Categories
কবিতা

সোনালী চক্রবর্তীর গুচ্ছকবিতা

সিরিজ— পঞ্চমুখী
(পাঞ্চালি নয়, পঞ্চকন্যাও নয়)

মহামায়া

দেখো, এভাবেই ঠিক, হারিয়েই যাব একদিন, বেঁচে আছি, এই কম্পন পদ্ম কাঁটার মতো ধ্রুবকহীন। ভেসে ওঠে, আবার মিলায়। যেভাবে জল মেনে নেয়, যেকোনো পাত্রে তার সামান্য পরাজয়। পোড়ো বাড়ির আগাছায়, বছর পুরোয় ফিকে হতে নেশারু আবীর। শুধু কিছু ছিন্ন মঞ্জরী গাঁথা হয়, ব্যবধানে গোলাপির। উঠোন জুড়ে শুকনো পাতা ছড়িয়ে শীত ফিরে গেছে, যেন সারা দুপুর ধরে গয়নাবড়ি দিয়ে আর তুলতে আসেনি সন্ধ্যায় সিঁদুরে সিঁথি নিয়ে গঙ্গা যাত্রার ঠাকরুণ। হলদে পাখির পালক খুঁজতে গিয়ে অজানা মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলল শৈশব এক ভগ্ন চিলেকোঠায় কিন্তু কৈশোরে কোনো রূপকথা কাজলের টিপ পরিয়ে গেল না। মেঘেদের দেশে না কি অনন্ত বর্ষা, সংবাদ এল না সবিস্তারে।

আয়ুগ্রাসে বসন্ত পেরোয়…
তবু, সন্তান ফিরবে না জেনেও রোজ তুলসীতলায় ‘মা’ প্রদীপ জ্বালায়।

নিম অন্নপূর্ণা

অভাবী চান্দ্রমাস গৃহস্থালির উঠোনে
খেলতে দেখছে ঝরে পড়া নক্ষত্রকণা,
ভরা চরকায় ডাইনরূপ নিষাদ,
সংক্রান্তির অপেক্ষায় মৃত্যু খুঁটছে
সহস্র বালিহাঁস, নাগ দেবীর মোহিনী হাসি।
খরজমিনে ভুলের বশে এই বছর আউল বারিষ।
আঙিনায় নির্লজ্জ ময়ূরাক্ষীর শরীর।
তুমি উদাসীন ব্রহ্মের মতো কালপুরুষ পাহারায়।
তোমার জ্বলন্ত উনুনে চাপানো হাঁড়িতে জল ফুটছে,
পলাশের রক্তে ছেয়ে উঠছে পাথুরে ভাস্কর্য ক্রমেই,
করতল ঋজুতায় মেপে ধুয়ে নিচ্ছে
আমার অন্ত্যেষ্টির চাল,
এই জনমে, আমি তবে তোমার
নিম অন্নপূর্ণা-ই?

উপাস্য কলঙ্ক

নির্বাসিত উপান্তে কোন ঋষি ফেরে পরিত্যক্ত জপমালার সন্ধানে?
যে মৃগচর্ম আসনের অহং-এ তুচ্ছ করে সাকার উপাসনা, বিস্মৃতি সম্বল হয় তার তৃণে অবিশুদ্ধি সঙ্গমে।
শূন্যস্থান বলে কিছুর স্বীকৃতি নেই এই ব্রহ্মাণ্ডের আদি হতে অন্তে,
শুষ্ক কমণ্ডলু জানে।
মৃত্যু অধিক নিপুণ ও অব্যর্থ ব্যাধ অলভ্য জেনেও
গৃহজ সুখ পূর্ণগর্ভা হয়, শকুন্ত সাক্ষী লোকপুরাণে।

