সুমন ঘোষের কবিতা

ভুলোমনা

ভুলে যাচ্ছি সব
মোবাইল ফোনটি টেবিলে রেখে খুঁজছি পকেটে
ভুলে গীতাঞ্জলির বদলে অফিসব্যাগে ভরছি আইপ্যাড
চোখের সামনে নিউজফিডে বুথফেরত সমীক্ষা
দু-দিন আগের গণধর্ষণটা ভুলে গেছি
একটু আগেই একটা শিশুকে শ্বাসরোধ করে দিল তার বাবা
এখনই আবার মসনদ বদলালো দিল্লীর
প্রত্যেকবারই বদলায় কি?
মনে থাকে না, আমার এ ভুলে যাওয়ার রোগ।

ব্যাগে জলের বোতল ভেবে ভরেছি কীটনাশকের ব্যারেল
পাশাপাশি কারোর বোতলেও জল নেই
অথচ ফাঁকা নয়, বোতলগুলি সব ভর্তি
কোনোটায় ধর্ষিতা নারীর যৌনদ্বার ফেটে বেরিয়ে আসা রক্ত
কোনটায় প্রতিবাদী যুবক বা সৎ পুলিশ অফিসার
কোনোটায় বন্দি মুখ দিয়ে রক্ত ওঠা অভুক্ত কৃষক
একফোঁটা জল নেই কোথাও।
মনের ভুল হতে পারে ভেবে নিয়ে এসব থেকে দু’পা সরে আসি আমি।

মোবাইলের নিউজফিডে দেখলাম এবার মসনদে লাল
না না, কী যেন কী একটা রং…ঐ… নীল,সাদা, গেরুয়া, সবুজ…
না কি কালো? না সবকটাই?
ধুস! সব ঘুলিয়ে যাচ্ছে আমার
আমি ভুলোমনা কি না…ভুলে যাচ্ছি সব।

তৃষ্ণা

তৃষ্ণার্ত আমি
তাই নদীটির তিরতির বয়ে চলা দেখে আমার
শিহরণ জাগে শরীরে
পোশাক ছেড়ে আমি তৈরি হলাম ঝাঁপ দেব বলে
নদীর বুকের দুপাশে চকচক করছে যে প্রশস্ত বালি
তার স্পর্শে আমি দরকারী উষ্ণতা শুষে নিলাম
নখহীন নরম আঙ্গুল আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে ওঠে
আমি হেঁটে চলি মধ্যপ্রবাহে যার কুলকুল শব্দ খিলখিল ধ্বনির স্বাদ এনে দেয়
ঝুঁকে পড়ি, উবুর হই, হাত-পা টান টান
পা থেকে কোমর পেরিয়ে আস্তে আস্তে
বুক, গলা, মাথা ডুবে যায়
গর্ভে প্রবেশের পথে—
আধারে সঞ্চিত যত তাপ সব পরিবাহিত হয় জলে
শীতল শান্ত আমি উঠে আসি ধীরে
সকল তৃষ্ণা মিটে গেলে পোশাক পরে হাঁটা দিই জীবনের পথে।

রহস্য

অনেকটা বড়ো হয়ে গেলাম
ভেবেছিলাম এ বয়সে এসে ক্ষয়িষ্ণু দুই ডানায় ভর করে
পেরিয়ে যাব ওই দূর দিগন্ত
মরণোন্মুখ কাঠামোটিকে শেষ বিশ্রামের অবকাশ দিয়ে
জঙ্গলে রাত কাটাব রহস্যময়
পর্ণমোচী উদ্ভিদের তলা দিয়ে হেঁটে যাব মচ্ মচ্ করে
তোর সঙ্গে, তুই মশাল জ্বেলে নিবি
আমি তাঁবু টাঙিয়ে দেব, রাত কেটে যাবে।
ভোর হবে কোনো এক নির্জন দ্বীপে…
আমরা সারাদিন সমুদ্রতটে বালি দিয়ে বানাব ঘর
আর, ইচ্ছেমত ভাঙব-গড়ব নিজের হাতে নিজেদের

আজ অনেকটা বড়ো হয়ে যাওয়ার পরও
ডানা গজায়নি
তবে পাতা ঝরে পড়তে দেখলেই এখনও
ওই মচ্ মচ্ শব্দটা শুনতে পাই
রহস্যটা কী… খুঁজে চলেছি নিরন্তর।

কাকটির মতো

একটি কাক আনন্দে আকাশে ছোঁ মেরে উপরে উঠছে
পরক্ষণেই ডাইভ দিচ্ছে নীচে
যেমন করে একটি ডলফিন
জলের উপরে উঠেই ভিতরে ঢুকে যায় আবার বেরোবে বলে
দেখছি হাঁ করে বসে বসে
ওদের মধ্যে কত মিল!
এত মিল বোধ হয় ওরা শুধু খেলছে বলেই
খেলাতেই এত আনন্দ, মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায়
মনে পড়ছে একটু একটু করে।

জবুথবু জীবন, খেলা ভুলেছি বহুদিন
সংসার, একটি মাটির ঢিবির মত স্থবির
আমি চাই কেউ আসুক, পদাঘাতে গুঁড়িয়ে দিক ওটা
খোলস ছেড়ে আবার, একবার আমি ছোঁ মেরে উপরে উঠে
আকাশ ছুঁয়েই ফিরে আসব কথা দিলাম
আমার আর ওই পাখির মধ্যে ব্যবধান শুধু ওই ডাকটুকু
আমি যে একই আত্মা ধারণ করি সেটা একবার বুঝে নিতে দাও…

ওই কালো কুচকুচে কাকটির মতো কা কা করে
আমাকে শুধু একবার গলা ছেড়ে ডাকতে দাও।

খোলা জানলার ইচ্ছেরা

অপরাহ্নে দক্ষিণের জানলা খুলে দেখি
আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে নারকেল, সজনে, শিশুর দল আর কয়েকটা পেঁপেচারা
দূর থেকে চেয়ে আছে শিরীষ, কৃষ্ণচূড়া, নিম, সারিবদ্ধ কলার ঝোর, আর তেঁতুল
সঙ্গে রয়েছে ওই খামারে ধানের গাদা আর নিকানো মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ঘাস
সামনেই মুখরা এক বুড়ির আলকাতরায় মোড়া মাটির বাড়ি, টালির চাল
দোতলা, বেশ অনেকটাই উঁচু
চালের কিনারায় খাদ্যশস্য, আর একসুতো পরেই খাদ
ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা আসে, বসে
সাবধানে পা ফেলে খাদ্যকণা ঠোঁটে তুলে নেয়
আমি হলে নিশ্চিত পা-ফসকে নীচে নর্দমায় পড়তাম
আমার ওই পায়রার মতো শান্ত, সাবধানী হতে ইচ্ছে করল।

মৌমাছির ব্যস্ততা দেখি বাঁ-পাশের সজনে গাছটিকে ধরে
অনেক সাদা সাদা ফুল
দু’একটা প্রজাপতি বসছে, উড়ে যাচ্ছে
দুটো পাখিও ছিল একটু আগে
এত কাছ থেকেও ফুলের সুবাস আমার কাছে কেন আসছে না…
ঐ গাছটির আনন্দে হাত-পা নাড়া দেখে আমার কোনো এক কালে
দৃঢ়মূল গমনহীন একটা গাছ হতে ইচ্ছে করেছিল

দূরের থেকে গান ভেসে আসছে হঠাৎ
কোনো কথাই আমার কানে ঢুকছে না তখন
শুধু সুর বেজে বেজে ওঠে খুব
আর আমি
একটা কাঠের টেবিলে কবিতার খাতা খুলে নেচে নেচে উঠছি
এভাবেই অনন্তকাল…
আমার গাছ আর পায়রাদের মাঝে বসে থাকার ইচ্ছে হয়েছিল।

অন্দরমহল

ফোটা ফুল দেখে সব বোঝা যায় না
কুড়ির ভিতরে যে পৃথিবী তার মায়ারূপ সুদূর কল্পনা-ছবি
চোখের পাতা বুজে পড়ে থাকা অলি গলি
মগজ মনের কাটাকুটি খাতার পাতায় ফোটে কতটুকু ?
ধরা পড়ে না ।

আমি কী করে কথা দিই তোমায় …
এই সংসার, এই কবিতার পথে প্রথাহীন চলাফেরা করি
ঘূর্ণাবর্ত কেটে বেরোলে দেখে নিও তুমি
যদি না হয় তবে কল্পনা করো কুঁড়ির ভিতরের রূপ
পাতা বুজে থাকা অলি গলি প্রকাশ্যে আসে না পুরোপুরি।

সুমন ঘোষের কবিতা

আমাদের নতুন বই