রাতুল ঘোষের গুচ্ছকবিতা

কাম


আগামী হপ্তায় মারা যাব, তবু তোমার ঐ কাম
সার্কাসে বাঘের মতো লাফ দেওয়ায় আমাকে আগুনগোলক
ভেদ করে। কেন এত শয্যাপরায়ণ বলো মৃত্যু আমাদের?
দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে বড়ো যেন আর কোনো জৈব ক্রীড়া নেই!

অথচ ঘুমের মধ্যে আমাদের সন্তানের বিরক্ত চিৎকার,
গুঞ্জনে শুনেছি আমি— তোমার প্রবল স্তন অতিপৌরুষেয়,
মানুষের ক্লান্তি নিয়ে তোমার ঐ প্রসাধন— তাও বুঝি শ্রেয়,
মৃত্যু নয়! এ কেমন উন্মাদনা তোমার প্রণয়প্রার্থীদের?

এবছর ব্যাধি এল ঘাসের ফুলের মতো চোখের আড়ালে।
যত ভাবি নিভে যাব, উষালগ্ন ক্রমশঃ পিছিয়ে যেতে থাকে
তোমার ঋতুর মতো— যেন ক্রমে পেছোতে পেছোতে একদিন
তোমার কৈশোরে গিয়ে পৌঁছে যাব, চুমু খাব কামনাবিহীন ।


তুমি অন্ধকারে, তুমি আলোর ভেতর দিয়ে শোকে
আত্মসমর্পণ করো। ডুবে থাকা তোমাদের স্নান
মাত্র, ভেসে থাকা আমাদের মৃত্যু। শেওলার মতো
চুল ভাসে ঘোলা জলে, মাছ এসে ঠুকরে দেয় খুলি।
তুমি জলে, তুমি বাতাসে নেহার করে পরাক্রমী
ঈশ্বরকে ভ্রূমধ্যে ধরো; আমি শুধু স্তনের গোলাপ
পাখি ও পতঙ্গ হয়ে প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চেয়েছি।
তুমি যেভাবে অনাবৃত হলে তার মধ্যে শিল্প আছে কিছু,
তবে তা নিস্পৃহ বড়ো; খাবার শেষের পাতে সাদা
রসোগোল্লা যেরকম লবণাক্ত হলদে হয়ে ওঠে,
সেভাবে কখোনো যদি কাছে যেতে পারি, চলে যাব।


উত্তরবঙ্গের কথা মনে করো, ছাদের বাগানে
বিশল্যকরণী গাছ কারা যে লাগিয়েছিল, হাওয়া
অসুখ সারিয়ে দিত। প্রাকৃত স্তনের মায়া যার
জন্ম জন্ম লেগে আছে, সেরকম পুরুষমানুষ
দুপুরের দিকে আসত ফেরিওয়ালাদের বেশ ধরে।
পাশের বাড়ির ছায়া হেলে পড়ত কাপড়ের গায়ে,
শুকোতো না একদিনে, সেই রাগে তুমি
ভেজা গায়ে উঠে বসলে হেমন্তবিছানা সোঁদা করে,
ফুলের পরাগ বেছে আমাদের কেটে গেল যৌবনের দিন।
অসুখ সারিয়ে নিয়ে পুনরায় অসুখের অপেক্ষায় থেকে
আমরা চলে আসলাম কলকাতায়, এইখানে
দেহ বড়ো অস্বাভাবিক, প্রেম ঘটনাপ্রধান…

এই যে সন্ধ্যা

এই যে সন্ধ্যা হল, এর কোনো লক্ষ্যস্থির নেই,
এ জানেনা রাত্রির শুরু নাকি গোধূলির শেষ—
কোন দিকে নিয়ে যাবে বিষণ্ণতা। আলোর অপর
এক নেশা যেন, ঘুমের অপর এক শবভঙ্গিমা,
যেন কোনো বিপরীত মোহ নিয়ে আমাদের কাম
শুরু হয় দেহের অপরে, আরও রাত্রে কিংবা দিনে
ঘোর দুপুরবেলার ঘরে, স্কাইলাইট ঢেকে রেখে
আমাদের প্রাকৃত বিক্রম যেন ইতিহাসে থাকে
এই ভেবে শেষ হয় টিপ্পনীতে যৌথ রসপাতে।
কিন্তু এই সন্ধ্যা কেন তোমাকে, আমাকে, তাকে,
এবং আমাকে এই অনুত্তেজ প্রগতিতে স্থবির করেছে?
সে কেন দিচ্ছে না বলে, ‘ভান’ এক বিশুদ্ধ কারক?
“বিষণ্ণতা মিথ্যা নয়” — বলে কেন অকস্মাৎ রাত
নেমে আসছে না, কেন “প্রেমই প্রকৃত কাব্য”— বলে
নেমে আসছে না কোনো উৎকেন্দ্রিক ছায়াহীন দিন?

স্মৃতি

প্রাগ শহরের মধ্যে নকল ছবির ধাঁধায় হারিয়ে গেলাম আমরা
আর একটি নৌকোর ছই ফুঁড়ে বেরিয়ে এল অজস্র জোনাকি!
মানুষ ভিড়ের ভেতর এমন আপনমনে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন
বাকি দৃশ্যের কোনোটাই তার সঙ্গে যাবে না, যেন
যে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সে চোখ ফিরিয়ে নিল, তাদের
আর কোনোদিন কাছে আসতে দেবে না সে…

বিশাল ক্যাথেড্রালের ভেতরে পায়রার মতো জমে আছে
মানুষের বিড়ম্বনা, নোংরা করছে তাদের তীর্থস্থান,
তবু তারা ফিরে আসছে বারবার সেখানেই। জীবন,
সাদা কাপড়ের ওপর একটা দুটো মুদ্রার মতো
জমে উঠছে ফুরিয়ে যাচ্ছে ব্যবহারে, উদাসীনতায়।

রাতুল ঘোষের গুচ্ছকবিতা

আমাদের নতুন বই