সুপ্রসন্ন কুণ্ডুর কবিতা

ফানুস চেহারা


এই তো বেশ বেঁচে আছি
অযত্নে বাড়ছে ডালপালা
ভূমিকা ছাড়াই আমাকে মাড়িয়ে যাচ্ছে
কচি শোক, তোমার শুশ্রূষা

এই আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি
তোমার ঘাড়ের পাশে
ততটাই কাছে যতটা করুণা ছড়ায়
মহামারি দেখে

আমি আছি
পেটমোটা, ক্ষুধার্ত মায়ের আঁচলে
ক্রমশ বাড়ছি আমি মৃত আলো হয়ে


গল্পের ভেতরে তুমি। দেশ। সমকাল।
আর আছে আমার সন্তান
হেঁটে চলেছে নিরলস
ক্ষিদে নেই। আছে শুধু ক্ষতের প্রলেপ

ঠিকানা বলতে শুধু নীরবতা, মুখরিত স্মৃতিভার।
চলেছে পাঁজর হাতে গল্পের ওপারে

আমাদের সমকাল। রং ধরে প্রখর বিকেলে।
যেটুকু প্রলাপ জুড়ে তুমি আর আমি,
সে সত্য গুজব হবে
দেশ তা ভালো করে জানে

আমরা সকলেই আছি। নেই। থাকি।
অপরের দুঃস্বপ্নে ।

কাকেই বা ডাকব আমি ক্ষুধার শহরে
সকলেই অতিথি আজ স্ব-বাসভূমে

জল চাই। চাই ভাত।
ছেঁড়া হোক, জামা চাই লজ্জা বাঁচাতে।

ছিপছিপে গড়ন তার, ঘুরছে চারপাশে
ভয় হয়, আতঙ্ক দরজা ঠেলে জবানবন্দি চেয়ে বসে!


সকলেই বেঁচে থাকে নিজের কারণে
যেমন মৃতেরা বেঁচে থাকে

এ পাড়ায় বরাবর জলের অভাব
লাইন পড়ে অহেতুক, গল্পের টানে
সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে রোগা মোটা
কদাকার দেহ

সকলেই ঘরে ফেরে অজুহাতে
সকলে ফেরে না ঘরে পথ চিনে রাখে


তুমি যে পোশাকটা পরেছ
সেটা কখনোই তোমার ছিল না
আসলে আমার বলেও দাবি করেনি কেউ

এই যে কেবিলের ছেলেটা তোমাকে ছুঁয়ে গেল
অনুতপ্ত লাগছে নিজের কাছে, এত কাগুজে
সত্য নয়। বেশকিছু মুহুর্তের প্রতিশোধ

অনেকগুলো অভিসন্ধি
আমাদের ডানেবায়ে ছুটে বেড়ায়
চেহারা বুঝে হাত-পা নাড়ে

এখন দেখার
তুমি আমি কতো বার জেগে উঠি


খিদে লুকিয়ে থাকে না
হাত পা ছড়িয়ে বসে মানুষের বেশে
তোমাকে বুঝতে হবে
পেটপুরে খাওয়ার পরও খিদে থেকে যায়
স্বভাবে, মুখের ভাষায়

কেউ সোজা, কেউ উল্টো হয়ে
আমরা সকলেই হাঁটছি সামনের দিকে
চোখ কান খুলে

হুস করে কেউ কেউ ঘাড়ে চেপে বসে
খিদের জ্বালায়


যতবার কাছে গেছি ততবারই
পথ গেছে ভেসে
তোমার বাড়ির পাশে ঐ যে আমগাছ
পড়ে থাকতে দেখেছি নিজেকে, ছাইমেখে
সন্ন্যাসীর বেশে

সন্ন্যাস আমার লক্ষ্য নয়
ঘর ভুলে যাব, সেও তো ভাবি না
তবু হেরে যাই
হারিয়ে ফেলিছি শোক
তুমি যেন সুর তোলো বীনে

লালসা লালিত এই দেহভার
তবে আমি কোথায় রাখি
তুমি কি ঘাটবে ছাই প্রাণ ভালোবেসে


তার চেয়ে ঘরে তুমি পুতুল এনে রাখো
সাজাবে মশকরা করে
তেষ্টার বালাই নেই, ভিজে শোক হাওয়ায় উবে যাবে
যেমন শুকায় কাপড় অনাদরে ছাদের উপরে

ঠিক হবে । ধীরে ধীরে হাসবে তুমি পুতুলের মতো
অথবা পুতুল তুমি হাসতে শিখবে ওর চালে

কে বলেছে প্রাণ নেই, পুতুলের শরীর কাঁপে না!
সব হয় ভেতরে ভেতরে। হাত পা ভাঙলে পরে
জুড়ে যায়

মানুষ ভাঙলে শুধু ভেতরে ভেতরে শত চিড় ধরে থাকে


এই যে চুপ করে বসে আছি
আর ভিতরে ভিতরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর
অন্ধকার পাক খাচ্ছে আনাচেকানাচে
তাতে কি বা করার থাকে আমার

বাবার তরকারি কাটা, মায়ের পুজোপাঠ
বোনের বিড়বিড়— সবই চলছে তবু
আদতে থামার নয় দু একটা সবজি বিক্রেতার আসাও

অন্ধকার পুড়িয়ে ফেলছে অবকাশ
আমি শুধু টের পাই বিষ গড়িয়ে নামছে
হাত থেকে বুকে। বুক থেকে পা হয়ে মাথার ওপরে…

১০
অন্ধকার ঘরে বিড়াল ঢুকেছে
পেটমোটা শরীরটা বোঝা না গেলেও
চোখদুটো স্পষ্ট ইশারা

হুস করে হাওয়া যাচ্ছে কমে
ফানুসের শরীর কি তবে চেহারা হারাবে?

বেড়ালটা ঘুরছে
মাঝেমধ্যে পা চালাচ্ছে ফানুসের মুখে

অন্ধকারে কিছুই যায় না বোঝা
শব্দ শুনে আন্দাজ হয়
বেড়াল ফানুস হয়ে পাঁচিল টপকালো

Spread the love

15 Comments

  • একরাশ মুগ্ধতা ❣️

    Arup Chakraborty,
  • একরাশ মুগ্ধতা

    Arup Chakraborty,
  • বেশ ভালো লেগেছে।
    অনুভূতির দহন হয়ে উঠছে।
    সুস্পষ্ট জীবন, বেঁচে-বর্তে থাকা চারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
    উল্লাস!

    কেশব,
  • বারবার পড়বো।
    কবিকে শুভেচ্ছা।

    Dipankar Mukherjee,
  • আরে গুরু কী লিখেছ,ভালো লেখা সুপ্রসন্ন,খুব ভালো।

    সোহেল,
  • কি বলবো সুপ্রসন্ন, ১০ টি কবিতা দশ ফোঁটা রক্তের মতো ।

    Koustav Kundu,
  • ভালো লাগলো

    রাহুল গাঙ্গুলী,
  • অসামান্য লেখা। এই কবিতা কবির জীবনের একটি স্বতন্ত্র বাঁক। মনে থাকবে অনেকদিন। বেঁচে থাকবে জীবনঘেঁষা এইসব লেখা।

    Pankaj Chakraborty,
  • খুব ভালও লাগলো।

    Neeta Biswas.,
  • একটানে পথ ধরে ছুটে গেলাম…
    পেলাম কতো গন্ধ
    ধন্যবাদ ও ভালোবাসা কবি

    অঞ্জন ভদ্র,
  • অসাধারণ লেখা সুপ্রসন্ন । এতো স্রোতহীন গভীর লেখা অনেকদিন পড়িনি । তোর দীর্ঘ সুস্থ জীবন কামনা করি । ভালোবাসা নিস বন্ধু ।

    Ranjan Bhattacharya,
  • অপূর্ব কবিতা সব। খুব ভালো লাগা। ❤️

    শীর্ষা,
  • মুগ্ধতা! দশটি কবিতায় অসাধারণ!

    Kaushik Sen,
  • অসামান্য কবিতাগুচ্ছ। খুব ভালো লাগল কবিতাগুলি। অসামান্য।

    শুভদীপ সেনশর্মা,
  • অসাধারণ কবিতা, আপনার থেকে এই রকম কবিতা আবার আশা করি।

    Archana Saha,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *