কবিতা

অর্ণব রায়

ধ্বংসশহর: একটি অনুবাদ কবিতা

একবার আমাদের পুরোনো পিক আপ ভ্যান আর চার ক্রেট বিয়ার নিয়ে অসীমের প্রান্ত দেখব বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সে-প্রান্তটি, দেখা গেল, এক অচেনা মহিলার বাড়ির সামনে দুম করে থেমে গেল। ইতিমধ্যে ক্রেটের সব বরফ গলে জল হয়ে গেছে। অছিলা নয়, সত্যি সত্যি বরফ চাইতেই সেই বাড়ির সামনে থেমেছিলাম। আদিগন্ত গমের খেতের মধ্যে সেই একখানা একক কাঠের বাড়ি। ফিকে হলুদ আর কালচে রং করা।

আমি কোনোদিনও ভুলব না সেই সামনের কাঠের বারান্দা। ঝোলানো হ্যামক। আইসড টি। ভাই লুসি, অতদূর তুই কোনোদিন যাসনি। অতক্ষণ গাড়ি চালানোর পরে অমন একজোড়া চোখ, চোয়ালের ধার, নরম গ্রীবা আর কখনো কেউ দেখেনি। আর কেউ কখনো অমনভাবে কারোর বলা কথার দিকে হৃদয় পেতে রাখেনি।

এইসব আগুনঝড় ভূমিকম্প পাতালের আগ্রাসন মিটে গেলে একদিন আমরা ওই বাড়িটার খোঁজে বেরিয়ে পড়ব। দড়জায় টোকা মেরে বলব, একটু বরফ পাওয়া যাবে আপনার কাছে? এক আধটা পিক আপ ভ্যান আর কয়েক ক্রেট বিয়ারও জোগাড় হয়ে যাবে নিশ্চই।

ভাই লুসি, ওই বুঝি শুরু হল। আগুনের হলকার মতো এক একটা বাতাসের ঝাপটা বুঝি আসতে শুরু করল। রাত থাকতে চক্রাকার লাল মেঘ বাবায়ারামের মাথার ওপর জমতে শুরু করেছিল। যেন আমরা জানতাম, শেষের শুরু এরকমটাই হবে।

আমরা এ-সব পাশে নিয়েই রাস্তায় হেঁটে বেরিয়েছি। কিছু যে হবে, তা আমরা জানতাম। কিন্তু বিশ্বাস করতাম, কিছুই হবে না। আমাদের জানা আর বিশ্বাসের মাঝে এখন গরম হাওয়া বইছে। গা যেন পুড়ে যাচ্ছে।

এখন কবরস্থানের পাশে গিয়ে প্রার্থনা করার সময়। যে যার পাপের জন্য নিজ নিজ মাপে শাস্তি চেয়ে নেওয়ার সময়।

কিন্তু যদি কেউই না দেখছে, প্রার্থনা করে কী করব? ঈশ্বর এ-শহর ছেড়ে স্মিথদের ওয়াগনে চেপে চলে গেছেন।

যেন এক বিষণ্ণ মেলায় মাঝরাতে এসে উপস্থিত হয়েছি। এখানে লোকের মুখ নিথর। নাগরদোলা থেকে বিষণ্ণতা উপচে পড়ছে। খেলনার দোকান থেকে দুঃখের ফেনা ভসভস করে বেরিয়ে আসছে। আলোগুলি উজ্জ্বল কিন্তু ফিনফিনে কালো চাদরে ঢাকা। ডাঁই করে রাখা খাবারগুলি পাথর হয়ে গেছে। ছুঁয়ে দিলে ভেঙে যাবে।

আমরা, মানে আমি মার্থা আর বাচ্চারা একবার এই মেলায় এসেছিলাম। প্রচুর জিনিস দু-হাত ভরে কেনার পর, এখানেই আমাদের মধ্যে কিছু একটা বিষয় নিয়ে তীব্র ঝাঁঝালো ঝগড়া শুরু হয়। সেই ঝগড়া শুরুর মুহূর্ত থেকে মেলাটি সেই অবস্থায় স্থির হয়ে আছে। আর ধীরে ধীরে ভঙ্গুর পাথর হয়ে যাচ্ছে।

ভাই লুসি, সেই থেকে একটি ঘামে চটচটে মেলায় আমি পথ হারিয়ে ফেলি। সম্পূর্ণ ফাঁকা মাঠে অসংখ্য গলিপথ সৃষ্টি হয়। অগুন্তি ফেরিওয়ালা তাদের বেলুন, বুদবুদ, খেলনা বাঁদর নিয়ে আমার মুখের ওপর ‘পিকাবু’ বলে উঁকি দিয়ে যায়। অচেনা মুখের পাথর আমি রোজ দেখি।
আজ তোর সাথে মেলায় এসেছি। আজ আবার মেলা চালু হবে। এ-পর্যন্ত সরল আজ আমরা হব।

প্রবীণ বয়সে এসে হোমার অন্ধত্বের গুরূত্ব বুঝলেন। সারাজীবন আলোর জন্য হাহাকার করেছেন। সারাজীবন তার কল্পিত জগৎকে একবার দেখার জন্য আকুলি বিকুলি করেছেন। শেষ জীবনে এসে বুঝলেন, আলো নয়, আলোয় উদ্ভাসিত প্রিয়মুখ, ঘরবাড়ি বস্তুপুঞ্জ— কিছু নয়। অন্ধকারই আসল রূপ। নিকষ সীমাহীন অবয়বহীন কালো। এখন তিনি সেই অন্ধকারের ওপর অন্ধকার দিয়ে আঙুল নেড়ে নেড়ে আলপনা আঁকেন।

ভাই লুসি, আমরাও কি সেরকমই কোনো অন্ধত্বে ডুবে গেছি? দেখতে পাচ্ছি কি পাচ্ছি না তা-ই বুঝতে পারছি না। আলো আঁধার গোধূলি সকাল সাদা কালো ধোঁয়া ধূসর— কিচ্ছুটি এখানে নেই। এখান বলতে ঠিক কোথায় তা-ও স্পষ্ট নয়। পৃথিবীর বুক থেকে আমাদের শহর স্বেচ্ছায় গুটিয়ে নেই হয়ে গেছে। শহরের স্মৃতিও আর আমাদের মধ্যে নেই।

লুসি, আমি তোকে ডাকছি, কথা বলছি বটে, তুই আদৌ আমার সাথে শোনার দূরত্বে আছিস কি না জানি না। গাধাটি কোথায় গেল? আমিই-বা কই?

এ-সবের মাঝে হোমারই-বা কী করছেন? কী লিখছেন?

প্রথম ক-দিন ওরা খুব ঈশ্বর ডেকেছিল। ওরা, যে যেরকম, মাটিপূজারী, পাখিবাদী, ব্যথাসঞ্চয়ী, অবিশ্বাসী— যে যার মতন করে প্রাণ থেকে আবেদন পৌঁছোনোর চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। একদিনও কোনো গাছতলা, গুহা, পাতালঘর, যাদুর মাধ্যমে রোগ সারানো— একটি দরবারের একটি সিটও খালি যায়নি। লোকে রাস্তায় হাঁটু ভেঙে ভেঙে বসে পড়েছে যখন তখন।

প্রথম যেদিন বাবায়ারামের মাথা নড়ে উঠল, তার প্রায় একমাস আগে থেকে চৌকো টেলিভিশনের ভেতরে থাকা মেয়েটি হাত পা নেড়ে আমাদের নীচে, মাটির তলায় সান্দ্র আগুনের চলাচলের কথা বলে আসছিল। শহরের কেউ শুনতে পায়নি। শহরের সকলে সকাল হলে গাড়ি নিয়ে ট্রাফিকের মধ্যে লাফিয়ে পড়তে, বিকেল হলে সেই ট্রাফিক ভেঙে ভেঙে বাড়ি ফিরতে, সপ্তাহ শেষে আবার সেই গাড়ি নিয়ে সমুদ্রের জলে পা ডোবাতে বেরিয়ে পড়তে ব্যস্ত ছিল। রেস্তোঁরাগুলি প্রতি সন্ধ্যায় মানুষের সমবেত গুনগুনানিতে গুনগুন করছিল। প্রথম যেদিন বাবায়ারামের মাথা নড়ে উঠল, টেলিভিশনের ভেতরে থাকা মেয়েটি সেদিন আর হাত পা নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা করল না। সেদিন তার ঠোঁটের একপাশে এক নীরব আধখানা হাসি ফুটে উঠল। সেদিনও গোটা শহরে তাকে দেখার কেউ ছিল না। সকলে, যে যেখানে ছিল, স্তব্ধ বিস্ময়ে বাবায়ারামের মাথার দিকে তাকিয়ে ছিল।
ঈশ্বর ডাকার পর্ব একদিন শেষ হলে সকলে শুঁড়িখানায় গিয়ে ভিড় জমাতে শুরু করে।

অর্ণব রায়

জন্ম ১৯৮২। পশ্চিমবঙ্গের মালদা শহরে। মূল আবাস মুর্শিদাবাদের লালগোলা। লেখাপড়ার খাতিরে মালদা, কলকাতা ও কাশীধাম (বারানসী) ঘুরে চাকরিসূত্রে এক দশকের বেশি মুর্শিদাবাদেরই রঘুনাথগঞ্জে থিতু। পূর্বপ্রকাশিত দু-খানি কাব্যগ্রন্থ। ‘ঋজু চিকন বিস্মিত সরল’ (পত্রলেখা, ২০১১) ও ‘করুণাসমগ্র’ (সিগনেট প্রেস, ২০১৮)। আর দু-খানি গল্পগ্রন্থ, ‘মেজোবাবু আসবেন ও অন্যান্য’ (সৃষ্টিসুখ, ২০১৬) ও ‘আট ইঞ্চি পা’ (বৈভাষিক, ২০২০)।

আমাদের নতুন বই