এইসব কঠিন তত্ত্বে মায়াপাশ বড়ো উদ্ভ্রান্ত ঠেকে,
প্রাক্তন আত্মাকে দেখি আন্তর্জালিক আলাপরত,
সরল হতে ইচ্ছে হয়, মুগ্ধ বালকের অনাবিলে,
রাঙামাটি টানে, বিজন প্রস্তর বেলাভূমি,
আমি তো শ্লীল সভ্যতা চাইনি কখনও,
এ আর্য রক্তের উত্তরাধিকার পরম বধ্যভূমি,
জেনেও আমি অতন্দ্র,
সতী হোক অরুন্ধতী,
আমি দক্ষিণ অর্ধে ঈশ্বর রেখে,
ত্রিলোক সিদ্ধ অর্চনার বরাভয়ে দাঁড়াই।
আমি হ্লাদিনী, বিশ্ব কুহকিনী,
তন্ত্রে ডাকিনী ওরফে কলঙ্কিনী রাই ।

দ্বিতীয় লিঙ্গ

নারীজন্ম নাড়িছিন্ন ইস্তক চেনে যুদ্ধসাজ,
জানে অরণ্যে ঋষির কাম,
জলে কামটের রক্তঘ্রাণ,
পর্বতে ব্যাঘ্রের নখ,
আর ভূমে…
প্রতি ক্ষণের কস্তুরী শোক।

‘ধরিত্রী দ্বিধা হও’— পুরুষ বলে না কোনোদিন,
রক্তদাগ ধুয়ে এসে নবান্ন প্রসব করে যে গর্ভ,
তার অভিধানে শেষ আর শুরুর রেহাই লেখে না ভগবান ও তার সৃষ্টির ধর্ম।

তবুও শ্রান্তি আসে হে শ্রমণ,
কোথাও তো নীলচে ঘন অভিমান অশ্রু হতে নামতে চায় গহীন প্রস্তর সীমায়।
কেন যে ভ্রম আজও নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার পেল না,
অলীক রয়ে গেল মাথুর বিক্ষেপ।

নারী চিরদিন নটী…
সতী শিরোপা অর্জনে,
বেহুলাকে ছিঁড়তে হয় স্তনাংশ,
কৃষ্ণাকে বইতে হয় পঞ্চপ্রবলের সমানাধিকার।

ভালোবেসে কি আর অতিক্রম করা যায় চাকার দাগ?

সভ্যতা মানে…
মাটি উর্বর হোক বা নিষ্ফলা,
লাঙলের উপর ন্যাস্ত বীজের সম্ভোগ বিচার।

সোনালু

হরিণী এক আশ্চর্য অমলতাস,
‘ব্যথা’ এক ক্লিশে কাব্যিক শব্দ,
কারোর ঘনত্বের যথার্থ প্রতিনাম কেউ নয়।
পর্যাপ্ত অন্ধকার জমা হতে হতে
অধিগত হয় মায়ার এনাক্ষী সার্থকতা,
কায়া থেকে অগ্নিভ সঞ্চার উৎসারিত হলে
দীর্ঘশ্বাসে আবৃত হয় নাভিমূলের বেদান্ত ঘ্রাণ।
সহ্যাদ্রি দৃশ্য পেরিয়ে কোঙ্কনী চরে
লবণের মাদকতারা উপকূল বিস্ময়।
অথচ, প্রেম শুধুই মীরার পরিহাস।
নির্বাচন কি শুধু রাষ্ট্রসম্ভব ট্র্যাপিজ?
সে তো অস্তিত্ববাদের প্রতিটি ক্ষণ।
মাঘীপূর্ণিমায় ইকোর অলীক নিক্কন দৃশ্য
ঝলসে মুছে দেয় খরবাস্তবের ম্যাজেণ্টা সূর্যোদয়।

শিকড় শিমূল তুলো হলে,
মানুষের ডাকনাম পাখি।
অধিকারের মুঠি আলগা হলে,
কিছু প্রজাপতি, বরফচাপা মাছ।
আর আত্মাবিহীন সঙ্গম,
শকুনবান্ধব শ্মশান।

জড়বাদ গ্রাসের আগে হে চৈতন্য, আমি,
ওংকার পঞ্চমীতে কৈবল্যের প্রার্থনা রাখি।

2 replies on “সোনালী চক্রবর্তীর গুচ্ছকবিতা”

ভালো কবিতার খুব বেশি বাহারি অলংকার লাগে না,কবিকে ভালোবাসা এমন কবিতা লেখার জন্য,আর সেলিমকে ভালোবাসা এমন কবিতা পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *