প্রশান্ত সরকারের গুচ্ছকবিতা

পাখিসর্বস্ব

পাখিদের কথা লিখতে গেলেই যথাসম্ভব ছোটো হয়ে আসে জানালা, প্রথাগত কৌতুহল থেকে সামান্য সচেতনতা উড়িয়ে দিলেই যেখানে দূরত্ব মাপা যেত সহজে, সেখানে কীসেরই বা প্রয়োজন ছিল এতসব বিবৃতির? পাখিদের কোনো মাইলফলক নেই, তাই যেতে যেতে একবারও চোখে পড়ল না ফিরে আসার উপায়…

যে সব মাসের নাম জুলাই রাখা হয়েছিল, তারা এখন ফিরে যাচ্ছে বিকেলের রেডরোড ধরে… অবিকল গাছের আবডাল ছেড়ে কার্নিশ হয়ে উঠছে এখন তারাদের ঘরোয়া বন্দর। যতটা গন্তব্য ছিল তার সকালের রেওয়াজে তার চেয়েও বেশি জোরে বেজে উঠছে ডানা… এই উষ্ণীষে। যতটা দু-চোখ যায়, আসলে ততটাই পাখির পরিধি, আমরা অযথা বিরামচিহ্নে মেপে রাখি তার গতিপথ। পাখিরা ততক্ষণ ওড়ে যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তাকে চেনো….

অমায়িক বলতে যদি এইসব বিষন্নতাই বোঝো, তবে আমরা এখনও ততটাও অসার হইনি

মিথোজীবী

কোনো হত্যাদৃশ্যেই এখন আর অবাক হওয়া সাজে না, যেখানে আমরা জেনে গেছি শরীর মানেই শুধু সোরা, গন্ধক আর কাঠকয়লা, পোড়া ছাই, জেনে গেছি শরীর মানেই হাইড্রোজেন আর বাকিটা ফসফরাস, যেখানে আমরা নিজেই নিজের একমাত্র গুপ্তহত্যাকারী সেখানে কোনো হত্যাদৃশ্যই আর রহস্য নয়। বরং কলারে রক্তদাগ দেখেই বুঝে নেবেন খুন হয়েছিল।

এই যে আমরা এযাবৎ একে অন্যের শরীর ঘষটে শুষে খেয়েছি গুহ্যরস, ভালোবাসা ও ততোধিক সন্দেহ… আর তারপরও আমাদের আয়ু এসে মিলছে না কোথাও। এমন একটা স্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে যদি হারিয়েও ফেলি নির্লিপ্ত স্বভাব, যদি নিজেই নিজেকে আত্মহননের দায়ে দোষারোপ করি, তবে মাননীয় ধর্মাবতার আপনিই বলে দিন এক্ষেত্রে প্রকৃত খুনী কে।

শুধু নির্ভরশীলতা নেই বলে যদি ভিজে মাটির বুক পুড়ে যায় এই অঘ্রানেও, বুঝবেন দায়বদ্ধতাই আসলে আগুন, নাহলে আমি আপনি তো চিরকালই দাহ্য….

নগর-কীর্তন

দেদার আলাপ পেরিয়ে এই বেশ গৃহস্থের মুখোমুখি হওয়া। মুখোমুখি মানে জানো? নিজেরই ছায়ার বিপরীত। হাওয়া দিলে এমনিই নিভে আসে রব। স্থাবর পরিখা জুড়ে ভয়… শুধু ভয় বেজে ওঠে।

পাশাপাশি থাকা মানে শুধু অবিরাম ছুঁয়ে থাকা নয়, শুয়ে থাকা নয় দীর্ঘ কোনো অনুমান নিয়ে। গন্তব্য পারেনি যা যা…. নেহাত সেটা সম্ভাব্য নিয়তি। তা নাহলে, যথেষ্ট অন্যমনস্কতা একদিন আমাদের ভেতরেও ছিল।

এটুকুই ভেদ জেনো, বাকিটা সহজেই অনুমেয়। পুরোনো দালান থেকে এখনও প্রকট হয় ঘর, ঘরানা, আরও কিছু পর্যাপ্ত বিরাম। আমাদের আকাঙ্ক্ষা আর কোনো বিভেদ মানেনি, বিগ্রহ ধরা দিলে আলো ও স্বর, যেন সমবেত।

যৌনতাই প্রকট হবে যদি তবে এমনই অঘ্রাণে এসো, শাশ্বত চন্দনে এখনও সে ছায়া সুনিবিড়। মিছিলই মৌন হোক। শ্রীচরণে ধরা দিলে রাধাভাব জেগে ওঠে যদি…. মরুতকল্যানে।

ডার্ক ফ্যান্টাসি

ধরে নাও কোনো প্রতিবিম্ব নেই আর, শুধু ঋতুরাই আড়াআড়ি প্রতিফলিত হচ্ছে সর্বাধিক রাগে। বিগতের অনুষঙ্গ ছেড়ে যখন গন্তব্যও কিছুটা বিমুখ, তখন আপোষ করে নিতেই হচ্ছে পথ… আর নিজেরই ছায়ার সাথে যথাযথ, স্থিত ও স্থবির। মনে করো দীর্ঘ এক ছায়াপথ, তবু মেরুদন্ড সোজা রেখে কেমন উড়ে যাচ্ছে আরও এক পরিচিত ভ্রমণের দিকে…

চিরকাল যা স্থির, তা তো আরোপিতই। ধরে নাও তারই পরম্পরা থেকে এখন স্পষ্ট হচ্ছে ছায়ার ভঙ্গিমা। আর তার নীচেই আমাদের এই অহেতুক স্মৃতিকাতরতা, এই অন্তিম পরাগ সংযোগ। যেভাবে একটা শুরুয়াৎ ক্ষনিকের দিকে আরও কিছুটা তৎপর।

একেকটা আবদার কাটিয়ে উঠতেই তারপর সহজ হয়ে যাচ্ছে ইশারা। বুঝে যাচ্ছি কোনদিকে ফিরতে চাইছিল আসলে আদল। কমতে কমতে যখন ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকছে আমাদের এই পর্যাপ্ত যাতায়াত… মনে করো এসবই তোমার নিজস্ব কৌতুহল, মনে করো এসবই অলীক ও অমোঘ। এ ভ্রমণ তোমার কাছে তবে প্রাসঙ্গিক নয়, যদি না পুনর্জন্মে বিশ্বাস রাখো।

টাচউড

আড়াই চালে মাত হচ্ছে ঘোড়া… পা-য়ের দেখাদেখি চৌকস হয়ে উঠছে ঘরোয়া বারান্দা, যদিও এখন কিছুটা ঘনীভূত। আর তোমার ফিরে আসা বা না-আসার ওপর এখন কিছুই ততটা নির্ভরশীল নয়। বিষন্ন নূপুর যদি ইশারা না হত স্নানের পর, কীভাবে বোঝাতে তাকে বিকারের রোদ বা আবহ!! যতই বারণ করো— পা, সে তো বাজবেই।

তবুও স্পর্শকাতরতা। তবুও এই নিবিড় কলোনি। এইমাত্র নামকরণ হল যার, ভোরের প্রতিজ্ঞা ভেঙে এখন তাদেরই নেহাত মুখ দেখাদেখি। কঠোর ভায়োলিন থেকে শোনা যাচ্ছে পাখির রেওয়াজ, মরা গাছ যাকে একদিন সংযম শেখাবে বলেছিল।

ব্যাতিক্রম ভেবে তুমি তুলে নিলে সোজাসাপ্টা কয়েকফালি ঘর। নৌকা থেকে এখন দাঁড়ের ভাবনা অবধি যথারীতি মিলে যাচ্ছে সেলাইয়ের ফোর। পা ফেলার আগে বরং আরেকবার ভেবে নাও। সেও তো নিছকই একটা সম্ভাবনা তুমি যাকে চরিত্র ভেবেছ এতদিন। নেহাতই কৌতূহল, নাহলে প্রতিটা ঘোড়াই তো আসলে কোনাকুনি যায়।

পুনশ্চ

কী ভীষণ আলাপচারিতা থেকে তুলে আনছো বিকেলের গান। বয়ঃসন্ধির ইমন থেকে হংসধ্বনি অবধি যেটুকু আলাপ, তাকেই আবার শিখিয়ে দিচ্ছ এই নুপূরের স্রব, এই গার্হস্থ্যকল্যান… আর প্রসূতিসদন। যে তোমাকে জাগাচ্ছে যত বেশি, তুমি তার দিকেই সংশয়হীন ঝুঁকে পড়ছ বাৎসল্যের অনুতাপ নিয়ে।

এরপর প্রথাগত নিয়মেই বিনিময় হবে ডাক। অপ্রাকৃতিক কূটকচালি ছেড়ে সহজলভ্য হবে রোজকার রীতি ও রেওয়াজ। তবু কিছু অবরোহ হয়ত থেকেই যাবে পাখপাখালির ঈষৎ উদ্ভাসে। যদি বলো, তোমাকে এখনও সে প্রাচুর্যের দিকে নিয়ে যেতে পারি… নিয়ে যেতে পারি এখনও সে অভ্যেসের দিকে, যে আমাকে শিখিয়েছে প্রতিটা ভানই আসলে একেকটা আশ্রয়, আর প্রতিটা অনুকরণই আসলে একেকটা তাগিদ। সমস্ত উপাচার ছেড়ে স্বর, এখন নেমে আসছে ঘাসের ওপর। ক্রমে আরও সরলীকৃত হয়ে যাচ্ছে পাতা থেকে কুয়াশার দাগ। প্রবৃত্তি থেকে গেলে একইসাথে বেজে ওঠে করোটির যাবতীয় সুর।

বাদী থেকে পুনর্জন্মের দিকে ফিরতে পারে না সকলে, কেউ কেউ এখনও সহিষ্ণু হয়ে ওঠে….

Spread the love
By Editor Editor কবিতা 3 Comments

3 Comments

  • ডার্ক ফ্যান্টাসি, পুনশ্চ, নগর-কীর্তন অসাধারণ লেগেছি। বাকি লেখাগুলিও ভালো।♥

    অভিষেক নন্দী,
  • দুবার পড়লাম। অনেকদিন পর তোমার কবিতায় সেই পুরনো ঘোর! প্রতিটি লাইন নিজের মতো করে স্বকীয়। সেভ রাখলাম। আরো অনেক নিবিড় পাঠের দাবি রাখে এই লেখাসব।

    Piyali Majumder,
  • খুব সুন্দর লেখনশৈলী। অসাধারণ উপস্থাপনা।

    Sanjay Das,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *