গোলাম রসুলের কবিতা

কালো মানুষ

এত মেঘের রাতে আমি পানশালার সিঁড়িতে বসে দেখছিলাম তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আগুন ধরাচ্ছে কেউ

অবশেষে জ্বলে উঠল একটি কালো মানুষ
পৃথিবী যখন মানুষের মতো আচরণ করে

ঘুমে আচ্ছন্ন শহর
রোগে ভোগা রাস্তায় দু-একটা ফেন্সি গাড়ি
হাওয়া কিছুটা ছিঁড়ে ইলেকট্রিক তারের মতো ঝুলছে
ভোরের পিরামিড থেকে বেরিয়ে আসছে একটি কবর

সকালে আমি কবর খানার ধার দিয়ে ফিরে আসছিলাম
গাছের পাতাগুলো তখন খোলা ছিল

কাঁধে আইসব্যাগ আমার নির্জন বাড়ি

যত বার আমি জলের ধারে আসি
দেখি কীভাবে সব মর্মান্তিক হয়ে ওঠে
বেলা ডুবে যায় হাসি ঠাট্টায়
আলো বদলে নেওয়া অন্ধকারের কোনো ফাঁপা শব্দের ওপর নৌকা গুলো ভাসতে ভাসতে চূড়ান্ত শূন্যে গিয়ে একসময় ভেঙে যায় পৃথিবীর কাঠামোটি
আকাশ তখন হাফহাতা জামা
যে নীল সার্ট পরে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম

কাঁধে আইসব্যাগ আমার নির্জন বাড়ি

শীতল রাত্রি নামে
আর একটা ভৌতিক রিক্সা এসে দাঁড়ায়

শূন্যের উপশিরায় চাঁদের ধড়
কেউ এসে ফেলে দিয়েছে তারে ওই বিপুল তরঙ্গে

মধ্যরাতে মানুষ এখানে হাতে করে নিয়ে আসে শহর
আর রেখে দেয় কিছুক্ষণ
রুগ্ন ভাব শেষ নক্ষত্রটি জ্বলে সেযুগের গরীবের রান্না ঘর

নিকটতম বন্ধুর মতো শুধু মেঘ
আমি বার বার জলের ধারে গিয়ে দাঁড়াই

রোগা আকাশ

রোগা আকাশ
আমি ওপরের ঘরে
আর জানলাগুলো বুড়ো কয়েকটি শকুনের মতো ঝিমিয়ে রয়েছে
ঠোঁটে ধরা হাওয়ার হাড় এই বাড়িগুলো
এখনো গাড়িগুলো তোলপাড় করছে শহরকে নিয়ে
আর শহরটা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাচ্ছে

সবচেয়ে উঁচু
মাতালের মূর্তি
ওখানে প্রতিষ্ঠিত চাঁদ kind
আর হাসপাতালের কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে ভেসে আসছে অসহ্য গান
নদী পান করছে পিউর ইট ড্রেনের জল
জানোয়ারের ছায়াগুলো ভয় দেখাচ্ছ
গলির মুখে বধূ
বিবাহবাসর
পৃথিবীতে স্বর্গের আসবাব দিয়ে তৈরি করা নির্ঝর
দুঃখের রং মশলা
আর সুরাপানে অজস্র নক্ষত্র
মানুষের সমুদ্রতীরে আমাদের দ্বীপমালা শুধু বিজ্ঞাপন
সারাদিন অবরোধে বন্ধ ছিল বিপ্লব ধর্ম আর রাষ্ট্র
সন্ধ্যায় গজিয়ে ওঠা ক্রুশবিদ্ধ দোকান
আর কেউ কেউ ঝগড়া করছে বন্ধুত্ব নিয়ে
জলের জন্মের মতো মনুষ্যত্ব
রোগা আকাশ
আর অসুখে ভোগা সময়

শূন্যের চেয়ে শূন্য

শূন্যের চেয়েও আমি শূন্য হয়ে যাই
আলো পার হয়ে দেখি আমার হৃদয়
যে অনুসরণে তৈরি করে নিয়েছি ভালোবাসা আর স্নেহ
শরীরের ভেতর কেঁপে ওঠে পৃথিবী
প্রতিটি হিংসা ধারালো হতে হতে আত্মহত্যা করে

দৃষ্টি অসংখ্য রেখাপাত
যেমন আমাদের আকাশ আর নক্ষত্র

মানুষ কখনো নিখুঁত নয়
অনুশীলন করে মেঘ
বৃষ্টি পড়ে

আমাদের অসহায় শূন্যের চেয়ে শূন্য

আমাদের মর্মর মূর্তির অসুখ

আমাদের মর্মর মূর্তির অসুখ
আমাদের একাকীত্ব মেঘের ফসিল

আকাশে নুনের ছিটে
রান্নাঘর থেকে মেয়েরা দেখছে তাদের গর্ভের মধ্যে শিশুরা কীভাবে বুড়ো হচ্ছে
আর পৃথিবী একটি কমলালেবুর মতো খসে পড়ে যাচ্ছে গাছ থেকে
সূর্যের কাটা চামচ জ্বলছে
যেমন জ্বলন্ত হাত
আমরা ছুঁড়ে দিচ্ছি ভাগ্যের রুটি
মানুষের সংজ্ঞা জিরাফের গলা
তাকিয়ে রয়েছে দুটি মরুভূমি
কেউ কেউ বিপ্লবের গান গাইছে
আর মিছিলের সবার আগে ছেড়ে দিয়েছে একটি ঈগল
কাল পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল সবকিছু
জানি না কীভাবে নতুন করে সংক্রামিত হলো আমাদের জামাকাপড়
আমাদের মর্মর মূর্তির অসুখ

