লেখক নয় , লেখাই মূলধন

সংগীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুচ্ছকবিতা

ধারণ

দীর্ঘ অপমান জমে যে-সব কবিতা উঠে আসে
পড়ন্ত রোদের মতো তাদের গায়ের রং ধূসর হলুদ

বিকেল হারিয়ে যাওয়া মনখারাপিয়া

হেমন্তের শেষ রোদে
তাদের পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসি

যেভাবে জলের কাছে সহিষ্ণুতা পাঠ নেয়
যেকোনো আকার

জন্ম

লালন করেছি যত
একটু একটু করে নিয়েছে আকার
গোপন সে-বীজমন্ত্র
গোপন আঁধার
জানি, অবয়ব পেয়ে গেলে ছেড়ে চলে যাবে

সতী

দূরত্ব কোথাও বাড়ে
কোথাও-বা কমে যায়
অন্ধ দু-চোখ জুড়ে
যতিচিহ্ন খুঁজি

আজন্ম পাঞ্চালী আমি
নিজেকে খণ্ড করে
ভাগ করে বেড়ে দেওয়া
আমারও নিয়তি

পরকীয়া

‘চলে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি’ হুইশলে ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন

যাত্রীদের হুড়োহুড়ি
আরেকবার দেখে নেওয়া কোনো কিছু পড়ে রইল কি না
পরিজন হাত নেড়ে বিষাদ জানায়

গেটম্যান ফ্ল্যাগ নাড়ে
ট্রেন ছাড়ে একটু একটু করে
ধাতুতে ধাতুতে ঘষা লেগে শব্দ ওঠে
হাওয়ায় ফুলকি ওড়ে

সে-তাপ শরীরে নিয়ে
ভার হয়ে আসে তার লৌহময় পা
সেও যেন কাকে খোঁজে
শেষ মুহূর্তে চেন টেনে যে তাকে আটকে রাখবে
আরও কিছুক্ষণ…

নশ্বর পয়ার

যত ডাকাডাকি হোক, ফিরে তাকিয়ো না
হৃদয় উদ্‌বেল হোক, নিরাসক্ত থাকো
সন্ন্যাস তোমার ধর্ম, সংযমই জীবন
লালসা-আসক্তি-মায়া জয় করতে হয়

পূর্ব-আশ্রমের যত ক্ষোভ অপমান
শর্তহীন সমর্পণ করে গুরু পায়ে
দিনান্তে পাঠের শেষে শিষ্য অতঃপর
নিজ হাতে মাধুকরী সিদ্ধ করে খায়

জপতপ সারা হলে নিদ্রা অভিমুখে
নিশিডাকে পিশাচিনী হাতছানি দেয়
মাঝরাতে একা সেই ডাক শুনে শুনে
সন্ন্যাসী গেরুয়া রঙে আগুন লাগায়

অপযশ

দরজা ভেজানো ছিল
প্রবেশ করেছ তাই অতি সহজেই
আসঙ্গ তৃপ্তি মেখে একদিন সবিনয়ে
ছেড়ে চলে গেছ

সেই থেকে দরজা হাট-হাট খোলা

শরীর সাজিয়ে বসে আছি পসারিণী
সকলেই স্বাগতম, প্রবেশ অবাধ
ভালোবাসা শুষে নিয়ে বাকিটুকু ফেলে দিতে জানি

এ-শিক্ষা তোমার কাছে, তুমিই প্রাপক
করুণা ও কৃতজ্ঞতা
হে আমার প্রথম ধর্ষক

প্রায়শ্চিত্ত

জলজ প্রত্যাঘাতে জমে ওঠে যে-আগুন
তার মৃদু উত্তাপে উষ্ণ হয়েছি, তবু
আঁচটুকু সচেতনে স্বীকার করিনি
উপরন্তু মুঠো মুঠো ছড়িয়েছি নুন

কালো রক্তে ভেসে গেছে শিরা ও ধমনি…

সেই অভিশাপ বুকে মৃতবৎসা নারী
খড়কুটো জড়ো করে পুনরায় জ্বালাই আগুন

তোমার বৈধ স্ত্রীর গর্ভাশয়ে পুনর্বার
জন্ম নিক আমাদের অবৈধ ভ্রূণ

ভয়েড

বোনের প্রেমিক চিঠি পাঠাত বোনকে নিয়মিত
লুকিয়ে পড়তাম সেই খাজুরাহো কারুকাজ
শাণিত ছোরার মতো হস্তাক্ষর

অব্যর্থ কল্পনা করি তোমারও হাতের লেখা ভালো
প্রেমিকা তোমার চিঠি পেত?
আমি পাই, আজকাল
ডাকবাক্স উপচিয়ে প্রেমপত্র আসে
সে-চিঠি কারোর নয়
আমিই প্রেরক তার আমিই প্রাপক
কত চিঠি… কত চিঠি…

পড়তে পড়তে দেহ ভরে আসে জলে

মাঝরাতে কলঘরে সেইসব চিঠি নিয়ে ছেঁড়াছিঁড়ি করি
রঙিন অক্ষর সব ধুয়ে ধুয়ে যায়…

সংগীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুচ্ছকবিতা

আমাদের নতুন বই