এইজন্যেই ওর কবিতা অপ্রকাশ্য।
এই কবি প্রার্থনা করে মৃত্যু ও স্বাধীনতা
কিন্তু তার শব্দের চাই সশস্ত্র প্রহরীর সুরক্ষা।
সে হৃদয় বন্ধনের কথা বলতে পারে না
আবার অনুমতি নেই নীরবতারও।
এই তার অস্থিরতার উৎস।’

রবিন এস নাংগম-এর কবিতা।। অনুবাদ: সঙ্গীতা দাস

আমাদের নতুন বই