লেখক নয় , লেখাই মূলধন

কবিতা

বাপি গাইন

 

ভেঙে পড়বার মতো এক কাঠের চেয়ার কেবল, মানুষ নই
সারাদিন বারান্দায় জানালার সামনে বসে থাকি
যেন জন্মের আগে থেকে এই চোখের অপূর্ব এক খিদে
যেন মৃত্যুর পরেও এই চোখের কোনো বিরাম নেই

সুখী ও সফল মানুষের পৃথিবীতে
ঋতু পরিবর্তন হয় তবু
কেবল প্রার্থনায় বসার এই ভঙ্গিমার
কোনো পরিবর্তন হয় না

অশ্রু হারানোর পর, চোখ নয় জেগে থাকে পাথুরে দৃষ্টির চর

আমার ভেতরে যত মেঘ, আমি ততটাই শুষ্ক মাটি চাইছি ঝরে পড়ার, তোমার কাছে। যতটা আগুন আমাকে ঘিরেছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ততটা জলীয় ত্রান চেয়েছি, তোমাকে হত্যা করতে আসিনি। অথচ তুমি আমার শোবার ঘর তুলে নিয়ে গেছ, তোমার বরদির কাছে। যে-আঘাতে আঘাতে পাথর তাকে তুমি এনেছ আমার শোবার ঘরে। ফলে আমার অসহ্য রাতদিন, আমার কুয়াশায় কুঁকড়ে যাওয়া ভাষা তারও সহজপাঠ হবে না স্বাভাবিক। এ-সমস্তই হালকাভাবে নিতে হবে। আমার ভেতরে যত মেঘ, হালকাভাবে নিতে হবে আমাকেই। আমার ভেতরে যে-আগুন, শেষপর্যন্ত আমাকেই নিতে হবে তার ছাইয়ের অধিকার।

কতদিন লিখি না কিছুই
পর্ণমোচী বৃক্ষের মতো যেন সব কথা ঝরে গেছে, সব ব্যথা
জল থেকে উড়ে যাওয়া পাখি
জলে সামান্য ঢেউ এই মাটিতে আছড়ে পড়েছে।
হতভম্ব পাথরের মতো শুধু দেখে যাওয়া, এই চোখ
আর কোনো প্রশ্ন করে না।
এক্ষুনি অথবা একটু পরে মরে যাব
এই চেতনা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এখনও।

নিভৃত প্রশ্নের আলোয়
মৃত্যু নিয়ে অহেতুক কষ্ট পাচ্ছ তুমি
জীবন যেভাবে সম্ভব যায় নিজেকে অতিক্রম করে
প্রকৃতির গর্ভে সেভাবে কিছুই অপচয় হয় না।

প্রতিটা উত্তরের পর তাই
যে-প্রশ্নটির মৃত্যু ঘনিয়ে আসে
অজ্ঞানতাবশত তার জীবনপ্রণালী লক্ষ করি
দেখি জন্ম ও মৃত্যুকেই একমাত্র খিদে দিয়ে প্রশ্ন করা যাচ্ছে
অর্থাৎ এই প্রশ্নমুখর খিদের অজ্ঞানতাই জীবন
জীবন আমাকে ভুলতে বসেছে পথেঘাটে।

একমাত্র উৎসবের দিন এলে বোঝা যায়
উৎসবের মানুষ আমি না
আলো ও অন্ধকারের ভেতর— বেড়ালের গলায় আটকে থাকা ঘড়ির কাঁটা।

দিনের শেষে মানুষের তবু একটাই গল্প থাকে, উল্লেখ করার মতো।
গল্পের খাতিরে মানুষ ফুলপ্যান্ট পরা শেখে
দু-আঙুলে সিগারেট ধরার কৌশলও, অভ্যেস হয়ে যায় ঠিক একদিন।

গল্প এতটাই গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক
উঠতে বসতে তাকে নিয়ে ট্রেনে-বাসে-নেটে
এমনকী মন্দির আর বিধানসভায়ও মানুষের নিস্তার নেই।

ধর্মযুদ্ধ আর অজ্ঞাতবাসেও গল্পের মহিমা বহু প্রাচীন।

নেই নেই করেও অতিচর্চিত এক গল্পের আওতায়
প্রতি মুহূর্তে আমি মুদ্রিত হচ্ছি
যার স্বত্ব এখনও অরক্ষিত পৃথিবীর কাছে।

বাপি গাইন

উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁতে থাকেন। কবিতা নিবেদিত প্রাণ। কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লেখেন। তাঁর প্রকাশিত একটিই কাব্যগ্রন্থ ‘নেগেটিভ মুহূর্তের কবিতা’। ‘তবুও প্রয়াস’ থেকে প্রকাশিত হয়।

আমাদের নতুন বই