কবিতা

কৌশিক সেন

চারুলতা

গোবিন্দ মেসো যেদিন সন্ধ্যেয় দ্বিতীয় পক্ষ নিয়ে ঘরে তুলল,
সেদিন দুপুরে চারুমাসির বাড়ি গিয়েছিলাম। মা পাঠিয়েছিল,
একবাটি কুচো মাছের চচ্চড়ি দিয়ে।

চারুমাসি শুয়েছিল বিছানায়। আমায় দেখে মাসি বলেছিল,
আমার কপালে হাত রেখে দ্যাখ না বুধু, বড়ো গা ম্যাজ ম্যাজ করছে।
আমি দেখেছিলাম মাসির সারা শরীরে ডালপালা মেলছে
মস্ত একটা কলকে ফুলের গাছ। ঝুমঝুম করছে ফুলে…

চচ্চড়ির বাটিটা রেখে এসেছিলাম গাছের ছায়ায়। পেছনে ফিরে
দেখেছিলাম কুচো মাছগুলো লকলকে সাপ হয়ে গাছের শরীর বেয়ে
উপরে উঠছে…

উত্তরকাণ্ড

অমিত্রাক্ষর ছন্দে বাবা যখন একটা মহাকাব্য লেখা শেষ করেছে,
মা তখন সবেমাত্র ফোড়ন দিয়েছে ডালে।
বাবা ডাকে, শুনছ একবার এসো না গো, নতুন লেখা কাব্যখানা পড়ে শোনায়!

মা গ্যাস কমাতে ভুলে যায়, বাবা কাব্যখানা পড়ে চলে…

উত্তরকাণ্ড আসতেই পোড়া গন্ধ আসে রান্নাঘর থেকে। মা ছুটে যায়।
দেখে ডালের কড়াইয়ে টগবগ ছুটে চলেছে অশ্বমেধের ঘোড়া

মেয়েমানুষের গল্প

যেদিন জবাকুসুম তেলের শিশিটা হাত থেকে পরে
ভেঙে গিয়েছিল, ও-পাড়ার ডলিবউদি নিখোঁজ হয়ে
গিয়েছিল, বাড়ি থেকে, ভরদুপুরে। শিলনোড়ায়
সর্ষের সাথে কাঁচালঙ্কা বাটতে বাটতে যেদিন কাকের
ডাল শুনেছিল মান্তুর মা, সেদিন মাঝরাতে নিশিতে
ডেকে নিয়ে গিয়েছিল পাশের বাড়ির বিয়ের বয়স
পেড়িয়ে যাওয়া শ্যামলী পিসিকে।

তারপর যেদিন দোল পূর্ণিমার রাতে আমার মাথায়
অনেকদিনের গল্প জমে উঠল, জ্যোৎস্নায় জবাকুসুম
তেলের গন্ধ পেলাম আর চোখে লাগল লঙ্কা সর্ষের
ঝাঁঝ। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, সোনালি আলোয়
আমার কলমের দিকে নির্ভার হেঁটে আসছে
ডলিবউদি, শ্যামলী পিসিদের মতো জ্যোৎস্নাময়ী মেয়েমানুষেরা

চাঁপাফুলের কথা

পুরোনো প্রেমিকার বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে
আজও ঠাকুরঘরের পাশে মরা চাঁপাগাছে
ফুল ফোটে। লক্ষ্মী আসনে গন্ধ ছড়ায়।

প্রেমিকার ভাইপো ভাইঝিরা কুড়িয়ে নেয় ঝরা ফুল
বলাবলি করে, মালা গাঁথবে এবার। পিসিকে পড়াবে
পুজোর ছুটিতে বেড়াতে এলে।

আঁশ

বাবার জামাকাপড় থরে থরে সাজানো, মায়ের আলমারিতে
মায়ের শাড়ির পাশে।
আগে আলমারি খুললে বাবার গায়ের গন্ধ আসত,
এখন আসে না।

এবার মায়ের আলমারি খুলে দেখেছিলাম,
মা ঝোল-ভাত রেঁধে রেখেছে আলমারির লকারে
বাবার ছেড়ে যাওয়া লুঙ্গিতে মাছের ঝোলের আঁশটে গন্ধ!

জন্মকথা

আমায় যেদিন জন্ম দিয়েছিলে, মাগো
অমৃত পয়স্বিনী গাভীর মতো স্নেহ নামিয়ে এনেছিলে
নিরাভরণ আলপথে, কাশবনে, সাত সকালেই…

যেদিন জন্ম দিয়েছিলে আমায়,
কমণ্ডলু থেকে শান্তিজল ছিটিয়ে ছিলেন কুলগুরু
নিকানো তুলসীমঞ্চ জুড়ে সেদিন রৌদ্রের উৎসব…

রোদ নেয়ে হেসে উঠেছিল শালুক ফুলের মেয়ে
মাগো কবে আবার তেমন জন্ম দেবে আমায়!

কৌশিক সেন

জন্ম ১৯৭৬, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদে। ছাত্রজীবন ও বেড়ে ওঠা বহরমপুর শহরেই। কলেজ উত্তীর্ণ হবার পর কঠোর জীবন সংগ্রাম করে সাতাশ বছর বয়সে দিল্লিতে আসেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিক। সতেরো বছর ধরে দিল্লির বাসিন্দা। দিল্লি ও দিল্লির বাইরে কিছু পত্র পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত ও প্রশংশিত। একটি কাব্যগ্রন্থ ‘রাই জাগো গো’ প্রকাশিত।

আমাদের নতুন বই