লেখক নয় , লেখাই মূলধন

কবিতা

পঙ্কজ চক্রবর্তী

ধুলোর সংবাদ

আমি তো ভাবতেই পারি শোক নামমাত্র। চলে যেতে পারি আমোদিত ধুলোর অরণ্যে। তুমি জল দাও বারান্দায় প্রতিটি শিকড়ে। খুব যোগ্য মানুষ আমি নই। অবিবেচক। হলুদ পাতার দু-পাশে রান্নাঘর এঁকে বসে থাকি। ভাবি ভুল মানুষের বুকের আগুনে ফুটবে ডালভাত। দরজার ফাঁকে তদন্ত করবে তোমার পাঠানো লোক। ‘হাত পুড়িয়ে খায়’ এই মর্মে সংবাদ ছড়াবে বাজারে।

তোমার স্তন্যপানে প্রতি রাতে জেগে ওঠে হলুদ পাতার এক বাঁশি। আজ যদি তুমি না বলো, কেমন করে বুঝব মধ্যরাতে প্রতিটি গাছ একাই ঈশ্বর!

আবাসন

সূর্যাস্তের আলো গায়ে মেখে তুমি নেমে আসছ দশতলা বিল্ডিং থেকে। আজ তোমার ছেলের জন্মদিন। সকালে তার মুখ দেখা হয়নি। তবু মেঘের কানে কানে শুভেচ্ছা চেয়েছ এই জীবনের। এত উপর থেকে মনে হয় পিপাসা নিরর্থক। তবু শূন্য বুকে দম্পতি চায় ছোটোবাড়ি। সামান্য কয়েকটি ফুলগাছ। আর তখনই তোমার মনে পড়ে উটের সাম্রাজ্যে পোশাকের মূল্য নেই কোনো। তবু বাড়ি ওঠে মাঠের মাঝখানে। শূন্য হাওয়ায় ভেসে যায় তোমার সর্বস্ব। ঐ তো বাড়ি ফেরার পথ…

ঘরের জ্যামিতিটুকু নিঃসঙ্গ রান্নাঘরে একফালি আলো জ্বেলে রাখে…

গোধূলি

দীর্ঘস্থায়ী বাসনপত্রের ভিতর এখন তোমাকে দেখতে পাই। যেন পলাতক উড়োমেঘ, গাছের সংসার। তুমি দেবদূতহীন বেঁচেছিলে আরও পনেরো বছর। বাবার ফরিদপুরের কাঠের ছোটোবাক্সে জমিয়ে রাখতে দু-জন মানুষের অসংলগ্ন চিঠি। এখন আশ্বিন মাসের দুপুর। নিখিলেশ কাকুর আত্মমগ্ন প্রতারক ছায়া পড়ে আছে দক্ষিণের বারান্দায়। মানুষের রক্তমাংসে উপমার রাগ তেমন দীর্ঘস্থায়ী নয়। তোমাকে ডাকতে ডাকতে সুতো গুটোচ্ছি কেবল

এই তো সেদিন নিমগাছে এসে বসেছে নিজস্ব লাল ঘুড়ি। আমি তার পিছু পিছু অতর্কিতে পিছনের জানলা খুলেছি…

বাজার হাটের কড়চা

এই যে প্রতিদিন বাঁচি সে শুধু বাজার, ম্লান কিছু দোকানপাটের আলো। কয়েক টুকরো কাগজ আর ঘন ঘন প্লাস্টিকের বিবাহবন্ধনী। যদি সে আসে অলৌকিক হবে। মেঠোজল, বৃষ্টির দিন মনে হবে আঁধারের নৌকোবিলাস। নদীর ওপার থেকে এই তো সেদিন এল ঘন দুধ আর সুগন্ধি সাবান। খদ্দের দোকানীর লুকোচুরি খেলা কেমন স্বাস্থ্যবান শুয়ে আছে পথের ওপরে। কয়েকটি কুকুরের ছায়া আগন্তুক ঢুকে পড়ে জীবনীর প্রকাশ্য দরজায়।

আমরা নেই-মানুষের দল আজও দেখি দোকানপাট, রজকিনী ভাঙাচোরা আলো, ঢুকে পড়ছে অস্পষ্ট বুকের ভেতর। দু-একটি ধানখেত, নদী, সমুদ্র, নিকষিত হেম ছাড়াই দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকা গেল।

বাজারসমিতি

বাজারসমিতি, তুমি অনুরাধা পাড়োয়ালের শ্যামাসংগীতের মতো উদাসীন। খুব ভোরে মায়ের আঁচলে টের পাই উনোনের থাবা। ঐ তো এক হাজার চোখের সামনে তুমি কীভাবে খুলে ফেলো শাড়ি দূর থেকে দেখি। বেলা বাড়ে। চায়ের দোকানে ধারবাকি। সস্তার সিগারেট। তোমার স্তন, বাম বাহু উঁকি মারে বাজারের থলির ভিতর। শুধু সুখী মানুষের নিস্পৃহ চোখের মতো আরেকটা দিন চলে যায়।

তোমাকে এনেছি বিবাহ করে নগদ কুড়ি হাজার টাকা আর লাল সাইকেলের বিনিময়ে। এসো, বোসো, এমন এক বিকলাঙ্গ আখ্যানে। ঐদিকে শনিমন্দির, অলঙ্ঘ্য শ্যামাসংগীত— তার নীচে মাতৃআজ্ঞাবহ জল।

অবমানব

মেয়েলি কিশোর জানে নারীবাদ বলে কিছু নেই। শুধু তার চোখের চাহনি সন্দেহ করেছিল পুরুষের ছায়া। বাথরুমের দেওয়ালগুলি কবে থেকে ছন্নছাড়া প্রেমিকের চোখ? প্রতিদিন আয়নার ছবি জানে নির্জন বুকের রহস্য। প্রতারণা। লিঙ্গের পবিত্র আবহসংগীত। নারীর বুকের উপর, হে মায়াবী পুরুষ আমাকে চর্বচোষ্য খাও। ছুঁড়ে দাও রজঃস্বলা নদীর ওপারে। যদি পিতৃপুরুষ খোঁজ নেয় বলে দিয়ো নিজস্ব পাজামা আমি রেখে গেছি গাছের কোটরে।

নেই, নেই, কিছু নেই, সত্যি নেই, মেজদির দ্বিতীয় স্বামীর জীবনে। শুধু বাঁশবন থেকে একটু দূরে এখনও উড়ছে তার সন্ধ্যার রক্তমাখা প্রেমের অক্ষর।

পছন্দের বই