আগামীকাল পৃথিবীর সবচেয়ে একটি দয়ালু দিন

নৌকার চেয়েও ছোটো হয়ে এসেছে নদী
আমি তার কিনারায় বসে বাজনা বাজাই আর চাপা দিই মানুষের কান্না
আরো ছোটো হয়ে এসেছে পৃথিবী
ঠিক একটি বেঁটে মানুষের মতো
ভেবেছিলাম জলে আমি লিখব মানুষের কথা আর পৌঁছে যাবে সমুদ্রে
শক্তিশালী একটি দাঁড় যা আমি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলাম মায়ের পেট থেকে
আমাদের জন্ম ছিল পরিস্রুত রক্তে

আমার চোখে এখন বরফ
আর এত মানুষের মৃত্যুর জন্য একটি একটি করে বরফের চাঙ গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে কাঁধ থেকে
যে মানবিক পর্বতকে আমরা সম্মান করতাম

সঙ্গীতের পোড়া গন্ধের মতো সূর্য
তার নিচে আমাদের হাত করজোড়ে
আমারা যেভাবে হত্যা করতাম পশুদের

শরীরের ভেতর সেইসব অন্ধকার
অনেক কষ্ট করে আমি দেশলাই কাঠি জ্বালি হৃদয়ে
আগামীকাল পৃথিবীর সবচেয়ে দয়ালু একটি দিন
আমাদের রক্ষা করবে

বৃষ্টির কিছু আনন্দ এখনো আমি পাই

একটু আগে তোমার কবরে পৌঁছে দিয়ে এলাম একটি চিঠি
কেউ আমাকে দিয়ে গিয়েছিল
সামান্য মেঘ আর কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি

তোমার মরণের সময় আমার বিশেষ কিছু করার ছিল না
আর আমি জানতামও না কীভাবে মরতে হয়

নির্জন ঘরে আমার অস্তিত্বকে সবচেয়ে বেশি দেখি
সারাক্ষণ তাই রাস্তায় ঘুরে বেড়াই
পৃথিবী যেমন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে
সেই রূপ আমার ঘুরে বেড়ানো ছিল একটি কবরখানাকে ঘিরে

সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল
আমিও কখন যে মেঘ হয়ে গিয়েছিলাম মনে নেই

গভীর রাত
ভারী হচ্ছে আমার অস্তিত্ব
আর শুনতে পাচ্ছিলাম মানুষের কবরে বৃষ্টি হচ্ছে
তুমি এখনও মেঘের দেহ রেখা
বৃষ্টির কিছু আনন্দ এখনো আমি পাই

নিজের আড়ালে

মৃত্যুকে বিদেশ থেকে বয়ে নিয়ে এল যারা তারা এখন অর্ধেক ঈশ্বর হয়ে গেছে

কোনো এক নিজের আড়ালে মানুষ

আমি কিছু জানি না
একবার শরীরের কাছে যাই আর একবার পৃথিবী ধরে দাঁড়াই
তখন পৃথিবীর দেয়ালের বাইরে ভারী পায়ের শব্দ আমাদের অনুসরণ করে
আর দিনগুলো গৃহবন্দি সূর্যের কান্না
একদিন যে আগুন ছিল বেগবান ঘোড়ার মতো
রাজরাজাদের কাহিনির ঝোঁপঝাড়
এখন সে সব ভিজে মেঘের গাছ
গলির মুখে হাড়হীন মেয়ে
প্রেম আকাশের টিকা
পাতলা কানের গড়নের মতো
প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত সব শোনা যায়

জলের প্রহর
কিনারায় দাঁড়িয়ে শূন্য কেউ
মানুষের সান্ত্বনা শুধু জলের দিকে চেয়ে দেখা

মৃত্যু হাতে হাতে বিলি হচ্ছে
আমাদের বন্ধুত্বের মতো

আর বিদেশ থেকে মুখোশ আসছে
খুব সাবধানে

মানুষের দিগন্ত

এ পর্যন্ত যতবার আমি অদৃশ্য বাড়িটার দিকে তাকিয়েছি দেখেছি পৃথিবী পাঠ্যপুস্তকের মতো
অরণ্যের পাঠ আর একটি রেললাইন তীব্র বেগে ছুটে চলেছে মানুষের দিগন্ত ভেদ করে

থেমে দাঁড়িয়ে ক্রুশবিদ্ধ চাঁদ

ভাবছিলাম সন্তানের জন্ম দিতে দিতে নদীগুলো বয়ে চলেছে কতকাল
জলাভূমির বাল্যকালে ভাসছে মেঘ
আর বুড়ো নৌকার ছাদের মতো আকাশ
জীবন অভ্যাস মাত্র
গাল ভর্তি শ্যাওলা
বিরহের ব্যথার উৎস থেকে জেগে উঠছে ডাঙা
আর ভালোবাসা লঘু ঢেউ
আঘাত করে হৃদয়ে

একটি ধারালো যন্ত্রাংশ
ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে নিজে নিজে
তারপর নিড়ানিতে খুঁচিয়ে তোলা দারুন কল্পনা
হাওয়া একটি নিশাচর মেয়ে সারা রাত উঠোনে নাচে
আর তেমন করে বাড়িটা হারিয়ে গেল

Spread the love
By Editor Editor কবিতা 3 Comments

3 Comments

  • ওঁর লেখা বরাবরই ভালো লাগে

    Aritra Chatterjee,
  • অন্যরকম ভালো লেখা।

    হেদায়েতুল ইসলাম বাদল,
  • গোলাম রসুল আমার প্রিয় কবিদের একজন।এই কবিতাগুলিও ভালো লাগল খুব।

    Prabir Majumdar,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *