সিদ্ধার্থ সিংহের গুচ্ছকবিতা

কী করে বলি

হাইকম্যান্ডকে কী করে বলি!

ও রকম দু-চারটে খুন সবাই করতে পারে
কিন্তু এক কোপে কারো মাথা নামিয়ে
সেই মুণ্ডু নিয়ে কখনও কি ফুটবল খেলেছেন প্রকাশ্য রাস্তায়?
তবে?

ওরকম দশ-বিশটা ধর্ষণ সবাই করতে পারে
কিন্তু আপনার নাম শুনলেই
মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে যাবে মেয়েদের স্কুল, পাপড়ি গুটিয়ে নেবে ফুল
সেরকম বিভীষিকা কি ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন চারিদিকে?
তবে?

আপনাকে আসতে দেখলে
আশপাশের বাজার, চৌরাস্তার মোড়
কিংবা অফিসপাড়া
খরগোশ হয়ে যেতেই পারে
কিন্তু ওদের ভিতরের বাঘটাও যে মাথা নুইয়ে কোণে গিয়ে লুকোবে
সেরকম কুচকুচে কালো মেঘে কি ঢেকে দিতে পেরেছেন গোটা আকাশ?
তবে?

হাইকম্যান্ডকে আমি কী করে বলি
এ’বার অন্তত ভোটে দাঁড়ানোর জন্য আপনাকে একটা টিকিট দিক!

আমার ছেলে যেন

আমার ছেলে যেন কোনোদিন ফার্স্ট না হয়
হলে থার্ড হোক
খুব বেশি হলে সেকেন্ড।

পড়াশোনায় আমি মোটেও ভালো ছিলাম না
টায়ে-টুয়ে টেনে-হিঁচড়ে কোনোমতে ক্লাসে উঠতাম।
বন্ধুরা আমার দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকাত
কাছে গেলে নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল হত ওরা।
আমি ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসতাম
ফার্স্ট বয় বসত প্রথম বেঞ্চে।
টিফিনের সময় সবাই হইহই করে বেরিয়ে যেত
খাঁ খাঁ ক্লাসে তখন আমি একা
আর ধীরে ধীরে বইয়ের ব্যাগ গোছাত
প্রথম বেঞ্চের সেই ফার্স্ট বয়।
ওকে দেখে আমার মনে হতো
আমার চেয়েও ও কত একা, কত নিঃসঙ্গ।

আমার ছেলে যেন কোনোদিন ফার্স্ট না হয়
হলে থার্ড হোক
খুব বেশি হলে সেকেন্ড।

দেখা

তা হলে কি চৈতন্যদেব এদেরই দেখেছিলেন!

সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ
ফিরতে ইচ্ছে করছিল না।
পেছনে কপিলমুণির আশ্রম
সামনে ধূ ধূ নিকষ কালো অন্ধকার।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ নজরে পড়ল
পুতুলের মতো সার সার মেয়ে দুধ-সাদা ঘাঘরা কামিজ পরে
হাত ধরাধরি করে নাচতে নাচতে পাড়ে উঠে আসছে।
এরা কারা!
গাল টিপে খুব আদর করতে ইচ্ছে করল তাদের।
একটু হলেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম আরকী
আর ঠিক তখনই মনে পড়ল শ্রীচৈতন্যদেবের কথা।
তিনি নাকি এক ঘোরের মধ্যে সোজা নেমে গিয়েছিলেন সমুদ্রে
অতল গহ্বর থেকে আর মাথা তোলেননি।

তাহলে কি চৈতন্যদেব এদেরই দেখেছিলেন!

একই

বাবার কাছে কোনো দিন সাদা শাড়ি
কোনো দিন জংলা ছাপা
আবার কোনো দিন হাওয়ায় ওড়া আঁচল আসত।
ওরা আসার আগেই আমাকে আর দিদিকে
বাবা বসিয়ে দিয়ে আসতেন গলির মুখে, একটা রকে।
বলতেন, যে-গাড়িগুলো যাবে সেগুলোর নম্বর লিখে রাখ তো দেখি।
আমরা লিখতাম।
পরে নিজেরাই মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতাম কার ক’টা বাদ গেছে
বাদ গেলেই কানমলা
আর যে লিখত, সে পেত কখনও কাগজের উড়োজাহাজ
কখনও ঘটি চানাচুর।
আমি রোজ রোজ কানমলা খেতাম।
সতর্ক হতে হতে যখন বুঝলাম
দিদি আসলে ওগুলো পাওয়ার জন্য মিথ্যে মিথ্যে নম্বর টুকে রাখে
বাবাকে বললাম।
বাবা চালু করলেন নতুন খেলা।
বললেন, বসে বসে লোক দ্যাখ,
দেখবি, এত মানুষ, তার ওইটুকু একটা মুখ
তবু কী অদ্ভুত! কারও সঙ্গে কারো মিল নেই।
যদি কখনও একইরকম দুটো মুখ দেখতে পাস
দ্বিতীয় জনের নাম-ঠিকানা লিখে রাখিস
বকুলের দানা দিয়ে শিস-বাঁশি বানিয়ে দেব।

বাবার কাছে কোনো দিন সাদা শাড়ি
কোনো দিন জংলা ছাপা
আবার কোনো দিন হাওয়ায় ওড়া আঁচল আসত,
মা তাই চলে গিয়েছিলেন মামার বাড়ি।

আমরা একইরকমের আর একটা মুখ খুঁজতাম।
তখন মেলাতে পারিনি
এখন বুঝতে পারি, সাদা শাড়ি, জংলা ছাপা
আর হাওয়ায় ওড়া আঁচলের মুখগুলো আসলে একই
হুবহু এক।

ধুত

ছেলে মাধ্যমিক দিচ্ছে
তাকে বললাম, তুই যদি নাইন্টি পার্সেন্টের বেশি পাস
তোকে একটা ল্যাপটপ কিনে দেব,
ছেলে পেয়েছিল।

বাঁক ঘুরতেই আলো-আঁধারিতে ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে।
কানাঘুষোয় শুনেছিলাম, বাড়িওয়ালা লোক ফিট করেছে
আমি বললাম, তোমাকে উনি যা দিয়েছেন, তার থেকে বেশি দেব
তুমি শুধু ওঁকে একবার কড়কে দাও
আমার পিছনে যেন কোনো দিন না লাগে।
পর দিন রাস্তায় দেখা হতেই বাড়িওয়ালা গদগদ হয়ে
আমার দিকে সিগারেট এগিয়ে দিলেন, কেমন আছেন?

দিঘায় বেড়াতে গিয়েছিলাম
আচমকা একটা স্রোত আমাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল দূরে
নাকানি-চোবানি খেতে খেতে মা মনসাকে ডাকলাম
রক্ষা করো মা, রয়ানি দিয়ে তোমার পুজো দেব।
লোক নেই, জন নেই
হঠাৎ কোত্থেকে একটা নুলিয়া এসে আমার চুলের মুঠি ধরল।

শুধু মানব নয়
দানব নয়
ঈশ্বরও
ঠিক ঠিক প্রণামী পেলে
যা চান, তাই দিয়ে দেবে।
শুধু জানতে হবে কার প্রণামী কী।

আর, আপনাকে সুন্দরবনে ট্রান্সফার করে দিচ্ছে শুনেই
আপনি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন,
ধুত।

সতর্কীকরণ

বয়স্কদের থেকে একটু সাবধানে থাকবেন।

দেখবেন, ছেলেদের দিকে তেমন ভিড় না থাকলেও
লেডিজ সিটের সামনে মেয়েদের ঠিক পিছনে
কিংবা গাঁ ঘেষে দাঁড়ানোর জন্য
বাবা-জ্যাঠা-মামাদের সে কী প্রাণপণ লড়াই
কয়েক দিন খেয়াল করলেই টের পাবেন
গভীর রাতে উঠে শাশুড়ি কান পাতছেন
ছেলের ঘরের দরজায়
না না, ছিঃ, ও’সব শোনার জন্য নয়,
কান পাতছেন, বউ তাঁর ছেলের কানে কোন মন্ত্র দিচ্ছেন,
তা শোনার জন্য
বয়স হলে মানুষেরা ফুটপাতের এত ধার ঘেঁষে হাঁটেন যে, নোংরা তাঁরা পাড়াবেনই।

বয়স্কদের থেকে একটু সাবধানে থাকবেন।

এমনকী, যখন আমার বয়স হবে, তখন আমার থেকেও
অবশ্য আমার বয়স কি আর বাড়বে!

মানুষ

এখন আর মানুষ মরে না।

মরলে বি জে পি-র লোক মরে
তৃণমূলের লোক মরে
সি পি এমের লোক মরে

এখন আর মানুষ মরে না।

এ রাজ্যে মানুষ থাকলে তো মরবে!

রূপান্তর

মানুষের একটা লেজ হোক
দুটো শিং
এক-একটা থাবা হোক সাত মন।

বাচ্চাটাকে কাপড়ে জড়িয়ে কারা যেন ফেলে গিয়েছিল রাস্তার ধারে
যতক্ষণ না লোকজন এসে তাকে তুলে নিল
একটা কাকও যাতে ঠোকরাতে না পারে
আগলে রেখেছিল কয়েকটা সারমেয়।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটা দল গভীর জঙ্গলে ঢুকে একেবারে তাজ্জব
পরে সারা পৃথিবী জেনেছিল
সেই গোরিলা-মা আর তার কাছে বেড়ে ওঠা মানব শিশুটির কথা!

তাড়া খেতে খেতে পাহাড়ের এক গুহায় এসে লুকিয়েছিলেন
তাসখন্দের রাজা সিন্দাবাদ
পিছনে তলোয়ার উঁচিয়ে হাজার হাজার সৈন্য
এই বুঝি কোপ পড়ল!
ঠিক তখনই গুহার মুখ ঢেকে যেতে লাগল এক জংলি মাকড়সার জালে।

সামান্য একটা মাকড়সা? মন করে তাঁকে সেদিন বাঁচিয়ে দিয়েছিল
সে-কথা তিনি লিখে রেখে গেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে।

জংলি মাকড়সাও বিপদ থেকে অদ্ভুতভাবে রক্ষা করে একটা জীবন
বনের গোরিলাও কত মমতা দিয়ে বড়ো করে তোলে একটা মানবশিশু
রাস্তার কুকুরও কী সুন্দর আগলে রাখে একটা সদ্যজাতকে
আর মানুষ?

মানুষের একটা লেজ হোক
দুটো শিং
থাবা হোক ইয়া বড়ো বড়ো।

হাইট

লোকটার নাম শুনেছিলাম।
সবাই বলতেন, লোকটার হাইট সাত ফুট তিন ইঞ্চি
ইয়া ছাতি
লম্বা লম্বা হাত।
আমি বিশ্বাস করতাম না।

দূর থেকে যে-দিন দেখলাম
বুঝলাম, কেউ মিথ্যে বলেননি।
কঠাক মাপলে, দু-চার ইঞ্চি বেশিই হবে।

এর ক’দিন পরেই
লোকটার সঙ্গে আমার আলাপ হল,
ভালো করে চিনলাম।
একদিন ফিতে দিয়ে মাপতে গিয়ে দেখি
তাঁর হাইট মাত্র পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি।
পাঁচ ফুট চার!
হিসেবে কোনো গণ্ডগোল হচ্ছে না তো!
পরের দিন মাপতে গিয়ে দেখি
তিন ফুট সাত,
তার পরের দিন
কোনোরকমে টেনে-টুনে দু’ফুট। দু’ফুট! এর পরের দিন মাপতে গেলে
হয়তো আরও কমে যাবে…
আমি ছিটকে চলে এলাম।
মানুষকে আর কত ছোটো হতে দেখব!
কত!

সিদ্ধার্থ সিংহের গুচ্ছকবিতা

আমাদের নতুন বই