লেখক নয় , লেখাই মূলধন

সঙ্গীতা মাইতির গুচ্ছকবিতা

কোকিল

অতটা আত্মহত্যা চায়নি লক্ষ্মণরেখাটিও—
কেন তবে দোলালে ঈগলের চোখ?
আমাকে সযত্নে বাজিয়ে বাজিয়ে মেঘমল্লার!

তোমাকে আয়না ভাবলে পুড়ে যায় তামাম রক্ত
দু-একটা ছাই রঙের বালিশ ঢুকে পড়ে ব্যক্তিগত বসন্তে
বর্শাফলাকৃতি হাসি কুড়িয়ে বাড়ি ফিরে আসি।

অভিমান প্রাচীর হলে থাকে না অবধি,
উদাস হয়ে যায় ভিন্ন ঋতুর কোকিল।

প্রজাপতি

বিদগ্ধ সত্তার নিচে চাপা পড়ে আছে সেই প্রজাপতি,
ঘুমের চেয়েও অর্বাচীন দুটো ডানা
হেঁটে যাই তার দিকে বিমূর্ত রোদে,
চেতনার অনুশাসন ভেঙেছে যে তারা।

মাধবিলতার গায়ে মুকুলবেলা ঝরে যায়
যতিচিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে থাকে একাকিনী রাধা
তার অশ্রু জমে জমে হয় ফুল, ফুল ফোটে
হঠাৎ বুকের ভিতর বেজে ওঠে বিসমিল্লা।

শকুন্তলা

কতদূর গেলে প্রেমিকরা হয়ে যায় অভিশপ্ত দেবতা?
মীনরোদ্দুর থেকে তুলে নেয় চঞ্চল ভ্রমর

জানে শোক, স্মৃতি থিতিয়ে গেলে
উপুড় করে দিতে হয় পথিকজন্মের চোখ

তবু পরিখাজলে চাঁদ বিরহের অক্ষর আঁকে
ফুলের ঘ্রাণে জন্মায় আকাঙ্ক্ষার সহজ শিকড়
সব মগ্নতা ভেঙে রাতচরা পাখির মতো
ঘুরে বেড়ায় একটি নিঃশ্বাস—

সে বোবা বাঁশির কান্না,
সে শকুন্তলার কাঙাল মন।

একতারা

পিছুটান ফেলে ছুটে গেছি
সমুখে নিষাদের মতো আটপৌরে রোদ,
মাংসটুকু নিয়ে ছড়িয়েছে হাড়ের ঘুঙুর।

জেনেছি, বুকের ভাঁজে শুয়ে থাকা অন্যমনস্ক
নদীটার নাম আতপ-স্নান
স্মৃতি— আলপথের পায়ে পায়ে ঘেরা গমখেত,
আর ক্ষুধা, প্রেমিকের নেশাতুর চোখের নাব্যতা।

নত আগাছার ওপর সর্বনাশা নাস্তিক ঠোঁটে
ধ্রুপদী বিশ্বাসের নুড়ি ভাঙে আর গড়ে
কুয়াশার গর্ভ শিল্পিত রোমাঞ্চে মোড়া

আমি ভেসে উঠি তোমার অতলে
নিপাট মরনে বাউল বাজিয়ে যায় একতারা..

নৈকট্যের পাখি

পাখিটার নাম তাম্রলিপ্ত,
পারিযায়ী তার বন্দর—
ডানাতে কাচের চুড়ির মতো বাতাস বাজে।

সে নদীর মতো হাসতো
পাতার নিঃশ্বাসে ছুড়ে দিত কথাকলি ঢেউ,
হৃদয়ে ছড়াত ধানফুল, অক্ষরমালা
আমি অন্ধকার ভাঁজ করতে করতে
কুড়িয়ে রাখতাম কৃত্তিকা, মৃগশিরা।

তারাগুলো খসে পড়ছে দেবদূতের মতো
মসলিন পোশাকের মাছগুলো
স্নান করছে তার চোখের তারায়,
মাতাল হাওয়া ভাঙছে ঠোঁটের মূর্ততা।

হাই তোলো ও পোড়া বাঁশি,
স্পর্শে ঢালো স্মৃতির লালমিনার
আলুলায়িত চুলের কারুকার্যে
হরিণ হয়ে যাক তোমার এক একটা আঙুল।

সম্পর্কগাথা

মুখোশের আড়ালে বদল হয়ে যায় প্রিয় মুখ,
নৈঃশব্দ্য ভেঙে ভেঙে হয়ে ওঠে মেধাবী উচ্চারণ
এক পা, দু পা পিছিয়ে গেলেই নান্দনিক ঢেউ
বধুঁয়ার চোখে কাজলের করুণ মরণ।

লজ্জা ভেবে কেন তুমি কথাদের জীবন্ত পোড়ালে?
মরমে বিঁধে দিলে চণ্ডীদাসের গান।
দুলে উঠলো সম্পর্কের ঘনিষ্ঠ প্রহরগুলি
অনির্ণেয় হাওয়ায় তার মৃগনাভি ঘ্রাণ..

আঙুলের ডগায় সম্পৃক্ত হয় যে জোনাকির আলো
বন্ধক রেখেছ যাকে মোহিনী-মুদ্রায়,
ফাতনা থেকে সরে গেলে চোখ
তোমার প্রণয়ী সে তো নয়!

সঙ্গীতা মাইতির গুচ্ছকবিতা

আমাদের নতুন বই